ভ্রমণ-কানাডার চিঠি(পর্ব ৪)- বুমা ব্যানার্জী দাস-শরৎ ২০২৪

Happy Canada Day background

রকি বেয়ে গল্পেরা সব প্রেইরি জুড়ে নামে,
জুটিয়ে নিয়ে লিখছি চিঠি, মেপল পাতার খামে।

বিভারের লোম নিয়ে ফলাও ব্যাবসা করার লোভে ইউরোপিয়ানদের আগমনের কথা আগের পর্বেই বলেছি। আর এর ফলে ফার্স্ট নেশনদের বিভিন্ন গোষ্ঠী যে অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিল তাও মনে আছে নিশ্চয়ই?

সবথেকে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী লড়াই বেধেছিল ইরোকোইয়ান ফার্স্ট নেশনদের সঙ্গে অন্য পাঁচ গোষ্ঠীর। ইরোকোইয়ানদের মনে আছে তো? সেই যে লম্বাপানা বাড়ি বানিয়ে হোডিনো-শনি নাম পেয়েছিল যারা। ফরাসি কার্টিয়ার ইরোকোইয়ানদের আর স্কার্ভি রোগের মিলিত আক্রমণে রণে ভঙ্গ দিলেও হাল কিন্তু মোটেও ছাড়েনি ফরাসিরা। এবারে তারা স্যামুয়েল দ্য শম্পল্যাঁ নামে আর একজনকে পাঠায়। ইনি আবার বেশ গুণী মানুষ। ম্যাপ তৈরি করেন, আবার একাধারে অভিযাত্রী এবং ভূগোলবিদ। ইনি সেন্ট লরেন্স নদীর উপত্যকায় প্রথম ফরাসি ঘাঁটি তৈরি করেন এবং সেই এলাকার নাম দেন কোয়েবেক সিটি।

কিন্তু বছর পঞ্চাশ আগে এই এলাকায় কার্টিয়ারের দেখা ইরোকোইয়ানদের কোনও চিহ্ন তখন আর ছিল না। হয় দীর্ঘ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে তারা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল, অথবা ইউরোপিয়ানদের বয়ে আনা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল তারা। শম্পল্যাঁ এসে এখানে অ্যালগনকুইন গোষ্ঠীর আধিপত্য দেখেছিলেন, তবে তারা ছিল যাযাবর প্রকৃতির। ইরোকোইয়ানদের মতো বসতি স্থাপন করার ক্ষমতা বা মানসিকতা কোনোটাই তাদের ছিল না। তারা গ্রীষ্মে এই এলাকায় এলেও বছরের বাকি সময় অন্যান্য বনাঞ্চলে শিকার করে বেড়াত। বছর তিনেক ধরে শম্পল্যাঁ এই এলাকায় বাস করে অ্যালগনকুইনদের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক তৈরি করলেন। ততদিনে ইরোকোইয়ানরা আবার ধীরে ধীরে তাদের দল ভারী করে ফেলতে শুরু করেছে। বুদ্ধিমান শম্পল্যাঁ বুঝতে পেরেছিলেন, এই এলাকায় বাণিজ্য বিস্তার করতে গেলে অ্যালগনকুইনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলতে হবে, আর সেটা করার সেরা উপায় হল চিরশত্রু ইরোকোইয়ানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের পক্ষ নেওয়া। শম্পল্যাঁ অবশ্য এদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের একটা ক্ষীণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু অ্যালগনকুইনরা একেবারেই রাজি ছিল না তাতে। আশ্চর্যের বিষয় হল, তারা ফরাসি আধিপত্যও মেনে নিতে রাজি ছিল, কিন্তু সন্ধি প্রস্তাব? নৈব নৈব চ।

কিন্তু এর ফলে ফরাসিরা বেশ কিছু লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিল। মন্টানিয়ে আর হিউরন নামের আরও দুটো গোষ্ঠীও যোগ দিয়েছিল ইরোকোইয়ানদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে। নিজেদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জিততে গিয়ে যে আসলে খাল কেটে কুমির ডেকে আনছে সে-খেয়াল তাদের ছিল না তখন। সেটা বুঝেছিল আরও অনেক পরে। ইতিমধ্যে ফরাসি মিশনারিদেরও আগমন শুরু হয়ে গিয়েছিল। প্রথমে তারা পাড়ি জমাল হিউরোনিয়াতে, যাতে হিউরন যোদ্ধাদের বেশ কব্জা করা যায়। আসলে হিউরোনিয়ার অবস্থান লেক সিমকো, লেক অন্টেরিও আর লেক হিউরনের মধ্যবর্তী অঞ্চলে। তাই হিউরনদের কাজে লাগিয়ে ওই অঞ্চলের অন্যান্য ফার্স্ট নেশনদের পশু লোমের ভাণ্ডারের খোঁজ পাওয়া সহজ হয়েছিল। পনেরো-ষোলো বছর কেটে গেছে তার মধ্যে, লড়াই আর ঝগড়াও খানিক শান্ত হয়ে এসেছে। আর ধীরে ধীরে নিজেদের অজান্তে ফার্স্ট নেশনরা ইউরোপিয়ানদের হাতের পুতুল হয়ে উঠছে।

bhromoncanada9001

প্রথম ছবিতে শম্পল্যাঁর বানানো কোয়েবেকের প্রথম ফরাসি ঘাঁটির নকশা। দ্বিতীয় ছবিটা কোয়েবেকের এখনও টিকে থাকা সবচেয়ে পুরোনো বাড়ির।

bhromoncanada9002

শম্পল্যাঁর প্রথম বসতবাড়ির প্রায় পঁচাত্তর বছর পর এটা বানানো হয়েছিল। এখনও বহাল তবিয়তে দাঁড়িয়ে আছে। যতটা সম্ভব অপরিবর্তিত রেখে একে এখন রেস্তোরাঁ বানানো হয়েছে। ছবি ঋণ – উইকিমিডিয়া কমনস।

এর মধ্যে কিন্তু ওলন্দাজ, মানে ডাচরাও ইরোকোইয়ানদের এলাকার কাছে বাণিজ্য ঘাঁটি বানিয়েছিল, নাম দিয়েছিল ফোর্ট অরেঞ্জ। তাদের সঙ্গে ব্যাবসা করার অধিকার নিয়ে ইরোকোইয়ানদের লড়াই লাগল মোহেগান নামে আর এক গোষ্ঠীর সঙ্গে। তারা এই লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকার ফলে শম্পল্যাঁ আর অ্যালগনকুইনরা বেশ স্বস্তি পেয়েছিল। মোহেগানদের গঙ্গাপার, থুড়ি, অ্যালবানি পার করে দিয়ে ইরোকোইয়ানরা অবশেষে ডাচদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিল। একদিকে ফরাসিদের সঙ্গে অ্যালগনকুইন আর হিউরনদের, অন্যদিকে ডাচদের সঙ্গে ইরোকোইয়ানদের—এই দুই মূলস্রোত চালু হল। হয়তো এইভাবেই চলত, বাদ সাধল দুটো মোক্ষম কারণ। এক, ইরোকোইয়ানদের এলাকায় বিভারের সংখ্যা অন্য এলাকার তুলনায় কম ছিল। আর দুই, এই খিচুড়ির মধ্যে অবশ্যই এসে পড়ল ব্রিটিশরা।

বলা বাহুল্য, এলাকা নিয়ে প্রবল দ্বন্দ্ব শুরু হল কয়েক বছরের মধ্যে। ফরাসিদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্য, কিন্তু ইংরেজরা দলে দলে এসে চাষবাস করে রীতিমতো জমিয়ে বসেছিল। ফলে উর্বর জমি থেকে ফরাসিদের উৎখাত করার প্রয়োজন ছিল তাদের। ধীরে ধীরে দুই দেশই বিপুল পরিমাণে পেশাদার সৈন্য পাঠাতে শুরু করেছিল এই এলাকায়।  এই সমস্যার মাঝখানে ফার্স্ট নেশনরা কখনও এ-পক্ষের হয়ে, কখনো-বা ও-পক্ষের হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছিল। ইংরেজ আর ফরাসিদের মধ্যেকার এই লড়াই এবার নর্থ আমেরিকা ছেড়ে ছড়িয়ে পড়ল ইউরোপে, ক্রমে আফ্রিকা এবং এশিয়াতেও। ইতিহাসে এই যুদ্ধ সেভেন ইয়ার্স ওয়র বা সাত বছরের যুদ্ধ নামে খ্যাত। ব্রিটেনের জয়লাভে এই যুদ্ধের ইতি ঘটে এবং প্যারিস চুক্তি (ট্রিটি অফ প্যারিস) অনুযায়ী ফরাসিরা তাদের অধিকৃত নর্থ আমেরিকার সমস্ত অঞ্চল ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। তবে অনেক ফরাসিরা থেকেও যায় এখানে। আগেই বলেছি, ইংরেজরা কেবল ব্যাবসা করার জন্য আসেনি, তারা যথারীতি কলোনি বানিয়ে, আইন প্রণয়ন করে, সবকিছু নিজেদের আয়ত্তে এনে ফেলল। এতদিন ফার্স্ট নেশনরা ফরাসি, ইংরেজ বা ডাচ যে-পক্ষেই থাকুক না কেন, সম্পর্কের একটা সমতা অন্তত ছিল। সমস্যা শুরু হল যখন ব্রিটিশরা নিজেদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে চাইল তাদের।

ফার্স্ট নেশনরা যে উর্বর এলাকায় শিকার বা চাষ করত, স্বাভাবিকভাবে সেসব এলাকা ব্রিটিশদের চাই। তারাই তো সেখানে বসতি স্থাপন করবে, সেটাই তো সভ্য জগতের অধিকার। বেছে বেছে অনুর্বর, পানীয় জলহীন এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে ফার্স্ট নেশনদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হল। কায়দা করে সেসব এলাকার নাম দেওয়া হল রিজার্ভ। ফার্স্ট নেশনরা যে কেঁচোর মতো মেনে নিয়েছিল তা নয়, তবে ততদিনে তাদের মনের জোর তলানিতে ঠেকেছে। তাছাড়া সুন্দর সুন্দর সব আইন হয়েছিল যে। রিজার্ভের বাইরে থাকতে গেলে ব্রিটিশ আইন মানতে হবে, তাদের শিক্ষা পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। ফার্স্ট নেশনদের বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবকিছুর মহান দায়িত্ব ব্রিটিশরা স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছে, আর এইটুকু সহযোগিতা করতে পারবে না তারা!

প্রথমেই নতুন একটা সামাজিক ধাপ বানানো হল, তার নাম ইন্ডিয়ান। সমস্ত গোষ্ঠীর ফার্স্ট নেশনদের ওই একটাই পরিচয় হল—ইন্ডিয়ান। উল্লেখ্য, আজ এই শব্দটা আর কেউ ব্যবহার করে না।

bhromoncanada9003

ইন্ডিয়ানদের রিজার্ভের বাইরে বসতি স্থাপন করার বা কোনও জমির মালিকানা পাওয়ার কোনও অধিকার ছিল না। এমনকি তাদের গতিবিধির উপরেও ছিল নানা নিষেধাজ্ঞা। সেসব অধিকার কিছু অংশে পেতে গেলে ব্রিটিশদের শিক্ষা পদ্ধতি অনুযায়ী চলতে হবে তাদের, তবেই বৃহত্তর সমাজে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। নাহ্, সে-লোভে ফার্স্ট নেশনরা ভোলেনি। নিজেদের সংস্কৃতি আঁকড়ে রিজার্ভের কষ্টকর জীবন তারা মেনে নিয়েছিল, তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য বিসর্জন দিতে রাজি হয়নি।

ছবিতে এমনি এক রিজার্ভের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন ফার্স্ট নেশন গোষ্ঠীনেত্রী। লেব্রেখ্ট মিউজিক অ্যান্ড আর্টস ফোটো লাইব্রেরির সৌজন্যে পাওয়া এই ছবি।

ব্রিটিশরা দেখল মহা বিপদ, এরা নিজেদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। শুরু হল এক আশ্চর্য মতলব, আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ এমনকি হিতকর মনে হলেও আসলে তা বড়ো নিষ্ঠুর, বড়ো কুচক্রী। কানাডার ইতিহাস তাকে রেসিডেন্সিয়াল স্কুল নাম দিয়েছে বটে, কিন্তু এ-অধ্যায় অতটা সভ্য নামের উপযুক্ত নয়।

খুলে বলি ব্যাপারটা। সেটা ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ। কানাডার প্রধানমন্ত্রী তখন স্যার জন ম্যাকডোনাল্ড। তিনি স্কটল্যান্ডের মানুষ। এই সময়ের বছর পঞ্চাশ আগে থেকেই অসভ্য ফার্স্ট নেশনদের নিয়ে কী করা উচিত ভেবে কূল পাচ্ছিল না সুসভ্য ব্রিটিশরা। চার্চ এখানে ওখানে স্কুল বানিয়েছিল বটে, কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি বিশেষ। ইউরোপিয়ানরা চিরকালই নিজেদের সভ্যতাকে শ্রেষ্ঠ ভেবে এসেছে; ফার্স্ট নেশনদের দেখে তাদের মনে হয়েছিল এরা অনুন্নত, অসভ্য, এদের যথোচিত তত্ত্বাবধান করা প্রয়োজন, যাতে নিজেদের (অ)সভ্যতা সংস্কৃতি বিশ্বাস ভুলে একদিন ইউরোপিয় সমাজের অংশ হতে পারে এরা। না বললেও চলে, নিজেদের সমাজের অংশ বানানোর এত তাড়া ভালোবাসা থেকে নয়, অবশ্যই সস্তায় শ্রমিক পাওয়ার উদ্দেশ্যে। যাই হোক, এই ম্যাকডোনাল্ড তাঁর বিশ্বস্ত রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক বন্ধু নিকোলাস ফ্লাডকে মার্কিন উপজাতিদের জন্য তৈরি কারিগরি শিক্ষার স্কুলগুলোর কার্যপদ্ধতি খতিয়ে দেখার কাজ দিয়েছিলেন। ফ্লাড তার রিপোর্টে লিখেছিল, এই ইন্ডিয়ানদের কোনোরকম উন্নতি করতে গেলে খুব ছোটো বয়স থেকেই শুরু করা প্রয়োজন। তাদের ওই অনুন্নত ও সভ্যতাহীন পরিবেশ থেকে সরিয়ে এনে সভ্য জগতের সান্নিধ্যে রাখতে হবে নিরন্তর। তা না হলে লেখাপড়া জানা বর্বর প্রজাতি তৈরি হবে।

আশ্চর্য ব্যাপার হল, অন্যের বাসভূমিতে গিয়ে তাদের উৎখাত করে, তাদের সংস্কৃতি, তাদের জ্ঞান, তাদের দিনযাপনকে বর্বরতা বলাটা কিন্তু সভ্যতা।

যাই হোক, ফ্লাডের মূল্যবান উপদেশে উৎসাহিত হয়ে দেশ জুড়ে শুরু হল রেসিডেন্সিয়াল বা আবাসিক স্কুল খোলার ধুম। এই স্কুল যে চার্চ পরিচালিত ছিল সেটা বলাই বাহুল্য। পরিবার আর পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে রাখার জন্য নিজেদের এলাকার বাইরে বহু দূরের স্কুলে নিয়ে যাওয়া হত বাচ্চাদের, বেশিরভাগ সময়ই বল প্রয়োগ করে। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে আইন বানিয়ে ফার্স্ট নেশন বাচ্চাদের রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হল। অন্য কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের যাওয়া বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাদের পোশাক, ব্যবহার, আচরণ সমস্ত কিছু নির্ধারিত হতে থাকল ক্যাথলিক চার্চের অঙ্গুলিহেলনে। তিল তিল করে সুচিন্তিত পদ্ধতিতে মুছে ফেলা শুরু হল কানাডার আদি বাসিন্দাদের চিন্তাধারা, আয়ত্ত করা প্রাচীন জ্ঞান, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ। ছিন্নমূল ফার্স্ট নেশন শিশুরা বলি হতে থাকল এই নিষ্ঠুর শিক্ষা ব্যবস্থার হাঁড়িকাঠে।

রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের পরিবেশ আর যাই হোক আনন্দজনক যে ছিল না, তা সহজেই অনুমান করা যায়। ফার্স্ট নেশনরা সাধারণত বেশ লম্বা চুল রাখত, গোষ্ঠীর বিশেষত্ব প্রকাশ পেত তাদের পোশাকে। স্কুলে প্রথমেই তাদের চুল ছোটো করে কেটে পরিয়ে দেওয়া হল উর্দি। বেশ বাহারের নাম হত এদের, নামের মধ্যে বিশেষ গুণ বা গোষ্ঠীর বিশেষ কোনও বৈশিষ্ট্যের চিহ্ন থাকত। স্কুলে নাম হারিয়ে বাচ্চারা পেল নম্বর, জেলের কয়েদিদের মতো। ছেলে আর মেয়েদের আলাদা বিভাগ ছিল। সেটা থাকতেই পারে, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনোরকম যোগাযোগ থাকত না। ভাই-বোন দুজনকেই হয়তো পরিবার থেকে ছিনিয়ে আনা হয়েছে, তাদের মধ্যেও যোগাযোগ রাখার অনুমতি ছিল না। আর একেবারেই নিষিদ্ধ ছিল নিজেদের ভাষায় কথা বলা। অনেক ফার্স্ট নেশন শিশু অন্য কোনও ভাষা জানতই না, সে-ক্ষেত্রেও এই একই নিয়ম। লঙ্ঘন করলে কঠিন শাস্তি জুটত কপালে।

পড়াশোনার ব্যাপারটাও কিন্তু ছিল সাধারণ পাবলিক স্কুলের থেকে আলাদা। শেতাঙ্গ ব্রিটিশদের সঙ্গে সমশিক্ষা পাবে নাকি এরা, তাই হতে পারে কখনও? বলেছি না, শিকড়হীন, মর্যাদাহীন সস্তা শ্রমের উৎস বানাতে চেয়েছিল সুসভ্য ইংরেজের দল। মেয়েদের তাই শেখানো হত রান্না, সেলাই, কাপড় কাচা ইত্যাদি ঘর-গেরস্থালির কাজ। ছেলেরা শিখত চাষবাস, ছুতোর মিস্ত্রির কাজ, লোহা আর টিন ঢালাই ইত্যাদি। ভারতবর্ষে এরা বানিয়েছিল কেরানি, আর কানাডায় দক্ষ শ্রমিক।

আসলে এসব শ্রম স্কুলের কাজেই লাগানো হত। রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের খাতে বিশেষ অর্থ খরচ করার প্রশ্নই নেই, তাই বাচ্চারা সব কাজ নিজেরাই করত। এইসব সেরে সময় থাকলে তখন দেওয়া হত অক্ষরজ্ঞান বা অন্য কোনও পাঠক্রম। এর ফলে হয়তো আঠারো বছর বয়সে সবে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে উঠতে পারত তারা। আঠারো হয়ে গেলে আর স্কুলে রাখা চলে না, তখন স্রেফ বের করে দেওয়া হত। তাদের তখন না আছে শিকড়, না আছে তথাকথিত সভ্য জগতের উপযুক্ত শিক্ষা। ফিরে গিয়েও লাভ নেই, কারণ সেখানে টিকে থাকার মতো জ্ঞান তাদের নেই।

স্কুলে কেমন ব্যবহার তারা পেত এবার সেটা একটু বলি। পান থেকে চুন খসলেই মারধর, বেঁধে রাখা তো খুবই সামান্য ব্যাপার। পরবর্তী সময়ে এই নারকীয় স্কুল যখন বন্ধ হল চিরতরে, সাহস করে এগিয়ে এসেছিলেন অনেক প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী। দুঃস্বপ্নের মতো সব অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছিলেন অনুতপ্ত কানাডাবাসীদের সঙ্গে। জানিয়েছিলেন নিজেদের ভাষায় কথা বলে ফেললে জিভে সূঁচ ঢুকিয়ে দেওয়া হত। বিছানার সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার ঘটনাও বিরল নয় মোটেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর যথেষ্ট পরিমাণে খাবার না পাওয়া।

ফল যা হওয়ার তাই হয়েছিল। বিপুল সংখ্যায় মৃত্যু ঘটেছিল ফার্স্ট নেশন শিশুদের। অসুস্থ হলে তাদের ঝটপট বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হত, যাতে মৃত্যুর দায় স্কুলের উপর না আসে। সে-প্রচেষ্টার আগেই যে হতভাগ্যদের মৃত্যু ঘটত তাদের বাড়িতে খবর না দিয়েই কবর দিয়ে দেওয়া হত। সে-কবরে থাকত না কোন পরিচয় বা তাকে সনাক্ত করার মতো কোনও চিহ্ন। এই কয়েক বছর আগেও পরিত্যক্ত রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের জমিতে পাওয়া গেছে চিহ্নহীন কবর, উদ্ধার করা হয়েছে পরিচয়হীন শিশুদের দেহের অংশ।

কেউ কেউ কিন্তু চেষ্টা করেছিল অন্তত বাচ্চাগুলো যাতে অত্যাচারিত না হয় সেটা দেখার। তবে বিশেষ সফল হয়নি। দেড়শো বছর ধরে সামাজিক ক্ষত হয়ে বেঁচে ছিল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল।

bhromoncanada9004

তিনটে ছবি রইল বিভিন্ন রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের। প্রথম দুটি ছবি উইকিকমন্স কমন্স থেকে পাওয়া। তৃতীয় ছবিটির নাম: Indian Residential School, Sewing Class, Resolution, N.W.T। চিত্রঋণ: Library and Archives Canada/ Department of the Interior fonds/ a043181

ধীরে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে সমাজের স্তরে স্তরে জমা হচ্ছিল ক্ষোভ। ফার্স্ট নেশনদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছিল। শৈশবের আতঙ্ক, জীবনের হতাশা, শিকড়হীনতা ইত্যাদি ভুলতে বাড়ছিল মদ্যপান। সমাজের এক অংশে মারামারি, অশান্তি বাড়লে তার ফল সমগ্র সমাজে পড়তে বাধ্য। ডিপার্টমেন্ট অফ ইন্ডিয়ান অ্যাফেয়ার্স সচেতন হতে বাধ্য হয় ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে। চার্চের হাত থেকে স্কুল পরিচালনার ভার তারা নিজেদের হাতে তুলে নেয়। কিন্তু কয়েক বছর পর রেসিডেন্সিয়াল স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনায় বাদ সাধে চার্চ। কারণ, ফার্স্ট নেশনদের আলাদা পরিবেশে শিক্ষা দেওয়া তাদের যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল। যাই হোক, ১৯৮৬ থেকে একে একে বন্ধ করে দেওয়া শুরু হয় স্কুলগুলো। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে অবশেষে বন্ধ হয়ে যায় শেষ রেসিডেন্সিয়াল স্কুল। শেষ হয় কানাডার ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। ইতিমধ্যে অবশ্য ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে কানাডা সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশের মর্যাদা লাভ করে, যদিও ১৮৬৭ থেকে ব্রিটিশ কলোনি আর বলা চলত না তাকে। তার বদলে বলা হত ডমিনিয়ন। ১৯৫০-এর পর থেকে ডমিনিয়ন বলাও বন্ধ করা হয়েছিল; ধীরে ধীরে কানাডা নিজস্ব সংবিধান নিয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ততদিনে বিশ্বের প্রায় সব দেশের মানুষ এখানে এসে বসবাস করা শুরু করে দিয়েছে।

শেষ রেসিডেন্সিয়াল স্কুল বন্ধ হওয়ার পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ফার্স্ট নেশন পরিবাররা সরকার থেকে আর্থিক সহায়তা পেতে শুরু করেছিল। তবে সেটাই তো একমাত্র সমস্যা নয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবার, উদ্দেশ্যবিহীন জীবনযাপন, অসামাজিক আচরণ—সব মিলিয়ে ফার্স্ট নেশন সমাজ তখন প্রায় ধ্বংসের মুখে। সাহায্যের হাত বাড়ালেই তো হয় না, তা গ্রহণ করার মতো বিশ্বাসটাও তো চাই। সেই অশান্ত সময়ে ফার্স্ট নেশনদের ভিতর থেকেই কিছু মানুষ এগিয়ে এসে কাজটা সহজ করে দিয়েছিলেন। তবে সব কিছু আবার আগের মতো হয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না, কোনোদিন আর হয়ওনি।

কিছু ভুল কোনোদিন আর শোধরানো যায় না, তবু কানাডা কিন্তু চেষ্টা করে গেছে। ২০০৫ সালে কানাডা সরকার রেসিডেন্সিয়াল স্কুল ফেরত পরিবারদের জন্য ১.৯ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে। ২০০৮-এ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। স্বীকার করেন মস্ত বড়ো ভুল হয়ে গেছে। এই ক্ষমাপ্রার্থনাকে সুসম্পর্ক স্থাপনের দিকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করার অনুরোধ জানান। সে নিরন্তর চেষ্টা আজও চলছে।

তবে কিনা সম্পর্ক বড়ো স্পর্শকাতর বস্তু। জোড়া লাগলেও আজও তার ফাঁকে ফাঁকে থেকে গেছে আঁচড়ের চিহ্ন। পরস্পর বিশ্বাস আছে, তাও দুই পক্ষই যেন খানিকটা সচেতন, এই বুঝি ভুল হয়ে গেল আবার। সহজ স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্ক আছে, আবার নেইও। আসলে খুব বেশিদিন তো হয়নি, দাগ ফিকে হয়েছে, সম্পূর্ণ মুছে যেতে আরও কত বছর লাগবে জানা নেই।

bhromoncanada9005

ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ফিলিস ওয়েবস্ট্যাডকে ছ’বছর বয়সে রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে ছিল উজ্জ্বল কমলা রঙের একটা শার্ট। স্কুলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের জিনিসপত্র কেড়ে নিয়ে জোর করে স্কুলের ইউনিফর্ম পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর প্রিয় শার্টটি কোনোদিন আর ফিরে পাননি তিনি। আজ কানাডা জুড়ে এই ঘটনার স্মরণে পালন করা হয় অরেঞ্জ শার্ট ডে। ৩০ সেপ্টেম্বর স্কুল, কলেজ, অফিস সব জায়গায় কমলা রঙের পোশাক পরে যায় প্রায় সবাই।

ইউভিক ফোটো সার্ভিসেসের (UVIC Photo Services) সৌজন্যে পাওয়া ২০১৯ সালের এই ছবিতে ফিলিস ওয়েবস্ট্যাড তাঁর প্রিয় কমলা রঙের টি শার্ট পরে আছেন। হাতের পালকটা সম্ভবত ঈগলের।

অবশেষে ২০২২ সালের মার্চ মাসে পোপ ফ্রান্সিস রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের কার্যপদ্ধতিতে ক্যাথলিক চার্চের নিন্দনীয় ভূমিকার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। সেই বছর জুলাইতে উনি কানাডাতে এসেওছিলেন।

লক্ষণীয় যে, এহেন ক্ষমাপ্রার্থনায় ফার্স্ট নেশনরা যে ভীষণরকম আপ্লুত হয়ে পড়ে তা কিন্তু একেবারেই নয়। ক্যাথলিক চার্চের প্রধান হয়েও পোপ যে ভুল স্বীকার করেছেন, এতে তারা অবশ্যই খুশি। ক্ষতি স্বীকৃতি পেলেই যে সবসময় ক্ষত শুকিয়ে যায় তা হয়তো নয়। তবে এটা প্রথম ধাপ তো বটেই।

আজ কানাডায় যে-কোনো অনুষ্ঠান শুরু করার আগে ফার্স্ট নেশন আর তাদের প্রথাগতভাবে অর্জিত ভূমিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একে বলে ল্যান্ড অ্যাকনলেজমেন্ট। যাঁরা এই ভূমিতে বাস করেছেন চিরকাল, তাঁদের সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যেই এই স্বীকৃতি।

আমাদের বাঙালি অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৩-এর দুর্গাপূজায় এসেছিলেন মেটি গোষ্ঠীর গায়িকা শন্টাল শ্যানিয়ো (Chantal Chagnon)। উনি শুধু গায়িকাই নন, মেটিদের সংস্কৃতি, রীতি-রেওয়াজ, ওষধি সম্পর্কিত প্রাচীন জ্ঞান প্রভৃতি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বহুদিন ধরে করে আসছেন। খালি গলায় গান শুনিয়েছিলেন সেদিন। আকাশের মতো উদার সেই কণ্ঠ শুনে মনে হয়েছিল বদ্ধ অডিটোরিয়ামে এই গান সত্যি মানায় না। খোলা প্রান্তর বেয়ে হু হু করে ছুটে আসবে প্রেইরির বিখ্যাত হাওয়া, দূর থেকে ভেসে আসবে বাইসনের খুরধ্বনি, দ্রিম দ্রিম করে বেজে উঠবে পাওআও (ড্রাম), তবেই এই গানের যথাযথ পরিবেশ তৈরি হবে। এই গানের সুরে অনায়াসে ঝলসে উঠবে রকির তুষার-ঢাকা শীর্ষ।

শন্টাল হাসিমুখে আলাপ করেছিলেন সবার সঙ্গে, ছবি তুলেছিলেন। দিব্য খিচুড়ি ভোগ খেয়ে ধুনুচি নাচে যোগ দিয়েছিলেন। সেই আনন্দের মুহূর্তের ছবি দিয়ে শেষ করি আজ।

ওই যে উজ্জ্বল গোলাপি চুলের হাসিখুশি মানুষটি।

bhromoncanada9006

বেশ কঠিন কঠিন ব্যাপার বললাম এই পর্বে।

এদিকে কিন্তু শুরু হতে চলেছে ঘোড়া আর কাউবয় বা গার্ল দের নিয়ে সেই পৃথিবী বিখ্যাত শো—স্ট্যাম্পিড। কানাডিয়ানরা বলে, ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। আজ মেলা চলবে পুরো এক সপ্তাহ ধরে। সেই মেলার গল্প নিয়ে ফিরে আসব পরের পর্বে, ততদিনে আমার এই বছরের স্ট্যাম্পিড দেখে আসাও হয়ে যাবে।

টা টা।

ক্রমশ

ভ্রমণ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply