এই লেখকের আগের গল্প- দিপুপিসির জার্মানি অভিযান, একটা অদ্ভুত বিকেল, ভুলের ভবিষ্যৎ

সিকিমের একটি ঘন জঙ্গল, দুর্গম পাহাড়ি ঢালকে ঘিরে রয়েছে শাল, সেগুন, পাইনের সারি। এই জঙ্গলে দিনের বেলায় পর্যাপ্ত আলো ঢোকে না। আঁধারের সঙ্গে আনাকানি করতে করতে পাহাড়ি জঙ্গলে শীতের হাওয়া আচমকা চোখে মুখে বরফশীতল ঝাপটা দিয়ে যায়। পথিক সেই পাহাড়ি হাওয়ার শনশন আওয়াজে সচকিত হয়ে ওঠে মুহূর্তের জন্য। তাসি ভুটিয়া এমনই একটি জঙ্গুলে পথ দিয়ে দিনের শেষে বাড়ি ফিরছিল, সূর্য তখন সারাদিনের ক্লান্তি মেখে অলস ছন্দে সেদিনের মতো সন্ধ্যার কাছে পৃথিবীর দায়িত্ব সঁপে দিয়ে বিদায় নিচ্ছে একটু একটু করে। আচমকাই একটা তীব্র হাওয়া ঝাঁকুনির মতো তাসিকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল, মুহূর্তে তার পা দুটো থমকে গেল। সে কানের ওপর ভারি টুপিটিকে সরিয়ে হাওয়ায় কান পেতে কী যেন একটা শুনতে চেষ্টা করল। চকিতে তার চোখদুটো কী এক আসন্ন বিপদের আঁচ করতে পেরে ভয়ে যেন আঁতকে উঠল। চারিদিকের পরিবেশ ক্রমেই থমথমে হয়ে উঠল।অনতিদূরে কিছু পাহাড়ি টিয়া বিকট শব্দে চিৎকার জুড়ে দিল। সহসা তাসির চারিদিকে ঘন কুয়াশা জলের মধ্যে রং গোলার মতো করে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। দেখতে দেখতে সমস্ত জঙ্গল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্কের এক সূক্ষ্ম অথচ ভয়ংকর অনূভুতি।
তাসি আরও জোরে পা চালাল, একটু দূরে খুব অস্পষ্ট একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে। তাসি বুঝতে পারছে এভাবে ওদের হাত থেকে সে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না। তবুও… শেষ চেষ্টা তো করতেই হবে। একসময় সরু সুতোর ওপর ঝুলে থাকা দিনের আলো যেন ঝপ করে মাটির সঙ্গে মিশে নিভে গেল।তাসি বুঝতে পারল না, এটা প্রাকৃতিক নাকি সেই শয়তানগুলোর ষড়যন্ত্র। তাসি আর এগোতে পারছিল না, ক্রমেই তার সারা শরীর বিজবিজে ঘামে ভিজে উঠল, সে শেষ চেষ্টা করল, একটা গাছের ওপর উঠে আত্মগোপন করতে চাইল। হায় নির্বোধ মানুষ!সে বুঝল না, ততক্ষণে দুটো সবুজ চোখ তাকে দেখে নিয়েছে, সাপ যেভাবে ঠান্ডা চাউনিতে নিজের শীকারকে মেপে নেয়, ঠিক তেমন করেই নি:শব্দ পদসঞ্চারে দুটো প্রাণী এগিয়ে গেল গাছটির দিকে। গাছটির ওপর থেকে ভেসে এল তাসির মরিয়া চিৎকার
-ওরে, সর্বনাশী, আমাকে ছেড়ে দে, আ আ আমি কিছু দেখিনি, জানি না।
মুহূর্তে ক্রূর হাসিতে ভরে উঠল সর্বনাশীর সেই ভয়াল সবুজ চোখ। ততক্ষণে তাসি নিজের চোখদুটো বন্ধ করে নিয়েছে। সে ঘামে পিছলে যাওয়া হাতদুটো দিয়ে কোনক্রমে গাছটাকে ধরতে ধরতে স্বগোতক্তির মতো বলল
-চোখ বন্ধ করে থাকলে তুই আমার কিছুই করতে পারবি না।
আর ঠিক তখনই জঙ্গল কাঁপানো হ্রেষাধ্বনি ভেসে এল। ঘটনার আকস্মিকতায় তাসি মুহূর্তের জন্য চোখদুটো খুলে ফেলল। আর চোখ বন্ধ করার অবকাশ সে পেল না। তার হৃদপিণ্ড জমাট বাঁধতে বাঁধতে সে সবুজ ওই চোখ দুটোর মধ্যে নিজের সাক্ষাৎ মৃত্যু দেখতে পেল।
১
-মুকুট, এই মুকুট ওঠ বাবা, আজ আমাদের অনেক কাজ, এত বেলা অবধি ঘুমোলে হবে?
-মা, একটু ঘুমোতে দাও না, সেই তো আবার রাতে ট্রেনে চাপতে হবে।
মা বিরক্ত হয়ে বললেন,
-তোর বাবা বাজারে গেল, আমার কি কম কাজ? কোথায় জিনিসপত্র গোছগাছ করতে আমায় একটু সাহায্য করবি তা না এত বেলা অব্দি ঘুমাচ্ছিস।
এরপর আর শুয়ে থাকা যায় না, অগত্যা মুকুট তিতকুটে মন নিয়ে বিছানা ছাড়ল।
আজকাল কলকাতা শহরে বসন্ত বলে আলাদা করে কোনও ঋতু বোঝা যায় না। মাঝে মাঝে কোকিলের গলার স্বর নির্জন দুপুরের আনমোনা খেয়ালে বয়ে আনে বসন্তকে। এই ঋতুটা যেন মুকুটের ছোটবেলার শহরের ওপর একরকম অভিমান করেই বিদায় নিয়েছে। মুকুট বিছানা ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে ছাদে এল। এই জায়গাটাই একমাত্র তার নিজস্ব বসত। সে এই শহরটার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল, শহরটা ধীরে ধীরে সকালের আড়মোড়া ভেঙে তৈরি হচ্ছে একটা ব্যস্ত দিনের জন্য। পথচারীদের ব্যস্ত সংলাপ, মুটের বিকৃত স্বর, গাড়ির ধোঁয়া, শব্দ এ সবকিছুকে ছাপিয়ে ওর কানে ভেসে এল দূরের প্রায় ক্ষীণ হয়ে যাওয়া ট্রেনের হুইসেল। চকিতে মুকুট আনমনা হয়ে উঠল। কলকাতা শহরটাকে ছেড়ে আজ তারা উত্তরবঙ্গের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। বহুদিনের গিঁট পড়ে থাকা কাপড় যেমন খুলতে গেলে বেগ পেতে হয় বা খুলে গেলেও কাপড়ের ভাঁজ সহজে সোজা হতে চায় না, কিছু নাছোড় সুতোয় পুরোনো অভ্যাসের মতো লেগে থাকে দাগ হয়ে যাওয়া ভাঁজ। মুকুটেরও সহসা মনে হল বুকের মধ্যে সে বুঝি অমনই একটা নাছোড় দাগের মতোই একটা আস্ত কলকাতাকে বহন করে নিয়ে যাবে।
ওর বাবা ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিসে চাকরি করেন। প্রোমোশন পেয়ে বছর কয়েকের জন্য উত্তরবঙ্গে ট্রান্সফার হয়েছেন। বাবার ইচ্ছে ছিল না মুকুট ওঁর সঙ্গে সেখানে যায়, কারণ মাধ্যমিকের পর এই সময়টা কেরিয়ার গড়ার জন্য ভীষণ প্রয়োজনীয়। কিন্তু মুকুটের জেদ সে বছর দুয়েকের জন্য বাবার সঙ্গে উত্তরবঙ্গে যেতে চায়। তাই অগত্যা…
কিন্তু এই যাওয়ার মুহূর্তে মুকুটের মনে হচ্ছে পুরোনো অভ্যাসের মতো এই শহর, এখানকার বন্ধু, চেনা জনপদ, পরিচিত অভ্যাস সবকুছুকে ছেড়ে উত্তরবঙ্গের অচেনা ও নতুন পরিবেশে নিজেকে কতটা মানিয়ে নিতে পারবে?
এরপর আর মুকুট বেশি কিছু ভাববার অবকাশ পেল না, নিচে থেকে ওর মা ওকে ডাকলেন।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এসে সে অবাক হয়ে গেল, দীঘল, রূপকথা, অনিমিখ ওর স্কুলের বন্ধুরা এসেছে ওর সঙ্গে দেখা করতে।
-কিরে মুকুট, সিসামারায় গিয়ে আমাদের ভুলে যাবি না তো?
-আরে ভিডিও কল তো হবেই, তাছাড়া অনলাইন ক্লাসও তো আছে…
মুকুটের মা বললেন, আমরা একটু গুছিয়ে নিই, তারপর তোমরা আমাদের ওখান থেকে ঘুরে যেও।
-হ্যাঁ কাকিমা, আমাদের নর্থবেঙ্গল ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা অনেকদিনের।
মুকুটের মায়ের কথার উত্তরে ওরা প্রায় সমস্বরে একথা বলল।
তারপর কিছুক্ষণ গল্প করে ওরা সকলে ফিরে গেল।
মুকুট আর ওর মা ব্যস্ত হয়ে পড়ল গোছগাছে।
রাতের দার্জিলিং মেইলে ওরা যখন চাপল তখন শিয়ালদহ স্টেশন ব্যস্ততায় মুখরিত।
মুকুট একমনে বাইরের হ্যালোজেন আলোর দিকে তাকিয়ে কলকাতা শহরের শেষ ছবি দেখছিল। এমন সময় ওর বাবা এসে পিঠে হাত রাখলেন,
-কিরে, মন খারাপ করছে?
মুকুট বাবার দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে দুদিকে ঘাড় নাড়ল। আর ঠিক তখনই ঝাঁকি দিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল।
রাতের ট্রেনে বসে কাচের ওপারের দ্রুত সরতে থাকা, ঝাপসা হয়ে আসা তার প্রিয় শহরটাকে দেখতে দেখতে মুকুটের কেমন যেন ঘোর লেগে গেল, সে মনে মনে অস্ফুটে বলল
-ভালো থেকো, আমি আসব আবারও।
সিসামারার এই সরকারী বাংলোটি ব্রিটিশ আমলে তৈরি হলেও ভারত সরকার এটিকে খুব ভালো করে রক্ষনাবেক্ষণ করেছে। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে সকালে গাড়ি করে নিজেদের গন্তব্যে যাওয়ার সময়ই ডুয়ার্সের এই অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখে মুকুট অভিভূত হয়ে পড়েছিল। সিসামারা নদীর কাছে এই বনবাংলোটিতে এসে মুকুটের মনে হচ্ছে গোটা একটা জীবন এই নদীর ধারে বসে কাটিয়ে দেওয়া যায়।
সিসামারা হল একটি উপনদী। তোর্সা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কিছুটা পথ অতিক্রম করে আবার তোর্সার সঙ্গে মিলে গিয়েছে এই নদীটি। জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের থেকে নতুনপাড়া গ্রামটিকে আলাদা করেছে এই নদী। এই জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের কিছু প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক কাজের জন্য মুকুটের বাবা অনিমেষ সেন এখানে পোস্টিং পেয়ে এসেছেন।
একটেরে দোতলা বাংলোটির পোর্টিকোতে দাঁড়ালে দূরে বেঁকে যাওয়া নদী দেখতে পাওয়া যায়, সেই বাঁকের মুখে দাঁড়ালে পরের বাঁকটা দৃষ্টিগোচর হয়। নদীর ধারের সাদা চর, তার পাশের হলুদ হয়ে ওঠা পাহাড়ি গাছের দলবদ্ধ সমাবেশ দেখে মনে হয় বুঝি ঈশ্বর তার আপন খেয়ালে এই নদীকে গড়ে তুলেছেন। মাঝে মাঝে ময়ূরের ডাক মুকুটকে আনমনা করে তুলছিল। তার একছুটে ওই নদীর কাছে চলে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল, তারপর নতজানু হয়ে শুধু সেটিকে একবার ছুঁয়ে দেখবে।
-কিরে, মুকুট কলকাতার মতো একটা কসমোপলিটন শহর দেখার পর তোর এমন চুপচাপ, শান্ত পরিবেশে থাকতে ভালো লাগবে?
-বাবা, এই জায়গাটা আমার দারুণ লাগছে। কী অপূর্ব!
-এখান থেকে তোর স্কুল ঠিকঠাক করতে পারলে আমি বাঁচি।
মুকুটের মা বলে উঠলেন।
-রুমা, তুমি ওটা নিয়ে চিন্তা কোরো না, আমি ওর স্কুলের হেডস্যারকে সব জানিয়ে রেখেছি, উনি আমায় আশ্বস্ত করেছেন। মুকুটের মনে হয় না কোনও সমস্যা হবে।
এই বিষয়ে কথা আর বেশিদূর এগোল না। তার আগেই ওদের সামনে কেয়ারটেকার বিশু রাজবংশী ও তার ছেলে শুভ এল।
-সাহেব, অফিস থেকে আমায় বলে রেখেছিল, আপনাদের সমস্ত ব্যবস্থা করে রেখেছি আমি।
বছর চল্লিশ বয়সের কেয়ারটেকারটির চেহারায় এক অদ্ভুত ভয়ের ভাব লক্ষ করল মুকুট। সবসময় যেন কীসের ভয়ে তঠস্থ হয়ে রয়েছে। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি লম্বা, ফর্সা গায়ের রং, কাঁচা পাকা চুলগুলো পেছনে পনিটেল করে বাঁধা, কালো মোটা ভুরুর নিচে একজোড়া চোখে যেন ফিনফিনে শীতের কুয়াশার মতো ভয় লেগে রয়েছে।
বিশুর ছেলে শুভ কিন্তু বেশ চনমনে। দশ বছর বয়েসের কিশোরটি হাসি হাসি মুখ করে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
-বিশু, ওঁকে সাহেব বলতে হবে না, আমাদের দাদা, বৌদি বললেই আমরা খুশি।
মুকুটের মা আন্তরিক গলায় বলে উঠলেন। তারপরই কেজো গলায় বললেন,
-চলো, দোতলাটা ঘুরে আসি, দেখি ঘরদোর তোমরা কেমন পরিষ্কার করে রেখেছ!
মুকুট আর ওর বাবা বাংলোর সামনে কেয়ারি করা বাগানে চেয়ার টেবিলে বসে চা খেতে শুরু করল।
বাগানটি খুব সুন্দর করে সাজানো, কনকচাঁপা, দোলনচাঁপা, নয়নতারা, নাগকেশর গাছের সারির চারিদিকে ঘন সবুজ রঙের মেহেন্দি গাছ সুন্দর করে এক সাইজের সাজানো রয়েছে। রং বেরংএর প্রজাপতি এমনভাবে ক্যামোফ্লেজ করে ফুল গুলোর ওপরে বসে রয়েছে যেন মনে হচ্ছে ওগুলো ফুলেরই অংশ। মুকুট একটু দূর তাকিয়ে দুটো কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়া গাছকে পাশাপাশি দেখতে পেল। কী অপূর্ব নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য কানায় কানায় ভরে রয়েছে গাছদুটির চারপাশে। হলুদ ও লাল রঙের মাখমাখি কোলাজের সমারোহে কোকিলের তীব্র ডাক তৈরি করেছে এক সুন্দর আবহ। মুকুট অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে তাকিয়ে সবকিছু দেখছিল।তারপরই সামনের পিচের রাস্তায় একটা জিপের শব্দ শুনে পেছন ফিরে তাকাল।
২
-সাহেব, এটা একদম নতুন আর জেনুইন মাল।
অবিরল গুরুং তার লোভী কুতকুতে চোখ নিয়ে দু’হাত কচলাতে কচলাতে দোকানের মালিকের দিকে তাকিয়ে রইল।
-কিন্তু অবিরল, দামটা তো অনেকটাই বেশি বলছ।
-হে হে কী যে বলেন সাহেব, এটা বানাতে আমার কতদিন লেগে গেছে, এত সুন্দর নিঁখুত কাজ এই তল্লাটে অবিরল ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে?
দোকানটা হল আর্ট স্টুডিও, এখানে বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম কাজের জিনিস পাওয়া যায়। মাটি, গালা, কাঠ বা পাথরের তৈরি সুন্দর শো পিস বিক্রির জন্য এটি কয়েকবছরেই সুখ্যাতি অর্জন করেছে।বাগডোগরা বিমানবন্দরের কাছে হওয়ার জন্য এখানে প্রতিনিয়ত ভিন রাজ্য তো বটেই বিদেশীরাও প্রায়ই এই স্টুডিও থেকে অমূল্য হাতের কাজের জিনিস কিনে নেন।
অবিরল এই দোকানে পাথরের ভাস্কর্যের বিভিন্ন জিনিস সাপ্লাই করে।
অবিরল এবারে একটি পেখম তোলা পাথরের ময়ূর নিয়ে এসেছে। কালো গ্রানাইট পাথরের ওপর খোদাই করা পুরুষ ময়ূরটিকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এখনই সে ডেকে উঠবে। এত জীবন্ত ও সূক্ষ্ম কাজ দোকানের মালিক প্রিয়তোষ কখনও দেখেননি। তবে অবাক করা বিস্ময় হল, ময়ূরটিকে দেখে মনে হচ্ছে যেন অতর্কিতে তাকে একটা মুহূর্তে হঠাৎ করে বানিয়ে ফেলা হয়েছে। ময়ূরটির চোখ, মুখ ছাপিয়ে ভেসে উঠছে কেমন একটা ভয়ার্ত, আকুল করা চেহারা। একটানা বেশ কিছুক্ষণ গ্রানাইটের এই ভাস্কর্যটির দিকে তাকিয়ে থাকলে এক অজানা অস্বস্তিতে মন ভরে যায়।
প্রিয়তোষ ভাস্কর্যটিকে আতসকাচ দিয়ে দেখতে দেখতে অবিরলকে বললেন,
-কিন্তু অবিরল, এরকম একটা অপূর্ব কাজ, গ্রানাইটের মতো আগ্নেয় শিলা যা কিনা ভীষণ শক্ত, সাধারণ যন্ত্রপাতি দিয়ে কেমন করে বানালে?
অবিরল এবার তার মাথার টুপিটা একটু ঠিক করে নিতে নিতে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-সাহেব, নিতে হলে নিন। না হলে এসব হাবিজাবি সওয়াল করে সময় বরবাদ করবেন না।
-আরে, তুমি তো রেগে গেলে দেখছি!
-আপনার সঙ্গে আমার কতদিনের রিশতা, এতদিন তো কিছু বলেননি। এখন কেন?
প্রিয়তোষ একটু খুক খুক করে কেশে বললেন,
-এসো একটু ভাল দার্জিলিং চা খেতে খেতে দাম ঠিক করে ফেলি।
অবিরল আবার আগের চেহারায় ফিরে গেল, হাতদুটো ঘষতে ঘষতে বলল,
-হে হে এবার কিন্তু দামে কমতি হবে না, ওই দাম দিতে হোবে।
-সে তো তোমার হাতদুটো দেখেই বুঝতে পারছি, তা ওপরের তালুতে এমন জখম হল কীভাবে?
অবিরলের লোভী কুতকুতে চোখদুটো মুহূর্তে রাগে জ্বলে উঠল, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
-আরে সাহেব, আমার ঘোড়াটা আছে না? পেসা…উকে নিয়ে জঙ্গলে গিয়েছিলাম, উখানেই বেসামাল হয়ে যায়। ও খুব দুষ্টু আছে।
প্রিয়তোষ আর কথা বাড়ালেন না। আবারও গম্ভীর হয়ে অবিরলের আনা ময়ূরের ভাস্কর্যটিকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলেন।
অবিরল যতগুলো পাথরের ভাস্কর্য নিয়ে আসে সবগুলো এতই অস্বাভাবিক রকমের নিপুণ হয় যে, প্রতি বারই অনেক চড়া দামে বিক্রি হয়ে যায়।আর প্রতি বার প্রিয়তোষের মনে কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। এমন একটা প্রত্যন্ত গ্রামে বসে অবিরল কেমন করে এত সুন্দর ও সূক্ষ্ম কাজ করে?
তখন শিলিগুড়ির আকাশে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনাচ্ছে, শহরটা ঢেকে যাচ্ছে রহস্যময় শ্লেটরঙা আঁধারে। সেদিকে তাকিয়ে প্রিয়তোষের মনে হল কিছু অদৃশ্য রহস্য বুঝি আমাদের চারিদিকে গুড়ো গুড়ো রঙের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তার কূল কিনারা করা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
অবিরল ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে দেঁতো হাসি হেসে বলল,
-ইয়ে সাহেব, আমার নাম অবিরল গুরুং, নেপালিতে আমার নামের অর্থ হল ‘যা কোনদিন শেষ হয় না।’ আমিও কোনদিন শেষ হব না। আপনাকে এভাবেই বছরের-পর-বছর দিনের-পর-দিন এমনই অপূর্ব ভাস্কর্য সাপ্লাই করব।
প্রিয়তোষ একটু অন্যমনস্ক হয়ে ভুরু কুঁচকে অবিরলের দিকে একবার তাকালেন তারপর চুপচাপ চা খেতে শুরু করলেন।
৩
-ওয়েলকাম ইয়াংম্যান, আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম।
-স্যর, আপনারা আজ এসে পৌঁছেছেন শুনে অফিস যাওয়ার পথে চলে এলাম।
-খুব ভালো করেছ, শুভায়ন। আমার ছেলের সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দিই, শৌর্য সেন, ডাকনাম মুকুট।
শুভায়ন এগিয়ে গিয়ে ভীষণ আন্তরিকভাবে মুকুটের হাতদুটোকে নিজের হাতে নিল। তারপরই শ্রাগ করে বলল
-আমায় কিন্তু শুভায়নদা বলবে, তোমার বাবা আমার বস কম দাদা বেশি।
অনিমেষ হইহই করে বলে উঠলেন,
-মুকুট, শুভায়ন বড়ো ভালো ছেলে, এমন কৃতী ছাত্র চট করে পাওয়া যায় না, আর বিভিন্ন বিষয়ে ওর অগাধ জ্ঞান, এটা পরে ওর সঙ্গে মিশলে বুঝতে পারবি।
শুভায়ন একটু লজ্জিত হয়ে বলল,
-স্যর, আপনিও আবার শুরু করে দিলেন! এখন আসি। পরে আবার দেখা হবে।
ততক্ষণে মুকুটের মা বাগানে নেমে এসেছেন। উনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন,
-শুভায়নের অনেক গল্প ওঁর মুখে শুনেছি, প্রথমবার দেখা করতে এলে, এসো একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করি।
বিশু ডাইনিং রুম থেকে হাঁক দিল,
-চলে আসেন, খাবার রেডি।
ওরা সকলে বাংলোর মধ্যে প্রবেশ করল। সামনে ঢুকেই একটা বড়ো পুরোনো আমলের ওভাল শেপের টেবিল, ওর ওপরে সুন্দর কারুকার্য করা স্বচ্ছ কাচ আটকানো। টেবিলের পেছনেই সাহেবি কায়দায় ফায়ারপ্লেস রাখা রয়েছে। টেবিলের পাশ দিয়ে লম্বা বারান্দার একপাশে দুটি ঘর আর বারান্দার উল্টো দিকে রান্নাঘর এবং লাগোয়া আরও একটি ঘর রয়েছে। বর্ণময় ডাইনিং স্পেস জুড়ে প্রচুর ইনডোর প্ল্যান্ট ঘরটিকে করে তুলেছে আরও জীবন্ত ও সজীব। কাচের জানলার ওপারে তট জুড়ে সিসামারা নদী মেয়েলি বিভঙ্গ নিয়ে এগিয়ে গেছে দূরে। আর বাংলোর মধ্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল একেবারে শেষপ্রান্তে সেগুন কাঠের সিঁড়ি, সাপের মতো বেঁকে উঠে গেছে দোতলায়।
টেবিলের ওপর ততক্ষণে গরম লুচি আর সাদা আলুর তরকারি লোভনীয় মৌতাত ছড়াচ্ছে, সেটা দেখে মুকুটের পেটে খিদে যেন আরও বেশি করে চাগাড় দিয়ে উঠল। কিন্তু ওই কালো রঙের বার্ণিশ করা কাঠের সিঁড়ি যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল।
সে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল ওপরে। সুন্দর কাঠের রেলিং ছুঁয়ে দোতলায় পৌঁছে দেখল উত্তর দিক জুড়ে লম্বা টানা বারান্দা, তার উল্টো দিকে পরপর তিনটি ঘর, প্রতিটি ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুম রয়েছে। মাঝের ঘরের বাথরুমের বাইরের দিকে একটা দরজা, সেখান থেকে একটা লোহার স্পাইরাল স্টেয়ার নেমে গেছে নিচে। দোতলাটি এমনভাবেই বানানো যে এটির বারান্দা ও প্রতিটি ঘর থেকে সর্পিল রেখায় বইতে থাকা সিসামারা নদীকে দেখা যায়।
মুকুট এক একটা করে ঘরে ঢুকল, দক্ষিণের জানলা দিয়ে সকালের রোদ কারুকাজ করা গ্রিলের আগল টপকে ঘরের মেঝেতে তৈরি করেছে ছায়ার আলপনা। লাল রঙের পিছল মেঝে জুড়ে রয়েছে পুরোনো দিনের দামী কার্পেট। জানলার বাইরে থেকে সিসামারা নদীর মৃদু হাওয়ায় কাঁচের জানলাগুলো ক্যাচ ক্যাচ শব্দে নড়ে উঠছে। ঘরের অন্যান্য আসবাবের সঙ্গে রয়েছে কাঠের কারুকাজ করা সাবেকি আমলের অপূর্ব সুন্দর পালঙ্ক। মুকুট পালঙ্ক ছুঁয়ে দেখল। আর ঠিক তখনই পেছনে একটা বাচ্চার গলার আওয়াজে চমকে উঠল।
-দাদাবাবু, নিচে আপনাকে ডাকচে।
বিশুর ছেলে শুভ ওকে ডাকতে এসেছে। মুকুট ওর সঙ্গে নীচে নেমে এল। ততক্ষণে ডাইনিং টেবিলে জোর গল্প চলছে। শুভায়ন খাওয়া শেষ করে বলল,
-বৌদি, রাতে এখানে প্রায়ই লোডশেডিং হয়। সিসামারায় রাতে বন্য জন্তু জল খেতে আসে। আপনারা তো কোলকাত্তাইয়া লোকজন! ভয় পাবেন না আবার।
তারপর চটপট সকলের কাছ থেকে সেদিনের মতো বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে রওনা দিল।
ঠিক তখনই মুকুটের মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল। রূপকথার ফোন।
-কিরে, কখন থেকে গ্রুপে মেসেজ করেছি, ঠিক করে পৌঁছালি কি না জিজ্ঞেস করে হেদিয়ে মরছি, আর তুই কী করছিলিস বল তো?
-ও হো একদম ভুল হয়ে গেছে রে, আসলে এখানে এসে ইস্তক চারিদিকের পরিবেশ এত সুন্দর তোদের মেসেজ করতে একদম ভুলে গেছি রে।
-হ্যাঁ, পৌঁছেই ভুলে গেলি তো?
ফোনের ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসে।
-আরে না না, আচ্ছা তোদের এখানকার খানকতক ছবি পাঠাচ্ছি।
-ওক্কে
বলে রূপকথা ফোন কেটে দিল।
মুকুট ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
-আমি একটু সিসামারার ধারে যাচ্ছি।
-তাহলে শুভকে সঙ্গে করে নিয়ে যা।
সঙ্গে সঙ্গে বিশু কোথা থেকে যেন আবির্ভূত হয়ে একটু ভয়ার্ত গলায় বলল,
-ছোট দাদাবাবু, বেশি দূর কিন্তু যেওনি।
তারপর চোখ সরু করে যোগ করল,
-আসলে, বনের হাতি টাতি জল খেতি আসে কিনা তাই।
শুভ বলে উঠল,
-না গো দাদাভাই, ক’দিন থেকে জঙ্গলের দিকে কেমন আওয়াজ উঠছে, সেইজন্যিই বুঝি বাবা আমাদের বেশিদূর যেতি নিষেধ করছে।
মুকুটের বাবা চোখের চশমা সোজা করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন,
-কীসের আওয়াজ বিশু?
-ও কিচু নয়, দাদাবাবু, শুভটা বড়ো পেকেছে।
তারপর শুভকে রাগত গলায় বলল,
-যা দিকিনি মেলা না বকে, ছোড়দাকে লিয়ে যা।
মুকুটের তখন এইসমস্ত কথাবার্তার দিকে মন নেই, ও দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলেছে বাংলোর সীমানা ছাড়িয়ে। বাঁধের মতো উঁচু জায়গাটাকে পার করলেই সামনে একটু ঢালু জমি, তারপরই নেমে গেছে সিসামারা নদীর সাদা চর।
ফিনফিনে হাওয়ায় কান পাতলে শোনা যাচ্ছে বাতাসের কানাকানি। মাঝে মাঝে এই নিরবতাকে ছিন্ন করছে ময়ূরের কেকাধ্বনি। নদীর চরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গোলগোল নুড়িপাথর। দু’পাশের জঙ্গুলে গাছে নাম না জানা বিভিন্ন রঙের ফুল ফুটে রয়েছে। মুকুট মোবাইল বার করে কয়েকটা ছবি তোলবার জন্য সামনের দিকে এগোল। শুভ তাদের স্থানীয় ভাষায় গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ওর পেছনে হাঁটতে লাগল। নদীর সামনের বাঁক ঘুরে একটু এগোতেই মুকুট দেখতে পেল রুক্ষ হলুদ হয়ে যাওয়া গাছের আড়ালে দশ বারো বছরের একটা ছেলে বসে রয়েছে, একটু দূরে জঙ্গলের মধ্যে একপাল ছাগল চরছে। ছেলেটা রোদের দিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে মুকুটকে বলল,
-দাদা, উদিকে আর যাস না, বড়ো বড়ো জন্তু আছে।
মুকুট আর শুভ ততক্ষণে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
মোবাইল হাতে নিয়ে ছবি তুলতে তুলতে মুকুট ওর সামনে বসে থাকা ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল,
-আর একটু এগোলে কী কী জন্তু দেখা যাবে?
ছেলেটা চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে উত্তর দিল,
-হাতি গন্ডার আর বড় বড় সাপ।
-সাপ?
-হ্যাঁ রে, সকাল সকাল এলে আরও জঙ্গলের অনেক ভেতরে গেলে দেখতে পাবি।
মুকুট এই কথাটায় একটু থমকাল। তারপরই পেছন থেকে জামায় একটা টান অনুভব করে তাকিয়ে দেখল শুভ ওর জামা ধরে টান দিয়েছে। ভয়ার্ত গলায় সে বলল,
-বাবাও ওর মতো বলছিল একদিন। একটা ঘো…
তারপরই কথাটা গিলে ফেলে বলল,
-দাদা চলো ফিরে যাই।
মুকুট ভ্রূ কুঁচকে সিসামারার কাচের মতো স্বচ্ছ জলের দিকে তাকিয়ে রইল।
৪
-তোমাদের ফেন্সিং বা তলোয়ার খেলা শিখতে গেলে প্রথমে নিজের মনকে সেটার জন্য তৈরি করতে হবে। এখন তুমি ফয়েল মানে হালকা তলোয়ার নিয়ে খেলছ, এরপর ‘এপি’তে যেতে হবে। সেখানে সাড়ে সাতশো গ্রামের বেশি ভারী তলোয়াল চালাতে হবে। ফেন্সিং-এর ফয়েলে প্রথমেই অফেনসিভ অ্যাটাক করতে হয়, এবং এটা শরীরের ঊর্ধ্বাংশে মানে কোমরের ওপরে তলোয়ারের মুখটাকে স্পর্শ করাতে হয়। শরীর ও মনের ঠিকঠাক মেলবন্ধন না হলে এটি খেলা যায় না। তুমি যদি মনে করো তুমি পারবে তবেই এটি শেখো। শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্য নয়, এ খেলা তোমার মনোবল বাড়াতেও সাহায্য করবে। আজ এই পর্যন্ত, পরের ক্লাসে তোমাদের আমি তলোয়ারের বিষয়ে আরও অনেক কিছু জানাব। আর তোমরা যারা আমার বাড়ির কাছাকাছি থাকো তারা এরমধ্যেই চলে আসতে পারো, সামনে থেকে তলোয়ার শেখার মজাই আলাদা।
এতগুলো কথা বলে বর্ণিকা সেদিনের মতো ইউটিউব চ্যানেলে ক্লাস নেওয়া শেষ করল। তাকিয়ে দেখল তার বাবা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
-তোর জন্যই অপেক্ষা করছি, আগে মার্শাল আর্ট আর এখন তলোয়ার, পরবর্তীতে কী নিয়ে এগোবি ঠিক করেছিস্?
-বাবা, স্টেট লেভেলে ফেন্সিং জেতার পর এটার মোহে পড়ে গিয়েছি। বাচ্চাদের শেখাচ্ছি। পরবর্তী সময়ে এগুলো নিয়ে একটা অ্যাকাডেমি খোলবার ইচ্ছা রয়েছে।
-সেসব ঠিক আছে, কিন্তু আজ কি তুই স্কুলে যাবি?
-বাবা, তুমি যেদিন থেকে স্কুলের হেডস্যার হয়েছ আমার ওপর খবরদারি তোমার বেড়ে গেছে।
অভিমানী গলায় বর্ণিকা কথাগুলো বলে ওঠে।
-বনি মা, তা নয় রে, আমাদের এখানে একজন নতুন ফরেস্ট অফিসার জয়েন করেছেন, তাঁর ছেলে এই স্কুলে ভর্তি হয়েছে, তোর ক্লাসেই। তো আমি চাই তুই ওর সঙ্গে একটু থাক। বুঝতেই পারছিস নতুন এসেছে…
-আচ্ছা, বাবা আমি বুঝেছি, আজকেই ওর সঙ্গে দেখা করে নিচ্ছি। আজ তো স্পোর্টস ক্লাস আছে তখনই আলাপ করে নেব।
এরপর সমীরবাবু স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হলেন। বর্ণিকাও চটপট তৈরি হয়ে বাবার সঙ্গে স্কুলের পথে রওনা দিল।
মুকুটের নতুন স্কুল বেশ পছন্দ হয়ে গেল, বন্ধু ও শিক্ষকরা বেশ আন্তরিক। সবচেয়ে বড়ো কথা এই স্কুলের লাইব্রেরিটি দেখবার মতো। মুকুটের মনে হল সারাদিন বুঝি সে এই লাইব্রেরিতে কাটিয়ে দিতে পারবে ।
এই স্কুলের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল এখানে ছাত্র ছাত্রীদের খেলাধুলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেটা ওদের কলকাতার স্কুলে একদম ছিল না। মুকুট নিজেও ভলিবল খেলতে ভীষণ ভালোবাসে। তাই স্কুলের প্রথমদিনেই স্পোর্টস ক্লাস পেয়ে সে খুব আনন্দিত হয়েছিল।
প্লে গ্রাউন্ডে ঢুকতেই প্রথমে মুকুটের কানে এল, বর্ণিকা নামটা, ওরই ক্লাসের বেশ কিছু ছেলে মেয়ে একটা নির্দিষ্ট তালে ওই নামটা বারবার উচ্চারণ করছে।
তারপরই তাকিয়ে দেখল, ক্যারাটের সাদা পোশাক আর ব্ল্যাক বেল্ট পরা একটি মেয়ে, ঋজু চেহারা, গায়ের রং ডিমের কুসুমের মতো হলুদ কমলা, চোখ ও নাক ভীষণ চোখা একদম মিশরীয় দেবীদের মতো। মধু জমা গভীর চোখের মণিতে সচকিত ভাব, ধূসর চুলগুলো গাছখোঁপা করে বাঁধা। মুকুট বুঝতে পারল এর নাম বর্ণিকা।
মেয়েটি সোজা ক্যারাটে গ্রাউন্ডে চলে এল, তারপর ঠিক তিন মিনিটের মাথায় নিজের প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে ফেলল। আবারও ওর বন্ধুরা ওর নামের শ্লোগান দিতে শুরু করল। মুকুট ওর দিকে এগিয়ে গেল তারপর বর্ণিকাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে করমর্দনের জন্য নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল
-হাই, আমি শৌর্য সেন।
-হ্যালো, আমি বর্ণিকা রায়চৌধুরী। আমার বাবা এই স্কুলের হেডমাস্টার, আজ সকালেই তোমার কথা বলছিলেন।
-আচ্ছা, তোমার ক্যারাটে দেখলাম, অনবদ্য ।
বর্ণিকা সলজ্জ হেসে উত্তর দিল,
-ওই আর কী, মা বলেন গেছো মেয়ে।
-তোমার বডি সুইফটনেস তো দারুণ!
পাশ থেকে ওদের এক ক্লাসমেট বলল
-আরে শৌর্য তুমি ওর তলোয়ার চালানো দেখোনি, একেবারে নিনজা।
-তাই? আমি তো ভাবতেই পারিনি এমন একটা মফস্বলি জায়গায় এমন সব বৈশিষ্ট্য পাব।
-শৌর্য, এই শহরটার আনাচ কানাচে প্রচুর গল্প লুকিয়ে রয়েছে, তুমি যেমন চাও এই শহর ঠিক তেমন করে তোমার কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করবে।
মুকুট কিছুক্ষণ বর্ণিকার দিকে তাকিয়ে রইল তারপর ধীরে ধীরে বলল,
-ঠিক বলেছ, এই শহরের অনেক রহস্য আছে।
৫
অবিরল গুরুং শিলিগুড়ি থেকে ফেরার বাস ধরে যখন সিকিম সীমান্তে নামল তখন সন্ধ্যার বেলা সূর্যকে সেদিনের মতো ছুটি দিয়ে নিজেই একটু একটু করে আকাশের দখল নিচ্ছে। পাহাড়ের দুর্গম খাঁজে বেড়ে ওঠা নাম না জানা গাছগুলোর মাথায় মশারির জালের মতো শেষ বিকেলের আঁধার ঘনিয়ে আসছে। দূরের পাখিরা বাসায় ফেরার তাড়নায় মশগুল হয়ে কলকল করতে করতে শ্লেট রঙের আকাশের ওপর দিয়ে ব্যস্ত ডানা মেলে উড়ে চলেছে। একটু দূরে বাসের শব্দ মিলিয়ে যেতেই পাহাড়ের এই দিকটাকে যেন একটা বিরাট মৌনতা গ্রাস করল। অবিরল ধূসর রঙের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখল, সেখানে ধোঁয়ার মতো কুয়াশা জমাট বেঁধেছে।
কুয়াশার একটা বৈশিষ্ট্য আছে। এটি প্রথমেই দৃশ্যমানতাকে কমিয়ে দিয়ে তৈরি করে এক অদ্ভুত অজানা রহস্য। মানুষ যেটা পরিষ্কার বুঝতে পারে না বা দেখতে পারে না সেটা ঘিরেই তার মনে তৈরি হয় অজানা ভয়। অবিরলের সঙ্গে সঙ্গে দোকানের মালিক প্রিয়তোষের মুখটা মনে পড়ে গেল।একটা খল হাসি ওর চোখে মুখে ফুটে উঠল। সে মাফলারটাকে গলার মধ্যে আরও ভালো করে জড়িয়ে নিল, তারপর চড়াই ভেঙে এগিয়ে চলল তার বাড়ির উদ্দেশ্যে।
বাড়ি নামেই, ছোট্ট একটা মাথা গোঁজার জায়গা। জনবসতিহীন পাহাড়ের গায়ে ঝুলতে থাকা কাঠের কাঠামোর ওপর একটা ছোট ঘর, টিনের চাল, ঘরের এককোণে পার্টিশান করে রান্নার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবিরলের ঘরের ঠিক লাগোয়া পেছনের দিকে একটা ছোট খুপরি রয়েছে। সেই ঘরটির বাইরের দিকে একটাই জানলা, কাচের জানলাটির গায়ে বেশ কয়েক প্রস্থ আলকাতরা লাগানো রয়েছে।
অবিরল তার ঘরের সামনের একচিলতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কী যেন একটা ভাবল। তারপর দুটো আঙুল মুখের মধ্যে দিয়ে জোরে একটা শিস দিল।
সঙ্গে সঙ্গে যেন সন্ধ্যার কালো আকাশ ফুঁড়ে একটা দুধ ধবধবে সাদা ঘোড়া এসে অবিরলের সামনে দাঁড়াল। অবিরল ঘোড়াটির দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর বিড়বিড় করে দুর্বোধ্য ভাষায় কী একটা বলল। হাতে ধরা ব্যাগটা এগিয়ে দিল ঘোড়াটির দিকে, ঘোড়াটা যেন বুঝতে পারল অবিরলের কথা। এগিয়ে গিয়ে প্রায় ছোঁ মেরে ব্যাগটা ওর হাত থেকে মুখে করে ধরে আবার মুহূর্তেই পাহাড়ের ঢালে অদৃশ্য হয়ে গেল। অবিরল ওর কুতকুতে চোখগুলো আরও ছোট করে সেদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পেছন ফিরে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে তালা খুলে বাড়ির মধ্যে ঢুকল।ঘরের মধ্যে খুব কম পাওয়ারের একটা আলো জ্বলছে, সেই আলো ঘরের অন্ধকারকে যেন আরও বেশি করে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঘরের আনাচ কানাচের সূক্ষ্ম আলোর ও আঁধারীর মধ্যে কী এক অজানা ভয় যেন তুলো ভাসার মতো করে ঘরের পুরোটা জুড়ে ছেয়ে রয়েছে। ছোট্ট ঘরটার বাতাস বোঁটকা গন্ধে ছেয়ে রয়েছে, মনে হচ্ছে বহুদিনের মাংস পচে গেছে। ঘরের জিনিসপত্র সমস্ত এলোমেলো করে ছড়ানো। অবিরলের সেদিকে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। ঘরে ঢুকেই সে স্বগতোক্তি করে উঠল
-এবার ওই পাথরের জিনিস বিক্রি করে আমি বড়োলোক হয়ে যাব। আমার সাধনার জন্য আরও অনেক অনেক টাকা চাই। পেসাকে আমি যা বলব ও তাই করবে। ওরা আমার কথাই শুনবে, হ্যাঁ তাছাড়া ওদের আর উপায়ও নেই।
আমার নাম অবিরল যার মানে হল, যেটার কোনও শেষ নেই। আমি একদিন অমর হয়ে যাব।
তারপর অবিরল ঘরের মধ্যে ব্যস্ত পদক্ষেপে পায়চারি করতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে ঘরের কোণে গিয়ে বালতির মধ্যে বাজার থেকে কিনে আনা প্যাকেটটা উপুড় করে দিল। সেখানে বনমুরগির কাঁচা মাংস বেরিয়ে এল। অবিরল সেদিকে লোলুপ দৃষ্টি দিল, তারপর চটপট রান্না চাপিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পরে জঙ্গলের মধ্যে থেকে একটা বুনো শুয়োরের চাপা গজরানোর শব্দ ভেসে এল। সেই শব্দটা অবিরল কান পেতে শুনতে লাগল। তারপর নিজের মনেই বলতে শুরু করল,
-হ্যাহ্, ওদের বড়ো খিদে, এত দিই তবুও পেট ভরে না, আমার তো মনে হয় ওরা খিদের চোটে আমায় না কোনদিন খেয়ে ফেলে।
তারপর নিজেই হাসতে হাসতে হিসহিস করে বলে ওঠে,
-কী যে বলি না, আমার শরীরে যে বিষ রয়েছে, আমায় খেলে ওরা মরে যাবে।
তারপর অবিরল বালতির মাংসগুলো ছিঁড়ে খেতে খেতে আলোর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বিনবিনে গলায়, অদ্ভুত সুরে কী সব মন্ত্রের মতো বলতে শুরু করে দিল।
কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেল অবিরলের ছোট্ট কাঠের ঘরটার মধ্যে হরেকরকম বিষাক্ত সাপ কিলবিল করছে। অবিরল যেন সাপগুলোকে কী এক অজানা কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করছে। তার চোখদুটো লাল হয়ে ভাটার মতো জ্বলছে, ঠোঁটদুটো ফুলে উঠেছে। সে তখনও বিনবিনে গলায় সেই দুর্বোধ্য মন্ত্রটা বলেই চলেছে।
একসময় সে হাত বাড়িয়ে একটা সাপকে হাতে তুলে নিল, সাপটা বাধ্য ছাত্রের মতো ওর হাতের ওপর উঠে কনুইয়ের উল্টো দিকে হাতের নরম মাংসের ওপর ছোবল মারল।
অবিরল কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে রইল তারপর নেশাগ্রস্তের মতো বুঁদ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। একসময় অদ্ভুত মন্ত্র পাঠ থেমে গেল। ওর চারিপাশে ছড়িয়ে থাকা সাপগুলো ক্রমেই ওর শরীরের ওপরে কিলবিল করে ঘুরতে লাগল। বহু দূর থেকে সাপের ফোঁস ফোঁস শব্দ সেই নির্জন পাহাড়ের চারিদিকে ভেসে বেড়াতে লাগল।
৬
-এটা অভয়ারণ্য না রহস্যময় জঙ্গল? আমার এতবছরের চাকরিতে এরকম তো কখনও শুনিনি আমি। বাঘ, ভাল্লুক, হাতি গায়েব হয়ে যায় এ তো আকছার শোনা যায়, তা বলে ছোট জন্তুগুলো উধাও হয়ে যাচ্ছে এমনটা তো কখনও শুনিনি।
অনিমেষ সেন চশমাটিকে নাকের ওপর তুলে কথাগুলো বললেন।
এই বিট অফিসটি জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের একদম লাগোয়া। অফিসের পাশে একটি সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। তবে এটি সর্বসাধারণের জন্য নয়। শুধুমাত্র অফিসের কাজে এটি ব্যবহৃত হয়।
মুকুটের বাবা অনিমেষ সেন ও শুভায়ন সামনাসামনি বসে রয়েছেন। ধূমায়িত কফিতে চুমুক দিতে দিতে অনিমেষ অফিসের জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। সুন্দর রৌদ্রোজ্জ্বল দিন, একটু দূরের পাইন গাছের সারি দেখে মনে হচ্ছে বিধাতা যেন নিজের হাতে গাছগুলোকে অঙ্কের হিসাবে বিশেষ একটি দূরত্বে লাগিয়েছেন। গাছগুলো অনেকটা ছাতার মতো পাতাগুলো ছড়িয়ে আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিটি গাছে ডালপালা আর পাতা নির্দিষ্ট সীমানা ঘিরে রয়েছে। কোনও গাছের পাতা কোনও গাছকে অতিক্রম করেনি। যেন একটি আরেকটিকে না ছোঁয়ার খেলা চলছে। অনিমেষের মনে পড়ে গেল, গাছের শীর্ষের এই আচরণকে বলা হয় ‘ক্রাউন শাইনেস।’ পৃথিবীর বিভিন্ন বনাঞ্চলে এটি লক্ষ করা যায়। কোস্টারিকার ম্যানগ্রোভ থেকে শুরু করে মালয়েশিয়ার বনভূমিতেও এই “ক্রাউন শাইনেস” দেখা যায়। অনেক সময় বাতাস এই দূরত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে এ ধরনের দূরত্ব থাকলে বিভিন্নভাবে গাছের উপকার হতে পারে। সূর্যের আলো ঠিকঠাকভাবে গাছ পায়। আবার অনেক সময় বিভিন্ন পরজীবী এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়ায় না। বিভিন্ন রোগও কম ছড়ায়।
শুভায়নের গলার স্বরে তিনি আবার বাস্তবে ফিরে এলেন,
-স্যর, যদিও এটা আপনার দেখার কথা নয় তবুও সিনিয়র হিসাবে আপনার সুচিন্তিত মতামত আশা করছি।
একটু চুপ করে অনিমেষ কিছু ভাবলেন, তারপর বললেন,
-দেখো শুভায়ন, চাকরির বাইরে গিয়ে তোমায় বলছি, অরণ্যের নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে। মানুষ এই অরণ্য থেকে যা নেয় সেটাই তাকে ফেরতও দিতে হয়। আমি এখানে পোস্টিং পেয়েছি মাসখানেক, কিন্তু এসে থেকে কানাঘুষো যে সমস্ত খবর শুনছি তাতে কিছু পরিষ্কার করে বুঝতে পারছি না। আমার মনে হয়, আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা দরকার, ছোট ছোট জন্তু বা পাখি যেভাবে বলা নেই কওয়া নেই উধাও হয়ে যাচ্ছে তাতে করে মনে হচ্ছে এটা কিন্তু কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে বড়ো কোনও চক্র থাকতে পারে। তবে তাদের উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে না। তুমি একটা কাজ করতে পার এটা সরজমিনে তদন্ত করার জন্য একটা অ্যাকশন টিম বানাতে পারো। এই মুহূর্তে এটাই বলতে পারি।
ঠিক তখনই শুভায়নের বুক পকেটে মোবাইল শব্দ করে বেজে উঠল।
শুভায়ন ফোন রিসিভ করল, ফোনে কথা বলতে বলতেই ওর মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। তড়িঘড়ি ফোন রেখে ও অনিমেষের দিকে তাকিয়ে বলল,
-স্যার সাউথ রেঞ্জের দিকে বেশ কয়েকটা বুনো শুয়োরের লাশ একসঙ্গে পাওয়া গেছে। আমি একবার স্পট ভিজিট করে আসছি।
অনিমেষ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। শুভায়ন ঝটপট জিপে চড়ে রওনা দিল।
শাল, সেগুন, খয়ের, লালি, বহেড়া গাছগুলো উঁচু দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে, মনে হচ্ছে দীর্ঘ, ভারী আকাশটাকে যেন নিজেদের বলিষ্ঠ মাথায় আটকে রেখেছে। তোর্সা নদীর এই সেতুটি জলদাপাড়া ও চিলাপাতা অরণ্যকে ভাগ করেছে। তোর্সার জল এখন কম, তাই দুই অরণ্যের প্রাণীরা সহজেই এদিক ওদিকে ঘুরছে। হাতি, গাউর, হগ ডিয়ার, চিতা, কাঁকর বাঁদরের নির্ভীক চারণভূমি হল এই জলদাপাড়া অভয়ারণ্য। রাস্তায় যেতে যেতে আচমকা ড্রাইভার গাড়ির স্পিড কমিয়ে দিল, শুভায়ন ড্রাইভারের দিকে তাকাতেই সে চোখের ইশারায় সামনে দেখতে ইঙ্গিত করল। শুভায়ন তাকিয়ে দেখল, ফুট তিরিশেক দূরে রাস্তার ধারে একটি একশৃঙ্গ গন্ডার শাল গাছের গুঁড়িতে তার শৃঙ্গটি ঘষছে। গন্ডারের শৃঙ্গ মাঝে মাঝে চিড়বিড় করলে ওরা এমন করে থাকে। শুভায়নের মনে পড়ে গেল গন্ডারের রোজকার খাবারের মেনু হল কচিঘাস, চেপটি, নল মালসা, ইকরা ও খয়ের গাছের ছাল। জলদাপাড়া একশৃঙ্গ গন্ডারের জন্য বিখ্যাত। কাশিয়া গাছের জঙ্গলের পাশ দিয়ে একটি বেঙ্গল ফ্লোরিকান দম্পতিকে উড়ে যেতে দেখা গেল, এই লুপ্তপ্রায় প্রজাতির পাখিটি সারা ভারতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জলদাপাড়া অভয়ারণ্যেই শুধুমাত্র দেখা যায়।
শুভায়নের জিপ আবার চলতে শুরু করল, কিছুক্ষণ পরে বনকর্মীদের কোয়াটারের পাশ দিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতিদের বিশ্রামাগার অর্থাৎ পিলখানা পার করে আরও একটু এগিয়ে শুভায়ন তার গন্তব্যে পৌঁছাল।
জিপ থেকে নেমেই প্রথমে যেটা চোখে পড়ল সেটা হচ্ছে আকাশে প্রচুর শকুন উড়ছে। চারিদিকে কেমন যেন একটা গা-ছমছমে পরিবেশ। এই জায়গাটার আকাশটাও একটু নিভু নিভু বলে মনে হল শুভায়নের, চারিদিকের অরণ্য যেন কোনও এক অনাহূত ভয়ে নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে বলিষ্ঠ পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল, জলদাপাড়ার এই দিকটায় খুব বেশি বড়ো গাছ নেই। সামনে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় পাঁচটি বুনো শুয়োরের লাশ পড়ে রয়েছে। শুয়োরগুলোর শরীরে তেমন কাঁটাছেঁড়ার কোনও দাগ নেই। তবে লাশগুলো আপাতদৃষ্টিতে দেখে মনে হচ্ছে কোনও ভয়ংকর বিষক্রিয়া করা হয়েছে। শরীর শক্ত হয়ে গিয়েছে। দেখে মনে হল শেষরাতের দিকে শুয়োরগুলো কোনও এক অজ্ঞাত কারণে মারা গেছে।ভালো করে দেখতে দেখতে একটা শুয়োরের দেহ খোবলানো বলে মনে হল, যেন শুয়োরটিকে গিলে খাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। বন্য শুয়োরটির সারা গায়ে চটচটে আঠার মতো জিনিস লাগানো।একটা বোঁটকা বিশ্রী গন্ধ এখনও জঙ্গলের ওই চত্বরে পাক খাচ্ছে । শুভায়নের বমি পেয়ে গেল, সে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে র্সরে এল। একটু দূরে বনের ভেতরে আরও একটি আধখাওয়া শুয়োরের দেহ আবিষ্কার হল। আশ্চর্য হওয়ার মতো ব্যাপার হল, প্রতিটি শুয়োরের দেহে দাঁত বসানোর কোনও চিহ্ন নেই। যেন মনে হচ্ছে, কোনও একটি মারণ গহ্বরের মধ্যে শুয়োরগুলোকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে বেশিরভাগ শুয়োরকে মারা হয়েছে রাগে, আক্রোশে ।
শুভায়ন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল।তারপর তার কর্তব্য স্থির করল। ঠিক কীভাবে এতগুলো শুয়োর একসঙ্গে মারা গেল সেটি নিশ্চিত করতে সে ময়না তদন্ত করবে বলে ঠিক করল। তখনই একজন বনকর্মী এগিয়ে এসে শুভায়নের কানে চাপা স্বরে কয়েকটি কথা বলল। শুভায়ন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-লোকটিকে পারলে একটু আমার অফিসে নিয়ে আসুন।
কথাটা বলেই সে জিপের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
৭
মুকুট হোয়াইস্ অ্যাপে বর্ণিকার পাঠানো ফেন্সিং এর ভিডিও দেখছিল। দেখতে দেখতে অবাক হয়ে যাচ্ছিল, ওর হাতের কব্জির কায়দা, ওর তলোয়ার চালানোর ভঙ্গিমা অসাধারণ। সবচেয়ে বড়ো কথা কলকাতা থেকে এত দূরে এমন একটা মফস্বল শহরে এরকম প্রতিভা ভাবা যায় না। সে বর্ণিকাকে মেসেজে লিখল
-তোমার নাম বর্ণিকা না হয়ে নির্ভীকা হলে ভাল হত।
তারপর মনে মনে ঠিক করল, ওকে জিজ্ঞেস করে ওর কোলকাতার বন্ধুদের গ্রুপে অ্যাড করে নেবে।
এমনসময় চারিদিক অন্ধকার করে লোডশেডিং হয়ে গেল। মুকুট ফোন সরিয়ে রেখে ঘরের জানলার কাছে এসে দাঁড়াল। আজ পূর্ণিমা, চাঁদের নরম আলোয় সিসামারাকে আরও মোহময়ী দেখাচ্ছে। সিসামারার চর থেকে একটু দূরে চিক, লালি, জারুল গাছের নিচে মালসা, নল, পুরান্ডির জঙ্গলের মধ্যে তাকালে আলো আঁধারির এক অদ্ভুত বৈচিত্র্য লক্ষ করা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে এলোমেলো হাওয়া তিরতিরে জঙ্গলের ওপর দিয়ে ঢেউ এর মতো বয়ে চলেছে, পাতার শনশন আওয়াজ সেই দৃশ্যকে করে তুলেছে আরও প্রাণবন্ত ।চারিদিকের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে, যেন কোনও এক দক্ষ আঁকিয়ে রূপালি কালো ক্রেয়ন দিয়ে সাদা পাতার ওপর তৈরি করেছে এক অপূর্ব মায়াজগত। চাঁদের রূপালি আলোয় সিসামারার জল দেখে মনে হচ্ছে বুঝি রূপোর সুতো দিয়ে আঁকা কোনও কুহক।
মুকুট তন্ময় হয়ে প্রকৃতির এই অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করছিল।
আচমকা বৃংহনের শব্দ শুনে বুঝতে পারল হাতির দল জল খেতে এসেছে। মুকুট পায়ে পায়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল, এখান থেকে নদীর ওই বাঁকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, প্রায় সাত আটটা হাতি একসঙ্গে দল বেঁধে জল খেতে এসেছে। এভাবে মুকুট কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল জানে না। আচমকাই বাংলোর থেকে অনতিদূরে সার্ভেন্ট কোয়াটারের কাছে বিশুর চিৎকার শুনে সংবিৎ ফিরে পেয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এল।
-এই বিশু তুমি অমন করে অন্ধকারে চিৎকার করছ কেন?
মা উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করলেন।
-আ আ আপনি শোনেননি?
-কী ?
-সাপেদের ফোঁসফোঁস শব্দ?
এবার মুকুট বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
-বিশুদা, সন্ধেবেলাতেই হাঁড়িয়া খেয়েছ নাকি? এখানে এত সাপ কোথা থেকে আসবে?
বিশু বিস্ফারিত চোখে মুকুটের দিকে তাকিয়ে বলল,
-কয়মাস ধরে এমনই হচ্ছে, ছোড়দা। কেমন যেন চারিদিকে ভয় ভয় ভাব। আমরা জঙ্গুলে মানুষ, জঙৃগলের ভাষা আমরা বুঝতে পারি।তোমরা এটা বুঝতে পারবে না।
সঙ্গে সঙ্গে নদীর ধারের ওই ছেলেটার কথা মুকুটের মনে পড়ে গেল। এরা সকলে মিলে কী বলতে চাইছে মুকুট তার বিন্দু বিসর্গও বুঝতে পারছে না। কিন্তু একটা জিনিস সে ভালোই অনুভব করছিল, এই জঙ্গলে এমন একটা কিছু ঘটনা ঘটছে যা ঘটা উচিত নয়।
মুকুট তখনই ঠিক করল এটা নিয়ে শুভায়ন ও বর্ণিকার সঙ্গে সে কথা বলবে।
পরেরদিন স্কুলে গিয়ে টিফিন পিরিয়ডে মুকুট বর্ণিকাকে গতকাল রাত্রের ঘটনা জানাল। বর্ণিকা সমস্ত কথাগুলো শুনে মুকুটকে বলল,
-চলো, একদিন জঙ্গলের মধ্যে যাওয়া যাক। নিজেরা চাক্ষুষ করে আসি। ঠিক কী ঘটছে জেনে আসি।
মুকুট একটু ইতস্তত করে বর্ণিকাকে বলল,
-বনি, তার আগে শুভায়নদাকে জানালে হতো না?
-ওঁকে জানালে উনি কখনই আমাদের জঙ্গলের মধ্যে এভাবে একা একা যেতে দেবেন না।
মুকুট মিনিটখানেক কী যেন ভাবল তারপর বনির দিকে তাকিয়ে বলল,
-বেশ, তুমি যখন বলছ তখন যাওয়া যেতেই পারে।
বনি ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-তাহলে কবে যাচ্ছি আমরা?
-খুব শীঘ্রই ।
৮
মর্নিং ওয়াক সেরে ফিরে এসে চায়ের টেবিলে বসে অনিমেষ খবরের কাগজ পড়তে পড়তে চা খাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই ওঁর মোবাইল ফোনটি শব্দ করে বেজে উঠল। অনিমেষ দেখলেন স্ক্রিনে শুভায়নের নাম। ফোন রিসিভ করে হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গে ফোনের অপর প্রান্তে শুভায়ন হুড়মুড় করে বলে উঠল,
-স্যর আপনি আজকে একটু তাড়াতাড়ি অফিস আসতে পারবেন?
-কী ব্যাপার শুভায়ন? কিছু হয়েছে?
-স্যর আপনি আসুন, সাক্ষাতে বলব।
অনিমেষ ফোন কেটে দিয়ে অফিসের জন্য তৈরি হতে শুরু করলেন।
উনি অফিসে পৌঁছে দেখলেন শুভায়ন অফিসের সামনের করিডরে চিন্তিত মুখে পায়চারি করছে।
অনিমেষ ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই শুভায়ন বলে উঠল,
-স্যর আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম আসুন।
শুভায়ন একটা কাগজ হাতে করে এনে অনিমেষের চেম্বারে এল। অনিমেষ চশমা পরে কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলেন, শুয়োরের ময়না তদন্তের রিপোর্ট।
অনিমেষ খুব ভালো করে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পড়ে শুভায়নের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন।
-স্যর, এটা কী করে সম্ভব?
-আমিও বুঝতে পারছি না। রিপোর্টে যে ধরণের সাপের বিষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেটা তো ফরেস্ট কোবরা। এই ধরণের সাপ আফ্রিকার মধ্য ও পশ্চিমভাগে দেখা যায়। ফরেস্ট কোবরার বিষ আমাদের দেশে তাও আবার জলদাপাড়ায় পাওয়া অসম্ভবের কাছাকাছি।
-তাহলে? এই সমস্যা তো সমাধান হওয়ার জায়গায় আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে!
-হুম্, শুভায়ন আমার মনে হয় আমাদের একটু সময় নিয়ে ধৈর্য ধরে এই বিষয়টিকে নিয়ে ভাবতে হবে।
শুভায়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল
-ঠিক আছে স্যর, আপনি যখন বলছেন তখন দেখছি।
***
শুভায়ন নিজের চেম্বারে বসে সমস্ত ঘটনাগুলো প্রথম থেকে ভাবছিল।
আর্দালি ওর ঘরে বেল বাজিয়ে এসে জানাল অবিরল গুরুং দেখা করতে এসেছে।
অবিরল বিট অফিসের ভিজিটার্স লাউঞ্জে তিতকুটে মুখে বসেছিল। সেদিন রাতে সাপের বিষে নেশা করার পর, কতদিন অমন অজ্ঞান হয়ে বিছানায় পড়েছিল তা সে জানে না। জ্ঞান ফিরলে শুনতে পেল ওর দরজায় কে কড়া নাড়ছে। ঘুমচোখে উঠে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখল, দু’জন অচেনা লোক ওর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে।অবিরল একটু সতর্ক হয়ে গেল, ওর মনে হল হঠাৎ করে এই দু’জন কী উদ্দেশ্যে এসেছে?
সামনের লোকটি ওকে বলল,
-দাদা, আমরা ফরেস্ট অফিস থেকে আসছি, আপনি আমাদের সঙ্গে একটু অফিসে যাবেন?
অবিরলের ধূর্ত নজর সঙ্গে সঙ্গে সচকিত হয়ে গেল। ও ভাবল, এখন যদি সে ওদের সঙ্গে না যায়, তবে ওদের পুরো সন্দেহ ওর ওপর গিয়ে পড়বে।
অবিরল নিজের মুখ চোখে একটা গোবেচারা ভাব ফুটিয়ে বলল,
-আচ্ছা, বেশ চলো তবে।
অবিরল ঝোঁকের মাথায় ফরেস্ট অফিসে চলে এসেছে, তবে এখন ভাবছে কোনওরকম প্রস্তুতি ছাড়া এভাবে আসাটা একেবারেই ঠিক হয়নি।
তখনই একজন আর্দালি এসে ওকে ডেকে নিয়ে গেল।
-কী নাম আপনার?
টেবিলের ওপার থেকে শুভায়ন গম্ভীর গলায় অবিরলকে প্রশ্ন করল।
-হে হে, হুজুর অবিরল, অবিরল গুরুং।
-কী করা হয়?
-হুজুর, আমাদের মতো ভবঘুরে লোকজন কি নির্দিষ্ট কিছু করে? যখন যেটা পাই তখন সেটা করি।
হাতদুটো জড়ো করে বিগলিত কণ্ঠে অবিরল উত্তর দিল।
-এখন কী করা হচ্ছে? আর তুমি কতদিন থেকে ওই জায়গায় থাকো?
শুভায়ন ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে এবার তুমি সম্বোধন করল।
অবিরল সতর্ক হল, নিজের কুতকুতে চোখকে আরও ছোট করে শুভায়নের দিকে তাকাল,
-কেন হুজুর? আমি তো অনেকদিন থেকেই আছি।
-অবিরল, তোমার সঙ্গে বেশ কিছুদিন আগে তাসি ভুটিয়া বলে একজন থাকতো, সে কোথায় গেল?
অবিরল নিজের বুকের ঢিপঢিপ আওয়াজ নিজেই শুনতে পাচ্ছিল, তার ভয় হল, এবার বুঝি বামাল সমেত ধরা পড়ে গেল। তার নিজের ওপর মনে মনে খুব রাগ হল। কী দরকার ছিল এখানে আসার?
একটু চুপ করে থেকে মুখে ভালোমানুষি হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল,
-হুজুর, সে তো কবেই নিজের দেশে ফিরে গেছে!
শুভায়ন ওর টেবিলের ওপর রাখা ডাঁই করা ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল,
-আচ্ছা? এখন কোথায় থাকে?
-হুজুর আমাদের মতো ভবঘুরেদের কোনও নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই, দেখবেন আবার কবে ঘুরতে ঘুরতে আমার এখানে চলে আসবে।
-ঠিক আছে তুমি এখন যাও তবে মনে রেখো সন্ধ্যের পরে জঙ্গলে বেশি ঘোরাঘুরি কোরো না।
অবিরল আর কথা বাড়ালো না চুপচাপ মাথা নিচু করে সম্মতি জানিয়ে অফিসের বাইরে বেরিয়ে এল।
তারপর কী মনে করে জঙ্গলের দিকে হাঁটা দিল।
৯
-আমি সব গুছিয়ে নিয়েছি, দড়ি, ছুরি, টর্চ, কিছু শুকনো খাবার আর কিছু লাগবে?
বনি কিছুক্ষণ মুকুটের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বিরস গলায় বলল,
-আধার কার্ডটা বাদ রাখলে কেন? সেটাও নিয়ে নিতে।
উত্তরবঙ্গে এখন গ্রীষ্ম পুরোদমে পড়ে গিয়েছে। কোনও কোনও সময় সারারাত ধরে বৃষ্টি হয়, সেইসব দিনগুলোয় মুকুটের ভারী আনন্দ লাগে। সিসামারার ধারে বৃষ্টির টুপুস টুপুর শব্দের সঙ্গে ব্যাঙের কর্কশ স্বরের যুগলবন্দি শুনতে শুনতে ও হারিয়ে যায় নিজের সৃষ্টি করা এক অজানা, অদ্ভুত জগতে।
গতকাল রাতে বৃষ্টি হওয়ার দরুণ সকালে এই অরণ্যকে মনে হচ্ছে যেন এক সদ্যস্নাত কিশোর। সরস্বতী পুজোর দিনে সকাল সকাল তৈরি হয়ে এসেছে মাতৃবন্দনার জন্য। তার শরীরে যেমন শিশুসুলভ কৈশর আছে তেমনই মনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে যুবকের মতো দৃঢ়তা।
অরণ্য তার ছোট, বড়ো, ঋজু, নরম সমস্ত বৃক্ষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে বৃষ্টির পেলবতা।
বনির কথায় মুকুট প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেল, তারপরই ওর রসিকতা বুঝতে পেরে হেসে উঠল।
-আরে, কখন কী দরকার লাগে জানি না তো, সেইজন্যই আমি কোনও রিস্ক নিইনি।
-হুম্ ঠিক আছে চলো যাওয়া যাক।
সকালের নরম রোদ পিঠে মেখে মুকুট আর বনি চলল বনের মধ্যে।
-মুকুট তুমি নিশ্চয়ই জানো, একেবারে কোর এরিয়ায় আমরা যেতে পারব না, কিছু জায়গা ফেন্সিং করা আছে। সেইসব জায়গায় আমাদের বাইরে থেকে দেখতে হবে।
-দেখা যাক, কতটা যেতে পারি, ওইজন্যই শুভায়নদাকে নিয়ে এলে ভালো করতাম।
-কিন্তু আমার মনে হয় জঙ্গলে একটার পর একটা এরকম ঘটনা ঘটার পর উনি আমাদের এভাবে যেতে নিষেধ করতেন।
মুকুট আর কোনও কথা বলল না। ওরা ধীরে ধীরে জঙ্গলের আরও ভেতরে ঢুকতে লাগল।
অরণ্যের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। সেটা আলোছায়ার মন্তাজের মতো রহস্য তৈরি করে, আবার সবুজ পাতার মতো কখনও মেলে ধরে নিজেকে কখনও বা ধূসর রঙের গুঁড়ি ও মাটির কালো রঙ মিশিয়ে তৈরি করে এক অদ্ভুত ক্যামাফ্লেজ। শিকড়ের মতো চারিয়ে যায় মাটির অনেক গভীরে তুলে আনে ভুলে যাওয়া অবহেলিত মুহূর্তকে। ছোট গাছগুলোকে বড়ো গাছ যেন আরণ্যক স্নেহে রক্ষা করে, নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলে এক অপূর্ব অলিখিত নিয়ম। এই নিয়ম সবসময় মানুষের গোচরে আসে না। সবুজ, কালো, খয়েরি সিল্যুয়েটের আবছায় বুনে চলে কুহকজাল।
মুকুট হাঁটতে হাঁটতে চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে কথাগুলো ভাবছিল।
বনির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে তার সমস্যা হচ্ছে, প্রথমত সে আগে কখনও এরকম বন্য পরিবেশে চলাচল করেনি। দ্বিতীয়ত, এই জঙ্গুলে পরিবেশ ক্রমেই যেন ওকে সম্মোহিত করে ফেলছে।
এভাবে কতক্ষণ ওরা একটানা চলেছে জানা নেই। হঠাৎই মুকুট নিজের পেছনে গাছ পাতা সরে যাওয়ার একটা শব্দ পেয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
ওর সামনে চলতে থাকা বনির পায়ের শব্দ থেকে যাওয়ায় বুঝতে পারল সেও শব্দটি শুনেছে। হাতের ইশারায় বনি ওকে একটা বড়ো গাছের পেছনে লুকোতে বলল।
দূরে জঙ্গলের মধ্যে অন্ধকারে দৃশ্যমানতা হারিয়ে যাচ্ছে বারবার। মুকুট দেখল বনি ব্যাগ থেকে দূরবীন বার করল।
শব্দটা এখন আর শোনা যাচ্ছে না। জঙ্গলে পাতার নড়াও আচমকা থেমে গেল।
এভাবে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে থাকার পরে মুকুট আর বনি যখন ভাবছে এগিয়ে যাবে কিনা ঠিক তখনই জঙ্গলের ওই জায়গা থেকে খুব ক্ষীণ ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে এল।
মুকুট আর বনি একে অপরের দিকে তাকাল তারপর আস্তে আস্তে ওই শব্দের উৎস লক্ষ করে এগিয়ে গেল। কিন্তু ওরা বেশিদূর এগোতে পারল না তার আগেই যেন মাটি ফুঁড়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল একটি মধ্যবয়স্ক নেপালী লোক।
কুতকুতে চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-এখানে কিছু খুঁজছ?
-না, তেমন কিছু নয়, আমরা জঙ্গলে একটু ঘুরতে বেরিয়েছি।
বনি বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল।
লোকটি নেপালি টানে বলল,
-সন্ধ্যা নামতে তো আর খুব বেশি দেরি নেই, এখন এসময়ে জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করা ঠিক নয়।
তারপর ওদের আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বলল,
-আসো, আমার পিছনে, তোমাদের বাইরের রাস্তা দেখিয়ে দিই।
অগত্যা দু’জনে লোকটির পেছনে হাঁটতে শুরু করল।
ঠিক তখনই বর্ণিকা মুকুট কে কনুয়ের ঠেলা দিয়ে ইশারা করে একটু দূরে মাটির উপরে একটা দাগের দিকে ইঙ্গিত করল।
মুকুট তাকিয়ে দেখল মোটা লম্বা কোনও টিউবকে মাটির ওপর দিকে এঁকেবেঁকে নিয়ে গেলে যেমন ঢেউয়ের মতো লাগে দেখতে ঠিক সেরকম একটা দাগ মাটির উপর দিয়ে জঙ্গলের ভিতর দিকে গেছে। আগের দিন বৃষ্টি হওয়ায় সেই দাগ জঙ্গলের মাটির ওপর যেন আরও বেশি করে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ওরা বুঝতে পারছিল না, এটা কীসের দাগ, কেমন করে তৈরি হল।
সামনের লোকটি কীভাবে ওদের সামনে এল? সে এখানে কী করছিল?
তবে এসবকিছুকে ছাপিয়ে ওরা দু’জনেই মনে মনে ভাবছিল আজকের জঙ্গল অভিযানে এই লোকটার জন্য ভেস্তে গেল।
১০
-হ্যাঁ মুকুট বলো কেমন আছো?
-দাদা, ভালো আছি। তোমার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না।
-আসলে ভুলটা আমারই, কদিন অফিসের কাজে এত ব্যস্ত হয়ে গেছি…
-হ্যাঁ, বাবাও বলছিলেন। তোমাদের জঙ্গলে কিছু সমস্যা হচ্ছে।
কথার মাঝখানেই বিরতি দিয়ে শুভায়ন মুকুটকে বলল,
-মুকুট আমাকে একটা আর্জেন্ট কলে যেতে হচ্ছে, বিকেলে তোমার বাড়িতে আসছি।
মুকুট ফোনটা রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, কী হচ্ছে সেটার কোনো কিছুই সে বুঝতে পারছিল না সবকিছু কেমন একটা ধোঁয়া ধোঁয়া বলে মনে হচ্ছে। সে ঠিক করল বিকেলে বর্ণিকাকেও ওর বাড়িতে আসতে বলবে।
সন্ধ্যার আবেশ তখন একটু একটু করে ছুঁয়ে যাচ্ছে সিসামারার জলকে। মুকুটদের বাংলোর সামনের গাছগুলো গ্রীষ্মের শেষ বিকেলের মৃদু হাওয়ায় সুর করে গান গাওয়ার মতো দুলে উঠছিল। বনি আর মুকুট বাংলো লাগোয়া বাগান থেকে উঠব উঠব করেও বসেছিল। এমন সময় বাইকের শব্দ শুনে সামনে তাকিয়ে দেখল শুভায়ন এসেছে।
মুকুট বলে উঠল,
-শুভায়নদা, তোমার রয়্যাল এনফিল্ডটা তো দুর্দান্ত!
শুভায়ন মৃদু হেসে বর্ণিকার দিকে তাকাল।
মুকুট কিছু বলার আগেই শুভায়ন বলে উঠল,
-আরে, তুমি বর্ণিকা রায়চৌধুরী না? তুমিই তো জলপাইগুড়ি থেকে স্টেট লেভেলে ক্যারাটে আর ফেন্সিং এ খেলেছিলে?
বর্ণিকা সলজ্জ হেসে বলল,
-ওই আর কী…
মুকুট বলল,
-শুভায়নদা তুমি তো দেখছি বনিকে আগে থেকেই চেনো তাই আলাদা করে আর কিছু বললাম না আর বর্ণিকা তোমাকে তো আগেই বলেছি শুভায়নদার কথা! তবে শুভায়নদা একটা কথা না বলে পারছি না। বর্ণিকা যেমন খেলায় দক্ষ তেমনি ওর সাহসও দারুণ।
তখনই শুভ এসে জানাল, বিকেলের জলখাবার তৈরি হয়ে গেছে।
ওরা তিনজন বাংলোর মধ্যে প্রবেশ করল।
-বৌদি এত কী বানিয়েছেন আমি তো এত খেতেই পারব না।
প্লেটে সাজানো কেক, মিস্টি দেখে শুভায়ন কথাগুলো বলে উঠল।
বর্ণিকা বলল,
-শুভায়নদা এসো আমরা একটা প্লেট থেকেই খেয়ে নিই।
মুকুট বলল,
-সেই ভালো খেতে খেতে পরের কথা আলোচনা করা যাবে।
মিষ্টি খেতে খেতে শুভায়ন বলল,
-কদিন ধরেই আমাদের জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে।তোমরা নিশ্চয়ই খবরে দেখেছো, কিছুদিন আগেই একদল বন্য শুয়োর এর দেহ জঙ্গলের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল।আজ আবারও একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।
মুকুট ও বর্ণিকা খাওয়া থামিয়ে শুভায়নের দিকে তাকিয়ে রইল।
– আজকে ডেন্স ফরেস্ট মানে গভীর জঙ্গল যেখানে বাইরের কারোর যাওয়ার অনুমতি নেই সেখানে কতগুলো হরিণ ও শজারুর পাথরের তৈরি ভাস্কর্য পাওয়া গেছে। কে বা কারা ওখানে ওগুলো নিয়ে গিয়ে রাখলো, আর তাদের উদ্দেশ্যই বা কী তাও বুঝতে পারছি না।
বনি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
-জঙ্গলের কোন দিকটায়?
-ওই পশ্চিম দিকটায়।
বনি আর মুকুট চকিতে নিজেদের মধ্যে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করল।
মুকুটের মা এতক্ষণ সব শুনছিলেন, এবার বলে উঠলেন
-পাথরের ভাস্কর্যগুলো কেমন দেখতে?
-ভীষণই নিঁখুত, জীবন্ত, দেখে মনে হবে যেন এখুনি চলতে শুরু করবে।
বিশু খাবারের প্লেটগুলো নিতে এসেছিল, এইসব ঘটনা মন দিয়ে শুনছিল, তারপর ভয়ার্ত মুখে বলল,
-সাহেব, জঙ্গলের হাওয়া খারাপ, খুব খারাপ।আপনারা লেখাপড়া করা তাই মানবেন না। অনেক জিনিস আছে যেগুলোর মানে বই পড়লে পাওয়া যায় না। এগুলো জীবনের বাইরের জিনিস!
-বিশুদা, তুমি আবার শুরু করলে?
-মুকুট দাদাভাই, আমি জানি তোমরা কখনই আমার কথা মানবে না।
একথা বলতে বলতে বিশু রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
বর্ণিকা শুভায়নকে জিজ্ঞেস করল,
-কিন্তু এটাও ঠিক, এরকম একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে বলে আপনার মনে হয়?
-দেখো, বিষয়টা নিয়ে অনিমেষ স্যরের সঙ্গে আমার ডিটেলে কথা হয়েছে, এখন আমার মাথা যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠছে মিডিয়া। আগের ঘটনাতেই এত হাইপ তৈরি করেছিল, হেড অফিস থেকে রিপোর্ট তলব করেছিল। ভাগ্যি, অনিমেষ স্যার ছিলেন তাই সে যাত্রায় সামলে উঠেছিলাম না হলে কী হতো কে জানে!আর এবারের ঘটনাটা তো আরো বেশি করে অদ্ভুত।
শুভায়ন তারপরই হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
-অনেক দেরি হয়ে গেছে, আজ উঠি আবার পরে কথা হবে।
শুভায়ন চলে যাওয়ার পর বর্ণিকা ও মুকুট নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসল।
-বনি, তোমাকে নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না, যে ওই লোকটা কিন্তু এইসমস্ত ব্যাপারের সবই জানে।
-হ্যাঁ, আর আমার ধারণা আমরা সঠিক দিকেই এগোচ্ছিলাম সেইজন্যই লোকটি এসে আমাদেরকে অকুস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল।
কথা আর বেশি দূর এগলো না, বর্ণিকার বাবা ওকে ফোন করছেন, সে বাড়ি ফেরার জন্য তৈরি হল।
বাড়ি ফিরে ফেন্সিংএর অনলাইন ক্লাস নিতে হবে তাই বর্ণিকা একটু তাড়াতাড়ি ফেরার জন্য শর্টকাট নিল।তখন সন্ধ্যার অন্ধকার বাতাসে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার মতো করে দ্রুত গতিতে সিসামারা নদীর ধারের এই ছোট্ট শহরের বুকে নেমে আসছে। বর্ণিকা হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পেল, দূরে একটা বনমোরগ কর্কশ শব্দে চিৎকার করে উঠল।ওটা শুনেই বর্ণিকার মনের মধ্য যেন ছ্যাৎ করে উঠল। মুকুটের বাড়ির পাশের এই রাস্তাটা সিসামারা নদীর সমান্তরালে গেছে, তারপর কিছুটা বন পেরিয়ে বর্ণিকার বাড়ির রাস্তায় গিয়ে পড়ে। দিনের বেলায় এই রাস্তায় লোক যাতায়াত করলেও রাতের বেলায় রাস্তাটি প্রায় ফাঁকা এবং অন্ধকার থাকে। বনি দ্রুত পায়ে একটি গান গুনগুন করতে করতে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। আচমকাই কী মনে হতে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের তাড়নায় ওর পা’দুটো নিজে থেকেই রাস্তার উপরে যেন আটকে গেল। ডানদিকে বেশ একটু দূরে জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে সিসামারা নদী। অন্ধকারে গাছের পাতাগুলো যেন একটু বেশিই নড়তে লাগল। ততক্ষণে বর্ণিকার চোখ অন্ধকারে সয়ে গেছে। ও দেখতে পেল ওর থেকে প্রায় দশফুট দূরে সামনে একটা বিরাটকার সাপ, ফণা তুলে ওর সামনে দাঁড়িয়ে।বর্ণিকা একটুও ঘাবড়াল না, ও জানে একটু এদিক ওদিক হলেই ওর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। সে নিশ্বাস আটকে ওইভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। দশফুট দূরে সাক্ষাত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একেবারেই সহজ নয়।বনি জানে এই বিরাট সাপটির সঙ্গে দৌড়ে সে পারবে না। সাপটি ওকে স্রেফ গিলে নেবে, তাই দাঁতে দাঁত চিপে ও স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে রইল। চারিদিকে শুধু পাতা নড়ার শব্দ আর সামনের সাপটির ফোঁসফোঁস আওয়াজ। এভাবে প্রায় একমিনিট কাটল, বর্ণিকার মনে হচ্ছিল বুঝি যুগের পর যুগ ও এই ভাবেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।একসময় সাপটি ফনা নামিয়ে অলস গতিতে রাস্তা পার করে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। তারপরও বর্ণিকা বেশ কিছুটা সময় ওখানে ওইভাবে দাঁড়িয়ে রইল। এইসময় এতবড়ো একটা সাপ কেমন করে এল এবং এভাবে ফণা তুলে ওর রাস্তা আটকে কেনই বা দাঁড়িয়ে রইল এসব কিছুই বনি বুঝতে পারছিল না। ওর মনে হল ও বুঝি ধীরে ধীরে এক অজানা চোরাবালির মধ্যে নুজের অজান্তে ডুবে যাচ্ছে… ও ঠিক করল আজকের সন্ধ্যার ঘটে যাওয়া ঘটনাটির কথা ও এখনই কাউকে জানাবে না।
১১
বাগডোগরা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে মুকুট আর শুভায়ন যখন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল তখন শিলিগুড়ি শহর দুপুরের হাল্কা রোদ গায়ে মেখে আদুরি বিড়ালের মতো আরামের আমেজ নিচ্ছে। আজ মুকুটের বাবা কিছু জরুরি কাজ নিয়ে দিল্লি গেলেন। ওঁকে সি অফ্ করার জন্য মুকুট ও শুভায়ন এসেছিল।
মুকুটের মন আজ একটু বিক্ষিপ্ত। ওরা দু’জনে দুপুরের রোদ গায়ে মেখে স্লথ পায়ে পার্কিং লটের দিকে এগোচ্ছিল। আচমকাই শুভায়ন দাঁড়িয়ে পড়ল। মুকুট পেছন ফিরে শুভায়ন কে ডাকতে যেতেই হাতের ইশারায় শুভায়ন ওকে চুপ করতে ইঙ্গিত করল। তারপরই আপাদমস্তক কালো রঙের পোশাকে ঢাকা একজন লোকের দিকে হাত তুলে দেখাল।মুকুট শুভায়নের দৃষ্টি অনুসরণ করে লোকটির দিকে তাকাল, মাঝারি উচ্চতার লোকটি সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে হাঁটছে। লোকটির মাথা কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকার দরুণ মুকুট লোকটির মুখ দেখতে পাচ্ছে না। তবে শুভায়নের ইশারায় সে বুঝতে পারল লোকটিকে ফলো করতে হবে।ওরা একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে লোকটির পেছনে পেছনে এগোতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর ওরা বুঝতে পারল লোকটি একা নয়, ওর সঙ্গে আরও একটি মুটে গোছের লোক রয়েছে। মুটেটির হাতে ধরা রয়েছে বেশ বড় সাইজের একটা বস্তা। মিনিট পাঁচেক হাঁটার পরে সেই লোকটি একটি আর্ট স্টুডিওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আর ঠিক তখনই মুকুট লোকটির মুখ স্পষ্টভাবে দেখতে পেল। আরে এই লোকটিকেই তো সেদিনের জঙ্গলে ও আর বনি দেখেছিল। লোকটি কুতকুতে চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে স্টুডিওর মধ্যে প্রবেশ করল। শুভায়ন আর মুকুট স্টুডিওর উল্টোদিকে একটি চায়ের দোকানে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। প্রায় আধঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাদে নেপালি লোকটি মুটেটিকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। আরও কিছুক্ষণ পরে শুভায়ন স্টুডিওর উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। মুকুট বুঝতে পারছিল এই নেপালি লোকটি শুভায়নের পূর্বপরিচিত কিন্তু কী করে শুভায়ন লোকটিকে চিনল সেটা মুকুট বুঝতে পারছিল না।
একসময় ওরা দু’জনে স্টুডিওতে গিয়ে পৌঁছাল।
স্টুডিওর দরজা ঠেলে ওরা ভেতরে ঢুকে দেখল, একটি লোক ওদের দিকে পেছন ফিরে একটি পাথরের তৈরি ভাস্কর্যর সামনে ম্যাগনিফাইং গ্লাস নিয়ে মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছে। শুভায়ন লোকটির পেছনে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিল। লোকটি সামনে ঘুরে দাঁড়াতেই শুভায়ন বিস্মিত হয়ে বলে উঠল,
-আরে প্রিয়দা তুমি!
যে লোকটিকে উদ্দেশ করে বলা সেই লোকটি শুভায়নের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরে বলল,
-শুভায়ন না?
-হ্যাঁ, কিন্তু তুমি এখানে কী করে এলে সেটা তো বুঝতে পারছি না…
-আরে, এত বছর পর বাদে দেখা যখন হয়েছে তখন একটু গল্প করা যেতেই পারে চল কফি খেতে খেতে গল্প করি।
মুকুট স্টুডিওটির চারিদিকে তাকিয়ে দেখল। প্রায় তিরিশ ফুট বাই পঞ্চাশ ফুটের দোকানটি নতুন-পুরনো প্রচুর মূল্যবান জিনিসে ভর্তি।
কাঠের তৈরি হরেকরকম জিনিস, চামড়ার তৈরি পুরোনো জুতো, বইয়ের কভার, জামা। পেতলের হুঁকো, ড্রেসিং টেবিল, ব্রিটিশ আমলের ব্যবহার্য জিনিসপত্র আরও নাম-না-জানা প্রচুর জিনিসে দোকানটি ঠাসা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কফি ও কিছু স্ন্যাক্স্ এল। ওরা তিনজন দোকানের একপাশে একচিলতে টেবিলে এসে বসল।
শুভায়ন মুকুটকে বলল,
-প্রিয়তোষদার পুরো নাম হল প্রিয়তোষ বাগচী। দাদা আমার থেকে স্কটিশচার্চ কলেজে তিন বছরের সিনিয়র ছিল, এক সময় তো দাদার সঙ্গে খুবই যোগাযোগ ছিল, তারপর যা হয়, চাকরিতে ঢুকে দাদার সঙ্গে যোগাযোগের সুতো ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে গেল।
-শুভ, আমিও কোলকাতার দশটা-পাঁচটা চাকরিতে ধীরে ধীরে হাঁফিয়ে উঠেছিলাম। তারপর আমার জেঠু আমাকে এই মফস্বল শহরের ডেকে নেন। এখানে এসে এই জীবিকা নিয়ে জীবন কাটাতে আমার খুব ইন্টারেস্টিং বলে মনে হয়েছিল। আর তুই তো জানিস, আমার পুরনো জিনিসের প্রতি একটা আলাদা টান ছিল। তারপর যা হয়, এখানে থাকতে থাকতে এই শহরটার প্রতি একটা ভালবাসা তৈরি হয়ে গেল। আমার আর কোলকাতা যাওয়া হয়ে উঠল না।
মুকুটের চোখে চকিতে কলকাতা শহরের একটা আলগা ছবি ভেসে উঠল। সে নস্টালজিক হয়ে উঠল। দিঘল, রূপকথা ও অনিমিখের জন্য ওর মন হঠাৎই ব্যকুল হয়ে উঠল।
-তারপর বল, হঠাৎ করে আমার দোকানে কীসের জন্য আগমন হল?
-কিছুক্ষণ আগে তোমার দোকান থেকে যে নেপালি লোকটা কালো রঙের পোশাকে বেরিয়ে গেল তাকে তুমি চেনো?
-চিনি তো বটেই লোকটার নাম হল অবিরল গুরুং, লোকটা সিকিম লাগোয়া কোন একটা গ্রামে থাকে এবং আমাকে পাথরের দুর্মূল্য এবং নিখুঁত ভাস্কর্য সরবরাহ করে।ইনফ্যাক্ট, তোরা আসার আগে আমি ওর দিয়ে যাওয়া হরিণের মূর্তিটা দেখছিলাম।
শুভায়ন উত্তেজিত গলায় বলে উঠল,
-কই দেখাও তো আমাকে দেখি একবার!
প্রিয়তোষ টেবিলের ওপর রাখা পাথরের হরিণ ও শজারুর ভাস্কর্য হাতের ইশারায় দেখালেন।
মুকুট আর শুভায়ন সঙ্গে সঙ্গে উঠে ওই ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
গ্রানাইট পাথরের তৈরি দুই ফুট বাই দুই ফুট এর হরিণটি দেখে মুকুট অবাক হয়ে গেল।
হরিণটির চোখ-কান গায়ের চামড়া এমনকি পায়ের ক্ষুর পর্যন্ত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পাথর কেটে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে হরিণটি কালো হয়ে গেছে আসলেই এটি জীবিত, যে কোনও মুহূর্তে ছুটতে শুরু করবে।
-মার্ভেলাস…
শুভায়নের গলার স্বর শুনে মুকুট এবার সজারুর দিকে তাকাল এবং অভিভূত হয়ে লক্ষ করল সজারুর পিঠের প্রত্যেকটি কাঁটা আলাদা আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে।
-প্রিয়দা, কোনও মানুষের পক্ষে এইভাবে এত নিখুঁত করে পাথর কেটে এরকম জিনিস তৈরি করা কোনভাবেই সম্ভব নয়।
-শুভ, এটা নতুন নয়, এর আগেও অবিরল আমাকে এরকমই নিখুঁত পাথরের ভাস্কর্য সাপ্লাই করেছে।
তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে নিয়ে প্রিয়তোষ বললেন,
-সবথেকে বড় বিস্ময় হল, গ্রানাইটের মতন এমন শক্ত পাথরে এমন একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসে লোকটি কীভাবে এত নিখুঁত শিল্পকর্ম করছে!
মুকুটের সারা শরীর ধীরে ধীরে বিজবিজে ঘামে ভরে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, এই রহস্যটি অনেকটা ক্যালকুলাস এর মত হয়ে যাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে দেখে মনে হয় এটা ভীষণ সহজ অঙ্ক কিন্তু যখন অঙ্ক কষতে শুরু করা হয় তখন তার আর কূলকিনারা পাওয়া যায় না।
মুকুট মনস্থির করল আগের দিনের বনির সঙ্গে ওর জঙ্গল অভিযান এর সবটাই শুভায়ন কে জানাতে হবে।
ও সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল, শুভায়ন ও প্রিয়তোষ নিজেদের মধ্যে জরুরি কথোপকথনে ব্যস্ত।
-প্রিয়দা, আজ উঠি তোমার ফোন নাম্বারটা আমার কাছে রইল।তুমি তো ওই অবিরলের বিষয়ে অনেক কিছুই জানো। প্রয়োজনে আমি ফোন করব আমাকে একটু হেল্প করে দিও।
প্রিয়তোষ মৃদু হেসে ঘাড় নাড়লেন।
মুকুট আর শুভায়ন স্টুডিও থেকে বেরিয়ে এসে গাড়ির মধ্যে গিয়ে বসল।
১২
-সেদিন মুকুটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমার বাড়ি ফেরার সময় জঙ্গলের মধ্যে অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটার পরে আমি একটু অবাক হয়েছি।
-বনি তুমি বলে পেরেছো আমি হলে তো ওখানেই অজ্ঞান হয়ে যেতাম।
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এই মেসেজটা লেখার পরেই রূপকথা দুটো ভয়ের ইমো দিল।
মুকুটের কলকাতার গ্রুপের বন্ধুদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে আজ অনেকদিন পরে গল্প হচ্ছিল।
এর আগেও মুকুট এই গ্রুপের জলদাপাড়ায় ঘটতে থাকা অদ্ভুত ঘটনার বিবরণ দিয়েছে।
আজ বিকেল গাড়ি করে ফিরতে ফিরতে শুভায়নকে সমস্ত ঘটনার কথা মুকুট জানিয়েছে।
দিঘল গ্রুপে লিখল,
-মুকুট, অনেকদিন হয়ে গেল আমরা কোথাও ঘুরতে যাই না, আমি ভাবছি এবারে তোদের ওখানে সবাই মিলে গেলে কেমন হয়?
দিঘলের এই প্রস্তাবে গ্রুপে সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর লাইক পড়ে গেল।
অনিমিখ লিখল,
-এখন তো পড়ার অত চাপ নেই গেলে সামনের বর্ষার মধ্যে যাওয়াই ভালো, উপরি পাওনা হিসেবে বর্ষায় জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের অপূর্ব সৌন্দর্য দেখে নেওয়া যাবে।
সকলে মিলে আলোচনার পর ঠিক হল কলকাতা থেকে মুকুটের তিনজন বন্ধু ওর এখানে অগাস্ট মাসে আসবে।
বনি আর মুকুট দু’জনে মিলে ওদের আসতে বলে দিল। তারপর একে একে সকলে গ্রুপ থেকে সেদিনের মতো বিদায় নিল।
বনি মোবাইল নামিয়ে রেখে পড়তে বসল।
সেদিনের ওই ভয়ংকর ঘটনার পর বনি মনে মনে একটু চিন্তায় ছিল। যদিও জলদাপাড়া লাগোয়া জঙ্গলে এমন ঘটনা একেবারে অপ্রত্যাশিত নয়। তবুও ওর মনের মধ্যে কী যেন একটা বিষয় খচখচ করছিল।
এইসব ভাবতে ভাবতে বনি একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
-কে তুমি? সাহস থাকলে সামনে এসো।
ঘন জঙ্গলের নিকষ কালো অন্ধকারে বনির কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
বনির হাতে ওর বাড়িতে রাখা তলোয়ারে, ও বুঝতে পারছিল না কীভাবে ও এখানে এসে পৌঁছাল। তবুও মনে সাহস রেখে আবার চিৎকার করে বলতে শুরু করল,
-তুমি যেই হও আমি তোমায় ভয় পাই না।
এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ কাটার পর বনি অনেক দূরে ছেঁড়া ছেঁড়া শব্দের মতো ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনতে পেল। বনি ওইভাবেই তলোয়ার উঁচিয়ে গভীর জঙ্গলের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একসময় ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ ওর ভীষণ কাছে চলে এসে হঠাৎ করেই থেমে গেল। তার কিছুক্ষণ পরে ও একটা হুইসেলের শব্দ শুনতে পেল। কেউ যেন অনেক দূর থেকে ভীষণ সরু গলায় ব্যঙ্গের সুরে ওকে কেউ বলছে,
-শখের তলোওয়ারি করছো করো, এসব বিষয়ের মধ্যে এসো না। শেষে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়বে। হা হা হা তোমার কোনও ধারণা নেই তুমি কার লেজে পা দেওয়ার চেষ্টা করছ।
তারপর সেই অজ্ঞাত গলা থেকে ঝরে পড়ল একরাশ রাগ,
-শোনো, শেষবারের মতো বলছি, আমাকে রাগালে পরিণাম খুব খারাপ হবে, সারা দুনিয়া আমি বরবাদ করে দেবো।
বনি উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতে গেল কিন্তু ওর মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া কিছুই বেরোলো না।
আর ঠিক তখনই তীব্র ঝাঁকুনি খেয়ে ওর ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখল ওর সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি করে উঠে ও ওয়াশরুমের জন্য খাট থেকে নামতে গিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ করল, ওর পায়ে জঙ্গলের টাটকা ঘাস ও কাদা লেগে রয়েছে।
১৩
বর্ষার একটা নিজস্বতা আছে। অরণ্যে গামার, লাটোর, গাওয়ার, হরিতকি গাছের মতো মহীরূহের সঙ্গে ছোট গাছগুলোও সমান গুরুত্ব নিয়ে সহাবস্থান করে। অরণ্যে সমস্ত পশু পাখি এমনকি পোকা মাকড় পর্যন্ত নিজেদের তৈরি করা পৃথক জগতে বাস করে। তারা নিজেদের তৈরি করা নিয়মে পরিচালিত হয়। বর্ষার টুপটুপে বা মুষলধারা বৃষ্টি এই অরণ্যকে এনে দেয় এক অন্য মাত্রা। সোঁদা গন্ধ, জঙ্গলের জোলো হাওয়ায় নদীতে ডিঙি ভাসার মতো ভাসতে থাকে। গাছের সবুজ পাতাগুলো বৃষ্টির আবেশে যেন সবুজ জীবন ফিরে পায়।
মুকুট আজ অনেকটা সময় সিসামারার ধারে বসে কাটিয়েছে। এখানে বসে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে তার বড়ো ভাল লাগে। বর্ষার ছোঁয়া লেগেছে সিসামারাতেই। নদীটি ব্যক্তিগত ছন্দে যখন টুকরো উপলের ওপর দিয়ে যখন বয়ে যাচ্ছে, তখন দেখে মনে হচ্ছে, যেন কোনও এক উচ্ছল কিশোরী। মুকুট তন্ময় হয়ে নদীর জলের দিকে তাকিয়ে গান শুনছিল। সংবিত ফিরল একটু দূরে কতগুলো বাচ্চা ছেলের জটলা দেখে। তারা নদীর হাঁটুজলে নেমে নদীর জলের ভেতর থেকে কিছু জিনিস তুলছিল। আর একটু পরে মুকুট দেখল ওরা কয়েকটা পাথরের টুকরোকে জল থেকে তুলে নিয়ে এসে পরিষ্কার করছে।
কৌতূহলবশত মুকুট ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
-এই তোরা এগুলো জল থেকে কী তুলে আনলি রে?
-দাদা, এই যে, দেখো কী সুন্দর পাথরের মাছ। জলের মধ্যে পেলাম।
মুকুট ততক্ষণে মাছগুলো দেখে অবাক হয়ে গেছে। আট থেকে বারো ইঞ্চি মাপের পাথরের মাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে সেগুলো এক্ষুনি জীবন্ত হয়ে উঠবে। পাথরের চিংড়ি মাছের শুঁড়গুলোর কাটা কাটা দাগ পর্যন্ত ভীষণ নিঁখুত। মুকুট সঙ্গে সঙ্গে মাছগুলের ছবি তুলতে লাগল।এগুলো এক্ষুনি শুভায়নদাদা ও ওদের বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠাতে হবে। ওর মন বলছে এই ঘটনাটি অবিরল গুরুং এর সঙ্গে যুক্ত। একসময় ছেলেদের দলটা কলকল করতে করতে নদীর বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল। কী মনে হতে মুকুট নদীর অন্য একটা বাঁক ধরে জঙ্গলের মধ্যে যাওয়ার কথা ভাবল।
নদীর পাড় ধরে মিনিট দশেক চলার পরে ও জলদাপাড়া জঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করল। এই দিনের বেলাতেও কেমন একটা গা ছমছমে ভাব।যেন মনে হচ্ছে লম্বা গাছগুলো কী এক অপার রহস্য লুকিয়ে রেখেছে পাতাদের গায়ে গায়ে। মুকুট জঙ্গলের ভতরে আরও এগিয়ে যেতে লাগল। ওর যেন একটা জেদ চেপে গেছে। এভাবে কিছুদূর যাওয়ার পর একটু দূরে কাদার মধ্যে কিছু দাগ লক্ষ করল। মানুষের জুতো৷ ও ঘোড়ার ক্ষুরের দাগ। এই দাগদুটির সমান্তরালে চলে গেছে ভীষণ টাটকা আরও একটি দাগ। মুকুট সেই দাগটি অনুসরণ করে এগোবে বলে ঠিক করল। এমন সময়ে অরণ্যের নিরবতাকে খান খান করে দিয়ে মুকুটের পকেটের মোবাইলটা বেজে উঠল। মুকুট পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখল বনির ফোন।
-তোমার পাঠানো ছবিগুলো দেখলাম। পাথরের মাছ এত অবিশ্বাস্য ব্যাপার।তার চেয়েও বড়ো কথা এগুলো সব সীসামারা জলের মধ্যে পাওয়া গেছে!
-হ্যাঁ, আমিও বুঝতে পারছি না, তাই জঙ্গলের মধ্যে এসেছি।
ফোনের ওপারে মুকুট বনির উত্তেজিত গলার স্বর শুনতে পেল,
-মুকুট তোমাকে রিকোয়েস্ট, তুমি ওখান থেকে এখনই ফিরে এসো।
-আরে, তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? আগের দিন তো তুমি নিজেই কত উৎসাহ নিয়ে জঙ্গলে যাওয়ার জন্য আমাকে বলছিলে, আজ তোমার কী হল?
-আমি ভয় পাচ্ছি না, কিছু একটা ঘটছে সাধারণ বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
-তুমি কী বলছ? আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
-আমি তোমাদের বাড়ি যাচ্ছি, কিন্তু প্লিজ মুকুট তুমি জঙ্গল থেকে ফিরে এসো।
মুকুট ফোন কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর পেছন ফিরে বাড়ির পথ ধরল। ও জানতে পারল না, ওকে জঙ্গলের মধ্যে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল অবিরল।
মুকুট বাড়ি ফিরে দেখল বনি আগেই ওর বাড়িতে পৌঁছে গেছে। মুকুট ওর সামনে গিয়ে বসতেই বনি ওকে গতকাল রাতে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত ঘটনা জানাল। সব শুনে মুকুট কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইল।
তারপর মুকুট কপালে ভাঁজ ফেলে বনিকে জিজ্ঞেস করল,
-তোমার কী মনে হয়? কোনও ভাবে এটা কি মনের ভুল হতে পারে?
-দেখো, আমি ঘটনাটায় এতই অবাক হয়েছি যে আর কিছু ভাববার মতো অবস্থায় নেই। এখন সবসময় আমি নিজের সঙ্গে এটা রাখছি।
বর্ণিকা একটা লম্বা চকচকে তলোয়ার দেখাল। চকচকে ভারী তলোয়ারটির পেতলের হাতলে একটা সবুজ চোখের সাপ খোদাই করা আর সেই সাপটির দৈর্ঘ্য বরাবর এফোঁড় ওফোঁড় করে একটি তলোয়ার খোদাই করা রয়েছে।তরয়ালটা দেখলেই মনের মধ্যে একটা সভ্রম জাগে।ধারালো, শক্তিশালী তরয়ালটি এক কোপে মানুষের মুন্ডু ধর থেকে নামিয়ে দিতে পারে। বেশিক্ষণ সেটির দিকে তাকিয়ে থাকলে কেমন একটা ঘোরলাগা ঝিমুনি ভাব তৈরি হচ্ছে। জিনিসটি যেমন ভারী তেমনই সুন্দর। মুকুট তন্ময় হয়ে এটি দেখতে দেখতে বনিকে বলল
-এটা দেখে তো খুব প্রাচীন বলে মনে হচ্ছে, এমন একটা বিরল জিনিস, তুমি পেলে কোথায়?
আর ঠিক তখনই নিচতলা থেকে মুকুটের মা, বিশু ও তার ছেলে শুভর আর্ত চিৎকার ভেসে এল।
১৪
-দেখুন শুভায়নবাবু, আমরা সব বুঝতে পারছি। এমন ঘটনা তো এর আগে কোনও দিন ঘটেনি। আপনি বলছেন সাসপেক্ট পার্সন অবিরল গুরং-এর কথা। কিন্তু শুধুমাত্র সে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় এই অপরাধে আমরা তাকে ইন্টারোগেট করতে পারি না।
আমরা ওই এলাকার কিছু মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করবার জন্য ডেকেছি। দুটো তরতাজা জোয়ান এভাবে তো উবে যেতে পারে না। তারা তো জঙ্গলেও যায়নি। সামান্য কাঠ কুড়োতে গিয়েছিল।
-হ্যাঁ, অফিসার আমি বুঝতে পারছি, আপনার বক্তব্য। কিন্তু কয়েকদিন ধরে জলদাপাড়ায় অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটছে। সেই ঘটনাগুলোর জের হল কালকের ঘটনা। আমরাও ভীষণ বিভ্রান্ত। আমার এত বছরের চাকরিতে এমন ঘটনা প্রথম।
-ঠিক আছে, আপনাদের অপিসের সকলের একটা জবানবন্দি আমরা নেব। আজকের মতো উঠি। পরে আবার যোগাযোগ করব।
লোকাল থানার পুলিশ অফিসার চলে যাওয়ার পর, শুভায়ন অফিসের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে দূরের লম্বা লম্বা গাছগুলো কী এক অ-সমাধানযোগ্য রহস্য নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আজ দুপুরে মুকুট তাকে যে সমস্ত পাথরের মাছের ছবি পাঠিয়েছে তাতে করে বোঝাই যাচ্ছে এই সব কিছুর পেছনে ওই অবিরল লোকটা আছে। লোকটি যেখানে থাকে সেই চত্বরে শুভায়ন খোঁজ নিয়ে দেখেছে, লোকটি সম্বন্ধে কেউ কিছু তেমন জানে না।
একসময় শুভায়নের চিন্তার জাল ছিন্ন করে একটি আর্দালি ওর ঘরে এসে বলল টোটোপাড়া থেকে দু’জন ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
আলিপুরদুয়ারের উত্তর দিকে তোর্সা নদীর পাড়ে জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের কাছে এই টোটো সম্প্রদায়ের বাস। ভুটানের তাদিং পাহাড়ের ঢালে টোটোদের গ্রাম। এরা ভীষণ শান্তিপ্রিয় জনজাতি। সরকার থেকে এদের জন্য স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ইত্যাদি অনেকরকম ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এই প্রজাতির দু’জন পুরুষ জলদাপাড়া জঙ্গলে ঢুকে নিঁখোজ হয়ে গেছে। তবে, কোনও বন্য প্রাণীর আক্রমণের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
শুভায়ন আর্দালিকে বলল ওদের পাঠাতে।
দুজন লোক এই মুহূর্তে ওর ঘরে বসে রয়েছে। দুজনেই ভয়ার্ত ও সঙ্কুচিত। আজ একটু আগে ওরা জঙ্গলে গিয়ে একজন হারিয়ে যাওয়া ছেলের ছেঁড়া জামা খুঁজে পায়। পাশে পড়ে ছিল সাপের কালো রঙের বৃহদাকার খোলস।
-তোমরা কি সেই খোলসটি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছ?
-সাহেব, আমরা ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে এয়েচি, আমাদের ভয়ে মাথা কাজ করচিল না।
-জঙ্গলের ঠিক কোন দিকটায় তোমরা দেখেছ, বলতে পারবে?
লোক দুটি নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করল। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
-সাহেব, আমরা মুখ্যু মানুষ দিন আনি দিন খাই। আমরা পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে চাই না।
শুভায়ন বুঝতে পারল পুলিশের কাছে এরা মুখ খুলবে না।
সে একটু হেসে উত্তর দিল,
-আরে না না, তোমরা দূর থেকে আমাকে শুধু জায়গাটা দেখিয়ে দেবে।
লোকদুটো একটু ইতস্তত করল, তারপর কী মনে করে সম্মতিসূচকভাবে ঘাড় নাড়ল।
তাদের বিদায় দিয়ে শুভায়ন আরও কিছুক্ষণ অফিসে বসে রইল।
-দেখো, আমি তো তোমাদের আগেই বলেছি, আমার সাধনার জন্য আরও একটু সময় লাগবে। বহুযুগ ধরে সাপের বিষ আমি আমার শিরায় ধমনীতে বহন করে চলেছি। আমার আরাধ্য দেবতা আমাকে যেভাবে এগোতে বলেছেন তা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি।আর কিছুদিন, তারপর আমি হয়ে উঠব অমিত শক্তির অধিকারী, অমর। জল, স্থল অন্তরীক্ষ কোথাও কেউ আমাকে মারতে পারবে না। ইচ্ছে মতো যে কোনও রূপ আমি ধরতে পারব।
তারপরই ভ্রূ কুঁচকে অবিরল নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা ঘোড়াকে উদ্দেশ্য করে বলল
-পেসা, তোমায় এখানে কিছু লোক এই নামেই চেনে। আমার এই সাধনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হলে তোমরা দু’জন। বহু বছর ধরে বিভিন্ন দেশের জঙ্গল ঘুরে আমি তোমাদের পেয়েছি। তোমার ভাইকে খুঁজে দেওয়ার দায়িত্ব যখন আমি নিয়েছি তখন ওকে ঠিকই একদিন খুঁজে বার করব। কিন্তু এখানে তোমরা যা শুরু করেছ তাতে করে আমার মনে হচ্ছে তীরে এসে তরী না ডোবে।
এতক্ষণ অবিরলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পেসা মন দিয়ে ওর কথা শুনছিল। এবার ওর পেছন থেকে একটা মৃদু হিসহিস শব্দ পাওয়া গেল।
অবিরল মুহূর্তেই সচকিত হয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
-আর কয়েকটা দিন আমায় সময় দাও, আ আ আমি কথা দিচ্ছি ওকে আমি ঠিক খুঁজে বার করবই।
এবারও আগের দিনের মতো একটা বড়ো ব্যাগ সে পেসার দিকে এগিয়ে দিল। তারপর পেসা সেই ব্যাগটি নিয়ে চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে অদৃশ্য হয়ে গেল।
অবিরল সেইদিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা খল হাসি হাসল। তারপর নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল।
১৫
বনি আর মুকুট দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। একতলার দৃশ্য দেখে ওদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল।
নীচতলার রান্নাঘরের একদিকে বিশুর ছেলে শুভ বসে খেলা করছিল। বিশু কী একটা কাজ নিয়ে ডাইনিং টেবিলে গিয়েছিল। মিনিট-পাঁচেক বাদে শুভ-র চিৎকার শুনে দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে দেখে রান্নাঘরের মেঝে দেওয়াল জুড়ে হাজার হাজার মাকড়সা, বিষাক্ত বিছে, টিকটিকি কেন্নো ছড়িয়ে রয়েছে। রান্নাঘরের দেওয়াল, ছাদ পুরো কালো হয়ে গেছে। এত পোকামাকড় একসঙ্গে এত কম সময়ে এখানে কী করে আর কেন এল তা বিশু বুঝতে পারছিল না। ওর চিৎকার শুনে মুকুটের মা রান্নাঘরে গিয়ে একই দৃশ্য দেখেন। মুকুট আর বনি যখন গিয়ে পৌঁছে দেখল পোকামাকড়গুলো ধীরে ধীরে শুভর দিকে এগোচ্ছে।
বনি সঙ্গে সঙ্গে তার তলোয়ারটি হাতে নিয়ে লাফিয়ে রান্নাঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল এবং তখনই একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। বনি নিজের তলোয়ারটি রান্নাঘরের মেঝেতে যেখানে যেখানে রাখল পোকামাকড়গুলো জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো করে সরে সরে যেতে লাগল। বনি শুভকে নিজের পিঠে তুলে নিল, তারপর খুব সন্তর্পণে তলোয়ার দিয়ে মেঝেতে দাগ কাটতে লাগল। এইভাবে ওর সামনে একটা রাস্তা তৈরি হল, বনি কোনোক্রমে লাফিয়ে শুভকে নিয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। অদ্ভুত বিষয় হল, এত পোকা যেমন হঠাৎ করে এসেছিল তেমনই হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে গেল। রান্নাঘর দেখে কারোও মনে হওয়ার উপায় নেই যে এখানে একটু আগেই কী ঘটেছে।
শুভ বিশুর কোলে যাওয়া ইস্তক ভীষণ কাঁদছে। মুকুটের মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মুকুট বিশুর দিকে তাকিয়ে বলল,
-বিশুদা আমি জানি এসব কেন হচ্ছে তা তুমি জানো।
বিশু ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,
-ছোড়দা ওরা আমাকেও ছাড়বে না গো, আমাকে আর শুভকে ওরা মেরে ফেলবে। আ… আ… আমি তোমাদের সব বলব সব।
তখন রাত ঘন হয়ে এসেছে, জঙ্গলের পাতা নড়ার শব্দে কী যেন একটা গোপন রহস্য তিরতিরে হাওয়ার মতো বয়ে চলেছে। সহসা দূরে বিদ্যুৎ চমকে উঠল, ধীরে ধীরে চারিদিকের পরিবেশ হয়ে উঠল অশান্ত। ভীষণ ঝড় শুরু হওয়ার আগের থমথমে পরিবেশ যেমন মানুষের মনে তৈরি করে ব্যকুলতা তেমনই ঝড় শুরু হওয়ার পর সেই ব্যকুলতাই রূপান্তরিত হয় চূড়ান্ত ভয়ে। সিসামারার ধারে এই বাংলোর তিনজনের মনেই তখন বাইরের চেয়ে অনেক বড়ো, অনেক জটিল ঝড় বয়ে চলেছে।
সেই ভয়ংকর ঝড়ের মধ্যে কারেন্ট অফ্ হয়ে গেল। মুকুটের মা মোমবাতি জ্বালালেন। আবছা মোমের আলো চকিতে তৈরি করল এক রহস্যময় পরিবেশ। বিশু শুভকে কোলে নিয়ে ডাইনিং এ বসে বলতে শুরু করল বহু বছরের ধুলো জমা পুরোনো ঘটনা।
-এসবের বেশিরভাগই আমার বাবার কাছে শোনা আমি তখন খুব ছোট তবে সেইসময়ের কিছু স্মৃতি এখনও ঘষা কাচের মতো আবছা হয়ে আমার মনের মধ্যে থেকে গেছে। আমার বাবা ভুটান লাগোয়া তিব্বতের একটি দুর্গম গ্রামে থাকতেন। ওঁর নাম ছিল দীননাথ রাজবংশী। বাবা আগে এই জলপাইগুড়ির বাসিন্দা ছিলেন। ছোট থেকেই ওঁর পড়াশোনার প্রতি কোনও ন্যাক ছিল না। তন্ত্র, মন্ত্র, গুপ্তবিদ্যা এসব নিয়ে পড়াশোনা করতেন। ওঁর এইসব অদ্ভুত শখের জন্য বাড়িতে ঠাকুরদা , দিদিমার সঙ্গে বাবার প্রচুর বাকবিতন্ডা হত। বাবার যখন কিশোর বয়েস তখন উনি বাড়ি থেকে পালালেন। উদ্দেশ্য তন্ত্র শিখবেন। ভারত থেকে ভুটান এবং তারপর সেখান থেকে উনি গিয়ে পৌঁছালেন তিব্বত। ততদিনে বাবা যুবক হয়ে উঠেছেন। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে রয়েছে প্রচুর জ্ঞান।এভাবেই একদিন সন্ধ্যাবেলা তিব্বতের প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরতে ঘুরতে উনি পৌঁছে যান একটি অদ্ভুত জায়গায়। জায়গাটি অদ্ভুত কারণ সেখানে সবকিছুই সাপের আদলে তৈরি, এমনকি গাছগুলো পর্যন্ত সাপের শরীরের মতো এঁকেবেঁকে বেড়ে উঠেছে।দুটি তিনটি গাছ একসঙ্গে যুক্ত হয়ে সাপের মুখের আকৃতি নিয়েছে। সেখানে গুহার মতো একটি পাথরের আস্তানা ছিল। গুহার মুখটিও অদ্ভুতভাবে সাপের হাঁ এর মতো করে তৈরি। চারিদিকের পরিবেশে কেমন একটা অশৈলি ভাব। মনে হচ্ছে অলক্ষ্যে কেউ যেন ওঁর গতিবিধি অনুসরণ করছে। বাবার ভীষণ অস্বস্তি হতে শুরু করল। বাবা এই যায়গা থেকে চলে যাবেন বলে ঠিক করলেন। কিন্তু বিধি বাম, জায়গাটি যেন ভুলভুলইয়ার মতো ওঁর চারিপাশে পাক খেতে লাগল।উনি যতই সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে চান, ততই যেন আরও বেশি করে সেই রহস্যময় জায়গার আবর্তে ঢুকে পড়েন। এভাবে কতক্ষণ চলল বাবা জানেন না। একসময় দেখলেন সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়েছে। রাত হতে আর বেশি বাকি নেই। ততক্ষণে উনি বুঝে গিয়েছেন, ওঁর বিশেষ কিছু করার নেই। ওঁকে কেউ চালনা করছেন এবং এতকিছু সেই অদৃশ্যের অঙ্গুলিহেলনে হচ্ছে।
দিন দুয়েক এভাবেই কাটল, সারাদিন বাবা পাগলের মতো ঝিম মেরে বসে থাকেন, রাত্রে কোনও একটি গাছের ওপরে আশ্রয় নেন।
তিনদিনের দিন বাবা আর থাকতে না পেরে মরিয়া হয়ে সাপের মুখওয়ালা ভয়ংকর গুহার মধ্যে প্রবেশ করলেন। ওঁর মন বলছিল, এখানে কিছু একটা ঘটনা ঘটবে।
এতক্ষণ একটানা কথাগুলো বলে বিশু খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। যেন ঘটনাগুলোকে সে মনে মনে তৈরি করে নিচ্ছে। বাইরে বৃষ্টির বেগ রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলছিল। দেখে মনে হচ্ছে, বুঝি আজকের প্রকৃতি কোনও একটি ঘটনায় ভীষণ ক্ষুব্ধ, প্রতিশোধ নিচ্ছে পৃথিবীর ওপর।
বিশু ভয়ার্ত গলায় আবার বলতে শুরু করল,
-বাবা তখন যুবক, মনে অদম্য সাহস। উনি প্রায় অন্ধকার গুহাটির মধ্যে নিচু হয়ে এগিয়ে চললেন। গুহার মধ্যে চারিদিকে যত্রতত্র সাদা রঙের খোলস ছড়ানো, ভিজে স্যাঁতস্যাতে গুহাটিতে ঢুকে বাবার শীত করতে লাগল। বাইরের থেকে এখানকার তাপমাত্রা বেশ কয়েক ডিগ্রি কম। উঁচু নিচু পথ দিয়ে কিছুক্ষণ চলার পর বাবার অন্ধকারে চোখ সয়ে যেতে শুরু করল। উনি দেখতে পেলেন গুহার কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য সাপ। তার কোনওটা বড়ো, কোনওটা মোটা, লম্বা, ছোট। এমনকি পাইথন পর্যন্ত কুন্ডলী পাকিয়ে পড়ে রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল সাপগুলো বাবাকে আক্রমণ করছে না। মনে হচ্ছে যেন ওগুলো কারোর নির্দেশে চলাফেরা করছে ওদের নিজস্ব ইচ্ছা বলে কিছুই নেই। বাবা এই ঘটনায় বেশ অবাক হলেন, সাপকে পোষ মানানো যায় না। এবং এই প্রাণীটিকে নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব নয়। কিন্তু উনি যেহেতু তন্ত্র নিয়ে পড়াশুনা করেছিলেন, তাই উনি বুঝতে পারছিলেন, মানুষের সাধারণ জীবনের চেনা বৃত্তের বাইরেও একটা জগত আছে। সেখানকার নিয়ম নীতি সবকিছু আলাদা, সেখানে সবকিছু আবর্তিত হয় অন্য নিয়মে।
এই সমস্ত ভাবতে ভাবতে উনি যখন এগোচ্ছেন তখন একটু দূরে ধূনি জ্বেলে একজন মানুষকে বসে থাকতে দেখলেন।
এই জায়গাটা বলতে বলতে বিশুর চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল উত্তেজনায় ওর গায়ে কাঁটা দিল,
-দাদাবাবু আমি সে দৃশ্য দেখিনি কিন্তু বাবার কাছে শুনে কল্পনা করলেই আমার বুকের মধ্যে যেন সমুদ্র ঢেউ ভাঙতে শুরু করে।
বাবা ধূনির সেই অপ্রতুল আলোয় দেখলেন একটি মানুষ বসে রয়েছে, কী সমস্ত দুর্বোধ্য ভাষায় মন্ত্র পড়ে চলেছেন। মানুষটিকে ভালো দেখা যাচ্ছে না, কারণ তাঁর সমস্ত শরীরে জড়িয়ে রয়েছে অগুনতি সাপ। সেই তান্ত্রিকের সারা শরীর নিজেদের ঠান্ডা চামড়া দিয়ে তারা যেন লেহন করছে। বাবা খানিক দূরে গুহার মধ্যে গুড়ি হয়ে বসে এই অদ্ভুত ঘটনা দেখতে লাগলেন। এভাবে কতক্ষণ বাবা বসে ছিলেন তা উনি জানেন না। একসময় তান্ত্রিককে দেখে মনে হল বেশ কিছু সাপ ওঁর গায়ে ছোবল দিয়েছে।
বাবা যত দেখছিলেন তত অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন। অমন বিষধর সাপের ছোবল খেয়েও মানুষটি কীভাবে বেঁচে আছে তা বিস্ময়কর তো বটেই সঙ্গে অবিশ্বাস্য।
ছোড়দা, আমার ঘটনাগুলো শুনে কেউই বিশ্বাস করবে না। কিন্তু শুধু আমি জানি, সেই লোকটি একদিন ঠিক আমাদের বংশকে খুঁজে পাবে।আর আজকে তো সেটা তোমরা চাক্ষুষ দেখলে কিছুক্ষণ আগে কী ঘটনা ঘটল! যুক্তি দিয়ে কি সেই রহস্যের সমাধান করা যায়?
বনি বলে উঠল,
-দেখো বিশুদা, আলো থাকলে অবশ্যই অন্ধকারও রয়েছে। আর এই অন্ধকার জগতের সবকিছু আমরা জানি না, প্রকৃতি আমাদের সঙ্গে রহস্য করতে পছন্দ করে। মাঝে মাঝে এমন ঘটনা ঘটায় যাতে আমাদের হিসাব নিকাশ সব গুলিয়ে যায়। আমরা বিষয়টিকে নতুন করে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শুরু করি।তুমি ঘটনাটা বল, আমরা তোমার কথা অবিশ্বাস করছি না।
বাইরের বিধ্বংসী ঝড়ের থেকেও ওদের সকলের মনে তখন চলছে আরও অনেক বেশি জটিল ঝড়।
বাইরে ঝড়ের শোঁ শোঁ শব্দ ও ডাইনিং স্পেসের মোমবাতির ক্ষীণ আলো চারিপাশের পরিবেশকে করে তুলেছে ভয়াল, ভয়ংকর ।
বিশু আবার বলতে শুরু করল,
-একসময় সেই রহস্যময় মানুষটির শরীরের ওপর থেকে সব সাপ সরে গেল, আর তখনই বাবা অবাক হয়ে লক্ষ করলেন তান্ত্রিকটির শরীরের অনাবৃত অংশ অপরাজিত ফুলের মতো নীল হয়ে গিয়েছে। তবে বাবা যেহেতু আগে ওঁকে দেখেননি তাই বুঝতে পারলেন না ওঁর গায়ের রঙ এমনই নাকি সাপের কামড়ে একরম রঙ হয়েছে।
এরপর, সেই তান্ত্রিক গুহার মধ্যে অচৈতন্য হয়ে ওভাবেই পড়ে রইলেন। একসময় ধূনির আগুন নিভে গেল, গুহাকে অনন্ত অন্ধকার গ্রাস করল।
বাবা এখানে এসে ইস্তক এত অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে দেখছিলেন যে তিনি আর নতুন করে অবাক হলেন না। উনিও গুহার মধ্যে অন্ধকারে বসে তান্ত্রিকের জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা করতে লাগলেন।
প্রায় দু’দিন এভাবে কাটল তিন দিনের দিন সেই তান্ত্রিকের জ্ঞান ফিরল। উনি উঠে বসে বাবার দিকে বেশ কিছুক্ষণ শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। ছোড়দা, সেই দৃষ্টিতে ছিল ভয়ংকর ও অন্তর্ভেদী, যেন তান্ত্রিক বাবার মনের নাগাল পেয়েছেন বলে মনে হচ্ছিল। ওই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না৷ বাবাও সেই আলো আঁধারি মাখা গুহার অন্য দিকে তাকালেন। ঠিক তখনই গম্ভীর কণ্ঠে তান্ত্রিক বাবাকে উদ্দেশ করে বললেন,
-আয়, তোর জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম।
তখন দিনের আলো গুহার ফাঁক ফোকর দিয়ে অল্পবিস্তর ঢুকছে। সেই অপ্রতুল আলোয় বাবা মানুষটিকে ভালো করে দেখলেন। বয়স পঁচিশও হতে পারে আবার পঞ্চাশও হতে পারে।বেঁটে, খাটো চেহারা, গায়ের রং এখন কিন্তু সাদা, মাথার বড়ো চুল জট পাকিয়ে গেছে সেগুলো ঘাড় ছাপিয়ে পিঠের কাছে গিয়ে হঠাৎ করেই যেন শেষ হয়ে গেছে। ছোট কুতকুতে চোখের মধ্যে একটা নিষ্ঠুর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি রয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন মনের গোপন প্রকোষ্ঠের সমস্ত কিছু এক লহমায় পড়ে নিচ্ছেন। বাবা ঘোরলাগা চোখে মানুষটির দিকে এগিয়ে গেলেন।
সেই শুরু। তারপর সেই তান্ত্রিক বাবাকে নিজের যোগ্য সহকারী করে তুললেন।
তিব্বতের যে জায়গাটিতে বাবা তান্ত্রিকের দেখা পেয়েছিলেন সেটিকে উনি নিজের মন্ত্রবলে বিভ্রম তৈরি করেছিলেন। সেটি সব মানুষ দেখতে পাবে না, সেখানে একমাত্র তান্ত্রিক যাকে চাইছেন সেই প্রবেশ করতে পারে। সেই অমিতশক্তিধর তান্ত্রিক ছিলেন তিব্বতের নীলাম্বর বজ্রপানির সাধক।
মুকুটের মা জিজ্ঞেস করলেন,
-নীলাম্বর বজ্রপানি কে?
এবার বর্ণিকা উত্তর দিল,
-কাকিমা, তিব্বতি ধর্ম মতে মহেশ্বর নামে এক অপদেবতা ছিলেন। যিনি মতান্তরে মহাদেবের একটি রূপ। এই অপদেবতা মানুষের ওপর ভীষণ অত্যাচার শুরু করে দেয়। তখন মানুষের কষ্ট দূর করার জন্য বুদ্ধ সামন্তভদ্র এক ভয়ংকর দেবতার রূপ নেন, সেই দেবতার অস্ত্র হল বজ্র। তিব্বতের দুর্গম মেরু পর্বতে মহেশ্বর ও সেই দেবতার ভয়ংকর যুদ্ধ হয়। শেষ পর্যন্ত মহেশ্বরকে পরাজিত করে সেই দেবতা জয়লাভ করেন। দেবতাটির নাম হল বজ্রপানি, তিব্বতি ভাষায় দেবতাটিকে বলা হয় ছান্না দরজে।
এই দেবতাটি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রূপে পূজিত হন। যেমন নেপালে ওঁর গায়ের রং শ্বেত, শুভ্র , হাতে ধরা থাকে বজ্র ও পদ্ম। জাপান ও কোরিয়ার এই দেবতার নাম হল যথাক্রমে কঙ্গো সু বোসাতসু, বালসারাপানি।
এই বজ্রপানি দেবতা হলেন বৌদ্ধধর্মের আদি তিন দেবতার একজন। তবে বজ্রপানি দেবতার আবির্ভাব নিয়ে চীনা ও তিব্বতি ধর্মে অনেক মতান্তর আছে। তিব্বতি ধর্ম মতে এই বজ্রপানি দেবতার অনেক রূপ আছে তারমধ্যে একটি রূপ হল নীলাম্বর বজ্রপানি। এখানে ওই দেবতার একটি মাথা ও তিনটি চোখ আছে। নীলাম্বর বজ্রপানির এলোমেলো চুলে বাঁধা আছে একটি সর্প। মাথায় করোটির মুকুট পরা, দেবতার দুটো হাত ইন্দ্রজালিক মুদ্রায় বুকের কাছে থাকে, অন্য হাতে থাকে বজ্র। উনি দাঁড়িয়ে থাকেন একগুচ্ছ সাপের ওপর।
-তুমি এতসব কী করে জানলে?
মুকুটের প্রশ্নের উত্তরে বনি মৃদু হেসে বলল,
-নীলাম্বর বজ্রপানির অন্য রূপ হল অকাল বজ্রপানি। এঁকে নিয়ে আমার একটি ঘটনা আছে সেটা পরে শুনো। আপাতত বিশুদার ঘটনায় মনোনিবেশ করা যাক।
বিশু আবার বলতে শুরু করল,
-বাবা ওই সাধকের কাছে দীর্ঘদিন ছিলেন। সাধকের সান্নিধ্যে থাকতে থাকতে বাবা ওঁর সম্বন্ধে অনেক কিছু তথ্য জানতে পেরেছিলেন। তিনি প্রায় একশো বছর ধরে সাধনা করে চলেছেন। এখন তিনি তাঁর সাধনার শেষ মার্গে পৌঁছেছেন। আর কিছুদিন পরেই উনি সিদ্ধিলাভ করবেন। তখন উনি হয়ে উঠবেন সর্পদের রাজা। তার সঙ্গে আরও কিছু রহস্যময় ও বিরল শক্তির অধিকারী হবেন তিনি।
এভাবেই দিন কাটছিল, আমার বাবা হয়তো ওই তান্ত্রিকের গুপ্ত ইচ্ছার বলি হয়ে যেতেন। কিন্তু নিয়তির অন্য ইচ্ছা ছিল।সৌভাগ্যবশতঃ একদিন উনি বজ্রপানির সঙ্গে সাধকের কথোপকথন লুকিয়ে শুনে নিয়েছিলেন।
আগেই বলেছি, সাধকের সাধনা প্রায় শেষের দিকে। এই সাধনায় নীলাম্বর বজ্রপানিকে বলি উৎসর্গ করার রীতি আছে। তবে যে সে মানুষকে বলি দিলে হবে না। যে পুরুষের ত্রিশ বছর বয়স হয়েছে, যার বাঁ হাত ও বাঁ পায়ে পাঁচটার জায়গায় ছটা আঙুল থাকবে ও তার জন্ম হতে হবে তুলা লগ্নের তুলা রাশিতে, এমন জাতকের মুন্ডু কাটা রক্তের সঙ্গে বিষধর সাপের বিষ মিলিয়ে কৌশিকি অমাবস্যার রাতে সাধককে পান করতে হবে।তবে মিলবে মোক্ষ।
বিশুকে থামিয়ে দিয়ে মুকুট বিস্মিত হয়ে বলে উঠল,
-বিশুদা তোমারও তো তোমার বাবার মতো বাঁ হাত ও বাঁ পায়ে ছয়টা করে আঙুল রয়েছে।
বিশু ম্লান হেসে বলল,
-শুভরও তাই দাদাবাবু। এইজন্যই তো আমরা কোথাও পালিয়ে শান্তি পাব না। ওই দুষ্ট লোক ঠিক আমাদের খুঁজে নেবেই। ওঁর প্রতিশোধস্পৃহা সাংঘাতিক।
বিশু তারপর আবার তারপর আবার মূল গল্পে ফিরে গেল।
-একদিন সকালে জঙ্গল থেকে ফলমূল সংগ্রহ করে বাবা অন্য দিনের তুলনায় একটু তাড়াতাড়ি গুহায় ফিরেছিলেন। সেইসময় তান্ত্রিক বজ্রপানিের মূর্তির সঙ্গে কথোপকথনে ব্যস্ত ছিলেন। বাবার উপস্থিতি টের পাননি।
আমার বাবা আড়াল থেকে সব শুনেছিলেন এবং সেই বলির মানুষটি যে তিনি নিজে এটা বুঝতে পেরে ভয়ে কেঁপে উঠেছিলেন।
এই ঘটনার পরদিন, বাবা অন্যদিনের তুলনায় অন্যমনস্ক ছিলেন। বুঝতে পারছিলেন না কীভাবে এই আসন্ন বিপদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবেন। তবে কিনা একটি কথা আছে, রাখে হরি মারে কে?
সুযোগ এলো অচিরেই।তান্ত্রিক সেদিন আবার ধ্যানে বসলেন আর ওর ধ্যান মানেই হল, সাপের বিষ নিজের শরীরে ধারণ করা। সেদিনও ঠিক আগের দিনের মতো তান্ত্রিক বজ্রপানির পুজোয় বসলেন। তবে বাবা তক্কে তক্কে ছিলেন উনি জানতেন ওই বিশেষ জায়গা থেকে বেরিয়ে আসা অত সহজ হবে না। তবুও চেষ্টা তো ওঁকে করতেই হবে। তান্ত্রিক ধীরে ধীরে অচৈতন্য হওয়ার পর বাবা ওঁর ব্যবহৃত রুদ্রাক্ষের মালাটি নিজের হাতে তুলে নিলেন তারপর মরিয়া হয়ে গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। জঙ্গলের মধ্যে যেহেতু সবই একরকম তাই যে কোনও একটা গাছের কান্ডে মালাটি ছোঁয়াতেই ম্যাজিকের মতো কান্ডটি দু’ভাগ হয়ে একটি রাস্তা তৈরি হয়ে গেল। বাবা বুঝতে পারছিলেন না ওটা কীসের রাস্তা, এখান থেকে বেরোতে গিয়ে আবার একটা নতুন বিপদের মধ্যে গিয়ে পড়বেন কিনা তাও বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু তখন ওঁর এটা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই, বাবা দ্রুত ওই রাস্তায় ঢুকে পড়লে এবং আশ্চর্য বিষয় মাস কয়েক আগে ঠিক যেখান থেকে ওই রহস্যময় জায়গাটিতে আটকে পড়েছিলেন সেখানে আবার ফিরে গেলেন।
বাবা ওই ভয়ংকর তান্ত্রিকের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা তো করলেন কিন্তু বাকি জীবনটা কাটালেন মৃত্যুভয়ে। ঘুমের মধ্যে আঁতকে উঠতেন। জীবনের শেষ ক’দিন আগে খুব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলতেন। বাবার আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত মিলে গেল, এত করেও আমরা ওই তান্ত্রিকের হাত থেকে রক্ষা পেলাম না।
শেষের কথাগুলো বলতে বলতে বিশুর গলা ধরে গেল। ডাইনিং হলে তখন নেমে এসেছে এক গভীর নিস্তব্ধতা।
বিশু বুঝতে পারছে না সে নিজেকে ও তার একরত্তিকে কী করে এই আসন্ন, অজানা বিপদের হাত থেকে রক্ষা করবে। মুকুটরা তখন সমস্ত ঘটনা জানার পর আরও বেশি করে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। এই মুহূর্তে তাদের মূল লক্ষ হল সেই তান্ত্রিককে খুঁজে বার করা।
১৬
শুভায়ন টোটো সম্প্রদায়ের দুটি লোককে নিয়ে যখন জঙ্গলে পৌঁছাল তখন সূর্য মধ্যগগনে। বর্ষার ঢলোঢলো রূপে জঙ্গলে যেন লেগেছে সবুজের সমারোহ। পাখির কূজন আর গাছেদের ব্যক্তিগত সংলাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুভায়ন ভাবছিল এত সুন্দর একটা জঙ্গল তার বুকের মধ্যে বয়ে নিয়ে চলছে কী অপার একটা রহস্যকে। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে সহজ অথচ তার মধ্যেই না জানি কত কত কুহেলি বর্ষার জলের মতোই যেন সযত্নে লুকানো রয়েছে এই জঙ্গলের পাতায় পাতায়।
শুভায়ন মনে মনে ঠিক করল যেভাবেই হোক হারিয়ে যাওয়া লোকদুটোর হদিশ করতেই হবে।
জঙ্গলে আধো অন্ধকারে লোকদুটো সামনে হাঁটছে, শুভায়ন রয়েছে ঠিক তাদের পেছনে। কিছু দূর চলার পরই ঝোপের মধ্যে একটা ফ্যাকাশে সাদা প্ল্যাসটিকের বড়ো প্যাকেটের মতো একটা জিনিস পড়ে থাকতে দেখা গেল। লোকদুটো ওকে বলল ওটাই সাপের বড়ো খোলস। ওরা খোলশটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, সেটি লম্বায় প্রায় কুড়ি ফুট, চওড়ায় তিন ফুট। খোলসটিকে ভালো করে পরীক্ষা করলে বোঝা যায়, সেটির গায়ে এখনও সাপের চামড়ার কিছু দাগ লেগে রয়েছে অর্থাৎ এটি টাটকা। এত বিশালকায় একটা সদ্য ছেড়ে যাওয়া খোলস কিভাবে জলদাপাড়া জঙ্গলে এল এটি কিছুতেই শুভায়ন বুঝতে পারছিল না। সামান্য দূরেই একটা ব্যবহৃত হাওয়াই চটি পড়ে থাকতে দেখা গেল। শুভায়ন মনে মনে ঠিক করল এটার সমস্ত বিষয়টাই সে পুলিশকে জানাবে।
সে সঙ্গের লোকদুটিকে কিছু বলল না। ওদের সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে উঠে এল, গন্তব্য ওর অফিস। তখনই ওর মোবাইল বেজে উঠল প্রিয়তোষদার ফোন।
-শুভায়ন তুই আমার স্টুডিওতে একবার আসতে পারবি?
-কেন প্রিয়দা? কোনও খবর পেয়েছ?
ফোনে প্রিয়তোষের গলায় চাপা উত্তেজনা বোঝা যাচ্ছিল।
-আজ একটু আগে অবিরল এসেছিল, এবারে তো সে আমাকে অবাক করে দিয়েছে।
-কী হয়েছে, দাদা?
-এটা পাথরের মানুষের ভাস্কর্য এনেছে। তুই দেখলে অবাক হয়ে যাবি, কী নিঁখুত হাতে তৈরি, তোকে ছবি পাঠিয়েছি দেখ। তবে আমি একটা কথা বলতে চাই, এটা খুব একটা সাধারণ বিষয় নয়। অবিরল যে ধরণের মূর্তি আমাকে সাপ্লাই করছে, আমার এতদিনের অভিজ্ঞতা বলছে এমন একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে এরকম ভাস্কর্য পাওয়া অসম্ভব। তুই বিষয়টি একটু দেখ।
প্রিয়তোষকে ফোনে আশ্বস্ত করে শুভায়ন দ্রুত হাতে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকল, ও যা আন্দাজ করছে তা যদি ঠিক হয় তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিপদজনক।
শুভায়ন প্রিয়তোষের পাঠানো ছবিটি দেখে নিচের ঠোঁট কামড়ে গাড়ির মধ্যে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর ড্রাইভারকে বলল ওর সঙ্গের লোকদুটিকে টোটোপাড়ায় নামিয়ে দিতে।
গাড়ি চলতে লাগল আর শুভায়ন মনে মনে ছক সাজিয়ে নিল। এই লোকদুটিকে দ্রুত ওদের বাড়িতে নামিয়ে থানায় ফোন করে জানাতে হবে প্রিয়তোষদার ঘটনাটি।
১৭
-শুভায়নদা, তারপর কী হল? তুমি থানায় ফোন করে কী বললে?
আজ সকালেই কলকাতা থেকে মুকুটের বন্ধুরা উত্তরবঙ্গে এসে পৌঁছেছে। বিকেলের মনোরম হাওয়ায় মুকুটদের পোর্টিকোর সামনের লনে বসে বৈকালিক গল্প চলছিল।
দিঘলের প্রশ্নের উত্তরে শুভায়ন বলল,
-থানায় জানাতেই ওরা আমাকে নিয়ে অবিরলের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল। তখন আকাশের আলো নিভু নিভু হয়ে এসেছে। গাড়িতে অফিসার আমার মোবাইলে প্রিয়দার পাঠানো ছবি দেখে ভীষণ অবাক হয়ে গেলেন। পাথরের তৈরি মানুষের ভাস্কর্যটির মুখ অবিকল হারিয়ে যাওয়া দুটি লোকের মধ্যে একজনের। এটা কীভাবে সম্ভব হল তার সঠিক উত্তর একমাত্র অবিরলই দিতে পারবে।
কিন্তু অবিরলকে ধরা বোধহয় অত সহজ নয়, অবিরলের বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখি ঘন্টা খানেক আগেই সেই বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
-তার মানে অবিরল জেনে শুনে এই কাজ করেছে। কিন্তু কেন?
অনিমিখের প্রশ্নের উত্তরে শুভায়ন বলল,
-এত কথা তো আর প্রেস জানে না। অবিরলের কথা প্রেস জানলে কী যে হবে বুঝতে পারছি না। অবিরলের ঘটনাটি যতই ভাবছি কোনও তল খুঁজে পাচ্ছি না। লোকটা প্রথম থেকে যেন রহস্যে মোড়া একটা অদ্ভুত মানুষ।
জঙ্গলের মধ্যে অতিকায় সাপের খোলস পাওয়া যাওয়া, এটাও কি তবে কোথাও অবিরলের সঙ্গে যুক্ত?
মুকুট বলল,
-দাদা, আজ সকালে আমরা একবার সিসামারার চর ধরে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকেছিলাম। বাফার জোনের আগে যেখানে আমি আর বনি অবিরলকে দেখি, সেখানে দেখলাম বেশ কিছু জন্তুর হাড় ছড়ানো। সেগুলোর গায়ে এখনও মাংস লেগে। বুঝতে পারছিলাম না, সেগুলো কোথা থেকে এলো…
-তোমরা কিন্তু এভাবে আর কখনই জঙ্গলের মধ্যে যেও না। কারণ বুঝতেই পারছ, এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতি, তারমধ্যে স্যর দিল্লিতে। গোটাটা আমাকে একা হাতে সামলাতে হচ্ছে। এরমধ্যে তোমাদের সঙ্গে যদি কোনও কিছু খারাপ ঘটনা ঘটে, তাহলে বুঝতে পারছ তো, পরিস্থিতি আমার হাতের বাইরে চলে যাবে।
শুভায়ন গম্ভীর গলায় কথাগুলো বলল।
রূপকথা শুভায়নকে জিজ্ঞেস করল,
-তাহলে আপনার কী মতামত? অবিরল কোথায় লুকিয়ে রয়েছে?
শুভায়ন ভ্রূতে ভাঁজ ফেলে উত্তর দিল,
-মনে হয় সে এখানে অন্য কিছুর উদ্দেশে এসেছে। যতক্ষণ সেটি পূর্ণ হবে না, সে এই জলদাপাড়ার আনাচে কানাচে ঘোরাঘুরি করবে।
সেদিনের মতো গল্প আর এগোল না, শুভায়নের জরুরি ফোন আসায় সে বাড়ির পথে রওনা দিল।
১৮
বিছানায় শুয়ে রূপকথা বেশ কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করল। কী এক অজানা অস্বস্তিতে ক্রমেই যেন মন ভরে উঠছে। জানলার বাইরে একটানা ঝিঁঝিঁপোকা ও ব্যাঙ ডাকার শব্দ রাতের পরিবেশকে করে তুলেছে রহস্যময়। রূপ শুয়ে শুয়ে ভাবতে চেষ্টা করল, উত্তরবঙ্গে আসার পর থেকে সমস্ত ঘটনা কেমন যেন অদ্ভুতভাবে ঘটে চলেছে, আর কেমন করে সে নিজে এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে গেল।
এতসব কথা ভাবতে ভাবতে রূপের কেমন একটা ঘোর লাগার মতো হয়ে গেল।
ওর মনে পড়ে গেল এর আগে কখনও ও এভাবে একা থাকেনি। তারপরই ঘরের সিলিং এর দিকে ওর চোখ পড়তেই মনে হল সেখানে কিছু একটা এঁকেবেঁকে রয়েছে। রূপ বেশ খানিকক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তখনই ওর কানে এল ভীষণ মৃদু কিন্তু তীব্র একটা শব্দ।শব্দের মধ্যে একটা রহস্যময় আচ্ছন্ন করা ভাব আছে। রূপ সবকিছুই শুনছে, বুঝতে পারছে কিন্তু তবুও সে যেন নিজে থেকে আর কিছু করতে পারছে না। ওর শরীর যেন আর ওর নিয়ন্ত্রণে নেই। শব্দটির উৎস সম্বন্ধে সে কিছুই বুঝতে পারছে না, শুধু এটুকু বুঝতে পারছে সেই শব্দটি ধীরে ধীরে যেন ওর মাথার মধ্যে চারিয়ে যাচ্ছে। রূপ বুঝতে পারল যে সে একটু একটু করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে।
-রূপ, এই রূপ, নটা বেজে গেল আর কখন উঠবে?
মুকুটের মা সকালে ওর ঘরের বাইরে ডেকে চলেছেন। রূপের ঘরে কোনও সাড়াশব্দ না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ঘরের বাইরের দিকের জানলা দিয়ে বিশু উঁকি দিয়ে দেখে রূপ বিছানায় শুয়ে রয়েছে এত ডাকাডাকিতেও এমন ভ্রূক্ষেপহীন ভাবে রূপকে শুয়ে থাকতে দেখে মুকুটের মায়ের মনে কু ডেকে উঠল। মেয়েটার কোনও সমস্যা হল না তো? উনি তৎক্ষণাৎ মুকুটদের ঘুম থেকে ডেকে তুললেন।দিঘল রূপের ঘরের দরজার লক ভেঙে ওর ঘরে ঢুকে বিছানার ওপর ওকে পুতুলের মতো নিস্পন্দভাবে শুয়ে থাকতে দেখল।
অনিমিখ সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে রূপের কব্জিতে হাত ছোঁয়াল, তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে বলে,
– হার্টবিট ভীষণ ক্ষীণ, রূপের কী করে এমন হল বুঝতে পারছি না। সুস্থ মেয়েটা রাতে ঘুমোতে গেল তারপর এই অবস্থা হয়ে গেল?
ততক্ষণে মুকুট দিল্লিতে ওর বাবাকে ফোন করে সমস্ত কিছু জানিয়েছে। শুভায়ন রূপকে জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করবার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় কাজ শুরু করে দিয়েছে।
দিঘল ও বনি রূপের ঘরের আনাচ কানাচ দেখছিল যদি কোনও সূত্র পাওয়া যায়।কারণ ওদের বারবারই মনে হচ্ছিল রূপের এই ঘটনার সঙ্গে অবিরলের ঘটনার কিছু যোগসূত্র থাকলেও থাকতে পারে।
বাংলোর বাইরে বেশ একটু দূরে দিঘল একটা অদ্ভুত ছাপ দেখে বনিকে ডাকল।
-এটা দেখো তো একটা পায়ের ছাপ সিসামারার পার বরাবর চলে গিয়েছে।
-বেশ অদ্ভুত তো!
-হ্যাঁ, ছাপটা টাটকা।
বনির মনে পড়ে গেল, এমনই ছাপ বেশ কিছুদিন আগে ও আর মুকুট জলদাপাড়ার জঙ্গলে দেখেছিল।সেখানেও অকুস্থলে অবিরল ছিল। অর্থাৎ ওদের অনুমান সত্য, অবিরলকে খুঁজে বার করলেই সমস্ত ঘটনা বোঝা যাবে।
১৯
একটা আবছা অন্ধকার জঙ্গল, চারিদিকের গাছপালা জঙ্গলের ওপর ঝুম হয়ে যেন ঝুলে পড়ে রয়েছে।সেখানে রূপ দেখতে পেল এক অদ্ভুত হাড় হিম করা দৃশ্য।একজন ওর দিকে পিঠ করে বসে রয়েছে। রূপ বুঝতে পারল এটাই খুব সম্ভবত অবিরল। অবিরলের সামনে কোনও একটি যজ্ঞের আগুন নিভু নিভু করে জ্বলছে।ওর সামনে একটু দূরে একটি সাদা রঙের ঘোড়া দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেই ঘোড়াটির থেকে বেশ অনেকটা দূরে অন্ধকারের মধ্যে রূপ দেখতে পেল, একটি অবয়বকে। এতদূর থেকে আবছা আলোয় সে বুঝতে পারল না সেটি কীসের।
রূপ সবই দেখছে, শুনছে অথচ তার নিজস্ব শরীরটা নেই। মনে হচ্ছে সে যেন একটি স্বচ্ছ কোনও কিছুর মধ্যে আটকে রয়েছে।
রূপের ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে, তবুও তারই মধ্যে সে শুনতে পেল অবিরলের কণ্ঠ,
-এবার তো সবই হয়ে গেল, এই মেয়েটাকে নিয়ে এসে ওদের কড়া বার্তা দেওয়া হল। ওরা এবার যদি খুব বেশি বাড়াবাড়ি করে তাহলে মেয়েটাকে তুমি পাথর বানিয়ে দেবে।
রহস্যময়ী হাঁ করল, মুখের মধ্যে থেকে লকলকে কালো জিভ বেরিয়ে এল, সেটা বার করে বুকের রক্ত জল করা গলায় বলে উঠল,
-হ্যাঁ, আমি তো সেই কবে পৌরাণিক যুগ থেকে সকলের কাছে খারাপ। আমায় তো এই মানুষেরাই রাক্ষসী বানিয়েছে। আমারও এখন ওদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সময় এসেছে। তুমি তোমার সাধনা করো, শেষে আমি আমার দুজন ছেলেকে নিয়ে চলে যাব। তবে যাওয়ার আগে এদের সবাইকে শেষ করে দিয়ে যাব।
তারপর সেই ভয়ংকর নারী, রূপ যেটায় বন্দী সেই কাচের বয়ামের কাছে এল, জঙ্গলের শুকনো পাতাগুলো সরসর করে উঠলো। জঙ্গলের চারিদিকে কেমন একটা ভয় ভয়, গা ছমছমে পরিবেশ। ধীরে ধীরে সেই অবয়বটি বয়ামের সামনে এসে দাঁড়াল, তখনই রূপ সেই নারীটিকে দেখতে পেল, সাংঘাতিক ভয়ংকর দর্শন নারী। তার মাথায় চুল বলে কিছু নেই, সেই যায়গায় রয়েছে অজস্র জীবন্ত সাপ। সেগুলো তার মাথার মধ্যে কিলবিল করছে। সেই নারীটির গলা থেকে কোমর পর্যন্ত মানুষের মতো তার নীচে অবিকল সাপের শরীরের মতো কালো ও আঁশযুক্ত হয়ে রয়েছে।রহস্যময়ীর চোখদুটো এই অন্ধকারে সবুজ হয়ে জ্বলছে।
ভয়ে আঁতকে উঠতে উঠতে রূপকথার মনে পড়ে গেল, এই ভয়ংকর দর্শন নারীটি হল গ্রিক উপকথার কিংবদন্তী রাক্ষসী মেডুসা আর তার পাশে দাঁড়ানো সাদা ঘোড়াটি হল মেডুসার ছেলে পেগাসাস।
২০
রূপের চোখদুটো বন্ধ, মনে হচ্ছে মেয়েটা এখুনি ঘুম থেকে উঠে কথা বলবে। মুকুটের মা কান্নাকাটি করতে করতে রূপকে নিয়ে শুভায়নের সঙ্গে হাসপাতালে গেল।
দিঘল, অনিমিখ, বনি আর মুকুট ঠিক করল ওরা জঙ্গলে যাবে। ওদের মন বলছিল খুব বেশি সময় ওদের হাতে নেই। যা করার এই দু’এক দিনের মধ্যেই করতে হবে।
ওরা বুঝতে পারছিল না কোথা থেকে কী হচ্ছে, তবে এটা বুঝতে পারছিল যে, অবিরলকে খুঁজে বার করলেই সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
মুকুট শুভায়নকে ফোন করার চেষ্টা করল কিন্তু নেটওয়ার্ক পেল না, অগত্যা সে শুভায়নকে মেসেজে জানাল যে ওরা জঙ্গলে যাচ্ছে। মুকুট বিষন্ন স্বরে বলল
-আমি এখন কোন মুখে রূপের বাড়িতে ফোন করে বলব যে আমার বাড়িতে ছুটি কাটাতে এসে রূপের এমন ঘটনা ঘটেছে…আজ নিজেকে বড়ো অপরাধী বলে মনে হচ্ছে।
দিঘল চিন্তিত গলায় বলে উঠল,
-মুকুট, তুই চিন্তা করিস না। দুদিন দেখে না আগে, তাছাড়া হসপিটালের ডাক্তাররা কী বলেন সেটা আমাদের আগে জানতে হবে। তারপর রূপের বাড়িতে জানালেই হবে।
অনিমিখ বনিকে বলল,
-তোমরা তো আগেও এই জঙ্গলে অভিযান করেছিলে। তোমার কী মনে হয়? এইসব অদ্ভুত ঘটনার পেছনে কি শুধু অবিরল একা?
তখন সিসামারার চরের গাছগুলো বর্ষার দামাল হাওয়ায় অশান্ত হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে প্রকৃতি যেন কী এক গোপন রহস্য তার ঘন সবুজ জঙ্গলের পরতে পরতে লুকিয়ে রাখার জন্য মরিয়া চেষ্টা করছে। আকাশ ক্রমেই কালো হয়ে আসছে।
বনি পশ্চিম দিকের ক্রমবর্ধমান ঘন কালো মেঘের দিকে তাকিয়ে দেখল, মনে হল বুঝি সেই মেঘের কালো রঙের মধ্যে এক ভয়ংকর অজানা রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। সে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
-বিশু যেদিন ওর বাবার এমন অভিজ্ঞতার কথা বলেছিল তার দিনকয়েক আগে ভীষণ অদ্ভুতভাবে আমি এই তলোয়ারটি খুঁজে পাই।
সঙ্গে সঙ্গে সকলের দৃষ্টি বনির হাতে ধরা তলোয়ারটির দিকে নিবদ্ধ হল। সেটি যেন এই কয়েকদিনে আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তলোয়ারের হাতলের সাপের সবুজ চোখ দেখে মনে হচ্ছে সাপটি এখুনি হাতল থেকে বেরিয়ে চলে আসবে।
বনি আবার বলতে শুরু করল,
-আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী। এ সমস্ত বিষয় আমি কোনও ভাবেই বিশ্বাস করি না। কিন্তু আলো থাকলে যেমন অন্ধকারকে মানতে হয়, ঈশ্বর মানলে তেমন মানতে হবে অদৃষ্টকে।ঠিক তেমন করেই আমাদের জীবনে কিছু ঘটনা ঘটে যার ব্যাখ্যা সাদা চোখে পাওয়া, সম্ভব নয়।
আমি তোমাদের আগেই বলেছি, মুকুটের বাড়ি থেকে ফেরার দিন কী ভয়ংকর ঘটনা আমার সঙ্গে ঘটেছিল। তারপর তো একদিন আমি এক অজানা কণ্ঠস্বর শুনে পেয়েছিলাম যে আমাকে সতর্ক করেছিল আমি যেন এই সমস্ত ঘটনায় নিজেকে না জড়াই। তাতে আমি বুঝেছিলাম, সেই অদৃশ্য শত্রু আর যাই হোক কোনও কারণে আমায় ভয় পায়।
বিশুদা সেদিন আমাদের নীলাম্বর বজ্রপানির কথা শুনিয়েছিল। বজ্রপানির আরও একটি রুদ্র রূপ হল অকাল বজ্রপানি। এই রূপে ওঁর চারটে করে মাথা, হাত ও পা আছে। অকাল বজ্রপানির হাতে ধরা থাকে বজ্র, তরবারি, রজ্জু আর নর করোটি। উনি ভয়ংকর দর্শন রাক্ষসের মৃতদেহের ওপর দাঁড়িয়ে থাকেন।
আমি একদিন স্কুল থেকে ফিরছিলাম, সিসামারার সমান্তরালে যে রাস্তাটি চলে গিয়েছে তার ধার দিয়ে আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে মনে হল আমি বুঝি একা নই। চারিদিকে তাকিয়ে কারোকে দেখতে পেলাম না। কিন্তু আমার মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হতে শুরু করে দিল। তারপর হঠাৎই আমার চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে গেল, আমি সামনে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু কিছু একটা দৈব উপায়ে আমার পা দুটো এগিয়ে যাচ্ছিল সিসামারার জলের কাছে। আমি ক্রমশ জলের আরও আরও গভীরে নেমে যাচ্ছিলাম। কেমন একটা ঘোর, যেন কেউ আমাকে বশ করেছে তার অমোঘ নির্দেশ উপেক্ষা করার শক্তি আমার নেই। আমি যখন কোমর সমান জলে পৌঁছে গেছি তখনই আমার দৃষ্টি যেন হঠাৎ করেই ফিরে এলো। আমি জলের মধ্যে তাকিয়ে দেখলাম তলোয়ারটা নদীবক্ষে পোঁতা, আমি তলোয়ারটি ধরব কি ধরব না ভেবে ইতস্তত করছি, ঠিক তখনই কোথা থেকে জলের ওপর উদয় হলেন অকাল বজ্রপানি। ওঁর রুদ্র মূর্তি দেখে আমার মনে কোনও ভয় হল না, তৈরি হল সমীহ। উনি আমার মন থেকে সমস্ত রকমের দ্বিধা দূর করে দিলেন। স্মিত হেসে বজ্র গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, তোমার মধ্যে সেই স্ফুলিঙ্গ রয়েছে। তোমার বুদ্ধি তলোয়ারের মতোই সূক্ষ। তুমি ঋজু, কঠিন আবার নমনীয়ও বটে। তুমি দুষ্টের দমন করতে পারবে। আমার আশির্বাদপ্রাপ্ত এই তলোয়ার একমাত্র সেই খুঁজে পায় যার এই তলোয়ার হাতে নেওয়ার যোগ্যতা আছে।
তারপর হাতের বরাভয় দেখিয়ে বললেন, মা, নির্ভীক হও, বিজয়ী হও।
আমি মন্ত্রপূতের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। ক্রমে সেই দৈব মূর্তি অন্তর্হিত হলে তলোয়ারটির দিকে তাকালাম। জলের মধ্যে আলো জ্বলার মতো করে সেটি নদীবক্ষে গাঁথা রয়েছে। সেটি হাতে ধরার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। সেদিনের পর থেকে আমার মনে আর কোনও ভয় রইল না।
এতদূর বলে বনি থামল।
এতক্ষণ বাকিরা মন দিয়ে বনির এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা শুনছিল।
অনিমিখ বলে উঠল,
-তোমার কথায় এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, অকাল বজ্রপানি তোমায় তাঁর মন্ত্রপূত তলোয়ার দিয়েছেন দুষ্টের দমন করার জন্য। কিন্তু আমি একটা বিষয় বুঝতে পারছি না, সেই তান্ত্রিক তবে নীলাম্বর বজ্রপানির পুজো করে কেমন করে মানুষের ক্ষতি করল?
এবার দিঘল উত্তর দিল,
-তান্ত্রিক চেষ্টা করছে, কোনও একটা কারণে সে এখনও তার সাধনায় সিদ্ধি লাভ করতে পারেনি। যদি সিদ্ধি লাভ করত তাহলে বিশুদের ওভাবে ভয় দেখাত না, নির্ঘাত ওদের কোনও ক্ষতি করে দিত।
এবার মুকুট বলে উঠল,
-এমনও তো হতে পারে, সেই তান্ত্রিক ভুল পথে পুজো করছে।
আর ঠিক তখনই ওরা দেখল কথা বলতে বলতে বেখেয়ালে ওরা একটা অদ্ভুত জায়গায় পৌঁছে গেছে। সেখানে আচমকাই যেন এই ভরা বর্ষাতেও ঘাসের রং হয়েছে পুড়ে যাওয়া হলুদ, গাছগুলো যেন কী এক অজানা কারণে শুকিয়ে গিয়েছে। পরিবেশের চারিদিকে একটা রহস্যময় রিক্ত ভাব। কোনও পাখি ডাকছে না। থমথমে পরিবেশ।
বর্ণিকা ফিসফিস করে বলল,
-আমাদের কিন্তু প্ল্যান বি নিতে হবে। মানে দিঘল আর অনিমিখ একদিকে, আমি আর মুকুট অন্য দিকে যাব।
২১
-দেবতার রোষে আজ চল্লিশ বছর আমি আমার অধীত শক্তির প্রায় পুরোটা খুইয়ে সাধারণ মানুষের জীবন যাপন করছি। আমি বিশুর পরিবারকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলাম, ওর বাবা আমার চোখে ধূলো দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর আমি আমার পূজিত দেবতাকে বলি দিতে পারিনি। সেই কারণে আমার তখন সাধনায় সিদ্ধি লাভের একমাত্র উপায় ছিল তোমায় খুঁজে বের করা। তুমি হলে সর্পদেবী, তুমি ভয়ংকর রাক্ষসী, তোমার কুদৃষ্টি যেখানে পড়বে সেই প্রাণী পাথর হয়ে যাবে। তোমার বানানো পাথর বেচেই তো আমি একসময় অনেক টাকা রোজগার করেছি।একমাত্র তোমার সঙ্গে যজ্ঞে বসলে আমার দেবতা তুষ্ট হয়ে আমার সাধনা সফল করবেন।
মেডুসা আমায় কৃপা করো, আ আ আমি তোমায় কথা দিচ্ছি তোমার হারিয়ে যাওয়া ছেলে সিরেসোরকে খুঁজে দেবো। তোমায় আমি কোথায় না খুঁজেছি, সারা পৃথিবীর তাবড় জঙ্গল, নদী কোথাও তো বাদ দিইনি। দীর্ঘ কুড়িটা বছর পার করেছি তোমায় খুঁজতে গিয়ে। শেষপর্যন্ত তোমার অন্য ছেলে পেগাসাসের সাহায্যে তোমায় পেয়েছি।
এতক্ষণ মেডুসা চুপ করে অবিরলের কথা শুনছিল। তারপরই রূপ কাচের জারের মধ্যে থেকে দেখল মেডুসা হঠাৎই ভীষণ উত্তেজিত হয়ে নিজের মাথা জোরে জোরে দু’দিকে ঝাঁকাতে শুরু করল। রূপকথা শিউরে উঠতে উঠতে দেখল অসংখ্য সাপ মেডুসার মাথা থেকে মাটিতে পড়ে জঙ্গলের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছে। রূপকথা বুঝতে পারল ইচ্ছে করেই ওকে সশরীরে ওরা ওখানে আনেনি, না হলে মেডুসাকে দেখা মাত্র সেও পাথরের মানুষে পরিণত হত।
মেডুসা উত্তেজিত হয়ে হিসহিসে কণ্ঠে বলতে শুরু করল,
-পৃথিবীর মানুষের কাছে আজ আমি ভয়ংকরদর্শন রাক্ষসী, দানবী। মানুষ আমার নাম করতেও ভয় পায়। কিন্তু কেউ কখনও আমার ভেতরটা পড়ে দেখেনি। বুঝতে চায়নি আমাকে, লোকমুখে কথা উপকথা বানিয়েছে নিজেদের পছন্দমতো।
রূপকথা অবাক হলে লক্ষ করল মেডুসার কণ্ঠে যন্ত্রণা ঝরে পড়ছে।
-আমি একসময় অতীব সুন্দরী ছিলাম। আমি শৈশব থেকেই নিজেকে দেবী অ্যাথেনার সেবায় উৎসর্গ করেছিলাম। তারপর একদিন আমার জীবনে এলো সাগরের দেবতা পডাইসন, অন্য মেয়েদের মতো আমারও তাকে ভাল লাগতে শুরু করল, কিন্তু বিধি বাম, দেবী অ্যাথেনা আমাদের এই সম্পর্ক মেনে নিলেন না। আমায় অভিশাপ দিলেন। উফ্, সেই দিনটির কথা মনে পড়লে আমার বুকটা যন্ত্রণায় ফেটে যায়। আমার সুন্দর রূপ অচিরেই এমন ভয়াবহ চেহারায় পরিণত হল। আমার রেশমের মতো চুল রইল না, সেখানে জন্ম নিল লক্ষ লক্ষ বিষধর সাপ, আমার কাজল কালো চোখ হয়ে উঠল ভয়ংকর, সেই চোখের দিকে সরাসরি কেউ তাকালে মুহূর্তের মধ্যে পাথরে পরিণত হয়ে যায়।৷ আমার রূপ, সৌন্দর্য, জীবন সবকিছুকে দেবী অ্যাথেনা এক লহমায় শেষ করে দিলেন। আমার জীবন হয়ে উঠল দূর্বিষহ। অথচ দেখো, যে আমায় অভিশাপ দিল সেই অ্যাথেনা দেবীর আসনেই রইলেন, আমি হয়ে গেলাম রাক্ষসী মেডুসা। মনের দুঃখে আমি আফ্রিকার ঘন জঙ্গলে বাস করতে শুরু করলাম। আমার মাথা থেকে খসে পড়তে লাগল বিষধর সাপ। এই জন্য আফ্রিকা বিষাক্ত সাপের আবাসস্থল হয়ে ওঠে। এমনকি আমার রক্ত থেকে জন্ম নেওয়া আমার নিজের সন্তান পেগাসাসকেও কেড়ে নেওয়া হল আমার কাছ থেকে, তাকে আমারই বিরুদ্ধে চালনা করা হল।পেগাসাস হয়ে উঠল গ্রীক উপকথায় একটি অত্যন্ত ভালো চরিত্র।
আমার অন্য সন্তান সিরেসোরকে আমি আজ এত বছর খুঁজে চলেছি। আমার মাতৃহদয়, আমার কান্না, আমার দুঃখ বোঝবার মতো কেউ নেই। সকলে আমায় অভিশপ্ত দানবী বানাতে ব্যস্ত।
পরবর্তী সময়ে জিউসের ছেলে পার্সেউস আমায় বধ করেছে বলে উপকথায় রয়েছে।
মূর্খ মানুষগুলো জানেই না, একজন বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষ এত সহজে মরে না, মানুষের চোখে আমি অতীত, কিন্তু আমি ফিরে এসেছি এতদিন পর আমার এতদিনের বঞ্চনা, যন্ত্রণার হিসাব করব এবার। পেগাসাসকে সঙ্গে নিয়েছি, দ্রুতই সিরেসোরকে খুঁজে বার করব, তারপর আমার তান্ডব দেখবে এই নির্মম মানুষেরা।
কিছুক্ষণ থেমে থেকে মেডুসা ফের হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
-আমার শরীরে যে সমস্ত বিষধর সাপ রয়েছে সেগুলো দিয়ে এই জঙ্গল তো বটেই এই শহরটাকে আমি ছারখার করে দিতে পারি। সকলকে পাথর বানিয়ে ফেলব আমি। আমার ছেলেকে খুঁজে, আমি ফিরব আবারও। যে মানুষগুলো আমাকে দানবী বানিয়েছে তাদের কাছে আমি এই অন্যায়ের জবাব চাইব।
রূপকথা বুঝতে পারছিল, ভয়াল চেহারার এই দানবীর হৃদয়ে জমে রয়েছে বহু বহু বছরের অভিমান, অবজ্ঞা যা আমরা চাপিয়ে দিয়েছি ওর ওপর। সে এখন নিজেকে আমাদের সামনে তার সেই প্রলয় রূপ নিয়ে ফিরে আসতে চায়। প্রতিশোধ নিতে চায় আমাদের সকলের ওপর।
ঠিক তখনই অবিরল জঙ্গলের এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে ওঠে,
-সাধনায় বসবার আগে মনে হচ্ছে কয়েকজনের ব্যবস্থা করতে হবে।
তারপরই রূপকথা যে কাচের জারে ভরা আছে সেদিকে তাকিয়ে ক্রুর হেসে বলল,
-তোকে তো না মেরে ছেড়ে দিয়েছি, তোর বন্ধুদের কিন্তু এত ভাল ভাগ্য হবে না।
তারপরই পেগাসাসের পিঠে চেপে অবিরল মুহুর্তে জঙ্গলের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। রূপ বুঝতে পারছিল ভীষণ খারাপ কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
২২
আকাশের শ্লেটরঙ ধীরে ধীরে ছেয়ে যাচ্ছে জঙ্গলের মাথায়। টুকরো টুকরো কালো মেঘের দঙ্গল পরিযায়ী পাখির মতো যেন কোথা থেকে কোনও এক অজানার আহ্বানে এসে জড়ো হচ্ছে জঙ্গলের এই অংশের মাথায়। বাড়তে থাকা ঝোড়ো হাওয়ায় জঙ্গলের লম্বা গাছগুলো এমন করে দুলতে শুরু করেছে যেন মনে হচ্ছে কোনও এক অশুভ ঘটনার সূচনায় ভয়াল দৈত্য মৃত্যুকে আহ্বান করে নেচে চলেছে।
দিঘল আর অনিমিখ সেই দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ত্রস্ত পায়ে জঙ্গলের আরও ভেতরে এগোতে শুরু করল।
বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর আচমকাই অনিমিখ শুনতে পেল ঘোড়ার চিৎকার, ওরা দু’জনে সঙ্গে সঙ্গে একটা বড়ো জারুল গাছের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। তারপরই ওরা দেখতে পেল সাদা ধবধবে একটি ঘোড়ায় চেপে একজন মানুষ ওদের চেয়ে বেশ খানিকটা দূরে এসে থামলো, তারপর চিৎকার করে বলতে শুরু করল,
-জানি তোরা এখানেই আছিস, অনেকবার অনেকভাবে তোদের সাবধান করেছি, শুনিসনি। তোদের বন্ধু আমার কব্জায় যদি তাকে জীবিত ফেরত চাস তো এখুনি আমার সামনে বেরিয়ে আয়।
তারপর অট্টহাসি করে বলল,
-আমায় তোরা কিছুই করতে পারবি না, আমার নাম অবিরল, নেপালিতে এই নামের মানে হল যার কোনও শেষ নেই।
অনিমিখ দিঘলকে জানাল,
-মুকুটকে জানানো যাবে না,একটা বন্দুক থাকলে এই অবিরল লোকটিকে এক্ষুনি গুলি করে দিতাম। আমরা এখানেই লুকিয়ে থাকি। দেখি ও কী করে…
চারিদিকের প্রকৃতি যেন ক্রমশই উত্তাল হয়ে উঠছে, যেন মনে হচ্ছে কোনও প্রলয় আসতে চলেছে। একটা সময় অবিরল রাগে গজরাতে গজরাতে প্রায় ওদের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। দিঘল আর অনিমিখ দু’জনেই ইষ্ট নাম জপ করতে করতে চোখ বুজে ফেলল। আর ঠিক তখনই ওদের কানের পর্দা ফাটিয়ে ওদের খুব কাছেই বাজ পড়ল।
জঙ্গলের অন্য প্রান্তে মেডুসার পাশবিক চিৎকার ক্রমেই বাড়তে থাকল। সে আরও বেশি করে নিজের শরীর ঝাঁকাতে শুরু করল। রূপ অবাক হয়ে দেখছে লক্ষ লক্ষ বিষধর সাপ মেডুসার ভয়ংকর দর্শন মাথা থেকে নেমে জঙ্গলের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে মুকুটের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। বনির দিকে তাকিয়ে দেখল বনি মেডুসার সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মুকুট শুভায়নকে ফোন করে সমস্ত কিছু জানাল এবং তাড়াতাড়ি যাতে এখানে সদর জেলা থেকে পুলিশ পাঠানো যায় সেই ব্যবস্থা করতে বলল।
তারপর বনির দিকে তাকিয়ে দেখল সে নিজের চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধছে।
ভীষণ উত্তেজিত হয়ে প্রায় চিৎকার করে মুকুট বলে উঠল,
-তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? এসব কী করছ?
বনি নিজের চোখ বাঁধতে বাঁধতে বলল,
-ভয়ে পাগল হয়েছ তুমি, ওই পুলিশ এসে কী করবে? দেখছ না চারিদিক কেমন বিষাক্ত সাপে ভরে যাচ্ছে? ওই রাক্ষসীকে এখুনি না মারলে ও আমাদের সকলকে মেরে ফেলবে…
-কিন্তু চোখ বাঁধছ কেন? তুমি চোখ বেঁধে তলোয়ার চালাতে পারবে?
বনি মৃদু হেসে উত্তর দিল,
-স্বয়ং বজ্রপানি আমায় বলে দিয়েছিলেন, ইন্দ্রিয়ের চেয়েও নিজের শক্তির ওপর বিশ্বাস রাখতে।
বনি নির্ভীক হয়ে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। আকাশের আলো যেন ক্রমশই নিভে আসছে, এলোপাথাড়ি হাওয়ায় গাছের পাতাগুলো উড়তে শুরু করেছে, সেইদিকে তাকিয়ে মুকুট প্রমাদ গুনল।
তারপর ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখল, বনি মেডুসার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মেডুসা তার চেরা, কালো রঙের পিচ্ছিল লকলকে জিভ দিয়ে পেঁচিয়ে নিতে চাইছে বনির তলোয়ার। ঠিক তখনই বনি নির্ভুলভাবে নিজের তলোয়ার চালাতে শুরু করল। ধীরে ধীরে জঙ্গলের আধো আলোর মধ্যে মুকুট দেখতে পেল বনির চারিদিকে একটা আলোকবর্তিকা তৈরি হচ্ছে। বনি এত দ্রুততার সঙ্গে নিজের তলোয়ার ঘোরাচ্ছে যে সেটা দেখা যাচ্ছে না, শুধু চালনা করার শনশন ধাতব শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর মুকুট আবছা আলোয় দেখল, মেডুসা ধীরে ধীরে পেছনে সরতে শুরু করেছে, বনির দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে বিষাক্ত সাপের গুচ্ছ। সাপগুলো বনির ধারালো তলোয়ারের আঘাতে মুহূর্তে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। সেই সাপের কালচে রক্তে ভরে উঠছে বনির চারিদিক। বনি নিজের চোখ বাঁধা অবস্থায় তলোয়াল ঘুরিয়েই চলেছে। মেডুসা এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ বনির চারিদিকে ঘোরার পর মরিয়া হয়ে একসময় ওর ওপর তাক করে ঝাঁপ দিল, আর ঠিক তখনই আকাশ কাঁপিয়ে কাছেই কোথাও বাজ পড়ল।
২৩
-রূপ, আমি ভেবেছিলাম তোমায় আর পাব না।
– কাকিমা, এমন একটা অদ্ভুত ঘটনা, এমন অভিজ্ঞতা, এটা কি আমরা কখনও কল্পনাও করতে পেরেছি? ঈশ্বর পরম করুণাময় আমরা সকলেই ভালো আছি।
জঙ্গলের ভয়ংকর সেই দিনের ঘটনার পর এক সপ্তাহ কেটে গেছে। আগামীকাল মুকুটের বন্ধুরা কলকাতা ফিরবে। আজ সন্ধ্যাবেলার ফ্লাইটে মুকুটের বাবা অনিমেষ বাড়ি ফিরে এসেছেন। শুভায়ন অফিস থেকে সটান মুকুটের বাড়িতে চলে এসেছে।মুকুটদের ডাইনিং হলে বসে জমিয়ে গল্প হচ্ছে। মাঝে মাঝে বিশু এসে চিকেন পকোড়া দিয়ে যাচ্ছে।
অনিমেষ রূপকথার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-আমি তো ভাবতেই পারছি না, এই কয়েকটা দিনের মধ্যে এত কিছু হয়ে গেল? আমায় তোমরা কেউ জানাওনি?
-দাদা, আপনি তো তবু দিল্লিতে ছিলেন, আমিই সবকিছু জানতে পারিনি।
কফি খেতে খেতে শুভায়ন উত্তর দিল।
অনিমিখ বলল,
-ওই সময়ে বাজ যদি না পড়ত তাহলে আমার আর দিঘলের কী হতো জানি না। বজ্রপানি শেষ পর্যন্ত নিজের বজ্র প্রয়োগ করে অবিরলের সংহার করলেন।
বিশু সেই সময় পকোড়া দিতে এসেছিল। অনিমিখের কথাটা শুনে চমকে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
-দাদা, অবিরল মরে গেছে?
তারপর ভয়মিশ্রিত বিস্ময়ে বলল,
-আপনারা জানেন না মনে হয়, ওই তান্ত্রিকের কোনও শেষ নেই। ও ও ও অশেষ।
শুভায়ন বলে উঠল,
-আরে বিশুদা, তুমি আর চিন্তা করো না। জমিয়ে রান্না কর তো দেখি!
বিশু আর কিছু বলল না, শুধু অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে দু’দিকে মাথা নাড়তে নাড়তে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
এবার মুকুট বলল,
-তোমরা তো কেউ বনির সঙ্গে মেডুসার যুদ্ধ দেখোনি। অবশ্য পরে জেনেছি রূপ তো সবটাই দেখেছিল। ওরা রূপকে ওভাবে নিয়ে গিয়েছিল যাতে আমরা মেডুসার বঞ্চনার কথা জানতে পারি। বনিকে শেষ করার জন্য ওর ওপর যে মুহূর্তে মেডুসা ঝাঁপাল আমি ভয়ে উত্তেজনায় চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। তখনই বজ্রপাতের শব্দে চোখ খুলে সামনে দেখি মেডুসার মুন্ডু ধড় থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছে। চারিদিকের মাটিতে মেডুসার শরীরের আঁশটে কালো রক্ত ভরে রয়েছে। ওই বজ্রপাতেই অবিরল আর পেগাসাস মারা গিয়েছিল। আর ঠিক তখনই জঙ্গলের মধ্যে পড়ে থাকা কাচের জার যার মধ্যে রূপকথাকে ওরা বন্দী করে রেখেছিল সেটি শব্দ করে ফেটে গেল।
রূপকথা বলে উঠল,
-আমার মনে হল আমি বুঝি জলের কোন অতল থেকে উঠে এলাম। হসপিটালের বেডে নিজেকে আবিষ্কার করে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আশ্চর্যের বিষয় হল, আমার জঙ্গলের সমস্ত ঘটনা মনে থাকলেও তারপর কীভাবে শরীর ফিরে পেলাম সেটা কিন্তু একদমই বুঝিনি।
এতক্ষণ বর্ণিকা চুপ করে বসেছিল, এবার বলল,
-মেডুসাকে আমায় হত্যা করতে হয়েছে এটা যেমন সত্যি তেমনই ওর সঙ্গে হওয়া প্রতিটি অন্যায়, অবিচার সমস্ত কিছুকে কিন্তু উপেক্ষা করা যায় না। সে যেন ব্রাত্য, উপেক্ষিত এক রহস্য। উপকথায় এত ভয়ংকর দানবী হয়েও সে এত বছর ধরে তার সন্তানের জন্য চিন্তিত হয়েছে। গ্রিক দেবী অ্যাথেনা তাকে যেভাবে লঘু পাপে গুরুদন্ড দিয়েছিলেন, সেটাও তো ভীষণ অন্যায়। এরপরও মেডুসার কি মানব জাতির ওপর ঘৃণা হওয়া স্বাভাবিক নয়?
মুহূর্তেই পিন পতনের নিস্তব্ধতার ছেয়ে গেল সিসামারা ধারে এই বাংলোর ডাইনিং হল। তারপরও সেদিন অনেক রাত অবধি গল্প হয়েছিল। কিন্তু কোথাও যেন সকলের গোচরে অগোচরে মেডুসাই হয়ে উঠছিল সেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র।
***
রাতের দার্জিলিং মেইল, বাইরে হু হু শব্দের হাওয়ার সঙ্গে আনাকানি করতে করতে ট্রেন এগিয়ে চলেছে। ট্রেনের ভেতরের সমস্ত আলো নিভে গেছে। দিঘল, অনিমিখরা অনেকক্ষণ আগেই শুয়ে পড়েছে। রূপকথা শুধু সাইড লোয়ার বার্থের জানলায় বসে গত কয়েকদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনার স্মৃতিচারণ করছিল। আজ ট্রেনে ওঠার পর থেকেই কেমন একটা অজানা অস্বস্তিতে ওর মনটা ক্রমেই যেন ভরে উঠছে। রূপকথা ট্রেনের জানলার বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মেডুসার বলা শেষ কথাগুলো ভাবছিল। গ্রীক উপকথায় যদি সত্যিই পার্সিয়াস মেডুসাকে বধ করে থাকে তবে সে কেমন করে বিস্মৃতির পাতা থেকে উঠে এলো? তাহলে ওরা যে ভাবছে বনি মেডুসাকে চিরতরে মেরে ফেলেছে সেটা কি সত্যি ঘটেছে?
ঠিক তখনই আচমকা একটা হাল্কা ঝাঁকি দিয়ে ট্রেন থেমে গেল। রূপকথা তাকিয়ে দেখল ট্রেন একটা অনামি স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে। হয়তো সিগন্যাল পায়নি তাই দাঁড়িয়ে পড়েছে। এটা ভাবতে ভাবতে সে জানলার বাইরে তাকাল, বর্ষার রাতে স্টেশনটিতে গুটিকয়েক আলো মেঘে ঢাকা তারার মতো টিমটিম করে জ্বলছে। আলোগুলো জ্বলায় স্টেশনটিতে অন্ধকার যেন আরও বেশি করে ঘনিয়ে এসেছে বলে রূপের মনে হল। আধো আলো আধো আঁধারির মধ্যে হঠাৎই সে দেখতে পেল একটা লোক সাদা ঘোড়ার পিঠে চেপে ট্রেন লাগোয়া প্লাটফর্ম দিয়ে ওদের জানলার দিকে এগিয়ে আসছে। ওটা দেখেই রূপের বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। আগুন্তকের মুখ এমন করে কালো কাপড়ে ঢাকা যে দূরের অপ্রতুল আলোয় সেই মুখ চেনার উপায় নেই। রূপ একবার ভাবল অনিমিখ ও দিঘলকে ডেকে তোলে। তারপর কী মনে হতে অপেক্ষা করতে লাগল, শেষ পর্যন্ত কী হয় দেখার জন্য। সাদা ঘোড়া দুলকি চালে ধীরে ধীরে ওর জানলার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। আর ঠিক তখনই ট্রেন ছেড়ে দিল। জানলার সামনে এক সেকেন্ডের জন্য রূপ আগন্তুকের মুখটা পরিষ্কার দেখতে পেল। অবিরল…। আর ঠিক তখনই ওর কানে যেন কোনও অদৃশ্য গলা ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
-আমার নাম অবিরল, নেপালীতে যার মানে অশেষ, আমি আবারও ফিরে আসব।
রূপ এই ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সে এতটাই অবাক হয়ে পড়েছিল যে, ওর বাকি বন্ধুদের ডেকে তোলার কথা মনেই পড়েনি।একটু ধাতস্থ হওয়ার পর রূপ খেয়াল করল মোবাইলে টুং করে একটি মেসেজ নোটিফিকেশন, ও কাঁপা হাতে মোবাইলটি হাতে নিল। মোবাইল খুলে বন্ধুদের গ্রুপে দেখল, বনির মেসেজ,
“বজ্রপানির দেওয়া তলোয়ারটি খুঁজে পাচ্ছি না।”
রূপ বুঝতে পারল আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে, যতদিন অত্যাচারিতা, নিপীড়িতা, ভাগ্যের বলি মেডুসা তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে, তার হৃত গৌবরকে, তার আগের জীবনকে খুঁজে পাবে না, ততদিন বোধহয় কালের নিয়মে নিরবিচ্ছিন্ন তথাকথিত এই আলো ও অন্ধকারের খেলা চলতে থাকবে। অবিরল নিজের সমস্ত জীবন ধরে বা একটা জীবনের পর অন্য জীবন দিয়ে সন্ধান করবে তার শক্তিকে। বজ্রপানি যেমন অবিরলের মতো অসাধু মানুষকে শক্তি যোগাবেন, তেমনই বর্ণিকারা আবার ফিরে আসবে পৃথিবীতে এবং সেই বজ্রপানিই বর্ণিকাদের দুষ্টের দমন করতে নিযুক্ত করবেন।
বজ্রপানির দেওয়া সেই তলোয়ার তার কাজ শেষ করে পুনরায় ফিরে গেছে বজ্রপানির কাছে। বজ্রপানি বর্ণিকার মতো আবারও কারোকে কখনও নির্বাচন করবেন তাঁর তলেয়ারের জন্য। সেই সময় বা সেই দিন কবে আসবে, কত বছর পর, তা একমাত্র কাল বা সময় জানে।
জীবন মৃত্যুর এই চিরন্তন খেলায় তারা এক একটি পাত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।ভবিতব্য এভাবেই বোধহয় এমন অদ্ভুত ভারসাম্যে বয়ে নিয়ে চলেছে সময় তথা সমগ্র পৃথিবীকে।
মেডুসা, অবিরল, পেগাসাস আবারও নতুন কোনও জায়গা খুঁজে নেবে বা বলা ভালো নিয়তি আবার তাদেরকে এভাবেই তাদের নিজ নিজ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করবে। কালের নিয়মে আবার হয়তো ওদের মতো কিছু মানুষ আসবে যারা ভয়ংকর দানবীর হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করবে। রূপকথার মনে পড়ে গেল গীতার সেই অমোঘ বাণী “পরিবর্তনই জীবনের নিয়ম।”।
রূপকথা ওইভাবেই জানলার বাইরে সামনে আগত অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল, ট্রেন এগিয়ে চলল তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে।
তথ্যসূত্র-
১.https://www.wisdomlib.org/buddhism/book/the-gods-of-northern-buddhism/d/doc4713.html
২.https://en.m.wikipedia.org/wiki/Medusa
ছবি মৌসুমী