গল্প-একটি সরেস দিন-জয়তী রায়-শরৎ-২০২৪

জয়তী রায়ের আগের গল্প- চোখ, গজুমামা জিন্দাবাদ, আলোর কৌটো , আলো আসবে, গজুমামা ও গুহা রহস্য, উড়ন্ত কাকু আর গজুমামা , দোষ নেই

golpektisareshdin

গুমোট গরম। কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ায় প্রকাশকের দপ্তরে ঢুকতে ঢুকতে ঘেমেনেয়ে ক্লান্ত প্রসাদবাবু শরীরটাকে চেয়ারে ছেড়ে দিয়েছেন কি দেননি, কানে এল হুমকি—হাসির গল্প চাই।

বলে কী! হাসির গল্প? উঠে আসা ঢোঁক কুত করে গিলে খেয়ে বলেন, “লিখি রামায়ণ, মহাভারত। মহাকাব্যে হাসি কোত্থেকে আমদানি করব শুনি?”

প্রকাশকের নাম নন্দ ঠাকুর। নামের আগে ‘নিরা’ থাকলে খাপে খাপ হয়ে যেত। সবসময় চিরতা খেয়ে আছেন এমন মুখ। ঝোলা মোটা গোঁফ। পঞ্চাশের উপর বয়স। গম্ভীর বাজখাঁই গলা। ছোট্ট চাপা ঘরে বসে থাকেন তার একজন সহকারী। সেও ততোধিক ভিরকুটি মার্কা।

প্রসাদবাবু নিজেও বয়স্ক। কোনোমতে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বইপাড়ায় আসেন। নন্দবাবু অনেকদিন ধরে একটা দুটো করে তাঁর বই ছাপেন। দুজনের সম্পর্ক মাখোমাখো হলেও, প্রসাদবাবু নিরীহ লেখক আর নন্দ ঠাকুর তিরিক্ষি কটকটে সম্পাদক কাম প্রকাশক। এই যেমন এখন ফোনে মেসেজ দেখতে দেখতে গজগজ গজগজ গর্জন করতে করতে সরোষে বলে চলেছেন, “চলবে না প্রসাদবাবু, ওইসব সিরিয়াস লেখা চলবে না। সরস করুন। লেখা সরস করুন।”

“সিরিয়াস কীসের? দর্শন, শাস্ত্র জানবে না মানুষ?”

“ধুর মশাই, হাসতে জানলে তবে না শাস্তর পড়বে? এই আমাকেই দেখুন না, দিন-রাত্তির পড়ে আছি বইপাড়ায়। হাসার সময় পাই না।”

প্রসাদবাবুর চক্ষু কপালে।—“হাসির জন্যে আলাদা সময় লাগে নাকি? জম্মে শুনিনি মশাই।”

কথাটার মধ্যে কী ছিল কে জানে, প্রকাশক ফোন ফেলে চেয়ার ঘুরিয়ে টেবিল খামচে গরগর গলায় বলতে শুরু করলেন, “লাগে। আলবাত লাগে। বুকে হাত দিয়ে বলুন মশাই, শেষ কবে হেসেছেন? বলুন, বলুন।”

শেষ কবে হেসেছেন? সত্যিই তো। মনে পড়ছে না! মেয়ের বিয়ের সময়? হেসেছেন? মোটেই নয়। তিনদিন ঘুম আসেনি, এটা মনে আছে। নাতনির জন্মের সময়? ওরে বাবা, বর্ষায় ভেসে গিয়েছিল কলকাতা। কীভাবে যে সামলেছেন… আর লেখা শুরু করার পর থেকে ভুলেই গেছেন হাসতে। ইদানীংকালে আরও চিত্তির। উঠতি লেখক রকি মাস্টার মাসল  ঘুরিয়ে উপদেশ দেয়—‘কাকাবাবু, অনেকদিন তো হয়ে গেল। এই টপকানোর বয়সে এখনও কলম পিষছেন কেন? বছরে চারটে উপন্যাস নামাতে হবে, ফেসবুকে ছবি দিতে হবে—এসব এখন আর পারবেন? দম আছে?’ রকির কথা শুনলে বুকের ভিতর থেকে উঠে আসা  ঢিপঢিপ শব্দটা আরও বেড়ে যায়। ঢিপঢিপ বুক নিয়ে হাসবেন কখন? হাসির গল্প আসবে কোত্থেকে? মিনমিন করে বললেন, “গরম পড়েছে বেজায়। চারদিকে টেনশন, ঠিক পেরে ওঠা যাচ্ছে না।”

টেবিলে চাপড় মেরে বিজয়ীর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে প্রকাশক বললেন, “তব্বে? অত্ত সো-জা! প্রাণ খুলে হাসতে দম লাগে মশাই। গত তিন বছর আমি এক চিমটি হাসিনি। হাসির কথা ভাবিনি।”

“সে কি!”

“করব কী মশায়? যেই খুলছি মেইল, ঝাঁপিয়ে পড়ছে ভূত-পেত্নী নয়তো রাম-লক্ষ্মণ—হাসব কখন বলতে পারেন? হাসি আসবে মেঘের মতো, নদীর জলে নৌকা ভাসিয়ে দেওয়ার মতো, আলোর মতো, পাখির মতো…”

“থাক, থাক।” প্রসাদবাবু আর্তনাদ করে উঠলেন—“ভয়ানক লজ্জিত মশাই। পুরাণে হাস্যরসের ছিটেফোঁটা না থাকার দায়ভার আমার। বড্ড লজ্জিত।”

নন্দবাবু ঘোঁত ঘোঁত করে মাথা নাড়েন।—“ওইসব লেখায় যা আছে—কিছু মনে করবেন না, হনুমানের মতো অসহায় প্রাণী দিয়ে ওইসব বিকট কাজ না করালে চলছিল না?”

বাল্মীকির হয়ে তর্ক জুড়লেন প্রসাদবাবু—“হনুমান অসহায় প্রাণী? তিনি মহাবীর।”

নন্দবাবু পা ঠুকলেন। তর্ক করতে ভালোবাসেন। বইপাড়ায় নাম হয়ে গেছে তক্কোবাগীশ নন্দ ঠাকুর। গোঁফ নাচিয়ে তিনি বললেন, “আলবাত অসহায়। পটিয়ে-পাটিয়ে বেচারাকে একলা পাঠিয়ে দেওয়া হল শত্রুপুরী। ল্যাজে আগুন-টাগুন দিয়ে যাচ্ছেতাই কাণ্ড। তারপর ধরুন গিয়ে, গন্ধমাদন পর্বত কাঁধে করে নিয়ে এল! ইস। কী কষ্ট!”

নন্দ ঠাকুরের ভঙ্গি রাবণের মতো। রণে ভঙ্গ দেওয়াই স্থির করলেন প্রসাদবাবু। বানরসেনা আশেপাশে নেই যে বাঁচাবে। তিনি মিউ মিউ করে বললেন, “হনুমানের এই দিকটা ভেবে দেখা হয়নি।”

“আর গন্ধমাদন?”

“মানে?” ঘাড়ের উপর গন্ধমাদন পর্বত আছড়ে পড়ার মতো আঁতকে উঠলেন প্রসাদবাবু।—“বুঝলাম না?”

“বুঝবেন কেন? পাহাড় উপড়ে পরিবেশ দূষণ হয়নি? বলুন?”

“ওষুধটা চিনতে পারেনি তো কী করবে? সামান্য ব্যাপার।”

প্রকাশক হাঁক ছাড়লেন—“এটা সামান্য কথা? এক জায়গার পাহাড় অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, এটা দুর্বুদ্ধি নয়? আপনি এটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না?”

মহা মুশকিল! এ-ব্যাটা তো বাল্মীকির তুষ্টি নাশ করে ছাড়বে মনে হয়। হাসির গল্প থেকে কুরুক্ষেত্রে চলে গেল কেন রে বাবা? উপায় নেই দেখে তিনি ধরাশায়ী হয়ে বললেন, “দিচ্ছি, দিচ্ছি। গুরুত্ব দিচ্ছি। কিন্তু দেখুন নন্দবাবু, রামায়ণ আমার লেখা নয়। সেখানে কেন হাস্যরস নেই সেটা জিজ্ঞেস করার উপায় আর নেই।”

“কে বলেছে নেই হাস্যরস?”

“আছে নাকি? হতেও পারে। আমি আর কতটুকুন জানি!”

“আহাহ্, এত ভেঙে পড়ছেন কেন? ভেঙে পড়লে চলবে? সরাসরি নেই বটে, কিন্তু ছেলেবেলায় রাবণবধ পালা দেখে যা হেসেছিলুম, কী বলব।”

“কেন, কেন?” প্রসাদবাবু একই সঙ্গে কৌতূহলী ও উত্তেজিত।—“আপনি হেসেছিলেন?”

প্রকাশক উদার গলায় বলেন, “সে রাম নেই, সে অযোধ্যাও নেই। সেই দিন নেই, হাসিও গায়েব। তবে ঘটনাটা মনে পড়ল এখন।  শুনবেন নাকি?”

“রাবণবধ পালার ডায়লগ? নন্দবাবু, পঞ্চাশ বছর আগের কথা। স্মৃতির উপর বড়োই অত্যাচার হয়ে যাবে। আর ধরুন গে, গরমটাও বাড়ছে চড়চড় করে…”

“থামুন মশাই! কালির উপর আরশোলা ছেড়ে দিয়ে দেখেছেন কখনও? দেখেননি। ওইর’ম হাতের লেখা পড়েছি দিনরাত। বানানের গুষ্টির পিণ্ডি উদ্ধার করেছি। মাথায় গোলমাল হলে আগেই হয়ে যেত, বুইলেন? শুনবেন কি না বলুন।”

অফিস ঘরের ভিতর লাফিয়ে আসছে বাইরের গরম। তেড়িবেড়ি করলে আগুন ধরেও যেতে পারে। প্রসাদবাবু চেয়ারে এলিয়ে পড়ে বললেন, “আপনি বলুন।”

নন্দবাবুর গম্ভীর মুখে একটু যেন ঠান্ডা বাতাস খেলে গেল। ভুল হলেও হতে পারে, তবে গলার স্বর কিছুটা হলেও নরম মনে হচ্ছে।—“গ্রামের ছেলে মশাই আমি। খোলা আকাশের নীচে গাঁয়ের যাত্রা। তাতে উৎসাহের কমতি নেই মোটেই। গাঁয়ের লোক ভেঙে পড়েছে। স্টেজ ফেটে যাচ্ছে। রাম-রাবণের লড়াই। রাম ইয়া মোটা, রাবণ চিমসে। টিনের তরোয়াল ঘুরিয়ে লাফাচ্ছে দুজন। হঠাৎ দেখি, রাবণের তরোয়ালের খোঁচায় রামের ধুতি গেল খুলে। লোক হইহই করে উঠল। মাঠের উপর পেতে রাখা তিরপলে গড়াগড়ি খেয়ে হাসছি আমি আর পিন্টু।”

“পিন্টু?”

চারদিকে গুচ্ছ গুচ্ছ বই, গম্ভীর মুখের খিটখিটে প্রকাশক, ভুরু কুঁচকে থাকা সহকারী, গুমোট গরমে হাঁসফাঁস বইপাড়ায় টুক করে ঢুকে পড়ল একটুকরো মায়াময় মেঘ।

“পিন্টু আমার বন্ধু। আমি নান্টু।”

“ওহ্‌! আপনি নান্টু?”

প্রকাশক গম্ভীর।—“প্রশ্ন কেন? আমি নান্টু হতে পারি না? আপনি কি চিরকাল প্রসাদ হয়েই আছেন?”

“নাড়ু।”

“নাড়ু?” নন্দ ঠাকুর চোখ কপালে তুলে বলেন, “নাড়ু খাবেন নাকি? ভারি ইয়ে তো আপনার! এই বয়েসে নাড়ু খাবার শখ?”

“আমার ডাকনাম।”

“প্রসাদের ডাকনাম নাড়ু? ঘরের নাম আর বাইরের নামে এমন ম্যাচিং আগে কখনও শুনিনি মশাই।”

“নাম চাপিয়ে দিল দাদু। বয়ে বেড়াচ্ছি আমি।”

“সহমত, সহমত।” ঘাড় নাড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে হিটলারের ভঙ্গিতে বললেন নন্দবাবু, “নামের ব্যাপারে পরাধীন হয়েই থাকতে হয়।”

“রাম-রাবণের গপ্পটা শেষ হল না তো! মাঝে নাম এসে গোলমাল পাকিয়ে দিল।”

হাত দিয়ে মাছি তাড়িয়ে নন্দবাবু বলেন, “হ্যাঁ, হচ্ছিল সেই যাত্রাপালার কথা। তরোয়ালের খোঁচা খেয়ে রামের সে কী রাগ! লাফিয়ে উঠে হুংকার দিয়ে বলছে, ‘রে রে পটকা রাবণ, এত সাহস তোর! এক্ষুনি করিব তোরে বধ।’ রাবণ বলছে, ‘ধুতি ধরো রাম, ধুতি ধরো। ধুতি খুলিয়া গেলে হইবে নতুন পালা, রামের বস্ত্রহরণ।’”

লেখক-প্রকাশকের হাসির বুদবুদ উড়ে বেড়াতে লাগল ঘরময়। কোঁচকানো ভুরু সোজা করে সহকারী রেখে গেল দুই গেলাস শীতল প্যারামাউন্ট।

প্রসাদবাবু সোজা হয়ে বসে বললেন।—“ছোটবেলায় যাত্রাপালাগুলো এমন কাণ্ড করত বটে।”

“কাণ্ড বলে কাণ্ড! এই ফাঁকে পিন্টুর মেজোকাকার কথাটা বলে নিই একবার?”

“তিনিও ওই যাত্রার নাকি? জটায়ু, না কুম্ভকর্ণ?”

নন্দবাবু জানালা দরজা কাঁপিয়ে হেসে উঠে বলেন, “বেড়ে বলেছেন। না না, ওসব কিছু নয়, মেজোকাকা একটা সাংঘাতিক ইয়ে গোছের ছিলেন। তক্কে তক্কে থাকতেন। পরীক্ষা যেই শেষ হবে, উনি ক্যাঁক করে চেপে ধরবেন। বুইলেন, পিন্টু আর নান্টু ঘুড়ির আঠা নিয়ে লেগে পড়েছে। কত তার কম্মকাণ্ড। এ কি আর টিভির রিমোট যে ঘোরালুম আর চালু হয়ে গেল? কাচ গুঁড়ো, আঠা তৈরি করে মেশাও রে, ভাতের ফ্যান নিয়ে এসো রে, হাত কেটে ফেলো রে… এইসব রোমাঞ্চিত দুপুরে পিন্টুর মেজোকাকা খুঁজে খুঁজে পাকড়াও করে বলবে, ‘অ্যাই, তোরা দুটোতে করছিস কী? পরীক্ষা শেষ হলে সাপের পাঁচ পা দেখবি? চল অঙ্ক করবি। ব্যায়াম করবি, নিদেন গলা সাধবি। কিছু একটা করবি, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।’”

“ভারি অন্যায়। পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে, আবার অত্যাচার?”

“আপনারও ছিল নাকি? মেজোকাকা?”

“ছিল বইকি। কাকা নয়, মামা। পরীক্ষার সময় এইসা ঘুম পেত, সর্বক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব। জপ করছি পরীক্ষা শেষ হলেই ঝাঁপিয়ে পড়ব বিছানায়।”

“জ্ঞানের বন্যায় ভেসে যেত ঘুম? তাই না?”

“আর বলবেন না। মামা এসে গ্যাঁট হয়ে বসে যেত বাড়িতে। নাড়ুর মতো বিচ্ছুকে মানুষ না করে শান্তি নেই নাকি!”

“আপনি বিচ্ছু? দেখে তো মনে হয় একেবারে নিরামিষভোজী বৈষ্ণব।”

“আহ্‌হা। সে তো আপনাকেও—দেখে কিছু বোঝা যায়?”

প্রকাশকের দন্ত প্রকাশিত হচ্ছে দেখে প্রসাদবাবু বুক চিতিয়ে হাসলেন।—“পিন্টু-নান্টু ভয় পেত? মেজোকাকাকে?”

“ওরা ওস্তাদ ছেলে। ভয় পায় থোড়াই? ধা হাওয়া দিত। মাঠ পার হয়ে নদী, নদী পার হয়ে আবার মাঠ—বাতাসের সঙ্গে ছুটে দশ বছরের ছেলে দুটোকে ধরবে কী করে মেজোকাকা?”

“নাড়ুর মামা তো দৌড়তেই পারত না।”

“ঘুড়ি কাটাকাটি খেলা জমে যেত গরমের ছুটিতে।”

“উফ্। সে যা মজা!”

“সে আর বলতে।”

ক্রমে ক্রমে গল্পের মধ্যে ঢুকে এল হজমিওয়ালা, ফুটবল ম্যাচ, ভূত দেখা—নাড়ু-পিন্টু-নান্টুর হরেক কিসিমের গল্প।

প্রসাদবাবুর মনে হল, বইপাড়া নয়, তিনি ছুটে বেড়াচ্ছেন খোলা মাঠে। আকাশ জুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য ঘুড়ি। কে যেন চেঁচিয়ে বলছে, ভো-কাট্টা! চারদিক জুড়ে থইথই আনন্দ। পথে নামলেন প্রসাদবাবু। নাহ্, লেখার বরাত আজ জোটেনি বটে, কিন্তু দিনটা বেশ জবরদস্ত কাটল। জম্পেশ হাসিখুশি আর মালদাই আমের মতো সরেস।

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply