FUNবিজ্ঞান- বিজ্ঞানের গল্প- আলতা পায়ের আলতো ছোঁয়া-সৌম্যকান্তি জানা-শীত ২০২৫

সৌম্যকান্তি জানা-র আগের লেখা- ক্লোরোফিল চোর, বঁটিঝাঁপের মেলায়, রঙবদল, অবচেতন মনের আয়না, হাওয়া বাবা হাওয়া, অ্যাটমোবাবু কাবু , শিম্পাঞ্জির হাত, ক্লেয়ারভয়েন্স কারসাজি, ডবল রুটি ধামাকা, মদনের মদ মুক্তি

(এক)

“গলদা চিংড়ির মালাইকারিটা কিন্তু হেব্বি বানিয়েছেন মাসিমা।” গলদা চিংড়ির মাথা থেকে খোসা সরিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে লাল ঘি বার করতে করতে লেট্টুর চোখ-মুখ দিয়ে পরম তৃপ্তি ঝরে পড়ে।

“আর একটা গলদা চিংড়ি দিই বাবা?” রান্নার প্রশংসা যে-কোনো মহিলাকে তৃপ্তি দেয়। মেনাল্ডোর মেজো মাসিও তার ব্যতিক্রম নয়।

“আগামীকাল ইলিশ মাছ এনো তো বাবা।” গলাটা গম্ভীর করে বান্টি ফুট কাটে, “গলদার মালাইকারি আমার একদম ভালো লাগে না।”

“তা লাগবে কেন? যতবার ডার্বি ততবার হারবি। বাজারে শুধু গলদাই পাবি, ইলিশ আর পাবি না।” মেনাল্ডো তার মাসতুতো ভাই বান্টির উদ্দেশে কথার চিমটি কাটে।

আসলে সন্ধেবেলায় মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল নিয়ে মোনাল্ডো আর বান্টির মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে সমস্ত ডার্বিতেই মোহনবাগানের কাছে ইস্টবেঙ্গল হেরেছে। লেট্টু আর মেনাল্ডো মোহনবাগানের সাপোর্টার। বান্টি আবার ঘোর ইস্টবেঙ্গল। আর তাই সুযোগ পেলেই মেনাল্ডো ওর পেছনে লাগে।

তবে লেট্টু মেনাল্ডোর মতো এতটা নির্দয় নয়। সান্ত্বনা দেয় বান্টিকে— “দেখবি পরের মরশুমে সাফল্য আসবে।”

আর তাই খেতে বসে মেনাল্ডোর খোঁচা শুনে লেট্টু বলে ওঠে, “ঠিক আছে। আগামীকাল ইলিশই খাব। তুই টেনশন নিস না বান্টি।”

“কিন্তু আগামীকাল তো আমাদের নিরামিষ হবে বাবা। আগামীকাল গ্রামের দুর্গা মন্দিরে পুজো দিতে যাব।” মেনাল্ডোর মেজো মাসি বলে ওঠে।

“পুজো তো এখনও পাঁচদিন বাকি মা।” বান্টি খাওয়া বন্ধ করে মায়ের দিকে তাকায়।

“সে তো জানি। তবে কাল সকালে আমাদের গ্রামের দুর্গা মন্দিরে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে। শুনিসনি?”

“হ্যাঁ, শুনেছিলাম তো। সকালে কাজের মাসির সঙ্গে তুমি দুর্গা মন্দির নিয়ে কী সব বলাবলি করছিলে। স্কুলে গিয়েও শুনেছি। বন্ধুরা বলাবলি করছিল। দুর্গা ঠাকুর নাকি দুর্গা মন্দিরের পুকুরে স্নান করে মন্দিরের ভেতরে ঢুকে গিয়েছে। আলতা পায়ের ছাপ রয়েছে। এইসব শুনছিলাম। কিন্তু তুমি কী করবে মা?” বান্টি‌ ভ্রূ কুঁচকে বলে ওঠে।

এবারে পুজোর ছুটিতে লেট্টু বাইরে কোথাও বেড়াতে যাবে না বলে ঠিক করেছে। তার কোনও এক সাগরেদের সঙ্গে তার কোনও আত্মীয়ের বাড়ি ছুটির ক’টা দিন ঘুরে আসবে। পাঁচ সাগরেদের মধ্যে কেতো, বুবাই আর পিচকু বাড়িতেই থাকবে। টুকুন বাবা-মায়ের সঙ্গে পুজোর ছুটিতে যাচ্ছে সিমলা। মেনাল্ডো যখন বলল যে সে হাওড়ায় তার মেজো মাসির বাড়ি বেড়াতে যাবে, তখন লেট্টু তার সঙ্গে যাবে বলে পরিকল্পনা করে। মেনাল্ডো ফোন করে মাসিকে লেট্টুর কথা বলতেই মাসি হা-হা করে উঠেছিল। মাসি লেট্টুকে চেনে। সামনে না দেখলেও ওর গল্প অনেকবার শুনেছে মেনাল্ডোর মুখে। আর তাই যখন শুনল যে লেট্টু আসতে চায় তখন বলে উঠেছিল, “আমার বাড়িতে লেট্টুকে আসার জন্য পারমিশন নিতে হবে? যখন মনে করবি লেট্টুকে আমার বাড়ি নিয়ে আসবি। আর যতদিন থাকতে চাইবে লেট্টু আমার বাড়িতে থাকবে।”

ব্যস, এরপরে আর কোন‌ও কথা থাকে না। বাড়ি থেকে সকালবেলা রওনা দিয়ে সন্ধের আগেই মেনাল্ডো আর লেট্টু পৌঁছে গিয়েছে পেঁড়ো গ্রামে মেনাল্ডোর মেজো মাসির বাড়িতে।

হাওড়া জেলার পেঁড়ো থানার অন্তর্গত পেঁড়ো গ্রাম। আমতা থেকে খুব দূরে নয়। আগে নাকি নাম ছিল পাণ্ডুয়া। লোকমুখে পালটে পেঁড়ো হয়ে গিয়েছে। লেট্টু যেখানেই যায় সেই জায়গা সম্বন্ধে আগে থেকে কিছু খোঁজখবর করে নেয়। ট্রেনে শিয়ালদা আসার সময় সে মেনাল্ডোকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “বল তো, অন্নদামঙ্গল কাব্য কার লেখা?”

এক মুহূর্ত না ভেবে মেনাল্ডো বলে দিয়েছিল, “ভারতচন্দ্র।”

“সাব্বাস! তাহলে এবার বল ভারতচন্দ্রের উপাধি কী।”

এসব প্রশ্নে মোনাল্ডো ঘাবড়ায় না। চটজলদি উত্তর দিয়েছিল, “রায়গুণাকর।”

“দারুণ!” মেনাল্ডোর পিঠ চাপড়ে দেয় লেট্টু।— “তাহলে ভারতচন্দ্রের জন্মস্থানটা কোথায় বল দেখি?”

এবার মেনাল্ডোর মাথা চুলকানোর পালা।

“পারলি না তো? আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানেই তো রে।”

“মানে! ইয়ার্কি করছ নাকি?” মিথ্যা সন্দেহে মোনাল্ডোর চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল কথাগুলো শুনে।

“একশো ভাগ সত্যি রে। তোর মেজো মাসির বাড়ি যে গ্রামে, সেই গ্রামেই রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের জন্মস্থান। গ্রামের নাম পেঁড়ো তো?”

“হ্যাঁ, এটাই তো। কী কাণ্ড! আমি জানতামই না!”

“সবাই কি আর সব জানে? পড়িসনি, যাবৎ বাঁচি, তাবৎ শিখি!”

“কিন্তু আমি যেন কোথায় পড়েছিলাম উনি কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ছিলেন?”

“ঠিকই জানিস। জন্ম পেঁড়ো গ্রামে হলেও ওঁর বাবা নরেন্দ্রনারায়ণ রায় বর্ধমানের জমিদারের সঙ্গে এক গোলমালে নিজের সমস্ত স্থাবর সম্পত্তি হারিয়ে পথে বসেন। তখন ভারতচন্দ্র খুব ছোটো। তাই মামার বাড়িতে থেকে ভারতচন্দ্র বড়ো হলেন। খুব ভালো সংস্কৃত শিখলেন।”

“বাহ্‌, তারপর? কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি হলেন কী করে?” মেনাল্ডোর প্রবল কৌতূহল। পাশের দু-তিনজন সহযাত্রীও লেট্টুর কথা তখন মন দিয়ে শুনছেন।

“এর মধ্যে তিনি বিয়ে করেছেন। কিন্তু সংস্কৃত শেখা ও নিজের পছন্দে বিয়ে করা নিয়ে তিনি দাদাদের কাছে উপহাসের পাত্র হলেন। অপমানিত ভারতচন্দ্র হুগলির বাঁশবেড়িয়াতে এসে রামচন্দ্র মুন্সির বাড়িতে থেকে ফারসি ভাষা শিখে নিলেন। তারপর কিছুদিন মোক্তারি করলেন যদি হারানো পৈতৃক সম্পত্তি ফিরে পাওয়া যায় এই আশায়। কিন্তু হল না। তখন তিনি রুজির খোঁজে কিছুদিনের জন্য কটকে চলে যান। তারপর আবার বাংলায় ফিরে এসে চন্দননগরের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। এখানেই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর দেখা পান। আর সংস্কৃত ও ফারসিতে ভারতচন্দ্রের পাণ্ডিত্য দেখে তাঁকে তাঁর সভাকবি হিসেবে নিযুক্ত করেন।”

“তুমি গ্রেট, লেট্টুদা!” মেনাল্ডোর মুখে কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়েছিল। মুখে কিছু না বললেও সহযাত্রীদের চোখগুলোও বলে দিচ্ছিল, লেট্টুর কথা শুনে তাঁরাও মুগ্ধ।

তো মোনাল্ডোর মেজো মাসির মুখে সেই বিখ্যাত পেঁড়ো গ্রামের পুরাতন দুর্গা মন্দিরে গতকাল সকালে দেখা আশ্চর্য ঘটনার কথা খাওয়ার টেবিলে বসে শুনতে লাগল লেট্টু আর মেনাল্ডো।

ঘটনাটা হল এরকম— পেঁড়ো গ্রামের উত্তরদিকে রায়দের একটা পুরোনো দুর্গা মন্দির আছে। শোনা যায়, দু-পুরুষ আগে রায়বাবুদের ওই মন্দিরে প্রতিবছর খুব ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হত। ষষ্ঠীর দিন গ্রামের দুঃস্থ মহিলাদের শাড়ি আর পুরুষদের ধুতি-পাঞ্জাবি দান করা হত। আর গ্রামের সমস্ত মানুষকে অষ্টমীর দিন পাত পেড়ে খাওয়ানো হত। পুজোর ক’টা দিন গমগম করত রায়পরিবারের দুর্গামণ্ডপ। কিন্তু দশ-পনেরো বছর আগে ওই পরিবারের কর্তা মনমোহন রায় সপরিবারে এক ভয়ংকর ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর ওই মন্দিরে দুর্গাপুজো বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি নিত্য পুজোও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। গ্রামের বয়স্ক মানুষজন এই সমস্যা মেটানোর উদ্দেশ্যে সভা করে মনমোহনবাবুর এক জ্ঞাতি ভাই রজনীকান্ত রায়ের হাতে মন্দিরের ভার তুলে দেন। কিন্তু তারপর থেকে নিত্য পুজো কোনোরকমে চালু থাকলেও রায় পরিবারের সম্বৎসরের ঐতিহ্যপূর্ণ দুর্গাপুজো বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া সংস্কারের অভাবে মন্দিরের জৌলুসও কমে যায়। কমে যায় ভক্তদের আনাগোনা। এই পরিস্থিতিতে গতকাল খুব ভোরে গ্রামের কয়েকজন মহিলা নিত্যদিনের মতো দুর্গা মন্দিরে সামনের রায়দের পুকুরে স্নান করতে গিয়ে দেখেন পুকুরঘাটে পড়ে রয়েছে একটা নতুন লাল পাড় সাদা শাড়ি। আর পুকুরঘাট থেকে মন্দিরের গর্ভগৃহ পর্যন্ত আলতা পরা পায়ের ছাপ পড়ে রয়েছে। মন্দিরের বাইরে এবং ভেতরের দুটো দরজা তালাবন্ধ থাকা সত্ত্বেও ওই পায়ের ছাপ ভেতরের দেবীমূর্তি পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। সকালবেলা এই খবর শুনে মন্দিরের পুরোহিত যামিনীরঞ্জন ভট্টাচার্য এসে মন্দিরের গেট ও ভেতরের দরজার তালা খুলে এই পায়ের ছাপ দেবীর মূর্তি পর্যন্ত দেখতে পান। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই এই খবর পেঁড়ো গ্রাম ছাড়াও আশেপাশের সমস্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। আর তারপর থেকে ওই পায়ের ছাপ দেখার এবং পুজো দেওয়ার জন্য শুরু হয়েছে মানুষের ঢল। সবাই বলাবলি করছে, এত বছর ধরে শারদীয় দেবীর আরাধনা বন্ধ হয়ে থাকা মা ভালোভাবে নেননি। আর তাই তিনি নিজে সশরীরে মন্দিরে দেবীমূর্তির মধ্যে আসীন হয়েছেন। এই ঘটনার পর রজনীকান্তবাবু ঘোষণাও করে দিয়েছেন, এ-বছর আবার ধুমধাম করে বন্ধ থাকা পুজো শুরু হবে। এজন্য গ্রামের মানুষের কাছে তিনি আর্থিক সহযোগিতার জন্য আবেদনও করেছেন।

লেট্টু খাওয়া বন্ধ করে মেনাল্ডোর মেজো মাসির মুখে সমস্ত ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ শুনল বটে, কিন্তু কোনও মন্তব্য করল না। খাওয়া শেষ করে ভদ্রতাসূচক ‘উঠলাম মাসিমা’ বলে হাত-মুখ ধুয়ে দোতলায় ওদের থাকার ঘরে চলে গেল।

“লেট্টুদা কি জেগে আছ?” কিন্তু কিন্তু করে মেনাল্ডো জিজ্ঞাসা করল। লেট্টুর পাশেই শুয়ে আছে সে। লেট্টুর কোনও সাড়া পেল না। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, লেট্টু নিষ্পলক তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে।

“নিশ্চয়ই দুর্গা মন্দিরে পায়ের ছাপ নিয়ে কিছু ভাবছ। তাই না?” সাহস করে মেনাল্ডো ফের জিজ্ঞাসা করল।

“হুম।” লেট্টুর এটুকুই উত্তর।

“আচ্ছা লেট্টুদা, ওই রায়বাবুরা ভারতচন্দ্রের বংশধর নন তো?”

লেট্টু কোনও উত্তর দিল না। এই সময় বাড়তি কিছু প্রশ্ন করা মানেই বকুনি বা গাঁট্টা খেতে হবে। সুতরাং প্রশ্ন না করে ঘুমিয়ে যাওয়াই ভালো। মেনাল্ডো পাশ বালিশ আঁকড়ে উলটোদিকে কাত হয়ে শুয়ে চোখ বুজল।

(দুই)

সকালবেলা যখন মেনাল্ডোর ঘুম ভাঙল তখন দেখে পাশে লেট্টু নেই। ব্যাপারখানা কী? সকাল সাতটায় তো লেট্টু বিছানা ছাড়ে না! গুটিগুটি পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে বান্টি ব্রাশ করছে।

“লেট্টুদা কোথায় রে?”

“কেন, ঘরে নেই?”

“না। লেট্টুদা তো এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে না।”

ওদের কথা শুনে রান্নাঘর থেকে মেজো মাসি বলল, “সে তো অনেক ভোর ভোর উঠেছে। বলল একটু পায়চারি করে আসবে। ভোরবেলার পরিবেশ দেখতে নাকি খুব ভালো লাগে। গ্রামের আশপাশটা একটু ঘুরে দেখবে। ছেলেটাকে বললাম, একটু চা করে দিই, শুনল না। বলল, ফিরে এসে চা খাব মাসিমা।”

মেনাল্ডো কিন্তু বুঝে নিল, লেট্টু মোটেই গ্রামে ভোরের পরিবেশ দেখতে যায়নি। অন্য কোথাও গিয়েছে। এতদিন লেট্টুর সাথী হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে সে নিশ্চিত।

মেনাল্ডো আর বান্টির জলখাবার খাওয়া যখন শেষের পথে, হেলতে-দুলতে ঘরে ঢুকল লেট্টু। রাতে দেখা চিন্তাশীল মুখের পরিবর্তে লেট্টুর ঠোঁটের কোণে তখন মুচকি হাসি।

“কোথায় গিয়েছিলে গো, লেট্টুদা?” মেনাল্ডো শেষ লুচিটা চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞাসা করল।

“এই একটু গ্রামটা দেখে এলুম। তোদের পেঁড়ো গ্রামটা কিন্তু ভারি সুন্দর, বান্টি। ভারতচন্দ্রের ভিটেমাটিও দেখে নিলাম এই সুযোগে।”

“তুমি জানো এই গ্রামে কবি ভারতচন্দ্রের জন্ম?” রান্নাঘর থেকে মাসিমা জিজ্ঞাসা করল।

“লেট্টুদা কিন্তু সব জানে মাসি। লেট্টুদা হল এনসাইক্লোপিডিয়া।” গর্ব ঝরে পড়ল মেনাল্ডোর মুখে।

“মাসিমা, আজ একটু তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া করব। মানে ওই দুপুর একটার মধ্যে। অসুবিধা নেই তো?” লেট্টু চেয়ার টেনে বসতে বসতে জিজ্ঞাসা করল।

“না না, অসুবিধে কীসের? এই তো রান্না অর্ধেক হয়েই গেছে।”

“কোথাও যাবে নাকি, লেট্টুদা?” এবার বান্টি প্রশ্ন ছুড়ল।

“ওই একটু আমতা টাউনে ঘুরতে যাব। আগে কোনোদিন যাইনি কিনা। ভাবলাম আজ একটু ঘুরে আসি। পুজোর দিনগুলোতে তো যাওয়া যাবে না। প্রচুর ভিড় হবে।”

“ঠিক বলেছ, লেট্টু। যাও বেড়িয়ে এসো।” রান্নাঘর থেকে মাসিমা বলল।

“আমিও কিন্তু যাব লেট্টুদা।” মেনাল্ডোর আবদার।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই যাবি, বান্টিও যাবে। বান্টি না গেলে আমরা পথ হারিয়ে ফেলব তো। তাই না রে বান্টি?” মাসিমার দেওয়া লুচি-তরকারি মুখে পুরতে পুরতে লেট্টু বলে উঠল।

আমতা শহরে আসার পথে ট্রেকারে পুরো রাস্তাটা লেট্টু মোবাইলে কী যেন সার্চ করছিল মনোযোগ দিয়ে। একটা কথাও বলছিল না। লেট্টুর গভীর মনোযোগ দেখে মেনাল্ডো কোন‌ও প্রশ্ন করার সাহস দেখায়নি। কানে কানে বান্টিকেও বলে দিয়েছিল, “এই সময় লেট্টুদাকে কিছু জিজ্ঞাসা করিস না, বকুনি শুনবি।”

আমতায় পৌঁছে ট্রেকার থামতেই লেট্টু বান্টিকে জিজ্ঞাসা করল, “এখানে ভুবনমোহিনী বস্ত্রালয় বলে কাপড়ের দোকান কোন দিকে আছে জানিস?”

“কাপড়ের দোকান!” একসঙ্গে বিস্ময় ঝরে পড়ল মেনাল্ডো ও বান্টির মুখে।

“বল না, এই দোকানটা কোন দিকে?”

একটু মাথা চুলকে বান্টি বলল, “আমি তো চিনি না। চলো কাউকে জিজ্ঞাসা করি।”

দু-চারজনকে জিজ্ঞাসা করে পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গেল ভুবনমোহিনী বস্ত্রালয়। মুন্সিরহাটে আমতা রোডের উপর অবস্থিত দোকানটি বেশ বড়োসড়ো হলেও খদ্দের তেমন নেই। সাত-আটজন কর্মচারী রয়েছে।

দোকানে ঢুকে লেট্টু এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজতে লাগল। সাহস করে মেনাল্ডো আর বান্টি লেট্টুকে কিছু জিজ্ঞাসা করল না।

সামনের কাউন্টারে দাঁড়ানো ঝকঝকে সেলস গার্লটিকে লেট্টু জিজ্ঞাসা করল, “কয়েকদিন আগে এখানে ফ্রক পরা একটা পুতুলের মডেল ছিল না?”

“হ্যাঁ, কেন বলুন তো?” তরুণীর সন্ধিগ্ধ প্রশ্ন।

“না মানে, ওই পুতুলের গায়ে যে ফ্রকটি ছিল, ওটি কয়েকদিন আগে আমি দেখে গিয়েছিলাম। খুব পছন্দ হয়েছিল। টাকা ছিল না বলে নিতে পারিনি। তাই আজ নিতে এলাম। পুতুলের সঙ্গে ফ্রকটিও কি বিক্রি হয়ে গেছে?” লেট্টু অত্যন্ত শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল।

“হ্যাঁ, ফ্রকটি মনে হয় বিক্রি হয়ে গেছে। তবে যদি ওই ধরনের ফ্রক দেখতে চান তাহলে দেখাতে পারি।”

“না, আমার কিন্তু ওটিই পছন্দ। অন্য ফ্রক নয়। তবে ফ্রকটির সঙ্গে পুতুলটিও খুব পছন্দ ছিল। পুতুলটি থাকলেও নিতাম।” হেসে ফেলল লেট্টু।

এতক্ষণ লেট্টুর বানানো কথাবার্তা শুনে মেনাল্ডো আর বান্টি রীতিমতো ঘাবড়ে গেলেও চুপ করে ছিল। কিন্তু আর চুপ থাকতে পারল না।— “পুতুল কিনবে?” মুখ ফসকে মেনাল্ডো বলে ফেলল।

সঙ্গে-সঙ্গেই ঘাড় ঘুরিয়ে লেট্টুর কড়া চাউনি বুঝিয়ে দিল, ওদের এখন চুপ করে থাকা লেট্টুর পছন্দ।

“আমাদের মালিক কয়েকদিন আগে পুতুলটি বাড়িতে নিয়ে গিয়েছেন।” সেলস গার্লটি নিঃস্পৃহভাবে বলল।

“মালিক কি ভুবনমোহিনীবাবু?”

“না, না। মালিকের মায়ের নাম ভুবনমোহিনী। মালিকের নাম তো রজনীকান্ত রায়।”

সেলস গার্লের মুখে কথাটা শুনতেই লেট্টুর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। কিন্তু এমন একটা ভাব করল যেন কথাগুলোর কোন‌ও গুরুত্বই নেই তার কাছে।

“ঠিক আছে। পরে আবার আসব।” নমস্কার করে উঠে পড়ল লেট্টু।

“চল বাড়ি ফিরি।” লেট্টু হাঁটা দিল।

“ব্যাপারটা কী বলো তো লেট্টুদা?” দোকান থেকে বেরিয়েই মেনাল্ডো ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল। ঘাবড়ে গিয়ে বান্টিও চুপ হয়ে গেছে।

“সময়েই সব জানতে পারবি। আপাতত যে উদ্দেশ্যে আমতা এসেছিলাম, মনে হচ্ছে সেই উদ্দেশ্য পূরণ হতে চলেছে। এবার চল ফিরে যাই। তবে একটা কথা, বাড়িতে গিয়ে মাসিমা বা মেসোমশাইকে কিন্তু এ-ব্যাপারে কোনও কিছুই বলবি না। আমরা সবাই আমতা শহরটা দেখতে এসেছিলাম। কেমন? মনে থাকবে?”

লেট্টুর কথা শুনে দুজনেই বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় দোলাল।

(তিন)

“রজনীকান্তবাবু, আপনাকে গ্রামের মানুষজন শুধু নয়, আমরাও যথেষ্ট সম্মান করি। আপনার কাছ থেকে এই জিনিসটা কিন্তু আশা করিনি।” বেশ কঠোরভাবে কেটে কেটে কথাগুলো বললেন আমতা থানার ওসি প্রবাল সর্দার।

“কিন্তু আমার অপরাধটা কী সেটাই তো বুঝলাম না স্যার। কেন হঠাৎ এই সময় আমাকে ডেকে পাঠালেন? বহুবছর পর মায়ের মন্দিরে আবার বড়ো করে পুজোর আয়োজন করেছি। হাজার ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছি। কোনও অপরাধ যদি সত্যি করে থাকি তা নিজের অজান্তেই করেছি। আমাকে আপনি চেনেন। কী অপরাধ করেছি আমার তো মাথায় ঢুকছে না।” ওসির সামনে চেয়ারে বসে রজনীকান্তবাবু নীচু বলায় কথাগুলি বলে উঠলেন।

“আপনি সব জেনেও না জানার ভান করছেন, রজনীকান্তবাবু। আপনার দুর্গা মন্দিরে ওই যে আলতা পরা পায়ের ছাপ যা আপনি মা দুর্গার পদচিহ্ন বলে প্রচার চালিয়েছেন তা যে আপনারই মস্তিষ্কপ্রসূত কারসাজি, সেটা তো আমাদের কাছে জলের মতো পরিষ্কার। এখন যদি ভাজা মাছটি উলটে খেতে না জানার ভান করেন তাহলে তো আইনের আশ্রয় নিতেই হয়। তাই না রজনীকান্তবাবু?” ওসি প্রবাল সর্দারের গলা ক্রমশ কঠিন হচ্ছে।

“আমি কিন্তু কিছুই বুঝছি না স্যার।”

“ঠিক আছে। তাহলে আমি বুঝিয়ে দিই। মন্দিরে ভক্তসমাগম দিন দিন কমে যাচ্ছে। মন্দির থেকে রোজগার কমে যাচ্ছে। ওদিকে অনলাইনে বিক্রিবাটা বেড়ে যাওয়ায় আপনার কাপড়ের দোকানেও বিক্রিবাটা তলানিতে। সুতরাং মানুষকে বোকা বানানোর জন্য আপনি ফন্দি আঁটলেন। নিজের দোকান থেকে লালপাড় সাদা শাড়ি এনে তার লেবেল তুলে ভোরবেলা ফেলে রাখলেন পুকুরঘাটে। আর দোকান থেকে আনা মডেল পুতুলটির দুটো পা কেটে নিয়ে তা আলতায় চুবিয়ে পদচিহ্ন এঁকে দিলেন পুকুরঘাট থেকে মন্দিরের গর্ভগৃহ পর্যন্ত। মন্দিরের চাবি তো পুরোহিত ছাড়াও আপনার কাছে থাকে। ফলে পদচিহ্ন আঁকতে কোন‌ও অসুবিধেই হল না। আর গ্রামের ধর্মপ্রাণ মানুষ আপনার এই চালাকি ধরতেই পারল না। এইভাবে মানুষকে ঠকিয়ে গত কয়েকদিনে কত ইনকাম করলেন, রজনীকান্তবাবু?” শেষ কথাগুলো যখন ওসি বলছিলেন তখন চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠেছিল।

“এসব কী গল্প ফাঁদছেন, স্যার? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।” কথাগুলো বললেও গলাটা যেন কেঁপে গেল রজনীকান্তবাবুর।

“নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন।” কথা ক’টি বলে চেয়ারের পাশে নীচে রাখা দু-পা কাটা একটি পুতুল আর দুটি কাটা পা টেবিলের উপর রেখে ওসি বললেন, “পুতুলটি আর পাগুলো চিনতে পারছেন? গতকালই তো এগুলো বেচে দিয়েছেন ফেরিওয়ালার কাছে। তাই না?”

রজনীকান্তবাবুর মাথাটা তখন ক্রমশ নীচের দিকে ঝুলে পড়ছে।

“শুনুন রজনীকান্তবাবু, আপনি যে অপরাধ করেছেন তাতে আইপিসি-র ৪২০ ধারায় আপনাকে হাজতবাস করাতে পারি। কিন্তু আপনি যদি অপরাধ স্বীকার করেন এবং ভবিষ্যতে আর কখনও এমন অপরাধ করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেন তাহলে আপনার সামাজিক সম্মানের কথা মাথায় রেখে আমরা আপনাকে এবারের মতো রেহাই দিতে পারি। ভেবে দেখুন।”

কথাগুলো বলেই প্রবালবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে রজনীকান্তবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে প্রবালবাবুর দুটো হাত জড়িয়ে ধরলেন।— “স্বীকার করছি স্যার, আমি অপরাধ করেছি। আর কখনোই এমন হবে না। কথা দিচ্ছি স্যার।”

রজনীকান্তবাবুর টুকটুকে ফর্সা মুখ তখন লজ্জায় লাল।

“কথাগুলো যেন মনে থাকে। যান এবার।”

“ধন্যবাদ, স্যার।”

“ধন্যবাদ আমার প্রাপ্য নয়। প্রাপ্য সেই মানুষটির, যার প্রখর বুদ্ধি আর উদ্যোগে আপনার এই প্রতারণামূলক কাজটির রহস্য উদঘাটন করতে পারলাম।”

রজনীকান্তবাবুর এবার আর এক প্রস্থ বিস্মিত হওয়ার পালা।

“আয় রে লেট্টু। দেখা করে যা।” পাশের ঘরে পর্দা ঝোলানো দরজার দিকে তাকিয়ে ওসি প্রবালবাবু ডাক দিলেন। আর সঙ্গে-সঙ্গেই হাজির লেট্টু, সঙ্গে মেনাল্ডো ও বান্টি।

“গত পরশু সকালে তুমি আমার বাড়ি গিয়েছিলে না?” লেট্টুর দিকে তাকিয়ে রজনীকান্তবাবু বলে উঠলেন।

“হ্যাঁ। চিনতে পেরেছেন তাহলে।” লেট্টু হাসিমুখে বলে ওঠে।

“লেট্টুই তো সব রহস্য উন্মোচন করে আমাকে সব জানাল। তারপর প্রশাসনিকভাবে যতটুকু করণীয় সেটুকুই আমি করেছি। ঠিক আছে, আমি ব্যস্ত আছি, আপনি এখন আসুন। পুজো যেমন করছেন করুন, কিন্তু এই প্রতারণা যেন আর কখনও না হয়। কথাটা মাথায় থাকে যেন।” বলেই ওসি পাশের ঘরে চলে গেলেন।

রজনীকান্তবাবু একবার ভালো করে জরিপ করে নিলেন লেট্টুর পা থেকে মাথা পর্যন্ত। তারপর ধীরে ধীরে থানা থেকে বেরিয়ে গেলেন।

(চার)

পুজো শেষ হয়ে গিয়েছে। লেট্টু আর মেনাল্ডোও ফিরে এসেছে পেঁড়ো থেকে। ইতোমধ্যে মেনাল্ডো বুবাই, কেতো, টুকুন আর পিচকুর কাছে আলতা পায়ের ছাপ রহস্য কাহিনি বর্ণনা করে দিয়েছে। কিন্তু কীভাবে লেট্টু একদিনের মধ্যে এই রহস্যের কিনারা করল তা আজও লেট্টু বলেনি। তবে কথা দিয়েছে একদিন বলবে।

দীপাবলির আগের রবিবার যথারীতি ঘোষদের পুকুরের উত্তর-পশ্চিম কোণে অশ্বত্থ গাছের তলায় পরেশের চায়ের দোকানের সামনে লেট্টুর সঙ্গে পাঁচ বন্ধুর আড্ডা বসেছে। লেট্টু পরেশকে বেগুনি, মুড়ি আর চায়ের অর্ডার দিয়ে বেঞ্চের ওপর দু-পা তুলে বাবু হয়ে বসে নিজে থেকেই বলল, “আজ তোদের আলতা পায়ের আলতো ছোঁয়ার রহস্য কাহিনি বলব।”

পরেশ কথাটা শুনে দোকানের ভেতর থেকে বলল, “এটা একটা গানের লাইন না লেট্টু?”

“ঠিক বলেছ পরেশদা, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া বিখ্যাত গান। তবে মেনাল্ডোর মাসির বাড়ির গ্রামে আলতা পায়ের এই আলতো ছোঁয়া দিয়েই রজনীকান্তবাবু ধর্মপ্রাণ গ্রামের মানুষকে ঠকিয়ে নিজের পকেট ভরাচ্ছিলেন।”

“তুমি নিশ্চয়ই এই লোকঠকানো বিদ্যা ধরে ফেলেছ, তাই তো?” এতদিন ধরে লেট্টুকে দেখছে তো, তাই পরেশ আন্দাজ করতে পেরেছে।

“সেই রহস্যের কাহিনি আজ লেট্টুদার মুখে শুনব, পরেশদা।” কেতো ভ্রূ নাচিয়ে বলে উঠল।

বেগুনিতে কামড় দিয়ে বলতে শুরু করল লেট্টু।—

“সেদিন রাতে প্রায় ঘুমোতেই পারিনি। ভোরবেলা উঠে গ্রামের দু-একজনকে জিজ্ঞাসা করে পৌঁছে যাই দুর্গা মন্দিরে। তখনও আলতা পায়ের ছাপগুলো স্পষ্ট। ছাপগুলো যাতে মুছে না যায় সেজন্য খুঁটি পুঁতে দড়ি দিয়ে ছাপগুলোকে রক্ষা করা হয়েছে। আমার কিন্তু সন্দেহ লেগেছিল শুরুতেই। আলতা পায়ে কেউ হেঁটে গেলে ক্রমশ পায়ের ছাপ অস্পষ্ট হওয়ার কথা। পুকুরঘাট থেকে দশ-বারো পা ক্রমশ অস্পষ্ট হওয়ার পর আবার ছাপ খুব স্পষ্ট হয়ে গেল। তারপর আবার ক্রমশ অস্পষ্ট। তারপর মন্দিরের ভেতরের দরজা পেরোনোর পর আবার স্পষ্ট পায়ের ছাপ। এটা কীভাবে সম্ভব? আর একটা জিনিস দেখলাম, দুটি পায়ের মধ্যে ছাপের ব্যবধান সব জায়গায় সমান নয়। কিন্তু একজন মানুষ হেঁটে গেলে তার প্রতি পদক্ষেপে দু-পায়ের ব্যবধান সমান হওয়ার কথা। পায়ের ছাপ দেখে আমার মনে হয়েছিল আট-দশ বছর বয়সি কোনও মেয়ের পায়ের ছাপ। আর কোনও মানুষ যখন হেঁটে যায় তখন তার গোড়ালি, পায়ের পাতার সামনের দিক আর বুড়ো আঙুলে বেশি চাপ পড়ে। কিন্তু ছাপ দেখে আমার মনে হয়েছিল এটা কোনও কৃত্রিম পায়ের ছাপ। তারপর দেবীমূর্তিকে প্রণাম করার অছিলায় একেবারে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলাম। দেখলাম, লালপাড় শাড়িটি মূর্তির পায়ের কাছে ভাঁজ করে রাখা আছে। তখন পুরোহিত আসেননি। তাই সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করার ছুতোয় কাপড়ের ভাঁজটা সামান্য এদিক-ওদিক করে ছিঁড়ে দেওয়া লেবেলটা দেখতে পাই। লেবেল ছিঁড়ে দিলেও দোকানের নামের তিনটে অক্ষর বুঝতে পারছিলাম। প্রথমে ‘ব’, তারপর ‘নী’, আর শেষে ‘য়’। অক্ষরগুলোর অবস্থান দেখে আমি আন্দাজ করতে লাগলাম দোকানের সম্ভাব্য নাম কী হতে পারে। স্থানীয় কয়েকজন মানুষের সঙ্গে কথা বলে চিনে নিলাম রজনীকান্তবাবুর বাড়ি। আর এটাও জানলাম যে আমতা শহরে তাঁর একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে। দোকানের নাম ভুবনমোহিনী বস্ত্রালয়। দুয়ে দুয়ে চার হতে খুব বেশি সময় লাগল না। তারপর রজনীকান্তবাবুর বাড়ি গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলে তাঁর ব্যাবসায় মন্দার ব্যাপারটাও কিছুটা বুঝে নিলাম।”

“বাপ রে! ভোর থেকে এতসব কাণ্ড তুমি করেছ, আমরা কিচ্ছু বুঝতে পারিনি! সত্যিই তুমি গ্রেট, লেট্টুদা!” মেনাল্ডো উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠল।

“তুই একটু থাম। লেট্টুদাকে বাকিটা বলতে দে।” বুবাই ধমক দিল।

“হ্যাঁ, যা বলছিলাম। লেট্টু আবার শুরু করল। বিকেলে আমতা শহর ঘুরব বলে মেনাল্ডো আর বান্টিকে নিয়ে পৌঁছে গেলাম ভুবনমোহিনী বস্ত্রালয়ে। তার আগে আমি গুগল সার্চ করে দোকানের বেশ কিছু ছবি দেখে নিয়েছিলাম। সেখানে দেখেছিলাম দোকানে ঢোকার মুখে ডানদিকে ফ্রক পরা একটা পুতুলের মডেল ছিল। সেদিন কিন্তু গিয়ে দেখলাম আর সব ঠিকঠাক থাকলেও ওই পুতুলটা নেই। ফলে আমার সন্দেহ আর‌ও ঘনীভূত হল। সেলস গার্লের কাছ থেকে জেনেও নিলাম যে পুতুলটা রজনীকান্তবাবু বাড়ি নিয়ে গিয়েছেন দু-দিন আগে। দোকান থেকে ফেরার সময় মনে হল পুতুলটা হয় রজনীকান্তবাবুর বাড়িতে আছে নতুবা ফেরিওয়ালাকে বিক্রি করে দিয়েছেন। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটাই বেশি, কারণ পুতুলটা বাড়িতে থাকলে কার‌ও নজরে পড়ে যেতেই পারে।”

“এর পরের ঘটনাটা একটু আমি বলি?” পিচকু একটু নড়েচড়ে বসে বলে উঠল।

“বল তাহলে।”

লেট্টু অনুমতি দিতেই পিচকু শুরু করল— “লেট্টুদা ফোন করে আমাকে বলল, তোর কোনও রিলেটিভ আমতা থানায় চাকরি করে একবার বলেছিলি না? আমি বললাম, হ্যাঁ, আমার ছোটকাকু আমতা থানার ওসি। তারপর ছোটকাকুকে লেট্টুদার কথা বলে কাকুর ফোন নাম্বার দিয়ে দিলাম লেট্টুদাকে। এবার বাকিটা তুমি বলো, লেট্টুদা।”

“তারপর ছোটকাকুকে আমি ফোন করলাম। সব বললাম। কাকু বলল, তুই চিন্তা করিস না, আমি পুতুল উদ্ধার করার চেষ্টা করছি। তো কাকু পুলিশ দিয়ে ওই এলাকার সমস্ত ফেরিওয়ালাকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কাটা দু’পা-সহ পুতুলটাকে উদ্ধার করল। পুতুলের কাটা পা দুটোতে আলতা মাখানোর ছাপ তখনও স্পষ্ট লেগে ছিল। ব্যস, তারপর আর বুঝতে কোনও অসুবিধেই হল না। কাকু রজনীকান্তবাবুকে থানায় তলব করলেন। জেরার মুখে রজনীকান্তবাবু বাধ্য হলেন তাঁর ভণ্ডামি স্বীকার করে নিতে। আর ছোটকাকুও তাঁর সামাজিক সম্মানের কথা মাথায় রেখে এবারের মতো তাঁকে শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিলেন।” কথাগুলো বলে বোতলের ছিপি খুলে লেট্টু গলায় জল ঢালল।

দোকানের ভেতর থেকে পরেশ বলে উঠল, “ওসি সাহেব ছেড়ে দিলেও মা দুর্গা কি রজনীকান্তবাবুকে ছাড়বেন? উনি ঠিক শাস্তি দেবেন।”

“কিন্তু একটা বিষয় তো জানা হল না লেট্টুদা! রজনীকান্তবাবু কি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের বংশধর? খোঁজ নিয়েছ?” মেনাল্ডো বলে উঠল।

“ওই যাহ্‌! একদম ভুলে গেছি রে! তবে ভালোই হয়েছে। ওঁর মতো মনীষীর সঙ্গে একজন প্রতারকের রক্তের সম্পর্ক আছে জানতে পারলে আমাদের কি ভালো লাগত?”

সবাই ‘না না’ বলে মাথা দুলিয়ে উঠল।

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

Leave a Reply