এই লেখকের আগের গল্প- দিপুপিসির জার্মানি অভিযান, একটা অদ্ভুত বিকেল, ভুলের ভবিষ্যৎ,অন্ধকারের অন্তরালে

“দৃষ্টি! আরে ও-ও-ও-ও দৃষ্টি! কোথায় গেলি ভাই? দেখ, আমি কিন্তু আর খুব বেশি হাঁটতে পারছি না। আজ স্কুল থেকে ফিরে বাড়িতে বসে তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তুই এলি না। হাতড়াতে হাতড়াতে এতদূর এলাম। এখন তোকে যদি না পাই তাহলে, কী করব বল তো?” রাণু আলগোছে হাত নাড়তে নাড়তে বলল।
এতগুলো কথা যাকে উদ্দেশ করে বলা, সেই দৃষ্টি রাণুর থেকে একটু দূরে ঝরনার পাশে একটা ছোটো টিলার ওপর দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে বসে।
দৃষ্টির বয়স বারো বছর। সে এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামের একমাত্র স্কুলের ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। রাণুর কাতর আবেদনে দৃষ্টি মুখ তুলে তাকাল। ওর মাথার লালচে ঢেউখেলানো চুলগুলো কাঁধ পর্যন্ত নেমে গেছে। ঠান্ডা পাহাড়ি হাওয়া ওর চুলগুলোর আনাচ-কানাচ জুড়ে তৈরি করছে এলোমেলো তরঙ্গ। মেয়েটার ছোট্ট কপাল, নরম ভ্রূ, টানা নাক আর পায়রার ডিমের মতো থুতনি—সবকিছুই যেন ভীষণ মায়া মাখানো। তবে ওর চোখ দুটোর দিকে তাকালে যে-কারোর ঘোর লেগে যাবে—সবুজ পান্নার মতো চোখের মণি। দেখলে মনে হয় বুঝি সমুদ্রের অতল গহ্বরের যাবতীয় রহস্য কী এক অজানা উপায়ে জমা হয়েছে ওই চোখ দুটোর ছোট্ট মণির মধ্যে।
দৃষ্টি ফোঁপাতে ফোঁপাতে রাণুর দিকে এগিয়ে গেল। তারপর দু-হাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। রাণু ওর চোখে পরা কালো চশমাটিকে ভালো করে কপালে এঁটে নিতে নিতে নরম গলায় বলল, “দৃষ্টি, তুই আবার মনখারাপ করছিস? তোকে তো কতদিন বলেছি, রশ্মিতাদের সঙ্গে বেশি কথা বলবি না।”
দৃষ্টি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি তো ওদের সঙ্গে কথা বলিনি। আজ ড্রয়িং ক্লাসের দিদি বলল প্রজাপতি আঁকতে। আমি তিনটে রঙ মিশিয়ে একটা রঙ তৈরি করেছিলাম। দিদি সেটা দেখে বলল, কোনও রঙই নাকি হয়নি। অথচ আমি স্পষ্ট রঙ দেখতে পাচ্ছি। এটা দিদিকে বলাতেই রশ্মিতারা দিদিকে বলল, আমি নাকি সবসময় মিথ্যে বলি, রঙ না করে বলি রঙ করেছি। এই কথা শুনে একঘর মেয়েদের সামনে দিদি আমায় খুব বকল।”
তারপর একটু থেকে দৃষ্টি আবারও ধরা গলায় বলল, “রাণু, তুই বল, আমি কি মিথ্যুক?”
রাণু দৃষ্টির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে উত্তর দিল, “ওরা কিচ্ছু জানে না। এই যে, আমি তোর চোখ দিয়ে এই পৃথিবীকে দেখি। তুই এত এত রঙের কথা বলিস, সেইসব শুনে আমার দু-চোখের এই কালো রঙ ছাপিয়ে কত রঙে মেতে উঠি আমি, ওরা তো তোকে বিশ্বাসই করে না। ওদের কথা বাদ দে ভাই। আয়, আমরা বরং রঙ রঙ খেলি।”
দৃষ্টি নিজের চোখ মুছে রাণুকে ধরে ধরে টিলার ওপর নিয়ে গেল। তারপর দুজনে বসে গল্প করতে শুরু করল।
“দৃষ্টি, সামনে ওইদিকে কী গাছ আছে রে?”
“পাইন গাছের সারি রয়েছে।”
“ওগুলো কেমন রঙের ভাই?”
“রাণু, গাছগুলোর একদম ওপরের পাতাগুলোয় হালকা বেগুনি রঙ লেগে। আর ঝুরো পাতায় রয়েছে সোনালি। হাওয়ায় দুলছে যখন তখন চকচক করে উঠছে।”
রাণু আনন্দিত হয়ে বলল, “আর ওই দূরে ওই যে পাখিদের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, ওই পাখিগুলোকে কেমন দেখতে বল না।”
দৃষ্টি খুশি হয়ে বলে উঠল, “ভাই, টিয়াপাখিগুলোর বুকের কাছে সবুজের ওপর হালকা একটা লালমতো রঙ ছড়িয়ে আছে, আর ডানায় রয়েছে কত্ত রঙ!” তারপর মনে মনে কী যেন ভেবে আবার বলে উঠল, “রাণু, তুই ছাড়া কেউ এসব বিশ্বাস করে না। এত যে রঙ দেখি আমি—বাড়িতে, স্কুলে, রাস্তায়—ওরা অবাক হয়, ভাবে আমি মজা করছি। ওরা নাকি এসব রঙ দেখে না।”
রাণু হেসে বলল, “আমি তোকে বিশ্বাস করি। সবাই যেমন তেমনই আমাদের হতে হবে, তার বাইরে অন্যরকম কিছু আমরা হতে পারব না, এটা কে বলল? এই যে আমার ব্লাইন্ড স্কুল, এভাবে স্পর্শ চিনে বেঁচে থাকা, তোর এত এত রঙ দেখা, আমাদের বন্ধুত্ব—এগুলোই সব।”
দৃষ্টি রাণুর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, “আমি তোকে বলব এই পৃথিবীটা কতটা রঙিন। কেউ না বলুক আমি বলব। আমার চোখ দিয়ে তুই এই পৃথিবী চিনবি।”
তারপর ওরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে আরও অনেক গল্প করল। পাখিদের কলতানে সেইসব শব্দ চাপা পড়ে গেল।
॥ ২॥
“বাবা, কাল বিকেলে এই রাস্তা দিয়ে ফিরেছি। তখন তো এই ঘাস আর ফার্নের গায়ে এমন অদ্ভুত রঙ লেগে থাকতে দেখিনি!”
দৃষ্টির বাবা ওকে সাইকেলে বসিয়ে দুপুরের কমলা রোদ গায়ে মাখতে মাখতে পাহাড়ের পাকদণ্ডি বেয়ে নীচের দিকে নামছিলেন। রাস্তার ধারে ঝোরার সামনে সাইকেল থেকে নেমে সামনের ঘাসগুলো দেখে দৃষ্টি উত্তেজিত গলায় কথাগুলো বলে উঠল।
ওর বাবা,তখন মোবাইলে মেসেজ টাইপ করতে ব্যস্ত ছিলেন। উনি মোবাইলের পর্দায় চোখ রেখেই বলে উঠলেন, “মা, তোকে কতবার বলেছি, এরকম উলটোপালটা কথা বলবি না। ওদিকে ঘাস আর ফার্ন গাছের পাতাগুলোর ওপর কোনও আলাদা রঙ লেগে নেই।”
দৃষ্টি মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করল—“বাবা, একটু মন দিয়ে দেখো না, কেমন যেন একটা আলাদা রঙ ওই গাছগুলো আর মাটিতে লেগে! কেমন যেন। তুমি বুঝতে পারছ না?”
ওর বাবা ততক্ষণে সাইকেলে উঠে ওকে ইশারায় চাপতে বললেন। দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও সাইকেলে উঠল। ওর মন পড়ে থাকল অদ্ভুত রঙের ঘাসের দিকে।
দিন কাটতে লাগল নিজস্ব ছন্দে। ক্রমে একদিন ছোটো ছোটো নুড়ির ওপর দিয়ে এঁকে-বেঁকে চলা সরু নদীর মতো গভীর অথচ পেলব বর্ষা দৃষ্টিদের পাহাড়ি শহরে ঝেঁপে এল।
সেদিন বিকেলে স্কুল ছুটি হওয়ার পর দৃষ্টি স্কুল থেকে বেরিয়ে এল। ইদানীং রশ্মিতা ছাড়া ক্লাসের বাকি মেয়েরাও সুযোগ পেলেই ওকে নিয়ে মশকরা করে। দৃষ্টি মনস্থির করল, বিজ্ঞান স্যারের কাছে সময় করে ক্লাসের কয়েকটি অধ্যায় বুঝে নেবে। নির্মাল্য-স্যার এই স্কুলে নতুন এসেছেন। উনি ছাত্রীদের খুব মন দিয়ে বিজ্ঞান পড়ান। নিজেও পি.এইচ.ডি করছেন। দৃষ্টি ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে দেখল, ঝিরি বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করেছে চারদিকের পরিবেশ। স্কুলের পাশে উঁচু পাহাড়টির গা বেয়ে নামছে বিভিন্ন রঙের জলের ধারা। দেখে মনে হচ্ছে, কোনও দক্ষ শিল্পী কী এক অজানা উপায়ে গোটা একটা রামধনু সাজিয়ে দিয়েছে পাহাড়ের ঢালে। পাহাড়ের পাশ দিয়ে ঘুরে একটু এগোলেই সামনে সায়েন্স ল্যাবে স্যার বসেন। দৃষ্টি মুগ্ধ চোখে চারদিকের প্রকৃতি দেখতে দেখতে হাঁটছিল। তারপরই হঠাৎ করে পাহাড়ের উৎরাইয়ের একটা জায়গায় এসে ওর চোখ আটকে গেল। নিজের অজান্তেই ওর ভ্রূ দুটো কুঁচকে গেল।
“তুই ঠিক দেখেছিস, দৃষ্টি?”
“রাণু, তোরও কি আমার ওপর ভরসা নেই?”
“না দৃষ্টি, আমি তা বলতে চাইনি। আসলে আমাদের অনেক সময় দেখতে ভুল হয় তো, তাই…”
“দিন কতক আগেও বাবার সঙ্গে যখন ফিরছিলাম, তখন ঝোরার ধারে দেখেছিলাম ঘাস আর মাটিতে কেমন যেন অদ্ভুত একটা রঙ। বেশ কালোর মতো। কিন্তু ঠিক কালো নয়। এমন রঙ আমি আগে কখনও দেখিনি। তখনই বাবাকে বলেছিলাম। তারপর দিনই দেখলাম, ওই জায়গার ঘাসগুলো অদ্ভুতভাবে পুড়ে গিয়েছে। গতকাল স্কুল লাগোয়া পাহাড়ের নীচে ঘাসের গায়েও সেই একই রঙ জালের মতো ছেয়ে থাকতে দেখেছিলাম। আজ দেখলাম সেগুলোও আগের দিনের মতো বিশ্রীভাবে পুড়ে গেছে। পোড়া ঘাসগুলোর আশেপাশে পোকামাকড় থেকে শুরু করে কিছু ইঁদুর মরে পড়ে রয়েছে। আগের দিনের মতোই। রাণু, তুই তো জানিস বাবা রঙের বিষয়ে আমার কোনও কথা শোনেন না। শুধু বাবা কেন? তোকে ছাড়া বাকি সকলেই আমার এমন অদ্ভুত রঙ দেখা নিয়ে ঠাট্টা করে। ওরা নাকি এসব দেখে না। আচ্ছা রাণু, তুই বল, ওরা না দেখতে পেলেই কি সেইসব রঙের অস্তিত্ব নেই হয়ে যায়?”
রাণু ওর ব্লাইন্ড স্টিকটাকে হাতে ধরে বলল, “না রে, তা কেন? তুই মনখারাপ করিসনে।” তারপর চিন্তিত গলায় বলে উঠল, “বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে। আমাদের একটু সতর্ক থাকতে হবে। দিন কয়েক ভালো করে চারদিকের ঘাস আর মাটির দিকে লক্ষ রাখতে হবে।”
এই ছোট্ট পাহাড়ি জনপদে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে তা লোকের মুখে মুখে ছড়াতে বেশিদিন লাগে না। এখানে জীবন যেমন নিস্তরঙ্গ, তেমনই সহজ। দৃষ্টি আর রাণু যে-বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিল, দিন পনেরোর মধ্যে সেটি ওদের গ্রামের আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠল। বৃষ্টি হওয়ায় পরই দেখা যেতে লাগল, বিভিন্ন জায়গায় ঘাস বা ছোটো গাছের ঝোপ পুড়ে গেছে, আর সেইসব গাছের আশপাশ জুড়ে ছোটো ছোটো পোকামাকড় থেকে শুরু করে জন্তু যেমন, মেঠো ইঁদুর, বিড়ালছানা মরে পড়ে রয়েছে। দৃষ্টির ভীষণ মনখারাপ হয়। সে কাউকেই বোঝাতে পারে না এই অদ্ভুত রঙের কথা।
॥ ৩॥
“না রাণু, এটা আমি কিছুতেই করব না। তুই এটা করতে বলিস না।”
“কেন ভাই? তুই যখন এরকম গাছ পুড়ে যাওয়ার আগে বুঝতে পারছিস, সেই রঙ অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না। তখন সেটা তো কাউকে না কাউকে বলতে হবে।”
দৃষ্টি রাণুর সঙ্গে ছোট্ট টিলার ওপরে বসে ছিল। বর্ষার বিকেলের শেষ আলো কাঁচা আমের মতো রঙ নিয়ে মৃদু হাওয়ার সঙ্গে মশগুল গল্পে মেতে উঠছিল। দূরে কালো স্লেটের মতো ঘন মেঘকে দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি কোনোরকমে সেফটিপিন দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। সেফটিপিন খুলে যে-কোনো সময় এই মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে মাটিতে।
দৃষ্টি উদাস গলায় বলল, “রাণু, আমি তো ছোটো থেকে এমন রঙ দেখতে পাই যা কেউ দেখে না। এ-কথা তুই ছাড়া কখনও কেউ বিশ্বাস করেনি। এমনকি আমার বাবা-মা পর্যন্ত আমার এমন কথায় পাত্তা দেন না। আমাদের গ্রামে গত কয়েকদিন ধরে যে অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে, সেটার সঙ্গে আমি এমন করে জড়িয়ে পড়ব বুঝিনি।”
রাণু উত্তর দিল, “তোর ভয় লাগছে, না? তুই তো কাল নিজেই বললি আগে ছোটো ঘাসে এমন হচ্ছিল, এখন ধীরে ধীরে বড়ো গাছগুলোও এইরকমভাবে মরে যাচ্ছে, সঙ্গে জীবজন্তুগুলোও।”
“হ্যাঁ। আর এটা হওয়ার আগে কোথায় হতে চলেছে তা আমি আগে থেকেই বুঝতে পারি। কারণ, ওই বিচিত্র রঙের জন্য। কিন্তু তা বলে এসব কথা কাকে বলব? এরপর তো লোকে আমাকে পাগল বলবে!”
রাণু ধীরে ধীরে বলল, “দৃষ্টি, তোর স্কুলের বিজ্ঞানের টিচার নির্মাল্য-স্যারের কাছে চল।”
দৃষ্টি দূরে কালো মেঘের দিকে তাকাল। সেখানে তখন সেফটিপিনের আগল খুলে শুরু হয়েছে তুমুল বৃষ্টি। সে এক মুহূর্ত মনে মনে ভেবে নিল, তারপর রাণুকে সাইকেলে চাপিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
“স্যার, এই গাছগুলোর দিকে তাকান। ভালো করে একটু দেখুন। মাকড়শার জালের মতো একটা বিচ্ছিরি রঙ দেখতে পাচ্ছেন?” দৃষ্টি রাণুকে সঙ্গে নিয়ে ওর স্কুল ক্যাম্পাসের বাইরে নির্মাল্য-স্যারের সঙ্গে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত গলায় কথাগুলো বলল।
নির্মাল্য-স্যার দৃষ্টির দেখিয়ে দেওয়া গাছের দিকে তাকিয়ে বললেন, “না, আমি সেইরকম কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।”
দৃষ্টি একটু ইতস্ততভাবে নির্মাল্য-স্যারকে ওর বিচিত্র রঙ দেখার কথা জানাল। তারপর ভয়ে ভয়ে স্যারের দিকে তাকাল। ওর পূর্ব অভিজ্ঞতা এই বিষয়ে ভীষণ বাজে ছিল। ও রাণুর হাতটা চেপে ধরল। রাণু ফিসফিস করে ওকে বলল, “চিন্তা করিস না, সব ভালো হবে।”
নির্মাল্য-স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর দৃষ্টিকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাকে তোমার বাড়ির লোকজন এই রঙের বিষয়টির জন্য কখনও চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাননি?”
রাণু বলে উঠল, “স্যার, আমাদের মতো সাধারণ বাড়িতে ছোটোদের এইসব বিষয়কে কেউ পাত্তা দেয় না।”
নির্মাল্য-স্যার ওদের দুজনকে বললেন, “প্রথমে দৃষ্টির চোখ পরীক্ষা করাতে হবে। তারপর গাছগুলোর এমন অদ্ভুত ব্যাপার কেন হচ্ছে তা দেখতে হবে। আমি আমার ইউনিভার্সিটিতে এই নিয়ে এখনই মেইল করে দিচ্ছি। কালই দৃষ্টিকে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আমার মন বলছে আর দেরি করা ঠিক হবে না।”
॥ ৪॥
এই ঘটনার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ছয় মাস।
জানুয়ারি মাসের শীতে জুবুথুবু শরীরে রোদ সেঁকতে সেঁকতে দৃষ্টি আর রাণু টিলার ওপর বসে রয়েছে। রাণুর হাতে খবরের কাগজ ধরা। সে দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাই, দেখ তোর ছবি দিয়ে আমাদের গ্রামের খবরটা কত বড়ো করে খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে। তুই আমাদের পৃথিবীকে বাঁচিয়েছিস। আমরা সবাই তোর জন্য গর্বিত। আমি আজ খুব খুশি। খবরটা আমি পড়ছি। তুই শোন—
‘এই মুহূর্তে যে-ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বে তোলপাড় হচ্ছে, সেটি হল, আমাদের পৃথিবী অবধারিত অস্তিত্ব সংকটের হাত থেকে রক্ষা পেল। আমরা সকলেই জানি, পৃথিবীর মাটির নীচে রয়েছে বেশ কিছু স্তর। সেটির প্রকৃতি বা গঠন সম্বন্ধে বিজ্ঞানের ঝুলিতে জানার থেকে অজানার ভাগ বেশি রয়ে গেছে। মাটির গভীরের রহস্য আমাদের কাছে আজও অধরা।
মাস ছয়েক আগে পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি গ্রাম মুনহাটাতে কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটছিল। রহস্যজনকভাবে কোনও কারণ ছাড়াই সেখানকার কিছু ঘাস, ছোটো গাছ ও সেই সংলগ্ন ছোটো ছোটো জীবজন্তু মারা যাচ্ছিল। পরবর্তীতে এটির কারণ আবিষ্কার করতে গিয়ে জানা যায়, এই বিচিত্র ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে মাটির অনেক নীচে অজানা জগতের কিছু প্রাণী। সেই প্রাণীকুল পৃথিবীর অনেক গভীরে কয়েক হাজার ডিগ্রি উষ্ণতার পরিবেশে বসবাস করতে অভ্যস্ত। সারা পৃথিবীর তাবড় বিজ্ঞানীরা এটি নিয়ে গবেষণা করে জানতে পেরেছেন, মাটির নীচের সেই প্রাণীগুলো মাটির অনেক গভীর থেকে আমাদের জীবকুলের পক্ষে ক্ষতিকর, বিষাক্ত ও অজানা কোনও রাসায়নিক পদার্থ ভূপৃষ্ঠে পাঠাচ্ছিল। ওদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের মাটির নীচের দখল নেওয়া। ওরা পৃথিবীর অনেক নীচের দিক থেকে উপরে উঠে ভূপৃষ্ঠের একেবারে নীচে বসতি তৈরি করতে চেয়েছিল। সেই জন্য ওরা মাটির উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছিল, যার ফলাফলস্বরূপ গাছ ও জীবজন্তু মরতে শুরু করেছিল।
ওই প্রাণীগুলো সাধারণত যে-উষ্ণতায় বসবাস করে, মাটির নীচের উষ্ণতা ছিল তার চেয়ে কম। তাই তারা ওই রাসায়নিক প্রয়োগ করে পরীক্ষামূলকভাবে পৃথিবীর কিছু জায়গার মাটির উষ্ণতা ওদের বসবাসের পক্ষে উপযোগী করে তুলতে চেয়েছিল।
সাধারণত বৃষ্টির আগে ওরা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থটি প্রয়োগ করত, বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে সেটি ভূপৃষ্ঠের আরও বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ত। রাসায়নিক পদার্থের আরও বেশি ছড়ানো মানে বেশি বেশি গাছ পুড়ে যাওয়া ও জীবজন্তুর মৃত্যু। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যে-সমস্ত জায়গায় অজানা রসায়নিকটি মাটিতে মিশেছিল, সেই সমস্ত জায়গার মাটির উষ্ণতা অস্বাভাবিক বেশি। অতিরিক্ত উষ্ণতা ও বিষক্রিয়ায় পৃথিবীর গাছ ও জীবজন্তু মারা যাচ্ছিল।
কে বলতে পারে, আরও কিছুদিন এভাবে চললে হয়তো এই পৃথিবীর সবকিছু পুড়ে গিয়ে মানুষের অস্তিত্বই ধ্বংস হয়ে যেত।
পৃথিবীকে এই আশু বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছে সেই পাহাড়ি গ্রামের বারো বছরের একটি মেয়ে। তার নাম দৃষ্টি সেন। সে একটি অদ্ভুত ও বিরল ক্ষমতার অধিকারিণী। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ যেখানে চোখে দশ লাখ রঙ চিনতে পারেন, সেখানে দৃষ্টি তার চোখ দিয়ে এর দশগুণ বেশি অর্থাৎ দশ কোটি রঙ দেখতে পায়।
বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিশেষ দৃষ্টিশক্তিকে বলা হয় টেট্রাক্রোম্যাট। সাধারণ মানুষের চোখের কোণে থাকে তিনটি রিসেপ্টর, সেই জায়গায় অতিমানবী দৃষ্টির চোখে বিধাতা দিয়েছেন একটি চতুর্থ রিসেপ্টর। তাই সে এমন কিছু অলীক ও অদ্ভুত রঙ দেখতে পায় যা আমরা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারি না। বিস্ময় বালিকা দৃষ্টিই প্রথম গাছ পুড়ে যাওয়ার আগে জমি ও ঘাসের ওপর ওই রাসায়নিকটির অদ্ভুত রঙ দেখতে পেত, যেটি আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ত না। পরবর্তী সময়ে দৃষ্টির এই অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার সাহায্যে বিজ্ঞানীরা জমিকে বিষক্রিয়া ও পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন। বিজ্ঞানীরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মাটির নীচের সেই অজানা প্রাণীদের সনাক্ত করতে ও আটকাতে সমর্থ হয়েছেন। আর এর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে বারো বছরের দৃষ্টি সেনের জন্য। এই বিস্ময় বালিকা পৃথিবীকে ভয়ংকর বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছে।’
খবর পড়া শেষ করে রাণু বলল, “তুই তোর প্রাইজের টাকায় আমার চোখের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন অপারেশন করিয়েছিস। দৃষ্টি, তোর দৃষ্টি দিয়ে তুই আমার হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলি। তুই আমাদের সকলের চেয়ে আলাদা। কাল যারা তোকে নিয়ে খিল্লি করত, তারা আজ তোকে সমীহ করছে।”
দৃষ্টি হাসতে হাসতে বলল, “ভাই, আমি ভীষণ খুশি। আজ আমি বুঝেছি, আলাদা হওয়ার জন্য মনে কষ্ট পেতে নেই। নিজের ওপর বিশ্বাস কখনও হারাতে নেই। জানিস, আজ আমার এই রঙিন পৃথিবীটা ভরে উঠেছে আরও অনেক রঙে—সেগুলি হল বন্ধুত্বের রঙ, বিশ্বাসের রঙ, ভালোবাসার রঙ।”
তারপর ওরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে আরও অনেক গল্প করল। পাখিদের কলতানে সেইসব শব্দ চাপা পড়ে গেল।