পুষ্পেন মণ্ডলের আরো লেখা: বাউটম্যানের বাংলো, কুয়াশার ডাক, অরেলস্টাইন ক্যাসেল, সমুদ্রগুপ্তের তরবারি, গৌরীভিটিলের অদ্ভুত গন্ধ, জলদস্যুর রক্তচক্ষু, মেজাম্বা, কালযন্ত্র, ওম মণি পদ্মে হুম, পয়েন্ট নিমো

উদভ্রান্ত সেই আদিম যুগে
স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে
নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত
তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা নাড়ার দিনে
রুদ্র সমুদ্রের বাহু
প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে….
বেলিজ ব্যারিয়ার রিফ
ক্যারিবিয়ান সাগরের পশ্চিম প্রান্তে ছোট্ট সাজানো গোছানো শহর ড্যাংরিগা। সেখানে সমুদ্রের ধারে পুন্টা ক্যাফের একটা চেয়ারে বসে ছিলেন লিও রয়। সামনে টেবিলের ওপর রাখা ব্ল্যাক কফির মগ থেকে মাঝে মাঝে চুমুক দিচ্ছেন তিনি। পায়ের ওপর পা দিয়ে সজাগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সামনের নীল সমুদ্রের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা নামবে। মানুষজন এখনও সমুদ্রের জলে ঝাঁপাঝাঁপি করছে। থেকে থেকে হুইসল্ দিচ্ছে ওয়াচটাওয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা কোস্টগার্ডের লোক। আলো চলে যাওয়ার পরে এই সমুদ্রে আর থাকা যায় না। হাঙরেরা এগিয়ে আসে তটের দিকে।
সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে রোদচশমাটা মাথার ওপরে আটকে দিলেন লিও। আজকে নিয়ে সাতদিন হল তিনি এখানে এসে বসছেন। সারাদিন তাকিয়ে থাকছেন সমুদ্রের দিকে। মাঝে মধ্যে বায়নাকুলার চোখে দিয়ে সমুদ্রের জলে কিছু খুঁজছেন।
সন্ধ্যা নামার পর প্রতিদিন তিনি উঠে চলে যান নিজের হোটেলে। আবার পরেরদিন এসে একই জায়গায় বসেন। বেশিট্যুরিস্ট আসে না এখানে। বেয়ারা ক’দিন ধরে এঁকে লক্ষ করছে, ঐ একই মেক্সিকান মিক্সড স্যালাড অর্ডার করেন তিনি। আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে পানীয়তে চুমুক দেন।
আজকে হঠাৎ গোধূলির সময় সমুদ্রতটের পূর্ব প্রান্তে চোখ আটকে গেল লিও রয়ের। সন্ধ্যা নামার মুহূর্তে সমুদ্র থেকে একটা স্পিডবোট এসে থেমেছে সেখানে। বায়নাকুলার চোখে লাগিয়ে দেখলেন ডুবুরির পোশাক ছেড়ে বিচের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছেন বিখ্যাত জাপানি ওশেন বায়োলজিস্ট ডঃ ডাইজেন তানাকা।
ছোটোখাটো চেহারার মানুষটিকে দূর থেকেই নিখুঁতভাবে চিনে নিতে পেরেছেন লিও রয়। এবারে বিল মিটিয়ে তিনি সেদিকেই হাঁটতে শুরু করলেন বালির ওপর দিয়ে। সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় তাঁর কাঁচাপাকা চুল উড়িয়ে এলোমেলো করে দিচ্ছে। বেলিজ ব্যারিয়ার রিফের দিক থেকে হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসছে একটা আঁশটে গন্ধ। সোনালি আকাশে সিগালের দল ঝাঁক বেঁধে তাদের বাসায় ফিরে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে ক্যারিবিয়ান সাগরের গায়ে গলে যাচ্ছে গোধূলির শেষ আলোটুকু।
কিছুটা এগিয়ে ড্যাংরিগার সমুদ্রতটের ওপর দাঁড়িয়ে লিও রয় বায়নাকুলার নামিয়ে নিলেন। ডঃ তানাকা জেটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন হন্তদন্ত হয়ে। পা চালিয়ে গিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে লিও মৃদু হাসলেন, “অবশেষে উঠেছেন আপনি?” টিপিক্যাল আমেরিকান উচ্চারণে কথাটা কানে যেতেই চমকে উঠলেন ডঃ তানাকা। চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল তাঁর।
“আমি কি চিনি আপনাকে?”
“না ডঃ তানাকা। তবে আমি আপনাকে ভালো করে চিনি।”
“কে আপনি? আমাকে চিনলেন কীভাবে?”
“আমার কথা ছেড়ে দিন। কিন্তু আপনাকে অনেকেই চেনে। আপনার মতো ওশান বায়োলজিস্ট পৃথিবীতে খুব কমই আছে। সুদূর জাপান থেকে এখানে এসে সমুদ্রের নীচে ঠিক কী খুঁজছেন সেটা জানতে পারলে ভালো হত।” ডঃ তানাকার পাশে হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো বলছিলেন লিও রয়।
“আমি পরিচিত বৃত্তের বাইরের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে খুব একটা স্বচ্ছন্দ নই মিঃ…”
“আমার নাম লিও রয়। আমি একজন ফ্রি ল্যান্সার। আপাতত আমরাও সমুদ্রের নীচে কিছু খুঁজছি। তাই আপনার সাহায্য লাগবে। অবশ্যই উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাবেন প্রফেসর।”
“শুধুমাত্র পারিশ্রমিকের জন্য আমি কোনো কাজ করি না মিঃ রয়। আমার মন থেকে যেটা ভালো লাগে, সেটাই করি। আর আমার স্মৃতিশক্তি যদি খুব বেশি দুর্বল হয়ে গিয়ে না থাকে তাহলে আপনি হলেন সেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রাক্তন আমেরিকান স্পাই। তাই তো?”
একবার গলা ঝেড়ে নিয়ে লিও উত্তর দিলেন, “আপনার স্মৃতিশক্তি নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই প্রফেসর। আমার শুধু একটাই জিজ্ঞাসা ছিল, সমুদ্রের নীচে আপনারা যেটা খুঁজছেন, প্রবালের সেই আদিম প্রজাতি কি খুঁজে পাওয়া গেছে?”
“আমি সারা জীবন প্রবালদের নিয়ে গবেষণা করেছি। এখনও করছি। এখানের বেলিজ ব্যারিয়ার রিফে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রবালের বাসস্থান। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব তাদের ওপরে কী পরিমাণ পড়ছে, এই নিয়ে আমরা গবেষণা চালাচ্ছি। এর বাইরে আমি কিছুই বলতে পারব না।”
ঠিক সেই সময় লিও রয়ের কানের ভেতরের ছোট্ট ইয়ারপিসে ভেসে এল এক মহিলার গলা, “কন্ট্রোল কলিং ওরিয়ন।”
এজেন্সিতে লিও রয়ের ছদ্মনাম ‘ওরিয়ন’। লিও প্রফেসরের থেকে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে গলা নামিয়ে জানালেন, “ওরিয়ন শুনছে।”
“টার্গেট কি নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ, নিশ্চিত। জাপানের টিম লাইটহাউস রিফ থেকে ফিরে এসেছে।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। সম্ভবত হাইকম্যান্ডের অনুমতি চাইছে ওরা। লিও তখনও হাঁটছেন ডঃ তানাকার পাশে। কিছুক্ষণ পরে মহিলা কন্ঠ জানাল, “প্রফেসরকে ছেড়ে দাও।”
“কেন? এর কাছে অনেক তথ্য আছে। আমাদের সেফহাউসে তুলে নিয়ে গিয়ে জেরা করলেই সব উগরে দেবে।”
“সেটার প্রয়োজন হবে না। এই মুহূর্তে তোমার ওপর দুটো স্নাইপার টার্গেট করে রেখেছে ওরা। তুমি প্রফেসরকে কিছু করতে গেলেই গুলি চলবে। তাছাড়া খবর এসেছে সমুদ্রের মধ্যে জায়গাটা খুঁজে পাওয়া গেছে। আজকে রাতেই আমরা জলের নীচে যাব।”
“এটা ভালো খবর।” লিওর চোখ চিকচিক করে উঠল। সে এগিয়ে গিয়ে ডঃ তানাকাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “বিদায় প্রফেসার। পরে আবার দেখা হবে।” ডঃ তানাকার পাতলা ঠোঁটে তখন মুচকি হাসি।
রাত ১১টা। ড্যাংরিগা থেকে পনেরো নটিক্যাল মাইল দূরে, উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকার মাঝে ক্যারিবিয়ান সাগরের বুকে অন্ধকারের মধ্যে ভেসে যাচ্ছে একটা ছোটো জাহাজ। কোনও আলো নেই। কোনও পতাকা নেই। ‘ব্ল্যাক হরাইজন’ নামে জাহাজটির ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন লিও রয়। চারদিকে একটা অসম্ভব নিস্তব্ধতা। যেন ঝড়ের আগে শান্ত হয়ে আছে সমুদ্র। জাহাজের গতি ধীরে ধীরে কমছে। একজন তরুণ অফিসার এগিয়ে এলো লিওর দিকে। লিও জানতে চাইলেন, “টার্গেটের ডেপ্থ?”
“… ১৪৮ মিটার।”
“লোকেশন?”
“লাইটহাউস রিফ … গ্রেট ব্লু হোলের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে।”
লিও অবাক হলেন, “তোমরা নিশ্চিত?”
অফিসার মাথা নাড়ল, “আমাদের ইন্টারনাল সার্ভে স্যাটেলাইটের গ্র্যাভিমেট্রিক স্ক্যান দেখাচ্ছে ঐ জায়গায় সমুদ্রের নীচে একটা অস্বাভাবিক ক্যালশিয়াম গঠন রয়েছে।”
“প্রবাল?”
“না।”
“তাহলে কীসের?”
সে কম্পিউটারের পর্দায় একটি থ্রিডি ছবি দেখাল। ছবিটা দেখে লিওর বুক কেঁপে উঠল। ওটা কোনও সাধারণ প্রবালপ্রাচীর নয়। দেখতে যেন বিশাল একটি গাছের মতো। হাজার হাজার শেকড় আর ডালপালার শাখা প্রশাখা ছড়িয়েছে। পুরোটাই জীবন্ত। এটা কী করে সম্ভব? নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না লিও।
একই সময় বেলিজের লাইটহাউস রিফের অপর প্রান্তে রাতের অন্ধকারে এগিয়ে আসছিল আর একটি জাহাজ ‘কুরোমারু’। জাপানি গবেষণা জাহাজ। ভেতরে নিজের চেম্বারে ডঃ তানাকা হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে সমুদ্রের মানচিত্র দেখছিলেন। তাঁর সহকারী মিচি অস্পষ্ট স্বরে ডাকল প্রফেসারকে। “তানাকা সান…”
“হ্যাঁ, বলো।”
“আমাদের ড্রোন আবার একই জায়গায় সিগন্যাল হারিয়েছে।”
প্রফেসার শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কত নম্বর সেক্টর?”
“সপ্তম।”
“সবগুলো?”
“হ্যাঁ।”
পাশ থেকে আরেকজন বিজ্ঞানী জিজ্ঞেস করলেন, “ওখানে কি কোনও চৌম্বকীয় ক্ষেত্র আছে?”
ডঃ তানাকা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। “না… ওটা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক নয়।”
“তাহলে?”
ডঃ তানাকা খুব আস্তে বললেন, “ওটা জীবন্ত!”
ঘরের সবাই একসঙ্গে তাকিয়ে রইল। “সব প্রবালই তো জীবন্ত!”
“হ্যাঁ, কিন্তু তারা মানুষ বা অন্য প্রাণীদের মতো হাত-পা নাড়তে পারে না।”
“এটা পারে?”
“সেরকই মনে হচ্ছে! কিন্তু আমাকে সেখানে গিয়ে একবার নিশ্চিত হতে হবে।”
“তার মানে আপনি আবার জলের গভীরে যাবেন?”
“যেতেই হবে।” প্রফেসার নিজের মনের মধ্যেই বিড়বিড় করতে থাকলেন, “পৃথিবীর অন্যতম সেরা আন্ডার ওয়াটার ডাইভিং এলাকা এই বেলিজ বেরিয়ার রিফ, বৃহত্তর মেসো-আমেরিকান বেরিয়ার রিফ সিস্টেমেরঅংশ… প্রায় ৩০০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত প্রবালপ্রাচীর … প্রায় ৭০ প্রজাতির হার্ড কোরাল, ৩৬ প্রজাতির সফট কোরাল, ৫০০-রও বেশি মাছ, অসংখ্য অমেরুদণ্ডী প্রাণীর বাস এখানে। অথচ বিজ্ঞানীরা বলে নাকি এখনও এই বিশাল বাস্তুতন্ত্রের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা পুরোপুরি অনুসন্ধানই করা সম্ভব হয়নি। সেই অজানা অংশের মধ্যেই কি লুকিয়ে আছে আদিম প্রবালের রহস্য?”
কিছুক্ষণের মধ্যেই জলে নামার জন্য তৈরি হয়ে নিলেন তিনি। সঙ্গে যাবে আরও আটজন সহকারী। রাতের সমুদ্রে জলের মধ্যে সম্পূর্ণ অন্ধকার। সেজন্য সবাই পরেছে সর্বাধুনিক থ্রি ডি পদ্ধতিতে তৈরি ক্লোজড সার্কিট রিব্রিদার স্যুট। ফলে কোনও বুদবুদ উঠছে না। বাঁ হাতের কবজিতে লাগানো মনিটরের মাধ্যমে সব কিছু বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে। সেখানে দেখাচ্ছে সমুদ্রের নীচে জলের তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি, দৃশ্যমানতা প্রায় চল্লিশ মিটার। প্রত্যেকের হাতে ধরা ডাইভার প্রপালশন ভেহিকল-এর টানে জলের নীচে টর্পেডোর মতো ছুটে চলেছিল তারা।
কিছুক্ষণ পরেই এল ই ডি-র জোরালো আলোয় দেখা গেল বিশাল বিশাল ব্রেন কোরাল। তার পাশেই পার্পল সি ফ্যান, অরেঞ্জ এলিফ্যান্ট ইয়ারস্পঞ্জ, চারিদিকে হাজার হাজার এল্কহর্ণ কোরাল, স্টার কোরাল, স্ট্যাগহর্ণ কোরাল… আরো কত জাতের প্রবাল! পাশে দিয়ে চলে গেল এক ঝাঁক প্যারট ফিশ। একটা বিশাল সবুজ কচ্ছপ ধীরে ধীরে সাঁতরে চলে গেল। কিছুটা দূরে দেখা গেল রিফ শার্ক। মিচি ফিসফিস করে বলল, “এতো স্বর্গ…”
ডঃ তানাকা উত্তর দিলেন, “না… এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন শহর।”
হঠাৎ… সবার হেলমেটের ভেতর অ্যালার্ম বেজে উঠল। হাতের ডিসপ্লে বোর্ডের স্ক্রিনে একটা ছোটো লাল বিন্দু দেখা গেল। তারপর দুটো। তারপর… বাড়তে বাড়তে প্রায় দশটা। মিচি চমকে উঠল, “স্যার… ওগুলো আমাদের ড্রোন নয়।”
ডঃ তানাকা বললেন, “আমি জানি।”
“তাহলে ওরা কারা?”
তিনি দাঁত চেপে বললেন, “আমেরিকান এজেন্সি, আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ।”
অন্যদিকে লিও রয়ও একই সিগন্যাল পেয়েছেন। তিনি হেডসেটে কন্ট্রোল রুমে খবর পাঠালেন, “জাপানি টিমকে দেখা গেছে সামনে।”
“দূরত্ব কত?”
“একশো কুড়ি মিটার…” লিও রয় মৃদু হেসে জানালেন, “ওরাও আমাদের অবস্থান জেনে গেছে।”
নির্দেশ এল, “তোমরা যে কোনো চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত থাকো।”
ঠিক তখনই… সমুদ্রের নীচে একটা তোলপাড় শুরু হল। চোরাস্রোত ওদের ভাসমান শরীরগুলোকে উথালপাথাল করে দিচ্ছে। অন্ধকার জলের মধ্যে হঠাৎ যেন একটা বিশাল ছায়া নড়ে উঠল। সবার টর্চের আলো একসঙ্গে গিয়ে পড়ল সেখানে। তারপর… সবাই তাকিয়ে রইল নিঃশ্বাস বন্ধ করে। মিচি জিজ্ঞাসা করল, “এটা কী? এতো বিশাল বড়ো প্রবাল?”
ডঃ তানাকা ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন, “ওটা কোনও একটা প্রবাল নয়, কোনও তিমিও নয়, আবার কোনও অক্টোপাসও নয়…”
“তাহলে?…”
প্রায় পঞ্চাশ মিটার উঁচু এক বিশাল দৈত্যাকৃতি প্রবালের মতো সামুদ্রিক গাছ, যার শাখাগুলো মোটা মোটা অসংখ্য শিকড়ের মতো চারদিকে ছড়িয়ে আছে। পুরো কাঠামোটি হালকা নীল বায়োলুমিনেসেন্স ছড়াচ্ছে। প্রতিটি স্পন্দনের সঙ্গে মনে হচ্ছে যেন সেটি শ্বাস নিচ্ছে।
সেটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ডঃ তানাকার ঠোঁট শুকিয়ে গেল হেলমেটের মধ্যে। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, “প্রোটোকোরাল…!”
লিও রয়ও চাপা গলায় বললেন, “এটা কি সমুদ্রের জেনেসিস ট্রি?”
ঠিক সেই মুহূর্তে সমুদ্রের নীচ থেকে অজানা কম্পন শুরু হল। সেই বিশাল প্রবালটির কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে খুলে গেল একটি গোলাকার ফাটল। সেখান থেকে বেরিয়ে এল এক অদ্ভুত আলোকিত জেলি। সেটার শরীর থেকে বেরিয়ে আসছিল অসংখ্য নীলচে সুতোর মতো জিনিস। ডঃ তানাকা স্তব্ধ হয়ে গেলেন সেটা দেখে। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “এটা… পৃথিবীর কোনও প্রাণী নয়!”
আর ঠিক তখনই, আমেরিকান গবেষণা দলের দিক থেকে ছুটে এল প্রথম আঘাত। হারপুনটি গিয়ে আঘাত করল সেই নীলচে জেলিকে। তার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জলের মধ্যে একটা অসহ্য কাঁপুনি শুরু হল। জাপানি দলের মধ্যে থেকেও একজন হারপুন চার্জ করল। তারপরের জলের নীচে শুরু হয়ে গেল দু’পক্ষের যুদ্ধ। কোনও বিস্ফোরণের শব্দ নেই। নেই বন্দুকের বিকট গর্জন। শুধু সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে নীল আলো, লাল সতর্কবার্তা আর সেন্সর স্ক্রিনে দ্রুত ছুটে বেড়ানো অসংখ্য বিন্দু। পিং… পিং… পিং…
ডঃ তানাকার হেলমেটের হেড-আপ ডিসপ্লেতে ভেসে উঠল একটি লাল লেখা, হস্টাইল টার্গেট লকড। তিনি হাত তুলে ইশারা করলেন। জাপানি দলের আটজন ডুবুরি মুহূর্তের মধ্যে দুটি দলে ভাগ হয়ে বড়ো বড়ো ব্রেন কোরালের আড়ালে চলে গেল। প্রত্যেকের কোমরে টাইটানিয়ামের মাল্টিটুল, আর হাতে নতুন ধরণের ই.এম. হারপুন লঞ্চার। যার হারপুন লক্ষ্যবস্তুকে বিদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র তড়িৎচৌম্বকীয় স্পন্দন ছড়িয়ে তার সমস্ত ইলেকট্রনিক যন্ত্র অচল করে দিতে পারে।
অন্যদিকে লিও রয়ের দলও পুরো তৈরি। দ্রুত নিজেদের পজিশন নিয়ে নিয়েছে তারা। প্রাক্তন নৌ কমান্ডো, মেরিন স্পেশালিস্ট এবং সি.আই.এ.-এর আন্ডারওয়াটার অপারেশন ইউনিটের মোট দশজন। কিন্তু লিও সবাইকে থামতে বললেন, “কেউ গুলি চালাবে না, যতক্ষণ না আমি আদেশ দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য মানুষ নয়… ঐ গাছ প্রবাল।”
হঠাৎই তাঁর ডান দিকের অন্ধকারে একটা ক্ষীণ নীল রেখা ছুটে গেল। ঠাস! করে একটা চাপা শব্দ হল জলের মধ্যে। একটি হারপুন গিয়ে বিদ্ধ হয়েছে একজন আমেরিকান ডুবুরির ডি.পি.ভি.তে। সঙ্গে সঙ্গে মোটর বিকল হয়ে ঘূর্ণি খেতে খেতে নীচে তলিয়ে যেতে লাগল সে। ডুবুরিটি মরিয়া হয়ে ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাকে ফেরানো গেল না। লিও চিৎকার করে উঠলেন, “স্মোক ডিকয়!” দু’জন সঙ্গী সঙ্গেসঙ্গে কোমর থেকে গোলাকার কৌটো ছুড়ে দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেগুলো থেকে বেরিয়ে এল অগুন্তি সাদা বুদ্বুদের রাশি। মুহূর্তে চারপাশ ঘোলাটে হয়ে গিয়ে সেন্সরগুলো বিভ্রান্ত হয়ে গেল।
উলটো দিকে ডঃ তানাকা দাঁত চেপে বললেন, “লোকটা সাংঘাতিক ধুর্ত!”
মিচি জিজ্ঞেস করল, “এখন?”
“থার্মাল স্ক্যান চালাও। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা সমুদ্রের থেকে বেশি। ওরা লুকোতে পারবে না।”
মিচি কব্জিতে আঁটা পর্দায় স্পর্শ করতেই হেলমেটের ভাইসর-এ দৃশ্য বদলে গেল। কালো জলের মধ্যে ন’টি হলুদ অবয়ব জ্বলজ্বল করছে। চেঁচিয়ে উঠল সে, “পেয়ে গেছি!”
ঠিক তখনই লিওর টিমও একই কাজ করলেন। লিও নির্দেশ দিল, “ওরা আমাদের ইনফ্রারেডে ধরছে। স্টার্ট ই.এম.পি. পালস!”
দলের একজন ছোট্ট চাকতির মতো যন্ত্র খুলে সমুদ্রের মধ্যে ভাসিয়ে দিল। স্বয়ংক্রিয় প্রপেলারের মাধ্যামে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে নিঃশব্দে ফেটে গেল সেটা। চারপাশের জল যেন কেবল একবার কেঁপে উঠল। জাপানি দলের তিনটি হেলমেট মুহূর্তের জন্য অন্ধকার হয়ে গেল।
ডঃ তানাকা নির্দেশ দিলেন, “সিস্টেম রিবুট!”
“কম্পাস অফলাইন!”
“কোনো সেন্সর কাজ করছে না!”
কিন্তু ডঃ তানাকা আশ্চর্যরকম শান্ত। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। তারপর হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন পাশে থাকা একটা প্রবালকে। মিচি অবাক হয়ে গেল তাঁকে দেখে। অস্পষ্টভাবে তার মুখ দিয়ে বের হল, “তানাকা সান?”
ডঃ তানাকা খুব আস্তে বললেন, “মেশিনের ওপর ভরসা করো না। সমুদ্রকে অনুভব করো।” প্রবল স্রোতের মধ্যে তাঁর দস্তানার আঙুলে কাঁপন লাগল। প্রবালের ভেতর থেকে যেন নিয়মিত স্পন্দন আসছে। জেগে উঠছে ওরা। ধুপ… ধুপ… ধুপ… এটা সমুদ্রের ঢেউ নয়। এটা যেন কোনও বিশাল জীবের হৃদস্পন্দন।
ওদিকে, লিও রয়ের দৃষ্টি আটকে গেছে সেই অতিকায় কালো প্রবালের গঠনের দিকে। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল এটি মৃত পাথর। কিন্তু এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার গায়ের অসংখ্য ক্ষুদ্র পলিপ একই সঙ্গে খুলছে ও বন্ধ হচ্ছে। প্রতিবার খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে নীল আলোর ক্ষুদ্র রেখা, যেন কোটি কোটি জোনাকি অন্ধকারে জ্বলে উঠছে। লিও বিড়বিড় করে বললেন, “এই ধরণের প্রবাল এর আগে কখনও দেখিনি।”
হঠাৎ প্রবালের একটা মোটা শাখা ধীরে ধীরে নড়ে উঠল। তারপর আরও একটা। ধীরে ধীরে পুরো বিশাল কাঠামোটা যেন জেগে উঠল। মিচি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, “ওটা নড়ছে!”
ডঃ তানাকা গম্ভীর স্বরে বললেন, “না… ও আমাদের অনুভব করেছে।”
ঠিক সেই সময় আমেরিকান দলের একজন তরুণ ডুবুরি, মার্ক, কৌতূহল সামলাতে না পেরে প্রবালের গা থেকে একটি ছোট্ট নমুনা কাটার জন্য লেজার ছুরি ব্যবহার করল। লেজারের ধারালো আলোর রেখা প্রবালের গায়ে পড়তেই সমস্ত সমুদ্র যেন থমকে গেল। এক সেকেন্ড… দুই… তিন… তারপর সেই বিশালকায় প্রবালের গা থেকে ছড়িয়ে পড়ল এক অদৃশ্য কম্পন। কয়েক মিটার দূরে থাকা হাজার হাজার ছোটো মাছ আচমকা দিক বদলে পালাতে শুরু করল। রিফ শার্কগুলোও যেন ভয়ে গভীর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। ডঃ তানাকা বিস্ফারিত চোখে নির্দেশ দিলেন, “সবাই পিছিয়ে যাও!”
কিন্তু কেউ নড়ার আগেই প্রবালের অসংখ্য সূক্ষ্ম তন্তু বিদ্যুতের গতিতে ছুটে এসে মার্কের ডান হাতটা জড়িয়ে ধরল। অ্যামেরিকান দলের ঐ প্রথম হারপুন চার্জ করেছিল। মরিয়া হয়ে ছটফট করতে লাগল মার্ক। চিৎকার করছে, “হেল্প! হেল্প!” বলে। লিও দ্রুত এগিয়ে গেলেন তার দিকে। সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বললেন, “তোমরা সুতোগুলো কাটো।”
দু’জন ডুবুরি ধারালো ড্যাগার দিয়ে তন্তুগুলো কাটতে যেতে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল, সেগুলো কিছুতেই কাটা যাচ্ছে না। বরং ধাতব ড্যাগারের চারপাশে জড়িয়ে গিয়ে সেগুলোকেও টেনে নিচ্ছে। মার্কের হার্ট-মনিটরে হঠাৎ অস্বাভাবিক ওঠানামা শুরু হল। ৯২… ১০৫… ১৩৮… ১৬০… তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে ফেটে যাবার উপক্রম। হেলমেটের ক্যামেরা থেকে সরাসরি ছবি ভেসে উঠল লিওর স্ক্রিনে। তার মুখটা রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার ফলে লাল হয়ে গেছে। সে হতাশ হয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল শেষ মুহূর্তে। তারপর নিশ্চুপ হয়ে গেল। সম্ভবত হার্ট ব্লক হয়ে গেছে তার। দেখতে দেখতে মার্কের শরীরটাও সমুদ্রের গভীরে কালো জলের মধ্যে তলিয়ে গেল।
শরীরটা মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবালের কেন্দ্রস্থলে নীল আলোর একটি সরু স্তম্ভ ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে শুরু করল। সমুদ্রের অন্ধকার জলে কয়েকশো মিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল সেই আলো। লিও এবং ডঃ তানাকা দু’জনেই বুঝতে পারলেন, তাঁরা আর শুধুমাত্র একটি প্রাচীন জীবের সামনে দাঁড়িয়ে নেই। তাঁরা এমন এক সত্তার মুখোমুখি, যে সম্ভবত পৃথিবীর জানা ইতিহাসেরও আগে থেকে নিজের অস্তিত্ব বহন করে চলেছে।
আর সেই মুহূর্তে, দু’দলের কেউই খেয়াল করল না তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের অনেক ওপরে, অন্ধকার সমুদ্রপৃষ্ঠে, আলো নিভিয়ে ভেসে এসেছে তৃতীয় একটি অচিহ্নিত সাবমেরিন। তার গায়ে কোনও দেশের পতাকা নেই। লিও রয় বুঝতে পারলেন, পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। হেলমেটের কমিউনিকেশন সিস্টেমে একসঙ্গে ভেসে আসছে অসংখ্য কণ্ঠস্বর।
“টিম রিট্রিট…”
“মেডিক্যাল এমার্জেন্সি!”
“হাল ভাইব্রেশন ডিটেক্টেড!”
“অচেনা এক সেন্সর পাওয়া যাচ্ছে!”
কিন্তু সমুদ্রের নীচে এখন আর কেউ কারও নির্দেশ শুনছে না। ডঃ তানাকা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, “কেউ এখন গুলি চালাবে না।” কিন্তু তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকান দলের একজন কমান্ডো কোমর থেকে একটা আন্ডারওয়াটার ডার্ট গান বের করল। লিও সেটা দেখে গর্জে উঠলেন, “থামো!” কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। রকেটটি সোজা ছুটে গেল সেই আলোকোজ্জ্বল প্রবালের ঠিক কেন্দ্রের দিকে। মাত্র তিন সেকেন্ড পরে একটা নিঃশব্দ বিস্ফোরণ হল। জলের নীচে আগুন জ্বলে না, কিন্তু বিস্ফোরণের অভিঘাতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল প্রবল শকওয়েভ। ব্রেন প্রবালগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। কয়েকশো বছরের পুরোনো সি-ফ্যান ছিঁড়ে উড়ে গেল ভয়ঙ্কর স্রোতের সঙ্গে। অসংখ্য রঙিন মাছ মুহূর্তে প্রাণ হারাল।
কিন্তু এর পরেও যা ঘটল তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। আদিম প্রবালের শরীরে ফাটল ধরতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কালো রঙের একটা ঘন তরল। মনে হচ্ছিল, কোনও বিশাল জীবের রক্ত। সেই তরল সমুদ্রের জলে মিশতেই চারপাশের সমস্ত প্রবাল একসঙ্গে কাঁপতে শুরু করেছে। তারপরেই তারা জ্বলে উঠল ধীরে ধীরে। দশ মিটার… পঞ্চাশ মিটার… একশো মিটার… তারপর পুরো রিফ জুড়ে। যেন ক্যারিবিয়ান সাগরের তলায় জেগে উঠেছে লক্ষ বছরের পুরানো এক শহর। একসঙ্গে জ্বলে উঠেছে তারা।
ডঃ তানাকা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, “অসম্ভব…!”
মিচি ফিসফিস করে বলল, “এগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত…!”
প্রফেসরের চোখে আতঙ্ক, তিনি বললেন, “শুধু সংযুক্ত নয়… এরা একে অপরের সঙ্গে তথ্যের আদান প্রদানও করছে।”
ঠিক সেই সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে ভাসমান আমেরিকান গবেষণা জাহাজ ‘ব্ল্যাক হরাইজনে’ লাল অ্যালার্ম বেজে উঠল।
“ক্যাপটেন!”
“হ্যাঁ বলো…”
“ডিপ সেন্সর কিছু খুঁজে পেয়েছে… সাংঘাতিক কিছু…!”
ক্যাপ্টেন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটা বিশাল গোলাকার বস্তু অবিশ্বাস্য গতিতে নীচ থেকে ওপরে উঠছে। কম্পিউটার বলছে সেটার গতি প্রায় নব্বই নটিক্যাল মাইল। কিন্তু এ তো অসম্ভব! ক্যাপ্টেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। আধুনিক প্রযুক্তির কোনও সাবমেরিনও এত দ্রুত উঠতে পারে না।
পাশ থেকে একজন অফিসার বলল, “সম্ভবত ভূমিকম্পের অভিঘাত।”
ক্যাপ্টেন মাথা নাড়লেন, “না… এটা আমাদের দিকেই আসছে।”
কথাটা শেষ হতে না হতে হঠাৎ পুরো জাহাজ থরথর করে কেঁপে উঠল। জাহাজের নীচে যেন বিশাল হাতুড়ি দিয়ে ঘা মেরেছে কেউ।
ইঞ্জিন রুম থেকে চিৎকার ভেসে এল, “জাহাজের কাঠামোতে ফাটল দেখা গেছে!”
“তিন নম্বর কম্পার্টমেন্টে জল ঢুকছে হু হু করে…”
মাত্র দশ সেকেন্ডের মধ্যে দ্বিতীয় আঘাত। এইবার আরও ভয়ঙ্কর। অভিঘাতে জাহাজ প্রায় ত্রিশ ডিগ্রি কাত হয়ে গেল। ডেকের ওপর রাখা গবেষণাগারের কাচের কনটেনার ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল চোখের নিমেষে। ক্যাপ্টেন চেঁচিয়ে উঠলেন, “এমারজেন্সি ব্লাস্ট!”
কোনও উত্তর এল না। ওপরন্তু সমস্ত বিদ্যুৎ নিভে গেল। একই সময়ে, প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে জাপানি গবেষণা জাহাজ ‘কুরোমারু’তেও একই অবস্থা। রেডিও অপারেটর আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, “নীচে… কিছু একটা নড়ছে!”
ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করলেন, “কী?”
“আমি… কিছুই বুঝতে পারছি না ক্যাপ্টেন!”
স্ক্রিনে যেন অসংখ্য আলোকবিন্দু একসঙ্গে জড়ো হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে সেগুলো একটি বিশাল বৃত্ত তৈরি করল। তারপর জাহাজের নীচে সমুদ্র ফুলে উঠল হুহু করে…
পরমুহূর্তে অদৃশ্য কোনও শক্তি নীচে থেকে ভয়াবহ একটা ধাক্কা দিল। বিশাল গবেষণা জাহাজটা কয়েক ফুট ওপরে উঠে আবার আছড়ে পড়ল জলের ওপর। তার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে। রাডার বন্ধ। স্যাটেলাইট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ব্রিজের কাচ ভেঙে নোনা জল ঢুকছে হুহু করে। আর একজন সহনাবিক চিৎকার করে উঠল, “আমাদের নীচে কিছু আসছে!”
এদিকে সমুদ্রের তলায় লিও রয় অনুভব করলেন প্রবল স্রোত। আর সাংঘাতিক সেই আন্ডার ওয়াটার কারেন্ট কোনো ভাবেই ড্রাইভার প্রপালশন ভেহিকল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। স্রোতের সঙ্গে তীব্র গতিতে ভেসে চললেন তিনি। খুব কষ্ট করে লিও মাথা তুলে তাকালেন। দূরে ওপরের অন্ধকার জলরাশির মধ্যে বিশাল দুটি ছায়া দুলছে। তারপরেই তাঁর কানে ভেসে এল জাহাজের জরুরি সংকেত। “মে ডে! মে ডে!… মে ডে! মে ডে!…”
ফ্যাকাশে হয়ে গেল লিওর মুখ। ‘ব্ল্যাক হরাইজন’ আক্রান্ত হয়েছে!
ডঃ তানাকাও সেই প্রচন্ড সামুদ্রিক স্রোতের মধ্যে অসহায় ভাবে ভাসতে ভাসতে একই সঙ্গে নিজের কমিউনিকেশনে শুনলেন, “কুরোমারু ডুবছে!”
এতক্ষণে স্রোতের টানে লিও রয় আর ডঃ তানাকা দুজনেই চলে এসেছেন কাছাকাছি। দু’জনের চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য মিলিত হল। কয়েক সেকেন্ড আগেও তারা ছিল একে অপরের শত্রু। কিন্তু এখন দু’জনেই বুঝতে পারলেন তাঁদের ওপরের অস্থায়ী আস্তানা দুটোই ধ্বংস হতে চলেছে। ঠিক তখনই সমুদ্রের গভীর অন্ধকারের মধ্যে অদ্ভুত এক কম্পন শুরু হল। ভেসে উঠল একটা বিশাল জ্যামিতিক নকশা। ছোটো বড়ো সব উজ্জ্বল ফ্লুরোসেন্ট রঙের প্রবালগুলো মিলে আলোর রেখাগুলো তৈরি করছে ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছে যেন পুরো বেলিজ বেরিয়ার রিফ একটা জীবন্ত স্নায়ুতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। প্রবাল থেকে প্রবালে, অ্যাটল থেকে অ্যাটলে, লাইটহাউস রিফ, টার্নেফ অ্যাটল, গ্লোভার্স রিফ, সব জায়গায় একই সঙ্গে নীল আলোর স্পন্দন ছড়িয়ে পড়ছে। ডঃ তানাকা বিড়বিড় করে বললেন, “এটা ওদের যোগাযোগ ব্যাবস্থা।”
লিও জিজ্ঞেস করলেন, “কার সঙ্গে?”
প্রফেসারের কাছ থেকে উত্তর এল কিছুক্ষণ পর, “সম্ভবত পৃথিবীর বাইরে কারো সঙ্গে…”
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে দু’জনের হেলমেটেই একসঙ্গে একটি অজানা সিগন্যাল ধরা পড়ল। তবে এটা কোনও মানুষের ভাষা নয়। কোনও ডিজিটাল কোডও নয়। বরং গাণিতিক অনুপাতের মতো পুনরাবৃত্ত স্পন্দন, ২… ৩… ৫… ৮… ১৩… ২১… জলের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ধরে স্পন্দনটা অনুভব করার পরে ডঃ তানাকার চোখ বিস্ফারিত চোখে স্বগতোক্তি করলেন, “এত ফিবোনাচ্চি ধারার সংকেত!”
লিও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন প্রফেসারকে, “তার মানে প্রকৃতির ভাষা…”
ডঃ তানাকা ধীরে ধীরে বললেন, “পৃথিবীর বাইরের বুদ্ধিমান কোনো জীবের ভাষাও হতে পারে!”
ঠিক তখনই দূরের অন্ধকারে ভেসে উঠল তৃতীয় এক গোলাকার সাবমেরিনের অবয়ব। তাতে কোনও আলো নেই। কোনও জাতীয় পরিচয় নেই। শুধু তার নীচের একটা অংশে খুলে গেল চারটি নল। ডঃ তানাকা প্রথমেই বুঝতে পারলেন, “ওগুলো টর্পেডো নয়…!”
লিওর বহু বছরের গোয়েন্দা অভিজ্ঞতা তাঁর মস্তিষ্কে সতর্কতার সংকেত দিল। তিনি জানালেন, “না… এগুলো অন্যজাতের ঘাতক অস্ত্র। এর বিস্ফোরণ জাহাজকে বাইরে থেকে উড়িয়ে দেয় না, বরং কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডে সৃষ্ট ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বাষ্প বুদবুদের ধস এমন প্রচণ্ড চাপের তরঙ্গ তৈরি করে, যা জাহাজের তলার প্লেটিং ছিন্নভিন্ন করে দেয় মুহূর্তের মধ্যে।”
পরের মুহূর্তেই চারটি চার্জ দু’দিকে ছুটে গেল। গভীর সমুদ্রের বুক কাঁপিয়ে একসঙ্গে চারটি বিশাল অভিঘাতে চোখের সামনে আগেই বিধ্বস্ত হওয়া দুটি অত্যাধুনিক জাহাজ, ‘ব্ল্যাক হরাইজন’ আর ‘কুরোমারু’ টুকরো টুকরো হয়ে ডুবে গেল জলের মধ্যে।
ডঃ তানাকা চিৎকার করে উঠলেন, “ওরা আমাদের যুদ্ধাস্ত্রই আমাদের ওপরে ব্যবহার করছে!”
লিও দাঁত চেপে বললেন, “না, মনে হচ্ছে আমরাই ওদের ফাঁদে পা দিয়েছি!”
ডঃ তানাকা বুঝতে পারলেন তাঁরা ও লিও-রা একে অপরের প্রকৃত শত্রু নন। তাঁদের দুজনেরই প্রকৃত শত্রু তৃতীয় কেউ। বহু বছর ধরে সমুদ্রের নীচে লুকিয়ে থাকা আদিম প্রবালের অজানা শক্তি দখল করার জন্য তারাই এই পুরো সংঘর্ষের পরিকল্পনা করেছে।
কিন্তু তারা কারা?
লামাহাটার পাইনবনে
ম্যালের পাশ দিয়ে একা হাঁটতে হাঁটতে অর্ণবের মনে হল তার পেছনে অন্য একজন কেউ আসছে। কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে ঘন কুয়াশার মধ্যে আবছা একটা কালো অবয়ব ছাড়া কিছুই বুঝতে পারল না সে। দার্জিলিং টুরিজমের‘মেঘবালিকা’তে উঠেছে ওরা। দুপুরে মহামায়া রেস্তোরাঁতে খাওয়াটা বেশ জম্পেশ হয়েছে। তারপর বাবা-মা হোটেলে ফিরে ঢুকে পড়েছে কম্বলের ভেতর। বাইরে মেঘলা আবহাওয়া। ঠান্ডাটা জাঁক দিয়ে পড়ছে। সন্ধ্যায় ম্যালে যাওয়ার কথা ছিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অর্ণব বলল, “সবে বিকাল চারটে। আমি বরং ম্যালে গিয়ে বসছি। তোমরা একটু পরে এসো। গোল্ডেন লিপসের উলটো দিকের বেঞ্চে থাকব।” জিমখানা ক্লাবের পাশ দিয়ে নেমে বাঁদিকের সোজা রাস্তায় একটুখানি গেলেই মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ম্যাল। এই রাস্তাটা জমজমাট ভিড়ে ঠাসা। কিন্তু আজকে আর এই শর্টকাট রাস্তায় যেতে ইচ্ছা করল না অর্ণবের। তেমাথার মুখ থেকে ডানদিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল সে। এই রাস্তায় চিড়িয়াখানা আর মাউন্টিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট পড়বে। গতকালই ঘুরে এসেছে ওরা। কিন্তু অতদূর যাওয়ার আগেই ডানহাতে আর একটা রাস্তা বেঁকেছে, যেটা মহাকাল মন্দির হয়ে ম্যালে যাচ্ছে। এ পথে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। যদিও গত কয়েক দিনে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা একবারও পায়নি ওরা। পুরোটাই মেঘে ঢেকে আছে। দার্জিলিং এসে থেকে এই মেঘ কিছুতেই ওদের পিছু ছাড়ছে না। ক্লাস সেভেনের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হতেই অর্ণবের বাবা বলল, “চল অনি, আমার কাজের চাপ এখন হালকা আছে। ক’দিনের জন্য দার্জিলিং ঘুরে আসা যাক।”
মা সঙ্গে সঙ্গে গান ধরল, “আমার শৈশবের দার্জিলিংটা…”
ব্যাস্ তৎকালে টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে পড়ল দু’দিনের মধ্যেই।
আজকে গুগ্ল ম্যাপ দেখে অর্ণব একা নির্জন সেই রাস্তাতে হাঁটতে হাঁটতে পড়ন্ত বিকেলে ঢুকে গেল আরও একটা মেঘের রাজ্যে। এই রাস্তাটা বেশ নির্জন, বড়ো বড়ো ইউক্যালিপটাস গাছের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে। বেশ কিছু পাহাড়ি পাখির ডাক কানে আসছে। কান পেতে পাখির ডাকগুলো শোনার চেষ্টা করল অর্ণব। কোনো পাখির ডাকই বেশিক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে না। আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। মাঝে মধ্যে ম্যালের দিক থেকে কেউ ঘোড়ায় চড়ে সহিসকে নিয়ে ঘুরে যাচ্ছে এই রাস্তায়। তখন পিচঢালা রাস্তায় খটখট করে একটা শব্দ তৈরি হচ্ছে। বেশ মজা লাগছে অর্ণবের। মনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে একটা চাপা উত্তেজনা। হঠাৎ একরাশ ঘন কুয়াশা এসে ঘিরে ধরল ওকে। জ্যাকেট, টুপি, মাফলার সব গুঁড়ি গুঁড়ি জলকণায় ভরে গেল। বৃষ্টি নয়, কিন্তু বৃষ্টির মতোই ভিজে গেল গা। তখন দু’হাত দুরের জিনিস আর দেখতে পাচ্ছে না অর্ণব।
ঠিক তখনই অর্ণবের মনে হল পেছনে কেউ আছে। পায়ের শব্দ পাচ্ছে। পেছন ফিরে দেখল কুয়াশার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসছে একজন মানুষ। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। দুটো লোক আচমকা উলটো দিক থেকে ছুটে এল অর্ণবের দিকে। তবে সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকদুটো ওকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়ে আক্রমণ করল সেই পেছনের লোকটাকে। অর্ণব ভয় পেয়ে ছিটকে সরে গেল কিছুটা। খাদের পাশে রেলিংটা আঁকড়ে ধরে দেখল, দুটো ষণ্ডা মতো লোক যাকে আক্রমণ করল সেই লোকটা এদের থেকেও ক্ষিপ্র। এই লোকদুটোকে ক্যারাটের প্যাঁচে ধরাশায়ী করতে পাঁচ সেকেন্ড সময় লাগল না তার। লোক দুটো হাত-পা মচকে পড়ে রইল রাস্তার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে চোখের নিমেষে আগের লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেল কুয়াশা ঢাকা রাস্তায়। অর্ণব ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল পড়ে থাকা লোক দুটোর দিকে। তারা আস্তে আস্তে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে যে দিক দিয়ে এসেছিল, সেদিকেই চলে গেল তারা।
কিছুক্ষণ স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অর্ণব। ভাবার চেষ্টা করছিল, কী হল ব্যাপারটা! সে নিজেও ক্যারাটে শেখে। যদিও এখন সবে তার ইয়েলো বেল্ট। কিন্তু চোখের পলক পড়ার আগে যেভাবে দুটো গাঁট্টাগোট্টা লোককে ধরাশায়ী হতে দেখল তাতে ধাতস্থ হতে সময় লাগল ওর। কে এই কুংফু ম্যান?
হাঁটতে হাঁটতে ম্যালে এসে অনেক লোকজন দেখে বুকের ধুকপুকুনিটা ওর কমল। একটা বেঞ্চে বসার মতো জায়গা পেয়ে একটু ভালো লাগল তার। সামনে একদল কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়ে গোল হয়ে ঘিরে গিটার বাজিয়ে গান করছে। কান খাড়া করে শুনল। নেপালি ভাষার গান। সুরটা বেশ ভালো।
অনেকক্ষণ সেখানেই চুপ করে বসে রইল অর্ণব। চারপাশে কত লোকজন নিজের মতো করে আনন্দ করছে। কেউ বেলুন কিনছে, কেউ আইসক্রিম খাচ্ছে, কেউ ঘোড়ায় চড়ছে, বেশ কিছু মহিলা মোবাইল হাতে রিলস বানাচ্ছে অথবা ছবি তুলতে ব্যস্ত।
হঠাৎ ফোয়ারার কাছে কালো লেদারের জ্যাকেট পরা সেই ষণ্ডামতো লোক দুটোকে আবার দেখতে পেল অর্ণব। দূর থেকে মনে হল ওরা যেন কারো সঙ্গে কথা বলছে। দু-তিনটে ঘোড়া এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে সামনে। তাই এত দূর থেকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সে।
বেঞ্চ থেকে উঠে হাঁটতে শুরু করল অর্ণব। ফোয়ারার সামনে ঘোড়াগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। লোকদুটো ওর দিকে পেছন করে তিনজন পুলিশের ইউনিফর্ম পরা লোকের সঙ্গে কথা বলছে। অর্ণব অন্য বাচ্চাদের তুলনায় একটু লম্বা হলেও বয়েস কম। ঘোড়া দেখার অজুহাতে ওদের আশেপাশে কিছুক্ষণ ট্যুরিস্ট সেজে ঘুরে বেড়াল সে। তবে লোকগুলো অর্ণবকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলে চলেছে। কান খাড়া করে রাখল অর্ণব।
“কী যেন নাম বললে লোকটার?”
“পেম্বা তামাং।”
“লোকটা থাকে কোথায়?”
“দার্জিলিং-এ থাকে না, সে বিষয়ে নিশ্চিত। কার্শিয়াং বা কালিম্পং-এ থাকতে পারে। না হলে দূরে পাহাড়ি কোনো ছোটো গ্রামে।”
“এমনও তো হতে পারে, যে লোকটা ভারতেই থাকে না! হয়তো নেপালে থাকে। সীমানা পেরিয়ে যাতায়াত করে।”
“হ্যাঁ, হতেই পারে। নেপাল সীমানাতো খুব কাছেই। যাতায়াত করা খুব কঠিন কাজ কিছু নয়।”
“সীমান্তের গোয়েন্দাপুলিশের কাছে খবর পাঠাও। চোখ-কান খোলা রাখতে বলো। কার্শিয়াং, কালিম্পং-এর ডিএসপি-দের খবর দাও। লোকটাকে যে ভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে।”
“কী ব্যাপার বলো তো? কে এই পেম্বা তামাং? তোমরা এর পেছনে এমন হন্যে হয়ে ঘুরছ কেন?”
“আইজি সাহেবের আদেশ। লোকটাকে গত দশ বছর ধরে খোঁজা হচ্ছে। বার বার নাম পালটে জায়গা বদলে গা ঢাকা দিচ্ছে। কিছুতেই বাগে পাওয়া যাচ্ছে না। একজন লোকাল ইনফর্মারের কাছ খবর পেয়েছিলাম, পেম্বা তামাং আজকে বিকালে মহাকাল মন্দিরে আসবে। তবে জানতাম না লোকটার গায়ে অসুরের মতো শক্তি। আমাদের মতো দুজন স্পেশাল ফোর্সের লোককে চোখের নিমেষে ঘায়েল করে পালিয়ে গেল!”
“পেম্বা তামাং কি ওর আসল নাম নয়?”
“না। লোকটার অনেকগুলো নামের মধ্যে এটা একটা।”
“হুঁ। সন্ত্রাসবাদী? নাকি ভয়ানক কোনো অপরাধ…”
লোকগুলো কথা বলতে বলতে চকবাজারের রাস্তায় নেমে গেল। আলোচনাটা খুব ইন্টারেস্টিং চলছিল। গোগ্রাসে গিলছিল অর্ণব। কিন্তু সাহস করে ওদের পেছনে যেতে পারল না। যদি ধরা পড়ে যায়, এই ভয়ে ফিরে এসে গোল্ডেন লিপসের সামনের বেঞ্চে বসে পড়ল সে। বাবা-মার আসার সময়ও হয়ে গেছে। কিন্তু চোখের সামনে বারংবার ভেসে উঠছে ঘন কুয়াশার মধ্যে সেই ছিপছিপে লম্বা মানুষটার আবছা অবয়ব। কী অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় শক্তিমান দুই লোককে পরপর শূন্যে তুলে আছাড় মারল। ভয়ানক লোক!
“কিরে! কী ভাবছিস? কখন থেকে ডাকছি তোকে।”
অর্ণব চমকে উঠে দেখল মা দাঁড়িয়ে আছে পেছনে। বেঞ্চ ছেড়ে তিনজনে মিলে চকবাজারের জমজমাট রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওরা ক্যাভেন্টারসের রুফটপ ক্যাফেতে গিয়ে বসল। পুষ্পিতা অবশ্য এই রাস্তা দিয়ে আসতে আসতেই অনেক কেনাকাটা করে নিয়েছে। অর্ণবের বাবা রঞ্জন অর্ডার দিল, “আমার জন্য একটা কালো কফি চিনি ছাড়া। …তোমরা কী নেবে?”
অর্ণব খুঁটিয়ে মেনুকার্ডে চোখ বুলিয়ে জানাল, “আমি নেব মিল্ক চকোলেট শেক।” পুষ্পিতা বলল, “আমি নেব মকাইবাড়ি দার্জিলিং চা, দুধ ছাড়া।”
রঞ্জন ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে যাচ্ছে ক্রমাগত। পুষ্পিতা চারপাশে তাকিয়ে মন্তব্য করল, “আগের বারে যখন দার্জিলিং এসেছিলাম, এত ঘিঞ্জি ছিল না।” রঞ্জন বলল, “ঠিক, তবে এই মেঘ-রোদ্দুরের খেলাটা ক্যামেরাতে দারুণ ধরা পড়ছে। কালকে আমরা লামাহাটা হয়ে কালিম্পং যাব। সেই ডেলো পাহাড়ের কথা তোমার মনে আছে?”
একগাল হি-হি করে হেসে পুষ্পিতা বলল, “সে আবার মনে নেই! প্যারাগ্লাইডিং করতে গিয়ে গাছের ওপরে আটকে গিয়েছিলে তুমি…”
“সেটা আমার দোষ ছিল না মোটেই। সঙ্গের ট্রেনারটা নতুন ছিল। গড়বড় সে করেছিল।”
“তুমি যেখানেই যাও, কিছু না কিছু গড়বড় হয়। এবারে আবার কী হয় দেখো!”
মিল্ক চকোলেট শেক এসে গেছে। অর্ণব সেটাতে চুমুক দিতেই তার মুখে একটা তৃপ্তি ফুটে উঠল। সে জিজ্ঞেস করল, “কালিম্পঙে কালকের লাঞ্চটা ভালো জায়গায় করতে হবে।”
“ওখানে খাঁটি চাইনিজরেস্তোরাঁ পাওয়া যাবে। কিন্তু সেখানে চপস্টিক দিয়ে খেতে হবে, মনে রাখিস।”
“কুছ পরোয়া নেহি, দারুণ হবে! চপস্টিক দিয়ে খাওয়া তো আমার স্বপ্ন!”
পরেরদিন অর্ণবরা জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ল সকাল সকাল। ‘মেঘবালিকা’র পের্টিকোর মধ্যেই গাড়ি চলে আসে। এটা একটা খুব ভালো সুবিধা। গাড়িতে উঠেই নেপালি ড্রাইভারের সঙ্গে পরিচয় হল অর্ণবের, নাম অনিল শ্রেষ্ঠা। তিনি আজকের সারাদিনের পোগ্রাম জানিয়ে দিলেন, “এখান থেকে আমরা প্রথমে যাব লামাহাটা ইকোপার্ক। তারপর পেশোক টি-গার্ডেন, ডেলো পাহাড়, গ্রাহাম্স হোম, পাইন ভিউ নার্সারি, দুরপিন মনাস্ট্রি, মরগ্যান হাউস দেখে সন্ধ্যায় ব্যাক।”
“দুপুরের খানা কোথায় হবে?” ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে সিটবেল্ট আটকে অর্ণবের প্রথম প্রশ্ন, “ভালো চাইনিজরেস্তোরাঁ আছে তো?”
ছোটোখাটো চেহারার অনিল হেসে উত্তর দিল, “চাইনিজ তো কলকাতায় অনেক খেয়েছ, তোমাকে আমি একটা ভালো তিব্বতিরেস্তোরাঁতে নিয়ে যাব। তিব্বতি মোমো আর থুকপা খেয়ে দেখবে আজ।” নতুন খাবারের নাম শুনেই জিবে জল চলে এল অর্ণবের।
ঘুম স্টেশন থেকে ডানদিকে বেঁকে লামাহাটা পৌঁছাতে ঘণ্টাখানেক লাগল। রাস্তার গায়েই পাইনগাছের জঙ্গল। ঘড়িতে এখন সবে সকাল আটটা। ট্যুরিস্টদের গাড়িগুলো এখনও এসে পৌঁছায়নি দার্জিলিং থেকে। আকাশ ছোঁয়া লম্বা লম্বা পাইনগাছেরা কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে যেন এখনও ঘুমাচ্ছে। পাখিদের কিচিরমিচির শুনতে শুনতে অর্ণব এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে। মন্ত্রলেখা রঙিন কাপড়ের পতাকাগুলো উড়ছে পতপত করে। সামনেই সুন্দর ফুলের বাগান। কত রকমের ফুল ফুটে রয়েছে সেখানে। পাশ দিয়ে সিঁড়ি চলে গেছে ওপরে মেঘে ঢাকা পাইনবনের দিকে। একটা কাঠের বড়ো হলুদ রঙের ওয়াচটাওয়ার দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে।
কিছুক্ষণ অবাক হয়ে অর্ণব তাকিয়ে রইল সেইদিকে। ওর সামনে যেন বিশাল একটা রূপকথার পটভূমি। ওকে দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে। এক পশলা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়ে গেল গায়ের ওপর। টুপি, জ্যাকেট, মাফলার ভিজে গেল। ভেজা পাথরের সিঁড়ি দিয়ে অর্ণব ওপরে উঠছে। কেউ কোথাও নেই। পেছন ফিরে দেখল, মা কিছুটা উঠেই বসে পড়েছে কাঠের বেঞ্চে আর বাবা ছবি তুলতে ব্যস্ত।
অর্ণব একাই পাইনবনের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের ওপরের দিকে উঠে এল। লম্বালম্বা গাছেদের নীচ দিয়ে লুকোচুরি খেলে একা হারিয়ে যেতে ভালো লাগছে খুব। পাথরের গায়ে বিভিন্ন রকমের ফার্ণ এবং অর্কিড ঝাঁক বেঁধে রয়েছে। সেখানে ছোটো ছোটো সাদা সাদা ফুলের মেলা। একটু একটু করে উঠে নির্জন পাইন বনের একদম মাথায় উঠে এসেছে অর্ণব। সেখান থেকে বাবা-মাকেও আর দেখা যাচ্ছে না। আবার এক ঝাঁক জলভরা মেঘ এসে ঘিরে ধরল ওকে। ঠান্ডায় গা’টা শিরশির করে উঠল।
আচমকা একটা গোঙানি কানে এল অর্ণবের। “আ…আ…আ…”
তারপরেই কিছুটা দূরে একটা মোটা পাইনগাছের গোড়ায় চোখে পড়ল এক জোড়া জুতো পরা পা। কেউ ওখানে চিত হয়ে শুয়ে আছে। শব্দটা আসছে ওদিক থেকেই।
অর্ণব এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল ঐ দিকে। ঝোপের আড়ালে একজন কালো চামড়ার জ্যাকেটপরা লোক বুকে হাত দিয়ে শুয়ে আছে। আর একটু এগিয়ে গিয়ে মাথা নিচু করে অর্ণব বুঝতে পারল জ্যাকেটের ভেতরে লোকটার জামা ভিজে গেছে রক্তে। শুধু প্রাণটাই ধুকপুক করছে তার।
দৃশ্যটা দেখেই সারা শরীর শক্ত হয়ে গেল অর্ণবের। হাত-পা পাথরের মতো হয়ে গেছে মুহূর্তের মধ্যে। মাথার ওপর দিয়ে একটা পাহাড়ি টিয়া চিৎকার করে উড়ে গেল।
সম্বিৎ ফিরে পেল অর্ণব। তাড়াতাড়িপেছন ফিরে জায়গাটা ছেড়ে চলে আসতে যাচ্ছিল সে। কিন্তু একটা আওয়াজ শুনে আবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। “পানি… পানি… পানি…”
লোকটা যেই হোক, মৃত্যুপথযাত্রী হয়তো… জল চাইছে! অর্ণবের পিঠের ব্যাগে জল আছে। এই নির্জন পাইনবনে, যেখানে কেউ কোথাও নেই, আহত মানুষটি জল চাইছে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মারা যাবে। অর্ণব সেখান থেকে নেমে আসতে গিয়েও পারল না। মনে মধ্যে কোথাও একটা খচখচ করছে। পিঠের ব্যাগের চেন খুলে জলের বোতলটা বের করে নিল অর্ণব। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল অচেনা সেই লোকটার দিকে। মাথার পাশে গিয়ে বসল হাঁটু মুড়ে। জলের বোতলের ঢাকনা খুলে গালে জল দিল। লোকটা আধখোলা চোখে তাকিয়ে ছিল অর্ণবের দিকে। অর্ণব লক্ষ্য করল ব্যক্তিটি না বাঙালি- না নেপালি। বেশ লম্বা, সুগঠিত চেহারা, উজ্জ্বল গায়ের রং, দাড়িগোঁফ কামানো। পোশাক-আশাকের মধ্যে একটা আভিজাত্য আছে। প্রচুর রক্ত বেরিয়েছে লোকটার শরীর থেকে। জ্যাকেট ফুঁড়ে পাথুরে জমি অনেকটা ভিজে কালো হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে বহুক্ষণ এখানে পড়ে আছে লোকটা।
শান্ত হয়ে অর্ণবের বোতল থেকে অনেকটা জল খেল সে। তারপর মুখ দিয়ে অস্পষ্টভাবে কিছু বলার চেষ্টা করল অর্ণবকে। কান পেতে অর্ণব শোনার চেষ্টা করল। “২… ৩… ৫… ৮… ১৩… ২১…” এটা কী কোনো কোড?
অর্ণব কিছু বুঝতে পারার আগেই লোকটা হঠাৎ করে কাঁপা কাঁপা হাতে অর্ণবের ডানহাতটা চেপে ধরল। ধরতেই ঝিনঝিন করে উঠল তার হাতটা। লোকটার হাতে পিনের মতো কিছু একটা ছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে গেল ঘটনাগুলো। তারপরেই হাতটা ছেড়ে দিয়ে লোকটা ঢলে পড়ল। মরে গেল নাকি?অর্ণব ভয় পেয়ে দ্রুত সরে এল জায়গাটা থেকে।
পাইনের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে অর্ণব যখন তরতর করে নামছে, দেখল সেই রাস্তা দিয়েই ওপরে উঠে আসছে পাঁচ-সাতজন পুলিশ। অর্ণব মাথা নীচু করে সরু রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াল একটু।
পুলিশগুলো হুড়মুড় করে উঠে গেল ওপরে। এদের মধ্যে দু’জন লোককে চিনতে পেরেছে সে। ওরা দুজনে ম্যালের পেছনে সেই লোকটার হাতে মার খেয়েছিল। তাহলে কি ওপরে পাইনবনের মধ্যে পড়ে থাকা লোকটাই গতকালকের সেই ম্যালের পেছনে মহাকাল মন্দিরের নীচে কুয়াশার মধ্যে দেখা কুংফু ম্যান? কিন্তু লোকটাকে মারল কে? লোকটা কি সত্যিই অপরাধী?
নীচে ফুলগাছের বাগানে বাবা-মাকে দেখতে পেয়ে অর্ণবের যেন ধড়ে প্রাণ এল। মা বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ফুলের সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত। কিন্তু ওর মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে, গা’টা গুলাচ্ছে!! এই জায়গাতে আর এক মুহূর্ত থাকতে ইচ্ছা করছে না ওর। তাড়াতাড়ি নীচে নেমে কাঠের গোল রেস্টরুমে ঢুকে বসে পড়ল অর্ণব। বোতল খুলে জল খেল অনেকটা। তারপর মাকে ডেকে বলল, “এখানে আমার আর ভালো লাগছে না। পরের স্পট টি-গার্ডেন না হলে ডেলো পাহাড়ে চলো।”
“তোর শরীর ঠিক আছে তো? তোকে এরকম অস্থির লাগছে কেন?”
“তেমন কিছু নয়, তবে.. এই জায়গাটা আমার আর ভালো লাগছে না। চলো তাড়াতাড়ি।”
অর্ণব আর বেশি কথা না বাড়িয়ে সোজা গাড়ির সামনে চলে এল। কিন্তু ড্রাইভার অনিলকে খুঁজে পাওয়া গেল না। পাশে দু-তিনটে পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। রঞ্জন অনিলকে ফোন করতে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই চলে এল সে। অনিল গাড়ি স্টার্ট দিয়ে জানাল, “আপনারা তাড়াতাড়ি নেমে এসে ভালো করেছেন। শুনলাম ওপরে নাকি একটা সন্ত্রাসবাদীর মৃতদেহ পাওয়া গেছে। গতকাল রাতে পেছনের পাহাড়ি একটা গ্রাম ঘিরে ফেলেছিল পুলিশ। সারারাত গুলির লড়াই চলেছে। তবু ধরতে পারেনি তাকে। এখন নাকি লোকটার লাশ পাওয়া গেছে ওপরের জঙ্গলে।”
অর্ণব চুপ করে রইল কথাটা শুনে। পুষ্পিতা শুনে হাঁউমাউ করে উঠল, “তুই তো একা গিয়েছিলি ওপরে, কিছু দেখতে পাসনি?”
মায়ের প্রশ্নের উত্তরে অর্ণব শুধু মাথা নেড়ে বাইরের দিকে তাকাল। পাহাড়ের গা দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ি ছুটছে। মাথার ঝিমঝিমানিটা কিছুটা কমেছে অর্ণবের। কিন্তু এখনও চোখ বন্ধ করলে সেই লোকটাকেই দেখতে পাচ্ছে চোখের সামনে। রঞ্জন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অনিলকে জিজ্ঞেস করল, “এখানে সন্ত্রাসবাদীরা আছে?”
সে উত্তর দিল, “কাছেই নেপাল বর্ডার। হয়ত ওদিক থেকে পাহাড় টপকে চলে এসেছে এদিকে। শিলিগুড়ি করিডোর, চিকেন নেকের ওপর শত্রু দেশগুলোর নজর পড়েছে এখন। অনেক কিছুই হতে পারে। শুনলাম যে মারা গেছে তার নাম পেম্বা তামাং। পুলিশ নাকি অনেকদিন থেকে খুঁজছিল একে।”
নামটা শুনেই চমকে উঠল অর্ণব। তারমানে ম্যালের পেছনে কুয়াশার মধ্যে দেখা সেই লোকটা! আশ্চর্য! আজকে সে খুব কাছ থেকে দেখেছে লোকটাকে। দেখে পাহাড়ি লোক বলে তো মনে হয়নি। লোকটা ওর চোখের সামনেই মারা গেল কিছুক্ষণ আগে। তাকে দেখে সন্ত্রাসবাদী বলেও মনে হয়নি একদম।
এরপরের ঘটনা ঘটল ডেলো পাহাড়ে। চা বাগান ঘুরে ওরা যখন ডেলো পাহাড়ে পৌঁছাল, সূর্য মাথার ওপরে। তবে আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক। টুকরো টুকরো মেঘ ভেসে যাচ্ছে গায়ের ওপর দিয়ে। ডেলো পাহাড়ের বাংলোর চৌহদ্দিতে ঢুকতেই মনটা ভালো হয়ে গেল অর্ণবের। সুন্দর পিচঢালা রাস্তার দু দিকে ফুলের বাগান। কত বিচিত্র রঙের ফুল ফুটে রয়েছে সেখানে। রঞ্জন ক্যামেরা হাতে ক্রমাগত ছবি তুলে যাচ্ছে। বাংলোর পাশে বড়ো মাঠ। অনেকে ঘোড়া চড়ছে সেখানে। মাঠের পরে রডোডেনড্রনের জঙ্গল। সেখানে প্যারাগ্লাইডিং হচ্ছে।
সেখান থেকে বেরিয়ে ওরা যখন অনিলের গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে, অর্ণব লক্ষ করল একটা সাদা স্করপিও দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা দূরে। এই গাড়িটাকে সে মনে হয় লামাহাটার নীচের পার্কিং-এও দেখেছে। কারণ গাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সানগ্লাস পরা লোক দুটো তাকিয়ে আছে ওর দিকেই। ম্যালেও এই লোকগুলোকেই দেখেছিল অর্ণব। কিন্তু ওরা এখানে কেন? লামাহাটার ঘটনায় কি ওরা অর্ণবকে সন্দেহ করছে? এ কথাটা মাথায় আসতেই ওর হাত-পা যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।
দুপুরের খাবারের জন্য অনিল একটা তিব্বতি জাখাং অর্থাৎ রেস্তোরাঁতে নিয়ে গিয়ে হাজির হল। ভেতরে হালকা আওয়াজে তিব্বতি ভজন চলছে। পরিবেশটা খুব সুন্দর। অন্যান্য সময়ে এরকম জায়গাতে এলেই খিদেটা দ্বিগুণ হয়ে চাগাড় দেয় অর্ণবের। কিন্তু এখানে এসে মনে হল তার খিদেটা উবে গেছে। সেই সাদা স্করপিওটা যে ওদের পিছু নিয়েছে, সে বিষয়ে ওর এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ও তো কিছুই করেনি। শুধু মৃত্যুপথযাত্রী এক মুমূর্ষু মানুষের মুখে জল দিয়েছিল। একে কি কোনো অপরাধ বলা চলে?
খাওয়া সেরে ওরা নার্সারিতে ক্যাকটাস আর অর্কিড দেখতেগেল। অর্ণবের মায়ের এই বিষয়ে প্রবল আগ্রহ। অতএব বেশ কিছু ক্যাকটাসের নমুনা সংগ্রহ করে পুষ্পিতা ব্যাগে পুরে নিল ঝপাঝপ।
রঞ্জন অবশ্য বারবার বলছিল, “কালিম্পঙয়ের ঠান্ডা থেকে এদের কলকাতার গরমে নিয়ে গেলে একটাও বাঁচবে না।” কিন্তু কে শোনে তার কথা!
দার্জিলিং ফেরার আগেই সন্ধ্যা নামল। পথে ঘন কুয়াশায় পাহাড় জঙ্গল আর রাস্তা মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। গাড়ির হলুদ ফগ লাইট জ্বেলেও লাভ হচ্ছে না বিশেষ। পাহাড়ি রাস্তার ভয়ঙ্কর বাঁকগুলোয় কীভাবে যে গাড়ি ঘুরছে, সেটা অনিলের হাতের কারসাজি, না ম্যাজিক ঠিক বুঝতে পারছে না অর্ণব। তবে রাস্তাটা একদম ফাঁকা, শুনশান। উলটোদিক থেকে গাড়িও আসছে খুব কম। সামনে কাচের ওপর ওয়াইপার চলছে টানা। কারণ রাশি রাশি গুঁড়োগুঁড়ো জলকণা কুয়াশার মধ্যে দিয়ে এসে ঘিরে ধরছে প্রতি মুহূর্তে। অন্ধকার রাস্তায় বাঁক নেওয়ার সময়ে দমবন্ধ হয়ে আসছে সবার। তার মধ্যে অনিল শুরু করেছে ভূতের গল্প। এই রাস্তায় নাকি যত দুর্ঘটনা হয়ে মানুষ মারা গেছে তাদের আত্মারা এখনও ঘুরে বেড়ায় এখানে। এরকম অন্ধকারের মধ্যে তারা নাকি মাঝে মধ্যে গাড়িতে উঠতেও চায়। গল্পগুলো গাঁজাখুরি হলেও এই অদ্ভুত পরিবেশের জন্য শুনে বেশ অস্বস্তিই লাগছে।
আচমকা অনিল ব্রেক কষল। গাড়ির হেডলাইটে সামনে দেখা গেল সাদা মতো কিছু একটা নড়ছে। কাছে গিয়ে বোঝা গেল একজন লম্বা সাদা উইন্ডচিটার পরা লোক লিফট চাইছে। মাঝবয়সি লোকটা খুব বিনয়ের সঙ্গে ঝরঝরে ইংরাজিতে বললেন, “আমি কালিম্পং থেকে ফিরছিলাম। মাঝরাস্তায় গাড়িটা খারাপ হয়ে গেছে। আপাতত ঘুম পর্যন্ত যদি আমাকে লিফট দেন তো খুব উপকার হবে। অবশ্যই যদি আপনাদের কোনো অসুবিধা না হয়।”
ওর পেছনে রাস্তার পাশে সাইড করা অ্যাম্বাসেডার গাড়িটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে রঞ্জন এককথায় রাজি হয়ে গেল, “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমরা তো ঘুম হয়েই দার্জিলিং ফিরব। গাড়িতে জায়গা আছে। আপনি উঠে পড়ুন।”
অনিলের মনেহয় ব্যাপারটায় খুব একটা সম্মতি ছিল না। তবু রঞ্জনের কথায় সে ইনোভা গাড়ির পেছনের গেট খুলে তুলে নিল ভদ্রলোককে। তিনি বসলেন অর্ণবের পাশে। গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। অর্ণব বারবার আড়চোখে লক্ষ্য করছিল তাঁকে। চোখে একটা মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। মাথায় চেক চেক গল্ফ্ ক্যাপ। সাদা ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। শক্ত চোয়াল। পরনে জিন্সের প্যান্ট, হাফ সোয়েটারের ওপরে সাদা উইন্ডচিটার। গা থেকে ডিজেলের গন্ধ ছাড়ছে। রঞ্জন জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি এখানেই থাকেন?”
“হ্যাঁ, আপাতত আমি এখানেই আছি। কালিম্পঙয়ে আমার একটা নার্সারি আছে।”
“তারমানে আপনি এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নন?”
“না, আমার জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে বিদেশে। এক সময়ে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি সমুদ্রবিজ্ঞান পড়াতাম।”
“বাহ! সমুদ্রবিজ্ঞানী, কিন্তু পাহাড়ে বাস করেন! আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে খুব ভালো লাগল প্রফেসার। আমার নাম রঞ্জন বিশ্বাস। কলকাতায় আমার একটা আমদানি- রপ্তানির ব্যাবসা আছে। তিন-চারদিনের ছুটিতে দার্জিলিং বেড়াতে এসেছিলাম। কালকেই ফিরছি আমরা। ইনি আমার স্ত্রী পুষ্পিতা আর পুত্র অর্ণব।”
“নমস্কার! আমার নাম অরিন্দম রুদ্রপ্রসাদ। আপনার পুত্রটি বেশ চালাক চতুর। খুব ভালো লাগল আপনাদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে।”
ঘুম স্টেশনের কাছে নেমে গেলেন ভদ্রলোক। তারপর অর্ণব মন্তব্য করল, “হাতে-পায়ে কালো কালো কী সব লেগেছিল ওনার।”
রঞ্জন বলল, “গাড়ির কারবুরেটর খারাপ হয়ে গেছে। ভদ্রলোক অনেকক্ষণ চেষ্টা করেছেন ঠিক করার। কিন্তু পারেননি। নব্বইয়ের দশকের পুরানো অ্যাম্বাসাডার নিয়ে কেউ পাহাড়ে ঘোরে?”
পরের দিন ‘মেঘবালিকা’ থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ল ওরা বাগডোগরার উদ্দেশ্যে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা হয়েই যাচ্ছে। দুপুরের ফ্লাইট। তবু হাতে কিছুটা সময় নিয়েই বেরিয়েছিল অর্ণবরা। পুষ্পিতা আপশোশ করছে, “আর ক’দিন থাকতে পারলে ভালো হত। ছুটিটা যেন ঝড়ের বেগে শেষ হয়ে গেল!” অর্ণবের চোখ ঘুরছে এদিক ওদিক। আজকে আর সেই গাড়িটাকে দেখতে পাচ্ছে না পেছনে। তাহলে কি ওর মনের ভুল? কিন্তু লোক দুটোকে মরগ্যান হাউসের কাছেও দেখেছে ও। অনিল হঠাৎ জানাল, “কালকে রাতে আমরা যে রাস্তায় কালিম্পং থেকে ফিরলাম সেখানে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। কুয়াশার মধ্যে একটা সাদা স্করপিও বাঁকের মুখে গভীর খাদে পড়ে মারা গেছে দু’জন।”
“সেকি!” পুষ্পিতা আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করল, “ট্যুরিস্ট ছিল?”
“না, ট্যুরিস্ট নয়। শুনলাম ওটা ছিল পুলিশের গাড়ি।”
কথাটা কানে যেতেই অর্ণবের শরীর যেন শক্ত হয়ে গেল পাথরের মতো। সেই লোকদুটোই কি মারা গেল নাকি? ব্যাপারটা কেমন যেন ঘোরালো হয়ে উঠছে ক্রমশ।
গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ
গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের উত্তরপূর্ব প্রান্তে পাপুয়া নিউগিনির কাছে ‘ওশানস্পিরিট’ নামে জাহাজটি ভাসছিল। ঘড়িতে সবে তখন সকাল সাড়ে ছ’টা। পূর্ব আকাশে সূর্যের আলো ফুটলেও সমুদ্রের নীল জল এখনও যেন রহস্যের চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। সাদা সিগাল পাখিদের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে জাহাজের কাছে। ডেকের ওপর সাজানো রয়েছে ডাইভিং সরঞ্জামগুলো। অনিরুদ্ধ তার যন্ত্রপাতিগুলো পরীক্ষা করছিল। মেরিন বায়োলজিস্ট ডঃ সেরিনা হাতে একটা ওয়াটারপ্রুফ ডেটা ট্যাবলেট নিয়ে শেষবারের মতো পুরো পরিকল্পনাটা যাচাই করেনিচ্ছিলেন ডেকের ওপরে দাঁড়িয়ে। তিনি অনিরুদ্ধকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মহাকাশ থেকেও দেখা যায় এই গ্রেট ব্যারিয়ার রিফকে। দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৩০০ কিলোমিটার। আনুমানিক ন’শোটা দ্বীপ মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলে ৩৪ লাখ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিশ্বের সব থেকে বড়ো এই প্রবাল সাম্রাজ্য।”

ট্যাবটা সাইড ব্যাগে পুরে নিয়ে সেরিনা এবারে জিজ্ঞেস করলেন, “অনিরুদ্ধ, তোমার সিলিন্ডারের চাপ কত দেখাচ্ছে?”
অনিরুদ্ধ গেজের দিকে তাকিয়ে জানালেন, “তিন হাজার পিএসআই।”
“তার মানে আজকের জন্য যথেষ্ট।”
“আমি কিন্তু এই দ্বিতীয়বার স্কুবাড্রাইভে যাব।”
সেরিনা হাসলেন, “আগে যখন একবার করেছো, তাহলে তো ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। শুধু সরঞ্জামগুলো আরেকবার দেখে নাও ভালো করে।” তিনি নিজের পিঠের সিলিন্ডারটিতে হাত রেখে বললেন, “এটাই হচ্ছে স্কুবাট্যাঙ্ক। এর মধ্যে সংকুচিত বাতাস ভরা থাকে। আমরা জলের নীচে এই বাতাস থেকেই শ্বাস নেব। অনেকেই ভাবেন এর মধ্যে পুরোটাই অক্সিজেন ভরা থাকে। আসলে এটার মধ্যে মাত্র ২২ শতাংশ অক্সিজেন আর ৭৮ শতাংশ নাইট্রোজেন আছে।” এরপর তিনি মুখের রেগুলেটরটি দেখালেন, “এটা ট্যাঙ্কের ভেতরের উচ্চচাপের বাতাসকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যাতে আমরা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারি।” তারপর সেরিনা তাঁর জ্যাকেটের মতো পোশাকটির দিকে ইঙ্গিত করলেন। “এটা হলো বিসিডি বা ব্যুয়োন্সি কন্ট্রোল ডিভাইস। এর মধ্যে বাতাস ভরে বা বের করে আমরা জলের মধ্যে ভাসব না ডুবব সেটা নিয়ন্ত্রণ করি।”
এরপর দুজনেই ডেকে দাঁড়িয়ে পরে নিল রবারের কালো রঙের ওয়েটস্যুট দুটো। সেরিনা অনিরুদ্ধর কোমরে বাঁধা সীসার বেল্টটা দেখিয়ে বললেন, “এটা হল ওয়েটবেল্ট। মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবে জলে ভাসতে চায়। এই ওজন কোমরে বাঁধা না থাকলে জলের নীচে নামা কঠিন।” সেরিনা আরও জানালেন, “এই পোশাক শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখে। বিশেষ করে গভীর জলে যেখানে তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়।”
দুজনেই জলে নামার জন্য তৈরি হয়ে নিল। মুখে স্বচ্ছ কাচের মাস্ক, পায়ে লম্বা ফিন আর হাতে লাগানো ডাইভ কম্পিউটার। সেরিনা ডাইভ কম্পিউটারটির ডিসপ্লে দেখিয়ে অনিরুদ্ধকে জানালেন, “এটাই আমাদের জীবনরক্ষক। বুঝলে! গভীরতা, সময়, জলের তাপমাত্রা, নাইট্রোজেন স্যাচুরেশন, সব হিসাব এখানে দেখা যাবে। চলো এবার সমুদ্রে নামা যাক।”
“থ্রি… টু… ওয়ান…” জলের উলটো দিকে মুখ করে সেরিনা ছপাৎ করে জলে নেমে গেলেন। তারপর অনিরুদ্ধও ঝাঁপ দিল একইভাবে। প্রথম মুহূর্তেই যেন পৃথিবীটা বদলে গেল। জলের ভেতরে প্রবেশ করতেই মুছে গেল ওপরের দুনিয়ার সব শব্দ। কোনো যানবাহনের শব্দ নেই, মানুষের কোলাহল নেই, জন্তু জানোয়ার পাখিদের ডাক শোনা যাচ্ছে না। শুধু নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। হৃদপিণ্ডর ধুকপুক শব্দটাও পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে অনিরুদ্ধ। বুড়বুড় করে রেগুলেটরের মধ্য দিয়ে বাতাস বেরিয়ে বুদবুদের সারি হয়ে ওপরে উঠছে।
প্রথম দশমিটার পর্যন্ত চোখের সামনে স্বচ্ছ ছিল নীল জল। সূর্যের আলো সোনালি ফলার মতো জলের মধ্যে ঢুকছে সেখানে। কিছুটা নেমে সেরিনা ইশারা করতে অনিরুদ্ধ খেয়াল করল, তাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার ছোটো ছোটো মাছ। একটু পরেই তারা একদম গায়ের কাছে চলে এল। অনিরুদ্ধর কাছে এটা একদম নতুন অভিজ্ঞতা। সিলভার ফুসিলিয়ার মাছের ঝাঁক রূপোলি বিদ্যুতের মতো ছুটে চলেছে। তাদের পেছনে রয়েছে উজ্জ্বল হলুদ বাটারফ্লাই ফিশ আর নীল প্যারট ফিশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল কমলা সাদা ডোরাকাটা ক্লাউন মাছের ঝাঁক। সব মিলিয়ে যেন জীবন্ত রঙের মেলা। অনিরুদ্ধ নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। জলের মধ্যে শরীরটা ভীষণ হালকা লাগছে। সাঁতার কেটে এগোচ্ছে ওরা। সামনে দেখা যাচ্ছে প্রবাল নগরী।
কিছুটা নীচে নামতেই প্রবাল প্রাচীরের দেখা মিলল। বিস্ময়ে থমকে গেল অনিরুদ্ধ। মনে হচ্ছিল বিশাল
কোনো ডুবে যাওয়া রঙিন শহর। কোথাও গম্বুজ, কোথাও মিনার, কোথাও আবার প্রাসাদের দেয়ালের মতো উঁচু কাঠামো। ব্রেন প্রবালগুলো যেন বিশাল পাথরের মস্তিষ্ক। এতদিন ছবিতে আর বইয়ের পাতাতেই অনিরুদ্ধ দেখেছে এগুলো। স্ট্যাগহর্ন প্রবালগুলো দেখতে ঠিক যেন হরিণের শিংয়ের জঙ্গলের মতো। টেবিল প্রবালগুলো বিশাল ছাতার মতো ছড়িয়ে আছে উজ্জ্বল হলুদ রং গায়ে মেখে। তাদের মধ্যে প্রতিটি ফাঁকে ফাঁকে অগণিত প্রাণের বাস। কানে আসছে বিভিন্ন শব্দ।
সেরিনা ডেটা রেকর্ড করতে করতে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে বললেন, “জলের নীচে একটা অদ্ভুত সঙ্গীত শুনতে পাচ্ছ?”
অনিরুদ্ধ কান খাড়া করে শুনল। সত্যিই তো! টিক… টিক… ক্র্যাক… ক্র্যাক… ক্রিক… ক্রিক… আরো কত অসংখ্য ক্ষুদ্র শব্দ।
সেরিনা জানালেন, “এগুলো সব কাঁকড়া, চিংড়ি আর সীহর্সদের শব্দ।” অনিরুদ্ধ মাথা নাড়ল, “অদ্ভুত!”
“এই নীরব সমুদ্র আসলে সব সময়ে কিন্তু নীরব নয়।”
গভীরতা যখন চল্লিশ মিটার ছুঁলো, আলো অনেকটাই কমে গেল। নীল রং গাঢ় হয়ে কালচে নীলে পরিণত হচ্ছে ক্রমশ। তাপমাত্রাও কমতে শুরু করেছে। সমুদ্রের নীচেটা যেন অন্য এক জগৎ।
হঠাৎ সেরিনা স্থির হয়ে গেলেন। সামনে কালো নীল জলের মধ্যে থেকে ভেসে আসছে একটা বিশাল কালো ছায়া। ধীরে ধীরে সেটি স্পষ্ট হলো। একটা বিশাল ম্যান্টা রে। তার ডানার বিস্তার প্রায় সাত মিটার। পাখির মতো ডানা মেলে নিঃশব্দে ভেসে যাচ্ছে সামনে দিয়ে। সূর্যের শেষ আলো তার পিঠে পড়ে কালো মখমলের মতো ঝলমল করছে। অনিরুদ্ধ ফিসফিস করে বলল, “সমুদ্রের উড়ন্ত ঈগল।”
আরও একটু সাঁতার কেটে এগোতে ওরা পৌঁছে গেল এক প্রবাল উপত্যকায়। অবাক হয়ে অনিরুদ্ধ দেখছিল চারদিকে ফ্লুরোসেন্ট রং, নিয়ন সবুজ, উজ্জ্বল নীল, অগ্নি কমলা, বেগুনি, গোলাপি। অনিরুদ্ধ বিস্ময়ে বলল, “মনে হচ্ছে যেন কোনো শিল্পী সমুদ্রের নীচে বসে ছবি এঁকেছেন।”
প্রত্যুত্তরে সেরিনা মাথা নেড়ে অনেকটা বুড়বুড়ি ছেড়ে মন্তব্য করলেন, “প্রকৃতি নিজেই সব থেকে বড়ো শিল্পী।”
ওদের চোখের সামনে শুরু হল অদ্ভুত এক জাদু। হঠাৎ মেঘ এসে ওপরে সূর্য ঢেকে দিতেই চারপাশ আরও অন্ধকার হয়ে গেল। আর তখনই শুরু হলো আসল ম্যাজিক। কিছু প্রবাল নিজেরাই আলো ছড়াতে শুরু করল। নীল, সবুজ, জ্যোৎস্নার মতো সাদা, আলোকময় ক্ষুদ্র প্রাণীরা চারপাশে জ্বলে উঠল। মনে হচ্ছিল ওরা সমুদ্রের নীচে নয়, নক্ষত্রভরা মহাকাশের সামনে রয়েছে। সেরিনা ধীরে ধীরে বললেন, “এ কারণেই আমি গ্রেট ব্যারিয়ার রিফকে পৃথিবীর অজানা মহাদেশ বলি।” অনিরুদ্ধ হতবাক হয়ে উপলব্ধি করছিল সেই অবাক বিস্ময়।
আরও কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করার পর সেরিনা জানালেন, “এবার আমাদের ফিরতে হবে অনিরুদ্ধ। ওপরে মেঘ বেশ ঘন হয়ে উঠেছে। জাহাজ থেকে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে আমাকে। ঝড়বৃষ্টি শুরু হতে পারে। তবে যে বিশেষ প্রবালের খোঁজে আমি এখানে এসেছি, সে জিনিস এখানে নেই। যদিও এলাকাটা অনেক বড়ো। নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও তাকে খুঁজে পাব। সময় লাগবে। হয়ত কয়েক মাস, কিম্বা কয়েক বছর।”
‘ওশানস্পিরিট’ নীল জলের ওপরে ভাসছিল ওদের অপেক্ষায়। সাঁতার কেটে উঠে আসতে প্রায় মিনিট দশেক সময় লাগল ওদের। সমুদ্রের ওপরে তখন জোরে হাওয়া চলতে শুরু করেছে। ওরা দুজনে ডেকের ওপর উঠে পড়তেই গতি বাড়িয়ে বন্দরের দিকে ছুটতে শুরু করল জাহাজ। ঢেউয়ের চোটে স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না অনিরুদ্ধ। কোনো রকমে ওয়েটস্যুটটা খুলে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল সে।
সেরিনা হেসে প্রশ্ন করলেন, “প্রথমদিন জলের নীচে কেমন লাগল তোমার? শরীর ঠিক আছে তো?”
“জলের নীচে অসাধারণ লেগেছে। কিন্তু মাথাটা একটু ভারি হয়ে আছে আর এখন পেটের মধ্যে গুলাচ্ছে।”
“ও কিছু নয়, সামান্য মোশন সিকনেস। জাহাজটা খুব দুলছে তো তাই।”
কোমরে সিটবেল্ট লাগিয়ে চেয়ারের হাতল চেপে ধরে বসে রইল অনিরুদ্ধ। বাইরে ঝড় আর বৃষ্টি দুটোই শুরু হয়েছে দাপটের সঙ্গে। জাহাজ একবার সমুদ্রের পেটের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে, আবার ওপরে উঠছে। সেরিনা অভয় দিলেন, “ভয় পেওয়া, এ জাহাজ ডুববে না।” এ কথাটা না বললেও চলত। এসব আধুনিক জাহাজ এমন ভাবে তৈরি যে ছোটোখাটো ঝড় বা সামুদ্রিক তুফানে ডোবে না। ঢেউয়ের ঝাপটা অনবরত এসে লাগছিল জাহাজের জানালার বাইরে। অনিরুদ্ধ দাঁত চেপে তাকিয়ে ছিল সেই দিকেই। পোর্ট ডগলাস পৌঁছাতে আনুমানিক তিনঘণ্টা সময় লাগবে। আর এই ঝঞ্ঝা কতক্ষণ চলবে তার কোনো ঠিক নেই। কিছুক্ষণ পরে ধীরে ধীরে সয়ে গেল সমুদ্র অভিযানের জন্য তৈরি ‘ওশানস্পিরিট’- এর দুলুনি। একঘেয়ে দুলুনিতে তন্দ্রা এসে জড়িয়ে ধরছে ওর চোখে।
সমুদ্র ওকে বরাবরই ভীষণ আকর্ষণ করে। ছোটোবেলায় দাদু-ঠাকুমার সঙ্গে কতবার যে পুরী গেছে তার ইয়ত্তা নেই। যখনই ছুটি থাকত রাতের ট্রেনে উঠে সকালে ওরা পৌঁছে যেত পুরী। সেখানে সমুদ্রের পাড়ে ঘুরে বেড়াত সারাদিন। বালি দিয়ে ঘর বানাত। মাছ, পাখি, কচ্ছপ, ইগলু আরও কত কী যে বানিয়েছে! সেই সময় থেকেই মনে হয় সমুদ্র ওর রক্তে ঢুকে গেছে। কলকাতা থেকে মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করার পর গেল কোচিন বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে থেকে মেরিনবায়োলজি নিয়ে মাস্টার্স শেষ করে গবেষণা করার জন্য স্কলারশিপ পেল অস্ট্রেলিয়ায়। ব্রিসবেনে ইউনিভার্সিটি অফ কুইন্সল্যান্ডে পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে লাফিয়ে উঠেছিল অনিরুদ্ধ। নদীর ধারে একশো বছরেরও বেশি পুরানো ছবির মতো সুন্দর এই বিশ্ববিদ্যালয়। কিছুটা দূরেই অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমপাড়ে ব্রিসবেনের অসাধারণ সমুদ্র তট। নীল আকাশ আর নীল সমুদ্রের মাঝখানে সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাস চত্ত্বরে বেশ কাটছিল দিনগুলো। হঠাৎ একদিন অরিন্দমের গাইড ফিলিস স্যার ওকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, “ইনি হলেন ডক্টর সেরিনা উইঙ্কেল, আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসছেন। প্রবাল নিয়ে সারাবিশ্বে একটা গবেষণা চালাচ্ছেন ইনি। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের ওপর কাজ করার জন্য একজন সহকারী প্রয়োজন এনার। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র হিসেবে তোমার নাম সাজেস্ট করেছি।”
“আমি কৃতজ্ঞ। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ নিয়ে কাজ করা আমার স্বপ্ন।”
“বেশ, তাহলে গবেষণার বিষয়ে বিস্তারিত তুমি ম্যাডামের কাছ থেকে বুঝে নাও।”
এরপর ডঃ সেরিনার সঙ্গে অনিরুদ্ধর দীর্ঘ আলোচনা চলল। “গোড়া থেকেই শুরু করি। প্রবাল হল নিডারিয়া পর্বের অ্যান্থোজোয়া শ্রেণিভুক্ত সামুদ্রিক প্রাণী। এদের নিকটাত্মীয় হল সি অ্যানিমোন। এরা সি অ্যানিমোনেরমতোই পলিপ তৈরি করে, তবে সাধারণত এরা কলোনি তৈরি করে বসবাস করে। কলোনির সমস্ত পলিপ জিনগত ভাবে অভিন্ন হয়। এরা প্রাণী হলেও, জীবনের পূর্ণবয়ষ্ক অবস্থায় সাগরতলে কোনো দৃঢ় তলের ওপর শক্ত হয়ে বসে বাকি জীবন পার করে দেয় নিশ্চল হয়ে। প্রতিটি প্রবাল পলিপ যেখানে বসে থাকে সেখানে নিজের শরীরের চারপাশে ক্যালসিয়াম কার্বনেট নিঃসরণ করে। এর মাধ্যমে সে একটা শক্ত পাথুরে খোলস বা বহিঃকঙ্কাল তৈরি করে ফেলে। একটা প্রবাল পলিপের মৃত্যুর পরেও খোলসটি রয়ে যায়। এরকম প্রবালের দেহাবশেষের ওপর নতুন করে আবার প্রবাল বসতে পারে। এভাবে একটা কলোনি বহু প্রজন্ম ধরে চলার ফলে বড়োসড় পাথুরে আকৃতি ধারণ করে। এভাবেই তৈরি হয় বড়ো প্রবাল দ্বীপ এবং প্রবাল প্রাচীর। অস্ট্রেলিয়ার উত্তরপূর্ব সমুদ্রতটে গ্রেট ব্যারিয়ার দ্বীপপুঞ্জ এরকমই পৃথিবীর বৃহত্তম প্রবালপ্রাচীর।”
অনিরুদ্ধ জানালো, “এসব বিষয় নিয়ে তো আমার মোটামুটি পড়াশোনা করা আছে। কিন্তু আপনি ঠিক কোন বিষয় নিয়ে গবেষণা করছেন যদি বলেন।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সেরিনা উত্তর দিলেন, “আমরা প্রবালকে যে ভাবে দেখি, প্রবাল কিন্তু আদপে সেরকম নয়। প্রবাল হল আসলে একেকটা রঙিন খোলস। এর মধ্যে বসবাস করে কোটি কোটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী। কয়েক কোটি বছর ধরে এরা এমন কিছু জিনকে বয়ে নিয়ে চলেছে যেগুলো পরীক্ষা করলে আমরা পৃথিবীর জেনেটিক বিবর্তনের একটা নতুন ধারণা পেতে পারি। তবে আমার গবেষণার মূল বিষয় যদিও সেটা নয়।”
“তাহলে?”
“প্রায় বছর পাঁচেক আগে বেলিজ বেরিয়ার রিফে কয়েকজন সমুদ্রবিজ্ঞানী প্রবালদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত সাংঘাতিক কিছু খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁরা, যেটা আমাদের চেনা পৃথিবীর ধারণাটাই বদলে দিতে পারত।”
“কীরকম?”
“সমুদ্রের অতলে এই প্রবালদের মধ্যে যদি এমন কোনো প্রাণী লুকিয়ে থাকে যারা অন্য কোনো বিশ্ব থেকে এসেছে! হয়তো কয়েক কোটি বছর ধরে তারা চুপচাপ রয়ে গেছে সমুদ্রের নীচে! কিন্তু আমরা তাদের সম্পর্কে এখনও কিছুই জানি না।”
কথাগুলো শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিল অনিরুদ্ধ। তার সামনে তখন বিস্তৃত গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের অসীম নীল রাজ্য, যেখানে প্রতিটি প্রবাল, প্রতিটি মাছ, প্রতিটি বুদবুদ যেন এক ঘন রহস্যে মোড়া। গবেষণা জাহাজ ‘ওশানস্পিরিট’ তখন গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের উত্তর প্রান্তে নোঙর করল আজকে। আগের দিন সাবমার্সিবল অভিযানে এক অদ্ভুত ও সুন্দর প্রবাল প্রাচীর আবিষ্কার করেছিলেন অনিরুদ্ধ ও ডঃ সেরিনা। কিন্তু সেই বিশাল প্রাচীরের ভেতরে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে কিনা সেটা জানার জন্য এবার তাঁদের সরাসরি স্কুবা ডাইভিং করে সমুদ্রের নীচে যেতে হবে।
সকালের সূর্য তখন সাগরের জলে সোনালি আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার পরীক্ষা করতে করতে সেরিনা বললেন, “আজকে আমাদের লক্ষ্য আরও গভীরে যাওয়া। অচেনা কোনো প্রবাল দেখলেই তাদের নমুনা সংগ্রহ করতে হবে।”
অনিরুদ্ধ হেসে বলল, “আর যদি কোনো এলিয়েন প্রজাতি খুঁজে পাই?”
“তাহলে হয়তো সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে তোমার নাম লেখা হবে। কিন্তু খুব সাবধান।”
দুজনেই মুখোশ পরে ঝাঁপ দিলেন সমুদ্রে। জলের নীচে নামতেই চারপাশে অজস্র রঙিন প্রবালের বন। অনিরুদ্ধ একটি ডালপালার মতো প্রবাল দেখিয়ে বলল, “ওই যে, স্ট্যাগহর্ন প্রবাল।”
অনিরুদ্ধ দেখল, হাজার হাজার ছোটোমাছ তার ফাঁকে আশ্রয় নিয়েছে। আরও কিছু দূরে গিয়ে তাঁরা দেখলেন বিশাল গোলাকার প্রবাল। সেরিনা বললেন, “দেখতে ঠিক মানুষের মস্তিস্কের মতো বলে এর নাম ব্রেন প্রবাল।”
সত্যিই তার পৃষ্ঠে আঁকাবাঁকা খাঁজগুলো মস্তিষ্কের ভাঁজের মতো। সেরিনা জানালেন, “এরা কিন্তু কয়েকশো বছর বাঁচতে পারে।”
একটি ঢালের ধারে পৌঁছে তাঁরা দেখলেন স্তরে স্তরে সাজানো বিশাল চাকতির মতো উজ্জ্বল রঙের প্রবাল। “এগুলো হল প্লেট প্রবাল। সূর্যের আলো বেশি সংগ্রহ করার জন্য এমন চ্যাপ্টা গঠন এদের।” ব্যাখ্যা করলেন সেরিনা। তার ওপর অসংখ্য ছোটো ছোটো চিংড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরও গভীরে নেমে তাঁরা দেখতে পেলেন হাতের আঙুলের মতো উঠে থাকা প্রবালের ঝাড়। একটি সবুজ সি টার্টল ধীরে ধীরে ভেসে এল অনিরুদ্ধর দিকে। ফলে আচমকা ভয় পেয়ে সরে গেছে সে।
সেরিনা বললেন, “কোনো ভয় নেই।” কচ্ছপটি শান্তভাবে প্রবালের পাশ দিয়ে সাঁতার কেটে চলে গেল। সেরিনা জানালেন, “এরা হাজার হাজার কিলোমিটার সাঁতরে এখানে ডিম পাড়তে আসে। কিন্তু এই কচ্ছপটি একা এদিকে কোথায় যাচ্ছে! …চলো দেখি।”
কিছুটা এগোতেই শুরু হল মৃত প্রবালের প্রান্তর, কিছুক্ষণ পরে দৃশ্যটা বদলে গেল। রঙিন প্রবালের বদলে সাদা কঙ্কালের মতো বিস্তীর্ণ এলাকা। সেরিনার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
“ব্লিচিং!”
“হ্যাঁ।”
সাদা হয়ে যাওয়া প্রবালগুলো যেন মৃত শহর। আরও কিছুটা এগিয়ে সেরিনা আবার মুখ খুললেন, “সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়লে প্রবাল তাদের সহবাসী শৈবালরা মারা যায়। আর তখনই এমন সাদা হয়ে যায়। অনেক বছর নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে থাকার পর এরা কালো হয়ে যায়। ঐ যে ওদিকের অন্ধকার অংশটা দেখছ, ওখানে প্রবালগুলো সব কালো হয়ে গেছে।”
কচ্ছপটা সেদিকেই এগোচ্ছে। সেরিনা তাকে অনুসরণ করলেন। ঠিক তখনই ডঃ সেরিনার হাতে লাগানো বিশেষ ধরণের সোনার স্ক্যানারে একটি ফাঁপা গঠন দেখা গেল কিছুটা দূরে। কালো প্রবালের দেয়ালের মধ্যে একটি গুহা। ভেতরটা অন্ধকার। দুজনেই নিজেদের হেলমেটে লাগানো টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। কালো প্রবালের মোটা দেয়াল পেরিয়ে একটা বড়ো ফাঁকা জায়গাতে পৌঁছলেন ওরা। ভেতরে প্রবেশ করতেই তাঁরা থমকে গেলেন। গুহার ছাদ জুড়ে ঝুলছে অদ্ভুত এক ধরণের স্বচ্ছ প্রবাল। টর্চের আলো পড়তেই তারা নীল আলো ছড়াতে শুরু করল। পুরো গুহাটা নীলচে আলোয় ভরে গেল। “বায়োলুমিনেসেন্ট প্রবাল!” সেরিনা বিস্ময়ে বললেন, “এরা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। কতদূর পর্যন্ত নীলচে আলোটা ছড়িয়ে পড়ছে দেখো!”
অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে বলল, “এরা তো কোনো নথিভুক্ত প্রজাতি নয়!”
“না, একেবারেই নয়। এই গুহার কথাও আমাদের অজানা ছিল।”
“আমি কি এদের নমুনা সংগ্রহ করব?”
“অপেক্ষা করো, আমরা আগে কিছু পরীক্ষা করে নিই।” বলে সেরিনা পিঠে ঝোলানো পোর্টেবল বিশ্লেষক যন্ত্রটি সামনে এনে চালু করলেন। তারপর সেটার সেন্সর ঐ প্রবালের কাছে নিয়ে যেতে কয়েক মিনিট পর রিপোর্ট বেরিয়ে এল। দুজনেই অবিশ্বাসে একে অপরের দিকে তাকালেন। সেরিনার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেছে, “জিনগত গঠন সম্পূর্ণ আলাদা!”
“মানে?”
“আমরা সম্ভবত নতুন এক প্রজাতির প্রবাল আবিষ্কার করেছি!” সেরিনার গলা কেঁপে উঠল।
অনিরুদ্ধর গলাতেও তখন আনন্দ ঝরে পড়ছে, “তাহলে এই অভিযানের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে!”
“হ্যাঁ, কিন্তু ওদিকে কী আছে?”
সেরিনার দৃষ্টি অনুসরণ করে অনিরুদ্ধ দেখল। গুহার ভেতরের দিকে নীল আলোটা কীরকম দপ দপ করছে। কালো জলের মধ্যে কেউ যেন নীলচে আলোর সিগন্যাল পাঠাচ্ছে। সেরিনা বলল, “চলো, ওদিকটা ঘুরে আসি।”
বেশ কিছুটা সাঁতার কেটে যাওয়ার পর অন্ধকার জলের মধ্যে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হল একটা বিশাল কালো গাছের মতো অবয়ব। পাতা বিহীন তার কালো ডালপালা ছড়িয়ে আছে পুরো গুহাটার মধ্যে। আর সেটার প্রধান কাণ্ড নেমে গেছে আরও নীচে। সেই অন্ধকারের মধ্যে টর্চের আলোও বেশিদূর পৌঁছাচ্ছে না। অনিরুদ্ধ কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “এটা কি কোনো প্রবাল?”
সেরিনার হার্টবিট তখন বেড়ে গেছে, তিনি জানালেন, “ডঃ তানাকা বেলিজ বেরিয়ার রিফ থেকে কোনোরকমে বেঁচে ফিরে মাস ছয়েক হসপিটালে ভর্তি ছিলেন। তারপর মারা যান। আমি দেখা করতে গিয়ে ছিলাম ওনার সঙ্গে। উনি এরকমই একটা প্রবাল দেখেছিলেন সেখানে। তবে এটা আদৌ প্রবালের কোনো প্রজাতি কিনা আমার সন্দেহ আছে। আর গোটা পৃথিবীতে এরকম প্রবাল আর কোথায় কোথায় লুকিয়ে আছে? সেটা ভেবেই আমার রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে!”
“আমি তাহলে ওখান থেকে কিছুটা নমুনা সংগ্রহ করি। ওপরে গিয়ে ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করে দেখা যাবে।”
“না! … একদম ওর কাছে যাবে না। আমাদের এখুনি এই জায়গা থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। গভীর জলের ঐ ঘুমন্ত রাক্ষস যদি একবার জেগে যায় তাহলে আমাদের আর ওপরের সূর্য দেখা হবে না।”
অনিরুদ্ধ বুঝতে পারছে না যে দুর্ধর্ষ সাহসী ডঃ সেরিনা হঠাৎ এতটা ভয় পেলেন কেন! যাইহোক হাতের ডিসপ্লেতে দেখা যাচ্ছে পিঠের সিলেন্ডারে অক্সিজেনের পরিমাণ দ্রুত কমে আসছে। বেশি দেরি করা আর ঠিক হবে না। সেরিনা সোনার স্ক্যানার চালু করে জায়গাটার একটা ওয়েভম্যাপিং করে নিল। সেই তথ্য পাঠিয়ে দিল কন্ট্রোল রুমে। তারপর ওরা দুজনেই গুহার মুখের দিকে এগোল।
কিন্তু যেখান দিয়ে ওরা ঢুকে ছিল এই জায়গাতে সেটা আর কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। কালো প্রবালের দেয়ালে কোনো ফাঁক নেই। তাহলে ওরা বের হবে কী করে বাইরে? দুজনেই আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে শুরু করল রাস্তাটা। তবে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। মনিটরে দেখা যাচ্ছে ওদের হার্টবিট বাড়ছে আর অক্সিজেনের মাত্রা কমছে। হেলমেট সমেত ওদের পুরো পোশাকটাই শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু অনিরুদ্ধ রীতিমতো ঘামছে। জিজ্ঞাসা করল, “এবার কী হবে?”
সেরিনা জানাল, “নিজের শরীর আর মনকে শান্ত করো। হাত-পা বেশি নাড়া যাবে না। তাতে করে অক্সিজেন আরও কিছুক্ষণ চলবে। আমি জাহাজে সিগন্যাল পাঠিয়ে দিয়েছি। তবে সেই সিগন্যাল পৌঁছেছে কিনা জানি না। এখন আমাদের মাথা ঠান্ডা করে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই।”
কলকাতার জঙ্গলে
গরমের ছুটিতে আন্দামান যাওয়ার কথা শুনে সকালেই মনটা নেচে উঠল অর্ণবের। সেদিন টিফিন সেরে পাড়ার মোড়ে এসে বাবার সঙ্গে প্রতিদিনের মতো এসে দাঁড়াল। সকাল সাতটায় পুলকার আসে ওকে নিতে। হয় পুষ্পিতা, নইলে রঞ্জন সঙ্গে গিয়ে গাড়িতে তুলে দেয় অর্ণবকে। সোজা ক্যাম্পাসের মধ্যে ঢুকে গাড়ি থেকে নেমে অর্ণব স্কুলে ঢুকে যায়। আবার ছুটির পরে স্কুল থেকে ওদেরকে নিয়ে এসে পাড়ার মোড়ে ছেড়ে দেয় গাড়ি। অর্ণব সব শেষে নামে। ফেরার সময়ে অর্ণব একা হেঁটে বাড়ি ফেরে। এটাই প্রতিদিনের রুটিন।
ইদানিং অর্ণবের মনটা উচাটন হয়ে থাকে সবসময়ে। দার্জিলিং থেকে ফেরার পর এই সমস্যাটা হচ্ছে তার। কদিন আগেই জ্বর থেকে সেরে উঠে সবে স্কুল যেতে শুরু করেছে। অসুখের সময়ে সে যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। তখন অদ্ভুত কিছু স্বপ্ন দেখেছে সে। সমুদ্রের নীচে রঙিন জগতের জীবন্ত ছবি। সে একা ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে। জলের তলায় অপূর্ব সুন্দর এক দুনিয়া। সেখানে কত রঙের ছোটবড় প্রাণী, রংবেরঙের প্রবাল আর শ্যাওলা। তারা যেন সবাই ওর সঙ্গে কথা বলছে। আশ্চার্যের ব্যাপার হল ওদের ভাষা অর্ণব বুঝতেও পারছে।
এখন অর্ণবের মনে হয় কেউ বুঝি প্রতিনিয়ত ফলো করছে ওকে। ফলে খেলায় বা পড়ায় মন বসছে না একদম। দু’দিন আগে বিকালে ক্যারাটে ক্লাসে গিয়ে পা মচকে গেছে। যদিও দোষটা পুরোপুরি তার নিজেরই ছিল। ফাইট প্র্যাকটিসের সময় গৌরবকে একটা ফ্লাইং আপার কাট দিতে গিয়ে অর্ণবের বাঁ পা’টা বেকায়দায় পড়ে এটা হল। আসলে ঠিক তখনই মাঠের পূর্ব দিকে সোনাঝুরি গাছের পেছনে যেন কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিল। লোকটাকে মনে হয় এর আগেও সে অনেকবার দেখেছে। যদিও ভিড়ের মধ্যে খুঁটিয়ে না দেখলে লোকটাকে চেনা মুশকিল। টাক মাথা, মাঝারি উচ্চতা, ভুঁড়িওলা গাঁট্টাগোট্টা চেহারা, গায়ের রং আর পাঁচটা কলকাতার লোকের মতোনই। গায়ে থাকে কখনও গেঞ্জি বা সার্ট, মাথায় মাঝে মধ্যে টুপি পরে থাকে। অর্ণব নিশ্চিত যে লোকটা দার্জিলিং থেকে ফেরার পর থেকেই ওকে ফলো করছে। কখনও স্কুলের গেটের উলটো দিকের ফুটপাথে, নইলে পাড়ার খেলার মাঠে অথবা পুলকারের পেছনে বাইকে করে। একটা রোগা পাতলা সিড়িঙ্গে মতো ছেলেকেও অর্ণব দেখেছে ঐ লোকটার সঙ্গে। সেটা অবশ্য সব সময়ে নয়। কথাটা বাড়িতে সাহস করে বলতে পারেনি এখনও। ওর সন্দেহ ভুল প্রমাণিত হলে তখন কী হবে? বাবা-মাকে জানালেই তারা চিন্তায় পড়ে যাবে। যদি পুলিশে জানায় আর পরে লোকটা নির্দোষ প্রমাণিত হয়, তখন তো সবাই অর্ণবকেই বকাবকি করবে। সে জন্য ও কাউকেই কথাটা জানায়নি।
ব্যাপারটা মাসখানেক চলার পর অর্ণবের যখন নিজের বুদ্ধির ওপরেই আস্থাচলে গেল, ওর মনে হল যে বেকার সন্দেহ করছে লোকটাকে… আসলে ভদ্রলোক একজন নিরীহ গোবেচারা ভালোমানুষ, হয়তো নিজের অন্য কোনো প্রয়োজনেই ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর কাকতালীয়ভাবে তাকে হয়ত দেখা যাচ্ছে অর্ণবের চারপাশে। ঠিক তখনই ঘটনাটা ঘটল।
সেদিন গরমের ছুটি পড়ল অর্ণবের স্কুলে। গরমের ছুটিটা ওদের লম্বা থাকে, প্রায় দেড় মাস। পুলকারে করে ফিরছিল অর্ণব। শ্যামপুর মোড়ে ঋতমকে নামিয়ে দিয়ে প্রতিদিনের মতো একা অর্ণবকে নিয়ে চৌরাস্তায় ওকে ছাড়তেগাড়ি আসছিল। মনের মধ্যে ক’দিন হল খুব আনন্দ হচ্ছে ওর। কারণ ক’দিন পরেই আন্দামানে বেড়াতে যাচ্ছে।
হঠাৎ পাইকপাড়ার মোড়ের আগে ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে পড়ল। তারপর নিচু হয়ে সামনের ডানদিকের চাকা পরীক্ষা করে চুকচুক করে জানাল, “চাকা লিক হয়ে গেছে, স্টেপনিটা সঙ্গে নেই।” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার নিজেই সে বলল, “তোমার বাবাকে ফোন করে বলো, এসে নিয়ে যাবে।”
অর্ণব জানাল, “বাবা এখন অফিসে, মা’ও আসতে পারবে না।” ঠিক সেই সময়ে পাশে একটা অন্য স্কুলের পুলকার এসে দাঁড়াল। দুই ড্রাইভারের মধ্যে কিছু কথা হল। তারপর ওদের গাড়ির ড্রাইভার অর্ণবকে বলল, “তুমি এর গাড়িতে উঠে যাও, এ ঐ দিকেই যাচ্ছে। তোমাকে নামিয়ে দেবে।”
অর্ণব অন্য গাড়িতে উঠে পড়তেই গাড়িটা ছুটতে শুরু করল বেশ জোরে। এই গাড়ি আর ড্রাইভার কোনটাই তার চেনা নয়। সাদা টাটাসুমোর সামনে কাচের ওপর ‘স্কুল কার’ কথাটাও লেখা নেই। প্রথমে মনে হয়েছিল গাড়ির ভেতরে কেউ নেই, কিন্তু আচমকা পেছন থেকে এক জোড়া শক্ত হাত এসে চেপে ধরল অর্ণবকে। একটা মিষ্টি ঝাঁঝাল গন্ধ ধাক্কা মারল ওর নাকে। এটা কি ক্লোরোফর্ম? ঠিকঠাক বুঝে ওঠার আগেই অর্ণবের চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল। যেন একটা কালো পর্দা নেমে এল সামনে।
চোখ যখন খুলল, অর্ণব দেখল ও শুয়ে আছে একটা দড়ির খাটিয়াতে। ওর হাত আর পা দুটো দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। মাথার ওপরে পুরানোদিনের রঙচটা ছাদ থেকে লম্বা লোহার রডে একটা পাখা ঝুলছে। ঘট ঘট করে আওয়াজ আসছে সেই ঘুরন্ত পাখা থেকে। একটা ভ্যাপসা গন্ধ। চারপাশে চোখ বুলিয়ে অর্ণবের প্রথমে মনে হল এটা খুব বড়ো একটা ঘর। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝল আসলে ও একটা বিশাল বড়ো কোনো পুরানো গোডাউনের মধ্যে রয়েছে। পুরানো মেশিনপত্র আর কিছু জিনিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। কাছাকাছি কোনো লোকজনকে দেখতে পেল না। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর অর্ণব চেঁচিয়ে ডাকল, “কেউ আছে? আমি জল খাব …” আবার কিছুক্ষণ পরে চিৎকার করল। বেশ কয়েকবার চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে মনে হল কেউ কোথাও নেই। সময় যেন থমকে আছে এখানে। হাত-পায়ে যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। খুব কান্না পেল অর্ণবের। তবু নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করল। চুপ করে শুয়ে রইল বহুক্ষণ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। কয়েকটা চড়াইপাখি এল সন্ধ্যার মুখে। মনে হল ওরা এখানের পুরানো বাসিন্দা। দেয়ালের ওপরে ভাঙা স্কাইলাইটের মধ্যে দিয়ে ওদের যাতায়াতের রাস্তা। পাখিগুলোও অর্ণবকে দেখে অবাক। নিজেদের মধ্যে কিচিরমিচির করে কী সব আলোচনা করল। তারপর শান্ত হয়ে নিজেদের জায়গাতে গিয়ে বসল। ক্রমশঃ অন্ধকার হয়ে এল চারপাশ।
অর্ণব ভাবছে, ওকে কারা কিডন্যাপ করল? টাকা পয়সার জন্য যদি করে তাহলে এতক্ষণে বাবার কাছে কি টাকা চেয়েছে? আপাতত খুব খিদে পাচ্ছে ওর। বিকালে স্কুল থেকে ফিরলেই ওর মা যত্ন করে খাবার খাইয়ে দেয় অর্ণবকে। মায়ের কথা ভেবে কান্না পাচ্ছে। মা’ও নিশ্চয়ই খুব কান্নাকাটি করছে। দু-দিন পরেই ওদের আন্দামান যাবার কথা। সেজন্য ব্যাগ-স্যুটকেশ বাঁধাছাঁদাও প্রায় শেষ। প্রতি বছরই গরমের ছুটিতে ওরা তিনজনে কোথাও বেড়াতে যায়। এবছর অরুণাচল যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অর্ণবের বাবার এক বন্ধু পোর্টব্লেয়ারে এখন সরকারি দফতরে কর্মরত। তাঁর বিশেষ আমন্ত্রণেই হঠাৎ করে আন্দামান যাওয়া ঠিক হল মাসখানেক আগে। সেই মনোজকাকু নিজের উদ্যোগেই ট্যুর প্ল্যান আর সব টিকিট এবং হোটেল বুকিং করে দিয়েছেন। অর্ণব উত্তেজনায় ফুটছিল এত দিন। কিন্তু আন্দামান ট্যুর মনে হচ্ছে তার কপালে নেই। তবে স্বপ্নের মধ্যে প্রায়ই সমুদ্র যেন তাকে ডাকছে। স্বপ্নের ঘোরে তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে নীল জলের মধ্যে অদ্ভুত সুন্দর রঙিন এক দৃশ্য। আবার এই স্বপ্ন দেখতে গিয়ে তার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে কয়েকবার। যদিও ব্লাড টেস্টে কিছুই ধরা পড়েনি।
হঠাৎ করে একটা আলো জ্বলে উঠল তার পেছনে। কারোর পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। এদিকেই আসছে। হিন্দি টানে ভাঙা বাংলায় বলল, “এই নাও খোকা, তোমার জন্য খাবার এনেছি। খেয়ে নাও।” পরনে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি, কাঁধে ঝুলছে একটা গামছা, একজন মাঝ বয়সী দাড়িওলা লোক এসে সামনে দাঁড়াল। হাত থেকে একটা খাবারের প্যাকেট আর জলের বোতল পাশে রেখে বলল, “হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিচ্ছি। চুপচাপ খাবার খেয়ে আবার শুয়ে পড়বে। কোনো রকম বদমায়েশি করবে না।” কথাটা শুনে ভিজে বেড়ালের মতো ঘাড় নাড়ল অর্ণব।
খাবারে ছিল রুটি, ডাল-তড়কা, ভাত আর তরকারি। অর্ণব পুরোটাই চেটেপুটে খেয়ে নিল। জল খেল অনেকটা। বিপদের সময় পেট খালি রাখলে চলে না। এ কথাটা ওর মায়ের কাছ থেকে শেখা। খাওয়া শেষ হয়ে যেতেই লোকটা দড়ি নিয়ে এগিয়ে এসেছে বাঁধবে বলে। অর্ণব মিনমিন করে জানাল, “টয়লেট যানা হ্যায় চাচা।” লোকটা চোখ পাকিয়ে বলল, “কোই চালাকি নেহি করনা। আও হামারে সাথ।”
অর্ণব লোকটার সঙ্গে এগোল। চারিদিকে নোংরা ধুলো ভর্তি প্রচুর যন্ত্রপাতি জড়ো করে রাখা আছে। অন্ধকার পেরিয়ে বড়ো গোডাউনের শেষে একটা টয়লেটে গিয়ে ঢুকল সে। ঝাঁঝালো গন্ধে জ্বলে উঠল নাক। ও লক্ষ্য করল এদিকে একটা লোহার কোলাপসিকালের গেট আছে। লাইট জ্বলছে টিমটিম করে। তার নীচে বসে আর একজন গাঁট্টাগোট্টা লোক খইনি ডলছে হাতের তালুতে। আড়চোখে সে তাকাল অর্ণবের দিকে। তার মানে এই দু’জন লোককে ঘায়েল করতে পারলে অর্ণব হয়ত মুক্তি পেতে পারে। নাকি আরও কেউ আছে আশেপাশে? তবে সে যেই থাক আর যত জনই থাক, একটা চান্স তাকে নিতেই হবে। কারণ আবার একবার হাতেপায়ে দড়ি বেঁধে দিলে কখন ছাড়া পাবে তার ঠিক নেই। কিন্তু কারা এরা? ভাড়াটে কিডন্যাপার? তাই হবে। এদের পেছনে কে আছে? কী চায় তারা? শুধু কি টাকা?
টয়লেট থেকে বেরিয়ে অর্ণব দেখল লুঙ্গিপরা লোকটা নিশ্চিন্তমনে বিড়িতে টান দিচ্ছে। দূরেরজন ঘাড় কাত করে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে অর্ণব বিদ্যুৎগতিতে ‘কাতার’ একটা আপার পাঞ্চ দিল লোকটার থুতনি লক্ষ্য করে। ক্যারাটের ডেমস্ট্রেশনের দিন চারটে জ্বলন্ত টালি এক ঘুসিতে ভেঙে অর্ণব চমকে দিয়েছিল সবাইকে। সাংঘাতিক একটা আঘাতে লোকটা আচমকা উলটে পড়ে গেল দড়াম করে। অর্ণব দ্রুত লোকটার পিঠের ওপর উঠে গামছা দিয়ে মুখটা বেঁধে ফেলতে গেল। কিন্তু তার গায়েও জোর আছে, অর্ণবকে এক ঝটকা দিয়ে ফেলে দিল পিঠ থেকে। এবারে অর্ণবকে মেঝেতে ফেলে দিয়ে চেপে ধরতে গেল দাড়িওলা লোকটা। অর্ণব পা দুটো বুকের কাছে জড়ো করে জোড়া পায়ে পুরো শক্তি দিয়ে লাথি মারল লোকটার বুকে। লোকটা ছিটকে গিয়ে পড়ল উলটো দিকে স্তূপাকৃতি লোহার মেশিনের ওপর। মাথার পেছনে ঢং করে একটা ধাতব আওয়াজ হল তার। তারপর সে লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। এদিকে ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে অন্যজন দৌড়ে এসেছে এদিকে। অর্ণব বুঝল আগের লোকটাকে ঘায়েল করতে পারলেও, এর সঙ্গে পেরে ওঠা অতটা সহজ হবে না। হাতে পেশীর ভাঁজ দেখেই বোঝা যাচ্ছে লোকটা বেশ শক্তিশালী। অর্ণব বুদ্ধি খাঁটিয়ে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল ঢাল করে রাখা কার্টনের আড়ালে। তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল চোর পুলিশের খেলা।
অর্ণব বুঝতে পারল পরিত্যক্ত গোডাউনটা দোতলা। এখানের বেশিরভাগ আলোই অকেজো। তাই অন্ধকারের মধ্যে লুকোতে সুবিধা হচ্ছে, কিন্তু ভয়ও পাচ্ছে। আশেপাশে আর কোনো বাড়ি বা জনবসতি নেই। চিৎকার করলেও কেউ শুনতে পাবে না। অনেকক্ষণ ছাড়া ছাড়া ভোঁ… করে কোনো জাহাজের শব্দ শোনা যাচ্ছে অনেক দূর থেকে। তাহলে কি এটা বন্দর এলাকা? লোকটাও হন্যে হয়ে খুঁজছে ওকে। অর্ণবও অবস্থা বুঝে বারবার জায়গা বদলাচ্ছে। শেষে কাউকে ফোন করল লোকটা, “হ্যাঁ, আমি মিলন বলছি দাদা। বাচ্চাটাকে খুঁজে পাচ্ছি না। তাড়াতাড়ি এসো। … না, বাইরে যেতে পারেনি। এখানেই আছে। শয়তানের বাচ্চা একটা! মইদুলকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।”
কথাটা শুনে অর্ণবের হাসি পেল খুব। ও বুঝতে পেরেছে লোহার কোলাপসিবল গেটটাই এখান থেকে বেরোনোর রাস্তা। সেজন্য মিলন নামে লোকটা ঐ দিকেই পাহারা দিচ্ছে। মিলনকে একবার ভেতরের দিকে টেনে আনতে পারলে অর্ণব বাঁদিকের দেয়ালের পাশ দিয়ে ঘুরে গেটের কাছে যেতে পারবে। যন্ত্রাংশের একটা ভারী টুকরো তুলে ভেতর দিকে ছুঁড়ে দিল অর্ণব। টং টং করে আওয়াজ হতেই মিলন দৌড়ে গেল সেদিকে। অর্ণব চুপিসাড়ে চলে এল গেটের কাছে। কিন্তু লোহার গেটে তো তালা দেওয়া। আর এই তালার চাবি এখানে কোথাও নেই। মিলন যেখানে বসে খইনি দলছিল সেই জায়গাটাও আঁতিপাঁতি করে খুঁজল অর্ণব। কিন্তু চাবিটা পেল না কোথাও। তাহলে মনে হয় চাবিটা মিলনের পকেটেই রয়েছে। অর্ণব যতটা সহজে এখান থেকে বের হবে ভেবেছিল, সেটা আর সম্ভব হবে না। কিন্তু বেশি দেরিও করা যাবে না। কারণ মিলন যাকে ফোন করেছে সেও নিশ্চয়ই দলবল নিয়ে চলে আসবে এখানে। তখন অনেকজন লোকের সঙ্গে অর্ণব একা কিছুতেই পেরে উঠবে না। তাহলে রাস্তা এখন একটাই, মিলনের সঙ্গে সম্মুখ সমর।
অর্ণব বুঝতে পারল, মিলন এদিকেই আসছে। আবছা অন্ধকারে হামাগুড়ি দিয়ে একটা লোহার স্তূপের পেছনে চলে গেল সে। তারপর এদিক ওদিক খুঁজে অর্ণবের হাতে এসে গেল একটা লোহার ডান্ডা। সেটাকে বাগিয়ে ধরে নিঃশব্দে এগিয়ে গেল মিলনের পেছন দিক থেকে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মিলন বুঝতে পেরে ঘুরে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল অর্ণবের ওপর। অর্ণবও তৈরি হয়ে ছিল। ডান হাতে লুকিয়ে রাখা শক্ত লোহার রডটা প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতার সঙ্গে চালিয়ে দিল ওর মাথা লক্ষ্য করে। ছিটকে পড়ল মিলনের অত বড়ো শরীর। চিৎকার করে সংজ্ঞা হারাল সে। অর্ণব প্রথমে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে মিলনের পকেট হাতড়ে বের করে নিল চাবির থোকা। দৌড়ে গেল লোহার গেটের কাছে। একটার পর একটা চাবি ঘুরিয়ে দেখছে কোনটায় খোলে। শেষ পর্যন্ত তালাটা খুলতে পেরে ওর আনন্দ হল ভীষণ। কিন্তু নীচে থেকে ঠিক সেই মুহূর্তেই শোনা গেল একটা গাড়ির শব্দ। বেশ কয়েকজন লোক দুড়দাড় করে উঠছে সিঁড়ি দিয়ে। অর্ণব বাইরে থেকে আবার গেটে চাবি লাগিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। এবার যদি ওকে বাগে পায় লোকগুলো আর ছাড়বে না।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল অর্ণব। জনা দশেক লোকের পায়ের শব্দ আর চাপা কথা বার্তা কানে আসছে। ওদের কথাগুলো কান খাড়া করে শুনছিল ও। হঠাৎ চমকে উঠল অর্ণব। “গেটে তালা দেওয়া আছে। তালা ভাঙতে হবে।” এটা তো বাবার গলা! সিঁড়ির খাঁজে চোখ রেখে দেখল অনেকগুলো টর্চের আলো ঘোরাফেরা করছে নীচে। ইউনিফর্ম পরা কলকাতা পুলিশ ঘিরে ফেলেছে পুরো বাড়ি। তারমানে বিপদ কেটে গেছে। অর্ণব আনন্দে চিৎকার করে উঠল ওপর থেকে, “বাবা… আমি এখানে…!”
পুলিশের লোক ওদেরকে থানায় নিয়ে গিয়ে পুরো ঘটনা নোট করে নিল। বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরল যখন তখন সকাল হয়ে গেছে। পুষ্পিতা ছেলেকে দেখে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করল অনেকক্ষণ। তারপর রঞ্জন আর ছেলের মুখে পুরো ঘটনা শুনে পুষ্পিতা প্রশ্ন করল, “সেই টাক-মাথা লোকটা ধরা পড়েছে?”
“না, তাকে পুলিশ এখনও ধরতে পারেনি। খুঁজছে হন্যে হয়ে।”
“কিন্তু ঐখানেই যে অনিকে ধরে রেখেছিল সেটা পুলিশ জানল কী করে?”
“একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল থানায়। কেউ একজন টিপস দিয়েছিল।”
“কে টিপস দিল?”
“সেটা জানা যায়নি এখনও।”
অর্ণব দুপুরে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসে প্রথমেই জানতে চাইল, “আমাদের আন্দামান যাওয়াটা কি হচ্ছে?”
“হ্যাঁ, সে নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। আমি ওসিকে বলেই এসেছি। এয়ার টিকিট কাটা হয়ে গেছে, বাকি সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এখন না গেলে অনেক টাকা লোকসান হবে।”
“ওসি কী বললেন?”
“বললেন, অর্ণব তো ঠিকই আছে। দু’দুটো কুখ্যাত গুন্ডাকে যেভাবে ঘায়েল করেছে, ওকে নাকি কলকাতা পুলিশ পুরস্কার দেবে। তার আগে আমরা ঘুরে আসি আন্দামান থেকে।”
“বাহ, দারুণ খবর!”
রক্ত লাল শহীদ দ্বীপ
বিমান যখন পোর্টব্লেয়ারের বীর সাভারকার আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের মাটি ছুঁলো তখন দুপুর সাড়ে বারোটা। প্লেনে জানালার পাশের সিটটা প্রথমেই দখল করেছিল অর্ণব। রানওয়ে ছোঁয়ার কিছুক্ষণ আগে থেকে তাকিয়ে ছিল নীল সমুদ্রের দিকে। অপূর্ব সে দৃশ্য। নীল জল আর ঘননীল আকাশের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা টুকরো টুকরো মেঘ, আর সেগুলোর ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে সবুজ ছোটো বড়ো দ্বীপের সারি। পোর্টব্লেয়ার শহরটা খুবই ছোটো। বেল্ট থেকে লাগেজ নিয়ে, এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ওরা একটা রেস্তোরাঁতে খেয়ে হোটেলে পৌঁছল। হোটেলটা সমুদ্রের একদম কাছে ফ্ল্যাগ পয়েন্টে। হোটেলে ঢুকেই অর্ণব দৌড়ে গেল সমুদ্রের দিকে। রাস্তাটা ঢাল বেয়ে নেমে সোজা সমুদ্রের গা ঘেঁষে চলে গেছে। বাঁকের মুখে মস্ত বড়ো একটা ভারতের জাতীয় পতাকা উড়ছে পতপত করে। নীচে লেখা ১৯৪৩। আছে নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসুর মূর্তি এবং আজাদহিন্দ বাহিনীর কম্যান্ডারদের নাম। অর্থাৎ সেই সময়ে এই স্থানেই নেতাজী প্রথম ভারতের জাতীয় পতাকা তুলেছিলেন। সেই স্তম্ভের নীচে দাঁড়িয়ে গর্বে বুক ভরে গেল অর্ণবের।
সামনে সমুদ্রের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে দূরে একটা সবুজ দ্বীপ, ওটা রস আইল্যান্ড। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ সিনেমাটা দেখেছে অর্ণব। আজকে বিকালে ওদের সেলুলার জেল দেখার কথা আছে। সেখানে সন্ধ্যায় লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো হবে। সেটারও টিকিট কেটে দিয়েছে মনোজকাকু। আপাতত সমুদ্রের সামনে একটা পাথরের ওপরে বসে পড়ল অর্ণব। তবে এখানের সমুদ্র কিন্তু স্নান করার জন্য উপযুক্ত নয়। নীচে সমুদ্রের তট কালো প্রবালে ভর্তি হয়ে আছে। ওখানে নামাটা বেশ বিপদজনক। কারণ মৃত প্রবালের গা’গুলো বেশ ধারালো হয়। পা কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে ওপরে সমুদ্রের দিকে মুখ করে বসার জন্য ভালো ব্যাবস্থা করা আছে। সেখানে বসে বেশ মজা লাগছে সমুদ্রের হাওয়া খেতে। কাছেই সমুদ্রের পাড়ে ঘন নীল আর পেটের কাছে বাদামী রঙের একটা অপূর্ব মাছরাঙা পাখি এসে বসেছে। তার দিকেই তাকিয়ে ছিল অর্ণব। দুদিন আগের ঘটনাটা মনে পড়লেই ওর এখনো উত্তেজনায় সারা শরীরের লোমগুলো খাড়া হয়ে যাচ্ছে। ওকে যে কেউ কোনদিন কিডন্যাপ করতে পারে, সেটা বিশ্বাস করা বেশ মুশকিল। কারণ অর্ণব স্কুলে ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন আবার ক্যারাটেতে ইয়োলোবেল্ট, চেহারাতেও বয়স অনুযায়ী বেশ বড়ো সড়। কিন্তু ওকে কলকাতার গুন্ডারা কেন যে কিডন্যাপ করল, সেটা এখনো পরিষ্কার হল না। যাই হোক কলকাতা ছেড়ে এখন কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে আন্দামানে দাঁড়িয়ে বেশ আনন্দ হচ্ছে ওর। ক্লক টাওয়ারের ‘আনজু কোকো’তে দুপুরের জবরদস্ত লাঞ্চে আজকে ছিল কাঁকড়া। বেশি হয়ে গেছে খাওয়াটা। এখন আর সমুদ্রের হাওয়া ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। চুলগুলো টানা হাওয়ায় পেছন দিকে উড়ছে হুহু করে। ঘুম ঘুম পাচ্ছে।
“দুপুরের ফ্লাইটেই কি এলে নাকি কলকাতা থেকে?”
কথাটা শুনে একটু চমকে উঠল অর্ণব। ওর পাশে একজন ভদ্রলোক এসে বসেছেন। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল খুব চেনা চেনা লাগছে ওনাকে। কোথায় যেন দেখেছে, ঠিক মনে করতে পারছে না। কথাটা তিনি নিজেই বললেন, “কী মনে করতে পারছ না তো অর্ণববাবু? কোথায় দেখেছ বলত আমাকে?” একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপ করে রইল অর্ণব। ওর যেন পেটে আসছে কিন্তু মুখে আসছে না। সাদা চাপ দাড়ির ভদ্রলোক এক গাল হেসে বললেন, “কালিম্পং থেকে ফেরার পথে খুব কুয়াশা পড়েছিল সেদিন। মনে পড়ছে?”
সাঁ করে মনে পড়ে গেল অর্ণবের। এনার গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়েছিল পাহাড়ী রাস্তায়। অর্ণবদের গাড়িতে লিফট নিয়েছিলেন। ও উত্তেজিত হয়ে বলল, “সমুদ্রবিজ্ঞানী অরিন্দম রুদ্রপ্রসাদ!”
“সাবাস! আমার নামটাও মনে আছে দেখছি! ভারি বুদ্ধিমান ছেলে!”
“আপনিও এখানে বেড়াতে এসেছেন?”
“না, আমি এখানে এসেছি একটা কাজে। তোমরা বুঝি খুব ঘন ঘন বেড়াতে যাও?”
“না না, তবে এবারে হঠাৎ করে একটা সুযোগ এসে গেল। এমনিতে আমরা বছরে একবারই বেড়াতে যাই।”
“বেশ! তা ক’দিন আছো তো এখানে। পরে আবার দেখা হবে নিশ্চয়ই। কালকের প্ল্যান কী?”
“কালকে তো আমরা হ্যাভলক যাব, ওখান থেকে নীল আইল্যান্ড। তারপর আবার পোর্টব্লেয়ারে ফিরছি।”
“বেশ, এখন তাহলে আমি চলি। আর একটা কথা, আমার সঙ্গে যে তোমার দেখা হয়েছে সেটা বাবা-মাকে এখনই বলার দরকার নেই। তোমরা যখন পোর্টব্লেয়ারে ফিরে আসবে, একটা দারুণ সারপ্রাইজ দেব রঞ্জনবাবুকে।”
অর্ণব হেসে মাথা নাড়ল। অরিন্দমবাবু রিং রোড ধরে রামকৃষ্ণ মিশনের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পরে একজন ফেরিওলার কাছ থেকে ঝালমুড়ি কিনল অর্ণব। সে খেয়াল করল এখানে বেশিরভাগ মানুষই পরিস্কার বাংলায় কথা বলেন। কলকাতা থেকে এতদূরে, বঙ্গোপসাগরের নীচের দিকে একটা ছোটো দ্বীপপুঞ্জে এত বাংলাভাষী মানুষ আছেন দেখে খুব অবাক হল সে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে আছে বলে তার মনেই হচ্ছে না। আন্দামানের ভৌগোলিক অবস্থান যদিও একদিকে মায়ানমার আর অন্যদিকে ভারতের চেন্নাই থেকে কাছে। পরে বাবাকে কথাটা জিজ্ঞেস করতে রঞ্জন জানাল, “১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে লক্ষ লক্ষ হিন্দু বাঙালি শরণার্থী ভারতে ঢুকেছিল আশ্রয় নেওয়ার জন্য। তখন ভারত সরকার মূল ভূখণ্ড থেকে তাদের অনেকজনকে জাহাজে করে এই আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছে দিয়েছিল বসতি স্থাপনের জন্য। সেই থেকে তারা এখানে রয়ে গেছে। পরে তাদের জনসংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু কথাবার্তা, আচার আচরণ, সংস্কৃতি সব কিছুই আমাদের মতো।”
বিকালে অর্ণব, পুষ্পিতা আর রঞ্জন অটো করে পৌঁছে গেল সেলুলার জেলের সামনে। অটো থেকে নেমেই রঞ্জন জাতীয় পতাকাকে স্যালুট করে বলল, “ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গৌরবময় এবং বেদনাদায়ক স্মৃতিচিহ্ন।”
অর্ণব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ব্রিটিশ সরকারের তৈরি লাল ইমারৎটির দিকে। পুষ্পিতা বেশ কিছুদিন ধরে আন্দামানের ওপর পড়াশোনা করছে। সে জানাল, “উনিশ শতকের শেষ দিকে রাজনৈতিক বন্দিদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল এই জেলখানা।”
মূল দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই শরীরের রক্ত যেন দৌড়াতে শুরু করল অর্ণবের। সবাই মাথা তুলে দেখছে চারতলা উঁচু সেলুলার জেলকে। রঞ্জন কাছে এসে ওকে বোঝাল, “পোড়া ইঁটের তৈরি এই বিল্ডিং। ছোটো বড়ো মিলিয়ে মোট সাতটা করিডোর। কারাগারের প্রতিটি ছোটো ছোটো খুপরিতে মাত্র একজন করে বন্দিকেই রাখা হতো। তাই এর নাম হয় ‘সেলুলার জেল’।”
“ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হত এখানে। সঙ্গে ছিল হাড়ভাঙা খাটুনি, অমানবিক শাস্তি এবং দীর্ঘ একাকী বন্দিজীবন।”
“এই কারাগারে ভারতের বহু মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী বন্দি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, বটুকেশ্বর দত্ত সাভারকরসহ অনেক বিপ্লবীরা ছিলেন। বন্দিদের মধ্যে সব থেকে বেশি ছিলেন বাঙালি, তারপর পাঞ্জাবিরা।”
“এখন এই সেলুলার জেল একটি জাতীয় স্মৃতিসৌধ হিসেবে সংরক্ষিত হচ্ছে।”
সূর্য ডুবে যেতে জেলের মধ্যেই শুরু হল দুর্দান্ত এক লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো। রাতের খাওয়া সেরে হোটেলে ফিরতে বেশ রাত হল ওদের।
পরের দিন সকাল সাড়ে ছ’টায় পোর্টব্লেয়ারের ফিনিক্স বে জেটি থেকে ছাড়ল সরকারি লঞ্চ। ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগে হ্যাভলক দ্বীপে পৌঁছাতে। নীল আকাশে হালকা মেঘ আর মৃদু রোদে নীল সমুদ্রের বুক চিরে দ্রুতগতির জাহাজ এগিয়ে চলল হ্যাভলক দ্বীপের দিকে। চারদিকে শুধু জল আর জল। দূরে সবুজ দ্বীপের সারি। মাঝেমধ্যে উড়ুক্কু মাছের ঝাঁক আর সমুদ্রের ঢেউয়ের সাদা ফেনা। রঞ্জনের সঙ্গে অর্ণব ডেকের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। নোনা জলের ক্রমাগত ঝাপটা এসে লাগছে চোখে মুখে।
হ্যাভলক দ্বীপটা যেন সবুজ অরণ্যে ঢাকা এক স্বর্গ রাজ্য। নারকেল গাছের সারি আর স্বচ্ছ নীল জল প্রথম দেখাতেই মন জয় করে নিল ওদের। জেটি থেকে হোটেল পৌঁছাতে মিনিট পনেরো সময় লাগল। রঞ্জন জানাল, “হ্যাভলক আর নীল দ্বীপের অফিশিয়াল নাম বদলে এখন নেতাজীর দেওয়া স্বরাজ আর শহীদ করা হয়েছে।”
এখানে ওদের হোটেলটা একেবারে সমুদ্র লাগোয়া। সাদা বালির বিস্তৃর্ণ তটের ওপর সবজে নীল জলের সাদা ফেনাওলা ঢেউ আছড়ে পড়ছে ক্রমাগত। পুষ্পিতা সেই দৃশ্য দেখে মোহিত হয়ে নেমে পড়ল সমুদ্রের জলে। বিকেলে বিখ্যাত রাধানগর সমুদ্রসৈকতে সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য দেখে পুষ্পিতা বলল, “ভারতের মানুষ কেন যে এত টাকা খরচ করে বিদেশের সমুদ্র দেখতে যায় বুঝি না!” সামনে সোনালি আলোয় ঝলমল করা সমুদ্র, কিছুক্ষণের মধ্যে আবার দূরে মেঘ ফুঁড়ে নেমে আসা আলো যেন এক জীবন্ত ছবির মতো মনে হলো অর্ণবের।
কিন্তু অর্ণবের মনের ভেতরটা আবার খচ খচ করছে। কলকাতা থেকে এতদূরে এসে ও ভেবে ছিল এখানে আর ওসব ঝামেলা হবে না। কিন্তু এখন আবার মনে হচ্ছে ওকে এখানেও কেউ বুঝি ফলো করছে। রাধানগর বিচের শেষ প্রান্তে একজন টুপি মাথায় মোটা মতো লোক দূরবীন চোখে দাঁড়িয়ে ছিল। দূর থেকে মনে হল ওকেই দেখছে। কিছুক্ষণ পরে অর্ণব অবশ্য তাকে আর দেখতে পায়নি। সে ভাবল, কী জানি! মনের ভুলও হতে পারে।
পরের দিন সকাল থেকেই শুরু হয়েছে টানা বৃষ্টি। অগত্যা ছাতা মাথায় দিয়ে ওরা হাজির হল জেটিতে। দুর্যোগের মধ্যেও যথা সময়ে ভোঁ বাজিয়ে এসে গেল সরকারি লঞ্চ। আবার ফেরিতে চেপে ওরা রওনা দিল নীল দ্বীপের উদ্দেশে। এবারের সমুদ্রযাত্রাটা ভয়ানক হল। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে সমুদ্রের পেটের মধ্যে একবার লঞ্চটা ঢুকে যাচ্ছে, আবার ভেসে উঠছে। লঞ্চ এত সাংঘাতিক দুলছে যে চেয়ার ছেড়ে ওঠা যাচ্ছে না। একজন বয়স্ক মহিলা সহযাত্রী বসার জায়গাতেই বমি করে ফেললেন। তবে নীল ওরফে শহীদ দ্বীপের জেটিতে যখন ওরা গিয়ে পৌঁছাল ঝঞ্জা থেমে গেছে। এখানে প্রকৃতি যেন আরও শান্ত, আরও নিরিবিলি। দ্বীপের মাঝামাঝি অসাধারণ সুন্দর ‘সেভ গ্রিন’ রিসর্টে চেক ইন করে পুষ্পিতা আনন্দে নেচে উঠে বললে, “আমি আর বাড়ি ফিরতে চাই না। এখানেই থেকে যাব।” রঞ্জন ব্যস্ত হয়ে পড়ল ছবি তুলতে। খুব সুন্দর করে সাজানো কটেজের সারি আর তার সামনে অপূর্ব ফুলের বাগান। কতরকমের আর রঙের ফুল ফুটে আছে সেখানে। লাঞ্চ করে ওরা বেরিয়ে পড়ল ভরতপুরের সমুদ্রসৈকত দেখতে। সেখানে স্বচ্ছ জলে কত রঙিন মাছেরা খেলা করছে। সব থেকে মজা লাগল পরের দিন সকালে জেটির পাশে ‘বটম গ্লাস বোটে’ চড়ে প্রবাল দেখার অভিজ্ঞতা। এত সুন্দর রঙিন আর বিভিন্ন আকৃতির প্রবাল দেখে অর্ণব অবাক। মোটর বোটে চড়ে তারা সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর পায়ের নীচে পরিষ্কার কাঁচের মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছে জলের মধ্যে অদ্ভুত এক দুনিয়া। ছোটো ছোটো ডোরাকাটা ক্লাউন ফিসের ঝাঁক ছুটে বেড়াচ্ছে। কতরকম আকারের প্রবাল, সেগুলোর গায়ে প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সুন্দর উজ্জ্বল রং আর তুলি দিয়ে কত যত্ন করে রঙ করে দিয়েছে। আর সেই রঙিন জলের শহরে কত প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া, চিংড়িরা বাস করছে।
সমুদ্রের পাড়েই পর পর রেস্তোরাঁ। খিদেটা বেশ চাগাড় দিয়ে উঠেছে। একটা রেস্তোরাঁতে ঢুকে রঞ্জন সামুদ্রিক সুরমাই মাছের রোস্ট অর্ডার দিল। অতি সুস্বাদু খেতে সেই মাছ। পুষ্পিতা এক টুকরো মাছ মুখে পুরে মন্তব্য করল, “কিছুক্ষণ আগেই যে মাছগুলোকে সমুদ্রের মধ্যে কত আনন্দের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে দেখলাম, তাদেরকে ধরে মানুষ রোস্ট করে খাচ্ছে আর আহা উহু করছে। আমরা কত পাপী!”
“এই সুরমাই কিন্তু গভীর সমুদ্রের মাছ।”
“তাতে কী হল? আমাদের পাপ কি কমে যাবে?”
“না, তা যাবে না। তবে এমন স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়ে পুণ্য সঞ্চয় করার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। হাহাহা…”
এরপর ওরা গেল প্রবালের ন্যাচারাল ব্রিজ দেখতে। আর সেখানেই ঘটল সাংঘাতিক সেই ঘটনা।
জায়গাটার চলতি নাম ‘কালা পাত্থর বিচ’। সমুদ্রের পাড়ে কিছুটা ঢাল বেয়ে ভাঙাচোরা সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে কালো পাথরের সমুদ্রসৈকতে পৌঁছাল ওরা। রঞ্জন বলল, “আসলে এগুলো সব মৃত প্রবাল। হাজার হাজার বছর ধরে পাথরের মতো শক্ত আর কয়লার মতো কালো হয়ে গেছে। তবে সাবধানে পা ফেলবে। মৃত প্রবালরা ভয়ঙ্কর ধারালো হয়। পা কেটে গেলে ডাক্তারের কাছে দৌড়াতে হবে।” সমুদ্রে ভাটার জন্য এখন জল নেমে গিয়ে কালো এবড়ো খেবড়ো পাথর বেরিয়ে পড়েছে। দুপুরের পর বলে লোকজন বিশেষ নেই। রঞ্জন স্থানীয় কয়েকজন দোকানীকে জিজ্ঞেস করে বড়ো বড়ো সবুজ গাছপালায় মোড়া কিনারা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে সমুদ্রতটের বাঁদিকে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। বিস্তৃর্ণ অঞ্চল জুড়ে পায়ের নীচে ধারালো উঁচুনিচু প্রবাল, মাঝে মধ্যে ছোটো ছোটো স্বচ্ছ নোনা জলের কুন্ডলি, তাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে কাঁকড়া, চিংড়ি কিম্বা চারা মাছ। দুজন জেলে সমুদ্র থেকে জাল টেনে এনে কিনারে বালির ওপর ফেলে মাছগুলোকে জাল থেকে ছাড়াচ্ছে। পুষ্পিতা আর অর্ণব হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেল সেদিকে। পচা আঁশটে গন্ধ ধাক্কা মারল অর্ণবের নাকে। এক আঙুলের মাপে রূপালি রঙের মাছগুলো দেখে পুষ্পিতা জিজ্ঞেস করল, “কী মাছ এগুলো?”
একজন জেলে জানাল, “দারুকা…”
“ভারী অদ্ভুত নাম তো!”
কয়েকটা কুকুরের ছানা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে মাছের লোভে হাজির হয়েছে সেখানে। যে মাঝগুলো ফেলে দিচ্ছে জেলেরা সেগুলো বিড়ালগুলো ছোঁ মেরে তুলে নিচ্ছে। সামনে বড়ো পাথরের পাশ দিয়ে গিয়ে একটা বাঁক পেরিয়ে বিখ্যাত সেই প্রাকৃতিক প্রবাল সেতু, যেটা দেখার জন্য বহু দূর থেকে লোক ছুটে আসে। রঞ্জন আর পুষ্পিতা এগিয়ে গেল সেই দিকে। কিন্তু অর্ণব বসে রইল সমুদ্রের পাড়ে পড়ে থাকা একটা পুরানো কাঠের গুঁড়ির ওপর। এই জায়াগাটাতে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগছে ওর। কিছুটা দূরেই গর্জন করে নীল সমুদ্রের ঢেউ ভাঙছে একের পর এক। সাদা ফেনার বুদবুদ ছড়িয়ে পড়ছে। ওপরে ঘন নীল আকাশের গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাদা কাপাস তুলোর মতো তাল তাল মেঘ। নিরিবিলি বড়ো সুন্দর জায়গা।
“এই পাশে ছোটো ছোটো কচ্ছপের ছানা হয়েছে, কি সুন্দর!” অচেনা এক লোকের গলা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল অর্ণব। দেখল ওর পেছনে দুজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে। একজনের গলায় ঝুলছে নিকনের দামী ক্যামেরা। বাঙালি ট্যুরিস্ট দেখেই বোঝা যাচ্ছে। অর্ণব আগ্রহ দেখাল, “কোথায়?”
একজন আঙুল তুলে বলল, “জঙ্গলের মধ্যে এই দিকে। সবে আমরা দেখে এলাম। ছোটো ছোটো অনেক ছানা হয়েছে।”
আর একজন হাসি মুখে বলল, “কাছেই, তুমিও দেখে আসতে পারো। চলো আমরা নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে।”
কচ্ছপের ছানা এর আগে কোনোদিন সামনে থেকে দেখেনি অর্ণব। খুব ইচ্ছা হল গিয়ে দেখে আসতে, কিন্তু বাবা-মা চলে গেছে অন্য দিকে। তাদের না জানিয়ে গেলে ওকে খুঁজবে। সে বলল, “আমি বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে যাব।”
“আরে, তুমি তো রঞ্জনের ছেলে। ও তো আমার ছোটোবেলার বন্ধু। আমরা তো তোমাদের সঙ্গে একই ফ্লাইটে কলকাতা থেকে এলাম, তুমি মনে হয় খেয়াল করোনি। আমার নাম পরিমল আর এ হল রাজেশ।”
“চলো আমি তোমাকে নিয়ে যাই কচ্ছপের ছানা দেখতে। রাজেশ গিয়ে তোমার বাবামাকে ডেকে আনছে।”
“সেই ভালো!” বলে রাজেশবাবু চলে গেলেন ন্যাচারাল ব্রিজের দিকে।
অর্ণব পরিমলবাবুর সঙ্গে এগোল। সমুদ্রের পার থেকে একটা সরু পায়ে চলা পথ জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে। চারিদিকে ভর্তি নারকেল গাছ আর পান্ডানাসের ঝাড়। হাসনুহানার মতো লম্বা লম্বা পাতার দু ধারে তীক্ষ্ণ কাঁটা আর আতা ফলের মতো এক রকমের ফল হয়েছে সেই ঝাড়ে। পরিমলবাবু অর্ণবকে সাবধান করে বললেন, “ভালো করে দেখে এগোবে, এই কাঁটা পায়ে লাগলে কিন্তু কেটে যেতে পারে।”
জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বেশ কিছুটা যাবার পর অর্ণবের মনে সন্দেহ তৈরি হল। সে প্রশ্ন করল, “আর কতদূর কাকু? আপনি তো বললেন, পাশেই!”
“এসে গেছি, ঐ যে বড়ো থিটপক গাছটা দেখছ ওটার গোড়াতেই কচ্ছপের বাচ্চাগুলো আছে।”
অর্ণবের মনের মধ্যে সন্দেহ তবু গেল না। কচ্ছপ সাধারণত সমুদ্রের পাড়ে বালির মধ্যেই ডিম পাড়ে। জঙ্গলের এত ভেতরে এসে ডিম পাড়তে যাবে কেন? কচ্ছপের বাচ্চারা ডিম থেকে বেরিয়ে নিজেরাই চলে যায় সমুদ্রের জলে। তাও অর্ণব বড়ো গাছটা পর্যন্ত এগিয়ে গেল। থিটপক গাছের শেকড়গুলো হয় পাঁচিলের মতো উঁচু। তার আড়ালে চার পাঁচজন মানুষ বসে থাকলেও পাশ থেকে বোঝা সম্ভব নয়। ঝোপঝাড় পেরিয়ে অর্ণব যখন সেখানে এসে পৌঁছে দেখল কিছুই নেই।
“কোথায় কচ্ছপের ছানা?”
“এই রে! ছানাগুলো মনে হয় এখান থেকে সব চলে গেছে। হে..হে..হে..!” কথাটা বলতে বলতেই লোকটা এবার ঘুরে তাকাল অর্ণবের দিকে। তার হাতে একটা কালো পিস্তল। চমকে উঠল অর্ণব। চোখে কঠিন চাউনি। “শোনো খোকা, কোনো রকম চালাকি করার চেষ্টা করবে না। কলকাতায় তুমি পালিয়েছিলে, কিন্তু এই দ্বীপ থেকে পালানোর রাস্তা নেই। উল্টোপাল্টা করলে গুলি করে সমুদ্রের মধ্যে ফেলে দেব। কেউ খুঁজে পাবে না।” গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে আরও চারজন লোক বেরিয়ে এল। তারা স্থানীয় লোক, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। একটু থেমে লোকটা আবার বলল, “তোমার বাবা-মাকেও আমাদের লোক টার্গেট করে রেখেছে। অতএব যা বলব চুপচাপ শুনবে। এখন চলো আমাদের সঙ্গে।”
অর্ণব অতর্কিত এই ঘটনায় বেশ ভয় পেয়ে গেছে। তবে ও পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে যে এটা একটা ফাঁদ। অর্ণবের ভাবনা হচ্ছে বাবা-মাকে নিয়ে। ওকে দেখতে না পেয়ে এতক্ষণে ওরা নিশ্চয়ই খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছে। মায়ের মুখটা মনে পড়তেই কান্না পেয়ে গেল। কিন্তু এরা ওর কাছ থেকে কী চায়? বেড়াতে এসে কাউকে টাকার জন্য কিডন্যাপ করবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এমন কী জিনিস আছে ওর কাছে, যার জন্য লোকগুলো এত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে? পাঁচজন সশস্ত্র লোক অর্ণবকে ঘিরে নিয়ে যাচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। যে রাস্তায় ওকে নিয়ে এসেছিল, তার উলটোদিকে। প্রায় মিনিট দশেক হাঁটার পর জঙ্গলটা শেষ হল। সামনে আবার নীল সমুদ্র। অর্ণব লক্ষ্য করল তীরে ভাসছে একটা ছোটো স্পিডবোট। ওকে লোকটা বলল, “নাও, উঠে পড়ো।” কোনো কথা না বাড়িয়ে বাকি লোকজনের সঙ্গে উঠে পড়ল অর্ণব। তারপরেই সমুদ্রে ভেসে পড়ল স্পিডবোট। সমুদ্রের ঢেউ চিরে পড়ন্ত বিকেলে শহীদ দ্বীপ ছেড়ে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে ওরা। কিছুক্ষণ পর অর্ণব যখন পেছন ফিরে তাকাল তখন দ্বীপটি সমুদ্রের মধ্যে মিলিয়ে যেতে বসেছে। আকাশের মেঘে রক্তের মতো লাল রঙ ছড়িয়ে দিয়ে সূর্য ডুবছে। মাছরাঙা পাখিরা ঘরে ফিরছে দল বেঁধে।
অর্ণব কোথায়?
ন্যাচারাল কোরাল ব্রিজে পৌঁছে বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রঞ্জন আর পুষ্পিতা। প্রকৃতির অদ্ভুত সৃষ্টি। বিশাল বড়ো একটা মৃত প্রবালের গেট। নীল সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে যেন সবাইকে ডাকছে, অজানা কোনো মায়াবী দুনিয়ায় যাওয়ার জন্য। পুষ্পিতা হঠাৎ খেয়াল করল অর্ণব পেছনে নেই। সে চিন্তিত গলায় বলল, “অনি কোথায় গেল বলত? এখনও এল না!”
রঞ্জন ছবি তুলতে তুলতে নিশ্চিন্ত গলায় উত্তর দিল, “কোথায় আর যাবে? মাছ ধরা দেখছে হয়তো। নইলে সমুদ্রের ধারে বসে হাওয়া খাচ্ছে। আরে অত চিন্তা কোরো না, ছেলে বড়ো হচ্ছে, ওকে নিজের মতো একটু ঘুরতে দাও।”
তবু পুষ্পিতার মনটা কিছুতেই শান্ত হল না। কয়েকদিন আগেই একদল গুণ্ডা ওকে কলকাতায় কিডন্যাপ করেছিল। যদিও এক রাতের মধ্যেই অর্ণবকে উদ্ধার করতে পেরে ছিল পুলিশ। কিন্তু ঘটনাটা মনে পড়লেই বুকের মধ্যেটা ফাঁকা হয়ে যায় পুষ্পিতার। তাই ইদানিং ছেলেকে একটু বেশিই চোখে চোখে রাখছে ও। এখনও বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে সে। হিসাব করে দেখল মিনিট পনেরো পেরিয়ে গেছে, তবু সে আসছে না। আবার অনুরোধ করল রঞ্জনকে, “চলো, এবার ফিরি, অনি এখনও এল না!”
দুজনেই ফেরার পথ ধরল এবার। কিন্তু পাথরের বাঁকটা নিয়ে যখন অর্ণবকে কোথাও দেখতে পেল না, বুকটা ধড়াস করে উঠল ওদের। দেখল সামনে খোলা জায়গাটা পুরো ফাঁকা, এক ট্যুরিস্ট দম্পতি আসছিল। রঞ্জন উদগ্রীব হয়ে তাদের জিজ্ঞেস করল, “আপনারা লাল গেঞ্জি পরা কোনো বাচ্চা ছেলেকে দেখেছেন?” পুষ্পিতা ফোন থেকে অর্ণবের ছবি বের করে দেখাল। কিন্তু তারা মাথা নাড়ল বারবার। রঞ্জন আর পুষ্পিতা এগিয়ে গিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। যেখানে জেলেগুলো জাল থেকে মাছ ছাড়াচ্ছিল সেখানে এখন কেউ নেই। তবে দু’একটা ছোটো মাছ পড়ে আছে এখনও। আর আছে কয়েকটা কুকুর ছানা। তারা মাছ খেতে ব্যস্ত। ওরা আরও এগিয়ে পাথরের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দু’দিকে সারি দিয়ে বসা দোকানিদের অর্ণবের ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল। কিন্তু সবাই প্রায় একই কথা বলছে। এক মহিলা জানাল, “আপনাদের সঙ্গে যেতে দেখেছি। কিন্তু এই রাস্তায় সে ফেরেনি।”
রঞ্জন জিজ্ঞেস করল, “ওখানে যে দু’জন জেলে জাল থেকে মাছ ছাড়াচ্ছিল, তাদেরকে চেনেন? ওরা তো স্থানীয় লোক?”
বেশ কয়েকজন লোককে জিজ্ঞেস করে জেলে দুজনের নাম পাওয়া গেল, মানিক আর বিশু। তাদের বাড়ি পাশেই জেলে পাড়ায়। ওরা দৌড়াল সেখানে। সরু গলি দিয়ে গিয়ে জেলে পাড়ায় খোঁজ খবর শুরু করতে দুজনের বাড়ি দেখিয়ে দিল পাড়ার লোক। এরা প্রায় সবাই বাঙালি। কলকাতা থেকে বেড়াতে আসা দুজনের ব্যাকুল আর্তি শুনে জড়ো হয়ে গেল অনেকে। মানিককে তার বাড়িতে পাওয়া গেল না, সে বাজারে গেছে মাছ বিক্রি করতে। বিশুকে পাওয়া গেল আরও ক’টা বাড়ি পরে। সে সব শুনে কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “ছেলেটাকে জঙ্গলে ঢুকতে দেখেছি।”
পুষ্পিতা বলল, “একা সে জঙ্গলে ঢুকবে কেন?”
“সে তো একা ছিল না!”
“কে ছিল ওর সঙ্গে?”
“আরও দুজন লোক ছিল।”
“দুজন লোক! কারা তারা? আপনি চেনেন তাদের?”
“না, তবে ট্যুরিস্ট বলেই মনে হল। একজনের গলায় ক্যামেরা ঝুলছিল। আর একজনের মাথায় বড়ো টুপি ছিল। ছেলেটার সঙ্গে কথা বলছিল লোক দুটো। …তবে ওরা জঙ্গলের মধ্যে থেকেই বেরিয়েছিল।”
“সেকি?”
পুষ্পিতা আবার ব্যাকুল ভাবে বলল, “তাহলে এখুনি জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে খুঁজতে হবে!”
“চলুন, আমরাও যাচ্ছি আপনাদের সঙ্গে।” বেশ কয়েকজন লোক এগিয়ে এল ওদের সাহায্য করার জন্য।
আবার একই রাস্তায় ফিরে ওরা এসে দাঁড়াল সমুদ্রের পাড়ে যেখানে মাছ বাছছিল বিশুরা। কুকুরছানাগুলো তখন আর নেই। জায়গাটা ফাঁকা। বিশুই এগিয়ে গিয়ে দেখাল, “এখান থেকে একটা সরু রাস্তা ঢুকে গেছে জঙ্গলের মধ্যে। আসুন এদিকে…”
ওরা একে একে এগোল সেই রাস্তায়। চারিদিকে সামুদ্রিক গুল্মলতাপাতার ঝোপ আর নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে এঁকে বেঁকে অনেকটা ভেতরে ঢুকে গেল ওরা। পুষ্পিতা আর রঞ্জন মাঝে মাঝেই চেঁচিয়ে ডাকছে অর্ণবের নাম ধরে। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। বেশ কিছুটা ঢুকে একটা বড়ো থিটপক গাছে শিকড়ের আড়ালে পড়ে থাকা বেশ কয়েকটা বিড়ির অংশ পেয়ে বিশু বলল, “এখানে বেশ কয়েকজন বসে ছিল সকালে। কাল রাতে বৃষ্টি হয়েছে। এই নরম মাটিতে অনেকের জুতোর ছাপ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।”
“কারা এরা?”
“মনে হচ্ছে স্থানীয় লোক।”
“তবে এদিকের কেউ থাকলে আমরা জানতে পারতাম। অনেকক্ষণ হল খোঁজাখুঁজি চলছে, কেউ না কেউ বলত।”
বিশু মন্তব্য করল, “আর কিছুটা গেলেই সমুদ্র পড়বে। ঐ দিকে আজকে সকালে একটা মোটরবোট নোঙর করা ছিল।”
আর একজন বলল, “কিন্তু এদিকে তো আমাদের মাছ ধরা নৌকা ছাড়া অন্য কোনো বোট আসে না!”
“চলো দেখি!”
সবাই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এসে উপস্থিত হল সমুদ্রের তীরে। ফাঁকা ধুধু তট। কোনো নৌকা সেখানে নেই। তাহলে কি অর্ণবকে এই রাস্তাতেই কেউ কিডন্যাপ করেছে? পুষ্পিতা কান্না ভেজা গলায় বলল, “এখন কী করব আমরা?”
“জেটির পাশে পুলিশ স্টেশনে গিয়ে এখুনি কমপ্লেন করুন। পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।”
রঞ্জন বলল, “সেটাই ঠিক হবে।”
ট্যাক্সিস্ট্যান্ড থেকে গাড়ি নিয়ে পুলিশ স্টেশনে এসে ওরা অভিযোগ জানাল। ইন্সপেক্টর রেড্ডি একজন দক্ষিণ ভারতীয়। মন দিয়ে সব শুনে ইংরাজিতে বললেন, “এরকম ঘটনা এখানে সাধারণত হয় না। বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটে কিন্তু ট্যুরিস্টকে কিডন্যাপের কোনো রেকর্ড নেই। আমরা ওয়্যারলেসে এখুনি কোস্টগার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। মাঝসমুদ্রে কোনো বোট থাকলে ওরা সার্চ করবে। আপনারা চিন্তা করবেন না। আপনার বাচ্চাকে আমরা ঠিক খুঁজে বের করব।”
নীল সমুদ্রের মাঝে
ঘণ্টা দুয়েক বোটটা ফুল স্পিডে ছোটার পর মাঝ সমুদ্রে এবার গতি কমাল। অর্ণব মাথা তুলে দেখল একটা মাঝারি মাপের জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা দূরে। ছোটো বোটটা ধীরে ধীরে সেটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বোটের গায়ে লাগানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে ইশারায় উঠে যেতে বলল অর্ণবকে। সে বিনা প্রশ্নে উঠে গেল ওপরের ডেকে। কালাপাত্থর বিচের সেই লোকদুটোও উঠে এল জাহাজের ওপরে। “এসো আমাদের সঙ্গে।”
অর্ণব ওদের কথা মতো সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল জাহাজের পেটের ভেতরে। সেখানে একটা ছোট্ট খুপরি ঘরের মধ্যে লোকদুটো ঢুকিয়ে দিল ওকে। মেঝেতে ছোটো একটা খাট আর মাথার কাছে রয়েছে প্যাকিং করা খাবার এবং জল। তারমানে এখানেই ওকে বন্দী থাকতে হবে ওকে। অর্ণবের মনটা বড্ড খারাপ হয়ে আছে। কোনো প্রশ্ন করলে একটাও উত্তর দিচ্ছে না লোকগুলো। কেউ যেন ওদের মুখে সেলোটেপ লাগিয়ে দিয়েছে। খুপরি ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে এঁটে দিয়ে চলে গেল ওরা। ঘরের লোহার দেয়ালে কোনো জানালা বা উইন্ডোহোল, কিছুই নেই। শধু জালে ঢাকা একটা ছোটো সিলিং ফ্যান বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে ওপরে আর আলো দিচ্ছে একটা এল ই ডি লাইট। মৃদু দুলছে জাহাজটা। তারমানে ছুটছে জলের ওপর দিয়ে। প্রথমে বসে পড়ল ম্যাট্রেসের ওপর। হাঁটুদুটোর মাঝে মাথাটা ঢুকিয়ে দিয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। জাহাজের দুলুনিতে ক্রমশ ঘুম জড়িয়ে ধরছে চোখে। কখন যে সে শুয়ে পড়েছে সেটা আর খেয়াল নেই। মনে হচ্ছে সে যেন ডুবে যাচ্ছে এক অনন্ত মহাসাগরের কালো জলে।
আক্রান্ত পৃথিবী
দক্ষিণ আন্দামান সাগরে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। দিগন্তজোড়া নীল জলের বুক চিরে একটা জাহাজ এগিয়ে চলেছে। দূরে কোথাও কোথাও সমুদ্রের রং গাঢ় নীল থেকে হঠাৎ সবুজাভ হয়ে উঠছে। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে সেই দিকেই তাকিয়ে ছিল অর্ণব। প্রায় নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়ালেন লম্বা চওড়া চেহারার একজন সুপুরুষ ব্যক্তি। “গুড মর্নিং অর্ণব!” কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠে ঘুরে তাকালো অর্ণব। পাশে দাঁড়িয়ে অরিন্দম রুদ্রপ্রসাদ। শুধু তাঁর চাপ দাড়িটা নেই, একেবারে ক্লিন শেভ্ড, পরনে টান টান শার্ট প্যান্ট। যেন অফিস যাওয়ার জন্য একদম রেডি। তাঁর গলায় ঝোলানো একটা দূরবীন আর হাতে ছোট্ট নোটপ্যাড। সমুদ্রের দিকে আঙুল তুলে তিনি বললেন, “দূরে ঐ যে সবুজ রঙের জল দেখছ, ওর নীচেই আছে ভারতের বিশাল প্রবাল প্রাচীর।”
সকালে যখন অর্ণবের ঘুম ভাঙল, দেখল ঘরের দরজাটা খোলা। বাইরে এসে টয়লেট থেকে ঘুরে সোজা ডেকে এসে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ণব। চারিদিকে শুধু অনন্ত সমুদ্র। বহু দূরে দ্বীপের রেখা দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এরা কে জানে! কিন্তু চারপাশের পরিবেশটা খুব সুন্দর। এখন অরিন্দমবাবুর কথা শুনে সে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি এই জাহাজে কীভাবে এলেন? আপনাকেও কী এরা ধরে নিয়ে এসেছে নাকি?”
“না অর্ণব, আমি এখানে এসেছি একটা বিশেষ অভিযানে তোমার সঙ্গী হবার জন্য।”
“কীসের অভিযান?”
“সমুদ্রের নীচে এক রঙিন দুনিয়ায় নিয়ে যাব তোমাকে। যাবে তো আমার সঙ্গে?”
“তাহলে এই জন্যেই কি আমাকে এখানে ধরে এনেছেন?”
“ধরে না আনলে তুমি কি নিজের ইচ্ছায় আসতে এখানে? যদিও আমি তোমাকে ধরে আনিনি। আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারো। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।”
“কলকাতাতেও তো আপনার লোক কিডন্যাপ করেছিল আমাকে!”
“না, কলকাতায় তোমাকে অন্য একটা গ্রুপ তুলে নিয়ে গিয়েছিল। যাতে তোমাদের আন্দামান আসাটা বানচাল হয়ে যায়। আমিই পুলিশকে খবর দিয়েছিলাম তোমাকে উদ্ধার করার জন্য।”
“কী বলছেন আপনি? আমার তো মাথায় কিছুই ঢুকছে না। আপনি জানতেন যে আমরা আন্দামান আসছি?”
“হ্যাঁ, তোমাদের বেড়ানোর পুরো প্ল্যানটাই আমার করা। তোমার বাবার বন্ধু, মানে মনোজকে হাত করতে হয়েছে। যদিও ও নিজেও জানত না যে সে আমাদের সাহায্য করছে।”
“কারা আপনারা? কোনো টেরোরিস্ট অর্গানাইজেশন?”
হোহো করে হেসে উঠলেন অরিন্দমবাবু, “না না, ভয় পাওয়ার কোনো দরকার নেই। আমরা কোনো টেরোরিস্ট অর্গানাইজেশন নয়। আমরা হলাম ও.পি.ও. অর্থাৎ ওয়ার্লন্ড প্রটেক্টর অর্গানাইজেশন। পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য কিছু বিজ্ঞানী আর বিশেষ কয়েকজন স্পেশাল এজেন্ট সারা দুনিয়া জুড়ে কাজ করে চলেছে দিবারাত্র। আমি তাদেরই একজন। অবশ্য আমাদেরও শত্রুদলও আছে যারা তোমাকে কিডন্যাপ করেছিল।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অর্ণব বলল, “আপনাদের শত্রু কারা? তারা কি পৃথিবীর ক্ষতি চায়?
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ উত্তর দিলেন, “সব ভালোদিকের উলটো দিকে একটা অন্ধকার খারাপ দিকও থাকে অর্ণব। তারা কারো ভালো চায় না।”
“কিন্তু এসব ভালো খারাপের মধ্যে আমাকে জড়ালেন কেন? আমি কী করেছি?”
“ভাগ্যচক্রে তুমি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে গেছ অর্ণব। লামাহাটার কথা মনে আছে? পেম্বা তামাং নামে এক এজেন্ট পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে মারা গিয়েছিল লামাহাটায়। সে ডঃ তানাকা নামে এক সমুদ্রবিজ্ঞানীর ল্যাব থেকে একটা বিশেষ ধরণের প্রবালের অ্যান্টিডোট চুরি করে এনে লুকিয়ে ছিল কালিম্পংএ। তার উদ্দেশ্য ছিল নেপালে গিয়ে মোটা টাকায় সেটা বিদেশী এজেন্টকে বিক্রি করে দেবে। কিন্তু লোকটা আমাদের রাডারে আসার পর ভারতীয় ইন্টেলিজেন্স তাকে ঘিরে ফেলে। সে মারা যাওয়ার সময়ে ঐ অ্যান্টিডোটের স্যাম্পেল তোমার শরীরে পুশ করে দিয়েছিল। যদিও এর মধ্যে তোমার কোনো ভূমিকা নেই। এরপরে তোমার যখন জ্বর হয়েছিল সেই রক্তের নমুনা আমরা পরীক্ষা করেছি। তোমার শরীরের মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন তৈরি হয়েছে। আমাদের ধারণা প্রবাল আর মানুষের মধ্যে তুমি একটা সেতুবন্ধন করতে পারবে। তাই তোমাকে নিয়ে এসেছি। তোমার সাহায্য চাই।”
কথাগুলো শুনে হাঁ হয়ে গেল অর্ণব। অরিন্দমবাবু ওর মনের অবস্থা বুঝে মুচকি হেসে বললেন, “ভয় পেও না, এসো সামনে ডেকের চেয়ারে বসি। আমি বুঝিয়ে বলছি তোমাকে।”
ওরা চেয়ারে বসতেই জাহাজের একজন ক্রু এসে সামনের টি টেবিলে কফি আর কিছু স্ন্যাক্স রেখে গেল। অর্ণব প্রথমেই হাত বাড়াল স্ন্যাক্সের দিকে। অনেকক্ষণ থেকেই ওর খিদে খিদে পাচ্ছে। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ একটা কফির কাপ তুলে নিয়ে ছোটো করে চুমুক দিয়ে আবার ঘুরে তাকালেন সমুদ্রের দিকে। অর্ণব বলল, “আমার বাবা-মা নিশ্চয়ই খুব চিন্তা করছে আমার জন্য। শহীদ দ্বীপে এখনও হয়ত আমাকে খুঁজছে তারা!”
“রঞ্জন আর পুষ্পিতা এখন পোর্টব্লেয়ারে ফিরে এসেছেন। আছেন তোমার বাবার বন্ধু মনোজের বাড়িতে। তুমি ওদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলে নাও। বলবে আমার সঙ্গে আছো। সমুদ্রের নীচে বেড়ানো সেরে আগামীকাল বা পরশু ফিরবে। বাকি যা বোঝানোর আমাদের টিমের লোক ওদের বুঝিয়ে বলবে।” অরিন্দমবাবু নিজের ফোন থেকে কল করে এগিয়ে দিলেন অর্ণবের দিকে। অনেকক্ষণ কথা হল ওদের সাথে।
তারপর অর্ণব ফোনটা ডক্টর রুদ্রপ্রসাদকে ফিরিয়ে দিয়ে জানতে চাইল, “এবারে আমাকে সব কিছু আপনি খুলে বলুন।”
“নিশ্চয়ই! বুদ্ধিমান বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলতে বরাবরই আমার খুব ভালো লাগে।” কফিতে একটা চুমুক দিয়ে তিনি শুরু করলেন, “পৃথিবীতে প্রথম এককোষী প্রাণের সৃষ্টি হয়েছিল আনুমানিক ৩৮০ কোটি বছর আগে। এর অনেক পরে মোটামুটি ২৪ কোটি বছর আগে সমুদ্রের জলে প্রথম প্রবাল তৈরি হয়। অবাক করা বিষয় হল, প্রায় সেই সময়ের কাছাকাছিই পৃথিবীতে বিবর্তনের মাধ্যমে ধাপে একে একে সৃষ্টি হচ্ছিল বিভিন্ন জটিল শরীরের প্রাণীরা। আগামী আরও কয়েক কোটি বছরে তারা পৃথিবীর জল ও স্থলে বিপুল ভাবে বংশবিস্তার করে। এদের মধ্যে ডাঙায় রাজত্ব করে ডাইনোসর আর আরো পরে জলে তিমির পূর্বপুরুষেরা। ডাইনোসর যুগের শেষ হবার অনেক অনেক পরে, মাত্র ৩০ লক্ষ বছর আগে মানুষেরা প্রথম পৃথিবীতে পা রাখে। এর মধ্যে বহু প্রাণী পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার তৈরিও হয়েছে নতুন অনেক নতুন প্রজাতি। কিন্তু সমুদ্রের মধ্যে প্রবালের বংশ এখনও রয়ে গেছে। একদল সমুদ্রবিজ্ঞানী প্রবালের ওপর বেশ কয়েক দশক ধরে এই নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁরা বিশেষ এক প্রজাতির প্রবালের মধ্যে সন্ধান পেয়েছেন প্রাচীন এক ডিএনএর। তাঁদের মতে এই ডিএনএ এসেছিল পৃথিবীর বাইরে থেকে। সম্ভবত কোনো উল্কাপিণ্ডের সঙ্গে পৃথিবীর জলে এসে পড়েছিল এরা। সেই সময়ে জলে ঘুরে বেড়ানো এককোষী প্রাণীদের সঙ্গে পৃথিবীর বাইরে থেকে আসা প্রবালের জিন মিশে তৈরি হয় প্রথম জটিল কোষ। তারপর সেই হাইব্রিড কোষ থেকে ক্রমশ জন্ম নিতে থাকে কোটি কোটি জটিল শরীরের প্রাণীরা। যারা পরে আরও অনেক সময় ধরে বংশবৃদ্ধি করে পৃথিবীকে এত রঙিন আর সুন্দর বানিয়েছে।” একটু থেমে ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ অর্ণবের চোখের মধ্যে দিয়ে ওর ভেতরটা যেন পড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। তারপর আবার বললেন, “বর্তমান সময়ে বিশ্বের কিছু জেনেটিক রিসার্চ ল্যাব সেই আদিম প্রবাল খোঁজার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রের নীচে আন্ডার ওয়াটার রিসার্চ টিম পাঠাচ্ছে। তাদের মধ্যে চলছে চোরাগোপ্তা লড়াই। কারণ সেই বিশেষ ধরণেরপ্রবাল যারা প্রথম খুঁজে পাবে তারাই কৃত্তিম অ্যান্ড্রয়েড হিউম্যানের শরীরে জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে সমগ্র সৌরজগতের অধিকার দখল করবে। এই তত্ত্ব যদিও এখনও পরীক্ষিত সত্য নয়। তবুও কিছু পাগল বিজ্ঞানী নেমেছে নোংরা ইঁদুর দৌড়ে।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অর্ণব হঠাৎ বলল, “আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“অবশ্যই। বিজ্ঞান শুরুই হয় প্রশ্ন থেকে।”
“প্রবাল বা প্রবালরা কি সত্যিই প্রাণী? আমি তো সবসময় ভাবতাম ওগুলো রঙিন পাথর বা সমুদ্রের গাছপালা।”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ হেসে বললেন, “তুমি একা নও। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই নিয়েই বিভ্রান্ত ছিল। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের অনেকে প্রবালকে উদ্ভিদ মনে করতেন। কারণ এরা নড়াচড়া করে না, দেখতে গাছের মতো, আবার পাথরের মতো শক্ত।”
“তাহলে বিজ্ঞানীরা বুঝলেন কীভাবে?”
“অনেক পরে, যখন অণুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার শুরু হলো। বিজ্ঞানীরা দেখলেন প্রবালের শরীরে প্রাণীদের মতো কোষ, টিস্যু আর খাদ্য ধরার ব্যবস্থা আছে। তখনই বোঝা গেল প্রবাল আসলে সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী।”
অর্ণব বিস্ময়ে চোখ বড়োবড়ো করল, “মানে ওদের হাড় নেই?”
“হ্যাঁ। ওরা সিন্ডারিয়া পর্বের প্রাণী। জেলিফিশ আর সি অ্যানিমোনও এই একই দলে পড়ে।”
“আচ্ছা, একটা প্রবাল কি একটা প্রাণী?”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ মাথা নাড়লেন, “না। একটা প্রবাল আসলে অসংখ্য ছোটোছোটোপ্রাণীর উপনিবেশ। প্রতিটিছোটো প্রাণীকে বলে ‘পলিপ’।”
“পলিপ দেখতে কেমন?”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ ব্যাগ থেকে একটা ট্যাবলেট বের করলেন। তাতে প্রবালের একটি বড়ো করে তোলা ছবি দেখালেন। “দেখো, পলিপটা ছোট্ট থলির মতো। মাঝখানে একটা মুখ, চারপাশে শুঁড়। অনেকটা উল্টো জেলিফিশের মতো দেখতে, তাই না!”
অর্ণব অবাক হয়ে বলল, “এত ছোটো!”
“হ্যাঁ। বেশিরভাগ পলিপ মাত্র কয়েক মিলিমিটার বড়ো হয়। কিন্তু লক্ষ লক্ষ পলিপ একসঙ্গে মিলেমিশে বিশাল প্রবাল প্রাচীর তৈরি করে। চলো তোমাকে বরং আমি জলের মধ্যে নিয়ে যাই।” বলে একজন ক্রুকে ইশারা করতে সে একটা গ্লাসবটম বোট নিয়ে এসে লাগাল জাহাজের গায়ে। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ আর অর্ণব উঠে গেল সেটাতে। হ্যান্ডমোটর চালাতেই তীরবেগে ছুটতে শুরু করল সেটা। নীল দ্বীপে এই ধরণের নৌকায় সে গতকালই চড়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকার কাচের তলা দিয়ে নীচে দেখা গেল অদ্ভুত সুন্দর রঙিন প্রবাল। ড্রাইভার আস্তে করে দিল নৌকাটা। অর্ণব দেখল কোথাও হরিণের শিংয়ের মতো, কোথাও গোল মস্তিষ্কের মতো, কোথাও আবার বিশাল ফুলের মতো। অর্ণব উত্তেজিত হয়ে বলল, “এত রকম আকার কেন?”
“কারণ প্রবালের বিভিন্ন প্রজাতি বিভিন্নভাবে বাড়ে। কেউ ঝোপের মতো, কেউ পাতার মতো, কেউ স্তম্ভের মতো। পরিবেশ, আলো আর জলের স্রোতের ওপরও এদের আকার নির্ভর করে।”
“এরা কি নিজেরাই এই শক্ত কাঠামো বানায়?”
“ঠিক তাই। প্রতিটা পলিপ নিজের শরীরের নীচে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট নিঃসরণ করে। ধীরে ধীরে সেটা শক্ত কঙ্কালে পরিণত হয়।”
“মানে সমুদ্রের নীচে ওরা নিজেরাই বাড়ি বানায়!”
“হ্যাঁ। আর সেই বাড়ির ওপর নতুন পলিপ জন্মায়। পুরোনো পলিপ মারা গেলেও তাদের কঙ্কাল রয়ে যায়। হাজার হাজার বছর ধরে এভাবেই বিশাল প্রবালপ্রাচীর বা রিফ তৈরি হয়।”
অর্ণব চুপচাপ নীচের দিকে তাকিয়ে রইল। পায়ের নীচে স্বচ্ছ কাচের মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছে অসাধারণ সুন্দর প্রবাল সাম্রাজ্য। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ আবার বললেন, “তুমি কি জানো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো জীবন্ত কাঠামো হলো এই প্রবাল প্রাচীর?”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বেরিয়ার রিফ মহাকাশ থেকেও দেখা যায়।”
অর্ণব বিস্ময়ে বলল, “দারুণ বাপার!” কিছুক্ষণ পরে সে আবার প্রশ্ন করল, “কিন্তু প্রবাল খায় কী?”
“ভালো প্রশ্ন। ওদের শুঁড়ে থাকে বিশেষ দংশন কোষ নেমাটোসিস্ট। এগুলো ছোটো প্ল্যাঙ্কটন বা মাছের বাচ্চাকে অবশ করে খেয়ে নেয়।”
“মানে এরা শিকারিও?”
“অবশ্যই। তবে এদের প্রধান শক্তির উৎস অন্য জায়গায়।”
“কোথায়?
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ জলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রবালের শরীরের ভেতরে থাকে অতি ক্ষুদ্র এক ধরণের শ্যাওলা, যাদের বলে জুজানথেলি।”
“ওরা কী করে?”
“সূর্যের আলো ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে। সালোকসংশ্লেষ করে ঠিক গাছের মতো। তারপর সেই খাবারের বড়ো অংশ প্রবালকে দেয়।”
অর্ণব জানতে চাইল, “আর প্রবাল ওদের কী দেয়?”
“নিরাপদ আশ্রয়, কার্বন ডাই অক্সাইড আর পুষ্টি।”
অর্ণব হেসে বলল, “মানে একেবারে গিভ এন্ড টেক ফ্রেন্ডশিপ।”
“ঠিক তাই। এই সম্পর্ক ছাড়া অনেক প্রবাল বাঁচতেই পারবে না।”
জলের নীচে অর্ণব হঠাৎ একটা সাদা অংশ দেখে জিজ্ঞাসা করল, “ওই প্রবালগুলো সাদা কেন?”
ডক্টর সেনের মুখ একটু গম্ভীর হয়ে উঠল। বলল, “ওগুলো সম্ভবত ব্লিচডকোরাল।”
“ব্লিচড কোরাল মানে?
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ বুঝিয়ে বললেন, “যখন সমুদ্রের জল খুব গরম হয়ে যায় বা দূষিত হয়, তখন প্রবাল চাপে পড়ে যায়। তখন তারা শরীর থেকে সেই শৈবালদের বের করে দেয়।”
“তাহলেই রং চলে যায়?”
“হ্যাঁ। কারণ প্রবালের বেশিরভাগ রং আসে ওই শৈবালদের থেকে। শৈবাল চলে গেলে শুধু সাদা কঙ্কাল দেখা যায়।”
“তারপর কি তারা মারা যায়?”
“যদি দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, তাহলে মারা যায়।”
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস করল, “শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মরে যায় ওরা?”
“অনেকটা তাই। সমুদ্রের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে, জলে বেশি অ্যাসিড মিশছে। তারপর আছে প্লাস্টিক দূষণ, রাসায়নিক বর্জ্য, সব মিলিয়ে প্রবালরা এখন ভীষণ বিপদে।”
হঠাৎ জাহাজের পাশে একদল উড়ুক্কু মাছ জল থেকে লাফিয়ে উঠল। বড়ো মানুষের এক বিঘত করে তাদের সাইজ। অর্ণব মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ বললেন, “জানো তো, প্রবালপ্রাচীর শুধু সুন্দর নয়, এটা কোটি কোটি প্রাণীর বাড়ি। সামুদ্রিক প্রাণীদের একএকটা শহর বলা চলে।”
“কোন কোন প্রাণী?”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ জানালেন, “ছোটো বড়ো হাজারো মাছ, অক্টোপাস, সি-হর্স, কাঁকড়া, স্পঞ্জ, সামুদ্রিক শামুক সহ আরও অসংখ্য প্রাণীরা থাকে এই কলোনিতে। ‘ফাইন্ডিং নিমো’ নামে সেই এ্যানিমেশন সিনেমাটা তুমি দেখেছ তো? সেখানে যে হলুদ কালো ডোরাকাটা ক্লাউন ফিশকে নিয়ে গল্পটা ছিল, ঐ দেখো এক ঝাঁক ক্লাউন ফিশ যাচ্ছে জলের নীচে। রিফ মানে ওদের কলোনি না থাকলে ওরা কোথায় থাকবে? অনেকেই বাঁচতে পারবে না।”
অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “এরা মারা গেলে কি মানুষেরও ক্ষতি হবে?
“অবশ্যই হবে। প্রবালপ্রাচীর সমুদ্রের ঢেউয়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ শক্তি শোষণ করে নেয়। তাই ঝড় আর সুনামির ধাক্কা থেকে উপকূলকে রক্ষা করে। প্রবালপ্রাচীর না থাকলে সমুদ্র তার উপকুলের জমি গ্রাস করে গোটা পৃথিবীর স্থলভাগ অনেক দ্রুত কমিয়ে দিত।”
অর্ণব হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মানে প্রবাল না থাকলে সমুদ্রতীর ভেঙে যেতে পারে?”
“হ্যাঁ। আরও বড়ো সমস্যা হলো বহু মানুষের জীবিকা অনেকটাই রিফের ওপর নির্ভর করে। মাছ ধরা, পর্যটন, সবই।”
ঠিক তখন এক ডুবুরি জাহাজে উঠে এল। তার হাতে কয়েকটা ছোট্ট প্রবালের টুকরো। অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “ওগুলো কেন এনেছেন?”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ জানালেন, “এগুলো কোরাল ফার্মিংএর জন্য। বিজ্ঞানীরা এখন নার্সারিতে প্রবাল চাষ করছেন।”
“কীভাবে?”
“ভাঙা প্রবালের ছোটো অংশ নিয়ে বিশেষ ফ্রেমে বসানো হয়। সেখানে কৃত্রিম ভালো লালনপালন করা হয়। প্রবালগুলো ধীরে ধীরে বড়ো হয়। পরে সেগুলোকে আবার সমুদ্রে বসানো হয়। একে প্রবাল গার্ডেনিংও বলা হয়।”
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। সোনালি আলোয় সমুদ্র ঝিকমিক করছে। দূরে ডুবুরিরা আবার জলে নামছে। অর্ণব ধীরে ধীরে বলল, “আগে ভাবতাম প্রবাল শুধু ঘর সাজানোর কাজে লাগে। এখন মনে হচ্ছে ওরা সমুদ্রের মধ্যে রঙিন শহর।”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ মৃদু হেসে বললেন, “ঠিকই বলেছ। প্রতিটি রিফ আসলে এক জীবন্ত মহানগর। সেখানে জন্ম হয়, মৃত্যু হয়, শিকার হয়, বন্ধুত্ব হয়, আবার জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধও হয়।”
“আর আমরা?”
“আমরাও এই পৃথিবীর এই একই জলের অংশ। প্রবাল মারা গেলে শুধু সমুদ্রের ক্ষতি হয় না, শেষ পর্যন্ত মানুষেরও ক্ষতি হয়। কিন্তু কিছু বিশেষ ধরণের প্রবালের জন্য আমরাও তো একটা বড়ো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি …!”
অর্ণব অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল সমুদ্রের নীলজলের দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, “আমরা কখন যাব জলের নীচে?”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ জানালেন, “আমার এক বন্ধু আসার কথা আছে। লিও রয়। বেলিজ রিফের দুর্ঘটনায় সেই একমাত্র ব্যক্তি, যে বেঁচে আছে। তার জন্যই অপেক্ষা করছি। আমরা জলের নীচে গিয়ে যে ধরণের প্রবালপ্রজাতির সম্মুখীন হব সেটা আর পাঁচটা প্রবালের মতো নয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা এরা সম্পূর্ণ অন্য ধরণের, বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী… হয়তো ভিনগ্রহ থেকে এসেছিল কয়েক কোটি বছর আগে। এদের সম্পর্কে খুব বেশি এখনো জানা যায়নি। তিনটে জায়গাতে পাওয়া গেছে এদের। ক্যারিবিয়ান সাগরে বেলিজ বেরিয়ার রিফ, অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বেরিয়ার রিফ আর নিকোবরের কাছে এই জায়গাতে। এছাড়াও সমুদ্রের গভীরে এরা কোথায় কোথায় আছে তা নিয়ে গবেষণা চলছে।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ বায়নাকুলার তুলে নিলেন চোখে। তাঁর ঠোঁটে দেখা গেল মৃদু হাসি, “ঐ যে হাজির হয়ে গেছেন লিও রয়।” অর্ণব দেখল মাঝারি মাপের একটা কালো স্পিডবোট ছুটে আসছে এদিকে।
নীল জলের অতলে
অর্ণব কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইল। মিনিট পাঁচেক পরে প্রথম স্পিডবোটটি জাহাজের গায়ে এসে লাগল। লোহার সিঁড়ি বেয়ে একজন লম্বা, আঁটোসাঁটো পোশাক পরা মিলিটারি চেহারার মানুষ দ্রুত ডেকে উঠে এলেন। রোদে পোড়া মুখ, সাদা দাড়ি, ডান ভ্রূর ওপর পুরোনো কাটা দাগ, তবে চোখদুটো বেশ হাসিখুশি। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ পরিচয় করিয়ে দিলেন অর্ণবের সঙ্গে।
“ইনি আমার পুরানো বন্ধু লিও রয়। আমি যখন মিচিগান ইউনিভার্সিটিতে পড়াতাম, সেই সময়ে পরিচয় হয়েছিল এঁর সঙ্গে। লিও পরে আমেরিকান নেভিতে যোগ দেয়। ওর বাবা ছিলেন ভারতীয় বাঙালি।”
লিও মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে বললেন, “তুমিই অর্ণব?”
হেসে মাথা নাড়ল অর্ণব।
“তোমার সম্পর্কে শুনেছি।”
অর্ণব অবাক হয়ে বলল, “আমার সম্পর্কে!”
লিও কোনো উত্তর দিলেন না। মৃদু হেসে তিনি সোজা ডক্টর রুদ্রপ্রসাদের দিকে তাকালেন। দু’জনের চোখে সামান্য ইশারা হল এক মুহূর্তের জন্য। কেউ কোনও কথা বললেন না। তারপর দু’জন পরস্পরের হাত শক্ত করে ধরলেন। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ ধীরে বললেন, “তুমি বেলিজ রিফ থেকে বেঁচে ফিরেছ… এটাই অনেক!”
লিও দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “বেঁচে ফিরেছি… ঠিক কথা, কিন্তু আমি যা দেখেছি… তা হয়তো দেখা উচিত ছিল না।”
হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে জাহাজের কনফারেন্স রুমে বসল সবাই। পেছনে দেয়ালের ওপর বড়ো ডিজিটাল স্ক্রিন। লিও তাঁর পকেট থেকে একটা মাইক্রোচিপ বের করে এগিয়ে দিলেন অপারেটরের দিকে। বললেন, “এমনি হাসপাতালে ছিলাম অনেকদিন। তারপর কেটেছে একটা মানসিক হাসপাতালে। এই চিপটা যে আবার খুঁজে পাব, সে আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। এগুলোই আমার ক্যামেরায় শেষ রেকর্ডিং।”
স্ক্রিনে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল বেলিজ বেরিয়ার রিফের তলদেশ। প্রথমে রঙিন প্রবাল। তারপর… জাপানি দল আর আমেরিকান টিম। তারপর হঠাৎ সিগন্যাল কেঁপে উঠল। ভিডিওতে অসংখ্য নীল আলোর বিন্দু। ক্যামেরার মাইক্রোফোনে শুধু শোনা যাচ্ছে, টিক… টিক… টিক…”
অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “এটা কীসের শব্দ?”
লিও বললেন, “ওগুলো… ওরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলছিল।”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ চুপচাপ ভিডিও দেখছিলেন। কোনো কথা বললেন না। ভিডিও এগিয়ে চলল। তারপর হঠাৎ পুরো স্ক্রিন নীল আলোয় ভরে গেল। একটা বিশাল কালো রঙের আবছা প্রবালের গঠন যেন ভেসে উঠছে। অর্ণব নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল সেই দিকে। কিন্তু ঠিক সেই সময় ভিডিও থেমে গেল। লিও জানালেন, “এর পরের ঘটনাগুলো ক্যামেরা রেকর্ড করতে পারেনি।”
“কেন?”
“কারণ… সব ইলেকট্রনিক্স সিস্টেম একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।”
ঘরে কয়েক মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ। তারপর ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ বললেন, “মুখে বলো, ঠিক কী দেখেছিলে?”
লিও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। মনে হল যেন তিনি কথাগুলো বলতে চাইছেন না। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি শুরু করলেন, “আমরা ভেবেছিলাম আমরা প্রবাল খুঁজতে গেছি। আসলে…” বলে তিনি আবার চুপ করলেন।
“আসলে কী?”
“প্রবালই আমাদের খুঁজছিল।”
অর্ণব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“মানে?” ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ কিছুটা কাছে এগিয়ে এলেন।
“সেদিন প্রবালরা আমাদের আক্রমণ করেনি। ওরা প্রথমে পর্যবেক্ষণ করেছে। তারপর আমাদের প্রত্যেকের শরীর স্ক্যান করেছে।”
অর্ণব প্রশ্ন করল, “কীভাবে?”
লিও উত্তর দিলেন, “জলের মাধ্যমেই স্ক্যান করল ওরা। জৈবতড়িতের অনুরণন কাজে লাগিয়েছে।”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ মাথা নাড়লেন। লিও আরও বললেন, “মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ পড়তে পারে ওরা।”
“তারপর?”
“তারপর… আমার মাথার ভেতর কী যে হল? সব চিন্তাভাবনা যেন গুলিয়ে যেতে লাগল। কীভাবে যে বেঁচে ফিরলাম আমার তাও মনে নেই। অনেকদিন হাসপাতালে ছিলাম। তারপর বছরখানেক স্মৃতিভ্রম নিয়ে মানসিক হাসপাতালে কাটালাম। কিন্তু পাঁচ বছর আগের সেই দিনের ছবি এখনও চোখের সামনে ভাসছে।”
“তুমি যে বললে বেলিজ রিফে তোমাদের প্রবালরা আক্রমণ করেনি, তাহলে কারা তোমাদের লোকেদের সলিলসমাধি ঘটাল আর জাহাজগুলো ডুবিয়ে দিল?”
“এজেন্ট জিরোর লোক।”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ কথাটা শুনেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। পায়চারি করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, “এরা কারা?”
“ফিনল্যান্ডের এক ধনকুবের লুকাস পোহানপালো এদের বস। এখন ডার্ক ওয়েভের সিংহভাগ এদের কন্ট্রোলে। বড়ো বড়ো দেশের মাফিয়া আর এজেন্টরা সাইবার হ্যাকিংএর জন্য এদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সারা পৃথিবীজুড়ে এদের নেটওয়ার্ক ছড়ানো আছে। বেলিজে আমাদের জাহাজ ডুবিয়েছিল এদেরই সাবমেরিন। এরাই ডক্টর তানাকার ল্যাব থেকে জেনেসিস কোড চুরি করেছিল।”
“তারমানে কলকাতায় অর্ণবকে আটকে রাখার পেছনেও নিশ্চয়ই এদের হাত ছিল।”
“হতেই পারে, কোনো লোকাল এজেন্টকে কন্ট্র্যাক্ট দিয়েছিল নিশ্চয়ই।”
“হুম…!”
জাহাজের বাইরে নিকোবরের আকাশে তখন কালো মেঘ জমছে। সমুদ্রের হাওয়া আচমকা যেন ঠান্ডা হয়ে গেল। রাডার অপারেটর কাঁপা গলায় জানাল, “স্যার… একটা সমস্যা দেখা যাচ্ছে।”
“কী?”
“জলের নীচে… কিছু একটা আছে। আমাদের জাহাজের সমান্তরালে একটা বিশাল বস্তু এগোচ্ছে। কিন্তু আমাদের সিস্টেম কিছুতেই ডিটেক্ট করতে পারছে না।”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ বললেন, “কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাবমেরিন হতে পারে।”
লিও ধীরে ধীরে জানালার বাইরে অন্ধকার সমুদ্রের দিকে তাকালেন। খুব আস্তে বললেন, “ওটা আমাদের অনুসরণ করছে… সেই বেলিজ রিফ থেকে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে জাহাজের নীচে সমুদ্রের জল একবার প্রবলভাবে ফুলে উঠল। মনে হল, গভীর অন্ধকারের তলা থেকে বিশাল কোনও কিছু একটা পাশ কাটিয়ে চলে গেল। ডেকের সবাই একসঙ্গে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু কেউ কিছু দেখতে পেল না। তবে সবাই অনুভব করল। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ ভাবলেন ভারত মহাসাগরের মধ্যে কারা নজর রাখছে ওদের ওপর? এজেন্ট জিরো কি?
আরও প্রায় আটচল্লিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে অর্ণব দিনে ও রাতে বেশ কয়েকবার স্কুবাড্রাইভের পোশাক পরে গভীর জলে নেমে ছিল লিও রয়ের সঙ্গে। আন্ডারওয়াটার পোশাক পরে জলের মধ্যে চলা ফেরার বিশেষ কিছু পদ্ধতি আর নিয়ম আছে। লিও রয় ধৈর্য্য নিয়ে বুঝিয়ে দিলেন অর্ণবকে। বাবা-মার সঙ্গে ওর ভিডিও কলে কথা হয়েছে বেশ কয়েকবার। ওরা দুজনেই পোর্টব্লেয়ারে আটকে আছে অর্ণবের ফিরে আসার অপেক্ষায়।
নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরে বিস্তৃত গভীর নীল জলরাশির বুক চিরে এগিয়ে চলেছে ওদের জাহাজ ‘সমুদ্রবিজয়’। অন্ধকার রাত। নিস্তব্ধ প্রকৃতি। কালো আকাশে জ্বলজ্বল করছে কোটি কোটি নক্ষত্র। কিন্তু জাহাজের কনফারেন্স রুমে তখনও আলো জ্বলছে। টেবিলের ওপর একটি বিশাল ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মানচিত্র। সেই দিকে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছেন ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ, লিও রয়, অর্ণব এবং আরও কয়েকজন মেরিন অফিসার। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ নিজের মনে বিড় বিড় করছেন, “বেলিজ বেরিয়ার রিফ, গ্রেট বেরিয়ার রিফ, ফিলিপিনসের সুলু সাগর, ইন্দোনেশিয়ার রাজা আমপাত, তারপর গ্রেট নিকোবর…” ডঃ রুদ্রপ্রসাদ একটি পেন দিয়ে টেবিলের মানচিত্রে টোকা মারলেন, “আমার মনে হয়, এসব কিছুর মধ্যে একটা কানেকশন আছে, বুঝলে লিও! আমরা সেটা ঠিক ধরতে পারছি না।”
“আমার মনে হচ্ছে সমুদ্রের নীচে দিয়ে এদের একটা জাল ছড়ানো আছে!”
“ন্যাচারাল ইন্টারনেট সিস্টেম!”
“হ্যাঁ, আর এই আদিম যোগাযোগ ব্যবস্থার খোঁজ পেয়ে এজেন্ট জিরো এটাকে হস্তগত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।”
“এই কারণেই কি এজেন্ট জিরো বেলিজে আমাদের মেরে ফেলতে চেয়েছিল?”
“আমার তো সেটাই মনে হচ্ছে। যাতে এই আবিষ্কারটা অন্য কারো হাতে গিয়ে না পৌঁছায়। ভেবে দেখো আমাদের ইন্টারনেট সিস্টেমে যেমন সার্ভার থাকে, তেমনই এই প্রাকৃতিক পদ্ধতিতেও হয়ত সমুদ্রের নীচে কয়েকটা জায়গাতে সার্ভার বসানো আছে। এই যে এখানে ম্যাপে লক্ষ্য কর নিকোবরের দক্ষিণ থেকে আমাদের সোনার সিস্টেম নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে একটা অচেনা সিগন্যাল পাচ্ছে। আমরা এখন সেই দিকেই এগোচ্ছি।”
বেশ কিছুক্ষণের নীরবতা কাটিয়ে অর্ণব প্রশ্ন করল, “বেলিজ বেরিয়ার রিফে যেটা পাওয়া গিয়েছিল, সেটা কি আসল প্রোটো প্রবাল ছিল না?”
“না।” লিও রয় শান্তভাবে উত্তর দিলেন। “ওটা ছিল একটা জীবন্ত ‘বেকন’।”
ঘরের সবাই অবাক। অর্ণব জানতে চাইল, “বেকন! সেটা কী জিনিস?”
লিও বললেন, “ভাবো, মহাকাশে একটা রিলে স্টেশন। বেলিজের প্রবাল ছিল সেই রকমই। ওটা নিজে কোনো উৎস নয়, শুধুমাত্র উৎসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।”
ডঃ রুদ্রপ্রসাদ তাঁর ল্যাপটপ খুললেন। সেটা দেখিয়ে বললেন, “এই দেখো বেলিজ অভিযানের শেষ কয়েক সেকেন্ডের ডেটা।” স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা গ্রাফ। নীল রঙের স্পন্দন। তিনি বললেন, “শেষ বিস্ফোরণের ঠিক ০.৭ সেকেন্ড আগে প্রবালটি একটা সংকেত পাঠিয়েছিল।”
অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?”
ডঃ রুদ্রপ্রসাদ আরেকটি মানচিত্র খুললে দেখালেন একটা লাল বিন্দু। অর্ণব বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, “এটা তো…!”
“গ্রেট নিকোবরের দক্ষিণ পশ্চিমে, গ্রেট চ্যানেলের গভীর সমুদ্র।”
ঠিক সেই সময়েই হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ফিনল্যান্ডে ‘এজেন্ট জিরো’র সদর দপ্তরে বিশাল ঘরের মাঝখানে একটি ত্রিমাত্রিক পৃথিবী ঘুরছে। প্রায় সমস্ত স্যাটেলাইটকে হ্যাক করে রেখেছে এরা। একজন মহিলা এজেন্টের তীক্ষ্ণ নজর ভারত মহাসাগরের ওপর। সে তার বসকে খবর পাঠাল, “অ্যালার্ট মেসেজ… ভারতীয় নৌবাহিনী আন্দামান নিকোবরের দক্ষিণ অঞ্চলে নজরদারি বাড়িয়েছে।”
পোহানপালো হালকা হাসলেন গোঁফের নীচে, “তারা এখনও জানে না যে তারা কী পাহারা দিচ্ছে..! চিন্তা নেই আমরা জলের অনেকটা নীচে রয়েছি। আর আমাদের ব্লু হোয়েল সাবমেরিনকে শনাক্ত করার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো যন্ত্রে নেই।”
জেনেসিস কোর
ইন্দিরা পয়েন্ট থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে তখন ঘড়িতে ঠিক রাত দুটো বেজে সতেরো মিনিট। আকাশের গায়ে চাঁদ নেই। শুধু কোটি কোটি নক্ষত্র। নীচে চার হাজার মিটার গভীর অন্ধকার জল। সমুদ্রের বুকের ওপর ‘সমুদ্রবিজয়’ নিঃশব্দে ভাসছে। ডেকে দাঁড়িয়ে অর্ণব বুঝতে পারছিল, সমুদ্র আজ অন্যরকম। কোনও ঢেউ নেই। কোনও বাতাস নেই। মনে হচ্ছে যেন সমুদ্র নিজেই নিঃশ্বাস আটকে আছে।
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ ধীরে ধীরে বললেন, “এই জায়গাটার আমরা নাম দিয়েছি জেনেসিস বেসিন।”
অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “বেলিজের সেই প্রবাল শেষ সংকেত এখানেই পাঠিয়েছিল?”
“হ্যাঁ।”
লিও রয় অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। জাহাজের ডেক থেকে নীচে উঁকি মেরে বললেন, “আজকে তোমাদের নতুন একটা যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় করাব, যার অফিশিয়াল নাম ‘অগ্নিবীণা-১’। সে জাহাজের গায়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”
ঢেউ খেলানো কালো জলের ওপর সামান্য মাথা তুলে ভাসছে ক্যাপসুলের মতো একটা বস্তু। সেটার গা দিয়ে হালকা নীল রঙের একটা মৃদু আলোয় জিনিসটার অবয়ব বোঝা যাচ্ছে। অর্ণব জানতে চাইল, “এটা কি সাবমেরিন?”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ বললেন, “শুধু সাবমেরিন বললে ভুল হবে। অগ্নিবীণা হল ডি. আর. ডি. ও, ইসরো এবং মার্কোসের যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটা অত্যাধুনিক স্বয়ংসম্পূর্ণ এ.আই. পরিচালিত সাবমেরিন। ক্যাপ্টেন মহেশ আমাদের জন্য এর মধ্যে অপেক্ষা করছেন। চলে এসো আমার সঙ্গে।”
জাহাজের গায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটা গোল মুখ সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে গেল ওরা। ভেতরে সরু লম্বাটে একটা করিডোর। এখানেও হাল্কা নীল আলো জ্বলছে। চলছে শীততাপ নিয়ন্ত্রণ সিস্টেম। কিছুটা গিয়ে ওরা পৌঁছাল কন্ট্রোল রুমে। সেখানে গোটা দেয়ালে মোড়া ভিজুয়াল স্ক্রিনে সমুদ্রের নীচের চারপাশটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বাইরেও জ্বলছে নীল আলো। ইউনিফর্ম পরা দুজন অফিসার সেখানে অপেক্ষা করছিলেন ওদের জন্য। একজন হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে বললেন, “আমি ক্যাপ্টেন মহেশ আর ইনি হলেন আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যাপ্টেন নীলাদ্রি। আপনাদের সবাইকে ‘অগ্নিবীণা-১’এ স্বাগত!”
গোল করে রাখা আরামদায়ক চেয়ারে ওরা সবাই বসতেই সিটবেল্ট আপনা থেকেই ওদের কোমরের সঙ্গে আটকে গেল। তারপরেই নিজে থেকে চলতে শুরু করল অগ্নিবীণা। মনিটরে ভেসে উঠল, ‘রেসোনেন্স ডিটেকটেড’, গভীরতা ৩৮৬২ মিটার। অর্ণব অবাক চোখে তাকিয়ে তাছে স্ক্রিনের দিকে। ওরা জলের গভীরে নামতে শুরু করেছে। ক্যাপ্টেন মহেশ জানালেন, “অগ্নিবীণা নিজে থেকেই নিজের যাত্রাপথ ঠিক করতে বা পরিবর্তন করতে পারে, স্রোত বুঝতে পারে, যে কোনো রকম ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ বা রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত এবং ডিকোড করতে পারে। এর বাইরের গায়ে লাগানো আছে অংসখ্য সেন্সার আর ক্যামেরা। এগুলো বেস থেকে একটা অত্যাধুনিক কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।”
চারদিকে শুধু কালো জল। ছোটো বড়ো সামুদ্রিক প্রাণী অন্ধকারের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনো অস্বাভাবিক দৃশ্য চোখে পড়েনি। সমুদ্রের ৩৮০০ মিটার নীচে নামতেই হঠাৎ কাঁপতে শুরু করল অগ্নিবীণা। “কী ব্যাপার?” সবাই অবাক। ক্যাপ্টেন মহেশ জানালেন এরকম তো হবার কথা নয়। অর্ণব মনিটরের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস আটকে রাখল। কিন্তু সেখানে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবে তলদেশের কাছাকাছি আসতে ফ্লোরোসেন্ট নীল রঙের কয়েকটি রেখা চোখে পড়ল স্কিনে। তারপর আরেকটি। ক্রমশ সেই রেখাগুলো উজ্জ্বল হচ্ছে। হঠাৎ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজার নীল রেখা জ্বলে উঠল চারপাশে। মনে হল, সমুদ্রের তলায় কেউ একটি শহরের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। ক্যাপ্টেন মহেশ প্রশ্ন করলেন, “অগ্নিবীণা, এই নীল রেখাগুলো কীসের?”
“ওগুলো প্রবাল। প্রতিটি প্রবালের গায়ে জ্যামিতিক নকশা।” উত্তর দিল অগ্নিবীণা।
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ খুব আস্তে বললেন, “যেন প্রকৃতি নয়, কোনও বুদ্ধিমান সভ্যতা এগুলো নির্মাণ করেছে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে প্রবালগুলোর আলো একই ছন্দে স্পন্দিত হতে শুরু করল। একবার… দু’বার… তিনবার… অগ্নিবীণার অনুবাদ ব্যবস্থা সেই আলোর ছন্দ বিশ্লেষণ করছে। করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্কিনে একটা লেখা ফুটে উঠল, “তোমরা দেরি করে এসেছো।”
“মানে?”
লিও অবাক গলায় জানাল, “প্রবালরা আমাদের সঙ্গে কথা বলছে!”
অর্ণব ধীরে বলল, “অবিশ্বাস্য! এটা কি… ভাষা?”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ। কিন্তু শব্দের ভাষা নয়। আলোর ভাষা!”
হঠাৎ কেঁপে উঠল পুরো সমুদ্রতল। দূরে অন্ধকারের মধ্যে এক বিশাল ছায়া নড়ে উঠেছে। লিও রয় ফিসফিস করে বললেন, “ওরা জেগে উঠেছে!” তাঁর মনের মধ্যে ভেসে উঠছে বছর দশেক আগের বেলিজ রিফের সেই দুঃস্বপ্নের রাত।
ঠিক সেই সময় অগ্নিবীণার রাডারে নতুন একটা সংকেত ধরা পড়ল। সে তক্ষুণি জানাল, “অচেনা এক সাবমেরিন এগিয়ে আসছে এদিকে। পরিচয় নেই। কোনো সিম্বল নেই। কিন্তু অবিশ্বাস্য গতি।”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ শান্ত গলায় বললেন, “এজেন্ট জিরো এসে গেছে।”
অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “এবার?”
ঠিক তখনই এজেন্ট জিরো থেকে একটা ঠান্ডা গলা ভেসে এল যোগাযোগ চ্যানেলে, “ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ… আপনাদের অভিনন্দন। আপনারাই আমাদের পথ দেখিয়েছেন। না হলে আরও অনেকটা সময় আমরা সমুদ্রের নীচে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতাম। … তবে আপনাদের কাজ এখানেই শেষ। ভালোয় ভালোয় ওপরে ফিরে যান।”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ উত্তর দিলেন, “মিঃ পোহানপালো, ভুলে যাবেন না, এটা নতুন ভারতবর্ষ। আমরা পিছু হাঁটতে জানি না। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করাই আমাদের কাজ।”
“আপনারা কোন শিষ্টের পালন করবেন, ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ? আপনারা কী জানেন, এই আপাত নিরীহ প্রবালের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে অচেনা এক হিংস্র ভিনগ্রহীদের গুপ্তচর। এরা খুব গোপনে পৃথিবী থেকে সমস্ত তথ্য মহাকাশে পাঠাচ্ছে। সুযোগ বুঝে পৃথিবীকে আক্রমণ করবে এরা। আমরা এদের ধ্বংস করে তবেই শান্ত হব। আপনারা আমাদের রাস্তা থেকে সরে যান ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ।”
“শুধুমাত্র এদের ধ্বংস করে তোমরা শান্তি পাবে না মিঃ পোহানপালো। তোমরা সারা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা এদের আন্ডার ওয়াটার ন্যাচেরাল কমিউনিকেশন সিস্টেমকে গায়ের জোরে দখল করতে চাও।”
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। নীরবতা কাটিয়ে পোহানপালো বলে উঠলেন, “মানুষ সবসময় বিবর্তনের অপেক্ষা করে। আমি অপেক্ষা করি না। আমি বিবর্তনকে তৈরি করি। শেষবারের মতো সাবধান করলাম, আমাদের রাস্তা থেকে তোমরা সরে যাও।”
ঠিক সেই মুহূর্তে জলের মধ্যে চারপাশে অসংখ্য ছোটো ছোটো আলোকবিন্দু জ্বলে উঠল। অর্ণব স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে প্রথমে ভাবল প্ল্যাঙ্কটন। তারপর মনে হল, না এগুলো অন্যকিছু। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ, লিও, ক্যাপ্টেন রমেশ, সবাই অবাক হয়ে গেছে। অগ্নিবীণা কিছুক্ষণের মধ্যেই শনাক্ত করে জানিয়ে দিল, “এগুলো ক্ষুদ্র প্রবাল পলিপ।”
লক্ষ লক্ষ প্রবাল পলিপ নীল হয়ে জ্বলতে জ্বলতে কয়েক মিনিটের মধ্যে চারপাশে একটি জীবন্ত গোলক তৈরি করল। পোহানপালোর গলায় প্রথমবারের মতো উদ্বেগ শোনা গেল, “এগুলো কী?”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ খুব শান্ত স্বরে বললেন, “তুমি অস্ত্র নিয়ে এসেছ তো?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু এরা অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করে না।”
ঠিক তখনই পুরো সমুদ্রতল জুড়ে নীল আলো একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল। প্রবালগুলোর স্পন্দন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক বিশাল জীবন্ত নেটওয়ার্কে পরিণত হল। মনে হল, কোটি কোটি প্রাণী একসঙ্গে একটিমাত্র মস্তিষ্কে রূপান্তরিত হয়েছে। অর্ণব স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। লিও বললেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন বুদ্ধিমত্তা জেগে উঠছে!”
ভারত মহাসাগরের গভীরে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার হাজার মিটার নীচে, জেনেসিস বেসিনের অন্ধকারে দুটি যুযুধান কালো সাবমেরিন স্থির হয়ে রয়েছে। তাদের সামনে জীবন্ত প্রবালনগরী, আর চারদিকে লক্ষ লক্ষ নীল আলোকবিন্দু। হঠাৎ পোহানপালোর শব্দ শোনা গেল স্পিকারে, “তোমাদের শেষবারের মতো বলছি, পথ ছেড়ে দাও।”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন, “তুমি যা খুঁজছ, তা দখল করা যায় না।”
“পৃথিবীর সবকিছুই দখল করা যায়, ডক্টর। শুধু সঠিক প্রযুক্তি চাই।”
লিও রয় নিচু গলায় বললেন, “এই কথাটাই ওদের সবচেয়ে বড়ো ভুল।”
অর্ণব লক্ষ্য করল, প্রবাল নগরীর নীল আলো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। প্রতিটি আলোকস্পন্দন যেন অন্যটির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, কথা বলছে। লিও চোখ বড়ো বড়ো করে বলে উঠলেন, “এতো সেই ফিবোনাচ্চি ধারার সংকেত! বেলিজেও এরকম ঘটেছিল, গাণিতিক অনুপাতের মতো পুনরাবৃত্ত স্পন্দন, ২… ৩… ৫… ৮… ১৩… ২১…”
অর্ণব বলল, “এই সংখ্যাগুলো লামাহাটাতে পেম্বা তামাং মারা যাবার আগে আমাকে বলে গিয়েছিল।”
নীরবতা ভঙ্গ করে অগ্নিবীণার রোবোটিক কন্ঠস্বর জানাল, “প্রতিপক্ষ আমাদের লক্ষ্য করে আঘাত হানার জন্য তৈরি হচ্ছে।” তারপরেই অগ্নিবীণার নিজস্ব ডিফেন্স সিস্টেম চালু হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের মধ্যে। সাবমেরিনের বাইরের দেয়াল থেকে বেরিয়ে এল অনেকগুলো ড্রোন ডুবোযান। সেগুলো চোখের নিমেষে ঘিরে ফেলল অগ্নিবীণাকে। ইতিমধ্যে এজেন্ট জিরোর সাবমেরিন থেকে ক্যাভিটেশন ইমপ্লোশন বোমা ছোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু অগ্নিবীণা তখন পুরোপুরি তৈরি। ড্রোনগুলো জলের নীচে কয়েক মিটার দূর থেকে যেন একটা অদৃশ্য আয়রন ডোম তৈরি করে ফেলেছে তাকে ঘিরে। ফলে ইমপ্লোশন চার্জ সেই ডোমে প্রতিহত হল। শুধু কয়েক মুহূর্তের জন্য অগ্নিবীণা কেঁপে উঠে আবার স্থির হয়ে গেল।
পোহানপালো রীতিমতো অবাক। এই অস্ত্রকে সামাল দেওয়া কোনো সাধারণ সাবমেরিনের পক্ষে সম্ভব নয়। এবার এজেন্ট জিরোর সাবমেরিনের যোগাযোগ সিস্টেমে শোনা গেল ডক্টর রুদ্রপ্রসাদের ঠান্ডা কঠিন গলা, “আমি প্রথমেই তোমাদের জানিয়েছিলাম, এটা আগের ভারত নয়। এই মুহূর্তে তোমরা যদি নিজেদের যানকে এখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে না যাও …তাহলে চোখের নিমেষে তোমাদের সবার সলিলসমাধি হবে। এটাই আমাদের শেষ ওয়ার্নিং।”
কাজ হল সেই কথায়। পোহানপালোর নির্দেশে পিছিয়ে গেল এজেন্ট জিরোর সাবমেরিন। অর্ণব স্ক্রিনে লক্ষ্য করল ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে ওরা। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল কালো জলের মধ্যে।
এদিকে সমুদ্রের প্রায় চার হাজার মিটার নীচে, কোটি বছরের নিদ্রা ভেঙে জেগে উঠছে জেনেসিস কোর। তারপর তার প্রথম স্পন্দন পাঠাতে শুরু করল। আর সেই স্পন্দন শুধু ভারত মহাসাগরে নয়, একই সঙ্গে অনুভূত হল পৃথিবীর সবক’টা প্রবালপ্রাচীরে, অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বেরিয়ার রিফ, লাক্ষাদ্বীপ, মালদ্বীপ, রেড সি, ক্যারিবিয়ান সাগরে, এমনকি বেলিজের ভগ্ন প্রবাল উপনিবেশেও ক্ষীণ নীল আলো আবার জ্বলে উঠল। যেন এক অদৃশ্য স্নায়ুতন্ত্রে যুক্ত হয়ে গেল বিশ্বের সমস্ত মহাসাগর। অগ্নিবীণার দেয়ালে একে একে ফুটে উঠছে সমস্ত উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবিগুলো। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বুঝলেন, এখন আর একটি প্রবাল নয়, একটি গ্রহব্যাপী জীবন্ত নেটওয়ার্কের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা। সমুদ্রের অন্ধকার ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। যেখানে এতক্ষণ নীল আলোর ঝিলিক দেখা যাচ্ছিল, সেখানে এখন এক অদ্ভুত সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে, সমুদ্রের নীচে আর একটা সূর্য ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। অর্ণবও ছবিগুলো দেখছে অবাক চোখে। শুধু শোনা যাচ্ছে সাবমার্সিবলের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমের মৃদু গুঞ্জন। হঠাৎ ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ ফিসফিস করে বললেন, “ওটা… দেখো।”
সামনের অন্ধকারে ধীরে ধীরে জলের মধ্যে ভেসে উঠল একটা বিশাল গোলাকার গঠন। প্রথমে মনে হল পাহাড়। তারপর বোঝা গেল ওটা একটা বিশাল প্রবাল। কিন্তু পৃথিবীর কোনও বিজ্ঞানী এমন প্রবালের কথা কখনও কল্পনাও করেননি। ব্যাস প্রায় দেড় কিলোমিটার। তার গায়ে অসংখ্য সর্পিল খাঁজ। প্রতিটি খাঁজের মধ্যে তরল সোনালি আলো নদীর মতো প্রবাহিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন একটি বিশাল মস্তিষ্ক সমুদ্রতলের ওপর নিঃশব্দে জেগে উঠেছে।
লিও রয় খুব আস্তে বললেন, “জেনেসিস কোর!”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “না… এটা শুধু কোর নয়।” তিনি একটা গভীর নিশ্বাস নিলেন। “…এটাই সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন জীবন্ত সত্তা।”
হঠাৎ অগ্নিবীণার সমস্ত যন্ত্র একসঙ্গে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ইঞ্জিন চলছে। কিন্তু সমস্ত মনিটর সাদা। সোনার সিস্টেম কাজ করছে না। নেভিগেশন বন্ধ। রেডিও সিগন্যাল নীরব। ওপরে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শুধু অন্ধকার সমুদ্রের মধ্যে স্থির হয়ে ভাসছে অগ্নিবীণা। সবার চোখে মুখে জমাট বাঁধছে আতঙ্ক।
“স্যার! …এবার!”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ শান্ত গলায় বললেন, “জেনেসিস কোরের কাছে আমাদের আধুনিক বিজ্ঞান অকেজো। এবার সময় এসেছে আমাদের বাইরে বেরিয়ে ওটার মুখোমুখি হবার। …আমরা তিনজন যাব। আমি, লিও আর অর্ণব। দ্রুত পোশাক পরে নাও সবাই।”
ক্যাপ্টেন মহেশ চমকে উঠলেন কথাটা শুনে, “এটা খুব বিপদজনক সিদ্ধান্ত স্যার। শুধুমাত্র আপনারা তিনজন এই গভীর সমুদ্রে নামবেন? কয়েকজন অভিজ্ঞ মার্কোসকে পাঠাই আপনাদের সঙ্গে।”
“না ক্যাপ্টেন, সেটার প্রয়োজন মনে হয় হবে না। লিও রয়কে তোমরা ঠিক মতো চেনো না। এসব ক্ষেত্রে ও একাই একশো। মনে হয় না কোনো সমস্যা হবে। আমার ধারণা জেনেসিস কোর আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে, তবে সেটা কোনো কম্পিউটার বা যন্ত্রের মাধ্যমে নয়, সরাসরি। সেজন্য আমি আর অর্ণব সামনে যাব। লিও থাকবে পেছনে। তোমরা সিস্টেমকে রি-বুট করার চেষ্টা করো।”
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ওরা তিনজন বিশেষ ধরণের পোশাক পরে ভেসে পড়ল জলে। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল সেই বিশাল বড়ো মস্তিষ্কের দিকে। জলের মধ্যে ভাসছে শুধু লক্ষ লক্ষ নীলচে প্ল্যাংকটন। কিন্তু ওরা এগিয়ে আসতেই রাস্তা থেকে আপনা থেকে সরে গিয়ে ফাঁকা করে দিচ্ছে পথ। একদম কাছে আসতে হেডলাইটের আলোয় অর্ণব বুঝতে পারল জেনেসিস কোরের একটা মৃদু স্পন্দন আছে। অর্থাৎ এটা জীবন্ত! প্রথমে ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ সেটার গায়ে হাত দিলেন। কিন্তু কিছুই হল না। তারপর ইশারাতে অর্ণবকে বললেন হাত রাখতে। অর্ণব হাত দিয়ে বুঝল এটা রবারের মতো নরম একটা জিনিস। হাল্কা সোনালি আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে সেটা থেকে। অর্ণব সেটার ওপর হাত রাখতেই চারপাশে অদ্ভুত কিছু পরিবর্তন শুরু হল। প্রথমেই লক্ষ লক্ষ নীলচে প্ল্যাংকটনদের উজ্জ্বলতা হঠাৎ করে বেড়ে গেল।
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ চাপা স্বরে রেডিও ট্রান্সমিশনে জানালেন, “চুপ করে চোখ বন্ধ করে, শুনতে চেষ্টা করো!”
অর্ণব চোখ বন্ধ করল। প্রথমে কিছুই শুনতে পেল না। তারপর… অনুভব করল খুব ধীরে একটা স্পন্দন। ধুপ… ধুপ… ধুপ… অনেকটা হৃদস্পন্দনের মতো। স্পন্দনটা হয়েই চলেছে। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ মৃদু হেসে বললেন, “ওটা শব্দ নয়। এটা জলের মধ্যে এক ধরণের বৈদ্যুতিক স্পন্দন। আলোর ভাষা!”
ওরা লক্ষ্য করল জেনেসিস কোরের গা থেকে সোনালি আলোর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে এই স্পন্দনের সঙ্গে সঙ্গে। অর্ণব হঠাৎ দেখল আলোর স্পন্দনটা শুধু জ্বলছে না, এর সঙ্গে এক ধরণের লিপি তৈরি হচ্ছে। যেন চলমান অক্ষর। সেই সোনালি অক্ষরগুলো জলের মধ্যে ভাসতে ভাসতে গিয়ে জলের নীচে অজস্র কালো মৃত প্রবালের গায়ে ধাক্কা খেয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। লিও অবাক হয়ে গেলেন, “অবিশ্বাস্য…!”
এদিকে অগ্নিবীণা থেকে নতুন করে সিগন্যাল ভেসে আসছে, “রিবুট কমপ্লিট। নতুন স্পন্দন ডিকোড করা হচ্ছে।”
তারপরেই অগ্নিবীণার ভেতরের স্কিনে ভেসে উঠল একটু আবছা অস্পষ্ট একটা ছবি। সেই ছবিগুলো সরাসরি রিলে হচ্ছে ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ, অর্ণব আর লিওর ডান হাতে আটকে থাকা স্কিনেও। একটার পর একটা পরিবর্তন হচ্ছে ছবিগুলো।
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ জানালেন, “এটা কোনও ভাষা নয়।”
“তাহলে?”
“এটা ওদের স্মৃতি।”
অর্ণব খুঁটিয়ে দেখতে থাকল ছবিগুলো। কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবী, চারদিকে আগ্নেয়গিরি, ধূসর বাষ্পে ঢাকা আকাশ, অম্লীয় সমুদ্র। তারপর আকাশ চিরে নেমে এল এক বিশাল উল্কাপিণ্ড। কিন্তু উল্কাপিণ্ডটি বিস্ফোরিত হল না। জলে পড়েই হাজার হাজার আলোকবিন্দুতে ভেঙে গেল। সেই আলোকবিন্দুগুলো ধীরে ধীরে ভেসে এসে মিশে গেল পৃথিবীর আদিম এককোষী জীবের সঙ্গে। লিও বিস্ময়ে বললেন, “আমরা কোটি কোটি বছরের পুরানো ছবি কীভাবে দেখছি!”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ মাথা নাড়লেন। বললেন, “না। আমরা সম্ভবত ওদের স্মৃতি দেখছি। পৃথিবীর আদি সময় থেকে সব কিছু ধরা আছে ওদের স্মৃতিতে। সেগুলোর কয়েকটা ঝলক ওরা দেখাচ্ছে আমাদের।”
এবার জেনেসিস কোরের মাঝখানে ধীরে ধীরে একটা বিশাল অংশ খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক গোলাকার স্বচ্ছ স্ফটিক। সেটি কোনও পাথর নয়। তার ভেতরে অসংখ্য ক্ষুদ্র আলোর বিন্দু ঘুরছে। অর্ণবের মনে হল এটা একটা ছোট্ট গ্যালাক্সি। অর্ণব অনুভব করল, তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন দ্রুত হচ্ছে। কেন জানে না, কিন্তু তার মনে হল যাকে এতক্ষণ পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন জীব বলে মনে হচ্ছিল সেও যেন অন্য কারও আগমনের অপেক্ষায় গভীর জলের নীচে নিমজ্জিত ছিল এতদিন। ঠিক তখনই গোলাকার স্বচ্ছ স্ফটিকের মধ্যে থেকে একটা নতুন আলোর সর্পিল স্তম্ভ বেরিয়ে এল। এবার সেই আলো সোজা অর্ণবের দিকে এগিয়ে আসছে। সোনালি আলোর সর্পিলটি স্তম্ভটা ধীরে ধীরে অর্ণবের সামনে এসে থামল। মনে হল নিরীক্ষণ করছে তাকে। অর্ণব অবাক হয়ে দেখল, আলোটি কোনও বস্তু নয়, কোনও শক্তির রশ্মিও নয়, বরং লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র আলোককণা একত্র হয়ে মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনের মতো একটি জাল তৈরি করেছে। আলোকজালটি ধীরে ধীরে অর্ণবের কপালে স্পর্শ করল। কোনও ব্যথা হল না ওর। শুধু মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল একবার। তারপরেই চারপাশের সমুদ্র অদৃশ্য হয়ে গেল চোখের সামনে থেকে। অর্ণব নিজেকে দেখল অসীম অন্ধকারের মধ্যে ভাসতে ভাসতে চলেছে। তার সামনে একের পর এক জ্বলে উঠছে নক্ষত্রমণ্ডল, গ্যালাক্সি, নেবুলা, তারপর এক অচেনা নীল গ্রহ। সেখানে কোনও মানুষ নেই। কিন্তু আছে বিশাল প্রবালনগরী। প্রতিটি নগরী আলোর মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছে।
তারপর মুহূর্তের মধ্যে দৃশ্য পাল্টে গেল। এবার অর্ণবের চোখের সামনে কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবী। অগ্নিগর্ভ সমুদ্র। তারপর মহাকাশ থেকে ভেসে এল অণুবীক্ষণিক জীবন্ত বীজ। তারা পৃথিবীতে জীবন সৃষ্টি করতে আসেনি। তারা এসেছিল স্মৃতি সংরক্ষণ করতে। যদি পরবর্তী কোনও সভ্যতা একদিন নিজের অস্তিত্বের প্রশ্ন করে তাহলে যেন সেই উত্তর কোথাও সংরক্ষিত থাকে।
সমুদ্রের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে একটি অস্বাভাবিক কম্পন অনুভূত হল। তারপরেই হঠাৎ আলোর তরঙ্গ আসাটা বন্ধ হয়ে গেল জেনেসিস কোর থেকে। মুহূর্তের মধ্যে সমুদ্রের নীচে নেমে এল সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা। অগ্নিবীণা থেকে বিপ… বিপ… বিপ… করে বিপদ সংকেত আসছে। ওয়ার্লেস সিস্টেমে অগ্নিবীণা খবর পাঠাল, “পয়েন্ট জিরোর সাবমেরিন দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে এদিকে। সাবধান! আমাদের ডিফেন্স সিস্টেম এখনও তৈরি হতে পাঁচ মিনিট সময় লাগবে। কিন্তু পয়েন্ট জিরো তার আগেই পৌঁছে যাবে আপনাদের কাছে।”
ক্যাপ্টেন মহেশের নির্দেশে মার্কোসের টিম সমুদ্রে নামার জন্য দ্রুত তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সময়ের আগেই চোখের পলকে পয়েন্ট জিরোর সাবমেরিন এগিয়ে এল ওদের দিকে। সমুদ্রের নীচে সাংঘাতিক একটা জলের চাপ তৈরি হয়েছে এই অস্বাভাবিক গতির জন্য। সেই স্রোতের ধাক্কায় অর্ণবরা পিছিয়ে গিয়ে ধাক্কা খেল জেনেসিস কোরের সঙ্গে। এর মধ্যেই পয়েন্ট জিরোর সাবমেরিন থেকে ট্রান্সমিশন সিস্টেমে ভেসে এল পোহানপালোর গলা, “তোমাদের সময় শেষ ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ। জেনেসিস কোর আর বাচ্চাটিকে এখানে ছেড়ে তোমরা এই মুহূর্তে নিজেদের যানে ফিরে যাও। নইলে সবার মৃত্যু অবধারিত।”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ ঠান্ডা গলায় তাঁর মতামত জানালেন, “অসম্ভব!”
কথাটা পোহানপালোর কানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তার নির্দেশে একটা লেজার বিম চার্জ হল ডক্টর রুদ্রপ্রসাদকে লক্ষ্য করে। কিন্তু তাঁর ঠিক সামনে প্রস্তুত হয়েছিল লিও রয়। নিজের শরীরটা দিয়ে মানব ঢালের মতো আড়াল করে শেষ মুহূর্তের জন্য বাঁচিয়ে দিলেন ডক্টর রুদ্রপ্রসাদকে। কিন্তু লেজারের আঘাতে লিও দাঁত চেপে আর্তনাদ করে উঠলেন। বিশেষ পোশাকের সেফটি ত্বক ভেদ করে ফালা হয়ে গেছে তাঁর শরীরটা। এবারে জলের প্রচণ্ড চাপে লিওর শরীরটা গুঁড়িয়ে যাওয়া শুধু কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা। সামনে তাঁর অবধারিত মৃত্যু। তবু তাঁর হাতে থাকা আন্ডার ওয়াটার সুপারসনিক রকেট ডার্ট পয়েন্ট জিরোর সাবমেরিনকে নিশানা করে চার্জ করে দিলেন। একটা বিস্ফোরণ হল। এক ঝটকায় লিও পিছিয়ে গেলেন অনেকটা। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন না। আলোর তীব্র ঝলকানির সঙ্গে সঙ্গে পয়েন্ট জিরো কেঁপে উঠে পিছিয়ে গেল অনেকটা। ইতিমধ্যে ওরাও একটা ক্যাভিটেশন ইমপ্লোশন চার্জ করেছে অগ্নিবীণাকে লক্ষ্য করে। সেটা প্রচণ্ড শক্তিতে এসে আঘাত হানল অগ্নিবীণাতে। কিন্তু এতক্ষণে তার রিবুটিং কমপ্লিট। ফলে সামান্য কম্পন ছাড়া অগ্নিবীণার কোনো ক্ষতি হল না।
লিওর হৃদস্পন্দন ততক্ষণে জলের চাপে বন্ধ হতে বসেছে। ডক্টর রুদ্রপ্রসাদের চোখে একটা ভয়ঙ্কর হতাশার ছাপ স্পষ্ট বুঝতে পারছে অর্ণব। সে বিহ্বল চোখে তাকিয়ে আছে জেনেসিস কোরের দিকে। লিও প্রায় শেষনিঃশ্বাস ছাড়ার আগে জেনেসিস কোরের ওপর ডান হাত রেখে মনে মনে বললেন, “আমাদের রক্ষা কর!”
এরপর যেটা ঘটল সেটা কল্পনা করাও সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। জেনেসিস কোর দ্রুত সংকুচিত হতে শুরু করল। বিশাল বড়ো আকাশ বেলুন ফুটো হয়ে গেলে যেমন চুপসে যায়। তেমনই কুঁকড়ে গেল চোখের সামনে। তারপর কোনো আলো বা শব্দের ঝলকানি ছাড়াই হল একটা মহাবিস্ফোরণ। পয়েন্ট জিরোর সাবমেরিন নিমেষের মধ্যে গুঁড়িয়ে গেল। ছিটকে জলের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে বহু দূরে সরে গেল অগ্নিবীণা। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে অর্ণব আর ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ একটা বড়ো জেলির মতো বুদবুদের মধ্যে করে দ্রুত ওপরে উঠতে থাকলেন। সেই বিস্ফোরণের শক তাঁদের স্পর্শ করতে পারল না।
জলের তলা থেকে প্রায় চার হাজার মিটার ওপরে উঠতে অনেকটা সময় লাগল। সমুদ্রপৃষ্ট ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুদবুদটা মিলিয়ে গেল জলের সঙ্গে। কালো জলের ওপর যখন অর্ণব আর ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ ভেসে উঠলেন, অন্ধকার আকাশের গায়ে কোটি কোটি নক্ষত্ররা তখন যেন ওদের হাসি মুখে স্বাগত জানাল।
তিন মাস পরে
পোর্ট ব্লেয়ার নিউজে পত্রিকায় ভারতীয় সমুদ্রবিজ্ঞানী ডক্টর রুদ্রপ্রসাদের একটা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
“উন্নয়নের পথে, নাকি প্রকৃতির বিপরীতে?
ভারতের গ্রেট নিকোবর দ্বীপে প্রস্তাবিত মেগা প্রকল্প আবারও উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের চিরন্তন বিতর্ককে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। গালাথিয়া উপসাগরে আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর নির্মাণের লক্ষ্যে প্রায় ১৬,১৫০টি প্রবাল উপনিবেশ এবং জায়ান্ট ক্ল্যাম স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া। পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু এর মধ্যেই উঠে আসে আরও বড়ো প্রশ্ন, প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতির বিনিময়ে উন্নয়ন কতটা গ্রহণযোগ্য?
গ্রেট নিকোবর কেবল একটি দ্বীপ নয়, এটি ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আধার। এখানকার প্রবাল প্রাচীর, ম্যানগ্রোভ, সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র এবং অসংখ্য বিরল প্রাণী-উদ্ভিদ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের অংশ। বিজ্ঞানীরা বহুবার সতর্ক করেছেন যে, প্রবাল স্থানান্তর একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। একটি প্রবালকে নতুন জায়গায় বসিয়ে দিলেই যে সে আগের মতো বেড়ে উঠবে বা সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র পুনর্গঠিত হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে, দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের দিকটিও অস্বীকার করা যায় না। ভারত মহাসাগর অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং দেশের সুরক্ষার ক্ষেত্রে গ্রেট নিকোবরের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি আধুনিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর দেশের বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকল্পটির তাৎপর্য যথেষ্ট।
এদিকে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল প্রকল্পটির পরিবেশগত ছাড়পত্র বহাল রেখেছে। কিন্তু আইনগত অনুমোদন পেলেই যে পরিবেশগত উদ্বেগের অবসান ঘটে, তা নয়। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থ এবং বিজ্ঞানীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক সূচকে নয়, তার পরিবেশগত স্থায়িত্বের ওপরও নির্ভর করে।
ভারতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মডেল এমন হওয়া উচিত, যেখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক। যদি কোনও প্রকল্প অপরিহার্য হয়, তবে তার প্রতিটি ধাপে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, স্বচ্ছ পরিবেশ মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রবাল স্থানান্তর কেবল একটি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা, প্রকৃত সমাধান হলো এমন উন্নয়ন পরিকল্পনা, যা প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাতে নয়, সহাবস্থানের দর্শনে বিশ্বাস করে।
গ্রেট নিকোবরের এই প্রকল্প ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্র। আমরা কি উন্নয়নের নামে প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ হারাব, নাকি এমন একটি পথ বেছে নেব যেখানে উন্নয়ন ও পরিবেশ দুই’ই সমান গুরুত্ব পাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করবে।”
কাগজটি ক্যুরিয়রে পাঠিয়েছে মনোজকাকু। অর্ণব লক্ষ্য করল পুরো প্রতিবেদনে কোথাও জেনেসিস কোরের নাম নেই। নেই বিশ্বব্যাপী সমুদ্রের তলদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবালের প্রাকৃতিক নেটওয়ার্কের প্রসঙ্গও। অর্ণব অনেক ভেবে শেষ পর্যন্ত ফোন করল ডক্টর রুদ্রপ্রসাদকে, অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি সবটা লিখলেন না কেন?”
ডক্টর রুদ্রপ্রসাদ হেসে উত্তর দিলেন, “সব সত্য জানার জন্য পৃথিবী এখনই প্রস্তুত নয়। তবে তোমার কাজ শুরু করে দাও। ভুলে যেওনা আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে দেখা করে এসেছি। তারা আমাদের জন্য কোনও অস্ত্র রেখে যায়নি। রেখে গেছে একটি সতর্কবার্তা! পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য সেই কাজ আমাদের করে যেতে হবে। ডক্টর সেরিনা আর অনিরুদ্ধ খুব তাড়াতাড়ি কলকাতায় গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করবেন।”
“অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বেরিয়ার রিফ থেকে তাঁরা বেঁচে ফিরেছেন?”
“জেনেসিস কোর তাঁদের বাঁচিয়ে রেখেছিল। ওরা যে কোনো মানুষের ক্ষতি চায় না, এটা তার প্রমাণ। আর একটা আনন্দের খবর হল লিও সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাস তিনেকের মধ্যেই আবার সুস্থ হয়ে উঠেছে। ভাগ্যিস অগ্নিবীণার সদস্যরা শেষ মুহূর্তে মৃতপ্রায় লিওকে উদ্ধার করেছিল!”
কার্তিক মাসের শুরুতে অর্ণবদের বাড়ির পাশে বড়ো পুকুরপাড়ে গাছের ডালে একটা মাছরাঙা পাখি উড়ে এসে বসেছে। ‘কিরকির …কিরকির’ করে ক্রমাগত ডাকছে সে। অর্ণবের যেন মনে হল, আন্দামান থেকে উড়ে এসে ওকে ‘ধন্যবাদ’ বলছে!
জয়ঢাক প্রকাশন থেকে প্রকাশিত পুষ্পেন মণ্ডলের তিনটি থ্রিলার-


