
প্রথম দৃশ্য
[সামনে বেশ চওড়া এক নদী। এ-পাড়ে বেশ কিছু গাছপালা। সেখানে জামগাছের ডালে বসে একটি বাঁদর জাম খাচ্ছে, তার নাম কপিকান্ত।]
কপি— হেউ-হে-এ-এ-উ, নাহ্, আর পারা যাচ্ছে না। পেট ফুলে জয়ঢাক হয়ে গেল! এরপর আরও খেলে পেটটাই হয়তো ফেটে যাবে ফটাস করে। না, আর খাব না। এবার নদীর জলে হাত-মুখ ধুয়ে একটু বসি আরাম করে।
(গাছ থেকে নেমে নদীর ধারে গিয়ে হাত-মুখ ধুল। তারপর পাড়ে বসে,ভুঁড়ি চুলকোতে চুলকোতে মহানন্দে গান ধরল।)
গাছে গাছে নেচে বেড়াই এই ডালে ওই ডালে।
পাকা পাকা ফলগুলি ভাই,টপ করে নিই গালে।।
বগল দুটি চুলকোই খুব,আরও চুলকোই ভুঁড়ি।
বাঁদরামিতে এই দুনিয়ায় নেই গো মোদের জুড়ি।।
[হঠাৎ গান থামিয়ে]— আরে, ওটা আবার কী রে বাবা,নদীর জলে ভেসে আসছে,মস্ত গাছের গুঁড়ির মতো! উঁহু, ভালো ঠেকছে না। গাছে উঠে পড়ে আড়াল থেকে ঘাপটি মেরে দেখি ব্যাপারটা কী।
[বাঁদর তরতরিয়ে গাছে উঠতেই হাপুসহুপুস শব্দ করে পাড়ে উঠল একটা কুমির। বিশাল হাই তুলে বলল—]
কুমির— ওফ্, সেই থেকে সাঁতার কাটতে কাটতে গায়ে শ্যাওলা পড়ে গেল! মাছেরা সারা দিনরাত জলের মধ্যে কী করে থাকে কে জানে! আমার তো আধঘণ্টা থাকলেই হাঁফ ধরে যায়। পাড়ে উঠে রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে চুপ করে একটু শুয়ে থাকলে ধড়ে প্রাণ আসে। ঘণ্টা খানেক ঘুমিয়ে নিই, তারপর ফেরার পথে বউ আর ছেলেমেয়েদের জন্যে মাছ ধরে নিয়ে যাব। এ-তল্লাটে নদীর মাছ ছাড়া আর কিছু পাওয়াও যায় না ছাতা। দু-একটা জন্তুজানোয়ার পেলে মাঝে মাঝে একটু মুখবদল হতে পারত। এমন ওঁচা জঙ্গল এর আগে কোনোদিন দেখিনি বাপু!
[জঙ্গলের নিন্দে শুনে বাঁদর বেজায় রেগে গেল। উত্তেজিত হয়ে বলল—]
বাঁদর— অ্যাইও, কে হে আপনি, হঠাৎ এসেই জঙ্গলের নিন্দে শুরু করে দিয়েছেন?
[থতমত খেয়ে কুমির চারদিকে তাকাল। কাউকে দেখতে না পেয়ে ভয়ে ভয়ে বলল—]
কুমির— কে ভাই? আপনি কোথায় ভাই? কিছু ভুল বলে ফেললাম কি ভাই?
বাঁদর— আপনি বেশ নড়েভোলা তো! চারদিকে তাকালেন, আর ওপরেই তাকালেন না? এই যে এদিকে, এখানে, গাছের ওপর।
[কুমির ওপরের দিকে তাকিয়ে বাঁদরকে দেখতে পেল। বলল—]
কুমির— অ, আপনি গাছের মগডালে উঠে বসে আছেন? আপনি উট নাকি?
বাঁদর— আপনি বেশ গোলমেলে জীব তো মশাই, গাছে উঠলেই বুঝি সব উট হয়ে যায়! উট থাকে মরুভূমিতে, যেখানে জল পাওয়া যায় না।
কুমির— তাই বুঝি? আমি তো কোনোদিন মরুভূমিতে যাইনি, তাই চিনি না। আমি কুমির, আমি জলেও থাকি আবার ডাঙাতেও থাকি। মানে উভচর আর কি, হে হে হে।
বাঁদর— আমি কপি। আমাদের আরও অনেক নাম আছে যেমন, বানর, শাখামৃগ। মানুষরা আমাদের বাঁদরও বলে। শুনেছি তারা নিজের ছেলেমেয়েদের আদর দিয়ে দিয়ে বাঁদর বানায়। আমরা গাছেও থাকি, আবার মাটিতেও হাঁটাচলা, লাফালাফি করতে পারি। কিন্তু আমাদের কেউ উভচর বলে না।
কুমির— বলে না বুঝি?
বাঁদর— না না, বলে না। সরি, একটা কথা মনে পড়ল তাই বলছি, আপনারা সরীসৃপ না?
কুমির— ঠিক ঠিক, আমরা সরীসৃপই তো! আমরা যে বুকে হাঁটি। কিন্তু এতে সরি হবার কী আছে?
বাঁদর— একে উভচর, তাতে আবার সরীসৃপ, এর পরেও সরি না হলে আর কীসে হবেন? যাক গে, ও-কথা থাক। তা আপনাদের খাবারদাবারের কী ব্যবস্থা?
কুমির— আমাদের আবার খাবারের অভাব? জলে মাছ ধরে খাই। ডাঙায় গোরু, ছাগল, কুকুর, হরিণ—যখন যা জোটে খাই। সুযোগ পেলে মানুষও খাই। তবে এ-জঙ্গলে তেমন কিছুই মেলে না, সেই জন্যেই বলছিলাম বাজে জঙ্গল।
বাঁদর— বাজে বললেই শুনব? এমন সুন্দর জায়গা ভূভারতে আর কেউ দেখেছে? দেখেনি। আমি বলছি কেউ দেখেনি। সামনেই এমন তিরতিরে নদী। নদীর ধারে এমন জমকালো জঙ্গল। আর সেই জঙ্গলে ফলভরা এমন গাছ—পাবে কেউ? গরমকালে আম, জাম, লিচু। বছরভর কলাটা, পেয়ারাটা—কত ফল খাবে খাও না। আর সে-ফলে ভাগ বসাতে দু-চারটে পাখি ছাড়া আর কেউই নেই এ-জঙ্গলে।
কুমির— [খুব অবাক হয়ে] ফল খাব? গাছের? আমরা?
বাঁদর— উঠলে তো নদীর জল থেকে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন আকাশ থেকে পড়লে! কোনোদিন খেয়েছ? খেয়ে দেখেছ?
কুমির— না, তা খাইনি।
বাঁদর— তবে? সর্বদা মাংস খাওয়ার জন্যে হাঁকপাক না করে মাঝে মাঝে ফল-টল খেয়েও দেখো না!
কুমির— না মানে, ইয়ে ফল খাবার কথা আমাদের মাথাতেই আসেনি কোনোদিন। বলি পেট-ফেট খারাপ হবে না তো?
বাঁদর— হে হে, খুব অবাক করলে যা হোক। পাকা ফল খেয়ে কারও পেট খারাপ হয়েছে, এমন শুনিনি ভাই।
কুমির— [লেজ দিয়ে পিঠ চুলকে] আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখব না-হয়।
বাঁদর— আরে ধুর, চেষ্টা করবে কী? গোটা কয়েক ফল দিচ্ছি, এখনই খেয়ে দেখো দেখি! হাঁ করো, হাঁ করো—ও বাবা, অত্তো বড়ো হাঁ! ঠিক আছে এই নাও। [বাঁদর বেশ ক’টা পাকা জাম ছুড়ে দিল কুমিরের মুখে, কুমির চিবোতে লাগল।] কী, কেমন?
কুমির— বাহ্, সত্যিই দারুণ তো! কী মিষ্টি! আরও আছে নাকি? আমাকে আরও ক’টা দাও দেখি, বাড়ির জন্যেও ক’টা নিয়ে যাব। বউ-ছেলেমেয়েরাও এ-জিনিস পেলে অবাক হয়ে যাবে। কোনোদিন খায়নি তো! কী নাম বলো তো এগুলোর?
বাঁদর— হে হে, এ হল জাম। এ তো কিছুই না, এর থেকেও কত ভালো ভালো ফল আছে! সে-সব খেলে তো আর মাছ-মাংসের ধার ঘেঁষবে না। আচ্ছা সে হবে’খন, আমার সঙ্গে ক’দিন কাটাও, তোমাকে আরও অনেক ফল খাওয়াব। আজ এই জামগুলো নিয়ে গিয়ে বাড়িতে সকলকে খাওয়াও, কাল এসে বলবে বাড়িতে কে কী বলল।
[বাঁদর গাছের ডালপালা ঝাঁকিয়ে অনেক জাম ফেলল মাটিতে, কুমির সেগুলো কুড়িয়ে নিল চটপট।]
কুমির— তোমার সঙ্গে আলাপ হয়ে খুব ভালো লাগল, বাঁদরভাই। অনেক কিছু জানা হল, শেখা হল। কাল এরকম সময়েই আবার আসব।
বাঁদর— আচ্ছা, কুমিরভাই। কাল আসবে কিন্তু আবার। আজ তো তেমন কোনও কথাই হল না। কাল অনেক গল্প হবে, কেমন? কাল সকালে আরও নতুন কিছু ফল তোমার জন্যে জোগাড় করে রাখব।
কুমির— একটা কথা তোমাকে বলতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু কী জানি তুমি কী ভাববে, সেই ভেবে বলতে ভরসা পাচ্ছি না।
বাঁদর— কী কথা বলো তো?
কুমির— আমার তো কোনও বন্ধু নেই! তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হলে বেশ হত।
বাঁদর— হা হা হা হা। আমরা তো বন্ধু হয়েই গেছি! তা, এ-কথাটা বলতে এত কিন্তু কিন্তু করছ কেন বন্ধু?
কুমির— না, অনেকে বলে, সমান সমান না হলে বন্ধুত্ব হয় না। তাই একটু কিন্তু কিন্তু করছিলাম।
বাঁদর— সমান সমান বলতে?
কুমির— মানে এই যেমন ধরো আমি সরীসৃপ আর তুমি স্তন্যপায়ী। তারপর যেমন ধরো, আমার তুলনায় তোমার চেহারা অনেক ছোট্ট। তুমি ফল-টল খাও, আর আমরা মাংস খাই। আমাদের গায়ের জোরও তোমার তুলনায় অনেক অনেক বেশি…
বাঁদর— বুঝেছি বুঝেছি, আর বলতে হবে না। ওইসব কথা পণ্ডিতেরা বলে। ওদের সব কথায় কান দিতে আছে নাকি? সবকিছু সমান যদি নাও হয়, তবু মনের মিল বলে একটা ব্যাপার আছে—বলি সেটা মানবে তো?
কুমির— সে কথা তো একশো বার।
বাঁদর— ব্যস, ব্যস, ওটুকুই যথেষ্ট। মনের মিল যখন হয়েছে, তখন আমরা বন্ধু।
কুমির— বড়ো আনন্দ পেলাম বন্ধু। আজকে বাড়ি গিয়ে বলব, এতদিনে আমি একজন বন্ধু পেয়েছি। আজ তবে আসি বন্ধু?
বাঁদর— এসো বন্ধু, এসো। কাল আসবে কিন্তু। বেশ জমিয়ে গল্প করা যাবে।
দ্বিতীয় দৃশ্য
[কুমিরের বাসা। কুমির আর তার ছানাপোনারা কচরমচর করে ফল খাচ্ছে। কুমিরের বউ চোখ কুঁচকে দেখতে দেখতে বলল—]
কুমিরনী— পরশু আবার যেন হুট করে কোথাও বেরিয়ে পোড়ো না।
কুমির— কেন? পরশু কী আছে?
কুমিরনী— পরশু ছেলেমেয়ের স্কুল থেকে আমাদের দুজনকেই ডেকেছে।
কুমির— [ছানাপোনাদের ধমকে] কেন রে? কী করেছিস তোরা? নিশ্চয়ই নিয়মিত হোম-টাস্ক করিস না! নাকি পড়া পারিসনি? পড়াশুনোর নাম নেই, দিনরাত কেবল খেলা আর খেলা। পিঠের চামড়া তুলে দিতে হয়!
কুমিরনী— পুরোটা না শুনেই ছেলেমেয়েদের বকছ কেন? আমার ছেলেমেয়েদের বুদ্ধিসুদ্ধি কম হতে পারে, কিন্তু ফাঁকি দেয় না।
কুমির— তাহলে স্কুল থেকে ডাকল কেন? তার মানে নিশ্চয়ই কোনও বদমায়েশি করেছে! দুষ্টুমি করে থাকলে দুটোরই লেজ মুচড়ে দেব—এই বলে রাখলাম।
কুমিরনী— ধ্যাত্তেরিকা, খালি পিঠের চামড়া তুলছে, নয় লেজ মুলে দিচ্ছে! আর অন্য কোন কথাও নেই মুখে? বেশ ক’দিন ধরেই তোমার রকমসকম কিন্তু আমার ভালো ঠেকছে না। ছেলেমেয়েরাও দেখছি তোমার চোখের বালি হয়ে উঠছে দিন দিন।
কুমির— [ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আম খেতে খেতে] বাজে না বকে কী ব্যাপার হয়েছে খুলে বলবে নাকি?
কুমিরনী— আগে বলো তো, আজকাল রোজই তোমার এই হাবিজাবি ফলপাকুড় নিয়ে আসার মতি হচ্ছে কেন? তুমি কি আমার ছেলেমেয়েদের ছাগল-গোরু বানিয়ে তুলতে চাইছ?
কুমির— [ভারি অবাক হয়ে] তার মানে?
কুমিরনী— তা নয়তো কী? কুমিরের বাচ্চারা কবে কোথায় ওইসব ছাইপাঁশ খেয়ে বড়ো হয়েছে, শুনি?
কুমির— ছাইপাঁশ মানে? জানো, আমার বন্ধু বলেছে, এইসব ফল মানুষেরাও খায়। আম, জাম, কাঁঠাল, কলা এসব ছাইপাঁশ! কী বলছ গো, গিন্নি?
কুমিরনী— রাখো তোমার বন্ধু। ওই বন্ধুই তোমার মাথাটা খেয়েছে। কুমিরের বন্ধু বাঁদর! এমন শুনেছে কেউ, নাকি দেখেছে? লজ্জায় মরি আর কি! কুমির সমাজে কেউ শুনলে ছি ছি করবে। আমাদের সঙ্গে আর কেউ সম্পর্ক রাখবে? আমাদের একঘরে করবে।
কুমির— আহা, ব্যাপারটা বুঝছ না গিন্নি! এতদিন আমাদের কেউ কোনও ফল পায়নি, তাই খায়নি। কোনও কুমির কি কোনোদিন গাছে চড়েছে, নাকি ফল পেড়ে খেয়েছে? কুমির তো গাছে চড়তেই পারে না! সে আবার ফল খাবে কী করে? আমার বন্ধু বাঁদর, গাছে চড়তে পারে। তার দৌলতেই আমরা ফলের স্বাদ পেয়েছি। আমি বলি কী, আমাদের পাড়ার সবাইকে একদিন নেমন্তন্ন করো, সক্কলকে ফল খাওয়াই।
কুমিরনী— বোঝো, নেমন্তন্ন করে কী করবে শুনি? তোমার ছেলেমেয়ের পেটে কোনও কথা থাকে? স্কুলে গিয়ে তারা বন্ধুদের গিয়ে গল্প করেছে। ওদের ক্লাসের বন্ধুরা আবার তাদের বাবা-মাকে গিয়ে বলেছে, ও বাবা, ফল খাব, ফল এনে দাও! ও মা, বাবাকে বলো না অনেক অনেক ফল আনতে। ছেলেমেয়েদের নাকি কান্না শুনে তাদের বাবা-মায়েরা কমপ্লেন করেছেন স্কুলের হেড-দিদিমণির কাছে।
কুমির— হা হা হা হা, এ হচ্ছে হিংসে, গিন্নি, হিংসে! তুমি কিচ্ছু ভেবো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
কুমিরনী— ঘোড়ার ডিম ঠিক হবে! অলরেডি ক্লাসের বন্ধুবান্ধবেরা ওদের সঙ্গে কথা বলে না। ওদের সঙ্গে এক বেঞ্চে বসে না। তাদের গার্জেনরা একসঙ্গে হেড-দিদিমণিকে চিঠি দিয়ে বলেছে, আমাদের ছেলেমেয়েদের যদি স্কুল থেকে বের করে না দেওয়া হয়, তারাই নিজেদের ছেলেমেয়েকে অন্য স্কুলে ভরতি করে দেবে।
কুমির— তার মানে? আমাদের ছেলেমেয়ে পড়াশুনো করে—অসভ্য নয়, দুষ্টু নয়—তাদের স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেবে, তারা ফল খায় বলে? এ কি মগের মুল্লুক নাকি? আমরা আমাদের মতো যা খুশি খেতে পারব না? আমরা কী খাব না খাব, সেটা আর পাঁচজনে ঠিক করে দেবে? আর স্কুলও সেটা মেনে নেবে? দেখে নিও, স্কুল নিশ্চয়ই এই অন্যায় আবদার মানবে না।
কুমিরনী— ওই ভরসায় থাকলেই হয়েছে আর কি! অলরেডি স্কুল ঠিক করে ফেলেছে আমাদের ছেলেমেয়েদের তাড়িয়ে দেবে। পরশু হেড-দিদিমণি আমাদের সেই কথাই বলবেন, আর শেষবারের মতো হয়তো দু-চারদিন সময় দেবেন। আমরা যদি আর কোনোদিন ফল-টল খাব না বলে প্রমিস করি, তাহলে স্কুল ওদের পড়তে দেবে।
কুমির— এ তো অত্যাচার। কুমিরের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। এ চলতে পারে না। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ করছি।
কুমিরনী— ভালো, তুমি প্রতিবাদ করো। আর আমাদের ছেলেমেয়েরা মুখ্যু হয়ে বড়ো হোক। অন্য কুমিরের ছানারা স্কুল থেকে পাস করে, বড়ো বড়ো হরিণ, গোরু, ছাগল, মানুষ-টানুষ শিকার করার নানান ফন্দিফিকির শিখে দু-বেলা ভরপেট মাংস খাবে। আর আমাদের ছেলেমেয়েরা তাদের আশেপাশে ঘুরঘুর করবে, আর কেঁদে কেঁদে ভিক্ষে করবে—দু-পিস মাংস হবে-এ-এ-এ! দু-একজন হয়তো দয়া করে একটা কান বা দুটো খুর ছুড়ে দেবে ওদের দিকে।
কুমির— কী ভয়ানক কথা বলছ, গিন্নি! আমার তো চোখে জল চলে আসছে!
কুমিরনী— যাক, এতদিন মানুষরা ‘কুমিরের কান্না’, ‘কুমিরের চোখে জল’ বলে যেসব ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত, তোমার চোখের জল দেখে সে-সব বন্ধ হয়ে যাবে।
কুমির— এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, গিন্নি?
কুমিরনী— খুব সহজ। ওই কুচুটে বাঁদরটাকে মেরে ফেললেই সব ল্যাঠা চুকে যাবে। বরং কুমিরেরা তোমাকে ধন্য ধন্য করবে।
কুমির— ধন্য ধন্য করবে? কী বলছ, গিন্নি?
কুমিরনী— ঠিকই বলছি। এখন পর্যন্ত কুমিরের দল অনেক জন্তুজানোয়ারের স্বাদ পেলেও বাঁদরের স্বাদ খুব একটা পায়নি মনে হয়। একে তারা গাছে থাকে, আর খুব সেয়ানা হয়—তাদের ধরা কুমিরের পক্ষে বেশ শক্ত।
কুমির— তাতে কী?
কুমিরনী— [মুচকি হেসে] তাতেই আমাদের কপাল খুলে যাবে। ধরো বাঁদরটাকে তুমি মেরে আনলে, তারপর বাঁদরের মাংসের টুকরো আমরা পাড়ার মাতব্বর কিছু কুমিরকে, স্কুলের হেড-দিদিমণির বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম।
কুমির— তাতে লাভ কী হবে?
কুমিরনী— বুঝলে না? পাড়ার লোক বুঝবে, বাঁদরটাকে ধরার জন্যেই তুমি এতদিন বন্ধু সেজে ওই সব ছাইপাঁশ ফল-টল খাচ্ছিলে। লোকে তোমার বুদ্ধির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবে, দেখে নিও।
কুমির— যা বললে সেটা হয়তো ঠিকই বললে। কিন্তু আমি সত্যিই বাঁদরকে বন্ধু বলে মনে করি। আমি বাঁদরকে কোনোমতেই মারতে পারব না।
কুমিরনী— সে আমি জানি। তুমি শুধু তাকে এখানে নিয়ে এসো, তোমাকে আর কিচ্ছু করতে হবে না। তারপর যা করার আমিই করব।
কুমির— কিন্তু, বন্ধু হয়ে বন্ধুর সঙ্গে এমন শয়তানি করা উচিত হচ্ছে না গিন্নি
কুমিরনী— তুমি তো কিছু করছ না গো, তুমি শুধু নেমন্তন্ন করে ডেকে আনবে।
কুমির— নেমন্তন্ন করলেই চলে আসবে! প্রথম কথা, সে সাঁতার জানে না। তার ওপর আমরা যে মাংস ছাড়া কিছুই খাই না, সেও সে জানে। আমরা তাকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াব কী? নেমন্তন্ন করলেই সন্দেহ করবে।
কুমিরনী— ধুর বাবা, তুমি বড্ড বোকা। নেমন্তন্ন মানে বলবে, আমাদের ও-পাড়েও অনেক গাছপালা আছে, তাতে অনেকরকম ফলও ফলে। আমরা তো ফল চিনি না, আর ফল পাড়তেও পারি না। বন্ধু, তুমি যদি আমাদের ওখানে গিয়ে ফলগুলো চিনিয়ে দাও, আর কিছু পেড়ে দাও, তাহলে খুব উপকার হয়। আমাদের ওখানে সারাদিন থেকে তুমিও যত খুশি ফল খাবে, তারপর বিকেল হলে তুমি এ-পাড়ে ফিরে আসবে।
কুমির— ওফ্, তুমি তো আমার প্রথম কথাটা শুনলেই না—ও আসবে কী করে? ও তো সাঁতারই জানে না!
কুমিরনী— ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয় গো, উপায় হয়। বাঁদর এমন কী আর বড়ো আর ভারী হয়? তুমি পিঠে চাপিয়ে নিয়ে চলে আসবে। নিয়ে আসতেই তোমার যা একটু কষ্ট হবে। তারপর আমরা তো সবাই মিলে ভাগ করে খেয়েই নেব। পিঠের ভার পেটে এলে দেখবে মন্দ লাগবে না গো!
কুমির— হুঁ, যে-ফন্দি তুমি বের করেছ, তাতে আমার বন্ধু বাঁদর বিশ্বাস করে নেবে এবং সত্যিই চলে আসবে।
কুমিরনী— আসবে গো, আসবে। নিশ্চয়ই আসবে দেখে নিও। ওফ্, আমার যা আনন্দ হচ্ছে না! সারাজীবন মিষ্টি মিষ্টি ফল খেয়ে তোমার বন্ধুর কলজেটার যা স্বাদ হয়েছে, ভাবতেই আমার জিভে জল আসছে গো!
কুমির— [খুব মনমরা মুখে] সেই তো মানলে, যে ফল খেতে মিষ্টি আর মজাদার!
কুমিরনী— বাজে কথা বোকো না তো। তোমার ওই ফলের জন্যে ছেলেমেয়েদের, আমাদের ভবিষ্যৎ-টবিষ্যৎ সব জলাঞ্জলি দেব নাকি? যা বললাম তা যদি না করেছ, তাহলে আমি কালই ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাব। তখন থেকো তোমার মিষ্টি ফল আর প্রাণের বন্ধুকে নিয়ে।
[দুমদুম পা ফেলে, মুখ হাঁড়ি করে, কুমিরনী বেরিয়ে গেল অন্য জলায়।]
কুমির— [দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলল] হায় বন্ধু, আমাদের এই বন্ধুত্ব না হলেই ভালো হত। ছি ছি, বন্ধু হয়ে বন্ধুকে কী বিপদেই ফেললাম!
তৃতীয় দৃশ্য
[প্রথম দৃশ্যের নদীর পাড়। পাড়ে বসে বাঁদর। নদী থেকে মাথা তুলল কুমির।]
বাঁদর— গুড মর্নিং, কুমিরভাই। আজ একটু দেরি করে ফেললে আসতে!
কুমির— হ্যাঁ, ঘরের কিছু কাজকর্ম সেরে আসতে একটু দেরি হল।
বাঁদর— খুব কাজের চাপ নাকি বন্ধু? মুখটাও কেমন ভার ভার দেখছি!
কুমির— মুখভার? না না, মুখভার হবে কেন? এই তো হাসছি। আজ আমাদের ওখানে তোমার নেমন্তন্ন। আমার সঙ্গে তোমাকে একবার যেতেই হবে বন্ধু।
বাঁদর— ওয়াও, অনেকদিন নেমন্তন্ন খাইনি! কীসের নেমন্তন্ন ভাই? বিবাহবার্ষিকী, নাকি ছেলেমেয়ের জন্মদিন? তা কী কী খাওয়াবে গো বন্ধু?
কুমির— আমরা তো মাংস খাই, সে তো তুমি খাবে না বন্ধু। তাই আমার বউ বলল, আমরা যে জলা-জঙ্গলে থাকি সেখানেও তো অনেক ফল-ফুলুরির গাছ আছে। সে-সব ফলের কোনটা খাদ্য, কোনটা অখাদ্য সেও তো আমরা জানি না। তুমি একবার গিয়ে আমাদের চিনিয়ে দেবে, আর ওই সঙ্গে তুমি নতুন নতুন ফলও খেয়ে আসতে পারবে পেটভরে।
বাঁদর— কথাটা মন্দ বলোনি, কিন্তু যাব কী করে? আমি তো সাঁতারই জানি না।
কুমির— ধুর বাবা, আমি থাকতে ও-নিয়ে তুমি ভাবছ কেন? আমার পিঠে চেপে পড়বে, নৌকোর মতো ভেসে ভেসে, হাওয়া খেতে খেতে দিব্যি আরামে যাবে আর আসবে।
বাঁদর— হে হে, এত করে যখন বলছ, তখন তো যেতেই হয়। কিন্তু আজ তো অনেক দেরি হয়ে গেল, আজ কি আর হবে? বরং কাল একটু সকাল সকাল চলে এসো, কাল বেরিয়ে পড়ব দুই বন্ধুতে।
কুমির— না না বন্ধু, আজই যেতে হবে। আমার বউ আরও অনেককে বলে রেখেছে তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে বলে—তারা সব এসে বসে থাকবে যে!
বাঁদর— [জনান্তিকে] হঠাৎ হুটোপাটি করে কীসের নেমন্তন্ন কে জানে। গতিক সুবিধের ঠেকছে না। কিন্তু যেভাবে উৎসাহ দেখাচ্ছে, না করাও বেশ মুশকিল।
কুমির— কী এত ভাবছ, বলো তো বন্ধু? একেবারে চুপ মেরে গেলে যে? বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর বাড়ি যেতেও তোমার এত ভাবনা?
বাঁদর— না না, ভাবনা আর কীসের? চলো তবে যাওয়া যাক।
[পাড় থেকে নেমে বাঁদর কুমিরের পিঠে উঠে বসতেই কুমির জলে নামল। প্রথম প্রথম একটু ভয় ভয় লাগলেও পরে বেশ মজাই লাগল বাঁদরের।]
কুমির— কেমন লাগছে, বন্ধু? ভয় লাগছে না তো? হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে বসো বন্ধু। আমার পিঠটা তেমন ছোটো তো নয়।
বাঁদর— না না বন্ধু, তোমার মতো বন্ধু থাকতে আবার ভয় কীসের? আর সত্যিই, নদীর মাঝখান থেকে দুই পাড় যে এত সুন্দর দেখায়, তোমার সঙ্গে না এলে জানতেই পারতাম না!
কুমির— তবে? আমার সঙ্গে এসে নতুন একটা অভিজ্ঞতা হল বলো?
বাঁদর— তা হল। কিন্তু আজকে আমার কীসের জন্যে নেমন্তন্ন সেটা বললে না তো বন্ধু?
কুমির— কীসের নেমন্তন্ন? বন্ধুর বাড়ি বন্ধু যাচ্ছে, তাতে আবার কারণ দরকার হয় নাকি?
বাঁদর— সে-কথা একশো বার। কিন্তু তুমি বললে না আজকে আমার নেমন্তন্ন! কীসের নেমন্তন্ন সেটা জানলে একটু সুবিধে হত।
কুমির— কীসের সুবিধে?
বাঁদর— বাহ্ রে, প্রথম দিন তোমার বাড়ি যাচ্ছি নেমন্তন্ন খেতে, খালি হাতে যাওয়া ভালো দেখায় না বন্ধু।
কুমির— খালি হাতে মানে?
বাঁদর— মানে কোনও উপহার-টুপহার নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল আর কি! ধরো ছেলেমেয়ের জন্মদিন হলে—একটা দুটো চকোলেট। অথবা বিবাহবার্ষিকী হলে বৌদির জন্যে একগোছা ফুল…
কুমির— ভুল করছ বন্ধু, মস্তো বড়ো ভুল। সত্যি কথাটা তাহলে তোমাকে বলেই ফেলি। তোমাকে মিথ্যে বলতে আমার ভালোও লাগছে না।
বাঁদর— মিথ্যে কথা? কী মিথ্যে কথা বন্ধু? [ভয়ে বুক কেঁপে উঠল বাঁদরের।]
কুমির— নেমন্তন্ন-টেমন্তন্ন কিচ্ছু না। তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি…
বাঁদর— নেমন্তন্ন নয়? তাহলে কী?
কুমির— আমার বউ তোমার দেওয়া মিষ্টি ফল খেয়ে খুব খুশি হয়েছে। তার ধারণা, সারাজীবন এমন মিষ্টি মিষ্টি ফল খেয়ে তুমিও নিশ্চয়ই মিষ্টি হয়ে উঠেছ।
বাঁদর— আমি মিষ্টি হয়ে উঠেছি? যাহ্, কোনোদিন টের পাইনি তো!
কুমির— তুমি না পেলে কী হবে? আমার বউ টের পেয়েছে। তার খুব ইচ্ছে আজ তোমার কলজে খাবে।
বাঁদর— কী খাবে? [বাঁদরের মাথা ঘুরতে লাগল, কোনোরকমে বলল।]
কুমির— কলজে, কলজে—মানে হৃৎপিণ্ড!
[ভয়ে বাঁদরের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল। কী সর্বনাশ! এখন কী উপায়? মাঝনদীতে সে বসে আছে মস্ত এক কুমিরের পিঠে, সেখান থেকে পালাবার কোনও উপায় নেই। জলে ঝাঁপ দিলেও কুমির অনায়াসে ঝপ করে কামড়ে ধরবে। কী করা যায়—ভাবতে লাগল বাঁদর। এদিকে অনেকক্ষণ সাড়া না পেয়ে কুমির বলল—]
কুমির— কী হল? চুপ করে গেলে যে? কিছু বলছ না তো! ভয় পেলে নাকি? ভয় কী? আর মিনিট পাঁচেক গেলেই আমার বাসা, সেখানে গেলেই আমার বৌ তোমার গলাটা টিপে দেবে—ব্যস্, ভয়-ভরসা সব মিটে যাবে বন্ধু।
বাঁদর— হো হো হো হো [হাসতে হাসতে বাঁদর লাফিয়ে লাফিয়ে উঠল কুমিরের পিঠে।] হো হো হো হো…
কুমির— [অবাক হয়ে] পাগল হয়ে গেলে নাকি? বন্ধু, এত হাসছ কেন?
বাঁদর— হো হো হো হো…
কুমির— কী বিপদ, কেন হাসছ বলবে তো!
বাঁদর— এ-কথাটা তুমি আমাকে আগে বলতে পারলে না? হা হা হা হা হা—হাসব না তো কী?
কুমির— কোন কথাটা?
বাঁদর— হো হো হো হো—ওই ওই, আমার কলজের কথাটা।
কুমির— কেন, কী হত বললে?
বাঁদর— কী হত? তুমি যে এতটা মুখ্যু আমি বুঝতেই পারিনি বন্ধু। বাঁদরেরা বুঝি সর্বদা কলজে নিয়ে ঘোরে?
কুমির— তার মানে?
বাঁদর— বলি বাঁদরের কলজে ক’টা হয়?
কুমির— একটাই তো হয়!
বাঁদর— তবে? আমরা যে গাছের এ-ডালে ও-ডালে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াই, যদি হাত ফসকে পড়ে যাই?
কুমির— হাত-পা ভাঙবে—সে আর আশ্চর্য কী?
বাঁদর— আজ্ঞে না স্যার, হাত-পা ভাঙলে সেরে যায়, তার জন্যে আমরা চিন্তা করি না। চিন্তা করি কলজের জন্যে। পড়ে গিয়ে কলজেটা ফাটলেই—শেষ, অক্কা।
কুমির— তাহলে?
বাঁদর— তাহলে? কলজেটা খুলে গাছের কোটরে আমাদের বাসায় রেখে দিই। তারপর গাছে গাছে লাফালাফি করি।
কুমির— তারপর?
বাঁদর— তারপর আবার কী? সন্ধেয় ঘরে ফিরে কলজে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। রাত্রিবেলা ছাড়া কলজের দরকারই-বা কী?
কুমির— তাই? তার মানে, তোমার কাছে এখন কলজে নেই?
বাঁদর— হা হা হা হা, সেই থেকে আর বলছি কী তোমায়? আর হাসছিই-বা কেন? তুমি যদি তখনই বলতে তোমার মিষ্টি বৌ আমার মিষ্টি কলজে খেতে চেয়েছে, তখনই তোমায় দিয়ে দিতাম!
কুমির— তাই বুঝি? তাহলে এখন উপায়?
বাঁদর— উপায় আর কী? আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে চলো। নয়তো আমার কলজেহীন ফাঁপা শরীরটা পেলে তোমার বউ খুব দুঃখ পাবে—হয়তো কেঁদেই ফেলবে বেচারি।
কুমির— কাঁদবে না ছাই! গাল দিয়ে আমার ভূত তাড়াবে! না হে বন্ধু, চলো ফিরেই যাই।
বাঁদর— সেই ভালো। একটু দেরি হয়তো হবে, কিন্তু কলজেটা পেয়ে যাবে।
[কুমির ঘুরে উলটোমুখে সাঁতার দিতে লাগল।]
কুমির— ভাগ্যে তোমায় সময় থাকতে বলেছিলাম বন্ধু, তা না হলে ঘরে আজ কী অশান্তিটাই না হত!
বাঁদর— যাই বলো আর তাই বলো বন্ধু, তুমি কিন্তু আমাকে সত্যিকারের বন্ধু বলে মনে করো না।
কুমির— কেন কেন? এ-কথা বলছ কেন?
বাঁদর— প্রথমেই আমায় যদি সব কথা খুলে বলতে, তাহলে এই হয়রানি হত, বলো?
কুমির— সে-কথা সত্যি। আমার খুব ভুল হয়ে গেছে বন্ধু।
বাঁদর— যাক গে, যা হবার হয়ে গেছে, এখন তাড়াতাড়ি চলো। দেরি দেখে ওদিকে তোমার বৌ আবার উতলা হয়ে উঠবে।
[বাঁদরের কথায় কুমির সাঁতারের গতি বাড়াল। নদীর পাড়ে তার গাছটাকে দূর থেকে দেখতে দেখতে বাঁদরের বুক মানে কলজে দ্রুত ধুকধুক করতে লাগল। পাড়ের কাছাকাছি এসে পড়ার পর কুমির জিজ্ঞেস করল—]
কুমির— আচ্ছা বাঁদরভাই, কলজে ছাড়া কোনও জীব বাঁচতে পারে?
বাঁদর— হা হা হা হা, কী যে বলো তার কোনও মাথামুণ্ডু বুঝি না। কলজে ছাড়া যদি বাঁচা না যায় তো আমি রয়েছি কী করে?
[নদীর পাড় এসে যাওয়াতে বাঁদর কুমিরের পিঠ থেকে বিশাল এক লাফ মারল পাড়ে। সেখান থেকে তরতরিয়ে উঠে গেল গাছের মগডালে। আরাম করে গাছের মগডালে বসে লেজ দুলিয়ে বলল—]
বাঁদর— ওরে হতভাগা কুমির, শুধু কলজে নয়, মগজ ছাড়াও দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকা যায়। তা নইলে তোদের মতো শয়তান কুমিরকে বিশ্বাস করে আমি তোর পিঠে চড়তে যাই? আর ভাগ্যে তুইও মগজ ছাড়াই জন্মেছিস, নইলে কী আর আমার কলজের কথায় বিশ্বাস করে ফিরে আসতিস? যাঁরা বলেন সমানে সমানে ছাড়া বন্ধু হয় না, তাঁরা ঠিকই বলেন—তাঁরা সত্যিকারের পণ্ডিত। তাঁদের কথা না শুনলে আমার মতোই বিপদে পড়তে হয় রে, বজ্জাত কুমির। যা, এবার কেটে পড়। কোনোদিন যদি তোকে আর এ-পাড়ে দেখি, পাথর ছুড়ে তোর মাথা ভাঙব, এই বলে রাখলাম।
[কুমির ডুব দিল জলে। পর্দা নেমে এল।]
[কৃতজ্ঞতা: পণ্ডিতেরা বলেন, বাইবেলের পরে সবথেকে যে প্রাচীন গ্রন্থটি পৃথিবীতে সবথেকে বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, সেই গ্রন্থের নাম ‘পঞ্চতন্ত্র’। পঞ্চতন্ত্রের রচয়িতা পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা। পণ্ডিতেরা অনুমান করেন, খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে দাক্ষিণাত্যের মহিলারোপ্য নামক কোনও এক রাজ্যের রাজা অমরশক্তির তিন মূর্খ পুত্রকে মাত্র ছয় মাসে নীতিশাস্ত্রে পণ্ডিত করে তোলার ব্রত নিয়ে পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা এই গ্রন্থ রচনা করেছিলেন়। প্রধানত জঙ্গলের পশুপাখিদের নিয়ে সেইসব নীতিশিক্ষার গল্পগুলির একটি নিয়েই এই নাট্যরূপ।]
জয়ঢাকের নাট্যশালা: হাবুদের ডালকুকুরে , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুরাতনভৃত্য , যোগীনদাদা –রবীন্দ্রনাথের কবিতার নাট্যরূপঃ (তাপস শঙ্কর ব্রহ্মচারী) রাজপুত্তুর, (কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়) সেলফিশ জায়েন্ট- (অনুপম চক্রবর্তী,) পুজোর প্রস্তুতি(আশুতোষ ভট্টাচার্য), অমৃতযাত্রী(কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়), চিচিং ফাঁক(কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়), নিউটনের সঙ্গে একবেলা(বামাচরণ ভট্টাচার্য), ঘ্যাঁঘাসুর(কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়), গুরুদক্ষিণা(কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়), বোম্বাগড়ে গুপীবাঘা (সাগ্নিক ভট্টাচার্য) কুমিরের বন্ধু(কিশোর ঘোষাল)
কিশোর ঘোষাল এর সমস্ত লেখা একত্রে