এই লেখকের আগের গল্প-গণপতি বেহেরা, জীবরত্নের ডায়েরি, প্রতীক্ষা, রুমমেট, দেশলাই (শীতল পাইনের গল্প প্রথম পর্ব), পোস্টাপিস(শীতল পাইনের গল্প দ্বিতীয়পর্ব)

যোগেশ জোয়ারদার ফোনটা পেয়েছিলেন হরিসাধন হুই-এর কাছ থেকে। যোগেশবাবু একটা বিদেশি কোম্পানিতে কেমিস্টের কাজ করেন। ওঁর বয়স পঞ্চান্নর কাছাকাছি। স্ত্রী কয়েক বছর হল গত হয়েছেন। লিভার ক্যানসার হয়েছিল। ওঁর একমাত্র সন্তান শৌনক ব্যাঙ্গালোরে একটা আইটি কোম্পানিতে কাজ করে।
যোগেশবাবুর দোহারা চেহারা। বাঙালির তুলনায় লম্বাই বলা চলে। গায়ের রঙ বেশ ফর্সাই বলা যায়। এককালে ফুটবল খেলতেন। যৌবনে দাড়িগোঁফ দুই-ই ছিল, এখন শুধু সরু গোঁফ। মাথায় বিরাট টাক। যোগেশবাবু বলেন এটা ওঁর বংশের ডি.এন.এ-তে আছে।
হরিসাধনবাবু যোগেশবাবুর প্রতিবেশী। হরিসাধনবাবুর ছিপছিপে লম্বা চেহারা। গায়ের রঙ আনন্দবাজারের পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলা যায় উজ্বল শ্যামবর্ণ। মুখের দাড়িগোঁফ এখনকার ক্রিকেট প্লেয়ারের মতো। উনি একটা সরকারি অফিসে কাজ করেন। বয়সে যোগেশবাবুর থেকে এক বছর ছোটো। ওঁরও একটি মাত্র সন্তান। মেয়ে দময়ন্তী বিয়ের পর নাগপুরে থাকে। স্ত্রী লিপিকা একটা প্রাইভেট স্কুলের টিচার। ছুটি পেলেই স্বামী-স্ত্রী নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ান। বিশেষ করে হিল স্টেশনগুলিতে।
হরিসাধনবাবু ইংরেজিত এম.এ পাশ করে কাজে ঢুকেছেন। নানান বিষয়ে পড়াশোনা করেন। লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত প্রবন্ধ লেখেন। এ-বিষয়ে ওঁর সঙ্গে যোগেশবাবুর মিল আছে। তবে যোগেশবাবু নানান গ্যাজেটের ব্যাপারে খোঁজ রাখেন। এসবে হরিসাধনবাবুর খুব আগ্রহ নেই। যোগেশবাবুকে উনি মোবাইলটা দিয়েছিলেন কারণ, ওঁর মতে যোগেশবাবু ফোনটার বিচিত্র ব্যবহারের একটা কারণ হয়তো খুঁজে বার করবেন।
হরিহরবাবুর কাছে এই ফোনটা আসার পিছনে একটা গল্প আছে। হরিসাধনবাবু টিভি সিরিয়ালে, বিশেষত ক্রাইমের সিরিয়ালগুলিতে নিয়মিত অভিনয় করেন। তবুও ওঁর নাম খুব বেশি লোকে জানে না, তার কারণ উনি মৃত সৈনিকের রোল করেন। যাঁরা খুব নিয়মিত ‘ক্রাইম স্টোরি’ বা ‘অপরাধী কে’ খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেন, তাঁরা জানেন, মর্গে শায়িত মৃতদেহগুলির মধ্যে হরিসাধনবাবু থাকবেনই। বলা বাহুল্য, ডায়ালগের খুব একটা সুযোগ নেই। তবে মাঝে মাঝে একটা দুটো রোল পান যেখানে আততায়ী ওঁকে হয়তো গুলি বা ছুরি মেরেছে এবং মরবার আগে উনি খুনির নাম বলার চেষ্টা করতে করতে মারা যান। আবার রাস্তার ধারে চাওয়ালা বা পানওয়ালা ইত্যাদি ছোটো রোলেও দেখা গেছে ওঁকে। এমনকি একটা সিরিয়ালে হোটেলের ম্যানেজার হিসেবে প্রায় দশ মিনিটের একটা রোলও করেছেন। সরকারি চাকরিটা না ছেড়েও এসব ছোটোখাটো রোল করা যায়। হরিসাধনবাবু একটা নাটকের দলের সঙ্গেও যুক্ত আছেন। মৃত সৈনিকের পাঠ করলেও টালিগঞ্জ পাড়া বা টলিউডে হরিসাধনবাবুকে অনেকে চেনে এবং পছন্দও করে। উনি খুব মজার গল্গ বলেন। এই কারণে উনি খুব পপুলার।
যে ফোনটা হরিসাধন যোগেশবাবুকে দিয়েছেন সেটা ওঁর নিজের ফোন নয়। ওটা শ্যামল ওঁকে দিয়েছে। শ্যামল একটা স্টুডিওতে কাজ করে। নানান ফাইফরমাশ খাটে। স্টুডিও পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও ওর। ফোনটা একটা সোফার নীচে চাপা ছিল। সোফাটা পরিষ্কার করতে গায়ে শ্যামল ওটা দেখতে পায়। ফোনটা অন্য ফোনের থেকে একটু আলাদা দেখতে। শ্যামল ভেবেছিল কোনও টেকনিশিয়ানের ফোন। স্টুডিও যারা আসে, তাদের প্রত্যেককে শ্যামল ফোনটা দেখিয়েছে, কিন্তু কেউই ফোনটার মালিক নয়।
শ্যামল ছেলেটা সৎ। বয়স আঠারো হবে। নিয়মিত খেলাধূলা করে। সুঠাম চেহারা। শ্যামলা গায়ের রঙ। ওকে পলাশ সিকদার পরামর্শ দিল ফোনটা শ্যামল ব্যবহার করুক। যখন আসল মালিকের সন্ধান পাওয়া যাবে তখন দেখা যাবে। পলাশ একজন টেকনিশিয়ান। পলাশ ফোনটার ব্যাটারি চেক করে শ্যামলকে বলল, এটা কোনও চেনা কোম্পানির ফোন নয়। আর সার্ভিস প্রভাইডারও আমাদের দেশের কোনও কোম্পানি নয়। ফোনের পিছনে শুধু ‘T’ লেখা। টেলিনর বলে একটা নরওয়ের মোবাইল সংস্থা আছে, তাদের হতে পারে। কিন্তু সে বিষয়ে পলাশ নিশ্চিত নয়। পলাশ আরও বলল, শ্যামল যেন একটা মোবাইলের দোকানে গিয়ে একটা ব্যাটারি চার্জার কেনে। এটা স্মার্ট ফোন নয়। পুরোনো চার্জার লাগবে।
শ্যামল স্টুডিওর কাছেই একটা মোবাইলের দোকানে চার্জার কিনতে গেল। টেকনিশিয়ানরা এখান থেকেই ওদের মোবাইল সারায় বা নতুন মোবাইল কেনে। দোকানের মোবাইল এক্সপার্ট এক পাঞ্জাবি। তিনি মোবাইলের কভার খুলে ব্যাটারিটা বার করে ভালোভাবে চেক করলেন।
“এটা আপনি কোথা থেকে কিনেছেন?”
সর্দারজির প্রশ্ন শুনে শ্যামল একটু ঘাবড়ে গেল। বলল, “এটা আমি স্টুডিওর একটা সোফা থেকে পেয়েছি। সিকদারবাবু বললেন আপনার কাছে নিয়ে আসতে।”
সর্দারজি সিকদারকে চেনেন বোধ হয়। বললেন, “দেখুন, এটা কোনও চেনা কোম্পানির ফোন নয়। বোধ হয় কেউ নিজে বানিয়েছে। এটাতে স্মার্ট ফোনের চার্জার লাগবে না। তবে দেখছি কোন চার্জার লাগে।”
সর্দারজি তিনটে বিভিন্ন চার্জার দিয়ে ফোনটা চার্জ করার চেষ্টা করে দেখলেন। বললেন, “এই তিনটের যে-কোনোটা আপনার ফোনে লাগবে। কোনটা আপনি নেবেন?”
শ্যামল সবচেয়ে সস্তারটাই নিল। সর্দারজি শ্যামলকে সাবধান করে বললেন, ও যেন ফোন চার্জ হওয়ার সময় ফোন ব্যবহার না করে। ব্যাটারি বার্স্ট করতে পারে। কিছু গণ্ডগোল হলে যেন সঙ্গে সঙ্গে দোকানে নিয়ে আসে।
শ্যামল কিছুদিন ফোনটা ব্যবহার করার পর বুঝতে পারল ফোনটাতে কিছু গণ্ডগোল আছে ৷ প্রায়ই একটা নাম্বার থেকে ফোন আসে, কিন্তু কলটা রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে কেটে যায়। এটা বার বার হওয়ার পর শ্যামলের মনে হল এটা কল ড্রপের ব্যাপার নয়, কেউ ইচ্ছে করে এসব করছে। শ্যামলের প্রথমে মনে হল শিবুই এসব করছে। শিবু ওর মতোই স্টুডিওতে ফাইফরমাশ খাটে। বয়স মাত্র উনিশ হলে কী হবে, এর মধ্যেই মদ আর গাঁজার নেশায় ধরেছে। নেশার জন্য মাঝে মাঝে চুরিচামারি করে। শ্যামল অনেকবার বলেছে এসব ছেড়ে দিতে, কিন্তু শিবু বলেছে ওর ব্যাপারে শ্যামল নাক গলালে ফল ভালো হবে না। অবশ্য শিবু হয়তো এসব করে না, কারণ ওর অত বুদ্ধি নেই।
শ্যামল রোজ সকালে উঠে দৌড়ায়। একদিন এই ফোনটা পকেটে রেখে দৌড়চ্ছিল, হঠাৎ নজরুলের ‘চল চল চল’ গানটা বেজে উঠল। গানটা শ্যামল শুনেছে। ভাবল ফোনে হয়তো গানটা রেকর্ড করা ছিল। কিন্তু আপনা হতে বেজে উঠবে কী করে? ফোনটা শুধু গণ্ডগোলের নয়, এটাতে কোনও ভৌতিক ব্যাপার আছে। এ-ব্যাপারে শ্যামল নিশ্চিত হল যখন হঠাৎ এক রাত্রে ফোনে একটা মেয়ের কান্নার আওয়াজ ও শুনতে পেল।
হরিসাধনবাবু শ্যামলকে পছন্দ করেন। শ্যামল ক্লাস এইট অবধি পড়েছে। তারপর বাবা মারা যাওয়ায় আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। হরিসাধন বলেছেন ও মাধ্যমিক পাশ করলে একটা জায়গায় ঢুকিয়ে দেবেন। নেতাজি মুক্ত বিদ্যালয় থেকে পাশ করলেও হবে।
একদিন শ্যামলের একটা অনুরোধ শুনে হরিসাধনবাবু একটু অবাক হলেন। ওর কুড়িয়ে পাওয়া ফোনটা শ্যামল ওঁকে দিতে চায়। কারণ জিজ্ঞেস করতে শ্যামল সব খুলে বলল।
হরিসাধনবাবু বললেন উনি ভৌতিক কোনও কিছু বিশ্বাস করেন না।
“শোন, তুই ফোনটা আরও কিছুদিন রাখ। আমি তোকে মাঝে মাঝে ফোন করব আর মেসেজ পাঠাব। তুইও আমাকে ফোন করবি। হয়তো ফোনটার সার্কিটে গণ্ডগোল আছে। সকালে একবার আর রাত্রিতে একবার ফোন করবি। মেসেজও করবি।”
হরিসাধনবাবুর কথা শুনে শ্যামল বলল, “স্যার, এখনও পর্যন্ত তো ফোনটা কেউ দাবি করেনি। এটাকে বেচে দেব? আপনি বলেন তো রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসতে পারি। কাছে যে পুকুরটা আছে ওখানে ফেলে দিলে কেউ টের পাবে না।”
“না না, কিছুদিন তোর কাছে রাখ। মাঝে মাঝে ফোনটা অফ করে রাখবি।”
“হ্যাঁ, স্যার। মাঝে মাঝে অফ করে রাখি। ফোনটা এমন গরম হয়ে যায়, হাত দিলে মনে হয় ছ্যাঁকা লাগল স্যার।”
বেশ কয়েকদিন হরিসাধনবাবু শ্যামলের কুড়িয়ে পাওয়া ফোনে ফোন করেছেন। শ্যামল ওঁকে ফোন করে, মেসেজ পাঠায়। হরিসাধনবাবু ফোন করলে শ্যামলের কোনও অসুবিধে হয় না, কিন্তু 007 (এই নামকরণ করেছেন হরিসাধনবাবু) থেকে শ্যামল ফোন করলে মাঝে মাঝে হরিসাধনবাবু শ্যামলের গলার আওয়াজ ছাড়াও আরও একটা আওয়াজ শুনতে পান। চাপা গলায় কেউ কিছু বলার চেষ্টা করছে, কী বলছে বোঝা যায় না। এমনকি কোন ভাষায় কথা বলছে তাও বোধগম্য হয় না। হরিসাধনবাবু খেয়াল করেছেন, রাত্রে শ্যামল ফোন করলে এই ব্যাপারটা বেশি ঘটে। এছাড়া অদ্ভুত সব মেসেজ আসে। কিছু সংখ্যা আর চিহ্ন থাকে। বোধ হয় কোনও কোড হবে। শ্যামলকে ফোন করে জেনেছেন, এরকম কিছু শ্যামল পাঠায়নি আর ওর ফেনে এরকম কোনও মেসেজই নেই। হরিসাধন ভাবলেন শ্যামল ঠিকই বলেছে। ফোনটা রহস্যজনক। যারা আত্মা ইত্যাদিতে বিশ্বাস করে, তারা বলবে ফোনটাতে কোনও আত্মা ভর করেছে। স্টুডিওর কয়েকজন শ্যামলকে বলেছে ও শিগগিরি যেন ফোনটাকে গঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসে। অনেকে আবার পরামর্শ দিয়েছে, ফোনটা ফেলে দিয়ে কালীঘাটে পূজা দিতে।
হরিসাধনবাবু ঠিক করলেন, ফোনটা নিয়ে একদিন যোগেশবাবুর বাড়ি যাবেন। ওঁদের দুজনের মধ্যে বন্ধুর সম্পর্ক। যোগেশবাবু একদিন বলছিলেন, এখনকার স্মার্ট ফোনে কয়েক কোটি ট্রানজিস্টার আছে। হরিসাধনবাবু ভেবেই পান না এতগুলো ট্রানজিস্টার অতটুকু জায়গায় থাকে কী করে। একবার যোগেশবাবু বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। হরিসাধনবাবু কিছুই বুঝতে পারেননি। ইলেক্ট্রনিক্সের জ্ঞান না থাকলে এসব বোঝা সম্ভব নয়, এটুকু হরিসাধনবাবু বুঝেছিলেন।
যোগেশবাবু ঠিক আটটায় চা খান। দার্জিলিং থেকে চা আনান। এটাই ওঁর একমাত্র বিলাসিতা। হরিসাধনবাবুও মাঝে মাঝে চায়ের আসরে যোগ দেন। হরিসাধনবাবু সকাল ঠিক আটটা বাজার পাঁচ মিনিট আগেই যোগেশবাবুর বাড়িতে পৌঁছে যান। 007-টা পকেটে নিয়ে। দু-কাপ চা খাওয়ার পরে 007-টা পকেট থেকে বার করেন।— “যোগেশ, তুমি ফোনটা একটু ভালো করে চেক করো।”
যোগেশবাবু ফোনটা একটু উলটেপালটে দেখে বললেন, “কেন, ফোনটা খারাপ হয়েছে? আর এরকম ফোন তো এর আগে আমি দেখিনি। তবে এটা স্মার্ট ফোন নয়। একটা স্মার্ট ফোনে প্রায় কয়েক কোটি ট্রানজিস্টার থাকে। শেন উই আমার মতোই একজন কেমিস্ট। কিন্তু এখন স্মার্ট ফোন বিশেষজ্ঞ। ওঁর মতে, অদূর ভবিষ্যতে স্মার্ট ফোন কী চেহারা নেবে আমরা এখন তা কল্পনাও করতে পারব না।”
“যোগেশ, তোমাকে আগেও জিজ্ঞেস করেছি, এখনও করছি, এতগুলি ট্রানজিস্টার এত ছোটো জায়গায় কী করে সেট করে? আমি তো এক লক্ষও কল্পনাই করতে পারি না।”
হরিসাধনবাবুর কথা শুনে যোগেশবাবু একটু হেসে বললেন, “ব্যাপারটা খুব জটিল। আমিও কল্পনা করতে পারি না। তবে একটা ট্রানজিস্টারের আয়তন বা দৈর্ঘ্য বলতে পারো এক ন্যানো মিটারের মতো। এক ন্যানো মিটার যে কত ছোটো সেটাই কি আমরা কল্গনা করতে পারি!”
হরিসাধনবাবু জানেন এবার যোগেশবাবু ছোটোখাটো একটা লেকচার দেবেন। যোগেশবাবু হরিসাধনবাবুকে নিরাশ করলেন না।— “দেখো, বাণিজ্যিকভাবে মোবাইল বাজারে আনে মোটোরলা বলে এক কোম্পানি। ১৯৭৩ সালে। অবশ্য চারের দশক থেকেই মোবাইল টেকনোলজির উপর রিসার্চ শুরু হয়েছিল। কিন্তু মোটোরলার ফোন ভীষণ ভারী আর দামি বলে বাজারে খুব চলেনি। এরপরের জেনারেশনের মোবাইল বাজারে আসে আটের দশকের প্রথমে। তাও প্রথমে ইউরোপ ও আমেরিকায় শুধু এই ফোনগুলি পাওয়া যেত। দামও ছিল খুব বেশি।”
যোগেশবাবুর কথা শুনে হরিসাধনবাবু বললেন, উনি প্রথম মোবাইল কেনেন ১৯৯৭ সালে। নোকিয়া কোম্পানির। সেটিও বেশ ভারী। আর সেই সময়ের তুলনায় দামও বেশ। আর তাতে শুধু ফোন করা যেত আর মেসেজ করা যেত।
“ঠিকই। লক্ষ করেছ কি না জানি না, আগের ফোনগুলিতে খুব ছোটো হলেও অ্যান্টেনা থাকত। আর এইসব গ্যাজেট যত পপুলার হবে, তত দাম কমবে। অবশ্যই আপেক্ষিকভাবে। তুমি এখন নশো টাকায় ফোন পাবে যেগুলি কুড়ি বছর আগেকার ফোনের মতো প্রিমিটিভ। এই ফোনটাতে কোনও অ্যান্টেনা নেই।”
“শ্যামল বলছিল এটাতে ছবি তোলা যায়, কিন্তু সেভ করা যায় না। কিছুক্ষণ পরেই ছবিটা কালো হয়ে যায়।”
হরিসাধনবাবুর কথা শুনে যোগেশবাবু বললেন, “ফোনটা আমি রেখে দিই। একবার ভালো ভাবে দেখি। এতে তো দেখছি অ্যাপস খুব কম। শনিবার আমার ছুটি। আর তোমারও ছুটি কারণ, কাল ফোর্থ স্যাটার ডে।”
শনিবার দিন যোগেশবাবুর ব্রেকফাস্টে একটু বৈচিত্র্য থাকে। কফি, ফ্রেঞ্চ টোস্ট আর কেকের সঙ্গে থাকে আপেল। হরিসাধনবাবু আবার আপেল খান না। অবশ্য অন্য কোনও ফলে ওঁর আপত্তি নেই। ওঁর জন্য যোগেশবাবু পেঁপে আনিয়েছিলেন।
ব্রেকফাস্ট শেষ হলে যোগেশবাবু চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বললেন, “দেখো, ফোনটা যে স্মার্ট ফোন নয় সেটা তো জানো। এটা অ্যান্ড্রয়েড নয়। তবে কম্পিউটারের সঙ্গে লিংক করা যায়। আমি এর মধ্যে অনেক ফাইল পেয়েছি। সেগুলোর বেশিরভাগই ডিলিট করে দিয়েছি। একটা অডিও ফাইল ছিল। ভোররাতে একটা মেয়ের কান্নার আওয়াজ। এটা ওই ফাইল থেকেই আসত। তবে কী করে ঠিক ভোর চারটেতেই ওটা বাজত এটা এখনও বার করতে পারিনি। আরও কিছু অদ্ভুত জিনিস আসে এটাতে।”
যোগেশবাবুর কথা শুনে হরিসাধনবাবু বললেন, “হ্যাঁ, ফোনটাই তো অদ্ভুত।”
“ঠিকই বলেছ। তবে সবচেয়ে মারাত্মক জিনিস কী জানো?”
“মারাত্মক?” হরিসাধনবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন।
“হ্যাঁ, মারাত্মক। দেখো, এখনকার সব ফোনেই টর্চ থাকে, এটাতেও আছে। তবে বাইরের কোনও বাটন টিপে এটা অন করা যাবে না। সেটিংয়ে গিয়ে করতে পারো। তবে টর্চ বলে কিছু নেই। আমিও তাই প্রথমে বুঝতে পারিনি কী করে টর্চ অন করব। তারপর ফারদার সেটিং বলে একটা জায়গায় গিয়ে দেখি লেসার বলে একটা অপশন। এটাকে অন করে প্রায় সর্বনাশ হওয়ার থেকে বেঁচে গেছি।”
“সে কি! এ আবার কীরকম টর্চ?”
“দেখবে? তবে সাবধান, ফোনটার দিকে তাকিও না।”
যোগেশবাবু নিজের চেয়ারটা সরিয়ে দেয়ালে ঝোলা একটা ক্যালেন্ডারের সামনে রাখলেন। এবার একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে ‘ওয়ান টু থ্রি’ বলে লেসারটা অন করার সঙ্গে সঙ্গে একটি লাল রশ্মি ক্যালেন্ডারে উপর পড়তেই ক্যালেন্ডার থেকে ধোঁয়া বেরোতে লাগল।
“সাংঘাতিক!”
হরিসাধনবাবুর কথা শুনে যোগেশবাবু বললেন, “সাংঘাতিক তো বটেই। আমার প্রথমে মনে হয়েছিল এটা লেসার মার্কার, যেরকম সেমিনারে ব্যবহার করা হয়। আবার টর্চেরও কাজ করে। কিন্তু কাল রাত্রে এই এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে আমার একটা জামা পুড়ে যায়। বেশ পাওয়ারফুল লেসার।”
শুনে হরিসাধনবাবু বললেন, “ভাগ্যিস শ্যামল এটার ব্যবহার জানত না। স্টুডিওতে এটা ব্যবহার করলে পুলিশ কেস হয়ে যেত।”
“তোমরা দুজনেই বেঁচে গেছ। এটকে কী করে অন করতে হয় জানো না বলেই বেঁচে গেছ। যাই হোক, আজ এটাকে জাভেদের কাছে নিয়ে যাব।”
“জাভেদ?” হরিসাধন এর আগে যোগেশবাবুর কাছে জাভেদের নাম শোনেননি।
“জাভেদের নাম তুমি শোনোনি, স্বাভাবিক। খুব কম লোকই ওর নাম জানে। ও হল মোবাইলের ইসি বা ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট এক্সপার্ট। চেষ্টা করলে কম্পিউটার হ্যাক করতে পারে। কলকাতার সাইবার সেকশনের পুলিশরাও মাঝে মাঝে ওর সাহায্য নেয়। আমাকে ও চেনে কয়েকটা গ্যাজেটের ব্যাপারে ওর কাছে হেল্প নিয়েছিলাম বলে। খিদিরপুরে ওর একটা ছোটো দোকান আছে। ফোন করে দেখি আজ দোকান খুলবে কি না।”
হরিসাধনবাবু রবিবার আর যোগেশবাবুর বাড়িতে গেলেন না। রাত্রের দিকে ফোন করবেন ঠিক করলেন। রাত্রি আটটার সময় যোগেশবাবুকে ফোন করলেন। ভোদাফোন নাম্বার। একটি মহিলা কণ্ঠস্বর ভেসে এল— ‘অনুগ্রহ করে ফোন নাম্বার চেক করুন। এই ফোন নাম্বারের কোনও অস্তিত্ব নেই।’
হরিসাধনবাবু এইসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। আবার ফোন করতেই যোগেশবাবু ধরলেন।— “ঠিক সময়ে ফোন করেছ হরিসাধন। এইমাত্র শ্রীরামপুর থেকে ফিরলাম।”
“শ্রীরামপুর?”
যোগেশবাবুর কথা শুনে হরিসাধনবাবু একটু বিস্মিত হন। রবিবার সাধারণত যোগেশবাবু কোথাও বেরোন না।
হরিসাধনবাবুর প্রশ্ন শুনে যোগেশবাবু বললেন, “শ্রীরামপুরে আমার বোন থাকে। ওর ছেলে হলান্ডে থাকে। কয়েকদিনের জন্য এসেছে। বলল, ছোড়দা পিকু এসেছে কয়েকদিনের জন্য। আজ এখানে এসো। লাঞ্চ করবে আর গল্পগুজব করা যাবে। আমি তোমাদের ওই 007 ফোনটা নিয়ে গিয়েছিলাম। পিকু দেখে বলল, এরকম ফোন ও কোথাও দেখেনি। ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়াও কোম্পানির কাজে ও ব্রাজিলেও গিয়েছিল। কোথাও এরকম দেখতে ফোন ওর চোখে পড়েনি।”
“তুমি জাভেদের কাছে যাওনি?”
“হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। তুমি এখন আমার বাড়িতে আসতে পারবে?”
হরিসাধনবাবু ফোনে জানালেন উনি এখনই যাচ্ছেন।
বাড়িতে হরিসাধনবাবু ধুতি আর হাফ হাতা পাঞ্জাবি পরেন। এখন মার্চ মাসেও একটু শীত শীত ভাব আছে। উনি গায়ে একটা শাল জড়িয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই যোগেশবাবুর বাড়িতে হাজির। যোগেশরবাবুর নিজের হাতে বানানো কফি খেতে খেতে বললেন, “জাভেদের কাছ থেকে জবর কোনও খবর পেয়েছ মনে হচ্ছে?”
“তা বলতে পারো। শোনো, আমরা যা ভেবেছিলাম তা নয়। এটাতে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম না থাকলেও এটাকে স্মার্ট ফোন বলা যেতে পারে।”
“কেন বলো তো? আমি তো জানি স্মার্ট ফোন মানেই অ্যান্ড্রয়েড।”
“না, তা নয়।” যেগেশবাবু বললেন, “আরও বিকল্প অপারেটিং সিস্টেম আছে যেগুলি ওপেন সিস্টেম। যেমন টাইজেন, পোস্ট-মার্কেট এইসব। আমি এ-দুটোর নাম জানতাম। জাভেদ আরও অনেকগুলো সিস্টেমের নাম বলল। তবে ও সার্কিট চেক করে বলল, এটা বাজারে চালু কোনও অপারেটিং সিস্টেমে চলে না।”
“সে কি! তা হলে এমন কোন সিস্টেম আছে যার নাম জাভেদ পর্যন্ত শোনেনি?”
“সেটাই জবর খবর। জাভেদ বলল, এই ফোনটা একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে বানান হয়েছে। ওর মতে শুধু এইটা নয়, আরও অনেকগুলো এই মডেলের ফোন হয়তো কোনও স্টার্ট-আপ কোম্পানি বানিয়েছে।”
“তাই!” হরিসাধনবাবু এবার সত্যিই বিস্মিত হন। ভাবলেন কেঁচো খুঁড়তে সাপ না বেরিয়ে পড়ে।
যোগেশবাবু এবার একটু হেসে বললেন, “জাভেদ ফোনটা কিনতে চেয়েছিল। ভালো দামই বলছিল। আমি বললাম, ফোনটা আমার নয়। যার ফোন তাকে বলে দেখব।”
হরিসাধনবাবু শুনে বললেন, “আমি শ্যামলকে বলব ফোনটা বেচে দিতে। এসব ভূতুড়ে ফোন না রাখাই ভালো।”
যোগেশবাবু বললেন, “সেটাই ভালো হবে। তুমি ফোনটা নিয়ে যাও।”
যোগেশবাবু এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে ওঁর পড়ার টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা কার্ড বার করে হরিসাধনবাবুকে দিয়ে বললেন, “এটা জাভেদের ভিজিটিং কার্ড। জাভেদের ফোন নং আর ঠিকানা এতে লেখা আছে। আমার মনে হয় শ্যামল যদি ফোনটা বিক্রি করতে চায় তবে জাভেদের কাছে বিক্রি করাই ভালো।”
হরিসাধনবাবু বললেন, “ফোনটা তুমিই রেখে দাও। শ্যামল তো ওটা গঙ্গায় ফেলে দিতে চাইছিল।”
যোগেশবাবু হরিসাধনবাবুর কথা শুনে খুশিই হলেন মনে হল। আবার ড্রয়ার খুলে দু-হাজার টাকা বার করে বললেন, “সেই ভালো। তুমি শ্যামলকে এই টাকাটা দিও। আর যদি ফোনটার মালিক শ্যামলের কাছে ফোনটা চাইতে আসে, আমার কাছে পাঠিয়ে দিও।”
এরপর যে কাণ্ডটা ঘটল তার জন্য হরিসাধনবাবু নিজেকেই দায়ী মনে করলেন।
সোমবার সকালে যোগেশবাবুর বাড়িতে দুটো লোক ঢুকে যোগেশবাবুকে মারধর করে ড্রয়ার থেকে টাকাপয়সা, দুটো মোবাইল, যার মধ্যে 007-ও ছিল, আর একটা ঘড়ি নিয়ে পালায়। যোগেশবাবুর বাড়ির কাজের লোকটি, ওর নাম পুলু, বাজারে গিয়েছিল। ও-ই হরিসাধনবাবুর বাড়িতে এসে খবর দেয়। হরিসাধনবাবু ওর সঙ্গেই যোগেশবাবুর বাড়িতে গিয়ে দেখেন যোগেশবাবু শুয়ে আছেন। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। হরিসাধনবাবুকে ডেকে বললেন, “চিন্তা কোরো না। মাথার আঘাত তত গুরুতর নয়। পুলু ডাক্তার ডেকে এনেছিল। উনিই ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। বললেন দু-দিন বিশ্রাম নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“তুমি পুলিশে খবর দাওনি? হয়তো ওরা 007-টার জন্যই এসেছিল।”
যোগেশবাবু একটু হেসে বললেন, “আমার তা মনে হয় না। দুটি ছেলে এসেছিল। আমার মনে হয় ড্রাগের নেশা আছে। মোবাইল আর ঘড়ি বেচে দেবে। ড্রয়ারে হাজার দেড়েক মতো টাকা ছিল। আর পুলিশে খবর দিলে জাভেদকে নিয়ে টানাটানি করত।”
হরিসাধনবাবু বললেন, “তুমি 007-এর ব্যাপারটা চেপে রেখে থানায় রিপোর্ট করতে পারো।”
“না হরিসাধন, মিথ্যে বলতে পারব না। এছাড়া পুলিশকে তো জানো। সবচেয়ে আগে পুলুকে সন্দেহ করবে।”
শুনে হরিসাধনবাবু বললেন, “যা ভালো বুঝবে তাই করো। তবে আমার মনে হয় ফোনটা অভিশপ্ত। এতদিন এ-পাড়ায় আছি, এরকম তো আগে ঘটেনি।”
হরিসাধনবাবুর কথা শুনে যোগেশবাবু বললেন, “দেখো, ওসব অভিশপ্ত ব্যাপার-স্যাপার আমি বিশ্বাস করি না। নিতান্তই কাকতালীয় ঘটনা। দিনকাল পালটে যাচ্ছে, বুঝলে। এবার থেকে সাবধানে থাকতে হবে।”
হরিসাধনবাবু ভাবলেন, একমাত্র সান্ত্বনা, শ্যামলের ফোনটা বিদেয় হয়েছে। নিশ্চয় কোনও সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইলের দোকানে ফোনটা ইতোমধ্যেই চলে গেছে।