গল্প- ভুলের ভবিষ্যৎ-অনুভা নাথ বর্ষা ২০২১

সন্ধ্যা ভট্টাচার্য গল্প প্রতিযোগিতা ২০২০( দ্বিতীয় স্থান)

golpoBhuler Bhabisyat_ Illustration

(১)

“স্যা স্যা, ছেলেগুলান এক্কেরে সাগল হয়ে গেল যে।”

মুখ কুঁচকে চশমাটা নাকের ওপরে আরো সামান্য তুলে দিয়ে টিচার্স রুমে বসে পরাশরবাবু বিরক্তির সঙ্গে কথাগুলো উচ্চারণ করলেন। পাশে বসা বাংলার স্যার অনিরুদ্ধবাবু স্মিত হেসে বললেন, “আবার কী হল পরাশরদা, তুমি বাঙাল ভাষায় খামোখা ছেলেগুলোকে গালিগালাজ করছ কেন?”

“তো কী করুম, পুজো করুম? খাতায় কীসব বিচ্ছিরি ভুল কইরা রাখতাসে! নিউটনের তৃতীয় সূত্রের উদাহরণ  দিসে, দেখো লিখতাসে, ‘পড়া না করে স্কুলে গেলে স্যার কান ধরে নেল-ডাউন করান। এখানে পড়া না করা ক্রিয়া আর স্যারের নেল-ডাউন করানোটা হল সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া!’”

বলতে বলতে পুরুলিয়ার বীরগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের টিচার পরাশর সেনের চোখ দুটো উত্তেজনায় রসগোল্লার মতো গোল গোল হয়ে উঠল। ততক্ষণে টিচার্স রুমের বাকি শিক্ষকরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিচ্ছেন।

ভীষণ রেগে গিয়ে ওঁর লম্বা গোঁফজোড়ায় টান দিতে দিতে দাঁতে দাঁত পিষে পরাশরবাবু বললেন, “দাঁড়া, আজ নিউটনের সূত্র নয়, ধোলাই সূত্র প্রয়োগ করুম।”

ইতিহাসের স্যার হাসতে হাসতে বললেন, “ছাড়ো তো পরাশরদা! নম্বর কম বসিয়ে দাও, ছেলেরা ওর’ম ভুল তো করবেই।”

পরাশরবাবু হুঙ্কার ছেড়ে উত্তর দিলেন, “না, আমি সব বরদাস্ত করতে পারি, কিন্তু ভুল, তাও আবার বিজ্ঞানে, নৈব নৈব চ।”

পরাশরবাবু খুব কড়া মেজাজের শিক্ষক, পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেলেও পড়া না পারলে ওঁর হাত থেকে কারো রেহাই নেই। ছাত্ররা ওঁকে আড়ালে ‘পড়াসুর’, মানে পড়া আর অসুরের সন্ধি, এই নামে ডাকে। তাতে অবশ্য ওঁর কিচ্ছুটি যায় আসে না। ক্লাসে কোনো ছাত্র পড়া না পারলে, উনি ওঁর লম্বা গোঁফজোড়ায় তা দিতে দিতে বলেন, “তগো পড়াসুর স্যারের ক্লাসে পড়া সুর করে পড়াব এখন আমি।”

এরপর একদিনের কথা। তখন নভেম্বর মাস, পুজোর ছুটি সবেমাত্র শেষ হয়েছে, স্কুলের জানালা দিয়ে বাইরে তখনো কাশফুলের সাদা সমাহারকে দূর থেকে দেখলে শরতের মেঘ বলে ভ্রম হয়, পুরুলিয়ার এই প্রত্যন্ত গ্রামের ক্ষীণ হয়ে ভেসে আসা ট্রেনের হুইসেলের শব্দ আর শীতের শিরশিরানি বাতাস মিলেমিশে যেন এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করেছে। স্কুলের বেশিরভাগ ছাত্রেরই তখনো পুজোর রেশ মন থেকে কাটেনি।

এমনই একটা দিনে স্কুলের ক্লাস সেভেনে একটি ছেলে ভর্তি হল, জোনাকির আলোর মতো উজ্জ্বল হলুদ গায়ের রং, কোঁকড়া চুল, গোল মুখ, কান দুটো যেন মুখের তুলনায় একটু বেশি বড়ো, চ্যাপ্টা নাক—তবে ছেলেটির চেহারায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল ওর চোখ দুটো—অসম্ভব চকচকে মণি, যেন মনে হয় কোনো স্বচ্ছ নদী, সরু ভুরু দুটোর নীচে যেন জ্বলজ্বল করে আলো বিকিরণ করছে।

পরাশর স্যারের ক্লাস থার্ড পিরিয়ডে, উনি ক্লাসের এসে পড়াতে শুরু করলেন।

জ্যামিতির ক্লাসে উনি পড়াচ্ছিলেন ট্রাপিজিয়াম। ক্লাসের বেশ কিছু ছাত্ররা পড়ায় অমনোযোগী হয়ে পড়েছিল; পরাশর স্যার তখন ওদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললেন, “এই তোরা সকলে এক্ষুনি যেটা পড়ালাম, ট্রাপিজিয়ামের এরিয়া কী করে বার করতে হয় খাতায় এঁকে বোঝা। এর জন্য তোরা দশ মিনিট পাবি।”

পরাশরবাবু মোটামুটি নিশ্চিন্ত ছিলেন যে কেউই এটা পারবে না, সবাই ভুল করবে। ওঁর লম্বা গোঁফজোড়ায় বেশ মৌতাত করে উনি তা দিচ্ছিলেন আর ভাবছিলেন যে কতরকম ভুল আজ ছাত্ররা করবে।

ছাত্ররা একে একে খাতা জমা দিল। স্যার গোটা কুড়ি খাতায় কাটা চিহ্ন বসানোর পর হঠাৎ একটা খাতা কাটতে গিয়ে দেখলেন একটি ছেলে একেবারে নির্ভুল উত্তর লিখেছে। পরাশরবাবু অভ্যাসবশত চোখের চশমাটাকে আঙুল দিয়ে ঠেলে একটু ওপরের দিকে তুলে খাতা উলটে ছাত্রটির নাম পড়লেন, নক্ষত্র রায়। অদ্ভুত নাম তো! তারপর সামনে, বেঞ্চে বসে থাকা ছাত্রদের উদ্দেশ করে বললেন, “নক্ষত্র রায় কেডা?”

সামনের বেঞ্চ থেকে একটা ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি স্যার।”

“অ, তা তুমি এখানে নতুন এয়েচ?”

“হ্যাঁ, স্যার।”

“ভেরি গুড, এক্কেরে নির্ভুল উত্তর দিয়েছ। আমি খুব খুশি হয়েছি।”

এই কথা বলে পরাশর স্যার ওঁর চোখগুলো আনন্দে রসগোল্লার মতো গোল গোল করে নক্ষত্রের দিকে তাকালেন।

সেই শুরু। নক্ষত্র শুধুমাত্র পরাশর স্যারের ক্লাস নয়, সমস্ত ক্লাসের সব সাবজেক্টে নির্ভুল উত্তর দিত। বার্ষিক পরীক্ষার খাতায় নক্ষত্র প্রতিটি বিষয়ে ফুল মার্কস পেয়ে পাশ করল। এমনকি সে ইতিহাস-ভূগোল থেকে শুরু করে পিটি পরীক্ষাতেও একেবারে নির্ভুল পরীক্ষা দিয়ে স্যারদের তাক লাগিয়ে দিল।

অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নক্ষত্র স্কুলের আইকন হয়ে উঠল। তবে একটা জিনিস অবাক করার মতো ছিল, নক্ষত্র সময় পেলেই যে-সব ছাত্ররা ভুল উত্তর দিত তাদের খাতা খুব মনোযোগ সহকারে দেখত। সেগুলো দেখতে দেখতে ওর চোখ মুখে একটা বিস্ময়ভাব ফুটে উঠত। ক্লাসের যত দুষ্টু, ফাঁকিবাজ ছেলেদের সঙ্গে নক্ষত্রকে দেখা যেত, হয় সে ছেলেদের ভুলে ভরা খাতা নিয়ে বসে আকাশপাতাল ভাবছে, অথবা তাদের ভুল উত্তরে খুব মজা পেয়েছে, এমন ভাব করত।

পরাশর স্যার এরপর স্কুলের সব ক্লাসে নক্ষত্রের উদাহরণ দিতে শুরু করে দিলেন, আর ছাত্ররা ভুল করলে তাদের আরো বেশি করে শাস্তির ব্যবস্থা করলেন যাতে ওরা যেন ভুল করেও ভুল না করে।

(২)

দিন কাটতে লাগল নিজস্ব ছন্দে। পুরুলিয়ার এই গ্রামে লালমাটি, পলাশ ফুল, গ্রামের বাইরের ধু ধু মাঠ, সাঁওতালদের বাহুল্যহীন জীবন, সবকিছু মিলিয়ে যেন মনে হয় প্রকৃতি তার নিজের নিপুণ হাতে সবকিছুকে সাজিয়ে তুলেছে। এখানে এক-একটি ঋতু যেন এক-একটা সৌন্দর্যের সম্ভার নিয়ে গ্রাম্য পরিবেশকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

জুলাই মাসের এমনই এক সকালে পরাশরবাবু আদ্রা গিয়েছিলেন একটি বিশেষ কাজে। সেদিন বর্ষাকাল হলেও আকাশে বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও ছিল না। দুপুরের আকাশের দিকে তাকিয়ে পরাশরবাবুর হঠাৎ করে আশ্বিনের আকাশের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। থরে থরে মেঘ সাদা আইসক্রিমের মতো নীল জারে করে কেউ নিপুণ হাতে সাজিয়ে রেখেছে বলে মনে হচ্ছিল। সেদিন বাতাসও যেন আকাশের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে একটা ধীর লয়ে বয়ে চলেছিল। রাস্তার দু-পাশের গাছের সবুজ পাতাগুলো বাতাসের সঙ্গে এতোল-বেতোল করে খেলা করছিল। দূরের লালমাটির ওপর দিয়ে এঁকে-বেঁকে বইতে থাকা কংসাবতী নদীর ওপর শেষ বিকেলের গাছগাছালির পেলব ছায়া পড়ে মনে হচ্ছিল যেন, লাল ক্যানভাসে একটা রুপোর চাদরের ওপর কোনো শিশু তার অপটু হাতে কল্পিত চরিত্র এঁকেছে।

পরাশরবাবু ভালো করে মন দিয়ে দেখছিলেন। দেখতে দেখতে ওঁর মনে হচ্ছিল কোথাও কোনো ভুল নেই, সবকিছু যেন হিসাব করে বানানো। উনি মনে মনে খুব খুশি হলেন, ভাবলেন একেই বলে বিজ্ঞান।

কাজ মিটিয়ে উনি বাড়ির ফিরতি পথ ধরলেন যখন, তখন দুপুর গড়িয়ে দিনের আলো যেন অলসভাবে একটু একটু করে পৃথিবীর কাছ থেকে সারাদিনের পরিশ্রমের পর ছুটি চেয়ে নিচ্ছে।

গ্রামের বাইরের বড়ো ভুবনডাঙার মাঠ পার করার পর গ্রামের সীমানা শুরু হচ্ছে। পরাশরবাবু শর্টকাটে পৌঁছানোর জন্য ওই মাঠের রাস্তাটা বাছলেন। কিছুক্ষণ হাঁটার পর হঠাৎ করেই সামনে একটু দূরে দুজনকে দেখতে পেলেন। এত বড়ো মাঠে বিকেলের পর তেমন কেউ আসে না, উনি কৌতূহল-পরবশ হয়ে একটু এগিয়ে যেতে দেখলেন, নক্ষত্র একজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে। ওঁকে দেখতে পেয়ে হাসছে। পরাশরবাবু কিছু বলতে যাওয়ার আগেই নক্ষত্রর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক হাসি হাসি মুখে পরাশরবাবুকে বললেন, “শুভ সন্ধ্যা।”

লোকটি লম্বায় প্রায় ছ’ফুট, ঢ্যাঙা চেহারা, পাস্তায় কালো রং মাখিয়ে দিলে যেমন দেখতে হয় মাথার চুল ঠিক তেমন, কানদুটো অনেকটা পুরোনো দিনের গ্রামাফোনের মতো, গায়ের রং তামা আর পেতলের রং মেশালে যেমন হবে ঠিক তেমন, তবে চোখ দুটো ঠিক নক্ষত্রর চোখের মতোই উজ্জ্বল, স্বচ্ছ ও বুদ্ধিদীপ্ত।

পরাশরবাবু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকাতেই নক্ষত্র বলল, “স্যার, উনি আমার পার্টনার।”

পরাশরবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “মানে? তুমি কোনো ব্যাবসা করতাছো নাকি যে উনি তোমার পার্টনার!”

পাশের লম্বা ভদ্রলোক হাত নেড়ে উত্তর দিলেন, “তা কেন? আমরা তো প্রজেক্ট এরর-এর পার্টনার।”

পরাশরবাবু নক্ষত্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওসব হেঁয়ালির কিস্যুই বুঝতে পারতেছি না।”

তারপর বর্গীয় ‘জ’-এর সঙ্গে ইংরেজি জেড মেশানো উচ্চারণে বললেন, “zআ পারো করো, কাল ক্লাস কামাই কোরোনি বাপু।”

“স্যার, আমি তো আর ক্লাসে যাব না।”

“সে কি! তর মাথা খারাপ হইল! ভুলভাল কতা বলতাসো ক্যান?”

“স্যার, আপনি নক্ষত্রকে যেমন দেখেছেন ও ঠিক তা নয়, এটা একটু বিশদে আপনাকে বলতে হবে।”

তখনই নক্ষত্র আকাশের দিকে তাকিয়ে লম্বা লোকটিকে বলল, “বাবা, যা বলার তাড়াতাড়ি বলো, আমাদের হাতে কিন্তু সময় কম।”

পরাশরবাবু সঙ্গে সঙ্গে রেগে গিয়ে লোকটিকে বললেন, “মশকরা করতাসেন আমার লগে? ও এখুনি আফনারে বাবা বলে ডাক দিল যে!”

লম্বা লোকটি পকেট থেকে জেলির মতো তলতলে স্বচ্ছ একটা জিনিস বার করলেন। পাঁচ ইঞ্চি বাই তিন ইঞ্চির মতো মাপ, হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে বর্ণহীন অ্যালোভেরার একটা মণ্ড, তবে এতটাই স্বচ্ছ যে জিনিসটার ও-পারে মাঠের সবুজ ঘাস অনায়াসের দেখা যাচ্ছে।

পরাশরবাবু কিছুই বুঝতে পারছিলেন না, সবকিছু যেন একটা অবোধ্য ধাঁধার মতো মনে হচ্ছিল। লোকটি ওই অদ্ভুত জিনিসটি হাতে নিয়ে ঝাঁকাতেই ওটি হঠাৎ করে একটা উজ্জ্বল বেগুনি রং বিকিরণ করতে শুরু করে দিল। লোকটি পরাশরবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “বেগুনিব রঙের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম, তাই এই যন্ত্রটি থেকে ওই রঙের বিচ্ছুরণ দেখতে পাচ্ছেন।”

উত্তেজিত হয়ে পরাশরবাবু বললেন, “মানে! হেইডা আবার কী বস্তু? কী কন মশাই, সব যে গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।”

লোকটি কোনো উত্তর না দিয়ে ওই যন্ত্রটিকে হাতে নিয়ে টেপাটেপি শুরু করে দিলেন। একটা সরু মিহি শব্দের সঙ্গে যন্ত্রটি অদ্ভুত রং ধোঁয়ার মতো বিকিরণ করতে শুরু করল। লোকটি পরাশরবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাদের ঘড়ি অনুযায়ী আর ঠিক কুড়ি মিনিট পঁয়ত্রিশ সেকেন্ডে আমরা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব।”

পরাশরবাবু ততক্ষণে হাল ছেড়ে দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে নক্ষত্র ও লোকটির দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।

লোকটি তখন পরাশরবাবুকে বললেন, “আসুন, ওই উঁচু জায়গায় বসে আপনাকে সব বোঝাচ্ছি।”

(৩)

তখন বেলা অনেকটাই শেষ হয়ে এসেছে। আকাশের নীল রং ক্রমেই তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারের দিকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে, দূরের আকাশে কালো মেঘের অন্তরাল থেকে কোনো এক গোপন রহস্যও যেন উঁকি দিচ্ছে বলে মনে হল। ওদের তিনজনের মাথার ওপর দিয়ে সহসা একটা পাখির দল কলকল করতে করতে বাসায় ফিরছিল। সেদিকে তাকিয়ে লোকটি বললেন, “আমাদেরও এবার ফেরার সময় হয়ে গেল।“

নক্ষত্র হেসে মাথা নেড়ে ওঁর কথায় সম্মতি জানাল।

একটু চুপ করে থেকে লোকটি বলতে শুরু করলেন, “আমরা এই পৃথিবীর বাসিন্দা নই, এসেছি মহাকাশের অনেক দূরের একটা গ্রহাণু থেকে। আপনাদের পৃথিবীর তুলনায় সেটি অনেক গুণ ছোটো। তবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে আমরা আপনাদের থেকে অনেক এগিয়ে। এই পৃথিবীতে আমরা এসেছি আপনাদের সময় অনুযায়ী প্রায় ৬৮০০ বছর আগে, অর্থাৎ পৃথিবীর হিসাবে আমরা ৬৮০০ বছর ধরে আছি। সেটা আবার আমাদের গ্রহাণু অনুযায়ী ছয় মাসের মতো সময়।”

“অর্থাৎ আপনাদের দেড় বছর মানে আমাদের একঘণ্টা।” নক্ষত্র পাশ থেকে বলে উঠল।

“হ্যাঁ, ঠিক তাই।” মুচকি হেসে লোকটি জবাব দিলেন। “মানব শরীর কী দিয়ে তৈরি জিজ্ঞেস করলে আপনি বলবেন রক্ত, হাড়, ডি.এন.এ, দেহকোষ। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন মূলত অক্সিজেন, নাইট্রোজন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম, এমনকি সামান্য সোনা হল মানব শরীরের মূল উপাদান? এই মহাবিশ্বের সমস্ত নক্ষত্র গোটা জীবনকাল ধরে তার মধ্যে এই উপাদানগুলির কিছু তৈরি করেছে, মৃত্যু-মুহূর্তে তৈরি করেছে বাকিটা। অর্থাৎ নক্ষত্রগুলি তার ধ্বংসের আগে এই মহাবিশ্বকে দান করে গেছিল সেই পরমাণুগুলি, যা দিয়ে আজ আপনি তৈরি।

“আমাদের শরীরেরও মূল উপাদান এগুলোই। এছাড়া কিছু অন্য উপাদান রয়েছে যা পৃথিবীতে নেই। সেই জন্যই আমরা আপনাদের থেকে আলাদা, আমরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচুর উন্নতি করেছি যা আপনাদের ভাবনার বাইরে। কিন্তু মানব মস্তিষ্কের একটা বিষয় কিছুতেই বুঝতে পারিনি। তা হল আপনাদের মধ্যের অনুভূতিগুলো। এগুলোর জন্য মূলত নিউরোন দায়ী, কিন্তু অনুভূতি তৈরি হয় কেন সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। আমার আর নক্ষত্রর প্রজেক্ট ছিল ‘মিশন এরর’। কী কারণে মানুষ ভুল করে, সেটা কীভাবে বুঝতে পারে, এই সবকিছু নিয়ে আমরা গবেষণা করছিলাম। আমাদের গ্রহাণুতে ভুল হয় না, সবকিছুই পারফেক্ট। কিন্তু আমরা ওই ভুল ব্যাপারটা বুঝতে চাই, ভুল করতে চাই।

“অতীতের ইতিহাস ঘাঁটলে জানতে পারবেন, আপনাদের পৃথিবীর বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা ভুল করে যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছিলেন যেমন, পেনিসিলিন, এক্স-রে, মাইক্রো ওভেন এগুলি বিজ্ঞানীদের অভূতপূর্ব ভুলের ফসল। আপনাদের বাংলার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তো বলেছেন, ‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?’

“অর্থাৎ, ভুলের মধ্যেই সত্য বা সঠিকের বীজ লুকিয়ে আছে। আমরা সেই ভুলটাকে বুঝতে চাই, শিখতে চাই মানুষ কেমন করে ভুল করে।

“এবার আসি আমাদের কথায়। আমাদের গ্রহাণুতে আপনাদের মতো সম্পর্ক নেই, তাই নক্ষত্র আমার ছেলে নয় বা আমি ওর বাবা নই। পৃথিবীতে আমাদের দুজনের থাকার জন্য এটা একটা নাম দেওয়া হয়েছে বলতে পারেন। সেই কারণে ও আমাকে বাবা নামে ডাকে।

“পৃথিবীর হিসাবে ৬৮০০ বছর অনেকটা সময়, এই সময়ের মধ্যে আমরা পৃথিবীর বেশ কিছু জায়গা ঘুরে প্রজেক্ট এররের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছি। এবার আমাদের ফেরার পালা। আমরা কিন্তু কোনো স্পেস শিপে চেপে আসিনি, ওসব কল্পবিজ্ঞানে ঘটে। আপনি নিওওয়াইজ ধূমকেতুর নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন? এটি মহাকাশে উপবৃত্তাকার পথে ঘুরছে, তাই প্রায় ৬৮০০ বছর পর পর এটি পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি চলে আসে। আমরা ওই ধূমকেতুর সাহায্যে আপনাদের সময় অনুযায়ী ৬৮০০ বছর আগে পৃথিবীতে এসেছি। আমাদের শরীরের অনেক উপাদান যেমন, কার্বন-মনোক্সাইড, ডাই-অক্সাইড, জল, ইথেন, ফর্ম্যাল-ডিহাইড এগুলো ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসের উপাদানের সঙ্গে মেলে। আমি আর আপনার ছাত্র নক্ষত্র, আমাদের গ্রহাণু থেকে এই শরীর বদলে গ্যাসীয় শরীরে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসের ওই উপাদানের সঙ্গে মিশে পৃথিবীর কাছে আসি। সেই সময় নিওওয়াইজ ধূমকেতু থেকে পৃথিবীর দূরত্ব অর্থাৎ প্রায় ১০ কোটি ৩০ লাখ কিলোমিটার পথ গ্যাসীয় অবস্থায় অতিক্রম করার পর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করি।

“একইভাবে আপনাদের হিসাবে ৬৮০০ বছর পার হওয়ার পর আজকে ২৩শে জুলাই, ২০২০ সাল সন্ধ্যাবেলা সূর্যাস্তের পর ওটি পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি আসবে, ওই সময়ের আগেই আমাদের পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে। আমরা আগের মতোই একইভাবে গ্যাস আকারে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসে করে নিজেদের গ্রহাণুতে পৌঁছে যাব।”

পরাশরবাবু এতক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে লোকটির কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনছিলেন। টানা এতগুলো কথা বলে লোকটি চুপ করলেন।

পরাশরবাবু ওঁর রেডিয়াম দেওয়া ঘড়িতে দেখলেন, সময় হয়েছে পুরো সাড়ে ছ’টা। তারপরই পাশে তাকিয়ে দেখেন নক্ষত্র আর ওই অদ্ভুতদর্শন লোকটি তাঁর পাশে আর নেই, সেই জায়গায় দুটো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। অদ্ভুত তাদের রং, মাঝে মাঝেই যেন রং বদলাচ্ছে। কুণ্ডলী দুটো পাক খেতে খেতে ওপরে উঠে নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার কিছুক্ষণ পরেই পরাশরবাবু খালি চোখে দূরের আকাশে নিওওয়াইজ ধূমকেতু দেখতে পেলেন। নিজের অজান্তেই রসগোল্লার মতো গোল গোল চোখ করে ডানহাত তুলে অদৃশ্য দুজনকে পরাশরবাবু শেষ বিদায় অভিবাদন জানালেন।

তখন পৃথিবীর বুকে সন্ধ্যা ঘনিয়েছে। নিওওয়াইজ ধূমকেতু একসময় পরাশরবাবুর দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। চারদিক নিস্তব্ধ। আকাশে একে একে সপ্তর্ষিমণ্ডলের সমস্ত তারাগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। পরাশরবাবু একরাশ বিস্ময় আর মনকেমনকে সঙ্গী করে ফাঁকা মাঠের ওপর দিয়ে শ্লথগতিতে বাড়ি ফিরে চললেন।

এরপর পরাশরবাবুর মধ্যে ওঁর স্কুলের সকলে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করলেন। উনি কখনো কোনো ছাত্রকে ভুল করার জন্য বকাবকি করতেন না, বরং তাদের ভুল থেকেও কী করে নতুন কিছু শেখা যায় সে বিষয়ে উৎসাহ দিতেন। পুরুলিয়ার বীরগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা এক নতুন পরাশর স্যারকে পেল, যিনি ছাত্রদের কোনো ভুলের জন্য শাস্তি না দিয়ে তাদের ভালোবেসে যত্ন করে ঠিক উত্তরটি বুঝিয়ে দিতেন। ক্রমে স্কুলে ওঁর ‘পড়াসুর’ নামটি অচিরেই সবাই ভুলে গেল। ক্লাসের সমস্ত দুষ্টু ছেলে বিজ্ঞানে দারুণ নম্বর পেতে শুরু করল।

তবে কেন জানি না, পরাশরবাবু সারাদিনের মধ্যে মাঝে মাঝেই উদাস দৃষ্টিতে জানালার বাইরে আকাশের দিকে উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে কিছু খুঁজতেন, জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু মুচকি হাসতেন।

অলঙ্করণ- স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

1 thought on “গল্প- ভুলের ভবিষ্যৎ-অনুভা নাথ বর্ষা ২০২১

  1. অনুভা, তোমার কল্পবিজ্ঞান-নির্ভর গল্প “ভুলের ভবিষ্যৎ” পড়লাম। প্রথমেই বলি, তোমার যত গল্প পড়েছি এখন পর্যন্ত, সেগুলোর মধ্যে এটা আমার বিবেচনায় থাকবে প্রথম স্থানে। যেমন অভিনবত্ব প্লটে, তেমনই পরিবেশনের মুনশিয়ানা ! শুরু করেছ হাস্যরস ব্যবহার করে, তারপর এসেছে বৈচিত্র্য । কল্পবিজ্ঞানের গল্প হিসেবে বিখ্যাত বিখ্যাত গল্পকারদের সম্ভারের কথা মাথায় রেখেই বলছি, এই গল্পটি ওই সম্ভারের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য! ভুল নিয়ে শুরু করে যা শুনিয়েছ প্রথমেই, তা আমরা জানি । কিন্তু তোমার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করিনি ! সত্যিই তো — ভুল করার ফলেই তো অনেক অনেক আবিষ্কার… ভেবে দেখিনি! তুমি সেসব নিখুঁত তথ্যও সরবরাহ করেছ। এমন লঘু ভঙ্গিতে শুরু করে পরে যে সিরিয়াস বিষয়ের অবতারণা করেছ, তা এতটাই শক্তপোক্ত বুনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত, যে পাঠক এই পরিবর্তনও উপভোগ করবে বলে আমার বিশ্বাস ।
    সবশেষে বলি, তুমি এই গল্পের জন্যে পুরস্কৃত হয়েছ বলে আমার তরফে থাকছে নিখাদ অভিনন্দন এবং অনেক অনেক শুভেচ্ছা ।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s