জয়ঢাকের নাট্যশালা:
হাবুদের ডালকুকুরে , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুরাতন ভৃত্য , যোগীনদাদা –রবীন্দ্রনাথের কবিতার নাট্যরূপঃ (তাপস শঙ্কর ব্রহ্মচারী) রাজপুত্তুর, (কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়) সেলফিশ জায়েন্ট- (অনুপম চক্রবর্তী,) পুজোর প্রস্তুতি (আশুতোষ ভট্টাচার্য), অমৃতযাত্রী(কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়), চিচিং ফাঁক(কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়), নিউটনের সঙ্গে একবেলা(বামাচরণ ভট্টাচার্য), ঘ্যাঁঘাসুর (কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়), গুরুদক্ষিণা (কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়) , বোম্বাগড়ে গুপিবাঘা(সাগ্নিক ভট্টাচার্য), কুমিরের বন্ধু (কিশোর ঘোষাল)

পাত্র পাত্রী
ছোটো আলাদিন, ওই বন্ধুর দল, বড়ো আলাদিন, ওই বন্ধুর দল, জাদুকর মুসিবান, আংটির দৈত্য, প্রদীপের দৈত্য, আলাদিনের মা, রাজকন্যা বুদুর, প্রহরী, সুলতান, উজির, সভাসদবৃন্দ, রক্ষীদল, ঘোষক, বান্দা।
(সামান্য পোশাকের হেরফের ঘটিয়ে রক্ষীদলই পরে সভাসদবৃন্দে পরিণত হতে পারে। প্রহরী ও বান্দা একজনই হতে পারে। আলাদিনের বন্ধুসংখ্যা অভিনেতাপ্রাপ্তির ওপর নির্ভরশীল)
প্রথম দৃশ্য
(পর্দা খুলে যায়। অল্প আলোয় গা ছমছম করা এক পাহাড়ি এলাকা।
জাদুকর মুসিবান সামনে ধোঁয়া জ্বেলে যজ্ঞ করছে)
জাদুকর:
(মন্ত্র) চিম্বাসাউ ইহিন
জিম্বাসাউ ইহিন —
দ্রাহি দ্রাহি দ্রাহি উর্র্র্-র্ – রুঘাম —
আন্নুরিয়াবাং পান্নুজিয়াবাং অন্তরন্তরজাং …
উম্বুরা—ঙ গুলুহুজা—ঙ উন্ডুভুন্ডুরুসাং — / মন্তরাং বাং চাং (২)
(ছন্দে) আম্বুরাম্বুরু গুলুগুলাম্বা / খুল্লু খুল্লু রে গুলুগুজাম্বা
অন্তরন্তর গুরুগুরাম্বা / দম্ভসম্বলমাং — মন্তরাং বাং চাং (২)
আয় রে আয় যত / দত্যি দানো দল / রত্নভান্ডার / কোথায় খুলে বল্ / আমি যে জাদুকর / দূর বিদেশে ঘর / নাম যে মোর মুসিবান —/ মস্ত ক্ষমতাবান —/ মন্তরাং বাং চাং —
হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ। পেয়েছি, পেয়েছি। এতদিনে খুঁজে পেয়েছি। সেই রত্নভান্ডারের চাবিকাঠি এখন আমার হাতে। সেই রত্নভান্ডার, তার চাবি এখন আমার। কত রত্ন, কত মণি, সব হাতিয়ে হবো ধনী। দুনিয়ার সেরা ধনী। টাকা দিয়ে আর জাদু দিয়ে গোটা দুনিয়া করব আমার বশ। (হাসি)
কিন্তু — সেই যে প্রদীপ, টাকার খনি,
যা হাতিয়ে হব ধনী,
আছে সেটা গোপন গুহায়
কেউ যেন খবর না পায়।
আছে সেটা সুদূরে এক মরুভূমির প্রান্তে
নিষ্পাপ এক শিশু শুধু পারবে সেটা আনতে।
তার নাম হবেই হবে জানতে।
আমার এই জাদু ধোঁয়ায় — (হাসি)
ফুটে উঠবে জাদুর ছোঁয়ায় —
(আবার মন্ত্র পড়ে) আঙ বাঙ চাঙ — / উম্বুরুম্বুসাঙ — / উঠুক ফুটে নাম —
উঠেছে, উঠেছে — ফুটে উঠেছে — তার নাম আলাদিন, আলাদিন, আলাদিন —
(দুহাত তুলে হাসতে থাকে। আলো নেভে)
দ্বিতীয় দৃশ্য
(দৃশ্যান্তরের আবহ। সেই আবহের রেশ থাকতে থাকতেই দুপাশ থেকে দুই মানিকজোড় ছুটে এসে নাচতে নাচতে গান ধরে)
গান – ১ (এক + দুই)
শোনো শোনো — গল্প শোনো
শোনো শোনো গল্প শোনো চুপটি করে বসে
আজ তোমাদের নিয়ে যাব রূপকথারই দেশে।।
চীনদেশে এক ছোট্ট ছেলে বয়েসেতে সে নবীন
নাম ছিল তার আলাদিন
নাম ছিল তার আলাদিন।
তার কথাটি গল্প হয়ে থাকবে মনে চিরদিন
নাম ছিল তার আলাদিন
নাম ছিল তার আলাদিন।।
তার ছিল এক দুঃখী মা
আর কেউ তার ছিল না,
সেই মা তাকে ভিক্ষে করে খাওয়াত যে প্রতিদিন।।
ভয় ডর তার ছিল না
কারো কথাই শুনত না
বন্ধু নিয়ে মাঠেঘাটে খেলত শুধু সারাদিন।।
এইভাবে দিন কাটে তার
অনেক বছর হল পার
এমন সময় শোনো বলি ঘটল কী যে একদিন।
ঘটল কী যে একদিন — ঘটল কী যে একদিন —
(গান শেষ হতে এক ও দুই পরস্পরের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে)
এক। কী ঘটল?
দুই। কী ঘটল?
এক। (এবার দর্শকদের) কী ঘটল?
দুই। ঘটলটা কী?
এক। আরে দূর! সেটা তো আমরাই বলব।
দুই। (মাথায় হাত দিয়ে জিভ কেটে) তা—ই—তো!
(এটা দুইয়ের একটা মুদ্রাদোষ। বারবার ঘুরেফিরে আসবে)
কিন্তু — বলব কেমন করে?
এক। কেমন করে আবার? যেমন করে লোকে গল্প বলে! সেই যে, এক ছিল রাজার ছেলে — আরে না না। এঃ হে … এক ছিল দর্জির ছেলে, তার নাম ছিল আলাদিন। খুব ছোট্টবেলায় তার বাবা একদিন পট্ করে মরে গেল। তখন তার মা কত দুঃখকষ্ট করে তাকে মানুষ করতে লাগল। কিন্তু আলাদিন ছোট্ট হলে কী হবে, তার মাথায় কিন্তু খুব বুদ্ধি। বন্ধুদের মধ্যে সে-ই ছিল সর্দার। এই রকম করে আস্তে আস্তে আলাদিন বড়ো হয়ে উঠতে লাগল, তখন একদিন —
দুই। সেই জোচ্চোরটা এসে তার কাকা সেজে —
এক। আরে চুপ চুপ চুপ। (রেগে) গলগল করে সব বলে ফেললে লোকে দেখবেটা কী, অ্যাঁ?
দুই। তা—ই—তো! তাহলে কী হবে?
(তবলার তালের সঙ্গে এক ও দুই ছন্দে কথা বলে)
এক। সব হবে, সব হবে, আলাদিন নাচবে।
জোচ্চোর জাদুকর কাকা সেজে আসবে —
দুই। অং বং চং লং মন্তর পড়বে
প্রদীপের খেলা হবে, দত্যিরা আসবে —
এক। এবারের মতো তবে আমাদের ক্ষ্যামা দিন
কেটে পড়ি, ভেগে পড়ি, ওই আসে আলাদিন —
(দুজনে একই দিক দিয়ে ছুটে পালিয়ে যায়। অন্যদিক দিয়ে বন্ধুবান্ধবসহ ছোটো আলাদিন প্রবেশ করে নাচগান করতে করতে)
গান – ২ (আলাদিন ও বন্ধুরা)
আয় খেলি আয়, আয় খেলি আয় নতুন খেলা।
এই মাঠে আজ বসবে মোদের প্রাণের মেলা।।
লা লা লা লা —
এই মাঠে আজ মিলব ভাই
যার যা খুশি করব তাই
নেচেগেয়ে আজ কাটাব সারাবেলা।।
লা লা লা লা —
কোন বাধাই মানব না
কারো কথাই শুনব না
হৃদয় ভরে বাইব রে আজ খুশির ভেলা।।
বন্ধু ১। আলাদিন! আলাদিন! আজ আমরা কী খেলব?
আলাদিন। আজ হবে একটা নতুন খেলা।
বন্ধুরা। কী খেলা? কী খেলা?
আলাদিন। (যুদ্ধের ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে) যুদ্ধ!! আজ আমরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলব। আমি হব রাজা। (প্রথম বন্ধুকে) তুই হবি আমার সেনাপতি। আর তোরা সব অন্যদেশের সৈন্য। আমরা দুজনে মিলে তোদের কচুকাটা করব।
বন্ধুরা। কী মজা! কী মজা! তবে তাই হোক। চলো, যুদ্ধে চলো।
(কিছুক্ষণ যুদ্ধের অভিনয় চলে। তারপরেই প্রবেশ করে জাদুকর)
জাদুকর। আলাদিন!!!
(বন্ধুরা সবাই ভয়ে সিঁটিয়ে যায়। শুধু আলাদিন বুক ফুলিয়ে দু পা এগিয়ে আসে)
আলাদিন। কে তুমি? তোমাকে তো চিনি না!
জাদুকর। হুঁ: হুঁ: হুঁ: হুঁ:। চিনতে পারলি না তো? চিনবি, চিনবি। ওরে, আমি তোর চাচা রে! সেই কবে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। তোর তখন জন্মই হয়নি। চিনতে পারবি কী করে? আয় আয় আয়। কাছে আয়, কাছে আয়।
(ঝোলা থেকে খাবারদাবার বার করে)
এই নে, খা। ওদের সব দে।
(খাবার দেখে বন্ধুরা সব এক-পা দু-পা করে এগিয়ে আসে। আলাদিন ওদের খাবার ভাগ করে দেয়। নিজেরটা পকেটে রাখে। যাদুকর মাথা নাড়তে নাড়তে দেখতে থাকে)
জাদুকর। কী রে? তুই খাবি না?
আলাদিন। থাক। বাড়ি গিয়ে মায়ের সঙ্গে খাব।
জাদুকর। বা বা বা! লক্ষ্মী ছেলে। চল, তাই চল। হ্যাঁ, বাজার থেকে তোদের জন্য খাবারদাবার, জামাকাপড় সব কিনে নিয়ে যেতে হবে। রাত্তিরে চাপাটি আর কাবাব খেয়ে তোফা ঘুম। তারপর … কাল … কাল তোকে নিয়ে যাব সেইখানে —
আলাদিন। কোথায়?
বন্ধুরা। কোথায় নিয়ে যাবে আলাদিনকে?
জাদুকর। সে এক জাদুর রাজ্য।
সেখানে গাছে গাছে হীরে ফলে,
মুক্তো দোলে পাতায় পাতায়।
চোখ তুললেই মানিক জ্বলে,
রত্ন ঝরে পড়ে মাথায়।
বাগিচাতে খুশবু ভাসে,
রঙের খেলা দূর আসমানে —
বেহেস্ত্ থেকে পরী আসে,
মানুষ সেথায় বাদশা বনে।
আলাদিন। (স্বপ্ন দেখার মতো বলে) সত্যি? সব সত্যি?
জাদুকর। স—ব সত্যি। (সম্মোহন করে)
বন্ধুরা। আমরাও যাব। আমরাও যাব।
জাদুকর। যাবে, যাবে, সবাই যাবে। তবে হ্যাঁ, একটা কাজ করতে হবে। যে পারবে করতে / বুঝব সে-ই ভয় পায় না মরতে। খুবই কঠিন কাজ যে — / পারলে তবেই যাবে জাদুর রাজ্যে।
অং বং চং লং —
হাঁকুপাকু রঙ চঙ
সাজুগুজু বুঝু সঙ
রাগে মাগে বাগে টং।
(জাদুকর মন্ত্র পড়তে পড়তে মঞ্চের চারিদিকে ঘোরে। তারপর হঠাৎ দেখা যায় তার হাতের চেটোয় আগুন জ্বলছে)
আয় আয় আয় আয় / দেখি কে নেভায়। আগুনে যে নেভাবে, সে-ই আমার সঙ্গে যেতে পাবে।
(বন্ধুরা কেউ এগিয়ে আসে না, শুধু আলাদিন বীরদর্পে এগিয়ে এসে আগুন নিভিয়ে দেয়)
জাদুকর। (দুহাতে আলাদিনকে জড়িয়ে একবার তুলে ধরে) ইলিম্বা গিলিম্বা সিলিম্বা। এই তো আমার আলাদিন। পেয়েছি, পেয়েছি। চল্ চল্ চল্। জলদি চল্। চটপট খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়তে হবে। তারপর কাল ভোরবেলা উঠেই —
আলাদিন। (দুহাত ওপরে তুলে) জাদুর রাজ্য!!
তৃতীয় দৃশ্য
(পেছনের পর্দা তুলে ক্রমান্বয়ে এক ও দুই মঞ্চে ঢোকে। কথার সঙ্গে সঙ্গে তারা মঞ্চের
একদিকে আলাদিনের বাড়ির set লাগায়)
এক। কী বুঝলে?
দুই। বুঝলেটা কী?
এক। (ছন্দে) শুরু হয়ে গেল তাক-তেরে-কেটে তাক।
এল জাদুকর, সব মেরে-কেটে ফাঁক।
দুই। মায়াজাল, সব মায়াজাল, শোনো বলি।
হায় হায়, বুঝি আলাদিন হল বলি।
এক। মায়ার কাজল বুলিয়েছে তার চোখে,
আলাদিন শুধু ছুটে চলে তার ঝোঁকে।
দুই। মায়ের শাসন, ভালোবাসা বোঝে না সে —
জাদুর রাজ্য চোখের সামনে ভাসে।
(Set প্রস্তুত করে দিয়ে ওরা বেরিয়ে যায়। অন্যদিক দিয়ে মা ঢোকে, পেছনে পেছনে আলাদিন আর জাদুকর মুসিবান)
আলাদিন। না না না। আমি কিচ্ছু শুনব না। আমি চাচার সঙ্গে যাব, ব্যস।
মা। ওরে না না না। অমন কথা বলিস নে। তুই যে আমার আসমান, আমার গুলবাগিচার কলি। তোকে ছেড়ে আমি যে এক মুহূর্তও থাকতে পারি না।
আলাদিন। ওসব আমি জানি না। চাচার সঙ্গে সেই জাদুর রাজ্যে আমি যাবই। (পা দপদপিয়ে চলে যায়)
মুসিবান। সাব্বাস বেটা আলাদিন। এই তো চাই। এই তো আমার ভাইপোর মতো কথা! দ্যাখো ভাবী দ্যাখো, তোমার এইটুকু ছেলে একফোঁটা ভয় পায় না, আর তুমি মা হয়ে ভয়ে কাঁপছ। আজ যদি ভাইজান থাকত, তাহলে পারতে, পারতে এইভাবে ছেলেকে আটকে রাখতে? সে যদি থাকত, ছেলেকে ঘরকুনো করে না রেখে জোর করে ঠেলে পাঠাত বাইরে, নানা দেশ, নানা মানুষজন দেখে তবেই তো ছেলে মানুষের মতো মানুষ হয়ে —
মা। (ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে) চুপ করো, চুপ করো ভাইজান। আমার এই একমাত্র ছেলেকে আমার থেকে কেড়ে নিয়ো না।
মুসিবান। শোনো ভাবী, পৃথিবীতে আমার আপন বলতে তুমি আর আলাদিন ছাড়া আর কেউ নেই। এই যে আমি এতদিন সব ছেড়ে দেশবিদেশে ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি, এত টাকাকড়ি-মোহর জমিয়েছি, এসব কীসের জন্যে? কী হবে আমার এইসবে? এই সবকিছু ধনসম্পত্তি আমি আমার এই ছোট্ট আলাদিনকে দিয়ে যাব।
মা। তার মানে?
মুসিবান। হ্যাঁ গো ভাবী। সেইজন্যেই তো আলাদিনকে আগে মানুষের মতো মানুষ করে তুলতে হবে। দেশবিদেশ না ঘুরলে, মানুষজনের সঙ্গে না মিশলে আলাদিন বড়ো হয়ে উঠবে কী করে? দেশের দশের একজন হয়ে উঠুক আমাদের আলাদিন, তুমি কি চাও না, বলো? আর এই যে এত ধনসম্পত্তি ও পাবে, সেগুলো তো রাখতে জানতে হবে ওকেই, না কি?আমি তো বুড়ো হয়েই এসেছি, আর কি প্রয়োজন আমার এইসবে? কিন্তু — কিন্তু তোমাদের দুঃখকষ্ট তো ঘুচবে! আমার আলাদিন পেট ভরে খেতে পাবে!
মা। বোলো না, বোলো না, আর বোলো না। আমি সব সইতে পারি, কিন্তু আমার দিলের কলিজা, আমার আলাদিনের একফোঁটা কষ্ট আমি সইতে পারি না। যাও ভাইজান, নিয়ে যাও আলাদিনকে তোমার যেখানে ইচ্ছা। ওকে আমি তোমার হাতেই সঁপে দিলাম।
মুসিবান। ইলিম্বা গিলিম্বা সিলিম্বা! তবে তাই হোক। আমিই ওকে মানুষ করার ভার নিলাম। কালই শুরু হবে ওর দীক্ষা। যাও যাও, চটপট খানার ব্যবস্থা করো। অনেক রাত হল, অনেক।
(আলাদিনের মায়ের প্রস্থান)
মুসিবান। (স্বগত) হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ।
কেউ পারেনি, কেউ পারেনি জানতে।
কাল ওকে নিয়ে যাব সেই পাহাড়ের প্রান্তে।
খুলতে হবে গুহার বন্ধ দ্বার —
তারপর? মণি, মানিক, মুক্তো, হীরে গোটা দুনিয়ার —
সব, স-ব আমার হবে, শুধু একা আমার (হাসি)
(দুহাত শূন্যে তুলে মাথা ঝুঁকিয়ে নাড়তে থাকে। আলো নেভে)
চতুর্থ দৃশ্য
(এক ও দুই প্রবেশ করে গান গাইতে গাইতে। আলো-ছায়ায় ওদের গান ও নাচ চলে সারা মঞ্চ জুড়ে। জাদুকর ও আলাদিনের চলার ভঙ্গী। গানের ফাঁকে ফাঁকে এক ও দুই set পরিবর্তন করে মঞ্চের পেছনদিকে গুহার set লাগায়)
গান – ৩ (এক ও দুই)
এক। চলতে থাকে, আলাদিন চলতে থাকে।
জাদুকরের সঙ্গে সে চলতে থাকে।
মাঠ ও প্রান্তর বন-বনান্তর
মরুভূমি পেরিয়ে আলাদিন চলে আলাদিন ।।
দুই। চলতে থাকে, আলাদিন চলতে থাকে।
ক্লান্ত দেহ, তবু সে টানতে থাকে।
খাঁ খাঁ রোদ্দুর আরো কদ্দুর
কোন্ সে অচিন ঠিকানায় আলাদিন চলে আলাদিন ।।
(ওরা বেরিয়ে যায়। শ্রান্ত-ক্লান্ত আলাদিন ও জাদুকরকে দেখা যায়। তারা কেবল মঞ্চের সামনের দিকটা ব্যবহার করে, পেছনে গুহার set–এ আলো পড়ে না)
আলাদিন। ওঃ! আর পারছি না চাচা। আর কত দূর?
মুসিবান। চল্ বাবা চল্। আর একটু পা চালিয়ে চল্। আমরা তো প্রায় পৌঁছেই গেছি। ওই যে দূরে পাহাড়টা দেখছিস, বাঁদিকে একটা উঁচু টিলা আর ডানদিকে ধূ ধূ করছে মরুভূমি, ওইখানে, ঠিক ওইখানে আমরা যাব। ওই পাহাড়টার নিচেই আছে সেই —
আলাদিন। জাদুর রাজ্য।
মুসিবান। না। রাজ্য নয়, রাজ্য নয়, সা—ম্রা—জ্য!! সা—ত—শো রাজার ধন এক মানিক — আশ্চর্য প্রদীপ!!
(জাদুকরের মুখের ওপরে আলো Fade out হয়। অন্ধকার মঞ্চে ধীরে ধীরে গুরুগম্ভীর সঙ্গীত বেজে উঠতে থাকে। আবছায়া আলোয় দেখা যায় গুহার মুখের সামনে জাদুকর ও আলাদিন। জাদুকর জাদুদন্ড দিয়ে ধোঁয়ার সৃষ্টি করে ও সুর করে মন্ত্রপাঠ করতে থাকে)
চিম্বাসাউ ইহিন্
জিম্বাসাউ ইহিন্
দ্রাহিম্বি খুলুম্বাম্ গুহাং
মহায়াহাং গুহায়াহাং
খুলিয়াঙ গুলিয়াঙ ঘুলিয়াঙ
ইলিকাঙ বিলিকাঙ ঝিলিকাঙ —
ও – ও – ও – ও – ও – ও – ওয়াঙ!!!
(মন্ত্র শেষ করেই মুঠোয় করে সামনে কিছু ছুঁড়ে মারে। সঙ্গে সঙ্গে আগুন জ্বলে ওঠে। আর তখনই অদ্ভুত নাচের সঙ্গে জাদুকরের গান শুরু হয়)
গান – ৪ (জাদুকর)
দেরি নয় দেরি নয় দেরি ন—য় দেরি আর।
খুলে যা — খুলে যা খুলে গুহার দ্বার।।
যা খুলে যা খুলে যা খুলে যা খুলে।।
হোথা যত মণিমুক্তো আর ধনরত্ন
কোনকিছু নয় দরকার নয় নয় দরকার।।
শুধু একটা পিদ্দিম লোহার পিদ্দিম
র করে নিই করে বার করে নিই করে বার।।
(গান শেষ হতে না হতেই Music-এর সঙ্গে সামনে গুহামুখ খুলে যায়)
মুসিবান। (হাসি) খুলেছে, খুলেছে!! দুনিয়ার সেরা রত্নভান্ডার আজ উন্মুক্ত আমার সামনে! যা! যা যা যা। ওই সামনে দেখছিস কালো পাথরটা! ওর সঙ্গে আংটা লাগানো! ওর সামনে দাঁড়িয়ে বল্ — ‘আমি মুস্তাফা দর্জির ছেলে আলাদিন’। ব্যস, তারপর আংটা ধরে টানলেই — জাদুর রাজ্য! তুই ছাড়া দুনিয়ার কারও সাধ্য নেই ওই পাথর টেনে খোলে। যা যা যা। চটপট কর!
(আলাদিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভেতরদিকে পাথরের কাছে যায়। আংটা ধরে বলে)
আলাদিন। আমি মুস্তাফা দর্জির ছেলে আলাদিন। (পাথর সরে যায়)
মুসিবান। হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ। সব, স-ব মিলে যাচ্ছে। আমার গণনা একেবারে নির্ভুল। আর দেরি নেই। বিশ্বের সবসেরা ক্ষমতা আমার হাতের মুঠোয়। হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ। (ফিসফিসিয়ে) আলাদিন! ওই দেখ সারবাঁধা সিঁড়ি চলে গেছে নিচের দিকে। ওটা ধরে তোকে নেমে যেতে হবে নিচে।
আলাদিন। (ভয়ে ভয়ে) না না চাচা। সে আমি পারব না। ওখানে কী বিরাট অন্ধকার!!
মুসিবান। দূর বোকা! অন্ধকার কী রে? বাইরে থেকে দেখতে অন্ধকার, কিন্তু নামলেই দেখবি মণি-মানিক্যের আলোয় চারিদিক ঝলমল ঝলমল করছে।
আলাদিন। না চাচা না। আমার ভীষণ ভয় করছে।
মুসিবান। কোনও ভয় নেই রে, কোনও ভয় নেই।
(ঝোলা থেকে আংটি বার করে আলাদিনকে দেয়)
এই নে, এই মন্ত্রপূত আংটিটা হাতে পরে নে, তাহলে আর কোনও বিপদের ভয় থাকবে না। নির্ভয়ে নেমে যাবি নিচে। গেলেই দেখবি, চারিদিকে ঝকমকে সূর্যের আলোর মতো আলো। সেখানে রূপোর গাছে পান্নার ফল আর পোখরাজের পাতা। ওসব কোনদিকে দেখবি না। সোজা হেঁটে যাবি। পরপর তিনটে ঘর পড়বে। প্রথম ঘরে জালাভর্তি সোনার মোহর। দ্বিতীয় ঘরে মুক্তোর পাহাড় আর তৃতীয় ঘরে হীরে, শুধু হীরে।
আলাদিন। কী মজা! কী মজা!
মুসিবান। খবরদার! যাবার সময় ভুলেও কোনও ঘরের কিছুতে হাত দিবি না। তাহলেই পাথর হয়ে যাবে তোর সর্বাঙ্গ।
আলাদিন। তাহলে … আমি কী করব চাচা?
মুসিবান। সোজা এগিয়ে যাবি। ঘর পেরোলেই বারান্দা। সেই বারান্দার শেষে একটা কুলুঙ্গিতে আছে সেই সাতশো রাজার ধন — আশ্চর্য প্রদীপ! ওই প্রদীপটা নিয়ে সোজা চলে আয়, এনে তুলে দে আমার হাতে — ব্যস, (হাসি) দেখবি জাদুবলে আমরা হয়ে যাব তামাম দুনিয়ের সেরা ধনী। দুনিয়ার যেখানে যত শাহেনশা-বাদশা-শাহজাদা, সবার শির আনত হয়ে কুর্নিশ করবে আমাদের।
আলাদিন। (বিমুগ্ধ) চাচা!
মুসিবান। হ্যাঁ রে। যা, আর দেরি করিস না। সোজা নেমে যা নিচে। আমি মন্ত্র পড়ছি, দেখবি সব বিপদ কেটে যাবে।
(জাদুকর গুহার ভেতরে ঢুকে আলাদিনকে যেন গর্তে নামিয়ে দিচ্ছে এমন ভঙ্গী করে। আলাদিনকে গুহার আড়ালে দেখা যায় না। শুধু একটা অন্য আলো তলার দিক থেকে জাদুকরের মুখের ওপর পড়ে। জাদুকর যেন গর্তের মুখের কাছে বসে নিচের দিকে তাকিয়ে মন্ত্র পড়তে থাকে ও আলাদিনের চলে যাওয়ার দিকে দৃষ্টি রাখে)
মুসিবান। (মন্ত্র) ডুম্বুঝুম্বুড়ু ঘুম্বুড়াং
আকিলা পাকুড়ুম ঝুকুড়ুভাং
আম্বুরাম্বুরু গুড়গুড়াম্বুরু সুঙ্গুমুঙ্গুলুপাং —
আলাদিন!! কী দেখছিস?
(যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসে আলাদিনের কথা)
আলাদিন। চাচা! এখানে সিঁড়ি শেষ হয়ে বাগিচা দেখা যাচ্ছে। কী আলো! কী আলো! আঃহা, কী সুন্দর রঙিন রঙিন গাছ!
মুসিবান। খবরদার! কিছুতে হাত দিস না। এগিয়ে যা, এগিয়ে যা।
আলাদিন। চাচা! এই তো পরপর তিনটে ঘর।
মুসিবান। যা, ঘর পেরিয়ে পেরিয়ে চলে যা। গিয়ে বারান্দা থেকে সোজা প্রদীপটা নিয়ে চলে আয়।
(কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর আলাদিনের চিৎকার শোনা যায় আরও দূর থেকে)
আলাদিন। চাচা! প্রদীপ পেয়েছি। নিয়ে যাচ্ছি তোমার কাছে।
মুসিবান। পেয়েছিস? আয় আয় আয়, জলদি আয়।
আলাদিন। যাচ্ছি চাচা। কিন্তু এখানে ঘরের মধ্যে আলোর কী ঝলকানি, আমার আঁখ ঝলসে যাচ্ছে।
মুসিবান। (ধমকে) ওসব কিছু তোকে দেখতে হবে না। তুই জলদি করে আয় বলছি!
আলাদিন। একটুখানি সবুর করো চাচা। এই বাগিচার কী দারুণ দারুণ লাল নীল ফল, মায়ের জন্য নিয়ে যাই।
মুসিবান। (অস্থির) ওরে এই শয়তানীর পো, তোকে তো জলদি করে আসতে বলছি। এবার তোকে এই গুহাতে বন্ধ করে দিয়ে চলে যাব।
আলাদিন। (ভয়ে) না চাচা না, গুহা বন্ধ কোরো না, আমি আসছি, আমি আসছি।
(জাদুকরের মুখের ভঙ্গী থেকে বোঝা যায় আলাদিন প্রায় গুহার মুখের কাছে উঠে এসেছে। জাদুকর আরও ঝুঁকে পড়ে)
মুসিবান। হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ। এই তো, এই তো লক্ষ্মী ছেলে। দে দে, প্রদীপটা দে।
আলাদিন। (কাছ থেকে গলা শোনা যায়) দেব চাচা। আগে আমাকে বাইরে বের করে নাও। আমার ভীষণ ভয় করছে।
মুসিবান। নেব নেব, নিশ্চয়ই নেব। আগে প্রদীপটা আমার হাতে দে।
আলাদিন। ওটা আমার জেবের ভেতরে আছে চাচা। বাইরে বেরিয়ে বার করব’খন। আগে আমাকে তাড়াতাড়ি বের করো।
মুসিবান। ওরে এই শয়তানের বাচ্চা। ভালোয় ভালোয় প্রদীপটা দে বলছি।
আলাদিন। চাচা! তুমি এরকম করে কথা বলছ কেন?
মুসিবান। চাচা! কে তোর চাচা? আমি ‘মুসিবান’, দুনিয়ার সেরা জাদুকর। তোকে শেষবারের মতো বলছি, ভালয় ভালোয় প্রদীপটা দিয়ে দে, নইলে —
আলাদিন। চাচা! চাচা!
মুসিবান। তবে রে ইবলিশের বাচ্চা! কথা যখন শুনলি না, তখন সারা জিন্দেগীভর গুহায় পচে মর —
আম্বুরাম্বুরু গুড়গুড়াম্বুরু ভাং —
সাঙ্গুমাঙ্গুলু পাঙ্গুঝাঙ্গুলু ঝাং —
উকুড়ুভাং সুকুড়ুভাং ঝুকুড়ুভাং —
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ —
আলাদিন। চাচা! চাচা! দোহাই আমাকে ফেলে যেও না। আমার ভয় করছে। এই নাও প্রদীপ, আমাকে বাইরে বের করো। চাচা! চাচা!
(জাদুকরের মন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে বিরাট শব্দ করে গুহার দরজা বন্ধ হতে থাকে। জাদুকরের হাসি ও নেপথ্যে আলাদিনের চিৎকার। ওই অবস্থায় অন্ধকার হয় এবং অন্ধকারের মধ্যেই set বদল হয়ে যায়। এবার গোটা মঞ্চটাই গুহার ভেতরের অংশ হয়ে যায়। আলো জ্বললে দেখা যায় ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পাথরের মধ্যে আলাদিন কাঁদতে কাঁদতে ঘোরাফেরা করছে)
আলাদিন। মা! মা গো! আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। আমার ভীষণ ভয় করছে, ভীষণ ভয় করছে। হায় আল্লা! ওই দুষমনটার হাত থেকে আমাকে বাঁচাও। মা গো! মা!
(কাঁদতে কাঁদতে আলাদিন বসে পড়ে একটা পাথরে। নিরাশায় হাত ঘষে। হঠাৎ গুরুগম্ভীর আবহ বেজে ওঠে, ধোঁয়া দেখা যায়। আবির্ভূত হয় আংটির দৈত্য)
আং দৈত্য। মালিক! আমাকে ডেকেছেন?
আলাদিন। (ভয়ে সিঁটিয়ে যায়) ন্- ন্- না তো! কে? কে তুমি?
গান – ৫ (আংটির দৈত্য)
হুজুর আলাদিন
আমি আংটির জিন
ওই আংটি হাতে যার
শুনব কথা তার
চিরদিন। হাঃ হাঃ হাঃ।
আমি আংটির জিন (৩)।।
মুখের কথা না পুরতে
কাজ করব মুহূর্তে।
তাই নয় দেরি নয় আর
ভয়- ডর ভুলে একবার
হুকুম দিন। হাঃ হাঃ হাঃ।
আমি আংটির জিন (৩)।।
আং দৈত্য। আমি আপনার বান্দা হুজুর। আপনার হাতের ওই আংটি আমার মালিক। এখন ওই আংটি আপনার হাতে, তাই আপনিই এখন আমার মালিক। আপনি ওই আংটি পাথরে ঘষে আমাকে ডাকলেন, তাই হাজির হলাম হুকুম তামিল করতে। কী হুকুম হুজুর?
(দৈত্যের কথা শুনতে শুনতে আলাদিনের ভয় কেটে যায়)
আলাদিন। জিন! আমি যা বলব তুমি তাই করতে পারবে?
আং দৈত্য। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। ইবলিশের আমি সন্তান, তাঁর বরে দুনিয়ার এমন কোনও কাজ নেই, যা আমি করতে পারি না। হুকুম দিন মালিক।
আলাদিন। তবে এই মুহূর্তে আমাকে এই গুহার বাইরে নিয়ে চলো।
আং দৈত্য। যো হুকুম মালিক!
(আলো নেভে। চতুর্থ দৃশ্য শেষ। অন্ধকারে set বদল হয়)
পঞ্চম দৃশ্য
(আলাদিনের বাড়ি। আলাদিনের মা কাপড় সেলাই করতে করতে গান গাইছেন)
গান – ৬ (আলাদিনের মা)
আ —আ —আ —আ —
ছোট্ট ছেলে আলাদিন মোর কোথায় গেল চলে।
একলা বসে কাঁদি আমি, ভাসি চোখের জলে।।
মন যে মানে না
দিন যে কাটে না —
কবে আবার আসবে ফিরে এই মায়েরই কোলে।।
মা। হায় আল্লা! দুটো দিন কেটে গেল, কই, আমার আলাদিন তো ফিরে এল না! কী করি, কী করি আমি? আমার দিলের কলিজা আলাদিনকে ছাড়া আমি বাঁচব কেমন করে? ও আল্লা, ও দীন-ই-ইলাহি আল্লা, এ আঁধারে দেখাও পথের দিশা, ফিরিয়ে এনে দাও আমার জান, আমার দিল-ধড়কন্ আলাদিনকে। আর যে পারি না খোদা! (কান্না)
(আলাদিনের ডাক ভেসে আসে)
আলাদিন। (নেপথ্যে) মা! মা!
মা। (উৎকর্ণ) কে? কার ডাক ভেসে আসে? এ তো — এ তো আমার আলাদিনের ডাক! তবে কি খোদা মুখ তুলে চাইলেন? আয় আলা আয়, জলদি করে আয়!
(আলাদিন ছুটতে ছুটতে এসে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে)
আলাদিন। মা! মা!
(মায়ের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদে)
মা। কোথায় ছিলি বাবা আলাদিন? দুটো দিন ধরে কোথায় ছিলি তুই? তোর জন্যে এই দুটো দিন আমি ভেবে ভেবে সারা। কোথায় আছিস, কী খাচ্ছিস। কই, তোর চাচা কই রে?
আলাদিন। চাচা! চাচা না ছাই। সে লোকটা একটা শয়তান।
মা। কী বলছিস বাবা আলাদিন?
আলাদিন। হ্যাঁ মা, ওটা একটা বদমাশ জাদুকর। এই দেখ — (জেব থেকে প্রদীপটা বার করে দেখায়) এই পেতলের প্রদীপটার জন্যে সে আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। সে-ই তো পাথর চাপা দিয়ে সেই গুহাটার মধ্যে আমাকে কয়েদ করে রেখেছিল দু-দিন।
মা। হায় আল্লা! (দুহাতে আলাদিনকে আরবীয় ভঙ্গীতে আশীর্বাদ করেন)
তারপর কী হল?
আলাদিন। তারপর? (বীরত্বের ভঙ্গী করে) হুঁ! তোমার আলাদিন কি অতই বোকা ছেলে নাকি? সবকিছু দেখেশুনে নিলাম। তারপর এই আংটিটা পাথরে ঘষলাম। ঘষতেই একটা ইয়াব্বড়ো জিন এল।
মা। জিন!! হায় খোদা! তোর একটুও ডর লাগল না?
আলাদিন। ডর? দুনিয়ায় আলাদিন কাউকে ডর করে না। আমি জিনকে হুকুম করলাম…
মা। (অবাক) হুকুম করলি কী রে?
আলাদিন। হ্যাঁ মা। সে তো এই আংটির জিন। আংটিটা আমার হাতে, তাই সে আমার বান্দা হয়ে গেল। আমি তাকে হুকুম করলাম — আমাকে বাইরে নিয়ে চলো। অমনি সে আমাকে গুহার বাইরে নিয়ে চলে এল। তারপর তাকে বললাম, আমাকে আমাদের বাড়ির সামনে পৌঁছে দাও। সে আমাকে তক্ষুনি নিয়ে এসে ছেড়ে দিল আমাদের বাড়ির সামনে। আর তারপরেই আমি একছুট্টে চলে এলাম তোমার কাছে।
মা। আমার সোনা! আমার জহরৎ! খিদে-তেষ্টায় কত কষ্ট হয়েছে তোর!
আলাদিন। হ্যাঁ মা। খুব খিদে পেয়েছে। কিছু খেতে দাও না।
মা। হ্যাঁ বাবা, এই যে দিই। তোর জন্যে চাপাটি আর সিমুই করে রেখেছি। কিন্তু — কাল কী হবে বাবা? ঘরে যে আর খানা পাকানোর কিছু নেই।
আলাদিন। এক কাজ করো না মা। এই প্রদীপটা তুমি পরিষ্কার করে দাও, আমি বাজারে গিয়ে বেচে আসি। (মায়ের হাতে প্রদীপটা দেয়)
মা। হ্যাঁ বাবা, খুব ভালো কথা বলেছিস তো? ঠিক আছে, তাই করি বরং। চল্, রসুইঘরে চল্। তোকে খেতে দিয়ে আমি এটা মেজেঘষে চকচকে করে দেব।
(মা ভেতরে চলে যান। আলাদিন পোশাকের কিছু খোলে বা পাল্টায়)
মা। (নেপথ্যে) জানিস তো! তোর বন্ধুরা রোজ এসে তোর খোঁজ করে।
আলাদিন। (চেঁচিয়ে) হ্যাঁ মা, ওরা সবাই আমাকে খুব ভালবাসে।
(মা ফিরে আসেন প্রদীপটা আর একটুকরো কাপড় হাতে নিয়ে)
মা। যা। খেয়ে নিগে যা।
আলাদিন। হ্যাঁ মা। যাই। (আলাদিন ভেতরে চলে যায়)
মা। এই তো, বেশ হবে। এই প্রদীপটা বেচলে অন্তত পাঁচ দিরহাম তো পাওয়া যাবেই! তাতে আমাদের দুটো দিন চলে যাবে। তার আগে এটা ভালো করে ঘষেমেজে দিই।
(কাপড় দিয়ে প্রদীপটা ঘষেন। সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া, আলো আর প্রবল আওয়াজের সঙ্গে প্রদীপের দৈত্য আবির্ভূত হয়)
মা। ও মা গো! (অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। আলাদিন ছুটে আসে)
আলাদিন। কী হল মা? কী হল? (হঠাৎ দৈত্যকে দেখে ভয়ে থমকে যায়)
গান – ৭ (প্রদীপের দৈত্য)
সেলাম হুজুর সেলাম।
আমি প্রদীপের দৈত্য হাজির হলাম।
ওই প্রদীপ থাকে যার হাতে
আমি চিরদিন তার সাথে (২)
থাকি হয়ে গোলাম।
সেলাম হুজুর সেলাম।।
(আলাদিন প্রদীপটা হাতে তুলে নেয়। এখন তার ভয় কেটে গেছে)
আলাদিন। তুমি কে?
প্র. দৈত্য। আমি সাগর-পাতাল-আসমানের অধিপতি। কিন্তু আমার আল্লা আপনার হাতের ওই চিরাগ। যতদিন ওই চিরাগ থাকবে আপনার হাতে, ততদিন আমিও থাকব আপনার হুকুমের বান্দা হয়ে। যখনই যা চাইবেন, দুনিয়ার যে-কোনও চিজ, মুহূর্তের মধ্যে এনে দেব আপনার হাতের মুঠোয়। আমি আসমান-সাগর-পাতালের অধীশ্বর প্রদীপের দৈত্য। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ —
আলাদিন। তবে শোনো, কাল থেকে রোজ দুবেলা আমাদের জন্যে রকমারি খানাপিনা এনে দেবে। আর সাজপোশাক আনবে। আর আমাদের বাড়িটা বেশ চকচকে ঝকঝকে করে দেবে। আমার মায়ের দিলে যেন কোনও কষ্ট না থাকে।
প্র. দৈত্য। যো হুকুম মালিক। (দৈত্য অদৃশ্য হয়। আলাদিন ম্য-কে ঠেলা দিয়ে ডাকে)
আলাদিন। মা! মা! ওঠো, ওঠো। দৈত্য চলে গেছে । ওঠো মা!
মা। (উঠে বসে) কোথায়? সেই জিনটা কোথায়?
আলাদিন। সে চলে গেছে মা। চলে গেছে। আমাদের আর কোনও চিন্তা নেই। কাল থেকে আমাদের আর কোনও অভাব থাকবে না, দেখো। এই আশ্চর্য প্রদীপটা আমাদের সব কষ্ট দূর করে দেবে। কী মজা! কী আনন্দ! আমি যাই, আমার বন্ধুদের কাছে যাই। আবদুল, চী-চেং, সামাদ — ওরা সব আমার জন্যে হাঁ করে বসে আছে। ওদের সেদিন যে নতুন খেলাটা শিখিয়েছি, সেটা খেলতে হবে না? যুদ্ধ, যুদ্ধ, যুদ্ধ!!
(যুদ্ধের ভঙ্গীতে আলাদিন ছুটে বেরিয়ে যায়। মা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। আলো নেভে)
ষষ্ঠ দৃশ্য
(যুদ্ধের আবহ বাজে। আলাদিন তার বন্ধুদের সঙ্গে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে। আর সেইভাবে খেলতে খেলতেই সবাই বড়ো হয়ে যায়। যুদ্ধ চলতে থাকে। হঠাৎ ঢেঁড়া পেটানোর আওয়াজ। সকলে
সচকিত হয়ে একদিকে জড়ো হয়ে যায়)
বন্ধু ১। এই মরেছে! এ তো রাজবাড়ির ঘোষকের ঢেঁড়া!
বন্ধু ৪। কী ব্যাপার বল্ তো?
বন্ধু ৩। নিশ্চয়ই সুলতানের কোন আদেশনামা। আর রক্ষে নেই।
বন্ধু ২। চল্ আলাদিন, পালিয়ে চল্। রাজবাড়ির রক্ষীরা পথে বেরিয়েছে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ওই শোন্ সুলতানের আদেশ —
(ঢেঁড়া পেটাতে পেটাতে ঘোষক ঢোকে)
ঘোষক। শোনো শোনো পুরবৃন্দ,
মন দিয়ে শোনো সবাই।
দূর হঠো, রাস্তা করো, নইলে কারো রক্ষা নাই।
রাজকন্যা বুদুর আজ যাবেন হামাম;
ওই আসে তাঁর তাঞ্জাম —
ভীড় হঠাও, দূরে পালাও, নইলে কারো রক্ষা নাই।
(ঘোষক বেরিয়ে যায়)
বন্ধুরা। ওরে চল্ চল্, কেটে পড়।
আলাদিন। চোপ্! ভীতুর ডিম। এই তো বেশ মওকা পাওয়া গেছে রাজকন্যাকে দেখার।
বন্ধু ১। সে কী রে? তুই কী বলছিস আলাদিন?
বন্ধু ২। রাজকন্যাকে দেখবি? তুই কি পাগল হলি?
বন্ধু ৩। ওরে রাজবাড়ির রক্ষীরা সব খোলা তলোয়ার নিয়ে হাঁটে। সামনে পড়লে জানে মেরে দেবে।
আলাদিন। আরে আমি কি অতই বোকা? সামনে পড়ব কেন? যা যা, তোরা পালা। মায়ের কোলে গিয়ে মুখ লুকিয়ে বসে থাক। আজ যখন একবার সুযোগ পেয়েছি, রাজকন্যাকে না দেখে আমি এক পা-ও নড়ছি না।
বন্ধু ৪। গোঁয়ার্তুমি করিস না আলাদিন। এখনও সময় আছে। এইবেলা পালিয়ে চ।
আলাদিন। চোপ্! যা ভাগ!
(বন্ধুদের প্রস্থান। আলাদিন লুকিয়ে পড়ে। আবহের তালে তালে রক্ষীসহ রাজকন্যা আসে তাঞ্জামে চড়ে। যেতে যেতে একবার বোরখা তুলে চারপাশটা দেখে নেয়। তাঞ্জাম চলে যেতেই আলাদিন বেরিয়ে আসে)
আলাদিন। আঃ হা! কী অপরূপ! যেন বেহেস্ত্-এর পরী নকাবে মুখ লুকিয়ে এসে পড়েছে দুনিয়ার মাটিতে। যেন বস্রার গোলাপ-কুঁড়ি ফুটেছে মরুভূমির শুখা বালুকায়। বুদুর! বুদুর!! আজ থেকে আমার কলিজার আধখানা রয়ে গেল তোমার হেফাজতে। আজ থেকে তুমি আমার দিলবাগিচার রানি, আমার রাতের শবনম্। কোথায়, কোথায়, দুনিয়ার কোন্ প্রান্তে পাব তোমার দেখা?
(প্রস্থান। আলো নেভে)
সপ্তম দৃশ্য
(আলো জ্বলে। দুই প্রবেশ করে)
দুই। ব্যস! হয়ে গেল। অমন যে দুর্দান্ত আলাদিন, রাজকন্যা বুদুরকে দেখার পর থেকে সে যেন কেমন হয়ে গেল। নাওয়া নেই। খাওয়া নেই, দিনরাত শুধু বুদুরের চিন্তা। কিন্তু কোথায়, কোথায় গেলে সে রাজকন্যার দেখা পাবে? ভেবে ভেবে কোনও কূলকিনারা পায় না।
(‘দুই’-এর কথা বলার সময় ‘এক’ এসে চুপি চুপি পেছনদিকে বাগিচার set লাগিয়ে দেয়। তারপর ধমকে ওঠে)
এক। ওরে উজবুক! (Set-টা দেখিয়ে) এটা তাহলে লাগালাম কী জন্যে? জানিস্ না, রাজকন্যা বাগানে বেড়াতে এলে বাগানের পাঁচিল ডিঙ্গিয়ে আলাদিন এসে ঢুকবে?
দুই। তা—ই—তো! আসলে, আমিও যেন কেমন হয়ে গেছি।
এক। (ভেঙিয়ে) বেশ ভালো হয়েছে। এখন চলো। ওই রাজকন্যা এসে পড়ল বলে।
(এক ও দুই বেরিয়ে যায়। রাজকন্যা বুদুর প্রবেশ করে। পাখি ডাকে)
বুদুর। হায় আল্লা! কী খুবসুরৎ খুশবু! বাগিচায় কি আজ কোনও আনজান ফুল ফুটেছে? নাকি বেহেস্তের গুলাব অচিন পথ পেরিয়ে এসে ফুটল আমারই দিল্-বাগিচায়? এ কীসের ব্যথা কলিজার কোণ থেকে উঁকি মারে? পানি এনে দেয় চোখের কোণে? এরই নাম কি মহব্বত? কিন্তু কে সে? কার দুর্বার ডাকে সাড়া দেবে বলে দিল্ আজ আনচান করে?
(সহসা দূর থেকে ভেসে আসে আলাদিনের গান। রাজকন্যা উৎকর্ণ হয়ে শোনে। পাঁচিল ডিঙিয়ে যেন বাগিচায় প্রবেশ করে আলাদিন)
গান – ৮ (আলাদিন)
ওগো রাজকুমারী।
বান্দা তোমায় জানাচ্ছে সেলাম।
আলাদিন মোর নাম।
নাম আমার আলাদিন, আলাদিন মোর নাম।।
ওগো অচিন সুন্দরী,
জ্বালাও প্রেমের ফুলঝুরি —
তোমার পায়ে এ-আর্জি রাখলাম।।
বুদুর। কে? কে তুমি?
আলাদিন। আমি এক আনজান মেহ্মান। সুদূর আসমান আমার ঘর। তোমার গায়ের খুশবু ভেসে গেল দিকদিগন্তে, তারই খবর পেয়ে উড়ে এলাম তোমার রূপের গুলাব থেকে মধু নেব বলে।
বুদুর। (স্বগত) একি? এই অচিন পুরুষের কন্ঠস্বরে কেন আমার দিল্ জুড়ে উন্মাদনা জাগে? কোন্ শরাবের নেশায় এ আমাকে ডুবিয়ে দিল?
(আলাদিনকে) কে তুমি? কে তুমি? বলো তুমি কে?
আলাদিন। আমি আলাদিন। তোমার খোয়াবের রাজকুমার। আমাকে চিনতে পারছ না রাজকুমারী?
বুদুর। মনে হয় যেন কতদিন ধরে তোমায় চিনি। তোমার ডাকে যে ভেসে গেল আমার দিওয়ানা দিল্।
আলাদিন। যাক, ভেসে যাক দিল্। ঘুচে যাক সব বাধা-বন্ধন। চলো শাহাজাদি চলো, উড়ে যাই বেহেস্তের গুলবাগে। চুরি করে আনি খুবসুরৎ মহব্বতের ফুল।
বুদুর। শাহজাদা আলাদিন!
আলাদিন। বুদুর!!
(আরবীয় সঙ্গীতের তালে তালে দুজনে হাত-ধরাধরি করে নাচে। নাচতে নাচতে একপাশে গিয়ে দুজনে Freeze হয়ে যায়। ওদের ওপর আলো কমতে কমতে নিভে যায়। অন্যদিকে দেখা যায়
এক ও দুই মজাদার ভঙ্গীতে নাচতে নাচতে বাগানের set বদলে আলাদিনের
চাকচিক্যময় বাড়ির set লাগিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায়। আলো set-কে ধরে)
অষ্টম দৃশ্য
(আলাদিনের জমকালো বাড়ি। আলাদিন প্রবেশ করে — বিষণ্ণ, উদাস। অন্যমনে এসে বসে।
আলাদিনের মা বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেন)
মা। এই তো বাবা, এসেছিস? এত দেরি করলি কেন বল্ তো? খাওয়া দাওয়া নেই, দিনরাত কোথায় ঘুরিস আল্লাই জানে। চল্, খেয়ে নিবি চল্।
আলাদিন। আজ আর কিছু খাব না মা।
মা। সে আবার কী কথা? খাবি না মানে?
আলাদিন। হ্যাঁ মা, একদম খিদে নেই।
মা। আলাদিন! তোর কী হয়েছে ঠিক করে বল্ তো? এমন তো কোনদিন করিস না!
আলাদিন। মা!
মা। কী হয়েছে কী?
আলাদিন। মা! আমি ওকে শাদি করব মা! ওর রূপের জেল্লায় আমি দিওয়ানা হয়ে গেছি।
মা। সে কী বাবা? কোথাকার কোন্ জিন-পরী ভর করল তোকে?
আলাদিন। জিন নয় মা, পরী, পরী। একেবারে বেহেস্তের হুরী।
মা। কে? কে সে?
আলাদিন। বুদুর!!
মা। বুদুর-অল-বুদুর? চিন সুলতানের কন্যা? হায় আল্লা! তুই কি শরাব পান করেছিস? ওরে সে যে আমাদের কাছে সূরয্-কে ছোঁয়ার মতো! হাত বাড়াতে গেলে হাত পুড়ে যাবে।
আলাদিন। না মা, তোমার কোনও ভয় নেই। সে-ও আমার মহব্বতে পাগল। আমরা দুজনেই দুজনকে চাই।
মা। না না, এ হয় না। আলাদিন, তুই কি ভুলে যাচ্ছিস তুই সামান্য এক দর্জির ছেলে?
আলাদিন। তাতে কী হয়েছে মা? তোমার আলাদিন যে-সে আদমি নয়। তুমি একবার সুলতানের কাছে আর্জি পেশ করে দেখই না।
মা। ওরে না, তা হয় না। একথা শুনলে সুলতান আমাদের দুজনকেই কোতল করবার হুকুম দেবেন।
আলাদিন। কিচ্ছু হবে না মা, কিচ্ছু হবে না। প্রদীপের জিনের দৌলতে তোমার আলাদিন এখন অসীম ক্ষমতার অধিকারী। সে যা চাইবে, যেমনভাবে চাইবে, সেরকমভাবেই সব ঘটবে। তুমি যাও, সুলতানের দরবারে যাও মা! নজরানা হিসেবে নিয়ে যাও আমার সেই গুহা থেকে পাওয়া রঙ্গীন কাচের ফলগুলো। এগুলো দেখেই শাহেনশা সুলতান বুঝবেন, কী আশ্চর্য ক্ষমতা ধরে সামান্য দর্জির ছেলে আলাদিন।
(আলো নিভতে থাকে। শোনা যায় রাজকীয় সঙ্গীত। হঠাৎ ঢোল বেজে ওঠে। ঢোলের বাজনার সঙ্গে তাল দিয়ে নাচতে নাচতে প্রবেশ করে এক ও দুই, এবং কথার ফাঁকে ফাঁকেই আলাদিনের বাড়ির set বদলে দিয়ে রাজদরবারের set লাগায়)
এক। (সুরে) একদিন যায়, দুদিন যায়, তিনদিন চলে যায়।
এমনি করেই দিনের পরে দিন কেটে যায়।
দুই। (সুরে) আলাদিনের দুঃখী মা তার আর্জি জানাতে
রোজই আসে, রোজই আসে রাজার সভাতে।
এক। (সুরে) হ্যাঁ, রাজার সভাতে —
দুই। (সুরে) শেষে একদিন —
শেষে একদিন রাজার হঠাৎ কী হল মর্জি,
ডাকল তাকে, তখন মা তার জানাল আর্জি।
এক। (হঠাৎ ছন্দ কেটে দিয়ে থেমে যায়। ঢোলও বন্ধ হয়)
হ্যাঁ রে এই, দরবার শুরুই হল না, আলাদিনের মায়ের আর্জি জানানো হয়ে গেল?
দুই। (জিভ কাটে) তা—ই—তো! তাহলে —
এক। (আবার তালে তালে নাচ ও কথা শুরু করে। আবার ঢোল বাজতে থাকে)
(সুরে) এল সেইদিন —
দুই। (সুরে) হ্যাঁ এল সেইদিন —
এক। (সুরে) সক্কালবেলায় উঠল বেজে কাড়া-নাকাড়া
প্রাসাদে সহসা যেন পড়ল সাড়া
দুই। (সুরে) মন্ত্রী-কোটাল-সেনাপতির কেঁপে ওঠে প্রাণ
ওই আসছেন দরবারে শাহেনশা সুলতান —
এক। (সুরে) সাবধান, সাবধান, সাবধান —
দুই। (সুরে) সাবধান, সাবধান, সাবধান —
(ঢোল থেকে দ্রিমি দ্রিমি দামামা ও বিউগিল মিলে গিয়ে একটা টান টান পরিবেশ সৃষ্টি করে। এক ও দুই একদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়, অন্যদিক দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই প্রবেশ করে ঘোষক)
নবম দৃশ্য
ঘোষক। হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার —
(ঘোষক মঞ্চের অন্যদিকে যেতে যেতে ঘোষণা শুরু করে। তার পেছনে পেছনে রাজা উজির ও অন্যান্যরা এসে আসন গ্রহণ করেন। প্রহরীরা ও আলাদিনের মা ও অন্যান্য কিছু প্রজা দাঁড়িয়ে পড়ে)
ঘোষক। হুঁশিয়ার! হুঁশিয়ার! হুঁশিয়ার!! তামাম চিনমুলুকের অনুগত প্রজাবৃন্দ, এই শাহী প্রাসাদের দরবারে উপস্থিত তামাম অভ্যাগত, সবাই হুঁশিয়ার। চিন সাম্রাজ্যের মহান সম্রাট, শাহেনশা-উল-মুল্ক্, জনাব খাতুম-অল-খাতুমের দরবার শুরু —
সকলে। (অভিবাদন) জয় সুলতান খাতুম-অল-খাতুম-এর জয়!
(সুলতান ইঙ্গিতে সকলকে বসতে বলেন)
সুলতান। কী ব্যাপার উজির? কে ওই মহিলা? রোজই আমার দরবারে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে? কী চায় ও?
উজির। জাঁহাপনা! ও আপনারই রাজ্যের এক প্রজা। আপনার কাছে ওর আর্জি পেশ করতে চায়।
সুলতান। তাই নাকি? ডাকো ওকে। পেশ করুক ওর আর্জি।
(উজির ইঙ্গিত করেন। এক প্রহরী আলাদিনের মাকে সুলতানের সামনে এগিয়ে দেয়)
মা। (কুর্নিশ) জাঁহাপনা! যদি অভয় দেন, তবেই জানাতে পারি আমার আর্জি।
উজির। বলো বলো, নির্ভয়ে বলো।
মা। হুজুর! আমরা আপনার রাজ্যের সামান্য প্রজা। এ দেশের দক্ষিণ দিকে আমরা থাকি। কেমন করে জানি না, আমার বুরবাক ছেলে আলাদিন, রাজকুমারী বুদুরের জন্যে শোকে দুঃখে দিওয়ানা হয়ে গেছে। মা হয়ে ছেলের কষ্ট সইব কী করে জনাব? তাই আলাদিনের সঙ্গে বুদুরের শাদির প্রস্তাব নিয়ে —
সুলতান। (উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়েন) কী!! কী বললে? আমার মেয়ের সঙ্গে আমারই সামান্য এক প্রজার — এত স্পর্ধা!!
উজির। শান্ত হোন, শান্ত হোন জাঁহাপনা। আমি দেখছি। শোনো আলাদিনের মা, সুলতানের কাছে এলে ভেট আনতে হয় জানো না?
মা। জী হুজুর। আমরা দরিদ্র মানুষ, তাই নজরানা হিসেবে এই সামান্য জিনিসগুলো এনেছি।
(হাতের থালাটা প্রহরীর হাতে দেন। প্রহরী থালাটা নিয়ে গিয়ে উজির ও সুলতানের সামনে ধরে। উজির ঢাকনার কাপড়টা তুলতেই আলো ঠিকরে পড়ে)
সুল/উজির। এ কী!!!
উজির। এ যে অবিশ্বাস্য! (উজির একটা জহরৎ তুলে আলোতে দেখেন)
সুলতান। (একান্তে) কী ব্যাপার উজির? এ তো আসলি হীরে-মুক্তো-জহরৎ!
উজির। হুজুর। এরকম সাচ্চা আর এত বড়ো জহরৎ শুধু আপনার রাজকোষে কেন, তামাম দুনিয়া খুঁজলেও মিলবে না।
সুলতান। তবে তো ঠিকই আছে। যে এত দামী রত্ন অবহেলায় ভেট দিতে পারে, সে তো সামান্য নয়! আমি আলাদিনের সঙ্গেই আমার বুদুরের শাদি দেব।
উজির। গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। এ নিশ্চয়ই কোন মায়ার খেলা। ওই আলাদিন আলবাৎ কোনও মায়াবী জাদুকর।
সুলতান। না না উজির, তুমি ভুল করছ। এ আমি বিশ্বাস করি না।
উজির। জাঁহাপনা, মেহেরবানি করে একবার ভেবে দেখুন, যে-চিজ স্বয়ং চিন সুলতানের রাজকোষে নেই, তাবৎ দুনিয়ায় যে-রত্ন দুর্লভ, সেই জিনিস এই সামান্য দর্জির ছেলে পায় কোথা থেকে? এ কোনও অলৌকিক শক্তি ছাড়া সম্ভব নয় সম্রাট।
সুলতান। ঠিক আছে উজির। তুমি যখন এত করে বলছ, তখন আমি আরও একটা পরীক্ষা করে দেখি।
(আলাদিনের মা-কে) শোনো আলাদিনের মা, বুদুর আমার নয়নের মণি, খানদানি বংশের রাজকুমারী। তাকে তো তোমাদের সামান্য ঘরে রাখা চলবে না। আমি এক সপ্তাহ সময় দিলাম। ওই যে পূর্বদিকের ফাঁকা মাঠটা দেখছ, যদি এক সপ্তাহের মধ্যে ওখানে আলাদিন বিশাল এক মণিমানিক্যখচিত খুবসুরৎ প্রাসাদ তৈরি করতে পারে, তবেই আলাদিনের সঙ্গে হবে আমার বুদুরের শাদি। আর তা না পারলে, আলাদিনের গর্দান জমা রইল আমার জল্লাদের হাতে।
মা। (কুর্নিশ করে) যো হুকুম জাঁহাপনা। তাই হবে।
(আলোর খেলার মধ্যে দরবারের set ও লোকজন সরে যায় এবং Mime-এ ক্রমান্বয়ে দেখা যায় — (১) আলাদিনকে তার মা সব বলছে, (২) আলাদিন প্রদীপটা ঘষে দৈত্যকে ডাকছে, এবং (৩) দৈত্য এসে হাত নেড়ে যেন প্রাসাদটা এনে বসিয়ে দিচ্ছে। তারপরেই মঞ্চের এক কোণে একটা ঝকমকে প্রাসাদ দেখা যায়। উল্টোদিকে রাজপ্রাসাদের বারান্দায় আলো পড়ে। সেখানে সুলতান ও উজিরকে উত্তেজিতভাবে কথা বলতে দেখা যায়)
সুলতান। আশ্চর্য! অদ্ভুত! অবিশ্বাস্য! এ যে আমি কল্পনাও করতে পারছি না। দেখ উজির দেখ, আলাদিন কী অসাধ্যসাধন করেছে একবার দেখ।
উজির। জাঁহাপনা! জাঁহাপনা! এ যে ভয়ঙ্কর ব্যাপার! এক রাতের মধ্যে এমন খুবসুরৎ প্রাসাদ তৈরি করা কি কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব?
সুলতান। সম্ভব। সব সম্ভব উজির। এই দুনিয়ায় অসম্ভব বলে কিছু নেই।
উজির। জাঁহাপনা, এ এক মায়ার ছলনা। ভুল করেও এ ফাঁদে পা দেবেন না হুজুর।
সুলতান। না উজির না। আমি কোন ভুল করছি না। এতদিনে আমার বুদুরের যোগ্য পাত্র আমি খুঁজে পেয়েছি। আলাদিন। হ্যাঁ, অসম্ভব ক্ষমতাধর ওই আলাদিনের সঙ্গেই হবে আমার বুদুরের শাদি। যাও উজির যাও, আর দেরি করছ কেন? এখনই সারা রাজ্যে ঢেঁড়া পিটিয়ে ঘোষণা করো উৎসব, পোড়াও বাজি, জ্বালাও রোশনাই — আগামী পূর্ণিমার দিন হবে চিন সুলতানের কন্যা বুদুরের শাদি, আলাদিনের সঙ্গে।
(আলো নেভে। Set সরে যায়। নবম দৃশ্য শেষ)
দশম দৃশ্য
(আলাদিন, বুদুর, আলাদিনের বন্ধুরা নাচতে নাচতে প্রবেশ করে)
গান – ৯ (সমবেত)
বন্ধুরা। কী আনন্দ কী আনন্দ আজ।
করবে শাদি আলাদিন আয় ফেলে কাজ।।
ওই যে আকাশে
যেন রামধনু ভাসে
রঙিন এ দিল্ আজ পরেছে জামদানী সাজ।।
আজ স্বপ্ন-বাতাসে
খুশ— বু ভেসে আসে
কে যেন পরাল শিরে আজ খুশিরই তাজ।।
আলাদিন। আজ পেয়েছি কাছে মোর দিল্-পিয়ারি
গরবিনী রাজকুমারী।
বুদুর। বীর আলাদিন ভরেছে দিল্ আমারি।।
সবাই। আজ যত গুলবাগে
ফুল— পাখিরা জাগে,
দুনিয়ারই যত মানুষ হল খুশমেজাজ।।
(সকলের প্রস্থান। সঙ্গীতের রেশ থাকে। ‘এক’ প্রবেশ করে। তারপর ‘দুই’)
এক। তো, এইভাবে এতরকম কান্ডকারখানা ঘটিয়ে আলাদিন শাদি করল।
দুই। সারা চিনদেশের মানুষ সাতদিন ধরে খ্যাঁটন দিল।
এক। মুখের কথা তো নয়, চিন সুলতানের কন্যার শাদি।
দুই। আবার হচ্ছে কার সঙ্গে, না, আলাদিনের সঙ্গে।
এক। হ্যাঁ। আলাদিনের সঙ্গে, যে কিনা দিনকে রাত করে ফেলতে পারে, সমুদ্রে তুলতে পারে তুফান, হাতে এনে দিতে পারে আকাশের চাঁদ।
দুই। তাই তো শাদি করার পর থেকে গোটা রাজ্যে আলাদিন এনে দিল সুখ আর শান্তি। তার সমস্ত ধনসম্পদ দিয়ে রাজ্যের মানুষদের দুঃখকষ্ট সে ঘোচাতে লাগল। রাজ্যের প্রজারা ধন্য ধন্য করতে লাগল তাকে। তখন তার কত আনন্দ, কত সুখ। কিন্তু এত সুখ কি কারও কপালে সয়? তাই একদিন আলাদিন যখন শিকার করতে গেল, তখন সেই জাদুকরটা ছদ্মবেশে এসে —
এক। (চিৎকার) ওঃ ভগবান! বলি, তোর কি আর জীবনে আক্কেল হবে না?
দুই। কেন?
এক। ম্চিঃ (বিরক্তি) ওরে বুদ্ধু, এটা তো পরের ঘটনা!
দুই। তা—ই—তো! তার আগে তো সেই —
এক+দুই। অং বং চং!!
(আস্তে আস্তে আলো নিভে আসে)
একাদশ দৃশ্য
(মায়াবী আলোয় দেখা যায় জাদুকরকে)
মুসিবান। (জাদুদন্ড নাড়তে নাড়তে)
হিঙ্গুডুঙ্গা হেইডুলাং —
গুম্বাগুম্বাং গুরুগুলাং —
আন্নুরিয়াবাং পান্নুজিয়াবাং উন্ডুভুন্ডুরুসাং
মন্তরাং বাং চাং (২)
আয় আয়, আয় রে জিন- দানো- দত্যির শয়তান
আয় রে রক্ষ-রাক্ষস-আফ্রিদির শয়তান —
বল্ বল্ সেই জাদুচিরাগ কোথায়? কোথায় সেই আশ্চর্য প্রদীপ? কার কাছে?
(জাদুদন্ড দিয়ে কীসব হিসেব কষে লাফিয়ে ওঠে)
আলাদিন!! সেই শয়তানের বাচ্চা এখনও বেঁচে আছে? কোথায়? কোথায় সে?
(আবার হিসেব কষে)
এ কী!! চিন সুলতানের কন্যা বুদুরকে শাদি করেছে? সেই জাদুচিরাগ এখন তার কব্জায়? আ – আ – আঃ! শয়তান বদমাইশটা আমারই অস্ত্রে আমাকে ঘায়েল করেছে। ঠিক আছে, আমিও শয়তানের শয়তান, মূর জাদুকর মুসিবান। তুই কত সেয়ানা হয়েছিস আলাদিন, আমিও তা দেখব। কীভাবে তোকে খতম করি, একবার দ্যাখ।
উম্-ম্-ম্ মাকাডুম্-ম্-ম্ ওহিন স্-সাং
উম্-ম্-ম্ মাকাডুম্-ম্-ম্ ইহিন স্-সাং
উম্-ম্-ম্ মাকাডুম্-ম্-ম্ সাং সাং স্-সাং —
হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ। এই তো, এই তো আলাদিন তার বন্ধুদের নিয়ে শিকারে যাচ্ছে। প্রদীপটা রয়েছে তার দেরাজে। ই-হি-হি-হি, এই তো সুবর্ণসুযোগ। আয়, আয় রে আমার উড়ন্ত গালিচা — নিয়ে চল্ আমাকে চীনদেশে আলাদিনের প্রাসাদের কাছে —
(আলো কমতে কমতে নিভে যায়। ছায়াদৃশ্যে পিছনের পর্দায় দেখা যায় উড়ন্ত গালিচায় চড়ে জাদুকর
উড়ে চলেছে। তারপরেই শিকারের Music বাজে। আলাদিন ও তার বন্ধুদের
শিকারযাত্রার ছায়াদৃশ্য দেখা যায়। আলো নেভে)
দ্বাদশ দৃশ্য
(মঞ্চের এক কোণে উঁচু প্রাসাদের অলিন্দ। সেখানে রাজকন্যা বুদুর ও এক বান্দা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মঞ্চের নীচে দর্শকাসনের সামনে জাদুকর প্রবেশ করে ছদ্মবেশ ধরে)
মুসিবান। এই তো, এই তো সেই জায়গা, যেখান থেকে খুঁজে পেয়েছিলাম সেই কাফেরবাচ্চা আলাদিনকে। ওই তো দক্ষিণদিকে সুলতানের প্রাসাদ; কিন্তু আলাদিনের প্রাসাদ কোথায়? গণনায় জেনেছি, আলাদিন প্রদীপের দৈত্যকে দিয়ে এক বিশাল প্রাসাদ বানিয়েছে। সেটা কোথায়? তবে কি ওই যে বিরাট এক সুরম্য প্রাসাদ দেখা যাচ্ছে উত্তর-পূর্ব কোণে, আসমানে গিয়ে ঠেকেছে ওর মাথা, সারা গায়ে চকমকানো হীরে-মোতির ঝলকানি, ওটাই কি আলাদিনের প্রাসাদ? নিশ্চয়ই ওটাই হবে। তবে এইবার শুরু করি আমার খেল।
(চিৎকার) চাই, চা—ই, পুরনো প্রদীপের বদলে নতুন প্রদীপ চাই!
(একটু থামে, তারপর আবার হাঁকে)
চাই, চা—ই, পুরনো প্রদীপের বদলে নতুন প্রদীপ চাই!
(বুদুর ও বান্দা নড়েচড়ে ওঠে)
বুদুর। হ্যাঁ রে, লোকটা হেঁকে হেঁকে কী ফিরি করছে রে?
বান্দা। মালকিন, ও বোধহয় একটা পাগল। নইলে পুরনো জিনিস নিয়ে কেউ নতুন জিনিস দেয়? ও পুরনো প্রদীপ চাইছে, তার বদলে দেবে আনকোরা নতুন প্রদীপ।
বুদুর। তাই নাকি? যা তো, আমাদের দেরাজে অনেকদিন ধরে একটা মরচে-ধরা পুরনো প্রদীপ পড়ে আছে, সেটা বদলে নিয়ে আয় তো!
(প্রাসাদের অলিন্দে আলো নেভে। বান্দা নেমে আসে ডাকতে ডাকতে)
বান্দা। এই ফেরিওলা! ফেরিওলা! এই প্রদীপটা বদলে দে দিকি।
(জাদুকর লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছোঁ মেরে প্রদীপটা নেয়)
মুসিবান। এই তো!! এই তো আমার জাদুমণি! (স্বগত) অবশেষে এতদিন পরে তামাম দুনিয়ার সবসেরা ক্ষমতা আমার হাতে। আঃ! কী শান্তি!
বান্দা। (অধৈর্য) এই ফেরিওলা! কী ব্যাপার কী? নতুন প্রদীপ দে!
(জাদুকর চমকে বান্দার দিকে তাকায়। তারপর সঙ্গে সঙ্গে প্রদীপটা ঝোলার মধ্যে পুরে নিয়ে চারপাশ দেখে। তারপরেই ঝোলা থেকে সড়াৎ করে একটা চকচকে নতুন প্রদীপ বান্দার হাতে দিয়ে ধমকে ওঠে)
মুসিবান। যা ভাগ!
(আবার চারিদিক দেখে নিয়ে প্রায় ছুটে বেরিয়ে যায়। বান্দা অবাক হয়ে চলে যায়। জাদুকর মঞ্চে ঢুকে ছোটার Mime করে। তারপর ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে যায় ও হাঁফাতে হাঁফাতে মঞ্চে প্রবেশ করে, যেন অনেক পথ ছুটে এসেছে)
মুসিবান। ওঃ! ওঃ! ওঃ!! যাক, আর ভয় নেই। এবার আমি দুনিয়ার সবচেয়ে বড়ো শাহেনশা। দুনিয়া ওলটপালট করে দেব, সূর্যকে ওঠাব পশ্চিমদিকে, আসমান থেকে ছিনিয়ে আনব রামধনু! হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। আলাদিন, আমার হকের ধন ছিনিয়ে নিয়ে বাদশা বনেছিলি তুই। এবার তোরই একদিন কি আমারই একদিন। আয়, আয় প্রদীপের জিন, আমার বান্দা হয়ে পুতুলনাচ নাচবি আয়।
(প্রদীপ ঘষতে থাকে। প্রদীপের দৈত্য আবির্ভূত হয়)
গান – ১০ (প্রদীপের দৈত্য)
সেলাম হুজুর সেলাম।
আমি প্রদীপের দৈত্য উড়ে এলাম।।
আমার মালিক ওই প্রদীপটা ওই
যে পায় আমি তারই বান্দা হই,
হুকুম তামিল করতে যে তাই
হাজির হয়ে গেলাম।
সেলাম হুজুর সেলাম।।
মুসিবান। শোন্ বান্দা, এতদিন তুই ওই কাফের আলাদিনটার গোলামী করে এসেছিস। আজ থেকে তুই আমার বান্দা। শুধু আমার।
প্র দৈত্য। জী হুজুর।
মুসিবান। তবে শোন্ আমার হুকুম — এই মুহূর্তে আলাদিনের ওই রত্নখচিত প্রাসাদটা রাজকন্যা বুদুর আর যতসব বান্দা-বাঁদিসমেত যে অবস্থায় আছে, সেই অবস্থাতেই উড়িয়ে নিয়ে চলে যা, রেখে আয় আমার দেশের এক নির্জন বনের ধারে, তারপর আমাকেও নিয়ে যাবি সেখানে। দেখি এরপর বেইমান আলাদিন কী করে। এবার আমি হব শাহেনশা, চিন সুলতানের কন্যা বুদুরকে শাদি করে উপভোগ করব বেহেস্তের সুখ। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ —
প্র দৈত্য। যো হুকুম মালিক।
(আলো নেভে। মস্ত কিছু উড়ে যাওয়ার মতো আবহ বাজে)
ত্রয়োদশ দৃশ্য
(সুলতান ও উজিরের প্রবেশ)
সুলতান। (উত্তেজিত) কোথায়, কোথায় সেই কাফেরের বাচ্চা আলাদিন? আমার আসমানের তারা বুদুরকে নিয়ে সে কোথায় উধাও হল? উজির, উজির, আল্লার কাছে আমি কী পাপ করেছিলাম?
উজির। মাফ করবেন জাঁহাপনা, আমি তো আগেই বলেছিলাম, ওই ছেলেটা একটা জোচ্চোর জাদুকর। ভুলেও ওর ফাঁদে পা দেবেন না।
সুলতান। ঠিক, তুমি ঠিক বলেছিলে উজির। কিন্তু আমি তখন ওর রূপের জৌলুসে আর চোখ-ধাঁধানো হীরে-মোতির ছটায় পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। একবারও ভাবিনি, যা এই চিন সুলতানের রাজকোষে নেই, তেমন জহরৎ, তেমন মণি-মানিক ওই বাচ্চা ছেলেটা পায় কী করে? এক রাতের মধ্যে আসমান-ছোঁয়া খুবসুরৎ প্রাসাদ তৈরি করা একটা মানুষের পক্ষে কী করে সম্ভব? ভাবিনি, আমি ভাবিনি উজির। আর সেই সুযোগ নিয়ে ওই শয়তানটা আমার একমাত্র মেয়ে, আমার নয়নের মণি বুদুরকে শাদি করে উধাও হয়েছে। হায় আল্লা, হায় আল্লা!
উজির। আপনি চিন্তা করবেন না জাঁহাপনা। আলাদিন তার বন্ধুদের নিয়ে শিকার করতে গেছে শুনে আমি তিনশো সিপাই সঙ্গে দিয়ে সিপাহ্শালারকে পাঠিয়েছি। তারা যেখান থেকে পাবে, আলাদিনকে ধরে নিয়ে আসবে।
সুলতান। হ্যাঁ, নিয়ে এসো। দুনিয়ার যেখানেই থাক, টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এসো সেই বেইমানটাকে আমার সামনে। আমি তার গর্দান চাই। নিজের হাতে আমি তাকে কোতল করব, তবে আমি চিনের সুলতান।
(একজন প্রহরী এসে সুলতানকে কুর্নিশ করে। পেছনে পেছনে দড়ি-বাঁধা আলাদিনকে নিয়ে সিপাহশালার প্রবেশ করে)
প্রহরী। মহামান্য সুলতান! সিপাহশালার এসেছেন আপনার জামাইকে নিয়ে।
সুলতান। জামাই? কে আমার জামাই? এই ধূর্ত শয়তানটা? একে আমি এই মুহূর্তে কোতল করব।
(সুলতান তলোয়ার বার করেন)
উজির। জাঁহাপনা! জাঁহাপনা! গোস্তাকি মাফ করুন, মেজাজ গরম করবেন না। একে খতম করলে আপনি রাজকুমারীর সন্ধান পাবেন কী করে?
সুলতান। তাইতো! (তলোয়ার খাপে পোরেন) বল্ শয়তান, কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস আমার মেয়ে বুদুরকে?
আলাদিন। (দড়িবাঁধা হাতেই কুর্নিশ করে) শাহেনশা! আপনার কথার অর্থ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
সুলতান। তাই নাকি? কিছুই বুঝতে পারছিস না? বেইমান কাঁহাকা! কিছু বুঝতে পারছিস না তো কোথায় গেল আমার মেয়ে বুদুর? কোথায় গেল তোর সেই মায়ার প্রাসাদ? রাতারাতি কোথায় উধাও করলি তাদের?
আলাদিন। (প্রায় আর্তনাদ করে) হায় আল্লা! এ কী কথা শোনালেন জাঁহাপনা? আমার বুদুর নেই? মা, আমার মা, সে-ও নেই? আমার প্রাসাদ, আমার তিনশো বান্দা-বাঁদি, একশো নফর, খানসামা, সব, সব উধাও? কোথায়, কোথায় গেল তারা?
সুলতান। বাঃ! চমৎকার! চমৎকার অভিনয় শিখেছিস তো? কিন্তু না, তোর এই মায়াকান্নায় আমি আর ভুলব না। হায় আল্লা! কী ভুল করেছি আমি একটা আনজান আদমির হাতে আমার বুদুরকে তুলে দিয়ে। আজ আমি তার প্রায়শ্চিত্ত করব এর শিরশ্ছেদ করে। প্রহরী!
প্রহরী। (কুর্নিশ করে) জাঁহাপনা!
সুলতান। এখনই সারা রাজ্যে ঢেঁড়া পিটিয়ে দাও — কাল সকালে আলাদিনের গর্দান নেওয়া হবে।
আলাদিন। জাঁহাপনা! জাঁহাপনা! বিশ্বাস করুন, আপনার এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি বিন্দুমাত্র জানি না কোথায় কীভাবে উধাও হল আমার সব স্বপ্ন, সব আশার ফুল। বুদুর, আমার বুদুর — ও বুঝেছি, এ নিশ্চয়ই সেই শয়তান জাদুকরটার কোনও চাল। জাঁহাপনা। আমাকে একটু সময় দিন, আমি ঠিক খুঁজে বার করব আসল শয়তানকে, ফিরিয়ে নিয়ে আসব আমার মা-কে, সেইসঙ্গে এনে দেব আমার বুকের কলিজা, আমার মহব্বতের গুলাব বুদুরকে আপনার হাতে।
সুলতান। (একটু নরম) বেশ। তবে যাও। তোমাকে আমি একমাস সময় দিলাম। তার মধ্যে এনে দাও আমার বুদুরকে। ফিরিয়ে নিয়ে এসো তোমার প্রাসাদ, ঠিক যেমন ছিল তেমন অবস্থায়।
আলাদিন। যে আজ্ঞা জাঁহাপনা। (কুর্নিশ করে। আলো নেভে)
চতুর্দশ দৃশ্য
(পথ চলার সঙ্গীত। আলাদিন চলার Mime করে। জোরে চলা থেকে ক্লান্ত চলা।
তারপর ওই অবস্থাতেই গান শুরু করে)
গান – ১১ (আলাদিন)
আজ দুখী আলাদিন পথে পথে ঘুরি হায়,
সবকিছু গেছে হারিয়ে।।
পথে আর প্রান্তরে, জনপদে নগরে
মাঠঘাট যাই ছাড়িয়ে।।
সোনার প্রাসাদ আজ নেই যে কোথাও
স্বপ্নের সখী মোর সে-ও তো উধাও।
কিছুরই ঠিকানা নাই খুঁজে পেতে চলি তাই
দেশবিদেশ পেরিয়ে।।
নেই নেই কিছু নেই আর,
শুধু এক বেদনা অপার।।
যত কিছু সুখ ছিল গেল যে কোথায়
দুনিয়াতে একা একা কেঁদে মরি হায়।
কোনও আশা নেই আর খুঁজি পথ এগোবার
আঁধারের দ্বার সরিয়ে।।
আলাদিন। হায় খোদা! আজ পঁচিশ দিন ধরে দুনিয়ার এ-প্রান্ত থেকে সে-প্রান্ত খুঁজে বেড়ালাম, কিন্তু আমার বুদুরের তো কোনও সন্ধান পেলাম না। কোথায় লুকিয়ে আছে আমার আসমানের পরী? আর আমার মা, আমাকে না দেখতে পেয়ে কী যে কষ্ট সে পাচ্ছে! হায় আল্লা! দুশমন জাদুকরটা দুনিয়ার কোন্ প্রান্তে উড়িয়ে নিয়ে গেছে তাদের? ও আল্লা, ও দীন-দুনিয়ার মালিক, আর যে পারি না। পথ দেখাও, পথ দেখাও।
(ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে একটা নদীর ধারে বসে পড়ে জল দিয়ে মুখ ধোবার Myme করে। তারপর হাত দিয়ে মুখ ঘষে, হাত ঘষে, সঙ্গে সঙ্গে আংটির দৈত্য আসার Music বাজে। আলাদিন চমকে যায়, পরক্ষণেই তার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে যায়। আংটির দৈত্যের কথা তার মনে পড়ে গেছে। আংটির দৈত্যের আবির্ভাব ঘটে)
গান – ১২ (আংটির দৈত্য)
হুকুম করুন হুকুম করুন মালিক আলাদিন।
আংটির আমি জিন এসেছি আংটির আমি জিন।।
অন্যমনে অন্যমনে আংটিটা ঘষলেন
আমাকে ডাকলেন।।
তাই তো এলাম করতে তামিল হুকুম সুকঠিন,
হুকুম সুকঠিন।।
আলাদিন। তাই তো! আংটির জিন, তোমার কথা তো আমার মনেই ছিল না। ইয়া আল্লা, কী অসীম করুণা তোমার! শোনো আংটির জিন, সেই শয়তান জাদুকর মুসিবান আমার আশ্চর্য প্রদীপটা চুরি করে নিয়ে গেছে। আমার মা, আমার বেগম আর বান্দা-বাঁদিসমেত আমার প্রাসাদটা উড়িয়ে নিয়ে চলে গেছে কোন্ ভিনদেশে। আমার হুকুম, এই মুহূর্তে তুমি আবার সেই প্রাসাদটা ফিরিয়ে নিয়ে এসো আমার নিজের দেশে।
আং দৈত্য। মাফ করবেন মালিক। আপনার এই হুকুম আমি মানতে পারব না।
আলাদিন। সে কী? কেন? তুমি যে বলেছিলে দুনিয়ায় এমন কোনও কাজ নেই, যা তুমি পারো না?
আং দৈত্য। মালিক। আমি ইবলিশের সন্তান, দুনিয়ার সব কঠিন কাজই আমি পারি, কিন্তু প্রদীপের জিন আমার চেয়েও শক্তিমান। তার কোনও কাজ পণ্ড করার ক্ষমতা আমার নেই। আমায় মাফ করবেন হুজুর।
আলাদিন। (হতাশ) তবে? তাহলে কী হবে? আমার বুদুরের সন্ধান আমি পাব কেমন করে? হায় আল্লা! এত শাস্তি কেন দিচ্ছ আমায়?
আং দৈত্য। মালিক! যদি হুকুম করেন, তবে একটা কাজ আমি করতে পারি। মহান প্রদীপের দৈত্য যেখানে নিয়ে গেছেন আপনার প্রাসাদ, সেই প্রাসাদে আমি আপনাকে পৌঁছে দিতে পারি এক লহমায়, যেখানে আপনার বেগম আপনার প্রতীক্ষায় চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন।
আলাদিন। তাই নাকি? বুদুর, আমার শাহাজাদি, কত কষ্ট হচ্ছে তোমার! ওঃ!! তবে চলো জিন, আমার আর তর সইছে না। এই মুহূর্তে নিয়ে চলো আমাকে সেই ভিনদেশে, আমার মেহবুবার কাছে।
আং দৈত্য। যো হুকুম মালিক। (আলো নেভে)
পঞ্চদশ দৃশ্য
(উড়ে যাওয়ার মতো Music বাজে। সঙ্গে সঙ্গে ‘এক’ প্রবেশ করে ও সেই সুরেই কথা শুরু করে। একইসঙ্গে ‘দুই’-ও প্রবেশ করে এবং যথারীতি কথা বলতে বলতে ওরা প্রাসাদের অভ্যন্তরের Set লাগায়।
এদের কথা চলার সময় মঞ্চের একদিকে আলাদিন ও বুদুর
ঘটনা পরম্পরা অনুযায়ী Mime করতে থাকে)
এক। হু-উ-উ-উ-শ! চলে গেল। আংটির দৈত্য আলাদিনকে নিয়ে সোজা উড়ে গেল কোন্ দূরদেশে, সেই ঘন জঙ্গলের মধ্যে, একেবারে তার প্রাসাদের ভেতর। সেখানে বুদুর একা, একেবারে একা। প্রিয় মেহবুবের জন্য দুচোখে তার অঝোর পানি।
দুই। আর আলাদিন? শ্রান্ত, ক্লান্ত আলাদিন বুদুরের মুখোমুখি হওয়ামাত্র দুজনের চোখে দেখা দিল আলোর ঝলকানি। কতদিন পরে হল প্রিয়মিলন।
এক। কিন্তু আনন্দ করলে তো চলবে না। জাদুকর কোথায়? কোথায় সেই জাদুপ্রদীপ?
দুই। সে তো জাদুকরের কাছেই থাকে সবসময়য়।
এক। তাহলে তো জাদুকরকেই খতম করতে হবে।
দুই। হ্যাঁ, সেইজন্যেই তো আলাদিন বুদুরের হাতে ধরিয়ে দেয় এক বোতল শঙ্খচূড় সাপের বিষ। গোপনে সেটা মিশিয়ে দিতে হবে জাদুকরের সুরার পাত্রে। কিন্তু — বুদুর পারবে তো?
এক। কেন পারবে না? আমাদের বুদুর কম কীসে? তাকে পারতেই হবে।
দুই। ঠিক। তাকে পারতেই হবে। করতে হবে মহব্বতের অভিনয়য়, গাইতে হবে আনন্দের গান। আর সেই গান গাইতে গাইতে সুযোগ বুঝে —
(এক ও দুইয়ের ওপর থেকে আলো নেভে এবং হঠাৎই যেন বুদুর ও আলাদিন প্রাণ পেয়ে কথা বলে ওঠে)
বুদুর। এইরে! ও এসে পড়েছে। জলদি! জলদি লুকিয়ে পড়ো ওই দেরাজটার পিছনে।
আলাদিন। ঠিক আছে। তোমাকে যা বললাম সেইমতো করবে, কেমন? ও যেন একফোঁটাও সন্দেহ না করে।
(আলাদিন লুকিয়ে পড়ে। প্রবেশ করে জাদুকর)
জাদুকর। কই? আমার রাজকুমারী কই? আমার আসমানের তারা, আমার গুলাবের পাপড়ি!!
বুদুর। মুসিবান! এত দেরি করলে কেন? সেই কখন থেকে তোমার জন্যে সেজেগুজে বসে আছি!
জাদুকর। ইলিম্বা গিলিম্বা সিলিম্বা!! তাই নাকি? এ যে দেখি সূর্য উঠছে পশ্চিমদিকে, দিনের বেলা শবনম্ ঝরছে! রাজকুমারী, তুমি আমার জন্যেই বসে আছ? কী আনন্দ!
বুদুর। হ্যাঁ গো। সেই সকাল থেকে মনটা তোমার জন্য আনচান করছে।
মুসিবান। কী আনন্দ! কী আনন্দ! (স্বগত) এইজন্যেই বলে, আল্লাও বোঝেন না জেনানার দিল্।
(বুদুরকে) তবে বলো, তুমি আমাকে শাদি করার জন্য তৈরি?
বুদুর। (লজ্জার অভিনয় করে) হ্যাঁ।
মুসিবান। ইলিম্বা গিলিম্বা সিলিম্বা! শোন্ রে ইবলিশ, শোন্ রে জিন-দানো-দৈত্যের দল, চিন সুলতানের কন্যা বুদুর আমাকে শাদি করার জন্য তৈরি। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। তবে আর দেরি কেন? এসো রাজকুমারী। শাদির মধুর রাত যে পার হয়ে যায়। এই রঙিন রাতে তোমার শানদার গলায় শোনাও মহব্বতের গান!
(ইতিমধ্যেই পানপাত্রে বুদুর জাদুকরের অলক্ষ্যে বিষ মিশিয়ে দেয়)
বুদুর। জরুর! ততক্ষণ তুমি এই সুরাটুকু দিয়ে গলা ভিজিয়ে নাও।
মুসিবান। বাঃ! বা বা বাঃ! এই খুবসুরৎ রাতে সুরা আর সাকী একসঙ্গে না থাকলে জমবে কেন? দাও রাজকুমারী, দাও তোমার হাতের অমৃত। গাও প্রাণ উজাড়-করা গান।
গান – ১৩ (বুদুর)
ওই এসেছে আজ মধুরাত,
গুলবাগিচায় ফুটেছে ফুল।
এই বাতাসে খুশবু ভাসে (২)
আসমানে তারা মশগুল।।
আ — আ — আ
জিন্দেগীভরা আঁধার
পার হয়ে যাব এবার
সবকিছু আজ হবে যে উশুল।।
(গানের মধ্যে কয়েকবার জাদুকর “কেয়াবাৎ” বলে প্রশংসা করে। তারপর এক চুমুকে সবটা খেয়ে নেয়)
জাদুকর। আঃ!! জ্বলে গেল, জ্বলে গেল। শয়তানী! কী খাইয়েছিস আমায়? জহর? জহর? আ- আ- আঃ! জাদুদন্ড! আমার জাদুদন্ড কোথায় গেল? তোকে আমি এমন — আ-আ-আ- আঃ —
(আর্তনাদ করে পড়ে যায়। আলাদিন হাসতে হাসতে লুকোনো জায়গা থেকে বেরিয়ে আসে)
আলাদিন। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। শয়তান! এতদিনে তোর শয়তানীর যোগ্য শাস্তি পেয়েছিস তুই। যা, তোর জন্যে জাহান্নমের দরজা এখনও খোলা আছে। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ —
(জাদুকরের জেব থেকে প্রদীপটা বার করে তুলে ধরে) দেখ বুদুর দেখ, এই সামান্য প্রদীপটার কী অসামান্য ক্ষমতা! এরই জন্যে এতকিছু ঘটনা, এতরকম কাণ্ডকারখানা। এই আশ্চর্য প্রদীপটাই আমাকে দর্জির ছেলে থেকে বানিয়েছে সুলতানের জামাই, তোমাকে এনে দিয়েছে দুঃখকষ্টের স্বাদ, শয়তানীর ঘটিয়েছে সমাপ্তি, আবার আজ এই প্রদীপটাই আমাদের ফিরিয়ে দেবে আমাদের হারানো সব আনন্দ, এনে দেবে বেহেস্তের সুখ।
(প্রদীপটা ঘষতে থাকে ও বলতে থাকে)
এসো, এসো প্রদীপের দৈত্য, ফিরিয়ে নিয়ে চলো আমাদের নিজের দেশে। যে যেমন অবস্থায় ছিল, ঠিক সেইরকম অবস্থায়।
(চারিদিকে আলোড়ন করা সঙ্গীত ও আলোর খেলার মধ্যে দৈত্যের হাসি শোনা যায়। আস্তে আস্তে সবকিছু কমে আসে ও সেইসঙ্গে ভেসে আসে গানের সুর। গানের সঙ্গে নাচতে নাচতে প্রবেশ করে ‘এক’ ও ‘দুই’। সেই সুরের সঙ্গে Composition করে একে একে প্রবেশ করেন সুলতান, উজির, আলাদিনের মা ও আলাদিনের বন্ধুরা। গানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সবাই নাচতে থাকে)
গান – ১৪ (এক ও দুই)
আ — আ — আ — আ
মোদের গল্প ফুরোলো
নটে গাছটি মুড়োলো
জেনো এই গল্পের নেই তুলনা।
সেই থেকে আলাদিন
সুখী হল চিরদিন
এ কাহিনি কোনদিন কেউ ভুলো না।। লা- লা- লা-
হাসিখুশি ছড়িয়ে
মন রাখল ভরিয়ে
দূরে দিল সরিয়ে যত বেদনা।। লা- লা- লা-
আলাদিনের মতন
তোমরা যদি পাও গো মন
জেনো ঠিকই প্রদীপের পাবে ঠিকানা।। লা- লা- লা-
(পর্দা পড়তে থাকে।)