এই লেখকের আগের গল্প-গণপতি বেহেরা, জীবরত্নের ডায়েরি, প্রতীক্ষা, রুমমেট, দেশলাই (শীতল পাইনের গল্প প্রথম পর্ব)
পোস্টাপিস (শীতল পাইনের গল্প, দ্বিতীয় পর্ব

আগেই বলেছি শীতল পাইন বিপত্নীক। সম্প্রতি ওঁর ভাইঝি প্রতিমা তাঁর এবং বাড়ির সবকিছু দেখাশোনা করে। স্কুলের গণ্ডি পেরোবার আগেই প্রতিমা ওর বাবা ও মাকে হারায়। রাঁচিতে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় দুজনেই একসঙ্গে মারা যান। তারপর থেকে প্রতিমা কাকা শীতল পাইনের সঙ্গে থাকে। প্রতিমা কলকাতার একটি কলেজের থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। ইতিহাসের ছাত্রী।
সাধারণত শনিবার দিন শীতল পাইনের বাড়িতে গল্পের আড্ডা বসে। কথক শীতলবাবু, আমরা সবাই শ্রোতা। তবে ওঁর গল্প একবার শুরু হলে আমার মতো অবিশ্বাসীও শেয পর্যন্ত না শুনে উঠতে পারে না। আমার মনে হয় ওঁর গল্পগুলির অনেক কিছুই বিশ্বাসযোগ্য। অলৌকিক ঘটনাগুলোর যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব কি না সেটা পাঠক বা শ্রোতারাই বিচার করবেন। আমি ওঁর অনেক গল্পগুলির মধ্যে যেটি আমার যেটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে সেটা এখানে বলছি।
এখানে একটা কথা বলি। প্রত্যেক শনিবার সন্ধ্যায় শীতল পাইনের বাড়িতে আড্ডা হয় না। এর একটা কারণ পাইন মহাশয় প্রত্যেক মাসে কোনও না কোনও শনি-রবিবার দিন নানান জায়গায় বেড়াতে যান। খুব দূরে নয়। এক উইক-এন্ডে হয়তো গেলেন আঁটপুর। আর এক উইক-এন্ডে গেলেন টাকি—এরকম আর কি। দূরে কোথাও গেলে ওঁর সঙ্গী হন হরিনাথ ঘোষ হাজরা। হরিনাথবাবু একবছর আগে রিটায়ার করেছেন। ভারতে যত তীর্থস্থান আছে, ভ্রমণ করেছেন। তবে পঞ্চ কেদারের অন্যতম কেদার মদমহেশ্বরে যাননি। আগামী বছর জুন মাসে যাবার ইচ্ছে আছে। শীতল পাইনকে চাপাচাপি করছেন সঙ্গে যাবার জন্য। শীতল পাইন এখনও কিন্তু কিন্তু করছেন। কিন্তু আমরা জানি উনি যাবেন, মদমহেশ্বরে যাবার লোভ সংবরণ করতে পারবেন না।
আমি প্রত্যেক আড্ডায় যেতে পারি না।
হেমন্তের এক সন্ধ্যা।
শীতল পাইনের বাড়ি আড্ডা। বেশিরভাগ লোকই মনে করেন ঘোর বর্ষায় মুড়ি আর তেলেভাজা খেতে খেতে অলৌকিক গল্প দারুণ জমে। কিন্তু আমি মনে করি, হেমন্তের সন্ধ্যাতেই এসব গল্প জমে কফি আর চানাচুরের সঙ্গে। খাওয়ার খরচ আমরাই দিই। আড্ডায় দশ-বারোজন থাকে। শীতলবাবুর ভাইঝিও আড্ডায় আসে। কফি, চা ও-ই তৈরি করে। বাদল বলে একটি ছেলে শীতলবাবুর বাড়িতে কাজ করে। বাদলই চানাচুর, বাদাম এসব কিনে আনে। শীতলবাবুর ভাইঝি প্রতিমা দেখতে ভালো। এখনও বিয়ে করেনি। তাই শীতলবাবুর আড্ডায় যে সকলে নিছক গল্পের লোভে আসে, এ-কথা হলফ করে বলতে পারব না।
আমি যে হেমন্তের সন্ধ্যার কথা বলছি সেই সন্ধ্যায় অকালে একটা ভারী বর্ষণ হয়ে গেছে। বাতাসে গা শিরশির করা ভাব। আমি শীতল পাইনকে বললাম, “স্যার, চাকরি-জীবনে তো আপনি নানান জায়গায় ঘুরেছেন। সেই সময়ের কোনও অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার কথা বলুন।”
শীতলবাবু এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। এরপর আমি ওঁর ভাষাতেই ওঁর গল্প বলি। প্রতিমা ইতিহাসের ছাত্রী হলেও সাহিত্যে খুবই আগ্রহী। আড্ডায় একটা খাতা নিয়ে আসে। শীতলবাবুর গল্পের মূল অংশগুলি নোট করে। ভবিষ্যতে শীতলবাবুর গল্প সংকলন ছাপার ইচ্ছে আছে। শীতলবাবু গল্প শুরু করলেন।
॥ ২॥
আমি যখনকার কথা বলব তখন আমার বয়স পঁয়ত্রিশ। বেশ সাহসী ছিলাম আর তোমাদের মতোই অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাস করতাম না। আমি যে সময়টার কথা বলছি তখন হেমন্ত। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি করি। কর্মসূত্রে নানান জায়গায় ঘুরতে হয়। সব জায়গায় পরিবার নিয়ে যাওয়া যায় না। যে হেমন্তের কথা বলছি, সেই হেমন্তে একবার হাজারিবাগ যেতে হয়েছিল। তখন হাজারিবাগের জঙ্গল বিখ্যাত ছিল। এখন তো বনজঙ্গল সাফ করে উন্নয়নের কাজ চলছে। আমার সহকারী ছিল ওমপ্রকাশ দুবে। ওর দৌলতে হাজারিবাগের জঙ্গল দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তখন জঙ্গলে চিতাবাঘ, ভালুক এমনকি বাঘেরও দেখা মিলত।
তোমরা হয়তো জানো না, হাজারিবাগের ধারেকাছেই অনেক প্রাচীন হিন্দু মন্দির ও জৈন মন্দির আছে। আমি রাজরাপ্পা মন্দির দেখিনি শুনে ওমপ্রকাশ একদিন বলল, “চলুন স্যার, রাজরাপ্পা আর আশেপাশের কয়েকটা মন্দির দেখে আসি।”
“শুনেছি কয়েকটা মন্দির ঘন জঙ্গলের মধ্যে?”
আমার কথা শুনে ওমপ্রকাশ বলল, “স্যার, চিন্তা করবেন না। আমি জিপ নিয়ে যাব আর ড্রাইভার শিউচরণকে নিয়ে যাব। লোকাল লোক, এসব জায়গা সব চেনা।”
ওমপ্রকাশ নিজে জিপ চালাবে না শুনে আশ্বস্ত হলাম। ও এত জোরে গাড়ি চালায় যে মনে হয় ফর্মুলা ওয়ানে যোগ দেবার ইচ্ছে ছিল।
ওমপ্রকাশের বাড়ি হাজারিবাগ থেকে তিরিশ মাইল দূরে একটি গ্রামে। ঠিক হল, মন্দির দেখা সেরে ওর গ্রামের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া সেরে ফিরব। ওমপ্রকাশ হাজারিবাগ টাউনে এক সরকারি কোয়াটার্সে থাকে। তবে বউ আর একমাত্র সন্তান গ্রামের বাড়িতে থাকে। প্রত্যেক উইক-এন্ডে গ্রামের বাড়ি যায়।
এখানে সন্ধেবেলা হেমন্তেই ভালো ঠান্ডা পড়ে।
॥ ৩॥
আমরা শনিবার সকাল দশটায় রওনা হলাম।
যাওয়ার সময় ওমপ্রকাশ লোকাল বাজার থেকে মাছ, সবজি ও ফলমূল নিয়ে গেল। ওমপ্রকাশ নিরামিষাশী৷ সুতরাং মাছ যে আমার ভাগে জুটবে বুঝতে পারলাম। ও নিজের থেকেই বলল, ওর বাড়িতে যে কাজের মেয়েটি আছে সে মাছ-মাংস এসব রাঁধতে পারে। বাঙালিদের মাছ-মাংস ছাড়া চলে না এটা ওর জানা আছে।
॥ ৪॥
কতকগুলি মন্দির দেখার পর দুবের বাড়িতে গেলাম। দুবের স্ত্রী সাধনা শিক্ষিতা মহিলা। একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ান। মেয়েটি বেশ ফুটফুটে, নাম সুজাতা। বয়স ছ’বছর। মা যে-স্কুলে পড়ান, ওই স্কুলের ছাত্রী।
একগাদা ফল ও শরবত খেতেই হল। দুবে বলল, “একটু না হয় দেরি করেই খাবেন। ফিরতে রাত হলেও ক্ষতি নেই।”
গল্প করতে-করতেই তো তিনটে বেজে গেল। খাওয়া শেষ হতে প্রায় সাড়ে তিনটে হয়ে গেল। দুবে বলল, “একটু বিশ্রাম করে নিন, বিকেলে চা-টা খেয়ে যাবেন।”
॥ ৫॥
চা-টা মানে চায়ের সঙ্গে কাজুবাদাম, বিহারের প্যাঁড়া আর নারকোল দিয়ে মুড়ি খেয়ে যখন দুবের বাড়ি থেকে বেরোলোম তখন প্রায় সাড়ে ছ’টা বাজে। সূর্য বেশ খানিকক্ষণ হল ডুবে গেছে। শিউচরণ আমাকে পৌঁছে দিয়ে কাল বিকেলে ফিরে এসে দুবেকে নিয়ে যাবে। দুবে বার বার বলছিল, “স্যার, আপনার সঙ্গে যাই, শিউচরণ ঠিক দশটার মধ্যে ফিরিয়ে দেবে।”
আমি মানা করলাম। দুবে বলল, “সাবধানে যাবেন। আকাশের অবস্থা ভালো নয়। অকালে বৃষ্টি হতে পারে।”
আমি বললাম, “গাড়িতে যাচ্ছি, ভয় কীসের?”
প্রায় অর্ধেক রাস্তা গেছি। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে রাস্তা। হঠাৎ হুড়মুড় করে বৃষ্টি এল। তার সঙ্গে মুহুর্মুহু বজ্রপাত। এরপর শিউচরণ জানাল, গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। শিউচরণ গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। গাড়ির বনেট খুলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে অনেক কিছু চেক করল।
“না সাব, কী হল বুঝতে পারছি না।”
আমি বললাম, “গাড়িতে তেল আছে তো?”
“হাঁ সাব, তেল তো অনেক আছে। বোধ হয় ব্যাটারি খারাপ।”
“এখন কী করা যায়?”
আমার কথা শুনে শিউচরণ বলল যে চার কিলোমিটার জঙ্গল দিয়ে হেঁটে গেলে বড়ো রাস্তা পড়বে। ওখানে এক গ্যারাজ আছে। ওর দোস্ত এটার মালিক। একটা গাড়ি নিয়ে বা মেকানিক নিয়ে আসবে।
ততক্ষণে বৃষ্টি কমে গেছে। আমি বললাম, “তাহলে আমরা গাড়িতেই বসে থাকি।”
শিউচরণের তাতে প্রবল আপত্তি। এটা খুব খতরনাক জায়গা। বুনো জানোয়ার আছে। তাছাড়া ডাকাতের ভয়। ও বলল, “সাবের যদি ভয়-ডর কম থাকে তাহলে দু-কিলোমিটার দূরে একটা পুরোনো পোস্টাপিস আছে। ওখানে আমি বিশ্রাম নিতে পারেন।”
গাড়িতে দুটো টর্চ আছে, ছাতা আছে। আমি বললাম, “পোস্টাপিসে কেউ থাকে না?”
“না, সাব। এখান দিয়ে একটা ট্রেন লাইন যাবার কথা ছিল। ওই বাড়িটা ওয়ার্কারদের থাকার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।”
“কিন্তু তুমি ভয়-ডরের কথা বলছিলে কেন? এটা কি ভূতুড়ে বাড়ি? আর এটাকে পোস্টাপিস বলে কেন?”
আমার কথা শুনে শিউচরণ দু-কানে হাত দিয়ে বলল, “রাম রাম সাব, ভূতুড়ে কি না জানি না, তবে নানা গল্প লোকে বলে।”
“কী গল্প?”
“ওখানে সাব এক পোস্টমাস্টার থাকতেন। ওঁর অউরত কলেরায় মারা যান। পোস্টাপিস ছিল এক গাঁওতে। ওখান থেকে চার কিলোমিটার দূরে। তবে পোস্টমাস্টার সাব খুব ভালো লোক ছিলেন। ওঁর বাড়িতে উনি ছুটির দিনে পোস্টকার্ড, স্ট্যাম্প বিক্রি করতেন। গ্রামে একটা বয়স্ক লোকেদের জন্য নাইট স্কুল আছে, উনি ওখানে পড়াতেন। কোনও পয়সা নিতেন না। গাঁওয়ের বেশিরভাগ লোক সাব লেখাপড়া জানে না। উনি কারোর দরকার পড়লে চিঠি লিখে দিতেন। মানি অর্ডার এলে আঙুলের ছাপ নিয়ে টাকা দিতেন।”
“কী নাম ছিল ওঁর? এখন কোথায় থাকেন?”
আমার প্রশ্ন শুনে শিউচরণ দু-হাত কপালে ঠেকাল।—“এঁর নাম ছিল সাব রামপ্রসাদ। অনেকদিন হল মারা গেছেন।”
“কী হয়েছিল ওঁর?”
“মালুম নহি সাব। এক রবিবার গাঁওয়ের এক লোক পোস্টকার্ড কিনতে ওঁর বাড়িতে গিয়েছিল। গাঁওয়ের সবাই ওঁকে মাস্টারজি বলে ডাকত।
যে লোকটি পোস্টকার্ড কিনতে গিয়েছিল, মাস্টারজি চেয়ারে নেই দেখে অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া পেল না। তো সাব বাড়ির দরজা খোলা, ভিতরে ঢুকে দেখে মাস্টারজি বিছানায় শুয়ে আছে। একটা হাত বুকের উপর রাখা। লোকটার নাম মাখন সিং। মাখন ভয় পেয়ে গ্রামের কয়েকজনকে ডেকে আনে। গাঁও থেকে আট কিলোমিটার দূরে এক ডাক্তার থাকতেন। কোলকাতা থেকে পাস করা। কয়েকজন গিয়ে ডাক্তারসাবকে ডেকে আনে। ডাক্তারসাব দেখে বললেন—কী যেন বলে সাব, কার্ডিয়াক না কী?”
“কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।” আমি ওঁদের উচ্চারণেই বললাম।
“হ্যাঁ সাব, ডাক্তারসাব তাই বলেছিলেন। ও-বাড়িতে কেউ এখন থাকে না।”
বাড়ির তালার চাবি কোথায় পাব আমার এই প্রশ্ন শুনে শিউচরণ হেসে বলল, “বাড়িতে তালা দেওয়া নেই। বাহিরে থেকে হুড়কো দেওয়া আছে যাতে জানোয়ার না ঢোকে।”
আমি বুঝলাম জানোয়ারের তো ভূতের ভয় নেই, কাজেই এটা ভালো বুদ্ধি।
শিউচরণ আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি থেকে একটা ঝোলা ব্যাগ আমাকে দিয়ে বলল, “এর মধ্যে কম্বল আছে, ছাতা আছে আর টর্চ, মোমবাতি দেশলাই ভি আছে।”
তিন ঘণ্টার মধ্যে ও চলে আসবে আশ্বাস দিয়ে শিউচরণ দোস্তের গ্যারাজের রাস্তায় রওনা হয়ে গেল। বাড়িটা শেষ কবে ও দেখেছে শুনে যেতে-যেতেই বলল, “দু-সাল আগে। আর বাড়ির সামনে একটা বিরাট বটগাছ আছে, বাড়ি চিনতে কোনও তকলিফ হবে না।”
শিউচরণ চলে যাবার পর ওর দেখানো রাস্তাতেই হাঁটা শুরু করলাম। ঝোলা থেকে একটা পাঁচ ব্যাটারির টর্চ বার করেছি। টর্চের আলোয় রাস্তা দেখা যাচ্ছে। সরু হাঁটার রাস্তা। শীতকালে হয়তো জিপ যেতে পারবে, কিন্তু এই বৃষ্টির পর কোনও গাড়ি যাওয়া সম্ভব নয়। শিউচরণ হয়তো হেঁটেই আসবে আমাকে নিতে।
রাস্তায় কিন্তু কাদা নেই। শুকনো মাটি জল শুষে নিয়েছে। তাও পা টিপে টিপে হাঁটছিলাম। আলো দেখলে হয়তো জানোয়ার আসবে না, কিন্তু সাপ আসতে পারে। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আকাশে নিকষ কালো মেঘ। টর্চের আলো রাস্তা থেকে প্রতিফলিত হয়ে আশেপাশের গাছগুলিতে পড়েছে। এই আলো-আঁধারে গাছগুলিকে কিম্ভূতকিমাকার দৈত্যের মতো দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে শাল-সেগুনের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলেছি। দু-একটা বটগাছও চোখে পড়ল। অন্য গাছগুলো চিনতে পারলাম না।
আর টর্চ জ্বালিয়ে গাছ দেখতে ভরসা পাচ্ছি না। ব্যাটারি ফুরিয়ে গেলে কাহিল অবস্থা হবে। ঝিঁঝিঁর আওয়াজ আর গাছের পাতার হাওয়ার শিরশিরে শব্দ শুনে হেঁটে চলেছি। মাঝে মাঝে মনে হল হুড়মুড় করে কে যেন ছুটে জঙ্গলের একধার থেকে আর একধার ছুটে গেল। হয়তো বুনো শুয়োর।
কতক্ষণ এভাবে চলেছি জানি না, প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো হেঁটে চলেছি। মনে হচ্ছে জঙ্গল আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছে। আশেপাশে টর্চ ফেলে দেখলাম দু-পাশে মাঠ। মাঠের উপর ঘাসও আছে মনে হল। সামনে টর্চ ফেলে দেখতে পেলাম অস্পষ্ট একটা সাদা কিছু। বুঝলাম এটাই পোস্টাপিস। এরপর হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম।
যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। একটা সাদা রঙের একতলা বাড়ি। বাড়ির অনতিদূরে একটা প্রাচীন বটগাছ। বাড়িটার সামনে হুড়কো দেওয়া। খুলে ভিতরে ঢুকলাম। যতটা নোংরা আর ধুলো থাকবে ভেবেছিলাম ততটা নেই। শিউচরণ একটা বেঞ্চের কথা বলেছিল, এটি সামনের ঘরে এখনও আছে। দুটি ঘর আছে। সামনের ঘরে হয়তো টেম্পোরারি পোস্টাপিস ছিল। পেছনের ঘরে পোস্টমাস্টার থাকতেন। তবে কোনও খাট বা চেয়ার নেই।
॥ ৬॥
প্রথম ঘরের কোণে একটা ফুলঝাড়ু আছে, ওটা দিয়ে বেঞ্চের উপরটা একটু সাফ করে শুয়ে পড়লাম। নানান চিন্তা মাথায় আসছিল। শিউচরণ যদি মেকানিক বা গাড়ি না আনতে পারে তাহলে এখান থেকে বেশ খানিকক্ষণ হেঁটে গ্রামে পৌঁছতে হবে। কিন্তু শরীর দিচ্ছে না। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে গেল।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না, মুখে সকালের রোদ পড়তে ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু রোদ কোথা থেকে এল? আমি তো সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
॥ ৭॥
চোখ কচলে দেখি আমি একটা মাঠের উপর শুয়ে আছি। কোথায় পোস্টাপিস, কোথায় সেই বটগাছ? চারদিকে ধু ধু করছে মাঠ। আর সামনে দেখি দুবে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছে। আমি ধড়মড় করে উঠে পড়লাম।
“আপনি ঠিক আছেন স্যার?”
আমি বললাম, “একটু মাথা ধরা ছাড়া আমি ঠিক আছি। একটু জল আনতে পারেন?”
‘এখুনি আনছি’ বলে দুবে একটু দূরে যেতেই আমি দাঁড়িয়ে উঠে চারদিকে তাকালাম। কিছুটা দূরে দেখি একটা ছোটো নোটবুকের মতো কী যেন পড়ে আছে। আমি কুড়িয়ে নিয়ে দেখলাম, আরে, এটা তো আমারই একটা পুরোনো ডায়েরি! দু-বছর আগে হারিয়েছিলাম। দুবে আসার আগেই আমি ওটা পকেটস্থ করলাম। আধ মিনিটের মধ্যে দুবে একটা গ্লাসে করে জল নিয়ে হাজির।
“আপনি খুব লাকি।”
“কেন?” আমি ওর কথা শুনে বললাম।
“তার আগে বলুন আপনাকে এ-জায়গার খবর কে দিয়েছে।”
“কেন, শিউচরণ!”
“শিউচরণ কাল রাতে মারা গেছে। যেখানে গাড়ি পাওয়া গেছে তার এক কিলোমিটার আগে ওর ডেড বডি পাওয়া গেছে।”
“সে কি! কী করে মারা গেছে?”
“হার্ট ফেল। ডাক্তার বলল, প্রচণ্ড ভয় পেয়ে হার্ট ফেল করেছে। আচ্ছা স্যার, বলুন তো গাড়ি খারাপ হওয়ার আগে কি শিউচরণ গাড়ি থামিয়েছিল?”
“হ্যাঁ, একবার গাড়ি থামিয়ে বলল বাথরুম যাবে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরে এসেছিল।”
“তার মানে যে ফিরে এসেছিল সে শিউচরণ নয়।”
“সে কি! সে তাহলে কে?”
“তা তো জানি না। এরকম ঘটনা আগেও ঘটেছে। আমারই দোষ। আপনাকে একা ছাড়া উচিত হয়নি। রাত্রিবেলা আপনর কোনও খবর না পেয়ে আমি ফোন করে হাজারিবাগ থেকে গাড়ি আনাই। খুব সকালেই বেরিয়ে পড়ি। যেখানে অন্য শিউচরণ আপনার গাড়ি খারাপ হয়েছিল বলেছিল, ওখানেই আসবার পথে গাড়িটা পেলাম। গাড়ি বিলকুল ঠিক আছে। আমার বাড়িতে ওটা পাঠিয়ে দিয়েছি।”
“কিন্তু পোস্টাপিস, বটগাছ?”
“কুছ নহি স্যার। পোস্টাপিস দু-বছর আগে ভেঙে ফেলা হয়েছে। বটগাছও কাটা হয়েছে। এখানে একটা স্কুল হবে। রামজির কৃপায় আপনি বেঁচে গেছেন।”
দুবের কথা অবিশ্বাস করতে পারলাম না। কিন্তু কাল রাতে এই বাড়িতে থাকা, সামনের বটগাছ এখনও চোখের সামনে ভাসছে। সব চোখের ভ্রম! মানতে পারলাম না।
দুবেকে বলিনি, তোমাদের বলি। ওই ডায়েরিতে আমার নিজের হাতে লেখা পোস্টাপিসের বিবরণ আর তারিখ। এই পোস্টাপিসে দু-বছর আগেও আমি এসেছিলাম।