শিবানী রায়চৌধুরীর আগের গল্প খোক্কস, বাড়ি থেকে পালিয়ে, ফুলঝাড়ু, ইচ্ছেপূরণ, অদৃশ্য, নতুন রূপকথা

নীল রঙের ছোটো ড্রাগনটা বাড়ি থেকে পালিয়ে মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়াচ্ছিল। ভাসতে ভাসতে কোথায় যাচ্ছিল তার খেয়াল ছিল না। যখন খেয়াল হল তখন সে অনেক দূর চলে এসেছে। কেউ কোত্থাও নেই। চারদিকে ধু ধু মরুভূমি। রাশি রাশি বালি আর বালি। মাঝে মাঝে শুকনো ঘাস আর কাঁটাগাছ। মাথার ওপর লাল সূর্যটা জ্বলজ্বল করছিল আর নিশ্বাস নিচ্ছিল যেন আগুনের হলকা। নীল ড্রাগন রোদের তাপে ঘেমেনেয়ে কাঁটাঝোপের গায়ে আছড়ে পড়েছিল। তার একটা ডানায় এমন কাঁটা ফুটেছিল যে সে যন্ত্র্রণায় সহজে মেঘের ভেলায় উড়ে যেতে পারেনি। যন্ত্রণায় তার চোখ দিয়ে টসটস করে জল পড়ছিল। নীল ড্রাগন ছেলেমানুষ তো, মা’র কথা মনে করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল। এদিকে সূর্য ডুবল। মরুভূমিতে রাত নেমে এল। একটা বিশাল অন্ধকার রাক্ষসের মতো মরুভূমিকে গিলে ফেলল। নীল ড্রাগন ভয়ে চোখ বন্ধ করেছিল। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল তা সে জানত না।
নীল ড্রাগনের যখন ঘুম ভাঙল তখন চারদিক রোদে ঝলমল করছে। সূর্য তখন নরম হলুদ, মাথার ওপরে ওঠেনি। চোখ কচলে দেখল বাদামি রঙের ল্যাজওলা কী একটা দু-পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ওকে দেখছে। ও ভালো করে চোখ খুলতেই জিজ্ঞেস করল, “তুই কে? তোর নাম কী? কোথা থেকে এলি?”
নীল ড্রাগন বলল, “নীলমণি।” নীল ড্রাগন জিজ্ঞেস করল, “তুই কে? তোর নাম কী?”
সে বলল, “আমার নাম স্পিডি।”
নীলমণিকে দেখে স্পিডি আহ্লাদে আটখানা। এমন ছোটো নীল জন্তু সে জম্মে কখনও দেখেনি। স্পিডি নীলমণিকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখল। আবার জিজ্ঞেস করল, “কোত্থেকে এলি? কী করে এলি?”
নীলমণি উত্তর দিল, “মেঘের ভেলায় ভেসে আসছিলাম। মাঝ-গগনে ভীষণ ভিড়। একটা হেলিকপ্টারের ধাক্কায় পড়ে গেলাম।”
“তুই মাঝ-গগনে কী করছিলি?”
“আমি তো হারিয়ে গেছি। বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছিলাম।”
“মাঝ-গগনে কীসের এত ভিড়?”
নীলমণি বলল, “তুই তো আর গগনপথে যাসনি, জানবি কী করে?”
স্পিডি তার লম্বা ল্যাজ গুটিয়ে বালির ওপর বসে পড়ল। জিজ্ঞেস করল, “গগনে তো শুধু চিল, শকুন, বাদুড়, চামচিকে, প্রজাপতি ওড়ে। ওদের ধাক্কায় পড়লি কী করে?”
নীলমণি তো হেসে কুটিপাটি।— “হি হি, তুই কিচ্ছু জানিস না। গগনপথে ঘুড়ি, প্যারাসুট, হট-এয়ার বেলুন, উড়ন্ত ঘূর্ণি, হ্যান্ড গ্লাইডার, রকেট, এরোপ্লেন, ড্রোন— কত নতুন জিনিস আবিষ্কার হচ্ছে। তুই এসব দেখিসনি?”
স্পিডি বলল, “দেখব কী করে? আমি কি কোনোদিন মরুভূমির বাইরে গিয়েছি? আমরা মরুভূমির বাইরে থাকতে পারি না। আমাদের কষ্ট হয়। আমি কোনোদিন কোথাও যাইনি। আমার এখানে আর ভালো লাগে না।”
নীলমণি এবার অবাক হয়ে জানতে চাইল, “এটা মরুভূমি? আমি ভূগোল বইতে পড়েছি। কিন্তু চোখে দেখিনি।”
স্পিডি হেসে ফেলল, “তুই মরুভূমিও দেখিসনি? হেরে গেলি। এটা কালাহারি মরুভূমি। আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিমে। আমরা হলাম মিরক্যাট। মিরক্যাটরা অন্য অনেক মরুভূমিতে ছড়িয়ে আছে। তোর বাড়ি কোথায়?”
নীলমণি জলভরা চোখে বলল, “অনেক দূরে। উত্তুরে হিমালয় পর্বত পার হয়ে তিব্বতে।”
স্পিডির খুব কৌতূহল হল।— “তোর বাড়িতে কে আছে?”
নীলমণি বলল, “মা, বাবা, পাঁচ বোন আর চার ভাই।”
“তোরা সবাই নীল?” স্পিডি জানতে চাইল।
নীলমণি বলল, “সবাই নীল হবে কেন? আমাদের সবাইর সোনালি ডানা আর সোনালি পা। পাঁচ বোন সবুজ। হালকা সবুজ, গাঢ় সবুজ, নীলচে সবুজ, সবুজ ডোরা, সবুজ বুটি। ভাইরা সবাই নীল। নীল ডোরা, নীল বুটি, হালকা নীল আর গাঢ় নীল। আমাদের মা-বাবা হল লাল আর হলুদ। আমরা যখন দল বেঁধে যাই, রাস্তার লোক বলে, দ্যাখ দ্যাখ, পেন্টিং বক্স হেঁটে যাচ্ছে।”
স্পিডি জিজ্ঞেস করল, “পেন্টিং বক্স আবার কী?”
নীলমণি হেসেই বাঁচে না।— “তুই ইস্কুলে যাসনি? রঙতুলি দিয়ে আঁকতে শিখিসনি? পেন্টিং বক্স হল রঙের বাক্স। তাতে রামধনুর সাত রঙ থাকে।”
স্পিডি বিড়বিড় করছিল, “রামধনু! রামধনু! সাতরঙা জন্তু?”
নীলমণি উত্তর দিল, “জন্তু হবে কেন? মরুভূমির আকাশে রামধনু দেখোনি, একটা সাতরঙা ধনুক?” বলেই ও বালিতে পা দিয়ে ধনুক এঁকে দেখাল।
স্পিডি এক লাফ দিয়ে বলল, “বুঝেছি, বুঝেছি, একটা ইয়াবড়ো পাখির ডানা গগনপথে দেখেছি। সাতরঙা না, দু-তিনটে রঙ।”
নীলমণি ধৈর্য হারিয়ে ফেলল।— “ভুলেই গেছি, তোরা তো সব রঙ দেখতে পাস না। এই রঙিন পৃথিবীর অনেকটাই তোর কাছে সাদাকালো ছবি। তুই কিছুই বুঝিসনি। ইস্কুলে তো যাস না, তা সারাদিন কী করিস শুনি?”
স্পিডি চটে গিয়ে বলল, “আমাদের কত কাজ জানিস? আমি আর আমার খুড়তুতো ভাই মুডি একপাল ছোটো মিরক্যাটের দেখাশোনা করি। তাদের শেখাই মরুভূমির কোন দিকে যাবে, কোন দিকে যাবে না। বালিতে খাবার খুঁজবে।”
নীলমণি স্পিডিকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোরা কী খাস?”
স্পিডি উত্তর দিল, “মাকড়সা, কাঁকড়াবিছে, গুবরে পোকা, সাপখোপ, ছোটো পাখি, ডিম, ফল, লতাপাতা।”
খাবারের ফর্দ শুনে নীলমণি মুখ বেঁকাল দেখে স্পিডি বলল, “মুখ বেঁকালে কী হবে? পথ হারিয়ে যখন মরুভূমিতে এসে পড়েছিস তখন এসবই খেতে হবে।”
নীলমণি বলল, “যাক গে খাবারের কথা। তোরা ছোটোদের দেখাশোনা করিস, তোদের কতই-বা বয়স, তোদের বাবা-কাকা মা-মাসি কী করে?”
“আমার বয়স পাঁচ, খুড়তুতো ভাই চার আর ছোটোরা এক থেকে দুই। বড়োরা সুজ্জি ওঠার আগে বেরিয়ে যায় খাবারের খোঁজে। আমাদের বাড়িতে পঁচিশ জন মিরক্যাট। অনেক পোকামাকড়, সাপখোপ, ফল-ফুল, লতাপাতা লাগে।” স্পিডি উত্তর দিল।
এসব শুনে নীলমণি অবাক।— “বাপরে বাপ! একসঙ্গে পঁচিশজন থাকে!”
স্পিডি এবার গর্বে বুক ফুলিয়ে বলল, “মিরক্যাটদের কোনো-কোনো দলে একসঙ্গে পঞ্চাশ জনও থাকে।” স্পিডি বলেই চলল, “আমরা সবাই ভাগাভাগি করে কাজ করি। একদল বালিতে গর্ত খুঁড়ে থাকার জায়গা তৈরি করে। একদল খাবারের খোঁজে বের হয়। একজন মিরক্যাট উঁচু ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে পাহারা দেয় কোনও জন্তু আমাদের খেতে আসছে কি না। আমরা দল বেঁধে মিলেমিশে থাকি বলে আমাদের খুব সুনাম।”
নীলমণি এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। এবার বলল, “তোরা মাটির তলায় থাকিস? সেখানে তো অন্ধকার!”
স্পিডি উত্তর দিল, “অন্ধকার, কিন্তু খুব ঠান্ডা। আমরা মরুভূমির গরমের হাত থেকে বাঁচি। রাক্ষুসে জন্তুগুলো আমাদের সহজে খুঁজে পায় না।”
এমন সময় দারুণ জোরে চিঁ চিঁ শব্দ শোনা গেল। স্পিডি নীলমণির ডানায় এক টান দিয়ে বলল, “উঠে পড়, উঠে পড়। আকাশে ঈগল কি বাজপাখি উড়ছে। পাহারাদার আমাদের সিগনাল দিয়ে জানাল।”
নীলমণি ভয় পেয়ে জানতে চাইল, “পাখিও আমাদের খাবে?”
স্পিডি বলল, “তোকে খাবে কি না জানি না। আমাকে পেলেই ঠুকরে খাবে।”
স্পিডি নীলমণিকে টানতে টানতে একটা গর্তের মুখে নিয়ে এল। বলল, “আস্তে আস্তে ঢুকে পড়। ভয় পাস না। আমি তোর সঙ্গে আছি।”
নীলমণি সারারাত গর্তের মুখে যেখানে একটু আলো পড়েছে সেখানে শুয়ে রইল। বুঝতে পারছিল কোনও মিরক্যাট ওর কাছ আসছে না। সকালে ঘুম ভেঙে দেখতে পেল গর্তের বাইরে স্পিডিকে ঘিরে একপাল কুচো কুচো মিরক্যাট বসে আছে। স্পিডি নীলমণিকে দেখে বলল, “দেখবি আয়, এদের পড়াচ্ছি।”
স্পিডি একরাশ আধমরা পোকামাকড় ছড়িয়ে বসেছিল।— “এদের চেনাচ্ছি কোনটা কী পোকা। কাকে খাবে, কাকে খাবে না।”
স্পিডির ক্লাস শেষ হলে ওর খুড়তুতো ভাই মুডি ওদের ক্লাস নিতে এল। স্পিডি বলল, “এটা ওদের খেলার ক্লাস। একসঙ্গে মিলেমিশে খেলবে। নো ঝগড়া, নো মারামারি। মুডি ওদের শেখাবে: দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ।”
নীলমণি সব দেখেশুনে বলল, “এ তো খুব ভালো ইস্কুল।”
স্পিডি জিজ্ঞেস করল, “তুই এই ইস্কুলে ভরতি হবি? খুব কড়াকড়ি এখানে। বাড়ি থেকে পালিয়ে মেঘের ভেলায় চড়ে মাঝ-গগনে হাওয়া খাওয়া বেরিয়ে যাবে।”
নীলমণি বলল, “আমি তো হারিয়ে যাব ভাবিনি। একটা অচেনা উড়ন্ত ঘূর্ণি দেখে তার পিছনে উড়তে গিয়ে পথ ভুলে হারিয়ে গেলাম। বাড়ি ফিরতে পারলাম না।”
স্পিডি একগাল হেসে বলল, “ভালোই হল। আমার সঙ্গে তোর দেখা হল।”
নীলমণি বলল, “এখন আমরা বন্ধু। আমরা একসঙ্গে ঘুরে বেড়াব।”
স্পিডি উদাস হয়ে বলল, “আমিও বেড়াতে চাই। সবাই মিলে এত ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকতে আমার আর ভালো লাগছে না। ইচ্ছে করে কাঁধে একটা ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।”
নীলমণি শুনে খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল, “আমাকে তো এখান থেকে যেতেই হবে। বাড়িতে নিশ্চয় সবাই খুব চিন্তা করছে। আমার মার জন্যে মনকেমন করছে। চল, কাল ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে আমরা চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ব।”
স্পিডি ঘুমোতে যাবার আগে কাঁধের ঝোলায় কিছু দরকারি জিনিস— টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, চিরুনি, লাাট্টু, ডট পেন, সানগ্লাস গুছিয়ে রাখল। চিঠি লিখে মা’র মাথার কাছে রেখে দিল: ‘আমার আর একসঙ্গে দল বেঁধে থাকতে ভালো লাগছে না। আমি এক বন্ধুর সঙ্গে দেশ দেখতে বের হলাম। যদি কোথাও মনের মতো থাকার জায়গা পাই তো সেখানেই থেকে যাব। মা, আমার জন্যে ভেবো না। আমি অচেনা কারও বাড়ি উঠব না। যদি মিরক্যাটদের দেখা না পাই, আমাদের আত্মীয় বেজিদের বাড়ি থাকব। তোমাদের নিয়মিত খবর পাঠাব। সবাই সাবধানে থেকো। ভালোবাসা নিও। —স্পিডি।’
অন্ধকার থাকতেই দুজনে গর্ত থেকে বেরিয়ে এল। স্পিডির হঠাৎ খেয়াল হল, নীলমণি তো আকাশে উড়ে যাবে, কিন্তু ও উড়তে পারে না। নীলমণিকে বলল, “আমি উড়তে পারি না। তোর সঙ্গে কী করে যাব?”
নীলমণি বলল, “কেন? তুই আমার পিঠে উঠে যাবি।”
স্পিডি বলল, “তুই আমার চেয়ে ছোটো। তোর পিঠে উঠে কী করে যাব?”
নীলমণি হেসে উঠল, “ছোটো হলে কী হবে, আমার গায়ে অনেক শক্তি। আমি বেঁটে মোটা। তুই পাতলা ঢ্যাঙা। তোর ওজন কত?”
স্পিডি লজ্জা পেয়ে উত্তর দিল, “এক কেজির একটু কম।”
নীলমণি বলল, “আমার ইস্কুলের রাকস্যাক তোর চেয়ে ভারী। চটপট আমার পিঠে উঠে পড়।”
স্পিডি নীলমণির উঁচু-নীচু পিঠের ওপর কোনোরকমে পা ঝুলিয়ে বসল। এবার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “আকাশে শকুন, চিল, বাজপাখি উড়ে বেড়ায়। আমাকে ছোঁ মেড়ে নিয়ে গেলে কী হবে?”
নীলমণি স্পিডিকে অভয় দিয়ে বলল, “আমরা হলাম জাতে ড্রাগন। রেগে গেলে আমাদের নিশ্বাসে আগুনের হলকা বের হয়। তা দেখলে কেউ আমার দিকে এগোবে না। আমার বন্ধুকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেলেই হল!”
নীলমণি স্পিডিকে বলল, “আমি এবার আকাশে উড়ব। আমি ম্যাপে দেখেছি, কালাহারি থেকে পুবদিকে ছোটো ছোটো মরুভূমি পার হয়ে উত্তরে বিশাল সাহারা মরুভূমি। সাহারা মরুভূমিতে আমরা পিরামিড দেখব।”
স্পিডি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পিরামিড আবার কী? বড়ো পাহাড়?”
শুনে নীলমণি বলল, “তুই তো ইতিহাস পড়িসনি, কী করে জানবি? শুধু পাহাড়, পর্বত, মরুভূমি এই সবই জানিস।” তারপর বলল, “মন দিয়ে শোন। পিরামিড হচ্ছে পৃথিবীর সাতটা আশ্চর্য জিনিসের একটা। সাড়ে চার হাজার বছরের পুরোনো কবর। কবরে ইজিপ্টের রাজা-রানিদের মৃতদেহ খুব যত্ন করে কাপড়ে মুড়ে রাখা আছে।”
স্পিডি বলল, “ওখানে ভূত আছে, আমি যাব না।”
নীলমণি বলল, “দেশ দেখতে বের হয়েছিস, ভয় পেলে চলবে না।”
নীলমণি বলে চলল, “তোকে সাহারা মরুভূমিতে রেখে আমি নীল নদ, লোহিত সাগর পার হয়ে উত্তরে চলে যাব। আরও উত্তরে কাস্পিয়ান হ্রদ, হিমালয় পর্বত পার হয়ে তিব্বতে আমার বাড়ি। তোকে আগেই নামিয়ে দেব।”
শুনে স্পিডির কান্নায় গলা ধরে এল।— “তুই আমাকে ফেলে চলে যাবি? আমাকে উত্তরে নিয়ে যাবি না?”
নীলমণি ওকে বোঝাল, “উত্তরে দারুণ ঠান্ডা। তুই শীতে জমে আইসক্রিম হয়ে যাবি। ওদিকে তোর চেনা কেউ থাকবে না। বাড়ি ফিরে আসবি কী করে?”
স্পিডিকে পিঠে করে নীলমণি আকাশে উড়ছিল। তাই দেখে মাথার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে এল। ঈগল, শকুন, চিল, বাজপাখির ডাক শুনে ভয়ে স্পিডির গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখল হলুদ ফুলে ভরা বাবলা গাছের ঝোপ। তার আড়ালে বাদামি রঙের হায়েনা। তার চোখ জ্বলছে। একটু দূরে এক সিংহী বসে আছে। তার ছানারা বালিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
স্পিডি বলল, “নীলমণি, আমি ফিরে যাব।”
শুনে নীলমণি আশ্বাস দিল, “ভয় পাস না। ওদের মজা দেখাচ্ছি।”
নীলমণি ফোঁস ফোঁস করে দু-বার নিশ্বাস নিতেই আগুনের হলকা বেরিয়ে এল। তাই দেখে পাখির দল ঝড়ের বেগে উড়ে গেল। নীলমণি স্পিডিকে বলল, “চোখ বুজে থাক। নীচের দিকে তাকাস না। হায়েনা আর সিংহ উড়তে পারে না। আমরা এত উঁচুতে যে লাফ দিয়ে ওরা ধরতে পারবে না।”
স্পিডি এবার নিশ্চিন্ত মনে নীলমণির পিঠে চড়ে গগনপথে ঘুরতে লাগল। সেখানে কত জিনিস ঘুরপাক খাচ্ছিল। স্পিডি তো এর আগে কিছুই দেখেনি, কিছুই চেনে না। নীলমণি ওকে এক এক করে চিনিয়ে দিল প্যারাসুট, হট-এয়ার বেলুন, উড়ন্ত ঘূর্ণি, ড্রোন, অনেক ওপরে এরোপ্লেন, তারও ওপরে রকেট।
কালাহারি মরুভূমি পার হয়ে নীলমণি পুবদিকে উড়ে চলল। স্পিডি নীচের দিকে তাকিয়ে দেখছিল ঘাসে ঢাকা জমি। কোথাও সবুজ ঘাস, কোথাও রোদের তাপে পোড়া বাদামি ঘাস। অনেক দূরে দূরে দু-একটা গাছ। স্পিডি কালাহারিতে দেখেছে বালি আর বালি। এখানে শুধু ঘাস আর ঘাস। নীলমণি স্পিডিকে বলল, এই ঘাসে ঢাকা জমিকে বলে সাভানা। সাভানা পার হয়ে নীলমণি লোহিত সাগরের তীরে একটা ছোটো মরুভূমিতে পৌঁছে বলল, “স্পিডি, এখানে একটু বিশ্রাম নেব। এতদূর উড়ে এসে আমার ডানায় ব্যথা করছে। আমি দু-দিন ঘুমিয়ে নিই।”
মরুভূমি হলেও জায়গাটা বেশ ভালো। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু গাছপালা। গাছে পাখি ডাকছিল আর সাগরে চ্যাপ্টা কচ্ছপ সাঁতার কাটছিল। স্পিডির খাবারের অভাব নেই। চেনা অচেনা পোকামাকড় থেকে বেছে বেছে মচমচিয়ে খেল। নীলমণি লতাপাতা, পাখির ডিম যা জুটল তাই খেয়ে একটা গাছের তলায় ঘুমিয়ে পড়ল।
পরের দিন সকালে নীলমণি আর স্পিডি সাহারার দিকে রওনা হল।
নীলমণি স্পিডিকে বলল, “পুরো মরুভূমিটা ঘুরে দেখতে অনেক সময় লাগবে। আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যেতে চাই।”
সাহারা মরুভূমিতে পৌঁছে নীলমণি আর স্পিডি লোকের ভিড় দেখে ভয় পেয়ে গেল। দলে দলে লোক গাড়ি থেকে, বাস থেকে নামছিল। সবাই পিরামিড দেখতে এসেছে। দুজনের কেউ এত লোক জীবনে দেখেনি। নীলমণি বলল, “এখানে নামা চলবে না। লোকজন আমাদের দেখতে পেলে ধরে নিয়ে যাবে।”
স্পিডি চটে গিয়ে বলল, “তুই আগে ভেবে দেখিসনি কেন? ইতিহাস, ভূগোল কত কিছু পড়েছিস, পৃথিবীর আশ্চর্য জিনিস দেখতে লোক আসবে এটা তোর বইতে লেখা ছিল না?”
নীলমণি বলল, “বইতে কি সব লেখা থাকে? আমরা দূর থেকে পিরামিড দেখব। না দেখে ফিরে যাব না।”
একটু দূরে বালিয়াড়িতে দৈত্যর মতো ফণীমনসা ঝোপের আড়ালে নীলমণি নেমে এল। স্পিডিও গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। নীলমণি বলল, “এখান থেকে ভালো দেখা যাচ্ছে না। চল, আমরা আকাশে হেলিকপ্টারের মতো ঘুরপাক খাই। নীচের জিনিস দেখতে পাব। আমাদের কেউ ধরতে পারবে না।”
নীলমণি আকাশে উঠে ইজিপ্টের বিখ্যাত নীল নদের ওপর দিয়ে উত্তরে উড়তে শুরু করল। নদে লোকজন নৌকো করে নদের উত্তরদিকে পশ্চিম পাড়ে পিরামিড দেখতে যাচ্ছিল। নৌকোর লোক ওপরদিকে দুটো আজব জন্তু উড়ে যাচ্ছে দেখতে পেল। ছোটো একটা ড্রাগনের পিঠে একটা মিরক্যাট বসে আছে। লোকগুলো দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিচ্ছে দেখে নীলমণির ভীষণ রাগ হল। ও জোরে জোরে নিশ্বাস নিতেই ধোঁয়ায় আকাশ ভরে গেল। সবাই ভয় পেয়ে চুপচাপ বসে পড়ল।
নীলমণি স্পিডিকে নিয়ে আরও উত্তরে উড়ে গিয়ে পিরামিড দেখতে পেল। নীলমণি আকাশে চক্কর দিয়ে ভালো করে দেখছিল। পিরামিডের সামনে একটা বিরাট পাথরের সিংহ। সিংহের মুখটা মানুষের, কিন্তু নাকটা ভাঙা।
স্পিডি জিজ্ঞেস করল, “এটা আবার কী? এর কথা তো বলিসনি!”
নীলমণি বলল, “স্ফিংস, খুব শক্তিশালী। ওর অনেক ক্ষমতা, তাই পিরামিড পাহারা দিচ্ছে।”
স্পিডি হতাশ হয়ে বলল, “এতদূর এসে পৃথিবীর প্রথম আশ্চর্য পিরামিড দেখে আামি একটুও আশ্চর্য হইনি।”
নীলমণি বলল, “এবার যাব নীল নদের মোহনায় যেখানে নদ ভূমধ্যসাগরে মিশেছে। সেখানে তোকে দারুণ আশ্চর্য জিনিস দেখিয়ে অবাক করে দেব। তারপর আমাদের বাড়ি ফেরার পালা।”
নীল নদের মোহনার ওপরে ঘুরপাক খেতে খেতে স্পিডি নীচে নদের চরায় বিশাল বিশাল টিকটিকি গিরগিটির মতো প্রাণী রোদ পোহাচ্ছে দেখে চমকে গেল। তাদের একজন দাঁত বের করে হাসছিল। স্পিডি জিজ্ঞেস করল, “এরা কারা?”
নীলমণি উত্তর দিল, “এরা কুমির। এদের চিনতে পারলি না? কাছে গিয়ে দেখবি?”
স্পিডি ভয় পেয়ে বলল, “না, কাছে যাব না। আর আশ্চর্য জিনিস দেখতে চাই না। আমি বাড়ি ফিরে যাব।”
নীলমণি বলল, “এত ভয় পেলে বেড়াবি কী করে? এখনই তোর ফেরার ব্যবস্থা করছি। তোকে হিচ-হাইকিং করে ফিরে যেতে হবে।”
স্পিডি জানতে চাইল, “হিচ-হাইকিং কি একটা উড়োজাহাজ?”
নীলমণি বলল, “উড়োজাহাজে হিচ-হাইকিং হয় না। আকাশে যদি কেউ হট-এয়ার বেলুনে করে যায়, তাকে জিজ্ঞেস করব সে কালাহারির দিকে যাচ্ছে কি না। যদি যায়, তোকে নিয়ে যাবে কি না। এই চেয়েচিন্তে যাওয়াকে বলে হিচ-হাইকিং।”
স্পিডি বলল, “এমন জানলে আসতাম না। আমার ভয় করছে।”
নীলমণি বলল, “ভয়ের কিচ্ছু নেই। হঠাৎ নতুন বন্ধু পেয়ে যাবি। আমার সঙ্গে যেমন তোর হঠাৎই দেখা হল।”
ওরা যখন আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল, দু-তিনটে ড্রোন ওদের পাশ কাটিয়ে চলে গেল। কেউ ওদের দিকে ফিরেও তাকাল না। গোটা পাঁচেক রঙবেরঙের হট-এয়ার বেলুন আকাশ আলো করে উড়ে যাচ্ছিল। নীলমণি বলল, “স্পিডি, তোকে এদের একটাতে তুলে দেব।”
নীলমণি বেলুনগুলোর পাশে উড়তে লাগল। এক নম্বর বেলুনটাতে একটা মানুষ যাচ্ছিল। ওরা সরে এল। পরেরটা জোরে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তার পরেরটায় একটা কুকুর যাচ্ছিল। স্পিডি ভয়ে রাজি হল না। চার নম্বর বেলুনটাতে একটা বুনো খরগোশ বসে ছিল। সে বলল দক্ষিণ আফ্রিকায় ওর দেশ। সেখানে ফিরে যাচ্ছে। স্পিডিকে দক্ষিণ-পশ্চিমে কালাহারিতে নামিয়ে দিতে পারবে। নীলমণি স্পিডিকে ঠেলে তুলে দিয়ে ওর কানে কানে বলল, “ভয় পাস না। খরগোশ ফলমূল, কাঁচা সবজি খায়। তোকে খাবে না।” তারপর ডানা নেড়ে টা টা বলে নীলমণি উড়ে চলল ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান পার হয়ে আরও উত্তরে হিমালয়ের ও-পারে তিব্বতে, যেখানে ওর বাড়ি।
***
খিদে-তেষ্টায় ক্লান্ত হয়ে নীলমণি ঘরে ফিরল। নীলমণিকে দেখে ওর মা বলল, “মানিক আমার, এতদিন কোথায় ছিলি?”
নীলমণি গরম স্যুপ খেতে খেতে বলল, “অনেক দূরে, মরুভূমিতে। মা, আমি আর পালিয়ে যাব না। নিজের ঘরবাড়ির মতো কোনও জায়গা হয় না।”
এদিকে স্পিডি খরগোশের সঙ্গে হট-এয়ার বেলুনে চড়ে গগনে যে পথ দিয়ে এসেছিল, সে পথ দিয়ে ফিরে গেল। বেলুন থেকে ভালো করে চারদিক দেখল। পথে একরাত গাছতলায় কাটিয়ে ভোরবেলা কালাহারিতে ঘরে ফিরল।
স্পিডি গর্তে ঢুকতেই ওর মা বলল, “সোনা আমার, না খেয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে। একটা চিঠি লিখে কোথায় চলে গেলি?”
স্পিডি এক বাটি গুবরেপোকা খেতে খেতে বলল, “সাহারা মরুভূমিতে। পরে একদিন গল্প বলব। মা, এটুকু বুঝেছি নিজের ঘরের মতো কোনোকিছু নেই।”
ছবি তন্ময় বিশ্বাস