উপন্যাস-ওম মণি পদ্মে হুম-পুষ্পেন মণ্ডল-শরৎ ২০২৪

পুষ্পেন মণ্ডলের আরো লেখা: বাউটম্যানের বাংলো, কুয়াশার ডাক, অরেলস্টাইন ক্যাসেল, সমুদ্রগুপ্তের তরবারি, গৌরীভিটিলের অদ্ভুত গন্ধ, জলদস্যুর রক্তচক্ষু, মেজাম্বা, কালযন্ত্র

uponyasmonipodmehum

বুদ্ধম্‌ শরণম্‌ গচ্ছামি…
সংঘম্‌ শরণম্‌ গচ্ছামি…
ধম্মম্‌ শরণম্‌ গচ্ছামি…

শাক্যসিংহ গৌতম বুদ্ধ অধুনা জরাভারে ক্লান্ত ক্ষত্রিয় শরীরের সুঠাম বাঁধন কালের নিয়মে অবক্ষয়ের পথে হেঁটেছেইদানীং শরীরে বাসা বেঁধেছে বার্ধক্যজনিত ক্ষয়রোগ সময় হয়েছে এই মরজগৎ ত্যাগ করে তুষিতা স্বর্গে ফিরে যাওয়ার এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা

ক্লান্ত, রোগগ্রস্ত বুদ্ধ ভিক্ষুশিষ্য আনন্দ সহযোগে এসেছেন মল্ল গণসংঘে গন্তব্য শিষ্য চুন্দার ভবন চুন্দা পেশায় কর্মকার বুদ্ধের একনিষ্ঠ ভক্ত সে, অমিতাভের সেবায় সদা নিয়োজিত চুন্দার গৃহেই আজ ভোজন গ্রহণ করবেন সশিষ্য গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুশ্রেষ্ঠ গৌতমের জন্য আয়োজনের খামতি রাখেননি কর্মকার চুন্দা পঞ্চব্যঞ্জনে সাজিয়েছেন বুদ্ধের নৈবেদ্য সাধ্যমতো উৎকৃষ্ট বস্তুরাজি আহরণ করেছেন তিনি শাক্যমুনির সেবার জন্য কেবলমাত্র বুদ্ধের ভোজনের জন্যই প্রস্তুত করিয়েছেন উৎকৃষ্টশূকরমদ্ধব

ধীরপদে ভোজনকক্ষে উপনীত হলেন বুদ্ধ সমুখে সাজানো অন্নময় পাত্র কৃপা, করুণাময় দৃষ্টিতে দেখলেন সমস্ত ভোজ্যবস্তুকে তারপর একে একে সমস্ত পদ গ্রহণ করে ভোজন করলেন তাঁর জন্য তৈরি করা শূকরমদ্ধব ভোজন শেষে তৃপ্ত বুদ্ধ আসন ত্যাগ করলেন কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সিদ্ধার্থের শরীরে শুরু হল এক অসম্ভব বেদনা শারীরিক স্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে চলে যেতে লাগল শুরু হল আমাশয় জরাভারে ক্লিষ্ট শরীর দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে যেতে লাগল আমাশয়ের কোনোরকম নিরাময় না দেখে শিষ্য আনন্দ চুন্দার ভবন ছেড়ে চলে যাওয়াই সমীচীন মনে করলেন আনন্দসহ বাকি শিষ্যগণ বুদ্ধের অনুগমন করলেন পথমধ্যে বুদ্ধের অবস্থা ক্রমেই সঙ্গিন হয়ে উঠল বারংবার মলত্যাগে জীর্ণ শরীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে যেতে লাগল এদিকে কালরোগ আমাশয়ের কোনোরকম নিরাময় নাই

রোগক্লিষ্ট শরীরের জন্য প্রয়োজন একটু বিশ্রাম একটু জল পেলে মনে হয় ভালো হত, একটু শীতল, পুষ্করিণীর জল দূরে দেখা যায় শালবৃক্ষের সমাহার সেই বৃক্ষতলে বিশ্রাম নেওয়া আশু প্রয়োজন ভিক্ষুশিষ্য আনন্দ সহযোগে রোগগ্রস্ত গৌতম বুদ্ধ প্রবেশ করলেন মল্লনরপতিদের শালবনে বৃক্ষতলের নির্মল ছায়ায় প্রাণে যদি একটু স্বস্তি মেলে বুদ্ধের বিশ্রামের জন্য আনন্দ দুটি শালবৃক্ষের মাঝে শয্যা প্রস্তুত করে দিলেন

সন্ন্যাসীর শয্যা অর্থাৎ এক খণ্ড গৈরিক বস্ত্র সেই শয্যাতেই পরিশ্রান্ত শরীর এলিয়ে দিলেন শাক্যসিংহ গৌতম বুদ্ধ চেতনা ক্রমেই অবশ হয়ে পড়ছে, নিশ্বাস ত্যাগ হচ্ছে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর বুদ্ধের শরীর ধীরে ধীরে শীতল হয়ে গেল এই কি তবে মৃত্যু? এই কি সেই জগতের চরম সত্য? এতদিনে মৃত্যুকে অনুভব করলেন সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের হল মহাপরিনির্বাণ

জাপান

“কোনবানওয়া! ড. তুসুকা নিসিকাওয়া।”

“কোনবানওয়া!” পিছন থেকে আসা শব্দ শুনে প্রত্যুত্তরে নরম গলায় ‘শুভ সন্ধ্যা’ জানিয়ে জাপানি ভদ্রলোক ঘুরে তাকালেন। একজন ছাই রঙের সুট পরা কোঁকড়ানো চুল, লম্বা, শক্তপোক্ত চেহারার ইউরোপিয়ান মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন হাসি হাসি মুখ নিয়ে। হাঁটা থামিয়ে ড. নিসিকাওয়া হেসে প্রশ্ন করলেন, “আমি কি আপনাকে চিনি?”

“না ড. নিসিকাওয়া, আপনি আমাকে চেনেন না। তবে একটি গুরুতর বিষয়ে আলোচনার জন্য আমি অনেক দূর থেকে এসেছি আপনার সঙ্গে দেখা করতে।”

“আচ্ছা! কোথা থেকে আসছেন আপনি?”

“মস্কো থেকে।”

“রাশিয়া! তা এত দূর থেকে জাপানে কী ব্যাপার?”

“সব বলছি আপনাকে। চলুন হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি।”

টোকিও থেকে প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে নারা অঞ্চলে ওসাকা বন্দরের কাছে টোডাইজি প্যাগোডা। এখানের প্রাচীন লাইব্রেরিতে ড. নিসিকাওয়া গত দু-বছর হল যাতায়াত শুরু করেছেন। এমনিতে তাঁর অবসর জীবনে তেমন কোনও কাজ নেই। কোনও উত্তেজনাও নেই। সেটা অবশ্য চাকরি জীবনেও ছিল না। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের বউদ্ধ-ইতিহাস পড়াতেন এক সময়। ইদানীং এই টোডাইজি প্যাগোডার উপর হঠাৎ করে আগ্রহ বেড়েছে তাঁর। লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ সারাজীবনের জন্য সাম্মানিক সদস্যপদ দিয়েছে তাঁকে। ৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট সোমুর তৈরি জাপানের প্রাচীন এই প্যাগোডাতে একটি সুপ্রচীন লাইব্রেরি রয়েছে। প্রচুর পুরোনো পুথি আর বইপত্রে ঠাসা। এই বইগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই ধর্মীয় সাধনাতত্ত্ব, বউদ্ধিকতায় মানসিক পরিবর্তন আর লামাদের জীবনদর্শন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অমরত্বের সন্ধানও রয়েছে কিছু পুথিতে। তবে এসবের মধ্যেও প্রাচীন ইতিহাস লুকিয়ে আছে। ড. নিসিকাওয়া ছাঁকনি দিয়ে সেগুলোই ছাঁকার চেষ্টা করছেন সুচতুরভাবে। ভারত থেকে তিব্বত হয়ে বউদ্ধধর্ম কীভাবে জাপানে পৌঁছেছিল, কয়েকশো বছরের সেই ইতিহাস আজও পরিষ্কারভাবে কেউ জানে না। যতটা জানে সেগুলো নিমজ্জিত শৈলখণ্ডের চূড়া মাত্র। ড. নিসিকাওয়া যত তথ্য সংগ্রহ করতে পারছেন সেগুলো ইংরাজিতে অনুবাদ করে রাখছেন। পরে সমস্ত অধ্যায়গুলো ঠিকঠাক জুড়তে পারলে একটা গবেষণাপত্র প্রকাশ করার ইচ্ছা রয়েছে। এজন্য তিনি বার দুয়েক ইন্ডিয়া, নেপাল আর একবার লাসাতেও ঘুরে এসেছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কাজটার মধ্যে বেশ উত্তেজনা টের পাচ্ছেন তিনি। গবেষণার কাজটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তাঁর। এমন একটি তথ্যের তিনি সন্ধান পেয়েছেন যেটা পুরো পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিতে পারে।

‘টোটো-এটো-এঞ্চি’ পার্কে লাল রঙের পাতাওয়ালা চেরি গাছের লম্বা সারি। মাঝে এঁকে-বেঁকে পাথর বসানো রাস্তা। সন্ধ্যার পর এই রাস্তা ধরে প্রায় প্রতিদিন হেঁটে ফেরেন ড. নিসিকাওয়া। ‘কিজি’ মানে সবজে ফেজেন্ট পাখির কিচিরমিচিরে এই পার্কের রাস্তাটা সরগরম থাকে এই সময়ে। অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলে উঠেছে সরু রাস্তার ধারে ধারে।

হাঁটতে হাঁটতে আগন্তুক গলাটা ঝেড়ে নিয়ে ইংরাজিতে কথোপকথন শুরু করল—

“ওকাকসমা, আমার নাম ভিক্তর বুধানস্কি। প্রফেসর নিকিতা চেরনভ আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। ওঁর অনেক বয়েস হয়েছে। তাই আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য এত দূর আসতে পারলেন না।”

একটু চমকে উঠে ড. নিসিকাওয়া মন্তব্য করলেন, “হোল্ড অ্যা মিনিট। আপনি কি সেই প্রফেসর চেরনভের কথা বলছেন যিনি বছর দশেক আগে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন?”

বুধানস্কি মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, তিনিই আমাকে পাঠিয়েছেন আপনার কাছে। একটি বিশেষ কারণে।”

“কী কারণ?”

“আপনি গত এক বছর ধরে বউদ্ধ ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন, তাই তো?”

“হ্যাঁ, বউদ্ধ ইতিহাসের একটা অংশ নিয়ে আমি কাজ করছি। কিন্তু এ-খবর তিনি জানলেন কী করে? এ-বিষয় তো আমার কাছের কয়েকজন ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ জানেন না।”

“তা আমি বলতে পারব না। তবে তিনি আপনাকে একটা মেসেজ পাঠিয়াছেন। কামি-নো-কোকোরো যদি আপনি খুঁজে পান তবে সেটা এখনও পর্যন্ত বিশ্বের ইতিহাসে উদ্ধার হওয়া সবথেকে উল্লেখযোগ্য এবং মূল্যবান আবিষ্কার হবে। তবে এই গোপন ঐতিহাসিক জিনিস নিয়ে কোনও খবর যেন সাধারণ মানুষ না জানতে পারে। এটা নিয়ে আপনি যেন ভুলেও কোনও প্রবন্ধ বা বইয়ে লেখালিখি না করেন, কিংবা কোনও ইন্টারভিউতে উল্লেখ না করেন।”

কথাটা শুনে কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলেন ড. নিসিকাওয়া। ঠোঁটটা কেঁপে উঠল—“কামি-নো-কোকোরো মানে ‘হার্ট অফ গড’। উনি কি মনে করেন সেটা সত্যি আছে?”

“নিশ্চয়ই আছে, ওকাকসমা। না-হলে প্রফেসার এত দূরে আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমাকে পাঠাতেন না। আপনি প্রাচীন বউদ্ধিক পুথিতে এর কথা নিশ্চয়ই পড়েছেন বা জেনেছেন অথবা জানবেন।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ড. নিসিকাওয়া উত্তর দিলেন, “না, আমি সেরকম কিছু জিনিসের সন্ধান এখনও পাইনি।”

“বেশ, কথাটা আমি বিশ্বাস করলাম। কিন্তু একটা তথ্য আমাদের কাছে আছে। সেটা জানিয়ে রাখি, মাত্র তিন মাস আগে আপনি ইন্ডিয়াতে গিয়েছিলেন। নর্থ ইন্ডিয়ার কুশিনগরে। সেখান থেকে নেপাল হয়ে লাসাতেও গিয়েছিলেন।”

ড. নিসিকাওয়ার চোয়ালটা একটু শক্ত হল—“তোমরা কি আমার পিছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছ?”

“সেটা আমি অস্বীকার করছি না। আসলে চব্বিশ ঘণ্টা, তিনশো পঁয়ষট্টি দিন কেউ না কেউ আপনাকে নজরে রাখছে। কারণ, আপনি যে-জিনিসটির খোঁজ করে চলেছেন সেটা শুধু ঐতিহাসিক নয়, একটা অলৌকিক দৈববস্তু। এককথায় অমূল্য।”

“মানে?”

বুধানস্কি বলল, “৪৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গৌতম বুদ্ধ আশি বছর বয়েসে কুশিনগরে মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন। তাঁর মৃতদেহ দাহ করার পরে সেই স্থানে একটি স্তূপ তৈরি করা হয়। কিন্তু তাঁরই এক শিষ্যের কথা থেকে জানা যায়, বুদ্ধের হৃদয় আগুনে দগ্ধ হয়নি। হৃদপিণ্ডটি একটি লাল পাথরে রূপান্তরিত হয়েছিল। যদিও এটা শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস হতে পারে। কিন্তু সেই স্থান থেকে একটি লাল পাথর পাওয়া গিয়েছিল। কয়েকজন শিষ্য সেই লাল পাথরটি ছাইভস্মের মধ্যে থেকে সংগ্রহ করে কাপড়ে মুড়ে নেপালের লুম্বিনি ও কপিলাবস্তু হয়ে ঝানঝুং প্রদেশে নিয়ে চলে যান। অর্থাৎ বর্তমান তিব্বতে। সেখানে হাজার বছরের বেশি সময় ধরে কোন গোপন স্থানে সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে ভগবানের হৃদয়টি সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে জিনিসটি সেখানে নেই। তাহলে কোথায় গেল? কে কবে সরাল?”

ড. নিসিকাওয়া মুচকি হেসে মন্তব্য করলেন, “তোমার গল্পটি বেশ আকর্ষণীয়, কিন্তু এর মধ্যে বাস্তব সত্য বিন্দুমাত্র নেই। তাছাড়া আমার গবেষণার বিষয়ও এটা নয়। সামনে আমার বাসা এসে গেছে। এবার আমি বিদায় নিচ্ছি।”

কথাটা শেষ করে তিনি হনহন করে ঢুকে গেলেন কম্পাউন্ডের মধ্যে।

ড. নিসিকাওয়া এখন যেখানে আছেন সেটি একটি রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স। এখানের সবক’টি বাড়ি একইরকম, প্রাচীন জাপানি শৈলীতে তৈরি ছোটো ছোটো দোতলা বাড়ি। কমপ্লেক্সের ভিতরে বাইরের অচেনা লোকের প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু লোকটা বলল, তাঁর উপর চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি করছে কেউ। সেটা কীভাবে করছে? গোপন ক্যামেরা লাগিয়েছে কি ওরা? কিন্তু সিকিউরিটির দৃষ্টি এড়িয়ে সেটা কীভাবে সম্ভব? তাঁর ব্যক্তিগত কাজের ঘর, বইপত্র, খাতা, ডায়েরি, ল্যাপটপ এসবের মধ্যে একমাত্র রিসার্চের খুঁটিনাটি থাকে। সেখানে পৌঁছাতে গেলে গোপন ক্যামেরা লাগাতে হবে অথবা তাঁর ল্যাপটপ হ্যাক করতে হবে। এগুলো করা খুব কি অসম্ভব? প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, ইন্টারনেটের লোক—এরা দরকার পড়লে বাড়িতে ঢোকে। কেউ মনে করলে এদের মাধ্যমেই গোপন ক্যামেরা লাগানো বা ইন্টারনেট হ্যাক করা সম্ভব। এসব ভাবতে ভাবতে তিন ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে তাঁর কাঠের বাড়ির দরজায় বায়োমেট্রিক লকে বুড়ো আঙুলটা ঠেকালেন। সামান্য আওয়াজ করে খুলে গেল দরজা। ভিতরে ঢুকে যখন দরজাটা বন্ধ করতে যাচ্ছেন, কমপ্লেক্সের গেটের বাইরে স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোয় দেখলেন সেই লম্বা লোকটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি সরাসরি এই বাড়ির দিকে।

ড. নিসিকাওয়া ড্রয়িং-রুমে ঢুকে মৃদু আলোটা জ্বাললেন। জাপানি রাইস ওয়াইন ‘সাকে’ একটি পাত্রে হাতে নিয়ে নরম সোফায় শরীরটা এলিয়ে দিলেন। একটা ছোটো চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করতে তাঁর মনে হল নিজের সমস্ত আত্মবিশ্বাস আর গোপনীয়তার সলিলসমাধি হয়েছে। আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে একান্ত নিজস্ব বলে আর কিছু থাকছে না। কোনও মানুষ চাইলেই অন্য মানুষের বসার ঘর, পড়ার ঘর, রান্নাঘর এমনকি শোয়ার ঘরেও উঁকি দিতে পারে। এই মুহূর্তে তিনি কী করছেন, কী পান করছেন—সবকিছুই হয়তো পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসে কোনও ব্যক্তি লক্ষ করে চলেছে। তারাই নিজেদের স্বার্থে ওঁর এতদিনের পরিশ্রম, মেধা, গবেষণা নিজেদের মতো করে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। কিছুক্ষণ আগে দেখা হওয়া বুধানস্কি অথবা প্রফেসর নিকিতা চেরনভ—এঁরাও যে নিজের ইচ্ছাতে সব কাজ করছেন এমনটা নয়। অনেক শক্তিশালী কেউ বা কারা রয়েছে এসবের পিছনে।

কিন্তু ড. নিসিকাওয়ার পক্ষে কি ওদের চোখে ধুলো দেওয়া সম্ভব? ভাবতে হবে। অনেকটা চিন্তা করতে হবে গভীরভাবে। তাঁর এতদিনের পরিশ্রম, স্বপ্ন—সর্বোপরি পৃথিবীর বিপুল সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ কোনও অচেনা অজানা স্বার্থান্বেষী মানুষের হাতে জীবিত অবস্থায় তুলে দিতে পারবেন না। আর এত সহজে তিনি হাল ছেড়ে দেবার পাত্রও নন।

পানীয়টা ধীরেসুস্থে শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে মাথার মধ্যে পরবর্তী ধাপগুলো পরপর সাজিয়ে নিলেন। রান্নাঘরে ঢুকে স্টিকি রাইস দিয়ে টুনা মাছের সাদা খিচুড়ি মাইক্রো-ওভেনে গরম করে এক বাটি খেয়ে নিলেন পেটভরে। তারপর সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে নিজের শোওয়ার ঘরে গিয়ে পোশাক পালটে খাটে উঠে গায়ে কম্বল-চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লেন।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রোজকার মতো নিজের হাতে ঘরের সমস্ত কাজ করলেন। সারা ঘর মোছা, রান্নাঘর পরিষ্কার, বাসন ধোয়া, রান্না করা, গাছে জল দেওয়া। তিনি অবিবাহিত। তাই এই সমস্ত কাজ তিনি নিজেই করে এসেছেন সারাজীবন। স্নান-খাওয়া সেরে বুদ্ধের মূর্তির সামনে একটা ধূপ জ্বেলে দিলেন। এরপর প্রথমে দুটো দৈনিক খবরের কাগজ খুঁটিয়ে পড়লেন। তারপর চুপ করে বসে অনেকক্ষণ ভাবলেন। একটা কবিতার বই হাতে নিয়ে তাঁর প্রিয় ‘সাকে’ একটু একটু করে পান পাত্রে ঢেলে চুমুক দিতে দিতে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লেন।

টোডাইজি থেকে ওসাকা বন্দর

শেষরাতে অন্ধকারের মধ্যে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন ড. নিসিকাওয়া। বালিশ আর কম্বল দুটো বিছানাতে এমনভাবে সাজিয়ে রাখলেন যাতে কেউ দেখলে ভাবে উনি ঘুমাচ্ছেন। ওয়ারড্রবের নীচে থেকে পুরোনো রঙচটা একটা ‘হাকামা’ বের করে পরে নিলেন। মাথায় একটা সামুরাই হ্যাট চাপালেন। একগোছা ইয়েন আর ছোটো ল্যাপটপটা পিঠের ব্যাগে দ্রুত পুরে নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়লেন বাড়ির পিছনের গেট দিয়ে। চারদিক নিস্তব্ধ আর অন্ধকার। কিছুটা ছাড়া ছাড়া পোস্টে আলো জ্বলছে। মৃদু হাওয়া চলার শব্দ। গাছের পাতা উড়ছে। চেসউডের মিষ্টি গন্ধ পেলেন নাকে। প্রফেসর চেষ্টা করছেন ম্যাপেল গাছের ছায়ার নীচে দিয়ে যতটা সম্ভব যাওয়ার। রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সের মূল গেটের দিকে না গিয়ে বাগানের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমদিকে এগোলেন। এদিকে পাঁচিল টপকালেই ওদিকের সরু রাস্তায় পৌঁছাতে পারবেন। পাঁচিলটা বেশ উঁচু। কিন্তু একটা ছাতার মতো গেরুয়া চেরি ব্লসম গাছ মোটা ডাল ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচিলের গা ঘেঁষে। প্রফেসর মর্নিং ওয়াকের সময় বহুবার লক্ষ করেছেন গাছটাকে। অন্ধকারের মধ্যে সেই গাছটাই খোঁজার চেষ্টা করছেন। এদিকের বাগানটা অনেকটা চওড়া। কয়েকটা রাতচরা পাখির ডাক কানে আসছে। দ্রুত পায়ে এগোলেন প্রফেসর।

গাছটাকে খুঁজে পেতে মনে আনন্দ হল। এই বয়সে সোজা কোনও গাছে ওঠা তাঁর পক্ষে বেশ কষ্টকর। কিন্তু এই গাছটা মাটি থেকেই এমন বেড় খেয়ে উঠেছে যে তাঁর কষ্ট অনেকটা লাঘব হল। খুব সহজেই তিনি গাছের ডাল বেয়ে পাঁচিল টপকে লাফ দিয়ে রাস্তায় এসে পড়লেন। হাঁটুতে সামান্য চোট লেগেছে বটে, তবে আত্মবিশ্বাসটা ফিরে পাচ্ছেন তিনি। আপাতত লোকগুলোর অদৃশ্য চোখে কিছুটা হলেও ধুলো দিয়ে এক পা এগিয়ে তিনি। সাহো নদীর দিকে সোজা রাস্তা ধরে বেশ জোরে হাঁটতে শুরু করলেন প্রফেসর। হাতঘড়িতে দেখলেন রাত তিনটে পনেরো।

টোডাজি একটা ছোট্ট শান্ত শহর। এই শেষরাতে কোনও জনপ্রাণী রাস্তায় নেই। এটাই যদি টোকিও, ওকোহামা, নাগোয়া কিংবা ওসাকা হত তাহলে ভালোরকম লোক থাকত বাইরে। ওখানে রাতেও অনেক মানুষ জেগে থাকে। রাস্তাটা সোজা গিয়ে সাহো নদীর উপর ব্রিজে উঠে গেছে। তিনিও হাঁটতে হাঁটতে ব্রিজে উঠে পড়লেন। ব্রিজের মাঝামাঝি পৌঁছাতে পিছন থেকে একটা চার চাকা গাড়ির আলো এসে পড়ল তাঁর উপর। এদিকেই আসছে। প্রথমে কিছুটা ভয় পেলেন প্রফেসর। ভাবলেন এত কিছু করেও ওই লোকগুলোর হাত থেকে কি পার পাওয়া সম্ভব হল না? তবে মনে হয় না এখুনি ওরা বুঝতে পারবে। কিছুক্ষণ পরে ওরা জানতে পারবেই, যে ড. নিসিকাওয়া তাঁর ঘরে নেই। তবে সেই সময়ের মধ্যে যতটা সম্ভব দূরে চলে যেতে হবে গা-ঢাকা দিয়ে। তাঁর পথে কোনও ডিজিটাল ফুট প্রিন্ট যাতে না থাকে সেজন্য নিজের ক্রেডিট কার্ড, ফোন কিছুই সঙ্গে আনেননি। এখন দরকার অনেকটা সাহস আর ধৈর্য।

পিছনের গাড়িটা প্রফেসরের পাশে আসার আগেই হাত দেখালেন তিনি। ফলে তাঁর সামনে এসে গাড়িটা থেমে গেল। কোনও মানুষ সাহায্য চাইলে জাপানিরা ‘না’ বলতে পারে না। প্রফেসর লক্ষ করলেন, এটা মালপত্র নিয়ে যাওয়ার গাড়ি। মনে হয় ভোর হওয়ার আগেই কাজের জন্য ছুটেছে। তিনি বিনয়ের সঙ্গে ড্রাইভারের কাছে লিফট চাইলেন—“আমি ওসাকা যাব। আপনি কি নামিয়ে দিতে পারেন?”

হাসিমুখে ড্রাইভার মাথা নাড়তে পাশের সিটেই উঠে পড়লেন তিনি। ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত ছুটছে গাড়ি। জানালা দিয়ে ফুরফুর করে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে। প্রায় নাক-বরাবর সোজা রাস্তা। আনুমানিক মিনিট পঁয়তাল্লিশ লাগবে ওসাকা পৌঁছাতে। ওসাকা জাপানের একটা গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর। টোডাজির মতো শান্ত নিরিবিলি নয়। ঘনবসতিপূর্ণ জমজমাট জায়গা। ওসাকাতে তাঁর ছোটোবেলার এক বন্ধু থাকে। নাম তাকুমি। বহুবছর হল তার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই যদিও। তবুও স্কুলের বন্ধু নিশ্চয়ই তাঁকে সাহায্য করতে পিছপা হবে না। গাড়ির হাওয়ায় ঘুম জড়িয়ে ধরছে চোখে। ঝিমুনি আসছে। সারারাত ঘুম হয়নি ড. নিসিকাওয়ার। যদিও বিছানায় শুয়ে ছিলেন চুপ করে। মনের মধ্যে ছক কষছিলেন কীভাবে সবার অলক্ষ্যে দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া যায়। তাঁর নিজের পাসপোর্টে বেরোতে গেলে ওরা নিশ্চয়ই অনুসরণ করবে এবং যেখানে যাবেন সেখানেও নিশ্চিন্তে মানুষজনের সঙ্গে দেখা করা বা কাজ করার গোপনীয়তা থাকবে না। তাই বেনামে সবার অলক্ষ্যেই পালাতে হবে তাঁকে। রুট প্ল্যান মনে মনে তৈরি করে নিয়েছেন। কিন্তু অনিশ্চয়তা প্রতিমুহূর্তে তাঁর পথের প্রতিটা বাঁকে অপেক্ষা করবে, এ-বিষয়ে তিনি নিশ্চিত।

“ওকাকসমা, আপনি কোথায় নামবেন?”

ড্রাইভারের গলা শুনে ঝিমুনি ভেঙে সোজা হয়ে বসলেন ড. নিসিকাওয়া। তাকিয়ে দেখলেন চারপাশে বড়ো বড়ো বিল্ডিং। তার মানে শহরে ঢুকে গেছে গাড়ি। গলা ঝেড়ে নিয়ে প্রফেসর বললেন, “তুসুটেনকাকু টাওয়ারের কাছে যাব আমি।”

“তাহলে আপনাকে ওসাকা প্রাসাদের পরের মোড়ে নামিয়ে দিতে পারি। ওখান থেকে দু-মিনিট হাঁটাপথ। আশা করি আপনার কোনও অসুবিধা হবে না। আমাকে টাওয়ারের উলটোদিকে যেতে হবে।”

“কোনও সমস্যা নেই। ও-রাস্তা আমার চেনা। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।” বলে কিছু ইয়েন ড্রাইভারের দিকে এগিয়ে দিলেন প্রফেসর।

ড্রাইভার মাথা নীচু করে ধন্যবাদ জানাল—“অ্যারিগাতো!”

গাড়ি থেকে নেমে প্রফেসর ধীর গতিতে এগিয়ে চললেন তুসুটেনকাকু টাওয়ারের দিকে। এটি প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের মতোই পুরো স্টিলের তৈরি জাপানের বিখ্যাত একটি মনুমেন্ট এবং টুরিস্ট স্পট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে নতুন করে তৈরি করা হয়। তুসুটেনকাকু টাওয়ারের কাছে ড. নিসিকাওয়ার ছোটোবেলার বন্ধু তাকুমির একটা রেস্তোরাঁ আছে। সেটার নাম সম্ভবত ‘কোকোনচি’। তাকুমির মুখেই শোনা। ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় প্রফেসর ঠিক খুঁজে বের করলেন তাঁর বন্ধুর রেস্তোরাঁ। পোস্টার দেখে বুঝলেন এখানে আইসক্রিম, পেস্ট্রি, স্ন্যাক্স-সহ আরও অনেক কিছুই পাওয়া যায়। তবে দোকানটা এখনও খোলেনি। টাওয়ারের কাছে ফিরে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করলেন কয়েক ঘণ্টা। শুধু মনে হচ্ছে কেউ বুঝি তাঁকে অনুসরণ করছে। হয়তো লক্ষ করছে দূর থেকে। এটা তাঁর মনের ভুলও হতে পারে। ভোরের আলো ফুটছে চারদিকে। লোকজনের সংখ্যা বাড়ছে। তিনি চুপ করে বসে রইলেন একজায়গাতে।

প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পরে রেস্তোরাঁর দরজা খুলল। বন্ধুর দেখা পেলেন আরও দু-ঘণ্টা পর। বহুবছর পরে দেখা। আনন্দে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরলেন দুজনে। প্রফেসর যে রিটায়ার করার পর টোডিজিতে আছেন সে-খবর তাকুমির কাছে ছিল না। তিনি বন্ধুকে অ্যান্টি-চেম্বারে নিয়ে গিয়ে সব শুনলেন। তারপর জানতে চাইলেন, “আমার পক্ষে যা করা সম্ভব তোমার জন্য সবকিছু করতে রাজি আছি। কী ধরনের সাহায্য চাই তোমার?”

প্রফেসর জানালেন, “আমি যেভাবেই হোক এখান থেকে বেরোতে চাই। কিন্তু নিজের পাসপোর্ট, ব্যাংকের কার্ড, ফোন এসব কিছুই ব্যবহার করতে পারব না। অন্য নামে ছদ্মবেশে আমাকে পালাতে হবে।”

“হুম! কিন্তু পালিয়ে তুমি কোথায় যাবে?”

“ইন্ডিয়া।”

“সেখানে কী আছে?”

আমি যে তথ্যগুলো নিয়ে গবেষণা করছি, তা থেকে একটা বিষয় পরিস্কার, যে কামি-নো-কোকোরো মানে হার্ট অফ গড যদি কোথাও থাকে তাহলে সেটা ভারতেই কোথাও রয়েছে। যদিও আরও অনেকগুলো সূত্র মেলাতে বাকি। এই কাজে প্রফেসর সুন্দর সুব্রহ্মনিয়ম আর প্রফেসর পেট্রিয়া কেলভিনকে আমার লাগবে। আমি দুটো চিঠি লিখে দিচ্ছি, এঁদের দুজনের ঠিকানায় পাঠিয়ে দাও—একটা বেঙ্গালুরু ইউনিভার্সিটি আর একটা অক্সফোর্ড।”

“বেশ। তুমি আজকের দিনটা আমার ফ্ল্যাটেই থাকো। আমার এক ভাই আছে, তার ফিশিং ব্যাবসা। মাছধরা ট্রলার আছে অনেকগুলো। ওর সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে হবে। আজকে রাতের মধ্যেই ওসাকা সাগর পেরিয়ে কোনও ফিশিং আইল্যান্ডে তোমাকে পাঠিয়ে দেব। সেখানে চুপচাপ ক’দিন পড়ে থাকো। তার মধ্যে আমি ডুপ্লিকেট পাসপোর্ট তৈরি করতে দিচ্ছি। সেরকম লোক আছে আমার হাতে।”

“অ্যারিগাতো!”

“ছোটোবেলার বন্ধুকে ধন্যবাদ দিতে হবে না। আমি জানি তুমি খুব বড়ো কিছু করতে চলেছ।”

কলকাতা

ফিজিক্সের প্র্যাক্টিকাল ক্লাস শেষের পর ঋষি বলল, “চল, ক্যান্টিনে গিয়ে বসা যাক। খিদে পাচ্ছে।”

ঋষির মুখে খাওয়ার কথা শুনলেই মিতুলের হাসি পায়। সারাদিনে প্রায় সর্বক্ষণ ওর মুখ চলে। তেমনি ওর দশাসই চেহারা। আবার ক্যারাটেতে ব্ল্যাকবেল্ট। তাই কলেজে সবাই ওকে সমীহ করে চলে। কিন্তু ওর মনটা বড়ো ভালো।

লম্বা করিডোর পেরিয়ে ঋষি, মিতুল আর অভি ক্যান্টিনে ঢুকে এগিয়ে গেল কোণের টেবিলের দিকে। ফাঁকা থাকলে এই টেবিলটাই ওদের পছন্দের। টেবিলের পিছনেই বড়ো জানালা। জানালা দিয়ে দেখা যায় গাছপালায় মোড়া পুকুর। পাখিরা এসে কিচিরমিচির করে জানালার পাশে। চেঁচামেচি আর হই-হট্টগোলের মাঝে কোণের টেবিলটাই কিছুটা নিরিবিলি।

অভি চোখের ইশারা করে বলল, “ওটা সোম মনে হচ্ছে। টেবিলে ওরকম মাথা নীচু করে বসে আছে কেন?”

ঋষি মন্তব্য করল, “ও তো ক’দিন হল কলেজেও আসেনি।”

মিতুল কোঁকড়ানো চুল ঝাঁকিয়ে দুষ্টু হেসে উত্তর দিল, “ওর নতুন গার্লফ্রেন্ড মনে হয় ডিচ করেছে।”

টেবিলের অন্য চেয়ারগুলো ফাঁকাই ছিল। অভি কাছে এসে সোমের পিঠ চাপড়ে দিল, “হাই ব্রো! কী খবর? কলেজে আসছিস না কেন?”

সোম টেবিল থেকে মাথা তুলল। চোখ-মুখ থমথম করছে, চুলগুলো উসকোখুসকো। অভির গলায় বিস্ময়—“কী হয়েছে তোর?”

সোম মাথা তুলে ঢোঁক গিলে উত্তর দিল, “ছোটোদাদুকে তিনদিন হল খুঁজে পাচ্ছি না।”

“মানে! কী বলছিস?”

“তোর দাদু তো আর বাচ্চা ছেলে নয়! কোথাও গেছেন নিশ্চয়ই। চলে আসবেন।”

“না, সেরকম নয়। আমাদের ধারণা, ওঁকে কেউ কিডন্যাপ করেছে।”

“হঠাৎ এরকম মনে হল কেন?”

“কিছুদিন আগে একটা ফোন এসেছিল। তারপর থেকেই উনি গুম খেয়ে গিয়েছিলেন। আবার ক’দিন আগে বাড়িতে চোর ঢুকেছিল।”

“কী চুরি হয়েছে?”

“কিছু চুরি হয়েছে কি না জানি না। ছোটোদাদুই বললেন, রাতে নাকি ওঁর ঘরে চোর ঢুকেছিল। তারপরে হঠাৎ করে গুটিয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে। সবার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।”

সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর মিতুল জিজ্ঞেস করল, “ওঁর কি অ্যালঝাইমার আছে?”

সোমকে ঘিরে ওরা চেয়ারে বসে পড়ল তিনজন।

“না, অ্যালঝাইমার নেই।”

“বয়স কত হবে?”

সোম ভেজা গলায় উত্তর দিল, “ষাটের উপরে। তবে এখনও বেশ ফিট। প্রতিদিন সকালে মর্নিং ওয়াকে যান। তেমন কোনও ক্রনিক রোগও নেই।”

“তাহলে?”

“সেটাই তো অবাক কাণ্ড। আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।”

“পুলিশে কমপ্লেন করেছিস?”

“হ্যাঁ, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই করা হয়েছে।”

“কোন থানা?”

“বালিগঞ্জ। শুধুমাত্র তোদের সঙ্গে দেখা করার জন্যই আজকে কলেজে এসেছি বুঝলি।” একটু থেমে সোম আবার বলল, “আসলে পুলিশ তো কিছু খোঁজ পাচ্ছে না। মনে হয় তেমনভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না কেসটাতে। সেজন্য আমরা খুবই চিন্তিত ব্যাপারটা নিয়ে। ছোটোদাদু খুবই ভালো মানুষ। কারোর সঙ্গে শত্রুতা নেই। সবাই খুব ভালোবাসেন ওঁকে। অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন সরকারি স্কুলে। অল্প বয়সে পাহাড়ে চড়ার শখ ছিল খুব। রিটায়ার করার পর বাড়িতে দু-একটা টিউশন করতেন আগে। এখন সেটাও ছেড়ে দিয়েছেন। তবে বই পড়ার ঝোঁক ছিল অনেক। ঘরে শুধু বই ভর্তি।”

মিতুল বলল, “হ্যাঁ, গতবার তোদের বাড়িতে যখন গিয়েছিলাম, ওঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ।”

কিছুক্ষণের জন্য সবাই চুপ করে রইল। সোম জানতে চাইল, “কলেজের ছুটি পড়ার আগে নোটসগুলো আমাকে দিবি ভাই? প্র্যাক্টিক্যালগুলো আমার করা হল না। জে.বি. নম্বর কেটে নেবে।”

“নোটস নিয়ে ভাবিস না। চল তাহলে তোদের বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসি।” মিতুলের কথায় সবাই রাজি।

কলেজ থেকে বেরিয়ে রাস্তার মোড়ে এসে একটা পাবলিক বাসে উঠে পড়ল। আধ ঘণ্টার মধ্যেই বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে এসে নেমে গেল ওরা। তারপর হাঁটতে শুরু করল বাঁদিকের রাস্তাটা দিয়ে। দুটো ক্রসিং পেরিয়ে ডানদিকের গলির মুখে তিনতলা পুরোনো দিনের বড়ো বাড়ি।

সোম জানাল, “আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলি। দাদুরা দুই ভাই। সব ক’জন বাবা, কাকা, জ্যাঠা মিলিয়ে আমরা পনেরো জন থাকি এই বাড়িতে। আস্তিকদাদুকে ছোটোদাদু বলে ডাকে সবাই। বড়ো দাদুর নব্বইয়ের গোড়ায় বয়স। ঘর থেকে বেরোন না।”

বাড়িতে যাঁরা ছিলেন, সবার সঙ্গে কথা বলে ওরা দোতলাতে ছোটোদাদুর ঘরে পৌঁছাল। ঘরে ঢুকে সামনে দেয়ালজোড়া বিশাল বইয়ের তাকটাই চোখে পড়ল সবার আগে। টেবিলে, খাটের কোণে, চেয়ারের উপরেও অনেক বই রাখা আছে। মিতুল এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইল, “কী ধরনের বই পড়তেন ইদানীং? গল্প-উপন্যাস?”

“সবরকম। ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য, বিজ্ঞান। কিছুই বাদ নেই। ইদানীং তিব্বতের উপর কিছু বই পড়ছিলেন।”

টেবিলের উপরেই পড়ে আছে পাহাড়ে এক্সপিডিশন, বউদ্ধধর্ম, গৌতম বুদ্ধের জীবনী, নেপাল আর তিব্বতের উপর লেখা বেশ কিছু পুরোনো ইংরাজি ও বাংলা বই। সেগুলো কিছুক্ষণ উলটেপালটে দেখল মিতুল। অনেকগুলো পাতায় বেশ কিছু লাইনে আন্ডার লাইন করে পাশে পেন্সিল দিয়ে ছোটো হরফে নোট লিখে রেখেছেন। চোখ কাছে নিয়ে গিয়ে নোটগুলো পড়ার চেষ্টা করল। তারপর মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল, “উনি কি বুদ্ধের জীবনী নিয়ে কোনও রিসার্চ করছিলেন?”

সোম একটু ভেবে উত্তর দিল, “তা জানি না। তবে ছোটোদাদু একটা ডায়েরিতে নোট করতেন বই পড়ার সময়।”

“সেই ডায়েরিটা কোথায়?”

“এখানেই ছিল। টেবিলের উপর।”

কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ ধরে খুঁজেও সেই ডায়েরিটা পেল না সোম। মাথা নেড়ে বলল, “তাহলে হয়তো ছোটোদাদু ডায়েরিটা সঙ্গে নিয়েই বেরিয়েছেন।”

“আচ্ছা। সঙ্গে আর কিছু নিয়েছেন? জামাকাপড়, টাকাপয়সা?”

“না, কিচ্ছু নেননি। সকালে বাড়িতে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছিলেন। আমরা ভাবলাম দুপুরে এসে ভাত খাবেন। দুপুরে ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে মা ওঁকে ফোন করল। কিন্তু দেখে ফোন বন্ধ। ফোন তো অনেক কারণে বন্ধ হতে পারে। অনেক সময় চার্জ শেষ হয়ে যায়। ফোন হারিয়েও যেতে পারে। উনি পুরোনো দিনের সুইচ টেপা ফোন ব্যবহার করতেন। রাত পর্যন্ত যখন ফিরলেন না, কাছাকাছি সব আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, চেনাশোনা সবার বাড়িতে ফোন করা হল। তারপর মাঝরাতে থানায় গিয়ে ডায়েরি করা হল।”

“সেটা ক’দিন আগে?”

“এই তো গত পরশু বুধবার ঘটেছে ঘটনাটা। জলজ্যান্ত একটা সুস্থ মানুষ বাড়ি থেকে দুম করে গায়েব হয়ে গেলে মনের অবস্থা কী হয় তোরাই বল!”

মিতুল জিজ্ঞেস করল, “পুলিশ ফোনের লাস্ট লোকেশন কিছু বলতে পারেনি?”

“বলেছে। বাবার এক বন্ধু লালবাজারে আছেন। তাঁকে দিয়ে রিকোয়েস্ট করতে জানা গেল ফোনের লাস্ট লোকেশন কলেজ স্ট্রিট।”

“কলেজ স্ট্রিট!” কথাটা শুনে সবাই চমকে উঠল।

“হ্যাঁ, উনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে কলেজ স্ট্রিটেই গিয়েছিলেন। সম্ভবত কোনও বইয়ের খোঁজ করতে। কলেজ স্ট্রিটে পুরোনো সেকেন্ড হ্যান্ড বই বিক্রি করে অনেক দোকান। তাদের কাছ থেকে উনি আগেও বই কিনেছেন।”

ঋষি জানতে চাইল, “কোন কোন দোকান থেকে বই কিনতেন? তুই জানিস না?”

“না, কারণ সেকেন্ড হ্যান্ড বইয়ের জন্য ওরা কোনও বিল দিত না। তাই কোন দোকান থেকে কিনতেন সেটা বোঝা খুব মুশকিল।”

“হুম!” মিতুল মন্তব্য করল, “আমি কয়েকটা বইয়ের দোকান চিনি কলেজ স্কোয়ারের পাশে মহাবোধি সোসাইটির উলটোদিকে, ওখানে শুধু পুরোনো বই বিক্রি হয়। এছাড়া ক্যালকাটা মেডিক্যালের পাশেও আছে কয়েকজন, রাস্তায় ঢেলে বিক্রি করে।”

হঠাৎ দোতলার কোণের ঘর থেকে ঝনঝন করে একটা বাসন পড়ার শব্দ এল।

“কী হল?”

“বড়ো দাদু মনে হয় আবার ক্ষেপে গেছেন!”

“কেন?”

“ওঁর একটু মাথার ব্যামো আছে। হঠাৎ হঠাৎ রেগে যান। মাঝে-মাঝেই কাউকে চিনতে পারেন না। উনি ছোটো ভাইকে খুব ভালোবাসতেন। ক’দিন হল তাঁকেও দেখতে পাচ্ছেন না তাই খুব রেগে আছেন।”

মিতুল বলল, “বড়ো দাদুর সঙ্গে একবার কথা বলা যায়?”

অভি বলল, “পাগল নাকি! যদি কিছু ছুড়ে মারে?”

“ছুড়ে মারলে তোরা লুফে নিবি। ক্রিকেট খেলায় তো খুব নাম হয়েছে তোদের। চ, একবার কথা বলে দেখি বড়ো দাদুর সঙ্গে।”

ওরা চারজনে গুটি গুটি পায়ে গিয়ে দাঁড়াল বড়ো দাদুর ঘরের সামনে। ভিতরটা অন্ধকার। কিছুক্ষণ আগে চায়ের গ্লাস ছুড়েছেন পরিচারিকার দিকে। সেগুলো মুছে পরিষ্কার করে সরে গেলেন মহিলা। সোম ঘরে ঢুকে আলো জ্বালল। বৃদ্ধ মানুষ খাটের উপর হেলান দিয়ে বসে আছেন। পরনে লুঙ্গি আর গোল গলা গেঞ্জি। চোখে আলো লাগতে মুখ তুলে তাকালেন, “কে?”

“আমি সোম, দাদু!”

“অ, সোম! আয়, এদিকে আয়। কেমন আছিস?”

“ভালো আছি দাদু, তুমি কেমন আছো? চায়ের গ্লাস অমন ছুড়ে দিলে কেন? যদি কাজের মাসির লেগে যেত?”

“তা ওরকম বাজে চা করে কেন? চিনি নেই, নুন নেই, তেতো হাকুচ। ওরকম বিচ্ছিরি চা আমি খাই না।”

“ডাক্তার চিনি খেতে বারণ করেছে। তোমার তো হাই সুগার!”

“চিনি ছাড়া চা খাওয়া যায়? তোর পিছনে ওরা কারা?”

“আমার কলেজের বন্ধু। তোমার সঙ্গে কথা বলবে বলে এসেছে।”

“আমার কথা বলবে? কেন, আমার সঙ্গে তো কেউ কথা বলে না।”

মিতুল এগিয়ে গিয়ে ঢিপ করে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে নিল, “আমরা আপনার সঙ্গে গল্প করব বলে এলাম।”

“গল্প করবে? বাহ্‌! খুব ভালো। বসো, তোমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসো আমার চারপাশে। এখন তো আর কেউ গল্প শুনতে আসে না। আগে আসত। তখন মোবাইল ছিল না, টিভি ছিল না। অনেকে আসত গল্প শুনতে। তা কী গল্প শুনবে তোমরা বলো?”

মিতুল বলে উঠল, “আপনার কোন গল্প বলতে বেশি ভালো লাগে?”

“আমার? রিয়েল হিরোদের গল্প আমার খুব ভালো লাগে।”

“যেমন?”

“বাঘাযতীন। মানে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। বুড়িবালামের তীরে তিনশো ইংরেজ সৈন্যের সঙ্গে পাঁচজন বাঙালি বীর বিপ্লবীর যুদ্ধ। সে-কাহিনি জানো তোমরা? আচ্ছা, তোমরা সত্য গুপ্ত, দেবেশ, শৈবাল এদেরকে চেনো? ওরা মার্টিন হগকে গুলি করে মেরেছিল। কোনটা শুনবে তোমরা?”

মিতুল দুম করে জানতে চাইল, “আপনার ভাই আস্তিকবাবু কোথায় গেছেন জানেন আপনি?”

“কোথায় গেছে? তা বলে যায়নি আমাকে। তবে ও দেবেশ আর শৈবালকে চিনত। বলেছিল আমাকে। আর জিজ্ঞেস করছিল তাসিহুনপোতে কীভাবে যাওয়া যায়। ও তো পাহাড়ে চড়তে ভালোবাসে। আগে ও খুব পাহাড়ে যেত জানো? আবার মনে হয় পাহাড়েই গেছে। পাহাড় ওকে টানে। আমি ওকে তিব্বতের উপর লেখা একটা বই দিয়েছিলাম। সেটা আর ফেরত দিল না। বইটা নরেনদা আমাকে দিয়েছিল পড়তে। তখন সমিতিতে আমি যেতাম।” বলে বড়ো দাদু চুপ করে গেলেন। তারপর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মাথার উপরে ঘুরতে থাকা পাখাটার দিকে।

সোম ইশারা করতে ওরা চারজনেই পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

সোম বলল, “বড়ো দাদু কখন যে বর্তমানে থাকে আর কখন স্বাধীনতার আগে চলে যায়, বোঝা মুশকিল।”

বারান্দায় এসে ঋষি জিজ্ঞেস করল, “এবার?”

হাঁটতে হাঁটতে ওরা বাইরে এসে পার্কের সামনে দাঁড়াল। মিতুল চশমাটা তুলে বলল, “ছোটো দাদুর হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে কোনও একটা গভীর রহস্য আছে, বুঝলি। আমি সেই রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। খুব জোরালো গন্ধ।”

সোম জানতে চাইল, “কিছু বুঝতে পারলি তুই? কোথায় যেতে পারে?”

“কলেজ স্ট্রিট!” চেঁচিয়ে উঠল মিতুল।

“মানে?”

“ওই বাসটা কলেজ স্ট্রিট যাচ্ছে। চ, দৌড় সবাই মিলে।”

হুড়মুড় করে দৌড়ে চারজনেই ছুটন্ত বাসের হ্যান্ডেল ধরে উঠে পড়ল বাসটাতে। ঋষি হাঁপাতে হাঁপাতে বাকিদের শোনাল—“আমার কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে। তখন ক্যান্টিনে কিছু খাওয়া হয়নি।”

অভি জিজ্ঞেস করল, “আবার কলেজ স্ট্রিটে কেন যাচ্ছি আমরা?”

মিতুল চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “ঋষির খাবারের গন্ধ আর ছোটো দাদুর অন্তর্ধান রহস্যের গন্ধ—সব মিশে এক হয়ে গেছে। দুটোই পাওয়া যাবে কলেজ স্ট্রিটে। চল, মনে হচ্ছে নিরাশ হতে হবে না।”

বাস থেকে নেমেই ঋষি একটা রেস্তোরাঁয় দৌড়াল। সেখানে সবাই মিলে ভালো করে পেটপুজো সেরে নিয়ে মিতুলের কথায় কাজে লেগে পড়ল সবাই মিলে। তখন দিনের আলো ফুরিয়ে গেছে। সন্ধ্যা নামছে কলেজ স্কোয়ারের জলে। শাড়ির দোকানের রঙিন আলোয় সেল লেগেছে। পুরোনো বই বিক্রেতাদের খোঁজ শুরু হল গোটা কলেজ স্ট্রিট জুড়ে। প্রায় ঘণ্টা দেড়েকের চেষ্টায় অনেকগুলো দোকানে ঢুঁ মেরে একটা গলির ভিতর অতীনদার দোকানটা খুঁজে পাওয়া গেল।

“দাদা, আপনি আস্তিক দত্তকে চেনেন? আপনার দোকানে মাঝে মাঝে আসতেন পুরোনো ইতিহাসের বই কিনতে।”

একজন মাঝবয়সি লোক হাফ হাতা পাঞ্জাবি পরে টিমটিমে আলোর নীচে বসে ছিলেন বইয়ের স্তূপের পিছনে, “আমার দোকানে যত খদ্দের আসে সবাইকে চিনে রাখা সম্ভব নয়।”

“এই ছবিটা দেখুন।” সোম মোবাইলে ছোটো দাদুর একটা ছবি বের করে দেখাল।

নাক কুঁচকে ভদ্রলোক ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে জানালেন, “অ! এ তো চুনিদা। গত সপ্তাহে বুদ্ধদেবের শেষ যাত্রার উপর একটা ঝুরঝুরে ইংরাজি বই নিয়ে গেলেন আমার কাছ থেকে।”

“আচ্ছা, ওঁকে তিনদিন হল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা সেজন্য একটু খোঁজখবর করছি।”

“সে কী! কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাবে না কেন?” টাকে চুলকে নিয়ে তিনি আবার বললেন, “ওঁর পাহাড়ে যাবার কথা ছিল অবনীশবাবুর সঙ্গে। কিন্তু সে তো ফাইনাল হয়নি। হলে আমি জানতাম। এবারে আমারও যাবার কথা ছিল।”

“অবনীশবাবু কে?”

“প্রফেসর অবনীশ সেন, মঙ্গলের দোকানে আড্ডা মারতে আসেন প্রতি শনিবার। চুনিদাও আসত ওখানে। অবনীশবাবুর ফোন নম্বর মঙ্গলের কাছে আছে। কথা বলে দেখুন তো, আমাকে ফাঁকি দিয়ে ওরা দুজনেই পাহাড়ে চলে গেল কি না।”

“মঙ্গলের দোকান কোনটা?”

“ওই তো ইউনিভার্সিটি বিল্ডিংয়ের পিছনে, কালীদার বইয়ের দোকানের পাশে।”

“ধন্যবাদ দাদা।” বলে ওরা দৌড়াল সবাই।

***

মঙ্গলের দোকানে মঙ্গলকে খুঁজে পাওয়া গেল। কিন্তু গরম গরম শিঙাড়া আর চায়ের লম্বা লাইন। সবাইকেই আগে দিতে হবে। ওই ঝুড়ির গরম শিঙাড়া শেষ হয়ে গেলে মনে হয় পৃথিবীতে খাবার আর থাকবে না। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেদের এমনই মনোভাব। ঝুড়ি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সত্যি-সত্যিই ওদের এককোণে দাঁড়িয়ে থাকতে হল। ঋষি অবশ্য ধাক্কাধাক্কি করে চারটে জাম্বো সাইজের শিঙাড়া জোগাড় করে এনেছে। ঝুড়ি শেষ হতে ভিড়টা একটু পাতলা হল। মিতুল এগিয়ে গিয়ে অনুরোধ করল—“দাদা, প্রফেসর অবনীশ সেনের ফোন নম্বরটা আমাদের খুব দরকার। দেবেন প্লিজ!”

মিষ্টি কথায় কাজ হল। অবনীশবাবুর ফোন নম্বরটা পাওয়া গেল শেষ পর্যন্ত।

একটু ফাঁকা জায়গাতে এসে মিতুল ডায়াল করল নম্বরটা।

“হ্যালো!”

“হ্যালো স্যার, আমি আস্তিক দত্তর বাড়ির লোক বলছি। ওঁকে…”

কান থেকে ফোন নামিয়ে নিল মিতুল।

সোম জিজ্ঞেস করল, “কী হল?”

“ভদ্রলোক ফোন কেটে দিলেন।”

অভি মন্তব্য করল, “হয়তো কোনও কারণে ফোন কেটে গেছে। আর একবার ডায়াল কর।”

আবার ডায়াল করতে দেখা গেল ফোন সুইচড অফ।

“সে কি রে! ফোন বন্ধ করে দিল? গড়বড় লাগছে।”

মিতুল বলল, “চল, ওঁর বাড়ি যাই।”

“এত রাতে?”

“কোথায় রাত? সবে আটটা বাজে।”

“কিন্তু ওঁর বাড়ির ঠিকানা কীভাবে পাব?”

“ও তো আমার বাঁয়ে হাত কা খেল।” বলে মিতুল অন্য একটা নম্বর ডায়াল করল, “হ্যাঁ, রণজিৎদা, আমি মিতুল বলছি, ফিজিক্স সেকেন্ড ইয়ার। … হ্যাঁ, বলছি তুমি প্রফেসর অবনীশ সেনের নাম শুনেছ? হিস্ট্রি পড়ান। কোন কলেজ বলতে পারব না। তবে ওঁর ঠিকানাটা আমার লাগবে। এখুনি … খুব আর্জেন্ট … তুমি চেষ্টা করলে ঠিক পারবে। প্লিজ একটু দেখো।”

“রণজিৎদা মানে, আমাদের কলেজের জি.এস.?” বিস্ময় নিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল ঋষি।

মিতুল দন্ত বিকশিত করে উপর-নীচে মাথা নাড়ল।

হোয়াটস-অ্যাপে মেসেজ ঢুকল ঠিক দু-মিনিটের মাথায়, ‘অবনীশ সেন, সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক, বাড়ির ঠিকানা, আনন্দনগর, ১৯/২ মহেন্দ্র ব্যানার্জী লেন, বেহালা।’

মেসেজটাতে চোখ বুলিয়ে মিতুল চেঁচিয়ে উঠল, “চল চল, একটা ট্যাক্সি ধর। বেহালা যেতে হবে।”

সন্ধ্যার জ্যাম কাটিয়ে কলেজ স্ট্রিট থেকে বেহালা পৌঁছাতে এক ঘণ্টা পনেরো মিনিট লেগে গেল। ঘড়িতে তখন প্রায় রাত্রি সাড়ে ন’টা বাজে। সোম ইতিমধ্যে ফোন করে তার জেঠুর ছেলে সায়ন্তনদাকে ডেকে নিয়েছে। বেহালার আনন্দনগরে মহেন্দ্র ব্যানার্জী লেনে পৌঁছে ওরা দেখল সায়ন্তনদা দাঁড়িয়ে আছে। মিতুল লক্ষ করল, ছিপছিপে ব্যায়াম করা শরীর। চোখে সরু ফ্রেমের চশমা। চিবুকে হালকা দাড়ি। লম্বা ছ’ফুটের কাছাকাছি। বেশ স্মার্ট লুক।

সায়ন্তনদা ঠিকানাটা আগেই খুঁজে রেখেছিল। বলল, “এই যে এইদিকে। ১৯ বাই ২।”

রাস্তার উপর থেকে উঠেছে দোতলা বাড়ি। উপরে রাস্তার দিকে ব্যালকনিতে গ্রিলের গায়ে টবে গাছ বসানো। দরজার উপর নেমপ্লেটে প্রফেসর অবনীশ সেনের নাম লেখা। ওরা গিয়ে বেল বাজাতে কিছুক্ষণ পরে একজন বয়স্ক মহিলা বের হলেন। ইনি সম্ভবত পরিচারিকা।

মিতুল এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, অবনীশ-স্যার আছেন? আমরা কলেজ থেকে আসছি। একবার দেখা করব ওঁর সঙ্গে।”

মহিলা উত্তর দিলেন, “অবনীশবাবু তো বাড়িতে নেই।”

“নেই? কোথায় গেছেন?”

“পুরী। কবে ফিরবেন জানি না।”

“কবে গেছেন পুরী?”

“এই তো তিনদিন আগে।”

“ওঁর সঙ্গে আর কেউ গেছেন?”

“তা জানি না। সেদিন সকালে প্রতিদিনের মতো কলেজে গিয়েছিলেন। হঠাৎ করে বিকালে ফোন করে জানালেন, পুরী যাচ্ছি। জামাকাপড়, ব্যাগপত্র কিছুই নিয়ে যাননি। কলেজ থেকে বেরিয়ে মনে হয় সোজা পুরী চলে গেছেন।”

“কোথায় উঠেছে বলতে পারবেন?”

“সেসব আমি জানি না। তোমরা এখন যাও। পরে যোগাযোগ কোরো।” বলে দরজা বন্ধ করে দিলেন মহিলা।

সায়ন্তন রাস্তায় এসে জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের কেন মনে হচ্ছে যে ছোটো দাদু এই প্রফেসরের সঙ্গে গেছেন?”

বিকালের পর থেকে সব ঘটনাগুলো বুঝিয়ে বলে মিতুল উত্তর দিল, “অতীনদার কথা অনুযায়ী ছোটো দাদু আর প্রফেসর সেন দুজনের পাহাড়ে যাবার কথা হচ্ছিল।”

“কিন্তু পাহাড়ে তো যাননি?”

“হ্যাঁ, তবে দুজনে একই দিনে কলকাতা থেকে বেরিয়েছেন সেটা এই মহিলার কথা শুনে বোঝা গেল। ছোটো দাদুর ফোন ওইদিন কলেজ স্ট্রিটে এসে সুইচড অফ হয়। আর প্রফেসর কলেজ থেকে বেরিয়ে দুম করে সিদ্ধান্ত নেন পুরী যাবেন। আজকে আমরা যখন তাঁকে ফোনে আস্তিক দত্তর কথা জিজ্ঞেস করলাম তিনি লাইন কেটে দিয়ে ফোন বন্ধ করে দিলেন। তার মানে দুইয়ে দুইয়ে চার করা কি খুব অসম্ভব?”

কিছুক্ষণ গুম খেয়ে থেকে সায়ন্তন বলল, “হুম্‌, বুঝলাম। চল তোদের সবাইকে বাড়িতে নামিয়ে দিই। দশটা বেজে গেছে। তোদের বাড়ির লোক চিন্তা করবে।”

পাশের বড়ো রাস্তাতে সায়ন্তনদার ওয়াগনার রাখা ছিল। সেটাতে উঠে সোম জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি অফিস থেকেই সোজা চলে এলে?”

“হ্যাঁ, কাছেই জোকাতে আমার অফিস। আজকে সন্ধ্যার পর পেশেন্ট ছিল না। তাই তোর ফোন পেয়ে বেরিয়ে এলাম।”

ড্রাইভিং সিটে বসে স্টার্ট দিল গাড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যে মাঝেরহাট ব্রিজে উঠে সায়ন্তনদা আবার মুখ খুলল—“নেটে একবার সার্চ করে দেখ তো, এখন পুরী যাওয়ার কোনও ট্রেনে টিকিট পাওয়া যাবে কি না।”

“তুমি এখন পুরী যাবে?”

“রহস্য যখন পুরীতে, আমাকে তো যেতেই হবে। সেটা তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে পারলেই ভালো। তোরা সন্ধ্যাবেলা ফোন করেছিলি প্রফেসর সেনকে। তারপরেই ওঁর ফোন সুইচড অফ হয়ে গেল। এখন টাওয়ার লোকেশনটা যদি পাওয়া যায় তাহলে কালকে সকালের মধ্যে পুরী পৌঁছাতে পারলে ট্রেস পাওয়া যেতে পারে। কী বলিস তোরা?”

“তুমি পুরী গিয়ে ওঁদের খুঁজে পাবে কী করে?”

“আমার একটা বন্ধু আছে লোকনাথ, সে কলকাতা পুলিশের সাইবার ডিপার্টমেন্টে কম্পিউটার অপারেটর। ওকে অবনীশ সেনের নম্বর দিলে লাস্ট লোকেশন বলে দিতে পারবে। আমি হোয়াটস-অ্যাপে নম্বরটা পাঠিয়ে দিচ্ছি। থানায় মিসিং ডায়েরি তো করাই আছে।”

ঋষি আর অভি মোবাইলে সার্চ করে জানাল, “দুরন্ত সন্ধে সাড়ে আটটাতে শিয়ালদা ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। বাকি রাতে যে ক’টা ট্রেন আছে কোনোটাতেই টিকিট নেই। কালকে ভোর ছ’টায় বন্দেভারত ছাড়ছে। পৌঁছাবে দুপুর সাড়ে বারোটা। ওটাতেও প্রচুর ওয়েটিং দেখাচ্ছে।”

“ধুস! ট্রেন ক্যান্সেল। ফ্লাইট কী বলছে?”

সোম সার্চ করে উত্তর দিল, “কালকে সকাল আটটাতে ভুবনেশ্বরের ফ্লাইট আছে।”

চিড়িয়াখানার পরে ডানদিকে টার্ন নিয়ে সায়ন্তন স্টিয়ারিংয়ে একটা চাপড় মেরে বলল, “তার মানে পুরী পৌঁছাতে সেই দুপুর হয়েই যাবে। ততক্ষণে হয়তো পাখি ফুড়ুৎ!”

“কেন, ফুড়ুৎ হবে কেন?”

“তোরা এখনও কেসটার গুরুত্বটা বুঝতে পারছিস না। কিছুদিন আগে আমি মাঝরাতে ছোটো দাদুকে ফোনে কথা বলতে শুনেছি। যদিও চাপা গলায় বলছিল বলে আমি সব কথা বুঝতে পারিনি। তবে একটা কথা দু-তিনবার শুনেছি—‘হার্ট অফ গড’।”

“সেটা আবার কী?” ঋষি জিজ্ঞেস করল।

“তা জানি না। তবে মনে হচ্ছে কিছু একটা সাংঘাতিক রহস্য রয়েছে এর মধ্যে। খিচুড়িটা অনেকদিন আগে থেকেই পাকানো হচ্ছে।” বিড়বিড় করে বলল সায়ন্তন।

সোম মুচকি হেসে জানাল, “সায়নদার ছোটোবেলা থেকেই গোয়েন্দা হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু জেঠুর চাপে ডাক্তারি পড়ে এখন ডেন্টিস্ট হয়েছে। জোকাতে একটা চেম্বার করে দিয়েছে জেঠু। তবে স্বপ্নটা এখনও পুষে রেখেছে মনের মধ্যে।”

হঠাৎ সায়ন্তনদা গলা তুলে বলল, “যেতে হলে আমার চেতকই ভালো। বুঝলি?”

মিতুল প্রশ্ন করল, “চেতক কে?”

সোম উত্তর দিল, “এই যে গাড়িটাতে বসে আছি আমরা, এর নাম চেতক। মহারাণা প্রতাপের ঘোড়ার নাম অনুসারে।”

“তুমি এই গাড়ি নিয়ে পুরী যাবে? সারারাত চালিয়ে? জেঠিমা জানলে তোমাকে আর আস্ত রাখবে? আমরা কেউ যাব না বলে দিলাম।”

“তোদের আমি নিয়েও যাব না। মাত্র ৫২৮ কিলোমিটার রাস্তা। হাই রোড একেবারে ঝাঁ-চকচকে। রাস্তায় দু-বার হল্ট নিলেও ভোরের আগে ঠিক পৌঁছে যাব পুরী। তোরা সামনের মোড়ে নেমে পড়। বাঁদিকে ঘুরলেই সোজা দ্বিতীয় হুগলি সেতু। আমি কালকে সকালে পুরী থেকে তোদের কনফারেন্স কল করব।”

“সে কি! তোমার লাগেজ?”

“লাগেজের কী হবে? দুটো হাফ প্যান্ট, তিনটে জগন্নাথ মার্কা গেঞ্জি, একটা চটি, গামছা—এসব স্বর্গদ্বারের ফুটপাতের উপর ঢেলে বিক্রি হচ্ছে। তুই বাড়ি ফিরে মাকে বলবি, পেশেন্টের এমার্জেন্সি কল এসেছে, নাইট ডিউটি করে চেম্বারেই শুয়ে পড়ব।”

“যা বাবা!”

রেসকোর্সের সামনে সায়ন্তন বাকিদের নামিয়ে দিয়ে বিদ্যাসাগর সেতুর দিকে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। মিতুল বলল, “তোদের বংশে কি সবার মাথাতেই ছিট আছে?”

অক্সফোর্ড

চিরোয়েল নদীর পাশে একটি সুন্দর বাড়ি। তার সামনে একটা প্রশস্ত জায়গা। মাঝে সবুজ ঘাস। ধার দিয়ে দুধসাদা এনিমোন ফুল ফুটেছে ঝোপের মধ্যে। প্রতিটা ফুলে সাতটা করে পাপড়ি। মাঝে হলুদ গর্ভদণ্ড। ফুলে ফুলে মৌমাছিরা উড়ে বেড়াচ্ছে। পেট্রিয়া হাতে রবারের বড়ো গ্লাভস পরে মোটরচালিত ঘাস কাটার মেশিন দিয়ে সমান করে ছেঁটে দিচ্ছেন ঘাসের ডগাগুলো। আজকে রবিবার। সকাল থেকেই সূর্যোজ্জ্বল দিন। নীল আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। বেশ আরামদায়ক ঠান্ডা হাওয়া চলছে এখানে। গ্রীষ্মের শুরুতে এই আবহাওয়া মনে বড়ো প্রফুল্লতা আনে। নইলে ইংল্যান্ডে বেশিরভাগ দিনই স্যাঁতস্যাঁতে, ঝোড়ো বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়াটা কাঁটার মতো ফোটে।

“গুড মর্নিং পেট্রিয়া!” মিসেস ডেরেক তাঁর পোষা ল্যাব্রাডর নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন।

“ভেরি গুড মর্নিং মিসেস ডেরেক। তোমার হাজব্যান্ড ফিরেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে?”

“হ্যাঁ, গতকাল রাতে। আজকে সন্ধ্যায় তুমি কী করছ?”

“কিছুই না। ঘরেই থাকব অথবা পাবে গিয়ে বসব।”

“ওয়েল, তাহলে তুমি আমার বাড়িতে চলে এসো। জ্যাক অস্ট্রেলিয়া থেকে একটা উলফ ব্লাস ওয়াইন এনেছে। টার্কির রোস্টের সঙ্গে সেটার সদ্ব্যবহার করা যাবে।”

পেট্রিয়া সোনালি চুল ঝাঁকিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় বাড়ির সামনের লনটাকে চমৎকার চেহারা দিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি দেখা গেল পেট্রিয়ার মুখে। এবার বেশ ভালো লাগছে। মেশিনে কাটা ঘাসের ডগাগুলো একটা প্যাকেটে ঢুকিয়ে কিছু দূরের ডাস্টবিনে গিয়ে ফেলে এলেন তিনি। ঠিক সেই সময় একটি ধূসর রঙের লম্বা গাড়ি এসে দাঁড়াল তাঁর বাড়ির সামনে। একজন স্কার্ট-টপ পরা মাঝবয়সি ছিপছিপে চেহারার ইউরোপিয়ান মহিলা ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে হাসিমুখে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন, “আর ইউ প্রফেসর পেট্রিয়া কেলভিন?”

পেট্রিয়া ঘাড় নাড়তে মহিলা আবার বলল, “হাই! আই অ্যাম সুসি। আমি লন্ডন টাইমস থেকে আসছি। আজকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল আপনার সঙ্গে।”

“আচ্ছা। কাগজের জন্য ইন্টারভিউ তো?”

“হ্যাঁ, কোথাও বসে কথা বলা যায়?”

“নিশ্চয়ই। আসুন আমার ড্রয়িং-রুমে বসা যাক।”

সুসি বললেন, “আসলে আমি আপনাকে অনেকদিন থেকেই চিনি। আপনার লেখা অনেকগুলো বই পড়েছি আমি। অক্সফোর্ডে মাঝেমধ্যে আসি কাজের দরকারে। কিন্তু এর আগে দেখা হয়নি কোনোদিন। আপনার বাড়ির ঠিকানা আমাকে দিল জেনি। আপনি জেনি লরেন্সকে চেনেন তো? সেন্ট পিটার কলেজ।”

পেট্রিয়ার ড্রয়িং-রুমটা খুব সুন্দর করে সাজানো। দামি জিনিসপত্রে ঠাসা। দেয়ালে মস্ত বড়ো একটা সোনালি রঙের শায়িত বুদ্ধের অয়েল পেন্টিং। জানালার দিকে একটা সোফাতে বসতে বললেন সুসিকে। তারপর চোখ কপালে তুলে বিস্ময় প্রকাশ করলেন পেট্রিয়া—“ও! জেনি লরেন্স, আমরা কলেজে একসঙ্গে পড়তাম। কিন্তু পরে ও কোনও যোগাযোগ রাখেনি।”

“হ্যাঁ, জেনি আমাকে বলেছে সে-কথা। ও এখন লন্ডনে আমার অফিসেই কাজ করে। আপনার একটা আর্টিকেল উল্লেখ করতে সে জানাল, আপনাকে চেনে।”

“আচ্ছা, আপনি চা, কফি বা ড্রিংক নেবেন?”

“আমি একটা ছোটো ওয়াইন নিতে পারি।”

কাচের গ্লাসে সোনালি রঙের পানীয় ঢেলে সুসির দিকে এগিয়ে দিলেন পেট্রিয়া। নিজের জন্য কফি মেকারে ব্ল্যাক কফি বানিয়ে নিয়ে বসলেন উলটোদিকে, “বেশ, এবার আপনার প্রশ্নগুলো করে ফেলুন।”

সুসি কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা ইতিহাসের জার্নাল বের করে শান্ত স্বরে ইন্টারভিউ শুরু করলেন। প্রথমে ব্যক্তিগত কিছু জিজ্ঞাস্য শেষ করে আসল প্রসঙ্গে এলেন—“আপনি তো বুদ্ধের মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘদিন রিসার্চ করেছেন। আপনার লেখা এই আর্টিকেলটি আমি পড়েছি। বিশ্বের ইতিহাসে ওই সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনেক ধোঁয়াশাও রয়েছে ঘটনাটা নিয়ে। অনেকের মতে বুদ্ধকে নাকি বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছিল। এটা কি সত্যি?”

পেট্রিয়া উত্তর দেওয়ার আগে মনের মধ্যে কিছুটা গুছিয়ে নিলেন—“বিষপ্রয়োগ বললে ভুল বলা হবে, বিষক্রিয়া হতে পারে। আড়াই হাজার বছর আগের ভারতীয় সভ্যতা নিয়ে আমার বহুবছরের গবেষণা রয়েছে। এই সমস্ত বিষয়ে মোট পাঁচটা বই আছে আমার লেখা। সেজন্য অনেকবার আমাকে ভারত আর নেপালে যেতে হয়েছে। তিলাউরাকোট আর কপিলাবস্তুতে এ.এস.আই-এর পি.সি. মুখার্জি প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক তদন্ত শুরু করেছিলেন ১৯০১ সালে। সঙ্গে আরও অনেকে ছিল। তবে সবচেয়ে সাম্প্রতিক ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক রবিন কনিংহামের নেতৃত্বে একটি যৌথ আন্তর্জাতিক খনন শুরু হয়েছিল। ভারত ও ভারতের বাইরে বিভিন্ন বউদ্ধ মঠে ছড়িয়ে থাকা স্তূপের মধ্যে আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে খনন শুরু হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় ঝামেলার জন্য অনেক জায়গাতে খনন কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়।”

“কেন?”

“সেই প্রসঙ্গেই আসছি।” বলে কফি মাগে একটা চুমুক দিলেন পেট্রিয়া, “গৌতম বুদ্ধের জীবন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অতি সীমিত। কারণ, সমসাময়িক নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক কোনও উপাদান তেমনভাবে পাওয়া যায় না। যদিও অনেক কিছুই লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু ১২০০ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি সেই সময়ের পৃথিবী বিখ্যাত নালন্দার পাঠাগারের কয়েক কোটি প্রাচীন পুথি পুরোপুরি আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ফলে একটা অধ্যায়, একটা বিস্তৃত সময়ের ইতিহাসের উপর চিরকালের মতো কালো পর্দা পড়ে গেল। ফলে এখন আমরা যেটা পাই সে সবই প্রায় সিংহলী ইতিবৃত্ত আর সংস্কৃত ভাষায় লেখা ললিতবিস্তর থেকে নেওয়া। কিন্তু এগুলোর মাধ্যমে বুদ্ধের জীবন নয়, বরং পরবর্তী সময়ে বুদ্ধের ভক্তরা কী বিশ্বাস করত সেটা জানতে পারি।”

সুসি এই কথোপকথোন ফোনে রেকর্ড করে নিচ্ছিলেন। পেট্রিয়া কিছুটা থেমে আবার শুরু করলেন—“আনুমানিক ৪৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বর্তমানে ভারতের উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়া জেলার কুশিনগরে আশি বছর বয়সে বুদ্ধের মৃত্যু হয়েছিল। একটা মত এই কথা বলে যে বার্ধক্যজনিত শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি মারা গিয়েছিলেন। কারণ, সারাজীবনে প্রচুর কৃচ্ছ্রসাধন করেছিলেন তিনি। আর একদল গবেষকের মতে, পচা শুয়োরের মাংস খেয়ে বিষক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। অথবা তিনি ক্লোস্ট্রিডিয়াম পারফ্রিনজেন নামক সংক্রমণের বিষ দ্বারা সৃষ্ট একটি নেক্রোটাইজিং এন্টারোকোলাইটিস পিগ-বেল রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।”

“এই বিষয়ে আপনার কী মত?” সুসির প্রশ্নে পেট্রিয়াকে আবার থামতে হল।

পেট্রিয়া বললেন, “আমার মতামত গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছি। কিংবদন্তি অনুসারে, তাঁর মৃত্যুর পর কুশিনগরেই দেহ দাহ করা হয়েছিল এবং চিতাভস্ম আটটি ভাগে ভাগ করে তার অনুগামী আটটি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতরণ করা হয়। সেই অংশগুলির মধ্যে একটিকে কপিলাবস্তুর শাকিয়ান রাজ্যের রাজধানী শহরে তাঁর পরিবারের কবরস্থানেও সমাধিস্থ করা হয়েছিল। বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় ২৫০ বছর পরে মৌর্য রাজা সম্রাট অশোক বউদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন এবং তাঁর রাজ্যজুড়ে অনেক স্তূপ আর স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেন। সেগুলোর মোট সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৪ হাজার। প্রায় প্রতিটি বউদ্ধ বিহারে একটি স্তূপ পাওয়া যায়। সম্রাট অশোক কপিলাবস্তুতে গৌতম বুদ্ধের পরিবারের সমাধিস্থলেও গিয়েছিলেন এবং বুদ্ধের মৃত্যুর অত বছর পর তাঁর চিতাভস্মের বাক্সটি মাটি খুঁড়ে বের করেছিলেন। পরে একটা বড়ো স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়ে তার নীচে সেই ছাইয়ের কাসকেট আবার সমাধিস্থ করেন। সেখানেই ১৯৭০ দশকে একটি প্রত্নত্তাত্বিক খননে কে. এম. শ্রীবাস্তব একটি পাত্রের মধ্যে কিছু হাড়ের টুকরো খুঁজে পান। কিন্তু সেই হাড়ের টুকরোগুলো বুদ্ধের ছিল না অন্য কারও, সেটা নিশ্চিত বলা যায় না।”

সুসি তার পরের প্রশ্ন করলেন, “তাহলে গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর কারণ কি ফুড পয়েজনিং?”

“৪৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ৮০ বছর বয়সে গৌতম বুদ্ধ কুশিনগরে তাঁর অনুগামী, পেশায় কর্মকার চুন্দার স্বহস্তে তৈরি খাদ্যগ্রহণের পরে অসুস্থ হয়ে দেহত্যাগ করেন। সেই বিশেষ পদটির নাম ‘শূকরমদ্ধব’। প্রাথমিক যুগের বউদ্ধ লেখাপত্র অনুযায়ী, এই পদটি তৈরি হয়েছিল বুনো শুয়োরের মাংস থেকে। মধ্যবয়স্ক শুয়োরের নরম মাংস বেছে নিয়ে নিজের হাতে রান্না করেছিলেন গৌতম বুদ্ধের অনুগামী চুন্দা। কিন্তু গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা অনুযায়ী একমাত্র চূড়ান্ত অবস্থায়, যেখানে অন্য কোনও বিকল্প খাদ্যদ্রব্য অনুপস্থিত, একমাত্র সেখানেই প্রাণী হত্যা করে তার মাংস ভক্ষণ করা যেতে পারে। কুশিনগর তো সেরকম কোনও এলাকা নয়, তাহলে গৌতম বুদ্ধ শুয়োরের মাংস রান্না করার অনুমতি কীভাবে দিলেন? পরবর্তী সময়ে বুদ্ধিস্ট কমেন্টেটর এবং গবেষক ধামাপাল বললেন, আসলে যেটা হয়েছিল, সেই পদটি শুয়োরের পায়ের চাপে নরম হয়ে যাওয়া ব্যাম্বুশুট ছিল অথবা শুয়োর যেখানে বাস করে সেখানে উৎপন্ন মাশরুম ছিল, আদৌ শুয়োরের মাংস ছিল না। গৌতম বুদ্ধের জীবন নিয়ে লেখা বিভিন্ন চাইনিজ স্ক্রিপ্টও এই মতামত সমর্থন করে যে পদটি বিশেষ ধরনের মাশরুম দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। অ্যাকচুয়াল চাইনিজ শব্দ বলেছে যে বুদ্ধের শেষ খাবারের মূল উপাদান ছিল চন্দন গাছে জন্মানো ছত্রাক বা মাশরুম। পরবর্তীকালে পালি স্কলাররা ব্যাখ্যা করেছেন যে বিভিন্ন ঔষধের গুণসম্পন্ন ছত্রাকের নাম ছিল শূকরকাণ্ড, শূকরপাদিকা, শূকরেষ্ঠা ইত্যাদি। আদতে বুনো শুয়োরের মাংস নয়। বুদ্ধ অনুগামী চুন্দা পদটি রান্না করেছিলেন বিশেষ ধরনের মাশরুম দিয়ে। আর কিছু কিছু ছত্রাকে যেমন বিষক্রিয়া হয়, তেমনই এই পদটি খাওয়ার পরে গৌতম বুদ্ধ অসুস্থ হয়ে পড়েন আর তাঁর ডিসেন্ট্রি শুরু হয় এবং তার ফলেই ৮০ বছর বয়সে গৌতম বুদ্ধ কুশিনগরে দেহত্যাগ করেন।”

সুসি মাথা নেড়ে মন্তব্য করলেন, “এ তো বেশ গোলমেলে ব্যাপার, প্রফেসর।”

স্মিত হেসে পেট্রিয়া বললেন, “গোলমালের এখানেই শেষ নয়। আপনার কাগজের পাঠকদের চিন্তার উৎকর্ষের জন্য আরও কিছু তথ্য দিয়ে দিই। সিদ্ধার্থ ২৯ বছর বয়সে তাঁর পুত্র রাহুলের জন্মের রাতে গৃহত্যাগ করেন। এরপর তিনি ‘আলারা কালামা’ নামে এক ঋষির দেখা পান এবং তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর কাছ থেকে সিদ্ধার্থ ধ্যানের পদ্ধতি এবং ব্রহ্মবিদ্যা আয়ত্ত করেন। কে ছিলেন এই আলারা কালামা? তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জানা যায় না।”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার মুখ খুললেন পেট্রিয়া—“বউদ্ধধর্মের মতবাদ সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের নির্ভর করতে হয় মূলত পালি ভাষায় লেখা ত্রিপিটকের উপর। অর্থাৎ বিনয় পিটক, সুত্ত পিটক এবং অভিধম্ম পিটক। এই ধর্মগ্রন্থগুলির কেন্দ্রীয় বিষয় অথবা মূল লক্ষ্য হল সত্যের উপলব্ধি। সৎ চিন্তা, সৎ চেষ্টা, সৎ কার্য। ভাবুন তো, এই ধারণা আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে প্রচার করেছিলেন বুদ্ধ। মনে হয় না কোনও অতি উন্নত সভ্যতার বীজ বপন করার হচ্ছিল সেই সময়ে? বউদ্ধধর্মে সত্য সম্পর্কে ধারণাও স্বতন্ত্র। এই ধারণা অনুসারে, ইন্দ্রিয়গোচর এই বিশ্বের কোনও অস্তিত্বই নেই। নির্বাণ সম্পর্কে ধারণা আরও সূক্ষ্ম। এখানে বলা আছে নির্বাণ যে কী, তা বোঝানো সম্ভব নয়। কেননা, নির্বাণ অনন্ত এবং শব্দব্রহ্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নির্বাণ অতুলনীয় এবং মানুষের মহত্তম লক্ষ্য। বুদ্ধ মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী ছিলেন না এবং সর্বশক্তিমান কোনও ঈশ্বরেও তাঁর বিশ্বাস ছিল না। ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন। কৃষক, শ্রমিক, ধনী, দরিদ্র, ব্রাহ্মণ, শূদ্রের মধ্যে তিনি সাম্যতা আনতে চেয়েছিলেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার গুপ্তহত্যার চক্রান্ত করা হয়েছিল। যার ফলস্বরূপ শেষবার কুশিনগরে বিষপ্রয়োগে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল কি না সেই নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে।”

বেশ কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতার পর সুসি আবার প্রশ্ন করলেন, “আলারা কালামা কি উন্নত সভ্যতার কোনও মানুষ ছিলেন—যিনি ভবিষ্যৎ থেকে এসেছিলেন? আপনার এই আর্টিকেলে সেরকম একটা ইঙ্গিত রয়েছে প্রফেসর।”

“হতেও পারে। এরকম একটা সম্ভাবনার কথা আমি উল্লেখ করেছি আমার লেখায়। তিনি টাইম ট্রাভেল করেও আসতে পারেন, অথবা মহাকাশের অন্য কোনও প্রান্ত থেকেও আসতে পারেন। আমার তো মনে হয় এই ব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোনও প্রান্ত থেকে অতি উন্নত সভ্যতার প্রাণীরা পৃথিবীর দিকে প্রতিমুহূর্তে লক্ষ রাখছে। প্রায় চার বিলিয়ন বছর আগে যখন পৃথিবীর মাটি ঠান্ডা হয়ে এল, তৈরি হল প্রাণধারণের উপযুক্ত পরিবেশ, ঠিক সেই সময়ে শুষ্ক পৃথিবীতে প্রাণের প্রথম বীজ তারাই পাঠিয়েছিল। এরপর প্রাণের বাড়বাড়ন্ত হল এ-গ্রহে, কিন্তু রাজ করতে শুরু করল অতিবৃহৎ হিংস্র ডাইনোসরের দল। তাদের বিলুপ্তি না হলে মানুষের আদিম প্রজাতি এ-মাটিতে পা রাখতে পারবে না। তাই ডাইনোসরদের সমূলে উৎপাটিত করা হল বিশাল উল্কা পিণ্ডের আঘাতে। তারপর মানুষ এল। পৃথিবীতে বংশবিস্তার করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম উন্নততর জিন তৈরি করতে লাগল। কিন্তু পশুর মতো হিংস্র মানুষকে প্রকৃত উন্নত প্রাণী তৈরি করতে গেলে যে শিক্ষা লাগে, সেটা কে দেবে? আবার তারা তাদের প্রতিনিধি পাঠাল পৃথিবীতে। আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধের মাধ্যমে উন্নততর মানুষের শিক্ষা, জ্ঞান, দর্শন তারা ছড়িয়ে দিল পৃথিবীতে। কিন্তু সেই সময়ের মানুষরা সেই মত গ্রহণ করতে পারল না। বুদ্ধকে হার মানতে হল। তবু তাঁর মতাদর্শ রয়ে গেল আমাদের মধ্যে।”

সুসি মন দিয়ে শুনছিলেন পেট্রিয়ার কথা। এবার প্রশ্ন করলেন, “আর হার্ট অফ গড? সে নিয়ে আপনার মতামত কী?”

পেট্রিয়া একটু চমকে উঠলেন কথাটা শুনে। বিস্মিত গলায় জানালেন, “এ-বিষয়ে আমার কোনও মতামত নেই।”

“সে কী! ড. নিসিকাওয়া, প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়ম আর আপনি—এই তিনজন পৃথিবী বিখ্যাত ইতিহাস গবেষক একটা গোপন প্রজেক্টে কাজ করছেন। এ-বিষয়ে আমার কাছে নির্দিষ্ট খবর আছে। বুদ্ধের দেহ দাহ করার পর চিতাভস্মের মধ্যে একটা হাঁসের ডিমের সাইজের লাল পাথর পাওয়া গিয়েছিল। ভক্তদের মতে যেটা ছিল ‘ভগবানের হৃদয়’, আগুন যাকে ছাই করতে পারেনি। চিতাভস্মের সঙ্গে সেই লাল পাথরটিও লুম্বিনীতে নিয়ে এসে সমাধিস্থ করা হয়। আর সম্রাট অশোক সেই পাথরটি নেওয়ার জন্যই বুদ্ধের মৃত্যুর ২৫০ বছর পর সেই সমাধি খুঁড়েছিলেন। এ-কথা আপনার অজানা নয় আশা করি।”

পেট্রিয়ার চিবুকটা নিজের অজান্তেই শক্ত হয়ে উঠল। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “এ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে মিস সুসি। আড়াই হাজার বছর আগের ঘটনা। বিভিন্ন মানুষের আলাদা আলাদা মত থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে আমার যা বলার ছিল, আমি বলে দিয়েছি।”

“বেশ!” সুসি উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে জানালেন, “হ্যাভ অ্যা গুড ডে প্রফেসর। অনেক ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান সময় বের করে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য। শুধু কয়েকটা কথা আপনাকে জানিয়ে রাখি, জাপানে ড. নিসিকাওয়াকে গত একমাস হল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতে প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়মও বেপাত্তা। আপনি সাবধানে থাকবেন।”

কথাটা ঠান্ডা গলায় বলে সুসি বেরিয়ে গেলেন পেট্রিয়ার ঘর থেকে। গাড়িটা ব্যাক করে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল চিরোয়েল নদীর পাশের রাস্তা দিয়ে।

পেট্রিয়া কিছুক্ষণ স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন চুপ করে। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন দেয়ালে ঝোলানো শায়িত বুদ্ধের ছবিটার দিকে। চোখটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। তারপর ধীরে বসে পড়লেন সোফায়। ভাবছিলেন, সত্য যতই চেপে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন শেষ পর্যন্ত কোন একটা ফাঁক দিয়ে সেটা প্রকাশ হয়েই পড়ে। প্যান্ডেমিকের পর থেকে গত তিন বছর ধরে কিছু সূত্রের উপর ভিত্তি করে বুদ্ধের উপর তাঁদের এই রিসার্চ চলছে। গবেষণা যত এগিয়েছে, বহু ভারতীয় এবং জাপানি প্রাচীন ভাষার পুথি ও শিলালিপি উদ্ধার করে পড়া শুরু করা হয়েছে। গৌতম বুদ্ধের বিচরণভূমিতে বার বার ছুটে গেছেন ওঁরা। সেখান থেকে নতুন নতুন তথ্য উঠে এসেছে। সেই সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে চমকে উঠেছেন গবেষকরা। ক্রমশ তাঁদের নিশ্চিত ধারণা তৈরি হয়েছে বুদ্ধ হয়তো পুরোপুরি পার্থিব মানুষ ছিলেন না। গৃহত্যাগের পর কৃচ্ছ্রসাধন করার সময়েই তিনি মৃত্যুর মুখে পৌঁছে গিয়েছিলেন। সেই সময় তাঁকে নতুন জীবন দেন আলারা কালামা নামে এক দিব্য পুরুষ। এই দিব্য পুরুষ সম্ভবত গ্রহান্তর বা কালান্তর থেকে আসা কোনও অতি উন্নত সভ্যতার মানব। তিনিই বুদ্ধের শরীরে স্থাপন করেছিলেন এই লাল পাথরটি। পরে বুদ্ধের শরীর দাহ করা হলেও পাথরটি অক্ষত থাকে। ভক্তরা সেটাকে ভগবানের হৃদয় ভেবে সংরক্ষণ করে। কিন্তু কালের সমুদ্রে কখন যে সেই পাথরটি লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায় সেটা এতদিন খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। যদি পাথরটি এখন পাওয়া যেত তবে আধুনিক বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে নিশ্চয়ই অনেক কিছু জানা যেত। যদিও একটা ক্ষীণ আশা জেগেছে, হয়তো জিনিসটি উদ্ধার করা সম্ভব। সুব্রহ্মনিয়মের মতে, সম্ভবত সেটি আছে হিমালয়ের কোনও দুর্গম গুম্ফায়। যেখানে পৌঁছানো সাধারণ মানুষের পক্ষে কার্যত অসম্ভব।

গতকাল পেট্রিয়ার কলেজের ডেস্কে অচেনা এক ব্যক্তি এসে একটি হাতে লেখা চিঠি দিয়ে যায়। চিঠির লেখা এবং নীচের স্বাক্ষর—দুটোই তাঁর খুব পরিচিত। চিঠিটি পাঠিয়েছেন ড. নিসিকাওয়া। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব কাঠমান্ডু পৌঁছানোর জন্য। সেখানে হোটেল ম্যারিয়টে একটা স্যুট পেট্রিয়ার নামে বুক করা আছে। আজকে রাতের বিমানেই পেট্রিয়া হিথরো থেকে প্লেনে উঠবেন। কিন্তু এ-খবর কাকপক্ষীতেও জানে না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে খবরের কাগজের এই এডিটর অনেক তথ্যই জানে। আর কে কে জানে? ড. নিসিকাওয়া কিংবা প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়ম গোপনে বাড়ি ছেড়েছেন। কোন পথে তাঁরা নেপাল পৌঁছাচ্ছেন সেটা কি অন্য কেউ নজর রাখছে? কিন্তু পেট্রিয়া কী করবেন? প্ল্যান মোতাবেক আজকে রাতে হিথরো থেকে প্লেনে উঠবেন, না ঘুরপথে অন্য কোনও রাস্তায় নেপাল পৌঁছাবেন?

অগ্নিযুগ

“আর কতক্ষণ বাকি?”

“সময় হয়ে গেছে, সাহেব এখুনি আসবে।”

“কাজটা আমরা পারব তো?”

“পারতেই হবে। তুই তো জানিস, এটা অনেকদিনের পরিকল্পনা। গত একবছর ধরে লোকটাকে অনুসরণ করছি। রবিনদা অনেক আশা নিয়ে আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন।”

“সে তো জানি, কিন্তু ভয়ে আমার হাত-পা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে আসছে।”

“ও কিছু নয়, সকাল থেকেই ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে ধৈর্য ধরে বস। যা করার আজকেই করতে হবে। ভয় পেলে চলবে না।”

মাঠের পাশে একটা বড়ো শিমুলগাছের নীচে অন্ধকারের মধ্যে জড়োসড়ো হয়ে ঘাসের উপর শুয়ে ছিল শৈবাল আর দেবেশ। কিছুটা দূরে পাঁচিলঘেরা একটা বাংলো বাড়ি। ওদের দুজনেরই দৃষ্টি সেইদিকে। গেটের বাইরে দুজন উর্দিধারী সশস্ত্র দারোয়ান পায়চারি করছে। তাদের নজর এড়িয়ে ঘাসের মধ্যে শুয়ে মাটিতে মিশে এতদূর অনেক কষ্ট করে এসেছে দুজনে। এবার অন্তিম লগ্নের প্রতীক্ষা। ঝিঁঝিঁর ডাক আগের থেকে কমে এসেছে অনেকটা। আবার উত্তরের শীতল হাওয়া ধেয়ে আসছে গঙ্গার দিক থেকে। শিশির পড়তে শুরু করছে পৌষ মাসের শেষে। স্যাঁতস্যাঁতে ঠান্ডা মাটিতে শুয়ে থাকতে থাকতে ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছে শৈবাল। ওর বয়সটা কম। সবে গ্রাম থেকে এসে কলকাতার কলেজে ভরতি হয়েছে।

“ক’টা বাজে দেবেশদা?”

“আমার কাছে কি ঘড়ি আছে? তুই তো জানিস রবিনদা কোনও চিহ্ন রাখতে বারণ করেছে। ঘড়ি, টাকাপয়সা, চিঠি, কোনও কাগজের টুকরোও পকেটে রাখা যাবে না।”

“সে তো জানি। কিন্তু কী করে বুঝবে এখনও কতক্ষণ সময় লাগবে সাহেবের আসতে?”

“ক্লাব থেকে বেরোনোর সময় হয়ে গেছে। ফিটন গাড়ির আসতে বেশি সময় লাগে না। তুই তৈরি হয়ে থাক।”

শৈবাল তার কোমরে কাপড় দিয়ে জড়ানো দুটো বোমায় হাত বুলিয়ে বলল, “এগুলো ঠিক সময়ে কাজ করবে তো দেবেশদা?”

“করবে মানে? করতেই হবে। রবিনদা নিজের হাতে এই বোমা বানিয়ে দিয়েছে। এখন যেটা বলছি মন দিয়ে শোন।”

“বলো।”

“তুই এই গাছের গোড়াতেই অপেক্ষা করবি। সামনে রাস্তার যে বাঁকটা আছে দেখছিস, ওখান দিয়ে মার্টিন সাহেবের ঘোড়ায় টানা ফিটন গাড়ি আসবে এক্ষুনি। লক্ষ রাখ। গাড়িটা যখন দশ-পনেরো হাত কাছে চলে আসবে, এই গাছের আড়াল থেকে বোমা ছুড়বি। দুটো বোমাই যেন গাড়ির উপরে পড়ে। তারপরেই কোনও দিকে না তাকিয়ে দৌড় দিবি। খুব জোরে দৌড়াবি। গোল তালাবের পাশ দিয়ে লোয়ার সার্কুলার রোডে পৌঁছাবি। তারপর বাঁদিকে সোজা গিয়ে শিয়ালদা স্টেশন। পারবি তো?”

মাথা নেড়ে শৈবাল জানাল, “হ্যাঁ তা পারব, কিন্তু তুমি?”

“আমার কথা তোকে ভাবতে হবে না। তুই পিছন ফিরে তাকাবি না, বুঝলি?”

“কেন?”

“যা বলছি, তাই কর।”

“কিন্তু রবিনদা তো আমাদের একসঙ্গে থাকতে বলেছেন।”

“এখন পরিস্থিতিটা আলাদা। অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব রবিনদা আমাকে দিয়েছেন। তুই এখানেই থাক। আমি এগোচ্ছি।”

“বন্দেমাতরম!”

“বন্দেমাতরম!”

ক্ষণিকের শেষ দৃষ্টি বিনিময়ের পর নিঃশব্দ চিতার মতো হামাগুড়ি দিয়ে বাংলোর দিকে এগিয়ে গেল দেবেশ। ও জানে এই দেখাই ওদের মধ্যে হয়তো শেষ দেখা। বাংলোর গা ঘেঁষে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল সে।

সময় যেন আর এগোচ্ছে না। মনে হচ্ছে এই প্রতীক্ষার আর শেষ হবে না।

দম বন্ধ করা পরিস্থিতি শেষ হল। দূর থেকে একটা আলোর রেখা দেখা গেল। হ্যাঁ, একটা ঘোড়ার গাড়ি এগিয়ে আসছে। বাঁক মোড়ে পৌঁছাতে বেশি সময় নিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই কানফাটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল এলাকাটা। পরপর দুটো বোমা ছুড়েছে শৈবাল। অন্ধকারের মধ্যেই তীব্র আগুনের ঝলকানি আর তারপরেই সাদা ধোঁয়ায় ভরে গেছে চারপাশ। কিছুক্ষণের হতভম্ব ভাব কাটিয়ে বাংলোর সামনে থেকে দুজন সেপাই দৌড়ে গেল সেইদিকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আরও কয়েকজন কর্মচারী ও দারোয়ান বাংলো থেকে বেরিয়ে দৌড়াল সাহেবের গাড়ির দিকে। দাউদাউ করে আগুনে জ্বলছে ফিটন গাড়িতে। সবাই চেঁচামেচি করে জল ঢালতে ব্যস্ত। তার মধ্যেই গুলির শব্দ হল তিন-চারটে। রাইফেলের আওয়াজ। সঙ্গে আর্ত চিৎকার। শৈবালের গলা! দেবেশ বিকৃত মুখে দাঁতে দাঁত চেপে নিথর হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যে। বেঘোরে প্রাণ গেল বেচারার। তবে দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে গেলে এরকম বহু তরুণ প্রাণের বলি দিতে হবে। অত্যাচারী ইংরেজ শাসকদের হাড়ে মৃত্যুভয়ের কাঁপুনি ধরাতে গেলে এরকম আরও অভিযান করতে হবে।

দেবেশ কালো কম্বল মুড়ি দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে মাথা নীচু করে এগিয়ে চলল ফাঁকা বাংলোর দিকে। গেট খোলা, দারোয়ানগুলো ফিটন গাড়ির আগুন নেভাতে ব্যস্ত। মুহূর্তের মধ্যে চৌহদ্দি পেরিয়ে দেবেশ দৌড়ে ঢুকে গেল বাড়ির ভিতরে। এদিকে এখন কেউ নেই। কয়েক মুহূর্তের অবকাশ। তার মধ্যেই ঘরগুলো খুঁজে ফেলতে হবে। প্রথমেই যে ঘরটাতে দেবেশ ঢুকল এটা মার্টিন সাহেবের ড্রয়িং কাম স্টাডি-রুম। একদিকে দেয়ালজোড়া বইয়ের আলমারি। লেখার জন্য বড়ো টেবিল। পাশে সোফা-সেট। তামাক সেবনের গড়গড়া। বন্দুকের আলমারি। বিভিন্ন সাইজের বন্দুক সাজিয়ে রাখা আছে সেখানে। আর আছে বেশ কয়েকটা বাঘ, চিতা, হায়না, হরিণের মুণ্ডুর স্টাফ। কিন্তু দেবেশ যা খুঁজছে সে-জিনিস এখানে নেই। একটা পুরোনো কাঠের বাক্স। গায়ে তিব্বতি কারুকার্য করা। বসার ঘরের পিছনে আর একটা ঘর আছে। এটা সাহেবের শোওয়ার ঘর। সাহেব এখানে একাই থাকেন। একটা পেল্লাই খাট ঘরের মাঝামাঝি। দেয়ালে বড়ো বড়ো কাঠের আলমারি। দেবেশ দৌড়ে গিয়ে ঢাকনা খুলে দেখল ভিতরে রাশি রাশি পোশাক। উপরের তাকে চাবি দেওয়া একটা লোহার সিন্ধুক। হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দেখল, চাবি ছাড়া সেটা খোলার কোনও উপায় নেই।

পিছনে আচমকা শব্দ হতে চমকে উঠল দেবেশ। অনেকগুলো পায়ের শব্দ। কারা যেন এদিকেই আসছে। এখন ঘর থেকে বেরোতে গেলেই ধরা পড়ে যাবে সে। আর একবার ধরা পড়লে বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সের হাঁড়ির খবর জানার জন্য অমানুষিক নির্যাতন শুরু হবে। তার থেকে মৃত্যু ভালো। কিন্তু মরার জন্য তো দেবেশ এত দূর আসেনি। এত বছরের পরিকল্পনা, এত মানুষের চোখের জল আর মৃত্যু। কিছু একটা বুদ্ধি বের করতেই হবে। ও মনে মনে ঠিক করে নিল কী করবে—দ্রুত কোথাও লুকিয়ে পড়তে হবে। ঘরের মধ্যে চোখ ঘুরিয়ে দেখল, জামাকাপড়ের দেরাজগুলো লুকানোর জন্য ভালো জায়গা। খাটের ডানদিকে একটা দেরাজের পাল্লা খুলে চট করে নীচের কোণে ঢুকে পড়ল সে। জড়সড় হয়ে চুপ করে বসে রইল অন্ধকারের মধ্যে। পায়ের শব্দগুলো কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে এই ঘরে ঢুকল। কাঠের পাটাতে কান পেতে শুনল দেবেশ। মর্টিন সাহেব আহত হয়েছেন। তবে সে-আঘাত খুব গুরুতর নয়। কথাবার্তা শুনে যা মনে হল, বোমা ফেটে গাড়িতে আগুন লেগে গেছে। মেঝেতে শুয়ে পড়েছিলেন, ফলে সাহেবের উপস্থিত বুদ্ধিতে তাঁর শরীরে আঘাত বেশি লাগেনি। ওঁর রিভলবারের গুলিতেই মৃত্যু হয়েছে শৈবালের।

চোখের সামনেটা ঝাপসা হয়ে গেল দেবেশের। প্রায় দম বন্ধ করে বসে রইল সে। এখান থেকে হাজার কিলোমিটার উত্তরে নেপালের একটা পাহাড়ি গ্রামে অনেক বছর আগের একটা স্মৃতি ভেসে আসছে মনের মধ্যে। এখনও সেই রক্তাক্ত ছবি জ্বলজ্বল করছে চোখের সামনে আর ওর বাবার মুখ থেকে বের হওয়া শেষ চিৎকার কানে আসছে, ‘ভাঙ্গনু ভাঙ্গনু ভাঙ্গনু…’ মানে পালিয়ে যা এখান থেকে পালিয়ে যা। মুহূর্মুহূ গুলির আওয়াজ। চারদিকে জ্বলন্ত ঘর। প্রচণ্ড চিৎকার। পোড়া গন্ধ আর ভারী ধোঁয়ায় সেদিনও দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল ওর। দেবেশের বয়স তখন পনেরো। চোখের সামনে তার বাবা, মা, ভাই, বোন, প্রতিবেশি সবাইকে ছটফট করে মরতে দেখেছে সে। ছবির মতো সুন্দর ছিল ওদের ছিন্তাং গ্রাম। চারদিকে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা। গ্রামের মধ্যে দিয়ে কুলকুল করে বয়ে চলেছে বরফগলা জল। ভুট্টা চাষ হয়েছে ক্ষেতে। সেই ক্ষেত রক্তে ভেসে গেল। তার মধ্যেই শোনা গেল ইংরেজ সৈন্যদের ভারী বুটের শব্দ। সালটা ছিল ১৯০৪। জেমস ম্যাকডোনাল্ড আর ফ্রান্সিস ইয়ং-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা তিব্বত দখল করে ফিরছে। কয়েক হাজার তিব্বতি মারা গেছে ওদের বন্দুকের গুলিতে। তিব্বতের তৎকালীন দলাই লামা যুদ্ধে হেরে গিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন ‘কনভেনশন অফ লাসা’। নেপালকে তিব্বত থেকে আলাদা করে ইংরেজরা তুলে দিয়েছে রানাদের হাতে। জুনিয়র লেফটেন্যান্ট মার্টিন হগের ব্যাটেলিয়ান লাসা থেকে ফেরার পথে শুরু করল তাণ্ডব। যত গ্রাম পড়ছিল রাস্তায়, তছনছ করে লুট করছিল সবকিছু আর যারা প্রতিবাদ করছিল তাদের কপালে ছিল নৃশংস মৃত্যু। রানারা বসে ছিল হাত গুটিয়ে। কারণ, সিংহাসনের লোভে তারা তখন উন্মত্ত। এই সময় একদিন উত্তর নেপাল প্রান্তে একটি শান্ত গ্রাম ছিন্তাং-এ আচমকা নেমে এল ব্রিটিশদের লোলুপ হাত। কারণ, লেফটেন্যান্ট মার্টিন তিব্বতের তাসিহুনপো মঠ লুট করার সময়ে শুনেছিলেন এই ছিন্তাং গ্রামের কথা। যুদ্ধের সময় তাসিহুনপো মঠের গর্ভগৃহের রত্নভাণ্ডার থেকে মূল্যবান কিছু রত্ন নিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন মঠেরই এক লামা তাসি কর্মাপা। তাঁকে খোঁজ করতেই লেফটেন্যান্ট মার্টিন হাজির হয়েছিলেন ছিন্তাং গ্রামে। কিন্তু গ্রামের মানুষ পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল ইংরেজদের সামনে। ফলে একপেশে লড়াইয়ে রাতারাতি শ্মশানে পরিণত হয়েছিল ছিন্তাং গ্রাম। তাসি কর্মাপাকে হত্যা করে বউদ্ধধর্মের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুথি আর বহুমূল্য প্রাচীন জিনিস-সহ একটি তিব্বতি কাঠের বাক্স নিয়ে এসেছিলেন মার্টিন হগ।

দেবেশ বেঁচে গিয়েছিল ভাগ্যের জোরে। তারপর এক বাঙালি লামার হাত ধরে কলকাতায় চলে এসে মুটের কাজ নেয়। সঙ্গে পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছিল। ইতিমধ্যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সারা ভারতেই ছড়িয়ে পড়ছিল বিদ্রোহের আগুন। আর সেই আগুন সবথেকে বেশি জ্বলতে শুরু করেছিল খাস কলকাতাতেই। দেবেশ থাপা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা শেষ করে যোগ দিয়েছিল এক জাহাজ কোম্পানিতে। ইতিমধ্যে হুগলি নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। ১৯২৮ সালে সুভাষচন্দ্র বসু বিপ্লবীদের নিয়ে একটি গুপ্তসমিতি তৈরি করলেন—‘বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স’। বিপ্লবী সত্য গুপ্তের হাত ধরে দেবেশ যোগ দিল বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সে। আর কিছুদিনের মধ্যেই খবর এল মার্টিন হগের কলকাতায় পোস্টিং। এত বছরের ছাইচাপা প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে উঠল দাউদাউ করে।

ডাক্তার এসে দেখে গেছেন হগ সাহেবকে। ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন। তারপর যন্ত্রণা লাঘব করার জন্য কড়া ঘুমের ওষুধ ইঞ্জেক্ট করে চলে গেলেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিচারিকা আর ভৃত্যরা ঘরের আলো কমিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে গেল। সাহেব নাক ডাকিয়ে ঘুমাতে শুরু করলেন।

সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক পর দেবেশ নিঃশব্দে আলমারি থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। মৃদু আলোতেই ঘুমন্ত সাহেবের বালিশের নীচ থেকে সাবধানে বের করে আনল একগোছা চাবি। তার মধ্যে নিশ্চয়ই সিন্দুকের চাবিটাও রয়েছে। বড়ো লোহার চাবিটা সিন্দুকে লাগিয়ে ঘোরাতেই খুলে গেল ঢাকনা। যেটা খুঁজছিল দেবেশ, সেই তিব্বতি কাঠের বাক্সটা সিন্দুকের ভিতরেই রয়েছে। বাক্সটা বের করে কম্বলের ভিতর মুড়ে নিল। কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও পারল না। খাটের উপর নরপিশাচ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। একে পরলোকে পাঠিয়ে যেতে না পারলে সত্যদা, রবিনদাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না চোখ তুলে। এক লাফে খাটের উপর উঠে সাহেবের বুকের উপর বসে নাক মুখ চেপে ধরল দেবেশ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দু-একবার ঝটকা দিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ল অত বড়ো শরীরটা। নাকে, গলার শিরায় হাত দিয়ে নিশ্চিত হল যে সাহেবের ভবলীলা সাঙ্গ হয়েছে। তারপর বাক্সটা নিয়ে পিছনে বাথরুমের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গড়ের মাঠ পেরিয়ে দৌড় দিল অন্ধকারের মধ্যে।

পুরী

সায়ন্তন প্রথম হল্ট করল খড়গপুরের আগে বালিহাটি থেকে বাঁদিকে ঘুরে আরও পাঁচ কিলোমিটার গিয়ে। রাত তখন একটা। শুনশান রাস্তা। চোখ দুটো যেন কেউ টেনে ধরছে। চেয়ে থাকতে পারছে না আর। পাশে অন্য কেউ নেই যার সঙ্গে একটু কথা বলে নিজেকে সজাগ রাখবে। তাই ঝিমুনি আসছে। মনে মনে ভাবল, এই অবস্থায় হাই রোডে গাড়ি চালানো বিপদজনক হতে পারে। উলটোদিক থেকে আসা বড়ো গাড়িগুলোর জোরালো হেড লাইটের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। টোল প্লাজাগুলোতে শুধু একবার করে দাঁড়াতে হয়েছে। তাও গাড়িতে ফাস্ট্যাগ লাগানো আছে বলে চটপট পেরিয়ে আসতে পেরেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই।

হাইওয়ে ১৬। মধ্যরাতে চারপাশ অন্ধকার। বড়ো বড়ো মাল বোঝাই ট্রাক আর দূরপাল্লার বাসগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটছে। দিনের বেলায় এই রাস্তাতেই বেশ ভিড় থাকে। সাইকেল, বাইক, অটোরা দাপাদাপি করে। কিন্তু এখন কেউ কোথাও নেই। এক্সেলেরেটরে একটানা পা দিয়ে থাকতে থাকতে অবশ হয়ে যাচ্ছে পা। গাড়ির গতি ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার রেখেই চালাচ্ছে সায়ন্তন। এবার মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে চোখে-মুখে জল দিয়ে আবার শুরু করতে হবে। এখনও পুরো রাস্তার চার ভাগের একভাগও পার হয়নি ও। তখন ঝোঁকের মাথায় একাই বেরিয়ে পড়ল। এখন মনে হচ্ছে, কাজটা কি ঠিক হয়েছে? সঙ্গে কেউ নেই, মাঝরাতে নিজেকে ড্রাইভ করে এতটা রাস্তা পেরোতে হবে। তবু গুগল ম্যাপ আছে বলে ভরসা। কিন্তু হঠাৎ যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে? আর একটা জিনিস ওকে অনেকক্ষণ থেকে ভাবাচ্ছে। একটা কালো স্করপিও বেহালা থেকে পিছু নিয়েছে ওর। মাঝে মাঝে দূরত্বটা বাড়াচ্ছে। পিছিয়ে পড়ছে। ব্যাক মিররে দেখা যাচ্ছে না কখনও। আবার কিছুক্ষণ পরে ঠিক ওর পিছনে চলে আসছে গাড়িটা। সায়ন্তন যখন উলুবেড়িয়াতে ইন্ডিয়ান অয়েলের পাম্পে ঢুকে ট্যাংক ফুল করে পাশেই রেস্তোরাঁয় ডিনার সেরে নিল, তখনও ওই গাড়িটা পার্কিংয়ে রাখা ছিল। পুরো গাড়িটা কালো কাচ দিয়ে মোড়া। ভিতরে কে বা কারা আছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ওরা কি নিছক একই পথের যাত্রী, না ওকেই ফলো করছে?

সামনে অন্ধকার রাস্তার বাঁপাশে দুটো ছোটো ছোটো চায়ের গুমটি দেখতে পেল সায়ন্তন। আলো জ্বলছে টিমটিম করে। রাতজাগা ড্রাইভারদের প্রতীক্ষায় স্টোভ জ্বালিয়ে গরম চায়ের ডেকচি নিয়ে বসে আছে ওরা। দুটো মালবোঝাই ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। সায়ন্তন এক্সেরেলেটর থেকে পা তুলে নিয়ে গাড়ির গতিবেগ কমিয়ে রাস্তা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ট্রাকগুলোর পিছনে। ক্লান্ত লাগছে খুব। সকাল থেকে কাজের মধ্যেই ছিল আজকে। বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পায়নি এতটুকু। এখন রাত দেড়টার সময় চোখ আর চেয়ে থাকতে পারছে না। গাড়ির মধ্যে জলের বোতল ছিল। কিছুটা জল গলায় ঢেলে নিল। তারপর ড্রাইভিং সিটটা পিছন দিকে পুরো হেলিয়ে এসি চালিয়ে চোখে রুমাল-চাপা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে খেয়াল নেই, কাচের গায়ে ঠকঠক করে একটা আওয়াজ শুনে চমকে উঠল সায়ন্তন। গাড়ির পাশে স্যান্ডো গেঞ্জি পরা একটা স্বাস্থ্যবান লোক এসে দাঁড়িয়েছে। তন্দ্রাটা সবে গভীর হতে শুরু করেছিল, কেটে গেল মুহূর্তের মধ্যে। লোকটা কিছু বলছে ওকে। সাইডের কাচটা নামাল।

“গাড়ি থোড়া আগে বাড়াইয়ে বাবু, পিছে ওর একঠো ট্রাক লাগেগা।”

“আচ্ছা, ঠিক হ্যায়।”

সায়ন্তন দেখল পিছনে আর একটা বড়ো ট্রাক এসে দাঁড়িয়েছে। তার পার্কিংয়ের জন্য জায়গা চাই। তাই ওকে গাড়ি সরাতে হবে। ও গাড়িটা আর একটু এগিয়ে দিয়ে নামল নীচে। চোখে-মুখে জল দিল। চায়ের দোকান থেকে এক ভাঁড় গরম চা নিয়ে চুমুক দিল ছোটো করে। একটা সিগারেটে আগুন ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে মনে হল, আহা! এই তো জীবন! চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝে চওড়া রাস্তায় ঝড়ের বেগে দৌড়ে যাওয়া গাড়ি। বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ। অচেনা অজানা জায়গায় হলুদ বাল্বের নীচে দাঁড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে ধোঁয়া-ওঠা চা। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই উত্তেজনা। তবে বেশ ফ্রেশ লাগছে এখন। ঝিমুনি ভাবটা কেটে গেছে একেবারে। পুরী গিয়ে ছোটো দাদুকে খুঁজে বের না করা পর্যন্ত রেস্ট নেওয়া যাবে না। মনে মনে ঠিক করে নিল সায়ন্তন।

শুধু সেই কালো স্করপিওটা ওকে ভাবাচ্ছে। এখন চারপাশে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে গাড়িটা খুঁজে পেল না সায়ন্তন। নিশ্চিন্ত হয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে স্টার্ট দিল ‘চেতক’কে। খড়গপুর ভুবনেশ্বর হাইরোড দিয়ে এখনও তিনশো কিলোমিটার রাস্তা বাকি। চেতকের স্পিডোমিটার ১০০ ছুঁতে কয়েক মিনিট সময় নিল।

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সায়ন্তন পৌঁছে গেল পুরীতে। সেই কোন ছোটোবেলায় এসেছিল বাবা-মায়ের সঙ্গে। সব বাঙালির সঙ্গেই পুরীর একটা আত্মিক যোগযোগ রয়েছে। জগন্নাথদেব কবে যে উড়িয়া থেকে বাঙালি হয়ে গেছেন, তিনি নিজেও তা জানেন না। সমুদ্রের সামনে দিয়ে সোজা চলে গেছে মেরিন ড্রাইভের রাস্তা। বালির উপর অজস্র দোকান। তারপর বালির উপর আছড়ে পড়ছে সাদা ঢেউ। বাতাসে নোনা গন্ধ।

বাকি রাস্তাতে সেই কালো স্করপিওটাকে একবারও দেখতে পায়নি সায়ন্তন। তাহলে হয়তো মিথ্যাই চিন্তা করছিল ওটাকে নিয়ে। লোকনাথ হোয়াটস-অ্যাপ করে পুরী হোটেলের ঠিকানাটা পাঠিয়েছে ওকে। তার মানে প্রফেসর অবনীশ সেন গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরী হোটেলেই ছিলেন। সায়ন্তন গাড়ি নিয়ে সোজা পুরী হোটেলে ঢুকে গেল। রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আস্তিক দত্ত আর অবনীশ সেন কোন রুমে উঠেছেন?”

মহিলা রিসেপশনিস্ট জানতে চাইল, “আপনি কে?”

“আমি ওঁর ফ্যামিলি মেম্বার, ডক্টর সায়ন্তন দত্ত। এই যে আমার আই-কার্ড আর নেম কার্ড।” বলে নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্সটা এগিয়ে দিল।

কম্পিউটার স্ক্রিনে কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে মহিলা মিষ্টি হেসে জানাল, “সরি ড. দত্ত, আমরা ওঁদের অনুমতি ছাড়া রুম নম্বর আপনাকে শেয়ার করতে পারব না।”

“হ্যাঁ, ঠিক আছে। ফোন করে জিজ্ঞেস করে নিন ওঁদের।”

“ওয়েট অ্যা মিনিট।” বলে রিসেপশনিস্ট ফোন করলেন ওঁদের রুমে।

“সরি, ওঁদের ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত ওঁরা সমুদ্রের দিকে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছেন। ফিরলে যোগাযোগ করতে পারি।”

“বেশ। ততক্ষণে আমাকে একটা ভালো রুম দিন। সারারাত গাড়ি চালিয়ে এসেছি কলকাতা থেকে। খুব টায়ার্ড লাগছে।”

শরীর আর বইছে না সায়ন্তনের। তাই আগে তিনতলায় সি-ফেসিং একটা রুম নিয়ে গরম জলে স্নান সেরে নরম বিছানায় ছুড়ে দিল শরীরটাকে। মুহূর্তের মধ্যেই গভীর ঘুম এসে গ্রাস করল ওকে।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে মনে করতে পারছে না সায়ন্তন। কলিং বেলের আওয়াজ, ফোনের শব্দ, দরজায় দুমদুম ধাক্কা—সব মিলিয়ে ঘুমের জগৎ থেকে কে বা কারা জোর করে যেন টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে আনল সায়ন্তনকে। হোটেলের তোয়ালেটাকে জড়িয়ে শুয়ে পড়েছিল সায়ন্তন। সেটা পরেই ঘুম চোখে দরজাটা খুলল। বাইরে দুজন গাঁট্টাগোঁট্টা লোক দাঁড়িয়ে আছে।

“আপনি কি ডাক্তার সায়ন্তন দত্ত?”

“হ্যাঁ। কী ব্যাপার?”

“আপনি আস্তিক দত্তর নাতি?”

“হ্যাঁ, কী হয়েছে বলবেন তো?”

“আমরা লোকাল থানা থেকে আসছি। আপনি এখুনি রেডি হয়ে নীচে আসুন। আমরা রিসেপশনে অপেক্ষা করছি। তাড়াতাড়ি আসবেন।”

“কেন?”

“যা বলছি, তাই করুন।” জোরগলায় কথাটা বলে লোক দুটো লিফটের দিকে চলে গেল।

সায়ন্তন ভাবল, সে সারারাত গাড়ি চালিয়ে এসেছে, কিন্তু কোনও অ্যাকসিডেন্ট তো করেনি। একটা বিড়ালকেও আঘাত করেনি ও। তাহলে পুলিশে কেন তলব করবে? অন্য কোনও অ্যাকসিডেন্ট কেসে ফাঁসিয়ে দিতে পারে কি? অসম্ভব কিছুই নয়। কলকাতা পুলিশ হলে তবু একে ওকে ফোন করে ম্যানেজ করা যেত। কিন্তু এ তো অন্য রাজ্য। উড়িয়া পুলিশ কি ওকে পাত্তা দেবে? সাতপাঁচ ভেবে জামা-প্যান্ট পরে নীচে এল সায়ন্তন। ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে দশটা। তার মানে প্রায় চার ঘণ্টা টানা ঘুমিয়েছে ও।

রিসেপশনে এসে দেখল, পুলিশের উর্দি পরা আরও বেশ কয়েকজন কনস্টেবল আছে। একজন অফিসার ওকে দেখে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন, “আপনি সারারাত গাড়ি চালিয়ে একা কলকাতা থেকে পুরী এসেছেন শুনলাম?”

“হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন।”

“কেন এসেছেন জানতে পারি?”

“আমার দাদু, ষাটের কোঠায় বয়স, নাম আস্তিক দত্ত, গত চারদিন ধরে নিরুদ্দেশ। আমরা কলকাতা পুলিশে মিসিং ডায়রিও করেছি। গতকাল সন্ধ্যায় হঠাৎ জানতে পারি তিনি অবনীশ সেন নামে এক বন্ধুর সঙ্গে পুরীতে এসেছেন। কিন্তু কোনও কারণে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন না। বাড়ির লোক সবাই খুব চিন্তিত। এখানে আসার জন্য রাতে কোনও ট্রেনে টিকিট পেলাম না। তাই নিজের গাড়ি চালিয়ে চলে এলাম।”

“হুম! আজকে ভোরে ক’টায় পুরী ঢুকেছেন?”

“সূর্যের আলো ফোটার সঙ্গে-সঙ্গেই প্রায়। ভোর পাঁচটা হবে।”

অফিসার গম্ভীর গলায় জানালেন, “ঠিক ওই সময়েই পুরীতে একটা মার্ডার হয়েছে।”

“মার্ডার! কে মার্ডার হয়েছে?” আঁতকে উঠল সায়ন্তন।

“আপনার দাদুর সঙ্গে যিনি এসেছিলেন। অবনীশ সেন।”

“হোয়াট! আর আস্তিক দত্ত, মানে আমার ছোটো দাদু—তিনি ঠিক আছেন তো?”

“তাঁকে তো পাওয়া যাচ্ছে না। এই হোটেলের সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে বোঝা যাচ্ছে ওঁরা পৌনে চারটে নাগাদ বেরিয়েছিলেন। ওই সময় অনেক বোর্ডারই সানরাইজ দেখার জন্য সমুদ্রের ধারে যান।”

কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে চুপ করে রইল সায়ন্তন। জানতে চাইল, “খুনটা কোথায় হয়েছে?”

অফিসার জানালেন, “এই মেরিন ড্রাইভ ধরে সোজা গেলে লাইট হাউস পড়বে। সেটা ছাড়িয়ে আরও কিছুটা গেলে যেখানে হোটেলগুলো সব শেষ হয়ে গেছে, রাস্তাটা ডানদিকে বাঁক নিয়েছে বাইপাস হয়ে, ওখানেই রাস্তার পাশে ফাঁকা নীচু জমিতে ঘাস আর উলু ঝোপের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়েছিল লাশটা। একজন ডাব বিক্রেতা সাইকেলে করে আসছিল ডাবের কাঁদি নিয়ে। দেখতে পেয়ে থানায় গিয়ে খবর দেয়।”

“খুনটা কীভাবে হল?”

“মাথার পিছনে ভারী কিছু দিয়ে জোরে আঘাত করেছে।” একটু থেমে তিনি প্রশ্ন করলেন, “ড. দত্ত, আপনি গাড়ি নিয়ে কোন রাস্তা দিয়ে ঢুকেছিলেন পুরীতে?”

কাঁপা গলায় সায়ন্তন উত্তর দিল, “আ-আমি? ওই বাইপাস ধরেই এসেছি। গুগল ম্যাপে তো ওই শর্টকাট রাস্তাটাই দেখাল।”

“আচ্ছা, তার মানে এটাও হতে পারে যে আপনিই ওই মার্ডারটা করেছেন। আপনিও একজন সাসপেক্ট।”

“কী বলছেন আপনি? এখানে আমার মোটিভ কী? তাছাড়া আমি যদি খুন করব তাহলে ধরা দেওয়ার জন্য একই হোটেলে এসে শুয়ে থাকব?”

“হ্যাঁ, এগুলো প্রমাণসাপেক্ষ। আপনি কিন্তু আমাদের পারমিশন ছাড়া পুরী ছেড়ে যেতে পারবেন না। তদন্তে পুরো কো-অপারেট করতে হবে। আপনার গাড়ির চাবিটা এবং আইডি কার্ড আমাকে দিন। আর আমাদের সঙ্গে থানায় চলুন। আরও কিছু জিজ্ঞাসাবাদ আছে। সব ডিটেল নোট করতে হবে।”

সায়ন্তন ভাবল, এসব বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে লাভ নেই। বরং সহযোগিতা করলে তাড়াতাড়ি বিশ্বাস অর্জন করা যাবে। তাহলে এখান থেকে বেরোতেও পারবে। কিন্তু ছোটো দাদু কোথায় গেল? আর প্রফেসর সেনকে খুনই-বা করল কে? তাঁরা কী জন্য যে পুরী এসেছিলেন সেটাও তো জানা গেল না।

পুলিশের জিপে উঠে থানায় গিয়ে বসে রইল অনেক্ষণ। হাজারো প্রশ্ন, একই জিজ্ঞাস্য বার বার রিপিট করছিল ওরা। উত্তর দিতে দিতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিল সায়ন্তন। বাড়িতে বাবা-মার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। মা শুনেই হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। বাবা বললেন, কলকাতা পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে উনি কথা বলবেন। সোম শুনে বলল, “আমরা পরের ট্রেনেই পুরী যাচ্ছি। তোমাকে একা ছাড়া উচিত হয়নি।”

“পাগলামো করিস না। আমি এখনও ঠিক আছি। পুলিশ আমাকে অ্যারেস্ট করেনি। শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কিছু না পেলে ছেড়ে দেবে।”

অবশ্য ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কলকাতার পুলিশ কমিশনারের অফিস থেকে ফোন গেল পুরী সি-বিচ থানায়। ফলে সায়ন্তনকে ওরা কিছু সইসাবুদ করিয়ে ছেড়ে দিল, “আপনি এখন যেতে পারেন ড. দত্ত। আপনার উপর কোনও অ্যালিগেশন নেই।”

কিন্তু ছোটো দাদুকে ছেড়ে কিছুতেই ফিরে আসতে মন চাইছে না সায়ন্তনের। ছোটো দাদু আজকে সকাল পর্যন্ত পুরীতে ছিলেন, কিন্তু তারপর কোথায় গেলেন? এখান থেকে কেউ কি কিডন্যাপ করেছে ওঁকে?

সায়ন্তন অফিসারকে বলল, “আমি আমার ছোটো দাদুকে খুঁজতে এখানে এসেছিলাম, যতক্ষণ না তাঁর খোঁজ পাচ্ছি, কোথাও যাব না।”

অফিসার জানালেন, “তাঁর খোঁজ চলছে। সব আউট-পোস্টে তাঁর ছবি পাঠানো হয়েছে। বেঙ্গালুরু ইউনিভার্সিটির আর একজন খুব নামি প্রফেসর ড. সুন্দর সুব্রহ্মনিয়মও পুরী হোটেলে ছিলেন। তাঁকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর জিনিসপত্র সব রুমেই পড়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে এসব ঘটনাগুলো একসঙ্গে জুড়ে আছে একে অপরের সঙ্গে। কোনও সাংঘাতিক ক্রিমিনাল দল কাজ করছে এসবের পিছনে। হোম ডিপার্টমেন্ট দিল্লিতে যোগাযোগ করছে। দেখা যাক কী খবর আসে।”

সায়ন্তনের আরও চব্বিশ ঘণ্টা কেটে গেল পুরীতে। কিছুটা সময় সমুদ্রের ধারে বালির উপর হেঁটে, বাকি সময় পুলিশ স্টেশনে। মানুষের ঢল হু হু করে আসছে, জলে নামছে, ঢেউয়ে স্নান করছে, কত কিছু কিনছে, আনন্দ করে খাচ্ছে, তারপর আবার দলবেঁধে চলে যাচ্ছে। আবার পরের দিন শুধু মুখগুলো পালটে যাচ্ছে, কিন্তু উৎসাহে কোনও ভাটা নেই। সমুদ্রের ধারে হরেক মাছের পসরা, রাশি রাশি ডাব, খেলনার দোকান, পোশাকের দোকান, খাবারের স্টল—সবাই ব্যস্ত। সায়ন্তন বেশ ক’টা পোশাক কিনেছে ফুটপাথ থেকে। সেগুলো পরে ঘুরলে এখন আর তাকে ডাক্তার বলে চেনা যাচ্ছে না।

ও হাঁটতে হাঁটতে বিকালের দিকে গেল খুনের স্পটে। রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে তার ডানদিকে নীচু জমি। বড়ো ঘাস আর গুল্ম লতাপাতায় ভরতি। এই ঘাসের বনেই পড়ে ছিল অবনীশ সেনের লাশ। জায়গাটা বেশ ফাঁকা, নির্জন। শোঁ শোঁ করে নোনতা সমুদ্রের হাওয়া চলছে। চুলগুলোকে উড়িয়ে এলোমেলো করে দিচ্ছে বার বার। ঢালু জায়গায় কিছুটা নেমে অনেকক্ষণ এদিক ওদিক খোঁজার পর থেঁতলানো ঘাসের জায়গাটা খুঁজে পেল সায়ন্তন। এখনও রক্ত জমাট বেঁধে আছে ঘাসের গোড়ায়। ভাবার চেষ্টা করল, অবনীশবাবুকে এখানেই মারা হয়েছে, না অন্য কোথাও মেরে লাশটা নিয়ে এসে এখানে ফেলা হয়েছে। যুক্তি দিয়ে ভাবলে দেখা যায় মার্ডার যদি অন্য কোথাও হত তাহলে লাশটা ভোরবেলা পুরীর সি-বিচের এত কাছে ফেলার বোকামো কেউ করত না। দূরে কোথাও ফেললে পুলিশের পক্ষে খুঁজে পাওয়া আরও সমস্যা হত। সায়ন্তনের মনে হচ্ছে মার্ডারটা এখানেই হয়েছে। হঠাৎ করে এবং তাড়াহুড়ো করে লাশটা এই ঘাসের মধ্যে ফেলে দিয়ে চলে গেছে। তাহলে মার্ডারের ঠিক আগে নিশ্চয়ই ধ্বস্তাধ্বস্তি হয়েছে। রাস্তার পাশে ফুটপাথের উপর বালির মধ্যে ভালো করে লক্ষ করছিল সায়ন্তন। যদি কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পর কিছুটা দূরে বালির মধ্যে একটা চকচকে জিনিসে চোখ আটকে গেল ওর। কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে ঘাসের গোড়া থেকে টেনে বার করল একটা ভাঙা চশমা। পাশেই একটা ভাঙা পাথরের গায়ে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত।

গোল্ডেন ফ্রেমের এই চশমাটা ছোটো দাদুর নয়। তার মানে নিশ্চয়ই অবনীশ সেনের। তার মানে এখানেই হয়েছিল ধস্তাধস্তি। সেই সময় নিশ্চয়ই কেউ রড দিয়ে ওঁর পিছনে খুব জোরে মারে। উনি মুখ থুবড়ে পড়ে যান। মারা গেছেন বুঝতে পেরে তাড়াহুড়ো করে লাশটা চাগিয়ে নিয়ে গিয়ে নীচে ঘাসের জমিতে ফেলে দেওয়া হয়।

“কিছু খুঁজছেন বাবু?”

আওয়াজ শুনে উঠে দাঁড়াল সায়ন্তন। দেখল একজন ডাব বিক্রেতা সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় সব ডাব শেষ। সি-বিচ থেকে দিনের শেষে বাড়ি ফিরছে। সন্ধ্যা নামছে পিছনে।

সায়ন্তন উত্তর দিল, “হ্যাঁ, আসলে গতকাল ভোরে এখানে একটা খুন হয়েছে। যিনি মারা গেছেন আমি ওঁর আত্মীয়।”

“ও আচ্ছা, বাবু একটা কথা কইবু? মুঁ পুরা ঘটনাকু দূরারু দেখিলি!”

“তাই নাকি? পুলিশকে বলেছেন?”

“না বাবু, পুলিশের কাছে ভয়ে যাইনি। কথায় বলে পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা।”

“কী দেখেছিলে সেদিনকে আমাকে ভালো করে বলো।”

“আমি ওইদিকে রাস্তা ধরে আসছিলাম। তখন ভোরের আলো ফোটেনি। রাস্তার আলোগুলো জ্বলছিল। সেই আলোয় দূর থেকে দেখলাম দুজন পাঞ্জাবি পরা লোক হাঁটতে হাঁটতে এখানে এল। তারপর একটা কালো বড়ো গাড়ি এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। সেটা থেকে চারজন লোক নামল। ওদের সঙ্গে কিছু কথা হচ্ছিল। পিছনে আবার একটা নীল গাড়ি এসে থামল। সেটা থেকে একজন সাদা ধুতি-কুর্তা পরা লোক এগিয়ে এল। হঠাৎ ওদের মধ্যে চেঁচামেচি শুরু হয়। তারপর ধাক্কাধাক্কিতে একজন ঠেলা দিতে একটা পাঞ্জাবি পরা লোক পড়ে গিয়ে মাথায় লাগল। দুজন পড়ে যাওয়া লোকটাকে চ্যাংদোলা করে ছুড়ে ফেলে দিল ঘাসের মধ্যে। তারপর গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে স্পিডে বেরিয়ে গেল ভুবনেশ্বরের দিকে। নীল গাড়িটাও স্বর্গদ্বারের দিকে চলে গেল। ঠিক তখনই আর একটা কালো গাড়ি এসে হাজির হল সেখানে। দুজন লোক নেমে আর একজন পাঞ্জাবি পরা লোককে জোর করে তুলে নিল গাড়িতে। তারপর সেটাও চলে গেল ওইদিকে।”

“হুম! গাড়ির নম্বর দেখেছিলে?”

“না বাবু, আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। গাড়ির নম্বর দেখার কথা মাথায় ছিল না।”

সায়ন্তন সঙ্গে সঙ্গে ফোন খুলে নেটে সার্চ করে একটা কালো স্করপিওর ছবি বের করে দেখাল ওকে, “এইরকম গাড়ি?”

লোকটা এক পলক দেখেই মাথা নাড়ল—“হ্যাঁ বাবু, একদম এরকম দেখতে।”

অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। বলে একটা পাঁচশ টাকার নোট লোকটার হাতে গুঁজে দিল সায়ন্তন। সেদিন রাত্রে যে কালো স্করপিওটা ওর পিছনে আসছিল, সেটার লাস্ট চারটে ডিজিট মনে আছে সায়ন্তনের। ‘দুসাতিশূ’ মানে, দুই সাত তিন শূন্য। এখন একবার থানায় যাওয়ার দরকার।

স্বর্গদ্বারের দিকে কিছুটা যেতেই একটা টোটো পেয়ে গেল সায়ন্তন। সন্ধ্যার ভিড় ঠেলে সি-বিচ রোড পেরিয়ে বাঁদিকে বেঁকে গভর্নর রোডের ক্রসিংয়ে সি-বিচ থানা। সায়ন্তন থানায় ঢুকে আই.ও-র খোঁজ করতে একজন কনস্টেবল জানাল, “স্যার রাউন্ডে গেছেন। আপনি বসুন।”

আধঘণ্টা বসার পর অফিসার এলেন। সায়ন্তন তাঁকে বিকালের ঘটনাটা খুলে বলল। তিনি শুনে বললেন, “আপনি একবার ভুবনেশ্বরে গিয়ে পুলিশ হেড-কোয়ার্টারে ক্রাইম ডিপার্টমেন্টে সিনিয়র ইন্সপেক্টর অনন্ত মোহান্তির সঙ্গে দেখা করুন। উনি আপনার সঙ্গে কো-অপারেট করবেন। কেসটা এখন ওঁর হাতে।”

“এখন যাব?”

“এখন কোথায় যাবেন? কালকে সকাল দশটার পরে অফিসে থাকবেন স্যার।”

“আচ্ছা, তাহলে আজকে রাতে পুরীতেই থেকে যাই।”

“হ্যাঁ, তাই করুন।”

সায়ন্তন থানা থেকে বেরিয়ে পুরীর মন্দিরের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

কলকাতা থেকে নেপাল

মিতুলের মনের মধ্যে উথালপাথাল চলছে সারারাত ধরে। তেমনভাবে ঘুমটাও হয়নি। সোমের নিরুদ্দেশ হওয়া দাদু আস্তিক দত্তকে নিয়ে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত যা তোলপাড় চলল তাতে মাথা পুরো ঘেঁটে আছে। সায়ন্তনদার সঙ্গে আগে আলাপ ছিল। কিন্তু ও যে এরকম একরোখা, জেদি সেটা জানত না। কালকে সে যখন দুম করে একাই গাড়ি নিয়ে পুরী চলে গেল ছোটো দাদুকে খুঁজতে তখন মিতুল বুঝতে পারল ওদের মধ্যে বন্ডিংটা কত দৃঢ়। ছোটো দাদুকে নিয়ে সে যত চিন্তা করছে তত যেন রহস্যের অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। নাহ্‌! এর শেষ দেখে তবেই সে ছাড়বে। সকালে ফ্রেশ হয়েই ছুটল দত্তবাড়িতে।

সোম ওকে দেখে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী রে? সকাল সকাল কী ব্যাপার?”

“তোর দাদার খবর পাওয়া গেছে?”

“হ্যাঁ, এইমাত্র ফোন এল পুরী থেকে, ওকে একটা মার্ডার কেসে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।”

“সে কী!”

“হ্যাঁ, মনে হচ্ছে ওকে কেউ জোর করে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। বাবা এক বন্ধুর সঙ্গে পুলিশ কমিশনারের কাছে গেছেন। দেখা যাক কী হয়।”

“ছোটো দাদুর কোনও খোঁজ পাওয়া গেছে?”

“জানি না। কিছুই বুঝতে পারছি না। সায়ন্তনদা ফোন করলে ফোন ধরছে না।”

মিতুল একটু চিন্তা করে বলল, “শোন, আমি তোর ছোটো দাদুর ঘরটা একবার ভালো করে দেখব। বুঝলি? তুই থাকবি আমার সঙ্গে।”

“বেশ, চ’ উপরে।”

বাড়িটা অনেক পুরোনো। তবে ঠিকঠাক মেন্টেনেন্স হয় বলে নতুনের মতোই আছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলার মাঝামাঝি একটা ঘর ছোটো দাদুর। ঘরটা খুব বড়ো নয়। রাশি রাশি বইপত্রে ঠাসা। গতকাল এসে মোটামুটি চোখ বুলিয়ে গিয়েছিল মিতুল। আজকে চেয়ার টেনে বসল লেখার টেবিলের সামনে। ডাঁই করে রাখা খাতা, কাগজ, ম্যাগাজিন, কত বই! সব একটা একটা করে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল মিতুল। সোম ছোটো দাদুর খাটের উপর শুয়ে শুয়ে ফোন দেখছিল। অনেকক্ষণ পর একটা ফোন আসতে উঠে গেল। তারপর এসে মিতুলকে জানাল, “সায়নদাকে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু ছোটো দাদুকে পাওয়া যায়নি। আর প্রফেসর অবনীশ সেন খুন হয়েছেন।”

মিতুল পুরো ঘটনাটা শুনে আবার মুখ ডোবাল খাতার মধ্যে। সে নিজে একটা ডায়েরি নিয়ে এসেছে। তাতে কিছু কিছু পয়েন্ট নোট করছে। কাজটা অনেকটাই রিসার্চের মতো। অন্ধকারে হাতড়ানো। একটা ঘটনা অন্ধকারের মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। আড়াই হাজার বছর আগের একটা ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন লেখায়, ম্যাগাজিনের প্রবন্ধে, খাতায়। কিছু জায়গাতে পেন দিয়ে দাগ দিয়েছেন ছোটো দাদু। পাশে নোট লিখে গেছেন ক্ষুদে অক্ষরে। বউদ্ধধর্মের প্রবক্তা গৌতম বুদ্ধের মৃত্যু নিয়ে মিতুলের কোনও ধারণাই ছিল না। কোন ছোটোবেলায় স্কুলের বইয়ে বুদ্ধের কথা পড়েছিল। পরে বড়ো হয়ে বাবার সঙ্গে সারনাথে বেড়াতে গেছে একবার। তখন দ্বিতীয়বার বুদ্ধের সঙ্গে পরিচয় হয়। কিন্তু তেমনভাবে মনে দাগ কাটার মতো কিছু ছিল না। এখন একটার পর একটা বুদ্ধের উপর বই পড়তে গিয়ে একটা ঘোরের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে মিতুল। আড়াই হাজার বছর আগে একটা মানুষ যা বলে গেছেন, যে পথ ভারতবর্ষের মানুষকে দেখিয়ে গেছেন, যে দর্শন শিখিয়ে গেছেন তা যেন আরও আড়াই হাজার বছর পরের কোন উন্নত সভ্যতার কথা। একটা লম্বা দিস্তা কাগজের সাদা খাতায় অনেক কিছু লেখা ছিল। আস্তিক দত্তের নিজের হাতের লেখা। অনেকগুলি প্রবন্ধ। সেগুলোও খুঁটিয়ে পড়ছিল মিতুল।

এক জায়গাতে লেখা তিব্বতি মহামন্ত্র ‘ওম মণি পদ্মে হুম’, মন্ত্রের অর্থ ব্যাখ্যা করা আছে নীচে,

‘ওম: এই ধ্বনিকে ব্রহ্মাণ্ডের শব্দ রূপে দেখা হয়। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শব্দতরঙ্গ ওম ধ্বনির মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। বউদ্ধদের মত অনুসারে, ওম শব্দ আমাদের সব অহংকার দূর করে স্বর্গীয় শক্তি জাগিয়ে তোলে।

মা: মা ধ্বনি উচ্চারণের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে ঈর্ষার বিনাশ ঘটে।

নি: বউদ্ধ মত অনুসারে সবরকম কামনা বাসনা থেকে আমাদের মুক্ত করে ‘নি’ ধ্বনি। এটি ধৈর্য ধরার শিক্ষা দেয়।

পদ: সবকিছুকে সমান দৃষ্টিতে দেখার শিক্ষা দেয় ‘পদ’ ধ্বনি।

মে: এই দুনিয়ার কোনও কিছুই আমার নয়, সবই একদিন পঞ্চভূতে লীন হয়ে যাবে। মনের মধ্যে এই অনুভূতি জাগিয়ে তোলে ‘মে’ ধ্বনি।

হুম: মনের ঘৃণা ও আক্রমণাত্মক আচরণ দূর করে মনের মধ্যে জ্ঞানের আলো জাগিয়ে তোলে ‘হুম’ ধ্বনি।’

আচমকা খাতার শেষের দিকে একটা পাতা মনে হল জোর করে ছেঁড়া। হঠাৎ কেউ যেন পাতাটা ছিঁড়ে নিয়েছে এক টানে। মিতুল ভালো করে লক্ষ করল, পরের পাতায় অস্পষ্ট কিছু ছাপ পড়েছে উপরের পাতার লেখার।

একটা পেন্সিল নিয়ে হালকা করে পাতাটার উপর থেকে নীচে ঘষতে শুরু করল মিতুল। ফলে অস্পষ্ট লেখাগুলো কিছুটা স্পষ্ট হল। বেশ কয়েকটা শব্দ তিরচিহ্ন দিয়ে উপর থেকে নীচে লেখা হয়েছে। মিতুল উত্তেজিত গলায় সোমকে ডেকে বলল, “দেখ, এখানে কিছু লেখা রয়েছে।”

‘ফুংলিং > রানিপুল > তুলসীধারা > তোরণদেন > তোসিরাম > রামচে > কে.এস.বি.সি. > ওখটাং মনাস্ট্রি’

সোম ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল শব্দগুলো, “কী এগুলো বুঝতে পারছিস?”

মিতুল একটা কাগজে ওই নামগুলো পরপর লিখে নিয়ে বলল, “এগুলো কোনও জায়গার নাম। কিন্তু কোথাকার জায়গা?”

“ছোটো দাদু ট্রেকিংয়ের লোক। তাই এগুলো কোনও পাহাড়ি জায়গাই হবে নিশ্চয়ই।”

“হুম! সেরকমই মনে হচ্ছে। একবার গুগলে সার্চ করে দেখ তো কিছু খুঁজে পাওয়া যায় কি না।”

সোম সঙ্গে সঙ্গে ফোনে সার্চ করল। কিন্তু গুগল কিছুই বলতে পারল না।

মিতুল মন্তব্য করল—“এগুলো সম্ভবত অচেনা কিংবা স্বল্পপরিচিত কোনও স্থান। পাহাড়ি কোনও ছোট্ট জনপদ। তাই গুগল আইডেন্টিফাই করতে পারছে না।”

“তাহলে?”

“আমার এক দিদি আছে, সে প্রায়ই পাহাড়ে ট্রেকিংয়ে যায়। আমি তার সঙ্গে একবার পুরুলিয়ায় গিয়েছিলাম রক ক্লাইম্বিং কোর্স করতে। তাকে জিজ্ঞেস করি একবার।”

মিতুল নিজের ফোন থেকে একটা নম্বর ডায়াল করল, “হ্যালো, কাকলিদি, কেমন আছো? … আমি ভালো আছি, বাড়ির সবাই ভালো। শোনো না, একটা দরকারে তোমাকে ফোন করলাম। তোমার ফোনে একটা ছবি পাঠাচ্ছি। তাতে কয়েকটা জায়গার নাম লেখা আছে। সম্ভবত কোনও পাহাড়ি জায়গা। একটু দেখে বলবে কোথায় এগুলো?”

“আমি এখন লোকাল ট্রেনে। প্রচণ্ড ভিড়। রাতে বাড়ি ফিরে তোকে ফোন করছি।”

কাকলিদির ফোনটা কেটে যেতে মিতুল ধড়ফড় করে উঠে পড়ল, “সকাল থেকে সন্ধ্যা হয়ে গেল তোদের বাড়িতে। মা কী ভাববে কে জানে। আমি যাই, বুঝলি।”

সোম হেসে উত্তর দিল, “কাকিমা কিচ্ছু ভাববে না। আমি কাকিমার সঙ্গে তিনবার ফোনে কথা বলেছি। সব ঠিক আছে।”

“ওকে, বাই। আমি এই ক’টা বই নিয়ে যাচ্ছি। এখনও পড়তে বাকি আছে।” বলে সন্ধ্যার রাস্তায় এসে হাঁটতে শুরু করল মিতুল। স্ট্রিট ল্যাম্পগুলো সবক’টা জ্বলছে না। পা চালিয়ে মোড়ে এসে একটা বাসে উঠে পড়ল সে।

কাকলিদির মেসেজ এল অনেক রাতে, ‘এই জায়গাগুলো সব নেপালে। কাঞ্চনজঙ্ঘা বেস ক্যাম্পের ট্রেকিং রুট। ফুংলিং নেপালের উত্তর-পূর্বে একটা ছোট্ট শহর। সেখান থেকে প্রথমে গাড়িতে, তারপর হেঁটে কে.এস.বি.সি. অর্থাৎ কাঞ্চনজঙ্ঘা সাউথ বেস ক্যাম্পে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু ওটাং মনাস্ট্রির নাম আমি কোনোদিন শুনিনি। তবে ওরকম ছোটোখাটো অনেক দুর্গম গুম্ফা হিমালয়ের কোলে লুকিয়ে বসে আছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে সেগুলো জানা সম্ভবও নয়।’

ছোটো দাদুর সঙ্গে ওটাং মনেস্ট্রির কী সম্পর্ক? উনি কি এখানে গিয়েছিলেন কখনও? সায়ন্তনদার মুখে শোনা ‘হার্ট অফ গড’ কথাটা কানে বাজছে। বুদ্ধের মৃত্যর পর নাকি চিতাভস্মের মধ্যে একটা বড়ো লাল পাথর পাওয়া গিয়েছিল। অনুগামীরা তার নাম দিয়েছিলেন ‘হার্ট অফ গড’। তবে অনেক ইতিহাসবিদ এটাকে অলীক কল্পনা বলে বাতিল করে দিয়েছেন।

প্রায় সারারাত জেগে বাকি বইগুলো পড়া শেষ করল মিতুল। এর মধ্যে একটা বই হল ‘অগ্নিযুগের বিস্মৃত বিপ্লবীরা।’ সেই বইটার পাতা ওলটাতে গিয়ে মিতুলের চোখে পড়ল দেবেশ আর শৈবাল নামে দুই বিপ্লবীর জায়গাতে পেন্সিল দিয়ে আন্ডারলাইন করা আছে। বৃদ্ধ বড়ো দাদুও বিপ্লবী সত্য গুপ্ত, দেবেশ, শৈবাল—এঁদের নাম নিয়েছিলেন। তিনি কি আরও কিছু জানেন? এই দত্তবাড়ির সঙ্গে কি স্বাধীনতার আগে বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল? বইয়ের মধ্যে একটা পুরোনো হাতে লেখা চিঠি থেকে জানা গেল, দেবেশ থাপার আসল বাড়ি ছিল নেপালে। অত্যাচারী জেনারেল মার্টিন হগকে হত্যা করার পর দেবেশকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাহলে কি দেবেশ নিজের কাজ সম্পূর্ণ করে নেপালে ফিরে গিয়েছিল? অনেকগুলো প্রশ্নের ধোঁয়াশা মাথার মধ্যে ঘুরছে। কীভাবে এর উত্তর পাওয়া যাবে জানা নেই। মিতুলের মনে হল সায়ন্তনদাকে একটা ফোন করা উচিত। ওর মতামতটা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটা ডায়াল করল ফোনে। রিং হচ্ছে।

তবে সায়ন্তনদা ফোন ধরে যা বলল, তাতে দুইয়ে দুইয়ে চার করতে অসুবিধা হল না মিতুলের।

“হ্যাঁ, ভালোই হল তুমি ফোন করলে। কয়েকটা কথা বলছি মন দিয়ে শোনো। আমি এখন বসে আছি ভুবনেশ্বরে ঊড়িষ্যা পুলিশের হেড-কোয়ার্টারে। ইন্সপেক্টর মোহান্তি ইন্টেলিজেন্স মারফত খবর পেয়েছেন একটা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম র‍্যাকেট ছোটো দাদুকে পুরী থেকে কিডন্যাপ করে বাই রোড নেপালে নিয়ে গেছে। সম্ভবত মুম্বইয়ের কুখ্যাত মাফিয়া শাকিল এর মধ্যে ইনভলভড। মাঝে বেশ কয়েকবার ওরা গাড়ি পালটেছে রাস্তায়। তাই চেকপোস্টে ধরা পড়েনি। ইন্টেলিজেন্সের এজেন্ট ইতিমধ্যে নেপালে ওদের ফলো করছে। মোহান্তি আজকের দুপুরের ফ্লাইটে ভুবনেশ্বর থেকে কলকাতা হয়ে কাঠমান্ডু যাচ্ছেন। আমিও ওঁর সঙ্গে যাব বলে দিয়েছি। তুমি একটা কাজ করো, সোমকে বোলো আলমারি থেকে আমার পাসপোর্ট, কিছু পোশাক, জ্যাকেট, ক্রেডিট কার্ড একটা ব্যাগে গুছিয়ে কলকাতা এয়ারপোর্টে এসে দিয়ে যেতে।”

“কাঠমান্ডু থেকে তোমরা কোথায় যাবে?”

“তা জানি না।”

মিতুল দৃঢ় গলায় বলল, “মনে হচ্ছে আমি জানি।”

“মানে? তুমি কীভাবে জানলে?”

“তোমার ফোনে একটা ছবি পাঠাচ্ছি দেখো। এটা ছোটো দাদুর খাতা থেকে আমরা খুঁজে পেয়েছি। সম্ভবত কাঞ্চনজঙ্ঘা বেস ক্যাম্পের কাছে ওটাং মনাস্ট্রিতে যাচ্ছে ওরা।”

“ওটাং মনাস্ট্রি? কী আছে সেখানে?”

“তা জানি না। তবে মনে হচ্ছে ওরা একটা দুষ্প্রাপ্য লাল পাথর, যার নাম ‘হার্ট অফ গড’, সেটাই খুঁজতে যাচ্ছে। যেটার কথা শুনেছিলে তুমি।”

“তাই নাকি? এটা একটা দারুণ আবিষ্কার। আমি এখুনি মোহান্তিকে জানাচ্ছি।”

ফোনটা কেটে গেল। মিতুল পড়ল আতান্তরে। খুব ইচ্ছা করছে সায়ন্তনদার সঙ্গে ঝুলে পড়তে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা কলকাতা ছুঁয়ে উড়ে যাবে নেপালে। তারপর দুর্গম ট্রেকিং রুটে বেরিয়ে পড়বে কাঞ্চনজঙ্ঘা বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। সেখানে পাহাড়চূড়ায় একটা ঘাত-প্রতিঘাতের সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তারপর শেষ পর্যন্ত কি পাওয়া যাবে ‘হার্ট অফ গড’? ঘরের মধ্যে উঠে পায়চারি করতে শুরু করল মিতুল। মা এখন বাড়িতে নেই। বাবা কাজের ঘরে বসে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছে। বাবাকেই গিয়ে বলতে হবে। গুটি গুটি পায়ে সেদিকেই এগোল মিতুল।

নেপাল

সোয়ালটি রিসর্টের ক্যাসিনোতে আধো অন্ধকার কেবিনের মধ্যে তিনপাত্তির আসর তখন জমে উঠেছে। অ্যান্ড্রু বাফেটের সোনালি চশমার পিছনে চোখ দুটো ঘোলাটে হয়ে এসেছে। নীলচে সুটের নীচে সাদা চামড়াটা ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠছে। তাঁর সামনে রাখা রঙিন কয়েনগুলো ক্রমশ পিছলে চলে যাচ্ছে উলটোদিকে বসে থাকা তামাটে ভারতীয়ের হাতে। ইতিমধ্যে হাফ মিলিয়ন ডলারের জুয়া খেলে ফেলেছেন তিনি। প্রথমে ভালোই জিতছিলেন। তাই মনের মধ্যে একটা প্রফুল্লতা কাজ করছিল। ঝোঁকের মাথায় বেশি অঙ্কের বাজি ধরতে গিয়ে যত গণ্ডগোল হয়েছে। ছেড়ে বেরিয়েও আসতে পারছেন না। সব টাকাই তাহলে জলে যাবে। সামনে বসা অল্পবয়সি ভারতীয় ছেলেটিকে প্রথমদিকে তেমন পাত্তা দেননি মি. বাফেট। কিন্তু খেলা যত গড়াচ্ছে, দ্রুত হাতে কার্ড পাসিং, থ্রোয়িং, আত্মবিশ্বাস এসব কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছে ছেলেটি এ-লাইনে নতুন নয়। মি. বাফেট ভাবছেন বিদেশ-বিভূঁইয়ে এসে জুয়ার ঠেকে এক কাঁড়ি টাকা নষ্ট না করলেই হত। বার বার হাতঘড়ির দিকে চোখ চলে যাচ্ছে মি. বাফেটের। কাঠমান্ডুতে এসে জুয়া খেলার জন্য অর্থ বা সময় কোনোটাই নষ্ট করার ইচ্ছা নেই। রাত বাড়ছে। এখনও কেন খবরটা আসছে না, সেটা ভেবেই অস্থির হয়ে উঠছে মন। আবার একটা সিগার ধরালেন তিনি।

ভিক্তর বুধানস্কি কালো স্যুট পরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল পিছনের দরজা দিয়ে। মি. বাফেটের পিছনে দাঁড়িয়ে কোমর ঝুঁকিয়ে কানে কানে কিছু একটা বলল তাঁকে। মি. বাফেটের চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। লাফিয়ে উঠলেন চেয়ার ছেড়ে, “আই কুইট! তুমি দারুণ খেলেছ। অনেক অভিনন্দন।” কথাটা বলে বেরিয়ে এলেন মি. বাফেট।

হোটেলের লিফটে উঠে বুধানস্কি মুখ খুলল, “ড. নিসিকাওয়া, প্রফেসর সুন্দর সুব্রহ্মনিয়ম, প্রফেসর পেট্রিয়া কেলভিন—এঁরা সবাই এখন কাঠমান্ডুতে।”

মি. বাফেট নিজের বাঁহাতের তালুতে একটা ঘুসি মেরে বললেন, “আর ইউ শিওর? খরবটা পাকা তো?”

“একশ শতাংশ পাকা। জিনিসটা নিশ্চয়ই এখানেই পাওয়া যাবে। আপনি যদি সবুজ সঙ্কেত দেন তাহলে লোক লাগিয়ে সবক’টাকে তুলে নিয়ে আসি।”

“না, এই বিষয়ে তাড়াহুড়ো করা ঠিক হবে না। তোমার লোকেদের বলো ছায়ার মতো ওদের সঙ্গে লেগে থাকতে। প্রতিমুহূর্তের রিপোর্ট আমার চাই। ওরা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—এভরিথিং। বুঝেছ?”

“হ্যাঁ, স্যার।”

একটু থেমে বুধানস্কি আবার বলল, “একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে স্যার।”

“কী হয়েছে?”

“ইন্ডিয়াতে শাকিলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়মকে অনুসরণ করার জন্য। সুব্রহ্মনিয়ম বেঙ্গালুরু থেকে গা-ঢাকা দিয়ে পুরীতে এসে লুকিয়ে ছিলেন। সেখানে কলকাতার দুজন লোকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন গোপনে। শাকিল অনেক চেষ্টা করে প্রফেসরের খোঁজ পায়। কিন্তু অতি তৎপর হয়ে ব্যাপারটাকে গুলিয়ে ফেলেছে। কলকাতা থেকে আসা একজন ইতিহাসের প্রফেসরকে থ্রেট দিয়ে ওদের গতিবিধি জানার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু হাতাহাতির সময়ে অবনীশ সেন মারা গেছেন ওদের হাতে। আর একজন ছিলেন আস্তিক দত্ত। তাঁকে নিয়ে ওরা বাই রোড নেপালে পালিয়ে এসেছে।”

“হোয়াট! আমার নির্দেশ ছাড়া তোমার লোক একজনকে মার্ডার আর একজনকে কিডন্যাপ করে নিল?”

লিফট থেকে বেরিয়ে নিজের সুইটের দিকে এগোলেন মি. বাফেট। তাঁর গলায় বিরক্তির স্বর স্পষ্ট। দরজা খুলে সিটিং রুমে সোফার উপরে বসে পড়লেন।

বুধানস্কি মুখ নীচু করে বলল, “ওরা ম্যানেজ করে নেবে স্যার। শাকিল খুবই এফিসিয়েন্ট লোক।”

“শাট-আপ!” চেঁচিয়ে উঠলেন মি. বাফেট, “এটা কি ছেলেখেলা পেয়েছ? একজন প্রফেসর মার্ডার হয়েছে। একজন কিডন্যাপড। ইন্ডিয়ান পুলিশ ছেড়ে দেবে? কোনও এনকোয়ারি হবে না?”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি আবার বললেন, “তোমার নেপালের টিমকে নির্দেশ দাও শাকিলকে এলিমিনেট করতে। ওর কোনও ট্রেস যেন না থাকে। এটা যেন একটা অ্যাকসিডেন্ট মনে হয়। আসল জিনিসটা তো এখনও আমাদের হাতে এল না।”

বুধানস্কি মাথা নেড়ে জানাল, “ওকে স্যার।”

কিছুক্ষণ থেমে সে আবার মুখ খুলল, “আর একটা ইন্টেল আছে স্যার। আস্তিক দত্ত, মানে শাকিল যাকে কিডন্যাপ করেছে, তাদের বাড়ির দুজন ছেলেমেয়ে ওঁকে খুঁজতে নেপালে এসেছে। খবর আছে, ওরা একটা ট্রেকিং গ্রুপের সঙ্গে কে.এস.বি.সি. যাচ্ছে।”

মি. বাফেট বললেন, “তার মানে কে.এস.বি.সি.তেই জিনিসটা আছে। তুমি নিজে ওদের ফলো করো। সুসি তোমার সঙ্গে যাবে।”

রানিপুল

ভোর পাঁচটার সময় উঠে হাঁটতে শুরু করেছে সায়ন্তন আর মিতুল। পাকদণ্ডি পাথুরে সরু রাস্তা। ধীরে ধীরে উপরে উঠছে ওরা। একদিকে ঘন জঙ্গল, আর একদিকে সরু পাহাড়ি নদীর হিমশীতল জল পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে নামছে পাহাড়ের মাথা থেকে। দিগন্তে যতদূর চোখ যায়, সবুজ ঢেউ-খেলানো পাহাড়ের ওপারে নীল আকাশের নীচে সাদা বরফে মোড়া পাহাড়। ওটাই কাঞ্চনজঙ্ঘা। পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম আর অন্যতম কঠিন শৃঙ্গ। বেস ক্যাম্পে পৌঁছাতে এখনও কয়েকদিন লাগবে। পুরোটাই হাঁটাপথ। দেবদারু, পাইন, বার্চ, ইউ, ওক, রডোডেনড্রন, সিডার—এরকম হাজারো গাছের জঙ্গল ভিড় করে আছে রাস্তার দু-ধারে। নাম না জানা কত পাখিদের ডাকে কান পাতা দায়। টিঁ টিঁ করে একটা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে। কিন্তু পাতার আড়ালে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সায়ন্তন তার ক্যামেরায় ৩০০ এম.এম. লেন্স লাগিয়ে চেষ্টা করল পাখিটাকে খুঁজে বের করার। কিন্তু সে-চেষ্টা ব্যর্থ হল। টিমের ক্যাপ্টেন ধীরাজ সমানে হুইসেল বাজিয়ে চলেছে যাতে কেউ বেশি পিছিয়ে না পড়ে।

সায়ন্তন ক্যামেরাটা গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে বলল, “তোমার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো মিতুল?”

“না, একদম নয়। বরং দারুণ মজা হচ্ছে। হঠাৎ করে এই ট্রেকিংয়ে না এলে এমন সুন্দর প্রকৃতি মিস হয়ে যেত। এসব বর্ণনা এতদিন শুধু বইতেই পড়েছি, আর ছবি দেখেছি। নিজের চোখে দেখা আর নিশ্বাসের মধ্যে ফিল করা, এটা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না।”

সায়ন্তন আবার প্রশ্ন করল, “পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা আছে এর আগে?”

“না, এরকম পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটার অভিজ্ঞতা আগে নেই। যদিও ছোটো থেকে নাচ আর জিমন্যাস্টিক করে বড়ো হয়েছি। পাহাড়ে চড়ার ক্লাসও করেছি। তাই শারীরিকভাবে আশা করি কোনও অসুবিধা হবে না।”

“তোমার বাড়ি থেকে কোনও আপত্তি করেনি তো?”

মিতুল হেসে উত্তর দিল, “আমার বাবা খুবই স্বাধীনচেতা আর উদার মনের মানুষ। কাঞ্চনজঙ্ঘা বেস ক্যাম্প ট্রেক করব শুনে এক কথায় রাজি হয়ে গেল। মা একটু চেঁচামেচি করেছিল। সে ম্যানেজ করে নিয়েছি।”

ওরা বার বার পিছিয়ে পড়ছে দেখে ধীরাজ এগিয়ে এসে বলল, “পা চালিয়ে চলুন। দিনে পাঁচ থেকে ছ’ঘণ্টা হাঁটতেই হবে। তবে সাতদিনে পুরো রাস্তা শেষ হবে। প্রথম দিন রানিপুল থেকে তুলসীধারা, তার পরের দিন তোরোনদেন, তারপর তেসিরাম, চতুর্থ দিন ৪৬০০ মি. উচ্চতায় রামচে। রামচেতে দু-দিন রেস্ট নিতে হবে, হাই অল্টিচুড আর লো অক্সিজেন শরীরে অ্যাডজাস্ট করার জন্য। সপ্তম দিন রামচে থেকে ৪৯০০ মি. উচ্চতায় গ্লেসিয়ার ক্যাম্প অর্থাৎ সাউথ বেস ক্যাম্পে পৌঁছাব আমরা। কাঠমান্ডুতে আপনাদের পুরোটা ব্রিফ করা হয়েছিল।”

মিতুল মন্তব্য করল, “এই পরিবেশ আমাদের জড়িয়ে ধরছে বার বার। বরফে মোড়া পাহাড়ের শৃঙ্গগুলো দেখে ছবি না তুলে কি হাঁটা যায়!”

ধীরাজের শরীরে খাঁটি শেরপার রক্ত। এই জঙ্গল পাহাড় ওর নিজের হাতের তালুর মতো চেনা। সে ওদের কথা শুনে বলল, “কাঞ্চনজঙ্ঘা নামের মানে জানো তো? বরফ-ঢাকা গুপ্তধন। যা কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জের পাঁচটি চূড়ার পরিচয়। তিব্বতি ভাষায় কাঙ মানে বরফ, চেন মানে সুবিশাল, জ মানে ধনসম্পদের আধার এবং ঙ্গা মানে পাঁচ। আর সেই পঞ্চ সম্পদ হল নুন, সোনা, বহুমূল্য রত্ন, পবিত্র ধার্মিক পুথি এবং অপরাজেয় রক্ষাকারী বর্ম।” সে আরও বলে চলল, “যাঁরা কাঞ্চনজঙ্ঘা আরোহণ করেছেন এবং স্বচক্ষে সেই রূপ দেখেছেন, সবাই জানিয়েছেন যে কাঞ্চনজঙ্ঘা শুধুমাত্র পৃথিবীর অন্যতম উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাই নয়, অন্যতম বিপজ্জনকও বটে। তাই অন্নপূর্ণা শৃঙ্গের পরেই দ্বিতীয় দুরূহতম শৃঙ্গ হিসেবে কাঞ্চনজঙ্ঘার পরিচয়।”

মিতুল বলল, “আমি পড়েছি, কাঞ্চনজঙ্ঘা সম্পর্কে অনেক মিথ মানে অদ্ভুত গল্প ছড়িয়ে আছে এখানে।”

“হ্যাঁ, আছে তো! সিকিমে বসবাসকারী জনজাতি লেপচারা মনে করেন পৃথিবীর আদিমতম মানব ও মানবী, যাঁদের থেকে সমগ্র মানবসমাজের সৃষ্টি, তাঁদের উৎপত্তি হয়েছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গ হতে। তাই নিজেদের ভাষায় লেপচারা নিজেদের বরফচূড়ার সন্তান বলে মনে করে। আজ পর্যন্ত কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় কেউ পা রাখেনি। মনে করা হয়, এই পর্বতমালার চূড়ায় নানা আত্মা এবং দৈবশক্তির বসবাস। তাঁদের সম্মানার্থে প্রাক্তন সিকিম সাম্রাজ্যের রাজাধিপতি চগ্যালকে কথা দেওয়া হয় যে ভবিষ্যতেও এই চূড়ায় কেউ আরোহণ করবে না। তাই পর্বতারোহীদের দল সামিটের প্রান্তদেশে এসেই থেমে যান। আজ অবধি প্রায় ২০০ আরোহী চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছেন। তবে তাঁদের এক-চতুর্থাংশ এই আরোহণ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।”

সায়ন্তন জিজ্ঞেস করল, “কাঞ্চনজঙ্ঘায় নাকি আদিম যুগের রাক্ষসরা রয়ে গেছে এখনও?”

হো হো করে হেসে উঠল ধীরাজ। হাঁটতে হাঁটতে বলল, “শোনা যায়, ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল অভিযাত্রীরা এক দ্বিপদ প্রাণীর দেখা পেয়েছিল। তাঁরা যখন স্থানীয়দের কাছ থেকে এই ব্যাপারে জানতে চান তখন তাঁদেরকে বলা হয়, প্রাণীটি কাঞ্চনজঙ্ঘার রাক্ষস। এছাড়াও নানা ভূতুড়ে গল্প প্রচলিত আছে। আসলে নানা প্রাকৃতিক কারণে, যেমন প্রচণ্ড দুর্গম আবহাওয়া, অক্সিজেনের স্বল্পতায় আরোহীদের দৃষ্টিবিভ্রম হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই সওয়ারিদের অনেকেই নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করেন যে তাঁরা আত্মা বা রাক্ষস বা ভৌতিক কোনও কিছু দেখেছেন, শুনেছেন এবং অনুভব করেছেন। এমনই এক ঘটনায় শোনা যায়, এক পর্বতারোহী হিমবাহের বিভিন্ন খাতের মধ্যে থেকে বাকবিতণ্ডার আওয়াজ শুনেছিলেন। কিছু কিছু কণ্ঠস্বর চাইছিল তাঁর নিরাপদে এগিয়ে যাওয়া, কেউ চাইছিল তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে। এর পরে ওই পর্বতারোহী তৃতীয় কোনও আত্মার সংস্পর্শ পান। সেই আত্মা হয়তো-বা মৃত কোনও প্রাক্তন আরোহীর এবং তাঁর সাহায্যে নিরাপদে নিজের তাঁবুর পথ খুঁজে পান।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরাজ আবার বলল, “১৯৬৩ সালে তুলশূক লিংপা নামক এক তিব্বতি সন্ন্যাসী বারোজন অনুগামী নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে যাত্রা করেন। তাঁরা খুঁজছিলেন কোনও এক এমন অতিপ্রাকৃত প্রবেশদ্বার যার মাধ্যমে তাঁরা জাগতিক জীবন অতিক্রম করে রূপকথার স্বর্গোদ্যানে প্রবেশ করতে পারেন। সবাই বলে, তুলশূক নানা পবিত্র পুথি নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে উপরে উঠছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে তাঁদের সামনের সবকিছু মিলিয়ে যেতে থাকে। শুরু হয়েছিল প্রচণ্ড বরফের ঝড় আর হিমবাহের ধ্বস। সেই হিমবাহের নীচে চিরতরে হারিয়ে যান তুলশূক। এরপর ১৯৯২ সালে ওয়ান্ডা রুতকিউইকজ নামক এক পোলিশ আরোহী কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযান করেন। প্রথম মহিলা হিসাবে তিনি হিমালয়ের এই অঞ্চলের শীর্ষে উঠতে চেয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ৮০০০ মিটারের উপর উচ্চতাবিশিষ্ট পৃথিবীর সকল ১৪টি চূড়ায় আরোহণ করে বিশ্ব রেকর্ড স্থাপন করা। ওয়ান্ডাও নিখোঁজ হন এবং তাঁর কোনও চিহ্ন আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। মনে করা হয়, ঠান্ডায় জমে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।”

সায়ন্তন জানতে চাইল, “আপনি ওটাং মনাস্ট্রির নাম শুনেছেন?”

নামটা শুনে একটু চমকে উঠে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরাজ প্রশ্ন করল, “কেন বলুন তো?”

“কাঞ্চনজঙ্গা বেস ক্যাম্পের কাছে এই গুম্ফার কথা আমরা পড়েছি। আপনি তো অনেক বছর ধরে আসছেন এই রাস্তায়, ওই অঞ্চলে কোনও গুম্ফা চোখে পড়েনি আপনার?”

“আমি এই রাস্তায় গত পাঁচ বছর ধরে আসছি। এটা নিয়ে বারোটা ট্রেক কমপ্লিট হবে। এখনও পর্যন্ত বেস ক্যাম্পের কাছে কোনও গুম্ফা আমার চোখে পড়েনি। তবে দু-বছর আগে বেস ক্যাম্প থেকে উত্তরের দিকে কয়েকজন লামাকে হেঁটে যেতে দেখেছিলাম। আর একটা ব্যাপারে আমি বেশ অবাক হলাম।”

“কী ব্যাপার?”

“ওটাং মনাস্ট্রির নাম আমি তিনদিন আগে কাঠমান্ডুর ট্রাভেল অফিসে বসে প্রথমবার শুনেছি। কয়েকজন খোঁজ করতে এসেছিল।”

“তাই নাকি? কারা এসেছিল বলতে পারবেন?”

“দুজন বিদেশি, তার মধ্যে একজন মহিলা। আর একজন ভারতীয়। সবাই বেশ বয়স্ক মানুষ। ওরা জিজ্ঞেস করছিল প্রাইভেট হেলিকপ্টারে করে ওটাং মনাস্ট্রিতে যাওয়া যায় কি না।”

“তারপর?”

“আমাদের ট্রাভেল কোম্পানিতে হেলিকপ্টার সার্ভিস নেই। সেটা শুনে ওরা চলে গেল। আবার তোমাদের মুখে শুনছি ওটাং মনাস্ট্রির কথা।”

ওরা দুজনেই চুপ করে গেল কথাটা শুনে। তিনজন মধ্যবয়স্ক মানুষ? কারা এরা?

রামচে

নেপাল-সিকিম সীমানার মধ্যবর্তী উপত্যকায় দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল মিতুল। সামনে শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পর্বত শৃঙ্গ। বহু দশক ধরে যা বহু মানুষের কাছে ঈশ্বরতুল্য প্রতীক। চারপাশে কোনও বড়ো গাছ নেই বললেই চলে। সবুজ ঘাস লেগে আছে পায়ের গোড়ায়। আরও তিনশো মিটার এগোলেই শুরু হচ্ছে গ্লেসিয়ারের প্লেট। সেদিক থেকে সোঁ সোঁ করে ঝড়ের মতো ঠান্ডা হাওয়া ছুটে এসে পোশাকের সমস্ত স্তর ভেদ করে হাড়ে গিয়ে বিঁধছে। কথা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে মিতুলের। ধীরাজ সবাইকে টেন্টের মধ্যে বিশ্রাম নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

টেন্টের মধ্যে ঢুকে ধোঁয়া-ওঠা গরম গরম কফি গলায় দিতে কিছুটা থিতু হতে পারল মিতুল। কাঁপা গলায় সায়ন্তনকে জিজ্ঞেস করল, “পুলিশের টিমকে তো দেখতে পাচ্ছি না?”

সায়ন্তন কাপে চুমুক দিয়ে উত্তর দিল, “ওঁদের অনেকরকম সরকারি নিয়মকানুন মেনে কাজ করতে হয়। ইন্সপেক্টর মোহান্তি কাঠমান্ডুতে আমাকে বললেন, তোমরা ট্রেকিং দলের সঙ্গে এগিয়ে যাও আর চারপাশে চোখ-কান খোলা রাখতে বললেন। ওঁদের ইন্টেলিজেন্সের সিগন্যাল না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।”

“আচ্ছা, যে তিনজন লোক ট্রাভেল কোম্পানিতে ওটাং মনাস্ট্রির খোঁজ করতে এসেছিল, তারা কারা? ওরা কি এদিকে এসেছে? ছোটো দাদু কি ওদের সঙ্গেই আছেন?”

“যদি হেলিকপ্টারে আসে, তাহলে ওরা আগেই পৌঁছে গেছে। ছোটো দাদু এদিকে এসেছেন কি না সেটা জানার জন্য আরও খোঁজখবর করতে হবে।”

ওদের দলেও বেশ কয়েকজন বিদেশি চলেছে। একজন লম্বা কোঁকড়ানো চুলের লোক আর এক সোনালি চুলের মহিলা। যাত্রা শুরু হবার দু-দিন পর সুখেতার এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি করে রানিপুলে এসে ওদের সঙ্গে মিট করল ওরা।

মিতুল হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলল, “তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি, আসার দিন তোমাদের বাড়িতে যখন গিয়েছিলাম, বড়ো দাদু আমাকে ডেকে কাগজের একটা খাম দিল। তখন তাড়াহুড়োর মধ্যে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছিলাম। পরে খামটার কথা একেবারে ভুলে গেছি।” বলে পিঠের ব্যাগ থেকে ব্রাউন রঙের পুরোনো একটা খাম বের করল মিতুল। সেটার মধ্যে থেকে এক ফুট বাই দেড় ফুট মাপের সিল্কের রঙিন কাজ করা একটা কাপড় বের হল। টেন্টের মেঝেতে বিছিয়ে ধরে ভালো করে লক্ষ করল দুজনে।

সায়ন্তন বলল, “এটা তো একটা বুদ্ধিস্ট থাংকা মনে হচ্ছে। বড়ো দাদু এ-জিনিস কোথায় পেলেন? আর তোমাকেই-বা দিলেন কেন?”

মিতুল মন্তব্য করল, “নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে। হয়তো সোমের কাছ থেকে শুনেছিলেন ওটাং গুম্ফার কথা। এটা তো একটা অস্ত্র হাতে নীল রাক্ষসের মূর্তি। তার চারপাশে আরও অনেকগুলো ভূত, প্রেত, দত্যি-দানো। এটার মানে কী?”

“এটা তিব্বতি দেবতা মহাকালের ছবি। ইনি সম্ভবত ধ্বংসের দেবতা। ভালো করে লক্ষ করো ছবিটা, মহাকালের চারটে হাতের মধ্যে দুটো হাতে অস্ত্র, একটা তলোয়ার আর একটা ত্রিশূল। বাকি দুটো হাত বুকের কাছে যত্ন করে একটা লাল পাথরকে ধরে আছে। পাথরটা থেকে উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ছে। এটা নিশ্চয়ই কোনও সিম্বলিক ছবি।”

“এটার চারপাশে কতরকমের আঁকিবুকি কাটা। যেন কোনও রাস্তার নির্দেশ। দেখো, এখানে একটা পাহাড় আঁকা আছে। এটাই কি কাঞ্চনজঙ্ঘা?”

সায়ন্তন অনেকক্ষণ চুপ করে রঙিন ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বিড়বিড় করল, তারপর ধীর গলায় বলল, “আজকের দিনটা ভালো করে রেস্ট নিয়ে নাও মিতুল। কালকে থেকে কাজে লেগে পড়তে হবে। আমরা ঠিক রাস্তাতেই এসেছি।”

বাইরে থেকে একটা হইহই আওয়াজ আসছে। টেন্টের উপর ঝুরঝুর করে কিছু একটা পড়ছে। তাঁবুর চেন খুলে মুখ বাড়াতে দুজনে অবাক হয়ে গেল। তুষারপাত শুরু হয়েছে বাইরে। সঙ্গে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আরও অনেকগুণ বেড়ে গেল।

ওটাং গুম্ফা

চারদিকে ধু ধু সাদা বরফ। হাঁটতে গেলে হাঁটু পর্যন্ত ঢুকে যাচ্ছে ঝুরো বরফের নরম স্তরের মধ্যে। সায়ন্তন আর মিতুল দুজনে এগিয়ে চলেছে কষ্ট করে। পিছনে পড়ে রয়েছে বেস ক্যাম্পের হলুদ টুপির মতো তাঁবুগুলো। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সেগুলো দেখা যাচ্ছিল। এখন পাহাড়ের বাঁকের ও-পারে অদৃশ্য হয়েছে। ধীরাজ অনেক করে বারণ করেছিল ওদের। চেনা পথ ছেড়ে অন্য রাস্তায় অতর্কিত বিপদের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কত অভিযাত্রী নাকি এভাবেই প্রাণ হারিয়েছে। তবু সায়ন্তন আর মিতুল নিজের জেদে হাঁটতে শুরু করেছে। আসলে ওরা জানতে পেরেছে বিদেশি অভিযাত্রীদের একটা টিম দু-দিন আগেই এখানে এসে পৌঁছেছে হেলিকপ্টারে করে। তারপর তারা বেস ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে না গিয়ে উলটোদিকে পাহাড়ের কোলে মিলিয়ে গেছে। সায়ন্তনের স্থির বিশ্বাস, বিদেশি অভিযাত্রী দল ওটাং গুম্ফার উদ্দেশ্যেই গেছে। সায়ন্তন আর মিতুল দুজনে সেই নতুন রাস্তাতেই হাঁটতে শুরু করল। সারা শরীরে মোড়া ফোলানো উইন্ডসিল জ্যাকেট। চোখ-ঢাকা স্নো গগল। পায়ে ক্রাম্পন লাগানো স্পাইক জুতো। ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়ায় পথ চলার গতি খুবই সীমিত। দিনের বেলাতেই তাপমাত্রা মাইনাসে চলছে। সূর্যের আলো চলে গেলে টেম্পারেচার কোথায় গিয়ে নামবে তার কোনও ধারণা নেই। বাতাসে অক্সিজেনও খুব কম। তবু দু-তিনদিন ধরে শরীরকে সইয়ে নিয়েছে ওরা। অন্ধকার হওয়ার আগে যেভাবেই হোক রাত কাটানোর মতো আস্তানা খুঁজে বের করতে হবে।

সকাল থেকে ঘণ্টাতিনেক টানা উৎরাই হেঁটে একটা পাথরের উপর বসল দুজনে। সায়ন্তন সেই থাংকাটা বের করে আকাশের সামনে মেলে ধরল। কিছু চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করছে ও। তারপর বলল, “বাঁদিক ধরে আরও কিছুটা ইউয়ের মতো ঘুরে এগোলে একটা পাথরের গম্বুজ পড়বে। মানে ম্যাপে তেমনই দেখাচ্ছে।”

“তুমি নিশ্চিত?”

সায়ন্তন মাথা নেড়ে বলল, “তাই তো মনে হচ্ছে।”

মিতুল মন্তব্য করল, “চলো তাহলে ওইদিকেই যাওয়া যাক। তবে তোমার ধারণা যদি ভুল হয় সেক্ষেত্রে আমাদের বরফ হয়ে যাওয়া শরীর দুটো পড়ে থাকবে এই জনমানবহীন অঞ্চলে, ধু ধু বরফের রাজ্যে। কেউ খুঁজতেও আসবে না।”

“হা হা হা…”

কিছুটা শুকনো খাবার খেয়ে আরও অনেকক্ষণ হাঁটার পর পায়ের নীচে ঝুরো বরফগুলো কমে এল। শুরু হল শুকনো বরফ-মাখা পাথুরে জমি। এখানে হাঁটার গতি কিছুটা বাড়ল। একটা বড়ো বরফের স্তূপ সামনে থেকে সরে যেতে ওরা দেখল দেড়-দু-কিলোমিটার ফাঁকা জমির পরে একটা আকাশছোঁয়া পাহাড়শ্রেণি উঠে গেছে। কাঠামান্ডু থেকে কেনা জাপানি বাইনোকুলারে চোখ রেখে সায়ন্তন খুঁটিয়ে দেখল বেশ কিছুক্ষণ ধরে। উত্তর-পশ্চিম কোণে স্থির হয়ে রইল তার দৃষ্টি। তারপর বাইনোকুলারটা মিতুলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “দেখো তো পাহাড়ের কোলে ওইখানে কিছু একটা হলুদ রঙের নড়ছে। বুঝতে পারছ?”

মিতুল বাইনোকুলারটা চোখে লাগিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল ওইদিকে। তারপর মাথা নেড়ে জানাল, “না সায়ন্তনদা, আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না। শুধু একটা গোল গম্বুজ চোখে পড়ছে।”

“হুম। তাহলে হয়তো আমার চোখের ভুল হবে। চলো হাঁটা যাক। আলো কমে যাওয়ার আগে ওই পাহাড়ের কোলে আমাদের পৌঁছাতেই হবে।”

গম্বুজটার গায়ে অনেক রঙিন তেকোনা সিল্কের পতাকা উড়ছে। সেটা পেরিয়ে পাহাড়ের কোলে পৌঁছাতে ওদের আরও ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগল। আসলে দূর থেকে যতটা কাছে মনে হচ্ছিল, বাস্তবে তার থেকে অনেকটা দূরে। কিন্তু কাছে গিয়ে তাদের চোখে-মুখে প্রশান্তির হাসি খেলে গেল। শুকনো পাথরের গায়ে পরপর রঙিন কালিতে লেখা তিব্বতি মহামন্ত্র—‘ওম মণি পদ্মে হুম’। কিছুটা ছাড়া ছাড়া পতপত করে উড়ছে মন্ত্র লেখা রঙিন কাপড়ের পতাকা। অর্থাৎ, কাছাকাছি রয়েছে ওটাং গুম্ফা। তার মানে ওরা ঠিক রাস্তাতেই এসেছে। কিন্তু চারপাশে কোনও জনমানবের দেখা নেই। এখানে পাহাড়টা সটান ষাট ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে উঠে গেছে আকাশের দিকে। তরাই অঞ্চলটা যেখানে এসে মিশেছে, তার গোড়াতে বড়ো বড়ো পাথরের চাঁইয়ের পিছনে বেশ কিছু ফাঁকফোকর রয়েছে। ছোটো-বড়ো অনেকগুলি গুহা। সবক’টাতেই তিব্বতি মহামন্ত্র ‘ওম মণি পদ্মে হুম’ লেখা। তবে কোনও মানুষের দেখা নেই এখানে। বাইরে সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। সারাদিন হেঁটে ওরা দুজনেই খুব ক্লান্ত। গুহার ভিতরে একটা সমান জায়গা দেখে জিরিয়ে নিল প্রথমে। তারপর রুকস্যাক থেকে টেন্ট বের করে খাটিয়ে নিল। বাইরে অন্ধকার নেমেছে। ঠান্ডা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। তবে শুকনো পাথরের ঘেরাটোপের মধ্যে খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে না ওদের। একটা ব্যাটারির লাইট জ্বালিয়ে নিল ওরা।

মিতুল প্রশ্ন করল, “ওটাং গুম্ফাটা কি এই পাহাড়ের কোলেই?”

সায়ন্তন থাংকাটা খুলে তাঁবুর মেঝেতে বিছিয়ে বলল, “মনে তো হচ্ছে। এই পাহাড়ের কোলে একটা গুহা আছে। এই যে ছবিটা দেখো, এখানে। আপাতদৃষ্টিতে এটা একটা আল্পনা বা কলকা। কিন্তু আসলে এটা একটা ম্যাপ। এই যে গুহার মুখ আঁকা আছে পাহাড়ের কোলে। সেখান থেকে সরু একটা রাস্তা এঁকে-বেঁকে ঢুকেছে পাহাড়ের পেটের ভিতর। শেষে বুদ্ধের মূর্তি। তার মানে এটাই নিশ্চয়ই গুম্ফা।”

“ওই বিদেশিগুলো কি এদিকেই এসেছে?”

“হতে পারে। হয়তো তারা গুহার মুখ খুঁজে পেয়ে গেছে।”

বড়ো আতসকাচ হাতে নিয়ে সায়ন্তন থাংকার ছবিগুলো আরও অনেকক্ষণ লক্ষ করল। তারপর বলল, “ব্যাগে শুকনো খাবার, চকলেট আছে। খেয়ে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে পড়ো। সকালে উঠে গুহার মুখটা খুঁজতে হবে।”

দিনভর যা ধকল গেছে, স্লিপিং ব্যাগে ঢুকতে দুজনেরই চোখ বন্ধ হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের মধ্যে। কিন্তু রাত শেষ হওয়ার আগেই একটা গুমগুম শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। স্লিপিং ব্যাগ থেকে মাথাটা বের করে মিতুল জিজ্ঞেস করল, “কীসের আওয়াজ হচ্ছে এটা?”

“বুঝতে পারছি না। যেন মনে হচ্ছে মাটি কাঁপছে।”

“ভূমিকম্প নয় তো?”

“কী জানি! হতে পারে।”

তবে কিছুক্ষণ চলার পর ধীরে ধীরে কমে এল শব্দটা। সায়ন্তন কিছুতেই বুঝতে পারল না এরকম যান্ত্রিক শব্দ ফাঁকা পাহাড়ি এলাকায় কীভাবে তৈরি হচ্ছে। যেন মনে হচ্ছে মাটির নীচে কোনও যন্ত্র চলছে।

***

এদিকে বুধানস্কি আর সুসি ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে এসেছিল ধীরাজকে না জানিয়েই। সামনে যে দুজন যাচ্ছে ওদের নাম ক্যাম্পের রেজিস্টার থেকে দেখে নিয়েছে সুসি। সায়ন্তন আর মিতুল। দুজনেই কলকাতার বাঙালি। কিন্তু ওদের হাঁটা দেখে মনে হচ্ছে নির্দিষ্ট রাস্তার হদিস ওরা জানে। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছে। আবার রাস্তা ঠিক করে নিয়ে হাঁটতে শুরু করছে। সুসি আর বুধানস্কি অনেক দূর থেকে অনুসরণ করছে ওদের। ফাঁকা জায়গাতে বেশ দূর থেকে দেখা যাচ্ছে সবকিছু। মি. বাফেট ওদেরকে দুটো আগ্নেয়াস্ত্র আর একটা স্যাটেলাইট ফোন দিয়েছেন। ফোনের মাধ্যমে প্রতিমুহূর্তে আপডেট পাঠাতে হচ্ছে কাঠমান্ডুতে।

সুসি প্রশ্ন করল, “ওদের কাছে কি ম্যাপ আছে?”

“থাকতে পারে। শুনেছি আস্তিক দত্ত বহুবছর আগে এ-রাস্তায় ঘুরে গেছে। সে তখন গুম্ফাটা খুঁজে পেয়েছিল কি না জানি না। সায়ন্তন নামে ছেলেটা দত্ত পরিবার থেকেই এসেছে। ওর কাছে ম্যাপ থাকা অসম্ভব নয়।”

“আস্তিক দত্ত এখন কোথায়?”

বুধানস্কি হাঁটতে হাঁটতে মাথা নাড়ল, “আমার কাছে এই মুহূর্তে কোনও ইনফর্মেশন নেই।”

“কেন? শাকিল তো তোমার লোক। সে আস্তিক দত্তকে নিয়ে নেপালে ঢুকেছে, এ-খবর তুমিই আমাকে দিয়েছ।”

“হ্যাঁ, কিন্তু এখন আমি শাকিলকে ট্রেস করতে পারছি না। ওর ফোন বন্ধ। ও মনে হয় আমাদের ডবল ক্রস করছে। কিংবা অন্য কোনও বিপদে পড়েছে। আস্তিক দত্ত কোথায় আছে তাও বুঝতে পারছি না। তবে মি. বাফেট পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। এই প্রজেক্টে প্রচুর টাকা ঢেলেছেন তিনি। আমি জানি ওঁর সাংঘাতিক নেটওয়ার্ক। শাকিল মি. বাফেটকে ধোঁকা দিয়ে পালাতে পারবে না।”

সুসি জানতে চাইল, “আর তিনজন প্রফেসরের কী খবর?”

বুধানস্কি জানাল, “আমার ধারণা, ওরা তিনজন ওটাং গুম্ফার কাছাকাছিই কোথাও আছে। গুম্ফাতে পৌঁছেও যেতে পারে। ওরা হেলিকপ্টারে করে এসেছে।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সুসি মন্তব্য করল, “মনে হচ্ছে সবাই বিভিন্ন রাস্তায় গুম্ফার দিকেই চলেছে। কে সবার আগে খুঁজে পাবে হার্ট অফ গড?”

“অন্য কে কী করবে জানি না, তবে আমার কাছে এটা জীবনমরণ সমস্যা। মস্কোর হাসপাতালে আমার ছোটো মেয়েকে ভরতি করে এসেছি। জিনিসটা মি. বাফেটের হাতে তুলে দিতে পারলে আমার মেয়ের হৃদপিণ্ডের ফুটো সারানোর সব খরচ তিনি দেবেন। না-হলে আমিও ফিরতে পারব না। মি. বাফেটের হৃদয় বলে কিছু নেই।”

“জানি। আমার প্রেস তো দেনার দায়ে ডুবতে বসেছে। মি. বাফেট একমাত্র বাঁচাতে পারবেন। বিনিময়ে এই কাজে ওঁকে সাহায্য করতে হবে আমাকে। এটাই শর্ত।” হঠাৎ সুসি চেঁচিয়ে উঠল, “কোথায় গেল ওরা? সামনে তো আর দেখতে পাচ্ছি না!”

“হ্যাঁ, একটা মেঘ এসে সামনেটা ঢেকে দিয়েছে। চলো ওই পাথরটার উপরে বসে একটু অপেক্ষা করা যাক। মেঘ আশা করি কিছুক্ষণের মধ্যে সরে যাবে।”

সুসি কিছুক্ষণ পরে অধৈর্য হয়ে বলল, “দিনের আলো তাড়াতাড়ি কমে আসছে। অন্ধকার হয়ে গেলে গতকালের মতো আবার তুষারপাত শুরু হতে পারে। তখন রাস্তা খুঁজে পাওয়া আরও মুশকিল হবে। আর আমরা ঠান্ডায় জমে যাব।”

বুধানস্কি পিঠে রুকস্যাক বেঁধে নিয়ে কম্পাস হাতে রেখে হাঁটতে শুরু করল। বলল, “ম্যাপে দেখাচ্ছে বাঁদিকে ঘুরে একটা বড়ো পাহাড় আছে। আমার ধারণা, ওরা ওই পাহাড়ের কোলে গিয়ে আশ্রয় নেবে।”

“মেঘটা সরে গেলে বরফের মধ্যে পায়ের ছাপ দেখে অনুসরণ করতে সুবিধা হত। কিন্তু এদিকটা ঘন মেঘে একদম ঢেকে গেছে।”

***

ড. নিসিকাওয়া গুহার মধ্যে গম্ভীর মুখে পায়চারি করতে করতে বললেন, “এখান থেকে রাস্তা আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গত চব্বিশ ঘণ্টা আটকে আছি এখানে। হাতে আর একটা দিন আছে। ওটাং গুম্ফার গর্ভগৃহ খুঁজে না পেলে মহাপ্রলয় আসবে। পুরো হিমালয় ডুবে যাবে টেথিস সাগরের নীচে।”

প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়ম এগিয়ে এসে বললেন, “কী বলছেন আপনি?”

“হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। টোডাইজি প্যাগোডার প্রাচীন লাইব্রেরিতে আমি যে হাজার বছর আগের বউদ্ধ জ্যোতির্বিজ্ঞানীর লেখা পুথি খুঁজে পেয়েছি, তাতে স্পষ্ট লেখা আছে ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসের যে তারিখে সৌরমণ্ডলের ছ’টি গ্রহ একটা সরলরেখায় অবস্থান করবে—অর্থাৎ বুধ, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন—সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ‘হার্ট অফ গড’কে ওটাং গুম্ফার গর্ভগৃহে স্থাপন করতে হবে। না করতে পারলে মহা বিস্ফোরণ হবে। ফলে হিমালয় ভূগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।”

“এটা কবে হবে?”

“আজকেই, ২৪ আগস্ট। রাত শেষ হওয়ার আগেই ঘটবে।”

পেট্রিয়া জানতে চাইলেন, “সেজন্যই কি আপনি লোক লাগিয়ে কলকাতার দত্তবাড়ি থেকে পাথরটা চুরি করে আনলেন?”

ড. নিসিকাওয়া মাথা নেড়ে জানালেন, “হ্যাঁ। পাথরটাকে আমি অনেক বছর থেকেই হন্যে হয়ে খুঁজছি। নেপাল, ভারত আর তিব্বতের অনেক জায়গাতে গেছি। বুদ্ধিস্ট মনাস্ট্রির লাইব্রেরিগুলোতে পুরোনো পুথির অধ্যয়ন করেছি। শেষে কলকাতার এক ইতিহাসের অধ্যাপকের সঙ্গে আলাপ হয় বেনারসে। নাম অবনীশ সেন। তিনি জানালেন, ওঁর এক বন্ধুর কাছে এই ‘হার্ট অফ গড’ নামে পাথরের কথা শুনেছেন। তখন আমি ওঁর সঙ্গে কলকাতা গেলাম। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারলাম, ভারতের স্বাধীনতার আগে দত্তবাড়িতে বিপ্লবীদের আনাগোনা ছিল। ১৯০৪ সালে জেমস ম্যকডোনাল্ড আর ফ্রান্সিস ইয়ং-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা যখন তিব্বত দখল করে ফিরছিল, জুনিয়র লেফটেন্যান্ট মার্টিন হগ তাসিহুনপো গুম্ফা থেকে চুরি করা এই লাল পাথরটি উদ্ধার করেন। দেবেশ থাপার বয়স তখন খুব কম। কিন্তু চোখের সামনে অত্যাচারী হগের হত্যালীলা তার মনে গভীর দাগ কাটে। সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, যেভাবেই হোক হগ সাহেবকে উচিত শিক্ষা দেবে। দেবেশ কুড়ি বছর পর ১৯২৮ সালে কলকাতায় মার্টিন হগকে হত্যা করে পাথরটি উদ্ধার করল। কিন্তু পাথরটি নিয়ে নেপালে পালিয়ে যাওয়ার আগেই পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলে। তখন আস্তিক দত্তর বাবা মহিম দত্তর হাতে দেবেশ পাথরটি তুলে দেয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে মহিম দত্ত পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। বিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য তাঁকে আন্দামানের সেলুলার জেলে আজীবন নির্বাসিত করা হয়। সেখানেই তিনি মারা যান। পাথরটির কথা সবাই ভুলে যায়।”

“তারপর?”

“এরপর আস্তিক বড়ো হয়ে বাড়ির গোপন কুলুঙ্গির মধ্যে থেকে পাথরটি হাতে পায়। সেও যুবক বয়সে অনেকবার চেষ্টা করেছে ওটাং গুম্ফাতে আসার জন্য। কিন্তু সফল হয়নি।”

প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়ম জিজ্ঞেস করলেন, “পাথরটা চুরি করার প্রয়োজন পড়ল কেন? আস্তিককে বললে ও হয়তো সানন্দে আমাদের সঙ্গে যোগ দিত।”

ড. নিসিকাওয়া হাত তুলে বললেন, “আপনি কি ভাবছেন আমি সেই চেষ্টা করিনি? এক বছর আগে আমি কলকাতায় এসে আস্তিক দত্তর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। কিছুদিন আগে ফোন করেছিলাম। কিন্তু সে এত বছর পরে ওই পাথরটা আর হাতছাড়া করতে রাজি ছিল না। হিমালয় ধ্বংসের তত্ত্বও সে ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বলল, ওসব অন্ধ ধর্মীয় কুসংস্কার সে মানে না। পাথরটা ওর পরিবারের সৌভাগ্যের প্রতীক। সে কিছুতেই জিনিসটা হাতছাড়া করবে না। তখন বাধ্য হয়ে আমাকে লোক লাগিয়ে ওটা চুরি করতে হল।”

“বুঝলাম।”

পেট্রিয়া জানতে চাইলেন, “পাথরটা কি এখন আপনার কাছেই আছে?”

ড. নিসিকাওয়া উপর-নীচে মাথা নাড়লেন, “সুব্রহ্মনিয়মকে পুরীতে পাঠিয়েছিলাম পাথরটা ডেলিভারি নেওয়ার জন্য। কিন্তু ঠিক সেই সময় আস্তিক দত্ত আর অবনীশ সেনও ওখানে চলে আসে। ধাক্কাধাক্কির মধ্যে অবনীশ সেনের মাথায় লাগে। সে মারা যায়।”

তারপর ড. নিসিকাওয়া নিজের রুকস্যাকের ভিতর থেকে লাল শালু কাপড়ে মোড়া একটা পুঁটুলি বের করে আনলেন। সুতোটা সাবধানে খুলে মেলে ধরলেন সবার সামনে। বাকিরা এগিয়ে এসে চোখ বড়ো বড়ো করে দেখলেন, রক্তের মতো লাল একটি ডিম্বাকৃতি পাথর। কিন্তু সেটা যেন জীবন্ত! একটা আলোর দ্যুতি প্রতি সেকেন্ডে বিচ্ছুরিত হচ্ছে পাথরটি থেকে। অবাক অপলক চোখে তিনজনে তাকিয়ে রইলেন এই দৈব বস্তুটির দিকে।

তখনই আচমকা কেঁপে উঠল পায়ের তলার মাটি। একটা গুম গুম করে শব্দ আসছে নীচে থেকে। ড. নিসিকাওয়া দ্রুত পাথরটিকে মুড়ে জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে বললেন, “আবার শুরু হল।”

“এই নিয়ে তিনবার।”

“এটা মনে হয় জোরালো কোনও ভূমিকম্পের আভাস।”

“কিন্তু এই গুম গুম যান্ত্রিক শব্দটা কীসের?”

ড. নিসিকাওয়া মন্তব্য করলেন—“বুঝতে পারছি না। তবে মনে হচ্ছে আমরা পাথরের উপরের স্তরে আটকে আছি। নীচে যাওয়ার নিশ্চয়ই কোনও রাস্তা আছে। সেটাই খুঁজে বের করতে হবে।”

পুরো পাহাড়টাই যেন কাঁপতে শুরু করেছে। গুহার মাথা থেকে পাথরের চাঁই খসে পড়তে শুরু করল ধুপধাপ করে। ‘ওম মণি পদ্মে হুম’ লেখা পাথরগুলো মেঝেতে কাঁপতে কাঁপতে গড়াগড়ি যাচ্ছে। প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়ম চেঁচিয়ে বললেন, “চলো, এখান থেকে তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। না-হলে আমরা সবাই পাথর চাপা পড়ে মারা যাব।”

ব্যাগগুলো কাঁধে ঝুলিয়ে গুহার মুখের দিকে দৌড়াতে শুরু করেছেন ওঁরা। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে অন্ধকার গুহা ছেড়ে দিনের আলোতে এসে পৌঁছালেন। পাহাড়ের সানুদেশ ছেড়ে বেশ কিছুটা দৌড়ে এসে সবাই হাঁফিয়ে পড়েছেন। বড়ো পাথরের গম্বুজটার গায়ে হেলান দিয়ে বসে পড়লেন পাথুরে জমিতে। এমনিতেই বাতাসে এখানে অক্সিজেন কম। তার উপর দৌড়ঝাঁপ করলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। মাটির কাঁপুনিটা এতক্ষণে থেমে গেছে। কিন্তু পেট্রিয়া দেখলেন, দূরে আরও দুজন মানুষের আবির্ভাব হয়েছে এই ধু ধু নির্জন প্রান্তরে। হলুদ জ্যাকেট পরা দুজন এদিকেই আসছে। কারা ওরা?

কাছে আসতে ওদের আরও মিনিট পনেরো সময় লাগল। দুজন তরুণ-তরুণী। এঁরা সবাই একটু অবাক হলেন।

সায়ন্তন সবাইকে চমকে দিয়ে ইংরাজিতে বলল, “আমি যদি ভুল না হই, আপনি ড. নিসিকাওয়া। জাপানি প্রফেসর। আর ইনি হলেন প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়ম।”

ড. নিসিকাওয়া চোখ বড়ো বড়ো করে বললেন, “হ্যাঁ, কিন্তু তোমাকে তো চিনতে পারলাম না।”

“আমি সায়ন্তন দত্ত। আস্তিক দত্ত আমার ছোটো দাদু। আপনাকে আমি দু-বছর আগে দেখেছিলাম। আমাদের বাড়িতে। আপনি গিয়েছিলেন দাদুর সঙ্গে দেখা করার জন্য। আর প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়মের ছবি দেখেছি। উনি পুরিতে যে-হোটেলে ছিলেন, আমিও সেই একই হোটেলে উঠেছিলাম।”

“আচ্ছা… কিন্তু আস্তিক দত্ত কোথায়?”

“তাঁকে খুঁজতেই তো আমি এত দূর এসেছি। পুরীতে অবনীশ সেন খুন হলেন আর ছোটো দাদুকে কিডন্যাপ করে কে বা কারা নেপালে নিয়ে এসেছে। আমরা দুজন এসেছি তাঁকে খুঁজতে। ভাবলাম এখানেই পাব তাঁকে।”

প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়ম উঠে দাঁড়িয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “বুঝেছি, এ নিশ্চয়ই শাকিলের কাজ। আমাকেও পুরীতে ও থ্রেট দিয়ে বলেছিল পাথরটা ওর চাই।”

সায়ন্তন বলল, “কিন্তু পাথরটা তো ওটাং গুম্ফায় আছে। সেটা খোঁজার জন্যই তো আপনারা এত দূর থেকে এসেছেন এখানে?”

ড. নিসিকাওয়া জানালেন, “না ইয়ং ম্যান। পাথরটা এতদিন তোমাদের বাড়িতেই ছিল। তোমার দাদু আস্তিক দত্তর কাছে। সেটা তোমাদের বাড়ি থেকে আমরা নিয়ে এসেছি। ওটাং গুম্ফাতে ফেরত দিতে হবে। আর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সেটা যথাস্থানে ফেরত দিতে না পারলে মহাপ্রলয় আসবে। এত বড়ো ভূমিকম্প হবে যা গোটা হিমালয়কে মাটির নীচে ঢুকিয়ে দেবে।”

মিতুল মুখ খুলল, “ভূমিকম্পের আভাস তো পাওয়া যাচ্ছে। গতরাত থেকে অনেকবার মাটি কেঁপেছে।”

সায়ন্তন জিজ্ঞেস করল, “পাথরটা তাহলে আপনাদের কাছেই আছে?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে সেটা গুম্ফাতে ফিরিয়ে দিচ্ছেন না কেন?”

“কারণ, গুম্ফার গর্ভগৃহে যাওয়ার রাস্তা আমরা গত দু-দিন ধরে অনেক খুঁজেও বের করতে পারিনি।”

“এই বিষয়ে আমি হয়তো আপনাদের সাহায্য করতে পারি।” বলে সায়ন্তন জ্যাকেটের পকেট থেকে বড়ো দাদুর দেওয়া থাংকাটা বের করল, “এই ছবিটাতে সাংকেতিক ভাষায় বোঝানো আছে গুম্ফায় যাওয়ার রাস্তা।”

সিল্কের রঙিন থাংকাটা মাটিতে বিছিয়ে তার চারকোণে চারটে ছোটো পাথর চাপা দিল সায়ন্তন। সবাই হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল সেটাকে ঘিরে। ভালো করে লক্ষ করতে লাগল নকশাগুলি। আরও দুজন মানুষের ছায়া পূর্বদিকে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে ওদের পাশে এসে পড়েছে। সেদিকে খেয়াল গেল না কারও।

ড. নিসিকাওয়া ছবিটার এক জায়গাতে আঙুল ছুঁইয়ে বললেন, “এইটা হল গুহার মুখ। এঁকে-বেঁকে ভিতরের দিকে এগিয়েছে রাস্তা। তারপর এইখানে একটা পদ্মের ছবি। এটা আমি দেখেছি একটা পাথরের গায়ে পদ্ম খোদাই করে সেটাতে রঙ করা আছে। কিন্তু আমরা ওটা পেরিয়ে চলে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছে ওই পাথরটা সরালে ওর নীচে একটা রাস্তা পাওয়া যাবে। তাড়াতাড়ি চলো।”

“ওই লাল পাথরটা আমার চাই, ড. নিসিকাওয়া।”

জোরালো শব্দটা এল পাহাড়ের কোল থেকে। সবাই চমকে উঠে মুখ তুলে তকালেন পিছন দিকে।

সায়ন্তন দেখল ওদের দলের সঙ্গে আসা দুজন ইউরোপিয়ান, যারা দু-দিন পরে এসে যোগ দিয়েছিল। দুজনের হাতে দুটো অটোমেটিক পিস্তল। পিস্তল দুটো ওদের দিকেই তাক করা আছে।

ড. নিসিকাওয়া উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “কোন পাথরের কথা তুমি বলছ, বুধানস্কি?”

“আপনি ভালো করেই জানেন ডক্টর, আমি হার্ট অফ গডের কথা বলছি। জাপান থেকে গা-ঢাকা দিয়ে জাহাজে করে ইন্ডিয়া পৌঁছানো। তারপর নাম পরিবর্তন করে নেপালে আসা। আপনার রোমাঞ্চকর যাত্রাপথের পুরোটাই আমরা জানি, ডক্টর। বৃথাই এত কষ্ট করলেন আপনি। হার্ট অফ গড আপনার ভাগ্যে নেই, ড. নিসিকাওয়া। আমি তিন গুনব। তার মধ্যে পাথরটা আপনি ওই মাটিতে রেখে পিছিয়ে যাবেন। নইলে গুলি চালাতে বাধ্য হব। এক…”

পেট্রিয়া ফিসফিস করে বলল, “কোনও বোকামি না করে পাথরটা দিয়ে দিন, ডক্টর। গুলি চললে আমাদের সবার জীবনসংশয় হবে।”

“দুই…”

ড. নিসিকাওয়া সবার চোখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে জ্যাকেটের পকেট থেকে লাল শালুতে মোড়া পাথরটা বের করে পাথুরে মাটিতে রেখে পিছিয়ে গেলেন। বাকিরাও পিছিয়ে গেল তাঁর সঙ্গে। মিতুলের বুকের ভিতরটা ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করেছে। সায়ন্তন ওর হাত ধরে নিজের আড়ালে নিয়ে এল।

বুধানস্কি এবার গলা উঁচিয়ে বলল, “সবাই উলটোদিকে মুখ করে সামনে এগিয়ে যাও। কোনোরকম চালাকি করবে না। সুসি পাথরটা নিয়ে এসো আমার কাছে।”

সুসি ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে যে-মুহূর্তে পাথরটা কুড়াতে গেছে, পরপর দুটো গুলির আওয়াজ হল মিতুলের পাশ থেকে। সায়ন্তন আর মিতুল চমকে উঠে দেখল, ড. নিসিকাওয়ার হাতে একটি জাপানি অটোমেটিক পিস্তল। চোখের পলকে দু-বার গর্জে উঠেছে সেটা। আর উলটোদিকে দুজন আর্তনাদ করে ডানহাত চেপে ধরে মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে।

ড. নিসিকাওয়া চেঁচিয়ে উঠলেন, “সায়ন্তন, তাড়াতাড়ি ওদের অস্ত্রগুলো সরিয়ে নাও।”

সায়ন্তন লাফ দিয়ে গিয়ে অস্ত্রগুলো তুলে নিল মাটি থেকে।

ড. নিসিকাওয়ার এরকম দুর্দান্ত লক্ষ্যভেদ দেখে সবাই অবাক। তিনি পিস্তল হাতে এগিয়ে গিয়ে শক্ত গলায় বললেন, “আমি জানতাম শয়তানের চোখ আমাদের দিকে থাকবে। তাই আমি তৈরি হয়েই এসেছিলাম। আমার ব্যাগের বাইরের চেনে নাইলনের দড়ি আছে। ওদের দুজনের হাত-পা বেঁধে ফেলো এখুনি।”

এবারে মিতুল হাত লাগাল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুধানস্কি আর সুসিকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলা হল। তারপর ওরা এগোল পাহাড়ের নীচে গুহা মুখের দিকে।

পেট্রিয়া মন্তব্য করলেন—“ওরা তো মারা যাবে এই ফাঁকা জায়গাতে এভাবে পড়ে থাকলে।”

ড. নিসিকাওয়া বললেন, “চিন্তা কোরো না, আমরা কাজ সেরে ফেরার পথে ওদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেব।”

সায়ন্তন প্রশ্ন করল, “আমাদের ছোটো দাদু, মানে আস্তিক দত্ত কোথায়? তাঁকে খুঁজতেই তো আমরা এসেছি এখানে।”

“তাঁকে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। এদের বস মি. বাফেট এখানে এসে পড়ার আগে আমাদের কাজটা শেষ করতে হবে। চলো তাড়াতাড়ি।”

গুহার মুখ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার সময় দেখা গেল গুহার ছাদ আর দেয়াল থেকে অনেক পাথর খসে পড়েছে মেঝেতে। সেগুলো পেরিয়ে সাবধানে এগোতে লাগল ওরা। পদ্ম আঁকা পাথরটা খুঁজে পেতে আরও কিছুটা সময় লাগল। ড. নিসিকাওয়ার নির্দেশে সবাই মিলে হাত লাগাতে অনেক কষ্টে পাথরটা সরানো গেল তার জায়গা থেকে। ফলে নীচে আর একটা গুহাপথ বেরিয়ে পড়ল। টর্চের আলোয় দেখা গেল এবড়োখেবড়ো পাথরের প্রাকৃতিক সিঁড়ি নেমে গেছে পাতালে। প্রথমে ড. নিসিকাওয়া নামলেন, তারপর প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়ম, পেট্রিয়া, মিতুল ও সায়ন্তন। সিঁড়িটা বেশ খাড়াই। ব্যালেন্স করে নামতে গিয়ে প্রায় পাথর আঁকড়ে শুয়ে পড়তে হচ্ছে। মিতুলের মনে হচ্ছে, সে এই পথে আর কোনোদিনই ফিরতে পারবে না। পৃথিবীর আলো তার আর দেখা হবে না কোনোদিন। টর্চের সাদা আলোয় সায়ন্তনের মুখটা দেখে বোঝা যাচ্ছে না ওর মনের অবস্থা।

কতটা গভীরে ওরা নামল তার ধারণা মিতুলের নেই। সায়ন্তন জানাল, “আনুমানিক তিনশো মিটার হবে।”

ওরা একটা গোল জায়গাতে পৌঁছাল। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো গেল এখানে। সবাই ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েছে। এখানে অক্সিজেন মনে হয় আরও কম। মাথার মধ্যে কেমন যেন ঝিমঝিম করছে মিতুলের। ব্যাগে অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল। সেটা থেকে কিছুটা শ্বাস নিতে স্বাভাবিক হল শরীর। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে চমকে উঠল মিতুল। মানুষের হাড়গোড়, খুলি ছড়িয়ে আছে যত্রতত্র।

পেট্রিয়া বিস্ময় নিয়ে বললেন, “এখানে আগেও অনেকে এসেছে!”

ড. নিসিকাওয়া বললেন, “হ্যাঁ, শোনা যায় সমুদ্রগুপ্ত, রাজেন্দ্র চোল, লক্ষ্মণ সেন—এঁরা সেনাপতিদের পাঠিয়েছিলেন এই পাথরটা খোঁজার জন্য।”

কিছুক্ষণ পরে উঠে দাঁড়িয়ে জায়গাটা ভালো করে নিরীক্ষণ করে আবার বললেন, “তবে আসল জায়গাটা কেউ খুঁজে পায়নি। এখানে তিনদিক দিয়ে তিনটে রাস্তা বেরিয়েছে। কিন্তু ম্যাপে এটার উল্লেখ নেই। এবার কোন দিকে যাব?”

সবাই মিলে অনেকক্ষণ ধরে থাংকাটা লক্ষ করে কিছুই উদ্ধার করতে পারল না। শেষে প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়ম বললেন, “আমরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে তিনটে রাস্তায় এগোই। আমাদের কাছে ওয়াকিটকি আছে। এক কিলোমিটার রেঞ্জের মধ্যে নিজেদের সঙ্গে কথা বলা যাবে।”

পেট্রিয়া মাথা নেড়ে জানালেন, “সেই ভালো। সায়ন্তন আর মিতুল বাঁদিকের রাস্তায় এগোও। আমি আর সুব্রহ্মনিয়ম ডানদিকের রাস্তায় যাচ্ছি। নিসিকাওয়া মাঝের রাস্তাটা ধরুন। এই নিন সবার ওয়াকিটকি। অন করে টেস্ট করে নিন।”

সায়ন্তন ওয়াকিটকির সুইচ টিপে অন করে দেখে নিল। তারপর ওরা ঢুকে গেল বাঁদিকের রাস্তায়। টর্চের আলোয় ওরা দেখল রাস্তাটা কিছুটা গিয়ে ডানদিকে ঘুরে গেছে। তারপর আবার বাঁদিক। এ-রাস্তাতেও বেশ কয়েকটা নরকঙ্কাল পড়ে রয়েছে। কিছুটা গিয়ে এঁকে-বেঁকে গিয়ে শেষ হয়ে গেল রাস্তা।

মিতুল জিজ্ঞেস করল, “এবার কী হবে?”

পাথরের গায়ে হাত দিয়ে সায়ন্তন বোঝার চেষ্টা করল এখানে আর কোনও গোপন রাস্তা আছে কি না। কিন্তু ওরা কিছুই খুঁজে পেল না। ওয়াকিটকি অন করে সায়ন্তন বলল, “আমরা ফিরে আসছি। এখানে রাস্তা শেষ।”

কিন্তু উলটোদিক থেকে কোনও শব্দ আসছে না।

“কী ব্যাপার?”

“কিছু বুঝতে পারছি না।”

তারপরেই পরপর দুটো গুলির শব্দ। গুহার মধ্যে প্রতিধ্বনি হয়ে গমগম করে উঠল কানাফাটা আওয়াজে। সায়ন্তন আর মিতুল পিছন দিকে দৌড়াতে শুরু করেছে। কিন্তু গুহার রাস্তা শেষ হবার আগেই একটা বিস্ফোরণের শব্দ হল। কেঁপে উঠল পাথরগুলো। সামনে ধোঁয়া আর ধুলোয় ভরতি। ধুলো নাকে-মুখে ঢুকে ওরা দুজনেই কাশতে শুরু করে দিয়েছে। পিছিয়ে এসে একটু ধাতস্থ হয়ে দেখল গুহার একমাত্র বেরোনোর রাস্তা পুরো বন্ধ। তার মানে ওরা দুজনে এখানে বন্দি। সামনে বা পিছনে, কোনও জায়গাতেই বেরোনোর কোনও রাস্তা নেই। সায়ন্তন আর মিতুল দুজনেই ‘হেল্প, হেল্প’ বলে চিৎকার করল কিছুক্ষণ। কিন্তু উলটোদিক থেকে কোনও শব্দ এসে পৌঁছাল না।

শেষে মেঝেতে ক্লান্ত হয়ে বসে বোতল থেকে দু-ঢোঁক জল খেল। তারপর মাথা নীচু করে বসে ধীর গলায় বলল, “এখানে গুলি চালাল কে?”

“আর এক্সপ্লোসিভ এল কোথা থেকে?”

“পিস্তল তো ড. নিসিকাওয়ার কাছে আছে। কিন্তু…”

“কিন্তু বিস্ফোরণের জন্য এক্সপ্লোসিভ! তার মানে কি মি. বাফেট দলবল নিয়ে হাজির হয়েছে এখানে?”

অন্ধকার গুহায় টিমটিমে টর্চের আলো ধীরে ধীরে কমে আসছে। ভিতরে অক্সিজেন সীমিত। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে মিতুল। ব্যাগে খাবার বলতে দু-এক প্যাকেট বিস্কুট, চকোলেট আর পেস্তা। বোতলের জল তলানিতে এসে ঠেকেছে। বেঁচে থাকার আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। কলকাতা থেকে কত দূরে বরফ-রাজ্যের নীচে ঘনিয়ে আসছে মৃত্যু। পরিবার, প্রিয়জন, বাবা-মা আর কারোর সঙ্গেই দেখা হবে না এ-জন্মে। শেষ মুহূর্তে ওরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে পিঠ চাপড়ে দিল দুজনের সাহসিকতার জন্য। কতক্ষণ ওরা অচৈতন্যের মতো পড়ে থাকল বদ্ধ গুহার মধ্যে, সে-সময়ের হিসেব আর মনে করতে পারছে না কেউই।

মাটিটা যেন আবার কেঁপে উঠল। নাকি এটাও মনে ভুল? ঘোরের মধ্যে কোনও স্বপ্ন দেখছে? নাহ্‌! সায়ন্তন নড়েচড়ে বসল। হ্যাঁ, গুহার ধ্বসে যাওয়া মুখের পাথরগুলো নড়ছে। একটা সরু ফাঁক দিয়ে টর্চের আলো এসে পড়ল ভিতরে।

“সায়ন্তন! মিতুল!”

এ তো ছোটো দাদুর গলা!

সায়ন্তন চেঁচিয়ে উঠল, “ছোটো দাদু! আমরা এখানে।”

কিছুক্ষণের মধ্যে পাথরগুলো সরিয়ে ভিতর থেকে বেরোনোর মতো একটা পথ তৈরি হল। ওরা দুজনেই খুব কষ্ট করে পাথরগুলো পেরিয়ে বাইরে এল। ছোটো দাদু দুজনকেই জড়িয়ে ধরলেন বুকের সঙ্গে, “আমাকে খুঁজতে তোরা এত দূর এসেছিস?”

ছোটো দাদুর গায়ে নেপালি পোশাক। পাশে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে ট্রেকিং গ্রুপের ক্যাপ্টেন ধীরাজ। সঙ্গে আরও তিনজন গেরুয়া পোশাকধারী মুণ্ডিতমস্তক লামা। মাঝের গোল বড়ো জায়গাটাতে নিয়ে এসে বসাল দুজনকে। ধীরাজ জলের বোতল আর অক্সিজেন দিয়ে ওদের দুজনকে একটু সুস্থ করে তুলল।

সায়ন্তন প্রথম লক্ষ করল, পাশে পাথরের মেঝেতে দুজন পড়ে আছে চিৎ হয়ে, “এ কী! প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়ম আর পেট্রিয়া। ওঁরা কি মারা গেছেন?”

ছোটো দাদু সায়ন্তনের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, এদের দুজকেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তোদেরকেও নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। আমরা ঠিক সময়ে এখানে এসে পৌঁছলাম বলে রক্ষে।”

“কিন্তু কে করল এটা?”

“সব বলছি। আগে এই বদ্ধ গুহা থেকে তাড়াতাড়ি বাইরে বেরোতে হবে। এটা একটা মৃত্যুকূপ।”

যে সরু খাড়াই রাস্তা দিয়ে ওরা নেমেছিল, সেটা দিয়ে উপরে ওঠা কার্যত অসম্ভব। কিন্তু সায়ন্তন আর মিতুল কাছে গিয়ে দেখল উপর থেকে একটা দড়ির সিঁড়ি ঝুলছে। সেটা আঁকড়ে ধরে ধীরে ধীরে উপরে উঠে এল ওরা সবাই। সবশেষে এলেন তিনজন লামা। দড়ির সিঁড়িটা গুটিয়ে নিয়ে পদ্মফুল আঁকা পাথরটা আবার ঠেলে বসিয়ে দিলেন গুহার মুখে। বাইরে ওঁদের সাহায্য করার জন্য আরও দুজন লামা দাঁড়িয়ে ছিলেন।

গুহার পথ ধরে বাইরে দিনের আলোয় এসে দাঁড়াতে যেন প্রাণ ফিরে পেল সায়ন্তন আর মিতুল। কয়েক ঘণ্টা আগে দুজনে ভেবেই নিয়েছিল, আর কোনোদিন উন্মুক্ত পৃথিবীর আলো-বাতাস পাবে না।

দিনের আলো কমে আসছে আজকের মতো। ড. নিসিকাওয়ার কথা অনুযায়ী, মহাপ্রলয় আসবে আজকে রাতেই। ঠান্ডা নামছে হু হু করে। লামারা ওদের পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নিতে বললেন। সামনে বিস্তীর্ণ ধু ধু প্রান্তর। সাদা গম্বুজটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা দূরে। পশ্চিমদিকে ঢলে পড়া সূর্যের শেষ রক্তিম আলো এসে পড়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায়। অপূর্ব সে দৃশ্য। এই ছবি মনের মধ্যে গেঁথে মৃত্যুর মুখোমুখি হতেও আপত্তি নেই মিতুলের।

সায়ন্তন প্রশ্ন করল, “ড. নিসিকাওয়া কোথায়?”

ছোটো দাদু উত্তর দিলেন, “জানি না। আমরা যখন গুহার ভিতর পৌঁছাই, সেখানে শুধু দুটো মৃতদেহ পড়ে ছিল। তোদের খুঁজে না পেয়ে ফিরে আসছিলাম। তখন লামাজি বললেন, ভিতরে বারুদের গন্ধ, পাথর ধ্বসে পড়েছে—এখানে যদি কেউ আটকে থাকে? তখন আমরা পাথর সরাতে শুরু করলাম সবাই মিলে। তার আগে আসার পথে ট্রেকিং গ্রুপের ক্যাপ্টেন ধীরাজের মুখে তোদের কথা শুনেছি।”

ধীরাজ তখন উৎসাহ নিয়ে বলল, “এত বছর আমি পাহাড়ে আসছি, এই প্রথম শুনলাম কেউ তাদের হারিয়ে যাওয়া দাদুকে খুঁজতে এত কষ্ট করে বেস ক্যাম্প ট্রেক করছে। আমি ওঁকে সে-কথাই বলেছি।”

সায়ন্তন আবার জানতে চাইল, “কিন্তু তোমাকে নাকি শাকিল কিডন্যাপ করে এখানে এনেছিল?”

“হ্যাঁ। শাকিল, বুধানস্কি, সুসি, বাফেট—এরা সবাই একই দলের সাঙ্গোপাঙ্গো। শাকিল পুরী থেকে আমাকে কিডন্যাপ করে ঘুমের ওষুধ ইঞ্জেক্ট করে। আমার আড়াই দিন পরে ঘুম ভাঙে নেপালে এসে। কিন্তু রাস্তায় ধানকুটার কাছে পাহাড়ের খাড়াই বাঁকে উলটোদিক থেকে আসা একটা ট্রাক আচমকা এমন ধাক্কা মারল, শাকিলের গাড়ি গিয়ে পড়ল গভীর খাদে। আমারও বাঁচার কথা ছিল না। ভাগ্যজোরে গাড়ির দরজা খুলে একটা গাছে আটকে গিয়েছিলাম আমি। গাড়িসমেত বাকিরা সবাই খাদে গিয়ে পড়ল। সেখানে এই পরিব্রাজক লামারা আমাকে উদ্ধার করে শুশ্রূষা করেন। তাঁরাই আমার কথা শুনে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন এখানে। ওটাং গুম্ফার কথা ওঁরা জানতেন।”

মিতুল প্রশ্ন করল, “বুধানস্কি আর সুসিকে ওই গম্বুজের কাছে আহত অবস্থায় আমরা বেঁধে রেখে গিয়েছিলাম। তারা কোথায়?”

সায়ন্তন একই সুরে জানতে চাইল, “আর গুহার মধ্যে প্রফেসর সুব্রহ্মনিয়ম আর পেট্রিয়াকে কারা গুলি করল? বিস্ফোরণই-বা করল কে?”

“ড. নিসিকাওয়াকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!”

ছোটো দাদু উত্তর দিলেন, “হতে পারে বাফেট তার গ্যাং নিয়ে এখানে আশেপাশেই কোথাও লুকিয়ে আছে। নিসিকাওয়াকে ওরাই হয়তো ধরে রেখেছে। সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ঘাপটি মেরে বসে আছে নিশ্চয়ই। আমরাও দেখি কী হয়।”

অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে কানের মধ্যে সুমধুর গম্ভীর সুরে একটা সংগীত ভেসে এল—‘ওম… মণি… পদ্মে… হুম… ওম… মণি… পদ্মে… হুম…’

ছোটো দাদু, ধীরাজ, সায়ন্তন আর মিতুল দেখল, ওদের সঙ্গে আসা পাঁচজন লামা কিছুটা দূরে পাহাড়ের খাঁজে গোল হয়ে ধ্যানে বসেছেন। তাঁদের মুখ থেকেই অদ্ভুত এই শব্দ কানে আসছে। মনে হচ্ছে যেন ওঁরা পৃথিবী ছেড়ে ভেসে যাচ্ছেন মহাশূন্যে। এত উজ্জ্বল আকাশ জীবনে কখনও দেখেনি মিতুল। পুরো আকাশগঙ্গা যেন নেমে এসেছে মাথার কাছে। জ্বলজ্বল করছে নক্ষত্ররা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কালপুরুষ, সপ্তর্ষিমণ্ডল। আজকেই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যখন বুধ, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন—সৌরমণ্ডলের এই ছ’টি গ্রহ একটা সরলরেখায় চলে আসবে। খালি চোখে কি দেখা যাবে তাদের? এদের মিলিত আকর্ষণে পৃথিবীতে কি মহাপ্রলয় আসতে চলেছে? আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধের মৃত্যু কি এরকমই কোনও দুর্লভ মুহূর্তে হয়েছিল? আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার জন্য? আদৌ কি পাওয়া যাবে উত্তর? একঘেয়ে ‘ওম… মণি… পদ্মে… হুম… ওম…’ শুনতে শুনতে মিতুলের চোখে ঘুম জড়িয়ে ধরছে। গত বেশ কয়েকদিনের শারীরিক ধকল কাহিল করে দিয়েছে ওকে। এবার ও একটু ঘুমাতে চায়। রুকস্যাক থেকে ফোলানো বালিশ নিয়ে মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়ল স্লিপিং ম্যাটের উপর। ঘুমটা যেন ওত পেতে ছিল। লাফ দিয়ে এসে পড়ল ঘাড়ের উপর।

আচমকা ভেঙে গেল গভীর ঘুমটা। ধড়ফড় করে উঠে বসল মিতুল। বাকিরাও ঝিমুনি ভেঙে উঠে বসেছে। আবার কাঁপতে শুরু করেছে মাটি। গুম গুম শব্দটা শোনা যাচ্ছে মাটিতে কান পাতলে। আওয়াজটা জোরে হচ্ছে ধীরে ধীরে। সায়ন্তনের হঠাৎ খেয়াল হল, পাঁচজন লামা তিব্বতি মহামন্ত্র জপ করতে করতে এগিয়ে চলেছেন সামনের ওই গোল গম্বুজটার দিকে। ওরাও উঠে পড়ে পিছু নিল লামাদের। লামারা গোল করে গম্বুজটার চারপাশে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। ওঁদের হাত দুটো আকাশের দিকে ছড়িয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন গম্বুজের সামনে। গম্বুজটা তখন প্রচণ্ড কাঁপছে। কোটি কোটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মৃদু আলো এসে ভরিয়ে দিয়েছে সাদা বরফের প্রান্তর। গম্বুজটার গা থেকে খসে পড়ছে পাথরের চাঙড়।

মিতুল অস্ফুট স্বরে বলল, “আশ্চর্য!”

এতক্ষণ যেটা গম্বুজ ছিল, পাথরগুলো ভেঙে পড়তে সেটা একটা গোল রূপালি মসৃণ বলের আকার নিয়েছে। বলটা মাটির সঙ্গে আটকে আছে। আর সেখান থেকেই গুম গুম ধাতব শব্দটা আসছে। যেন মনে হচ্ছে নীচে থেকে কোনও জিনিস ধাক্কা মারছে ওকে। আর সেজন্যই সে কাঁপছে। তার সঙ্গে কাঁপছে চারপাশের মাটি। কাঁপুনিটা ক্রমশ বাড়ছে। পাথুরে জমিতে কেউ স্থির থাকতে পারছে না। মনে হচ্ছে যে-কোনো মুহূর্তে গোটা এলাকাটা পাতালপ্রবেশ করবে।

ধীরাজ আর্তনাদ করে আঙুল তুলে দেখাল উত্তরদিকে। দূরে পাহাড়ের মাথাটা সাদা বরফে চকচক করছিল এতক্ষণ। কিন্তু এখন সেখানে সাদা ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে।

“তুষারধ্বস! পাহাড়ের গা থেকে বরফের স্তর ভেঙে ছুটে আসছে এদিকে। সেজন্য সাদা ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। এখুনি আমাদের শেল্টার নিতে হবে। নইলে সবাই মারা যাব!”

ছোটো দাদু জিজ্ঞেস করল, “কতক্ষণ সময় লাগবে ওই বরফের ঝড়টা এখানে এসে পৌঁছাতে?”

“খুব বেশি হলে মিনিট দশেক!”

ইতিমধ্যে খুব জোরে হাওয়া বইতে শুরু করেছে। মাটিটাও সমানে কাঁপছে। মাটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। সায়ন্তন উত্তেজিত হয়ে বলল, “ওই যে ড. নিসিকাওয়া!”

আবছা অন্ধকারের মধ্যে মিতুল দেখল, ড. নিসিকাওয়া দৌড়ে আসছেন রূপালি গোলকের দিকে। তাঁর ডানদিকে আরও দুজন। তার মধ্যে একজন লম্বা লোক।

“ওটা তো বুধানস্কি! তাহলে সামনের লোকটা কে?”

“ও মনে হচ্ছে বাফেট।”

বাফেট চেঁচিয়ে নির্দেশ দিল, “দাঁড়িয়ে যাও, নিসিকাওয়া! আর এক পা এগোলে গুলি চলবে। পাথরটা আমাকে দিয়ে দাও।”

“নো, নেভার!”

গুলির শব্দ। আবার! পরপর তিন রাউন্ড গুলি চলল। মিতুল, সায়ন্তন সবাই মাথা নীচু করে মাটিতে শুয়ে পড়েছে। ড. নিসিকাওয়া আর বুধানস্কি পড়ে গেছে। বাফেট এগিয়ে এসে ড. নিসিকাওয়ার হাত থেকে কেড়ে নিল পাথরটা। কিন্তু পাথরটা নিয়ে সে উলটোদিকে না গিয়ে রূপালি গোলকটার দিকেই এগোল। বাফেট পাগলের মতো আনন্দে চিৎকার করে বলতে থাকল, “বার্ধক্য, জরা, মৃত্যু—এসবের ঊর্ধ্বে উঠে আমি আজকে অমর হয়ে যাব। আমাকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কারোর নেই।”

এদিকে ড. নিসিকাওয়া আহত অবস্থাতেও শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলেছেন গোলকটার দিকে, “আমি সারাজীবন এই দিনের জন্য অপেক্ষা করেছি। শেষ মুহূর্তে এসে ফল তুমি ভোগ করবে, তা হতে পারে না। আমি তোমাকে কিছুতেই এই ফল ভোগ করতে দেব না।”

সায়ন্তন চাপা গলায় বলল, “এসব কী বলছে ওরা? ড. নিসিকাওয়া আর বাফেট অমরত্বের জন্য নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে? হিমালয়কে বাঁচানোর কথা সব মিথ্যা?”

ছোটো দাদু মন্তব্য করলেন, “সেটা আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম। সেজন্যই আমি ওঁর হাতে পাথরটা তুলে দিতে রাজি হইনি। সুব্রহ্মনিয়ম আর পেট্রিয়াকে নিসিকাওয়াই হত্যা করেছে। তোদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছে গুহার মধ্যে। সবকিছুই অমরত্ব পাওয়ার জন্য।”

ধীরাজ চেঁচিয়ে বলল, “হাতে আর সময় নেই। আমাদের দৌড়াতে হবে। না-হলে সবাই মারা পড়ব!”

মিতুল দেখল, উত্তরদিকের আকাশে তারারা ঢাকা পড়ে গেছে বিশাল সাদা ধোঁয়ায়। তুষারঝড়টা তীব্র গতিতে ধেয়ে আসছে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বলে। মাটির কাঁপুনি উত্তরোত্তর বাড়ছে। এর মধ্যে আবার গুলির শব্দ! বাফেট মাটিতে শুয়ে পড়েছে। তার হাত থেকে লাল পাথরটা ছিটকে পড়ল সাদা বরফের মধ্যে। অন্ধকারের মধ্যে দূর থেকে তার রক্তিম দ্যুতি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।

মিতুল, সায়ন্তন, ছোটো দাদু আর ধীরাজ দৌড়াতে শুরু করেছে পাহাড়ের কোলে। কয়েক মুহূর্তের জন্য মিতুল ছুটতে ছুটতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, পাঁচজন লামা সেই লাল পাথরটা কুড়িয়ে নিয়ে হাত ধরাধরি করে ঝড়ের মধ্যে এগিয়ে চলেছেন রূপালি গোলকটার দিকে।

ইতিমধ্যে তুষারঝড় এসে মাঝের দৃশ্যপথ বন্ধ করে দিল। ওরা কোনোরকমে ধীরাজের হাত ধরে ছুটতে ছুটতে পৌঁছে গেছে পাহাড়ের নীচে। এক ধাক্কায় তাপমাত্রা নেমে গেছে শূন্যের অনেক নীচে। একটা ছোট্ট গুহায় মাথা গোঁজার আশ্রয় পেয়ে মিতুলের মনে হল, এ-যাত্রায় আবার বেঁচে গেলাম।

“ওটা কী?”

ধীরাজের চিৎকারে সবার মুখ ঘুরে গেছে বাইরের দিকে। সাদা তুষারঝড়ের মধ্যে একটা প্রচণ্ড উজ্জ্বল আলো দেখা গেল। মনে হচ্ছে যেন দ্বিতীয় সূর্য উঠেছে আকাশে। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখা দিয়ে গোলকাকৃতি আলোটা দ্রুত উপরে উঠে মিলিয়ে গেল মহাশূন্যে। ছোটো দাদু ওইদিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে স্বগতোক্তি করলেন, “আড়াই হাজার বছর পর পাথরটা মুক্তি পেল পৃথিবী থেকে। কিন্তু ও আমাদের যা শেখাতে এসেছিল, সেটা কি এত হাজার বছরেও শিখতে পেরেছি আমরা?”

মাটির কাঁপুনি থেমে গেছে। তুষারঝড়ও থিতিয়ে এসেছে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সাদা কার্পেটের মতো বরফের মোটা স্তর বিছিয়ে দিয়ে। ওরা চারজনেই গুহার পাথরের দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল ভোররাতে। হেলিকপ্টারের ফটফট শব্দে তন্দ্রা ভাঙল।

বাইরে তখন সকালের আলো উজ্জ্বল হয়ে সাদা প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। সায়ন্তন এগিয়ে গিয়ে দেখল হেলিকপ্টার থেকে লাফ দিয়ে নামলেন ইন্সপেক্টর অনন্ত মোহান্তি। গায়ে মোটা ওভারকোট, মাথায় হ্যাট। তাঁর সঙ্গে আরও দুজন অফিসার আর নেপাল পুলিশের লোক।

ছোটো দাদু সায়ন্তনের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ওর কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, “পুলিশ চিরকাল সবশেষেই আসে।”

মোহান্তি বরফের মধ্যে এক হাত ঢুকে গিয়ে হাত তুলে একগাল হেসে বললেন, “কী ডাক্তারবাবু, আপনারা তো বহাল তবিয়তে আছেন দেখছি। এদিকে নেপাল পুলিশকে কনভিন্স করতে আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হল। রিখটার স্কেলে এদিকে একটা মৃদু ভূমিকম্প হয়েছে। গতরাতের রেকর্ডে দেখাচ্ছে। সেজন্য রেসকিউ টিম পাঠাল আমাদের সঙ্গে। এখানে তো ভয়ানক স্নো-স্লাইড হয়েছে দেখছি। আপনারা সব ঠিক আছেন তো?”

পুলিশ এসে সাবার কাছ থেকে স্টেটমেন্ট নোট করে নিল। কিন্তু চারপাশে অনেক খুঁজেও কোনও মৃতদেহ পাওয়া গেল না। দেখা গেল, শুধু সেই বড়ো গম্বুজটা ভ্যানিশ হয়ে গেছে মাঝখান থেকে। তদন্ত শেষ করে পুলিশ ওদের সবাইকে নিয়ে হেলিকপ্টারে উঠে পড়ল। হেলিকপ্টার আকাশে উঠতে উপর থেকে মিতুল অবাক চোখে তাকিয়ে রইল চির-রহস্যে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে। স্লিপিং বুদ্ধা! সারাজীবনে হৃদয়ে দাগ কাটা দৃশ্য। সাদা মেঘে ঢাকা পড়ে গেল কয়েক  মুহূর্তের মধ্যে।

সায়ন্তন হঠাৎ মিতুলের হাত খামচে ধরে আঙুল বাড়িয়ে দেখাল। বড়ো অদ্ভুত একটা ছবি। অনেক উপর থেকে দেখা যাচ্ছে, সাদা বরফের উপর পিঁপড়ের মতো লাইন দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন পাঁচজন গেরুয়া পোশাক পরা লামা।

uponyamonipadma03

ছবি-মৌসুমী 

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

adokakamikeজয়ঢাক প্রকাশন থেকে প্রকাশিত পুষ্পেন মণ্ডলের থ্রিলার সংগ্রহ। ডিসকাউন্টেড দামে বিনা কুরিয়ার চার্জে দেশের সর্বত্র পেতে ছবিতে ক্লিক করুন

Leave a Reply