
পৃথিবী যে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, সেই প্রস্তাব প্রথম করেছিলেন কোপার্নিকাস। এ আমরা সব্বাই জানি। সে গ্যালিলিওর জন্মের বেশ কিছু বছর আগের কথা। তখন কিন্তু টেলিস্কোপের বালাই ছিল না। গ্যালিলিও প্রথম টেলিস্কোপ ব্যবহার করেছিলেন, আশ্চর্য লাগলেও কোপার্নিকাস কিন্তু খালি চোখেই দিব্য জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা করতেন। তবে পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার প্রস্তাব ছিল ঘোরতর ক্যাথলিক-চার্চ বিরুদ্ধ। গ্যালিলিও চার্চের রোষের কবলে পড়লেও কোপার্নিকাসের সাথে কিন্তু চার্চের বেশ সুসম্পর্ক ছিল। এর একটা কারণ, তাঁর এক কাকা ছিলেন বিশপ। দ্বিতীয় কারণ হল, কোপার্নিকাস নিজেই চার্চের কর্মী ছিলেন। উত্তর পোল্যান্ডের ফ্রমবর্ক ক্যাথিড্রালে কর্মরত থাকাকালীনই তাঁর মৃত্যু ঘটে, এমনকি সম্প্রতি তাঁর দেহাবশেষের সন্ধানও এখানে পাওয়া গেছে। কিন্তু তাঁর ব্যবহার করা কোনো সরঞ্জামের সন্ধান পাওয়া যায়নি এতদিন। যদিও তেমন উল্লেখযোগ্য সরঞ্জামের ব্যবহার শুরুই হয়নি তখন, তবুও তামার পাতে খোদাই করা কোপার্নিকাসের প্রতিকৃতিতে তাঁকে ডান হাতে কম্পাস ধরে থাকতে দেখা যায়। ওনার নথি ইত্যাদি ফ্রমবর্কে পাওয়া গেলেও কম্পাস কিন্তু গায়েব ছিল এতদিন।
সম্প্রতি এক অপেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিক দল নেহাৎই শখের বশে ফ্রমবর্ক ক্যাথিড্রালে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে তিন সুড়ঙ্গওলা এক ভূগর্ভস্থ ঘর আবিষ্কার করে। শুধু তাই নয়, সেখানে পাঁচশো বছরের পুরানো এক কম্পাসের সন্ধান পায় তারা। কোপার্নিকাসের কম্পাসের সাথে তার হুবহু মিল। সরাসরি প্রমাণ করা হয়ত সম্ভব হবে না, কিন্তু ঘটনাক্রম সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। কোপার্নিকাস বহু বছর কাজ করেছেন ফ্রমবর্কে, এও জানা যায় তিনি কাছের এক দুর্গে থাকতেন এবং সুড়ঙ্গ দিয়ে চার্চ থেকে সেখানে যাতায়াত করতেন। হয়ত সেই যাতায়াত করার সময়েই কখনো অন্যমনস্ক বিজ্ঞানী হারিয়ে ফেলেছিলেন তাঁর সাধের কম্পাসটিকে। আপাতত পোলিশ সৌধ সংরক্ষণ বিভাগের জিম্মায় আছে এই ঐতিহাসিক কম্পাস, প্রাথমিক কাজকর্ম মিটলে ফ্রমবর্কেরই নিকোলাস কোপার্নিকাস মিউজিয়ামে অবশ্যই দেখা মিলবে এর।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে জীবদ্দশায় সুসম্পর্ক থাকলেও তাঁর মৃত্যুর পর চার্চ কিন্তু ভ্যাটিকানের আদেশে তাঁর লেখা বই নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করে। সে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে লেগেছিল আরো দুশো বছর।
***

এদিকে, তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বে এক অতি প্রাচীন প্রত্নক্ষেত্রে ভারি আশ্চর্য এক ব্যাপার লক্ষ্য করেছেন প্রত্নবিদরা। এমনিতে এই ধ্বংসাবশেষ প্রায় প্রস্তর যুগের শেষ দিকের, অর্থাৎ এর সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব দশম সহস্রাব্দ (10,000 BC)। সেই সময়ে এখানে অস্থায়ী বসতি থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা পরিত্যক্ত হয়। গোবেকলি তেপে নামক এই প্রত্নক্ষেত্রের বিশাল বিশাল স্তম্ভে ঘেরা প্রায় কুড়িটি বৃত্ত বরাবরই ঐতিহাসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। স্তম্ভের সংখ্যা দু’শ। তাদের গায়ে চেনা অচেনা মিলিয়ে নানারকম নকশা খোদাই করা। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে সেই সময়ের যাযাবর জীবনে অভ্যস্ত শিকারিরা হয়ত এখানে আশ্রয় নিত। ধারে কাছে চাষ আবাদের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি, তাই গোবেকলি তেপে যে অস্থায়ী আশ্রয় ছিল তাতে সন্দেহ নেই। তবে ওই নকশা কাটা স্তম্ভগুলো কী কারণে তৈরি করা হয়েছিল, তা বোঝা যায়নি এতদিন।
কিন্তু, ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরার একদল গবেষক সম্প্রতি এই স্তম্ভগুলো আলাদা করে নিরীক্ষণ করেছেন, এবং রীতিমত চমকে উঠেছেন। বেশ কিছু স্তম্ভের সারা গা জুড়ে ইংরেজি ভি অক্ষর খোদাই করা। এই ভি অক্ষর কাল বা সৃষ্টি নির্দেশক দেবদেবীর মূর্তির গলাতেও খোদাই করা থাকতে দেখা গেছে। তাই ভি অক্ষরের সাথে সময়ের একটা সম্পর্ক আছে বোঝা যায়।
একটা স্তম্ভে আবার ঠিক ৩৬৫টি ভি অক্ষর আছে। পাখির মত একটা প্রাণীকেও দেখায় যায় স্তম্ভের গায়ে, তার গলাতেও ওই একই অক্ষর। গবেষকদের মতে উত্তরায়ণ বোঝাতে এই প্রাণীটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত সেই সময়ের উত্তরায়ণে সূর্যকে যে নক্ষত্রমণ্ডলীর সামনে দেখা গিয়েছিল এই পাখি তারই প্রতীক। শুধু তাই নয়, তের হাজার বছর আগে যে বিখ্যাত ধূমকেতু বা ধূমকেতুর দল পৃথিবীর উপর আছড়ে পড়ে ম্যামথদের বিলুপ্ত করে দিয়েছিল, সেই ঘটনাও সযত্নে খোদাই করা আছে অন্য একটি স্তম্ভের গায়ে। তাহলে একে কি পৃথিবীর প্রাচীনতম সৌর ক্যালেন্ডার বলা চলে? কিন্তু গুণে গুণে ৩৬৫ দিনের হিসেবটা নব্য প্রস্তর যুগের মানুষের পক্ষে একটু বাড়াবাড়ি নয় কি? জুলিয়াস সিজার শুনলে নির্ঘাত ডিপ্রেশনে চলে যেতেন।
***

পার্থিব সমুদ্রে ডাইমিথাইল সালফাইডের উৎস হল সামুদ্রিক ব্যাকটেরিয়া আর ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন। তা এহেন বস্তুর সন্ধান পৃথিবী থেকে ১২০ আলোকবর্ষ দূরে পাওয়া গেলে চিন্তায় পড়তে হয় বইকি। জেমস্ ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এমনই এক গ্রহের সন্ধান পেয়েছে। এটি এক্সোপ্ল্যানেট বা বহির্গ্রহ, অর্থাৎ আমাদের সৌরজগতের বাইরে অন্য একটি নক্ষত্রের চারপাশে ইনি ঘূর্ণায়মান। নামও খুব সুবিধের নয়, K2-18b; তা নামে আর কী এসে যায়। তার পরিমণ্ডলে ডাইমিথাইল সালফাইডের উপস্থিতি আসলে প্রাণের অস্তিত্বের ইঙ্গিত কিনা সেটাই দেখার বিষয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অবশ্য এখনই অতটা আশাবাদী হচ্ছেন না, বলছেন- না না ও কেবল মিথেন। তবু কল্পনা করতে ক্ষতি কী? একদিন হয়ত সত্যি সত্যি গোল মাথার এক প্রাণী তার সরল জ্বলজ্বলে চোখদুটো মেলে চার আঙুলের একটা আকাশের দিকে তুলে দূরে, বহুদূরে দেখিয়ে বলবে – ই.টি. ফোন হোম।