বনের ডায়েরি-রবিন পাখিরা কেন সূর্যোদয়ের আগেই গান গাইতে শুরু করে-বিশ্বরঞ্জন গোস্বামী-শরৎ ২০২৬

আগের লেখা- পাখির মধুর ডাকে ভরে যায় মন, পাখির চোখ, পাখি বাবা-মার যত্নআত্তি

রবিন পাখি বিশ্বের নানা দেশে নানা রূপে নানা নামে পরিচিত। তাদের মধ্যে অন্যতম হল ইউরোপীয় রবিন এবং উত্তর আমেরিকায় বসবাসকারী তাদের জ্ঞাতি পাখিরা। আমাদের দেশের দোয়েল বা শ্যামা পাখিরাও একধরনের রবিন পাখি।

ভোরের আকাশ আলোকিত হওয়ার অনেক আগেই যে প্রজাতির পাখিদের প্রথম গান শুরু হয়ে যায়, তারা হল রবিন পাখি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন অতি প্রত্যূষে, যখন আলোর পরিমাণ খুবই নগণ্য থাকে, তখন কোনও পাখির গান শুনতে পাওয়াটা অনেকের কাছেই অদ্ভুত মনে হতে পারে।

রবিন পাখিরা কেন এত ভোরে গান গাইতে শুরু করে সেটা কিছু বিজ্ঞানীর গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে জানা গিয়েছে। এর পেছনে জৈবিক, পরিবেশগত এবং আচরণগত নানাধরনের কারণ আছে। কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে রবিনদের এত ভোরে গান গাওয়ার একটা কারণ দেখানো হয়েছে যে এর ফলে তারা বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা লাভ করে।

রবিন পাখির গানের জন্য ভোর কেন গুরুত্বপূর্ণ? পাখিদের কণ্ঠস্বর নিয়ে গবেষণা করা পণ্ডিতরা ব্যাখ্যা করেন যে ভোর একটি বিশেষ ফলপ্রসূ সময়। এই সময়ে এদের পারস্পরিক ভালো যোগাযোগ সম্পন্ন হয়। কিছুদিন আগে ‘ফিলোসফিক্যাল ট্রানজ্যাকশনস অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি কেস স্টাডিতে বলা হয়েছে, ভোরবেলার গান পাখিদের এলাকা চিহ্নিত ও সঙ্গী আকর্ষণ করতে, আবার আশপাশের প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে বার্তা পাঠাতেও সাহায্য করে।

রবিনদের ক্ষেত্রে, ভোরবেলার গান অন্যান্য পাখির ডাকের চেয়ে নিজেদের আরও বেশি লক্ষ্যণীয় করে তোলার সুযোগ পায়। তার মানে রবিন পাখির গান এই নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, নিছক একটি আনুষ্ঠানিক কার্যকলাপ নয়।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অতিপ্রত্যূষে গান গাইবার  আরো একটি কৌতূহলদ্দীপক ব্যাখ্যা তাদের দৃষ্টিশক্তির সক্ষমতার সঙ্গে জড়িত।

রবিন পাখিরা খুব অল্প আলোতেও কাজ করতে পারে। Proceedings of the Royal Society B জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পাখি রাতে ভালো দেখে, তারা আবছা আলোয় দৃষ্টি সংবেদনশীলতা কম এমন পাখিদের তুলনায় অনেক আগেই কিচিরমিচির শুরু করে।

রবিন পাখিরা যখন গান গাইতে শুরু করে, তখন ভোরের পরিবেশ প্রায়ান্ধকার থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, দিনের আলোর ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রজাতির তুলনায় এরা কিছুটা বাড়তি সুবিধা ভোগ করে।

এই ধারণাটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষালব্ধ প্রমাণও রয়েছে। বিশেষ করে ফিনল্যান্ড, জার্মানি এবং স্পেনে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ইউরোপীয় রবিন এবং সাধারণ ব্ল্যাকবার্ড পাখিরাই ভোরের প্রথম প্রহরে গান গাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগামী। Behavioral Ecology and Sociobiology জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় আরও দেখা যায় যে, ফিনল্যান্ডে যেসব রাতে অন্ধকারের তীব্রতা বেশি থাকে, রবিন পাখিরা সেসব রাতে আরও আগে গান গাইতে শুরু করে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গান গাওয়ার সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবল শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈব-ঘড়িই (Biological clock) নয়, বরং আলোর প্রকৃত তীব্রতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কৃত্রিম আলোয় রবিন পাখির গান গাওয়ার সময়সূচির পরিবর্তন হয়। তাঁরা লক্ষ করেছেন যে কৃত্রিম আলোর প্রতি ওরা তীব্রভাবে সাড়া দেয়।

বিজ্ঞানীরা শহরের রবিন পাখিদের আচরণের ওপর গবেষণা থেকে দেখেছেন, রাস্তার আলো এবং আলোকিত এলাকাগুলোতে ভোরের গানের সময় পরিবর্তিত হয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে রাতের কৃত্রিম আলোর প্রভাবে রবিন-সহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় গায়ক পাখির ভোর ও সন্ধ্যার গানের ধরণ পরিবর্তন হয়।

শহরের পরিবেশে রাতের আলো গানের আচরণের দৈনিক সময় পরিবর্তন করে দেয়। এই ফলাফলগুলো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে যে কেন শহরের রবিন পাখিরা কখনো-কখনো সূর্যোদয়ের অনেক আগেই গান গাইতে শুরু করে। তাদের অভ্যন্তরীণ সময় নির্ধারণ ব্যবস্থা আলোর প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে মনে হয়, সেই আলো প্রাকৃতিক দিগন্ত থেকে আসুক বা মানুষের তৈরি উৎস থেকে যেভাবেই আসুক।

‘রবিন’ পাখিরা কৃত্রিম আলোর উপস্থিতির প্রতি সমানভাবে সংবেদনশীল। শহরের পাখিদের আচরণ নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের রাতের আলোকসজ্জা তাদের ভোরবেলার গান গাওয়ার সময়কে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন’’(NCBI) কর্তৃক প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, রাতের কৃত্রিম আলো অনেক প্রজাতির গায়ক পাখির ভোর ও গোধূলিবেলার গান গাওয়ার সময়কে প্রভাবিত করে। এই পাখিগুলোর তালিকায় অন্যদের পাশাপাশি রবিনরাও অন্তর্ভুক্ত আছে।

এই সমস্যাটি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে একটি পরীক্ষামূলক পদ্ধতি অবলম্বন করেও একই ফলাফল পাওয়া গেছে। ‘অ্যানিমেল বিহেভিয়ার’ (Animal Behaviour) নামক জার্নালে প্রকাশিত একটি পরীক্ষায় দেখানো হয়েছে, রাতের আলোকসজ্জা কীভাবে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির ভোরবেলার গান গাওয়ার সময়কে প্রভাবিত করে।

কৃত্রিম আলোর প্রতি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়াটি লক্ষ করা গেছে ‘ইউরোপীয় রবিন’-এর ক্ষেত্রে—কৃত্রিম আলোর প্রভাবে এরা ধীরে ধীরে আরও আগে গান গাইতে শুরু করে। এই সমস্ত পর্যবেক্ষণই প্রমাণ করে যে, রবিন পাখিরা আলোর প্রতি কতটা সংবেদনশীল। তাছাড়া এই বিষয়টিও ব্যাখ্যা করে, কেন শহরের রবিনরা মাঝে-মধ্যে সূর্যোদয়ের অনেক আগেই তাদের প্রভাতী গান শুরু করে দেয়।

সূর্যোদয়ের সময় রবিন পাখিরা কেন কিচিরমিচির করে, তার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সম্ভবত বেশ কিছু সম্মিলিত ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজেই এর মূল কারণ। তাছাড়া, দিনের কর্মব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগেই নিজেদের এলাকা বা সীমানা চিহ্নিত করার জন্য ভোরবেলাটি একটি অত্যন্ত উপযুক্ত সময়। সবশেষে, ভোরের নিস্তব্ধ পরিবেশের সুযোগ নিয়ে তারা একে অপরের সঙ্গে অত্যন্ত কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। ভোরবেলা রবিন পাখিরা যে সুরেলা গানে মাত করে দেয়, তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই লক্ষ করা গেছে। তবে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশগত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার বা খাপ খাওয়ানোর যে অসাধারণ ক্ষমতা তাদের রয়েছে, তাও সমানভাবে উল্লেখযোগ্য। রবিনদের এই আচরণের সময়টি কেবল দিনের আলোর মতো প্রাকৃতিক উপাদানের দ্বারাই প্রভাবিত হয় না। উদাহরণস্বরূপ, শহরাঞ্চলের মতো কৃত্রিম উৎস থেকে নির্গত আলোর তারতম্যের কারণেও রবিনরা তাদের দৈনন্দিন সময়সূচিতে পরিবর্তন আনতে পারে।

পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই বিশেষ ক্ষমতাই হল সেই আর একটি কারণ, যার ফলে ভোরের প্রথম প্রহরে রবিনদের কিচিরমিচির করার বিষয়টি বিজ্ঞানীদের মনে গভীর কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। তারা কেবল একটি নির্দিষ্ট উদ্দীপকের প্রতিই প্রতিক্রিয়া দেখায় না, বরং এর ঠিক বিপরীতভাবে তারা একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের উদ্দীপকের প্রতি সাড়া দেয় এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের মানিয়ে নেয়।

লেখক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ একাডেমি, কলকাতা-র সদস্য

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Leave a Reply