গল্প-শৃঙ্খল-বিশ্বদীপ সেনশর্মা-শীত ২০২৪

এইলেখকের আগের গল্প কৃপণের বামমুঠি, দহনভার, পরবাস, সাভান্ত, ছিন্নমূল, স্বপ্নসম্ভব,  ব্যথা যখন

পূর্বকথা

ওকামুরা  মাউন্ট মিকি’র বিখ্যাত এনকোজি মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের পরিবার বংশানুক্রমে এই মন্দিরের  পুরোহিত। চারিদিকে রাতের আকাশ জুড়ে ছোটো সাদা সাপের মত আলোর রেখা পৃথিবীর দিকে নেমে আসছে। উল্কাগুলির কোনো কোনোটি বায়ুমন্ডলেই জ্বলে যাচ্ছে; অধিকাংশই মাটিতে আছড়ে পড়ে সশব্দে বিস্ফারিত হচ্ছে। অপার্থিব সাদা আলোয় আকাশ ভরে আছে, কিছুদিন পরে হয়তো দিন আর রাতের তফাৎ বোঝা যাবে না। বৈজ্ঞানিকদের পরামর্শ অনুযায়ী সব মানুষকেই  অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কিন্তু তেমন জায়গাও ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে। মহাবিশ্বের কোনো অতল কৃষ্ণগহ্বর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আগুনের তির এই গ্রহের বুকে এসে আছড়ে পড়ে  যেন ব্রহ্মান্ড থেকে প্রাণের শেষ চিহ্নটুকু মুছে দেবার খেলায় মেতে উঠেছে। পৃথিবীতে মানুষের আয়ু বুঝি  ফুরিয়ে এল।

ওকামুরা খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করলেন। বিজ্ঞানের অজানা কিছুই আর নেই। মানুষ এতদিনে জেনে গেছে মহাবিশ্বে সে একাই। মানুষী চেতনাই এই বিশ্বকে প্রথম অনুভব ও ধারণ করেছিল, সে না থাকলে প্রকৃতার্থে এই গ্রহ, তারা, ছায়াপথও কি থাকবে? এই আবির্ভাব, চেতনা ও প্রস্থান যেন বড়ো আকস্মিক, কার্যকারণহীন। মানতে মন চায় না। শিক্ষা, প্রযুক্তি, শিল্প, বিজ্ঞান, দর্শন নিয়ে সভ্যতার এই বিপুল আয়োজন শুধু অন্তহীন সর্বব্যাপী এক শূন্যতায় ফিরে যাবার জন্য? মানুষ কি অন্ধকারে আলোর টুকরোমাত্র, প্রকৃতি’র ক্রীড়নক?

তাঁর বুক থেকে গভীর শ্বাস উঠে এল। অনেকদিন আগে পড়া গীতায় শ্রীকৃষ্ণের উক্তি তাঁর মনে পড়ল,  “হে অর্জুন, ইহারা পূর্বেই নিহত হইয়াছে, তুমি নিমিত্ত মাত্র।”

কাহিনি

এক

সকাল সকাল সুহাসের ফোন। অরিত্র কানে তুলে লঘুগলায় বললেন, “কী ব্যাপার, সাতসকালে হঠাৎ মনে পড়ল কেন?”

সুহাস লজ্জিত গলায় বলল, “আসলে স্যার করব করব বলে করা হয় না। বোঝেনই তো.”

অরিত্র হেসে বললেন, “বুঝেছি। কাজের কথায় এস।”

সুহাস আমতা আমতা করে বলল, “স্যার কথাটা ঠিক ফোনে বোঝান যাবে না। একবার আসতে পারি?”

***

দশটার সময় অরিত্রের বসার ঘরে দুজনে মুখোমুখি বসে ছিলেন। কাজের মেয়েটি রান্নাবান্না সেরে ঘরদোর পরিষ্কার করে দিয়ে চলে গেছে। বাড়ি এখন ফাঁকা। অরিত্রর স্ত্রী গত হয়েছেন, একমাত্র ছেলে বাইরে থাকে, ফোনে খোঁজখবর নেয়। বছরে একবার করে ঘুরে যায়।

অরিত্র’ চটপট দুকাপ কফি বানিয়ে এনেছেন। কফিতে চুমুক দিয়ে সুহাস মোবাইল ঘেঁটে একটা স্ক্রিনশট বার করে তাঁর হাতে দিয়ে বলল, “এটা দেখেছেন?”

অরিত্র দেখলেন ছোটো একটা বিজ্ঞাপন, 

“বিনামূল্যে গ্যারান্টি সহ আপনার ভবিষ্যৎ জানতে হলে ক্লিক করুন।” তিনি মোবাইল ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, “এরকম তো জ্যোতিষীরা অনেকদিন ধরেই দেন।”

সুহাস বলল, “স্যার এটা আলাদা। প্রথমত এরা কুষ্ঠি বা হাত দেখে না, আপনাকে কিছু প্রশ্ন করবে তারপর যা জানতে চাইবেন বলে দেবে। দ্বিতীয়ত, যা খবর পাচ্ছি এদের ভবিষ্যৎবাণী প্রায় একশো ভাগ নির্ভুল।”

অরিত্র বললেন, “তাও সম্ভব। আজকাল বেশ কিছু সঠিক ভবিষ্যৎবাণী করা খুব একটা শক্ত নয়। কিন্তু তা নিয়ে কলকাতা পুলিশের সাইবার সেল মাথা ঘামাচ্ছে কেন? তোমাদের কাছে কি কেউ কোনো কমপ্লেন করেছে?”

সুহাস বলল, “এখনও নয়। আমরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। আসলে এভাবে লোকের বিশ্বাস অর্জন করে এরা পরে অনেক ক্ষতি করতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপারটা ছড়িয়ে যাচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত এই লিঙ্কটা অল্পজনই পেয়েছে।”

অরিত্র ঘাড় নেড়ে বললেন, “তা ঠিক। অনেক সাইবার ফ্রড এভাবেই হয়।”

সুহাস একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, “স্যার, আপনি তো ইনফর্মেশন টেকনোলজি’র একজন বিশেষজ্ঞ। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছেন। একটা কথা ভাবছিলাম। আজকাল তো শুনি সুপার কম্পিউটার অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত কান্ড করে। যেমন আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রায় নিখুঁতভাবে করতে পারে। শেয়ার মার্কেটেও নাকি কেউ কেউ এভাবে প্রচুর লাভ করছে। এক্ষেত্রে সেরকম কিছু হচ্ছে না তো?” 

অরিত্র হেসে বললেন, “মনে হয় না। আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি নিছক প্রাকৃতিক ব্যাপার, অতীতের ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করে তার মোটামুটি সঠিক পূর্বাভাস করা সম্ভব।  কিন্তু মানুষের জীবন নির্দিষ্ট সূত্র মেনে চলে না, তার নিজস্ব একটা চিন্তা ও উদ্যোগ আছে।”

সুহাস ঘাড় নেড়ে বলল, “সেটাই ভাবছিলাম। দেখি আর কটা দিন। আপনাকে জানাব।”

সে উঠে দাঁড়াল। অরিত্র তাকে দরজা অবধি এগিয়ে দিয়ে বললেন, “ভালো করে খোঁজ নাও। হয়তো  যাদের মিলছে না তারা সামনে আসছে না। কিছু এদের নিজেদের লোকও হতে পারে।”

সুহাস ঘাড় নাড়ল।

দুই

লিভারপুল, ইউ কে।

স্ট্যানলি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি নিয়মিত রেসের মাঠে যান পরিচিত কয়েকজন এই লিঙ্কটি পেয়েছেন শুনে তিনি হাত কামড়াতেন, এখন তাঁরই ইনবক্সে। কাঁপা হাতে তিনি লিঙ্কটি ক্লিক করে নির্দেশমতো কিছু তথ্য দিলেন ও নিজের প্রশ্নটি করলেন। উত্তর পেয়ে তাঁর চোখ প্রায় কপালে উঠে গেল। এরা যে ঘোড়াটি জিতবে বলছে সেটা একেবারেই ফেভারিট নয়, এক পাউন্ড লাগালে দুশ পাউন্ড পাওয়া যাবে। তাঁর ও স্ত্রী’র আকাউন্টে যা টাকা আছে লাগিয়ে দিলে যা লাভ হবে সেটা ভাবতেও সাহস হচ্ছে না। তিনি মোবাইল তুলে স্থানীয় বুকির নম্বর ডায়াল করলেন।

এডমন্টন, কানাডা

জুনিয়র রেসিডেন্ট ডাক্তারটি হতবাক। ড: ক্যালভিন প্রখ্যাত স্নায়ুবিশেষজ্ঞ কিন্তু পেশেন্টের এই অবস্থায় উনি যে কম্বিনেশন অফ ড্রাগস দিতে বলছেন সেটা শুধু অপ্রচলিত নয়, রোগীর পক্ষে বিপজ্জনকও হতে  পারে। সে ইতস্তত করে বলল, “ড: ক্যালভিন, আর ইউ শিওর..”

ড:  ক্যালভিন মৃদু হাসলেন।  রেসিডেন্ট ডাক্তার’টির কাঁধে হাত রেখে গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, “জাস্ট পুশ ইট। হি উইল বি অলরাইট।”

ডাক্তারটির মনে পড়ল উনি গত একসপ্তাহ ধরে এই জটিল অসুখটি নিয়ে পড়াশুনো ও চিন্তাভাবনা করেছেন, হয়তো অন্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন। সে আর দ্বিধা করল না।

তিন

লালবাজারের কনফারেন্স রুমে শহরের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি সমবেত হয়েছেন।এরা সকলেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে  বিশেষজ্ঞ। এদের কয়েকজনের সঙ্গে অরিত্রের আলাপ আছে, বাকিরাও মুখচেনা।

টেবিলের মাথায় পুলিশ কমিশনার মিত্র, পাশে সুহাস ও আরও একজন পুলিশকর্তা।

মিত্র শুরু করে বললেন, “প্রথমেই এখানে আসার জন্যে আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। আপনারা সকলেই এই শহরের মানীগুণী বিশিষ্ট নাগরিক। সুহাস আপনাদের সকলকেই বিষয়টা জানিয়েছে।”

একটু থেমে তিনি বললেন, ”সমস্যা ক্রমশ আরও জটিল হচ্ছে। চারদিক থেকে খবর আসছে। এদের  ভবিষ্যৎবাণীগুলি প্রায় সবক্ষেত্রেই মিলে যাচ্ছে, লোকে এদের বিশ্বাস করছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে শুরু করছে। শেয়ার মার্কেটে কিছু স্টক চড়চড় করে বাড়ছে, কিছু লোক ধার-দেনা করেও কিনছে। ভবিষ্যতে এরা সর্বস্বান্ত হতে পারে। জীবনবিমা’র ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ছে। যাদের দীর্ঘায়ু বলা হচ্ছে, তাদের অনেকে প্রিমিয়াম দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ব্যক্তিজীবনেও ভবিষ্যত আশাব্যঞ্জক নয় জানলে মানুষ হয়তো কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে পারে যদিও খুঁটিনাটি সব তথ্য এখনও আমাদের হাতে নেই।”

সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড: চ্যাটার্জি চিন্তিত ভাবে বললেন, “অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের তফাৎ হচ্ছে তার চিন্তা ও কাজের একটা বিরাট অংশ ব্যয় হয় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। এবারে সেটা যদি জানা হয়ে যায়, মানুষের  সমাজ অর্থনীতি, ব্যক্তিজীবন সবই আমুল পাল্টে যাবে।”

সকলে মাথা নাড়লেন। অরিত্রর পাশের চেয়ারে একটি বিখ্যাত পত্রিকার সাংবাদিক সংযুক্তা৷ তিনি উল্টোদিকে বসা মনোবিদ ড: হালদারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটা একটা যাকে বলে সেল্ফ সাপোর্টিং প্রফেসি হচ্ছে না তো? অর্থাৎ কিছু ভবিষ্যৎবাণী মিলে গেল, ফলে মানুষের বিশ্বাস বাড়ল, ফলে আরও মিলতে থাকল।”

হালদার মাথা নেড়ে বললেন, “খুবই সম্ভব। অসুস্থ রোগীকে যদি আশার কথা শোনানো যায়, সে মনের জোরে অনেক সময়ে সেরে উঠতে পারে। কিম্বা স্টকমার্কেটে যেমন, সকলে কিনতে থাকলে কোনো শেয়ারের দাম বাড়বেই।”

অরিত্র সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকালেন। চ্যাটার্জি বললেন, “একটাই সংশয়, এই প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য প্রথমে যথেষ্ট সংখ্যক ভবিষ্যৎবাণী সঠিক হওয়া চাই। সেটাই বা কী করে হচ্ছে?”

মিত্র  অরিত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার কী মনে হয়?”

অরিত্র বললেন, “আমারও  ধারণা নিছক প্রযুক্তির ব্যবহার করে এতগুলি নিঁখুৎ ভবিষ্যৎবাণী করা অসম্ভব। এরা হয়তো প্রযুক্তির ব্যবহার করছে কিন্তু সেইসঙ্গে কিছু ইনট্যুইশন, কিছুটা ঝুঁকি এবং সম্ভবত সংযুক্তা যেটা বললেন সেই বিশ্বাসের ব্যাপারটা রয়েছে। আমি বলব, যারা এই ভবিষ্যৎবাণী পেয়েছে তাদের নিয়ে যদি একটা সার্ভে করে বিস্তারিত তথ্য যোগাড় করা যায়, তাহলে কিছু প্যাটার্ন ধরা পড়তেও পারে।  হয়তো অনেকক্ষেত্রে দেখা যাবে ভবিষ্যৎবাণী করা খুব শক্ত ছিল না।”

সকলেই মাথা নাড়লেন। মিত্র বললেন, “আপনি ঠিকই বলেছেন, আগে একটা ডেটাবেস বানান দরকার। সুহাস অবশ্য ইতিমধ্যেই চেষ্টা করছে। তবে আমাদের সাবধানে এগোতে হচ্ছে ব্যাপারটা নিয়ে বেশি প্রচার হোক এটাও আমরা চাই না।”

মিত্রর পাশে বসা সিনিয়র পুলিশ অফিসারটি বললেন,  “কীভাবে  করছে সেটা ছাড়াও আমাদের কাছে এই মুহূর্তে আরো বড়ো প্রশ্ন হল কিভাবে এদের থামানো যায়। আমরা সবরকম চেষ্টা করে দেখেছি। এরা বিভিন্ন লোককে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে মেসেজ করছে। তাই ব্লক করে লাভ নেই। কয়েকটি আই পি ট্রেস করার চেষ্টা করে দেখেছি, এরা অনেকগুলি প্রক্সি সার্ভারের আড়াল থেকে কাজ করছে। ধরা খুব কঠিন।” 

 চ্যাটার্জি বললেন, “ব্যাপারটা কি শুধু কলকাতাতেই হচ্ছে?”

সুহাস মাথা নেড়ে বলল, “দেশের মধ্যে শুধু এখানেই। কিন্তু  সোশ্যাল মিডিয়ায় খুঁজে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন দেশের আরও অন্তত চারটি শহরে এরা পৌঁছে গেছে। তাদের সকলেরই একই অভিজ্ঞতা। আর সর্বত্রই বেছে বেছে কিছু লোকের কাছে পাঠাচ্ছে এবং একবার ব্যবহার করার পর লিঙ্কটি  নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে।”

আরো কিছুক্ষণ আলোচনা চলল, যদিও নির্দিষ্ট সমাধান সূত্র কিছু পাওয়া গেল না। মিত্র শেষে বললেন, “আপনাদের কথা শুনলাম। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীকে ব্রিফ করব। ইতিমধ্যেই আমরা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককেও পুরো ব্যাপারটা জানিয়ে তাদের সাহায্য চেয়েছি। আপনারাও আরো ভাবুন নিজেদের সার্কেলেও খোঁজখবর নিন। সুহাস  আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। দেখা যাক। আপনাদের কারো আর কিছু বলার আছে?”

অরিত্র ধীরে ধীরে বললেন “একটা ব্যাপারে খটকা লাগছে। এদের উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন এরা বেছে বেছে মাত্র কিছু লোককে মেসেজ পাঠাচ্ছে কেন?”

সবাই চুপ করে রইলেন। একটু পরে সংযুক্তা বললেন, “স্যার, এটা কি স্যাম্পল সার্ভের মত কোন ব্যাপার? এদের প্রেডিকশন বাস্তবে  কতটা সঠিক দেখে নিতে চাইছে?”

অরিত্র মৃদু হেসে বললেন, “আমারও তাই মনে হয়। সেক্ষেত্রে এই পর্ব শেষ হলে কিছুদিনের মধ্যেই এরা হয়ত লার্জ  স্কেলে অপারেশন শুরু করতে পারে।”

মিত্র ও তার পাশের পুলিশ অফিসারটি মুখ চাওয়াচাওয়ি  করলেন। শেষে মিত্র  বললেন, “এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু তো  করার নেই। তবে এ সম্ভাবনার কথাও আমি উপরমহলে জানিয়ে দেব।”

চার

অরিত্র সন্ধ্যাবেলা টিভি’তে নিউজ দেখছিলেন। মোবাইলে পিং করে মেসেজ ঢুকল। অরিত্র খুলে দেখলেন সুভাষ লিখেছে, “স্যার বিবিসি দেখুন।”

অরিত্র চ্যানেল পালটে বিবিসিতে গেলেন। স্ক্রিনে পরিচিত অ্যাঙ্কর ডরোথি। তিনি বললেন, “এবারে বান্ডুং-এ আমাদের প্রতিবেদক ইভার কাছে যাওয়া যাক।”

স্লিটস্ক্রিনে বুম হাতে সপ্রতিভ এক যুবতীকে দেখা গেল। আশপাশে বিভিন্ন বয়সের কয়েকজন ইন্দোনেশিয়ান নারী ও পুরুষ। তিনি  বললেন, “আমি একটু আগে এখানকার মেয়রের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি জানিয়েছেন এই শহরের বেশ কিছু  অধিবাসী রহস্যময় লিঙ্কটি পেয়েছেন। আমার সঙ্গে এঁদের কয়েকজন রয়েছেন।”

এক এক করে তিনি তিন-চার জনের সঙ্গে কথা বললেন। প্রত্যেকেই জানালেন তাঁদের পাঠানো ভবিষ্যৎবাণী সফল হয়েছে। কেউ ছেলেমেয়ের স্কুলের গ্রেড জানতে চেয়েছিলেন, কেউ অসুস্থ মায়ের আরোগ্যের ব্যাপারে। একজন হেসে বললেন, “আমি একসপ্তাহ পরে একটি শেয়ারের দাম জানতে চেয়েছিলাম, হুবহু মিলে গেছে।  আরও বেশি লাগাইনি বলে আফশোষ হচ্ছে।”

ডরোথি বললেন, “এই ভবিষ্যৎবাণী কিভাবে করা হচ্ছে সে সম্বন্ধে ওদের কী ধারণা?”

ইভা বললেন, “তা নিয়ে এদের কোন ধারণা বা বিশেষ আগ্রহও নেই। এঁরা শুধু হতাশ যে একবার ব্যবহার করার পর লিঙ্কটি আর কাজ করছে না।”

ডরোথি  বললেন, “এমন কেউ কি আছেন যাঁদের  মেলেনি?”

ইভা বললেন, “আমি এখানে আমার পরিচিত বন্ধু ও সাংবাদিক মহলে অনেক খোঁজ নিয়েছি, কিন্তু এরকম কাউকে পাইনি।”

তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে ডরোথি অন্য এক শহরের প্রতিবেদকের কাছে গেলেন। ক্যামেরা এরপর সারা  পৃথিবী ঘুরতে লাগল। ফুকুওকা, লিভারপুল, কলকাতা, এডমন্টন। সর্বত্রই এক চিত্র। কলকাতায় এক চিত্রপরিচালক ও প্রযোজক বললেন, তিনি জানতে চেয়েছিলেন তাঁর ছবি মুক্তির পর প্রথম সপ্তাহে কত টাকার ব্যাবসা করবে। তা প্রায় হুবহু মিলে গেছে। ফুকুওকায় এক ভদ্রমহিলা বললেন তিনি সুনামি আসার দুদিন আগে ভবিষ্যৎবাণী পেয়ে উপকূল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আবহাওয়া দপ্তরের রাডারে তা পরে ধরা পড়ে৷

ক্যামেরা আবার স্টুডিওতে ফিরে এলো। ডরোথি বললেন, “পৃথিবীতে নিঃশব্দে একটা প্রায় অবিশ্বাস্য ব্যাপার ঘটে চলেছে। এই লোকগুলি কারা, কীভাবে তারা এই ভবিষ্যৎবাণীগুলি করছে, তাদের উদ্দেশ্য কী, এ ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা বিভাগ ও বৈজ্ঞানিকেরা এখনও অন্ধকারে। তবে অনেকেই মনে করছেন, এখন কয়েকটি শহরে যেটা হচ্ছে সেটা ট্রায়াল মাত্র, কিছুদিনের মধ্যেই এরা পৃথিবী জুড়ে কাজ শুরু করবে।”

প্রোগ্রামটা শেষ হবার প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই সুহাসের ফোন এল। “স্যার কী বুঝলেন?”

অরিত্র বললেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় যাদের পোস্ট তুমি দেখিয়েছিলে তাদের কয়েকজন’কে চাক্ষুষ  দেখলাম। এছাড়া নতুন কিছু তো মনে হল না।”

সুহাস  বলল, “তবু বিভিন্ন শহরে এতজনের কথা শুনলেন, কোন সূত্র বা সেরকম কিছু…”

অরিত্র  একটু ভেবে বললেন, “হ্যাঁ, একটা কথা… এরা অনেকেই মেসেজ বেশ কিছুদিন আগে পেয়েছে। সাম্প্রতিক কেস বেশ কম। ভবিষৎবাণীর সংখ্যা কি কমে আসছে?”

সুহাস উত্তেজিতভাবে বলল, “স্যার,  কলকাতাতেও তাই। গত কয়েক দিনে মাত্র চার জন লোক মেসেজ পেয়েছে।”

অরিত্র চিন্তিত মুখে বললেন, “এটাই ভাবাচ্ছে। এরা আপাতত কিছুদিন  কিছু লোককে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখল। হয়তো এদের যা টার্গেট ছিল প্রায় হয়ে এসেছে। এখন কিছুদিন হয়তো চুপচাপ থাকবে তারপর কী করবে কেউ জানে না।”

পাঁচ

জেনেভায় ইউ এন ও অফিসের বেসমেন্টে ছোটো সাদামাটা অনাড়ম্বর  একটি ঘর। একটি টেবিলের দু’দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকজন বসে আছেন। দেখে মনে হয় কোন ডিপার্টমেন্টের মামুলি কোনো মিটিং। তবে ভালো করে দেখলে বোঝা যায় এঁদের সকলের চেহারায় একধরণের পেশাদারি দক্ষতা ও কাঠিন্যের  ছাপ।

তাঁদের একজন বলছিলেন, “মনে হয় এদের  ট্রায়াল শেষ হয়ে আসছে।”

“হ্যাঁ, মেসেজের সংখ্যা এখন অনেক কম। নতুন কোন শহরও যোগ হয়নি।”

“আশ্চর্য যে এদের এখনও  ট্রেস করা গেল না। সারা পৃথিবীর সাইবার ক্রাইম সেলগুলি চেষ্টা করেছে। এরা সম্পূর্ণ নতুন কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এত দ্রুত আই পি পালটে ফেলছে যে ধরা প্রায় অসম্ভব।”

“তাহলে উপায়?”

“একমাত্র উপায় সব দেশের সরকারকে বলে এদের খুঁজে বার করা। এতবড়ো একটা কাজের জন্য এরা  অবশ্যই অনেকটা জায়গা জুড়ে নিজেদের সার্ভার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ইনস্টল করেছে। কোনো দ্বীপ বা নির্জন কোন জায়গা হতে পারে। তবে ঝুঁকি হচ্ছে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে এরা সতর্ক হয়ে যাবে।”

এবারে  গম্ভীর শীতল একটা  কন্ঠ বলল, “লেটস ডু দ্যাট জেন্টলমেন। উই আর রানিং আউট অফ অপশনস।”

ছয়

সিঙ্গাপুর থেকে অকল্যান্ডের ফ্লাইটটা বেশ লম্বা, বারোঘণ্টার মত। আজকাল অবশ্য ওয়াইফাই থাকে, ঘরে বসে যা করেন সবই করা যায়। তবু এতক্ষণ বসে থাকার একটা অস্বস্তি তো থাকেই।

একটু আগে খাবার দিয়ে গেছে। সঙ্গে উৎকৃষ্ট সুরা। অরিত্র এমনিতে মদ্যপান বিশেষ করেন না, তবে লম্বা ফ্লাইটে সময় কাটাতে অল্পসল্প ওয়াইন চলে। ঘুমটাও ভালো হয়। ওয়াইনে চুমুক দিতে দিতে তিনি মেলিয়ার দুদিন আগের মেসেজটা আবার দেখলেন। লিখেছে, “অরিত্র, এই ভবিষ্যৎবক্তাদের সম্বন্ধে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য পেয়েছি।  উড লাইক টু ডিসকাস ইন পারসন। ইনভাইটিং ডক্টর জেরাল্ড অলসো। প্লিজ কনফার্ম।”

অরিত্র  একসময় মিশিগান ইউনিভার্সিটিতে পড়াতেন। মেলিয়া তাঁর কাছেই পিএইচডি করেছিল। করে ওখানেই গবেষণার কাজে যোগ দেয়। বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স  নিয়ে  কয়েকটা  পেপার লিখে বৈজ্ঞানিক মহলে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল। ডক্টর জেরাল্ড মিশিগানেই দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। অরিত্রের প্রতিবেশি ও ভালো বন্ধু ছিলেন। সেই সূত্রেই মেলিয়ার সঙ্গে আলাপ। তাঁরা তিনজনে বসে প্রায়ই আড্ডা দিতেন ।

অরিত্র দেশে ফিরে আসার পরও মেলিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তারপর সে হঠাৎ কোথাও উধাও হয়ে যায়। বহুদিন পর মাত্র কয়েক মাস আগে হঠাৎ যোগাযোগ করে জানায় সে নিউজিল্যান্ডে সেটল করেছে, স্থানীয় একটি  কলেজে পড়ায়।

দু’দিন আগে মেসেজটা পেয়ে  অরিত্র তাকে ফোন করেছিলেন, কিন্তু মেলিয়া কিছু খুলে বলেনি। শুধু আসার জন্য জোরাজুরি করেছে। অরিত্রকে বাধ্য হয়েই রাজি হতে হয়েছে। ডাক্তার জেরাল্ডও বিস্মিত, তবে তিনিও আসছেন। মেলিয়া থাকে নর্থ আইল্যান্ডের উপর দিকে কাইটাইয়া বলে একটা বিচ-টাউনে। অকল্যান্ডে নেমে প্লেন বদল করে যেতে হবে।

পানভোজন পর্ব শেষ, কেবিনের আলো স্তিমিত করে দিয়েছে। যাত্রীরা কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন। অরিত্র চোখ বন্ধ করলেন। আধোঘুমে  দেখলেন পৃথিবী জুড়ে যেন পরমাণু যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, নীচে বিশাল আগুনে মেঘ ব্যাঙের ছাতার মত পাকিয়ে উঠছে। তাঁদের প্লেন নামতে পারছে না, নামলেই যাত্রীরা আগুন ও তেজস্ক্রিয়তার মধ্যে পড়বেন।

 স্বপ্ন ভাঙার পর অরিত্রর বুক ধক করে উঠল। এই স্বপ্নের অর্থ বোঝা খুব কঠিন নয়।

সাত

অকল্যান্ড থেকে কাইটাইয়া ঘণ্টাখানেকের ফ্লাইট। দিনে দুটিই মাত্র ফ্লাইট। কাইটাইয়া এয়ারপোর্টটা বেশ ছোটো, প্লেন থেকে নেমে হেঁটেই  টার্মিনালে ঢোকা যায়। লাগেজ তুলে নিয়ে দু’পা এগোতেই এগজিট,  গেটের সামনেই মেলিয়া আর জেরাল্ড দাঁড়িয়ে। অরিত্রকে দেখে হই হই করে জড়িয়ে ধরলেন জেরাল্ড। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বকবক হল, তারপর মেলিয়া গাড়ি নিয়ে এল। এয়ারপোর্ট থেকে তার বাড়ি মাত্র দশ মিনিট।

ছোটো সুন্দর কটেজ টাইপের বাড়ি। লিভিং কাম ডাইনিং রুম পেরিয়ে একপাশে বেশ বড়ো খোলামেলা একটি গেস্ট রুম। মেলিয়া বলল, “তোমরা সেটল করে ফ্রেশ হয়ে নাও, তারপর কফি-টফি দিচ্ছি।”

একটু পরে বাইরে টেবিল ঘিরে তিনজন বসেছিলেন। মেলিয়া বিশাল একপট কফি আর প্লেটে করে একগাদা স্যান্ডউইচ নিয়ে এসেছে। জমাটি আড্ডার পরিবেশ।

খেতে খেতে গল্প জমে উঠল। মেলিয়া বিয়ে-টিয়ে করেনি। একজন বয়ফ্রেন্ড অবশ্য আছে। এখানে ছোটোখাটো একটা কলেজে পড়ায়, উইকএন্ডে বাবা-মা’র কাছে চলে যায় কিম্বা বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়ে। অরিত্র জিগ্যেস করলেন, “তোমার এত ব্রাইট কেরিয়ার ছিল, রিসার্চের কাজ ছেড়ে দিলে?”

মেলিয়া হেসে বলল, “পুরোপুরি যে ছাড়িনি তা তো বুঝতেই পারছ। দু-একটা কোম্পানিকে গাইড করি,  পরামর্শ-টর্শ দি। সেইসূত্রেই এদের সম্পর্কে জানতে পারি।”

জেরাল্ড আর অরিত্র মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। মেলিয়া বলল, “তোমরা অনেকদূর থেকে এসেছ, আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। আসলে আমার এখন আর বৈজ্ঞানিকমহলে বিশেষ যোগাযোগ নেই। তাই তোমাদের কথাই মনে হল। ডেকে পাঠানোর কারণটা তাহলে বলি।”

মেলিয়ার কথা

“ব্যাপারটা আমি প্রথমে জানতে পারি এডমন্টন প্রবাসী এক বন্ধুর কাছ থেকে। কৌতূহলের বশে আমি সোশ্যাল মিডিয়ায়  খোঁজ করতে থাকি। কয়েকজনের সঙ্গে কথাও হয়।

খুঁজতে খুঁজতে কিছুটা আকস্মিকভাবেই খবর পাই আমার বিশেষ পরিচিত একটি ছেলে এদের সঙ্গে যুক্ত। তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। প্রথমে অস্বীকার করলেও আমি তাকে ধীরেধীরে ব্যাপারটার গুরুত্ব বোঝাই।  শেষমেশ সে শুধু তাদের কাজের প্রযুক্তিগত দিকটা সংক্ষেপে জানিয়েছে। কিছুটা আমার অনুমান।”

একটু থেমে সে বলল, “জেরাল্ড তো এ-ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ, অরিত্র তুমিও হয়তো জানো, অনেক বিখ্যাত  দার্শনিক ও বিজ্ঞানী  বিশ্বাস করেন যে  মহাবিশ্বে সব কিছুই পূর্বনির্ধারিত এবং অত্যন্ত জটিল এক কার্যকারণ শৃঙখলে বাধা। মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও কাজ সেটা পাল্টাতে পারেনা। আশির দশকেই নিউরোসায়েন্সের এক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল আমরা সচেতনভাবে  কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কয়েক মুহূর্ত আগেই আমাদের ব্রেনে সে ব্যাপারে সঙ্কেত ধরা পড়ছে। অর্থাৎ. আমাদের অগোচরে সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হচ্ছে, সেখানে আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।”

এই তত্ত্ব অরিত্রের অজানা নয় তবু তিনি যেন চমকে উঠলেন। জেরাল্ড চুপ করে শুনছেন।

মেলিয়া বলল, “এবারে  মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। একজন মানুষ কোন পরিস্থিতিতে কবে কিরকম আচরণ করবে তলিয়ে দেখলে তা মূলত দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে – তার জিন ও পরিবেশ। স্বভাবগত প্রবৃত্তি ও শিক্ষা। ইংরেজিতে যাকে নেচার ও নার্চার বলা হয়। তবে তার জীবনে ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা শুধু তার  আচরণ নয়, তার গোটা পারিপার্শ্বিক, তার সমাজ, অর্থনীতি, জলবায়ু এমনকি তার প্রতিবেশির আচরণের উপরেও নির্ভর করে। ধরুন আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আপনার মাথায় কারো বাড়ির বারান্দা থেকে অসাবধানে রাখা ফুলের টব ভেঙে পড়ল। সেটাও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।”

দুজনে প্রায় দম বন্ধ করে শুনছেন। মারিয়া বলল, “এবার ধর এই সমস্ত তথ্য.. একজন মানুষের জেনেটিক ডেটা, তার স্কুল, শিক্ষা, পরিবার, ঘনিষ্ঠ বন্ধুবর্গ এবং তার গোটা পারিপার্শ্বিকের যাবতীয় তথ্য একটা সুপার কম্পিউটারে পুরে দেওয়া হল। তাহলে  হয়তো তার পক্ষে নিখুঁত ভবিষ্যৎবাণী করা সম্ভব।” 

অরিত্র উত্তেজিতভাবে বললেন, “তোমার কথা মেনে নিলেও এই অবিশ্বাস্য পরিমাণ ডেটা প্রসেস করতে যে ধরনের কম্পিউটিং পাওয়ার দরকার তা আমাদের ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার হয়তো পারতেও পারে, কিন্তু সে তো এখনও দূর অস্ত।”

মেলিয়া শান্তভাবে বলল, “ধরা যাক এদের টিমে একজন জিনিয়াস সায়েন্টিস্ট আছেন যিনি এই সমস্যার সমাধান বার করেছেন। এবং এমন একটি কম্পিউটার তৈরি করেছেন যা ঠিক এই কাজটিই করতে পারে।”

দুজনেই চুপ করে গেলেন। একটু পরে জেরাল্ড ধীরে ধীরে বললেন, “মানুষের চিন্তা স্বাধীন নয় এই তত্ত্ব বেশ বিতর্কিত। বিরুদ্ধমতই বেশি। আমি নিজেও তাই মনে করি। তুমি যে পরীক্ষাটির কথা বলছ অন্য পরীক্ষায় তার বিপরীত ফলও পাওয়া গেছে। তাছাড়া আমার মতে বিষয়টা শুধু নিউরোসায়েন্সের এক্তিয়ারে পড়ে না, দর্শন ও মনোবিদ্যাও এর সঙ্গে জড়িত।”

মেলিয়া বলল, “অবশ্যই বিতর্কিত। কিন্তু বিজ্ঞান ও সভ্যতার কাছে এটা একটা বড়ো প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ ছিল। হয়তো সেজন্যই এরা হাতেকলমে করে দেখতে চেয়েছিল।”

তারপর সে মৃদু হেসে বলল, “ফলাফল তো আমরা দেখলাম।”

মেলিয়ার শেষ কথাগুলি যেন তাদের ঘিরে ধরে বাতাসে ভাসতে লাগল। দুজনে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। একটু পরে অরিত্র বললেন, “তাহলে এখন কী করবে ভাবছ? এরা কোথা থেকে কাজ করছে,  এদের নেতা কে এ ব্যাপারে কিছু জেনেছ?”

মেলিয়া মাথা নেড়ে বলল, “বিন্দুমাত্র না। এব্যাপারে প্রশ্ন করব না এই শর্তেই ছেলেটি মুখ খুলতে রাজি হয়েছে।”

জেরাল্ড বললেন, “এবার এদের প্ল্যান কী? পৃথিবী জুড়ে অপারেশন শুরু করবে?”

মেলিয়া বলল, “না। কয়েকদিন আগে ছেলেটি নিজেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। ওর কথামত এরা  শুধুমাত্র বিজ্ঞান ও দর্শনের এই জটিল প্রশ্নটি হাতেকলমে পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিল। সে কাজ সফল হয়েছে। পাঁচটি শহরের প্রতিটিতে পাঁচ হাজার করে মানুষকে নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে সেগুলি প্রায় সবই মিলে গেছে। এবারে এরা অপারেশন গুটিয়ে ফেলতে চায়।”

অরিত্র ও জেরাল্ড  দুজনেরই চোখ কপালে উঠল। জেরাল্ড বললেন “তোমাকে জানাল কেন?”

মেলিয়া বলল, “এরা একটা সাহায্য চাইছে। এই গবেষণার ফলাফল এরা প্রকাশ্যে আনতে চায়। কিন্তু নিজেরা সামনে আসতে চায় না। এরা চায় প্রতিষ্ঠিত কোন বিজ্ঞানী’র হাতে নিজেদের ডেটাবেস এবং গবেষণালব্ধ তথ্য তুলে দেবে। তিনি বিজ্ঞানীদের কোন কনফারেন্সে তা বিশদ ব্যাখ্যা করবেন।”

জেরাল্ড বিস্মিতভাবে বললেন, “সামনে না আসার কারণ কী? এতবড়ো একটা আবিষ্কারের কৃতিত্ব ছেড়ে দেবে? সঠিক ভবিষ্যৎবাণী করা নিশ্চয়ই কোন অপরাধ নয়?”

মেলিয়া বললেন, “সেটা আমি বলতে পারব না। এরা প্রস্তাবটা আমাকেই দিয়েছিল, কিন্তু আমার আর নতুন করে প্রচারের আলোয় আসায় ইচ্ছে নেই, তাই তোমাদের কথা ভেবেছি। তোমরা দুজনেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিচিত নাম। এদের ডেটাবেসে প্রত্যেকের ফোন নম্বর দেওয়া আছে। তোমরা কোন পেশাদার সার্ভে সংস্থাকে দিয়ে অনায়াসে যাচাই করে নিতে পারো।”

জেরাল্ড  বললেন, “সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু ব্যাপারটা জনসমক্ষে আনার আগে এর ভয়ঙ্কর দিকটা ভেবে দেখেছ? সবকিছুই যদি পূর্বনির্ধারিত হয় তাহলে মানুষের আর নৈতিক দায়িত্ব বলে কিছু থাকে না। রাষ্ট্রেরও  আর অপরাধীদের শাস্তি দেবার অধিকার থাকে না। পৃথিবী জুড়ে নৈরাজ্য শুরু হয়ে যাবে।”

মেলিয়া বলল, “হ্যাঁ, কঠিন প্রশ্ন। মনে হয় সেজন্যই এরা ব্যাপারটা শুধু বিজ্ঞানীদের সম্মেলনেই জানাতে চায়। সংবাদ-মাধ্যম থাকবে না। তারপর বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা হবে, প্রশ্ন উঠবে৷ কেউ কেউ হয়তো বিবৃতি দিয়ে ব্যাপারটা নস্যাৎও করতে পারেন। যেহেতু এরা এই প্রযুক্তি ও তার ব্যবহার গোপন রাখবে, ব্যাপারটা ধীরেধীরে থিতিয়ে যাবে বলে মনে হয়। এরা হয়তো চাইছে বিজ্ঞানের ইতিহাসে  ভাবীকালের জন্য কোথাও ব্যাপারটা নথিবদ্ধ হয়ে থাক।”

অরিত্র বললেন, “আর একটা প্রশ্ন। ভবিষ্যৎবাণী এরা যে পদ্ধতিতে করছে বলে দাবি করছে সেটাই যে ঠিক বুঝব কী  করে? সেটা প্রমাণ না করতে পারলে লোকে আমাদের বিশ্বাস করবে কেন?”

মেলিয়া হেসে বললেন, “এ প্রশ্ন আমারও। তবে ওরা কোথায় বসে  কিভাবে কাজ করছে সেটা চর্মচক্ষে দেখলেও কি আমরা নিশ্চিত হতে পারব? আমরা ত বাইরের কিছু মেশিন বা সেট-আপ দেখব, এবার আসল  কাজটা তারাই করছে না অনুমান বা দৈবশক্তিতে হচ্ছে সেটা বাইরে থেকে নিশ্চিত করে বুঝবে কী করে?”

দুজনেই  স্বীকার করতে বাধ্য হলেন কথাটায় যুক্তি আছে। আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর অরিত্র বললেন, “কাজটা বেশ ঝুঁকির। আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আমাদের কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে। সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগবে।”

জেরাল্ড সায় দিয়ে বললেন, “আমরা ফিরে গিয়ে ঠান্ডামাথায় ভেবেচিন্তে তোমাকে জানাব।”

মেলিয়া হেসে বলল, “ফেয়ার এনাফ। কিন্তু এবারে এই প্রসঙ্গে ইতি। আমার এক বন্ধু ইতালি থেকে ভালো ওয়াইন আর চিজ পাঠিয়েছে, সদ্ব্যবহার করা যাক।”

সাত

দুজনে এয়ারপোর্টে বসে ছিলেন। মেলিয়া একটু আগে তাঁদের ছেড়ে দিয়ে বিদায় জানিয়ে চলে গেছে। এতদূর থেকে আসার পর মেলিয়া অতিথিসেবা না করে কিছুতেই তাদের ছাড়তে চায়নি। দুদিন পান-ভোজন ও তুমুল আড্ডা হয়েছে, ফাঁকে ফাঁকে মেলিয়া শহর ও আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। আসল প্রসঙ্গ নিয়ে বিশেষ কোন কথা হয়নি।   

নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে অরিত্ররা মোটামুটি কাজটা করবেন বলেই ভেবেছেন। এতবড়ো একটা কাজ সুষ্ঠুভাবে সবার সামনে আনা দরকার। যদিও মেলিয়াকে এখনও জানাননি।

অরিত্র দু’কাপ কফি নিয়ে এসেছেন। জেরাল্ড কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, “পুরো ব্যাপারটা এখনও যেন  বিশ্বাস হচ্ছে না।”

অরিত্র ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন। তারপর বললেন, “একটা কথা ভেবে দেখেছ? একজন বাইরের লোক হিসেবে মেলিয়া যেন ব্যাপারটা সম্বন্ধে বড়ো বেশি জানে। ”

জেরাল্ড ভুরু কুঁচকে বললেন, “মানে.. কী বলতে চাইছ?” 

অরিত্র মুচকি হেসে বললেন, “ভেবে দ্যাখো।”

জেরাল্ডের ভুরু কুঁচকে গেল। তারপর হঠাৎ প্রায় লাফিয়ে উঠে অরিত্রর উরুতে প্রচন্ড জোরে চাপড় মেরে বললেন, “হোলি শিট। ইউ আর ব্লাডি রাইট। ইট’স হার ব্রেন-চাইল্ড অনলি।”

এবার দুজনে মিলে হাসতে লাগলেন। হাসি থামলে অরিত্র বললেন, “একটা কথা জানা হল না। কম্পিউটারটা নিয়ে এরপর ওরা মানে মেলিয়া কী করবে?”

জেরাল্ড বললেন, “আমার ধারণা ওটা সযত্নেই থাকবে। পরের কোন প্রোজেক্টে কাজে লাগাবে।  হয়তো ও  চাপ এড়িয়ে শান্তিতে কাজ করে যেতে চায় বলেই নিজে সামনে এলো না৷”

অরিত্র সায় দিয়ে বললেন, “তাছাড়াও সামনে এলে এই প্রযুক্তি গোপন করে রাখা সম্ভব হত না। আর প্রযুক্তির অপব্যবহার কত ভয়ঙ্কর হতে পারে আমরা জানি। আমার ধারণা ওর আবিষ্কার ও যথাসময়ে উত্তরকালের জন্য রেখে যাবে, তার ব্যবহার কী বা কবে হবে তারাই ঠিক করবে।”

দুজনে নি:শব্দে কফি শেষ করলেন। বোর্ডিং শুরু হতে এখনও সময় আছে। ছোটো এয়ারপোর্টটি এখনও প্রায় ফাঁকা, দু-একজন স্টাফ ইতস্তত ঘোরাফেরা করছে।

জেরাল্ড হঠাৎ বললেন, “এতবড়ো একটা আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে চলেছি ভেবে রোমাঞ্চ হচ্ছে ঠিকই তবু ব্যাপারটা জানার পর  অদ্ভূত একটা অনুভূতি হচ্ছে।”

অরিত্র হেসে বললেন, “মনে হচ্ছে হঠাৎ কেউ বিশাল একটা শূন্যতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, তাই না?”

জেরাল্ড মৃদু হেসে বললেন, “ঠিক তাই। ভেবে দ্যাখ মেলিয়ার তত্ত্ব অনুযায়ী হাজার কোটি বছর আগে যখম ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয়েছিল সেই জ্বলন্ত মেঘপুঞ্জের অণুপরমাণুগুলিতেই ঠিক করা ছিল তুমি আর আমি আজকে এই  এয়ারপোর্টে বসে কথা বলব।”

অরিত্র কটমট করে তাকিয়ে বললেন, “আমার মত একজন ডেটা সায়েন্টিস্টের পক্ষে এটা বড্ড জটিল হয়ে গেল না?”

দুজনে আবার হাসতে লাগলেন।

জয়ঢাকের গল্পঘর

এই লেখকের কুড়িটি কিশোর কাহিনির সঙ্কলন ‘ভয়ের ভাক্সিন”  বইটি সম্বন্ধে জানতে ও  জয়ঢাক প্রকাশনের বুকস্টোর থেকে অর্ডার দিতে নীচের ছবিতে ক্লিক করুন

bhoyvacbook

Leave a Reply