উপন্যাস–দুর্গ থেকে বর্গি-কৃষ্ণেন্দু দেব-শরৎ’২৬

আগের লেখাভূবনডাঙার ভূত  অছু সাহেবের বিষয় আশয়, শিক্ষাব্রতী বিদ্যাসাগরআহত ঈশ্বরস্বাধীনতার তিন অধ্যায়আন্দামানে ভাইসরয় নিধন, স্বাধীনতার তিন অধ্যায়লোম্যান হত্যাকাণ্ড, বাজি রাউত- দেশের সর্বকনিষ্ঠ শহিদ

“তোদের সেই আর্মি অফিসার সৌরভদাকে মনে আছে?” বিশু আড্ডাখানায় ঢুকেই আমাদের উদ্দেশে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল। আমাদের আড্ডাখানা মানে মাতারা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ছয় আর সাত নম্বর টেবিল। প্রতি সপ্তাহের মতো গত শনিবারও সন্ধ্যায় যথারীতি আমরা আড্ডা দিতে জড়ো হয়েছিলাম ওখানে।

বিশুর প্রশ্নের জবাবে আমি বললাম, “সৈকতের মাসতুতো দাদা তো? দিব্যি মনে আছে। বাব্বা, কী লম্বা চওড়া চেহারা! সৈকতের বাড়িতে ওঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। সে সময় উনি কার্গিলে পোস্টেড ছিলেন।”   দেবুও আমার কথায় সায় দিল।

এবার গৌতম বিশুকে পাল্টা জিজ্ঞাসা করল, “হঠাৎ তোর সৌরভদার কথা মনে পড়ল কেন? কাগজে নাম-টাম বেরিয়েছে নাকি?”

“না না, সেরকম কিছু নয়। সৌরভদা কিছুদিন আগে ফোর্ট উইলিয়ামে পোস্টিং পেয়েছে। আজ সৈকতের সঙ্গে দেখা হল। ও বলল, একটা দিন ঠিক করতে। তাহলে সৌরভদার বদান্যতায় আমরা ক’জন ফোর্টের ভিতরে ঢোকার সুযোগ পাব। কবে যাব জানিয়ে দিলে সৌরভদা সব ব্যবস্থা করে দেবেন। উনিই আমাদের ভিতরটা যতটা সম্ভব ঘুরিয়ে দেখাবেন। যাওয়ার দিনটা আজই ঠিক করে ফেলা যাক। এরকম সুযোগ কিন্তু আর পাওয়া যাবে না। তিনশ বছরেরও বেশি পুরনো একটা দুর্গে…”

“যে ফোর্ট উইলিয়াম তোমরা দেখতে যাচ্ছ সেটা কিন্তু মোটেই তিনশো বছরের পুরনো নয়। ওটার নির্মাণ কার্য শুরু হয়েছিল পলাশীর যুদ্ধের পরে, ওয়ারেন হেস্টিংসের সময়ে। আর দুর্গটা মোটামুটি ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠেছিল ১৭৮০ নাগাদ। তারও বছর আশি বাদে দুর্গের দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল এবং তা চলেছিল আরও অনেকদিন ধরে।”   মন্তব্যটা যিনি করলেন, বলাই বাহুল্য, তিনি শ্রী মনোতোষ পাল, মানে আমাদের গ্রেট মনাদা। মনাদা কখন সাত নম্বর টেবিলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, আমরা কেউ খেয়ালই করিনি।

আমরা সঙ্গে সঙ্গে মনাদাকে মাঝখানে বসিয়ে নিলাম। বিশু ওঁকে জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে পুরনো দুর্গটা কোথায় ছিল মনাদা?”

“এখনকার যে ডালহৌসি স্কোয়ার, তার পশ্চিমপাড়ে। ওর পুবে ছিল লালদিঘি আর পশ্চিমে গঙ্গা। এখন যেখানে জিপিও, ইস্টার্ণ রেলের অফিস, কাস্টম হাউস, সেখানেই ছিল দুর্গটা। আসলে তড়িঘড়ি বানাতে গিয়ে শুরু থেকেই ওর কাঠামোয় খানিক গলদ ছিল। তাই ওটা বাতিল করে একটা নতুন দুর্গ বানিয়েছিল ইংরেজরা।”  

“তা আগেরটা বানানোর সময় অত তাড়াহুড়োর দরকারটা কী ছিল? একটু রয়ে সয়ে বানালেই তো চলত।”   মলয় মন্তব্যটা করল।

“না চলত না। সেক্ষেত্রে গোল্ডসবরা সাহেবের ইচ্ছাটা হয়ত অপূর্ণই থেকে যেত।”   মনাদা বেশ গম্ভীর স্বরেই কথাটা বললেন।

“এই গোল্ডসবরা সাহেবটা আবার কে?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

“সেটা জানতে গেলে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একেবারে শুরুর দিকের ইতিহাসটা একটু বলতে হবে।”   মনাদা জবাবে বললেন।

“আ হা, কে বাধা দিচ্ছে, আপনি বলুন না।”   গৌতম কথাটা বলেই মাতারা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের সব চেয়ে পুরনো কর্মচারী কাম হেডকুক বিমলদাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ছ’টা অমলেট দাও। তারপরে চা।”  

“মনাদা এবার বেশ জমিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর বলতে শুরু করলেন, “জোব চার্ণক মারা যাওয়ার পর সুতানুটিতে ইংরেজদের যে কুঠিটা ছিল, তার হেড বানানো হয়েছিল ফ্রান্সিস এলিসকে। লোকটা মোটেই কাজের ছিল না, অপদার্থ বললেও কম বলা হয়। ইংরেজদের কুঠি বলতে তখন ছিল কতকগুলো খড়ের চালা। সেগুলোই একাধারে গুদামঘর আবার অফিসঘরও বটে। বেচাকেনার জন্য দামি দামি মালপত্র সব ওখানেই রাখা হত, সঙ্গে ব্যাবসার কাগজপত্রও। বেশ কিছু অফিসার ঐ চালাঘরেই রাত কাটাত। বাকিদের জায়গা হত না। তারা নৌকায় তাঁবু খাটিয়ে ঘুমোত। মাঝেমধ্যেই ঐ চালাঘরগুলোতে আগুন লেগে যেত। তখন ভোগান্তির শেষ থাকত না। মালপত্র তো নষ্ট হতই, সঙ্গে লেনদেনের কাগজপত্রও পুড়ে খাক হয়ে যেত। আবার সব কিছু নতুন করে বানাতে হত। তার ওপর কোম্পানির অনেক কর্মচারীই তখন সারাদিন নেশাভাং করে পড়ে থাকত, নিজেদের মধ্যে মারামারিও করত।

“মাদ্রাজে তখন কোম্পানির প্রধান ঘাঁটি। সেখান থেকে একজন বড়ো অফিসারকে পাঠানো হল বাংলার ব্যাবসা তদারকি করতে। তারই নাম জন গোল্ডসবরা। সে তো ওই সব কাণ্ড দেখে রেগে কাঁই হয়ে গেল। এভাবে কি ব্যাবসা চলে? প্রথমেই গোল্ডসবরা ফ্রান্সিস এলিসকে বরখাস্ত করল, আর কুঠির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মাদ্রাজ থেকে ডেকে পাঠাল জোব চার্ণকের নাতি চার্লস আয়ারকে। তারপর একটা নতুন জায়গার খোঁজ করতে লাগল কুঠি বানানোর জন্য। সুতানুটির দক্ষিণের একটা উঁচু জায়গা তার পছন্দ হল। ওর পুবদিকে বিশাল লাল দিঘি। একটু সংস্কার করে নিলেই তার জল অনায়াসেই ব্যবহার করা যাবে। ঐ দিঘির পাশেই ছিল সাবর্ণ চৌধুরীদের কাছাড়ি বাড়ি। সেটা কিনে নিতে পারলে মালপত্র রাখার আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

“অতঃপর ইংরেজ কুঠি উঠে এল কলকাতায়। সাবর্ণ চৌধুরীদের কাছারি বাড়ি আপাতত ভাড়া নেওয়া হল। গোল্ডসবরা সাহেবের মনে একটা কেল্লা বানানোর স্বপ্ন ছিল। সেই কাজ এবার শুরুও হল। কিন্তু কিছুদিন বাদেই গোল্ডসবরা হঠাৎই মারা গেল। ফলে থমকে গেল কেল্লা বানানোর কাজ। তখন মাদ্রাজ থেকে আয়ার কলকাতা কুঠির সর্দার হিসেবে যোগ দিল। সে আবার শুরু করে দিল কেল্লার কাজ। কিন্তু সাহস করে আর বেশি দূর এগোতে পারল না।”  

“কেন? এগোতে পারল না কেন?” বিশু জানতে চাইল।

“আসলে যে জমিতে ওরা কুঠি বানিয়েছে তার মালিকানা তখনও পাকা হয়নি। আর সে সময়ে কোঠাবাড়ি, কেল্লা ইত্যাদি বানানোর জন্য সরকারি অনুমতি লাগত। নবাব যদি একবার শোনেন যে তাঁকে না জানিয়েই কেল্লা নির্মাণ শুরু হয়েছে তাহলে আর রক্ষা নেই। উনি হাতে মাথা কাটবেন। তবে এই অবস্থায় শোভা সিংহ ইংরেজদের খুব সুবিধা করে দিয়েছিল।”   মনাদা জবাবে বললেন।

“শোভা সিংহ-টা আবার কে?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

“সেটাই বলতে যাচ্ছিলাম। আকবরের রাজস্ব-সচিব টোডরমল সুবা বাংলাকে উনিশটি ‘সরকার’-এ এবং দুশোটি মহাল বা ‘পরগনা’য় ভাগ করেছিলেন। সরকার ‘মান্দারণ’-এর আন্ডারে মেদিনীপুরের একেবারে পূর্বপ্রান্তে রূপনারায়ণের পশ্চিমে ছিল চেতুয়া এবং বরোদা পরগনা। ওই দুটো জায়গা এখন হুগলির গোঘাট থানায়। যাইহোক, ঐ দুই পরগনার রাজা ছিল শোভা সিংহ।”  

“বরোদা তো গুজরাটে! বাংলাতেও বরোদা আছে নাকি?”

“না, এখন নেই বটে, তবে ১৬৬০ সালে ফানডেন ব্রুকের আঁকা মানচিত্রে বরোদা গড়ের চিহ্ন ছিল। রেনেলের মানচিত্রেও বরোদার উল্লেখ ছিল। ওখানে সম্ভবত বড়ো একটা ‘দহ’ মানে গর্ত ছিল এবং বড়ো দহ থেকেই ‘বরোদা’ নামের উৎপত্তি।

পশ্চিমের রাজপুতানা ছেড়ে বাংলায় বাণিজ্য করতে এসেছিল রঘুনাথ সিংহ নামের এক ক্ষত্রীয়। সরকার মান্দারণ-এর চেতুয়া এলাকায় কাজ শুরু করেছিল সে। ব্যাবসাজমে ওঠে। রঘুনাথের পুত্র কানাই সিংহ এত পয়সা করেছিল যে পুরো চেতুয়া পরগনা কিনে নিয়ে একটি জমিদারি বানিয়ে ফেলেছিল। তার রাজধানী ছিল রাজনগর। ঐ কানাইয়েরই ছেলে শোভা সিংহ।”  

“বুঝলাম। তারপর বলুন।”   মলয় বলল।

মনাদা বলতে লাগলেন, “শোভা ছোটো থেকেই ছিল খুব দাপুটে, দুঃসাহসী আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী। বাগদি সম্প্রদায়ের লোকজন নিয়ে একটা দুর্দান্ত সেনাবাহিনী বানিয়ে শোভা প্রথমেই পাশের জমিদার কীর্তি সিংহকে হটিয়ে ঐ বরোদা অধিকার করে নেয়। তারপর রাজধানী রাজনগর থেকে বরোদায় নিয়ে আসে। তিনখানা পরিখা দিয়ে ঘেরা সেই রাজধানীতে ছিল বিশাল প্রাসাদ, সেনানিবাস, কাছারিবাড়ি, হাতিশাল, ঘোড়াশাল, বড়ো বড়ো দিঘি, কুলদেবী বিশালাক্ষীর মন্দির, আরও কত কী!

শোভা প্রজা-কল্যাণে অনেক কাজ করেছিল। পানীয়জলের জন্য বড়ো বড়ো পুকুর কাটিয়েছিল, সেচ-নিকাশি-পরিবহণের জন্য নদী-খালের সংস্কার করেছিল, অনেক পথ-ঘাটও বানিয়েছিল। আর করেছিল গ্রামীণ হস্তশিল্পের উন্নতি। হস্তশিল্প সামগ্রী বিক্রির জন্য বেশ কয়েকটা হাট-বাজারের পত্তন করেছিল সে। রাজধানী বরোদার কাছে নিজের বৌয়ের নামে তেমনই বড়ো আকারের একটা বাজারের নাম রেখেছিল ‘রানির বাজার’। কাঁসার বাসন, সুতি ও পাট বস্ত্র, বিশেষ করে রেশমকাপড়ের বিপুল বেচা-কেনা হত ঐ বাজারে। দ্রুত লোকবসতি গড়ে উঠেছিল ওই বাজারকে ঘিরে।”  

“তা এমন লোক হঠাৎ বিদ্রোহী হয়ে উঠল কেন?” দেবু জানতে চাইল।

“তার স্বাধীন রাজা হওয়ার শখ হয়েছিল যে। আগেই তো বললাম, শোভা সিংহ লোকটা ছিল দুঃসাহসী আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী। জিজিয়া কর চালু হওয়া কিংবা রাজা-জমিদারদের ‘নজর-পেশকাস’ পাঠানো বন্ধ করা ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে বাংলা জুড়ে সে সময়ে মোগল শাসনের প্রতি একটা অসন্তোষ তৈরি হয়েই ছিল। দিল্লির মসনদে তখন সম্রাট আওরঙ্গজেব। কিন্তু তিনি তখন দাক্ষিণাত্যে মারাঠা, পাঞ্জাবে শিখ আর উদয়পুরে রাজসিংহের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত। আর এদিকে বাংলার মোগল রাজধানী ঢাকায় সুবাদার ও দেওয়ানের মধ্যে চূড়ান্ত আকচাআকচি চলছে। এই সব ব্যাপার শোভাকে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে ইন্ধন জুগিয়েছিল।

শোভার বিদ্রোহের শুরু অবশ্য ভূ-সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে। দক্ষিণবঙ্গে তখন সম্রাটের জায়গিরদার বর্ধমানের রাজা কৃষ্ণরাম রায়। তাঁর আমলে শুধু বর্ধমান পরগনার বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ ছিল এক লক্ষ টাকা। কৃষ্ণরামের মোট ইজারা ছিল ২২ লক্ষ টাকার। আর তাতেই কৃষ্ণরাম একেবারে টাকার কুমির হয়ে গিয়েছিলেন। শোভা সিংহ নিজে তাঁকে বার্ষিক ২২ হাজার টাকা দিত।

এবার শোভা সিং-এরও রাজা হওয়ার শখ হল। সে কয়েক হাজার পদাতিক সেনা নিয়ে শুরু করল পাশের পরগনাগুলো আক্রমণ করতে। হাতে আসতে লাগল অনেক টাকা, ফলে অনুচরের সংখ্যাও বাড়তে লাগল দিন-কে-দিন। তাতে শোভা হয়ে উঠল একেবারে বেপরোয়া। সে তখন আর মোগল শাসকের অধীনে থাকতে চাইছিল না। ১৬৯৫ সালে সে বিদ্রোহ ঘোষণা করল। সেই বিদ্রোহে ওর সঙ্গী হল চন্দ্রকোণার জমিদার রঘুনাথ সিংহ, বিষ্ণুপুরের গোপাল সিং এবং ওড়িশার আফগান সর্দার রহিম খাঁ।

কৃষ্ণরামের বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে একজন সামান্য জমিদার এমনভাবে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। উনি আর চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না। পরের বছর জানুয়ারিতেই শোভাকে শায়েস্তা করার জন্য নিজেই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সৈন্যসামন্তসমেত হাজির হলেন চন্দ্রকোণায়। তবে শোভার ক্ষমতা সম্পর্কে ওঁর কোনো ধারণাই ছিল না। যুদ্ধে মারা পড়লেন বেচারা কৃষ্ণরাম। ছেলে জগৎরাম কোনো রকমে ঢাকায় পালিয়ে গিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাল। শোভা সিংহ দখল করে নিল বর্ধমান রাজবাড়ি। বন্দি হল রাজকন্যা সত্যবতী।

শোনা যায় সেই সময় নিজেদের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য বর্ধমান রাজপ্রাসাদের মোট তেরোজন নারী নাকি বিষ পান করে আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে জিতু দেবী, মুলুক দেবী, লাজো দেবী, পাতো দেবী, লছমি দেবী ও কৃষ্ণা দেবী ছিলেন কৃষ্ণরাম রায়-এর স্ত্রী। ১৬৯৬ সালের পৌষ মাসের শুক্ল পক্ষের সপ্তমী তিথিতে ঐ ভয়ঙ্কর ঘটনাটা ঘটেছিল। আত্মসম্মান রক্ষার জন্য বিষ বা জহর পান করে আত্মহত্যা করেছিলেন বলে তাঁদের ‘জহুরি’ বলা হয়। বর্ধমান রাজপরিবারে এক সময় নাকি ঐ তিথিতে জহুরিদের উদ্দেশ্যে জল-পিণ্ডদানের রীতি চালু ছিল।

যাইহোক, আবার আগের কথায় ফিরে আসি। বর্ধমানের সঙ্গে মান্দারণও অধিকার করে নিল শোভা সিংহ। নিজেকে ‘রাজা’ ঘোষণা করল। এরপর হুগলি, সপ্তগ্রাম সমেত গঙ্গার পশ্চিমের বিশাল একটা এলাকা মোগল শাসনমুক্ত করল শোভার বাহিনী। এই কারণে অনেকে শোভা সিংহ-কে ‘বাংলার শিবাজি’ বলেও ডাকেন।”  

“বাংলার সুবাদারসাহেব তখন কী করছিলেন? বিদ্রোহদমনের ব্যবস্থা করেননি?” গৌতম জানতে চাইল।

“বাংলার সুবাদার তখন ইব্রাহিম খাঁ। তিনি তখন বুড়ো হয়েছেন, যুদ্ধ-বিগ্রহ আর ভালো লাগে না, নিজেকে ফার্সি পুথিতে ডুবিয়ে রাখতেই পছন্দ করেন বেশি। প্রথমে অবশ্য উনি ঐ বিদ্রোহকে সেভাবে পাত্তাই দেননি। কিন্তু শোভা হুগলিতে ঢুকে পড়ায় আর চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না। বাংলার ফৌজদার নুরুল্লা খাঁকে আদেশ দিলেন বিদ্রোহ দমন করতে। নুরুল্লা খাঁও আরেকজন! তিনি ব্যবসায়ী মানুষ। এতদিন নিজের ব্যাবসাকীভাবে আরও বাড়ানো যায়, তা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। এখন শোভার বাহিনীর মুখোমুখি হতে হবে শুনে তো তিনি ভয়েই আধমরা হয়ে গেলেন, আর লুকিয়ে পড়লেন হুগলি দুর্গে। শোভা সিংহের সৈন্যরা সেই হুগলি দুর্গও ঘেরাও করল। কোনো মতে নুরুল্লা খাঁ ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচলেন।”  

“এসব খবর ঔরঙ্গজেবের কানে পৌঁছয়নি?” মলয় জিজ্ঞাসা করল।

“একশোবার পৌঁছেছিল। দেওয়ানই নালিশ জানিয়েছিল মোগল সম্রাটকে। তখন বিদ্রোহ দমন করতে না পারার জন্য ঔরঙ্গজেব সুবাদার ইব্রাহিম খাঁকে খুব ভর্ৎসনাও করেছিলেন। অথচ ঐ দেওয়ানের খুব কাছের দুজন মানুষ—মানিকচাঁদ আর তার ভাই গুলালচাঁদ কিন্তু তলে তলে হুন্ডি দিয়ে এবং চিঠিপত্র চালাচালি করে শোভার বিদ্রোহে ইন্ধনই জুগিয়েছিল।

যাইহোক, দুর্গ দখল করে শোভা এবার যেন আরও আগ্রাসী হয়ে উঠল। তার আট হাজার ভাড়াটে আফগান এবং নিজের কয়েকহাজার সৈন্য অবাধে লুঠপাট চালাতে লাগল হুগলির বাণিজ্য কুঠিগুলোতে। ফলে ব্যবসাবাণিজ্যে ভাঁটা পড়ল। বস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র ও বাজার হিসেবে খ্যাত রাধানগর শোভা সিংহের উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল। মুদ্রাব্যবসায়ীরা হুগলি ছেড়ে চলে যেতে শুরু করল। ভাগীরথী অঞ্চলে অর্থনীতি জোর ধাক্কা খেল। বেশ কিছু মনসবদারেরও একেবারে সর্বনাশ হয়ে গেল।

ডাচ বণিকরা কৃষ্ণরামের কাছ থেকে ভালো টাকা ঋণ করেছিল। সেটা জেনে শোভা এবার তাদের কাছে ষাট হাজার টাকা দাবি করে বসল। ডাচরা সেটা দিতে রাজি না হওয়ায় শোভা সিংহ হুগলিতে তাদের ব্যাবসাবন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিল। ডাচরা তখন ভয় পেয়ে কয়েক হাজার টাকা তুলে দিল শোভার হাতে। তবে টাকা দিয়েও কিন্তু তাকে শান্ত করতে পারল না। ঐ সময়ে হুগলি ও মকসুদাবাদের মাঝের নদীতে চৌকি বসিয়ে চলাচলকারী নৌকা থেকেও কর আদায় করতে শুরু করল শোভা সিংহ।”  

“তারপর?” আমি জানতে চাইলাম।

মনাদা চোখ বুজে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “এই সময়েই ইংরেজ, ডাচ আর ফরাসিরা নিজের নিজের এলাকায় কেল্লা বানানোর জন্য অনুমতি চাইল বিদ্রোহীদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য। ইব্রাহিম খাঁ ঠিক কেল্লা তৈরিতে সায় দিলেন না বটে, তবে বললেন—তোমরা যে যেভাবে পারো নিজেদের রক্ষা করো।

ব্যাস, এই বক্তব্যকেই কেল্লা নির্মাণের অনুমতি ভেবে নিয়ে ইংরেজরা হৈ হৈ করে কাজ শুরু করে দিয়েছিল। একটুখানি অংশ তো আগেই বানানো হয়েছিলই, এবার তৈরি হল গোটা কেল্লাটা। তবে কেল্লা মানে বিশাল কিছু নয় কিন্তু। মাটির দেওয়াল-ঘেরা অনেকগুলো কাঁচাপাকা গুদামঘর। ঐ ঘরগুলোকে মাঝখানে রেখে চারদিকে চারটে বুরুজ। প্রতিটা বুরুজের ওপর দুটো করে কামান বসানো। তখন ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় উইলিয়াম। তাঁর নামেই কেল্লার নামকরণ হল ফোর্ট উইলিয়াম।”  

“সে তো বুঝলাম। কিন্তু শোভার কী হল?” মলয়ের এই প্রশ্নের জবাবে মনাদা বললেন, “শোভা সিংহ যদি এই সময়ে একটা স্থায়ী রাজবংশও তৈরি করে ফেলত, তাহলেও আশ্চর্যের কিছু থাকত না। কিন্তু তার আকস্মিক মৃত্যু সব হিসেব গুলিয়ে দিল।”  

“মৃত্যু মানে! শোভা মারা গেল কীভাবে?” দেবু জিজ্ঞাসা করল।

মনাদা একটু বিরতি নিয়ে জবাব দিলেন, “এই মৃত্যু নিয়ে একাধিক মত আছে। কেউ বলেন আওরঙ্গজেবের নাতি আজিম-উস-শান নাকি শোভাকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু সেটা মোটেই ঠিক কথা নয়। কারণ ইব্রাহিম খাঁকে সরিয়ে আওরঙ্গজেব যে সময় আজিম-উস-শানকে বাংলায় সুবাদার করে পাঠিয়েছিলেন, তার বেশ কিছুদিন আগেই শোভা প্রাণ হারিয়েছিল। কেউ বলেন ভোজ উৎসবে মশগুল অবস্থায় উঁচু ইমারত থেকে পড়ে শোভা সিংহ মারা গিয়েছিল। কিন্তু এই ব্যাপারটাও সঠিক নয়। একজন রাজা কখনও ওভাবে একটা উঁচু জায়গা থেকে হঠাৎ পড়ে যেতে পারে নাকি? তবে শোভার মৃত্যু নিয়ে ঐতিহাসিক সলিমুল্লাহ যে গল্পটা শুনিয়েছেন সেটা বেশ রোমহর্ষক, অনেকটা সিনেমার মতো।”  

“কী রকম?” আমি জানতে চাইলাম।

মনাদা বললেন, “বর্ধমান অধিকার করার পরে সমস্ত রাজ-পুরবাসিনীরা আত্মহত্যা করলেও রাজকন্যা সত্যবতী সেই সুযোগ পায়নি। তাকে রাখা হয়েছিল বন্দি করে। শোভা সিংহের সাধ হয়েছিল রাজকুমারীকে ভোগ করার। সেই কথা শোভা একদিন অন্তঃপুরে গিয়ে রাজকুমারীকে জানিয়েও দিল। জবাবে রাজকুমারী কিন্তু একটা কথাও বলল না, একেবারে চুপ করে থাকল। শোভা ভাবল মৌনতা সম্মতির লক্ষণ বুঝি। তাই সে খুব উৎফুল্ল হয়ে এগিয়ে গেল রাজকুমারীকে নিজের কাছে টানতে। ওদিকে রাজকুমারীর শাড়ির ভাঁজে ছিল একটা ধারালো ছোরা। সেটা সে বসিয়ে দিল শোভার বুকে। তারপর ঐ ছোরা নিজের বুকে গেঁথে আত্মহত্যাও করল সে। গল্প হিসেবে এটা ভালো বটে, কিন্তু ঘটনাটা মোটেই সত্যি নয়। শোভাকে আসলে হত্যা করেছিল দামোদর মিশ্র নামের এক ব্রাহ্মণ ছোকরা।”  

“এই দামোদরটা আবার কে?” গৌতম প্রশ্নটা করল।

সিগারেটটা শেষ করে একরাশ দীর্ঘশ্বাস মিশ্রিত ধোঁয়া ছেড়ে মনাদা বললেন, “সম্পর্কে সে মুর্শিদকুলি খাঁর এক জ্ঞাতি ভাই। পরবর্তীকালে ওর ছেলে ভৈরবই বাংলার ইতিহাসে শাসক পরিবর্তনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। তবে ইতিহাসের পাতায় তাদের জায়গা হয়নি।”  

একথা শুনে তো আমাদের সকলের মুখ একেবারে হাঁ হয়ে গেল। অনেকগুলো প্রশ্ন তখন আমার মাথায় ভনভন করছে। তার মধ্য থেকে কেবল একটাই প্রশ্ন আমি মনাদাকে জিজ্ঞাসা করতে সমর্থ হলাম, “দাদা, মুর্শিদকুলি খাঁর জ্ঞাতিভাই ব্রাহ্মণ হল কীভাবে?”

মনাদা মুচকি হেসে বললেন, “আপত্তি কোথায়? আরে বাবা, মুর্শিদকুলি খাঁ তো আর কোনও ইসলাম পরিবারে জন্মাননি, তাঁর জন্ম তো দাক্ষিণাত্যের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে। ওঁর জন্মনাম সূর্যনারায়ণ মিশ্র।”  

“কিন্তু দাক্ষিণাত্যে মিশ্র পদবীধারী ব্রাহ্মণ আছে বলে তো শুনিনি! ওখানের ব্রাহ্মণরা কেউ চাপেকার, কেউ সাভারকার, কেউ গোলওয়ালকার…”

মনাদা গৌতমকে কথা শেষ করতে দিলেন না। বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ। মিশ্ররা আসলে বিহারের ব্রাহ্মণ। মুর্শিদকুলীর পূর্বপুরুষরা বিহারের বাসিন্দাই ছিলেন। ওই পরিবারের আর্থিক অবস্থা নানা কারণে খারাপ হয়ে পড়েছিল। তাই ওঁর ঠাকুরদা সরকারি রাজস্ব বিভাগের একটা চাকরি পেয়ে মহারাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন বাদেই অসুস্থ হয়ে তিনি মারা যান। তখন ওই পরিবার একেবারে অথই জলে পড়ে যায়। বিহারে ফিরে আসাও তাঁদের পক্ষে তখন সম্ভব ছিল না। দাক্ষিণাত্যেই কোনও মতে দিন গুজরান করতে থাকেন।”  

“তার মানে মুর্শিদকুলী খাঁর জন্ম খুব গরিব ঘরে?” বিশু জানতে চাইল।

মনাদা মাথা নেড়ে জবাব দিলেন, “একদম তাই। ওঁদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে তাঁর মা-বাবা ছেলেকে বেচে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন হাজি শফি ইসফাহানি নামের এক ইরানি বংশোদ্ভুত মোগল কর্মকর্তার কাছে। শফি ইসফাহানি ঐ ছেলের নাম রেখেছিলেন মহম্মদ হাদি।

ইসফাহানি লোকটা ভালোই ছিলেন। তিনি হাদিকে নিজের ছেলের মতোই বড়ো করতে থাকেন। নিজের দেশ পারস্যেও তাকে নিয়ে যান। সেখানে হাদি পড়াশোনা শেখে, শিখে ফেলে ফার্সি ভাষাও। এরপর শফি ইসফাহানি আবার দিল্লিতে ফিরে এসে দেওয়ান-ই-তান পদে কাজ শুরু করেন, সঙ্গে নিয়ে আসেন হাদিকেও। তখনই হাদি দেওয়ানি কাজকর্ম শিখতে শুরু করেন।
১৬৯৬ সালে শফি ইসফাহানি যখন মাটি নিলেন, হাদি ঢুকে পড়েন বেরার প্রদেশের দেওয়ান হাজি আবদুল্লাহ খোরাসানীর কাছে কাজ করতে। কিছুদিন বাদে দেওয়ানি কাজে হাদির দক্ষতা দেখে স্বয়ং সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে হায়দ্রাবাদের দেওয়ান বানিয়ে দেন। হাদি সেখানেও কাজ করলেন খুব নিষ্ঠার সঙ্গে। আওরঙ্গজেব তাতে দারুণ খুশি হয়ে তাঁকে ‘করতলব খান’ উপাধি দিয়ে পাঠিয়ে দেন বাংলায়। সেটা ১৭০১ সাল।

এই সময় বাংলার সুবাদার ছিলেন আওরঙ্গজেব-এর নাতি আজিম-উস-শান। তিনি প্রথম বাহাদুর শাহের ছেলে। তিনি নিজে এবং তাঁর সময়ের দেওয়ানেরা রাজকার্যের পাশাপাশি বৈধ-অবৈধ বাণিজ্য ও অন্যান্য কাজকারবার করে প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। হাদি বাংলায় এসেই সেই সব কাজে বাধা দিলেন। পাশাপাশি আওরঙ্গজেবকে বিশদে সবকিছু লিখে পাঠালেন। আওরঙ্গজেব সঙ্গে সঙ্গে আটকে দিলেন সেই টাকা রোজগারের পথ। ফলে সুবাদারের বিপুল আয় বন্ধ হয়ে গেল।

এদিকে আজিম-উস-শানও চুপ করে বসে থাকার বান্দা নন। তিনি এবার রাজকোষ থেকেই টাকা হাতানোর চেষ্টা করলেন। হাদি যথারীতি আবার বাধা দিলেন। তখন আজিম-উস-শান দারুণ রেগে গিয়ে তাঁকে খুন করার ষড়যন্ত্র করলেন। সেই ষড়যন্ত্রের কথা অবশ্য হাদির জানতে বাকি রইল না। সেটাও তিনি জানিয়ে দিলেন আওরঙ্গজেবকে। সব শুনে ১৭০২ সালে আওরঙ্গজেব হাদিকে অনুমতি দিলেন গঙ্গার তীরে মকসুদাবাদে নিজের দফতর সরিয়ে নিতে। অন্যদিকে নিজের নাতি আজিম-উস-শানকে পাটনায় পাঠিয়ে নায়েবের মাধ্যমে প্রদেশ শাসনের আদেশ দিলেন।

পরের বছর হাদি সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দাক্ষিণাত্যে গেলেন। আওরঙ্গজেব তো ওঁর কাজে দারুণ সন্তুষ্ট, দিলেন ‘মুর্শিদকুলি খাঁ’ উপাধি। আর মকসুদাবাদের নাম রাখলেন মুর্শিদাবাদ। পরে ওই মুর্শিদকুলি খাঁ-ই হয়ে গেলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব।”  

“আরে, এই মুর্শিদকুলি খাঁ-র কথা তো ছোটোবেলায় ইতিহাস বইতে পড়েছি। ওসব কথা পরে শুনব। আগে ওঁর সেই জ্ঞাতিভাই দামোদরের কথা বলুন। সে হঠাৎ দাক্ষিণাত্য ছেড়ে বাংলায় আসতে গেল কেন?”

“কেন আবার? দাদার সঙ্গে দেখা করতে। দাদা তখন একজন কেউকেটা লোক হয়েছে। যদি তাকে ধরে একটা ভালো সরকারি কাজ জুটে যায়…।”  

দেবুর কথা শেষ হল না। মনাদা ধমকের সুরে বললেন, “কী যা-তা বলছ দেবু! শোভা সিংহ তো খুন হয়েছিল ১৬৯৬-এর সেপ্টেম্বরে। আর দামোদর বর্ধমানে এসেছিল সেই বছর আগস্টের শেষে। তখন মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলায় ছিলেন কোথায়? তিনি তো তখন মহম্মদ হাদি, বেরারের দেওয়ানের অধীনে কাজ করা একজন সামান্য কর্মচারী মাত্র। উনি বাংলায় এসেছেন আরও প্রায় পাঁচ বছর পরে। ফলে তখন দামোদরের বাংলায় এসে দাদার সঙ্গে দেখা করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। সত্যি বলতে কি, দামোদর কখনও জানতেই পারেনি যে মুর্শিদকুলি খাঁ ওর সেই ছেলেবেলায় বিক্রি হয়ে যাওয়া দাদা।”  

কথাগুলো শুনে দেবু একেবারে চুপসে গেল। মলয় বলল, “ওর ছেলেবেলা থেকেই টাইম অ্যা‌ন্ড ডিস্টেন্সের কোনও জ্ঞান নেই মনাদা। একবার ক্লাসে স্যারকে এভারেস্টের উচ্চতা বলেছিল আট লক্ষ আট হাজার আটশ আটচল্লিশ কিলোমিটার। মানে পৃথিবী থেকে চাঁদের যা দূরত্ব, এভারেস্টের হাইট নাকি তার ডবলেরও বেশি! তাই আপনি ওর কথা বাদ দিন। দামোদর বাংলায় কেন এল, আর শোভাকে কেন মারল, সেটা বলুন।”  

মনাদা একথা শুনে দেবুর দিকে একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকালেন, তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, “মহারাষ্ট্রের যে অখ্যাত গ্রামে দামোদর থাকত সেখানে সাহসী ছেলে হিসেবে তার বেশ সুনাম ছিল। তাদের গ্রামের পাশেই ছিল একটা বিশাল জঙ্গল। দামোদর মাসে একবার একাই চলে যেত সেই জঙ্গলের গভীরে। আর মৌচাক ভেঙে নিয়ে আসত মধু। খাবার জন্য নয় কিন্তু। আসলে দামোদর ছিল খুব বিষ্ণুভক্ত। ওদের গ্রামে ছিল একটা ছোট্ট বিষ্ণুমন্দির। দামোদর সেই মন্দিরের পাথরের বিষ্ণুমূর্তিটাকে ঐ মধু মাখিয়ে স্নান করাতো প্রতিমাসের পূর্ণিমার দিনে। একবার জঙ্গল থেকে মধু আনতে গিয়ে সে পড়েছিল বাঘের খপ্পরে। বাঘটা অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দামোদরের ওপর। কিন্তু দামোদরও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সে তার কোমরে গোঁজা ছোরাটা নিয়ে প্রবল বিক্রমে লড়ে গিয়েছিল বাঘটার সঙ্গে। এবং শেষ পর্যন্ত জিত তারই হয়েছিল। বাঘটা ওখানেই দেহ রেখেছিল।

সেদিন রক্তাক্ত অবস্থায় দামোদর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে যখন গ্রামের লোকের কাছে সেই বাঘ-মারার গল্প শুনিয়েছিল, প্রথমে তার কথা কেউ বিশ্বাসই করেনি। কিন্তু দুএকজন অত্যুতসাহী গ্রামবাসী জঙ্গলে ঢুকে ক্ষতবিক্ষত মরা বাঘটাকে দেখতে পেল। তারপরই দামোদরকে নিয়ে শুরু হয়ে গেল প্রবল মাতামাতি। দূরদূরান্ত থেকে লোক আসতে লাগল তাকে দেখতে। তার বুকে-পিঠে বাঘের আঁচড়ের দাগ দেখে সকলে শিহরিত হতে লাগল। বাব্বা! একটা ষোল-সতেরোর বছরের ছেলের বুকে এত সাহস, আর শরীরে এত শক্তি যে একাই একটা বাঘকে নিকেশ করতে পারে! গোটা এলাকায় দামোদর তাই বীরের সম্মান পেল। আর এই সময়েই এক সাধুবাবা ওকে বাংলাদেশের বর্ধমানে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন।”  

“তা ওই সাধুবাবা হঠাৎ দামোদরকে বর্ধমানে যেতে বললেন কেন?” মলয় জিজ্ঞাসা করল।

“ঐ সাধুবাবা দামোদরদের গ্রামেরই একদম শেষপ্রান্তে একটা কুটীরে কিছুদিন ধরে আস্তানা গেড়েছিলেন। সেখানে বসেই তিনি কয়েকজন ভক্তের মুখে দামোদরের ব্যাঘ্রনিধনের কাহিনি জানতে পারেন। তারপর নিজেই চলে আসেন দামোদরের বাড়িতে। বলেন, ভগবান বিষ্ণুর কৃপাতেই নাকি দামোদর ওই অতিমানবিক কাণ্ডটা ঘটাতে পেরেছে। দামোদর যদি নিজের শক্তি আরও বাড়াতে চায়, তাহলে তাকে বর্ধমান রাজবাড়ির পাশে যে বিষ্ণু মন্দিরটা আছে, সেখানে একবার পুজো দিতে হবে। বছরখানেক আগেই সাধুবাবা ওই মন্দিরের বিগ্রহ দর্শন করেছেন। পায়ে হেঁটে ভারতবর্ষের আরও অনেক মন্দির ও তীর্থস্থান ঘুরেছেন তিনি। কিন্তু বর্ধমানের মতো অমন জাগ্রত বিষ্ণুমূর্তি তিনি নাকি আগে কখনও দেখেননি। তাই বিষ্ণুভক্ত দামোদরের ওই মন্দিরে গিয়ে অবশ্যই একবার পুজো করা উচিত।

দামোদর একথা শুনে আর স্থির থাকতে পারল না। বর্ধমান আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল। বাড়ির লোক অবশ্য তাকে কিছুতেই এত দূরে আসতে দিতে চায়নি। কিন্তু ইতিহাসের লিখন তো আর খণ্ডানো যায় না। তাই দামোদর বাবা-মা, আত্মীয়-পরিজন সকলের নিষেধ উপেক্ষা করেই ১৬৯৬ সালের জুলাইতে বাংলার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল পরিচিত একদল কাপড়ের ব্যবসায়ীর সঙ্গে।”  

“তিনশো বছর আগে মহারাষ্ট্র থেকে দামোদর বর্ধমানে এসেছিল কোন পথে?” বিশু জানতে চাইল।

মনাদা জবাবে বললেন, “তখন জলপথে বঙ্গোপসাগরের উপকূল ধরে অন্ধ্র উপকূল, উড়িষ্যা হয়ে দেশিয় নৌকা বা পালতোলা জাহাজে চড়ে বাংলায় আসা যেত। আবার স্থলপথে মহারাষ্ট্র থেকে বেরার এবং খানদেশ হয়ে মধ্যভারত দিয়ে বাংলায় ঢোকা যেত। আওরঙ্গজেবের সময়ে মুঘল সৈন্যবাহিনী ওই পথই ব্যবহার করত। দামোদর বস্ত্রবণিকদের সঙ্গে উটের পিঠে চেপে এই স্থলপথেই বাংলায় এসেছিল।

১৬৯৬ সালের আগস্টে ঘোর বর্ষার মধ্যে ওই বণিকদল দামোদরকে হুগলিতে ছেড়ে দেয়। সেখানে তখন শোভা সিংহের সৈন্যরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যাইহোক, দামোদর ওখান থেকে বর্ধমানে পৌঁছয় নৌকায় চেপে। তার সঙ্গে ছিল কেবল একটা ছোট্ট থলি। তাতে ছিল মাত্র দুজোড়া জামা-কাপড়, একটা চাদর, সামান্য কটা টাকা, আর কিছু শুকনো খাবার। আর তার কোমরে গোঁজা ছিল সেই ছোরাটা যেটা দিয়ে সে মহারাষ্ট্রের জঙ্গলে বাঘ মেরেছিল।”  

“তা ওইদিন তাহলে রাজবাড়ির বিষ্ণুমন্দিরে পুজো দিল দামোদর?” গৌতম জানতে চাইল।

“সেই পুজো দিতে গিয়েই তো বিপত্তিটা ঘটল। আর তার জেরেই নিজের প্রাণটা খোয়াতে হল শোভা সিংহকে।”  

“কী বিপত্তি মনাদা?”

আমার প্রশ্নের জবাবে মনাদা বললেন, “দামোদর যখন বর্ধমানে পৌঁছল, তখন সেই এলাকা পুরোপুরি শোভা সিংহের সৈন্যদের দখলে। অনেক ঘরবাড়ি তারা লুটপাট করেছে। দোকানপত্র ভেঙে জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়েছে। তাই এলাকার লোক দারুণ আতঙ্কে। এসব ব্যাপার দামোদর অবশ্য কিছুই জানত না।

দামোদর নৌকা থেকে বর্ধমানে নেমেছিল একদম ভোরবেলায়। খেয়াঘাট থেকে রাজবাড়ি বেশি দূরে নয়। তাই খানিকক্ষণ হেঁটেই সে পৌঁছে গিয়েছিল রাজবাড়ির সামনে। পথে শোভা সিংহের অনেক সেনাই তাকে লক্ষ্য করেছে। কিন্তু ওর একমাথা উস্কখুস্ক চুল, মুখভর্তি দাড়িগোঁফ, ময়লা পোশাক দেখে ভবঘুরে ভেবে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করেনি, কেউ পথও আটকায়নি।

যাইহোক, রাজবাড়ির সামনে গিয়েই বিষ্ণু মন্দিরটা দামোদরের চোখে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে খুশিতে তার মন উদ্বেল হয়ে উঠল। সে হনহন করে হাঁটা লাগাল মন্দিরের দিকে। কিন্তু মন্দিরের সামনে পৌঁছনোর আগেই দুজন সিপাই শোভার পথ আটকালো। দামোদর তাদের বোঝানোর চেষ্টা করল যে সে কেবল ওখানে বিগ্রহ দর্শন করে পুজো দিতে চায়। কিন্তু শোভার সেনারা তার ভাষা বুঝতে পারল না। দাক্ষিণাত্যের ভাষা তাদের বোঝারও কথা নয়।

এদিকে দামোদরও নাছোড়বান্দা। সে ওই বিষ্ণুমন্দিরে পুজো দেবেই। একটা সময়ে চিৎকার জুড়ে দিল সে। তখন ওই সিপাই দুজন তাকে ধরে নিয়ে গেল পাশের একটা ছাউনিতে। সেখানে বেঁধে রাখল ওকে। দামোদর কিন্তু তখনও পুজো দেওয়ার আকুতি করেই যাচ্ছে।”  

“তারপর কী হল মনাদা?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

“তারপরেই তো ঘটল গণ্ডগোলটা। শোভা সিংহ তখন বর্ধমানেই ছিল। কিছুক্ষণ বাদে সে দলবল নিয়ে ঢুকল ওই ছাউনিতে। একটা ভিনদেশি ভবঘুরে সকাল থেকে মন্দিরে ঢোকার জন্য পীড়াপীড়ি, চেঁচামেচি করছে, এই খবর পেয়ে তার মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। সে এসে দাঁড়াল দামোদরের সামনে। দামোদর শোভাকে দেখে আবার হাউমাউ করে মন্দিরে পুজো দেওয়ার কথা বলতে লাগল। সৌভাগ্যবশত শোভার সঙ্গীদের একজন দামোদরের ভাষা জানত। সে সব কিছু বুঝিয়ে বলল শোভাকে। একটা লোক সেই দাক্ষিণাত্য থেকে ভীষণ কষ্ট করে দীর্ঘপথ পেরিয়ে এই বাংলায় এসেছে কেবল এখানকার মন্দিরের বিষ্ণুমূর্তিকে পুজো করবে বলে, একথা শুনেই শোভার হাসি পেয়ে গেল। উচ্চস্বরে হেসে উঠল সে। তারপর হঠাৎই হাসি থামিয়ে চোয়াল শক্ত করে সে দামোদরকে বলল, “এখানে এখন শোভা সিংহের শাসন। এখন আর বিষ্ণু পুজো হবে না। আমার কুলদেবতা মা বিশালাক্ষী। আগামী পূর্ণিমায় এখানে তাঁর বিগ্রহ স্থাপন করা হবে। পুজো করলে মা বিশালাক্ষীর পুজোই করতে হবে।”

একথা শুনে তো দামোদর রেগে খাপ্পা। সে বলল, “আমি বিশালাক্ষীর পুজো করব না, বিষ্ণুর পুজোই করব।”

এমন জবাব শুনে শোভা সিংহ রেগে লাল হয়ে গেল। এলাকার কেউ হলে হয়ত সে তখন তার মাথাটাই ধড় থেকে নামিয়ে দিত। শুধু ভিনদেশি ভবঘুরে বলে শোভা দামোদরের প্রাণ নিল না। তবে দুজন সিপাইকে আদেশ দিল ছেলেটাকে দশ ঘা চাবুক মেরে পিছনের জঙ্গলটায় ফেলে আসতে। আর যদি ওকে কখনও রাজবাড়ির আশেপাশে দেখা যায়, তাহলে তক্ষুনি ওর মুণ্ডচ্ছেদ করতে।

সিপাইরা সেই আদেশ অবশ্য অর্ধেক পালন করল। কারণ যে দুজনকে চাবুক মারার ভার দিয়েছিল শোভা সিংহ, তারা দুজনেই হিন্দু। ব্রাহ্মণ সন্তান দামোদরকে চাবুক মারতে তাদের হাত সরেনি। তবে ওরা দামোদরকে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে রাজবাড়ির পিছনের জঙ্গলটায় ফেলে এসেছিল ঠিকই। আর শাসিয়ে বলেছিল, ভুলেও যেন দামোদর আর রাজবাড়ির দিকে কখনও না আসে। তাহলে আর সে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবে না।

তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল গোটা বর্ধমান জুড়ে। দামোদর ভিজে জবজবে হয়ে গেল একেবারে। শরীরটা ভিজে গেলেও তার অন্তরে তখন কিন্তু দাউ দাউ আগুন।

খানিক পরে বৃষ্টি থামল। রাগে-খিদেয়-তেষ্টায় দামোদরের তখন যেন পাগল পাগল অবস্থা। ভিজে পোশাকেই কিছুক্ষণ ঐ জঙ্গলের মধ্যেই চুপচাপ বসে রইল সে। মনটা শান্ত করল। নিজের ঝোলাটা তখন আর তার সঙ্গে নেই। ছাউনিতেই পড়ে আছে। তবে কোমরে গোঁজা ছোরাটা রয়েই গেছে। আসলে ভবঘুরে ভেবে ছাউনির কেউ আর ওর দেহতল্লাশি করেনি। তাই বাঘ-মারা অস্ত্রটা বেহাত হয়নি। দামোদর হাতে নিল সেই ছোরাটা। সঙ্গে সঙ্গে মনে যেন একটা অদ্ভুত বল পেল। সে ছোরাটা আবার কোমরে গুঁজে, ভিজে জামাটা গা থেকে খুলে কোমরে জড়িয়ে বেরিয়ে এল জঙ্গল থেকে। ইতিমধ্যে সে অবশ্য নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মনে মনে ছকে নিয়েছে।”  

“কী পরিকল্পনা মনাদা?” গৌতম জানতে চাইল।

মনাদা এই প্রশ্ন শুনে গৌতমের দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন ভূগোলের ক্লাসে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে ফেলেছে সে। গৌতম বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মলয় এই সময়ে সিচুয়েশনটা দারুণভাবে ম্যানেজ করল। বলল, “ধৈর্য ধর গৌতম, দামোদরের পরিকল্পনার কথা মনাদা সময় হলেই বলবেন।”   তারপর মনাদার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি চালিয়ে যান মনাদা। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে দামোদর কী করল?”

মনাদা আর নিজের দর বাড়ানোর চেষ্টা করলেন না। বলতে শুরু করলেন, “জঙ্গল থেকে বেরিয়ে দামোদর হাঁটা দিল রাজবাড়ির উল্টো দিকের রাস্তায়। পায়ে চলা সরু মাটির রাস্তা। বৃষ্টির জন্য কাদা হয়ে আছে। কিছুক্ষণ সেই রাস্তা ধরে এগনোর পরেই একটা বড়োসড় মাটির বাড়ি চোখে পড়ল দামোদরের। তার পিছনে আরও কটা ছোটো ছোটো মাটির ঘর। দামোদর দেখল সামনের বড়ো বাড়িটার উঠোনে একটা ছোট্ট মাটির মন্দির।

ইতিমধ্যেই সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়েছে, আকাশেও বোঝাই মেঘ। ফলে বিকেল শেষ না হলেও আলো কমে গেছে অনেকটাই। সেই আবছা আলোয় একটা বিশাল বটগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে এবার ওই বাড়িটার দিকে নজর রাখতে লাগল দামোদর। একটু বাদেই সন্ধ্যা নেমে এল। অন্ধকারে ছেয়ে গেল চারপাশ। দামোদর দেখল ওই বাড়ির দরজা খুলে একজন বয়স্ক মানুষ প্রদীপ হাতে বেরিয়ে এলেন।

উনিই বাড়ির মালিক অভয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্য। পেশায় পুরোহিত। তিনি বাড়ির উঠোনের ওই ছোট্ট মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে মন্ত্রপাঠ করে দেবতার আরতি করতে লাগলেন। তারপর প্রদীপটা মন্দিরের সামনে রেখে আবার ভিতরে ঢুকে গেলেন। দামোদর আর অপেক্ষা করল না। এগিয়ে গেল বাড়িটার দিকে। মন্ত্রপাঠ শুনেই দামোদর বুঝে গেছে ওই বাড়ির মালিক ব্রাহ্মণ এবং দেবভক্ত। সুতরাং এখানেই আপাতত তাকে আশ্রয়ের বন্দোবস্ত করতে হবে। তারপর সুযোগ বুঝে পরের ব্যবস্থা।

দামোদর ওই ছোট্ট মন্দিরটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভিতরে দেখল একটা রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। সে এবার বসে পড়ল মন্দিরের সামনে। মূর্তির সামনে একটা ছোট্ট পিতলের পাত্রের মধ্যে সিঁদুর গুলে রাখা ছিল। সেটা থেকে একটু সিঁদুর নিয়ে নিজের কপালে একটা বড়ো করে তিলক কেটে নিল দামোদর। তারপর চিৎকার করে মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগল। নিজের গ্রামের মন্দিরে বিষ্ণুপুজোর সময় যে মন্ত্রপাঠ সে করে, সেই মন্ত্র।

দামোদরের কণ্ঠস্বর বাড়ির ভিতরে ঢুকতে বেশি সময় লাগল না। একটু বাদেই দরজা খুলে প্রবীণ অভয়কৃষ্ণ বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে ওঁর বয়স্কা স্ত্রী ক্ষীরোদাসুন্দরী। দরজা খোলার শব্দ দামোদরের কানে ঠিকই পৌঁছেছিল। কিন্তু সে পিছন ফিরে তাকাল না। এক মনে মন্ত্রোচ্চারণ করে যেতে লাগল। তারপর প্রদীপটা হাতে তুলে আরতি করল রাধাকৃষ্ণের। এদিকে ভর সন্ধ্যাবেলা এক ভিনদেশি পূজারীকে নিজের বাড়ির মন্দিরে পুজো করতে দেখে ঐ ব্রাহ্মণ দম্পতি দামোদরের দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। আরতি শেষ করে দামোদর পিছন ফিরে চাইল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত জড়ো করে নমস্কার জানাল অভয়কৃষ্ণ আর ক্ষীরোদাসুন্দরীকে।

অভয়কৃষ্ণ এবার প্রতি নমস্কার জানিয়ে দামোদরের পরিচয় জানতে চাইলেন। দামোদর ভদ্রলোকের ভাষা বুঝতে পারল না ঠিকই, কিন্তু তিনি কী জানতে চাইছেন, সেটা বুঝতে ওর বিশেষ অসুবিধা হল না। দামোদর তাই আকারে ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করল যে সে অনেক দূর থেকে এখানে এসেছে এবং সে দারুণ ক্ষুধার্ত। রাত্তিরে এবাড়িতে সে একটু আশ্রয় চায়।

সৌভাগ্যক্রমে দামোদর কী বলতে চাইছে তা ওঁরা দু’জনেই বুঝতে পারলেন এবং দামোদরের অনুরোধে সাড়াও দিলেন। ওঁরা বেশ সমাদর করেই দামোদরকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলেন। একজোড়া নতুন ধুতি দিলেন পরার জন্য। তারপর ওকে যত্ন করে বসিয়ে দই-চিঁড়ে-কলা খেতে দিলেন। একটা খালি ঘরে বিছানা পেতে ওর থাকার বন্দোবস্তও করলেন। তাতে একটা নতুন জায়গায় প্রাথমিকভাবে দামোদরের যে চাহিদাগুলো ছিল, সেগুলো সবই মিটে গেল। এবার একরাশ ক্লান্তি ঘিরে ধরল ওকে। শরীর আর বইছে না। তাই দামোদর বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখে ঘুম এল না। মাথায় অনেকরকম ভাবনা ঘুরপাক খেতে লাগল।

আসলে দামোদর ওখানে পা দিয়েই বুঝতে পেরেছে, এবাড়ির লোকজন খুব সহানুভূতিশীল। প্রয়োজনে আরও কয়েকটা দিন সে ওখানে নিরুপদ্রবে কাটাতে পারবে। আর এবাড়ির লোকেদের সাহায্য পেলে সে নিজের পরিকল্পনাটাও বাস্তবায়িত করতে পারবে। কিন্তু ওখানে সমস্যা একটাই। ভাষা-সমস্যা। খিদে পেয়েছে, আশ্রয় চাই—এসব কথা আকারে-ইঙ্গিতে তবু বোঝানো যায়, কিন্তু সে মনে মনে যে ছক কষেছে, সেটা সফল করতে গেলে এভাবে ইশারায় কিছু হবে না। সে ঠিক কী চাইছে, সেটা ভাষাতেই বোঝাতে হবে। কিন্তু এবাড়িতে তার ভাষা বোঝে এমন লোক কোথায়? এসব ভাবতে ভাবতেই একটা সময় দামোদরের দুচোখে ঘুম নেমে এল। আর সেই ঘুমের মধ্যেই তার সমস্যার সমাধানও হয়ে গেল।”  

কথাটা শেষ করেই মনাদা বললেন, “গলাটা শুকিয়ে গেছে বুঝলে। একটু… “

ওঁর কথা শেষ হল না। মলয় বেশ রাগের সুরে হোটেলের হেডকুক বিমলদার উদ্দেশে বলল, “কী গো বিমলদা! আধঘণ্টা আগে তো বললাম, ছ’টা অমলেট আর ছ’ কাপ চা পাঠাও। তোমার তো কোনও হেলদোলই নেই দেখছি!”

বিমলদা ভিতর থেকে চিৎকার করে জবাব দিল, “হাত খালি ছিল না। ডিম ভাজা হয়ে গেছে। চায়ের জলও বসিয়ে দিয়েছি।”  

আমি বললাম, “চা-ডিমভাজা এক্ষুনি এসে যাবে মনাদা। আপনি গল্পটা চালিয়ে যান। ঘুমের মধ্যে দামোদরের সমস্যার সমাধান হল কী করে?”

মনাদা চুপ। এমন নির্বিকার রইলেন যেন আমার প্রশ্নটা শুনতেই পাননি। একটু বাদেই হোটেলের আরেক কর্মচারী গোপাল অমলেট-চা নিয়ে হাজির হল। মনাদা ও দুটো দ্রুত শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে তবে মুখ খুললেন। আমারই দিকে তাকিয়ে বললেন, “পরের দিন ঘুম থেকে উঠে দামোদর ওবাড়িতে বছর পঁয়তাল্লিশের এক নতুন মানুষকে দেখতে পেল। সে অভয়কৃষ্ণের ছেলে অজয়কৃষ্ণ। বছর কুড়ি আগে হুগলিতে বাংলার দেওয়ানের অধীনে রাজস্ব বিভাগের কর্মী ছিল সে। খুব নিষ্ঠাভরে কাজ করত। তাই সবাই ওকে খুব ভালোবাসত। অজয়কৃষ্ণ বিয়ে করেছিল ওখানকারই এক পাঠশালার পণ্ডিতের মেয়েকে। বিয়ের পর এক বছর খুব সুখেই দিন কাটিয়েছিল ওরা। কিন্তু সন্তানের জন্ম দেওয়ার সময় অজয়ের বৌ-বাচ্চা দুজনেই মারা গিয়েছিল। তাতেই শোকে একেবারে পাগল হয়ে গিয়েছিল সে। চাকরি ছেড়ে নিজের বাড়ি বর্ধমানে চলে এসেছিল। ঘর থেকে বেরই হত না।

এই সময় দেওয়ান সাহেব একদিন অজয়কৃষ্ণকে লোক পাঠিয়ে হুগলিতে ডেকে আনেন। আবার কাজে যোগ দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু অজয় আর ওখানে কাজ করতে রাজি হয়নি। সে বলেছিল, ওখানে থাকলেই সহধর্মিণীর স্মৃতি তাকে তাড়া করে বেড়াবে। তাই সে হুগলিতে আর কাজ করতে চায় না। তখন একরকম বাধ্য হয়েই দেওয়ান সাহেব দাক্ষিণাত্যে ওর একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, সেই রাজস্ব বিভাগেই।

কদিন পরেই অজয়কৃষ্ণ মহারাষ্ট্রে চলে যায়। আর বিয়ে-থা করেনি। বছরে একবার করে বাড়িতে আসে, মা-বাবাকে দেখে যায়। নিয়মিত বাড়িতে টাকাও পাঠায়। এবারে তার সকালেই বাড়িতে ঢোকার কথা ছিল। কিন্তু শোভা সিংহের হুগলি-বর্ধমান দখলের পর গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভয়ে অনেকেই রাস্তায় বেরচ্ছে না। তাই পথে অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে। গতকাল রাত ন’টা নাগাদ সে খেয়াঘাট থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরেছে। ততক্ষণে তো দামোদর ঘুমিয়ে পড়েছিল।”  

মলয় বলল, “এইবারে বুঝলাম। বিশ বছর মহারাষ্ট্রে চাকরি করার সুবাদে অজয়কৃষ্ণ ওখানকার ভাষা ভালোই বুঝত। তাই দামোদর নিজের বক্তব্য তাকে সহজেই বোঝাতে পেরেছিল।”  

“ঠিক তাই। অজয়কৃষ্ণকে পেয়ে দামোদর ওদের সব কথা খুলে বলল। শোভা সিংহ এবং তার লোকেরা যে ওকে বিষ্ণুমন্দিরে পুজো দিতে দেয়নি সে কথাও গোপন করল না। এবার সে অনুরোধ করল, তাকে কোনওভাবে ওই রাজবাড়িতে ঢুকিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে। তারপর সে সুযোগ বুঝে ওই মন্দিরে পুজো নিজেই দেবে।

এই কথা শুনে বৃদ্ধ অভয়কৃষ্ণ বললেন, ‘শোভা সিংহ সামনের পূর্ণিমা তিথিতে ঘটা করে মা বিশালাক্ষীর পুজো করবে। সেই জন্য বর্ধমানের আটজন ব্রাহ্মণকে সামনের বৃহস্পতিবার রাজবাড়িতে যেতে আদেশ করেছে। আমি সেদিন তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেই পারি। কিন্তু ওরা তো তোমাকে চিনে ফেলবে। তখন দুজনেই বিপদে পড়ব। দুজনেরই হয়ত গর্দান নিয়ে নেবে।’

দামোদর সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, আমি যদি চুল-দাড়ি-গোঁফ সব কামিয়ে ফেলি, আর কপালে তিলক কেটে নিই, তাহলে কেউ আমাকে চিনতেই পারবে না। আপনি আমাকে নিজের ভাগ্না পরিচয় দেবেন, বলবেন আমাকে পুজোর কাজে সাহায্য করার জন্য নিয়ে এসেছেন।’

একথা শুনে অভয়কৃষ্ণ দামোদরকে বললেন, ‘কিন্তু তোমার কথা শুনলেই তো ওরা বুঝতে পেরে যাবে যে তুমি ভিনদেশি। ভিনদেশি ভাগ্না হবে কী করে?’

দামোদর এবার অজয়কৃষ্ণকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘আমি তো ওখানে কোনও কথাই বলব না। বোবা সেজে থাকব। আপনি বলবেন ছোটোবেলায় একটা অসুখের পর আমার বাকশক্তি চলে গেছে। বোবা বলে কেউ কাজেও নেয় না। তাই আপনি নিজের কাছে এনে রেখেছেন। পুজোর কাজ শেখাচ্ছেন।’

শোভা সিংহ বর্ধমান অধিকার করার পর এই কয়েক মাসে গোটা এলাকায় কী ধরনের অত্যাচার করেছে, বৃদ্ধ অভয়কৃষ্ণ তা নিজের চোখে দেখেছেন। শুনেছেন নিজেদের সম্মান বাঁচাতে বর্ধমান রাজবাড়ির মহিলাদের আত্মহত্যার কাহিনিও। রাজকুমারী এখনও রাজবাড়িতে বন্দি। শোভা সিংহ নাকি বিশালাক্ষী মন্দির প্রতিষ্ঠার পরেই ওকে জোর করে বিয়ে করবে। এমন একটা লোক যদি জানতে পারে যে অভয়কৃষ্ণ ভিনদেশি দামোদরকে পরিচয় ভাঁড়িয়ে রাজবাড়িতে নিয়ে গেছেন, তাহলে আর দেখতে হবে না। নির্ঘাত দামোদরের সঙ্গে তাঁরও মুণ্ডচ্ছেদ করবে। তাই উনি দামোদরকে ভাগ্না সাজিয়ে রাজবাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন। তবে শুধু বৃদ্ধ অভয়কৃষ্ণ কেন, অমন পরিস্থিতিতে পড়লে অন্য যে কেউ ঐ একই সিদ্ধান্ত নিতেন।

এদিকে অভয়কৃষ্ণ তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় দামোদর স্বাভাবিকভাবেই খুব ভেঙে পড়ল। ওর চোখে জল চলে এল। এই দৃশ্য ভট্টাচার্য বাড়ির তিনজনকেই বেশ সেন্টিমেন্টাল করে তুলল। অজয়কৃষ্ণ বাবাকে বলল, ‘বাবা, একবার দামোদরের চুল-দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে দেখা হোক। আমার মনে হয় ও ঠিকই বলছে। সব কামিয়ে ফেললে ওর মুখ একদম বদলে যাবে। তখন ওকে সত্যিই আর চেনা যাবে না।’ ক্ষিরোদাসুন্দরীও ছেলের প্রস্তাবে সায় দিলেন। আসলে প্রথম দেখাতেই তাঁর দামোদরের ওপর একটা মায়া পড়ে গেছে। কারণ ওর মুখের গড়নটা ছিল অনেকটা নিজের অকালপ্রয়াত ছোটো ভাইয়ের মতো।

এই অবস্থায় অভয়কৃষ্ণ আর কী করেন, মেনে নিলেন ছেলের প্রস্তাব। এরপর একটা ক্ষুর দিয়ে দামোদরের চুল-দাড়ি-গোঁফ সব কেটে ফেলা হল। তাতে দেখা গেল দামোদরের কথাই ঠিক। তাকে সত্যিই আর একদম চেনা যাচ্ছে না। এক্কেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেছে সে।

এবার অভয়কৃষ্ণ মনে খানিক সাহস পেলেন। উনি দামোদরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ধরো তোমার কথা মতো আমি নিজের ভাগ্না সাজিয়ে তোমাকে আগামী বৃহস্পতিবার রাজবাড়িতে নিয়ে গেলাম। তারপর শনিবার পুজোর দিনও ধরো তুমি আমার সঙ্গে থাকলে। তাতে তোমার লাভটা কী হবে? বিষ্ণুমন্দিরের সামনে নিশ্চয়ই পাহারা আছে। ওখানে তো তোমাকে ঢুকতেই দেবে না। তাহলে তুমি পুজোটা দেবে কী করে?’

দামোদর জবাবে বলল, ‘দেখুন, সেই সুদূর দাক্ষিণাত্য থেকে কষ্ট করে আমি এখানে এসেছি কেবলমাত্র ওই মন্দিরে পুজো দেব বলে। আর একটা শয়তান লোকের জন্য সেটা করতে পারব না, সেটা হতে পারে না। আমি বিশ্বাস করি, স্বয়ং বিষ্ণু আমার সহায় হবেন। তিনিই আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। আমি আপনার সঙ্গে একবার রাজবাড়িতে ঢুকতে পারলে, ওই মন্দিরে পুজো দেওয়ার ঠিক একটা ব্যবস্থা করে ফেলতে পারব। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, ওখানে গিয়ে কোনও হটকারী কাজ আমি করব না। আমি শ্রীবিষ্ণুর দিব্যি খেয়ে বলছি, আমার জন্য আপনাদের কোনও বিপদে পড়তে হবে না।’

একথা শোনার পর অভয়কৃষ্ণ আর কথা বাড়ালেন না। দামোদরকে ভাগ্না পরিচয়ে রাজবাড়িতে নিয়ে যেতে রাজি হয়ে গেলেন। ক্ষিরোদাসুন্দরীকে দামোদরের জন্য নতুন ধুতি আর নামাবলী বের করে দিতে বললেন। দামোদর তো তখন দারুণ খুশি। ও এবার অজয়কৃষ্ণকে বলল, ‘বৃহস্পতিবার আমাদের সঙ্গে আপনিও চলুন না রাজবাড়িতে।’

অজয়কৃষ্ণ এই আবদার শুনে অবাক হয়ে গেল। বলল, ‘আমি তোমাদের সঙ্গে যেতে যাব কেন? আমি তো আর বাবাকে পুজোয় কোনও সাহায্য করতে পারব না। আমি পুজোর মন্ত্রতন্ত্র, নিয়ম-কানুন কিছুই জানি না। ওসব আমার ভালোও লাগে না।’

একথা শুনে দামোদর বলল, ‘আপনি গেলে আমার একটু সুবিধা হয়।’

‘কীরকম সুবিধা?’ অজয়কৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করল।

দামোদর জবাবে বলল, ‘আসলে শনিবারের বিশালাক্ষী পুজো নিয়ে ওখানে যা কথা হবে, আমি তার কিছুই বুঝতে পারব না। আপনি গেলে ব্যাপারটা আমি ওখানেই শুনে নিতে পারব। তাতে আমার চটজলদি সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।’

কেন জানি, দামোদরকে অজয়কৃষ্ণের খুব ভালো লেগে গিয়েছিল। তাই দামোদরের ওই অনুরোধ সে ফেলতে পারল না। বলল, সেও রাজবাড়ি যাবে। তবে শোভা সিংহের লোকজন যদি কোনও আপত্তি তোলে, তাহলে কিন্তু এক মুহূর্তও আর ওখানে থাকবে না, তক্ষুনি বাড়ি ফিরে আসবে৷”

এই অব্দি বলে মনাদা খানিকটা জল খেলেন। বললেন, “কী ব্যাপার বল দেখি। আজ বার বার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে কেন?”

বিশু বলল, “গ্যাস-অম্বল হলে অনেক সময় এমন হয়। আধঘণ্টা বাদে বিমলকে ফিশ ফ্রাই দিতে বলেছি। ওটা কি তাহলে বারণ করে দেব?”

একথা শুনে মনাদা বেশ আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। বললেন, “না না, আমার শরীর ঠিকই আছে, গ্যাস-অম্বল কিছুই হয়নি।”  

এমনি সময়ে একবার গল্পে বিরতি দিলে মনাদাকে আবার গল্প শুরু করার জন্য তাগাদা দিতে হয়। এবার কিন্তু আর সেটা করতে হল না। মনাদা বলতে শুরু করলেন, “এরপর দিনপাঁচেক ভটচাযবাড়ির ভিতরেই চুপচাপ কাটিয়ে দিল দামোদর। একবারের জন্যও বাড়ির বাইরে পা রাখল না। তারপর এল বৃহস্পতিবার। সেদিন সকালে যথা সময়ে অভয়কৃষ্ণ ছেলে আর দামোদরকে নিয়ে হাজির হলেন বর্ধমান রাজবাড়িতে। গিয়ে একটু স্বস্তি পেলেন। বাকি যে সাতজন ব্রাহ্মণ পুরোহিত এসেছেন, তাঁরা সকলেই সঙ্গে করে ছেলে, ভাই, ভাইপো, পড়শি বা বন্ধু নিয়ে এসেছেন। এক বৃদ্ধ পুরোহিত তো আবার তাঁর তিন তরুণ নাতিকে সঙ্গে এনেছেন। আসলে শোভা সিংহকে সকলেই ভয় পাচ্ছে। লোকটাকে কেউ বিশ্বাস করে না। সে কখন কাকে গারদে পুরবে বা গর্দান নিয়ে নেবে কেউ জানে না। তাই সবাই মনে বল জোগাতে সঙ্গে করে কাউকে না কাউকে নিয়ে এসেছে।

“যাইহোক, শোভা সিংহ কিন্তু পুরোহিতদের সঙ্গে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করল। সে যা বলল, তার সারমর্ম এইরকম- সে চায় সামনের শনিবার পূর্ণিমা তিথিতে অত্যন্ত সমারোহের সঙ্গে মা বিশালাক্ষীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করতে। তাই পুজোর আয়োজনে যেন কোনও কার্পণ্য না থাকে। যাগযজ্ঞ করে মূর্তি প্রতিষ্ঠা হবে। ইতিমধ্যে একটা মাটির মন্দিরও নির্মাণ করা হয়েছে। হাতে মাত্র দুটো দিন। তাই পুরোহিতরা যেন সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলে পুজোর জোগাড়যন্ত্র এখনই শুরু করে দেয়। রাজবাড়িতেই তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। সঙ্গে লোক দিয়ে দেওয়া হবে। পুজোর সামগ্রী যা যা লাগবে, সেগুলো কিনতে বা জোগাড় করতে ওরা সাহায্য করবে।

“এইসব কথা বলতে বলতে শোভা সিংহ উপস্থিত পুরোহিত এবং তাঁদের সঙ্গী—সকলের দিকেই চোখ ঘোরাচ্ছিল। দামোদরের দিকেও একাধিকবার তার নজর গেছে। কিন্তু তার মনে কোনও সন্দেহ জাগেনি। এর থেকেই পরিষ্কার, শোভা সিংহ দামোদরকে চিনতে পারেনি। এতে অভয়কৃষ্ণ, তাঁর ছেলে এবং দামোদর তিনজনেই বেশ নিশ্চিন্ত হল।

“শোভার বক্তব্য চাপাস্বরে অজয়কৃষ্ণ দামোদরকে বুঝিয়ে দিল। সব শুনে দামোদরের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। টানা দুদিন-দুরাত এই রাজবাড়িতে থাকার সুযোগ মিলবে। এর থেকে ভালো ব্যাপার আর কী হতে পারে! সে মনে মনে নিজের আরাধ্য দেবতা বিষ্ণুকে প্রণাম জানাল। এসব ওঁরই কৃপা।

“এরপর উপস্থিত আটজন পুরোহিত নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে মা বিশালাক্ষীর পুজো ঠিক কীভাবে কোন পদ্ধতিতে হবে, এবং সেই পুজোর জন্য কী কী উপকরণ লাগবে তার তালিকা বানিয়ে ফেললেন। কে কোন কাজের দায়িত্ব নেবেন, সেটাও ঠিক করে নিলেন।

“রাজবাড়ির ভিতরের একটা ঘরে পুজোর বাসনপত্র এবং নানা সামগ্রী রাখা ছিল। অভয়কৃষ্ণের ওপর ভার পড়েছে সেগুলো লোক দিয়ে বের করে, ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে পুজোর জন্য রেডি করার। অনেকে আবার যজ্ঞের জন্য বেলকাঠ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস জোগাড় করতে বেরিয়ে গেলেন। অনেকে আবার বেরিয়ে পড়লেন পুজোর নানা উপচার কেনাকাটা করতে।

“নিজের দায়িত্ব পালন করতে এবার অভয়কৃষ্ণ দামোদরকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকলেন রাজবাড়ির ভিতর। একটা সিপাই ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল যে ঘরে পুজোর সামগ্রী রাখা আছে, তার সামনে। দরজা খুলে দিতেই দেখা গেল ভিতরে থরে থরে সাজানো পুজোর বাসনপত্র, পঞ্চপ্রদীপ, ধূপদান, শাঁখ আরও কত কি! অভয়কৃষ্ণ দামোদরকে দেখিয়ে দিলেন, কোন বাসনপত্রগুলো বের করতে হবে। দামোদর এবার সেগুলো এক এক করে নিয়ে পুকুরঘাটে রাখতে লাগল। পুকুরটা রাজবাড়ির ঠিক পিছনটায়। সিপাইটাও দামোদরের দেখাদেখি একটা পাথরের রেকাব তুলতে গেল। কিন্তু অভয়কৃষ্ণ তাকে থামিয়ে দিলেন। অব্রাহ্মণ সিপাইয়ের পুজোর তৈজসপত্র স্পর্শ করা তিনি সঙ্গত মনে করলেন না।

“এদিকে আবার অভয়কৃষ্ণ নিজে যখন একটা রেকাব তুলতে গেলেন, দামোদর ওঁকে হাত ধরে নিরস্ত করল। বৃদ্ধ অভয়কৃষ্ণকে সে আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল, সে একাই সবকিছু বয়ে নিয়ে যাবে এবং ধোয়াধুয়ি করবে। সিপাইটা দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখল। সে বুঝে গেল দামোদর বোবা। পাশাপাশি এও বুঝল, ছেলেটা খুবই কর্তব্যপরায়ণ, তাই বুড়ো মামাকে কায়িক পরিশ্রম করতে দেবে না, একাই সব কাজ করবে।”  

এই পর্যন্ত বলার পর মনাদা আবার থামলেন। ওঁর নজর এবার হোটেলের কিচেনের দিকে। মলয় ব্যাপারটা বুঝে ফেলল। জোরে হাঁক পাড়ল বিমলদার উদ্দেশ্যে, “কী গো, ফিশ ফ্রাই দেবে না আমাদের?”

রান্নাঘরের ভিতর থেকে আওয়াজ ভেসে এল, “তোমরা তো আধঘণ্টা বাদে দিতে বললে। এই হাতের কাজটা সেরেই ভাজা শুরু করছি।”  

বিশু তাকাল মনাদার দিকে। বুঝতে পারছে না, মনাদা ফিশ ফ্রাই গলাধঃকরণ না করা অব্দি গল্প শুরু করবেন কিনা। মনাদা বোধহয় সেটা বুঝতে পারলেন। উনি আর আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিলেন না। আবার গল্প শুরু করলেন, “সেদিন বিকালের আলো থাকা পর্যন্ত দামোদর একাই প্রায় সব পুজোর বাসন পুকুর ঘাটে নিয়ে নারকেল ছোবড়া-ছাই দিয়ে মেজে ঝকঝকে করে ফেলল। তারপর সেগুলোকে এনে গুছিয়ে রাখল রাজবাড়ির ভিতরের ঠাকুর দালানে। প্রথম কিছুক্ষণ সিপাইটা দামোদরকে নজরে রাখছিল। কিন্তু দামোদর এক মনে নিজের কাজ করে যাচ্ছে দেখে সে একটা সময়ে চলে গেল বাইরে।

দামোদর নিবিষ্ট মনে নিজের কাজ করে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু তার চোখ ঘুরছিল রাজবাড়ির সব দিকে। ইতিমধ্যে রাজবাড়ির দোতলায় সে কয়েকজন কমবয়সী মহিলাকে উদ্বিগ্ন মুখে চলাফেরা করতে দেখেছে। ওরা সবাই রাজকুমারীর পরিচারিকা।

আসলে শোভা সিংহ যেদিন এই বর্ধমান রাজবাড়ির দখল নিয়েছিল, সেদিন রাজপরিবারের বেশ কয়েকজন মহিলা সদস্যা নিজেদের সম্ভ্রম বাঁচাতে আত্মহত্যা করলেও রাজকুমারী তেমনটা করেনি। হয়ত সুযোগ পায়নি। এখন শোভা সিংহ তাকে রাজবাড়ির দোতলার একটা ঘরে গৃহবন্দি করে রেখেছে। কয়েকজন খাস পরিচারিকা তাকে দেখাশোনা করে। দামোদর তাদেরই দেখেছে। শনিবার বিশালাক্ষীর পুজো দিয়েই শোভা সিংহ রাজকুমারী সত্যবতীকে জোর করে নিজের রানি বানাবে- এই ব্যাপারটা ঐ পরিচারিকারাও মন থেকে মেনে নিতে পারছিল না। কারণ রাজকুমারী ছিল ওদের খুব প্রিয়। তাই ওদের চোখেমুখে ছিল উদ্বেগের ছায়া।”  

“রাজকুমারী এই বিয়েতে রাজি ছিল না নিশ্চয়ই। সে ওই কদিনে কোনও প্রতিরোধের চেষ্টা করেনি?” আমি এবার জানতে চাইলাম।

মনাদা বললেন, “না। সে রাজবাড়িতে বন্দিনী হওয়ার পর না করেছিল আত্মহত্যার চেষ্টা, না করেছিল কোনওরকম প্রতিবাদ। সে বোধহয় মনে মনে প্রতিশোধের পরিকল্পনা করেছিল, তাই চুপচাপ সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিল।”  

“তারপর কী হল?” মলয় জিজ্ঞাসা করল।

“সেদিন বিকালেই দেখা গেল পুজোর জোগাড়যন্ত্র অনেকটা এগিয়ে গেছে। তা দেখে তো শোভা সিংহ খুব খুশি। এই সময়ে অভয়কৃষ্ণের মতো কয়েকজন বৃদ্ধ পুরোহিত শোভার কাছে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। বললেন, পরদিন সকালেই আবার রাজবাড়িতে চলে আসবেন, পুজোর প্রস্তুতি তাদারকি করতে। শোভা ওঁদের আবেদন মেনে নিলেন। তখন অজয়কৃষ্ণ দামোদরকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বাড়ি ফেরার কথা বলল। দামোদর কিন্তু ফিরে যেতে রাজি হল না। সে বলল, চারজন পুরোহিত এবং তাঁদের সঙ্গীরা থেকে যাচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে সেও রাজবাড়িতেই থেকে যাবে।

“একথা শুনে অজয়কৃষ্ণ বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। ভাবল, আজ রাতেই বুঝি দামোদর চুপিসারে বিষ্ণুমন্দিরে ঢুকে পুজো দেওয়ার ছক কষেছে। সেই মন্দিরের সামনে সর্বক্ষণ পাহারা দিচ্ছে দুজন সিপাই। রাতেও পাহারা থাকবে। দামোদর নির্ঘাত ধরা পড়ে যাবে। আর ধরা একবার পড়লে এদের কেউ না কেউ তাকে চিনেও ফেলবে। তখন তার বাবার দুর্দশার শেষ থাকবে না। একটা ভিনদেশিকে নিজের ভাগ্না সাজিয়ে আনার অপরাধে বাবার মৃত্যুদণ্ড অনিবার্য।

“এই ভাবনা দামোদরকে জানাতেই সে দুটো হাত ধরে অজয়কৃষ্ণকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘আপনাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আপনারা অচেনা অপরিচিত হওয়া সত্ত্বেও আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন, এই রাজবাড়িতে ঢোকার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি, আপনাদের কোনও বিপদে আমি ফেলব না। আপনি বাবাকে নিয়ে নিশ্চিন্তে বাড়ি চলে যান। কাল সকালে আবার দেখা হবে।’

“তারপরেই নীচুস্বরে দামোদর অজয়কৃষ্ণের কাছে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, যে রাজকুমারী এখানে বন্দি আছে, শোভা সিংহ কি তাকে জোর করে বিয়ে করতে চায়? কিছু শুনেছেন আপনি? রাজবাড়ির ভিতরে এই নিয়ে অনেক গুঞ্জন হচ্ছে। কিন্তু ভাষাটা বুঝি না বলে আমি ঠিক নিশ্চিত হতে পারছি না।’

“অজয়কৃষ্ণও এখানে সকাল থেকে অনেক কথাই শুনেছে। সে দামোদরকে জানিয়ে দিল, তার অনুমানই সত্যি। শুধু ওই বিশালাক্ষী পুজোর জন্যই শোভা সিংহ অপেক্ষা করছে। শনিবার বিকেলের মধ্যেই পুজোর কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। আর সেদিন রাতেই সে জোর খাটিয়ে রাজকুমারীকে বিয়ে করবে।

“একথা শুনে দামোদর মনে মনে কী যেন ভাবতে লাগল। সন্ধ্যা নেমে গিয়েছিল। তাই অজয়কৃষ্ণ আর অপেক্ষা করল না। বৃদ্ধ বাবাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।

“পরদিন সকালে ওঁরা দুজনে যখন আবার রাজবাড়ি পৌঁছলেন, দেখলেন দামোদর নবনির্মিত বিশালাক্ষী মন্দির পরিমার্জনার কাজ তদারকি করছে।”  

“মন্দির পরিমার্জনা মানে?” গৌতম জানতে চাইল।

মনাদা জবাব দিলেন, “মানে আর কি! রাজবাড়ির দুজন পরিচারিকা মাথায় ঘোমটা টেনে মন্দিরের দেওয়াল ও মেঝেতে গোবর-মাটি নিকোচ্ছে, আর দামোদর ইশারায় তাদের ইন্সট্রাকশন দিচ্ছে। আশেপাশে কোনও সিপাই-পেয়াদা নেই। ওই দুজন পরিচারিকার একজনের নাম জানকি, আরেকজন লক্ষ্মী।

“এবার আরও অবাক হওয়ার পালা। বিশালাক্ষী মন্দিরের কাজ শেষ করিয়ে ওই পরিচারিকা দুজনকে দামোদর নিয়ে এল বিষ্ণু মন্দিরের সামনে। ওই মন্দির পাহারায় থাকা সিপাইটা দরজার সামনে থেকে সরে গেল। লক্ষ্মী আর জানকি এবার বিষ্ণুমন্দিরের ভিতরটাও জল দিয়ে ধোয়ামোছা করল। দামোদর কিন্তু ভিতরে ঢুকল না। কেবল এক মনে চেয়ে রইল বিগ্রহটার দিকে। পরিচারিকা দুজন কাজ শেষ করে বেরিয়ে এলে তাদের নিয়ে দামোদর সোজা চলে গেল রাজবাড়ির ভিতরে।

“এই দৃশ্য দেখে খানিক অবাকই হয়ে গেলেন অভয়কৃষ্ণ ও অজয়কৃষ্ণ। এক রাতের মধ্যেই ভিনদেশি ছেলেটা রাজবাড়িতে অদ্ভুত প্রভাব খাটিয়ে ফেলেছে। শোভা সিংহের লোকজন তাকে এখন নিজেদের লোকই ভাবছে। ছেলেটার এলেম আছে বলতে হবে। ওঁরা দুজন ভেবে পেলেন না, একটাও কথা না বলে, এখানকার ভাষা না বুঝে দামোদর এক রাতের মধ্যে শোভা সিংহের লোকেদের থেকে এই আস্থা অর্জন করল কীভাবে!

“যাইহোক, অভয়কৃষ্ণ এবার রাজবাড়ির ভিতরে গেলেন। দেখলেন ঠাকুর পুজোর সমস্ত বাসনপত্র ধুয়ে, গুছিয়ে দামোদর রেখে দিয়েছে ঠাকুর দালানে। কিন্তু আশেপাশে কোথাও তার পাত্তা নেই।

“ইতিমধ্যে বাকি পুরোহিতরা সবাই হাজির হয়েছেন। অভয়কৃষ্ণ তাঁদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলেন, আগামীকাল পুজোর সব জোগাড়যন্ত্রই প্রায় সম্পূর্ণ। শেষ মুহূর্তের কয়েকটা কাজ মাত্র বাকি। তার মধ্যে একটা কাজ হল মন্দির প্রাঙ্গণে এবং রাজবাড়ির ঠাকুর দালানে আলপনা দেওয়া। আজ বিকাল থেকে সেই কাজ শুরু করা হবে।

“ইতিমধ্যে দামোদর কখন যেন চুপচাপ অজয়কৃষ্ণের পিছনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে চাপাস্বরে অজয়কৃষ্ণকে বলল, ‘আলপনা দেওয়ার কথা হচ্ছে, তাই না? আপনি বাবাকে বলুন, আমার নামটা প্রস্তাব করতে। আমি আলপনা ভালোই দিতে পারি।’

“অজয়কৃষ্ণ সঙ্গে সঙ্গে অভয়কৃষ্ণকে বলল, ‘বাবা, আমাদের দামোদর তো খুব ভালো আলপনা দিতে পারে। তাহলে বিকাল থেকে আলপনা দেওয়ার কাজটা কয়েকজনকে নিয়ে ও-ই করবেখন।’

“অভয়কৃষ্ণ একথার কোনও জবাব না দিয়ে প্রথমে ফ্যালফ্যাল করে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘সেই ভালো, সেই ভালো।’ বাকিরাও কেউ এই প্রস্তাবে না করলেন না। দামোদরের মুখে হাসি ফুটল। ও এবার চলে গেল ওই জায়গা ছেড়ে। অজয়কৃষ্ণ দেখল, রাজবাড়ির একটা লোককে গিয়ে আকারে-ইঙ্গিতে দামোদর কী যেন বোঝানোর চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আলপনা দেবার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। দেখা গেল ইয়া ব্বড়ো দুটো শিল-নোড়া নিয়ে সেই লক্ষ্মী আর জানকি চাল বাটতে শুরু করে দিয়েছে।

“যাইহোক, সেদিনের কথা আর বিশেষ কিছু বলার নেই। অভয়কৃষ্ণ এবং অজয়কৃষ্ণ সেদিন বিকালবেলায় যথারীতি বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। দামোদর ওখানেই থেকে গিয়েছিল আলপনা দেওয়ার জন্য।”  

“এই যে তোমাদের ফিশ ফ্রাই। খেয়ে বলো কেমন হয়েছে! আমি একটু বাদেই চা পাঠিয়ে দিচ্ছি।”   এই বলে বিমলদা রান্নাঘরে চলে গেল।

ফিশ ফ্রাই-চা পর্ব শেষ হতে মিনিট পনেরো লাগল। তারপর মনাদা একটা সিগারেট ধরিয়ে সুখটান দিতে শুরু করলেন। আমাদের তো আর তর সইছে না। বিশু বলল, “পুজোর দিন কী হল মনাদা?”

মনাদা এবার আর আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিলেন না। বলতে শুরু করলেন, “পরদিন সকাল আটটা থেকে মহা সমারোহে মা বিশালাক্ষীর পুজো শুরু হয়ে গেল। এলাকার প্রচুর মানুষ এল পুজো দেখতে। কাঁসর-ঘণ্টা আর শাঁখের শব্দে সরগরম হয়ে উঠল রাজবাড়ি চত্বর। শোভা সিংহ গৈরিক বস্ত্র পরে কপালে লাল তিলক কেটে পুজোয় বসেছে। আটজন পুরোহিত এক সঙ্গে পুজোর কাজ করে চলেছেন, তাঁদের সম্মিলিত মন্ত্রপাঠে গমগম করছে চারদিক। সিপাইরা প্রায় সবাই তখন পূজাস্থলে। এমন পুজোর আয়োজন তারা আগে কখনও দেখেনি।

“দামোদরও দারুণ ব্যস্ত। রাজবাড়ির ভিতরে ভোগ রান্নার মূল দায়িত্ব তার কাঁধে। বিশাল বিশাল পাঁচটা হাঁড়িতে খিচুড়ি রান্না শুরু হয়েছে। সেখানেও দেখা গেল সেই লক্ষ্মী ও জানকিকে বাটনা বাটা, সবজি কোটার কাজ করতে। পুরো ব্যাপারটা তদারকি করছিল দামোদরই। সে উনানের সামনে দাঁড়িয়ে খুন্তি নাড়ছিল আর দরদর করে ঘামছিল। খিচুড়ির পর পাঁচ সবজির তরকারি আর পায়েসও বানিয়ে ফেলল ওরা।

“দুপুর দুটো নাগাদ ভোগ রান্না শেষ হল। একটা বিশাল পাথরের রেকাবিতে সেই ভোগ আর ছানার সন্দেশ সাজিয়ে দামোদর নিয়ে গেল পূজাস্থলে। ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা সেই ভোগ নিবেদন করলেন মা বিশালাক্ষীকে। এরপর শুরু হল যজ্ঞ। পুজোর কাজ সম্পন্ন হতে বেলা তিনটে বেজে গেল। এবার পুজো দেখতে আসা এলাকার কয়েকশো মানুষকে রাজবাড়ির চাতালে বসিয়ে ভোগ খাওয়ানো হল। দামোদরই লোকজন নিয়ে ভোগ পরিবেশন করল। এসব করতে বিকেল গড়িয়ে গেল।

“পুরো ব্যাপারটা সুসম্পন্ন হওয়ায় শোভা সিংহ দারুণ খুশি। সে আট পুরোহিত এবং তাঁদের সঙ্গীদের ভালোমতো পারিশ্রমিক দিল। সঙ্গে চাল-কলা-মিষ্টি-কাপড়।

“এবার সকলের বাড়ি ফেরার পালা। অভয়কৃষ্ণ দামোদরের খোঁজ করতে লাগলেন। কিন্তু তাকে আশেপাশে কোথাও দেখতে পেলেন না। অজয়কৃষ্ণ এবার রাজবাড়ির ভিতরে ঢুকে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল। কিন্তু দামোদরের কোনও পাত্তাই নেই। একজন বলল, একটু আগে সে দামোদরকে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে ডানদিকের রাস্তা ধরে যেতে দেখেছে। ওইদিকেই অভয়কৃষ্ণের বাড়ি। তাহলে কি ওদের সঙ্গে দেখা না করেই দামোদর বাড়ির পথ ধরেছে? এসব ভাবতে ভাবতেই অজয়কৃষ্ণ রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। সেই সকাল থেকে পুজোর ধকলে বৃদ্ধ অভয়কৃষ্ণ তখন দারুণ পরিশ্রান্ত। ওঁর বিশ্রাম প্রয়োজন। তাই বাবাকে নিয়ে সে এবার বাড়ির পথ ধরল।”  

“বাড়িতে গিয়ে ওঁরা কি দামোদরের দেখা পেলেন?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

“না। দামোদর ওখানে আসেনি। তাহলে ছেলেটা গেল কোথায়? ভটচাজ বাড়ির সকলেই বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে ওঁরা চিন্তা করেই বা কী করবেন? দামোদরের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। ক্ষিরোদাসুন্দরী শুধু বললেন, ‘বিষ্ণুপুজো না করে দামোদর ওখান থেকে আসবে না। দেখো, ও নিশ্চয়ই ওই মন্দিরের আশেপাশে লুকিয়ে আছে। রাত নামলে মন্দিরে ঢুকে…’

“অভয়কৃষ্ণ একথা শুনে আঁতকে উঠলেন। ক্ষিরোদাসুন্দরীকে কথার মাঝেই থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এমন কথা বোলো না গিন্নি! ওই বিষ্ণুপুজো করতে গিয়ে দামোদর যদি ধরা পড়ে যায়, তাহলে ওর তো গর্দান যাবেই, সঙ্গে আমাদের কী হাল হবে বুঝতে পারছ!’ ভয়ে বেচারি অভয়কৃষ্ণের মুখ দিয়ে আর কথা বের হল না।”  

মলয় বলল, “দামোদর কি সত্যিই মন্দিরের আশেপাশে লুকিয়ে ছিল নাকি?”

“না।”   এটুকু বলে মনাদা আরও একটা সিগারেট ধরালেন। তবে আমাদের ধৈর্যের পারদ বিপদসীমা অতিক্রম করার আগেই তিনি আবার মুখ খুললেন। বললেন, “সেদিন রাত ন’টা নাগাদ শোভা সিংহ একটা জমকালো পোশাক আর গলায় ফুলের মালা পরে, হাতে একটা সোনার আংটি নিয়ে খোশমেজাজে রাজবাড়ির দোতলা উঠে গেল। তারপর দোতলার বারান্দা ধরে এগোতে লাগল রাজকুমারীর ঘরের দিকে। সেই ঘরের দরজায় তখন দাঁড়িয়ে ছিল এক পরিচারিকা। তার মুখ ঘোমটায় ঢাকা। সে শোভা সিংহকে অভিবাদন জানিয়ে ভিতরে নিয়ে গেল।

“ঘরের ভিতরের তখন দুইকোণে দুটো ঘিয়ের প্রদীপ নিয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মী আর জানকি। আর ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা একটা রাজকীয় কেদারায় বসে রাজকুমারী সত্যবতী। পরনে তার বিয়ের সাজ। গলায় ফুলের মালা। প্রদীপের মৃদু আলোতেও রাজকুমারীর রূপের ছটা চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। সেই রূপ দেখে শোভা সিংহ আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। আট মাস আগে সে বর্ধমান অধিকার করেছে। তারপর থেকে যুদ্ধবিগ্রহেই ব্যস্ত থেকেছে এতদিন। কিন্তু রাজকুমারীকে পাওয়ার বাসনা তার মন থেকে এক মুহূর্তের জন্যও ম্লান হয়নি। সঙ্গী গণৎকার বিধান দিয়েছিল, মা বিশালাক্ষীর পুজো না করে শোভা যেন রাজকুমারীর দিকে হাত না বাড়ায়। পুজোর সময়কালও ঠিক করে দিয়েছিল সেই গণৎকারই। শোভা তাই এই আট মাস চরম সংযমের পরিচয় দিয়েছে। এক মুহূর্তের জন্যও রাজকুমারীর ঘরে আসা তো দূর, রাজাবাড়ির দোতলাতেও পা রাখেনি।

“কিন্তু এখন আর সে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করতে রাজি নয়। তাই সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল রাজকুমারীর দিকে। ঘরের দরজাখানা ইতিমধ্যে যে বন্ধ করা হয়েছে, সেটা শোভা টেরই পেল না। ওদিকে রাজকুমারী সত্যবতী নির্বিকার। সে নিজের আসনেই বসে রইল। শোভা সিংহ এবার তার সামনে এসে যেই না সোনার আংটিখানা সত্যবতীর আঙুলে পরাতে যাবে, অমনি পিছন থেকে একটা দৃঢ় হাত সজোরে তার মুখ চেপে ধরল। আর পরক্ষণেই একটা ধারালো ছোরা গেঁথে গেল তার বুকের বাঁ দিকে। শোভা সিংহ হাত-পা ছুড়ে একটা প্রতিরোধের চেষ্টা করল বটে, কিন্তু তাতে কোনও ফল হল না। কারণ ইতিমধ্যে ছোরাটা তার বুকে ভিতরে একাধিকবার ওঠানামা করেছে। সে আস্তে আস্তে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। একটু পরেই তার দেহটা নিথর হয়ে গেল।

“রাজকুমারী সত্যবতী এবার উঠে দাঁড়াল। মুখে তার এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। আট মাস আগে সে মনে মনে শোভা সিংকে হত্যা করার শপথ নিয়েছিল। তবে কাজটা ঠিকমতো করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে নিজের মনেই সংশয় ছিল। কিন্তু দুদিন আগে এক ভিনদেশি যুবক যেন দেবদূত হয়ে হাজির হল এই রাজবাড়িতে। আজ সে-ই রাজকুমারীর ইচ্ছা পূরণ করেছে।”  

“তার মানে পরিচারিকার বেশে দামোদর শোভাকে হত্যা করল, তাই তো?”

“হ্যাঁ, ঠিক তাই। খুনটা সে করেছিল সেই ছোরাটা দিয়েই, যেটা দিয়ে বছরখানেক আগে সে নিজের দেশে বাঘ মেরেছিল। যাইহোক, রাজকুমারীর ইচ্ছা তো পূরণ হল, এবার দামোদরের স্বপ্ন পূরণের পালা। রাজকুমারী সত্যবতী এবার একটা সবুজ পাথর বসানো নাকছাবি দামোদরের হাতে দিলেন। বললেন, ওর দাদা জগৎরাম শোভা সিংহের ভয়ে ঢাকায় পালিয়ে গেছে। শোভার মৃত্যুর খবর পেয়ে সে নিশ্চয়ই বর্ধমানে ফিরে আসবে। তখন দামোদর যেন তাকে এই নাকছাবিটা দেখায়, আর সব কথা খুলে বলে। তাহলে জগৎরাম তাকে সমাদরে গ্রহণ করবে। এরপর সে নিজের কিছু সোনার অলংকার তুলে দিল লক্ষ্মী আর জানকির হাতে। তারপর ওদের সকলকে দ্রুত রাজবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলল।

“এই সময়ে দামোদর, লক্ষ্মী, জানকি তিনজনেই রাজকুমারীকে বারবার অনুরোধ করল তাদের সঙ্গে যেতে। কিন্তু সত্যবতী কিছুতেই রাজি হল না। বলল, শোভা সিংহকে হত্যার পর কী করবে, তা সে আটমাস আগেই ঠিক করে রেখেছে। নিজের সংকল্প থেকে সে এক পা-ও নড়বে না।”  

“কিন্তু ওই রাজকুমারীর সঙ্গে দামোদরের যোগাযোগটা হল কীভাবে?”

বিশুর প্রশ্নের জবাবে মনাদা বললেন, “জানকির বাবা ছিলেন আদতে বিজাপুরের লোক। বাবার সূত্রে তাই সে দক্ষিণের ভাষা কিছুটা জানত। ওর মাধ্যমেই দামোদর রাজকুমারীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিল।”  

“কিন্তু দামোদর তো রাজবাড়িতে ঢুকেছিল বোবা সেজে। আর জানকি যে তার ভাষা জানে, সেটাও সে জানত না। তাহলে ও জানকির সঙ্গে আলাপটা করেছিল কীভাবে?”

মলয়ের মুখে এই প্রশ্ন শুনে মনাদা বললেন, “জানকির হাতে একটা উল্কি ছিল। সেটা ছিল দক্ষিণী হরফে লেখা এক দেবীর নাম। জানকির বাবা ওটা মেয়ের হাতে এঁকেছিল সেই ছোটোবেলায়। ওই উল্কিটা দেখেই দামোদর বুঝে গিয়েছিল, বাংলায় থাকলেও জানকির অরিজিন দাক্ষিণাত্যে। তাই খানিক ঝুঁকি নিয়েই সুযোগ বুঝে জানকির সে সঙ্গে কথা বলেছিল। জানিয়েছিল সে শোভা সিংহের শত্রু, রাজকুমারীকে সাহায্য করতে চায়। তারপর ধীরে ধীরে ওর মারফতই গোটা পরিকল্পনাটা ছকে ফেলা হয়েছিল। জানকিই সেদিন সন্ধ্যায় দামোদরকে নিজের পোশাক দিয়েছিল।”  

“বুঝলাম। এরপর কী হল বলুন।”  

“এরপর আর কী! রাজকুমারী ওই ঘরেই থেকে গেলেন। ওদিকে দামোদর একটা ঘিয়ের পাত্র তুলে নিয়ে লক্ষ্মী আর জানকির পিছন পিছন নারী পোশাকে ঘোমটা মাথায় দিয়ে নীচে নেমে এল। লক্ষ্মী আর জানকি, দুজনের হাতেই ছিল প্রদীপ। নীচে চারজন সিপাই পাহারায় ছিল। লক্ষ্মী তাদের হেসে বলল, ‘রাজামশাই আমাদের আদেশ দিয়েছেন নীচে চলে আসতে। আমরা এখন ওঁর আদেশ মেনে বিশালাক্ষী আর বিষ্ণু মন্দিরে প্রদীপ দেব, তারপর পুজোর ঘট বিসর্জন দিতে গঙ্গায় যাব। আমাদের জন্য একটা ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা কর।’

“সিপাইদের তো আর রাজার বিয়ে পরবর্তী নিয়মকানুন সম্বন্ধে কোনও ধারণা নেই। তা নিয়ে প্রশ্ন বা সন্দেহ করারও সাহস নেই। সেনাছাউনির পাশে অনেকগুলো ঘোড়ার গাড়ি দাঁড় করানো ছিল। সিপাইরা তাই লক্ষ্মীর কথা মতোই একটা ঘোড়ার গাড়ি গাড়োয়ান সমেত বিষ্ণু মন্দিরের সামনে নিয়ে এল। গাড়িটার সামনে একটা মশাল জ্বলছে।

“ওদিকে দামোদর যে উদ্দেশ্যে সেই সুদূর দাক্ষিণাত্য থেকে বর্ধমান এসেছে, এবার সেই কাজ করে ফেলল বিনা বাধায়। পূর্ণিমার রাতে বিষ্ণু মন্দিরে ঢুকে সে ঘি মাখিয়ে বিষ্ণুর পুজো করল। মন্ত্রটা অবশ্য মনে মনে বলল। প্রদীপ দিয়ে আরতি করল। তারপর লক্ষ্মী আর জানকিকে নিয়ে চলে এল ঘোড়ার গাড়ির সামনে। দুজন সিপাই ওদের সঙ্গে গঙ্গায় যাবে বলে প্রস্তুত ছিল। লক্ষ্মী বলল, ‘এই গঙ্গা পুজোয় পুরুষদের সঙ্গে নেওয়া যায় না। তাই কোনও সিপাই তো নয়ই, এমনকি গাড়োয়ানকেও সঙ্গে নেওয়া যাবে না।’

“এমন নিয়মের কথা শুনে সিপাইরা অবাক হল ঠিকই, তবে মুখে কিছু বলল না। নারীবেশধারী দামোদর এবার গিয়ে বসল গাড়োয়ানের আসনে। প্রদীপ হাতে নিয়ে লক্ষ্মী আর জানকি বসল ভিতরে। গাড়ি চলতে শুরু করল গঙ্গার দিকে। পূর্ণিমার রাত। বর্ষাকাল হলেও আকাশে সেদিন মেঘের চিহ্ন ছিল না। চারিদিক জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। তাই ওই রাতে ঘোড়ার গাড়ি ছোটোাতে দামোদরের কোনও সমস্যা হল না।”  

“তখন রাজবাড়ির ভিতরের কী অবস্থা? শোভা সিংহ যে খুন হয়েছে, সেটা কেউ জানতে পারেনি নিশ্চয়ই?”

“জানতে পারবে কী করে? দোতলায় রাজকুমারীর ঘরে তো আর কেউ যায়নি।”   মলয়ের প্রশ্নের জবাবে মনাদা বললেন।

“শোভা সিংহের লোকেদের কোনও সন্দেহও হয়নি তাহলে?”

“সন্দেহ হয়েছিল বৈকি, তবে বেশ কিছুক্ষণ বাদে। তিন পরিচারিকা গাড়োয়ানকে নামিয়ে দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে রাতের অন্ধকারে গঙ্গায় পুজো দিতে গেল, কিন্তু ঘণ্টা দুই পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তারা ফেরার নাম করছে না দেখে শোভা সিংহের লোকেদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধল। দুজন সিপাই তখন ঘোড়ায় চড়ে পৌঁছে গেল গঙ্গার ধারে। দেখল ঘোড়ার গাড়িটা ফাঁকা পড়ে আছে। তিন পরিচারিকার কোনও পাত্তা নেই। ওরা তখন আশপাশটা বাতি নিয়ে ঘুরে দেখল। কিন্তু কারো দেখা পেল না। অতঃপর ছাউনিতে ফিরে এসে সব কথা জানাল ওরা।

“এবার শোভা সিংহের নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা ছিল, তারা পড়ে গেল প্রবল চিন্তায়। তারা ভাবল পরিচারিকার বেশে রাজকুমারী হয়ত রাজবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কিন্তু তেমনটা হলে রাজা শোভা সিংহ চুপ করে আছেন কেন? তিনি তো দোতলা থেকে নীচে নেমে আসবেন, বা চিৎকার করে প্রহরীদের সজাগ করবেন। তাহলে তিনি কি কিছুই জানতে পারেননি? কেন জানতে পারেননি? তবে শোভা যে খুন হয়ে গেছে, সেটা ওরা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।”  

“একথা কেন বলছেন মনাদা?” গৌতম জিজ্ঞাসা করল।

মনাদা জবাবে বললেন, “একবার ভাবো, শোভা সিংহ তখন সেই মেদিনীপুর থেকে হুগলি হয়ে বর্ধমান পর্যন্ত ভূখণ্ডের অধীশ্বর, বর্ধমানের রাজা কৃষ্ণরামকে সে যুদ্ধে পরাজিত করে হত্যা করেছে, মোগলরা পর্যন্ত তার ভয়ে কাঁপছে। এমন একজন প্রবল প্রতাপশালী ব্যক্তি সেই রাতে রাজবাড়ির যে ঘরে রয়েছে সেখানে কোনও পুরুষ মানুষ নেই। তার ওপর রাজবাড়ির সর্বত্র কড়া পাহারা। এই অবস্থায় রাজামশাইয়ের কোনও বিপদ হতে পারে, এই ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই কারো মনে আসেনি!”

“শোভা যে খুন হয়েছে, সেটা ওর লোকেরা জানল কখন?” এবার আমি জানতে চাইলাম।

“ওই দুজন সিপাই গঙ্গার ধার থেকে ফিরে আসার ঘণ্টাখানেক বাদে, মানে মাঝরাতে, শোভা সিংহের দুজন খুব বিশ্বস্ত অনুচর দোতলায় উঠল। ধীর পায়ে পৌঁছল রাজকুমারীর ঘরের সামনে। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। ওরা প্রথমে শোভা সিংহকে ‘মহারাজ’ সম্বোধন করে অনেকবার ডাকাডাকি করল। ভিতর থেকে কোনও সাড়া না আসায় প্রথমে আস্তে আস্তে, পরে বেশ জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে লাগল ওরা। তারপরেও কোনও সাড়া না পেয়ে বুঝতে পারল, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।

“তখন ওরা নীচে থেকে আরও কয়েকজন সিপাইকে ডেকে নিয়ে এল। তারপর সকলে মিলে একটা গাছের গুঁড়ি দিয়ে ধাক্কা মেরে ভেঙে ফেলল দরজাটা। ভিতরে ঢুকেই দেখল সেই বীভৎস দৃশ্য। ঘরের ঠিক মাঝখানে পড়ে আছে শোভা সিংহের রক্তাক্ত মৃতদেহ। আর কিছুটা দূরে একটা চেয়ারে এলিয়ে আছে রাজকুমারী সত্যবতীর অসাড় দেহ। তার হাতের শিরা কাটা। রক্তে ভিজে গেছে মেঝে।

“এই দৃশ্য দেখে সিপাইরা ধরে নিল রাজকুমারী শোভা সিংহকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছে। রাজামশাইকে হত্যা করতে ওই তিন পরিচারিকা রাজকুমারীকে নির্ঘাত সাহায্য করেছে।”  

“তারপর?”

“তারপর আর কি! রাজা হঠাৎ মারা গেলে যা হয় তাই হল। শোভা সিংহের বাহিনী মনোবল হারিয়ে দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ল। এই সময়ে আফগান রহিম খাঁ বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দিল বটে, কিন্তু বিদ্রোহ বেশিদিন টিকল না।”  

“কেন, টিকল না কেন?”

“কারণ ডাচ-রা ইতিমধ্যেই কামান দেগে বিদ্রোহীদের হুগলি থেকে বের করে দিয়েছিল। এদিকে নবাব আজিম-উস-শান তখন বিদ্রোহ দমনের জন্য ইব্রাহিম খাঁর ছেলে জবরদস্ত খাঁকে সেনাপতি পদে বসিয়ে দিয়েছিলেন। জবরদস্ত খাঁর আক্রমণে বিদ্রোহীরা ভগবানগোলায় যুদ্ধে হেরে গেল। তখন কৃষ্ণরাম রাইয়ের জমিদারি উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেওয়া হল তাঁর সেই জীবিত পুত্র জগৎরাম রাইকে, যে কিছুদিন আগে যুদ্ধে হেরে ঢাকায় পালিয়ে গিয়েছিল।

“যাইহোক, এরপর ইব্রাহিম খাঁ আর তার ছেলের পরাক্রমে বিদ্রোহীরা পিছোতে পিছোতে সেই চন্দ্রকোণাতেই ফিরে এল। সেখানে তারা একবারে দুরমুশ হয়ে গেল। আজিম-উস-শানের এক আরবি সেনাপতি নিজের হাতে রহিম খাঁর মাথা কেটে ফেলল। এই দৃশ্য দেখে বাকি বিদ্রোহীরা যে যেখানে পারল পালিয়ে প্রাণ বাঁচাল। তবে শোভা সিংহের কাকা মহা সিংহ নাকি ১৭০৩-০৪ সাল পর্যন্ত ওই বিদ্রোহের আগুন সামান্য হলেও টিকিয়ে রেখেছিল। সেই অল্প কিছু বিদ্রোহীদের পুরোপুরি দমন করেছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ। এই জন্য সম্রাট তাঁকে পুরস্কৃতও করেছিলেন।”  

“আর দামোদরের কী হল?” গৌতম জিজ্ঞাসা করল।

“ওই যে লক্ষ্মী নামের মেয়েটা, তার বাড়ি ছিল গঙ্গার ধারেই। আর ওর বাবা ছিল পেশায় মাঝি। সে-ই ওদের তিনজনকে সেদিন রাতেই নৌকা করে হুগলি নিয়ে চলে গিয়েছিল। ওখানে প্রথমে লক্ষ্মীর এক মাসির বাড়িতে সকলে আশ্রয় নিয়েছিল। কিছুদিন বাদে অবশ্য দামোদর জানকিকে নিয়ে ওখান থেকে চলে এসেছিল কলকাতায়। সে বিয়ে করেছিল জানকিকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে মজুরের কাজ জুটিয়ে নিয়েছিল দামোদর। প্রথমে জাহাজ থেকে মাল ওঠানো-নামানোর কাজ করত সে। আস্তে আস্তে সে বাংলা ভাষাটাও শিখে নিয়েছিল। তারপর কিছুদিন পুরোহিতগিরিও করেছিল। সে বাকি জীবনটা এই বাংলাতেই থেকে গিয়েছিল।”  

“দামোদর আর বর্ধমানে যায়নি অভয়কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে। উনি সাহায্য না করলে তো…” দেবু জানতে চাইল।

মনাদা জবাবে বললেন, “গিয়েছিল বইকি। বছর দুয়েক বাদে নিজের ছ’মাসের ছেলে আর বৌ জানকিকে সঙ্গে নিয়ে সে গিয়েছিল অভয়কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে। ওঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিল। তখন দামোদর বাংলা ভাষাটাও অনেকটাই শিখে নিয়েছে। তাই সেই পুজোর রাতের সব ঘটনা নিজেই বলেছিল অভয়কৃষ্ণ আর ক্ষিরোদাসুন্দরীকে। তারপর অভয়কৃষ্ণকে অনুরোধ করেছিল ওর ছেলের নামকরণ করতে। অভয়কৃষ্ণ দামোদর আর জানকির ছেলের নাম দিয়েছিলেন ভৈরব। এই ভৈরবই যুবক অবস্থায় আলিবর্দি খাঁকে সাহায্য করেছিল বাংলার মসনদ দখল করতে, তারপর বর্গি আক্রমণ থেকে বাংলাকে রক্ষা করতে।”  

মনাদার মুখে ওই শেষ বাক্যটা শুনে আমার ইতিহাসজ্ঞান খানিক ধাক্কা খেল। আমি বললাম, “আপনি তো মনাদা একটু আগে মুর্শিদকুলি খাঁর কথা বলছিলেন। এখন আবার আলিবর্দি খাঁ এল কোথা থেকে?”

আমার কথা শেষ হতে না হতেই দেবু বলল, “আমারও তো গুলিয়ে যাচ্ছে। যেটুকু মনে পড়ছে, মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলা শাসন করেছিলেন প্রায় ২৫-৩০ বছর। তারপর এসেছিলেন আলিবর্দি খাঁ। তাহলে মুর্শিদকুলির কথা বাদ দিয়ে আপনি হঠাৎ আলিবর্দিতে চলে গেলেন কেন? দামোদরের সঙ্গে তার জ্ঞাতিদাদা মুর্শিদকুলির দেখা হয়নি?”

মলয় এবার যোগ করল, “দেবু তো ঠিকই বলেছে। আপনি মুর্শিদকুলিকে টপকে আলিবর্দিতে চলে যাচ্ছেন কেন? তাছাড়া আপনি আজ গল্প শুরু করেছিলেন লালদিঘির পশ্চিম পাড়ে ইংরেজদের ফোর্ট উইলিয়াম বানানো নিয়ে। কেল্লাটা বানানোর পর ইংরেজরা কী করল সেটাও তো বললেন না মনাদা?”

পরপর এতগুলো প্রশ্ন শুনে মনাদা আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঘড়িতে এখন কটা বাজে দেখেছ? আটটা দশ। সেই গল্প শুরু করলে রাত দশটা বেজে যাবে। তাহলে তোমরা বাড়ি ফিরে ডিনার করবে কখন?”

দেবু সঙ্গে সঙ্গে বলল, “ওসব নিয়ে আপনি ভাববেন না। আজ শনিবার। কাল কারো অফিস-কাছারি নেই। তেমন হলে আমরা বাড়িতে ফোন করে দিচ্ছি। রাতের খাওয়াটা এখানেই সেরে নেব। জানেনই তো এই মাতারা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে মোগলাই পরোটা আর কষা মাংসের ব্যাপক সুনাম। আজ না হয় গল্প শুনতে শুনতে সকলে…”

গৌতম, মলয়, আমি সকলেই দেবুকে সমর্থন করলাম। মনাদা আর না করতে পারলেন না। একটা সিগারেট ধরিয়ে মৌজ করে দুটো সুখটান দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, “ইব্রাহিম খাঁ এবং তার ছেলে জবরদস্ত খাঁ শোভা সিংহের দলবলকে চন্দ্রকোণায় একেবারে ছত্রখান করে দিয়েছে, এই খবর পেয়ে নতুন নবাব আজিম-উস-শান তো খুব খুশি। তিনি সৈন্যসামন্তদের অনেক পুরস্কার দিলেন। গরিব-দুঃখীদের মধ্যে টাকা বিলোলেন।

“ইংরেজরা দেখল এই সুযোগ। নবাব তখনও বর্ধমানেই ছিলেন, ঢাকায় যাননি। ইংরেজরা খোজা সুহার্দ নামে এক আর্মেনিয় সওদাগরকে দূত হিসেবে পাঠালেন নবাবের দরবারে। তাদের আর্জি ছিল কলকাতায় কিছুটা জমি কিনে তারা ভালোভাবে ব্যাবসাআর বসবাস করতে আগ্রহী। তার অনুমতি যেন নবাব দেন। আজিম-উস-শানের টাকার প্রতি যে খুব লোভ সেটা খোজা সাহেব ভালোই জানতেন। তাই বেশ কিছু দামি উপহার আর নগদ ষোল হাজার টাকার বিনিময়ে শুধু কলকাতার একখণ্ড জমি নয়, গোটা কলকাতা গ্রাম, সেই সঙ্গে সুতানুটি ও গোবিন্দপুর গ্রাম দুখানা কেনার অনুমতিও তিনি ইংরেজদের জন্য আদায় করে আনলেন।

“ঐ তিনখানা গ্রাম ছিল তখন সাবর্ণ চৌধুরীদের সম্পত্তি। কিন্তু তাঁদের অবস্থা তখন পড়তির দিকে। শরিকও অনেক, শরিকদের মধ্যে আবার বিশেষ সদ্ভাব নেই। তাই মোট তেরশো টাকার বিনিময়ে ১৬৯৮ সালের ১০ নভেম্বর ঐ তিনখানা গ্রাম ইংরেজদের কিনে নিতে খুব বেশি বেগ পেতে হল না। যদিও কিছুদিন আগে সাবর্ণ চৌধুরীদের এক বংশধর এই তথ্য মানেননি। একটা মামলায় তিনি হাইকোর্টে অন্য তথ্য দিয়েছেন। সেই নিয়ে এখন কথা না বলাই ভালো।”  

আমি মনাদাকে বললাম, “হ্যাঁ। ওই প্রসঙ্গ এখন থাক। আপনি গল্প চালিয়ে যান।”  

মনাদা বলতে লাগলেন, “এরপরেই কলকাতা হয়ে গেল একটা আলাদা প্রেসিডেন্সি। কোম্পানি ঠিক করল, সেখানে থাকবে একজন প্রেসিডেন্ট আর কাউন্সিল। এবার এই কলকাতা প্রেসিডেন্টের আন্ডারেই বাংলার সব ইংরেজ কুঠিগুলো চলে এল, আর মাদ্রাজ প্রেসিডেন্টের আওতায় থাকল না। চার্লস আয়ারকেই করা হল কলকাতার প্রেসিডেন্ট।

“এর পরের কয়েক বছর গোটা দেশ জুড়েই ইংরেজদের ব্যাবসা মোটে ভালো হয়নি। কিছু লোক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাড়বাড়ন্ত দেখে নতুন একটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুলে বসেছিল, রাজা থার্ড উইলিয়ামের অনুমতিও জোগাড় করেছিল। তারপরই এদেশে ঝামেলা বেঁধে গেল ওই দুই কোম্পানির মধ্যে। আর তাতে ব্যবসার ক্ষতি হল উভয়েরই। বাদশা আওরঙ্গজেব তো বিরক্ত হয়ে ওদের ব্যাবসাবন্ধ করার হুকুমই দিয়ে বসেছিলেন। আটক করা হয়েছিল সব মালপত্তর। শেষে অবস্থা বেগতিক বুঝে আবার দুই কোম্পানি এক হয়ে গিয়েছিল।

“যাইহোক, এই সময় টানা পাঁচ-সাত বছর ধরে কলকাতা কাউন্সিল ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গটাকে ধীরে ধীরে পাকাপক্ত করে তুলেছিল। কেল্লার চারপাশে উঠেছিল পাকা দেওয়াল, তৈরি হয়েছিল আরও নতুন কয়েকটা বুরুজ। নদীর ধারটাও বাঁধিয়ে নিয়েছিল ইংরেজরা। মাল ওঠানো-নামানোর জন্য বানিয়ে ফেলেছিল দুটো নতুন জেটি, সঙ্গে দুটো বাঁধানো ঘাট।

“তবে কেল্লা নির্মাণের কাজ চালিয়ে যেতে পারলেও ইংরেজরা মোটে সুখে ছিল না। আগেই বলেছি, ১৭০১ সালে আওরঙ্গজেব বাংলার দেওয়ান করে পাঠিয়েছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁকে। তাঁর কাজ ছিল রাজস্ব আদায়ের জন্য বিলি বন্দোবস্ত দেখা। মুর্শিদকুলি খুব কড়া মানুষ ছিলেন, কীভাবে খাজনা আদায় করতে হয় তা ভালোরকম জানতেন। তিনি বাংলায় এসেই লক্ষ্য করলেন, কিছু লোক আগে থেকেই সব ভালো ভালো জায়গীর দখল করে বসে আছে। তিনি সটান তাঁদের উচ্ছেদ করে বিহার উড়িষ্যার বন-জঙ্গলে জায়গীর দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর ভালো জায়গীরগুলোতে নতুন লোক বসালেন। তাতে ভালো খাজনা পাওয়া গেল। সব কটা ইউরোপিয় কোম্পানিকেই চেপে ধরে তাদের থেকে বেশ বড়ো রকম কাঁচা টাকা আদায় করতে লাগলেন। বছরে তিনি এক কোটি টাকা রাজস্ব পাঠাতেন বাদশাকে! বস্তা বস্তা রুপোর টাকা বাংলা থেকে দাক্ষিণাত্যে যেত গোরুরগাড়ি বোঝাই হয়ে, আওরঙ্গজেবের কাছে।

“ওদিকে নবাব আজিম-উস-শানও বসে ছিলেন না। তিনিও নানা অছিলায় ইউরোপিয় কোম্পানিগুলোর কাছে টাকা আদায় করতে লাগলেন। নবাব-দেওয়ানের ওই সাঁড়াশি চাপে ইংরেজদের তখন একেবারে নাজেহাল অবস্থা। টাকা জোগাড় করতে তারা এবার কলকাতার জমিদারিতে মন দিল। শোভা সিং-এর বিদ্রোহের পর থেকেই অনেক লোক নিজের বাসস্থান ছেড়ে কলকাতায় চলে আসছিল। মুর্শিদকুলি খাঁর আগমনের পর অনেক জমিদারও জায়গীর খুইয়ে এদিকে চলে এসেছিলেন। কলকাতায় ব্যবসাও ভালো হয়। ফলে কলকাতায় বেড়েই চলল এদেশিয় লোকের ভিড়।

“এই সময়ে সাহেবদের অনেকেই কেল্লায় না থেকে কাউন্সিলের কাছ থেকে জমি নিয়ে কেল্লার চারপাশে বাড়ি বানাতে শুরু করে দিল। এইভাবে এখনকার ডালহৌসি স্কোয়ারে গড়ে উঠল সাহেবে পাড়া। অনেকে আবার একটু নির্জনে থাকবে বলে কলকাতার কিছুটা বাইরে গিয়ে ঘর বাঁধল। যারা বেশ হোমরা-চোমরা তারা বানাল বাগানবাড়ি। উত্তরে, এখনকার বাগবাজারে পেরিনসাহেবের বাংলো আর দক্ষিণে মানে একালের কুলিবাজার বা হেস্টিংসে তৈরি হল সুরম্যান সাহেবের বাগানবাড়ি।

“এদেশিয় লোকের সংখ্যা কলকাতায় অল্পদিনেই অনেক বেড়ে যাওয়ায় কাউন্সিলের সাহেব-জমিদারের পক্ষে আর সব কাজ একা সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই একজন এদেশিয় লোককে জমিদারি কাজে সাহায্য করার জন্য রাখা হল। তার নাম নন্দরাম সেন। ইংরেজদের সরকারি কাজে নন্দরামই প্রথম বাঙালি যে কিনা বেশ জব্বর একটা পদ পেয়েছিল। পদটার নাম ছিল ‘ব্ল্যাক জমিদার’। কিন্তু লোকটা কাঁচা টাকার লোভ সামলাতে পারেনি। তাই কিছুদিন বাদে অনেক টাকা-পয়সা গাব করে হুগলি পালিয়ে গেল। পরে অবশ্য ইংরেজরা আবার নন্দরামকে কলকাতায় ফিরিয়ে এনে ওর বাড়ি-ঘর, সম্পত্তি সব ক্রোক করে নিয়েছিল। পরবর্তীকালে গোবিন্দরাম মিত্র ব্ল্যাক জমিদার হিসেবে বেশ নাম কুড়িয়েছিল।

“এ তো গেল ইংরেজদের কথা। ওদিকে দেওয়ান-নবাবে সাপে-নেউলে সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। দুজনেই একে অপরের বিরুদ্ধে বাদশার কাছে নালিশ জানাচ্ছে। একটা সময় এমন অবস্থা হল যে মুর্শিদকুলি খাঁ ঢাকা থেকে তাঁর দপ্তর মকসুদাবাদে সরিয়ে নিয়ে এলেন। পরে তাই জায়গাটার নাম হয়েছিল মুর্শিদাবাদ। বাংলা রাজনীতির ভরকেন্দ্রও পরবর্তীকালে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে শিফট করল। নবাব আজিম-উস-শান অবশ্য দেওয়ানের ঐ দপ্তর স্থানান্তরের ব্যাপারটা একেবারেই মেনে নিতে পারলেন না। জোরালো নালিশ করলেন বাদশার কাছে। বাদশা আওরঙ্গজেব অবশ্য মুর্শিদকুলি খাঁর সিদ্ধান্ততেই শিলমোহর দিলেন। প্রতি বছর এক কোটি টাকা তো আর কম কথা নয়।

“এরপর ১৭০৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নব্বই বছর বয়সে আওরঙ্গজেব চলে গেলেন পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে। কদিনের মধ্যেই কে দিল্লির মসনদে বসবে তা নিয়ে লাঠালাঠি বেঁধে গেল। বাংলাতেও তার প্রভাব পড়ল। আওরঙ্গজেব ওঁকে নেক নজরে দেখতেন বলে বছর তিনেক ধরে মুর্শিদকুলি খাঁ খোশমেজাজেই বাংলার দেওয়ানগিরি করছিলেন। কিন্তু এবার ওঁর হাল খারাপ হয়ে গেল। উনি দিল্লি ফিরে গেলেন। ওদিকে আজিম-উস-শান তো আগেই দিল্লি চলে গিয়েছিলেন।

“নবাব দেওয়ান দুজনেই বাংলা ছেড়ে চলে যাওয়ায় সরকারি কর্মীদের উৎপাত বেড়ে গেল। তারা কথায় কথায় কোম্পানির কাছে টাকা চাইতে শুরু করল। কিন্তু ইংরেজদের তো কেল্লা নির্মাণ হয়ে গিয়েছিল, তাই সাহসও বেড়ে গিয়েছিল। সেই কারণে তারা তখন কোনো রকম অন্যায্য দাবি মেটাতে রাজি হচ্ছিল না।

.”ওদিকে দিল্লির সিংহাসনে তখন বসেছেন প্রথম বাহাদুর শাহ। ওই বাহাদুর শাহেরই ছেলে আজিম-উস-শান। তাঁর পিছনেই এতদিন মুর্শিদকুলি খাঁ আদাজল খেয়ে পড়েছিলেন। ফলে কপাল পুড়ল মুর্শিদকুলির। সম্রাট শাস্তিস্বরূপ মুর্শিদকুলিকে বাংলা থেকে সরিয়ে পাঠিয়ে দিলেন দাক্ষিণাত্যে।

“এই সময়ে ইংরেজদের ব্যাবসাকিন্তু ভালোই চলছিল। কারণ ফ্রান্সে যুদ্ধ লাগায় ফরাসিরা ওই সময় তাঁদের ব্যাবসাঅনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছিল। ডাচরা ভারত ছেড়ে চলে যাচ্ছিল সিঙ্ঘল জাভা সুমাত্রার দিকে। তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমে যাওয়ায় তখন ইংরেজদের বেচা-কেনা হচ্ছিল দেদার। এই সময় তারা প্রথম এদেশিয় দালাল নিয়োগ করল যাতে ব্যাবসাকরতে আরও সুবিধা হয়। ওই দালালরা বিলেত থেকে আমদানি করা মাল এদেশে বিক্রি করতে এবং এখানকার যেসব জিনিস বিলেতে রপ্তানি হবে তা কম দরে কিনে নিতে সাহায্য করত। কলকাতার জনার্দন শেঠ হল ইংরেজদের প্রথম বড়ো দালাল। পরে রাখা হল বেশ কজন ছোটো দালালও। ওরা সবাই এদেশের লোকের মধ্যে বিলেতি জিনিসের একটা নেশা ধরিয়ে দিল। যার ফলে ইংরেজদের ব্যাবসাবাড়তে লাগল হু হু করে। প্রচুর লোক আসতে লাগল কলকাতায়।

“বড়োবাজারের পর কলকাতায় আরও তিনটে বাজার বসল—শ্যামবাজার, লালবাজার ও খাসবাজার। বেশ কয়েকটা ব্রিজ হল, পুকুর কেটে জলের বন্দোবস্ত করা হল। জল নিকাশের জন্য ড্রেনও বানানো হল। তারপর একটা গির্জাও তৈরি হল, সেন্ট অ্যান্স চার্চ। গোরস্থানের পাশে বানানো হল একটা ছোটোখাটো হাসপাতালও। কলকাতা ক্রমশ গ্রাম থেকে পরিণত হল শহরে। সেই সময়ে হুগলির ফৌজদার মাঝেমধ্যেই কলকাতায় এসে থেকে যেতেন। ইংরেজরা তাঁর খুব খাতিরদারি করত। আবার পারস্য দেশের দূতও একবার কলকাতায় এসে বেশ কদিন কাটিয়ে এই শহরের খুব প্রশংসা করে গেলেন। ফলে কলকাতার নাম ছড়িয়ে পড়ল নানা দিকে।

“এদিকে ১৭১০ সালে মুর্শিদকুলি খাঁ দেওয়ান হয়ে আবার বাংলায় ফিরে এলেন। ইংরেজদের রমরমা দেখে তিনি প্রমাদ গুনলেন। তাঁর অনুপস্থিতে এই কবছরে ওরা যে ভালোই জেঁকে বসেছে, সেটা বুঝতে দেওয়ান সাহেবের বিশেষ অসুবিধা হল না। ওদের কন্ট্রোল করতে না পারলে একেবারে মাথায় চড়ে বসবে, একথা ভেবে মুর্শিদকুলি খাঁ নানারকম ব্যবস্থা নিতে শুরু করলেন। ইংরেজরা চাইছিল কলকাতার আশেপাশের কয়েকটা গ্রাম কিনে নিয়ে সেখানে বাইরে থেকে আসা এদেশিয় লোকেদের বসিয়ে দিতে। তাদের থেকে যে কর আদায় হবে, তা দিয়ে শহর গড়ার কাজ চলবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল কোনো জমিদারই ওঁদের এক ফালি জমিও বেচতে রাজি হচ্ছে না। আসলে আগে থেকেই কলকাঠি নেড়ে রেখেছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ নিজেই।

“ইংরেজরা পাটনার কুঠি থেকে প্রচুর সোরা নিয়ে আসত কলকাতায়। কিন্তু মাঝপথে মুর্শিদাবাদে সেই সোরা আটক করা হত। ছাড়া হত কেবল ভালো মতো টাকা নিয়ে। তাতে ইংরেজদের প্রচুর লোকসান হত। শেষে এমন অবস্থা হল যে কোম্পানি ঠিক করল ঐ পাটনার কুঠি তুলেই দেবে।

“আর্কট টাকা নিয়েও ইংরেজদের ভোগান্তির শেষ ছিল না। অনেককাল আগেই মাদ্রাজের কাছে আর্কট নামের একটা জায়গায় ইংরেজরা একটা টাঁকশাল বসিয়েছিল। বিলেত বা চিন থেকে রুপোর চাং এনে সেখানে রুপোর টাকা ছাপাত তারা, অবশ্যই বাদশা আওরঙ্গজেবের নামে। তাকেই বলা হত আর্কট টাকা। বাদশা তখন দাক্ষিণাত্যে থেকেই যুদ্ধ করছিলেন। তাই বাংলায় ঐ টাকা চলতে কোনো অসুবিধা হত না। এখান থেকে বিভিন্ন হাত ঘুরে ঐ টাকা আবার দাক্ষিণাত্যেই ফিরে যেত। কিন্তু আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এদেশে আর আর্কট চলছিল না। ইংরেজরা তাই দেওয়ানের কাছে আর্জি জানাল টাকার সমস্যা মেটাতে তারা কলকাতায় একটা টাঁকশাল বসাতে চায়। কিন্তু মুর্শিদকুলি খাঁ শোনামাত্র সেই আবেদন খারিজ করে দিলেন। তখন বাধ্য হয়ে ইংরেজরা ঠিক করল এবার দিল্লির বাদশার কাছে দূত পাঠিয়ে নিজেদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবে।

“দিল্লির নতুন বাদশা তখন ফারুখসিয়র। তিনি আবার বাংলার আগের নবাব আজিম-উস-শান-এর ছেলে। ঐ নবাবই যে তাঁদের তিনখানা গ্রাম কেনার অনুমতি দিয়েছিলেন তা ইংরেজরা ভোলেনি। সেই অনুমতি আদায় করে এনেছিল যে আর্মেনিয় সওদাগর, সেই খোজা সোহার্দও এবার সুরম্যানদের সঙ্গী হল। নৌকায় করে অনেক দামি দামি উপহার আর কাঁচা টাকা নিয়ে ইংরেজরা দিল্লি পৌঁছাল। তারপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে প্রায় ছমাস বাদে আদায় হল বাদশাহী ফরমান। তবে ডাক্তার হ্যামিলটন সেই সফরে সম্রাটের কঠিন অসুখ না সারালে ছ’মাস কেন, ছ’বছরেও ইংরেজরা ঐ ফরমান হাতে পেত কিনা সন্দেহ।”  

“কী লেখা ছিল ঐ ফরমানে?”

“ফারুখসিয়রের ফরমানে বলা ছিল ইংরেজ কোম্পানি আগের মতোই বছরে তিন হাজার টাকা মাশুল দিয়ে সর্বত্র ব্যাবসা করতে পারবে। ফরমানে তাঁদের কলকাতার আশেপাশে আটত্রিশটা গ্রাম কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সঙ্গে এও বলা হয়েছিল আর্কট টাকা বাংলাতেও চলবে। আর্কটের বদলে সিক্কা নিতে গেলে কোনো বাট্টাও দিতে হবে না। শুধু তা-ই নয়, ইংরেজরা চাইলে কলকাতায় একটা টাঁকশাল নির্মাণ করে নিতেই পারে।

“ইংরেজরা ঐ ফরমান হাতে পেল ১৭১৭-র জুন মাসে। আর দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁ তার চারমাস বাদেই অক্টোবরে এক লাখ টাকা নজরানা দিয়ে বাংলার সুবেদারী পদের পরোয়ানা জোগাড় করে নিলেন। আর, বলাই বাহুল্য, তিনি তখন আগের থেকেও ক্ষমতাবান হয়ে উঠলেন। নবাব সাহেব ইংরেজদের ঐ ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া, মানে তাঁকে এড়িয়ে বাদশার ফরমান নিয়ে আসার বিষয়টা একেবারেই ভালো চোখে দেখলেন না। অতঃপর তিনি উঠেপড়ে লেগে পড়লেন সাহেবদের জব্দ করতে। ফলে বাদশাহী ফরমান যাই থাকুক, ইংরেজরা তা আর কাজে লাগাতে পারল না। অনেকগুলো গ্রাম কেনার অনুমতি তারা পেয়েছিল। কিন্তু জমিদারদের কাছে গেলেই তারা ফিরিয়ে দিচ্ছিল, বলছিল গ্রাম বেচবে না। আসলে নবাব তাঁদের ইংরেজদের সঙ্গে বেচাকেনা করতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। নবাবের হুকুম অমান্য করার ক্ষমতা তাঁদের কারোই ছিল না।

“ইংরেজরাও তো বদবুদ্ধিতে কম যায় না। তারা এবার অন্য মতলব করল। নিজেদের আশ্রিত এদেশিয় প্রজাদের পাট্টা দিয়ে বসিয়ে দিল কলকাতার কাছাকাছি বেশ কিছু গ্রামে। ঐ প্রজারা ওখানকার অনেক আদি বাসিন্দাদের কাছ থেকে জমি-জায়গা ঘরদোর কিনে নিল। অনেককে আবার জোর জবরদস্তি তুলে দিয়ে তাদের জমির দখল নিয়ে নিল। ফলে বেকায়দায় পড়ে গেল ঐসব গ্রামের জমিদারেরা। তারা তো নিয়ম করে সরকারি কোষাগারে খাজনা মেটাচ্ছিল, কিন্তু বর্তমান প্রজাদের কাছে খাজনা চাইতে গেলে তারা কেউ এক পয়সা ঠেকাচ্ছিল না। মানে ব্যয় হচ্ছিল আগের মতোই, কিন্তু আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।

“কলকাতার কাছাকাছি যে গ্রামগুলো কেনার ছাড়পত্র ইংরেজরা পেয়েছিল, তাদের মধ্যে চিৎপুর, মির্জাপুর, সিমলা, কলিঙ্গা, আরপুলি, চৌরঙ্গী ও বির্জিতলা ইংরেজরা কায়দা করে নিজেদের দখলে নিয়ে নিল। উল্টোডাঙা, বেলগাছিয়া, শিয়ালদা, বাগমারি, শ্রীরামপুর, তিলজলার মতো আরও অনেক গ্রাম অবশ্য তখনো অধরাই রয়ে গেছে। তবে তারা পুরোদমে ওগুলোও কব্জায় আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। মুর্শিদকুলি খাঁর কাছে এই খবর পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না। তিনিও বুদ্ধিতে কম যান না। নবাব আজিম-উস-শানের অনুমতি পেয়ে ইংরেজরা প্রথম যে তিনটে গ্রাম কিনেছিল, সেই গ্রামগুলোর খাজনা তিনি নতুন করে পত্তন করলেন। তারপর ইংরেজদের হুকুম করলেন বারো বছরের খাজনা একসঙ্গে মিটিয়ে দিতে। দেখা গেল খাজনার পরিমাণ আগের থেকে তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় চুয়াল্লিশ হাজার টাকা।

“অত টাকা খাজনা দিতে হবে শুনে তো ইংরেজদের মাথায় হাত। ওরা চেষ্টা করতে লাগল বড়ো সরকারি কর্মচারীদের ঘুষ দিয়ে টাকার অঙ্ক কিছুটা কমাতে। খাজনা কিছুটা কমল বটে, কিন্তু উৎকোচ দিতে যা খসল তাতে আখেরে সাশ্রয় খুব একটা হল না। এই অবস্থায় ইংরেজরা তাঁদের জমিদারি বাড়ানোর কাজ তখনকার মতো স্থগিত রাখতে বাধ্য হল।

“মুর্শিদকুলি খাঁর বাসনা পূর্ণ হল। তবে ইংরেজদের ব্যাবসা উঠে যাক, এটা কিন্তু উনি কখনই চাননি। তাই উনি মাঝেমধ্যে ইংরেজদের কাছে নানা অছিলায় টাকা দাবি করলেও এবং সেই টাকা না পেলে তাদের মাল আটক করলেও, আবার কিছু টাকা নিয়ে সেই ঝামেলা মিটিয়েও নিতেন।

“তবে ইংরেজরা যাতে ব্যাবসাটা একচেটিয়াভাবে করতে না পারে, সেদিকে নবাব সাহেবের তীক্ষ্ণ নজর ছিল। তাই ডাচ, ফরাসি কোম্পানিদের উনি প্রায়ই নানা সুযোগসুবিধা দিতেন। মুর্শিদকুলির আমলেই জার্মান অস্টেন্ড কোম্পানি বাংলায় ব্যবসার সুযোগ পেয়েছিল।

“তবে এটাও ঠিক, কম্পিটিশন থাকলেও ঐ সময় ইংরেজদের কারবার কিন্তু ভালোই চলছিল। আসলে ব্যাবসাতো ওদের মজ্জায়। ওরা বিলক্ষণ জানত পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেও সেখান থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসতে হয়। তবে এরই মাঝে ওরা কারবারে যেসব ছলচাতুরি করতে গিয়েছিল, তা সবই ধরা পড়ে গিয়েছিল নবাবের কাছে। ফারুখসিয়রের ফরমানে ছিল ওরা বিনা শুল্কে বিদেশি মাল আমদানি-রপ্তানি করতে পারে। এটা দেখিয়ে ওরা বোঝাতে চেয়েছিল দেশি মালের যথেচ্ছ বেচা-কেনার অধিকার বাদশা ওদের দিয়েছেন। কিন্তু মুর্শিদকুলি খাঁ পোড় খাওয়া লোক। উনি সোজা বলে দিলেন ওসব চালাকি চলবে না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে সোজা সাগর পার করে বিলেত পাঠিয়ে দেবেন।

“তাই এরপর কোম্পানি আর কিছু চালাকি করার সাহস পায়নি। ওদিকে কলকাতার জনসংখ্যা দিন-কে-দিন বেড়ে চলায় সাহেব বা এদেশিয়—সব ধরনের লোকের মধ্যেই দ্বন্দ্ব, বিবাদ বেড়ে চলছিল। সাহেবদের মধ্যে ঝামেলা হলে কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আর এদেশিয় লোকেদের মধ্যে ঝামেলা হলে জমিদারের ওপর ছিল বিচারের ভার। কিন্তু লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ওঁদের পক্ষে আর এত মামলা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না দেখে, ১৭২৭ ইংল্যান্ডের রাজার অনুমতি নিয়ে কলকাতায় বসানো হল একাধিক কোর্ট। মেয়র’স কোর্টে সাহেবদের বিচার হত। এর ওপরে ছিল আপিল কোর্ট। আরেকটা ছিল ছোটো আদালত। এদেশিয় লোকের বিচার জমিদাররাই করত, তবে বিলিতি কায়দায়।

“১৭২৭ সালে মুর্শিদকুলি খাঁর ইন্তেকাল হল। উনিই দশসালা আইন চালু করে বাংলায় মোগল শাসনাধীন জমিদারি প্রথার সূচনা করেছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর শেষ জীবনে দিল্লির সম্রাট ছিলেন মুহম্মদ শাহ। তাঁর ক্ষমতা একেবারে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। তাই ঐ সময়ে মুর্শিদকুলি স্বাধীন নবাবের মতোই বাংলা শাসন করেছেন। তাই অনেকেই মুর্শিদকুলি খাঁকে বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব বলে থাকেন।”  

“এই ব্যাপারটা ছোটোবেলায় ইতিহাস বইতে পড়েছিলাম বটে। তা মুর্শিদকুলি খাঁর পর বাংলার নবাব কে হলেন? আলিবর্দি খাঁ তো?” দেবু বেশ কনফিডেন্টলি জানতে চাইল।

মনাদা তা শুনে শ্লেষের সুরে বললেন, “মলয় একেবারে ঠিক কথা বলেছে দেখছি। তোমার সত্যিই ইতিহাস-ভূগোলের সেন্স খুব কম। ছোটোবেলায় কী পড়েছিলে, কে জানে! মুর্শিদকুলির পর আরও দুজন নবাব এক যুগেরও বেশি বাংলা শাসন করেছেন। তারপর এসেছেন আলিবর্দি খাঁ।”  

মনাদার মুখে এই মন্তব্য শুনে দেবু আবার চুপসে গেল। মনাদা অবশ্য ওকে আর কিছু বললেন না। আবার গল্প শুরু করে দিলেন, “মুর্শিদকুলি খাঁ নিজের মেয়ের ঘরের নাতি সরফরাজ খাঁকে উত্তরসূরী নির্বাচিত করে গিয়েছিলেন। কিন্তু সরফরাজের বাবা সুজাউদ্দিন উড়িষ্যার ডেপুটি গভর্ণর পদ ছেড়ে দিয়ে একেবারে দিল্লির বাদশা মুহম্মদ শাহর পরোয়ানা নিয়ে মুর্শিদাবাদে হাজির হলেন। সরফরাজ মা, দিদিমার কথা শুনে আর নিজের বাবার বিরোধিতা করলেন না, নবাব হিসেবে মেনেই নিলেন সুজাউদ্দিনকে।

“সুজাউদ্দিন ছিলেন ভোগী মানুষ, বিশেষ করে নারীসঙ্গ তাঁর নেশা। অতএব কিছুদিন বাদে যা হওয়ার তাই হল। তিনি ভোগবিলাসে ডুবে গেলেন আর তাঁর হয়ে নবাবি চালাতে লাগলেন রায়রায়ান আলম চাঁদ, জগতশেঠ ফতেচাঁদ আর হাজি মহম্মদ। এই শেষ জন হলেন আলিবর্দি খাঁর বড়োভাই। ওঁরা দুই ভাই মিলে কটকে সুজাউদ্দিনকে রাজকার্যে প্রচুর সাহায্য করেছিলেন। তাই ওঁদের দুজনের প্রতিই সুজাউদ্দিনের অগাধ আস্থা ছিল। তবে এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আলিবর্দি খাঁর মাধ্যমেই।

“আলিবর্দি খাঁ হিন্দুস্থানী মুসলমান ছিলেন না। তাঁর বাবা আরবি আর মা তুর্কি। ওঁদের বংশের প্রধান মাতব্বর ছিলেন আওরঙ্গজেবের এক ছেলে আজম শাহ। এই আজম শাহ আবার বাদশা হবেন আশা নিয়ে বড়োভাই বাহাদুর শাহ আলমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যান এবং সেখানেই প্রাণ হারান। ফলে দিল্লিতে তখন আলিবর্দিদের হাল বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তাই ওখানে চাকরি-বাকরি কিছু জোটাতে না পেরে উনি চলে আসেন মুর্শিদকুলি খাঁর কাছে। কিন্তু তিনিও আলিবর্দিকে পাত্তা দেননি। তখন উনি চলে যান কটকে, ডেপুটি গভর্ণর সুজাউদ্দিনের দরবারে। সুজাউদ্দিনের সঙ্গে মামার বাড়ির দিক দিয়ে আলিবর্দির কীরকম যেন একটা আত্মীয়তা ছিল। সেই সম্পর্কের জেরেই আলিবর্দির চাকরিটা জুটে গিয়েছিল।

“এই আলিবর্দির মাথা ও হাত দুটোই সমানতালে চলত। তুখোড় বুদ্ধি আর হাতিয়ার চালনার দক্ষতার মাধ্যমে উনি সুজাউদ্দিনের অনেক সমস্যা সমাধান করে দিয়েছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন সুজাউদ্দিনের প্রিয় পাত্র। সেই সময় নিজের বড়োভাই হাজি মহম্মদকেও ডেকে নিয়েছিলেন কটকে। তাঁরও দরবারে চাকরি জুটে গিয়েছিল। তারপর দুই ভাইয়ের পরামর্শে সুজাউদ্দিন কাজকর্ম চালিয়েছেন স্বচ্ছন্দ গতিতে। শুধু তাই নয়, মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কোনো রক্তপাত ছাড়াই যে সুজাউদ্দিন বাংলার নবাব পদে বসে গিয়েছিলেন, সেখানেও ওই দুই ভাইয়ের মাথা কাজ করেছিল। সেই কারণে দুই ভাই ছিলেন বাংলার নতুন নবাবের খুবই আস্থাভাজন।

“বাংলার নবাবি পাওয়ার কিছুদিন বাদে সুজাউদ্দিনের কপালে বিহারের সুবেদারি পদটাও জুটে গেল। উনি চেয়েছিলেন ছেলে সরফরাজ ডেপুটি গভর্ণরের দায়িত্ব নিয়ে পাটনায় চলে যাক। কিন্তু তাঁর স্ত্রী বেঁকে বসলেন। আদরের ছেলেকে তিনি নিজের কাছ ছেড়ে অতদূর যেতে দেবেন না। তিনিই আলিবর্দিকে গোপনে ডেকে পাঠিয়ে পাটনা যাওয়ার অনুরোধ করলেন। উনি জানতেন আলিবর্দির নাম শুনলে স্বামী আর না করবেন না। এই প্রস্তাব আলিবর্দি লুফে নিলেন। দাদাকে মুর্শিদাবাদে রেখেই চলে গেলেন পাটনা।

“এদিকে নবাব সুজাউদ্দিনের শাসনকালে ইংরেজরা বেশ সুখেই ছিল। মুর্শিদকুলি খাঁর মতো উনি ইংরেজদের মোটেই বিব্রত করেননি। মাঝেমধ্যে কিছু টাকা দাবি করেছেন, এই যা। ইংরেজরা তা দিয়েও দিয়েছে। কলকাতায় ঝড়ের ধাক্কাও ইংরেজরাই সামলেছে।”  

“কলকাতায় ঝড়ের ধাক্কা মানে? আপনি কোন ঝড়ের কথা বলছেন বলুন তো?” আমি জানতে চাইলাম।

“৩০ সেপ্টেম্বর, ১৭৩৭। সেদিন সারা রাত ধরে চলেছিল ঝড়ের তাণ্ডবলীলা। সঙ্গে অঝোরধারায় বৃষ্টি আর মুহুর্মুহু বজ্রপাত। পরদিন সকালবেলা আর কলকাতাকে চেনা যায়নি। ২০২০-র আমফানে কলকাতার অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ক্ষতির পরিমাণ ১৭৩৭ সালের তুলনায় কিছুই নয়। প্রায় সমস্ত মাটির বাড়ি ধসে গিয়েছিল। সাহেবপাড়ার বেশ ক’টা পাকাবাড়িও কুপকাৎ হয়েছিল। কত যে গাছ পড়েছিল তার ইয়ত্তা নেই। হাস-মুরগি, গরু-ছাগল সব ভেসে চলে গিয়েছিল, মরে পড়েছিল এদিক-ওদিক। কাক-শকুনও মরেছিল অনেক। মানুষের দুর্দশার অন্ত ছিল না। এর ওপর আবার বন আর নদী থেকে বাঘ-হরিণ, হাঙর-কুমির ঢুকে পড়ে বিপদ বাড়িয়ে দিয়েছিল। একটা জাহাজের খোলে কীভাবে যেন ঢুকে বসেছিল একটা ইয়া লম্বা কুমির। সে নাকি দু’তিনটে লোককে গিলেও নিয়েছিল।

“কোম্পানিরও ক্ষতি হয়েছিল বিস্তর। গঙ্গায় বাঁধা ছিল অনেকগুলো মালবোঝাই জাহাজ আর নৌকা। সেগুলোর আর কোনো চিহ্নই ছিল না। প্রকৃতির অমন ধ্বংসলীলা কলকাতায় আর কোনোদিন দেখা যায়নি। আমফান তো সেই ঝড়ের কাছে নস্যি। কলকাতার ঐ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে লেগেছিল পাক্কা দুটো বছরা”

“দামোদরও তো তখন সপরিবারে কলকাতায় ছিল। তার কী হাল হল বললেন না তো?” গৌতম মন্তব্যটা করল।

“মনাদা এবার একটু থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমি সেটাই বলতে যাচ্ছিলাম। শেষ রাতে ঝড়ে একটা বিশাল গাছ ভেঙে পড়েছিল দামোদরের মাটির ঘরের ওপর। তাতে ঘরটার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। দামোদর কোনও মতে জানকিকে নিয়ে ওই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে এসেছিল ঘরের বাইরে। আশ্রয় নিয়েছিল পাশের বাড়ির বারান্দায়। সেখানে দাঁড়িয়েই খানিক পরে দামোদরের চোখে পড়ল দূরে একটা খালের পাড়ে কয়েকজন ভয়ে চিৎকার করছে। তখন সবে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। জানকিকে দাঁড় করিয়ে দামোদর ছুটে গেল সেই দিকে। তখন ঝড়ের দাপট অনেকটাই কমেছে। বৃষ্টি হচ্ছে ঝিরঝির করে। দামোদর দেখল, একটা কুমির খালে টেনে নিয়ে গেছে একটা বাচ্চা ছেলেকে। ঝড় কমার পর ছেলেটা বোধহয় একটু আগে প্রকৃতির ডাকে বাইরে বেরিয়েছিল। সে ভাবতেই পারেনি, তার ঘরের পিছনের খালে কুমির এসে হাজির হয়েছে। আসলে এই খালগুলো সবই গঙ্গার সঙ্গে যুক্ত। সারা রাত প্রবল বৃষ্টির জন্য গঙ্গার জল হুড়মুড় করে খালে ঢুকেছে। সেই জলের সঙ্গেই কুমিরটা চলে এসেছে এখানে।

“যাইহোক, ওই দৃশ্য দেখে দামোদর আর স্থির থাকতে পারল না। খালে নেমে ছেলেটাকে উদ্ধার করার চেষ্টা শুরু করল। একটা গাছের ভাঙা ডাল দিয়ে সে কুমিরটার মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করতে লাগল। তাতে একটা সময় কুমিরটা বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিল বটে, কিন্তু হামলে পড়ল দামোদরের ওপর। যুবক বয়সে দামোদর জঙ্গলে বাঘের সঙ্গে লড়াই করে তাকে কুপোকাত করেছিল। চল্লিশ বছর বাদে এবার সে লড়াই করল কুমিরের সঙ্গে। কিন্তু এবার আর তার হাতে কোনও ধারালো অস্ত্র নেই। পাশাপাশি বয়স বৃদ্ধির কারণে তার শরীরের বলও অনেকটাই কমেছে। তাও বেশ কিছুক্ষণ দামোদর কুমিরটার সঙ্গে লড়াই করল প্রবল বিক্রমে। আর এটা করতে গিয়ে এবার ভালোমতো ঘায়েল হল সে। ইতিমধ্যে সেই আহত ছেলেটির বাবা আর কাকাও খালে নেমে গাছের ভাঙা ডাল দিয়ে কুমিরটাকে আঘাত করতে শুরু করে দিয়েছিল। অবস্থা বেগতিক বুঝে এবার কুমিরটা খালের জলে ডুব দিয়ে নদীর দিকে পালিয়ে গেল।

“দামোদর তখন রীতিমতো রক্তাক্ত। ওর গলায় বড়ো ক্ষত তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে গলগল করে রক্ত ঝরছে। সবাই ধরাধরি করে দামোদরকে খাল থেকে তুলল। নিয়ে গেল ওই বাড়ির ভিতরে। জানকি ইতিমধ্যে ওখানে ছুটে চলে এসেছে। নিজের কাপড় ছিঁড়ে গলার ক্ষতে জড়িয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করল সে। কিন্তু ক্ষত গভীর। রক্ত বন্ধ করা গেল না কিছুতেই।

“ঝড়-বৃষ্টিতে কলকাতা সেই মুহূর্তে তছনছ হয়ে গেছে। তাই দামোদরকে যে কোনও ডাক্তার-কবিরাজের কাছে নিয়ে যাবে, সেই উপায়ও ছিল না। স্থানীয় এক বৃদ্ধ কিছু নয়নতারার পাতা বেটে ক্ষতে লাগিয়ে রক্ত বন্ধের চেষ্টা করল। কিন্তু বিশেষ ফল হল না। দামোদর ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়তে লাগল।

“বেলায় ঝড়-বৃষ্টি পুরোপুরি থামার পর ছেলে ভৈরব যখন ওখানে পৌঁছল, তখন দামোদর একেবারে মৃত্যুর দোড়গোড়ায়। ছেলের কোলে মাথা রেখেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল।”  

“ছেলে আগের রাতে ছিল কোথায়?” বিশু জানতে চাইল।

“ভৈরব সেই রাতে ছিল তার শ্বশুরবাড়িতে। আসলে তার স্ত্রী যশোদা তখন ছিল সন্তানসম্ভবা। আগেকার দিনে তো বিবাহিতা মেয়েদের ওই সময় বাপেরবড়োিতেই রেখে আসার চল ছিল। ভৈরব তাই ঝড়ের আগেরদিন তার বছর আটেকের ছেলে আর পোয়াতি বউকে নিয়ে চলে গিয়েছিল শ্বশুরবাড়ি গোবিন্দপুরে। ভাগ্যিস গিয়েছিল, না হলে ঝড়ের রাতে গাছ ভেঙে ওরা আহত হতে পারত, এমনকি মরেও যেতে পারত।”  

“গোবিন্দপুরটা কত দূরে মনাদা?”

“আরে দূর হতে যাবে কেন, ওটা তো এখনকার ময়দানের দিকটা—বড়োজোর ওদের কলকাতার বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার। আরে বাবা, কলকাতা, সূতানুটি আর গোবিন্দপুর নিয়েই তো কলকাতা শহর গড়ে উঠেছিল, ভুলে গেলে নাকি।”  

“তাহলে তো ওখানেও আগের রাতে ঝড় হয়েছে?”

“হয়েছে তো বটেই। কিন্তু ভৈরবের শ্বশুরবাড়ির ওপর তো আর কোনও বড়োগাছ ভেঙে পড়েনি। তাছাড়া গোবিন্দপুরের ঐবাড়িটা কলকাতার এই বাড়ির মতো গঙ্গার অত কাছাকাছি ছিল না। ফলে ওখানে রাতে হুহু করে নদীর জলও ঢোকেনি।”  

“বুঝলাম। তারপর কী হল বলুন।”  

“তারপর আর কী! দামোদরের ওই অকস্মাৎ মৃত্যুতে পরিবারের সবাই খুব ভেঙে পড়ল। জানকি মনে মনে এতটাই আঘাত পেল যে সে অচিরেই ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়ল। আর তিন মাস যেতে না যেতেই চলে গেল এই পৃথিবী ছেড়ে। এদিকে ভৈরবের স্ত্রী যশোদা এবার এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। দুই ছেলেমেয়ে আর বৌকে নিয়ে তখন ভৈরব কোনোমতে দিনগুজরান করতে লাগল। কারণ ঝড়ে যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তাতে সেই সময়ে কলকাতার জনজীবন একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। অনেক লোকেরই হাতে কাজকর্ম কিছু ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অবশ্য এই সময় যতটা সম্ভব কলকাতার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। দুবছরের জন্য খাজনা মকুবও করে দিয়েছিল। চাল নিয়ে কালোবাজারিও হতে দেয়নি।”  

“ভৈরব কী কাজ করত মনাদা?” মলয় জানতে চাইল।

“ভৈরব খানিক পড়াশোনা শিখেছিল। সে কলকাতার এক ব্যবসায়ীর গদিতে খাতা লেখার কাজ করত। পাশাপাশি সে রোজ ভোরে উঠে গঙ্গার ধারে গিয়ে নিয়মিত শরীরচর্চাও করত। শরীরের গঠনটা তার বাবার মতোই ছিল। গায়ে শক্তিও ছিল অসম্ভব। আর একটা ব্যাপার, ভৈরব ছিল খুব সৎ মানুষ। এই কারণে মালিক থেকে শুরু করে স্থানীয় মানুষজন তাকে খুব ভালোবাসত। আর এই সততার জন্যই সে একদিন জমিদার রামকান্ত রায়ের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠতে পেরেছিল।”  

“এই জমিদার রামকান্ত রায়টা আবার কে?” বিশু জিজ্ঞাসা করল।

“তার পরিচয় জানতে গেলে একেবারে সতেরো শতকের শেষ দিকে চলে যেতে হবে। সেই সময়ে রাজশাহীর পুঠিয়ার রাজা ছিলেন দর্পনারায়ণ। আর সেখানকার লস্করপুর পরগনার বারইহাটি গ্রামের তহশীলদার ছিলেন কামদেব। এই কামদেবের দুই ছেলে—রামজীবন ও রঘুনন্দন। রঘুনন্দন ছিলেন খুব বুদ্ধিমান। অল্প বয়সেই লেখাপড়ার সঙ্গে ফারসি ভাষা দিব্যি আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। আর তাতে খুশি হয়ে রাজা দর্পনারায়ণ সেই অল্প বয়সেই রঘুনন্দনকে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আন্ডারে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিছুদিন বাদেই নবাবের দেওয়ান বনে গিয়েছিলেন রঘুনন্দন।

“ভাইকে তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাই যে সমস্ত জমিদারেরা সঠিক সময় খাজনা দিতে পারত না, তাদের জমি নিলামে কিনে নিয়ে তিনি ভাই রামজীবনের নামে বন্দোবস্ত করে দিতেন। ১৭০৬ সালে বিখ্যাত জমিদার গণেশরাম রায় ও ভগবতীচরণ চৌধুরী রাজস্ব দিতে পারেননি বলে এভাবেই তাঁদের জমিদারিও রঘুনন্দন কিনে নিয়েছিলেন ভাইয়ের নামে। এরপরেই রঘুনন্দন ও রামজীবন একটা জমিদারী পত্তন করেন।

“ওদিকে রাজা দর্পনারায়ণ দুই ভাইকে একটা ব্রহ্মোত্তর জমি দান করেছিলেন। রামজীবন সেই জায়গা বসবাসের উপযুক্ত করে তুলে নাম দিলেন নাট্যপুর। সেখানে প্রায় পাঁচ বছর ধরে গড়ে তুললেন একটা বিশাল রাজবাড়ি। এই নাট্যপুর-ই ক্রমে পরিচিত হল নাটোর নামে। খুব অল্প দিনেই সমস্ত সুযোগ সুবিধাসমেত নাটোর একটা শহর হিসেবেও পরিচিতি পেয়ে গেল।”  

“নাটোর মানে বনলতা সেন যেখানে থাকে?” প্রশ্নটা করে দেবু নিজেই যেন লজ্জা পেয়ে গেল।

মনাদা বললেন, “এতক্ষণে তুমি একটা ঠিক কথা বললে। জীবনানন্দ তাঁর বনলতা সেন কবিতায় ঐ নাটোরের কথাই বলেছেন বটে। যাইহোক, যে কথা বলছিলাম, রামজীবন ১৭০৬ সাল থেকে ১৭৩০ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন নাটোরে। তাঁর একমাত্র ছেলে অল্পবয়সেই মারা গিয়েছিল। তাই রামজীবন দত্তক নিয়েছিলেন এক বালককে। রামজীবনের সেই দত্তক পুত্রের নামই রামকান্ত রায়। বাবার মৃত্যুর পর রামকান্তই নাটোরের জমিদার হলেন। কিন্তু তখন তাঁর বয়স খুব কম, জমিদারি চালানোর কোনও অভিজ্ঞতাও নেই। তাই তাঁর হয়ে সেই বিশাল জমিদারি দেখাশোনা করতেন দেওয়ান দয়ারাম রায়। রামকান্ত ছিলেন আসলে নামেই রাজা।”  

“এই রামকান্তের সঙ্গেই রানি ভবানীর বিয়ে হয়েছিল তো?” গৌতম জিজ্ঞাসা করল।

মনাদা বললেন, “হ্যাঁ। সেই বিয়ে নিয়েও একটা দারুণ গল্প আছে। একদিন শিকারের খোঁজে বেরিয়ে এক অপরূপ সুন্দরীকে দেখতে পেয়েছিলেন রামকান্ত। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, মেয়েটি বগুড়ার এক জমিদার আত্মারাম চৌধুরীর মেয়ে। তবে আত্মারামের জমিদারি নাটোরের থেকে অনেক ছোটো। তাতে কী! রামকান্ত ঠিক করলেন ওই মেয়েকেই বিয়ে করবেন।

“বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হল আত্মারাম চৌধুরীর কাছে। এত বড়ো এক জমিদার তাঁর মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে জেনে তো আত্মারাম এককথায় রাজি। কিন্তু মেয়ে ভবানী বড্ড জেদি। সে রামকান্তকে বিয়ে করার জন্য তিনটে শর্ত রাখল। এক, বিয়ের পর এক বছর তাকে বাপের বাড়িতে থাকতে দিতে হবে। দুই, বিয়ে উপলক্ষে এলাকার দরিদ্র মানুষজনকে জমি দান করতে হবে। আর তিন নম্বর শর্তটা ছিল, বাবার জমিদারি থেকে নাটোর পর্যন্ত রাস্তা বানিয়ে সেটা লাল শালু দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। তার ওপর দিয়ে হেঁটেই ভবানী শ্বশুরবাড়ি যাবে। রামকান্ত ওই প্রত্যেকটা শর্তই মেনে নিয়েছিলেন। আর বিয়ের পর বগুড়ার সেই ছোট্ট জমিদারের মেয়ে হয়ে উঠেছিলেন নাটোরের জমিদার বাড়ির বৌ, রানি ভবানী।

“১৭৪৮ সালে রামকান্ত মারা যান। রানি ভবানীর বয়স তখন মাত্র ২৭ বছর। নবাব আলিবর্দি খাঁ নাটোরের জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন ঐ রানি ভবানীর হাতেই। পরে রানি ভবানীর জমিদারি এখনকার রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম পেরিয়ে মালদা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। টানা ৫৪ বছর তিনি একা হাতে এই বিশাল জমিদারি সামলেছিলেন। তাই অনেকেই ওঁকে বলত ‘অর্ধবঙ্গেশ্বরী’। রানি ভবানী সেই সময়ে নবাবকে রাজস্ব দিতেন বছরে প্রায় সত্তর লক্ষ টাকা। বাংলার নবাব এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি–দু’পক্ষই রানিকে বেশ সমীহ করে চলত।

“রানি ভবানী প্রজাদের সমস্ত সুবিধা-অসুবিধার দিকে নজর রাখতেন। শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির চেষ্টা করেছিলেন। পানীয় জলের জন্য অনেকগুলো জলাশয়, পথিকদের জন্য পান্থশালা, যাতায়াতের জন্য সেতু আর রাস্তা তৈরি করেছিলেন তিনি। হাওড়া থেকে কাশী পর্যন্ত রাস্তার ব্যবস্থাও করেছিলেন। প্রজারা সম্মান করে তাঁকে মহারানী বলে ডাকত। ১৮০২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মারা যান।”  

“আপনি তো মনাদা মূল গল্প থেকে অনেক দূরে চলে গেলেন। ভৈরব কীভাবে জমিদার রামকান্ত রায়ের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিল, সেটাই তো বললেন না! “

মনাদা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “আসলে কী জানো, এই রামকান্ত রায়ের কথা উঠলেই রানি ভবানীর কথা আপনা-আপনি চলে আসে। অমন প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাবান মহিলা বাংলার ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি দেখা যায়নি।

“যাইহোক, এবার আসল কথায় আসি। দামোদর মারা যাওয়ার বছর খানেক বাদের ঘটনা। সেদিন সকালবেলা ভৈরব যথারীতি গঙ্গার ধারে শরীরচর্চা করে নিজের ঘরে ফিরছিল। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই তার কানে ভেসে এল ‘চোর চোর’ চিৎকার। তারপরেই চোখে পড়ল একটা ষন্ডামার্কা লোক পালিয়ে এদিকেই ছুটে আসছে। আর তার বেশ কিছুটা পিছনে লাঠি নিয়ে দৌড়ে আসছে দুজন সিপাই। তারাই ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করছে। চোরটা ভৈরবের কাছাকাছি এসে পড়েছিল। তাই ভৈরব আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে চোরটার পথ আটকালো। কিন্তু চোরটাও সহজে ধরা দেওয়ার বান্দা নয়। সে ভৈরবের সামনে এসেই নিজের কোমর থেকে একটা ছোরা বের করল। ভৈরবকে বলল ভালোয় ভালোয় রাস্তা ছেড়ে দিতে। নাহলে সে মারা পড়বে।”  

মনাদা এই পর্যন্ত বলে আবার একটা সিগারেট ধরালেন। মলয়ের আর তর সইছিল না। ও বলল, “তারপর কী হল বলবেন তো!”

মনাদা একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “কী আর হবে। ভৈরব দামোদরের ছেলে। ছোরা দেখে সে কি আর ভয় পাওয়ার লোক। উলটে সে চোরটার ওপর ভীষণ খেপে গেল। রাস্তার পাশেই পড়ে ছিল একটা গাছের ভাঙা ডাল। নিমেষে সেটা হাতে তুলে নিয়ে সে সজোরে আঘাত করল চোরটাকে। রাস্তায় পড়ে গেল লোকটা। এবার ভৈরব চেপে বসল তার বুকের ওপর, হাত মুচড়ে কেড়ে নিল ছোরাটা।

“ইতিমধ্যে সিপাই দুটো ওখানে চলে এসেছে। তারা এবার পাকড়াও করল চোরটাকে। তারপর তার কোমর থেকে উদ্ধার করল একটা থলি। একটা সিপাই এবার হুংকার দিয়ে চোরটাকে বলল, ‘তোর এত বড়ো সাহস, রাজাবাবুর টাকা চুরি করেছিস। তোর কী শাস্তি হয় দেখ।’

“অন্য সিপাইটা ভৈরবকে বলল, ‘তুমি ভাই এই চোরটাকে ঘায়েল করে আমাদের খুব উপকার করেছ। তুমি আমাদের সঙ্গে একবার চল। তুমিই একে ধরেছ শুনলে রাজাবাবু আর দেওয়ানজি খুব খুশি হবে। তুমি বকশিস পাবে।’

“ভৈরব বকশিস পাওয়ার কথা শুনে ওদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। তাছাড়া ‘রাজাবাবু’কে দেখার ইচ্ছাও তার খুবই হচ্ছিল।

“খানিকটা উত্তরদিকে হাঁটার পরেই ভৈরবের চোখে পড়ল একটা বড়োসড় পাকাবাড়ি। তার চারপাশে নানা গাছগাছালি। ওই বাড়ির সামনেই উদ্বিগ্ন চেহারায় বসেছিলেন অভিজাত পোশাক পরা দুজন মানুষ। তাদের মধ্যে যার বয়স চল্লিশের কোঠায়, গলায় দুগাছা মুক্তোর মালা, তিনিই জমিদার রামকান্ত রায়। উনিই সিপাইদের ‘রাজাবাবু’। আর তাঁর পাশে যে লম্বা চেহারার প্রৌঢ় মানুষটি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনিই দেওয়ান দয়ারাম রায়। নাটোরের জমিদারি আসলে উনিই সামলান। জমিদারির বিশেষ কিছু কাজে উনি আগেও বেশ কয়েকবার কলকাতায় এসেছেন। এবার সঙ্গে এনেছেন রামকান্তকেও। উঠেছেন এই বাংলোটায়।

“হবসন নামের এক সাহেব এই বাংলোটা বানিয়েছিল বছর দশেক আগে। তবে সে অসুস্থ হয়ে পড়ায় চার বছর আগে বিলেত চলে গেছে। একজন এদেশিয় লোক বাড়িটা দেখাশোনা করে। সে-ই হোমরা চোমরা লোকেদের বাড়িটা কিছু সময়ের জন্য ভাড়া দেয়। সঙ্গে রামকান্ত আছেন বলে এবার কলকাতায় এসে দয়ারাম তাই ওই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছেন দিন দশেকের জন্য। সঙ্গে এনেছেন চারজন সিপাই আর দুজন পরিচারককেও।

“যে লোকটা এই বাড়ি দেখভাল করে, সেই একজন রাঁধুনি জোগাড় করে দিয়েছিল। দিনসাতেক সেই রাঁধুনি খুব মন দিয়েই কাজ করেছিল। কিন্তু আজ সকালে হঠাৎই চুপি চুপি রামকান্তের ঘরে ঢুকে তোরঙ্গ খুলে টাকার থলিটা নিয়ে হনহন করে বেরিয়ে চলে গেছে বাংলোর বাইরে। রাজাবাবুর ঘর থেকে ওভাবে লোকটাকে বেরিয়ে যেতে দেখে এক পরিচারকের সন্দেহ হয়েছিল। সে ব্যাপারটা জানিয়েছিল দেওয়ানসাহেবকে। আর তক্ষুনি দেওয়ানসাহেব দুজন সিপাইকে আদেশ দিয়েছিলেন ওকে পিছু নিয়ে ধরে আনতে। ইতিমধ্যে লোকটা ছুটতে শুরু করে দিয়েছিল। ভেবেছিল কেউ ওকে ধরতে পারবে না। সত্যি বলতে কি, দুজন সিপাই ওর পিছু নিলেও ওরা শেষ পর্যন্ত মোটেই ওর নাগাল পেত না। কারণ আর কিছুটা ছুটতে পারলেই সে গঙ্গার ধারে নিজের এলাকায় পৌঁছে যেত। ওখানে তার লুকোবার অনেক জায়গা। কিন্তু মাঝপথে ভৈরব এসে পড়ায় পালানো আর সম্ভব হয়নি।

“যাইহোক, ভৈরব সশস্ত্র চোরটাকে রাস্তায় ঘায়েল করেছে শুনে রামকান্ত এবং দয়ারাম দুজনেই খুব খুশি হলেন। তারপর ভৈরব কী করে, কোথায় থাকে—সব কিছু জেনে নিয়ে দয়ারামের পরামর্শ মতো রামকান্ত ওকে নাটোর যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। বললেন ওখানে ভৈরবকে উনি নিজের পদাতিক সৈন্যবাহিনীতে চাকরি দেবেন, পাশাপাশি রাজবাড়ির কাছেই ওকে সপরিবারে থাকার ঘরও দেবেন। ভৈরব এখন খাতা লিখে যা হাতে পায়, ওখানে গেলে রোজগার প্রায় ডবল হয়ে যাবে। আর ওর ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার ব্যবস্থাও রাজামশাই-ই করবেন।

“সত্যি বলতে কি, নাটোর যাওয়ার এই প্রস্তাব ভৈরবের কাছে ছিল অনেকটা হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। তাছাড়া মা-বাবার অকালমৃত্যুর পর তার আর কলকাতায় থাকতে ভালো লাগছিল না। তাই রামকান্ত রায়ের প্রস্তাব মেনে সে বাক্সপ্যাটরা নিয়ে সপরিবারে দুদিন বাদেই রাজামশাইয়ের সঙ্গে নাটোরে চলে গেল।

“ওখানে পদাতিক সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়ে অল্পদিনের মধ্যেই ভৈরব তরোয়াল, বল্লম ইত্যাদি অস্ত্রচালনায় বেশ দক্ষ হয়ে উঠল। তারপর শিখে গেল বন্দুক চালাতেও। দেখা গেল ভৈরবের টিপ অসম্ভব ভালো। অনেক দূর থেকেও সে দিব্যি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারছে।

“ভৈরবের বছর দশেকের ছেলে নারায়ণ তখন নাটোরের এক পণ্ডিতমশায়ের কাছে মন দিয়ে লেখাপড়া শিখছিল। পাশাপাশি যুদ্ধবিদ্যাতেও ছিল তার প্রবল আগ্রহ। বাবাকে সে প্রবল জোরাজুরি করে লাঠিখেলা আর তরোয়াল চালানো শেখাতে রাজি করিয়েছিল। প্রতিদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে সে বাবার মতো শরীরচর্চাও করত। ইতিমধ্যে ভৈরবের স্ত্রী যশোদা হয়ে উঠেছিল রানি ভবানীর খুব কাছের মানুষ। ওরা নাটোরে আসার পর রানিমাই একদিন যশোদাকে ছেলে-মেয়ে সমেত রাজবাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তারপর থেকে যশোদা প্রতিদিন নিয়ম করে নিজের কোলের মেয়ে হেমলতাকে নিয়ে ওখানে যেত। রানিমার মেয়ে তারাসুন্দরী যশোদাকে খুব পছন্দ করত।”

“ওঁদের কি ঐ একটাই মেয়ে?”

“না, রানি ভবানী এবং রামকান্তের ছিল তিন সন্তান। তাদের মধ্যে শুধু মেয়ে তারাসুন্দরীই জীবিত ছিল, দুই ছেলে মারা গিয়েছিল ছোটোবেলাতেই। তাই পরে রামকৃষ্ণ নামের একটি ছেলেকে দত্তক নিয়েছিলেন রানি ভবানী। পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লার হয়ে লড়াই করার জন্য সৈন্যবাহিনীও পাঠিয়েছিলেন রানি ভবানী। তাঁর মেয়ে তারাসুন্দরীকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন সিরাজ-উদ-দৌল্লা স্বয়ং।”  

“বুঝলাম। আপনি আবার আগের গল্পে ফিরে আসুন মনাদা। নবাব সুজাউদ্দিনের কথা বলছিলেন।”  

“হ্যাঁ, সে কথাতেই আসছি। একযুগ ভালো-মন্দে নবাবি করে সুজাউদ্দিন মাটি নিলেন ১৭৩৯ সালে। এতদিনে তাঁর ছেলে সরফরাজ খাঁ নবাব হওয়ার সুযোগ পেলেন। কিন্তু বলতে বাধা নেই, নবাব হওয়ার কোনো যোগ্যতাই তাঁর ছিল না। বাবার থেকেও বেশি ভোগী তিনি, অন্তঃপুরে পনেরশো জেনানা। তার ওপর সারাক্ষণ একদল গাঁজাখোর, আফিমখোর ফকির-সন্ন্যাসীদের নিয়ে পড়ে থাকেন তাদের ভেল্কিবাজি দেখবেন বলে। পাশাপাশি সামন্তদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেন খুব। বাবার আমলের লোক হাজি মহম্মদের সঙ্গেও বন্ধুদের মদতে ঝামেলা জুড়ে দিয়েছেন। শেঠদের সঙ্গেও টাকা নিয়ে অশান্তি করেন। এমনকি একদিন ফতেচাঁদের এক বউমাকেও অকারণে অপমান করে বসলেন। অতঃপর সরফরাজকে গদিচ্যুত করবার তোড়জোড় পড়ে গেল। হাজি মহম্মদ নিজের ভাই আলিবর্দি খাঁকে উস্কাতে লাগলেন। আলিবর্দির মধ্যে যে নবাব হওয়ার যোগ্যতা আছে তা নিজামতের কেউই অস্বীকার করলেন না। তাই জগৎশেঠ ফতেচাঁদ থেকে শুরু করে অন্যান্য শেঠ এবং সামন্তরাও একে একে আলিবর্দির পিছনেই দাঁড়ালেন। ওদিকে আলিবর্দিরও নবাব হওয়ার বাসনা ষোলআনাই ছিল। তাই গদি উল্টোতে বেশি দেরি হল না। তাতে অবশ্য রামকান্ত রায় ও ভৈরবের ভূমিকাও কম ছিল না।”  

“তার মানে নাটোরের রাজা আলিবর্দির পক্ষ নিয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ সে তো বটেই।”   মনাদা এই পর্যন্ত বলে থেমে গেলেন। গৌতম বলল, “আরেকবার বিমলকে চা দিতে বলি। মোগলাই তো ন’টা নাগাদ খাব।”  

মনাদা মাথা চুলকে বললেন, “ঠিক আছে তা-ই বল। চা পেটে না পড়লে গল্প ঠিক জমে না।”  

গৌতম সঙ্গে সঙ্গে চায়ের অর্ডার দিয়ে দিল। এদিকে আমরা সবাই অস্থির হয়ে উঠছি। মলয় তো বলেই ফেলল, “কী মনাদা, কীভাবে সরফরাজের গদিটা ওল্টালো, সেটা বলুন।”  

“মনাদা গলা খাঁকারি দিয়ে আবার শুরু করলেন, “১৯৪০ সালের মার্চের শেষ দিক। নবাব সরফরাজ খাঁকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন আলিবর্দি খাঁ। তিনি আকবরনগর চাকলার সীমান্ত পেরিয়ে সুতির কাছে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে হাজির হলেন। গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে আওরঙ্গাবাদ থেকে চরকা বালিয়াঘাটায় শিবির বসালেন আলিবর্দি। এই খবর পেয়ে সরফরাজ খাঁ গঙ্গার পূবপাড় ধরে গিরিয়ার কাছে কোমরায় পৌঁছলেন। তারপর গঙ্গা পার হয়ে বিশাল বাহিনী নিয়ে সেনাপতি ঘাউস খানের নেতৃত্বে আলিবর্দির শিবির থেকে দশ মাইল দূরে তিনিও শিবির পাতলেন।

“দু’ পক্ষেরই সামরিক শক্তি প্রায় একইরকম ছিল। দু’দলেই তখন প্রায় বিশ হাজার পদাতিক সেনা আর দশ হাজার অশ্বারোহী। তারমধ্যে আলিবর্দির সঙ্গে হাজার তিনেক আফগান যোদ্ধা। সরফরাজ খাঁ আর আলিবর্দি খাঁর বাহিনীতে দশটা করে কামানও ছিল।

“যাইহোক, এরপর দুই শিবির থেকেই পরস্পরকে বিপথে চালনা করার চেষ্টা শুরু হল। গোপনে দল ভাঙানোর খেলাও চলতে লাগল। বিশেষ করে আলিবর্দির শিবির থেকে ঘাউস খান, মর্দান আলি খানের মতো অভিজ্ঞ সেনাপ্রধানদের টাকাপয়সা বা উঁচু পদের লোভ দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে টানার জোর চেষ্টা চলছিল। একই সঙ্গে জগতশেঠ ফতেচাঁদ এবং অন্যান্যরা নবাবি বাহিনীর মধ্যেই আলিবর্দির পক্ষে ভাঙন ধরাবার চেষ্টা করছিলেন।

“আলিবর্দি সরফরাজকে তিন দিক থেকে ঘিরে ধরার পরিকল্পনা করলেন। ঠিক হল সেনাপতি নন্দলালের নেতৃত্বে প্রথম বাহিনীটি ঘাউস খান এবং মীর সফিউদ্দিনের বাহিনীর সঙ্গে লড়বে। আর আলিবর্দি নিজে অন্য দুটি বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন। আফগান এবং বাহেলিয়া সর্দারদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল সেই দুটো বাহিনী। ঐ দুই বাহিনী নিয়ে ১৭৪০ সালের ৯ এপ্রিল মাঝরাতে আলিবর্দি গঙ্গা পেরিয়ে সরফরাজের বাহিনীর পিছনে হাজির হলেন।

“আলিবর্দির এক সেনাপতির নাম ছিল নাওয়াজিস মহম্মদ খান। তিনি হাজি আহমদের ছেলে। আলিবর্দির বড় মেয়ে মেহেরুন্নিসা বা ঘসেটি বেগমকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। আলিবর্দি নবাব হওয়ার পরে তাঁকে খাস-সম্পত্তির দেওয়ান ও ঢাকার সুবাদার বানিয়েছিলেন। সেই নাওয়াজিস মহম্মদ খান-এর নেতৃত্বে আবদুল আলি খান, শামসির খান এবং অন্যান্য আফগান সেনাপতিরা বাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললেন সরফরাজের শিবিরের দিকে। আর আলিবর্দি নিজে নাটোরের রাজা রামকান্তর বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে লাগলেন।”  

“ঐ বাহিনীতে ভৈরব ছিল নিশ্চয়ই?”

“রামকান্ত রায় আলিবর্দিকে যে বাহিনী দিয়েছিলেন, তাতে ভৈরব অবশ্যই ছিল। কিন্তু ৯ এপ্রিল রাতে সে আলিবর্দির সঙ্গে ছিল না। সে একদিন আগেই রাতের অন্ধকারে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সরফরাজের শিবিরের পিছনে পৌঁছে গিয়েছিল। সঙ্গে নিয়েছিল দুটো কামান।”  

“কেন?”

“রাতের বেলা অতর্কিতে হামলা করার জন্য। এই বুদ্ধিটা ভৈরবই আলিবর্দিকে দিয়েছিল। আসলে কদিন আগে সুতির কাছে শিবির বানিয়ে আলিবর্দি যখন সেনাপতিদের নিয়ে সরফরাজকে তিনদিক থেকে ঘিরে ধরার প্ল্যান করছিলেন, তখন ভৈরবও সেখানে হাজির ছিল পাহারাদার হিসেবে। নিজের বাহিনী আলিবর্দির হাতে তুলে দেওয়ার সময় রামকান্ত রায় আলাদা করে তাঁকে ভৈরবের কথা বলে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ভৈরব খুব বিশ্বস্ত এবং সাহসী। ওকে নিশ্চিতভাবে ভরসা করা যায়। তাই সেনাপতিদের নিয়ে রণকৌশল ঠিক করার সময় আলিবর্দি নিজের শিবিরে পাহারাদার হিসেবে যে কজনকে রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে ভৈরব অন্যতম। ভৈরব সেই আলোচনা থেকেই জানতে পারল যে নাটোরের বাহিনী নিয়ে আলিবর্দি খাঁ নিজে রাত্রিবেলা রওনা দেবেন গিরিয়ার উদ্দেশে। আর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই হামলা শুরু করবেন সরফরাজের শিবিরে। পরিকল্পনাটা তার মনে ধরেনি। তাই সে আলিবর্দিকে মৃদুস্বরে বলেছিল, ‘অপরাধ নেবেন না হুজুর, একটা কথা বলব?’

“সেনাপতিদের নিয়ে আলোচনার মধ্যে একজন সাধারণ সিপাইয়ের অমন মন্তব্য অন্য কেউ কীভাবে নিতেন জানি না, হয়তো ভৈরবকে শিবির থেকে বের করে দিতেন, বা কড়া শাস্তির নিদান দিতেন। কিন্তু আলিবর্দি তেমন কিছুই করেননি। উনি চিরকালই ঠান্ডা মাথার লোক। তাই সেনাপতিদের নিয়ে জরুরি আলোচনার মধ্যে একজন সাধারণ সিপাইয়ের নাক-গলানোতে তিনি সেদিন মোটেও বিরক্ত হননি, উলটে ভৈরবকে তার বক্তব্য জানানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। ভৈরব তখন আলিবর্দিকে বলেছিল, ‘দিনের আলো ফোটার অপেক্ষা না করে যদি আপনি রাতের অন্ধকারেই হামলাটা করেন হুজুর, তাহলে ওরা দারুণ ঘাবড়ে যাবে, সেভাবে প্রত্যাঘাত করতেই পারবে না। তাতে প্রথম ঝটকাতেই ওদের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হবে।’

“একথা শুনে বিরক্তির সুরে শামসির খান বলেছিল, ‘সেটা সম্ভব নয়। আমাদের এই দুটো বাহিনীর সঙ্গে যাবে সাতখানা কামান। রাতের অন্ধকারে ঐ কামান ঠিকঠাক বসানো সম্ভব নয়। আর কামান ছাড়া শত্রুশিবিরে আক্রমণ করে কোনো লাভ হবে না। তাই দিনের আলো ফোটার আগে…”

“শামসির খানের কথা শেষ হওয়ার আগেই ভৈরব বলেছিল, ‘কিন্তু আমরা যদি আগে থেকেই ঐ শিবিরের পিছনে দুটো কামান বসিয়ে রাখি, তাহলে তো…’

“‘কিন্তু ওখানে আগে থেকে দুটো কামান বসাবে কে? কীভাবেই বা বসাবে? সরফরাজের সেনারা দেখে ফেলবে তো?'”

ভৈরব আবার বিনীত স্বরে বলেছিল, ‘আমি বসাব। আমার সঙ্গে শুধু বাছাই করা বিশজন সিপাই দিন। ৮ তারিখ রাতের অন্ধকারে আমরা বেরিয়ে পড়ব দুটো কামান নিয়ে। সরফরাজ খানের শিবিরের পিছনে ঘনজঙ্গল। ওখানে কামান দুটো লুকিয়ে রাখব। আর ৯ তারিখ মাঝরাতে জঙ্গল থেকে কামান দুটো বের করে জায়গা মতো বসিয়ে দেব যাতে আপনারা বাহিনী নিয়ে পৌঁছেই হামলা শুরু করে দিতে পারেন।’

“একথা শুনে আব্দুল আলি খান বলেছিলেন, ‘তোমার পরিকল্পনাটা মন্দ নয়। কিন্তু ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আর যদি সেটা হয়, তাহলে আমাদের দুটো কামান শত্রুপক্ষের হাতে চলে যাবে। তাহলে আমরা অনেকটাই কমজোরি হয়ে যাব। আমাদের পরিকল্পনাটাও ওরা জেনে যাবে।’

“এর জবাবে ভৈরব বলেছিল, ‘যেখানে সরফরাজ খাঁয়ের তাঁবু পড়েছে, ঐ জায়গাটা আমি ভালোমতো চিনি। আমাদের জমিদারবাবুর এক আত্মীয় ওই এলাকাতেই থাকেন। তাঁর মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে রাজামশায় ওখানে গতবছর গিয়েছিলেন। আমাদের ছজনকেও সঙ্গে নিয়েছিলেন। ওখানে আমাদের কাজকর্ম তো কিছুই ছিল না। তাই দিন সাতেক গোটা এলাকাটা কজন মিলে চষে বেড়িয়েছি। ওখান থেকে আমাদের এই বালিয়াঘাটা আসার রাস্তাটাও আমি জানি। ঐ রাস্তার শুরুতেই একটা বড়োসড় জঙ্গল আছে। আমরা জনাবিশেক সিপাই ঐ জঙ্গলে দুটো কামান একটা দিন অনায়াসে লুকিয়ে রাখতে পারব। এটুকু ভরসা আমাদের ওপর করতে পারেন হুজুর।’

“আলিবর্দি খাঁ মন দিয়ে ভৈরবের কথা শুনছিলেন। এবার ভৈরবের বক্তব্য শেষ হলে উনি সেনাপতিদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনাদের কী মত?’ শামসির খান ভৈরবের প্রস্তাবে রাজি হননি। তিনি রাতে নন, ভোরের আলো ফোটার পরই হামলা করার পক্ষে। কিন্তু আব্দুল আলি খান এবং কিছু আফগান সর্দার ভৈরবের প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, গিরিয়ার কাছে আগে থেকে দুটো কামানের ব্যবস্থা করে রাখতে পারলে, এবং সেই কামান দেগে রাতেই সরফরাজের শিবিরে আঘাত হানতে পারলে এই যুদ্ধ জেতা অনেক সহজ হয়ে যাবে। এই বক্তব্য শুনে আলিবর্দি আর দ্বিধা করেননি। ভৈরবকে বলেছিলেন রাজা রামকান্ত রায়ের বাহিনী থেকে পছন্দ মতো দশজনকে বেছে নিতে। আর ওদের সঙ্গী হিসেবে দিয়েছিলেন আরো দশজন আফগান সেনা।

“ভৈরব সেদিন রাতেই নিজেদের বাহিনী থেকে দশজনকে বেছে নিয়েছিল। তাদের মধ্যে সেই পাঁচজনও ছিল যারা রামকান্ত রায়ের আত্মীয়ের বিয়েতে গতবছর গিরিয়ায় গিয়েছিল। তারপর ৮ তারিখ রাতে বিশজন সঙ্গী আর দুটো কামান নিয়ে সে রওনা হয়েছিল গিরিয়ার উদ্দেশে।”  

এই পর্যন্ত বলে মনাদা থামলেন। কারণ বিমলদা চা নিয়ে হাজির হয়েছে। মনাদা চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। মুখটা একটু কুঁচকে গেল। বিমলদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চা-টা একটু বেশিই ফুটিয়ে ফেলেছ বিমল। খানিক তিতকুটে হয়ে গেছে।”  

বিমলদা মাথা চুলকে একটু লজ্জিত মুখে বলল, “ঠিকই বলেছেন দাদা। আসলে এক খরিদ্দারের জন্য তড়কা বানাতে গিয়ে…। পরের বার দেখবেন একদম ঠিকঠাক বানাব।”   একথা বলেই ও সুড়ুৎ করে রান্নাঘরে চলে গেল।

মনাদা চুপচাপ নিজের কাপটা শেষ করতে লাগলেন। মলয়ের আর তর সইছিল না। ও জিজ্ঞাসা করল, “ভৈরব সেদিন রাতে দলবল নিয়ে গিরিয়ায় ঠিকঠাক পৌঁছতে পেরেছিল তো?”

মনাদা এবার শূন্য কাপটা টেবিলে রেখে বললেন, “হ্যাঁ, তা পেরেছিল। তবে কামান ঠেলে নিয়ে যেতে হয়েছিল তো, তাই সেদিন ওদের কোমরার জঙ্গলে পৌঁছতে প্রায় রাত কাবার হয়ে গিয়েছিল। তবে তখনও ভোরের আলো ফোটেনি, এই যা রক্ষে। ওরা জঙ্গলের মধ্যে কামান দুটো ঢুকিয়ে লতাপাতা দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল। ওদের সঙ্গে ছিল কিছু শুকনো খাবার। সেগুলো খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছিল পরের একুশ ঘণ্টা। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই জঙ্গলের মধ্যে ছড়িয়ে গিয়েছিল ওরা। তবে সকলেই দূর থেকে ওই কামান দুটোর দিকে নজর রেখেছিল। সকলের মনেই ভয় ছিল, পাছে সরফরাজ খানের কোনও সেনা ওদিকে চলে আসে। তবে ভাগ্য ভালো, শত্রু শিবিরের কেউই সেদিন ওখানে আসেনি।”  

“তারপর?”

“তারপর আর কী? ৯ মার্চ রাত দুটো নাগাদ আলিবর্দি দুটো বাহিনী নিয়ে পৌঁছে গেলেন সরফরাজের শিবিরের কাছে। ওদের দেখতে পেয়েই ভৈরব আর তার সঙ্গীরা জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা কামান দুটো বের করে আনল। খানিক পরেই সেই কামান থেকে সরফরাজের শিবিরের দিকে গোলা ছুড়ে যুদ্ধ শুরু করে দিলেন আলিবর্দি খাঁ। অতর্কিত এই আক্রমণে সত্যিই শত্রুপক্ষ প্রাথমিকভাবে বেসামাল হয়ে পড়ল। গোলার আঘাতে তাদের বেশ কিছু সৈন্য মারাও গেল। এই সময়ে আবার নওয়াজিস মহম্মদ খান আরেকদিক থেকে সরফরাজের বাহিনীকে আক্রমণ করলেন। আর ওদিকে নন্দলাল ব্যস্ত রাখলেন ঘাউস খানকে।

“যুদ্ধ রাত থেকে শুরু হয়ে গেলেও সূর্যের আলো ফোটার পর ফজরের নমাজ শেষ করে নবাব সরফরাজ খাঁ হাতে কোরান নিয়ে হাতিতে চড়ে হাজির হলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। এবার যুদ্ধ ভীষণাকার ধারণ করল। সরফরাজের অনেক ওজনদার সেনানায়ক, যেমন সুজাউদ্দিনের ভাইপো মীর মহম্মদ বাকির আলি খান, তার ভাই মীর কামাল, মীর গাদাই, মীর আহমদ, মীর সিরাজুদ্দিন, হাজি লুফত আলি খান যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারাল।

“সৈয়দ হুসেইন খান, নসরতউল্লা খান এবং অন্যান্য সেনাপতিরা ভীষণভাবে আহত হল। আর আলমচাঁদ তো আহত হয়েই যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে মুর্শিদাবাদে পালিয়ে গেলেন। তাঁর ডান হাতে গুলি লেগেছিল। কিছুদিন বাদে আলিবর্দি সিংহাসনে আরোহণ করার পরেই আলমচাঁদ মানসিক কষ্টে হিরের গুঁড়ো খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। মৃত্যুর আগে তাঁকে নাকি বউয়ের প্রবল গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছিল।

“যাইহোক, এরপর সরফরাজের বাহিনীর সেনারা পালিয়ে যাওয়ার জন্যে হুটোপুটি লাগিয়ে দিল। মর্দান আলি খানের মতো সেনাপতিও যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেল। যুদ্ধ ক্ষেত্রে তখন নবাব সরফরাজ হাতির পিঠে একা। তিনি আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে ছিলেন। কয়েক হাজার জর্জিয় এবং আবিসেনিয় (হাবসি) দাস তাকে ঘিরে ছিল। বাংলায় সে সময় অভিজাতদের বাড়িতে হাবসি দাস থাকা একটা স্ট্যাটাস সিম্বল ছিল। হাতির মাহুত নবাবকে বীরভূমের জমিদার বাদিউসজামানের আশ্রয়ে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু সরফরাজ পালিয়ে যেতে অস্বীকার করলেন। তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগলেন। শত্রুপক্ষের হাউই, বন্দুক, কামানের গোলা, তির ইত্যাদির মধ্যেই বাংলার নবাব এগোতে লাগলেন। তা দেখে ওঁর সেনাবাহিনীর মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই একটা উদ্দীপনা তৈরি হল। তারা বেশ জোশের সঙ্গে লড়াই করতে লাগল।

“ভৈরব তখন যুদ্ধক্ষেত্রে। হাতে মাস্কেট নিয়ে লড়াই করছে। আগেই বলেছি, তার নিশানা অব্যর্থ। ইতিমধ্যে শত্রুপক্ষের একাধিক সেনাকে সে কবরে পাঠিয়েছে। এবার সে হাতির পিঠে নবাবকে দেখতে পেল। কিন্তু তার কাছে যাওয়ার উপায় নেই। প্রচুর লোক তাকে ঘিরে রয়েছে। ভৈরব দেখল, যা করার দূর থেকেই করতে হবে। সে তার মাস্কেটের রেঞ্জ ভালোই জানে। সরফরাজ খাঁ সেই রেঞ্জের মধ্যে চলে আসতেই ট্রিগারে চাপ দিল ভৈরব। মাস্কেটের একটা গুলি সোজা সরফরাজ খাঁয়ের কপালে গিয়ে বিঁধল। হলওয়েল সাহেব একটা বইতে লিখেছেন, নিজের বাহিনীরই কোনও এক বিশ্বাসঘাতকের গুলিতে নবাব প্রাণ হারিয়েছিলেন। কিন্তু কথাটা মোটেও সত্যি নয়। ওই গুলিটা সরফরাজ খাঁ-এর কপাল লক্ষ্য করে ভৈরবই ছুড়েছিল।

“যাইহোক, গুলিবিদ্ধ হয়ে সরফরাজ হাতির হাওদা থেকে নীচে গড়িয়ে পড়লেন। নবাবের গদিতে তিনি ছিলেন মাত্র এক বছর। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর মৃত্যু হল।

“ওখানে নবাব শিবিরের যে সব হোমরা-চোমরারা হাজির ছিলেন, তাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন ভীতু আর ধান্দাবাজ। তাই নবাবের মৃত্যু তাঁদের মনে কোনও দাগ কাটল না। সেই কারণে মীর হাবিব, সিলেটের ফৌজদার শামশির খান কুরেশি, রাজা গন্ধর্ব-এর মতো লোকেরা নবাব সরফরাজ খাঁকে হাতির পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়তে দেখেও কাপুরুষের মতো দাঁড়িয়েই রইলেন। আর মীর হায়দার শাহ এবং খাজা বসন্ত তো একটা রথে চেপে মুর্শিদাবাদের দিকে পালিয়েই গেলেন। তবে নবাবের মৃতদেহ তাঁর বফাদার মাহুত রাজধানীতে নিয়ে এসেছিল। সেই মরদেহ খুব গোপনে নুকতাখালিতে কবর দিয়েছিল ছেলে হাফিজুল্লা খান এবং মুর্শিদাবাদের ফৌজদার ইয়াসিন খান।

“গিরিয়ার অন্যদিকে কিন্তু যুদ্ধের গতিপথ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ ভাগরথীর পশ্চিমপ্রান্তে সরফরাজ শিবিরের ঘাউস খাঁ এবং মীর সরফুদ্দিন আলিবর্দির সেনাপতি নন্দলালকে হত্যা করে ইতিমধ্যে লড়াই জিতে গিয়েছেন। তাঁরা একজন দূত পাঠিয়ে নবাব শিবিরে জয়ের খবর পাঠিয়ে দিলেন। দুজনে মিলে ঠিক করলেন, এবারে তাঁরা আলিবর্দির বাহিনীর ওপর যৌথভাবে হামলা চালাবেন।”  

“তার মানে নবাবের মৃত্যুর খবর ওঁরা জানতেন না?”

“না, তখনও জানতেন না। কিছুক্ষণ বাদে সেই দূত ফিরে এসেই ঘাউস খাঁকে নবাবের ইন্তেকালের খবর জানাল। ঘাউস খাঁ ছিলেন নবাব সরফরাজ খাঁর প্রধান সেনাপতি। তিনি একজন অভিজ্ঞ পাঠান যোদ্ধা। ইতিহাস বলে, পাঠান সেনানায়করা কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করতেন না—নেমকহারামি তাঁদের রক্তে ছিল না। তাই ঘাউস খাঁ কিন্তু মীর হাবিবদের মতো যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে সেদিন পালিয়ে গেলেন না, বরং দুই ছেলে মহম্মদ কুতুব এবং মহম্মদ পীরকে সঙ্গে নিয়ে সাহসী বীরের মতো ঘোড়া ছুটিয়ে আলিবর্দির বাহিনীর মধ্যে ঢুকে পড়লেন। খানিক বাদেই আলিবর্দী খাঁর সৈন্যরা ঘাউস খাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। এই অবস্থায় তাঁর দুই ছেলে সেই চক্রব্যুহ ভেদ করে বাবাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেল। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হল না। সেনাপতি ছেদন হাজারির মাস্কেটের গুলিতে ঘাউস খাঁ প্রাণ হারালেন। তাঁর দুই ছেলেও যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেল।

“এদিকে নবাবের শিবিরের আরেক সাহসী যোদ্ধা মীর শরফুদ্দিন তির-ধনুক হাতে কয়েকজন অশ্বারোহী নিয়ে আলিবর্দির দিকে ছুটে গিয়েছিলেন। শরফুদ্দিনের ছোড়া দুটি তীরের একটি আলিবর্দির ধনুকে আঘাত করেছিল, অন্যটি হাতে। কিন্তু দ্বিতীয়বার আলিবর্দিকে তাক করার আগেই শেখ জাহানিয়ার এবং মহম্মদ জুলফিকার তাঁকে হামলা চালিয়ে হত্যা করলেন। ওঁরা দুজনেই ছিলেন আলিবর্দির পুরোনো বন্ধু।

“ওদিকে নবাব-বাহিনীর রাজপুত জমাদার বিজয় সিংহও তখন যথেষ্ট বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছিলেন। তিনি প্রথমে খামরা অঞ্চলে সেনাদের কন্ট্রোল করছিলেন। কিন্তু নবাব সরফরাজ খাঁ প্রাণ হারানোর পরেই তিনি হাতি চেপে বর্শা হাতে কোমরার মূল যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং বহু শত্রু সেনাকে হতাহত করলেন। তারপর চেষ্টা করলেন আলিবর্দিকে ধাওয়া করে তাঁকে বর্শা ছুড়ে ধরাশায়ী করতে। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হল না। আলিবর্দির গোলান্দাজ দপ্তরের দারোগা দাতওয়ার আলি খানের ছোড়া গুলিতে তাঁর ভবলীলা সাঙ্গ হল। এরপরেই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা।”  

“কী ঘটনা?”

“সেটাই বলছি। বিজয় সিংহের ন’বছরের ছেলে জালিম সিংহও ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে। সে নিজের কোমরে বাঁধা ছোটো তরবারিটা বের করে বাবার মৃতদেহ রক্ষা করতে একা দাঁড়িয়ে পড়ল হাজারো সৈন্যের সামনে। সে কাউকে বাবার মৃতদেহ স্পর্শ করতে দেবে না। এই খবর কানে আসতেই আলিবর্দি খাঁ নিজে চলে এলেন ঘটনাস্থলে। জালিমের সাহস ও বীরত্ব দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন। তিনি নিজের সৈন্যদের আদেশ দিলেন বিজয় সিংহের মৃতদেহ যেন হিন্দু রীতিতে সৎকার করার ব্যবস্থা করা হয়। আলিবর্দির সৈন্যরা এরপর সেই বালক জালিম সিংহকে কাঁধে তুলে সম্মান জানিয়েছিল। গিরিয়ায় যেখানে জালিম সিংহ তার বাবার মরদেহ রক্ষার জন্য রুখে দাঁড়িয়েছিল, সেই জায়গাটার পরে নাম হয়ে গেল ‘জালিম সিংহের মাঠ’।

“যাইহোক, এরপর সরফরাজের শিবিরের আর কেউই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অবস্থায় রইল না। আলিবর্দি খাঁ লড়াই জিতে গেলেন। আর ৮৪ লক্ষ টাকা নজরানা দিয়ে আলিবর্দি খাঁ দিল্লির বাদশা মুহম্মদ শাহর কাছ থেকে নবাবি পরোয়ানা আদায় করে নিলেন।”  

“নবাব হিসেবে আলিবর্দি খাঁ তো বেশ দক্ষই ছিলেন মনাদা?” বিশু জানতে চাইল।

মনাদা ঘাড় নেড়ে বললেন, “তা তো বটেই। আর সেই জন্যই তো আলিবর্দি খাঁ নবাবের তখতে বসায় ইংরেজরা আবার বেশ ঝামেলায় পড়ে গেল। কারণ আলিবর্দি খাঁ ইংরেজদের সঙ্গে মুর্শিদকুলী খাঁর পলিসি অনুসরণ করলেন… সাহেবেদের ব্যাবসা করতে দেব, কিন্তু যা খুশি তাই করতে দেব না। তাই তাদের গতিবিধির ওপর সব সময় কড়া নজর রাখতে লাগলেন। আলিবর্দি খাঁ ড্যানিশ, ডাচ বা অন্যান্য কোম্পানিগুলোকে কিছু সুযোগ-সুবিধা দিলেন যাতে ইংরেজরা এদেশে একচেটিয়া ব্যাবসাচালিয়ে যেতে না পারে। আবার বর্ধমানের রাজা একটা বিশেষ কারণে যখন বেহালায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাল আটক করে গোমস্তাদের ফাটকে পুরে দিলেন, তখন আলিবর্দিই রাজাকে বলে মাল খালাসের ব্যবস্থা করলেন।

“অবশ্য এই নরম অবস্থান থেকে আবার গরম হতেও নবাবের বেশি সময় লাগল না। তিনি একদিন কোম্পানির লোকেদের ডেকে বললেন, আগে তো গঙ্গায় তোমাদের মাত্র চার-পাঁচটা জাহাজ থাকত, এখন তো থাকে চল্লিশ-পঞ্চাশটা। তার মানে ব্যাবসারমরমিয়েই হচ্ছে। তাই বর্গি দমনের খরচ হিসেবে তিন লাখ টাকা দিতে হবে। অবশ্য এই একই কারণ দেখিয়ে তিনি ফরাসি আর ডাচ কোম্পানিগুলোর কাছেও মোটা টাকা আদায় করেছেন।

“ইংরেজরা প্রথমটা গাঁইগুই করল বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত টাকাটা দিতে বাধ্য হল। আবার ঐ বর্গি হাঙ্গামার অজুহাত দেখিয়েই ইংরেজরা চাইছিল শিবপুরের থানা দুর্গটাকে খানিক মজবুত করে তুলতে। কিন্তু আলিবর্দি ঐ আর্জি শুনেই পত্রপাঠ তা খারিজ করে দিলেন। বললেন, তোমরা ব্যাবসাকরতে এসেছ, ব্যাবসাকর। তোমাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমার। তাই বর্গিদের ঠেকাতে যা করণীয় তা আমিই করব। তোমাদের কিচ্ছুটি করতে হবে না।”  

“এই বর্গিরা হঠাৎ বাংলায় এল কেন?” দেবু জানতে চাইল।

একথা শুনে মনাদা প্রথমে আরেকটা একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর দেবুর দিকে তাকিয়ে ক্লাসে পড়া বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন, “এই বর্গি মানে যে মারাঠারা, সেটা জান নিশ্চয়ই? আসলে হয়েছিল কি, শিবাজির মৃত্যুর পর মারাঠাদের মধ্যেও দলাদলি শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন মারাঠা ঘাঁটির নেতারা চাইছিলেন নিজের নিজের ক্ষমতা বাড়াতে। নাগপুরের মারাঠা ঘাঁটির সর্দার তখন রঘুজি ভোঁসলে। তাঁর বাসনা হল নাগপুরের সঙ্গে বাংলাদেশকে জুড়ে নেওয়ার। তখন কিন্তু বাংলাদেশ মানে শুধু বাংলা নয়, সঙ্গে বিহার আর উড়িষ্যাও ছিল।

“তাঁর ঐ মনের কথা সরফরাজ খাঁয়ের কিছু নিকট আত্মীয় আর ইয়ারবক্সির কানে পৌঁছাল। আলিবর্দির ওপর তাঁদের ভীষণ রাগ। কিন্তু নিজেদের কিচ্ছুটি করার ক্ষমতা নেই। তাই তাঁরা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে রঘুজি ভোঁসলেকে গোপনে আমন্ত্রণ জানাল বাংলায় আসার জন্য। এই রঘুজির এক ব্রাহ্মণ মন্ত্রী ছিল, ভাস্কররাম পন্থ। সবাই ওঁকে ভাস্কর পণ্ডিত নামেই ডাকত। লোকটা যেমন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা তেমনি মাথাটাও দারুণ সরেস। ওঁর সঙ্গে পরামর্শ করেই রঘুজি আলিবর্দির কাছে চৌথ কর চেয়ে বসলেন।”  

“এই চৌথ করটা আবার কী জিনিস?” বিশু জিজ্ঞাসা করল।

“চৌথ মানে এক চতুর্থাংশ। আগেই বলেছি, আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তো আর দিল্লির বাদশাদের কারোই দেশ চালানোর ক্ষমতা ছিল না। বিভিন্ন রাজ্যের সুবেদাররা আর বাদশাকে মানত না। আর মানবেই বা কেন? আজ একজন সিংহাসনে বসছেন তো কাল একজন। গদিচ্যুত করে একজনকে জেলে পোরা হচ্ছে, তো আরেকজনকে হত্যা করা হচ্ছে বিষ খাইয়ে। সে এক অরাজক পরিস্থিতি। এই সময়ই মারাঠারা দিল্লির ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করেছিল যে বাদশা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন—সারা দেশে মোট যে কর আদায় হবে তার চারভাগের এক ভাগ মারাঠারা পাবে। সেই হিসাবেই রঘুজি ঐ কর চেয়েছিলেন, যদিও তিনি ভালোই জানতেন বাংলার নবাব মোটেই এই দাবি মেনে নেবেন না।

“হলও তাই। নবাব চৌথ করের দাবি না মেটাতেই শুরু হল বর্গি অভিযান, যার দায়িত্ব পড়ল ভাস্কর পণ্ডিতের ওপরেই। তিনি তেইশজন সর্দার আর বিশ হাজার বর্গি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাংলার ওপর। নাগপুরের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে টাট্টু ঘোড়ায় চেপে বর্গিরা পঞ্চকোট হয়ে জঙ্গল পেরিয়ে বাংলা আর উড়িষ্যায় হানা দিতে লাগল। কী দুরন্ত তাদের গতি! আজ তারা কটকে তো কাল মেদিনীপুরে। কাল মেদিনীপুরে তো পরশু বর্ধমানে। তারা কেউ কিন্তু মুখোমুখি যুদ্ধ করত না। অতর্কিতে হালকা অস্ত্র নিয়ে হানা দিত, শুধু ‘রুপিয়া’ দাবি করত। পেলে ভালো, নাহলে আর রেহাই নেই। হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, বাচ্চা-বুড়ো কাউকে রেয়াত করত না। টাকা না পেলে লোকের নাককানও কেটে নিত।

“এই বর্গির হানায় বাংলার লোক একেবারে জেরবার হয়ে গেল। চাষিরা, তাঁতিরা সব ঘরদোর, জমিজমা ফেলে পালাতে লাগল। আর তাতেই একেবারে নাজেহাল দশা হল বাংলার। আলিবর্দি খাঁ অবশ্য চুপ করে বসে থাকেননি। সৈন্য সামন্ত নিয়ে টানা বর্গিদের পিছনে ছুটে বেড়িয়েছেন। কিন্তু যারা মুখোমুখি যুদ্ধ করে না আর যাদের গতি অত ক্ষিপ্র, তাদের কি আর অত সহজে বাগে আনা যায়?”

“ইংরেজদের বর্গি হামলার মুখে পড়তে হয়নি কখনো?” আমি জানতে চাইলাম।

“না, সেইভাবে হয়নি। কয়েকবার তাদের মালপত্তর বর্গিরা আটকে রেখেছিল এই যা। তবে একটা সময়ে বর্গিরা যখন হুগলি প্রায় দখল করে নিয়েছে, তখন তারা কলকাতায় চলে আসতে পারে ভেবে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল সাহেবরা। তখন কলকাতা কাউন্সিল বর্গিহানা আটকাবার জন্য নানা প্ল্যান-প্রোগ্রাম করেছিল। কিন্তু টাকা খরচের হিসাব করার পর আর এগোয়নি।

“অবশ্য বর্গি আক্রমণ ঠেকানোর জন্য তারা কলকাতার পাঁচটা জায়গায় কামান-ঘাঁটি বানিয়েছিল। একেবারে উত্তরে পেরিন সাহেবের বাগানে, চিৎপুর রোডের মাঝামাঝি জোড়াবাগানে, জোড়াসাঁকোতে, লালবাজারে সাহেবপাড়ার মুখে আর দক্ষিণে গোবিন্দপুর ও কলকাতার মাঝামাঝি লয়েডসাহেবের বাড়ির লাগোয়া বসানো হয়েছিল ঐ কামান-ঘাঁটিগুলো।

“কিন্তু তাতে প্রপার কলকাতার এদেশিয় লোকজনের ভয় কমেনি। তারা দেখল ইংরেজরা যা করছে সব নিজেদের লোকেদের বাঁচানোর জন্য। সেখানে তাদের নিরাপত্তা কোথায়? তাই তারা কাউন্সিলের কাছে আবেদন করল উত্তরে বাগবাজার থেকে দক্ষিণে কুলিবাজার (হেস্টিংস) পর্যন্ত একটা খাত কাটানো হোক। তাহলে বর্গিরা হুট করে কলকাতায় ঢুকে পড়তে পারবে না। যা খরচাপাতি হবে, তা ওরাই চাঁদা তুলে দিয়ে দেবে। তবে প্রথমে খরচটা কাউন্সিলকেই করতে হবে।

“কাউন্সিল এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। তবে এটাও জানিয়ে দিল যে খাত খোঁড়ার টাকাটা তাদের তিনমাসের মধ্যেই দিয়ে দিতে হবে। শেঠদের বাড়ির বৈষ্ণবদাস রামকৃষ্ণ রাসবিহারী আর বড়ো দালাল উমিচাঁদের কাছ থেকে জামিন লিখিয়ে নেওয়া হল যে সাত মাইল লম্বা একুশ হাত চওড়া ঐ খাত কাটতে যে পঁচিশ হাজার টাকা খরচ হবে তা দেশিয় প্রজাদের কাছ থেকে ওরাই আদায় করে দেবে।

“খাত কাটা অবশ্য পুরোটা হয়নি। অর্ধেক হয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেটারই নাম হল মারাঠা ডিচ। আসলে আলিবর্দির দাপটে সেই সময়ে মারাঠা আক্রমণ খানিক দমে গিয়েছিল। পরে অবশ্য খাত আরও কিছুটা কাটা হয়েছিল। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছিল হাজার দশেক টাকা। সেই টাকা এদেশিয় প্রজাদের কাছ থেকে আদায় করতে শেঠদের যা নাজেহাল হতে হয়েছিল, তা আর কহতব্য নয়। তিন মাস নয়, টাকাটা উসুল করতে সময় লেগেছিল পাক্কা তিনটে বছর।”  

“তা সেই খাতটার পরে কী হাল হল?” আবার দেবুর প্রশ্ন।

“তুমি দেখছি প্রাচীন কলকাতার কোনও খবরই রাখো না দেবু! বর্গিহানার অবসানের পর ঐ খাতে ফেলা হত কলকাতা শহরের যত আবর্জনা। ফলে গন্ধে টেকা দায়, একটা চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর অবস্থা। উনবিংশ শতকের গোড়াতেই তাই লর্ড ওয়েলেসলি ঐ ডিচ বুজিয়ে ফেলার হুকুম দিলেন। আর খাতটা বোজানো হতেই পাওয়া গেল বিশাল লম্বা-চওড়া একটা রাস্তা। সেই রাস্তারই নাম আপার আর লোয়ার সার্কুলার রোড।

“যাইহোক, আবার আগের কথায় ফিরে আসি। মারাঠা ডিচ কাটিয়েই কিন্তু ইংরেজরা চুপ করে বসে থাকেনি। সাহেবপাড়াটাকে আরও সুরক্ষিত করার জন্য তারা ওখান থেকে সব দেশিয় লোকেদের তাড়িয়ে দিয়ে গোটা পাড়াটাকে কাঠের রেলিং দিয়ে ঘিরে ফেলেছিল। রেলিং-এর মাঝে মাঝে বানিয়েছিল একটা করে গেট। তার সামনে খানিকটা গর্ত খুঁড়ে খাল কেটে তার ওপর বানিয়েছিল ব্রিজ। তারপর সেই ব্রিজের ওপর বসিয়েছিল দুটো করে কামান। তবে ফোর্ট উইলিয়ামের আর কোনো সংস্কার করা হয়নি। ওটা আগের মতোই সাদামাটা রয়ে গিয়েছিল।”  

“আপনি একটু আগেই বললেন, আলিবর্দি খাঁর দাপটে বর্গি আক্রমণ অনেকটাই কমে গিয়েছিল, তাই মারাঠা ডিচ পুরোটা খোঁড়া হয়নি। তা অমন দুর্ধর্ষ মারাঠাদের আলিবর্দি খাঁ বাগে আনলেন কী করে?”

“ব্যাপারটা মোটেই সহজে হয়নি। আমি বলেছিলাম না, ওই বর্গিদের নেতা ছিল ভাস্কর পণ্ডিত। নবাবসাহেব বেশ বুঝতে পেরেছিলেন, বর্গি দমন করতে গেলে ঐ ভাস্কর পণ্ডিতকে নিকেশ করতেই হবে। কিন্তু সেটা করা মোটেই সহজ ব্যাপার ছিল না। কাজটা ঠিকঠাক করার জন্য নিখুঁত পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল। আর ভালো মতন হোমওয়ার্কও জরুরি ছিল। তাই আলিবর্দি খাঁ নিজের বিশ্বস্ত কিছু লোকজন নিয়ে একদিন আলোচনায় বসলেন। সেখানে ভৈরবও হাজির ছিল।”  

“ভৈরব আবার ওখানে এল কোত্থেকে? সে তো নাটোরের জমিদার রামকান্ত রায়ের লোক!”

“এই দেখো, বলতেই ভুলে গেছি! বাংলার মসনদে বসার পরেই রামকান্ত রায়ের সঙ্গে কথা বলে আলিবর্দি খাঁ ভৈরবকে সপরিবারে মুর্শিদাবাদে ডেকে নিয়েছিলেন। ওকে সেনাবাহিনীর গুপ্তচর বিভাগের প্রধান করে দিয়েছিলেন। ওটা ছিল ভৈরবকে দেওয়া নবাবের উপহার।

“আসলে গিরিয়ার যুদ্ধে কোমরার ওই জঙ্গলে আগে থেকে কামান লুকিয়ে না রাখলে, আর যুদ্ধক্ষেত্রে সরফরাজ খাঁকে গুলি করে হত্যা না করলে আলিবর্দির পক্ষে ওই যুদ্ধ জেতা মোটেই সহজ হত না। নতুন নবাব সেটা বিলক্ষণ উপলব্ধি করেছিলেন। তাই ওই যুদ্ধজয়ের প্রতিদানরূপ তিনি ভৈরবকে নিজের কাছে ডেকে এনে ঐ গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিলেন। ভৈরব তখন হয়ে গিয়েছিল নবাবের একজন ভরসার পাত্র।”  

“বুঝলাম। এবার ওই আলোচনায় কী হল বলুন।”  

“আলোচনায় ভৈরবকে ভাস্কর পণ্ডিতের গতিবিধির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে বললেন আলিবর্দি। কারণ লোকটা কখন কোথায় যাচ্ছে, সেখানে গিয়ে কী করছে, কতদিন থাকছে—এই সমস্ত তথ্য জোগাড় করতে না পারলে তাঁকে মোটেই নাগালের মধ্যে পাওয়া যাবে না। তবে তাঁকে নজরে রাখার কাজটা খুব গোপনে করতে হবে। কারণ লোকটা খুব ধুরন্ধর। ওঁর দিকে নজর রাখা হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারলেই তিনি একেবারে সতর্ক হয়ে যাবেন। তখন আর ওঁর নাগাল পাওয়া যাবে না।

“এই আদেশ পাওয়ার পরেই ভৈরব আদাজল খেয়ে লেগে পড়ল ভাস্কর পণ্ডিতের সন্ধানে। তাঁর খোঁজে নানা জায়গায় নতুন করে লোক লাগাল। তাদের কাছ থেকে মাঝেমধ্যে ভাস্কর পণ্ডিতের গতিবিধির খবরও পেতে লাগল সে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই, লোকটাকে ঘিরে ধরার মতো কোনও সুযোগ সে পেল না। কারণ ভাস্কর পণ্ডিত কোনও জায়গায় দু’একদিনের বেশি থাকতেনই না।

“তবে একাধিকবার ব্যর্থ হয়েও ভৈরব কিন্তু হাল ছাড়ল না। পণ্ডিতের তালাশ করেই যেতে লাগল। মাসতিনেক বাদে একটা ভালো খবর পেল। ১৭৪২ সালের অক্টোবর মাসে ভৈরব জানতে পারল কালনার ঠিক দক্ষিণে দাঁইহাটিতে ঘাঁটি গেড়েছেন ভাস্কর পণ্ডিত। হিন্দু পণ্ডিতদের খুশি করতে নিজেই ওখানে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছেন। পুজোর সময় তিনি ওখানে নবদ্বীপের পণ্ডিতদের উপঢৌকনও দেবেন। এর মানে দুর্গাপুজোর ক’টা দিন উনি দাঁইহাটিতেই থাকবেন। এটাই দারুণ সুযোগ ভাস্কর পণ্ডিতকে নিকেশ করার।

“ভৈরব সব খবর নবাবকে জানাল। তা শুনে দশমীর আগেই আলিবর্দি সসৈন্যে হাজির হলেন দাঁইহাটিতে। কিন্তু ওখানে ভাস্কর পণ্ডিতের দেখা মিলল না। তিনি কোনওভাবে নবাবের আসার খবর পেয়ে পুজো অসমাপ্ত রেখেই পালিয়েছেন।

“কী আর করা যাবে! উদ্দেশ্য পূরণ হল না। ভৈরব তবু আশা ছাড়ল না। জোরকদমে ভাস্কর পণ্ডিতের খোঁজ চালিয়ে যেতে লাগল। প্রায় দেড় বছর পর আবার একটা ভালো খবর এল। এবারও সেই একই জায়গা। ভাস্কর পণ্ডিত ঐ দাইহাটিতেই আছেন।

“ভৈরবের কাছে এই খবর পেয়ে এবার আলিবর্দি খাঁ একটা অন্য মতলব করলেন। তিনি নিজের খুব কাছের দুজন মানুষ, মুস্তাফা খাঁ আর রাজা জানকীরামকে দূত হিসাবে পাঠালেন বর্গিনেতার কাছে। তাঁরা ভাস্কর পণ্ডিতের ডেরায় হাজির হয়ে জানালেন, বাংলার নবাব মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধি করতে আগ্রহী। সন্ধির শর্তগুলো নিয়ে আলিবর্দি খাঁ ভাস্কর পণ্ডিতের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনা করতে চান। মুর্শিদাবাদের কাছে মনকরা নামের একটা জায়গায় আলোচনাটা হবে।

“ভাস্কর পণ্ডিত প্রথমে এই প্রস্তাব শুনে বেঁকে বসলেও ঐ দুই মক্কেলের পীড়াপীড়িতে শেষ অব্দি রাজি হয়ে গেলেন। আলোচনার একটা দিনক্ষণও পাকা হয়ে গেল। এরপর আলিবর্দি খাঁ আবার কাছের কিছু লোকজন নিয়ে বৈঠকে বসলেন। কীভাবে ভাস্কর পণ্ডিতকে এই পৃথিবী থেকে সরানো হবে, সেদিনই তার একটা ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হয়ে গেল।”  

“তা প্ল্যানটা কেমন ছিল?”

“সেটাই বলছি। মনকরায় একটা বড়ো মাঠ ছিল। ঠিক হল বর্গিনেতার সঙ্গে আলোচনার জন্য সেখানে একটা বিশাল তাঁবু খাটানো হবে। সেখানে নবাব আলিবর্দির সঙ্গে দুজন থাকবেন, সেনাপতি মীর কাজিম খাঁ আর ভৈরব। আর বাছাই করা একদল আফগান সেনা নিয়ে তাঁবুর পিছনে লুকিয়ে থাকবেন আরেক সেনাপতি মুস্তাফা খাঁ। তারা আদেশ পেলেই তাবুর বাইরে থাকা বর্গিদের ওপর অতর্কিতে ঝটিকা হামলা চালাবে।

“তার আগে ভাস্কর পণ্ডিত ভিতরে এলে নবাব তাঁর সঙ্গে কথা শুরু করবেন। বোঝার চেষ্টা করবেন উনি সত্যিই ভাস্কর পণ্ডিত কিনা। কারণ লোকটা খুব চালাক। হতেই পারে নিজের মতো দেখতে কাউকে আলোচনার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন। এইরকম নকল কাউকে যদি আক্রমণ করা হয়, তাহলে এতদিনের সমস্ত পরিকল্পনা মাঠে মারা যাবে। ভাস্কর পণ্ডিতকে আর কোনও দিনই নাগালে পাওয়া যাবে না।

“যাইহোক, আলিবর্দি যদি কথা বলে নিশ্চিত হন যে ওই লোকটাই ভাস্কর পণ্ডিত, তাহলে তিনি ইশারা করবেন মীর কাজিম খাঁকে। আর সঙ্গে সঙ্গে সে ঝাঁপিয়ে পড়বে ভাস্কর পণ্ডিতের ওপর। হত্যা করবে তাঁকে।

“আলোচনার সময় ভৈরব অবশ্য আলিবর্দিকে অনুরোধ করেছিল, ভাস্কর পণ্ডিতকে হত্যার দায়িত্বটা তাকেই দেওয়ার জন্য। কিন্তু আলিবর্দি রাজি হননি। উনি বলেছিলেন, ‘ভৈরব তুমি বন্দুক চালানোয় দারুণ দক্ষ, তা আমি জানি। গিরিয়ার যুদ্ধে সেই প্রমাণও তুমি দিয়েছ। কিন্তু এখানে গুলি চালালে চলবে না। তাহলে গুলির শব্দে তাঁবুর বাইরে থাকা বর্গিগুলো সব সজাগ হয়ে যাবে। আমাদের ছক ভেস্তে যাবে।’

“একথা শোনার পর ভৈরব আর কথা বাড়ায়নি। নবাবের যুক্তি মেনে নিয়েছিল।

“যাইহোক, এরপর চলে এল সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটা। ১৭৪৪ সালের ৩১ মার্চ ভাস্কর পণ্ডিত বাইশজন সর্দার আর কয়েকশো বর্গি নিয়ে হাজির হলেন মনকরাতে। দেখলেন মাঠের মাঝখানে বিশাল একখানা তাঁবু খাটানো হয়েছে। ভাস্কর পণ্ডিতকে দেখতে পেয়েই জানকীরাম আর মুস্তাফা খাঁ খুব সমাদর করে ওঁকে তাঁবুর ভিতরে নিয়ে গেলেন। আলিবর্দিও ওঁকে যথাযোগ্য সম্মান জানালেন। কুশল বিনিময় করলেন। তারপর বর্গিনেতার সঙ্গে শুরু করলেন আলোচনা।

“দু’চারটে কথা বলার পরেই তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে এই লোকটাই ভাস্কর পণ্ডিত। ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে ইশারা করলেন তিনি। মীর কাজিম খাঁ-এর নজর এতক্ষণ নবাবের দিকেই ছিল। তাই ইঙ্গিত পেতেই সে তরোয়াল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল পণ্ডিতের ওপর। কিন্তু ভাস্কর পণ্ডিত অদ্ভুত কৌশলে সরিয়ে নিলেন নিজেকে। তারপর অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় মীর কাজিমকে ধরাশায়ী করে তার হাত থেকে হাতিয়ারটা কেড়ে নিতে চেষ্টা করলেন। সেই মুহূর্তে ভৈরব আর কারো আদেশের অপেক্ষা না করে তলোয়ার হাতে চিতার মতো লাফিয়ে পড়ল ভাস্কর পণ্ডিতের ওপর। আর নিমেষে বর্গিনেতার দেহটা দু’ টুকরো করে ফেলল।

“ঠিক তক্ষুনি মুস্তাফা খাঁ তাঁবুতে লুকিয়ে থাকা বাছাই করা আফগান সেনাদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাইরে অপেক্ষমান বর্গিদের ওপর। এই অতর্কিত আক্রমণে প্রচুর বর্গি কচুকাটা হল, অনেকে পালিয়ে বাঁচল। দুদিন বাদে বাংলায় আর একজনও বর্গি রইল না।

“নবাব এই ঘটনার পর ভৈরবকে খুশি হয়ে মুর্শিদাবাদে দশখানা গ্রাম উপহার হিসেবে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভৈরব জমিদার হতে রাজি হয়নি। নবাবের গুপ্তচর বাহিনীর প্রধান হিসেবেই সে কাজ করে যেতে চেয়েছিল। শুধু নবাবের কাছে প্রার্থনা করেছিল যাতে তার ছেলে নারায়ণকে ভালো মতো অস্ত্রশিক্ষা এবং ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। বলাই বাহুল্য, নবাব এই অনুরোধ শোনামাত্র আলাদা করে নারায়ণের জন্য একাধিক নামকরা শিক্ষকের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাই এরপর ঘোড়ায় চড়া, অসিচালনা, বন্দুক ছোড়ার পাশাপাশি নারায়ণ আরবি, ফারসি, এমনকি ইংরেজিতেও দক্ষ হয়ে উঠতে লাগল।

“তাহলে আলিবর্দি খাঁ বর্গি দমনে সত্যিই সফল হয়েছিলেন বলতে হবে?” মলয়ের এই প্রশ্নের জবাবে মনাদা কোনও মন্তব্য করলেন না। কারণ বিমলদা ইতিমধ্যে মোগলাই পরটা আর কষামাংস নিয়ে হাজির হয়েছে। মনাদার সামনে সে যে প্লেটটায় লেগ-পিস আছে, সেটা রাখল। মিনিট কুড়ি লাগল আমাদের খাওয়া শেষ হতে। ঘড়ির কাঁটা তখন দশটা ছুঁই-ছুঁই। মনাদা হাত ধুয়ে এসে টেবিলের সামনে এলেন। আর বসলেন না। দাঁড়িয়েই একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর খাবার আগে করা মলয়ের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বললেন, “সেদিন ভাস্কর পণ্ডিতকে নিকেশ করে আলিবর্দি বর্গিদমনে কিছুটা সফল হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাদের পুরোপুরি দমাতে পারেননি। কারণ ওই হত্যার কিছুদিন বাদেই আবার বর্গিরা নাগপুর থেকে নতুন উদ্যমে, নতুন লোক নিয়ে ফিরে এসেছিল। তাদের হামলা চলেছিল সেই ১৭৫১ পর্যন্ত। মাঝে অবস্থা এমনই সঙ্গীন হয়ে উঠেছিল যে আলিবর্দি খাঁ চৌথ কর দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি বাংলার রাজস্বের এক চতুর্থাংশ হিসেবে উড়িষ্যাকে পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিলেন বর্গিদের হাতে। তবে এই সময় কিন্তু মেদিনীপুরকে উনি উড়িষ্যার থেকে বের করে বাংলার সঙ্গে জুড়ে নিয়েছিলেন।”  

মনাদার কথা শেষ হতেই গৌতম জিজ্ঞাসা করল, “সবই তো বুঝলাম। কিন্তু একটা ব্যাপার আমার মাথায় ঢুকছে না। এই যে আপনি এতক্ষণ ধরে দামোদর আর ভৈরবের কাহিনি শোনালেন, তাদের কারো কথাই তো আমরা কোনওদিন ইতিহাস বইতে পড়িনি। স্থানীয় কোনও নথিতেও এসব তথ্য আছে বলে শুনিনি। তাহলে ওদের সম্পর্কে এত কথা আপনি জানলেন কী করে?”

এই প্রশ্ন শুনেই মনাদা কেমন উদাস হয়ে গেলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “এটাই তো আমাদের দেশের ইতিহাসচর্চার সমস্যা গো! মূলধারার ইতিহাসবিদরা যা লিখে গেছেন, তা সে যত অসম্পূর্ণই হোক, তার বাইরে আমরা আর কিছুই জানি না। অন্যভাবে বললে, আমাদের জানতে দেওয়া হয়ও না।”  

“কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে?” প্রশ্নটা গৌতম এবার বেশ সন্দেহের সুরেই করল।

মনাদা আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “আমার দিদিমার কাছ থেকে।”  

এবার আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনার দিদিমা ওসব কথা জানলেন কীভাবে?”

মনাদা সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে, জ্বলন্ত ফিল্টারটা মেঝেতে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে জবাব দিলেন, “ভৈরব আমার দিদিমার বাবার ঠাকুরদার ঠাকুরদার বাবা।”  

একথা শুনে তো আমাদের মাথা ঘুরে যাওয়ার যোগাড়। দেবু গোল গোল চোখ করে বলল, “তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, আপনি দামোদর, ভৈরবের বংশধর!”

“তাতে তোমার আপত্তি আছে?”

“না, মানে…ঠিক আপত্তির ব্যাপার নয়, আসলে…”

“আসলে কী? তোমার মনে হচ্ছে আমি মিথ্যা বলছি, তাই তো?”

“না তা নয়, তবে…”

“তবে কী? প্রমাণ চাইছ তাই তো? তাহলে এই দেখো…” উত্তেজিত স্বরে একথা বলেই মনাদা নিজের পকেটে হাত ঢোকালেন। বের করলেন একটা জীর্ণ মানিব্যাগ। দেখে মনে হল অন্তত তিরিশ বছরের পুরনো। এবার সেটার ভিতর থেকে মনাদা বের করলেন একটা ছোট্ট সবুজ পাথর বসানো ম্যাড়ম্যাড়ে নাকছাবি। সেটা দেবুর হাতে দিয়ে বললেন, “শোভা সিংহকে হত্যার পর বর্ধমানের রাজকুমারী সত্যবতী দামোদরকে নিজের নাকছাবিখানা দিয়েছিল তার দাদা জগৎরামকে দেখানোর জন্য, মনে আছে?”

আমরা সবাই ঘাড় নাড়লাম।

মনাদা বললেন, “কিন্তু জগৎরামের সঙ্গে তো দামোদরের কোনওদিন দেখাই হয়নি। নাকছাবিটা সে যত্ন করে রেখে দিয়েছিল নিজের ঘরে। সেটাই বংশপরম্পরায় হাত বদলাতে বদলাতে আমার হাতে এসেছে। মা মারা যাওয়ার আগে এটা আমাকে দিয়ে গিয়েছিল।”  

আমরা সবাই এবার নাকছাবিটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলাম। গৌতম বিড়বিড় করে বলল, “এটা তো ইমিটেশন, রংটাও চটে গেছে। আড়াইশো বছর আগে এ জিনিস ছিল নাকি!”

“রাজকুমারীরা তো শুনেছি সব সোনার গয়নাগাটি পরত। তাতে হিরে, চুনি, পান্না বসানো থাকত। এই সবুজ জিনিসটা তো পাথরই নয়, প্লাস্টিকের…”

মলয়ের কথা শেষ হল না। গোপাল আমাদের টেবিল থেকে প্লেট-বাটি তুলতে এসেছিল। ও নাকছাবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা তোমাদের কাছে এল কী করে গো? আমি তো ওটা কুড়িয়ে ফ্রিজের মাথায় রেখেছিলুম।”  

“কোথা থেকে কুড়িয়েছিলি?”

“ওই সামনের দু’নম্বর টেবিলের তলা থেকে। আসলে সেই রাসের মেলার সময় সামনের দুটো টেবিলে একদল হিন্দুস্থানি মেয়ে বসে খাওয়া-দাওয়া করেছিল। খাওয়ার চেয়ে হল্লাগুল্লাই করেছিল বেশি। ওদের সবার গলায়-কানে-নাকে-আঙুলে এরকম গয়না ছিল, মেলা থেকেই ওগুলো কিনেছিল বোধহয়। তারপর ফেরার সময় এখানে চপ-কাটলেট খেতে ঢুকেছিল।”  

গোপালের মুখে নাকছাবিটার এই ইতিহাস শোনার পর আমাদের সকলের চোখ মনাদাকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু তাঁকে চারপাশে কোথাও দেখতে পাওয়া গেল না। তিনি দেবুর হাতে নাকছাবিটা দিয়েই আমাদের আড্ডাখানা ত্যাগ করেছেন।

অতঃপর আর কী করা। বিশু গোপালের হাতে নাকছাবিটা তুলে দিয়ে বলল, “নে, এটা আবার ওই ফ্রিজের মাথায় যত্ন করে তুলে রাখ।”  

গোপাল সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলল, “কী যে বল বিশুদা! এই রংচটা তেলচিটে জিনিসটা আবার যত্ন করে রাখব!” একথা বলেই ও নাকছাবিটা ছুড়ে নোংরা ফেলার বাস্কেটটায় ফেলে দিল। মানে মনাদা-কথিত তিনশো বছরের বাংলার ইতিহাসের সাক্ষীবাহী একটি অমূল্য বস্তুর জায়গা হল মাতারা হোটেলের আস্তাকুড়ে।

জয়ঢাক প্রকাশন থেকে প্রকাশিত কৃষ্ণেন্দু দেব-এর বইগুলি-

Leave a Reply