জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়) অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)
এই অভিযানের আগের পর্ব- পর্ব ১, পর্ব ২ পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬

(ডেভিড লিভিংস্টোন ছিলেন পেশায় ডাক্তার। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজকও। লিভিংস্টোন প্রথম আফ্রিকা পাড়ি দেন ১৮৪১ সালে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। আফ্রিকার অবাধ দাস ব্যাবসার বিরোধী ছিলেন তিনি। বেশ কয়েক দশক ধরে আফ্রিকায় অভিযানে যান ডক্টর লিভিংস্টোন। প্রতিটি অভিযানে আফ্রিকার জনজাতি, ভূতত্ত্ব, পরিবেশ খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য লিখে রাখেন নিজের ডায়েরিতে। এই ধারাবাহিকে তাঁর নীলনদের উৎসের খোঁজে যাত্রার গল্প শুনছি আমরা।)
————————————————————————————–
উজিজির খুব কাছে পৌঁছে ঠিক করলাম এবার আর গাইডের ভরসায় নয়, কম্পাসের সাহায্য নিয়ে চলে যাব লেক টাঙ্গানাইকার দিকে। যতক্ষণ না লেকের দেখা পাচ্ছি, ততক্ষণ চলতে থাকব সোজা পশ্চিমদিক বরাবর। তারপর লেকের ধার ধরে হেঁটে যাব উজিজির দিকে। এর কারণ হল, আমার মন বলছে, যদি ডক্টর লিভিংস্টোন একবার জানতে পারেন যে আমরা তাঁর খোঁজে পৌঁছে গিয়েছি, তবে তিনি আমাদের এড়িয়ে যাবার জন্য অন্য পথ ধরতে পারেন।
মালাগারাজি নামের একটা নদীর সন্ধান পেলাম, সেটি নাকি পুবদিক থেকে এসে সোজা পড়েছে টাঙ্গানাইকাতে। আমাদের বর্তমান আস্তানা ইম্রেরা গ্রাম থেকে মালাগারাজি মাত্র তিনদিনের হাঁটাপথ। এবার বাকি রইল তিনদিনের রসদ জোগাড় করা।
ইটাগা গ্রামে এসে পৌঁছলাম। এই গ্রামটা পাহাড়ের এক খোঁদলের মধ্যে অবস্থিত। এখানে প্রচুর মিষ্টি আলু আর ট্যাপিওকার চাষ হয়। রসদ জোগাড় হল, তবে টাকা বা ভালোবাসা দিয়েও একটা মুরগি জুটল না। হঠাৎ করে একটা ল্যাগবেগে পাহাড়ি ছাগল জুটে গেল কপালে।

পঁচিশে অক্টোবর থেকে শুরু হল আমাদের দুর্ভোগ। প্রথমে পাহাড়ের সমতলভূমি পর্যন্ত পৌঁছনোর জন্য একটা রাস্তা ধরলাম। আড়াই ঘণ্টা পায়ে চলার পর পৌঁছলাম পাহাড়ের পাদদেশে। তাঁবু ফেলা হল। এবার খাড়াই চড়তে হবে উপত্যকা বেয়ে হাজার খানেক কিলোমিটার।
ইম্রেরা নদীর অববাহিকা ঘিরে খাড়া পাহাড় এঁকে-বেঁকে চলেছে। উপর থেকে ভারি সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়ছে। একেবারে যেন বায়স্কোপের পর্দা! তাঁবুর ফিরতি পথে একটা চিতার দেখা পেয়ে সেটাকে গুলি করলাম, কিন্তু গুলি ফসকে যাওয়ায় সে ছুটে পালাল। রাতে টাম্বু নদীর ধার থেকে ভেসে এল সিংহের গর্জন।
পরদিন সকালে গভীর জঙ্গলের ছায়ায় হাঁটা শুরু করলাম আবার। হঠাৎ দেখা হল এক আরব ব্যবসায়ী দলের সঙ্গে। তারা সবেমাত্র তাঁবু ফেলেছে এখানে। তারাও যাবে উজিজি। ওদের মুখে শোনা গেল, মিরাম্বো আবার আরবদের সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছে।
রুফুগু নদীর ডান পাশ দিয়ে চলেছি আমরা। এই নদীটা প্যাপিরাস আর অন্যসব আগাছাতে প্রায় মজে গিয়েছে। বুনো মোষদের দেখা পেলাম, আর কাদা মাটিতে দেখা গেল গণ্ডারের পায়ের ছাপ। ঘন গাছের উপর দেখা দিল দাড়িওয়ালা বাঁদরদের পুরো কলোনি। মোষগুলো কীভাবে যেন টের পেয়ে গিয়েছিল আমাদের মতো জন্তুরা ওদের পিছু নিয়েছে। একটু পরেই দুড়দাড়িয়ে তারা এমনভাবে পালাল, যে তাদের পিছু নেওয়া অসাধ্য বলে মনে হল।
ক্যাম্প গুটিয়ে আবার চলা শুরু করতে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ল। যেদিকে চোখ যায়, ভূখণ্ডের বুক চিরে চলে গিয়েছে অজস্র নদীনালা, যেন ক্ষতবিক্ষত করেছে ধরিত্রীর বুক। মধ্যে মধ্যে রুক্ষ বেলেপাথরের পাহাড় মাথা উঁচু করে জমিকে আরও বন্ধুর করে তুলেছে।
পাথুরে জমিতে একটা গ্রাম দেখা গেল। আমরা পাথরের ঢালানে তাঁবু ফেললাম। একটানা ছয় ঘণ্টা পথ চলার শ্রমে সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। চব্বিশ ঘণ্টা আগে যত খাবার ছিল, সব শেষ হওয়ায় ক্ষুধার্ত হয়ে উঠেছিলাম আমরা। এখানে এক ফোঁটা দানাপানি পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখতে পাওয়া গেল না। আমার কাছে আধ পাউন্ডমতো আটা পড়ে ছিল, দলের পঁয়তাল্লিশ জন লোকের পক্ষে সেটা ছিটেফোঁটা ছাড়া আর কিছুই নয়। খুঁজেপেতে তিরিশ পাউন্ড চা আর কুড়ি পাউন্ড চিনি রসদে পড়ে আছে দেখলাম। তৎক্ষণাৎ কেতলিতে চা বসিয়ে দেওয়া হল। বেশি চিনি দিয়ে চা খেয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করা ছাড়া উপায় ছিল না। আমার লোকেরা খাবার খুঁজতে জঙ্গলে গিয়ে বুনো পিচ ফল সংগ্রহ করে আনল। খিদের মুখে তাই-ই অমৃত। ওনাঙ্গওয়ানা উপজাতির লোকগুলো শুতে যাবার আগে আল্লার কাছে প্রার্থনা করল পরদিন বেশি করে খাবার জোগাড় করে দেবার জন্য।
ভোরের আলো ফুটতেই অভিযান চালালাম খাবার জোগাড়ের জন্য। জমিতে প্রচুর গণ্ডার আর মোষের পায়ের চিহ্ন দেখতে পেলাম, কিন্তু একটা জীবিত প্রাণীর দেখা পেলাম না। পাথুরে জমি ছাড়িয়ে এগোতে লাগলাম খাবারের সন্ধানে। হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে একটা সবুজ উপত্যকা নজরে এল। পাহাড় বেয়ে নেমে এসে দেখি, সেটা একটা ভুট্টার ক্ষেত। ক্ষেত যখন আছে, গ্রামও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। অনেক অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা তেকোনা পাহাড়ের মাথায় একটা ছোট্ট গ্রাম দেখা গেল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমার লোকেরা থলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নাচতে লাগল। এবার উপরে উঠে গ্রাম থেকে খাবার আনতে হবে। আমি কাপড়ের লোভ দেখিয়ে পাহাড় চড়ে গ্রামে যেতে বললাম কুলিদের। তিনজন ভলান্টিয়ার পেলাম। ওরা উপরে উঠে যেতেই ভুট্টার ক্ষেতের পাশে শুয়ে পড়লাম। অভুক্ত শরীর আর ধকল সইতে পারছে না।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ওরা ফিরে এল লাফাতে লাফাতে। গ্রামে নাকি খাবারের অভাব নেই। আমরা যে জায়গাটাতে এসে পৌঁছেছি, তার নাম উভিঞ্জা। গ্রামের মোড়লের নাম নোগেরা। সে আবার যুদ্ধ লাগিয়েছে উজিজির পথে আর-এক গ্রামের মোড়লের সঙ্গে, তার নাম লোকান্ডা। তবে মোড়লের পুত্রটি সদাশয় ব্যক্তি। সে কিছু গাইড দেবে উজিজি পর্যন্ত, যাতে আমরা নিরাপদে সেখানে পৌঁছতে পারি।
তাঁবু গুটিয়ে স্থানীয় গাইডদের সাহায্যে আমরা ঘুরপথে চলতে লাগলাম। উপত্যকার নীচ দিয়ে সোজা চলে গেলে নাকি এক জলাভূমি পড়ে, উপর থেকে দেখলে তার গভীরতা বোঝা যায় না। মাত্র কিছুদিন আগে তিরিশ জনের এক আরবদল ক্রীতদাসদের নিয়ে ওই পথে যেতে গিয়ে নাকি ডুবে মরেছে, তাদের কোনও চিহ্ন পর্যন্ত আর দেখতে পাওয়া যায়নি। গাইডরা না থাকলে আমরা ঠিক ওই পথটাই ধরতাম। বোঝা গেল, উপরে বুনো ঘাস আর পচা লতাপাতার নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে কোনও স্রোতস্বিনী। জোর বেঁচে গেলাম এ-যাত্রা।
সেই ভয়ংকর জলার উপর দিয়ে আমরা হেঁটে যেতে লাগলাম গাইডদের সাহায্য নিয়ে। ওরা জানে জলাভূমির কোন জায়গায় পা রেখে হেঁটে যাওয়া যায়, ডুবে যেতে হয় না। লাইন করে আমরা ওদের অনুসরণ করলাম। একটু এদিক ওদিক পা রাখলে একেবারে সলিল সমাধি। মনে হচ্ছিল হেঁটে চলেছি কোন দোদুল্যমান দড়ির উপর দিয়ে, নীচে বয়ে চলেছে অদৃশ্য এক সমুদ্র।

পা পিছলে একটা গাধা পড়ে গেল জলায়। মরেই যেত, কিন্তু দশজন লোক মিলে তাকে হেঁচড়ে টেনে তুলে বাঁচাল। কোনও দুর্ঘটনা ছাড়াই আমরা পার হলাম জলাভূমি। সামনে চোখে পড়ল সবুজ সমতলভূমি। সেখানে এক মনোরম গ্রাম যেন ঘুমিয়ে আছে। গ্রামের লোকেরা কাপড়ের লোভে ছুটে এল। নোগেরার লোকদের দেখে অবশ্য তারা নিজেদের সংযত করে ফেলল অচিরেই।
এখানে প্রচুর ভেড়া আর ছাগল পোষা হয়। দামেও বেশ সস্তা। আটটা ভেড়া কিনে কেটে ফেলে সবাইকে মাংস বিলি করার ব্যবস্থা করে ফেললাম।
দু-একদিন বিশ্রাম নিয়ে নভেম্বরের এক তারিখে আবার এগোতে লাগলাম। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে এলাম মালাগারাজি নদীর অববাহিকায়। পাহাড়ে ঘেরা উপত্যকায় এবার চতুর্দিকে নজরে এল অসংখ্য গ্রাম। খাবার অফুরন্ত, দাম একেবারে কম। গাছের মাথায় দেখালাম মাছখেকো পাখিদের ভিড়। কয়েক মাইল চলার পর এসে পৌঁছলাম একটা জনপদে। এখানকার নেতার নাম কিয়ালা। সে হল নোগেরার বড়ো ছেলে।
ভেবেছিলাম দেরি না করে মালাগারাজি নদী পার হয়ে যেতে অসুবিধা হবে না, কিন্তু বাধা দিল গ্রামের লোকেরা। জানা গেল, কিয়ালার অনুমতি ছাড়া নদী পার হওয়া সম্ভব নয়। লোক পাঠালাম কিয়ালার সঙ্গে কথা বলতে। তারা ফিরে এসে জানাল, একজন নোগেরার লোকও নদী পার হতে পারবে না। শুধু সাদা চামড়ার লোকটা তার দলবল নিয়ে যেতে পারে, যদি সে ছাপান্নটা কাপড় জমা করে কিয়ালার কাছে। স্থানীয় লোকের সাহায্য না নিয়ে নদী পার হওয়া অসম্ভব।
আবার বম্বে আর আসমানিকে দূত হিসাবে পাঠালাম দর কষাকষি করার জন্য। ওরা সাত ঘণ্টা কথা চালিয়ে ফিরে এসে জানাল, তেরোটা কাপড় নোগেরার জন্য, আর দশটা কাপড় কিয়ালার জন্য দিলে তবেই নদী পার হবার অনুমতি মিলবে। বম্বে খুব রেগে গিয়েছিল, কিন্তু আসমানি হাসতে হাসতে আমায় জানাল, আমাদের ভাঁড়ারে ডাকাতি হবার চাইতে এই প্রস্তাব নাকি অনেক গুণে ভালো। ওদের দাবি মেনে নিলাম।
এরপর কিয়ালার কাছে নোগেরার ঘনিষ্ঠরা যাতায়াত করতে লাগল শুনতে পেলাম। হঠাৎ ওরা লোক পাঠিয়ে চেয়ে বসল একটা বন্দুক আর এক কেজি বারুদ। আমি বেজায় রেগে গেলাম। কিয়ালার কাছে হার স্বীকার করব না। তার চাইতে বরং হোক ডাকাতি, বুঝে নেব।
আবার বম্বে আর আসমানি কথাবার্তা চালাতে লাগল। স্থানীয় লোকেরাও পিছু হটবে না। বম্বে জানাল, ওরা আর কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। সেই শুনে বললাম, “একটা করে কাপড় দুই দলপতিকে দিয়ে আয়। যদি রাজি না হয়, একটা অতিরিক্ত জিনিসও দেব না, সোজা নেমে যাব যুদ্ধে।”
অবশেষে মাঝরাতে একটা করে কাপড় নিয়ে নদী পার হবার অনুমতি মিলল, কিন্তু আবার বচসা বাধল পারানির কড়ি নিয়ে। শুরু হল দরাদরি। শেষে ভোর পাঁচটায় নৌকো জোগাড় হল আটটা কাপড় আর কুড়িটা পুঁতির মালা দিয়ে। কিন্তু ও-পাড়ে গিয়েও নিস্তার নেই। নৌকার চালকেরা আরও কুড়িটা পুঁতির মালা দাবি করে বসল। না দিলে তীরে নামতে দেবে না। উপায়ন্তর না দেখে ওদের দাবি মেনে নিতেই হল, নইলে এগোনো দায়।
গোধূলি বেলায় জলে প্রথমেই একটা গাধাকে নামানো হল। এখানে জলের গভীরতা কম। গাধাটার গলায় একটা দড়ি বেঁধে রেখেছিল একটা লোক। জলে নামামাত্র গাধাটা ভয়ানক লাফাতে শুরু করল। কে যেন তাকে জলের তলায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দেখা গেল একটা প্রকাণ্ড কুমির, গাধার পা ধরে টেনে নিয়ে চলেছে জলের তলায়। রক্তে লাল হয়ে উঠল নদী। গাধাটা তলিয়ে যাবার আগে ওর করুণ চোখ দুটো নজরে এল। একবারের জন্য ওর বাদামি রঙের পিঠ দেখা গেল। তারপর সব শান্ত। একটিমাত্র গাধা এখন সম্বল। বম্বের জিম্মায় তাকে নৌকোতেই রেখে দিতে হল। রাত কাটিয়ে সকাল হলে সাধারণত কুমিররা জলের ধারে আসে না। পরে গাধাটাকে নামাব স্থির করে আমরা এক এক করে নেমে গেলাম পাড়ে।
গত তিনদিনের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারলাম, আফ্রিকার এই অঞ্চলে মানুষের লোভ অনেক বেশি। উভিঞ্জা উগোগোর চাইতে ঢের বেশি খারাপ। সকাল দশটা নাগাদ একটা স্থানীয় দলের সঙ্গে দেখা হল। ওরা ওয়াগুহা উপজাতির লোক, উজিজি থেকে ফেরত আসছে। ভাব জমিয়ে এদিককার হালচাল জিজ্ঞেস করতে জানা গেল, একটা সাদা চামড়ার লোককে ওরা উজিজিতে আসতে দেখেছে। কেমন দেখতে তাকে জিজ্ঞেস করায় উত্তর এল, ঠিক যেমন আমাকে দেখতে ঠিক তেমনি। এবার আমি জিজ্ঞেস করলাম, “লোকটা বুড়ো, না যুবক?”
“বুড়ো। তার মাথায় সাদা চুল। লোকটা খুব অসুস্থ।”
“কোথা থেকে আসছিলেন তিনি?”
“অনেক দূর। সে দেশের নাম মানইয়েমা।”
“এখনও তিনি আছেন উজিজিতে?”
“আছে তো! মাত্র দিন আটেক আগেই তো আমরা তাকে দেখে এলাম!”
“এখন উজিজিতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যেতে পারে?”
“জানি না বাবু। হয়তো।”
“আগে কোনোদিন তাঁকে উজিজিতে দেখা গিয়েছে?”
“হ্যাঁ, এই লোকটা অনেক আগেও উজিজিতে এসেছে শুনেছি।”
স্থানীয় লোকদের সঙ্গে কথা বলে আনন্দে মন নেচে উঠল। অবশেষে পাওয়া গিয়েছে ডক্টর লিভিংস্টোনের খোঁজ। আবার মনে দোলাচল—অন্য কেউ নয় তো? অনেক শ্বেতাঙ্গই তো আফ্রিকা পাড়ি দেয়। তবে এই ভয়ানক মহাদেশে সাদাচুলো কোনও লোক আসতে কি সাহস পাবে, এক লিভিংস্টোন ছাড়া? যাই হোক, এবার আবশ্যিক কর্তব্য হল, যত দ্রুত সম্ভব উজিজির দিকে ধাবিত হওয়া, নইলে সামান্য দেরি হলে বুড়ো ভেগে যেতে পারে।
আমার সমস্ত লোককে একজায়গায় জড়ো করে ওদের উদ্দেশে বললাম, “এই মুহূর্তে ক্যাম্প ছাড়তে হবে। উজিজি পৌঁছতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। পথে একবারও থামা চলবে না। যারা রাজি, তারা হাত তোলো। উজিজি পৌঁছে প্রত্যেককে আমি দুটো করে কাপড় দেব।”
আমার কথা শেষ হতে না হতে ওরা সমস্বরে চেচিয়ে উঠে সায় জানাল। অবশ্য আমার চাইতে বেশি উত্তেজিত ওরা হয়নি। আমি নিজে ডক্টর ডেভিড লিভিংস্টোনকে খুঁজে বার করার সমাধান চাইছিলাম। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে তাঁকে বললাম—আমাকে শক্তি দাও, ধৈর্য দাও, যাতে যত শিগগির সম্ভব উজিজি পৌঁছে যাই।
নৌকার মাঝি এবার আমার উপর সদয় হয়ে দুটো কুলি দিল। মালপত্র নিয়ে রওনা দিলাম মালাগারাজি নদীর তীর ছেড়ে। ইসিঙ্গা গ্রাম ছাড়িয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম, থামার উপায় নেই। পথে অনেক ক্ষেতখামার পাওয়ায় খাবারের অভাব হল না।
নভেম্বরের চার তারিখে রাতের বিশ্রাম নেবার পর আমরা একেবারে নিঃশব্দে মুখে কুলুপ এঁটে পথ চলতে লাগলাম, যাতে আমাদের অভিযানের কোনও পূর্ব সংবাদ কেউ না পায়। দুজন গাইডের মধ্যে দূরত্ব রেখে তাদের এগোতে বললাম। ওদের পিছু নিলাম বাকিরা।
জঙ্গল পাতলা হতে হতে একেবারে মিলিয়ে গেল। সামনে পাওয়া গেল ভুট্টার ক্ষেত। ছড়ানো ছিটানো কিছু শঙ্কু আকৃতির পাতায় ছাওয়া কুঁড়েঘর দেখা গেল। এই প্রদেশের নাম উহা। উপজাতিদের বলে উয়াহা। গ্রামটা চারদিকে শক্ত বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত। উহা আর উভিঞ্জার মাঝে চলে গেছে একটা নোংরা নালা। আমরা কাওয়াঙ্গা গ্রামে আস্তানা গাড়লাম। এখানকার মোড়ল গর্বের সঙ্গে জানাল সে নাকি কিহা রাজার অধীনে রাজস্ব আদায় করে থাকে। আমাদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তাকে বারোটি উৎকৃষ্ট মানের ধুতি উৎকোচ দিলে তবেই তা যুক্তিযুক্ত হবে। আমরা তার দাবি অস্বীকার করার জন্য তখুনি তাঁবু গুটিয়ে চলে যাবার উদ্যোগ নিলাম। কাজেই বাধ্য হয়ে সে দুটি মাত্র ধুতিতে রাজি হয়ে গেল আমাদের তার গ্রামের পথ দিয়ে আগে যেতে।
পরদিন সকালে সমতলভূমি দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। মাথার উপর সূর্যের প্রখর তাপ থাকা সত্ত্বেও আমাদের ফুর্তির শেষ নেই। ভাবছি বুঝি এই মহাদেশের দুর্গম প্রান্তর দিয়ে চলতে চলতে যে দুরবস্থার সঙ্গে রোজ মানিয়ে নিতে হয়েছে, এখন তার অবসান ঘটবে খুব শিগগির। হঠাৎ দেখি একদল কালো মানুষের জটলার মধ্যে থেকে দুজন দৌড়ে এসে আমাদের পথ আটকাল। কারণ জিজ্ঞেস করলে উত্তর এল—“সাদা চামড়ার মানুষ কি জানে না যে এটা উহার এক ক্ষমতাশালী সুলতানের এলাকা? ভেট না দিয়ে, সেলাম না ঠুকে আরবরাও যেখানে এই এলাকা দিয়ে তাদের কাফিলা নিয়ে যেতে পারে না, সেখানে এই লোকটার এত বড়ো আস্পর্ধা হল কী করে?”
“আরে, কালই তো কাওয়াঙ্গা গ্রামের মোড়লের কাছে ভেট জমা করে তবে রওনা দিয়েছি আমরা!” আমি আপত্তি তুলি।
“কতগুলো ধুতি দিয়েছ?”
“কেন, দশটা! তাও সব অতি উৎকৃষ্ট মানের!”
“সত্যি বলছ?”
“মিথ্যে বলতে যাব কোন দুঃখে?”
“তাহলে এস আমাদের গ্রামে। বিশ্রাম করে যাও এখানে। আসলে আমাদের কাজ হল কাফিলা আটকানো আর স্থানীয় কর দেওয়া হয়েছে কি না জেনে নেওয়া।” এগিয়ে এসে জানায় এক সপ্রতিভ যুবক।
আমি জানালাম, আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। এখনও দিনের আলো মরে যেতে ঘণ্টা খানেক বাকি। কিন্তু আমার কথা শুনে যুবকটি দৌড়ে গ্রামের দিকে চলে গেল। ফিরে এল পঞ্চাশজন যোদ্ধা সঙ্গে নিয়ে। তাদের দলপতির মিয়নভুর চেহারা বিশাল। ডিম্বাকৃতি মুখ। আচরণ ক্রূর। পরনে দামি পোশাক। পোশাকের দুটি প্রান্ত গিঁট মেরে বাঁ কাঁধে তোলা। আমেরিকান কাপড় দিয়ে তৈরি পাগড়ি তার মাথায়। গলা থেকে ঝুলছে একটা সাদা ঝকঝকে বিশাল হাতির দাত। হাতে একটা ধারালো কুঠার। লক্ষ করে দেখলাম, সব যোদ্ধাদের হাতে কুঠার, তির-ধনুক। সংখ্যায় এরা আমাদের প্রায় সমান হলেও আমাদের কাছে আছে রাইফেল, বন্দুক আর পিস্তল। দলপতি মিয়নভু আমাকে সহাস্যে জিজ্ঞেস করল, “বানা, কেমন আছ? রাস্তায় কোনও কষ্ট হয়নি তো?”
আমি লোকটার চাতুরিতে ভোলার লোক নই। বললাম, “আমি বেশ ভালো, তুমি কেমন আছ সেনাপতি?”
লোকটা সামান্য হেসে বলল, “ঠিক ধরেছ। ওই যে দূরে পাহাড় দেখছ, ওখানে থাকে আমাদের রাজা। আর আমি এই রাজ্যের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি।”
সে বেশ গুছিয়ে উবু হয়ে বসল। তার দেখাদেখি বাকিরাও। আমি একটা কাপড়ের বান্ডিলের উপর বসে কথাবার্তা চালাতে লাগলাম।
“এখান দিয়ে চলাচল করতে গেলে রাজাকে যে কর দিতে হয়, তা কি তোমার জানা নেই? আমাদের লুকোমো গ্রামে ঢুকতে কী অসুবিধা আছে যে, এখানেই পথের মধ্যে বসে পড়েছ? সাদা চামড়ার মানুষ কি আমাদের সঙ্গে লড়াইতে নামতে চায়? হতে পারে তার কাছে বন্দুক আছে, হয়তো সে আমাদের চাইতে বেশি শক্তি রাখে, কিন্তু আমরা কিন্তু সংখ্যায় অনেক।” বলে লোকটা ইশারায় সমস্ত চরাচর দেখিয়ে বলল, “এখন বলো, তোমরা যুদ্ধ চাও না শান্তি?”
মিয়নভুর জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনে ওর দলের লোকদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। তাদের চেহারায় ফুটে উঠল হিংস্রতা। আমার লোকেরা অস্বস্তিতে ফিসফিস করতে লাগল। এবার আমি শুরু করলাম—“মিয়নভু, মাতয়ারেদের মহান দলপতি। এবার সাদা চামড়ার লোক কী বলে শোনো। কবে মিয়নভু শুনেছে যে, সাদা চামড়ার লোকেরা কালো মানুষদের সঙ্গে লড়াইয়ে নেমেছে? এতদূর দেশ থেকে এই দেশে এসে কি সাদা চামড়ার মানুষ এখানে যুদ্ধ করতে এসেছে, না সে হাতির দাঁত আর মানুষ কিনতে এসেছে? তার আসবার উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার। সে এসেছে এদেশের মানুষকে ভালোবেসে তাদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে। সে এসেছে এই দেশের পাহাড়, নদী আর খালবিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। সে এসেছে এই দেশের কেমন মানুষ থাকে তা জানতে। তারা কীভাবে বসবাস করে, তাদের নদী, জঙ্গল, ক্ষেতখামার, বাড়িঘর কেমন তাই আবিষ্কার করতে। এই দেশের জঙ্গলে কেমন প্রাণীরা বাস করে, তা সে দেখতে এসেছে। দেশে ফিরে গিয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা, এই দেশের গল্প সে তার সাদা রাজাকে জানাবে। নিজের দেশের স্ত্রীপুরুষ, ছেলেমেয়ে জানবে এক নতুন দেশের কথা, যা তাদের দেশ থেকে অনেক অনেক দূরে, যেখানে তারা কোনোদিন পা রাখতে পারবে না।
“সাদা চামড়ার লোকেরা আরব আর ওয়াঙ্গানাদের মতো নয়, তারা অনেক শক্তি রাখে। যখন তারা যুদ্ধ করে তখন আরব আর ওয়াঙ্গানারা লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালায়। আমাদের কাছে আছে বজ্রের মতো শক্তিশালী বন্দুক, সেখান থেকে গুলি ছুটলে ধরিত্রী মাও কাঁপে। সেই গুলি এতদূরে যেতে পারে, যেখানে তোমাদের দৃষ্টিও পৌঁছয় না। এই যে আমার ছোট্ট পিস্তলটা, এর থেকে যে গুলি বেরোয়, তা দশটা লোককে চোখের নিমেষে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট।” আমি আমার কোমরে গোঁজা পিস্তলটার দিকে ইশারা করে আবার বলতে লাগলাম, “মিয়নভু সত্যি কথা বলেছে হয়তো, কিন্তু এখুনি তাকে আমি ধরাধাম থেকে বিদায় দিতে পারি। তবু আমি বন্ধু ভেবে এখনও তার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলছি। এবার মিয়নভু বলুক আমি তার বন্ধু হয়ে কীভাবে তাকে সাহায্য করতে পারি।”
আমার কথাগুলো তর্জমা করে মিয়নভুকে জানানো হল। তার দলের লোকেরা মাথা নাড়িয়ে সায়ও দিল। আমি মিয়নভুর চোখে কখনও ভয়, আবার কখনও অবিশ্বাসের ছাপ দেখতে পেলাম। আমি যখন নিশ্চিত যে আমার কথা শুনে মিয়নভু বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে, তখনি আমার বিশ্বাস ভেঙে দিয়ে মিয়নভু বলে উঠল, “সাদা চামড়ার মানুষ বলছে সে আমাদের বন্ধু! তবে সে আমাদের গ্রামে পা না দিয়ে এইভাবে পথের মধ্যে গরমে অপেক্ষা করে আছে কেন? মিয়নভু এখানে বসে আর কথা বাড়াবে না। যদি সাদা চামড়ার মানুষ মনে করে সে বন্ধু, তবে তাকে গ্রামের ভিতরে আসতে হবে।”
আমি আমার লোকদের বোঝা উঠিয়ে নিতে ইশারা করে বললাম, “ভরদুপুরে আর কথা বাড়াতে চাই না। আমরা গ্রামে গিয়ে বিশ্রাম নিতে চাই।”
তাঁবু ফেলতে বাধ্য হলাম উহাদের গ্রামে। মিয়নভু আমাদের তাঁবুর কাছে কতগুলো গাছের ছায়ায় অপেক্ষা করতে লাগল। এদিকে কাওয়াঙ্গা গ্রাম থেকে দূত এল অনেক দেরি করে। সে বলল, দশটা ধুতিই সে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। উহার রাজার জন্য কিছু বাঁচিয়ে রাখেনি। এবার মিয়নভু একশোটা ধুতি দাবি করে বসল। আমি বললাম, “দশটা ধুতি দিতে পারি।”
আমার কথা শুনে মিয়নভু বলল, “ক্ষেপেছ? উহার রাজার জন্য মোটে দশটা ধুতি? একশোটার একটা কম ধুতি হলে এই গ্রাম থেকে এক চুলও নড়তে পারবে না।”
মিয়নভু আমার জন্য একটা কুঁড়েঘর পরিষ্কার করিয়ে রেখেছিল। আমি উঠে গেলাম সেখানে। একটা কথাও বললাম না। বম্বে, মাব্রুকি, আসমানিকে ডাকলাম আলোচনা করার জন্য। বম্বের মত হল, উহাতে যুদ্ধে নামা ঠিক হবে না। ওরা যা চাইছে চুপচাপ দিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এখানে হাজার হাজার গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে আমাদের পঁয়তাল্লিশ জন লোক একেবারেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আর যদি আমি বেঁচেই না থাকি তবে উজিজি পৌঁছে ডক্টর লিভিংস্টোনকে খুঁজে বার করবে কে?
বম্বের কথা শেষ হতে আমি বললাম, “কিন্তু ভেবে দেখো, এটা সরাসরি ডাকাতি! শেষকালে ডাকাতের হাতে আত্মসমর্পণ করতে হবে? ও যা চাইবে, তাই দিয়ে দিতে হবে? এবার যদি মিয়নভু আমাদের সব কাপড়, গোলাবারুদ আর বন্দুক কেড়ে নিতে চায়, বিনা বাধায় সব দান করে নিঃস্ব হয়ে যাব? আমি নিজে বরং মিয়নভু আর ওর সাঙ্গপাঙ্গদের সাবাড় করে দিই, তোমরা বাকিদের দেখে নাও।”
“বানা, উহাতে চারদিকে চোখ মেলে দেখুন, সব সমতলভূমি। কোথাও আড়াল নিয়ে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। উহা ছাড়িয়ে আরও দূরে আছে ওয়াতুতারা। তারাও কম যায় না। এরা একজোট হয়ে গেলে বিপদ বাড়বে বই কমবে না। মনে হয় এটাই উজিজির পথে শেষ জায়গা, যেখানে আমাদের ঘুষ দিতে হবে।” বম্বে তার সুচিন্তিত মতামত দিল।
আসমানিকে জিজ্ঞেস করাতে একই উত্তর এল। মাব্রুকির দিকে তাকাতে বলল, “আমার ইচ্ছে করছে ওদের ধড় থেকে মুণ্ডুগুলো খসিয়ে দিই। কিন্তু এরা দুর্ধর্ষ ডাকাত, এঁটে ওঠা শক্ত হবে। যা চাইছে দিয়ে ঝামেলা বিদেয় করাই মঙ্গল।”
“শুরু করো কুড়িটা কাপড় দিয়ে, না পোষালে তিরিশ, তারপর চল্লিশ… কিন্তু কোনোমতেই আশিটার বেশি কাপড় আমি দিতে পারব না।”
পঁচাত্তরটা ধুতিতে রফা হল। সেই ধুতির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ওদের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়ে গেল।
৬ই নভেম্বর, ১৮৭১।
ভোররাতে আমরা রওনা দিলাম উজিজির পথে। মাত্র ন’টা কাপড়ের গাঁটরি সম্বল এখন। পুঁতির মালা প্রায় সবই অক্ষত আছে। এই রসদ সম্বল করে আশা করি প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত ফিরে যেতে পারব। এই ডাকাতদের পাল্লায় পড়ে ডক্টর লিভিংস্টোনের এত কাছে এসেও মনে হচ্ছে যেন কতদূর যেতে হবে!
পম্বে নদী পার হয়ে গেলাম। অসমতল রাস্তা এবার উপরে উঠতে লাগল। দুইদিকে খাড়া পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে আমরা উপত্যকা বেয়ে চলতে লাগলাম। মাইল বিশেক দূরে আছে মালাগারাজি নদী। আশেপাশে প্রচুর গ্রাম নজরে আসতে লাগল। খাবারের কোনও অভাব নেই এখানে। দুধ, মাখন—সব সস্তা।
চার ঘণ্টা পথ চলার পর আমরা কানেঙ্গি নদীর পাড়ে পৌঁছে গেলাম। নদী পার করে কাহিরিগি গ্রামে গিয়ে শুনলাম এখানে উহার রাজার ভাই বাস করে। বুঝলাম, আবার আমরা বাঘ না হোক ঘোগের বাসায় পা রেখেছি। দু-ঘণ্টা বিশ্রাম করেছি কি করিনি, ডাকাত সর্দারের দুই চ্যালা এসে হাজির। তাদের দাবি, তিরিশটা ধুতি দিতে হবে। অথচ মিয়নভু বলেছিল আর কোনও ঘুষ দিতে হবে না কোথাও।
দু-দু’বার ধোঁকা খেলাম আমরা। ঠিক করলাম, আর সমঝোতা নয়। জানতে পারলাম, সামনের পথে এমন আরও পাঁচজন দলপতি আছে, যারা কাপড় না নিয়ে এগোতে দেবে না। সবার কথা শুনে চললে একেবারে ভিখিরি হয়ে ডক্টর লিভিংস্টোনের সামনে দাঁড়াতে হবে।
আসমানি আর বম্বের মধ্যস্থতায় কুড়িটা কাপড় দিয়ে কাজ হল। একটা মতলব বার করলাম। ডাকাত সর্দারের দুই দূতকে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, সামনের পথে উহাদের কাপড় না দিয়ে কীভাবে যাওয়া যেতে পারে উজিজি। আমার কথা শুনে ওরা প্রথমে খুব অবাক হল। তারপর বলল, বারোটা আরও ধুতি যদি ওদের দেওয়া যায়, তবে দুজনের একজন আমাদের পশ্চিম অভিমুখে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে, যাতে উহাদের খপ্পরে আর পড়তে না হয়। তবে পথে আমাদের কেউ কোনও টুঁ শব্দ পর্যন্ত করতে পারবে না। ওদের প্রস্তাবে রাজি হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায়ান্তর ছিল না।
দিন ছয়েকের রসদ জোগাড় করে মাঝরাতে ঘুমন্ত গ্রাম ছেড়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। চাঁদের আলোয় সেদিন চরাচর ভেসে যাচ্ছিল। আকাশে কালো মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছিল চাঁদ। আমাদের কুলিদের পা কেটে যাচ্ছিল ধারালো ঘাসের খোঁচা খেয়ে। তবু তারা মুখে রা কাড়ল না। সকাল হতেই আমরা পৌঁছে গেলাম রুসুগি নদীতে। জঙ্গলের ধারে বিশ্রাম নিতে আর প্রাতরাশ সারতে তাঁবু ফেলা হল।
নদীর পাড়ে অসংখ্য কৃষ্ণসার হরিণ আর মোষ জল খেতে নেমেছে দেখে আমার হাত নিশপিশ করতে লাগল শিকার করার জন্য। কিন্তু একটা গুলিও ছোড়া যাবে না, তাহলে লোকে আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে যাবে।
ঘণ্টা খানেক বিশ্রাম নিয়েছি কি নিইনি, হঠাৎ দেখি মালাগারাজির দিক থেকে ক’জন দেশি লোক আমাদের দিকেই আসছে। ওরা নুন সংগ্রহ করে ফিরছিল। আমাদের দেখে তারা নুনের বস্তা মাটিতে ফেলে চোঁ-চা দৌড় লাগাল দূরে গ্রামবাসীদের ডেকে আনবে বলে। সঙ্গে সঙ্গে আমি মার্চ করার হুকুম দিলাম। রুসুগি নদী পার হয়ে জোর পায়ে পালিয়ে যেতে লাগলাম আমরা। সামনে দেখা গেল বাঁশবন। আমরা বাঁশবন দিয়ে ছুটতে লাগলাম।
নয় ঘণ্টা চলার পর এসে পৌঁছলাম মুসুনিয়া হ্রদে। উহাতে অনেক হ্রদ আছে। মুসুনিয়া তাদের মধ্যে অন্যতম বড়োসড়ো হ্রদ—লম্বায় মাইল চারেক, আর চওড়ায় মাইল তিনেক। এটাও শিকার করার স্বর্গরাজ্য। শিকার করা দূরে থাক, এখানে তাঁবু ফেলতে বারণ করলাম। আগুন জ্বালানোও চলবে না, তাহলে স্থানীয় লোকে টের পেয়ে যাবে আমাদের উপস্থিতি। আমরা সতর্ক থাকলাম, যাতে যে-কোনো মুহূর্তে লটবহর তুলে দৌড় লাগানো যায়।
ঘুমোতে যাবার আগে আমার উইঞ্চেস্টার রাইফেল লোড করে পাশে রেখে দিলাম। দলের সবার বন্দুকে গুলি ভরে দিয়ে তবে শুতে যাওয়া হল।
ভোররাতে রওনা দিয়ে সূর্য উদয় হবার আগেই বাঁশের জঙ্গল শেষ হয়ে সমতলভূমিতে এসে পৌঁছলাম। গরমের তাত ততটা বোঝা যাচ্ছে না, কারণ শীতল হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ায় কত অজানা ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে; টের পাচ্ছি সবুজ দূর্বা ঘাসের সুবাস। এখানে অনেক ছোটো ছোটো প্রাকৃতিক জলাশয় নজরে পড়ল।
আমরা রুগুফু নদীতে পৌঁছলাম। এটি মালাগারাজি নদীর একটি উপনদী। অগভীর চওড়া নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কানে এল বাজ পড়ার মতো আওয়াজ। ক্রমাগত শব্দটা হয়েই চলেছে—যত এগোচ্ছি, তত বাড়ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বাজ পড়ার শব্দ কোথা থেকে আসছে?”
জবাব এল—সেটি হচ্ছে ‘কাবোগো’। ভাবলাম, সেটা আবার কী বস্তু! জানা গেল, টাঙ্গানাইকার অপরদিকে এক বিশাল পাহাড় আছে, যার মধ্যে আছে বিশাল বিশাল গর্ত আর গুহা। প্রবল বেগে সেই গর্তে জল ঢোকে বলে বাজ পড়ার মতো আওয়াজ হয়। বাতাস বইতে থাকলে তখন বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে সেই শব্দ।
কাবোগোতে নাকি বাস করে টাঙ্গানাইকার ঈশ্বর মালুঙ্গু। তাকে খুশি না রাখলে অভিশাপ লাগে, প্রাণে বাঁচে না কেউ। আরবরা পাশ দিয়ে যাবার সময় কাপড় আর সাদা পুঁতি মালুঙ্গুর জন্য জলে ভাসিয়ে দেয়। কত যে নৌকো সলিলসমাধি পেয়েছে কাবোগোর বুকে, তার ইয়ত্তা নেই। যদি জীবন নিয়ে ফিরতে হয়, তবে মালুঙ্গুকে খুশি করতেই হবে।
গল্পটা আমায় বলল সদা হাস্যময় আমার সহচর আসমানি। ওর গল্প শুনে অন্যেরা মাথা নাড়িয়ে সায় জানাল। রাতের খাবারের জন্য নদীর ধারে আমরা আস্তানা গাড়লাম। যা বুঝলাম, উজিজি সেখান থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল দূরে, আর কবোগো অন্তত পক্ষে একশো মাইল দূরে। এতদূর থেকে পাহাড়ের গহ্বরে জল পড়ার আওয়াজ শোনা যাবার অর্থ, তার বিশালতা অপরিসীম। ভেবেই বিস্মিত হতে হয়।
রাতের বেলাতেই আমরা চলতে চলতে পৌঁছলাম গভীর জঙ্গলে। এখানেই বিশ্রাম নিয়ে পরদিন সকালে পথ চলা শুরু করব ভাবলাম। পথ বলে কিছুর অস্তিত্ব নেই, আমরা দাঁড়িয়ে আছি জঙ্গলের বুকের ভিতর, যেখানে কেউ চলাফেরা করে বলে মনে হল না। আগুন না জ্বেলে চুপচাপ আমরা ঘুমে ঢলে পড়লাম। পথপ্রদর্শক বলল, পরদিন আমরা উহার সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে যাব। দু-দিন পর পৌঁছে যাব উজিজি। সেদিন রাতে স্রেফ ডক্টর লিভিংস্টোনের সঙ্গে দেখা হবার স্বর্গীয় মুহূর্ত কল্পনা করতে করতে ঘুমে চোখ জুড়িয়ে এল।
পরদিন সকালে উঠে আমাদের ছাগলগুলোর গলা কেটে মেরে ফেলতে বাধ্য হলাম। বাঁচিয়ে রাখলে ওদের ম্যা ম্যা আওয়াজে আমাদের অবস্থান জেনে যেত স্থানীয় লোকে। মুরগিগুলোকেও চিরকালের মতো শান্ত করে দেওয়া হল। এছাড়া আর উপায় ছিল না নিজেদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাবার। জঙ্গল পাতলা হতে বড়ো রাস্তায় পড়লাম কিছুক্ষণের মধ্যে। আমাদের গাইড অন্য শর্টকাট রাস্তা ধরল। একটা গ্রাম পড়ল পথে। সেটা এড়াতে সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হল পা চালিয়ে জলদি গ্রামের পাশ দিয়ে চলে যেতে।
আমার বিশ্বস্ত ম্যানচেস্টার রাইফেল হাতে নিয়ে আমি চললাম সবার পিছনে পাহারা দিতে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটা গ্রামবাসীর নজরে পড়ে গেলাম। সে প্রথমে সাদা চামড়ার মানুষ দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল, তারপর তারস্বরে চেঁচিয়ে গ্রামসুদ্ধু লোককে জাগিয়ে তুলল। রাস্তা ছেড়ে দূরে চলে যেতে লাগলাম আমরা। একটা গাছের আড়ালে বন্দুক তাক করে অপেক্ষা করতে লাগলাম অঘটনের জন্য। কিন্তু ওরা আমাদের তাড়া করল না। আরও আধঘণ্টা হাঁটার পর একটা অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর উপত্যকায় পা রাখলাম। ঠান্ডা বাতাস যেন আমাদের স্বাগত জানাল। বাতাসে বয়ে এল অজানা ফুল আর ফলের গন্ধ। নুড়ি বিছানো মাটি আমাদের পায়ের চাপে মর্মর ধ্বনি তুলল। আমরা অসভ্য উহা প্রদেশ ছাড়িয়ে চলে এলাম উকারাঙ্গা। দলের লোকেরা আনন্দে বিজয়োল্লাস করতে লাগল।
উকারাঙ্গায় প্রথম গ্রাম নজরে এল। এখানে চারদিক উঁচু-নীচু পাহাড়ে ঘেরা। সবুজে ঢাকা পাহাড়। মনে হল যেন রূপকথার দেশে পাড়ি জমিয়েছি। সুদৃশ্য পাহাড়ের পদতলে সারি সারি কুঁড়েঘর। এখানে প্রচুর চাষের ক্ষেত। গ্রামের লোকেরা আমাদের দেখে সমাদরে নিয়ে গেল ভিতরে। অবশেষে হিংস্র উহাদের হাত থেকে ছাড়া পেলাম। আমার মাথায় একটাই চিন্তা, ডক্টর লিভিংস্টোনের সঙ্গে কখন দেখা হবে। তিনি কি আদৌ দেখা দেবেন, না উজিজি থেকে পালিয়ে গিয়েছেন ইতিমধ্যে? তাঁর সঙ্গে মিলিত হবার প্রবল ইচ্ছেয় গ্রামে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আবার পথ চলা শুরু হল।
ছোট্ট একটা নদী পার হলাম। নিমতাগা নামের একটা গ্রামের কাছে আসতে না আসতেই কানে এল দ্রিমি দ্রিমি ড্রাম বাজার শব্দ। দেখি আমাদের দেখে গ্রামবাসীরা সব পালাচ্ছে। শুনলাম গাঁয়ের মোড়ল অবধি তাঁর বউ-বাচ্চা নিয়ে পলাতক। জানা গেল ওরা আমাদের মিরাম্বোর ডাকাতদল ভেবে বসেছে। ধরে নিয়েছে আমরা উজিজিতে আরবদের উচ্ছেদ করতে অভিযান চালাচ্ছি। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে তাদের আশ্বস্ত করা হল যে আমরা উনিয়ানুম্বে থেকে আসছি, মিরাম্বোর সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই।
ভয়ে ভয়ে এসে আমাকে একজন জিজ্ঞেস করল, “সাহেব, মিরাম্বো কি মরে গেছে?”
“না, এখনও নয়।” আমি উত্তর দিই।
“উকারাঙ্গা এলে কীভাবে?”
“প্রথমে উকোনোঙ্গো, তারপর উকায়েন্ডি, অবশেষে উহা পার হয়ে।”
আমার উত্তর শুনে একটা বিশাল অট্টহাসি দিয়ে ওরা বলে উঠল ‘ও-হি-লে-এ-এ…’, যার অর্থ হয়—বোঝো ঠ্যালা! এবার গাঁয়ের মোড়লমশাই এগিয়ে এল সামনে। কে যেন তাকে অভয় দিয়ে ডেকে এনেছে। সে বলে, “এই জঙ্গলে গিয়েছিলাম তোমাদের উপযুক্ত লড়াই দেব বলে। যদি তোমরা রোগা রোগা হতে, তবে এতক্ষণে তোমাদের ধরাশায়ী করে ফেলতে সময় লাগত না আমার। নেহাত প্রাণে বেঁচে গেলে।”
লোকটার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বুঝলাম তখনও সে ডাকাতের ভয়ে কাঁপছে, মুখে যাই বলুক। সে যাই হোক, তিনটে মোটাসোটা ভেড়া, প্রচুর বিয়ার, আটা আর মধু উপহার পেয়ে আমরা বেজায় খুশি হয়ে দুটো মিহি কাপড় দান করে বন্ধুত্ব রক্ষা করলাম।
তাঁবুতে ফিরে এসে আমি আমার ভৃত্যদের আদেশ দিলাম আমার সবচাইতে প্রিয় ফ্লানেলের স্যুট বার করতে। আমার জুতো পালিশ করে ঝকঝকে করে তুলতে বললাম। মাথার টুপিটাও ঠিকঠাক করে দিতে বললাম। অবশেষে নিজের এই ভূতের মতো চেহারাটা একটু আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে যখন সাদা দাড়ির সাদা চামড়ার লোকটার সঙ্গে দেখা হতে চলেছে।
১০ নভেম্বর, ১৮৭১।
পাক্কা ২৩৬ দিন পর বাগাময়ো থেকে রওনা দিয়ে উজিজিতে এসে পৌঁছেছি, যে কারণে আফ্রিকা আসা। শান্ত মনোরম এক সকাল। ঠান্ডা তাজা বাতাস বইছে চারদিকে। গাছের পাতাদের মর্মর ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। পান্না রঙের ছায়া সুনিবিড় উপত্যকা দিয়ে বয়ে চলেছে মুকুটি নদী।
বাঁশবনে ছাওয়া একটা পাহাড়ে চড়তে লাগলাম আমরা। তারপর গিরিখাত দিয়ে নামতে লাগলাম। আরও একটা ছোটো পাহাড় পেরিয়ে সরু রাস্তা দেখতে পেলাম। দু-পাশে ঘন জঙ্গল। শুনলাম আর-একটু এগিয়েই দেখা পাব টাঙ্গানাইকার। উত্তেজনায় আমি টানটান।
হঠাৎই পামগাছের সারির ফাঁকফোকর দিয়ে নজরে এল রুপোলি জল—সেই বহু কথিত টাঙ্গানাইকা হ্রদ। চারদিকে তার ছোটোবড়ো পাহাড় দিয়ে ঘেরা। একটা ছোটো নদী পার হয়ে আমরা আরও এগোতে লাগলাম হ্রদকে পাশে রেখে। স্বর্গীয় দৃশ্যও এর কাছে ম্লান মনে হয়। নিজের আবেগকে সামলানো দায়। চাষের ক্ষেত আর ছোটো একটা গ্রাম দেখতে পেলাম।
শয়ে শয়ে মাইল পার হয়ে, কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হতে হতে, গরমে ঝলসে যেতে যেতে, হাজারো পাহাড়ের চড়াই উতরাই বেয়ে, জঙ্গল পার হয়ে অবশেষে যে-জায়গায় এসে পৌঁছলাম, সব কষ্টকর স্মৃতি ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল শুধু এই দৃশ্যের জন্য। সারি সারি কুঁড়েঘরের কোনটিতে পাব সেই সাদা দাড়িওয়ালা মানুষটাকে?
হেঁকে উঠলাম—”সবক’টা পতাকা তুলে ধরো, বন্দুকে গুলি ভরে নাও। আমরা এসে গিয়েছি। আমি তিন গুনলেই আকাশের দিকে তাক করে গুলি ছুড়বে।”
সবাই হইহই করে সাড়া দিল। তারপর এক, দুই, তিন বলতেই গুড়ুম গুড়ুম শব্দে চল্লিশটা বন্দুক গর্জে উঠে জঙ্গলের নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান করে দিল।
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম—“সাদা দাড়ি বুড়োর দেশের পতাকা সবচাইতে সামনে আনো। গুলি ছুড়তে থাকো যতক্ষণ না থামতে বলি। চলো এগিয়ে যাই গ্রামের বাজারের দিকে। সামনে অপেক্ষায় আছে প্রচুর বিশ্রাম। কে যেন বলেছিল, সে টাঙ্গানাইকার মাছের গন্ধ দূর থেকে পায়! ওই তো আমিও টাঙ্গানাইকার মাছের গন্ধ পাচ্ছি। এখানে মিলবে প্রচুর পানীয়। আমরা আনন্দ করব।”
শ-খানেক গ্রামবাসী আমাদের কাফিলা দেখে দৌড়ে এল। তারা আনন্দে নাচতে নাচতে বলল, “বিন্দেরা কিসুঙ্গু!”—যার অর্থ হল সাদা মানুষের পতাকা।
নানা উপজাতির আফ্রিকার মানুষ, আরব দেশের লোকেরা আমাদের দেখে আনন্দে ফেটে পড়ল। ওরা চেঁচাতে লাগল—“ইয়াম্বো বানা, ইয়াম্বো বানা!”
হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে থেকে আমার কানের কাছে কে যেন ইংরেজিতে বলে উঠল, “গুড মর্নিং স্যার!”
আমি চমকে উঠে দেখি এক কুচকুচে কালো মানুষ, ধপধপে সাদা পোশাক আর বাহারি পাগড়ি পরে দাঁত বার করে হাসছে। পরিচয় জিজ্ঞেস করি। সে বলে, “আমার নাম সুসি। আমি ডক্টর লিভিংস্টোনের সহকারী।”
“মানে? তিনি কি এই গ্রামেই…” আমি লাফিয়ে উঠি।
“হ্যাঁ স্যার। এইমাত্র আমি তাঁর কাছেই ছিলাম।”
বিস্মিত হতে না হতে আর-একজন বলে সম্ভাষণ করল—“গুড মর্নিং স্যার! আমি চুমা। আমি সাহেবের ভৃত্য।”
“কেমন আছেন তিনি?”
“খুব ভালো নন স্যার।”
“দেরি করো না। যাও, তাঁকে গিয়ে বলো আমি এসেছি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে।” আমি উদ্বিগ্ন গলায় বলি। লোকটা তিরের বেগে ছুট দিল গ্রামের দিকে।
আর মাত্র দুশো গজ দূরে গ্রাম। কাতারে কাতারে মানুষ আমাদের দিকে ছুটে আসায় এমন অবস্থা হল যে, আমাদের পক্ষে এগোনো কষ্টকর হয়ে উঠল। আরবরা দেশি লোকদের ধাক্কা দিয়ে আমাদের কাছে ছুটে এল। সুসি নামের লোকটা ছুটে এল গ্রাম থেকে। আমার নাম জিজ্ঞেস করে আবার দৌড় লাগাল। ডক্টর লিভিংস্টোনকে সে আমার পৌঁছসংবাদ দিয়েছে। তিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করেছেন। আমার গায়ে কাঁটা দিল। আরবরা জানাল, তারা আগেই ডক্টর লিভিংস্টোনকে আমার বিষয়ে জানিয়ে দিয়েছে। তিনি নাকি ঘরের বারান্দায় আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। শুনে আমার আবেগে চোখে জল এল। কিন্তু কালো মানুষদের সামনে একজন সাদা চামড়ার লোক কী করেই-বা তার আবেগ প্রকাশ করে? তাই কম্পিত বুকে এগোতে লাগলাম ডক্টর লিভিংস্টোনের বাসস্থানের দিকে। দেখি আরবদের এক অর্ধবৃত্তাকার সারির ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন ডক্টর লিভিংস্টোন—সাদা দাড়ির, সাদা চামড়ার সেই বহু প্রতীক্ষিত মানুষটি। পরনে ধূসর রঙের পাজামা, গায়ে লাল রঙের হাতা লাগানো ওয়েস্টকোট। মাথায় নীল রঙের সোনালি পাড় দেওয়া টুপি। মানুষটি একটু বিষণ্ণ এবং রুগ্ন দেখাচ্ছে।
একবার ভাবলাম তাঁর দিকে ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরি। পরক্ষণেই নিজের আত্মমর্যাদা বোধ আমাকে সংযত করল। আর এই কাজটা এত মানুষের চোখের সামনে দৃষ্টিকটুও লাগবে। নিজের মাথা থেকে টুপি খুলে, সামান্য ঝুঁকে বললাম, “আমার ধারণা আপনিই ডক্টর লিভিংস্টোন!”
নিজের টুপিটা সামান্য তুলে তিনি সহাস্যে জবাব দিলেন, “ঠিক তাই।”
আমরা ধাতস্থ হয়ে করমর্দন করলাম। আমি বললাম, “আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই অবশেষে আপনাকে খুঁজে বার করার মহান দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি বলে।”
তিনি জবাব দিলেন, “আমিও তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ যে তোমাকে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আজ স্বাগত জানাতে পারছি।”
এবার আমি টুপি খুলে অপেক্ষারত আরবদের অভিবাদন জানালাম। প্রত্যুত্তরে তারাও আমাকে সম্ভাষণ জানাল সজোরে। ডক্টর লিভিংস্টোন মাটির বারান্দায় একটা খড়ের তৈরি বসার জায়গা দেখিয়ে বসতে অনুরোধ করলেন আমাকে। আমি বসার জায়গাটা দেখেই বুঝে গেলাম, এইখানে প্রতিদিন তিনি বসে থাকেন। প্রবল আপত্তি জানিয়ে বললাম, “আপনার চেয়ারে বসার যোগ্যতা আমার নেই। এখানে বসা আমার পক্ষে অসম্ভব।”
দেওয়ালে পিঠ দিয়ে আমি মেঝেতে বসে পড়লাম। তিনি আমার মুখোমুখি তাঁর চেয়ারে। আমাদের বামদিকে বসল আরবেরা। ঘরের উঠোনে প্রায় হাজার খানেক আফ্রিকার মানুষ। তারা উৎসুক হয়ে সাগ্রহে দেখতে লাগল দুইজন সাদা চামড়ার লোক কেমনভাবে তাদের দেশ উজিজিতে এসে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চালায়।
কীভাবে কথা শুরু করব ভেবে না পেয়ে আমি শুধু নির্নিমেষ নয়নে তাঁর মুখের বলিরেখা, তাঁর সাদা দাড়ি, কুঁচকে যাওয়া পোশাক দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, এই দিনের আশায় একদিন এই অন্ধকার মহাদেশে প্রবেশ করেছিলাম শুধু একজনের কথা শুনে, সে হল হেনরি বেনেট। এখন তার কথা কানে বাজতে লাগল—‘যাও, যা নেবার নিয়ে বেরিয়ে পড়ো। যেমন করে পারো ডক্টর লিভিংস্টোনকে খুঁজে আনো।’
আমি যথাসম্ভব মৃদু স্বরে তাঁকে প্রশ্ন করলাম, “কোথায় ছিলেন এতদিন? বাইরের দুনিয়া তো ধরেই নিয়েছিল আপনি মারা গিয়েছেন!”
তাঁর ঠোঁট নড়তে শুরু করল। বুঝলাম একসঙ্গে পাঁচ-ছয় বছরের সব বিবরণ তাঁর পক্ষে একদিনে দেওয়া অসম্ভব। তিনি শেষের দিক থেকে শুরু করলেন। মনে হল, সেটাই তাঁর পক্ষে সহজ। আমি আমার পকেট নোটবই বার করে শর্টহ্যান্ড নোট নিতে লাগলাম।
(ক্রমশ)
(ক্রমশ)