গল্প- ব্লু -বুমা ব্যানার্জী দাস-শরৎ২০২৪

এই লেখকের আগের লেখা-এই লেখকের আগের গল্প – প্রতীক্ষানকশি কাঁথা, আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি, অ্যানথ্রোপোসিন 

golpoblue

ভারি চমৎকার দিন। নীল আকাশে কয়েকটা মেঘের নৌকো পাল তুলেছে। হালকা হালকা হাওয়ায় ঢেউ উঠছে উত্তর অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের বুকে। ঝলমলে নীল জল আজ যেন গাঢ় নীল দেখাচ্ছে। এখন সেপ্টেম্বর, এই এলাকার জল এখনও ততটা ঠান্ডা হয়নি। তারা অবশ্য হালকা গরম জলের স্রোত ধরে চলতে জানে। দল বেঁধে এই ঈষৎ উষ্ণ জলে সাঁতার কাটতে কাটতে এগিয়ে চলার মজাই আলাদা। খাবারেরও কোনও অভাব নেই এখানে। হেরিং পেলে হেরিং খাও, নইলে কড—ম্যাকারেল তো ঝুড়ি ঝুড়ি আছেই। তবে সবচেয়ে প্রিয় খাবার স্কুইড পেতে গেলে সাঁতরে আরও একটু উপরে যেতে হবে।

তাদের আজকের ঝাঁকটা মস্ত বড়ো। এমনিতে দল বেঁধেই থাকে তারা, তবে আজকের মতো বড়ো দল সচরাচর দেখা যায় না। শুরুতে এতজন ছিল না যদিও, মাঝে আরও দুটো বড়ো দল জুটে গেছে সঙ্গে। তা হোক, খাবারের অভাব যখন নেই, তখন বড়ো দল হলেই বেশি মজা। বেশ কয়েকটা ছানাও আছে তাদের নিজেদের দলে। বাকি দুটো ঝাঁকেও নিশ্চয়ই আছে। এই সময় থাকারই কথা। মায়ের পাশে পাশে তারাও মহানন্দে সাঁতার দিচ্ছে নিশ্চয়ই। ঝিমঝিমে একটা শান্তি ছড়িয়ে পড়ছে তাদের শরীর জুড়ে। কোথাও কোনও বিপদ নেই, মাছ ধরার জাহাজ পর্যন্ত চোখে পড়ছে না একটাও। তাদের বিশাল জালে জড়িয়ে পড়লে মহা বিপদ উপস্থিত হয়, কিন্তু সে-সম্ভাবনা আজ ক্ষীণ।

দলের এক-একজন হঠাৎ হঠাৎ জল ছেড়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠে ডিগবাজি খাচ্ছে। তারপর জলের উপর এসে পড়ছে ঝপাত করে। ফোয়ারার মতো জল ছিটছে চারদিকে, খুব মজা। তবে খালি মজা পাওয়ার জন্য যে লাফাচ্ছে তা কিন্তু নয়। চারপাশটা ভালো করে দেখে নেওয়ার বা শরীর ঠান্ডা করার উদ্দেশ্যেও ওরা এটা করে। একেবারে ছানাগুলো অবশ্য এসব করতে শেখেনি এখনও।

ওই দূরে, ওই যে আর একটা মস্ত ফোয়ারা লাফিয়ে উঠল না? না, এটা কারও লাফিয়ে উঠে জলে পড়া মোটেই নয়। একেবারে জলের গা থেকে সটান আকাশের দিকে উঠে মসৃণভাবে শেষ হল এক সময়। ওটা নির্ঘাত তিমি।

সামনে একটা দ্বীপপুঞ্জ আসছে। তবে ওরা দ্বীপ থেকে বেশ দূর দিয়েই যাবে। ওদিকটায় অনেক স্কুইড। ডিগবাজি খেতে খেতে, জলের বুকে ঝলমলে আলপনা কাটতে কাটতে এগিয়ে যায় তারা। এগিয়ে যায় ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের দিকে। অ্যাটলান্টিক হোয়াইট সাইডেড ডলফিনের ১৪২৯ জনের বিশাল একটা দল।

ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ ছবির মতো সুন্দর। বাসিন্দাদের মনোভাবও বেশ শান্তিপূর্ণ। আঠারোটা ছোটো ছোটো দ্বীপের সমষ্টি এই দ্বীপপুঞ্জ। ডেনমার্কের অংশ হলেও ১৯৪৮ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পেয়েছে এরা। ইদানীং অন্যান্য কাজকর্ম করলেও প্রত্যেক বাড়িতে অন্তত একজন মৎস্য ব্যবসায়ী আছে। কিছু বছর আগে পর্যন্ত মাছের ব্যাবসাই এদের উপার্জনের প্রধান উপায় ছিল। আজকাল অনেকেই পড়াশোনা শিখে কলেজে যাচ্ছে, যদিও সাকুল্যে একটাই বিশ্ববিদ্যালয় আছে তাও আবার রাজধানী টোর্শনে। ড্যানিশ মোটামুটি সকলে জানলেও, নিজেদের মধ্যে ফ্যারোইজ ভাষাতেই কথা বলতে পছন্দ করে এরা। ভাইকিংদের নর্স ভাষা থেকে এই ফ্যারোইজ ভাষার জন্ম। ভাইকিংদের সংস্কৃতির অনেক কিছু আজও থেকে গেছে এদের জীবনযাত্রায়, ধ্যানধারণায়।

দিনটা সত্যিই খুব সুন্দর আজ। আকাশ আর সমুদ্রের নীল যেন একাকার হয়ে গেছে। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি, তবে ঠান্ডা এখনও শুরুই হয়নি। তবে মেক্সিকো উপসাগর থেকে আসা উষ্ণ স্রোতের জন্য এখানে তেমন ঠান্ডা পড়েও না। এস্তোরয় দ্বীপের বাসিন্দারা সকাল থেকে যে-যার কাজে ব্যস্ত। সমুদ্র যতই মনোরম দেখাক, জন্ম থেকে সমুদ্রের পাশে থাকার ফলে তাদের একরকম গা-সওয়া হয়ে গেছে। এই সকাল সাড়ে দশটায় খাঁড়ির ধারের স্কালাফিওরদর গ্রাম একেবারে শান্ত। ছোটোরা স্কুলে আর বড়োরা যে-যার রুজি-রোজগারে ব্যস্ত।

খাঁড়ির ধার ঘেঁষে বসে ছিল ফ্লোভিন। মাছের ব্যাবসা একটু মন্দা যাচ্ছে তার। ছেলেটা স্কুলে পড়ে, আরও এক বছর পর হাই স্কুল শেষ হবে তার। এরপর পারিবারিক মাছের ব্যাবসায় যোগ দেওয়ার কথা, সেটাই চিরকাল ভেবে এসেছে ফ্লোভিন। কিন্তু হেকুন আরও পড়তে চায়; সে নাকি রাজধানীতে গিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ভরতি হবে। ফ্লোভিন নিজে আট ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে। ছেলেটা ব্যাবসায় হাত লাগালে ভালোই হত, বেশ বুদ্ধিসুদ্ধি আছে তার। কিন্তু মতিগতি বোঝা দায়। গত বছর থেকে গ্রিনডাড্র্যাপেও যেতে চাইছে না। অথচ ছোটো থেকেই তো দেখছে। বলে, এসব ভয়ানক পরম্পরার নাকি মানে নেই কোনও। শুধু হেকুন কেন, ইয়োসভা, রুনের আরও কারা কারা সব বন্ধু আছে ওর, সবাই নাকি চায় গ্রিনডাড্র্যাপ বন্ধ হয়ে যাক। মেয়েরা অনেকেই অবশ্য পছন্দ করে না এসব, তার নিজের বোন রুস্কভা তো দ্বীপ ছেড়েই চলে গেল এই নিয়ে ঝগড়া করে। এখন কোথায় যেন সামুদ্রিক প্রাণী নিয়ে গবেষণা করে। বহুবছর যোগাযোগই নেই, হয়তো দেখলে চিনতেও পারবে না ফ্লোভিন। যার নামের মানে সাহসী মানুষ, সে-ই কিনা ভয় পেয়ে পালাল!

প্রায় চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা পরম্পরা ভালো না খারাপ সেই নিয়ে কখনও ভাবেনি ফ্লোভিন। তাদের সেই প্রাচীন পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রা ছিল অসম্ভব কঠিন। খাদ্যাভাব, অর্থাভাব—সবকিছুর সঙ্গে লড়তে হয়েছিল তাদের। সেই কারণে হয়তো তাদের মনের ভিতরটাও কঠিন হয়ে গিয়েছিল। চিরকাল উত্তর অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের পাইলট তিমি আর ডলফিনের দল এদিকের উষ্ণ জলে শাবকের জন্ম দিয়ে দল বেঁধে ফ্যারোর পাশ দিয়ে নরওয়ের দিকে চলে যায়, ওদিকের জলে খাদ্য অনেক বেশি। সেই ঝাঁককে মাছধরার নৌকো আর ডিঙি নিয়ে তাড়া করে খাঁড়ির অগভীর জলে তাড়িয়ে আনা হত। অত কম জলে কি আর ওরা সাঁতরাতে পারে? তারপর বর্শা আর হারপুন দিয়ে মেরে ফেলতে কতক্ষণ। এই শিকার অভিযানকেই ফ্লোভিনদের পূর্বপুরুষরা নাম দিয়েছিল গ্রিনডাড্র্যাপ। এই শিকারে পাওয়া মাংস আর চর্বির উপর ভরসা করে দীর্ঘদিন কাটিয়ে দিত ওরা। ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতির সঙ্গে এই মাংস বা চর্বির উপর নির্ভরতা কমে গেল ঠিকই, কিন্তু ততদিনে এটা একটা ঐতিহ্য, অবশ্যপালনীয় কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। এখন তো সত্যিই বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই এই শিকারের, তবু এত পুরোনো ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে চায় না কেউ। প্রত্যেক বছরই কোনও না কোনও ঝাঁকের আর ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে যাওয়া ঘটে ওঠে না। তবে অনেক নিয়ম-টিয়ম বানানো হয়েছে আজকাল। বর্শা আর হারপুন তো সেই কবেই নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে। এখন ছুরি আর হাতলওলা ধাতব রডের দুই ধারে লাগানো ধারালো দু-মুখো ব্লেডই একমাত্র হাতিয়ার। অবশ্য মাছধরা নৌকো আর ডিঙির জায়গায় স্পিড-বোট আর জেট-স্কি তাদের কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে। তাছাড়া শিকারের লাইসেন্স থাকতে হয়, যাকে-তাকে গ্রিনডাড্র্যাপে অংশ নিতে অনুমতি দেওয়া হয় না। তবে দেখতে যেতে বাচ্চা-বুড়ো সবাই পারে, তার উপর কোনও বিধিনিষেধ নেই। হয়ও তাই। এই তো আগের বছর ফ্লোভিনের প্রতিবেশী ইসাকুর তার ছেলে সেমাল আর মেয়ে ওসলাকে নিয়ে দাপিয়ে বেড়াল খাঁড়ি জুড়ে। মেয়েটা বাইশ-তেইশ বছরের হলেও সেমাল তো তার ছেলে হেকুনেরই বয়সি, চৌদ্দ বছর পার হলেই শিকারের লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা দেওয়া যায়। হেকুনেরও সে-লাইসেন্স আছে, কিন্তু তাতে আর কী। কাঠ হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল পুরো সময়টা। দিনের শেষে ইসাকুর ঢাকা দেওয়া মস্ত মস্ত পাত্রে ভরে মাংস আর চর্বি বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। ওর মাংস রাখার বড়ো ফ্রিজারটা বোধ হয় উপছে পড়েছিল সেদিন। ফ্লোভিনের ফ্রিজারটা অর্ধেকও ভরেনি, একা আর কত পারবে। তবে আজকাল নানা কথা কানে আসে, তিমি আর ডলফিনের সংখ্যা নাকি কমে আসছে, এতে নাকি প্রাকৃতিক বিপর্যয় উপস্থিত হবে। কে জানে, হবেও-বা। ফ্লোভিন অতশত বোঝে না। হেকুন এইসব খুব বলে, রুস্কভাও বলত। সি শেপার্ড বলে একটা আন্তর্জাতিক সংস্থা মাঝে মাঝে ঘুরঘুর করে এদিকে, ওরা নাকি এইসব সামুদ্রিক প্রাণী সংরক্ষণ করার দায়িত্ব নিয়েছে। ক’দিন আগে বোধ হয় গ্রিনডাড্র্যাপ বন্ধ করার কথা বলতেই সি শেপার্ডের কয়েকজন স্কালাফিওরদরে এসেছিল, তবে কিস্যু লাভ হয়নি। মেয়র দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল ওদের।

তবে আজকাল ফ্যারোরও কিছু কিছু ডাক্তার নানা কথা বলতে শুরু করেছে। সমুদ্রের জলে নাকি দূষণ এতটাই বেড়ে গেছে যে তিমি আর ডলফিনের মাংসে পারদের চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে। স্বাস্থ্য দফতর থেকে সরাসরি কিছু না বললেও অনেক ডাক্তার এইসব মাংস খেতে নিষেধ করেছেন। অনেকে খায় না আজকাল ঠিকই, তবে ফ্লোভিনের মনে হয় তাদের রক্তে মিশে আছে তিমি আর ডলফিনের মাংসের নেশা। হেকুন বলেছিল, ওটা নাকি আসলে হিংস্রতা আর রক্তের নেশা। ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে শিকারের উন্মাদনাকে প্রশ্রয় দেওয়া। রক্তের লোভের থেকে বড়ো লোভ সম্ভবত আর নেই।

বোধ হয় সামান্য ঝিমিয়ে পড়েছিল ফ্লোভিন, হাতের পাইপটা ঠক করে নীচে পড়তেই চমকে জেগে উঠল। আড়মোড়া ভেঙে অলস চোখে সমুদ্রের দিকে তাকাতেই চোখ গোল গোল হয়ে ওঠে তার। অভিজ্ঞতা তার কম নয়, ভুল তো হবে না। ওই তো সূর্যের আলো পড়ে ঝিকিয়ে উঠছে, মাঝে মাঝে ফোয়ারার মতো ছিটকে উঠছে জল, সাদা ফেনা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। দূর হলেও এসব লক্ষণ তার চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয়। দেখতে দেখতে লোম খাড়া হয়ে ওঠে তার, কেমন শীত শীত করতে থাকে। এ যে বিশাল দল, এখুনি খবর দিতে হবে সবাইকে। গ্রিনডাড্র্যাপের দিনক্ষণ যেহেতু আগে থাকতে ঠিক করা সম্ভব নয়, তাই বিশেষ পরিস্থিতিতে অফিস-টফিসগুলোতে তাৎক্ষণিক ছুটি ঘোষণা করার রীতি আছে, স্কুল-কলেজও বাদ যায় না। এই প্রাচীন পরম্পরায় যাতে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে, তাই এই ব্যবস্থা।

রেষারেষি থাকলেও ফ্লোভিনের প্রথমেই মনে পড়ল ইসাকুরের কথা। খাঁড়ির মুখে ওই তো ওর কটকটে কমলা রঙের মাছ ধরার নৌকোটা বাঁধা আছে দেখা যাচ্ছে, তার মানে ইসাকুরও আজ বেরোয়নি সমুদ্রে। গ্রামের ভিতরে ছোটো একটা কফির দোকান আছে ওদের, ওসলা চালায়। মাছ ধরতে না গেলে ইসাকুর ওখানেই থাকবে। চোখের উপর হাত রেখে আরও একবার সমুদ্রের দিকে ভালো করে তাকিয়ে নেয় ফ্লোভিন, তারপর পড়িমরি করে গ্রামের দিকে ছুটতে থাকে।

***

ঘচাং করে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল সুকুমারদা। তারপর দাঁড়িয়েই থাকল দুই মিনিট। রাংতা নাকের সামনে প্রফেসর শঙ্কু সমগ্র খুলে বসেছিল, কিছুই লক্ষ করেনি। বইটা আসলে জিষ্ণুর, আজ অঙ্কের কোচিং ক্লাসে ফেরত দিয়ে দিতে হবে, কিন্তু এখনও চার-পাঁচটা পাতা বাকি। কোচিংয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে শেষ হয়ে যাবে অবশ্য। উর্মিদের বাড়ির গাড়িতে রাংতা আর উর্মি একসঙ্গে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে অর্ণব-স্যারের কোচিংয়ে যায়। এই বছর ক্লাস এইটে ওঠার পর থেকে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ি, অসুবিধার কিছুই নেই।

অন্যদিন দুজনেরই মুখে খই ফোটে, আজ উর্মির অনর্গল বকবকানির উত্তরে রাংতা হুঁ হাঁ ছাড়া কিছুই বলেনি, মনটা বইয়ের দিকে পড়ে ছিল। এখন গাড়ি থামাতে চশমাটা নাকের উপর ঠেলে তুলে জিজ্ঞেস করল, “সুকুমারদা থামলে যে? সামনে তো পুরো ফাঁকা।”

স্যারের বাড়ির গলির মুখটায় গাড়িটা দাঁড়িয়ে।

“আরে বেড়াল রাস্তা কাটল দেখলি না?” উর্মি কলকল করে ওঠে।

“ওহ্।” রাংতা আবার বইয়ে নাক গোঁজে।

উর্মি পাশ থেকে বিড়বিড় করে, “বেড়ালটা আবার কালো ছিল। আজ অঙ্ক পরীক্ষাটা গেল।”

“এই, বাজে কথা বলবি না একদম। অমনি কালো বেড়ালের দোষ!” কটমট করে রাংতা উর্মির দিকে তাকায়।

“দিম্মা যে বলে।” চ্যাঁ করে ওঠে উর্মি, একে অঙ্ক পরীক্ষার চিন্তা।

“শোন।” গম্ভীরভাবে বইটা বন্ধ করে কোলের উপর রাখে রাংতা। উর্মি মনে মনে বলে, এই রে। রাংতার এই ভঙ্গিটা তার খুব চেনা। এখুনি লেকচার শুরু হল বলে।

“ধর, এখুনি এই যে-বেড়ালটা—কালো, ধূসর, সাদা, যাই হোক না কেন, রাস্তা কাটল,” রাংতার গলায় হগওয়ার্টসের প্রফেসর ম্যাকগনাগালের গাম্ভীর্য।—“এমন তো হতেই পারে যে, আসলে সামনে কোনও একটা বিপদ ছিল, ও ঠিক সময়ে রাস্তা কেটে দাঁড় না করিয়ে দিলে হয়তো অ্যাকসিডেন্ট হতো একটা। ও আসলে আনলাকি নয়, ভীষণভাবে লাকি। বুঝলি?”

মস্ত হাঁ করে তাকিয়ে থাকে উর্মি। রাংতা বরাবরই উদ্ভট সব আইডিয়ার ঠাকুমা। তার উপর ওর জন্তুজনোয়ার প্রীতির চোটে বন্ধুদের হাল খারাপ। রাস্তায় বেরোলেই পাড়ার সবক’টা কুকুর লেজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে আসে রাংতার দিকে। ভয়ে উর্মির হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়।

“হাঁ বন্ধ কর, বোলতা ঢুকে যাবে। স্যারের বাড়ি এসে গেছে, নাম।” রাংতা হালকা ঠেলা দেয় বন্ধুকে।

***

চকচক করছে ভিজে গা, রোদ পড়ে ঝিকিয়ে উঠছে। বাচ্চাগুলো একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বোধ হয়, সামনে একটু বিশ্রাম নিতে পারলে ভালো হয়। পেট সবার ভরতি, আরামে শান্তিতে সবারই আয়েস লাগছে যেন। এত বড়ো দল নিয়ে সাঁতরে চলার মজাই আলাদা। দলের বয়োজ্যেষ্ঠ ডলফিনটির হালকাভাবে কী যেন একটা মনে পড়তে চায়—এই এলাকায় কোনও বিপদ আছে, না কী যেন। একটা শঙ্কার বোধ হালকা মেঘের মতো তার স্মৃতির উপর দিয়ে ভেসে গেল, কিন্তু আরামে সেও যেন সজাগ থাকতে পারছে না আর।

দশ-বারোটা স্পিড-বোট আর জেট-স্কি সাদা ফেনার ঝড় তুলে তীব্র গতিতে এগিয়ে যায় ডলফিনদের বিশাল দলটার দিকে। উদ্দেশ্য, তাদের ছত্রভঙ্গ করে খাঁড়ির দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া। দলছাড়া না করতে পারলে কাজটা সহজ হয় না। একবার ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে আতঙ্কে দিশেহারা প্রাণীগুলোকে তাড়া করে ইচ্ছামতো দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। তাদের আসতে দেখেই ডলফিনের দলটা হয়তো সচেতন হয়েছিল, কিন্তু তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বোট আর জেট-স্কি ঘূর্ণি তুলে একেবারে মাঝখানে গিয়ে পড়ল। চারদিকে তাকিয়ে চোখ কপালে ওঠে ইসাকুরের। এ যে বিশাল দল! গ্রিনডাড্র্যাপের ইতিহাস আজ নতুন করে লেখা হবে নির্ঘাত।

মাঝখানে পড়েই সঙ্গে সঙ্গে স্পিড-বোটটা ঘুরিয়ে নেয় ইসাকুর। ও-পাশে ফ্লোভিনও ঠিক তাই করেছে। জেট-স্কির উপরে বসা পুত্র সেমালকে ইঙ্গিত করে ইসাকুর, যদিও তার প্রয়োজন ছিল না। এরপর কী হবে সবার জানা। ডলফিনের দলটা ছোটো ছোটো অংশে বিভক্ত হয়ে এক-একদিকে পালানোর চেষ্টা করবে। বুদ্ধু প্রাণীগুলো বোঝে না যে এতে মানুষের কাজটা আরও সহজই হয়ে যায়।

ডলফিনের যে-দলটা প্রথম বেরিয়ে এল, তাতে অনেকগুলো ছোটো ডলফিন আছে। তাহলে দলের বড়োগুলো নিশ্চয়ই ওদের মা। বাচ্চাগুলোকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে সাঁতরাতে লাগল তারা। কয়েক মুহূর্ত পর সেমালের জেট-স্কি নির্ভুল লক্ষ্যে তাদের খাঁড়ির দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকল। তীক্ষ্ণ শিসের মতো শব্দ ছড়িয়ে পড়ল সমুদ্র জুড়ে।

হাত কাঁপছিল হেকুনের। তার হাতে বিশাল একটা হুক ধরিয়ে দিয়ে চলে গেছে তার বাবা। ডলফিনের ব্লো হোল বা শ্বাসছিদ্রের ভিতর এই হুক ঢুকিয়ে তাদের আটকাতে হয়। তার পরের কাজটা সারার জন্য দু-ফলা ছুরি লাগানো ধাতব রডের হাতলটা আঁকড়ে তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ওসলা। উত্তেজনায় মুখ চকচক করছে তার।

চারপাশে একবার চোখ বোলায় হেকুন। রোজের চেনা মানুষগুলো যেন হঠাৎ পালটে গেছে। ওই তো ইয়োগভান, ওকে তো বেশ দয়ালু বলেই জানে হেকুন। এখন ছুরি হাতে কেমন দৈত্যের মতো দেখাচ্ছে। স্মেরা আবার ওর ছোটো বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে চলে এসেছে। সবার ভিতর কেমন একটা অপেক্ষা তৈরি হয়েছে টের পায় হেকুন। গা-টা কেমন শিরশির করতে থাকে ওর।

প্রায় দেড় ঘণ্টা হয়ে গেছে সমুদ্রে। একটা দলকেও এখনও খাঁড়িতে ঢোকানো যায়নি। মরিয়া হয়ে জলের ভিতর আছড়ে পড়ছে এদিক ওদিক, কিন্তু খাঁড়ির মুখে এসেই যেন বিপদ টের পেয়ে পিছলে চলে যাচ্ছে অন্য দিকে। ইসাকুর হঠাৎ স্পিড-বোট নিয়ে ছেলের পাশে চলে আসে, ইঙ্গিতে দেখায় দলের শাবকগুলোকে। দূর থেকে হাত নাড়ে ফ্লোভিনও। দলের বাকিরাও গোল করে ঘিরে ফেলে খাঁড়ির মুখটা। বিকট শব্দ করে সেমালের জেট-স্কি এগিয়ে যায় ছোটো ডলফিনগুলোর দিকে। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে প্রথম ভুলটা করে ফেলে ডলফিনের দল। খাঁড়ির অগভীর জলের দিকে এগিয়ে যায় প্রথমে খান পাঁচেক ছোটো ডলফিন। তিরবেগে জেট-স্কি আর ছানাদের মাঝে ভেসে ওঠে এক মা ডলফিন। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, তারপরেই দলের বাকিরাও ঢুকে পড়ে খাঁড়ির ভিতর। পাড় থেকে উল্লাসধ্বনি ওঠে। একবার ঢুকে গেলে আর সাঁতরে বেরিয়ে যেতে পারবে না কেউ। খাঁড়ির মুখে কয়েকটা স্পিড-বোটকে পাহারায় রেখে বাকিগুলো আবার সমুদ্রের দিকে রওনা দেয়। একটা দল ঢুকে গেলে বাকিদের এনে ফেলতে আর বিশেষ পরিশ্রম করতে হয় না। মাঝ-দুপুর হয়ে গেল প্রায়।

দিশাহারা হয়ে ইয়োসভা আর রুনেরকে খোঁজে হেকুন। তার দুই পাশ দিয়ে উৎকট উল্লাস করতে করতে ছুটে চলেছে তাদের গ্রামের প্রায় সমস্ত মানুষ। তাদের কারোর হাতে লম্বা হুক, কারোর দু-ফলা ছুরি লাগানো বর্শা। আর কিছুক্ষণের মধ্যে খাঁড়ির জলের রঙ পালটে যাবে। ধীরে ধীরে সেই গাঢ় লাল রঙ ছড়িয়ে পড়বে সমুদ্রে। খাঁড়ির পাড়ে সার দিয়ে শোওয়ানো থাকবে ডলফিনের মৃতদেহ, তাদের ঘাড়ের কাছটা ফালা করে কাটা। হেকুনের ভিতর থেকে একটা চিৎকার উঠে আসতে চায়। খাঁড়ির ভিতর আর জল দেখা যাচ্ছে না, এত ডলফিন। বাকিরা নামতে শুরু করে দিয়েছে খাঁড়ির জলে। হঠাৎ হেকুনের হাত ধরে টান মারে কেউ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবার গলা কানে আসে তার।—“বোকার মতো হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, চল!” ধমকে ওঠে ফ্লোভিন।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো খাঁড়ির দিকে এগিয়ে চলে হেকুন। সেখানে তখন মৃত্যুযজ্ঞ শুরু হয়ে গিয়েছে।

***

কোচিং থেকে ফিরে লেটার-বক্সে এয়ার-মেইলের লাল-নীল স্ট্রাইপের বর্ডার দেওয়া খামটা দেখতে পেয়ে মনটা নেচে উঠল রাংতার। ছোটকা কানাডা থেকে চিঠি পাঠিয়েছে নির্ঘাত। ইমেইল তো করেই ছোটকা, কিন্তু বিশেষ বিশেষ সময়ে এখনও হাতে চিঠি লেখে। কী যে ভালো লাগে এয়ার-মেইলে চিঠি পেতে! হাতে লেখা চিঠিগুলোতে ছোটকা যেন সামনে এসে দাঁড়ায় একদম। তাছাড়া স্ট্যাম্পগুলো উপরি লাভ।

“মা, ছোটকার চিঠি!” ভিতরে ঢুকে চিৎকার ছেড়ে দুদ্দাড় করে নিজের ঘরের দিকে ছোটে রাংতা।

মুখ টিপে হাসেন অবন্তী। রাংতার বাবার দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলেন, “জন্মদিন এসে গেল মেয়েটার, এখন কাকা-ভাইঝিতে ঘনঘন চিঠি চালাচালি হবে।”

***

দিন সাতেক হয়ে গেল এবার সমুদ্রে। সি শেপার্ডের মাঝারি আকারের জাহাজটার ডেকে দাঁড়িয়ে আকাশপাতাল ভাবছিলেন জীববিজ্ঞানী ডক্টর ওলসেন। তিনি ডেনমার্কের একটি কলেজে জীববিজ্ঞানের প্রফেসর, তাছাড়া ফাঁকা সময়ে সি শেপার্ডের হয়ে কাজ করেন। প্রথমটি পেশা, আর দ্বিতীয়টি নেশা। সি শেপার্ড সংস্থাটি সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে বেশ কিছু বছর ধরে। মাঝে-মাঝেই জাহাজে করে সমুদ্রে টহল দিয়ে বেড়াতে হয় তাদের স্বেচ্ছাসেবীদের। মূলত দানের উপর নির্ভর করে চললেও বেশ কয়েকটা জাহাজ আছে তাদের। এই জাহাজটা প্রায় নতুন, নাম পোসাইডন। উত্তর অ্যাটলান্টিকের এই অংশে এলেই মনটা বড়ো উন্মনা হয়ে যায় ডক্টর ওলসেনের। কত স্মৃতি জমে আছে এই সমুদ্রের অথৈ জলে, শুধু কি তিক্ত স্মৃতি সে-সব? শৈশবের স্বচ্ছ আনন্দের স্মৃতিও তো কম নেই। মাঝে মাঝে বড়ো শিকড়হীন লাগে নিজেকে। মধ্যবয়স পার করে আজও তিনি সম্পূর্ণ একা। অথচ একদিন সুন্দর একটা পরিবার ছিল তাঁর। প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলেমিশে হাসিখুশিভরা একটা জীবন ছিল। নিজের সংসার পাতার ইচ্ছা তাঁর হয়নি কখনও। আজ এই সমুদ্র আর সমুদ্রগর্ভে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণীই তাঁর সংসার, তাঁর একমাত্র পরিবার। না, ঠিক একমাত্র নয়, আরও একজন আছে তাঁর পরিবারে। তাঁর আদরের বিড়াল বার্থোলোমিউ। সমুদ্রে আসার সময় সি শেপার্ডেরই আর এক কর্মীর কাছে রেখে এসেছেন তাকে।

সমুদ্রের দিকে আরও একবার সতর্ক দৃষ্টি ফেরান ডক্টর ওলসেন। যতদূর নজর চলে, অপার শান্তি। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলে আবার কেবিনে ঢুকে যান ডক্টর রুস্কভা ওলসেন।

***

হেকুনের বোধ-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। কলের পুতুলের মতো খাঁড়ির হাঁটুজলে নেমে দাঁড়ায় সে। চারদিকে ঘন লাল জল, তীক্ষ্ণ শিসের শব্দে কানে তালা ধরে যাচ্ছে। সেই রক্তবর্ণ জলের ভিতর এখানে ওখানে ভেসে উঠছে গাছের গুঁড়ির মতো একের পর এক মৃতদেহ। উন্মাদের মতো মাথার উপর অস্ত্র তুলে লাফাচ্ছে যারা, তাদের কি হেকুন চিনত কোনোদিন? ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের গল্পকথায় ড্রেগুর নামে নরমাংসভোজী যে পিশাচের কথা শোনা যায়, এরা কি আসলে সেই ড্রেগুর? পিছন থেকে একটা ধাক্কা খেয়ে খানিকটা সংবিৎ ফেরে হেকুনের। বাবা ডাকছে তাকে। হাতের দুই ফলা ছুরিটা তুলে নীচের দিকে দেখিয়ে হেকুনের হাতের হুকের দিকে ইঙ্গিত করে কী যেন বলছে। চোখে নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো দৃষ্টি। হেকুন নীচের দিকে তাকায়। ছোটো একটা ডলফিন, প্রায় শাবক বললেই চলে। নিষ্পাপ দুটো চোখ মেলে স্থিরদৃষ্টিতে তাকেই দেখছে। হেকুনের কানের কাছে মুখ এনে আবার চিৎকার করে ওঠে ফ্লোভিন, “ঢোকা! শিগগির হুকটা ঢোকা ওর শ্বাসছিদ্রে। এটা বেশ ছোটো, ইচ্ছা করলে খাঁড়ির জল বেয়ে পালাতে পারবে।”

আবার ডলফিনটার দিকে তাকায় হেকুন। ওর দৃষ্টি যেন পুড়িয়ে দিচ্ছে হেকুনের চোখ দুটো। হুকটা খাঁড়ির দিকে ছুড়ে দিয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে ওই রক্ত লাল জলের ভিতর ধীরে ধীরে বসে পড়ে হেকুন। তাকে ঘিরে ভাসতে থাকে অগুনতি মৃতদেহ। ফ্লোভিন নিজের ছেলের এহেন কীর্তিতে সামান্য চমকে গিয়েছিল। খেয়াল হতেই ঘুরে দাঁড়াল ছুরি বাগিয়ে। কিন্তু কোথায় সেই ডলফিন? জল এত লাল হয়ে গেছে যে স্পষ্ট করে দেখাও যাচ্ছে না। ভেবেছিল ছোটো ডলফিন দিয়েই ছেলের গ্রিনডাড্র্যাপ শুরু হবে, কিন্তু তা বোধ হয় হবার নয়। যাক গে, কেউ না কেউ ওটাকে এখুনি মারবে নিশ্চয়ই। এখন এই ক্যাবলা ছেলেটাকে নিয়ে কী করবে ফ্লোভিন সেটাই ভাবার বিষয়।

***

“ডক্টর ওলসেন, শিগগির আসুন, সমুদ্রের জলে লাল একটা ধারা মিশছে। সামথিং ইজ রং।”

ছুটতে ছুটতে কেবিনে ঢোকে অ্যালেক্স। নেদারল্যান্ডসের ছেলে, সবে ইউনিভার্সিটি শেষ করেছে। চাকরি খোঁজার পাশাপাশি সি শেপার্ডের হয়েও কাজ করে। ভারি ভালো ছেলে, কিন্তু মুখটা এখন উদ্বেগে লাল।

“লাল ধারা!” মুহূর্তে লাফিয়ে ওঠেন ডক্টর ওলসেন। মুখটা ফ্যাকাশে।—“আমরা এখন ঠিক কোথায়?”

শেষ শব্দগুলো বলার সময়ে গলা কেঁপে যায় তাঁর। জিজ্ঞেস করার দরকার নেই, তিনি বোধ হয় জানেন তাঁরা এখন কোথায়।

“আমরা ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের কিছুটা দূরে।” অ্যালেক্স কিছুটা অবাক হয়।

“উফ্‌!” দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়েন ডক্টর। কোনোক্রমে বলেন, “ফিরে চলো, আর ওদিকে গিয়ে লাভ নেই।”

“কেন ডক্টর?”

“গ্রিনডাড্র্যাপ।” কোনোক্রমে শব্দটা উচ্চারণ করেন ডক্টর রুস্কভা ওলসেন। তাঁর গলায় তীব্র বিতৃষ্ণা ঝরে পড়ে।

***

স্কালাফিওরদর গ্রামে আজ রীতিমতো উৎসবের আমেজ। খাঁড়ির পাড়ে এখনও স্তূপ হয়ে পড়ে আছে ডলফিনের মাংস। এমনিতেই গ্রিনডাড্র্যাপে যারা অংশগ্রহণ করে তারা সবাই সমান ভাগ পায় শিকারের। আজ তো মনে হচ্ছে আশেপাশের গ্রামেও বিলোতে যেতে হবে। ধৈর্য ধরে গুনে দেখেছে ইসাকুর, ১৪২৮টা ডলফিন। এত বড়ো মাপের শিকার গ্রিনডাড্র্যাপের ইতিহাসে বোধ হয় নেই। তিমি আর ডলফিন মিলিয়ে হাজার খানেক করে প্রতি গ্রিনডাড্র্যাপে শিকার করা হয় বটে, কিন্তু কেবল এতগুলো ডলফিন একসঙ্গে শিকার করা কল্পনারও বাইরে। স্বয়ং মেয়রের আগমন ঘটেছিল সন্ধ্যার দিকে। মুখে হাসি থাকলেও কপালে ভাঁজ পড়েছিল মেয়রের। গলাখাঁকারি দিয়ে বলেছিলেন, “তোমরা আজ ইতিহাস সৃষ্টি করেছ ঠিকই, কিন্তু বাইরের পৃথিবী আমাদের এই ঐতিহ্যকে খুব ভালো চোখে দেখে না। এই খবর ছড়ালে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হতে পারে। সি শেপার্ড এদিকে নিয়মিত ঘোরাঘুরি করে তা তো তোমরা জানোই। ওই জাতীয় আরও কিছু সংস্থা মিলে শিকার বন্ধ করার জন্য চাপ তৈরি করতে পারে আমাদের উপর। হয়তো একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গেছে।”

সম্ভবত মেয়রের বক্তব্য কেউ মন দিয়ে শুনছিল না, তাই খুব হাততালি পড়ল।

প্লাস্টিকের বড়ো বড়ো বালতিতে নিজের ভাগের মাংস ভরে ছেলেকে খুঁজছিল ফ্লোভিন। এখুনি গিয়ে ফ্রিজারে তুলতে হবে এগুলো। ইসাকুর সপরিবারে হইহই করতে করতে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছে খানিক আগে। খাঁড়ির দিক থেকে বিশ্রী একটা গন্ধ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে সারা গ্রাম জুড়ে।

সবাই বাড়ি চলে যাওয়ার পর সন্ধের অন্ধকারে উঠে দাঁড়ায় হেকুন। এতক্ষণ সবার নজর এড়িয়ে একরকম লুকিয়েই ছিল সে। এখন প্রায় টলতে টলতে বাড়ির দিকে রওনা দিল। জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। খাঁড়ির জল তখনও টকটকে লাল।

***

নীলকান্ত মণির মতো জলে ঘন লাল ধারা এসে মিশছে। ডক্টর ওলসেন পাথরের মূর্তি হয়ে ডেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। অ্যালেক্স আর গ্রেসিও স্তব্ধ হয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে। এই জাহাজে সবসুদ্ধ আছে নয়জন। চারজন জাহাজের ক্রু, বাকিরা কেউ বিজ্ঞানী, কেউ গবেষক ছাত্রছাত্রী, কেউ স্রেফ স্বেচ্ছাসেবী। একজন পশুচিকিৎসকও আছেন, তিনি জন্মসূত্রে ভারতীয়।

“জলে ওটা কী নড়ছে?” এতক্ষণের স্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ গ্রেসি লাফিয়ে ওঠে। আঙুল দিয়ে দেখায় লাল স্রোতের দিকে।

চকিতে গলায় ঝুলতে থাকা শক্তিশালী দূরবীনটা চোখে লাগান ডক্টর ওলসেন। পরমুহূর্তে তীব্র গলায় চিৎকার করে ওঠেন—“বোট নামাও, শিগগির!”

সুলা স্কিয়ারের সমুদ্রতটে উদ্বিগ্ন মুখে বসে ছিলেন ডক্টর ওলসেন। দৃষ্টি সামনের ঘেরা জায়গায়। তলায় জাল দেওয়া ঘেরা জায়গাটাতে মহানন্দে সাঁতরে বেড়াচ্ছে ছোটো একটা ডলফিন। হাবভাব দেখে বোঝার উপায় নেই কী ঝড় গেছে তার উপর দিয়ে।

স্কটল্যান্ডের এই ক্ষুদ্র দ্বীপে কোনও মানুষ বাস করে না। সম্প্রতি এখানে সি শেপার্ড ছোটো একটা পুনর্বাসন কেন্দ্র বানাতে পেরেছে, তাও অনেক লড়াইয়ের পর। আশেপাশের এলাকা থেকে উদ্ধার করা সামুদ্রিক প্রাণীদের এখানে রেখে চিকিৎসা করা হচ্ছে ইদানীং। তারপর অবস্থা বুঝে আবার সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া বা সংরক্ষিত অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া। মানুষের সংস্পর্শে যত কম আসে ততই এদের পক্ষে মঙ্গল। হয়তো আবার শিকারিদের হাতে ধরা পড়বে। সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেললে তবু একরকম, বন্দি করে অ্যামিউজমেন্ট পার্কে নিয়ে গেলে তার থেকে খারাপ আর কিছু হতে পারে না। যতসব উৎকট অস্বাভাবিক আচরণের ট্রেনিং নিয়ে বাকি জীবন মনোরঞ্জন করো মানুষের। ট্রেনিংয়ের নামে তিল তিল করে কেড়ে নেওয়া হবে শিকার করার ক্ষমতা, প্রকৃতির কোলে বেঁচে থাকার সমস্ত গুণ। এই পার্কগুলো থেকে উদ্ধার করা ডলফিনদের নিয়ে কী যে মুশকিল হয় তখন। ডক্টর ওলসেনের মনে পড়ে কিছু বছর আগে দেখা একটা ডলফিনের কথা। খেলা দেখিয়ে হাততালি পেয়ে উৎসাহী দর্শকের সঙ্গে সেলফি তুলে যখন সে আবার তার সি পেন বা খোঁয়াড়ে ফিরে এল, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ধাতব বেড়ার গায়ে তাকে মাথা ঠুকতে দেখেছিলেন ডক্টর রুস্কভা ওলসেন। রাতে ঘুমাতে পারেননি সেদিন। কিন্তু এইসব ডলফিনদের কোনোভাবে উদ্ধার করে ছেড়ে দিলে দুটো দিনও টিকতে পারবে না। এই ডলফিনটা অবশ্য ছোটো, মানুষের ছোঁয়া কলুষিত করতে পারেনি এখনও তাকে। আবার দিন চারেক আগের সেই দৃশ্য মনে করে শিউরে ওঠেন তিনি। রক্তের স্রোতের ভিতর ভাসতে দেখে প্রথমে ভেবেছিলেন ও আহত, কিন্তু তোলার পর দেখা গেল দেহে কোনও আঘাত নেই। প্রাথমিক চেক-আপের পর ছেড়ে দেওয়া যেত, কিন্তু ওর তো কোনও দল নেই, শিকার করে খেতে পারবে কি না সেটা বোঝা দরকার। ঘেরা জায়গাটাতে মাছ ছেড়ে সেটাই একাগ্র মনে লক্ষ করছেন তিনি।

আপন মনে সাঁতার কাটতে কাটতে হঠাৎ হালকা ডিগবাজি খেয়ে জলের তলায় ঢুকে যায় সে। মুখে একটা মাছ নিয়ে উঠে আসতে লাগে তিরিশ সেকেন্ড। আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠেন ডক্টর ওলসেন।

“আপনার পোষ্যটিকে তাহলে বাড়ি ফেরানো যাবে, কী বলেন?” পশুচিকিৎসক ডক্টর ভার্গব কখন এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়াল করেননি রুস্কভা।

“ঠিক তাই। ও বাড়ি ফিরলে আমিও ফিরব।” বার্থোলোমিউয়ের জন্য মনটা কেমন করছে তাঁর।

“তাহলে ট্যাগিং করে দিই কাল, রিলিজ প্রসেস শুরু করতে বলি? ডক্টর ভার্গব হাতের কাগজগুলো দোলাতে দোলাতে বলেন। কাগজের বাঁ কোণ থেকে উঁকি মারছে কতগুলো সংখ্যা—ডি.এফ-২৩৮, বাকিটা আর পড়া যাচ্ছে না। ওটা ডলফিনটাকে সনাক্ত করার নম্বর।

ডক্টর ভার্গব পাড়ে খাটানো তাঁবুর দিকে হাঁটা লাগিয়েছিলেন, রুস্কভার ডাকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ফিরে তাকালেন।

“ডক্টর, শুধু আইডি নয়, একটা নামও যদি সেই সঙ্গে লিখে নেন।”

হেসে ফেলেন ডক্টর ভার্গব। দলের সবাই জানে উদ্ধার করা প্রাণীদের নামকরণ করতে ভালোবাসেন ডক্টর ওলসেন।

“নিশ্চয়ই। কী নাম দিয়েছেন ওর?”

মুখটা ঝলমল করে ওঠে মধ্যবয়স্ক জীববিজ্ঞানীর। ষড়যন্ত্র করার ভঙ্গিতে বলেন, “ব্লু।”

অ্যালেক্স আর গ্রেসিকে বোধ হয় চিনে গিয়েছে ব্লু। গায়ে হাত দিলেও কিছু বলে না। পিঠের উপরের তিনকোনা পাখনাটা ধরে আছে অ্যালেক্স। পাখনাটা যেখানে পিঠের সঙ্গে মিশেছে, তার সামান্য উপরে ছোট্ট একটা ট্রান্সমিটার লাগাচ্ছে গ্রেসি। হয়তো সামান্য ইনজেকশন ফোটানোর মতো লাগল, বিশেষ আপত্তি করল না ব্লু। এই ট্রান্সমিটারকে বলে স্যাটেলাইট ট্যাগ। যখনই সাঁতরাতে সাঁতরাতে ঘাই দিয়ে উপরে উঠে আসবে ব্লু, এই ট্রান্সমিটার কয়েকটি প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠাবে স্যাটেলাইটে। সে-সব তথ্য থেকে ব্লু বর্তমানে কোথায় আছে, কেমন গতিতে সাঁতরাচ্ছে, সেখানে জলের তাপমাত্রা কত—এই সমস্ত জানা যাবে। তবে সব উদ্ধার করা প্রাণীদের যে ট্যাগ করা হয় এমনটা নয়। ব্লু ছোটো বয়সে দলছুট বলেই ওর উপর খেয়াল রাখাটা দরকার। ট্যাগগুলোর দাম আছে বেশ।

হঠাৎ মনটা কেমন খারাপ হয়ে যায় ডক্টর ওলসেনের। এবার ব্লু হারিয়ে যাবে অতল জলে; কয়েক মাস ধরে ও কোন দিকে যাচ্ছে খেয়াল রাখা হবে; তারপর ব্যাটারি শেষ হয়ে ট্যাগ অকেজো হয়ে যাবে এক সময়। আর খুঁজে পাওয়া যাবে না ওকে। এই ট্যাগগুলো সাত-আট মাস থেকে বড়োজোর বছর খানেক কার্যকরী থাকে। কখনও তার আগেই খুলে পড়ে যায়। কাল সকালে সূর্য ওঠার অল্প সময় পরেই ব্লুকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে তার নিজের এলাকায়। যতদিন না কোনও দল খুঁজে পায়, একা একা লড়াই করে বাঁচতে হবে ওকে।

“ট্যাগের দামটা যদি কোনোভাবে একটু কমানো যেত।” টিম লিডার উইলিয়ামও এসে দাঁড়িয়েছে তাদের পাশে, ট্যাগ লাগানো দেখছে। বিরাট চেহারার জন্য ওকে সবাই বিগ বিলি বলে ডাকে। একবার একদল তিমি শিকারিদের জাহাজের প্রপেলার জ্যাম করে দিয়ে আইনি জটিলতায় ফেঁসে গিয়েছিল সে। অনেক সমস্যার পর সে-সব ঝামেলা মিটলে বিগ বিলি নির্বিবাদে বলেছিল, প্রয়োজন পড়লে নাকি আবার ওরকম করতে ওর আটকাবে না।

“ফান্ড বাড়ানোর একটা মতলব এসেছে মাথায়, বলব পরে।” ডক্টর ওলসেন অন্যমনস্কভাবে বললেন। একটা সাংঘাতিক আইডিয়া তাঁর মনের মধ্যে খেলে বেড়াচ্ছে ক’দিন ধরে।

***

খাঁড়ির জল আবার পরিষ্কার হয়ে গেছে, কিছুদিন আগের মৃত্যু তাণ্ডবের চিহ্নমাত্র নেই। হেকুন হাঁটুর উপর থুতনি রেখে বসে আছে সেইদিকে তাকিয়ে। তার শরীর এখনও খুব দুর্বল। সেই ঘটনার পরদিন থেকে মারাত্মক জ্বরে পড়েছিল সে। সুস্থ থাকলে কী হত বলা যায় না, তবে অত জ্বরের মধ্যে ছেলেটাকে কিছু আর বলতে পারেনি ফ্লোভিন। জলের দিকে তাকালেই সেই ছোটো ডলফিনটার কথা মনে পড়ছে হেকুনের। তারপর থেকে কয়েকটা দিন উৎকট গন্ধে তাদের স্কালাফিওরদর গ্রাম যেন ছেয়ে গিয়েছিল। খাবার মুখে তুলতে পারেনি হেকুন।

“কী রে ভিতুর ডিম, খাঁড়ির পাড়ে বসে দিবাস্বপ্ন দেখছিস নাকি?” সেমালের ভাঙা গলা হঠাৎ ভেসে আসে পিছন থেকে। সঙ্গে আরও তিন-চারটে গলার সমবেত হাসি। সেমালের দলবলকে চিরকাল এড়িয়ে চলে হেকুন। সেদিনের ঘটনার জের এত সহজে কাটবে না বোঝা উচিত ছিল। সামনে শিকার পেয়ে এইভাবে ছেড়ে দেওয়া ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের ইতিহাসে বোধ হয় এই প্রথম।

“জানিস না, এবার থেকে ট্রন্ডুরের পরেই ওর নাম বলবে সবাই।” আর একটা চাঁছাছোলা গলা ভেসে আসে।

হেকুনের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে হাসতে থাকে ওরা সবাই। ট্রন্ডুর এই দ্বীপপুঞ্জে প্রাচীনকালে বাস করা এক বীর ভাইকিং। তার নানা কাহিনি এখন কিংবদন্তির রূপ নিয়েছে।

হেকুন বুঝতে পারে তার কান গরম হয়ে উঠছে, মাথার মধ্যে তীব্র একটা যন্ত্রণা।

“অ্যাই ওকে ছাড়।” ইয়োসভার গলা ভেসে আসে এবার। ইয়োসভা একে ওদের থেকে সামান্য বড়ো, তার উপর ভীষণ গম্ভীর।

রুনের ছুটে এসে হেকুনের পাশে বসে পড়ে। হাসতে হাসতে গ্রামের দিকে ফিরে যায় সেমাল ও তার দলবল।

***

ভোর হয়েছে সবেমাত্র। ক্যানভাসের মস্ত বড়ো স্লিংয়ের ভিতর পোরা হয়েছে ব্লুকে। জাহাজে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আয়ারল্যান্ডের দিকে। এই হোয়াইট সাইডেড ডলফিনরা উত্তর অ্যাটলান্টিকের বাসিন্দা। তাই অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। ফ্যারো দ্বীপ থেকে দূরত্ব বজায় রাখাটাই আসল উদ্দেশ্য।

ক্যানভাসের স্লিং ধীরে ধীরে নামানো হয় মহাসাগরের জলে। ঢেউয়ের ছোঁয়া পেয়ে দুলে ওঠে সেটা। স্লিংটা খুলে দিয়ে অপেক্ষা করে ওরা ক’জন। ডক্টর ওলসেনের মনে হয় ব্লু যেন একবার তাকাল তাঁর দিকে। এক মিনিট, দুই মিনিট—ঠিক তিন মিনিটের মাথায় ডিগবাজি খেয়ে জলে গিয়ে পড়ল ব্লু। তারপর জল ছিটিয়ে অদৃশ্য হল সমুদ্রের তলায়। হঠাৎ বুকের ভিতরটা কেমন ঠান্ডা হয়ে আসে ডক্টর ওলসেনের। কতই-বা বয়স হবে ওর। ছোটো ছোটো মাছ ধরে খেতে শিখলেও বছর খানেকও হয়তো নয়। অনেক ডলফিন শাবক তিন বছর পর্যন্তও মায়ের সঙ্গে ঘোরে। ব্লু বাঁচতে পারবে কি না তিনি জানেন না। ছাড়াটা কি ঠিক হল? না-হলে কোনও অ্যামিউজমেন্ট পার্কে—নাহ্, সে-জীবনের থেকে বরং এই ভালো।

“ও আবার ফ্যারোর দিকে চলে যাবে না তো?” গ্রেসির উদ্বিগ্ন স্বরে সংবিৎ ফেরে রুস্কভা ওলসেনের। নিজের চিন্তায় হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

“একা একা পারবে না। গেলেও দল না হলে শিকারিদের পাল্লায় পড়বে না।”

ছোটবেলায় দেখা গ্রিনডাড্র্যাপের দৃশ্য হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে ডক্টর ওলসেনের। মাথা ঝাঁকিয়ে যেন দৃশ্যটাকে সরাতে চাইলেন তিনি। তারপর অসীম অনন্ত মহাসাগরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “ভালো থাকিস ব্লু।”

***

“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!” ফোনে রীতিমতো গান গেয়ে ওঠে উর্মি। কাকভোরে রাংতার ঘুম ভাঙিয়েছে সে।

ফোনটা রেখে হাসিমুখে আড়মোড়া ভাঙে রাংতা, মনে বেজায় আনন্দ। মা-বাবা এখনও ঘুম থেকে ওঠেননি, কাল রাত বারোটার সময় কেক-টেক কেটে শুতে শুতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। ঘুমের রেশটা কাটতেই রাংতার মনে পড়ে যায় ছোটকার গিফটটার কথা। কাল বিকেলে এসেছে সুন্দরভাবে মোড়া ছোট্ট একটা বাক্স, সঙ্গে একটা কার্ড। জন্মদিনের শুভেচ্ছার সঙ্গে কার্ডে রয়েছে আজ সকালের আগে বাক্সটা না খোলার নির্দেশ, যেমন প্রত্যেক বছর থাকে।

সোনালি চকচকে কাগজে মোড়া বাক্সটা হাতে নিয়ে বিছানায় এসে বসে রাংতা। ছোটকার পাঠানো বাক্সগুলো সাধারণত বেশ বড়োসড়ো হয়, এমন ছোটো বাক্সে কী পাঠিয়েছে কে জানে।

বাক্সটা খুলতেই বেরিয়ে এল উজ্জ্বল রঙের কিছু কাগজপত্র আর আরও ছোটো একটা বাক্স। কাগজগুলোর দিকে এক ঝলক তাকিয়ে রাংতার মনে হল সেগুলোর উপর কিছুর নির্দেশ লেখা আছে। ছোট্ট চৌকো বাক্সটা এবার খুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল রাংতা। এটা আবার কী বস্তু! বড়ো বড়ো নীলচে পুঁতি দিয়ে গাঁথা একটা হাতে পরার গহনা। পুঁতিগুলো দেখলে কেমন যেন সমুদ্রের কথা মনে পড়ে। ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট ডলফিনের মূর্তি, যেন এইমাত্র জল থেকে লাফিয়ে উঠল সে। খামোখা একটা হাতের গহনা ছোটকা নিশ্চয়ই পাঠাবে না, কী ব্যাপার বুঝতে এবার কাগজপত্রে মন দিল রাংতা। প্রথম কাগজটাতে একটা ডলফিনের ছবি, তলায় লেখা আছে, ওকে নাকি রেসকিউ করা হয়েছিল, ওর নাম ব্লু। ছবির তলায় একটা কিউ.আর কোড, পাশে লেখা ওটা স্ক্যান করলে নাকি ব্লুকে ম্যাপে ট্র্যাক করা যাবে। রাংতার চুল খাড়া হয়ে উঠল। ম্যাপে ট্র্যাক করা যাবে মানেটা কী? ব্লু একটা সত্যিকার ডলফিন আর ও এখন কোথায় সাঁতরে বেড়াচ্ছে রাংতা সেটা এখানে বসে দেখতে পাবে? বাবাকে মোবাইল ফোনে কিউ.আর কোড স্ক্যান করতে দেখেছে রাংতা, কিন্তু নিজে কখনও করেনি। রাংতার কোনো-কোনো বন্ধুর নিজের মোবাইল ফোন থাকলেও ওর নেই। মা বলেছেন, ক্লাস নাইনের আগে কখনোই নয়। কিন্তু ও নিজে নিজে স্ক্যান করতে পারবে কি? দেখাই যাক না। এক ছুটে বাবার কাজের টেবিল থেকে ফোন নিয়ে এল রাংতা। পাসওয়ার্ড ও জানে, নিজের জন্ম তারিখ।

স্ক্যান আইকনটার উপরে ট্যাপ করে কিউ.আর কোডটার সামনে ধরল রাংতা। বুকটা দুরুদুরু করছে এবার, হাতের তালু ঘেমে উঠেছে—কিছু হবে কি আদৌ?

আস্তে আস্তে স্ক্রিনে উপর ফুটে উঠল একটা ম্যাপ, নীল সমুদ্রের পাশে সবুজ হলুদ-খয়েরিতে কোন একটা দেশ। কী দেশ এটা? আংশিকভাবে দেখা যাচ্ছে, তাই রাংতা ঠিক বুঝতে পারছে না এটা পৃথিবীর কোন জায়গা। এবার সমুদ্রের উপর সবজেটে গোল গোল ছোটো ছোটো দাগ ফুটে উঠছে পাশাপাশি। কী ওগুলো? খানিকটা এগিয়ে এবার গোল দাগগুলো থেমে গেল, পাশে ফুটে উঠল দিন দু-এক আগের তারিখ। রাংতা উপুড় হয়ে পড়ল বাকি কাগজপত্রের উপর।

***

“বলছিস কী, তুই একটা সত্যিকার ডলফিন কোথায় যাচ্ছে ম্যাপে দেখতে পাচ্ছিস?” উর্মির চোখ দুটো প্রায় কপালে উঠে পড়ে।

“নিজের চোখেই দেখ।” বাবার মোবাইলটা সকাল থেকে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছে রাংতা। রবিবার হওয়াতে বাবা আপত্তি করেননি, শুধু মাঝে মাঝে ফোন এলে দিয়ে আসতে হচ্ছে।—“আমি সকালে যখন দেখলাম তখন এইখানটায় ছিল। এই খানিকক্ষণ আগে আবার রিফ্রেশ করেছে।” আঙুল দিয়ে ম্যাপটার একটা বিশেষ জায়গার উপর গোল দাগগুলো দেখায় রাংতা।

“এতক্ষণ পরপর আপডেট করছে কেন রে, প্রায় দিন দুই পরে করল তাহলে?” প্রায় আধঘণ্টা ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে উর্মি।

“লিখছে, দুটো কারণে এরকম হয়। স্যাটেলাইট ট্যাগ লাগানো আছে ওর তিনকোনা পাখনায়। যখন নিশ্বাস নিতে বা অন্য কোনও কারণে জলের উপরে আসে ব্লু, পাখনাটা জলের উপরে থাকলে তবেই তথ্য পাঠাতে পারে। হয়তো নিশ্বাস নেওয়ার জন্য ব্লো-হোলটা উপরে তুলে রইল কেবল। আর একটা বাজে কারণ আছে। শিকারিদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ঘন ঘন আপডেট দেয় না।”

চমকে ওঠে উর্মি। সত্যি তো, এই বিপদের কথাটা ভেবে দেখেনি ও।

চকোলেট কেকের বিশাল একটা টুকরো, চিকেন ফ্রাইড রাইস আর চিলি চিকেন খেয়ে যখন বাড়ি ফিরল উর্মি, তখনও ব্লু ম্যাপে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। আসলে নিশ্চয়ই ও আরও বেশ খানিকটা চলে গেছে। ম্যাপটা তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে বড়ো করলে সমুদ্রের নামটা দেখায়, উত্তর অ্যাটলান্টিক মহাসাগর। রাংতার ব্লু ডলফিন আইসল্যান্ডের কাছাকাছি ঘুরছে।

ঘুমিয়ে পড়েছে রাংতা। হাতে সমুদ্ররঙা ব্রেসলেট, মাথার পাশে বাবার মোবাইল। ছোটকার সঙ্গে ফোনে অনেকক্ষণ কথা বলেছে সন্ধেবেলা। সঙ্গে আসা কাগজে একটা ইমেইল অ্যাড্রেস আছে, সেটা নাকি এক জীববিজ্ঞানীর। সি শেপার্ড নামে এক সংস্থার হয়ে তিনি কাজ করেন, ব্লুকে তিনিই কী একটা যেন বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। তাছাড়া এই ব্রেসলেট বানিয়ে বিক্রি করার বুদ্ধিটা নাকি ওঁরই। বিক্রির লাভের অংশ সি শেপার্ডের কাজেই লাগানো হয়। রাংতার আরও কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে ওঁকে নাকি মেইলও করা যায়। শুনে তো রাংতা অবাক।

স্বপ্নের মধ্যে ঢেউয়ে ঢেউয়ে রাংতা ভেসে চলে কোন দূরদেশের পাশ দিয়ে। তাকে ঘিরে সাঁতার কাটে এক নীলচে ডলফিন। কখনও জল ছিটিয়ে তার মাথার উপর দিয়ে ডিগবাজি খায়। ঘুমের মধ্যে যেন জলের ঝাপটা এসে লাগে রাংতার দুই গালে। ওর পাখনায় লাগানো ট্যাগ খুব বেশিদিন কাজ করবে না আর। বড়োজোর এক বছর টিকে থাকে এইগুলো। তার মধ্যে প্রায় ছয় মাস তো পেরোতেই চলল। ব্যাটারি শেষ হওয়ার আগে খুলেও পড়ে যেতে পারে। মা রাংতার হাত থেকে মোবাইলটা সরিয়ে নিতে নিতে শুনতে পেলেন, তাঁর কন্যা ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে কীসব বলছে। ভালো করে বুঝতে না পারলেও ব্লু শব্দটা তাঁর কান এড়াল না।

জিমেইল খুলতেই অচেনা কারোর কাছ থেকে আসা একটা মেইলের দিকে চোখ গেল ডক্টর ওলসেনের। অচেনা দেখে এড়িয়েই যাচ্ছিলেন, সাবজেক্ট লাইনে একটা চেনা শব্দ চোখ টানল তাঁর। ব্লু। বেশ কিছু মাস পরে ব্লুয়ের কথা মনে পড়ল আবার। প্রথম দেড় মাস নিয়ম করে ট্র্যাক করতেন তাকে, তারপর আরও নানা কাজ, আরও উদ্ধার করা বিপন্ন প্রাণীরা এসে ভিড় জমাল তাঁর চারদিকে। তার মধ্যে ব্রেসলেট বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। খবর পেয়েছেন হু হু করে বিক্রি হচ্ছে সেগুলো। শুধু বাচ্চারা নয়, বড়োদেরও নাকি খুবই পছন্দ। মাস খানেক বাদে মনে হয়েছিল ব্লু বোধ হয় কোনও দলে গিয়ে ভিড়েছে। নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন একরকম। তারপর কখন যেন মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

ইন্ডিয়া থেকে ছোটো একটা মেয়ে লিখেছে এই বৈদ্যুতিন চিঠি। ব্লুয়ের ব্রেসলেট পরে তার যাত্রাপথের দিকে সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে সময় পেলে। জানতে চেয়েছে কী হয়েছিল ব্লুয়ের। তার নামের সঠিক উচ্চারণ হয়তো করতে পারলেন না তিনি, সম্ভবত রুংটা।

সামান্য থমকালেন ডক্টর ওলসেন। ইন্ডিয়াতে তিনি যাননি কখনও, খুব পরিষ্কার ধারণাও নেই সে-দেশ সম্বন্ধে। তবে এটা শুনেছেন, এশিয়া মহাদেশের বাচ্চাদের উপর পড়াশোনার চাপ থাকে খুব। আর শুনেছেন তাদের বাবা-মায়েরা জীবনের রুক্ষতা থেকে তাদের আগলে রাখেন, ছাতা হয়ে সুরক্ষা দেন। আর এ তো নেহাত ছোটো, গ্রেড এইটে পড়ে মাত্র। গ্রিনডাড্র্যাপের মতো বীভৎস জিনিসের পরিচয় কি দেওয়া চলে তাকে? উত্তর লিখতে গিয়ে চিন্তায় ডুবে গেলেন রুস্কভা ওলসেন।

চার মাস কেটে গেছে, রাংতা প্রতিদিন খেয়াল রাখে ব্লু কোন দিকে যাচ্ছে। এক-একবার হয়তো গোটা দিন, এমনকি দুই দিন ধরে ম্যাপে ব্লুয়ের অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হয়নি। রাংতা ভয় পেয়েছে, ছটফট করতে করতে ভেবেছে ব্লুয়ের কিছু হয়নি তো? নাকি ওর পাখনা থেকে খুলে পড়ে গেছে ট্যাগটা? ম্যাপে ওর গতিবিধি আবার চালু হলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে রাংতা। একবার তো ভয় পেয়ে ডক্টর ওলসেনকে খবরটা জানাবে ভেবেছিল। আসলে এই ক’দিনে ব্লু যেন ওর পরিবারের একজন হয়ে গেছে। রাংতা তো ঠিক করেই নিয়েছে, বড়ো হয়ে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী হবে।

পরীক্ষা একেবারে সামনে এসে গেছে, বেশ রাত পর্যন্ত পড়তে হচ্ছে রাংতাকে। হাতের ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে রাংতা ভাবছিল, গত দুইদিন ব্লুয়ের উপর নজর রাখা হয়নি তো! এখন উঠে মোবাইল আনতে গেলে মা নির্ঘাত বকুনি দেবেন।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিউ.আর কোড স্ক্যান করে ম্যাপটা খুলে প্রথমে একটু চমকে উঠল রাংতা। ব্লু একটু অন্যদিকে চলে গেছে যেন। তাড়াহুড়োর মধ্যে খুব ভালোভাবে খেয়াল না করলেও ও যে ঠিক আছে সেটা দেখে নিশ্চিন্ত হল সে।

ঘুমের মধ্যে কীসের যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল রাংতার। কী যেন একটা সমস্যা তার অবচেতন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু স্পষ্ট হচ্ছে না। কাল ভূগোল পরীক্ষা, কোনও চ্যাপ্টার ভুলে ভুলে বাদ দিয়ে ফেলল নাকি? ম্যাপ পয়েন্টিংগুলো সব প্র্যাকটিস করেছে ঠিকঠাক? আধা তন্দ্রার ভিতর এইসব প্রশ্ন মাথার ভিতর পাক খাচ্ছিল রাংতার। হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসল সে, চোখ বিস্ফারিত। ম্যাপে শেষ কী দেখেছিল স্পষ্টভাবে চোখের সামনে ভেসে ওঠে আর-একবার। ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ! ঠিক, ব্লু তো ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের দিকে চলেছে! কী করবে এখন রাংতা? ব্লু তো যেদিকে খুশি যেতে পারে, কোনও বাধানিষেধ তো নেই। কিন্তু ডক্টর ওলসেনের মেইলে সবকিছু জানার পর ওই জায়গাটা নিয়ে কেমন একটা আতঙ্ক হয় তার।

নাইট স্ট্যান্ডের উপরে রাখা টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকায় রাংতা। রাত পৌনে তিনটে বাজে। ডক্টর ওলসেনের ওখানে তাহলে এখনও মাঝরাত হয়নি। জেগে থাকবেন কি? থাকলেও কী জানাবে তাঁকে সে? উনি যদি বলেন ব্লু তো ওদিকে যেতেই পারে, এতে তো আমার কিছু করার নেই। হয়তো বললেন ওদিকে যাওয়া থেকে কোনও প্রাণীকেই তো আটকাতে পারব না আমরা, তবে?

ছটফট করতে থাকে রাংতা। তারপর এক সময় গিয়ে বসে পড়ে ল্যাপটপের সামনে।

লম্বা একটা প্রবন্ধ লেখা শেষ করে শুতে যাচ্ছিলেন ডক্টর রুস্কভা ওলসেন। হঠাৎ টুং শব্দ করে মেইল ঢুকল একটা। আরে, ইন্ডিয়া থেকে সেই রুংটা নামের মেয়েটা। কাল সকালেই দেখব না-হয়, ভেবে উঠে পড়তেই যাচ্ছিলেন, হঠাৎ সময়টা খেয়াল হল তাঁর। ইন্ডিয়াতে এখন শেষরাত। এই অদ্ভুত সময়ে কী লিখতে পারে একটা ছোটো মেয়ে।

অ্যালার্মের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় রাংতার। পড়ার টেবিলে ল্যাপটপের সামনে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। ভাগ্যিস, মা আসেননি তাকে ডাকতে। কাল অত রাতে মেইল পাঠিয়ে আরও অনেকক্ষণ জেগে বসে ছিল উত্তরের অপেক্ষায়। এতক্ষণে নিশ্চয়ই কিছু জানিয়েছেন উনি। কিন্তু কই, কোনও উত্তর তো এখনও আসেনি। মনের উপর যেন মস্ত একটা ভারী পাথর চেপে বসে রাংতার। আর একবার দেখা দরকার ম্যাপটা। লাফিয়ে উঠেই দুটো কথা একসঙ্গে মনে পড়ে যায়—এক, বাবা আজ খুব ভোরে বেরিয়ে গিয়েছেন, তিনদিন পরে ফিরবেন। অফিসের কাজে ভুবনেশ্বর গিয়েছেন তিনি। দুই, মায়ের ফোনটা কীসব গড়বড় করায় গতকাল বিকেলে দোকানে সরানোর জন্য দিয়ে আসা হয়েছে। হঠাৎ চোখ ফেটে জল আসে রাংতার।

ডলফিনদের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। ব্লুয়ের অবশ্য স্পষ্ট কিছু মনে পড়ছে না, তবু কীসের একটা অদ্ভুত তাড়নায় সাঁতরে চলেছে তিরবেগে। দল থেকে আলাদা হয়ে পড়েছে কখন যেন। কী যেন হয়েছিল এখানে, ভাসা ভাসা ছবি দুলছে তার স্মৃতিতে। কাদের সঙ্গে যেন দল বেঁধে কোথায় যাচ্ছিল—তার এখনকার দল নয়, সে যেন অন্য একটা দল। একটু থামল ব্লু। যেন বুঝতে পারছে না এবার কোন দিকে যাবে। তার সহজাত প্রবৃত্তি বলল সামনে অগভীর জল, যাওয়া ঠিক হবে না। আতঙ্ক মিশে আছে এই জলে। কিন্তু কীসের আতঙ্ক? আগুনের দিকে পতঙ্গের মতো সেই অগভীর জলের দিকে এগিয়ে গেল ব্লু।

আজ ওলাসুকা উৎসব। ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের জাতীয় দিবস। নরওয়ের বীর রাজা ওলাফ হ্যারাল্ডসনের স্মরণে এই উৎসব। সকাল থেকে নাচ-গান-খাওয়া-দাওয়ার কোনও কমতি নেই। পুরো গ্রামটা খাঁড়ির ধারের ঢালে বেরিয়ে এসেছে, হই-হুল্লোড় চলছে পুরোদমে। হেকুনকে আজ অনেকদিন পর বেশ হাসিখুশি ঝলমলে লাগছে। সেমালদের দলকে এড়িয়ে রুনেরদের সঙ্গে লাফালাফি করে বেড়াচ্ছে সারাটা দিন। মাঝ-দুপুরের ভোজের পর সবাই একটু ঝিমিয়ে পড়েছিল, এখন আবার গান ভেসে আসছে এদিক ওদিক থেকে। হেকুন পা ছড়িয়ে বসে ছিল খাঁড়ির পাড়ে। জলে কিছু একটা নড়ে ওঠাতে চোখ কচলে আবার তাকানোর আগেই ওসলার তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এল, “ওটা কী?”

মুহূর্তে ভিড় জমে খাঁড়ির পাড়ে। ইসাকুর বর্শা হাতে কেন উৎসবে এসেছিল কে জানে, তবে ও বোধ হয় বর্শা হাতে ঘুমাতেও যায়। জলের উপরে নাকটা তুলে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে একটা ছোটো ডলফিন, একটাই। হেকুনের হাঁটু দুটো কাঁপতে থাকে হঠাৎ। সব ডলফিন তো একইরকম দেখতে, তবু ওই দৃষ্টি যেন তার খুব চেনা। কয়েকটা নিস্তব্ধ মুহূর্ত, হেকুনের মনে হল সময় যেন হঠাৎ থেমে গেছে। তারপর হইহই করে ইসাকুরদের দল নেমে পড়তে লাগল খাঁড়ির জলে। জাতীয় দিবসে শিকার নিজে এসে ধরা দিয়েছে, তা সে একটা হলে একটাই সই।

পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে দাঁত বের করে সেমাল বলে গেল, “যা রে, ভিতু কেঁচো বাড়ি যা।”

তিন-চারজন মিলে ঘিরে ধরেছে দিশেহারা ডলফিনটাকে। একজন মস্ত হুক উঁচিয়ে ধরেছে, ব্লো-হোলে ঢোকাবে। হঠাৎ পাশ থেকে কী একটা জিনিস জলে আছড়ে পড়ে নিজের শরীরে দিয়ে ঢেকে দিল ডলফিনটাকে, তারপর ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলল খাঁড়ির মুখটার দিকে।

হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে থাকা একপাল সাহসী শিকারি অবাক হয়ে দেখল, তাদের সবচেয়ে ভিতু আর নিরীহ ছেলেটা নিজের শরীর দিয়ে সযত্নে ঢেকে রেখেছে একটা ছোটো ডলফিনকে আর ঠেলতে ঠেলতে বের করে দিচ্ছে খাঁড়ি থেকে সমুদ্রের দিকে। খাঁড়ির মুখটায় পৌঁছিয়ে একবার ফিরে তাকায় হেকুন। তারপর ডলফিনটার পাশাপাশি সাঁতার দিতে থাকে অথৈ সমুদ্রের দিকে।

ফ্লোভিন প্রাণফাটা আর্তনাদ করে ওঠে হঠাৎ—“নৌকা নামাও! ছেলেটা আমার কোথায় চলে গেল?”

ডক্টর ওলসেনের ভিতরটা হিমশীতল হয়ে যাচ্ছে। ম্যাপে শেষ দেখেছিলেন আধঘণ্টামতো আগে ফ্যারোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ব্লু। ঠিক কোন জায়গাটাতে এই ম্যাপ থেকে বোঝা সম্ভব হচ্ছে না, তবে ব্লুয়ের স্মৃতিশক্তি হয়তো ওকে স্কালাফিওরদর গ্রামের খাঁড়িতে নিয়ে গিয়েই ফেলেছে। আজ ওলাসুকা, সবাই খাঁড়ির পাড়েই বেরিয়ে এসেছে নিশ্চয়ই। তারপর আর ভাবতে পারেন না রুস্কভা ওলসেন।

“ডক্টর!” গ্রেসির চিল-চিৎকারে সংবিৎ ফেরে তাঁর। রাংতার মেইলটা পড়ে প্রথমে কী করবেন কিছু বুঝতে পারেননি তিনি। ফ্যারোর দিকে প্রাণীদের যাতায়াত তো তিনি বন্ধ করতে পারবেন না, তাহলে? সেইমতোই উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মেয়েটার লেখা শব্দগুলোর মধ্যে যে অদ্ভুত আকুতি ছিল সেটা তিনি মন থেকে কিছুতেই বের করতে পারলেন না। শেষ রাতের দিকে যখন সি শেপার্ডের জাহাজ জলে ভাসল, ততক্ষণে কেবল গ্রেসি আর অ্যালেক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছেন তিনি। এটা ছোটো জাহাজ, আজ এদিকে সি শেপার্ডের টহল দেওয়ার দিনও নয়। শুধু তাঁর অনুরোধে এদিকে একবার ঘুরে যেতে রাজি হয়েছে এরা।

গ্রেসি সমানে চিৎকার করছে। দৌড়ে ডেকের অন্যদিকে গেলেন ডক্টর ওলসেন। তারপর বাকরুদ্ধ হয়ে জীবনের আশ্চর্যতম দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকলেন তিনি। একটা ছোটো ছেলে আর একটা ডলফিন পাশাপাশি সাঁতার কাটছে।  ছেলেটার মুখটা আশ্চর্যরকম চেনা, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন একে কোনোদিন তিনি দেখেননি।

ছেলেটাকে জাহাজে তোলার পর একটা মস্ত ডিগবাজি খেয়ে জলের তলায় অদৃশ্য হল ব্লু।

নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ডক্টর ওলসেন। প্রায় ফিসফিস করে বললেন, “তোমার বাবার নাম কি ফ্লোভিন?”

চমকে ওঠে হেকুন। উত্তর দেওয়ার আগেই বেশ কিছু গলার চিৎকার ভেসে আসে। জাহাজের পাশে একটা স্পিড-বোট এসে দাঁড়িয়েছে। তোয়ালে জড়ানো হেকুনকে পাশে নিয়ে ডেকের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ান ডক্টর ওলসেন। বোট থেকে ফ্লোভিন আবার কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়।

ধরা গলায় ডক্টর ওলসেন বলেন, “আপাতত ছেলেটা আমার কাছে থেকে পড়াশোনা করুক। ফিরবে তো বটেই।”

হেকুনের দিকে আরও একবার তাকায় ফ্লোভিন। তারপর স্পিড-বোট ফিরে চলে ফ্যারোর দিকে।

“আমি আপনার কাছে থাকব কেন?” অবাক গলায় জিজ্ঞেস করে হেকুন।

“আমি যে তোমার পিসি রুস্কভা, থাকবে না আমার কাছে?”

আরও অনেকক্ষণ পর ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে হেকুন, “তোমার বাড়িতে কে কে থাকে?”

“আমি আর কুচকুচে কালো বার্থোলোমিউ।” চোখ দুটো হাসিতে ঝলমল করে ওঠে ডক্টর ওলসেনের।

গ্রেসি আর অ্যালেক্সের চেঁচামেচিতে আবার ছুটতে হয় ডেকে। ঘন নীল জলে ফোয়ারা তুলে জাহাজের পাশে ডিগবাজি খেতে খেতে যাচ্ছে একটা ডলফিন, মুখটা দেখে মনে হয় যেন সে হাসছে।

প্রিয় রাংতা,

তোমার ব্লু বহাল তবিয়তে খেলে বেড়াচ্ছে উত্তর অ্যাটলান্টিকের নীল জলে। ছবি পাঠালাম, দেখো। তুমি বলেছিলে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী হতে চাও। একদিন নিশ্চয়ই তাহলে দেখা হবে তোমার সঙ্গে।

এই গ্রহ বড়ো সুন্দর রাংতা, একে নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী রক্ষা কোরো। আমার দাদার ছেলে আমার কাছে থেকে পড়াশোনা করছে। সে তোমার থেকে খানিকটা বড়ো হলেও অনেকটা তোমার মতো। আরও একটা ছবি পাঠালাম, সেটা আমার বেড়াল বার্থোলোমিউয়ের।

ভালো থেকো রাংতা। তোমরা ভালো থাকলে এই গ্রহটা ভালো থাকবে।

ভারি চমৎকার দিন। নীল আকাশে কয়েকটা মেঘের নৌকো পাল তুলেছে। হালকা হালকা হাওয়ায় ঢেউ উঠছে উত্তর অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের বুকে। ঝলমলে নীল জল আজ যেন গাঢ় নীল দেখাচ্ছে। এখন সেপ্টেম্বর, এই এলাকার জল এখনও ততটা ঠান্ডা হয়নি। তারা অবশ্য হালকা গরম জলের স্রোত ধরে চলতে জানে। দল বেঁধে এই ঈষৎ উষ্ণ জলে সাঁতার কাটতে কাটতে এগিয়ে চলার মজাই আলাদা। খাবারেরও কোনও অভাব নেই এখানে। হেরিং পেলে হেরিং খাও, নইলে কড—ম্যাকারেল তো ঝুড়ি ঝুড়ি আছেই। তবে সবচেয়ে প্রিয় খাবার স্কুইড পেতে গেলে সাঁতরে আরও একটু উপরে যেতে হবে।

তাদের আজকের ঝাঁকটা মস্ত বড়ো। এমনিতে দল বেঁধেই থাকে তারা, তবে আজকের মতো বড়ো দল সচরাচর দেখা যায় না। শুরুতে এতজন ছিল না যদিও, মাঝে আরও দুটো বড়ো দল জুটে গেছে সঙ্গে। তা হোক, খাবারের অভাব যখন নেই, তখন বড়ো দল হলেই বেশি মজা। বেশ কয়েকটা ছানাও আছে তাদের নিজেদের দলে। বাকি দুটো ঝাঁকেও নিশ্চয়ই আছে। এই সময় থাকারই কথা। মায়ের পাশে পাশে তারাও মহানন্দে সাঁতার দিচ্ছে নিশ্চয়ই। ঝিমঝিমে একটা শান্তি ছড়িয়ে পড়ছে তাদের শরীর জুড়ে। কোথাও কোনও বিপদ নেই, মাছ ধরার জাহাজ পর্যন্ত চোখে পড়ছে না একটাও। তাদের বিশাল জালে জড়িয়ে পড়লে মহা বিপদ উপস্থিত হয়, কিন্তু সে-সম্ভাবনা আজ ক্ষীণ।

দলের এক-একজন হঠাৎ হঠাৎ জল ছেড়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠে ডিগবাজি খাচ্ছে। তারপর জলের উপর এসে পড়ছে ঝপাত করে। ফোয়ারার মতো জল ছিটছে চারদিকে, খুব মজা। তবে খালি মজা পাওয়ার জন্য যে লাফাচ্ছে তা কিন্তু নয়। চারপাশটা ভালো করে দেখে নেওয়ার বা শরীর ঠান্ডা করার উদ্দেশ্যেও ওরা এটা করে। একেবারে ছানাগুলো অবশ্য এসব করতে শেখেনি এখনও।

ওই দূরে, ওই যে আর একটা মস্ত ফোয়ারা লাফিয়ে উঠল না? না, এটা কারও লাফিয়ে উঠে জলে পড়া মোটেই নয়। একেবারে জলের গা থেকে সটান আকাশের দিকে উঠে মসৃণভাবে শেষ হল এক সময়। ওটা নির্ঘাত তিমি।

সামনে একটা দ্বীপপুঞ্জ আসছে। তবে ওরা দ্বীপ থেকে বেশ দূর দিয়েই যাবে। ওদিকটায় অনেক স্কুইড। ডিগবাজি খেতে খেতে, জলের বুকে ঝলমলে আলপনা কাটতে কাটতে এগিয়ে যায় তারা। এগিয়ে যায় ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের দিকে। অ্যাটলান্টিক হোয়াইট সাইডেড ডলফিনের ১৪২৯ জনের বিশাল একটা দল।

ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ ছবির মতো সুন্দর। বাসিন্দাদের মনোভাবও বেশ শান্তিপূর্ণ। আঠারোটা ছোটো ছোটো দ্বীপের সমষ্টি এই দ্বীপপুঞ্জ। ডেনমার্কের অংশ হলেও ১৯৪৮ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পেয়েছে এরা। ইদানীং অন্যান্য কাজকর্ম করলেও প্রত্যেক বাড়িতে অন্তত একজন মৎস্য ব্যবসায়ী আছে। কিছু বছর আগে পর্যন্ত মাছের ব্যাবসাই এদের উপার্জনের প্রধান উপায় ছিল। আজকাল অনেকেই পড়াশোনা শিখে কলেজে যাচ্ছে, যদিও সাকুল্যে একটাই বিশ্ববিদ্যালয় আছে তাও আবার রাজধানী টোর্শনে। ড্যানিশ মোটামুটি সকলে জানলেও, নিজেদের মধ্যে ফ্যারোইজ ভাষাতেই কথা বলতে পছন্দ করে এরা। ভাইকিংদের নর্স ভাষা থেকে এই ফ্যারোইজ ভাষার জন্ম। ভাইকিংদের সংস্কৃতির অনেক কিছু আজও থেকে গেছে এদের জীবনযাত্রায়, ধ্যানধারণায়।

দিনটা সত্যিই খুব সুন্দর আজ। আকাশ আর সমুদ্রের নীল যেন একাকার হয়ে গেছে। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি, তবে ঠান্ডা এখনও শুরুই হয়নি। তবে মেক্সিকো উপসাগর থেকে আসা উষ্ণ স্রোতের জন্য এখানে তেমন ঠান্ডা পড়েও না। এস্তোরয় দ্বীপের বাসিন্দারা সকাল থেকে যে-যার কাজে ব্যস্ত। সমুদ্র যতই মনোরম দেখাক, জন্ম থেকে সমুদ্রের পাশে থাকার ফলে তাদের একরকম গা-সওয়া হয়ে গেছে। এই সকাল সাড়ে দশটায় খাঁড়ির ধারের স্কালাফিওরদর গ্রাম একেবারে শান্ত। ছোটোরা স্কুলে আর বড়োরা যে-যার রুজি-রোজগারে ব্যস্ত।

খাঁড়ির ধার ঘেঁষে বসে ছিল ফ্লোভিন। মাছের ব্যাবসা একটু মন্দা যাচ্ছে তার। ছেলেটা স্কুলে পড়ে, আরও এক বছর পর হাই স্কুল শেষ হবে তার। এরপর পারিবারিক মাছের ব্যাবসায় যোগ দেওয়ার কথা, সেটাই চিরকাল ভেবে এসেছে ফ্লোভিন। কিন্তু হেকুন আরও পড়তে চায়; সে নাকি রাজধানীতে গিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ভরতি হবে। ফ্লোভিন নিজে আট ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে। ছেলেটা ব্যাবসায় হাত লাগালে ভালোই হত, বেশ বুদ্ধিসুদ্ধি আছে তার। কিন্তু মতিগতি বোঝা দায়। গত বছর থেকে গ্রিনডাড্র্যাপেও যেতে চাইছে না। অথচ ছোটো থেকেই তো দেখছে। বলে, এসব ভয়ানক পরম্পরার নাকি মানে নেই কোনও। শুধু হেকুন কেন, ইয়োসভা, রুনের আরও কারা কারা সব বন্ধু আছে ওর, সবাই নাকি চায় গ্রিনডাড্র্যাপ বন্ধ হয়ে যাক। মেয়েরা অনেকেই অবশ্য পছন্দ করে না এসব, তার নিজের বোন রুস্কভা তো দ্বীপ ছেড়েই চলে গেল এই নিয়ে ঝগড়া করে। এখন কোথায় যেন সামুদ্রিক প্রাণী নিয়ে গবেষণা করে। বহুবছর যোগাযোগই নেই, হয়তো দেখলে চিনতেও পারবে না ফ্লোভিন। যার নামের মানে সাহসী মানুষ, সে-ই কিনা ভয় পেয়ে পালাল!

প্রায় চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা পরম্পরা ভালো না খারাপ সেই নিয়ে কখনও ভাবেনি ফ্লোভিন। তাদের সেই প্রাচীন পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রা ছিল অসম্ভব কঠিন। খাদ্যাভাব, অর্থাভাব—সবকিছুর সঙ্গে লড়তে হয়েছিল তাদের। সেই কারণে হয়তো তাদের মনের ভিতরটাও কঠিন হয়ে গিয়েছিল। চিরকাল উত্তর অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের পাইলট তিমি আর ডলফিনের দল এদিকের উষ্ণ জলে শাবকের জন্ম দিয়ে দল বেঁধে ফ্যারোর পাশ দিয়ে নরওয়ের দিকে চলে যায়, ওদিকের জলে খাদ্য অনেক বেশি। সেই ঝাঁককে মাছধরার নৌকো আর ডিঙি নিয়ে তাড়া করে খাঁড়ির অগভীর জলে তাড়িয়ে আনা হত। অত কম জলে কি আর ওরা সাঁতরাতে পারে? তারপর বর্শা আর হারপুন দিয়ে মেরে ফেলতে কতক্ষণ। এই শিকার অভিযানকেই ফ্লোভিনদের পূর্বপুরুষরা নাম দিয়েছিল গ্রিনডাড্র্যাপ। এই শিকারে পাওয়া মাংস আর চর্বির উপর ভরসা করে দীর্ঘদিন কাটিয়ে দিত ওরা। ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতির সঙ্গে এই মাংস বা চর্বির উপর নির্ভরতা কমে গেল ঠিকই, কিন্তু ততদিনে এটা একটা ঐতিহ্য, অবশ্যপালনীয় কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। এখন তো সত্যিই বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই এই শিকারের, তবু এত পুরোনো ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে চায় না কেউ। প্রত্যেক বছরই কোনও না কোনও ঝাঁকের আর ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে যাওয়া ঘটে ওঠে না। তবে অনেক নিয়ম-টিয়ম বানানো হয়েছে আজকাল। বর্শা আর হারপুন তো সেই কবেই নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে। এখন ছুরি আর হাতলওলা ধাতব রডের দুই ধারে লাগানো ধারালো দু-মুখো ব্লেডই একমাত্র হাতিয়ার। অবশ্য মাছধরা নৌকো আর ডিঙির জায়গায় স্পিড-বোট আর জেট-স্কি তাদের কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে। তাছাড়া শিকারের লাইসেন্স থাকতে হয়, যাকে-তাকে গ্রিনডাড্র্যাপে অংশ নিতে অনুমতি দেওয়া হয় না। তবে দেখতে যেতে বাচ্চা-বুড়ো সবাই পারে, তার উপর কোনও বিধিনিষেধ নেই। হয়ও তাই। এই তো আগের বছর ফ্লোভিনের প্রতিবেশী ইসাকুর তার ছেলে সেমাল আর মেয়ে ওসলাকে নিয়ে দাপিয়ে বেড়াল খাঁড়ি জুড়ে। মেয়েটা বাইশ-তেইশ বছরের হলেও সেমাল তো তার ছেলে হেকুনেরই বয়সি, চৌদ্দ বছর পার হলেই শিকারের লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা দেওয়া যায়। হেকুনেরও সে-লাইসেন্স আছে, কিন্তু তাতে আর কী। কাঠ হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল পুরো সময়টা। দিনের শেষে ইসাকুর ঢাকা দেওয়া মস্ত মস্ত পাত্রে ভরে মাংস আর চর্বি বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। ওর মাংস রাখার বড়ো ফ্রিজারটা বোধ হয় উপছে পড়েছিল সেদিন। ফ্লোভিনের ফ্রিজারটা অর্ধেকও ভরেনি, একা আর কত পারবে। তবে আজকাল নানা কথা কানে আসে, তিমি আর ডলফিনের সংখ্যা নাকি কমে আসছে, এতে নাকি প্রাকৃতিক বিপর্যয় উপস্থিত হবে। কে জানে, হবেও-বা। ফ্লোভিন অতশত বোঝে না। হেকুন এইসব খুব বলে, রুস্কভাও বলত। সি শেপার্ড বলে একটা আন্তর্জাতিক সংস্থা মাঝে মাঝে ঘুরঘুর করে এদিকে, ওরা নাকি এইসব সামুদ্রিক প্রাণী সংরক্ষণ করার দায়িত্ব নিয়েছে। ক’দিন আগে বোধ হয় গ্রিনডাড্র্যাপ বন্ধ করার কথা বলতেই সি শেপার্ডের কয়েকজন স্কালাফিওরদরে এসেছিল, তবে কিস্যু লাভ হয়নি। মেয়র দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল ওদের।

তবে আজকাল ফ্যারোরও কিছু কিছু ডাক্তার নানা কথা বলতে শুরু করেছে। সমুদ্রের জলে নাকি দূষণ এতটাই বেড়ে গেছে যে তিমি আর ডলফিনের মাংসে পারদের চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে। স্বাস্থ্য দফতর থেকে সরাসরি কিছু না বললেও অনেক ডাক্তার এইসব মাংস খেতে নিষেধ করেছেন। অনেকে খায় না আজকাল ঠিকই, তবে ফ্লোভিনের মনে হয় তাদের রক্তে মিশে আছে তিমি আর ডলফিনের মাংসের নেশা। হেকুন বলেছিল, ওটা নাকি আসলে হিংস্রতা আর রক্তের নেশা। ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে শিকারের উন্মাদনাকে প্রশ্রয় দেওয়া। রক্তের লোভের থেকে বড়ো লোভ সম্ভবত আর নেই।

বোধ হয় সামান্য ঝিমিয়ে পড়েছিল ফ্লোভিন, হাতের পাইপটা ঠক করে নীচে পড়তেই চমকে জেগে উঠল। আড়মোড়া ভেঙে অলস চোখে সমুদ্রের দিকে তাকাতেই চোখ গোল গোল হয়ে ওঠে তার। অভিজ্ঞতা তার কম নয়, ভুল তো হবে না। ওই তো সূর্যের আলো পড়ে ঝিকিয়ে উঠছে, মাঝে মাঝে ফোয়ারার মতো ছিটকে উঠছে জল, সাদা ফেনা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। দূর হলেও এসব লক্ষণ তার চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয়। দেখতে দেখতে লোম খাড়া হয়ে ওঠে তার, কেমন শীত শীত করতে থাকে। এ যে বিশাল দল, এখুনি খবর দিতে হবে সবাইকে। গ্রিনডাড্র্যাপের দিনক্ষণ যেহেতু আগে থাকতে ঠিক করা সম্ভব নয়, তাই বিশেষ পরিস্থিতিতে অফিস-টফিসগুলোতে তাৎক্ষণিক ছুটি ঘোষণা করার রীতি আছে, স্কুল-কলেজও বাদ যায় না। এই প্রাচীন পরম্পরায় যাতে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে, তাই এই ব্যবস্থা।

রেষারেষি থাকলেও ফ্লোভিনের প্রথমেই মনে পড়ল ইসাকুরের কথা। খাঁড়ির মুখে ওই তো ওর কটকটে কমলা রঙের মাছ ধরার নৌকোটা বাঁধা আছে দেখা যাচ্ছে, তার মানে ইসাকুরও আজ বেরোয়নি সমুদ্রে। গ্রামের ভিতরে ছোটো একটা কফির দোকান আছে ওদের, ওসলা চালায়। মাছ ধরতে না গেলে ইসাকুর ওখানেই থাকবে। চোখের উপর হাত রেখে আরও একবার সমুদ্রের দিকে ভালো করে তাকিয়ে নেয় ফ্লোভিন, তারপর পড়িমরি করে গ্রামের দিকে ছুটতে থাকে।

***

ঘচাং করে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল সুকুমারদা। তারপর দাঁড়িয়েই থাকল দুই মিনিট। রাংতা নাকের সামনে প্রফেসর শঙ্কু সমগ্র খুলে বসেছিল, কিছুই লক্ষ করেনি। বইটা আসলে জিষ্ণুর, আজ অঙ্কের কোচিং ক্লাসে ফেরত দিয়ে দিতে হবে, কিন্তু এখনও চার-পাঁচটা পাতা বাকি। কোচিংয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে শেষ হয়ে যাবে অবশ্য। উর্মিদের বাড়ির গাড়িতে রাংতা আর উর্মি একসঙ্গে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে অর্ণব-স্যারের কোচিংয়ে যায়। এই বছর ক্লাস এইটে ওঠার পর থেকে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ি, অসুবিধার কিছুই নেই।

অন্যদিন দুজনেরই মুখে খই ফোটে, আজ উর্মির অনর্গল বকবকানির উত্তরে রাংতা হুঁ হাঁ ছাড়া কিছুই বলেনি, মনটা বইয়ের দিকে পড়ে ছিল। এখন গাড়ি থামাতে চশমাটা নাকের উপর ঠেলে তুলে জিজ্ঞেস করল, “সুকুমারদা থামলে যে? সামনে তো পুরো ফাঁকা।”

স্যারের বাড়ির গলির মুখটায় গাড়িটা দাঁড়িয়ে।

“আরে বেড়াল রাস্তা কাটল দেখলি না?” উর্মি কলকল করে ওঠে।

“ওহ্।” রাংতা আবার বইয়ে নাক গোঁজে।

উর্মি পাশ থেকে বিড়বিড় করে, “বেড়ালটা আবার কালো ছিল। আজ অঙ্ক পরীক্ষাটা গেল।”

“এই, বাজে কথা বলবি না একদম। অমনি কালো বেড়ালের দোষ!” কটমট করে রাংতা উর্মির দিকে তাকায়।

“দিম্মা যে বলে।” চ্যাঁ করে ওঠে উর্মি, একে অঙ্ক পরীক্ষার চিন্তা।

“শোন।” গম্ভীরভাবে বইটা বন্ধ করে কোলের উপর রাখে রাংতা। উর্মি মনে মনে বলে, এই রে। রাংতার এই ভঙ্গিটা তার খুব চেনা। এখুনি লেকচার শুরু হল বলে।

“ধর, এখুনি এই যে-বেড়ালটা—কালো, ধূসর, সাদা, যাই হোক না কেন, রাস্তা কাটল,” রাংতার গলায় হগওয়ার্টসের প্রফেসর ম্যাকগনাগালের গাম্ভীর্য।—“এমন তো হতেই পারে যে, আসলে সামনে কোনও একটা বিপদ ছিল, ও ঠিক সময়ে রাস্তা কেটে দাঁড় না করিয়ে দিলে হয়তো অ্যাকসিডেন্ট হতো একটা। ও আসলে আনলাকি নয়, ভীষণভাবে লাকি। বুঝলি?”

মস্ত হাঁ করে তাকিয়ে থাকে উর্মি। রাংতা বরাবরই উদ্ভট সব আইডিয়ার ঠাকুমা। তার উপর ওর জন্তুজনোয়ার প্রীতির চোটে বন্ধুদের হাল খারাপ। রাস্তায় বেরোলেই পাড়ার সবক’টা কুকুর লেজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে আসে রাংতার দিকে। ভয়ে উর্মির হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়।

“হাঁ বন্ধ কর, বোলতা ঢুকে যাবে। স্যারের বাড়ি এসে গেছে, নাম।” রাংতা হালকা ঠেলা দেয় বন্ধুকে।

***

চকচক করছে ভিজে গা, রোদ পড়ে ঝিকিয়ে উঠছে। বাচ্চাগুলো একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বোধ হয়, সামনে একটু বিশ্রাম নিতে পারলে ভালো হয়। পেট সবার ভরতি, আরামে শান্তিতে সবারই আয়েস লাগছে যেন। এত বড়ো দল নিয়ে সাঁতরে চলার মজাই আলাদা। দলের বয়োজ্যেষ্ঠ ডলফিনটির হালকাভাবে কী যেন একটা মনে পড়তে চায়—এই এলাকায় কোনও বিপদ আছে, না কী যেন। একটা শঙ্কার বোধ হালকা মেঘের মতো তার স্মৃতির উপর দিয়ে ভেসে গেল, কিন্তু আরামে সেও যেন সজাগ থাকতে পারছে না আর।

দশ-বারোটা স্পিড-বোট আর জেট-স্কি সাদা ফেনার ঝড় তুলে তীব্র গতিতে এগিয়ে যায় ডলফিনদের বিশাল দলটার দিকে। উদ্দেশ্য, তাদের ছত্রভঙ্গ করে খাঁড়ির দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া। দলছাড়া না করতে পারলে কাজটা সহজ হয় না। একবার ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে আতঙ্কে দিশেহারা প্রাণীগুলোকে তাড়া করে ইচ্ছামতো দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। তাদের আসতে দেখেই ডলফিনের দলটা হয়তো সচেতন হয়েছিল, কিন্তু তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বোট আর জেট-স্কি ঘূর্ণি তুলে একেবারে মাঝখানে গিয়ে পড়ল। চারদিকে তাকিয়ে চোখ কপালে ওঠে ইসাকুরের। এ যে বিশাল দল! গ্রিনডাড্র্যাপের ইতিহাস আজ নতুন করে লেখা হবে নির্ঘাত।

মাঝখানে পড়েই সঙ্গে সঙ্গে স্পিড-বোটটা ঘুরিয়ে নেয় ইসাকুর। ও-পাশে ফ্লোভিনও ঠিক তাই করেছে। জেট-স্কির উপরে বসা পুত্র সেমালকে ইঙ্গিত করে ইসাকুর, যদিও তার প্রয়োজন ছিল না। এরপর কী হবে সবার জানা। ডলফিনের দলটা ছোটো ছোটো অংশে বিভক্ত হয়ে এক-একদিকে পালানোর চেষ্টা করবে। বুদ্ধু প্রাণীগুলো বোঝে না যে এতে মানুষের কাজটা আরও সহজই হয়ে যায়।

ডলফিনের যে-দলটা প্রথম বেরিয়ে এল, তাতে অনেকগুলো ছোটো ডলফিন আছে। তাহলে দলের বড়োগুলো নিশ্চয়ই ওদের মা। বাচ্চাগুলোকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে সাঁতরাতে লাগল তারা। কয়েক মুহূর্ত পর সেমালের জেট-স্কি নির্ভুল লক্ষ্যে তাদের খাঁড়ির দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকল। তীক্ষ্ণ শিসের মতো শব্দ ছড়িয়ে পড়ল সমুদ্র জুড়ে।

হাত কাঁপছিল হেকুনের। তার হাতে বিশাল একটা হুক ধরিয়ে দিয়ে চলে গেছে তার বাবা। ডলফিনের ব্লো হোল বা শ্বাসছিদ্রের ভিতর এই হুক ঢুকিয়ে তাদের আটকাতে হয়। তার পরের কাজটা সারার জন্য দু-ফলা ছুরি লাগানো ধাতব রডের হাতলটা আঁকড়ে তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ওসলা। উত্তেজনায় মুখ চকচক করছে তার।

চারপাশে একবার চোখ বোলায় হেকুন। রোজের চেনা মানুষগুলো যেন হঠাৎ পালটে গেছে। ওই তো ইয়োগভান, ওকে তো বেশ দয়ালু বলেই জানে হেকুন। এখন ছুরি হাতে কেমন দৈত্যের মতো দেখাচ্ছে। স্মেরা আবার ওর ছোটো বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে চলে এসেছে। সবার ভিতর কেমন একটা অপেক্ষা তৈরি হয়েছে টের পায় হেকুন। গা-টা কেমন শিরশির করতে থাকে ওর।

প্রায় দেড় ঘণ্টা হয়ে গেছে সমুদ্রে। একটা দলকেও এখনও খাঁড়িতে ঢোকানো যায়নি। মরিয়া হয়ে জলের ভিতর আছড়ে পড়ছে এদিক ওদিক, কিন্তু খাঁড়ির মুখে এসেই যেন বিপদ টের পেয়ে পিছলে চলে যাচ্ছে অন্য দিকে। ইসাকুর হঠাৎ স্পিড-বোট নিয়ে ছেলের পাশে চলে আসে, ইঙ্গিতে দেখায় দলের শাবকগুলোকে। দূর থেকে হাত নাড়ে ফ্লোভিনও। দলের বাকিরাও গোল করে ঘিরে ফেলে খাঁড়ির মুখটা। বিকট শব্দ করে সেমালের জেট-স্কি এগিয়ে যায় ছোটো ডলফিনগুলোর দিকে। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে প্রথম ভুলটা করে ফেলে ডলফিনের দল। খাঁড়ির অগভীর জলের দিকে এগিয়ে যায় প্রথমে খান পাঁচেক ছোটো ডলফিন। তিরবেগে জেট-স্কি আর ছানাদের মাঝে ভেসে ওঠে এক মা ডলফিন। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, তারপরেই দলের বাকিরাও ঢুকে পড়ে খাঁড়ির ভিতর। পাড় থেকে উল্লাসধ্বনি ওঠে। একবার ঢুকে গেলে আর সাঁতরে বেরিয়ে যেতে পারবে না কেউ। খাঁড়ির মুখে কয়েকটা স্পিড-বোটকে পাহারায় রেখে বাকিগুলো আবার সমুদ্রের দিকে রওনা দেয়। একটা দল ঢুকে গেলে বাকিদের এনে ফেলতে আর বিশেষ পরিশ্রম করতে হয় না। মাঝ-দুপুর হয়ে গেল প্রায়।

দিশাহারা হয়ে ইয়োসভা আর রুনেরকে খোঁজে হেকুন। তার দুই পাশ দিয়ে উৎকট উল্লাস করতে করতে ছুটে চলেছে তাদের গ্রামের প্রায় সমস্ত মানুষ। তাদের কারোর হাতে লম্বা হুক, কারোর দু-ফলা ছুরি লাগানো বর্শা। আর কিছুক্ষণের মধ্যে খাঁড়ির জলের রঙ পালটে যাবে। ধীরে ধীরে সেই গাঢ় লাল রঙ ছড়িয়ে পড়বে সমুদ্রে। খাঁড়ির পাড়ে সার দিয়ে শোওয়ানো থাকবে ডলফিনের মৃতদেহ, তাদের ঘাড়ের কাছটা ফালা করে কাটা। হেকুনের ভিতর থেকে একটা চিৎকার উঠে আসতে চায়। খাঁড়ির ভিতর আর জল দেখা যাচ্ছে না, এত ডলফিন। বাকিরা নামতে শুরু করে দিয়েছে খাঁড়ির জলে। হঠাৎ হেকুনের হাত ধরে টান মারে কেউ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবার গলা কানে আসে তার।—“বোকার মতো হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, চল!” ধমকে ওঠে ফ্লোভিন।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো খাঁড়ির দিকে এগিয়ে চলে হেকুন। সেখানে তখন মৃত্যুযজ্ঞ শুরু হয়ে গিয়েছে।

***

কোচিং থেকে ফিরে লেটার-বক্সে এয়ার-মেইলের লাল-নীল স্ট্রাইপের বর্ডার দেওয়া খামটা দেখতে পেয়ে মনটা নেচে উঠল রাংতার। ছোটকা কানাডা থেকে চিঠি পাঠিয়েছে নির্ঘাত। ইমেইল তো করেই ছোটকা, কিন্তু বিশেষ বিশেষ সময়ে এখনও হাতে চিঠি লেখে। কী যে ভালো লাগে এয়ার-মেইলে চিঠি পেতে! হাতে লেখা চিঠিগুলোতে ছোটকা যেন সামনে এসে দাঁড়ায় একদম। তাছাড়া স্ট্যাম্পগুলো উপরি লাভ।

“মা, ছোটকার চিঠি!” ভিতরে ঢুকে চিৎকার ছেড়ে দুদ্দাড় করে নিজের ঘরের দিকে ছোটে রাংতা।

মুখ টিপে হাসেন অবন্তী। রাংতার বাবার দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলেন, “জন্মদিন এসে গেল মেয়েটার, এখন কাকা-ভাইঝিতে ঘনঘন চিঠি চালাচালি হবে।”

***

দিন সাতেক হয়ে গেল এবার সমুদ্রে। সি শেপার্ডের মাঝারি আকারের জাহাজটার ডেকে দাঁড়িয়ে আকাশপাতাল ভাবছিলেন জীববিজ্ঞানী ডক্টর ওলসেন। তিনি ডেনমার্কের একটি কলেজে জীববিজ্ঞানের প্রফেসর, তাছাড়া ফাঁকা সময়ে সি শেপার্ডের হয়ে কাজ করেন। প্রথমটি পেশা, আর দ্বিতীয়টি নেশা। সি শেপার্ড সংস্থাটি সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে বেশ কিছু বছর ধরে। মাঝে-মাঝেই জাহাজে করে সমুদ্রে টহল দিয়ে বেড়াতে হয় তাদের স্বেচ্ছাসেবীদের। মূলত দানের উপর নির্ভর করে চললেও বেশ কয়েকটা জাহাজ আছে তাদের। এই জাহাজটা প্রায় নতুন, নাম পোসাইডন। উত্তর অ্যাটলান্টিকের এই অংশে এলেই মনটা বড়ো উন্মনা হয়ে যায় ডক্টর ওলসেনের। কত স্মৃতি জমে আছে এই সমুদ্রের অথৈ জলে, শুধু কি তিক্ত স্মৃতি সে-সব? শৈশবের স্বচ্ছ আনন্দের স্মৃতিও তো কম নেই। মাঝে মাঝে বড়ো শিকড়হীন লাগে নিজেকে। মধ্যবয়স পার করে আজও তিনি সম্পূর্ণ একা। অথচ একদিন সুন্দর একটা পরিবার ছিল তাঁর। প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলেমিশে হাসিখুশিভরা একটা জীবন ছিল। নিজের সংসার পাতার ইচ্ছা তাঁর হয়নি কখনও। আজ এই সমুদ্র আর সমুদ্রগর্ভে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণীই তাঁর সংসার, তাঁর একমাত্র পরিবার। না, ঠিক একমাত্র নয়, আরও একজন আছে তাঁর পরিবারে। তাঁর আদরের বিড়াল বার্থোলোমিউ। সমুদ্রে আসার সময় সি শেপার্ডেরই আর এক কর্মীর কাছে রেখে এসেছেন তাকে।

সমুদ্রের দিকে আরও একবার সতর্ক দৃষ্টি ফেরান ডক্টর ওলসেন। যতদূর নজর চলে, অপার শান্তি। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলে আবার কেবিনে ঢুকে যান ডক্টর রুস্কভা ওলসেন।

***

হেকুনের বোধ-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। কলের পুতুলের মতো খাঁড়ির হাঁটুজলে নেমে দাঁড়ায় সে। চারদিকে ঘন লাল জল, তীক্ষ্ণ শিসের শব্দে কানে তালা ধরে যাচ্ছে। সেই রক্তবর্ণ জলের ভিতর এখানে ওখানে ভেসে উঠছে গাছের গুঁড়ির মতো একের পর এক মৃতদেহ। উন্মাদের মতো মাথার উপর অস্ত্র তুলে লাফাচ্ছে যারা, তাদের কি হেকুন চিনত কোনোদিন? ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের গল্পকথায় ড্রেগুর নামে নরমাংসভোজী যে পিশাচের কথা শোনা যায়, এরা কি আসলে সেই ড্রেগুর? পিছন থেকে একটা ধাক্কা খেয়ে খানিকটা সংবিৎ ফেরে হেকুনের। বাবা ডাকছে তাকে। হাতের দুই ফলা ছুরিটা তুলে নীচের দিকে দেখিয়ে হেকুনের হাতের হুকের দিকে ইঙ্গিত করে কী যেন বলছে। চোখে নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো দৃষ্টি। হেকুন নীচের দিকে তাকায়। ছোটো একটা ডলফিন, প্রায় শাবক বললেই চলে। নিষ্পাপ দুটো চোখ মেলে স্থিরদৃষ্টিতে তাকেই দেখছে। হেকুনের কানের কাছে মুখ এনে আবার চিৎকার করে ওঠে ফ্লোভিন, “ঢোকা! শিগগির হুকটা ঢোকা ওর শ্বাসছিদ্রে। এটা বেশ ছোটো, ইচ্ছা করলে খাঁড়ির জল বেয়ে পালাতে পারবে।”

আবার ডলফিনটার দিকে তাকায় হেকুন। ওর দৃষ্টি যেন পুড়িয়ে দিচ্ছে হেকুনের চোখ দুটো। হুকটা খাঁড়ির দিকে ছুড়ে দিয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে ওই রক্ত লাল জলের ভিতর ধীরে ধীরে বসে পড়ে হেকুন। তাকে ঘিরে ভাসতে থাকে অগুনতি মৃতদেহ। ফ্লোভিন নিজের ছেলের এহেন কীর্তিতে সামান্য চমকে গিয়েছিল। খেয়াল হতেই ঘুরে দাঁড়াল ছুরি বাগিয়ে। কিন্তু কোথায় সেই ডলফিন? জল এত লাল হয়ে গেছে যে স্পষ্ট করে দেখাও যাচ্ছে না। ভেবেছিল ছোটো ডলফিন দিয়েই ছেলের গ্রিনডাড্র্যাপ শুরু হবে, কিন্তু তা বোধ হয় হবার নয়। যাক গে, কেউ না কেউ ওটাকে এখুনি মারবে নিশ্চয়ই। এখন এই ক্যাবলা ছেলেটাকে নিয়ে কী করবে ফ্লোভিন সেটাই ভাবার বিষয়।

***

“ডক্টর ওলসেন, শিগগির আসুন, সমুদ্রের জলে লাল একটা ধারা মিশছে। সামথিং ইজ রং।”

ছুটতে ছুটতে কেবিনে ঢোকে অ্যালেক্স। নেদারল্যান্ডসের ছেলে, সবে ইউনিভার্সিটি শেষ করেছে। চাকরি খোঁজার পাশাপাশি সি শেপার্ডের হয়েও কাজ করে। ভারি ভালো ছেলে, কিন্তু মুখটা এখন উদ্বেগে লাল।

“লাল ধারা!” মুহূর্তে লাফিয়ে ওঠেন ডক্টর ওলসেন। মুখটা ফ্যাকাশে।—“আমরা এখন ঠিক কোথায়?”

শেষ শব্দগুলো বলার সময়ে গলা কেঁপে যায় তাঁর। জিজ্ঞেস করার দরকার নেই, তিনি বোধ হয় জানেন তাঁরা এখন কোথায়।

“আমরা ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের কিছুটা দূরে।” অ্যালেক্স কিছুটা অবাক হয়।

“উফ্‌!” দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়েন ডক্টর। কোনোক্রমে বলেন, “ফিরে চলো, আর ওদিকে গিয়ে লাভ নেই।”

“কেন ডক্টর?”

“গ্রিনডাড্র্যাপ।” কোনোক্রমে শব্দটা উচ্চারণ করেন ডক্টর রুস্কভা ওলসেন। তাঁর গলায় তীব্র বিতৃষ্ণা ঝরে পড়ে।

***

স্কালাফিওরদর গ্রামে আজ রীতিমতো উৎসবের আমেজ। খাঁড়ির পাড়ে এখনও স্তূপ হয়ে পড়ে আছে ডলফিনের মাংস। এমনিতেই গ্রিনডাড্র্যাপে যারা অংশগ্রহণ করে তারা সবাই সমান ভাগ পায় শিকারের। আজ তো মনে হচ্ছে আশেপাশের গ্রামেও বিলোতে যেতে হবে। ধৈর্য ধরে গুনে দেখেছে ইসাকুর, ১৪২৮টা ডলফিন। এত বড়ো মাপের শিকার গ্রিনডাড্র্যাপের ইতিহাসে বোধ হয় নেই। তিমি আর ডলফিন মিলিয়ে হাজার খানেক করে প্রতি গ্রিনডাড্র্যাপে শিকার করা হয় বটে, কিন্তু কেবল এতগুলো ডলফিন একসঙ্গে শিকার করা কল্পনারও বাইরে। স্বয়ং মেয়রের আগমন ঘটেছিল সন্ধ্যার দিকে। মুখে হাসি থাকলেও কপালে ভাঁজ পড়েছিল মেয়রের। গলাখাঁকারি দিয়ে বলেছিলেন, “তোমরা আজ ইতিহাস সৃষ্টি করেছ ঠিকই, কিন্তু বাইরের পৃথিবী আমাদের এই ঐতিহ্যকে খুব ভালো চোখে দেখে না। এই খবর ছড়ালে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হতে পারে। সি শেপার্ড এদিকে নিয়মিত ঘোরাঘুরি করে তা তো তোমরা জানোই। ওই জাতীয় আরও কিছু সংস্থা মিলে শিকার বন্ধ করার জন্য চাপ তৈরি করতে পারে আমাদের উপর। হয়তো একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গেছে।”

সম্ভবত মেয়রের বক্তব্য কেউ মন দিয়ে শুনছিল না, তাই খুব হাততালি পড়ল।

প্লাস্টিকের বড়ো বড়ো বালতিতে নিজের ভাগের মাংস ভরে ছেলেকে খুঁজছিল ফ্লোভিন। এখুনি গিয়ে ফ্রিজারে তুলতে হবে এগুলো। ইসাকুর সপরিবারে হইহই করতে করতে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছে খানিক আগে। খাঁড়ির দিক থেকে বিশ্রী একটা গন্ধ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে সারা গ্রাম জুড়ে।

সবাই বাড়ি চলে যাওয়ার পর সন্ধের অন্ধকারে উঠে দাঁড়ায় হেকুন। এতক্ষণ সবার নজর এড়িয়ে একরকম লুকিয়েই ছিল সে। এখন প্রায় টলতে টলতে বাড়ির দিকে রওনা দিল। জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। খাঁড়ির জল তখনও টকটকে লাল।

***

নীলকান্ত মণির মতো জলে ঘন লাল ধারা এসে মিশছে। ডক্টর ওলসেন পাথরের মূর্তি হয়ে ডেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। অ্যালেক্স আর গ্রেসিও স্তব্ধ হয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে। এই জাহাজে সবসুদ্ধ আছে নয়জন। চারজন জাহাজের ক্রু, বাকিরা কেউ বিজ্ঞানী, কেউ গবেষক ছাত্রছাত্রী, কেউ স্রেফ স্বেচ্ছাসেবী। একজন পশুচিকিৎসকও আছেন, তিনি জন্মসূত্রে ভারতীয়।

“জলে ওটা কী নড়ছে?” এতক্ষণের স্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ গ্রেসি লাফিয়ে ওঠে। আঙুল দিয়ে দেখায় লাল স্রোতের দিকে।

চকিতে গলায় ঝুলতে থাকা শক্তিশালী দূরবীনটা চোখে লাগান ডক্টর ওলসেন। পরমুহূর্তে তীব্র গলায় চিৎকার করে ওঠেন—“বোট নামাও, শিগগির!”

সুলা স্কিয়ারের সমুদ্রতটে উদ্বিগ্ন মুখে বসে ছিলেন ডক্টর ওলসেন। দৃষ্টি সামনের ঘেরা জায়গায়। তলায় জাল দেওয়া ঘেরা জায়গাটাতে মহানন্দে সাঁতরে বেড়াচ্ছে ছোটো একটা ডলফিন। হাবভাব দেখে বোঝার উপায় নেই কী ঝড় গেছে তার উপর দিয়ে।

স্কটল্যান্ডের এই ক্ষুদ্র দ্বীপে কোনও মানুষ বাস করে না। সম্প্রতি এখানে সি শেপার্ড ছোটো একটা পুনর্বাসন কেন্দ্র বানাতে পেরেছে, তাও অনেক লড়াইয়ের পর। আশেপাশের এলাকা থেকে উদ্ধার করা সামুদ্রিক প্রাণীদের এখানে রেখে চিকিৎসা করা হচ্ছে ইদানীং। তারপর অবস্থা বুঝে আবার সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া বা সংরক্ষিত অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া। মানুষের সংস্পর্শে যত কম আসে ততই এদের পক্ষে মঙ্গল। হয়তো আবার শিকারিদের হাতে ধরা পড়বে। সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেললে তবু একরকম, বন্দি করে অ্যামিউজমেন্ট পার্কে নিয়ে গেলে তার থেকে খারাপ আর কিছু হতে পারে না। যতসব উৎকট অস্বাভাবিক আচরণের ট্রেনিং নিয়ে বাকি জীবন মনোরঞ্জন করো মানুষের। ট্রেনিংয়ের নামে তিল তিল করে কেড়ে নেওয়া হবে শিকার করার ক্ষমতা, প্রকৃতির কোলে বেঁচে থাকার সমস্ত গুণ। এই পার্কগুলো থেকে উদ্ধার করা ডলফিনদের নিয়ে কী যে মুশকিল হয় তখন। ডক্টর ওলসেনের মনে পড়ে কিছু বছর আগে দেখা একটা ডলফিনের কথা। খেলা দেখিয়ে হাততালি পেয়ে উৎসাহী দর্শকের সঙ্গে সেলফি তুলে যখন সে আবার তার সি পেন বা খোঁয়াড়ে ফিরে এল, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ধাতব বেড়ার গায়ে তাকে মাথা ঠুকতে দেখেছিলেন ডক্টর রুস্কভা ওলসেন। রাতে ঘুমাতে পারেননি সেদিন। কিন্তু এইসব ডলফিনদের কোনোভাবে উদ্ধার করে ছেড়ে দিলে দুটো দিনও টিকতে পারবে না। এই ডলফিনটা অবশ্য ছোটো, মানুষের ছোঁয়া কলুষিত করতে পারেনি এখনও তাকে। আবার দিন চারেক আগের সেই দৃশ্য মনে করে শিউরে ওঠেন তিনি। রক্তের স্রোতের ভিতর ভাসতে দেখে প্রথমে ভেবেছিলেন ও আহত, কিন্তু তোলার পর দেখা গেল দেহে কোনও আঘাত নেই। প্রাথমিক চেক-আপের পর ছেড়ে দেওয়া যেত, কিন্তু ওর তো কোনও দল নেই, শিকার করে খেতে পারবে কি না সেটা বোঝা দরকার। ঘেরা জায়গাটাতে মাছ ছেড়ে সেটাই একাগ্র মনে লক্ষ করছেন তিনি।

আপন মনে সাঁতার কাটতে কাটতে হঠাৎ হালকা ডিগবাজি খেয়ে জলের তলায় ঢুকে যায় সে। মুখে একটা মাছ নিয়ে উঠে আসতে লাগে তিরিশ সেকেন্ড। আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠেন ডক্টর ওলসেন।

“আপনার পোষ্যটিকে তাহলে বাড়ি ফেরানো যাবে, কী বলেন?” পশুচিকিৎসক ডক্টর ভার্গব কখন এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়াল করেননি রুস্কভা।

“ঠিক তাই। ও বাড়ি ফিরলে আমিও ফিরব।” বার্থোলোমিউয়ের জন্য মনটা কেমন করছে তাঁর।

“তাহলে ট্যাগিং করে দিই কাল, রিলিজ প্রসেস শুরু করতে বলি? ডক্টর ভার্গব হাতের কাগজগুলো দোলাতে দোলাতে বলেন। কাগজের বাঁ কোণ থেকে উঁকি মারছে কতগুলো সংখ্যা—ডি.এফ-২৩৮, বাকিটা আর পড়া যাচ্ছে না। ওটা ডলফিনটাকে সনাক্ত করার নম্বর।

ডক্টর ভার্গব পাড়ে খাটানো তাঁবুর দিকে হাঁটা লাগিয়েছিলেন, রুস্কভার ডাকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ফিরে তাকালেন।

“ডক্টর, শুধু আইডি নয়, একটা নামও যদি সেই সঙ্গে লিখে নেন।”

হেসে ফেলেন ডক্টর ভার্গব। দলের সবাই জানে উদ্ধার করা প্রাণীদের নামকরণ করতে ভালোবাসেন ডক্টর ওলসেন।

“নিশ্চয়ই। কী নাম দিয়েছেন ওর?”

মুখটা ঝলমল করে ওঠে মধ্যবয়স্ক জীববিজ্ঞানীর। ষড়যন্ত্র করার ভঙ্গিতে বলেন, “ব্লু।”

অ্যালেক্স আর গ্রেসিকে বোধ হয় চিনে গিয়েছে ব্লু। গায়ে হাত দিলেও কিছু বলে না। পিঠের উপরের তিনকোনা পাখনাটা ধরে আছে অ্যালেক্স। পাখনাটা যেখানে পিঠের সঙ্গে মিশেছে, তার সামান্য উপরে ছোট্ট একটা ট্রান্সমিটার লাগাচ্ছে গ্রেসি। হয়তো সামান্য ইনজেকশন ফোটানোর মতো লাগল, বিশেষ আপত্তি করল না ব্লু। এই ট্রান্সমিটারকে বলে স্যাটেলাইট ট্যাগ। যখনই সাঁতরাতে সাঁতরাতে ঘাই দিয়ে উপরে উঠে আসবে ব্লু, এই ট্রান্সমিটার কয়েকটি প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠাবে স্যাটেলাইটে। সে-সব তথ্য থেকে ব্লু বর্তমানে কোথায় আছে, কেমন গতিতে সাঁতরাচ্ছে, সেখানে জলের তাপমাত্রা কত—এই সমস্ত জানা যাবে। তবে সব উদ্ধার করা প্রাণীদের যে ট্যাগ করা হয় এমনটা নয়। ব্লু ছোটো বয়সে দলছুট বলেই ওর উপর খেয়াল রাখাটা দরকার। ট্যাগগুলোর দাম আছে বেশ।

হঠাৎ মনটা কেমন খারাপ হয়ে যায় ডক্টর ওলসেনের। এবার ব্লু হারিয়ে যাবে অতল জলে; কয়েক মাস ধরে ও কোন দিকে যাচ্ছে খেয়াল রাখা হবে; তারপর ব্যাটারি শেষ হয়ে ট্যাগ অকেজো হয়ে যাবে এক সময়। আর খুঁজে পাওয়া যাবে না ওকে। এই ট্যাগগুলো সাত-আট মাস থেকে বড়োজোর বছর খানেক কার্যকরী থাকে। কখনও তার আগেই খুলে পড়ে যায়। কাল সকালে সূর্য ওঠার অল্প সময় পরেই ব্লুকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে তার নিজের এলাকায়। যতদিন না কোনও দল খুঁজে পায়, একা একা লড়াই করে বাঁচতে হবে ওকে।

“ট্যাগের দামটা যদি কোনোভাবে একটু কমানো যেত।” টিম লিডার উইলিয়ামও এসে দাঁড়িয়েছে তাদের পাশে, ট্যাগ লাগানো দেখছে। বিরাট চেহারার জন্য ওকে সবাই বিগ বিলি বলে ডাকে। একবার একদল তিমি শিকারিদের জাহাজের প্রপেলার জ্যাম করে দিয়ে আইনি জটিলতায় ফেঁসে গিয়েছিল সে। অনেক সমস্যার পর সে-সব ঝামেলা মিটলে বিগ বিলি নির্বিবাদে বলেছিল, প্রয়োজন পড়লে নাকি আবার ওরকম করতে ওর আটকাবে না।

“ফান্ড বাড়ানোর একটা মতলব এসেছে মাথায়, বলব পরে।” ডক্টর ওলসেন অন্যমনস্কভাবে বললেন। একটা সাংঘাতিক আইডিয়া তাঁর মনের মধ্যে খেলে বেড়াচ্ছে ক’দিন ধরে।

***

খাঁড়ির জল আবার পরিষ্কার হয়ে গেছে, কিছুদিন আগের মৃত্যু তাণ্ডবের চিহ্নমাত্র নেই। হেকুন হাঁটুর উপর থুতনি রেখে বসে আছে সেইদিকে তাকিয়ে। তার শরীর এখনও খুব দুর্বল। সেই ঘটনার পরদিন থেকে মারাত্মক জ্বরে পড়েছিল সে। সুস্থ থাকলে কী হত বলা যায় না, তবে অত জ্বরের মধ্যে ছেলেটাকে কিছু আর বলতে পারেনি ফ্লোভিন। জলের দিকে তাকালেই সেই ছোটো ডলফিনটার কথা মনে পড়ছে হেকুনের। তারপর থেকে কয়েকটা দিন উৎকট গন্ধে তাদের স্কালাফিওরদর গ্রাম যেন ছেয়ে গিয়েছিল। খাবার মুখে তুলতে পারেনি হেকুন।

“কী রে ভিতুর ডিম, খাঁড়ির পাড়ে বসে দিবাস্বপ্ন দেখছিস নাকি?” সেমালের ভাঙা গলা হঠাৎ ভেসে আসে পিছন থেকে। সঙ্গে আরও তিন-চারটে গলার সমবেত হাসি। সেমালের দলবলকে চিরকাল এড়িয়ে চলে হেকুন। সেদিনের ঘটনার জের এত সহজে কাটবে না বোঝা উচিত ছিল। সামনে শিকার পেয়ে এইভাবে ছেড়ে দেওয়া ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের ইতিহাসে বোধ হয় এই প্রথম।

“জানিস না, এবার থেকে ট্রন্ডুরের পরেই ওর নাম বলবে সবাই।” আর একটা চাঁছাছোলা গলা ভেসে আসে।

হেকুনের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে হাসতে থাকে ওরা সবাই। ট্রন্ডুর এই দ্বীপপুঞ্জে প্রাচীনকালে বাস করা এক বীর ভাইকিং। তার নানা কাহিনি এখন কিংবদন্তির রূপ নিয়েছে।

হেকুন বুঝতে পারে তার কান গরম হয়ে উঠছে, মাথার মধ্যে তীব্র একটা যন্ত্রণা।

“অ্যাই ওকে ছাড়।” ইয়োসভার গলা ভেসে আসে এবার। ইয়োসভা একে ওদের থেকে সামান্য বড়ো, তার উপর ভীষণ গম্ভীর।

রুনের ছুটে এসে হেকুনের পাশে বসে পড়ে। হাসতে হাসতে গ্রামের দিকে ফিরে যায় সেমাল ও তার দলবল।

***

ভোর হয়েছে সবেমাত্র। ক্যানভাসের মস্ত বড়ো স্লিংয়ের ভিতর পোরা হয়েছে ব্লুকে। জাহাজে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আয়ারল্যান্ডের দিকে। এই হোয়াইট সাইডেড ডলফিনরা উত্তর অ্যাটলান্টিকের বাসিন্দা। তাই অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। ফ্যারো দ্বীপ থেকে দূরত্ব বজায় রাখাটাই আসল উদ্দেশ্য।

ক্যানভাসের স্লিং ধীরে ধীরে নামানো হয় মহাসাগরের জলে। ঢেউয়ের ছোঁয়া পেয়ে দুলে ওঠে সেটা। স্লিংটা খুলে দিয়ে অপেক্ষা করে ওরা ক’জন। ডক্টর ওলসেনের মনে হয় ব্লু যেন একবার তাকাল তাঁর দিকে। এক মিনিট, দুই মিনিট—ঠিক তিন মিনিটের মাথায় ডিগবাজি খেয়ে জলে গিয়ে পড়ল ব্লু। তারপর জল ছিটিয়ে অদৃশ্য হল সমুদ্রের তলায়। হঠাৎ বুকের ভিতরটা কেমন ঠান্ডা হয়ে আসে ডক্টর ওলসেনের। কতই-বা বয়স হবে ওর। ছোটো ছোটো মাছ ধরে খেতে শিখলেও বছর খানেকও হয়তো নয়। অনেক ডলফিন শাবক তিন বছর পর্যন্তও মায়ের সঙ্গে ঘোরে। ব্লু বাঁচতে পারবে কি না তিনি জানেন না। ছাড়াটা কি ঠিক হল? না-হলে কোনও অ্যামিউজমেন্ট পার্কে—নাহ্, সে-জীবনের থেকে বরং এই ভালো।

“ও আবার ফ্যারোর দিকে চলে যাবে না তো?” গ্রেসির উদ্বিগ্ন স্বরে সংবিৎ ফেরে রুস্কভা ওলসেনের। নিজের চিন্তায় হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

“একা একা পারবে না। গেলেও দল না হলে শিকারিদের পাল্লায় পড়বে না।”

ছোটবেলায় দেখা গ্রিনডাড্র্যাপের দৃশ্য হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে ডক্টর ওলসেনের। মাথা ঝাঁকিয়ে যেন দৃশ্যটাকে সরাতে চাইলেন তিনি। তারপর অসীম অনন্ত মহাসাগরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “ভালো থাকিস ব্লু।”

***

“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!” ফোনে রীতিমতো গান গেয়ে ওঠে উর্মি। কাকভোরে রাংতার ঘুম ভাঙিয়েছে সে।

ফোনটা রেখে হাসিমুখে আড়মোড়া ভাঙে রাংতা, মনে বেজায় আনন্দ। মা-বাবা এখনও ঘুম থেকে ওঠেননি, কাল রাত বারোটার সময় কেক-টেক কেটে শুতে শুতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। ঘুমের রেশটা কাটতেই রাংতার মনে পড়ে যায় ছোটকার গিফটটার কথা। কাল বিকেলে এসেছে সুন্দরভাবে মোড়া ছোট্ট একটা বাক্স, সঙ্গে একটা কার্ড। জন্মদিনের শুভেচ্ছার সঙ্গে কার্ডে রয়েছে আজ সকালের আগে বাক্সটা না খোলার নির্দেশ, যেমন প্রত্যেক বছর থাকে।

সোনালি চকচকে কাগজে মোড়া বাক্সটা হাতে নিয়ে বিছানায় এসে বসে রাংতা। ছোটকার পাঠানো বাক্সগুলো সাধারণত বেশ বড়োসড়ো হয়, এমন ছোটো বাক্সে কী পাঠিয়েছে কে জানে।

বাক্সটা খুলতেই বেরিয়ে এল উজ্জ্বল রঙের কিছু কাগজপত্র আর আরও ছোটো একটা বাক্স। কাগজগুলোর দিকে এক ঝলক তাকিয়ে রাংতার মনে হল সেগুলোর উপর কিছুর নির্দেশ লেখা আছে। ছোট্ট চৌকো বাক্সটা এবার খুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল রাংতা। এটা আবার কী বস্তু! বড়ো বড়ো নীলচে পুঁতি দিয়ে গাঁথা একটা হাতে পরার গহনা। পুঁতিগুলো দেখলে কেমন যেন সমুদ্রের কথা মনে পড়ে। ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট ডলফিনের মূর্তি, যেন এইমাত্র জল থেকে লাফিয়ে উঠল সে। খামোখা একটা হাতের গহনা ছোটকা নিশ্চয়ই পাঠাবে না, কী ব্যাপার বুঝতে এবার কাগজপত্রে মন দিল রাংতা। প্রথম কাগজটাতে একটা ডলফিনের ছবি, তলায় লেখা আছে, ওকে নাকি রেসকিউ করা হয়েছিল, ওর নাম ব্লু। ছবির তলায় একটা কিউ.আর কোড, পাশে লেখা ওটা স্ক্যান করলে নাকি ব্লুকে ম্যাপে ট্র্যাক করা যাবে। রাংতার চুল খাড়া হয়ে উঠল। ম্যাপে ট্র্যাক করা যাবে মানেটা কী? ব্লু একটা সত্যিকার ডলফিন আর ও এখন কোথায় সাঁতরে বেড়াচ্ছে রাংতা সেটা এখানে বসে দেখতে পাবে? বাবাকে মোবাইল ফোনে কিউ.আর কোড স্ক্যান করতে দেখেছে রাংতা, কিন্তু নিজে কখনও করেনি। রাংতার কোনো-কোনো বন্ধুর নিজের মোবাইল ফোন থাকলেও ওর নেই। মা বলেছেন, ক্লাস নাইনের আগে কখনোই নয়। কিন্তু ও নিজে নিজে স্ক্যান করতে পারবে কি? দেখাই যাক না। এক ছুটে বাবার কাজের টেবিল থেকে ফোন নিয়ে এল রাংতা। পাসওয়ার্ড ও জানে, নিজের জন্ম তারিখ।

স্ক্যান আইকনটার উপরে ট্যাপ করে কিউ.আর কোডটার সামনে ধরল রাংতা। বুকটা দুরুদুরু করছে এবার, হাতের তালু ঘেমে উঠেছে—কিছু হবে কি আদৌ?

আস্তে আস্তে স্ক্রিনে উপর ফুটে উঠল একটা ম্যাপ, নীল সমুদ্রের পাশে সবুজ হলুদ-খয়েরিতে কোন একটা দেশ। কী দেশ এটা? আংশিকভাবে দেখা যাচ্ছে, তাই রাংতা ঠিক বুঝতে পারছে না এটা পৃথিবীর কোন জায়গা। এবার সমুদ্রের উপর সবজেটে গোল গোল ছোটো ছোটো দাগ ফুটে উঠছে পাশাপাশি। কী ওগুলো? খানিকটা এগিয়ে এবার গোল দাগগুলো থেমে গেল, পাশে ফুটে উঠল দিন দু-এক আগের তারিখ। রাংতা উপুড় হয়ে পড়ল বাকি কাগজপত্রের উপর।

***

“বলছিস কী, তুই একটা সত্যিকার ডলফিন কোথায় যাচ্ছে ম্যাপে দেখতে পাচ্ছিস?” উর্মির চোখ দুটো প্রায় কপালে উঠে পড়ে।

“নিজের চোখেই দেখ।” বাবার মোবাইলটা সকাল থেকে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছে রাংতা। রবিবার হওয়াতে বাবা আপত্তি করেননি, শুধু মাঝে মাঝে ফোন এলে দিয়ে আসতে হচ্ছে।—“আমি সকালে যখন দেখলাম তখন এইখানটায় ছিল। এই খানিকক্ষণ আগে আবার রিফ্রেশ করেছে।” আঙুল দিয়ে ম্যাপটার একটা বিশেষ জায়গার উপর গোল দাগগুলো দেখায় রাংতা।

“এতক্ষণ পরপর আপডেট করছে কেন রে, প্রায় দিন দুই পরে করল তাহলে?” প্রায় আধঘণ্টা ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে উর্মি।

“লিখছে, দুটো কারণে এরকম হয়। স্যাটেলাইট ট্যাগ লাগানো আছে ওর তিনকোনা পাখনায়। যখন নিশ্বাস নিতে বা অন্য কোনও কারণে জলের উপরে আসে ব্লু, পাখনাটা জলের উপরে থাকলে তবেই তথ্য পাঠাতে পারে। হয়তো নিশ্বাস নেওয়ার জন্য ব্লো-হোলটা উপরে তুলে রইল কেবল। আর একটা বাজে কারণ আছে। শিকারিদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ঘন ঘন আপডেট দেয় না।”

চমকে ওঠে উর্মি। সত্যি তো, এই বিপদের কথাটা ভেবে দেখেনি ও।

চকোলেট কেকের বিশাল একটা টুকরো, চিকেন ফ্রাইড রাইস আর চিলি চিকেন খেয়ে যখন বাড়ি ফিরল উর্মি, তখনও ব্লু ম্যাপে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। আসলে নিশ্চয়ই ও আরও বেশ খানিকটা চলে গেছে। ম্যাপটা তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে বড়ো করলে সমুদ্রের নামটা দেখায়, উত্তর অ্যাটলান্টিক মহাসাগর। রাংতার ব্লু ডলফিন আইসল্যান্ডের কাছাকাছি ঘুরছে।

ঘুমিয়ে পড়েছে রাংতা। হাতে সমুদ্ররঙা ব্রেসলেট, মাথার পাশে বাবার মোবাইল। ছোটকার সঙ্গে ফোনে অনেকক্ষণ কথা বলেছে সন্ধেবেলা। সঙ্গে আসা কাগজে একটা ইমেইল অ্যাড্রেস আছে, সেটা নাকি এক জীববিজ্ঞানীর। সি শেপার্ড নামে এক সংস্থার হয়ে তিনি কাজ করেন, ব্লুকে তিনিই কী একটা যেন বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। তাছাড়া এই ব্রেসলেট বানিয়ে বিক্রি করার বুদ্ধিটা নাকি ওঁরই। বিক্রির লাভের অংশ সি শেপার্ডের কাজেই লাগানো হয়। রাংতার আরও কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে ওঁকে নাকি মেইলও করা যায়। শুনে তো রাংতা অবাক।

স্বপ্নের মধ্যে ঢেউয়ে ঢেউয়ে রাংতা ভেসে চলে কোন দূরদেশের পাশ দিয়ে। তাকে ঘিরে সাঁতার কাটে এক নীলচে ডলফিন। কখনও জল ছিটিয়ে তার মাথার উপর দিয়ে ডিগবাজি খায়। ঘুমের মধ্যে যেন জলের ঝাপটা এসে লাগে রাংতার দুই গালে। ওর পাখনায় লাগানো ট্যাগ খুব বেশিদিন কাজ করবে না আর। বড়োজোর এক বছর টিকে থাকে এইগুলো। তার মধ্যে প্রায় ছয় মাস তো পেরোতেই চলল। ব্যাটারি শেষ হওয়ার আগে খুলেও পড়ে যেতে পারে। মা রাংতার হাত থেকে মোবাইলটা সরিয়ে নিতে নিতে শুনতে পেলেন, তাঁর কন্যা ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে কীসব বলছে। ভালো করে বুঝতে না পারলেও ব্লু শব্দটা তাঁর কান এড়াল না।

জিমেইল খুলতেই অচেনা কারোর কাছ থেকে আসা একটা মেইলের দিকে চোখ গেল ডক্টর ওলসেনের। অচেনা দেখে এড়িয়েই যাচ্ছিলেন, সাবজেক্ট লাইনে একটা চেনা শব্দ চোখ টানল তাঁর। ব্লু। বেশ কিছু মাস পরে ব্লুয়ের কথা মনে পড়ল আবার। প্রথম দেড় মাস নিয়ম করে ট্র্যাক করতেন তাকে, তারপর আরও নানা কাজ, আরও উদ্ধার করা বিপন্ন প্রাণীরা এসে ভিড় জমাল তাঁর চারদিকে। তার মধ্যে ব্রেসলেট বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। খবর পেয়েছেন হু হু করে বিক্রি হচ্ছে সেগুলো। শুধু বাচ্চারা নয়, বড়োদেরও নাকি খুবই পছন্দ। মাস খানেক বাদে মনে হয়েছিল ব্লু বোধ হয় কোনও দলে গিয়ে ভিড়েছে। নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন একরকম। তারপর কখন যেন মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

ইন্ডিয়া থেকে ছোটো একটা মেয়ে লিখেছে এই বৈদ্যুতিন চিঠি। ব্লুয়ের ব্রেসলেট পরে তার যাত্রাপথের দিকে সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে সময় পেলে। জানতে চেয়েছে কী হয়েছিল ব্লুয়ের। তার নামের সঠিক উচ্চারণ হয়তো করতে পারলেন না তিনি, সম্ভবত রুংটা।

সামান্য থমকালেন ডক্টর ওলসেন। ইন্ডিয়াতে তিনি যাননি কখনও, খুব পরিষ্কার ধারণাও নেই সে-দেশ সম্বন্ধে। তবে এটা শুনেছেন, এশিয়া মহাদেশের বাচ্চাদের উপর পড়াশোনার চাপ থাকে খুব। আর শুনেছেন তাদের বাবা-মায়েরা জীবনের রুক্ষতা থেকে তাদের আগলে রাখেন, ছাতা হয়ে সুরক্ষা দেন। আর এ তো নেহাত ছোটো, গ্রেড এইটে পড়ে মাত্র। গ্রিনডাড্র্যাপের মতো বীভৎস জিনিসের পরিচয় কি দেওয়া চলে তাকে? উত্তর লিখতে গিয়ে চিন্তায় ডুবে গেলেন রুস্কভা ওলসেন।

চার মাস কেটে গেছে, রাংতা প্রতিদিন খেয়াল রাখে ব্লু কোন দিকে যাচ্ছে। এক-একবার হয়তো গোটা দিন, এমনকি দুই দিন ধরে ম্যাপে ব্লুয়ের অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হয়নি। রাংতা ভয় পেয়েছে, ছটফট করতে করতে ভেবেছে ব্লুয়ের কিছু হয়নি তো? নাকি ওর পাখনা থেকে খুলে পড়ে গেছে ট্যাগটা? ম্যাপে ওর গতিবিধি আবার চালু হলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে রাংতা। একবার তো ভয় পেয়ে ডক্টর ওলসেনকে খবরটা জানাবে ভেবেছিল। আসলে এই ক’দিনে ব্লু যেন ওর পরিবারের একজন হয়ে গেছে। রাংতা তো ঠিক করেই নিয়েছে, বড়ো হয়ে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী হবে।

পরীক্ষা একেবারে সামনে এসে গেছে, বেশ রাত পর্যন্ত পড়তে হচ্ছে রাংতাকে। হাতের ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে রাংতা ভাবছিল, গত দুইদিন ব্লুয়ের উপর নজর রাখা হয়নি তো! এখন উঠে মোবাইল আনতে গেলে মা নির্ঘাত বকুনি দেবেন।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিউ.আর কোড স্ক্যান করে ম্যাপটা খুলে প্রথমে একটু চমকে উঠল রাংতা। ব্লু একটু অন্যদিকে চলে গেছে যেন। তাড়াহুড়োর মধ্যে খুব ভালোভাবে খেয়াল না করলেও ও যে ঠিক আছে সেটা দেখে নিশ্চিন্ত হল সে।

ঘুমের মধ্যে কীসের যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল রাংতার। কী যেন একটা সমস্যা তার অবচেতন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু স্পষ্ট হচ্ছে না। কাল ভূগোল পরীক্ষা, কোনও চ্যাপ্টার ভুলে ভুলে বাদ দিয়ে ফেলল নাকি? ম্যাপ পয়েন্টিংগুলো সব প্র্যাকটিস করেছে ঠিকঠাক? আধা তন্দ্রার ভিতর এইসব প্রশ্ন মাথার ভিতর পাক খাচ্ছিল রাংতার। হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসল সে, চোখ বিস্ফারিত। ম্যাপে শেষ কী দেখেছিল স্পষ্টভাবে চোখের সামনে ভেসে ওঠে আর-একবার। ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ! ঠিক, ব্লু তো ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের দিকে চলেছে! কী করবে এখন রাংতা? ব্লু তো যেদিকে খুশি যেতে পারে, কোনও বাধানিষেধ তো নেই। কিন্তু ডক্টর ওলসেনের মেইলে সবকিছু জানার পর ওই জায়গাটা নিয়ে কেমন একটা আতঙ্ক হয় তার।

নাইট স্ট্যান্ডের উপরে রাখা টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকায় রাংতা। রাত পৌনে তিনটে বাজে। ডক্টর ওলসেনের ওখানে তাহলে এখনও মাঝরাত হয়নি। জেগে থাকবেন কি? থাকলেও কী জানাবে তাঁকে সে? উনি যদি বলেন ব্লু তো ওদিকে যেতেই পারে, এতে তো আমার কিছু করার নেই। হয়তো বললেন ওদিকে যাওয়া থেকে কোনও প্রাণীকেই তো আটকাতে পারব না আমরা, তবে?

ছটফট করতে থাকে রাংতা। তারপর এক সময় গিয়ে বসে পড়ে ল্যাপটপের সামনে।

লম্বা একটা প্রবন্ধ লেখা শেষ করে শুতে যাচ্ছিলেন ডক্টর রুস্কভা ওলসেন। হঠাৎ টুং শব্দ করে মেইল ঢুকল একটা। আরে, ইন্ডিয়া থেকে সেই রুংটা নামের মেয়েটা। কাল সকালেই দেখব না-হয়, ভেবে উঠে পড়তেই যাচ্ছিলেন, হঠাৎ সময়টা খেয়াল হল তাঁর। ইন্ডিয়াতে এখন শেষরাত। এই অদ্ভুত সময়ে কী লিখতে পারে একটা ছোটো মেয়ে।

অ্যালার্মের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় রাংতার। পড়ার টেবিলে ল্যাপটপের সামনে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। ভাগ্যিস, মা আসেননি তাকে ডাকতে। কাল অত রাতে মেইল পাঠিয়ে আরও অনেকক্ষণ জেগে বসে ছিল উত্তরের অপেক্ষায়। এতক্ষণে নিশ্চয়ই কিছু জানিয়েছেন উনি। কিন্তু কই, কোনও উত্তর তো এখনও আসেনি। মনের উপর যেন মস্ত একটা ভারী পাথর চেপে বসে রাংতার। আর একবার দেখা দরকার ম্যাপটা। লাফিয়ে উঠেই দুটো কথা একসঙ্গে মনে পড়ে যায়—এক, বাবা আজ খুব ভোরে বেরিয়ে গিয়েছেন, তিনদিন পরে ফিরবেন। অফিসের কাজে ভুবনেশ্বর গিয়েছেন তিনি। দুই, মায়ের ফোনটা কীসব গড়বড় করায় গতকাল বিকেলে দোকানে সরানোর জন্য দিয়ে আসা হয়েছে। হঠাৎ চোখ ফেটে জল আসে রাংতার।

ডলফিনদের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। ব্লুয়ের অবশ্য স্পষ্ট কিছু মনে পড়ছে না, তবু কীসের একটা অদ্ভুত তাড়নায় সাঁতরে চলেছে তিরবেগে। দল থেকে আলাদা হয়ে পড়েছে কখন যেন। কী যেন হয়েছিল এখানে, ভাসা ভাসা ছবি দুলছে তার স্মৃতিতে। কাদের সঙ্গে যেন দল বেঁধে কোথায় যাচ্ছিল—তার এখনকার দল নয়, সে যেন অন্য একটা দল। একটু থামল ব্লু। যেন বুঝতে পারছে না এবার কোন দিকে যাবে। তার সহজাত প্রবৃত্তি বলল সামনে অগভীর জল, যাওয়া ঠিক হবে না। আতঙ্ক মিশে আছে এই জলে। কিন্তু কীসের আতঙ্ক? আগুনের দিকে পতঙ্গের মতো সেই অগভীর জলের দিকে এগিয়ে গেল ব্লু।

আজ ওলাসুকা উৎসব। ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের জাতীয় দিবস। নরওয়ের বীর রাজা ওলাফ হ্যারাল্ডসনের স্মরণে এই উৎসব। সকাল থেকে নাচ-গান-খাওয়া-দাওয়ার কোনও কমতি নেই। পুরো গ্রামটা খাঁড়ির ধারের ঢালে বেরিয়ে এসেছে, হই-হুল্লোড় চলছে পুরোদমে। হেকুনকে আজ অনেকদিন পর বেশ হাসিখুশি ঝলমলে লাগছে। সেমালদের দলকে এড়িয়ে রুনেরদের সঙ্গে লাফালাফি করে বেড়াচ্ছে সারাটা দিন। মাঝ-দুপুরের ভোজের পর সবাই একটু ঝিমিয়ে পড়েছিল, এখন আবার গান ভেসে আসছে এদিক ওদিক থেকে। হেকুন পা ছড়িয়ে বসে ছিল খাঁড়ির পাড়ে। জলে কিছু একটা নড়ে ওঠাতে চোখ কচলে আবার তাকানোর আগেই ওসলার তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এল, “ওটা কী?”

মুহূর্তে ভিড় জমে খাঁড়ির পাড়ে। ইসাকুর বর্শা হাতে কেন উৎসবে এসেছিল কে জানে, তবে ও বোধ হয় বর্শা হাতে ঘুমাতেও যায়। জলের উপরে নাকটা তুলে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে একটা ছোটো ডলফিন, একটাই। হেকুনের হাঁটু দুটো কাঁপতে থাকে হঠাৎ। সব ডলফিন তো একইরকম দেখতে, তবু ওই দৃষ্টি যেন তার খুব চেনা। কয়েকটা নিস্তব্ধ মুহূর্ত, হেকুনের মনে হল সময় যেন হঠাৎ থেমে গেছে। তারপর হইহই করে ইসাকুরদের দল নেমে পড়তে লাগল খাঁড়ির জলে। জাতীয় দিবসে শিকার নিজে এসে ধরা দিয়েছে, তা সে একটা হলে একটাই সই।

পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে দাঁত বের করে সেমাল বলে গেল, “যা রে, ভিতু কেঁচো বাড়ি যা।”

তিন-চারজন মিলে ঘিরে ধরেছে দিশেহারা ডলফিনটাকে। একজন মস্ত হুক উঁচিয়ে ধরেছে, ব্লো-হোলে ঢোকাবে। হঠাৎ পাশ থেকে কী একটা জিনিস জলে আছড়ে পড়ে নিজের শরীরে দিয়ে ঢেকে দিল ডলফিনটাকে, তারপর ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলল খাঁড়ির মুখটার দিকে।

হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে থাকা একপাল সাহসী শিকারি অবাক হয়ে দেখল, তাদের সবচেয়ে ভিতু আর নিরীহ ছেলেটা নিজের শরীর দিয়ে সযত্নে ঢেকে রেখেছে একটা ছোটো ডলফিনকে আর ঠেলতে ঠেলতে বের করে দিচ্ছে খাঁড়ি থেকে সমুদ্রের দিকে। খাঁড়ির মুখটায় পৌঁছিয়ে একবার ফিরে তাকায় হেকুন। তারপর ডলফিনটার পাশাপাশি সাঁতার দিতে থাকে অথৈ সমুদ্রের দিকে।

ফ্লোভিন প্রাণফাটা আর্তনাদ করে ওঠে হঠাৎ—“নৌকা নামাও! ছেলেটা আমার কোথায় চলে গেল?”

ডক্টর ওলসেনের ভিতরটা হিমশীতল হয়ে যাচ্ছে। ম্যাপে শেষ দেখেছিলেন আধঘণ্টামতো আগে ফ্যারোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ব্লু। ঠিক কোন জায়গাটাতে এই ম্যাপ থেকে বোঝা সম্ভব হচ্ছে না, তবে ব্লুয়ের স্মৃতিশক্তি হয়তো ওকে স্কালাফিওরদর গ্রামের খাঁড়িতে নিয়ে গিয়েই ফেলেছে। আজ ওলাসুকা, সবাই খাঁড়ির পাড়েই বেরিয়ে এসেছে নিশ্চয়ই। তারপর আর ভাবতে পারেন না রুস্কভা ওলসেন।

“ডক্টর!” গ্রেসির চিল-চিৎকারে সংবিৎ ফেরে তাঁর। রাংতার মেইলটা পড়ে প্রথমে কী করবেন কিছু বুঝতে পারেননি তিনি। ফ্যারোর দিকে প্রাণীদের যাতায়াত তো তিনি বন্ধ করতে পারবেন না, তাহলে? সেইমতোই উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মেয়েটার লেখা শব্দগুলোর মধ্যে যে অদ্ভুত আকুতি ছিল সেটা তিনি মন থেকে কিছুতেই বের করতে পারলেন না। শেষ রাতের দিকে যখন সি শেপার্ডের জাহাজ জলে ভাসল, ততক্ষণে কেবল গ্রেসি আর অ্যালেক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছেন তিনি। এটা ছোটো জাহাজ, আজ এদিকে সি শেপার্ডের টহল দেওয়ার দিনও নয়। শুধু তাঁর অনুরোধে এদিকে একবার ঘুরে যেতে রাজি হয়েছে এরা।

গ্রেসি সমানে চিৎকার করছে। দৌড়ে ডেকের অন্যদিকে গেলেন ডক্টর ওলসেন। তারপর বাকরুদ্ধ হয়ে জীবনের আশ্চর্যতম দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকলেন তিনি। একটা ছোটো ছেলে আর একটা ডলফিন পাশাপাশি সাঁতার কাটছে।  ছেলেটার মুখটা আশ্চর্যরকম চেনা, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন একে কোনোদিন তিনি দেখেননি।

ছেলেটাকে জাহাজে তোলার পর একটা মস্ত ডিগবাজি খেয়ে জলের তলায় অদৃশ্য হল ব্লু।

নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ডক্টর ওলসেন। প্রায় ফিসফিস করে বললেন, “তোমার বাবার নাম কি ফ্লোভিন?”

চমকে ওঠে হেকুন। উত্তর দেওয়ার আগেই বেশ কিছু গলার চিৎকার ভেসে আসে। জাহাজের পাশে একটা স্পিড-বোট এসে দাঁড়িয়েছে। তোয়ালে জড়ানো হেকুনকে পাশে নিয়ে ডেকের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ান ডক্টর ওলসেন। বোট থেকে ফ্লোভিন আবার কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়।

ধরা গলায় ডক্টর ওলসেন বলেন, “আপাতত ছেলেটা আমার কাছে থেকে পড়াশোনা করুক। ফিরবে তো বটেই।”

হেকুনের দিকে আরও একবার তাকায় ফ্লোভিন। তারপর স্পিড-বোট ফিরে চলে ফ্যারোর দিকে।

“আমি আপনার কাছে থাকব কেন?” অবাক গলায় জিজ্ঞেস করে হেকুন।

“আমি যে তোমার পিসি রুস্কভা, থাকবে না আমার কাছে?”

আরও অনেকক্ষণ পর ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে হেকুন, “তোমার বাড়িতে কে কে থাকে?”

“আমি আর কুচকুচে কালো বার্থোলোমিউ।” চোখ দুটো হাসিতে ঝলমল করে ওঠে ডক্টর ওলসেনের।

গ্রেসি আর অ্যালেক্সের চেঁচামেচিতে আবার ছুটতে হয় ডেকে। ঘন নীল জলে ফোয়ারা তুলে জাহাজের পাশে ডিগবাজি খেতে খেতে যাচ্ছে একটা ডলফিন, মুখটা দেখে মনে হয় যেন সে হাসছে।

প্রিয় রাংতা,

তোমার ব্লু বহাল তবিয়তে খেলে বেড়াচ্ছে উত্তর অ্যাটলান্টিকের নীল জলে। ছবি পাঠালাম, দেখো। তুমি বলেছিলে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী হতে চাও। একদিন নিশ্চয়ই তাহলে দেখা হবে তোমার সঙ্গে।

এই গ্রহ বড়ো সুন্দর রাংতা, একে নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী রক্ষা কোরো। আমার দাদার ছেলে আমার কাছে থেকে পড়াশোনা করছে। সে তোমার থেকে খানিকটা বড়ো হলেও অনেকটা তোমার মতো। আরও একটা ছবি পাঠালাম, সেটা আমার বেড়াল বার্থোলোমিউয়ের।

ভালো থেকো রাংতা। তোমরা ভালো থাকলে এই গ্রহটা ভালো থাকবে।

ইতি,

রুস্কভা ওলসেন।

দিনটা খুব সুন্দর আজ। চকচকে নীল জলে ঢেউ উঠছে মৃদু মৃদু। একরাশ ফোয়ারা ছড়িয়ে ডিগবাজি খেয়ে কে যেন মিলিয়ে গেল জলের তলায়। অনেক অনেক দূরে একজন একরাশ ভালোবাসা নিয়ে একটা ম্যাপের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে।

——————————-

সম্পাদকীয় সংযোজন-গল্পের সঙ্গের ছবিটা সভ্য মানুষের রাক্ষসের মত আচরণের ফটোগ্রাফ। নিরীহ জীবের রক্তে প্রতিবছর সমুদ্র লাল করে তোলার এই হত্যাযজ্ঞের একটা ভিডিও লিংক রইল সঙ্গে। 

https://nypost.com/2021/07/02/faroe-islands-slaughter-hundreds-of-whales-in-gruesome-tradition/

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

 

2 thoughts on “গল্প- ব্লু -বুমা ব্যানার্জী দাস-শরৎ২০২৪

Leave a Reply