এইলেখকের আগের গল্প কৃপণের বামমুঠি, দহনভার, পরবাস, সাভান্ত, ছিন্নমূল
(সন্ধ্যা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০২৩- চতুর্থ স্থান)

কলটা এল রাত দুটোর সময়। শৌভিক বিরক্ত ও বিস্মিত হলেন। এত রাতে কে তাঁকে ফোন করছে? তিনি চোখ খুললেন এবং চমকে উঠে বসলেন। তাঁর সামনে দেয়ালজোড়া স্ক্রিনে যে মুখটা ভেসে উঠেছে সেটা তাঁর মা সুমিতার। তিনি হাসিমুখে বললেন, “বুবলু আমি রে। কেমন আছিস?”
শৌভিক প্রাথমিক বিস্ময়ের ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠেছেন। তিনি কড়া গলায় বললেন, “দেখুন আপনি যে-ই হোন, মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে রসিকতা করাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?”
সুমিতা কিছু একটা বলতে গেলেন, কিন্তু হঠাৎ স্ক্রিন ব্ল্যাংক হয়ে গেল। শৌভিক উঠে গিয়ে পাওয়ার অফ করে দিয়ে এলেন। এখন চট করে ঘুম আসবে না। তিনি এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে বসলেন।
সুমিতা গেছেন প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল। শৌভিক বিয়ে করেননি, মা তাঁর সঙ্গেই থাকতেন। এখনও যেন মিস করেন। আজকাল অত্যুন্নত চিকিৎসার দৌলতে মানুষ অনেকদিন বাঁচে, অনেকেই শতায়ু হয়। সুমিতা সে হিসাবে একটু আগেই গেছিলেন। তবে প্রায় শেষদিন অবধি কর্মক্ষম ছিলেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল গত শতকের শুরুর দিকে; সভ্যতাকে অনেক সংকটের মধ্যে দিয়ে যেতে দেখেছেন। একসময় পরিবেশ দূষণ, মহামারী, পারমাণবিক যুদ্ধ—এইসব কিছু নিয়ে সভ্যতা ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছিল। সেখান থেকে প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। সুমিতার কাছে সেইসব গল্প অবাক হয়ে শুনতেন।
তাঁর নিজের ছোটবেলার কথাও মনে পড়ে যাচ্ছিল। তাঁরও দেখতে দেখতে সত্তর বছর হয়ে গেল। চোখের সামনে অনেক কিছু পালটাতে দেখেছেন। গ্লোবাল গভর্নমেন্ট বা সারা পৃথিবীর জন্য এক সরকার যখন চালু হয় তাঁর কুড়ি বছর বয়েস।
পরের দিন ন’টা নাগাদ শৌভিক ভার্চুয়াল ওয়ার্ক স্পেসে লগ-ইন করলেন। বস্তুত তিনি সেই বিরল-মেধাবী মানুষদের একজন, মৌলিক গবেষণার কাজে যাঁদের এখনও প্রয়োজন হয়। অন্য সব কাজই এ.আই এবং এ.আই চালিত রোবটরাই করে। অধিকাংশ মানুষ সরকারের দেওয়া ভাতায় আরামে দিন কাটায়।
ওয়ার্ক স্পেসে সহ-গবেষক শান্তনুর সঙ্গে দেখা হল। কথায় কথায় তিনি গতরাতের ঘটনাটা বললেন। শান্তনু বললেন, “সমস্যা হল কাজকর্ম না থাকায় লোকে হাঁপিয়ে উঠেছে। কাহাঁতক আর ভার্চুয়াল স্পেসে ভিডিও গেম খেলে সময় কাটানো যায়? তাই এইসব করে কিছুটা উত্তেজনার স্বাদ পাওয়ার চেষ্টা।”
তিনি ঘাড় নাড়লেন। গত শতাব্দীর তুলনায় পৃথিবী এখন প্রায় স্বপ্নের দেশ। উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে শস্যক্ষেত্রগুলিতে ফসল উপচে পড়ছে। কলকারখানাগুলি দূষণ না ছড়িয়েই থরে থরে ভোগ্য পণ্য তৈরি করে চলেছে। সামরিক খাতে বিপুল খরচা বন্ধ হয়েছে; সেই অর্থ উন্নততর গবেষণার কাজে ব্যয় করা হয়। নাগরিকদের বিনোদনের দায়িত্ব পর্যন্ত রাষ্ট্র নিয়েছে। কিন্তু সবকিছু পেয়েও কিছু মানুষ সুখী নয়। তাদের জীবনে কোনও লক্ষ্য নেই, চ্যালেঞ্জ নেই। বৈচিত্র্যহীন একঘেয়ে জীবন। তার জিনের মধ্যে রয়ে গেছে প্রয়াস ও পরিশ্রম করে সফল হবার বাসনা; অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজের ভাগ্যকে শিকার করে ফেরাতেই তার আনন্দ। এত স্বাচ্ছন্দ্য ও নিশ্চয়তার মধ্যে কিছুদিন পরেই সে হাঁপিয়ে ওঠে। এইজন্য অনেকে আজকাল রাষ্ট্রের আশ্রয় ও নিরাপত্তা ছেড়ে দল বেঁধে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাচ্ছে। সেখানে অহোরাত্র লড়াই করে অনেক প্রতিকূলতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকাই এদের পছন্দ। রাষ্ট্র এদের বাধা দেয় না, শুধু নিঃশব্দে নজর রাখে।
একটু পরে তাঁর সহকারী রঞ্জনা এল। কাজের কথা শেষ হলে সে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, “এনিথিং রং শৌভিক?”
শৌভিক প্রথমে অবাক হলেন। তারপর হেসে ফেললেন। রঞ্জনার ব্রেনে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি প্রোগ্রাম করা আছে। সে মুখ-চোখের সামান্যতম পরিবর্তনও ধরে ফেলে। মেয়েটি অত্যন্ত কুশলী; শুধু তাঁর গবেষণার কাজে নয়, যাবতীয় ব্যক্তিগত কাজেও তাঁকে সাহায্য করে।
তিনি রঞ্জনাকেও ঘটনাটা বললেন। সে বলল, “আমি শুনেছি, এই ধরনের কলারদের কঠোর শাস্তি দেবার ব্যাপারে সরকার চিন্তাভাবনা করছে। যাই হোক, আমি কমপ্লেইন্ট করে দিচ্ছি। ওরা হয়তো আইডিটা ট্রেস করতে পারবে।”
আজকাল অবশ্য শাস্তি দেবার জন্য কাউকে জেলে পাঠাতে হয় না। শুধু বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
একটু পরেই সেন্ট্রাল অপারেশন টিম থেকে একটি মেয়ে কল করল। খুব বিনীতভাবে বলল, “আয়াম সো সরি শৌভিক, কিন্তু আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী আজ সকালে আপনার কাছে কোনও কল যায়নি।”
শৌভিকের চোখ-মুখ কুঁচকে গেল। তিনি বললেন, “হোয়াট?”
মেয়েটি আবার খুবই নম্রভাবে বলল, “বুঝতে পারছি কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের রেকর্ড তাই বলছে। আমাদের ডেটাবেস হ্যাক করে রেকর্ড পালটে দেওয়া প্রায় অসম্ভব, তবু সেটাও আমরা চেক করে নিয়েছি।”
শৌভিক বিস্মিত হয়েছেন বললে কম বলা হয়। তাহলে কি তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন? কিন্তু কলটা আসার পর কফি বানিয়ে খেলেন, অনেকক্ষণ জেগে ছিলেন—এসব তো পরিষ্কার মনে আছে! সবই স্বপ্নের মধ্যে?
যাই হোক, আপাতত বেশি ভেবে লাভ নেই। আবার বিরক্ত করলে দেখা যাবে। রঞ্জনাও শুনে-টুনে তাই বলল।
দেখতে দেখতে কয়েকদিন কাটল। শৌভিক স্বভাবমতো কাজে ডুবে রইলেন। কলের ব্যাপারটাও তাঁর মাথা থেকে প্রায় বেরিয়ে গেছে। তবে তিনি ঠিক করেছেন তাঁদের ফ্যামিলি আর্কাইভে এই স্বপ্নের ব্যাপারটা লিখে রাখবেন।
একদিন শৌভিক কাজ শেষ করে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছেন, ভাবলেন নীচে নেমে একটু হেঁটে আসবেন। আজকাল সবকিছুই ভার্চুয়াল স্পেসে হয়, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বেরোনোর দরকার হয় না। নতুন প্রজন্ম এতেই স্বচ্ছন্দ। শৌভিকের মতো পুরোনো জমানার লোকদের জন্য বিল্ডিংয়ের সামনে সবুজে ঘেরা ওয়াকিং ট্র্যাক আছে। হাঁটতে হাঁটতে সমবয়সি মুখচেনা কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হল, দু-চারটে কথাও হল। এঁদের অনেকেই অনেকদিন থেকেই অবসর জীবন যাপন করছেন। সারাদিন ভার্চুয়াল স্পেসেই কাটান। আড্ডা দেন, গেম খেলেন বা সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান। নতুন কোনও গ্যাজেট বেরোলে কিছুদিন সেটা নিয়ে মেতে থাকেন। যেমন, কয়েক বছর আগে টেলিপ্যাথিক হেলমেট বাজারে এসেছে। এটা মাথায় পরে নিয়ে পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তে মানুষের সঙ্গে টেলিপ্যাথিতে কথা বলা যায়। নতুন প্রজন্ম আজকাল এটাই ব্যবহার করে। আর একটা গ্যাজেট সম্প্রতি বেরিয়েছে—ড্রিম ক্যাচার। শৌভিক এটা ব্যবহার করেননি। আজ একজন বললেন, তিনি করে দেখেছেন, রাতের স্বপ্নগুলি রেকর্ড হয়ে যায়; সকালে উঠে চালিয়ে দেখা যায়।
শৌভিকের হঠাৎ মনে হল, এটা ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে। সকালে উঠে সব স্বপ্ন মানুষের মনে থাকে না।
অর্ডার দেবার কিছুক্ষণের মধ্যেই জিনিসটা চলে এল। এটাও একটা হেলমেটের মতো, রাতে শোবার আগে পরে নিতে হয়। প্রথমে একটু অস্বস্তি হয়, পরে অভ্যাস হয়ে যায়।
প্রথম ক’দিন কিছুই এল না। তারপর একদিন রাতে শৌভিক ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন। মেশিনের পর্দায় একটা ছবি ফুটে উঠছে। একটু ঝাপসা, কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয় না। সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে ছোটো একটা কটেজ। শৌভিক চিনতে পারলেন, এখানে ছোটবেলায় তাঁরা বেড়াতে গেছিলেন। দরজায় তিনি বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, আর অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে সুমিতা চলে যাচ্ছেন। ধীরে ধীরে তিনি কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেলেন। এরপর স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে গেল।
শৌভিক মনে মনে হাসলেন। প্রযুক্তি স্বপ্ন রেকর্ড করে দেখাতে পারে ঠিকই, কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারে কি? এটা যদি মায়ের মৃত্যু-দৃশ্যের প্রতীক হয়, তা হলে বাবা তো মায়ের অনেকদিন আগেই চলে গেছিলেন।
রঞ্জনাও বিশেষ সাহায্য করতে পারল না। বলল, “স্বপ্নের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। তবে অনেকেই মনে করেন যে মানুষের অপূর্ণ ইচ্ছাগুলিই স্বপ্ন হিসাবে আসে। তবে সরাসরি নয়। এত জটিলভাবে আসে যে বোঝা বেশ কঠিন।”
শৌভিক বললেন, “উলটোটাও কি সম্ভব—অর্থাৎ মেশিন কি আমাকে ইচ্ছেমতো স্বপ্ন দেখাতে পারে?”
রঞ্জনা বলল, “অবশ্যই সম্ভব। তবে আমাদের ডেটাবেস বলছে, এই প্রযুক্তি এখনও বাজারে আসেনি।”
দুই
এরপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। জীবন নিজের নিয়মে এগিয়ে চলেছে। শৌভিক নিজের কাজ নিয়ে মেতে আছেন।
একদিন ওয়ার্ক প্লেসে অনেকদিন পর শান্তনুর সঙ্গে দেখা হল। এ-কথা সে-কথার পর শান্তনু জিজ্ঞেস করলেন, “তোর কাছে আর কল-টল আসে না তো?”
শৌভিক বিস্মিত হয়ে বললেন, “কল?”
শান্তনু বিরক্ত হয়ে বললেন, “ভুলে গেছিস? কেউ মাসিমা সেজে তোকে কল করে বিরক্ত করত না?”
শৌভিক কাষ্ঠহাসি হেসে বললেন, “ও হ্যাঁ—না, এখন আর আসে না।”
শান্তনু সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে গেলেন। শৌভিক চিন্তায় পড়লেন। সত্যিই কি এরকম কিছু হয়েছিল? স্মৃতিবিভ্রম?
বাড়ি ফিরেও মাথা থেকে চিন্তাটা গেল না। তারপর তাঁর মনে হল, রঞ্জনার সঙ্গে সব কথাই হয়, ও বলতে পারবে। অগত্যা তিনি রঞ্জনাকে কল করলেন। সে সব শুনে বলল, “অফ কোর্স শৌভিক, আপনি আমাকে বলেছিলেন। তার পরের দিন আমি কমপ্লেইন্টও করেছিলাম, মনে পড়ছে?”
শৌভিক স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাঁর এসব কিছুই মনে নেই। এটা কী হচ্ছে—অ্যামনেশিয়া?
রঞ্জনা তাঁকে দেখছিল। বলল, “ক্যান আই হেল্প ইউ শৌভিক?”
শৌভিক বললেন। রঞ্জনা চিন্তিত মুখে বলল, “গিভ মি ওয়ান মিনিট।”
সে চলে গেল। এক মিনিট পরে ফিরে এসে বলল, “আমাদের ডেটাবেস বলছে, এরকম সিলেক্টিভ অ্যামনেশিয়ার কোনও মেডিক্যাল রেকর্ড নেই।” তারপর বলল, “আপনি সাধারণত উল্লেখযোগ্য কোনও ঘটনা ফ্যামিলি আর্কাইভে লিখে রাখেন। এটাও হয়তো লিখেছেন।”
শৌভিকের সেটাও মনে নেই। রঞ্জনার কথায় তিনি আর্কাইভে ঢুকে দেখলেন, তিনি শেষ কিছু লিখেছেন প্রায় বছর খানেক আগে।
রঞ্জনা শুনে বলল, “লেট মি চেক ওয়ান্স।”
সে শৌভিকের পাসওয়ার্ড নিয়ে কিছুক্ষণ খুটখুট করে বলল, “আপনি কিন্তু মাস দুয়েক আগে লগ-ইন করেছিলেন। কিন্তু কিছু না লিখেই বেরিয়ে গেছেন। কিছুদিন পরে আবার গিয়েছিলেন। এবারেও কিছু লেখেননি। হতে পারে আপনি শুধু পড়ার জন্যই ঢুকেছিলেন। এরকম কি মাঝে-মধ্যেই যান?”
শৌভিক একটু ভেবে বললেন, “অনেকদিন আগে যেতাম। এখন যাই বলে তো মনে পড়ছে না।”
রঞ্জনার মুখে চিন্তার ছাপ পড়ল। সে বলল, “আমি বলব আপনি ফেডেরাল সরকারের সর্বোচ্চ স্তরে একটা অভিযোগ করুন। সিনিয়র সায়েন্টিস্ট হিসাবে আপনার সেই অ্যাকসেস আছে। খুব বেশি লেখার দরকার নেই। শুধু বলুন আপনি কয়েক মাস আগে এরকম একটা কল পেয়েছিলেন, সেটা এখনও ট্রেস করা যায়নি।”
তিন
টেবিলের উলটোদিকে যিনি বসে আছেন তাঁর ছোটোখাটো সাধারণ চেহারা। দেখে এফ.বি.আই-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার কর্তা বলে মনেই হয় না। এফ.বি.আই হল ফেডেরাল ব্যুরো অফ ইনটেলিজেন্স; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স সংক্রান্ত যাবতীয় গবেষণা এরাই করে।
ভদ্রলোক কথাও বলেন খুব নীচু গলায়। শৌভিককে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, “আসুন শৌভিক। দুঃখিত, আপনাকে এভাবে ডেকে পাঠাতে হল।”
সৌজন্য বিনিময় করে শৌভিক বসলেন। ভদ্রলোক বললেন, “আপনার অভিযোগ যখন ফেডেরাল গভর্নমেন্ট থেকে আমার কাছে পাঠায়, আমার মনে হল ব্যাপারটা আপনাকে মুখোমুখি বসে বোঝালে ভালো হয়। আসলে আপনার মতো আমিও পুরোনো জমানার লোক।”
শৌভিক একটা ভদ্রতাসূচক হাসি দিলেন।
ভদ্রলোক বললেন, “মূল প্রসঙ্গে যাবার আগে ছোটো একটু ভূমিকা দরকার। আপনি অন্য বিষয় নিয়ে কাজ করলেও ব্রেন মেশিন ইন্টারফেস বা সংক্ষেপে বি.এম.আই কথাটা হয়তো শুনে থাকবেন।”
শৌভিক বললেন, “শুনেছি, তবে সামান্যই জানি।”
ভদ্রলোক বললেন, “সংক্ষেপে বলি, আমাদের ব্রেন আসলে অসংখ্য নিউরোন বা নার্ভ সেল দিয়ে তৈরি। সংখ্যাটা প্রায় একশো বিলিয়ন। এরা প্রতিনিয়ত নিজেদের মধ্যে সিগন্যাল বা সংকেত বিনিময় করে চলেছে। আমাদের স্মৃতি, চিন্তা, চেতনা ও অনুভূতির জন্য এরাই দায়ী। একশো বছর বা তারও আগে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এই সংকেতগুলির পাঠোদ্ধার করতে পারলে তার অনেক ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্ভব। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। ধরুন আপনি বিশেষ একজনের কথা চিন্তা করছেন এবং সেই অনুযায়ী আপনার ব্রেনে বিশেষ কিছু নিউরোন সক্রিয় হয়ে উঠছে। এই প্যাটার্নটা যদি আমরা বুঝতে পারি, তাহলে তার ভিত্তিতে আমরা তাকে চিনতে পারব। একইভাবে আপনার শব্দ, স্পর্শ, ঘ্রাণ বা দৃষ্টিও ব্রেনে আলাদা আলাদা সংকেত সৃষ্টি করছে যেগুলি আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব।
“কাজটা অত্যন্ত কঠিন ছিল। এই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সংকেতগুলির বিশ্লেষণ করার জন্য যে উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্র দরকার, তাও অনেকদিন অবধি আমাদের কাছে ছিল না। যাই হোক, বোধ হয় পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে কঠিন ও দীর্ঘ গবেষণার পর আমরা কিছুদিন আগে এই কাজে অনেকটাই সফল হয়েছি। আপনারা এখন যে টেলিপ্যাথিতে কথা বলেন বা ভুলে যাওয়া স্বপ্ন সকালে দেখে নেন, সেইসব প্রযুক্তি এই দীর্ঘ গবেষণারই সুফল। আরও অনেক ব্যবহারিক প্রয়োগ আছে। তবে কোনো-কোনো প্রযুক্তি অপরাধীদের হাতে পড়লে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তাই সব আমরা অনুমোদন করিনি।”
শৌভিক মন দিয়ে শুনছিলেন।
ভদ্রলোক বললেন, “আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন এর সঙ্গে আপনার সমস্যার কী সম্পর্ক? আসছি সে প্রসঙ্গে। তবে তার আগে আপনার কাছে একটা স্বীকারোক্তি করার আছে। আপনি সেই রাতে যে কলটা পেয়েছিলেন তা নিয়ে বেশ কিছু অসঙ্গতি আপনি হয়তো লক্ষ করেছেন। যেমন, আপনার ফ্যামিলি আর্কাইভ থেকে লেখা মুছে যাওয়া বা পরে আপনার স্মৃতিতে ঘটনাটা না থাকা। এই সবকিছুর জন্য আমরাই দায়ী।”
শৌভিক প্রচণ্ড বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি প্রায় অস্ফুটে বললেন, “স্মৃতি কীভাবে চলে গেল? আর এতসব কেন?”
ভদ্রলোক একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আপনি কিছুদিন আগে একটা রুটিন ব্রেন স্ক্যান করাতে গিয়েছিলেন। তখন আমরা বিশেষ কিছু সিগন্যাল পাঠিয়ে শুধু ওই বিশেষ ঘটনার স্মৃতিটুকু মুছে দিই। আপনার ফ্যামিলি আর্কাইভের পাসওয়ার্ডও আমরা হ্যাক করেছিলাম। এই কাজগুলির কোনোটাই ফেডেরাল গভর্নমেন্টের আইনসম্মত নয়। আপনি আইনি ব্যবস্থা নিলে আমরা মুশকিলে পড়ব। তবে আমাদের ধারণা, কী পরিস্থিতিতে এ-কাজ করতে বাধ্য হয়েছি জানলে আপনিও সেটা বুঝবেন। কিন্তু এর পরেও আপনি যখন অভিযোগ করলেন, আমাদের মনে হল আপনি একজন কৃতী বিজ্ঞানী এবং সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক। তাই ঠিক করি, আপনার মুখোমুখি ডেকে আপনাকে ব্যাপারটা খুলে বলাই ভালো।”
শৌভিক দেখলেন বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা কেটে যাবার তীব্র কৌতূহলে তাঁর প্রায় শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। সমগ্র চেতনা চোখ ও কানে এসে ঠেকেছে।
ভদ্রলোক বললেন, “এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। ব্রেনের মূল কার্যকলাপ জানার পরই বিজ্ঞানীরা ভাবেন—স্মৃতি বা চিন্তাকে যদি ধরা যায়, চেতনাকেই-বা নয় কেন? অর্থাৎ একজন মানুষের ব্রেন অত্যন্ত হাই-রেজোলিউশন মেশিনে স্ক্যান করে প্রাপ্ত সংকেতগুলি যদি ঠিকভাবে সাজিয়ে একটা শক্তিশালী কম্পিউটারে ধরে রাখা যায় তবে মানুষটির ব্রেনের হুবহু একটি ডিজিটাল কপি হতে পারে। সেইমতো গবেষণা শুরু হয়। কিন্তু সেই একই সমস্যা, প্রযুক্তি তখনও অনেক পিছিয়ে। এ-কাজের জন্য যে-ধরনের স্ক্যানার, নিউরাল কম্পিউটার বা মেমোরির প্রয়োজন, তার কিছুই তখন ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানীরা হাল ছাড়েননি। একটু একটু করে গবেষণা এগিয়েছে। সেই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তিও বাজারে এসেছ। অবশেষে বেশ কিছুদিন আগে এ-ব্যাপারে আমরা সফল হয়েছি। আমরা এখন একজন মানুষের ব্রেন হুবহু কপি করতে পারি এবং যতদিন খুশি কম্পিউটারে ধরে রাখতে পারি।”
শৌভিক বিস্মিত হয়ে বললেন, “আপনি বলছেন এই ডিজিটাল ব্রেনটি মানুষের মতো সচেতন হবে?”
ভদ্রলোক বললেন, “উত্তর হল, হ্যাঁ। বায়োলজিক্যাল মানুষটির সঙ্গে তার একমাত্র তফাত হবে সেই অর্থে তার কোনও শরীর থাকবে না। কিন্তু ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে বাঁচবে। তার সঙ্গে বাস্তবের পৃথিবীর যোগাযোগও থাকবে।”
শৌভিকের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। এও কি সম্ভব? সেই সঙ্গে আর একটা কথা মনে হওয়ায় তিনি দেখলেন তাঁর বুকে ধুকপুকানি শুরু হয়েছে।
ভদ্রলোক হাসলেন। বললেন, “আমার কথা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে আমরা আমাদের ডেটাবেস থেকে দশজন এমন মানুষকে বেছে নিই যারা মেধাবী কিন্তু আমাদের প্রেডিকশন সিস্টেম অনুযায়ী তাদের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। আমরা অনুমতি নিয়ে তাদের ব্রেন স্ক্যান করাই। তারা মারা যাবার পর আমরা তাদের স্ক্যান করে রাখা ডিজিটাল ব্রেন কম্পিউটারে আপলোড করি। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম মানুষ মৃত্যুর পর আবার জীবন ফিরে পায়।”
শৌভিক উত্তেজনায় কাঁপছেন। ভদ্রলোক বললেন, “আপনি কথা বলুন।”
সামনে দেয়ালের পর্দায় সুমিতার ত্রিমাত্রিক ছবি ভেসে উঠেছে। শান্ত সুন্দর মুখচ্ছবি। শৌভিক উত্তেজিত হয়ে পর্দার দিকে ছুটে গেলেন৷ তারপর ভুল বুঝতে পেরে থেমে গেলেন। কোনোরকমে বললেন, “মা—তুমি!”
সুমিতা হাসছেন। বললেন, “হ্যাঁ রে, আমিই।”
ভদ্রলোক ‘আপনারা কথা বলুন’, বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সুমিতা বললেন, “আমরা এখানে ভালোই আছি। তোদের খবর-টবরও পাই। শুধু কারও সঙ্গে কথা বলার অনুমতি নেই। চেষ্টা করলেও পারি না। সেদিন রাতে এদের সিস্টেমে সাময়িক কিছু গোলমাল হয়েছিল। আর আমি দৈবক্রমে তখনই চেষ্টা করে তোকে পেয়ে যাই৷ এরা সেটা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে কলটা কেটে দেয়।”
তারপর হাসি-কান্না-গল্পে কতক্ষণ কেটেছে শৌভিকের খেয়াল নেই।
একসময় ভদ্রলোক ফিরে এলেন। হাসিমুখে সুমিতাকে বললেন, “ম্যাডাম, এবারে ছেলেকে ছেড়ে দিতে হবে। মাঝে মাঝে কথা বলিয়ে দেব।”
সুমিতা হাসিমুখে ঘাড় নেড়ে বললেন, “অনেক ধন্যবাদ আপনাদের।” শৌভিককে বললেন, “ভালো থাকিস।” তারপর ছবিটা মিলিয়ে গেল।
শৌভিকের চোখের পাতা ভিজে গেছে। তিনি দুই হাতে মাথা চেপে ধরে বসে রইলেন। তারপর বললেন, “আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। সত্যিই কি এতক্ষণ মার সঙ্গে কথা বললাম?”
ভদ্রলোক হাসলেন। বললেন, “আমাদের প্রজেক্ট টিমের হাতেগোনা কয়েকজনই ব্যাপারটা জানতেন। এবারে আপনিও আমাদের দলে এলেন। বুঝতেই পারছেন ব্যাপারটা গোপন রাখা কতটা জরুরি। অমর হতে কে না চায়, জানাজানি হলে সকলে ছুটে আসবে। কিন্তু সেই পরিকাঠামো আমাদের নেই। সমাজে চূড়ান্ত হতাশা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। তাছাড়া কয়েকজনকে পরীক্ষামূলকভাবে পুনর্জীবিত করা আর সকলের জন্য অমরত্বের দরজা খুলে দেওয়া—দুটোর মধ্যে আকাশপাতাল তফাত। এর সামাজিক ও নৈতিক তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। আমাদের তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে হবে। কোটি কোটি মানুষ যদি শরীরহীন অবস্থায় বেঁচে থাকে, তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সমাজেরই অংশ হবে। এদের মধ্যে কারো-কারো অপরাধপ্রবণতাও থাকতে পারে। একজন আটিলা বা হিটলারও থাকতে পারে। সেটা একটা ব্যাপার। তাছাড়া এই ভার্চুয়াল মানুষদের উপর রাষ্ট্রের কী দায়িত্ব বা অধিকার থাকবে, এদের জন্য বিধিনিষেধ বা আইনকানুনই-বা কী থাকবে—এসব নিয়ে আমাদের বোর্ডকে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। এছাড়াও কোটি কোটি মানুষকে ভার্চুয়ালি বাঁচিয়ে রাখতে হলেও পৃথিবীর সীমিত সম্পদের একটা অংশ এদের জন্য লাগবে, কিছুদিন পর সেটা সমস্যা হতে পারে। অনেক প্রযুক্তি যেমন জিন-এডিটিং আমরা অনেকদিন আগেই আয়ত্ত করেছি, কিন্তু সবদিক বিবেচনা করে আমরা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
ভদ্রলোক চুপ করে গেলেন। শৌভিক বললেন, “এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত কবে নাগাদ নেওয়া হবে?”
ভদ্রলোক বললেন, “বলা মুশকিল। প্রথমত, এই পরীক্ষার জন্য আমরা যে সময়সীমা রেখেছি তা এখনও অতিক্রান্ত হয়নি। তারপর এঁদের উপর বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করে তবেই আমরা ছাড়পত্র দেব। তবে যা বললাম, সফল হলেও এটি সকলের জন্য উপলব্ধ করার সিদ্ধান্ত খুব সহজ নয়। তবে সিদ্ধান্ত যাই হোক, এই প্রযুক্তি অমূল্য সম্পদ হিসাবে মানুষের কাছে থাকবে। কে বলতে পারে একদিন তাকে পৃথিবী ছেড়ে অন্য গ্রহে পাড়ি দিতে হবে কি না। তখন এই প্রযুক্তিই তাকে বাঁচাবে।” তারপর হেসে বললেন, “আপনি এখন আমাদেরই একজন, আপনার সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ রাখব।”
শৌভিক উঠে দাঁড়ালেন। ভদ্রলোককে বিদায় জানিয়ে তিনি নীচে নেমে এলেন। পরে কী হবে তিনি জানেন না, তবে এই মুহূর্তে সুমিতার সহাস্য মুখটি তাঁর চেতনা জুড়ে আছে। তিনি কেজো মানুষ, তবু তাঁর মনে হল মুখচ্ছবিটি যেন ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে পৃথিবীর আকাশ বাতাস ছেয়ে ফেলছে।
শোকতাপের এই পৃথিবীতে নশ্বর মানুষের অনেক দিন কেটে গেল। তবু বেঁচে থাকা এখনও কী রোমাঞ্চকর!
জয়ঢাকের গল্পঘর
এই লেখকের কুড়িটি কিশোর কাহিনির সঙ্কলন ‘ভয়ের ভাক্সিন” বইটি সম্বন্ধে জানতে ও জয়ঢাক প্রকাশনের বুকস্টোর থেকে অর্ডার দিতে নীচের ছবিতে ক্লিক করুন

বিশে, তোর গল্প কল্পবিজ্ঞান নির্ভর বলে তাতে ইসাক অ্যাসিমভকে খুঁজে পেলাম। বেড়ে হয়েছে। চালিয়ে যা গুরু…
বিশ্ব তোর এই লেখাটা পড়লাম। লেখাটার মধ্যে একটা মৌলিক চিন্তা ভাবনা আছে যা ভাবায়। খুব ভাল লিখেছিস। আরো এরকম লেখ।