ঋতা বসুর আরো গল্প: শিকার ও শিকারী, মিষ্টিবুড়ির কাণ্ড, ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি, মৌটুসীর বাসা, বিজু যা দেখে, আলো ছায়ার খেলা , সুশোভন বাগচির এক্সপেরিমেন্ট, ডাইনীর প্রতিশোধ,সোনা আর কোলা

মেঘনাদের বাড়ির সামনের মস্ত মাঠটায় সার্কাসের তাঁবু। দলে দলে লোক আসছে। লম্বা লাইন দিয়ে টিকিট কাটছে। সার্কাসে হাতি বাঘ কুকুর টিয়া পাখির খেলার সঙ্গে আরও কত কী। মেঘনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সার্কাস দেখার জন্য লোকেদের লম্বা লাইনটাই শুধু দেখে চলেছে আজ পনেরো দিন। মা বাবা দুজনেই ব্যস্ত। রোজই বলে যাব কিন্তু সময় আর বার করতে পারে না। হঠাৎ একদিন পিন্টুমামা এসে হাজির। বলল, “এ কী রে এখনও সার্কাস দেখিসনি? আর তো মাত্র ক’দিন! আমি সকালে এসে একবার জন্তজানোয়ারগুলোকে ওষুধ দিয়ে এসেছি। সার্কাসের মালিক আমার বন্ধু কিনা সেই ডেকে পাঠাল। আমাকে আর একবার যেতে হবে। চল আমার সঙ্গে। ওমনি নিখরচায় সার্কাসটাও দেখে নিবি। একদম ফার্স্ট রোতে বসে দেখার মজাই আলাদা।”
মেঘনা খুব খুশি। এমন আচমকা সুযোগ এসে যাবে সে কল্পনাও করেনি। পিন্টুমামার সঙ্গে গেটের সামনে এসে শুনল কদিন ধরেই বাঘের খেলা দেখানো হচ্ছে না। তার নাকি শরীর খারাপ। পিন্টু মামা বলল, “ওষুধ দিয়েছি। ঠিক হয়ে যাবে। পরের সপ্তাহে বাবা মায়ের সঙ্গে এসে বাঘের খেলা দেখে যাস।”
আবার আসা হবে কি হবে না ভেবে মেঘনার একটু মন খারাপ হলেও বেশিক্ষণ সেটা বজায় রইল না। পিন্টুমামার সঙ্গে তাকেও খাতির করে একেবারে সামনে সারিতে নিয়ে বসাল সার্কাসের ম্যানেজার। সার্কাস শুরু হতেই মেঘনা চোখের পাতা পর্যন্ত ফেলতে ভুলে গেল। ঝলমলে পোশাক পরে মেয়ের দল সাইকেলে ব্যালান্স আর কত উঁচু থেকে ঝুলে ঝুলে তারের খেলা দেখাচ্ছে। জোকারগুলো পর্যন্ত ওদের সঙ্গে তাল দিচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে এখনই পড়ে যাবে। ভয়ের চোটে গা শিরশির করে উঠছে মেঘনার।
হঠাৎ একটা লোক এসে ফিসফিস করে কী যেন বলল পিন্টুমামার কানে কানে আর পিন্টুমামা সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।
মেঘনা জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছ? “
পিন্টুমামা সেকথার কোন উত্তর না দিয়ে লোকটার সঙ্গে হতদন্ত হয়ে ভেতরে কোথায় চলে গেল। পিন্টুমামার কান্ডই এইরকম। সবসময় রহস্যময়। মেঘনা আবার সার্কাসে মন দিল।
কিন্তু খানিকটা বাদে পিন্টুমামা ফিরে এসে যা বলল তাতে মেঘনার সার্কাস দেখা মাথায় উঠল। বাঘটার নাকি তিনটে বাচ্চা হয়েছিল। বিশেষ করে মা-সুদ্ধ ছানাদের দেখতেই নাকি পিন্টুমামাকে ডাকা হয়েছিল। মামা ফিসফিস করে মেঘনার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “বন্যেরা বনে সুন্দর এই কথাটা তো অনেকবার শুনেছিস। এখন তোদের মত শহুরে ছেলেপিলেদের সার্কাসে এসে হাতি বাঘ সিংহ না দেখলে মন খারাপ হয়। সেইজন্য এরা আসে। কিন্তু বুঝতেই পারছিস শহুরে হাওয়ায় এরা মোটেই ভালো থাকে না। মার্গারেট মরেছে ছ’মাস আগে। এর নাম ডায়না। মালিকের খুব আদরের। একেবারে আসল রয়াল বেঙ্গল টাইগার কিনা। অনেক টাকা দিয়ে কিনেছে একে।”
মেঘনা জিজ্ঞেস করল, “এদের সবার ইংরেজি নাম কেন? আমাদেরও তো কত সুন্দর সুন্দর নাম আছে।”
—বাঘের নাম কখনো চম্পা চামেলি হয় ? তেজটাই তো ফুটবে না।
—রাজিয়া সুলতানা লক্ষ্মীবাঈ – তারপর রানি রাসমণি এইসব নামের তেজ কি ডায়না মার্গারেটর থেকে কম?
—তাহলে তুই বসে বসে নামের মালা গাঁথতে থাক। আমি যাই। মাথার ওপর কতটা বিপদ যদি জানতিস…
পিন্টুমামা রেগে গেছে বুঝতে পেরে মেঘনা তাড়াতাড়ি বলল, “সত্যি সত্যি বিপদ নাকি? আমি তো ভাবছি তুমি ঠাট্টা করছ।”
চারদিকে ঝমঝম বাজনার মধ্যে চেঁচিয়ে না বললে কথা শোনাই মুশকিল তাও পিন্টুমামা গলাটা একেবারে খাদে নামিয়ে বলল, “বাচ্চা হবার পর থেকেই ডায়না কমজোরি হয়ে পড়ছিল। আমি সেইজন্যই সকালে এসেছিলাম। রাখার ব্যবস্থা দেখে তো মাথা গরম হয়ে গেল। বনের রাজা বাঘ। তার থাকার ব্যবস্থা রাজার মতই হওয়া উচিত। আমি তড়িঘড়ি লোক লাগিয়ে পাথরের গুহার মতো করে তার মধ্যে পাতার মোটা আস্তরণ বিছিয়ে মা আর তিনটে ছানার থাকার জায়গা ঠিক করলাম। ডায়না ব্যবস্থা দেখে মহাখুশি। ছানাগুলোর এখনও ভালো করে চোখ ফোটেনি। কী কায়দা করে মা বাঘিনী ধারালো দাঁতে বাচ্চাগুলোকে মুখে করে একটুও ব্যথা না দিয়ে একটা একটা করে নতুন জায়গায় নিয়ে গেল সেটা দেখার মত। এইসময় ওরা কাছেপিঠে কারোকে আসতে দেয় না। ডায়নার ব্যবস্থা করে আমি অন্য জন্তুজানোয়ারগুলোকে ওষুধ দিয়েছি। আসার সময় দেখে এসেছি ডায়না ঝিমনো ভাব কাটিয়ে বাচ্চাগুলোর গা চাটছে। বুঝলাম ওষুধ ধরেছে।”
মেঘনা পিন্টুমামাকে খুশি করার জন্য বলল, “কি দিলে? উদকম নাকি সম্বোধি ৯৯?”
—বোকার মত কথা বলিস না। ওগুলো দিয়ে ওদের আরও তেজি বানিয়ে সবার বিপদ ডেকে আনব নাকি?
—তখন থেকে বিপদ বিপদ করছ কি বিপদ সেটাই তো বলছ না।
—তিনটে ছানার মধ্যে একটা মিসিং।
—বলো কী? কী হবে এখন ?
—কী আর হবে? ম্যানেজার লোক লাগিয়েছে এখনই ধরা পড়বে।
—কিন্তু তার আগেই যদি বিপদ ঘটে? বাঘের বাচ্চা বলে কথা।
—একটা সামান্য প্রটেকশন আছে। যেখান থেকে হনুমান বিশল্যকরণী এনে লক্ষণের প্রাণ বাঁচিয়েছিল সেই অমরকন্টক থেকে তেজসি গাছের পাতা এনে তার সঙ্গে সিংহের থাবার মাটি, হরিণের শিংয়ের টুকরো আর দুশো তেইশ ফোঁটা বেলেডিয়ানা দিয়ে বানিয়েছি সৌরচা বড়ি। এতে তাকত ঠিক থাকে কিন্তু মেজাজ একদম জলের মতো হয়ে যায়। তবে তার মেয়াদ কদিন সেটা আমিও বলতে পারব না কারণ ওটা এক এক জনের ওপর এক এক রকম ভাবে কাজ করে।
এই বলে পিন্টুমামা বিপদ টিপদের কথা ভুলে দিব্যি সার্কাস দেখতে লাগল। এদিকে মেঘনা সৌরচা বড়ির ওপর ভরসা রাখতে না পেরে চেয়ারের ওপর পা তুলে বসল। তার কেবল মনে হতে লাগল কার লোম যেন পায়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। কে যেন পেছন থেকে জামা টেনে ধরছে। সার্কাসে আর মনই দিতে পারল না মেঘনা। পিন্টুমামা কিন্তু দিব্যি একেবারে শেষ খেলা পর্যন্ত দেখে ম্যানেজারের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে হারিয়ে যাওয়া বাঘের বাচ্চাটার কী হল সে সব কিছুই আলোচনা না করে বাইরে বেরিয়ে এল।
বাড়ির দরজায় এসে আর থাকতে না পেরে মেঘনা বলল, “এই যে তুমি বললে এত বিপদ। এখন মনে হচ্ছে ভুলেই গিয়েছ হারানো বাঘের বাচ্চার কথা।”
পিন্টুমামা নির্বিকার ভাবে বলল, “ভুলব কেন? কিন্তু মিছিমিছি প্যানিক করে সবাইকে ভয় পাইয়ে দেওয়াটাও কোন কাজের কথা নয়। খবরদার কারোকে বলবি না।এমনকি নিজের ছায়াটাকেও নয়। আমার ওষুধ যতদিন কাজ করবে ভয়ের কিছু নেই। তার মধ্যে একটা ব্যবস্থা নিশ্চয় হবে“
বাড়ি আসার পর মা জিজ্ঞেস করল, “কেমন দেখলি?”
বাঘের বাচ্চার কথাটা যদি মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় সেই ভয়ে মেঘনা ভালো করে কী দেখেছে, কোনটা ভাল লেগেছে সে সব কিছু বলতেই পারল না।
মা বলল, “তোর কি সার্কাস ভালো লাগেনি? এমন ছাড়াছাড়া ভাবে কথা বলছিস কেন?”
পিন্টুমামা বারণ করেছে বলে মেঘনা মাকেও বলতে পারল না। এদিকে ভয়ে দুশ্চিন্তায় তার ঘুম উড়ে গেল। বাড়ির সামনেই সার্কাসের মাঠ। সেখান থেকে সহজেই তো তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারে। রাত্রিবেলা ভাল করে খাটের তলা দেখে ঘুমোতে গেল মেঘনা। পরদিন পাশের বাড়ির বড়োদাদু এসে বলল, ওদের একটা পোষা হাঁস পাওয়া যাচ্ছে না। বাবা বলল, “নিশ্চয়ই পাড়ার দুষ্টু ছেলেদের কাজ।” মেঘনার বুকটা ভয়ে গুড়গুড় করে উঠল। একমাত্র পিন্টুমামাই এই সমস্যার সমাধান করতে পারত। কিন্তু সে নিজে না এলে পিন্টুমামাকে যোগাযোগ করার কোন উপায় নেই। সন্তুদের বাড়ির পোষা দুটো খরগোশের মধ্যে একটাকে বাগানে পাওয়া গেল ঘাড়ের কাছে কে খুবলে খেয়ে গিয়েছে । কেউ ঠিকমত বলতেই পারল না এটা কার কাজ। মেঘনা জানলেও মুখে কুলুপ এঁটে রইল। পিন্টুমামা সেরকমই বলে গিয়েছে। কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত তার মন জুড়ে থাকে শুধু বাঘের বাচ্চার কথা।
পরদিন স্কুলে জোর করে পড়ায় মন বসাতে চেষ্টা করছিল মেঘনা। হঠাৎ জানালা দিয়ে স্কুলের মাঠে চেনা বেড়ালদের দলে একটা হলদে কালো ডোরাকাটা বেড়াল দেখে সে চমকে উঠল। একে তো আগে কখনো দেখেনি! মেঘনাদের স্কুলে অনেকগুলো বেড়াল আছে। তারা মাঠের ধারে পাঁচিলের ওপর বসে স্কুলের কাজকর্ম লক্ষ করে। টিফিনের সময়ে, ছুটির সময়ে মেয়েদের পায়ে পায়ে ঘোরে খাবারের আশায়। এই নতুন বেড়ালটা কিন্তু একদম অন্যরকম। সে কারোর কাছে খাবার চায় না। দূরে একা একা ঘোরে রাজার মত। দুলে দুলে হাঁটার সময় তার লেজটা একবার এদিক আর ওদিক করছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও তার চোখের ভাষাটা মেঘনা ঠিক বুঝতে পারল না। ইশ পিন্টুমামাকে যদি এই খবরটা দেওয়া যেত তবে সে বোধহয় ছানাটাকে ওর মায়ের কাছে দিয়ে আসত। মেঘনাও যে খবর দেবে তার উপায় নেই। সার্কাসের দল তাঁবু গুটিয়ে কোথায় চলে গিয়েছে কে জানে।
বাঘের বাচ্চার খবরটা বন্ধুদের খুব বলতে ইচ্ছে করলেও মেঘনা বলল না। পিন্টুমামা ঠিকই বলেছে মিছিমিছি সবাইকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। অন্য বিড়ালগুলো যখন টিফিনের সময় হ্যাংলার মতো ছুটে আসে সে তখন খেলার মাঠের একদম নিরিবিলি একটা কোণে ওৎ পেতে বসে থাকে যেন শিকারকে লক্ষ করছে। সুযোগ এলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর একদিন মেঘনা দূর থেকে দেখল কী একটা যেন থাবা দিয়ে ছিন্নভিন্ন করছে। তারপর ওই থাবা দিয়েই মুখটা মুছল। শিকার করার পর বাঘ সিংহ যেমন করে। সৌরচা বড়িটা আদৌ কাজ করছে কিনা এটা একমাত্র পিন্টুমামা থাকলেই বুঝতে পারত। সেই ভয়টা সারাক্ষণ লেগে আছে তবু তার সঙ্গে।
বাঘের ছানাটার জন্য মেঘনার খুব কষ্টও হয়। বেচারা মাকে হারিয়ে ফেলেছে। ওর কোন সঙ্গী ভাই বোন কিচ্ছু নেই। মেঘনা ওর নাম দিয়েছে বাঘু। সে নিয়ম করে বাঘুর জন্য বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসে। একটা নীল সাটিনের ফুলও রাখা আছে ব্যাগে। মেঘনার খুব ইচ্ছে ওটা বাঘুর গলায় বেঁধে দেয়। কিন্তু বাঘু রাজি কিনা বুঝতে পারছে না বলে এখনো সেটা সম্ভব হয়নি।
বাঘু এখন মেঘনাকে দেখলে চিনতে পারে। রাজার মত দুলকি চালে হেঁটে মেঘনার কাছাকাছি আসে। সে কখনো বাঘুর গায়ে হাত দিয়ে আদর করে না। দূর থেকে খাবার ছুঁড়ে দেয়। পিন্টুমামা যদিও বলেছে সৌরচা বড়ির জন্য গায়ে শক্তি থাকলেও স্বভাব হবে জলের মত। তবুও বলা তো যায় না কখন কী হয়। যতই পোষা হোক বাঘু তো আর সাধারণ বেড়াল নয়! সে যে সত্যিকারের বাঘ!
বাঘু জীবনে আসার পর মেঘনার নিজেরও স্বভাবে অনেক বদল ঘটেছে।কথায় কথায় অত আর কান্না পায় না। বাঘুর মত সে-ও চুপচাপ চারপাশ লক্ষ করে আর নিজেকে আস্ত একটা বাঘের মালিক ভাবতে আজকাল মেঘনার খুব ভালো লাগে।





