উপন্যাস-বাহাদুর শাহের হিরের নেকলেস-সত্যজিৎ দাশগুপ্ত-শীত’২৫

সত্যজিত দাশগুপ্তর আগের গল্প মোতিবিবির আয়নাক্লাইম্যাক্স, ফ্ল্যাট নম্বর ২০১, সেই মেয়েটা, সুরের জালে,  প্রতীক, এক রাতের গল্প 

রাজধানী এক্সপ্রেসের গতি এখন অনেক কম। আমরা এর মধ্যেই চার ঘণ্টা লেট। কখন দিল্লি পৌঁছব জানি না। এখানেই দুপুর দুটো। ভেবেছিলাম আজকে অন্তত কুতুবমিনারটা সেরে ফেলব। কিন্তু কোথায় কী!

আমাদের এবারের ট্যুর দিল্লি-আগ্রা। বেশ কিছুদিন ধরেই অনিদা ফন্দি করছিল এই শীতে উত্তর ভারত আসার। ঝোপ বুঝে কোপ মারার মতো ডিসেম্বরের টিকিটও কেটে রেখেছিল। দিল্লি আমার প্রথমবার হলেও অনিদা এর আগে বেশ কয়েকবার এসেছে। উত্তর ভারত বলতে আমার বছর খানেক আগে লখনউ আসা। সে-বার আমরা ‘লখনউ হত্যা মামলা’-তে জড়িয়ে পড়েছিলাম। কেসটা যদিও অনিদা সলভ করেছিল কলকাতায় এসে।

গাজিয়াবাদ হয়ে সাবিবাবাদ যাবার রাস্তায় বাড়িগুলো অদ্ভুত। চার দেওয়ালের কোনও না কোনও একটা দেওয়াল পুরো জানালা বা দরজা ছাড়া। কোনও ঘুলঘুলিও নেই। একেবারে সোজা দালান তুলে দেওয়া। দেওয়ালের দিকে তাকালেই দম বন্ধ হয়ে যায়। তার ওপর কয়েকটা বাড়ির রঙ তো তাজ্জব বানিয়ে দেবার মতো। পুরো কালো। যেন আলকাতরা লেপা! তবে জানালা-দরজার আকারগুলো খুব সুন্দর। মাথাগুলো আর্ক টাইপ। আসলে হাজার বছরের পুরোনো শিল্পকলার ছোঁয়া আজও রয়ে গেছে দিল্লি আর তার আশেপাশে।

এসি কামরায় ছিলাম বলে এতক্ষণ ঠান্ডাটা মালুম হয়নি। এবার ট্রেন থেকে নেমে বুঝলাম দিল্লির ঠান্ডা কী জিনিস! মাথা থেকে পা সোয়েটার, টুপি, জিনসে ঢাকা। সাংঘাতিক কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। হি হি করে কাঁপছি। দুপুর তিনটে। রোদ নেই। পুরো রাজধানী কুয়াশায় ডুবে।

শহরটাতে অসাধারণ ট্রাফিক ব্যবস্থা। সঙ্গে ঝকঝকে রাস্তাঘাট। যে-কাউকে অবাক করবেই করবে। আর সেই অবাক হওয়া অবস্থাতেই অনিদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “দিল্লির বয়স কত, অনিদা?”

অনিদা বলল, “শোনা যায়, প্রায় পঞ্চাশ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৌর্য সম্রাট ধীলু বা দীলু রাজার নাম থেকে এই শহরের নাম হয়। অবশ্য কেউ কেউ আবার বলেন, পার্সিয়ান শব্দ দেহলিজ বা দেহালি থেকে দিল্লি শব্দটা এসেছে। কারও মতে দিল্লির বয়স তিন হাজার। পাণ্ডবদের রাজধানী নাকি ছিল দিল্লি।”

এত পুরোনো! শহরের বয়স শুনে চোখ কপালে উঠে গেল আমার। মনে পড়ল আমার এক প্রিয় বিজ্ঞানী দাদা, অরূপদার লেখা বইটার কথা— ‘দাস্তান-এ-দেহলি’। বললাম, “লোকসংখ্যাও তো অনেক। সারা পৃথিবীর লোকের আসাযাওয়া, তাই না?”

তা তো বটেই। আমার কথায় সায় দিয়ে অনিদা বলল, “আর এটা আজকের নয়। হাজার হাজার বছর ধরে স্লেভ, তুর্কি, আফগান, তুঘলক, সঈদ, লোধি থেকে মোগল— কত জাতির যে এই শহরে পায়ের ধুলো পড়েছে, ভাবলে অবাক হতে হয়। তবে এদের মধ্যে সবথেকে বেশি সময় দিল্লিকে কব্জা করে রেখেছিল মোগলরা।”

“আমরা তো নতুন দিল্লিতে থাকব?”

“হ্যাঁ।”

“পুরোনো দিল্লিতে যাব না?”

“যাব তো!” জোরে মাথা ঝুঁকিয়ে অনিদা বলল, “ওখানেই তো লালকেল্লা।”

লাল কেল্লা! নামটা শুনেই শরীরটা ঝাঁকিয়ে উঠল। ভাবলাম, শাহজাহান সারাজীবনে কত কিছু তৈরি করে গেছেন!

অনিদা বলল, “আসলে পুরোনো দিল্লি ছিল মোগলদের রাজধানী। শাহজাহানের তৈরি শহরটা শাহজাহানাবাদ নামে পরিচিত ছিল।”

অরবিন্দ আশ্রম দক্ষিণ দিল্লিতে। জায়গাটা হজ খাস এলাকা। সেখানেই ঘর বুক ছিল আমাদের। দিল্লির গল্পে মশগুল হয়ে কখন যে পৌঁছে গেছি বুঝতে পারিনি। রিসেপশনে মি. গুপ্ত ছিলেন। ভদ্রলোক প্রবাসী বাঙালি। কলকাতার লোক বলে বিশেষ খাতির পেলাম ওঁর কাছ থেকে। তাছাড়া অনিদাও এখন বেশ নাম করেছে। সেটাও সাহায্য করল।

কুতুবমিনার এখান থেকে হাঁটাপথে মাত্র দশ মিনিট। ঘরে বেশি সময় নষ্ট না করে স্নান সেরেই বেরিয়ে পড়লাম।

মাথা তুলে কুতুবউদ্দিন আইবকের অমর কীর্তি দেখতে দেখতে অনিদা বলল, “প্রথম তলাটা কিন্তু পৃথ্বীরাজ চৌহানের তৈরি।”

“তাই নাকি!” তথ্যটা আমাকে অবাক করল।

তখন অনিদা বলল, “এর পেছনে আবার ইলতুতমিসেরও হাত রয়েছে।”

“ইলতুতমিস, মানে কুতুবউদ্দিনের মেয়ের হাজব্যান্ড, না?”

উত্তরে হেসে মাথাটা দু-বার সামনের দিকে ঝোঁকাল অনিদা।

কুতুবমিনার আমার অবাক ভাবটা বাড়িয়ে তুলছিল। অনিদাকে বললাম, “আমাদের দেশ কত ঐতিহ্যময়, তাই না?”

“তাও তো লোকে ছোটে পশ্চিমের দেশে!”

কথাটায় তাচ্ছিল্য ছিল। এল আমাদের পেছন থেকে। ঘাড় ঘুরিয়ে আবিষ্কার করলাম বয়স্ক এক ভদ্রলোককে। আমাদের পেছনে হাত পাঁচেকের মধ্যে দাঁড়িয়ে। পরনে মোটা জাম্পার ও প্যান্ট। হাতে গ্লাভস। গলায় মাফলার। মাথায় কানঢাকা টুপি। পায়ে স্পোর্টস শু। মাঝারি উচ্চতার ভদ্রলোক যে বাঙালি, তা আর আলাদা করে বলে দেবার দরকার নেই। কালো মোটা ফ্রেমের চশমার পেছনে চোখজোড়া বলে দিচ্ছিল ভদ্রলোকের চরিত্রে একটা ব্যক্তিত্ব আছে।

ঠোঁটের কোণের মুচকি হাসিটা দেখে বুঝলাম ভদ্রলোকের কথাটা অনিদার মনে ধরেছে।

“কলকাতা থেকে?” আবার প্রশ্ন করলেন ভদ্রলোক।

উত্তরে অনিদা মুচকি হাসল। তারপর প্রশ্ন করল, “প্রবাসী বাঙালি?”

“আশ্চর্য! কী করে বুঝলেন?” প্রশ্ন দিয়েই হ্যাঁ বললেন ভদ্রলোক। সঙ্গে অবাক হওয়াটাও বুঝিয়ে দিলেন।

“সবাই হাঁ করে কুতুবমিনার দেখছে, আর আপনি আপনমনে এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত হেঁটে বেড়াচ্ছেন। খুব সম্ভবত সান্ধ্যভ্রমণ, তাই তো?”

“বাহ্‌, দারুণ ধরেছেন তো!” ভদ্রলোকের সঙ্গে সঙ্গে আমিও অবাক। অনিদা কখন এত কিছু নজর করে ফেলেছে!

আমরা কলকাতা থেকে আসছি শুনে ভদ্রলোক গদগদ হয়ে উঠলেন। বললেন, ওঁর নাম শ্যামল ভট্টাচার্য। আজ প্রায় তিরিশ বছর দিল্লিতে। পেশায় আর্কিটেক্ট। মজার ব্যাপার, অরবিন্দ আশ্রমের উলটোদিকে সর্বোদয় এনক্লেভে ওঁর ফ্ল্যাট। আমরা অরবিন্দ আশ্রমে উঠেছি শুনে উনি বললেন, “বাহ্‌, তাহলে তো ভালোই হল। সময় করে আসুন না আমার ওখানে।”

অনিদা সচরাচর ঝট করে নিজের পরিচয় কাউকে দেয় না। এবার মি. ভট্টাচার্য যখন জানতে পারলেন অনিদার পেশার কথাটা, তখন চোখ কপালে তুলে বললেন, “আপনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ!” তারপর নামটা যখন শুনলেন, তখন মাথা নাড়িয়ে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার এক ভাগনে থাকে কলকাতায়। ওর মুখে অনিরুদ্ধ সেন নামটা শুনেছি।”

উত্তরে অনিদা মুচকি হাসল। তখন মি. ভট্টাচার্য চোখ কপালে তুলে বললেন, “আপনি তো এখন সেলিব্রিটি মশাই!”

অনিদা তাতে আবার হেসে প্রশংসাটা গ্রহণ করল।

মি. ভট্টাচার্য এবার আমার দিকে চেয়ে বললেন, “তুমি রণজয়? রণজয় বোস? অনিদার কেসগুলো তুমিই গল্পের আকারে লেখো?”

আমিও সঙ্গে সঙ্গে হেসে মাথাটা দু-বার সামনের দিকে ঝোঁকালাম।

অনিদা বলল, “ও আমার মাসতুতো ভাই। জয়। কেসগুলোতে আমাকে হেল্পও করে।”

আসলে আগেও বলেছি। তাও যারা জানে না, তাদের জন্য আবার বলি। আমাদের মায়েরা মেয়েবেলার বান্ধবী। আমরা কালীঘাটের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকি। মায়ের বান্ধবীর ছেলে হলেও অনিদা আমাকে মাসতুতো ভাই বলেই পরিচয় দেয়।

“তার মানে আমি এমন একজনের সঙ্গে কথা বলছি, যাঁর কাজই হল অন্ধকার রাস্তায় আলো ফেলা! আপনি যেখানে থাকবেন, অপরাধী তার দুশো গজের মধ্যেও আসবে না।”

“আসলে ব্যাপারটা ঠিক উলটো।” মাথা নেড়ে অনিদা বলল, “যেখানেই তেনাদের পায়ের ধুলো পড়ে, সেখানেই আমাদের ডাক পড়ে।”

কথাটা শুনে হো হো করে হেসে উঠলাম আমরা।

***

দিল্লিতে আসব আর ‘পরাঠাওয়ালা গলি’-র পরোটা খাব না, তা কখনও হয়? তাই হজ খাস থেকে আমরা এবার পা বাড়ালাম চাঁদনি চকের দিকে। হজ খাস মেট্রো থেকে সিটি সেন্টারের মেট্রো ধরে সোজা পৌঁছে গেলাম চাঁদনি চক। জায়গাটা আমাদের ধর্মতলার মেট্রো অঞ্চলকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। অফিসফেরতা মানুষ, সবাই দৌড়োচ্ছে। সবার বাড়ি ফেরার তাড়া। এটাই পুরোনো দিল্লি।

অনিদা দেখলাম দিল্লিটা নিজের হাতের তালুর মতো চেনে। এতদিন পরে এসেও কাউকে কিছু না জিজ্ঞাসা করে চাঁদনি মেট্রো থেকে সোজা আমরা এসে পৌঁছলাম পরাঠাওয়ালা গলি। এসে দেখলাম, পুরোনো দিল্লি নতুনের থেকে অনেক বেশি ঘিঞ্জি। অপরিষ্কারও। তার প্রধান কারণ বেশি মানুষের আসাযাওয়া ও থাকা।

লালকেল্লা এখান থেকে হেঁটে মাত্র পাঁচ মিনিট। শুনে লাফিয়ে উঠলাম আমি। জিজ্ঞাসা করলাম, “আমরা যাব না?”

তাতে আমাকে একটা ধমক মেরে থামিয়ে দিয়ে অনিদা বলল, “এত ছটফট করিস না। আগে পেটের খিদে মেটা। মনের খিদেটা বাড়তে দে। আমরা কাল যাব।”

হজ খাস মেট্রো স্টেশন থেকে অটো নিয়ে অরবিন্দ আশ্রমের সামনে এসেছি, ঠিক সেই সময় সর্বদয়া এনক্লেভের সামনে ঘটে গেল একটা মর্মান্তিক ঘটনা। একজন বাইকওয়ালা সামনের মোড়টা দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে বাঁক নিচ্ছিল। উলটোদিক থেকে আসছিল মালবোঝাই একটা বিশাল লরি। বাইকটা গতি সামলাতে না পেরে পড়ে গেল একেবারে লরিটার সামনে। একটা হালকা ছোঁয়া। উড়ে গেল বাইকটা। সেখানেই মারা গেল বাইকওয়ালা। দেখতে দেখতে লোক জমে গেল। লরিটা যদিও ততক্ষণে হাওয়া হয়ে গেছে। মানুষজনের কথাবার্তায় বুঝলাম, আমাদের মতো আরও কয়েকজনও ঘটনাটা দেখেছে। কেউ কেউ আবার লরির নম্বরটাও মনে রেখে দিয়েছে। অনিদা তো বটেই, আমিও দেখে রেখেছিলাম নম্বরটা। কিন্তু আমাদের আর আলাদা করে কিছু করার নেই এখানে। তবে আচমকা এমন ঘটনা আমাদের ঝিমিয়ে দিল। এই সময় আমাদের চোখ গেল সর্বদয়া এনক্লেভের একটা বিল্ডিংয়ে দোতলার একটা ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে। একজন দাঁড়িয়ে। রাস্তার আলোয় চিনতে অসুবিধে হল না। শ্যামল ভট্টাচার্য। পাশে দাঁড়ানো বছর কুড়ির ছেলেটার পরিচয় অবশ্য আমাদের জানা নেই।

ট্রেন লেট, দেরি করে দিল্লি পৌঁছানো, কুতুবউদ্দিনের অমর সৃষ্টির চাক্ষুষ দর্শন, পরাঠাওয়ালা গলির পরোটা খাওয়া। আর সবশেষে এই মর্মান্তিক অ্যাক্সিডেন্ট— সারাদিন কতকিছু ঘটল। আর শরীর দিচ্ছিল না। হাত-পা ধুয়ে বিছানা নিতেই ধীরে ধীরে চোখ বুজে এল। গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল এই ভেবে যে, আমি এখন ভারত সম্রাট আকবরের শহরে!

লালকেল্লার ভেতর দরজার একেবারে গায়ে যে বাজারটা রয়েছে, অনিদা বলল সেটা নাকি শাহজাহানের আমলের। সেই ঐতিহ্য রক্ষার জন্য এখানকার মানুষ আজও বাজারটা চালিয়ে যাচ্ছে।

শাহজাহানের বিচারসভা দেওয়ান-ই-খাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় অনিদার ফোনটা বেজে উঠল। ল্যান্ড নম্বর। অচেনা। তবে সামনে ০১১ দেখে অনিদা বলল সেটা দিল্লির। তারপর ফোন ধরে কানে দিতে বুঝলাম, নম্বর অচেনা হলেও ফোনের ও-পাশের মানুষটা মোটেও তা নয়।

ফোনটা এসেছিল অরবিন্দ আশ্রমের ম্যানেজার মি. গুপ্তর কাছ থেকে। সর্বদয়া এনক্লেভের মি. ভট্টাচার্য ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। অনিদাকে অনুরোধ করেছেন একবার ওঁর ফ্ল্যাটে যেতে। কোনও একটা বিশেষ সমস্যায় পড়েছেন। তাই অনিদার সাহায্যের দরকার। তাহলে কি দিল্লিতে এসেও… আমার নিশ্বাসের গতি বেড়ে গেল। অনিদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “নতুন তদন্ত?”

আমরা ততক্ষণে লালকেল্লা থেকে বেরিয়ে পড়েছি। আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর না পেয়ে আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, “যাবে না?”

আমার দিকে একবার আড়চোখে চেয়ে নিয়ে হাঁটতে থাকল অনিদা। ওর মুখ দেখে মনে হল ও যাবে। তাই আমি ফের জিজ্ঞাসা করলাম, “কখন যাবে?”

“দেখছি।” বলে ও সোজা গিয়ে বসল একটা সাইকেল রিকশাতে। আমিও চুপচাপ ওর পাশে গিয়ে বসলাম। তখন রিকশাওয়ালা আমাদের অবাক করে দিয়ে পরিষ্কার বাংলায় জিজ্ঞাসা করল, “কোথায় যাবেন, বাবুরা?”

অনিদা কিছু বলতে যাচ্ছিল। তখন রিকশাওয়ালা বলল, “আমি বর্ধমানের ছেলে, বাবু। সাত বছর দিল্লিতে আছি। কোথায় যাবেন বলুন?”

“জামা মসজিদ।” বলে আরও জুত করে রিকশায় জায়গা করে নিল অনিদা। লক্ষ করলাম, কপালে ওর তখনও চারটে অবাক হওয়ার ভাঁজ। সেটা রিকশাওয়ালার পরিচয় পেয়ে, নাকি আচমকা ফোনটা পেয়ে, জানি না। তবে দ্বিতীয়টা হলেই আমি বেশি খুশি হব।

কয়েকশো বছর পুরোনো মিনা বাজার পেরিয়ে জামা মসজিদে ঢোকার সময় অনিদার মোবাইলটা আবার বেজে উঠল। আবার মি. গুপ্ত। মি. ভট্টাচার্য নাকি ফের ফোন করেছিলেন। বার বার অনুরোধ করছেন অনিদা যেন আজ একবার অবশ্যই ওঁর ফ্ল্যাটে যায়। শেষমেশ আজ রাত আটটা নাগাদ আমাদের যাওয়া ঠিক হল।

“ব্যাপারটা সিরিয়াস মনে হচ্ছে?” আমার প্রশ্ন শুনে অন অনিদা ছোট্ট করে উত্তর দিল, “হুম।”

ভারতবর্ষের সবথেকে বড়ো মসজিদ, জামা মসজিদ। ভেতরে ঢুকে থ হয়ে গেলাম আমি।

“এটা মসজিদ, নাকি প্রাসাদ?”

আমার কথা শুনে অনিদা মুচকি হেসে বলল, “এ কি যার-তার তৈরি? সম্রাট শাহজাহানের আর একটা অমর কীর্তি। ছ’বছর লেগেছিল তৈরিতে।”

মসজিদ চত্বরের এককোণে দাঁড়িয়ে আমি তখন ছবি তোলায় ব্যস্ত। এমন সময় চোখ গেল অনিদার দিকে। ওর নজর তখন মসজিদের চূড়ায়। কপালে গোটা চারেক ভাঁজ। এবার বুঝলাম, মনে মনে ও পৌঁছে গেছে শ্যামল ভট্টাচার্যের ফ্ল্যাটে।

***

মি. গুপ্তর পেছন পেছন তরতরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলাম আমরা। দোতলায় আসতে ডানদিকের একটা দরজার নেমপ্লেটে শ্যামল ভট্টাচার্যের নাম পেলাম। বেল বাজাতে দরজা খুললেন বয়স্ক একজন লোক। মাথা-ভরতি পাকা চুল। ঠোঁটের ওপর পেল্লায় গোঁফের দুটো ডানা থুঁতনির কাছে ঝুলে এসে একে অপরের সঙ্গে হাত মেলাতে চাইছে। লোকটার চোখ দুটোও ঢুলু ঢুলু। সাদা পায়জামার সঙ্গে গায়ে জড়ানো মোটা চাদর বলে দিচ্ছিল লোকটা কাজের লোক জাতীয় কেউ একজন হবেন। মি. গুপ্তর সঙ্গে যে ওঁর পরিচয় রয়েছে তা ভদ্রলোকের হাসি দেখেই বুঝলাম। এবার ওঁর চোখজোড়া যখন আমাদের মাপছে, তখন ভেতর থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল— “সুখেনদা, ওঁদের নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে এসো।”

একদিনের পরিচয় হলেও গলাটা চিনতে অসুবিধে হল না। শ্যামল ভট্টাচার্য।

কোলাপসিপল গেট পেরিয়ে সামনের সোজাসুজি ঘরটার দিকে তাকাতে পর্দার পাশ থেকে একজোড়া পা চোখে পড়ল। একটা পা আর একটার ওপর তোলা। আন্দাজ করতে অসুবিধা হল না ইনিই বাড়ির মালিক। মানে মি. শ্যামল ভট্টাচার্য। ডানদিকের দুটো ঘর পেরিয়ে এগিয়ে যাবার সময় প্রথম ঘরটার ভেতরে একবার নজরটা গেল। দেখলাম একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বিছানায় আধশোয়া হয়ে একদৃষ্টে বাইরের দিকে চেয়ে আছেন। এক ঝলকের জন্য হলেও, ভদ্রলোকের ঘোলাটে চোখ দেখে আমার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। উনি অনিদারও নজরে পড়েছিলেন। আমি মুখ খুলতে গেলে ও আমাকে চোখের ইশারা করল। যার মানে হল, চেপে যা।

পর্দা সরিয়ে আমরা এবার ঢুকলাম মি. ভট্টাচার্যের বসার ঘরে। তিন দেওয়াল জুড়ে শুধু বই। বেশিরভাগ যদিও আর্কিটেক্টের। চার নম্বর দেওয়ালে একটা আটচল্লিশ ইঞ্চি ফ্ল্যাট স্ক্রিন টিভি ঝুলছে। তাতে পুরোনো একটা খেলা চলছিল। আমরা ঘরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তেন্ডুলকর গ্লেন ম্যাকগ্রাকে বাঁ পা বাড়িয়ে একটা স্ট্রেট ড্রাইভে বলটা মাঠের বাইরে পাঠালেন।

“আসুন আসুন, মি. সেন।” উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের খাতির করে বসতে বললেন মি. ভট্টাচার্য। সঙ্গে টিভিটাও বন্ধ করলেন।

ওঁর উলটোদিকের সিঙ্গল সোফাটাতে বসল অনিদা। অন্যদিকে ডানদিকের সোফাটায় আমি।

ভদ্রলোক মনে হয় সরাসরি প্রসঙ্গে আসতে চাইছিলেন। একটা গলা খাঁকারি দিয়ে অনিদাকে বললেন, “একটা বিশেষ সমস্যায় পড়ে আপনাকে ডেকেছি। কোনও উপকার আশা করতে পারি?”

ভদ্রলোকের কাছ থেকে এমন তেরছা কথা আশা করিনি। অবশ্য অনিদাকে সেটা এতটুকু টলাতে পারেনি। একদৃষ্টে ওঁর দিকে চেয়ে থেকেই বলল, “সমস্যাটা আগে শুনি।”

“হুম।” কিছুক্ষণ একদৃষ্টে মাটির দিকে চেয়ে থেকে মি. ভট্টাচার্য বললেন, “একটা হিরের নেকলেস।”

“চুরি হতে পারে, নাকি অলরেডি হয়ে গেছে?”

অনিদার প্রশ্ন শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মি. ভট্টাচার্য বললেন, “অলরেডি হয়ে গেছে। তাও আবার আমার শোবার ঘর থেকে। ব্যাপারটা সিরিয়াস। কিন্তু সবথেকে যেটা বেশি দুঃখ দিচ্ছে, সেটা হল ওই নেকলেসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস।” 

নিশ্বাসটাকে টানতে টানতে সোফায় মাথাটা এলিয়ে দিলেন মি. ভট্টাচার্য। তারপর ধীরে ধীরে ছাড়তে ছাড়তে চোখ দুটো বুজলেন। আচমকা থম মেরে গেছিল পরিবেশটা। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে এবার উনি চোখ খুললেন। তারপর সোজা হয়ে বসে আমাদের সঙ্গে সেই নেকলেসটার পরিচয় করানো শুরু করলেন।

“সময়টা তখনও সরকারিভাবে মোগলদের। যদিও বেসরকারিভাবে ইংরিজি পতাকা ততদিনে ভারতবর্ষে উড়তে শুরু করে দিয়েছে। দিল্লির মসনদে তখন শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ। জাতে মোগল হলেও সেই মোগলাই তেজ তাঁর ছিল না কোনোকালেই। বলাই বাহুল্য, কফিনের শেষ পেরেকটা পোঁতার অপেক্ষায় ছিল ইংরেজরা।

“শাহজাহানাবাদে সেই সময় বাস ছিল এক পাঠান ব্যবসায়ীর। নাম আফজল খান। যেমন নামে তেমন কাজে, লোকটা ছিল আপাদমস্তক পাঠানি। একবার একটা বাচ্চাকে পাগলা ষাঁড়ের হাত থেকে বাঁচাতে নিজের জীবন পর্যন্ত বাজি রেখেছিলেন। খবরটা এ-মুখ সে-মুখ ঘুরে শেষে পৌঁছে গেল বাহাদুর শাহের কাছে। তৎক্ষণাৎ তাঁর ডাক পড়ল রাজদরবারে। বাহাদুরির পুরস্কার হিসেবে সেদিন সম্রাট বাহাদুর শাহ আফজল খানের হাতে তুলে দিলেন একটা হিরের নেকলেস।

“এর পর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর। দিল্লিতে প্রায় ছয় পুরুষ কাটিয়ে ফেলেছেন আফজল খানের বংশধরেরা। মোগলদের পর ইংরেজরাও ভারতকে বিদায় জানিয়েছে। ভারতের ইতিহাস তখন একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। আমিও আর্কিটেক্ট হিসেবে দিল্লিতে বেশ নাম করে ফেলেছি। ওদিকে আফজল খানের বংশধর শাহবাজ খান তখন দিল্লির এক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। কয়েকশো কোটি টাকার মালিকও বটে।”

মি. ভট্টাচার্যের কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিল অনিদা। আমার মাথা তখন একটাই হিসেব মেলানোয় ব্যস্ত। এই ইতিহাসের সঙ্গে হিরে চুরির কী সম্পর্ক? অবশ্য এও বুঝতে পারছিলাম, যে-হিরেটা চুরি হয়েছে, সেটার মালিক শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ।

মি. গুপ্ত এতক্ষণ দম বন্ধ করে বসে ছিলেন। এবার মি. ভট্টাচার্য দম নেবার জন্য থামলে ওঁর মুখ দিয়ে ‘উ’ করে একটা শব্দ বেরিয়ে এল। মনে হয় শ্বাস ছাড়তে গিয়ে আওয়াজটা বেরিয়ে গেছে।

সেকেন্ড দশেক সময় নিয়ে মি. ভট্টাচার্য আবার বলতে শুরু করলেন, “একদিন দুপুরে আমি অফিসে বসে আছি। সেই সময় শাহবাজ খানের একটা ফোন পেলাম। অর্ডার পেলাম ওঁর নতুন অফিসের প্ল্যান করে দেবার। ভারী খদ্দের। নাম, যশ, অর্থ— সবদিক দিয়েই। প্রাণপণে খাটলাম। আমার কাজে খুব খুশি হলেন উনি।

“এরপর কেটে গেছে আরও দেড় বছর। একদিন দুপুরবেলা। আচমকা আমার অফিসে হাজির স্বয়ং শাহবাজ খান। নতুন অফিসে ব্যাবসা ওঁকে দারুণ লাভ দিচ্ছে। আর এতে নাকি আমার হাত রয়েছে। আমি বুঝতে পারলাম না উনি কী বলতে চাইছেন। আমি চুপ করে আছি দেখে উনি এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আরে মি. ভট্টাচার্য, আপনি যে অফিস আমাকে করে দিয়েছেন, সেটা আমার জন্য খুব লাকি।’ তারপর ব্যাগ থেকে লাল ভেলভেট জড়ানো একটা বাক্স বের করে আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘আপনার জন্য এই একটা ছোট্ট উপহার।’

“প্যাকেটটা খুলে দেখি তাতে একটা নেকলেস! এমন জিনিস আমি জীবনে দেখিনি। এই প্রথমবার এতগুলো হিরে একসঙ্গে দেখলাম। গোল গোল। পরপর সোনার সুতোয় গাঁথা। আলো যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে ওটা থেকে। আমি চোখ বড়ো বড়ো করে জিনিসটা দেখছি, তখন উনি বললেন, ‘খোদ বাহাদুর শাহের জিনিস, মি. ভট্টাচার্য!’ ”

“মোগল সম্রাট?” আমার কথা আটকে গেল।

উনি মুচকি হেসে মাথা ঝোঁকালেন।

“আমি ওঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কিন্তু এ-জিনিস আমাকে কেন?’

“উনি তখন আমার হাত দুটো জড়ো করে ধরে বললেন, ‘আমার ব্যাবসা মোটেও ভালো যাচ্ছিল না। এক জ্যোতিষী বলল অফিস চেঞ্জ করতে। করলাম। ফলও পেলাম। গত দেড় বছরে এত্ত লাভ করেছি, স্বপ্নেও ভাবিনি। আর এর পেছনে রয়েছে আপনার হাত। তাই এই উপহারটা আপনার জন্য। দয়া করে না করবেন না।’ ”

এতটা বলে আবার থামলেন মি. ভট্টাচার্য। আমরা হাঁ হয়ে তখন ওঁর কথা শুনছি। বুঝতে পারছিলাম বাহাদুর শাহের দেওয়া সেই নেকলেসটাই চুরি হয়েছে। অনিদার দিকে তাকিয়ে দেখি ও তখন একদৃষ্টে চেয়ে আছে মি. ভট্টাচার্যের দিকে। মি. গুপ্তর মুখও হাঁ। এবার বিরতি পেতে একটা ঢোঁক গিললেন। মি. ভট্টাচার্য তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “গত পনেরো বছর আমি নেকলেসটা খুব সাবধানে রেখেছিলাম। কিন্তু গতকাল খুব আশ্চর্যজনকভাবে জিনিসটা আমার ফ্ল্যাট থেকে চুরি গেছে।”

এমন দামি একটা জিনিস ঘরে রাখতেন উনি! জিনিসটা মনে হয় আমার মতো অনিদাকেও অবাক করেছিল। সেটা বুঝলাম অনিদার প্রশ্ন শুনে।

“জিনিসটা আপনি ঘরে রাখতেন?”

“হ্যাঁ, এই ঘরেই। ওই তাকে রাখা থাকত।” সামনে টিভির পাশে একটা দেওয়াল আলমারির দিকে ইশারা করলেন মি. ভট্টাচার্য।

“এভাবে? খোলা জায়গায়!” প্রশ্ন শুনে বুঝলাম অনিদার অবাক হওয়ার ঘোর এখনও কাটেনি।

মি. ভট্টাচার্য কিন্তু নির্বিকার। বললেন, “খোলা কোথায়? ওতে চাবি দেওয়া থাকে সবসময়। তাছাড়া আমরা মনে করতাম ওই নেকলেস আমাদের পরিবারের জন্য লাকি। কারণ, ওটা আসার পর থেকে আমার ব্যাবসার এই রমরমা।”

অনিদা একদৃষ্টে চেয়ে ছিল ওঁর দিকে। তখন উনি মুচকি হেসে বললেন, “জানি, ভাবছেন জিনিসটার দামের কথা?” তারপর কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন, “প্রায় পঞ্চাশ। এখনকার মার্কেট ভ্যালু।”

অনিদা এবারও চুপ। তাতে ভদ্রলোক আবার হেসে বললেন, “হাজার নয়।”

অনিদা তখন খুব নির্বিকার গলায় বলল, “বুঝেছি, লাখ।”

নেকলেসের দাম শুনে আমি একবার অনিদার দিকে তাকালাম। এবার চোখ ফেরানোর সময় নজর গেল মি. গুপ্তর দিকে। ভদ্রলোকের পরিষ্কার ঢোঁক গেলাটা দেখতে পেলাম। সত্যি বলতে কী, আমি কিছুতেই এমন একটা দামি জিনিস ঘরে রাখাটার পেছনে কোনও যুক্তি মেনে নিতে পারছিলাম না।

অনিদা আর কথা বাড়াল না। সোজা জিজ্ঞাসা পর্বে গেল।

“কখন চুরি হয়েছে জিনিসটা?”

“কাল বিকেল থেকে পাচ্ছি না।” বললেন মি. ভট্টাচার্য।

“শেষ কখন দেখেছিলেন জিনিসটা?”

“কাল সকাল পর্যন্ত জিনিসটা ওখানে দেখেছি। কিন্তু বিকেলবেলা আমার ছোটো ছেলে আবিষ্কার করে জিনিসটা আর ওখানে নেই।”

“আপনার পরে আর কেউ নেকলেসটা দেখেনি? মানে চুরির আগে পর্যন্ত?”

“দুপুরবেলা একবার আলমারি খুলেছিলাম। তখনও জিনিসটা জায়গামতোই ছিল।” একটা মহিলা কণ্ঠ কানে আসতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আটপৌরে কাপড় পরা প্রায় পঞ্চান্ন পেরোনো একজন মহিলা। শ্যামল ভট্টাচার্য ভদ্রমহিলাকে ওঁর স্ত্রী বলে পরিচয় করালেন। উনি ঘরে ঢুকতে ওঁর পেছন পেছন ঘরে ঢুকল বছর কুড়ির একটা ছেলে। সঙ্গে একটা ট্রলি। তাতে খাবার।

লুচি, তরকারি, মিষ্টি— থালা-ভরতি খাবারের দিকে কপালে চোখ তুলে চেয়ে থেকে মি. গুপ্ত বললেন, “এগুলোর আবার কী দরকার ছিল, বউদি?”

তাতে মুচকি হেসে ভদ্রমহিলা বললেন, “এতটুকু না করলে হয়?”

শ্যামল ভট্টাচার্যর স্ত্রী মল্লিকা ভট্টাচার্য জানালেন, দুপুর দুটো নাগাদ উনি জিনিসটা শেষবারের জন্য দেখেছিলেন।

জেরা পর্বের মধ্যেই আমাদের খাবার পর্ব শুরু হয়ে গেল। দু-টুকরো আলু একটুকরো লুচিতে পেঁচিয়ে মুখে চালান করে চিবোতে চিবোতে অনিদা প্রশ্ন করল, “ঠিক ক’টা নাগাদ আপনার ছোটো ছেলে জানতে পারে যে নেকলেস আলমারিতে নেই?”

একটু ভেবে মি. ভট্টাচার্য জানালেন, “এই সন্ধে সাড়ে ছ’টা নাগাদ।”

“তার মানে দুপুর দুটো থেকে ছ’টার মধ্যেই চুরিটা হয়েছে।”

অনিদার কথা শুনে মি. ভট্টাচার্য আর ওঁর স্ত্রী একে অপরের দিকে চাইলেন।

“সেদিন, মানে কাল ওই সময় বাইরের কোনও লোক এসেছিল?”

“চারটে নাগাদ মি. রায় এসেছিলেন।” বললেন মিসেস ভট্টাচার্য।

“মি. রায় কে?” নতুন মানুষের নাম শুনে নড়েচড়ে বসল অনিদা।

“আমার অফিসে কাজ করেন। কাল আমি অফিস যাইনি। তাই একটা কাজে আমার কাছে এসেছিলেন।” বললেন মি. ভট্টাচার্য।

“কতক্ষণ ছিলেন উনি?” আবার প্রশ্ন করল অনিদা।

তাতে একটু ভেবে শ্যামল ভট্টাচার্য বললেন, “পাঁচটা নাগাদ চলে যান।”

“উনি আপনার নেকলেসটার কথা জানতেন?”

“হ্যাঁ, জানতেন। ওঁকে দেখিয়েও ছিলাম একবার।”

“হুম।”

কিছুটা সময় নিয়ে অনিদা কী ভাবল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, “ওই সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে ঘরে কে কে ছিলেন? মি. রায় ছাড়া আর বাইরের কেউ এসেছিলেন?”

“না।” মিসেস ভট্টাচার্য তখন বললেন, “আর কেউ আসেননি। আমি, আমার হাজব্যান্ড, আমার ছোটো ছেলে ছাড়া সুখেন আর জগা ঘরে ছিল।”

সুখেন আর জগার পরিচয় আমরা আগেই পেয়েছি। সুখেনদা আমাদের দরজা খুলে ফ্ল্যাটে ঢুকিয়েছিল। আর জগা তো এইমাত্র আমাদের খাবার দিয়ে গেল। ও হ্যাঁ, একটা কথা বলি, এর মধ্যেই আমাদের প্লেটের সবক’টা লুচি শেষ। মিষ্টির প্লেটও ফাঁকা।

মিসেস ভট্টাচার্য জানালেন, সুখেনদা আজ প্রায় কুড়ি বছর আছেন ওঁদের বাড়ি। পরিবারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। আর জগা থাকে কাছের একটা এলাকায়। সকালে আসে। সারাদিন থাকে। রাতে চলে যায়।

মি. আর মিসেস ভট্টাচার্যের কাছ থেকে এদের দুজনের যা ফিডব্যাক পাওয়া গেল, তাতে এদের অন্তত সন্দেহ করার কোনও কারণ নেই। অবশ্য আসল অপরাধী তদন্তের শেষেই ধরা পড়বে।

শ্যামল ভট্টাচার্যের দুই ছেলে। সৈকত আর সৌরভ। যদিও তাদের কেউই এখন বাড়িতে নেই। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, কাল ওঁর বড়ো ছেলে সৈকত বাড়ি ফেরে সন্ধে সোয়া ছ’টা নাগাদ। ছোটো ছেলে সৌরভ যে তখন বাড়িতেই ছিল তা ওঁরা আগেই বলেছেন।

এতক্ষণ চুপ করে সবার কথা শুনছিলাম। অবশ্য বেকার বসে ছিলাম না। মোবাইলে ক্যামেরা অন করে দিয়েছি। তাতে ছবি থেকে কথা, সবই রেকর্ড হয়ে যাচ্ছিল। এটা অনিদাকে পরে কেসটা নিয়ে কাটা-ছেঁড়া করতে সাহায্য করবে।

“কাল সাড়ে ছ’টা নাগাদ এখানে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল না?” অনিদা জিজ্ঞাসা করল।

“হ্যাঁ।” মুখ দিয়ে চুক করে একটা শব্দ করে মি. ভট্টাচার্য বললেন, “খুবই মর্মান্তিক! এত অল্পবয়সি একটা ছেলে! মারা গেল। হঠাৎ চেঁচামেচি শুনে ছুটে গেছিলাম। কিন্তু ব্যালকনিতে গিয়ে দেখি— ইস!” বলতে বলতে নাক-মুখ কুঁচকে গেল মি. ভট্টাচার্যের।

ঘটনাটা কতটা ভয়াবহ, আমরা দেখেছি। আর মি. ভট্টাচার্যকে আমরা সেই সময় দেখেছিলাম, সেটা অনিদা আর বলল না।

মিসেস ভট্টাচার্য জানালেন, উনি ছুটে নীচেও গেছিলেন। ওঁর সঙ্গে আরও অনেকেই গেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।

“জিনিসটা কোথায় রাখা ছিল?” বলে উঠে দাঁড়াল অনিদা।

“ওই সামনের দেওয়াল আলমারিতে।” বলে সামনের একটা দেওয়াল আলমারির দিকে ইশারা করলেন মি. ভট্টাচার্য। দেখলাম সেটায় তালা দেওয়া।

আলমারিটা দেখতে দেখতে অনিদা জিজ্ঞাসা করল, “এর চাবি?”

“একটা আমার কাছে আর অন্যটা আমার মিসেসের কাছে।” বললেন মি. শ্যামল ভট্টাচার্য।

“হুম।” বলে সেকেন্ড পাঁচেক কী যেন ভাবল অনিদা। তারপর বলল, “আলমারির গায়ে কোনও দাগ নেই। মনে হচ্ছে চোর খুব স্বাভাবিকভাবেই এর দরজা খুলেছিল।”

“তা কী করে সম্ভব?” অবাক হয়ে মি. ভট্টাচার্য বললেন, “চাবি কোথায় পাবে? সে তো আমাদের কাছে থাকে।”

“সেটাই তো জানতে হবে, মি. ভট্টাচার্য।” বলল অনিদা।

আজকের পর্বটা ও এখানেই শেষ করল। এবার আমাদের চোখ গেল দেওয়ালে টাঙানো একটা পারিবারিক গ্রুপ ফটোর ওপর। মি. আর মিসেস ভট্টাচার্যের সঙ্গে যে দুজনকে দেখলাম, একজন বছর আটাশের। আর অন্যজন অল্পবয়সি। বুঝতে অসুবিধে হল না তারা ওঁদের দুই ছেলে। সৈকত আর সৌরভ। সৌরভকে দেখে মনে হল কোথায় যেন দেখেছি। একটু চেষ্টা করতেই মনে পড়ল, কাল অ্যাক্সিডেন্টের সময় এই ছেলেটাই ব্যালকনিতে মি. ভট্টাচার্যের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

ঘর থেকে বেরোনোর সময় অনিদা মি. ভট্টাচার্যকে জিজ্ঞাসা করল, “পাশের ঘরে একজন বয়স্ক মানুষকে দেখেছিলাম। ওঁর পরিচয়?”

তাতে মুখটা সামান্য ভার করে মি. ভট্টাচার্য জানালেন উনি ওঁর ভাই। সৌম্য ভট্টাচার্য। আজ চার বছর হল উনি প্যারালাইসড। ভালো ছাত্র ছিলেন। নেভিতে চাকরি করতেন। ওঁর দাপটে নাকি অফিসের সবাই কাঁপত। বিয়ে করেননি। এই অবস্থায় ওঁর ভরসা বলতে একমাত্র ভাই আর তাঁর পরিবার।

“ওঁর দেখাশোনা কে করেন?” আবার প্রশ্ন করল অনিদা।

“সুখেন। স্নান করানো থেকে খাওয়ানো— সব করে।”

ফেরার সময় সৌম্য ভট্টাচার্যের ঘরে একবার ঢুঁ মেরেছিলাম। ঘরে ঢুকেই মালুম হল, শ্যামল ভট্টাচার্য ভাইয়ের দেখাশোনায় কোনও ত্রুটি রাখেননি। উনি একা হলেও ওঁর ঘরে আলাদা করে ফ্রিজ, টিভি সব রয়েছে। ভদ্রলোক আমাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে ছিলেন।

ফেরার সময় মি. গুপ্ত বললেন, “বুঝলেন মি. সেন, এই হল জীবন। আজ হেড তো কাল টেল। কোনও ভরসা নেই। সৌম্যবাবুকে তো আগেও দেখেছি। দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্যক্তিত্ব বলতে যা বোঝায় ঠিক তেমন। আর আজ!” একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ওঁর মুখ থেকে।

এখন আমরা অরবিন্দ আশ্রমের মেন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। অনিদা মাটির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে কিছু একটা চিন্তা করছিল। বুঝতে পারছিলাম, হিরের নেকলেস চুরির রহস্যের কিনারা করতে ও এর মধ্যেই মাথার কলকব্জাগুলোকে নাড়াচাড়া শুরু করে দিয়েছে।

প্রতি শনিবার রাষ্ট্রপতি ভবন চত্বরে সকাল দশটা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত একটা প্যারেড হয়। সাধারণ মানুষের দেখার ব্যবস্থা থাকে। আমরা আজ সেখানে গেছিলাম। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে যে রাস্তাটা বেরিয়ে এসেছে, সেটাই মিশেছে জনপথে। এখানেই প্রতিবছর ছাব্বিশে জানুয়ারি কুচকাওয়াজ হয়। আমি নিয়ম করে টিভিতে দেখি। দু-পা হাঁটলে ইন্ডিয়া গেট।

জনপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি অনিদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “হিরে চুরি কেসটা নিয়ে কিছুটা এগোলে?”

“হয় চেনা লোক, না-হয় ঘরের লোক।” হেঁয়ালি করে বলল অনিদা।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “দুটোর মধ্যে তফাত কী?”

অনিদা তখন ব্যাপারটা পরিষ্কার করল।— “মি. রায় যদি হন, তাহলে চেনা লোক। আর বাকিরা তো ঘরের।”

“মানে ওঁদের ছেলেরাও…”

“ফাইনাল ওভার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে রেহাই দেওয়া যাচ্ছে না যে।” আমার কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল অনিদা।

আমি বুঝলাম অনিদার সন্দেহের তালিকায় আপাতত প্রায় সব্বাই। ও বলল, “লোকজনের উপস্থিতির ওপর বেস করে যদি দেখি, তাহলে মিসেস ভট্টাচার্যের শেষবারের মতো নেকলেসটা দেখতে পাওয়া থেকে শুরু করে ওঁদের ছোটো ছেলের চুরি আবিষ্কারের সময়টা, এই সময়টাকে তিনটে ভাগে ভাগ করা যায়।”

“তিনটে ভাগ?” অবাক হয়ে আমি বললাম, “সেটা কীরকম?”

“নেকলেসটা শেষবার দেখা গেছিল দুপুর দুটোর সময়। তারপর বিকেল চারটের সময় আসেন মি. রায়। ছিলেন পাঁচটা পর্যন্ত। তাহলে প্রথম স্লট হল, দুপুর দুটো থেকে বিকেল চারটে। আর সেই সময় ঘরে ছিলেন ছয়জন। মি. এবং মিসেস ভট্টাচার্য। ওঁদের ছোটো ছেলে সৌরভ। দুজন কাজের লোক। আর মি. সৌম্য ভট্টাচার্য, শ্যামল ভট্টাচার্যের ভাই।”

“ওঁকেও?” আমি অবাক হয়ে অনিদাকে প্রশ্ন করলাম।

উত্তরে ও মুচকি হেসে কাঁধ ঝাঁকাল। যার মানে হল, অগত্যা।

আমি তখন জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমার সেকেন্ড স্লট?”

“চারটে থেকে পাঁচটা।”

“মানে যখন মি. রায় ফ্ল্যাটে ছিলেন?”

আমার কথায় সায় দিয়ে মাথাটা একবার সামনের দিকে ঝোঁকাল অনিদা। বলল, “চুরিটা সেই সময়ও হতে পারে।”

কথাটা আমাকে প্রথমটায় খুব খুশি করল। ভাবলাম অনিদা হয়তো কেস প্রায় সলভ করে ফেলেছে। কিন্তু তারপরই ও বলল, “নাও হতে পারে।”

এবার কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “এর পরের স্লট, বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধে সাড়ে ছ’টা। মানে মি. রায় চলে যাবার পর থেকে শুরু করে যখন শ্যামল ভট্টাচার্যের ছোটো ছেলে যখন আবিষ্কার করল যে, নেকলেসটা চুরি গেছে। সেই সময়টাতে মি. রায় যেমন ছিলেন না, তেমনই শ্যামল ভট্টাচার্যের বড়ো ছেলেও অফিস থেকে ফিরেছিলেন।”

বুঝলাম, কেস বেশ জটিল আর মজাদার হয়ে উঠেছে। সঙ্গে এও বুঝতে পারছিলাম, চোর আমাদের হাতের সামনেই। শুধু তাকে খুঁজে নেওয়ার অপেক্ষা। এক্ষেত্রে আমাদের একমাত্র ভরসা, অনিদার বুদ্ধি। ও এখন কী করবে জানার জন্য ছটফট করছিলাম। তাই জিজ্ঞাসা করলাম, “তাহলে এখন করণীয়?”

ও বলল, “প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা-আলাদাভাবে কথা বলতে হবে।”

এমনটাই ভাবছিলাম। বুঝতে পারলাম, একটু একটু হলেও আমিও অনিদার পথে ভাবতে শিখছি।

সন্ধেবেলা আমরা গেলাম ভট্টাচার্যদের ফ্ল্যাটে। আজ ওঁদের দুই ছেলেই ঘরে। আর অনিদার কথামতো ডাকা হয়েছিল মি. রায়কে। একে তো চুরির কেস, তার ওপর মালিকের বাড়ি। বেচারা, পরিস্থিতি না পারছেন গিলতে, না পারছেন সামলাতে। বুঝতে পারছিলাম, বেশ ফাঁপরে পরেছেন মি. রায়।

মি. রায়ের পাথরের কারবার। মানুষের ভাগ্য গণনা করেন উনি। এক কথায় জ্যোতিষী। তারপর যে রোগের যে ওষুধ, সেইভাবে দরকারমতো সমস্যা অনুসারে মানুষকে পাথর পরার উপদেশ দেন। অনিদাকে উনি জানালেন, শ্যামল ভট্টাচার্যকে উনি ওঁর খারাপ সময়ে একটা পাথর পরার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

“খারাপ সময় মানে?” মি. রায়ের কথা শুনে অনিদার ভুরু কুঁচকে গেল।

“আসলে সেই সময় ওঁর ব্যাবসা ভালো চলছিল না। তেমন কোনও কন্ট্রাক্টও পাচ্ছিলেন না।”

“ও।” বলে অনিদা কিছুক্ষণ সময় নিল। তারপর আবার জিজ্ঞাসা করল, “ওঁর ঘর থেকে একটা হিরের নেকলেস চুরি হয়েছে। জানেন?”

“আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?” অনিদার প্রশ্নের উত্তরে পালটা প্রশ্ন করলেন মি. রায়।

অনিদা শান্ত গলাতেই উত্তর করল, “চোর কে না জানা পর্যন্ত কেউই সন্দেহের বাইরে নয়, মি. রায়।”

তাতে সামান্য দমলেন ভদ্রলোক। অনিদা ওঁকে আবার জিজ্ঞাসা করল, “সেদিন আপনি কোন ঘরে বসেছিলেন?”

“এই ঘরেই।”

বলে রাখি, আমরা যে ঘরে জিজ্ঞাসাবাদের আসর বসিয়েছি, হিরের নেকলেসটা এই ঘরেই রাখা ছিল।

অনিদা ওঁকে আবার প্রশ্ন করল, “মি. ভট্টাচার্য তখন কোথায় ছিলেন?”

“আমি ওঁর কাছেই এসেছিলাম। উনি নিশ্চয়ই অন্য ঘরে বসে থাকবেন না!” আবার বাঁকা উত্তর এল মি. রায়ের কাছ থেকে। উনি জানালেন, উনি যখন ঘরে ঢোকেন, মি. ভট্টাচার্য তখন এ-ঘরেই ছিলেন। ঘর থেকে না বেরোনো পর্যন্ত উনি মি. রায়ের সঙ্গেই ছিলেন।

“একবারের জন্যও ঘর ছেড়ে যাননি?”

একটু ভেবে মি. রায় মাথা নেড়ে জানালেন, “উঁহু, একবারও না।”

“অন্য কেউ সেই সময় ঘরে ঢুকেছিল?”

“হ্যাঁ,” মাথা নেড়ে ভদ্রলোক বললেন, “ম্যাডাম একবার এসেছিলেন।”

“মিসেস ভট্টাচার্য?”

“হ্যাঁ।”

“ও। আর?”

“নতুন কাজের ছেলেটা এসেছিল। চা দিতে।”

অনিদা ওঁকে অল্পেতেই রেহাই দিল। যদিও প্রয়োজনের বেশি প্রশ্ন ও করে না। মি. রায়ের টাকাপয়সার অভাব নেই। একমাত্র ছেলে থাকে আমেরিকাতে। উনি স্ত্রীকে নিয়ে ফ্ল্যাটে থাকেন।

“আপনার চাকরিটা কি খুব জরুরি?” মি. রায়কে শেষ প্রশ্ন করল অনিদা।

তাতে হেসে মি. রায় বললেন, “টাইম পাস। আর মি. ভট্টাচার্য ভালো মানুষ। ভালো বন্ধুও।”

অনিদার আদেশমতো জেরার ঘরে কারও আসার অনুমতি ছিল না। আমি এর মধ্যে সবার কথাবার্তা আমাদের মোবাইলে রেকর্ড করে রাখছিলাম। এই পদ্ধতি আমরা বরাবর ব্যবহার করে থাকি। আগেই বলেছি, সব তথ্য হাতের কাছে থাকলে অনিদার তদন্তে সুবিধা হয়।

সুখেনদা আর জগা, দুজনকেই একে একে প্রশ্ন করল অনিদা। সুখেনদা আজ বহুবছর এ-বাড়িতে কাজ করছেন। জগা সে তুলনায় মাত্র কয়েকদিন। সুখেনদা অকৃতদার। তিনকুলে কেউ নেই। মি. ভট্টাচার্যের কথামতো ‘বিশ্বাসযোগ্য’। এর আগে কোনও ব্যাড রেকর্ড নেই। অবশ্য জগারও কোনও নেগেটিভ রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। মি. রায় চুরির দিন যখন এসেছিলেন, সুখেনদা তখন নাকি সারাক্ষণ সৌম্য ভট্টাচার্যের ঘরেই ছিলেন।

“একবারের জন্যও এই ঘরে আসেননি?” প্রশ্ন করল অনিদা।

উত্তরে ডানে বাঁয়ে দু-বার মাথা নাড়ল সুখেনদা।

“সন্ধেবেলা একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল।” আবার জিজ্ঞাসা করল অনিদা, “সেই সময় আপনি কোথায় ছিলেন?”

“মেজবাবুকে খাবার খাওয়াচ্ছিলাম। চেঁচামেচি শুনে ছুটে গেলাম। কিন্তু তখন তো ছেলেটা মারা গেছে।”

“আর ঘরের অন্যরা?”

“বড়োবাবু সেই সময় বারান্দাতেই ছিলেন। মাও নীচে ছুটে গেছিলেন। সৌরভদাদাবাবুকে আমি তখন দেখিনি।”

“আর সৈকতবাবু?”

কয়েক মুহূর্ত ভেবে সুখেনদা বললেন, “যেমনটা মনে পড়ছে, আমি যখন নীচে গেছি, তখন উনি ঘরে ঢুকছিলেন।”

“হুম।“ গম্ভীর গলায় অনিদা বলল, “আর জগা?”

তাতে মাথা নেড়ে সুখেনদা বললেন, “ওকেও দেখিনি।”

অনিদার শেষ প্রশ্নে সুখেনদা জানালেন উনি মালদা জেলার লোক। শ্যামল ভট্টাচার্য ওঁকে নিয়ে এসেছিলেন দিল্লি। অন্যদিকে জগার জন্ম দিল্লিতেই। লেখাপড়া ক্লাস সিক্স পর্যন্ত। ছেলেটা জানাল, মি. রায় আসার আগে পর্যন্ত ও বসার ঘরে ছিল। খেলা দেখছিল। অনিদা অবশ্য পরে এই কথার সত্যতা যাচাই করে নিল শ্যামল ভট্টাচার্যর কাছ থেকে। জানা গেল, জগা মিথ্যে বলেনি। তবে একটা ছোট্ট চিন্তার বিষয় এই যে, এই সময় মি. ভট্টাচার্য মিনিট পনেরোর জন্য বাইরে যান।

“কেন?” জিজ্ঞাসা করল অনিদা।

“ওঁর একটা পার্সেল এসেছিল। কুরিয়ার।” বলল জগা।

জগা দেখলাম বাংলাটা খারাপ বলে না। দিল্লিতে থাকলেও ভাষাটা জানে। তবে একটু হিন্দি টান আছে।

“হুম।” কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে অনিদা জিজ্ঞাসা করল, “অ্যাক্সিডেন্টের সময় তুমি কোথায় ছিলে?”

প্রশ্নটা শুনে কেন জানি না সামান্য থতমত খেয়ে গেল জগা। সামান্য আমতা আমতা করে বলল, “নীচে একটা হল্লা হচ্ছিল। সেটা দেখতে বারান্দায় ছুটে গেছিলাম। তারপর নীচে গেছিলাম।”

“সেই সময় ঘরের অন্যরা কোথায় ছিলেন?”

অনিদার প্রশ্নগুলো সবাইকেই প্রায় এক। বুঝতে পারছিলাম কথার প্যাঁচে ও সত্যিটা বের করে আনতে চাইছে।

কয়েক মুহূর্ত ভেবে জগা বলল, “বড়োবাবু আর সৌরভদাদাবাবু বারান্দায় ছিলেন। সুখেনদা আর মাজিকে নীচে গিয়ে দেখতে পেয়েছিলাম।”

“আর সৈকতদাদাবাবু?”

“প্রথমে দেখিনি। পরে ওপরে এসে দেখি উনি ছোটো দাদাবাবুর ঘরের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।”

অনিদা এবার জগাকে একটা অন্য লাইনে প্রশ্ন করল।— “এ-বাড়ি থেকে যা মাইনে পাও, চলে তোমার?”

প্রশ্নটা শুনে মুখের শান্ত ভাবটা উধাও হয়ে হয়ে গেল জগার। ভারী গলায় ও বলল, “ওতে কি আর চলে? চালিয়ে নিতে হয়।”

জগা ছুটি পাওয়ার পর একে একে ঘরে ঢুকলেন মি. ভট্টাচার্যের দুই ছেলে। সৈকত আর সৌরভ। যদিও এই দুজনের তথ্যগুলোও খুব একটা সাহায্য করল না আমাদের। তবুও নিয়মমাফিক ওঁদেরও কিছু প্রশ্ন করল অনিদা।

“সেদিন আপনি ক’টায় ঘরে ঢোকেন?” সৈকত ভট্টাচার্যকে জিজ্ঞাসা করল অনিদা।

তাতে একটু ভেবে সৈকত ভট্টাচার্য বললেন, “এই ধরুন ছ’টা দশ থেকে সোয়া ছ’টা হবে।”

“অ্যাক্সিডেন্টটা দেখেছিলেন? ওই সময়ই তো হয়েছিল।”

“না। যা হয়েছিল, আমি আসার আগেই। আমি ওপরে চলে এসেছিলাম। ও-জিনিস দেখা যায় না।”

“ঘরের অন্যরা তখন কে কোথায় ছিলেন?” আবার লক্ষ করলাম, অনিদার প্রশ্নগুলো প্রায় সব একই।

একটু ভেবে সৈকত বললেন, “মা, সুখেনদা আর জগা তো নীচেই ছিল দেখেছিলাম। বাকিরা ওপরে।”

“আপনি কী করেন?” সৈকতকে করা অনিদার প্রশ্নটা এবার অন্য ধরনের।

“আমার ব্যাবসা।” বললেন সৈকত।

“কীসের?”

“লেদারের।”

“কেনাবেচা?”

“ঠিক তা নয়। আমরা লেদারের জিনিস বানাই।”

“ও। তাহলে তো বড়ো মাপের ব্যাবসা বলতে হয়।”

“ওই আর কী।” এবার সৈকতের গলায় আত্মবিশ্বাসের ঝলক পেলাম। ব্যাবসাটা সম্পর্কে আমার যদিও তেমন ধারণা নেই, তবে এটা বুঝলাম, ওঁকে অনেক টাকাপয়সা নাড়াচাড়া করতে হয়।

অনিদা একইভাবে সৌরভকেও প্রশ্ন করল। সৌরভ এখন এম.বি.এ পড়ছে।

“তুমিই দেখেছিলে যে নেকলেস মিসিং?”

“হ্যাঁ।” মাথা নাড়ল সৌরভ।

“কেন?”

“মানে?”

অনিদার প্রশ্নটা অদ্ভুত। সৌরভ তো বটেই, আমিও সেটার মানে বুঝলাম না। অনিদা তখন বলল, “মানে এই যে, তুমিই কেন আবিষ্কার করলে যে নেকলেস চুরি হয়ে গেছে? তুমি কি জানতে?”

প্রশ্নটা বেশ কড়া। শুনে আমতা আমতা শুরু করল সৌরভ। বলল, “আমি কী করে জানব?”

“তাহলে হঠাৎ আলমারি চেক করলে কেন?” আবার তেরছা প্রশ্ন করল অনিদা।

“আমি চেক করতে যাইনি। আমার চোখে পড়েছিল। তাই মাকে ডেকে বললাম।”

সৌরভের দিকে বেশ কিছুক্ষণ এক নজরে চেয়ে রইল অনিদা। ওর প্রশ্নোত্তর পর্ব প্রায় শেষ, এমন সময় পাশের ঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন সৌম্য ভট্টাচার্য, “আলো আন। আলো। এখুনি লোডশেডিং হবে।”

শ্যামল ভট্টাচার্য তখন ঘরে এসে ঢুকেছেন। ভাইয়ের চেঁচানিতে সামান্য অপ্রস্তুত দেখাল ভদ্রলোককে।

অনিদা ওঁকে জিজ্ঞাসা করল, “কোনও সমস্যা?”

ও, বলতে ভুলে গেছি, ভদ্রলোক এর আগেও একই কথা বলে একবার চেঁচিয়ে উঠেছিলেন।

এবার গলা খাঁকারি দিয়ে মি. ভট্টাচার্য বললেন, “আসলে কাল থেকে আমাদের ফ্ল্যাটে বেশ কয়েকবার কারেন্ট গেছে।”

“ফ্ল্যাটে!” ওঁর উত্তর শুনে অনিদার ভুরু কোঁচকাল।

“হ্যাঁ।” মাথাটা দু-বার ঝুঁকিয়ে মি. ভট্টাচার্য বললেন, “কাল থেকে আমাদের ফ্ল্যাটে বার বার কারেন্ট যাচ্ছে। কিন্তু অন্য কোনও ফ্ল্যাটে এমন প্রবলেম হয়নি।”

“স্ট্রেঞ্জ!” অনিদার কপালের ভাঁজ শক্ত হল। তারপর ও জিজ্ঞাসা করল, “ইলেক্ট্রিশিয়ানকে খবর দেওয়া হয়নি?”

“না, আজকের দিনটা দেখি। তেমন হলে কাল দেব।”

ফেরার আগে আমরা একবার সৌম্য ভট্টাচার্যের ঘরে ঢুকলাম। সুখেনদার পরিচর্যায় ঘরটা পরিপাটি দেখালেও পরিবেশটা বেশ থমথমে। সৌম্য ভট্টাচার্যের ঘোলাটে চোখজোড়া আমাদের প্রতিটা গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল। বুঝতে পারছিলাম, শরীর অকেজো হলেও ভদ্রলোকের মাথাটা এখনও সচল। এক পা, দু-পা করে ওঁর দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা। অনিদা ওঁকে কিছু একটা জিজ্ঞাসা করতে গেছিল, তার আগেই উনি উলটে অনিদাকে প্রশ্ন করলেন, “আপনারা নেকলেস চুরি রহস্যের কিনারা করতে এসেছেন?”

তাতে অবশ্য অনিদা এতটুকু ঘাবড়াল না। মুচকি হেসে বলল, “সেজন্যই তো আমাকে ডাকা হয়েছে।”

“পারবেন?”

লক্ষ করলাম ভদ্রলোক অনিদার চোখে চোখ রেখে প্রশ্নটা করলেন। আসলে এই ধরনের মানুষের মনের জোরটাই অন্য মাত্রার হয়।

অনিদা অবশ্য এসবে অভ্যস্ত। ও মুচকি হেসে উত্তর দিল, “চেষ্টা করছি।”

তাতে সৌম্য ভট্টাচার্য ভুরু কপালে তুলে বললেন, “তাই?” তারপর চোখ সরু করে বললেন, “করুন দেখি বাজিমাত। তবেই বুঝব ফেলুদার দেশের লোক!”

কথাটা শুনে আবার মুচকি হাসল অনিদা।

সৌম্য ভট্টাচার্য তখন অনিদার দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ে গলাটা নামিয়ে বললেন, “নেকলেস তো কাশ্মীরে।” তারপর হো হো করে হেসে উঠলেন।

কথাটা শুনে অনিদার কপালটা একবার কোঁচকাল।

আমরা ঘরের বাইরে আসতে শ্যামল ভট্টাচার্য বললেন, “ওর মাথাটাও দিন দিন বিগড়াচ্ছে।”

অরবিন্দ আশ্রমে ঢোকার মুখে দেখা পেলাম মি. গুপ্তর। অনিদাকে উনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কেসের কোনও কিনারা হল?”

“এই তো সবে শুরু।” হেসে বলল অনিদা।

আমরা ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। তার আগে হিটারের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, এখানে গিজার নেই। আর দিল্লিতে তাপমাত্রা এখন এক ডিগ্রি।

রাত এখন একটা। এবার দিল্লির ঠান্ডা আগের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। ঠান্ডাটাকে কনকনে বললেও বোধ হয় ঠান্ডাকে অপমান করা হবে। ঘরের বাইরে বেরোলেই মনে হচ্ছে শীত আমাদের বরফের দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরছে। জোড়া কম্বলের তলা থেকে মাথাটা কোনোরকমে বের করে রেখেছিলাম। অনিদা তখন ঘরের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পায়চারি করছে। সোয়েটার থেকে উলিকটন, মোজা, অনিদার মাথা থেকে পা ঢাকা। দৃষ্টি স্থির। চোখের পাতা অনেকটা সময় নিয়ে পড়ছে। কপালেও  বেশ কয়েকটা ভাঁজ। বোঝাই যাচ্ছিল, নেকলেস চুরির কেসটাতে ও পুরোপুরি ডুবে গেছে। মনে মনে কী হিসেব করছে, তা আমার পক্ষে আন্দাজ করা সম্ভব নয়। এই সময় ও কথা বলা পছন্দ করে না। কিন্তু জানার ইচ্ছা আমাকে সাহসী করে তুলল। জিজ্ঞাসা করলাম, “কিছু আন্দাজ করতে পারলে?”

তাতে ও হেঁয়ালি করে বালল, “আশ্চর্য!”

বুঝতে পারলাম কোনও একটা জিনিস ওকে অবাক করেছে। সাহস পেয়ে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, “কেন?”

তাতে ও গম্ভীর গলায় বলল, “সবাই এক সুরে গাইছে!”

বুঝলাম ও আজকের জেরা পর্বের ব্যাপারে বলছে। এবার ঘরের কোণে রাখা বেতের চেয়ারটাতে ধপ করে বসে বলল, “এতগুলো লোক, এতগুলো প্রশ্ন, কিন্তু উত্তর সবার প্রায় এক।”

“কিন্তু বাইরের লোক তো চোর নয়, একমাত্র যদি মি. রায়ের এতে হাত না থাকে।”

“হান্ড্রেড পার্সেন্ট।” আমার কথা শুনে ডান হাতের মুঠো দিয়ে বাঁ হাতের চেটোতে একটা ঘুসি মেরে অনিদা বলল, “এই ক’জনের মধ্যেই একজন চোর।”

অনিদার কথা শুনে ভট্টাচার্যবাড়ির প্রত্যেকটা সদস্যের মুখগুলো একবার করে চোখের সামনে ভেসে উঠে মিলিয়ে যেতে থাকল। শেষে এল মি. রায়ের মুখটা। এমনকি মি. গুপ্তর চেহারাও চোখের সামনে ভেসে উঠল আমার। তবে এই লোকগুলোর মধ্যে আবার শ্যামল ভট্টাচার্যের ভাই সৌম্য ভট্টাচার্যও আছেন। ওঁর কথা অনিদা কি সন্দেহের তালিকায় রাখছে? কথাটা ভেবে ওকে সেটা জিজ্ঞাসা করলাম, “সৌম্য ভট্টাচার্যকে তোমার কেমন লাগল?”

“খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।” বলল অনিদা। তারপর আবার পায়চারি করা শুরু করল।

আমি বললাম, “শ্যামল ভট্টাচার্য কেমন যেন জোর করে নিজের ভাইকে পাগল প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন, তাই না?”

প্রশ্নটা শুনে আমার দিকে বেশ প্রশংসার চোখে তাকাল অনিদা। আমি উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “ভদ্রলোক কি আদৌ মানসিকভাবে অসুস্থ?”

“মোটেও না।” বেশ জোর দিয়ে অনিদা বলল, “বরং খুব বুদ্ধিমান মানুষ। চোখগুলো লক্ষ করার মতো। প্রতিটা চাউনিই কিছু না কিছু বুঝিয়ে দেয়।”

“ওঁর বলা শেষ কথাগুলোর মানে কী?”

“সেটাই তো আমাকে ভাবাচ্ছে রে জয়।” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অনিদা। তারপর আবার কোনও এক গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। এবার বলল, “ভদ্রলোকের কথাগুলো ভেবে দেখ— নেকলেস তো কাশ্মীরে।”

কাশ্মীর কথাটা দু-বার বিড়বিড় করে ও নিজেকেই নিজে একটা প্রশ্ন করল আর সেটা আমার কানেও এল।— “কাশ্মীর মানে কী? কোনও জায়গা? নাকি একটা সংকেত?”

সংকেত? অনিদার মুখে কথাটা শুনে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম আমি। বললাম, “তাই যদি হয়, তাহলে তো বলতে হয় উনি নেকলেসের হদিস জানেন!”

“গুড!” আবার প্রশংসার চোখে আমার দিকে তাকাল অনিদা।

“তাহলে তো ওঁকে চেপে ধরলেই হয়।”

কথাটা শুনে অনিদা এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন সুন্দর একটা কভার ড্রাইভ করার পর সোজা বলে লোপ্পা ক্যাচ দিয়ে দিয়েছি। আমাকে খেঁকিয়ে উঠে বলল, “উনি যদি জেনেও থাকেন, তাতে আমার কী? ওঁর সাহায্যই যদি নিতে হবে, তাহলে আমার আর আলাদা করে দরকার কী?” তারপর গলা গম্ভীর করে বলল, “দেখছিস না, আমাকে চ্যালেঞ্জ করলেন ভদ্রলোক?”

আমি তখন জিজ্ঞাসা করলাম, “এতে ওঁর কোনও হাত নেই তো?”

“হুম।” আমার প্রশ্নে চোখজোড়া সরু করে অনিদা বলল, “হলেও আশ্চর্য কিছু নয়। তবে সেক্ষেত্রে মোটিভটা জানা দরকার।”

অনিদার উত্তর আমার মাথা গুলিয়ে দিল। কাকে ছেড়ে কাকে সন্দেহ করি? খালি মনে পড়ছিল সৌম্য ভট্টাচার্যের বলা কথাগুলো। ভাবছিলাম, ‘কাশ্মীর’ কথাটার মানে কী। সত্যিই কি কোনও সংকেত? নাকি অন্য কিছু? শব্দটাকে নানাভাবে ভেঙে পরীক্ষা করার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু কিছুই বের করতে পারলাম না। এর মধ্যে কখন যেন মাথাটা বালিশে গুঁজে ফেলেছি। ধীরে ধীরে চোখজোড়াও জুড়ে আসছে। মাথায় তখন শুধু হিরের নেকলেসের কথা ঘুরছে। খোদ বাহাদুর শাহের। কম কথা? ইতিহাস একেবারে চুঁইয়ে পড়ছে কেসটা থেকে। শেষ মুহূর্তে শুধু বুঝতে পারছিলাম, অনিদা তখনও পায়চারি করে চলেছে।

***

অনিদার মাথায় আচমকা এমনসব অদ্ভুদ খেয়াল জাগে! কাল রাতে ঠিক করল আজ আমরা দিল্লি শহর ঘুরব। বলল, ওর মনটা একটু অন্যদিকে ঘোরানো দরকার। তাতে মাথাটা একটু হালকা হবে আর কেসটা নিয়ে পরিষ্কার করে চিন্তা করতে পারবে। এর মধ্যে যে-ক’দিন আমরা দিল্লি ঘুরেছি, অটো, মেট্রো আর বাসেই ঘুরেছি। অনিদা বলে পথে না নামলে শহরের গন্ধ পাওয়া যায় না, শহরকে জানাও যায় না। তাই গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কোনও মানে হয় না। সেই কারণে আমরা আজ লোকাল বাসে চড়ে ঘুরছি।

আগেই বলেছি, আমরা দক্ষিণ দিল্লির হজ খাস এলাকায় রয়েছি। এখান থেকে বাস ধরে রাজীব চক এলাকায় যাচ্ছি। বাসে তেমন বাদুড়ঝোলা ভিড়ও নেই। অনিদাকে বললাম, “দিল্লির বাসও চড়ে ফেললাম।”

উত্তরে মুচকি হাসল অনিদা। তারপর বলল, “পৃথিবীতে প্রথম বাস কবে চলেছিল জানিস?”

উত্তরটা আমার জানা নেই। আমি হাত তুলে দিতে অনিদা বলল, “সাড়ে তিনশো বছর আগে।”

সাড়ে তি-ন-শ! সংখ্যাটা শুনে চোখ কপালে উঠল আমার।

অনিদা বলতে থাকল, “১৬৬২ সালের ১৮ মার্চ ব্লেজ পাসকাল নামে এক ম্যাথমেটিশিয়ানের উদ্যোগে প্যারিস শহরে প্রথম বাস চলে। সে-বাস ছিল ঘোড়ায় টানা। সব মিলে সে-সময় সেখানে সাতখানা বাস চলত। প্রতিটা বাসে ধরত ছয় থেকে আটজন যাত্রী। শুধুমাত্র রাজপরিবারের লোকেদেরই তখন বাসে চড়ার পারমিশান ছিল।”

আমি হাঁ করে অনিদার কথা শুনছি। ও থামতে জিজ্ঞাসা করলাম, “বাস মানে কী, অনিদা?”

“মানে তো বলতে পারব না। তবে শব্দটা এসেছে ‘অমনিবাস’ থেকে। ১৮২৭ সালে ফ্রান্সের নন্ত শহরে বড্রি নামে এক রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার ব্যবসায়িক কারণে একটা বাঁধাধরা সময়ে গাড়ি চালানোর ব্যবস্থা করেন। এই গাড়ির নাম দেবার জন্য খুঁজতে খুঁজতে তিনি দেখেন ওমনেস নামে এক টুপি বিক্রেতা তাঁর দোকানের সাইন বোর্ডে লিখে রেখেছেন ‘ওমনেস অমনিবাস’। মানে ‘ফর অল’। ব্যস, বড্রি পেয়ে গেলেন তাঁর গাড়ির নাম। এল অমনিবাস। আজ বড্রিও নেই, ওমনেসও নেই। শুধু রয়ে গেছে অমনিবাসের ছোট্ট নাম, ‘বাস’।”

“সেই সময় শুধু ফ্রান্সেই বাস চলত?”

“তার কয়েকদিন পর নিউ ইয়র্কেও চালু হল। পথচারীরা হাত দেখালে থেমে যেত। কেউ নামতে চাইলে বাসের মধ্যে ঝোলানো একটা চামড়ার স্ট্র্যাপ ধরে নাড়া দিত। সেই স্ট্র্যাপের অন্য অংশ বাঁধা থাকত ড্রাইভারের পায়ের সঙ্গে।”

“বাহ্‌, বেশ মজার তো!”

আমার কথায় মুচকি হাসল অনিদা। বলল, “১৮৩০-এর দশকে প্রথম স্টিম বাস চালু করেন লন্ডনের স্যার গোল্ডওয়ারদি গারনি। ১৮৮২-তে প্রথম ইলেকট্রিক বাস চালু হয়। মাথার ওপর ঝোলানো ইলেকট্রিক তার ছুঁয়ে চলত এই বাস।”

“আমাদের কলকাতার ট্রামের মতো?”

“ঠিক তাই।”

“কলকাতার বাসের হিস্ট্রি কী?”

“সেটাও দেখতে দেখতে একশো নব্বই পেরিয়ে গেছে। ১৮৩০ সালের ২১ নভেম্বর তিনটে ঘোড়ায় টানা বাস চলেছিল এসপ্ল্যানেড থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত। অবশ্য মোটরে টানা প্রথম বাস চলে ১৯২২-এ।”

“লোক তখন আজকের মতোই বাসে চড়ে অফিস যেত?”

“আসলে তখন লরিওয়ালারা লরিতে বেঞ্চ পেতে লোক তুলত। টিকিটেরও ব্যবস্থা ছিল। কলকাতায় ওই লরি বাস থেকেই এল আসল বাস। তখন বাসের নামও হত ইন্টারেস্টিং। মা, মেনকা, কিন্নরী, উর্বশী, পথের বন্ধু, আমি যাচ্ছি, চলে এসো…”

“দারুণ মজার তো!” ইতিহাস শুনতে শুনতে আমি জাঁকিয়ে বসলাম। অনিদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কলকাতায় তখন দোতলা বাস ছিল না?”

“Walford Company ১৯২৬ সালে কলকাতায় খোলা ছাদের দোতলা বাস চালু করে।”

অনিদার কথা শুনতে শুনতে কখন যেন পৌঁছে গেছিলাম বিশ শতকের গোড়ায়। এবার একটা বাইকওয়ালাকে বাঁচাতে আমাদের বাসটা ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষতে আমার ঘোর কাটল। জানালা দিয়ে বাইরে চোখ গেলে আবিষ্কার করলাম, একটা ভিড় রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আমরা। রিকশা, সাইকেল, অটো কাটিয়ে আমাদের বাসটা কয়েক গজ এগিয়েছে, এমন সময় সামনে একটা সোনার দোকানের দরজায় আমার চোখ আটকে গেল। চমকে গিয়ে অনিদার দিকে তাকাতে দেখি ওর নজরও সেদিকেই। চোখজোড়া সরু। কপালে হালকা দুটো ভাঁজ।

“শ্যামল ভট্টাচার্য না?”

“হুঁ।” ছোট্ট করে উত্তর দিল অনিদা।

“উনি সোনার দোকানে!”

আমার কথার কোনও উত্তর দিল না। এবার ঝট করে উঠে দাঁড়াল। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কোথায় যাচ্ছ?”

আমার প্রশ্ন এড়িয়ে দৌড়ে বাস থেকে নামল অনিদা। অগত্যা পেছন পেছন আমাকেও দৌড়তে হল।

রাস্তার এ-পারে মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে। এবার দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন শ্যামল ভট্টাচার্য। ঘন ঘন রুমালে মুখ মোছা, সন্দেহজনকভাবে থেকে থেকে ডানে বাঁয়ে তাকানো— জিনিসগুলো মোটেও সুবিধাজনক ঠেকছিল না আমার কাছে। এবার উনি গাড়িতে উঠে রাস্তায় মিলিয়ে যেতে আমরা সোজা গিয়ে ঢুকলাম সোনার দোকানটাতে।

প্রথমে তো দোকানের মালিক সৎপাল সিং আমাদের কথা শুনতেই চাইছিলেন না। শেষে অনিদার কথার চালে কাবু হয়ে আমাদের বসা তো বটেই, জলও খেতে দিলেন। তারপর শ্যামল ভট্টাচার্যের কথা তুলতে উনি এমন একটা তথ্য দিলেন, যা আমাদের চোখ কপালে তুলল। বুঝতে পারলাম, কেস আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

অনিদা ওঁর সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলছিল। আমি সেগুলো বাংলাতেই লিখছি।

“শ্যামল ভট্টাচার্য এখানে কেন এসেছিলেন?” জিজ্ঞাসা করল অনিদা।

“উনি গয়নাতে টাকা ইনভেস্ট করবেন বলে দরদাম করছিলেন।” বললেন মি. সিং।

কথাটা শুনে আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল। অনিদা তখন অপলকে সিংজির দিকে চেয়ে আছে। ও জিজ্ঞাসা করল, “কত টাকার?”

“বললেন তো অনেক। কিন্তু কত সেটা বলেননি।”

এবার প্রশ্ন করল, “কেন?”

তাতে মনে হয় চটলেন সিংজি। উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আমি কী করে জানব?” তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “কোনও গড়বড় নেই তো?”

“না না,” অনিদা মাথা নেড়ে বলল, “তবে উনি যদি আবার আসেন আর যদি তেমন কোনও সন্দেহজনক জিনিস ঘটে, তাহলে আমাকে খবর দেবেন।”

“কেন?” অনিদার কথা শুনে সিংজি অবাক হলেন।

কিন্তু অনিদা যখন ওর কার্ডটা সিংজির দিকে এগিয়ে দিল, তখন উনি কার্ডটা দেখে চোখ কপালে তুলে বললেন, “আপনি ডিটেকটিভ!” এবার অনিদার দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ে গলা নামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কোনও গড়বড় কেস নাকি, স্যার?”

অনিদা কোনও উত্তর না দিয়ে মুচকি হাসল। তারপর বলল, “আশা করি দরকারের সময় হেল্প পাব?”

“জরুর!”

আমাদের দোকানের দরজা পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়া পর্যন্তও সিংজির মুখে হাসিটা লেগে ছিল।

দুপুরের খাওয়া আমরা পাঞ্জাবি ধাবাতে সারলাম।

সামনে ‘হুমায়ূন কা মকবরা’ বা হুমায়ুন’স টম্ব, মানে হুমায়ূনের সমাধিস্থান। এর চত্বরতায় পায়চারি করতে করতে অনিদা বলল, “আবার একটা জট। এবার পাকালেন মি. মক্কেল নিজে।”

“ওঁর মাথায় কি অন্য কোনও মতলব ঘুরছে?” জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

তাতে অনিদা বলল, “ঘুরলেও সেটা কী, বোঝার দরকার আমার। আচমকা ওঁর গয়নাতে টাকা ইনভেস্টমেন্টের কী দরকার? তাও আবার অনেক টাকা! যদিও কত, সেটা জানা গেল না।”

সত্যিই, এর পেছনের রহস্যটা যে কী হতে পারে, আন্দাজ করতে পারলাম না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কাশ্মীরের জটটা ছাড়াতে পারলে?”

“উঁহু।” মাথা নাড়ল অনিদা।

অনিদার উত্তর আমাকে হতাশ করল। দিল্লি ঘুরতে এসে আমরা একটা জটিল চুরির কেসে জড়িয়ে পড়েছি। একে তো রহস্য, তার ওপর মারাত্মক ঠান্ডার নির্দয় কামড়। সারা শরীরের সঙ্গে নাক-মুখ ঢেকেও রেহাই নেই। এবার কাশ্মীরের কথা উঠতে অনিদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কাশ্মীরে তো এখন মারাত্মক ঠান্ডা, তাই না অনিদা?”

তাতে অনিদা চোখ কপালে তুলে বলল, “ঠান্ডা বলে ঠান্ডা! শরীরের রক্ত পর্যন্ত জমে বরফ হয়ে যেতে পারে!”

ভাবলাম, এই ঠান্ডাই নিতে পারছি না, ওখানে মানুষ থাকে কী করে!

রাতের খাওয়া সেরে নিজেদের ঘরে বসে আছি। বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটা ইংরিজি ম্যাগাজিনে মন বসানোর চেষ্টা করেও পারছি না। অনিদা ঘরের কোণে রাখা বেতের চেয়ারটাতে বসে একটা ডায়েরিতে কী যেন লিখে চলেছে। কিছুক্ষণ পর সেটা খাটের ওপর ছুড়ে ফেলে চেয়ারে হেলান দিল। খাতাটা খুব উৎসাহ নিয়ে হাতে নিলাম বটে, কিন্তু তাতে লেখা জিনিসগুলো বিন্দুমাত্র বুঝতে পারলাম না। প্রথম পাতাটাতে দেখলাম আট-দশটা তিরচিহ্ন আঁকা। প্রতিটা তিরের মাথাতেই কারও না কারও নাম লেখা। মানে এই কেসের সঙ্গে যাঁরা জড়িয়ে। আর লেখাগুলো ইংরিজিতে। ব্যস, এটুকুই। এর বেশি কিছু উদ্ধার করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

অনিদাকে এবার জিজ্ঞাসা করলাম, “কী চিন্তা করছ?”

তাতে অনিদা নীচের ঠোঁট উলটে বলল, “একটা জিনিস আমাকে ভাবাচ্ছে।”

“কী?” নতুন কোনও তথ্যের আশায় আমি নড়েচড়ে বসলাম।

অনিদা তখন বলল, “যে আলমারিতে নেকলেসটা রাখা ছিল, তার একটা চাবি থাকত শ্যামল ভট্টাচার্যের কাছে। আর অন্যটা ওঁর স্ত্রীর কাছে। চোর যে-ই হোক না কেন, সে আলমারি খুলল কী করে?”

প্রশ্নটা ভাবাল আমাকে। বললাম, “এর পেছনে দুটো সম্ভাবনা থাকতে পারে। হয় ওঁরা আলমারি খোলার পর বন্ধ করতে ভুলে গেছিলেন। না-হয় আগে থেকেই কেউ আলমারির চাবিটা সরিয়ে রেখেছিল।”

আমার কথা সটান নাকচ করে অনিদা বলল, “দুটোর চান্সই জিরো।”

“কেন?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

“শ্যামল ভট্টাচার্যের স্ত্রী দুটোর সময় আলমারি খুলেছিলেন। তারপর চাবি উনি নিজের কাছেই রেখেছিলেন। আর শ্যামল ভট্টাচার্যও তাই।”

“তাহলে?”

তাতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অনিদা বলল, “আমার আর একটু সময় দরকার। অঙ্কটা মিলেও মিলছে না।”

মাথাটা এবার চেয়ারে এলিয়ে চোখ বন্ধ করল অনিদা।

গতকাল মি. ভট্টাচার্যের বাড়িতে হওয়া মোবাইলে রেকর্ড করে রাখা জেরা পর্বটা অনিদা পরপর দু-বার শুনল। অবশ্য সেটা থেকে কী বের করতে পারল বা আদৌ কিছু বের করতে পারল কি না, আমাকে সে ব্যাপারে কিছু জানায়নি। শুধু বলেছে, মিসেস ভট্টাচার্যকে ও সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। কারণ, ওর মনে হয়েছে, ভদ্রমহিলার কোনও মোটিভ নেই।

“আর বাকিরা?”

অনিদাকে জিজ্ঞাসা করতে ও বলল, “সৌরভের ব্যাপারটা ভাবছি।”

“কী?”

তাতে ও বলল, “চুরি হয়েছে, সেটা প্রথম দেখল শ্যামল ভট্টাচার্যের ছোটো ছেলে। কিন্তু কেন?”

ভাবলাম, সৌরভ ভট্টাচার্যের এই চুরি আবিষ্কারটা কি তাহলে সাজানো ঘটনা? সঙ্গে সঙ্গে শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। তার মানে কি অনিদা চোর ধরে ফেলেছে! জিজ্ঞাসা করলাম, “তার মানে সৌরভের গতিবিধি সন্দেহজনক?”

আমার কথার উত্তর না দিয়ে ও একবার আমার দিকে তাকাল। বলল, “ওর চান্স আছে তো বটেই, কিন্তু…”

“কিন্তু?”

“কিন্তু আলমারি সবসময় তালা দেওয়া। তাহলে নেকলেসটা চোরের হাতের নাগালে এল কী করে? আর দেওয়াল আলমারি থেকে চাবি ছাড়া কিছু বের করতে গেলে তো দরজা ভাঙতে হবে। কিন্তু আলমারিতে একটা আঁচড়ের পর্যন্ত দাগ নেই!”

অনিদা ঠিকই বলেছে। আলমারির দরজা ছিল না। কাচও ভাঙা হল না। আবার চাবিও নেই, অথচ আলমারির ভেতর থেকেই নেকলেসটা চুরি গেল। অনিদার কথায় একবার সৌরভ ভট্টাচার্যকে অপরাধী বলে মনে হয়েছিল, কিন্তু অনিদা সে ব্যাপারে সবুজ আলো জ্বালেনি।

এরপর বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল আমাদের। এবার মুখ খুলল অনিদা।— “মঞ্চে আরও অভিনেতা আছে। কিন্তু তার আগে কাশ্মীর কথাটার মানে বের করতে হবে।” এবার চোখ সরু করে অনিদা বলল, “ওটার পেছনেই আসল রহস্য লুকিয়ে আছে।”

আমি তখন জিজ্ঞাসা করলাম, “আর শ্যামল ভট্টাচার্যের সোনার দোকানে যাওয়াটা?”

“সেটাও ভাববার ব্যাপার। নেকলেস চুরি যাবার পরপরই সোনার দোকানে যাওয়াটা সন্দেহজনক তো বটেই। দুটোর মধ্যে যেমন মিল আছে, তেমন অমিলও রয়েছে।”

“মানে?” অনিদার কথার প্যাঁচটা ধরতে পারলাম না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “উনি নিজেই কি…”

আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে অনিদা বলল, “হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।”

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “মি. রায়েরও কি চুরির উদ্দেশ্য থাকতে পারে?”

“অবশ্যই পারে।” জোরে মাথাটা একবার সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে অনিদা বলল, “মনে রাখতে হবে, ভদ্রলোকের একটা সাইড বিজনেস রয়েছে। আর সেটা পাথরের।”

***

অনিদার এক বন্ধু কাজ করে দিল্লির ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে। আমাদের এখনকার গন্তব্যস্থল সেটাই। জায়গাটা রাষ্ট্রপতি ভবনের কাছে। অটোটা আমাদের নিয়ে যে রাস্তা দিয়ে চলেছে, সেটার নাম আকবর রোড। এটা মনে হয় দিল্লির সবথেকে লম্বা রাস্তাগুলোর মধ্যে একটা। কখন শুরু হয়েছিল, শেষ হবার নাম নেই! এই সময় অনিদার মোবাইলে একটা ফোন এল। অনিদা খুব অল্পে কথা কথা সারল। ফোনটা এসেছিল শ্যামল ভট্টাচার্যর কাছ থেকে। সেটা বুঝলেও ওদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল সেটা জানার জন্য অনিদার ফোন কাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল।

“শ্যামল ভট্টাচার্যর বাড়িতে কাল চোর এসেছিল। তাই উনি আমাদের একবার ওঁদের বাড়ি যেতে অনুরোধ করেছেন।”

***

“ক’টা নাগাদ চোর এসেছিল?” শ্যামল ভট্টাচার্যকে প্রশ্ন করল অনিদা।

“মাঝরাতে।“ একটু ভেবে শ্যামল ভট্টাচার্য বললেন, “রাত আড়াইটে হবে।”

“কে দেখেছিল?”

“আমার ছোটো ছেলে সৌরভ প্রথম টের পেয়েছিল।”

সৌরভকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, মাঝরাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে কাদা, তখন হঠাৎ খুট করে একটা শব্দ পেয়ে ওর ঘুম ভেঙে যায়। প্রথমে কিছু বুঝতে না পারলেও পরে বুঝতে পারে ব্যালকনিতে কেউ রয়েছে। তবে সঙ্গে-সঙ্গেই বিছানা ছেড়ে ওঠেনি ও। কয়েক মুহূর্ত পরে আবার শব্দটা কানে আসে। কান পাততে মনে হয় ঘরের দরজাটা কে যেন খোলার চেষ্টা করছে। তখন বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সৌরভ। দৌড়ে গিয়ে ঝট করে বারান্দার দরজাটা খোলে। কিন্তু ততক্ষণে সব ভোঁ ভাঁ।

সৌরভের কথা খুব মন দিয়ে শুনল অনিদা। তারপর গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল, “কাউকে দেখতে পাওনি?”

“না।” অনিদার প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ল সৌরভ।

“ঘরের কাউকে ডাকোনি তখন?”

“ডেকেছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে চোর পালিয়ে গেছে।”

সৌরভের উত্তরে কপাল কোঁচকাল অনিদার। ও জিজ্ঞাসা করল, “সঙ্গে সঙ্গে ডাকলে না কেন?”

“আমি নিজেই ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম।”

“তারপর?”

“আমি ব্যালকনির আলো জ্বালার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু লোডশেডিং ছিল বলে পারিনি।”

আবার লোডশেডিং! চমকে উঠলাম আমি।

“কখন লাইট এল?” আবার প্রশ্ন করল অনিদা।

“দাদা গিয়ে দেখে মেন সুইচ অফ।”

সৌরভের কথা শুনে হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসল অনিদা। তারপর একবার আমার দিকে তাকাল। ও যা বলতে চাইল, তা আমি বুঝেছি। কেউ ইচ্ছে করে মেন সুইচ অফ করে দিয়েছিল। আমি ভাবলাম, তার মানে কি এই যে এই ফ্ল্যাটে গত কয়েকদিনে যে ক’বার লাইট গেছে, সেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো?

সৈকত ভট্টাচার্য জানালেন, ভাইয়ের কথা শুনে উনি প্রথমে দৌড়ে নীচে গেছিলেন। তবে কাউকে দেখতে পাননি। বিল্ডিংয়ের সিঁড়ির সব লাইট তখন জ্বলছে। ব্যাপারটা অবাক করে ওঁকে। তারপর কিছু একটা সন্দেহ হতে মিটার বক্সের কাছে গিয়ে আবিষ্কার করেন মেন সুইচ বন্ধ।

“হুম।” কয়েক মুহূর্ত মেঝের দিকে চেয়ে থেকে কী যেন চিন্তা করল অনিদা। তারপর বলল, “একবার ব্যালকনিটা দেখা যায়?”

“অফ কোর্স!”

আমাদের ব্যালকনিতে নিয়ে গেলেন শ্যামল ভট্টাচার্য।

শরীরটাকে ব্যালকনি দিয়ে ঝুলিয়ে যতটা দেখা যায়, ডানে বাঁয়ে ততটাই দেখল অনিদা। এই ব্যালকনি থেকে তিনটে ঘরে যাওয়া যায়। এক্কেবারে প্রথমে সৌরভের ঘর। তার পরেরটা শ্যামল ভট্টাচার্যের। আর শেষেরটা সৈকতের। সুতরাং চোরের উপস্থিতি যে-কারও পক্ষেই বোঝা উচিত ছিল। কিন্তু কেবল মাত্র সৌরভই কেন টের পেল? অনিদাকে এবার তফাতে পেলে কথাটা জিজ্ঞাসা করতে ও জানাল, জিনিসটা ওর মাথাতেও ঘুরছে।

চুরির ব্যাপারে বাড়ির দুই কাজের লোক সুখেনদা আর জগাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। আগেই বলেছি যে জগা এ-বাড়িতে থাকে না। আর সুখেনদাও কোনও শব্দ শোনেননি।

সবার সঙ্গে কথা হয়ে গেলে অনিদা এবার সৌম্য ভট্টাচার্যের ঘরে ঢুকল। ভদ্রলোককে চুরির কথা বলতে উনি হো হো করে হেসে বললেন, “কাশ্মীর। কাশ্মীর। আবার কাশ্মীরে জঙ্গী হামলা।” এবার ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা অনিদার নাকের সামনে তুলে ধরে বললেন, “গোয়েন্দা? ধুস! বুদ্ধির বৃহস্পতি।” বলেই আমাদের দিকে পেছন ফিরে কাত হয়ে শুলেন। অগত্যা আমাদের ওঁর ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হল।

সর্বদয়া এনক্লেভ থেকে বেরোনোর সময় ক্যাম্পাসের সিকিউরিটি গার্ড যাদব জানালেন গতকাল রাতে কাউকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে বা বেরোতে দেখেননি। আর কারও পক্ষে ক্যাম্পাসের এত বড়ো পাঁচিল ডিঙনো সম্ভব নয়। কারণ, তার উচ্চতা প্রায় পনেরো ফুট।

***

বিকেলে কফির কাপ নিয়ে বসেছি। টিভিতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে একটা তথ্যচিত্র চলছে। অনিদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “সিকিউরিটি গার্ডও কিছু দেখতে পেলেন না?”

আমার কথায় মুচকি হেসে অনিদা বলল, “কেউ হয়তো আসেইনি। তো বেচারা দেখবে কী করে?”

“সে কি! তাহলে সৌরভ ভট্টাচার্য দেখল কাকে?”

আমার কথার কোনও উত্তর না করে একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি তখন ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, “সৌম্য ভট্টাচার্যের হেঁয়ালিটা?”

তাতে অনিদার কপালে দুটো ভাঁজ পড়ল। বলল, “এই জিনিসটার কোনও ক্লু পাচ্ছি না।”

টিভিতে এখন একটা বরফে ঢাকা নদী দেখাচ্ছে। পাহাড়িরা কীভাবে জীবন হাতে নিয়ে বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে নদী পারাপার করে, দেখতে দেখতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। বিপদ সবথেকে বেশি হয় যখন তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। বরফ গলতে শুরু করলে বরফের মাঝে পা আটকে যাবার ভয় থাকে। অনেক সময় মানুষ দেখতে দেখতে বরফের নীচে তলিয়েও যায়! এইরকমই একটা দৃশ্য দেখাচ্ছিল সেই সময়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি অনিদার চোখ টিভিতে আটকে রয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ আমাদের কারও মুখে কোনও কথা নেই। এবার হঠাৎ ও ‘ইয়েস, ইয়েস’ বলে চেঁচিয়ে উঠল।

আচমকা এমন চেঁচানিতে চমকে গিয়ে আমার হাতটা কেঁপে গেল। তাতে আমার কাপ থেকে একটু কপি চলকে আমার পায়ে পড়ল। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী হল?”

ও এবার চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। তারপর চেঁচিয়ে উঠে শূন্যে ঘুসি ছুড়ে বলল, “পেয়েছি জয়, পেয়েছি।”

আমিও উত্তেজনার চোটে উঠে দাঁড়ালাম।

“কী পেয়েছ, অনিদা?”

বুঝতে পারলাম রহস্যের জট ও খুলতে শুরু করে দিয়েছে।

“কাশ্মীর, জয়, কাশ্মীর!”

আনন্দে তখন অনিদার চোখ দুটো চিকচিক করছে। সঙ্গে আমার বুকের ঢিপঢিপানিটাও বাড়তে শুরু করেছে। হাতের কফি কাপটা ঠক করে সামনের সেন্টার টেবিলে রাখলাম। তারপর দুটো ঢোঁক গিলে অনিদার দিকে উৎসুক হয়ে চেয়ে রইলাম।

অনিদা এবার ধীরে ধীরে টিভির দিকে এগিয়ে গেল। স্ক্রিনের ওপর ঝুঁকে পড়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কাশ্মীর বললে তোর কী মনে হয়, জয়?”

“কাশ্মীর তো ভূস্বর্গ। পাহাড়।”

“রাইট!” ডানহাতে একটা তুড়ি মেরে অনিদা বলল, “আর পাহাড় মানে?”

“উঁচু উঁচু চূড়া। লম্বা লম্বা গাছ।”

“আর চূড়ার ওপর?”

“ঠান্ডা।”

“আর ঠান্ডা মানে?”

“বরফ।”

“রাইট।” শূন্যে এবার তর্জনী ছুড়ে অনিদা বলল, “পাহাড়ে কখন বরফ জমে?”

“ঠান্ডা পড়লে।” বললাম আমি।

“আর গলে?”

“গরম পড়লে!”

অনিদার কথার হেঁয়ালি কিছুতেই মাথায় ঢুকছিল না আমার।

অনিদা তখন টক করে মুখ দিয়ে একটা শব্দ করে বলল, “ফ্ল্যাটে বার বার কারেন্ট যাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক!”

আবার হেঁয়ালি করল অনিদা। আমি নাক-মুখ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলাম, “মানে?”

আমার কথার কোনও উত্তর করল না অনিদা। জাম্পারটা গায়ে চাপিয়ে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল, “সৌম্য ভট্টাচার্য মানুষটা বেশ ইন্টারেস্টিং।” তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, “তুই টিভি দেখ, আমি আসছি।”

“কোথায় যাচ্ছ?”

“ছিপ কিনতে।”

“ছিপ?” আবার অবাক হলাম আমি।

ও বলল, “ছিপ মানে জানিস না?”

“হ্যাঁ।” ও কী বলতে চাইছিল বুঝতে চাইছিলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, “কিন্তু তোমার ছিপ দিয়ে কী কাজ?”

তাতে ও একপেশে একটা হাসি দিয়ে বলল, “মাছ ধরব।”

আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অনিদা বেরিয়ে গেল। বুঝলাম ও এখন কিছুই খোলসা করবে না। তাই ভেতরের উত্তেজনাটা আপাতত চেপে রাখা ছাড়া কোনও উপায় নেই। আর এসবে আমি অভ্যস্ত। সুতরাং টিভি দেখায় মন দিলাম।

অনিদা আমার জন্য আর একটা লোমহর্ষক অভিযানের ব্যবস্থা করেছে। দুপুরের খাওয়া সেরে আমরা পৌঁছলাম শ্যামল ভট্টাচার্যের ফ্ল্যাটে। উদ্দেশ্য কী, তখনও জানি না। ফ্ল্যাটের বেল বাজানোর জন্য হাত বাড়িয়েছি, অনিদা তখন আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, “লাভ নেই। চাবি আমার কাছে।”

হাতটা কলিং বেলের দিকে অর্ধেক ওঠা অবস্থাতেই আটকে গেল আমার।— “চাবি তোমার কাছে মানে?”

“ওঁরা গুরগাঁও গেছেন। এক আত্মীয়ের বাড়ি। নিমন্ত্রণ। ফিরতে রাত হবে।” বলতে বলতে পকেট থেকে চাবি বের করে ততক্ষণে খুট করে দরজা খুলে ফেলেছে অনিদা। আমার থ ভাব তখনও কাটেনি। ঘোর কাটল ওর কথায়।

“চলে আয় রে।”

আমি যেন ঘুমের ঘোরে হাঁটছি। কোনও কথা না বলে অনিদার পেছন পেছন পা বাড়ালাম। আমার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন, ওঁরা অনিদাকে কেন ফ্ল্যাটের চাবি দিয়ে গেলেন!

অনিদা আমার মনের কথা পড়তে পারে সে-কথা আমি আগেও বহুবার বহু গল্পে লিখেছি। চাবির ব্যাপারটা মনে হয়ে মুখে আসার আগেই ও বলল, “একবার চুরি হয়ে গেছে, তাই উনি আর রিস্ক নিতে চাননি।”

“ও, বুঝেছি।” অল্প কথায় সারলাম বটে, কিন্তু জিনিসটা আমার মনে ধরল না। এবার দু-পা এগোতে আবার চমক।

“এ কি!” সৌম্য ভট্টাচার্যকে ওঁর নিজের ঘরে আবিষ্কার করলাম। আমি চমকে উঠতে অনিদা মুচকি হেসে বলল, “আজ ওঁর দেখাশোনার ভার আমার।”

মন বলছিল এর পেছনেও একটা রহস্য রয়েছে। কিন্তু সেটা কী, তা এখনই আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। অনিদা এবার সটান গিয়ে ঢুকল বসার ঘরে। আমি ওর পিছু নিলাম।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে। অনিদা একটা ম্যাগাজিনে মুখ ডুবিয়ে বসে রয়েছে। আমি ওদিকে আজকের ইংরিজি কাগজটার প্রায় প্রতিটা পাতাই শেষ করে ফেলেছি। ঘড়ির কাঁটা চারটে ছুঁইছুঁই। এমন সময় কলিং বেলটা বেজে উঠল। দেওয়াল ঘড়িটার দিকে একটা আড় নজর দিয়ে উঠে দাঁড়াল অনিদা। মনে হল এই বেলটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। বসার ঘর থেকে ফ্ল্যাটের সদর দরজা দেখা যায় না। অনিদা গেল দরজা খুলতে। একটু পর ওর গলা কানে এল। আগন্তুককে ভেতরে আসার অনুরোধের ঢং শুনেই বুঝলাম যিনি এসেছেন, তিনি ওর পরিচিত। কিন্তু সে ব্যক্তি কে, সেটা ভাবছি, তখন অনিদার পেছন পেছন ঘরে এসে ঢুকলেন মি. গুপ্ত। আমি ওঁকে দেখে অবাক হয়েছি মাত্র, ঠিক সেই সময় দুজন অপরিচিত লোক ঘরে এসে ঢুকল। হাতে তাদের স্ট্রেচার। ওরা সোজা সৌম্য ভট্টাচার্যের ঘরে ঢুকে গেল। ঘটনার জেরে আমি তখন হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এবার যখন ছুটে গেলাম সৌম্য ভট্টাচার্যের ঘরে, ততক্ষণে লোকগুলো ওঁকে স্ট্রেচারে তুলে ফেলেছে।

ওরা দরজার দিকে এগিয়ে আসতে আমি একবার করে অনিদা আর মি. গুপ্তর দিকে চেয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “ওঁকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”

তখন মি. গুপ্ত আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, “উনি এখন অরবিন্দ আশ্রমের অতিথি।”

“কেন?”

“সেটা সময় এলেই জানতে পারবি।” মুচকি হেসে বলল অনিদা।

আমি যেন একটা গোলকধাঁধায় আটকে গেছি। অনিদা যে নতুন কিছু ফন্দি এঁটেছে, তা বুঝতে পারছি। আর সঙ্গে এও বুঝতে পারছি, সেটা মি. গুপ্তও জানেন। মনে মনে ভাবলাম, এ ভীষণ অন্যায়। আমি অনিদার সহকারী। অথচ কিছুই জানি না! সত্যিই অনিদার ওপর রাগ হচ্ছিল। কিন্তু জানি, লাভ নেই। কারণ, ও এখন কিছুই খোলসা করবে না।

মি. গুপ্ত মি. সৌম ভট্টাচার্যকে নিয়ে চলে গেছেন প্রায় একঘণ্টা হতে চলল। দিল্লিতে সন্ধে নেমে গেছে। জানি না কী চমক অপেক্ষা করে আছে। তবে আশ্চর্যজনক কিছু একটা ঘটবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অনিদা সৌম্য ভট্টাচার্যের খাটে চুপ করে বসে ছিল। আমার ওপরেও নির্দেশ ছিল সামনের চেয়ারটাতে চুপ করে বসে থাকার। অগত্যা আমিও মুখে কুলুপ এঁটে আগামী কোনও একটা চমকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ফ্ল্যাটের সব লাইট নেভানো।

সেই সন্ধে থেকে হত্যে দিয়ে বসে আছি কিছু একটা ঘটার জন্য। এখন প্রায় আটটা। ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে যাবার জোগাড়। চারদিকে পিন পড়া নিস্তব্ধটা। জানি না আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকতে হবে। অনিদাকে জিজ্ঞাসা করতে যেতেই ‘স-স-স’ করে আওয়াজ করে ডানহাতের তর্জনী মুখে দিল। আর ঠিক সেই সময় নিভে গেল ঘরের ডিম লাইটটা।

অনিদা চাপা গলায় বলল, “আবার লোডশেডিং। কাউন্টডাউন স্টার্ট।” বলেই ও সৌম্য ভট্টাচার্যের কম্বলের তলায় সুড়ুত করে ঢুকে গেল। তারপর আমাকে খুব গম্ভীর গলায় বলল, “তুই সোজা গিয়ে রান্নাঘরে লুকিয়ে পড়। আমাদের আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। অন্তত পঁয়তাল্লিশ মিনিট মতো। তোর মোবাইলটা সাইলেন্ট মোডে রাখ। আমি মিস কল দিলেই দৌড়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়াবি। তারপর যখন বলব, তখন ফ্ল্যাটের মেন সুইচ অন করবি।”

“তার মানে…”

আমার কথা শেষ করতে না দিয়ে অনিদা বলল, “ঠিক ধরেছিস। যার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সে এসে গেছে।”

“কিন্তু এখন এই ফ্ল্যাটে তার কী দরকার?”

“সেটা সময়মতো জানতে পারবি। এখন যা।”

আমাকে জোর করে রান্নাঘরে পাঠিয়ে দিল অনিদা। অন্ধকারে ডুবে থাকা রান্নাঘরটাতে সময় যেন কাটতেই চাইছিল না। অনিদার কড়া নির্দেশ, শব্দ করা তো দূরের কথা, এতটুকু নড়াও চলবে না। রান্নাঘরের একেবারে গায়ে লাগানো ডাইনিং। ওই ঘরে টাঙানো দেওয়াল ঘড়ির পেন্ডুলামটা অবিরাম দুলে চলেছে। টিক টিক আওয়াজে সমস্ত নিস্তব্ধটা ভেঙে যাচ্ছে। এতক্ষণ টানা অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকাতে কখন যে সেটা চোখ সওয়া হয়ে গেছিল বুঝতে পারিনি। বেশ সময় নিয়ে নিশ্বাস পড়ছিল। এর মধ্যে মোবাইলে বার দু-এক সময় দেখে নিলাম। অবশ্য সেটা আড়াল করে। বুকের ধুকপুকানিটা আস্তে আস্তে বাড়ছিল।

দেখতে দেখতে কেটে গেল আরও প্রায় চল্লিশ মিনিট। একবার মনে হল, আদৌ আমাদের হাতে কিছু আসবে তো? ঠিক এমন সময় খুট করে একটা শব্দ কানে এল। সঙ্গে সঙ্গে সজাগ হয়ে উঠলাম। বুঝলাম অতিথি এসে গেছেন। মনের মধ্যে হাজার হাজার প্রশ্ন ধাক্কা মারতে থাকল। এ-লোক কি ঘরের কেউ? নাকি বাইরে থেকে এসেছে? এই সময় তার এখানে আসার কারণ কী? অনিদা জানল কী করে যে এই লোক এখন এখানে আসবে? ও কি শব্দটা শুনতে পেয়েছে? ভয় হল, যদি শব্দটা ওর কান পর্যন্ত না পৌঁছয়! তবে? তাহলে তো ওর বিপদ! কথাটা ভেবেই আবার বুক ঢিপঢিপ করতে শুরু করল আমার। আর ঠিক এই সময় অনিদার মেসেজ ঢুকল আমার মোবাইলে— ‘রান্নাঘরের দরজার সামনে চলে আয়।’

আমি দেরি করলাম না। পা টিপে টিপে রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। এখান থেকে সৌম্য ভট্টাচার্যের ঘরের অর্ধেকটা দেখা যায়। অন্ধকার হলেও বেশ বুঝতে পারছিলাম সৌম্য ভট্টাচার্যের খাটে কম্বল মুড়ি দিয়ে মটকা মেরে পড়ে আছে অনিদা। ওদিকে আওয়াজটা এসেছিল প্রায় পাঁচ মিনিট হয়ে গেছে। কিন্তু কোথাও কারও পাত্তা নেই। তাহলে কি আগন্তুক আমাদের ঘরে থাকাটা টের পেয়ে গেল? তাহলে তো অনিদার সব প্ল্যান ফেল! ইস্‌, তাহলে এখন কী হবে?

আমি এইরকম সাতপাঁচ ভাবছি, ঠিক এমন সময় আপাদমস্তক চাদর ঢাকা একজন এসে ঢুকল ডাইনিং রুমে। বেশ কিছুক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে রইল লোকটা। ঘর অন্ধকার বটে, তবু আকার দেখে আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু চিনতে পারলাম না। লোকটা এবার খুব আস্তে আস্তে সৌম্য ভট্টাচার্যের ঘরের দিকে এগোতে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে সজাগ হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল, এবার শুধু সময়ের অপেক্ষা। একবার ভয় হল, ওর সঙ্গে যদি অস্ত্র থাকে! যদি অনিদাকে কিছু করে বসে! অবশ্য অনিদার কাছেও রিভলভার আছে। এর মধ্যে লোকটা ঘরে ঢুকে ফ্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এবার সে একবার করে ডানে-বাঁয়ে তাকাল। তারপর আচমকা আমাকে অবাক করে দিয়ে ফ্রিজটা খুলে ফেলল। তারপর মোবাইলের টর্চ জ্বেলে ফ্রিজের ভেতর কী যেন খুঁজতে লাগল। এমন সময় বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল অনিদা। চোখের পলক ফেলার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ল আগন্তুকের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে কাবু করে ফেলল ওকে। মাটিতে উপুড় করে ফেলে হাত দুটো পেছন দিকে চেপে ধরল। এবার চেঁচিয়ে বলল, “জয়, তাড়াতাড়ি মেন সুইচটা অন করে আয়।”

আমি এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ছুটে গেলাম মিটার বক্সের দিকে। মেন সুইচ অন করে ফিরে এসে দেখি সেই আগন্তুক উপুড় হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। চাদরটা তখনও ওর গায়ে জড়ানো। আমি লোকটাকে ওই অবস্থাতেই চেনার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। অনিদা তখন আমাকে খুব গম্ভীর গলায় আদেশ করল, “এখুনি শ্যামল ভট্টাচার্যকে কল কর।”

আমি চমকে উঠে বললাম, “ওঁরা তো গুরগাঁও গেছেন!”

তাতে মাথা নেড়ে অনিদা বলল, “ওঁরা অরবিন্দ আশ্রমে আছেন।”

অনিদার কথা শুনে আমি তাজ্জব বনে গেলাম। মনে হয় চাদরে ঢাকা লোকটাও। একবার সে নড়েচড়ে উঠল।

অনিদার মোবাইল থেকে আমি এবার শ্যামল ভট্টাচার্যকে ফোন করলাম। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে একেবারে সপরিবারে হাজির হলেন শ্যামল ভট্টাচার্য।

ঘরে ঢুকতেই চাদর চাপা দেওয়া লোকটাকে দেখে মিসেস ভট্টাচার্য প্রায় আঁতকে উঠলেন।— “এটা কে?”

অনিদা তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। ওর মুখে বেশ কিছুক্ষণ পর এবার মুচকি হাসি। ঘরে উপস্থিত সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, “এই অতিথিই আসল তস্কর।”

তাতে গলা তুলে মিসেস ভট্টাচার্য বললেন, “কিন্তু ও ঘরে ঢুকল কী করে!”

“বলব।” মাথাটা বার দু-এক সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে অনিদা বলল, “তার আগে বলি, ঢুকল কেন।” বলে এবার ফ্রিজের দিকে এগোল অনিদা। তারপর সেটার দরজা খুলতে গেলে শ্যামল ভট্টাচার্য অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওটা খুলছেন কেন?”

অনিদা এখন ভুরু নাচিয়ে বলল, “চলুন, এবার কাশ্মীর থেকে ঘুরে আসি।”

“কাশ্মীর!” অনিদার কথায় অবাক হলেন ভদ্রলোক। আমিও। অনিদা এবার ডিপ ফ্রিজের ঢাকনাটা খুলে আমার দিকে তাকাল। তারপর মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করল, “সৌম্য ভট্টাচার্যের কথাটা মনে পড়ে, নেকলেস আছে কাশ্মীরে?”

“হ্যাঁ।” আমি ঘাড় কাত করলাম।

আর সঙ্গে সঙ্গে ডিপ ফ্রিজে হাত ঢুকিয়ে অনিদা বের করে আনল চোখ ধাঁধানো চকচকে একটা নেকলেস। আলো ঠিকরে বেরোচ্ছিল ওটার গা থেকে। জিনিসটা দেখে কথা হারিয়ে ফেললাম আমি। শ্যামল ভট্টাচার্যের মুখে তখন হাসি ফুটে উঠেছে। ছোঁ মেরে অনিদার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন নেকলেসটা।

“বাহাদুর শাহের হিরের নেকলেস!” চোখের সামনে তুলে ধরে বললেন উনি। চোখজোড়া ওঁর তখন চিকচিক করছিল।

“কিন্তু জিনিসটা ফ্রিজের ভেতরে গেল কী করে?” মিসেস ভট্টাচার্যের গলাতেও তখন উত্তেজনা।

তাতে মুচকি হেসে অনিদা বলল, “গেল নয় মিসেস ভট্টাচার্য, নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”

“কেন?” কপাল কুঁচকে গেল ওঁর। বুঝলাম ধোঁয়াশায় রয়েছেন ভদ্রমহিলা। অবশ্য ঘরে উপস্থিত আমরা সকলেই।

অনিদা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে এবার মুখ খুলল। বলল, “দেওয়াল আলামারি থেকে ফ্রিজ পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছল, সেটা বলতে গেলে অ্যাক্সিডেন্টের সময় থেকে শুরু করতে হয়।”

“অ্যাক্সিডেন্ট! নেকলেসের সঙ্গে অ্যাক্সিডেন্টের কী সম্পর্ক?”

অনিদা তখন হেসে বলল, “সেদিন যখন আপনাদের কমপ্লেক্সের সামনে অ্যাক্সিডেন্টটা হয়, তখন থেকেই শুরু হয় আসল খেলাটা। আচমকা ঘটনাটা ঘটাতে আপনারা সবাই হুড়মুড়িয়ে ছুটে গেলেন সেটা দেখতে। কেউ গেলেন ব্যালকনিতে, তো কেউ নীচে। ঠিক এই সময় চোরের আবির্ভাব ঘটল। ভাবল, এই সুযোগ। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না সে। সুযোগের পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করে হাতিয়ে নিল নেকলেসটা। কিন্তু বাইরে চালান করার সুযোগ পেল না। তাই লুকিয়ে ফেলল ডিপ ফ্রিজে। তারপর বেশ কয়েকদিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছিল। আপনাদের ফ্রিজ সবসময় চালু থাকে। নেকলেস বরফের মধ্যে আটকে ছিল। আর সেই বরফ গলাতে হলে ফ্রিজ বন্ধ করা দরকার। কিন্তু সেটা আবার বেশিক্ষণ সম্ভব নয়। তাই মাঝে-মাঝেই ফ্ল্যাটের মেন সুইচ বন্ধ করে রাখা হচ্ছিল। যাতে বরফ গলে যায় আর নেকলেসটা সহজেই বের করে আনা যায়। অনেকবার চেষ্টা করল চোর। তবে সুবিধা করে উঠতে পারল না। শেষে আজ কেউ ঘরে না থাকাতে মি. চোর ভাবল আর দেরি নয়, এই সুযোগ। তাই সে মোক্ষম সময়ে হানা দিল ফ্ল্যাটে। কিন্তু আজও কাজ হাসিল হল না।”

আমরা এতক্ষণে সবাই জেনে গেছি যে চাদরে ঢাকা যে লোকটা মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে, সে-ই চোর। মল্লিকা ভট্টাচার্য চোখ বড়ো বড়ো করে ওর দিকে চেয়ে ছিলেন। এবার বললেন, “ওর পরিচয় কী?”

ওঁকে তখন প্রায় থামিয়ে দিয়ে শ্যামল ভট্টাচার্য জিজ্ঞাসা করলেন, “তার আগে বলুন ও আলমারি থেকে নেকলেসটা চুরি করল কী করে। চাবি তো আমাদের কাছে থাকে!”

“আসলে,” অনিদা বলল, “ও একটা ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়ে নিয়েছিল।”

“সর্বনাশ!” অনিদার কথা শুনে মিসেস ভট্টাচার্য বললেন, “কিন্তু চাবি পেল কী করে?”

অনিদা ওঁর কথার কোনও উত্তর করল না। আমার ভেতরটা তখন টগবগিয়ে ফুটছে। চোর তখনও এক অবস্থায় মাটিতে পড়ে। ওর পরিচয় জানার জন্য সবাই আমরা ছটফট করছি। অনিদা আমাদের সবার মনের অবস্থা বুঝতে পারছিল। ও এবার ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে লোকটার পাশে বসল। তারপর এক ঝটকায় মুড়ি দেওয়া চাদরটা সরিয়ে দিল। লোকটার পরনে মোটা জাম্পার আর জিন্সের প্যান্ট। ও এখনও উপুড় হয়েই পড়ে। পেছন থেকে দেখতে পেলেও মনে হচ্ছিল ওকে কোথায় যেন দেখেছি। ঘরের সবাই তখন চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে লোকটার দিকে।

অনিদা এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে লোকটাকে বলল, “এবার আপনি উঠে দাঁড়ান।”

কয়েক মুহূর্ত পর ধীরে ধীরে উঠে বসল লোকটা। তখনও সে আমাদের দিকে পেছন ফিরে। অন্যদের কথা বলতে পারব না, আমি কিন্তু একটা আন্দাজ করতে শুরু করেছিলাম। তাই এতটুকু না নড়াচড়া করে কাঠ হয়ে ওর দিকে চেয়ে ছিলাম। এবার সে উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়াতে আমার আন্দাজ সত্যি বলে প্রমাণিত হল। আর ঘরে সবার যেন একসঙ্গে নিশ্বাস আটকে গেল। মনে হল ভালো করে একবার চোখ কচলে নিই। শ্যামল ভট্টাচার্য কথা হারিয়েছিলেন। আমার মুখটা অজান্তেই হাঁ হয়ে গেছিল। মল্লিকা ভট্টাচার্যের চোখের পলক পড়ছিল না। শেষে ওঁর গলা চিরে বেরিয়ে এল, “তুই!”

বোধ হয় এতগুলো লোকের সামনে ধরা পড়ে গিয়ে আর এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল। দৃষ্টি মাটির ওপর স্থির। গলার কাছটা ওঠানামা করা বুঝিয়ে দিচ্ছিল বার বার ঢোঁক গেলা। শেষে আর থাকতে না পেয়ে সামনের চেয়ারটাতে ধপ করে বসে পড়লেন শ্যামল ভট্টাচার্যের বড়ো ছেলে সৈকত ভট্টাচার্য।

“তাহলে দিল্লি এসে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করে ফেললেন!” হেসে বললেন মি. গুপ্ত।

সকাল এখন আটটা। আমরা অরবিন্দ আশ্রমের রিসেপশনের সোফাতে বসে।

কফির কাপে চুমুক মেরে মুচকি হাসল অনিদা। এবার বলল, “বেশ কিছুদিন পর একটা কেস মাথা ঘামানোর সুযোগ দিল।”

আমি বললাম, “কেসটাতে তো অনেকগুলো রহস্যজনক চরিত্র ছিল।”

“হ্যাঁ।” মাথা নেড়ে অনিদা বলল, “প্রথমে তো প্রায় প্রত্যেককেই অপরাধী মনে হচ্ছিল। মালিক থেকে কাজের লোক, কেউ বাদ যাচ্ছিল না।”

আমি বললাম, “আর মি. রায়?”

“উনি তো বটেই।” বলে আর একবার কফির কাপে চুমুক মারল অনিদা।— “আসলে মজার ব্যাপার কী জানিস? প্রথম থেকেই কেসটাতে বেশ কিছু ঘটনা বা অবস্থা তথ্য হয়ে উঁকি মারছিল।” সোফাতে আরও জাঁকিয়ে বসল অনিদা। বলল, “প্রথমেই ভাব সৌম্য ভট্টাচার্যের কথা।”

“লোডশেডিং আর কাশ্মীর?”

“হ্যাঁ। বোঝাই যাচ্ছিল দুটো কথার মধ্যেই লুকিয়ে কিছু মজাদার আর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সৈকত ভট্টাচার্য যে নেকলেসটা চুরি করে ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলেন, তা উনি দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু ভাইপোকে ধরিয়ে দিতে মন চাইছিল না ওঁর। কিন্তু উলটোদিকে মেনেও নিতে পারছিলেন না ব্যাপারটা। কিন্তু কিছু করারও নেই। শেষে আমি আসতে উনি আশার আলো দেখতে পেলেন। মনেপ্রাণে চাইছিলেন আমি নিজে থেকেই চোর ধরি। তাই মাথা খাটিয়ে সাধ্যমতো একটা ক্লু দিয়েছিলেন। যদিও আসল ক্লু কিন্তু আমি জেরা থেকেই পেয়েছিলাম।”

“তাই নাকি!” অবাক হয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কীভাবে?”

“আসলে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকটা চরিত্র আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। আর তা আলাদা-আলাদাভাবে।”

“যেমন?”

“প্রথমেই আসি জগা নামে কাজের ছেলেটার কথায়। মাইনের কথা জিজ্ঞাসা করায় ওর মুখের ভাবটা মনে পড়ে? তাই আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ওর পক্ষে এ-কাজ করা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। এর পরের ব্যক্তি সুখেনদা। যদিও ওঁর বিরুদ্ধে কোনও নেগেটিভ রিপোর্ট ছিল না, তাও সন্দেহের তালিকা থেকে ওঁকে বাদ দিতে পারিনি।”

“আর সৌরভ ভট্টাচার্য?”

“সবথেকে সন্দেহজনক চরিত্র। নেকলেস চুরি গেছে, ও-ই প্রথমে দেখল। রাতে চোর এসেছিল, সেটাও জানতে পারল প্রথমে সৌরভই। কিন্তু কীভাবে? প্রথমে ভাবলাম, হঠাৎ করে ওই-বা কেন প্রথমে দেওয়াল আলমারির কাছে গেল? নেকলেস আছে না নেই, সেটাই-বা ও দেখতে গেল কেন? তার মানে কি চুরিটা নিজেই করে শুধুমাত্র ঘটনাটা রটিয়ে দিল? আর রাতে চোর দেখার ব্যাপারটা স্রেফ নাটক করল? এতগুলো জিনিস সত্যিই আমাকে ভাবাতে বাধ্য করেছিল যে সৌরভই আসল অপরাধী। আর তাছাড়া…”

“তাছাড়া?”

“ছেলেটা শেয়ার মার্কেটে কয়েক লক্ষ টাকা লস করে বসে আছে। আমি খোঁজ করে জেনেছি। সুতরাং…”

“ওর চুরির মোটিভ ছিল।” বললাম আমি।

“নিশ্চয়ই।” বলে সুরুত করে কফির কাপে চুমুক মারল অনিদা।

“মি. রায়েরও তো চুরির যথেষ্ট কারণ ছিল?” আবার জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

“অবশ্যই। হাত দেখেন। লোককে পাথর বিক্রি করেন। নেকলেসটা হাতাতে পারলে ওঁর লাভও কিছু কম হত না। তাছাড়া ওই ফ্ল্যাটে তো ওঁর নিয়মিত যাতায়াতও ছিল।” এতটা বলে থামল অনিদা। তারপর বলল, “তবে আমাকে সবথেকে বেশি ফাঁপরে ফেলেছিলেন শ্যামল ভট্টাচার্য আর সৌম্য ভট্টাচার্য।”

“সে কি! এমন কেন?”

“সেদিন শ্যামল ভট্টাচার্যকে আচমকা গয়নার দোকানে দেখলাম আর তার ওপর উনি আবার গয়নায় টাকা ইনভেস্ট করতে চাইছিলেন। তাও আবার অনেক টাকা। ব্যাপারটা আমার মনে নতুন করে সন্দেহ তৈরি করেছিল। এই সময় আচমকা ওঁর টাকা ইনভেস্ট করার দরকার পড়ল কেন? ভাবতে শুরু করেছিলাম, পুরো ব্যাপারটা সাজানো নয় তো? সন্দেহ হয়েছিল, ভদ্রলোকের হয়তো অন্য কিছু মতলব আছে।”

আমি এ-কথা শুনে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, “এমন ভাবার কারণ?”

তাতে অনিদা বলল, “হতে পারে ওঁর টাকাপয়সার টানাটানি ছিল। নেকলেস বেচে মোটা টাকা পাওয়া যেত। কিন্তু সে-কথা বাড়িতে স্বীকার করা সম্ভব ছিল না। তাই ওই ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। অবশ্য পরে খবর পেলাম তেমন কিছুই নয়।”

“কিন্তু সৌম্য ভট্টাচার্যকে কেন আপনি সন্দেহ করেছিলেন?” আমার মুখের প্রশ্নটা যেন কেড়ে নিলেন মি. গুপ্ত।

“ওঁর ওই সাংকেতিক কথাটা তো বটেই, তাছাড়া দীর্ঘদিন দাদার দয়ার পাত্র হয়ে থাকা মোটেও সুখের নয়। আর তো কিছুই ছিল না ওঁর।”

এতটা বলে থামল অনিদা। তারপর ভুরু কুঁচকে বলল, “আসলে চুরির মোটিভ আর পদ্ধতি, কিছুই ধরতে পারছিলাম না। সৌম্য ভট্টাচার্য বলেছিলেন যে নেকলেস আছে কাশ্মীরে। কথাটার আসল মানে বুঝতে না পারলেও এটা বেশ বুঝতে পারছিলাম যে উনি ঠান্ডা কোনও জায়গার কথা বলতে চাইছেন। তাছাড়া ফ্ল্যাটে বার বার লোডশেডিং ব্যাপারটাও বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল আমাকে। তারপর যখন জানতে পারলাম মিটার বক্সের মেন অফ করে রাখা হচ্ছে, তখন শিওর হলাম সবকিছু প্রি-প্ল্যানড। কিন্তু কারণটা বুঝতে পারছিলাম না। শেষে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির তথ্যচিত্রটা দেখতে দেখতে মনে সব অন্ধকার দূর হয়ে গেল। তার সঙ্গে আত্মবিশ্বাসে রসদ জোগাল সেদিন রাতে ওঁদের ফ্ল্যাটে চোর আসাটা। বুঝতে পারলাম নেকলেস ওই ফ্ল্যাটেই আছে। আর সেটা আছে ফ্রিজে।”

“সৈকত ভট্টাচার্য যে চোর, সেটা কী করে বুঝতে পারলে?”

“সেটাই ছিল সবথেকে সোজা এবং কঠিন।”

“কীভাবে?”

“জেরা পর্বটা আমার আরও ভালো করে শোনা উচিত ছিল।”

“ওটা থেকে কী তথ্য পেয়েছিলে?”

“কারও উত্তরগুলোই তেমন কিছু স্পেশাল ছিল না। শুধুমাত্র জগা আর সৈকত ভট্টাচার্যের দুটো কথা ছাড়া।”

“কী কথা?” উৎসাহ নিয়ে প্রশ্ন করলাম অনিদাকে।

তাতে একপেশে একটা হাসি দিয়ে অনিদা বলল, “জগা বলেছিল অ্যাক্সিডেন্টের সময় ও যখন নীচে যাচ্ছিল, তখন সৈকত ভট্টাচার্য ঘরে ঢুকছিলেন। কিন্তু সৈকত ভট্টাচার্য জানালেন উনি ঘরে ঢোকার সময় কাউকে দেখেননি। পুরো জেরা পর্বে এই একটাই অসঙ্গতি ধরা পড়েছিল। বুঝতে পারলাম, অপরাধী এই দুজনের মধ্যেই একজন হবেন। এবার দুজনের ওপর নজর রাখতে শুরু করলাম। শেষে সৈকত ভট্টাচার্যকে আবিষ্কার করলাম একজন চাবিওয়ালার সঙ্গে। চাবিওয়ালাকে খুঁজে বের করে তার সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে চোখ কপালে উঠে গেল আমার। কারণ, ওর কাছ থেকেই আলমারির নকল চাবি তৈরি করে নিয়েছিলেন সৈকত ভট্টাচার্য। কেসটাতে গোয়েন্দা লাগানো হয়েছে বলে উনি চাবিওয়ালাকে সাবধান করছিলেন। কিন্তু সেটা আমার চোখে পড়ে যায়।”

“এবার বুঝেছি, কেন আপনি সেদিন এমন একটা ফাঁদ পেতেছিলেন।” বললেন মি. গুপ্ত।

তাতে মুচকি হেসে অনিদা বলল, “আমি জানতাম বাড়ি খালি করে দিলে অপরাধী একবার চেষ্টা করবেই। হলও তাই। এতে তাকে হাতেনাতে ধরাটা সহজ হয়ে গেল।”

“কিন্তু, মোটিভ?”

“সেই টাকা। ব্যাবসায় বিশাল লস। বাড়িতে না জানাতে পারা। প্রচুর দেনা।” থেমে থেমে বলল অনিদা।

আমি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী করে জানলে?”

তাতে চোখ পাকিয়ে ও বলল, “খোঁজখবর নেওয়াটাও তদন্তের মধ্যে পড়ে সেটা নিশ্চয়ই এতদিনে শিখেছিস?”

আমি চুপ মেরে গেলাম। অনিদা ততক্ষণে অরবিন্দ আশ্রমের ড্রাইভার সিংজিকে ফোন করছিল। কাল সকালে আমরা যাব তাজমহল দেখতে।

জয়ঢাকের গল্পঘর

প্রকাশিত হয়েছে  সত্যজিৎ দাশগুপ্তের অসামান্য ভৌতিক কাহিনি সঙ্কলন- দশ ভূতুড়ে। জয়ঢাক প্রকাশন। নীচের ছবিতে ক্লিক করে জয়ঢাক ওয়েবস্টোর থেকে বইটির অর্ডার দিন।

doshbhutu

Leave a Reply