ভ্রমণ-কানাডার চিঠি১-বুমা ব্যানার্জি দাস-শীত-২০২৩

Happy Canada Day background

রকি বেয়ে গল্পেরা সব প্রেইরি জুড়ে নামে,
জুটিয়ে নিয়ে লিখছি চিঠি, মেপল পাতার খামে।
।।
পোড়া গাছের সারি।
।।
।।
মেপল পাতার আপন দেশে আইন কানুন সর্বনেশে নয় ঠিকই, কিন্তু সর্বনেশে একটা কান্ড কানাডার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণপুবের অন্ট্যারিও অবশ্য একেবারেই বাদ যায়নি।

।।
এই সর্বনেশে কাণ্ডটি যে এই বছরই প্রথম হচ্ছে তা একদমই নয়, বসন্তের শেষ থেকেই এই অঞ্চলের লোকজন প্রস্তুত থাকে এর জন্য, কিন্তু এই বছরে (২০২৩) সমস্ত হিসেব ছাপিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধ্বংসের নতুন রেকর্ড।
bhromoncanada02
আমি পুড়ে যাওয়া গাছ আগে দেখিনি তেমন। ওই বাজ পড়ে ঝলসে যাওয়া গাছ দেখেছি কখনো, তবে তেমন কিছু একটা মনে হয়নি। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মাইলের পর মাইল জুড়ে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া গাছের সারি প্রথমবার দেখে গা শিরশির করে উঠেছিল। যেন মৃতদেহের সারি। কোনোটা তখনও খাড়া দাঁড়িয়ে, হয়তো ভিতর পর্যন্ত ঝলসে যায়নি,আবার কোনোদিন জেগে উঠবে,সবুজ পাতা বেরোবে। বেশির ভাগ হাল ছেড়ে দিয়ে এলিয়ে পড়েছে একপাশে। নৌকো করে ওয়াটারটন লেকে ঘোরাতে ঘোরাতে হাসি হাসি মুখের গাইড হঠাৎ গম্ভীর হয়ে তীরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন, “ওই যে দেখছ,২০১৭তে ওই পর্যন্ত এসে গিয়েছিল আগুন। শহরটাকে গিলে ফেলেছিল প্রায়। হঠাৎ হাওয়া অন্যদিকে ঘুরে যাওয়াতে রক্ষা পেয়েছিল ওয়াটারটন। এখনো ওদিকটায় বিস্তর পোড়া গাছ।” বোটের যাত্রীরা কেমন চুপ করে যায়। মনে মনে ক্যালগেরি থেকে ওয়াটারটনের দূরত্ব আরো একবার হিসেব করে নিই। ক্যালগেরিতে সংসার পেতেছি যে।
।।
কমলা সূর্যের দিন
bhromoncanada03
এই হিসেবটা অবশ্য মাঝে মধ্যেই করতে হয়। পাশের রাজ্য ব্রিটিশ কলম্বিয়া থেকে গলগল করে আসা ধোঁয়া যখন মুড়ে ফেলে শহরটাকে, দরজা জানলা সব বন্ধ করে ওয়াইল্ড ফায়ার ম্যাপ খুলে বসি তখন। হিসেব করি সবচেয়ে কাছের দাবানলটা আর কত দূর। হ্যাঁ, একটা ওয়াইল্ড ফায়ার ম্যাপ আছে, যেটাতে লাল কমলা বিন্দু দিয়ে জ্বলতে থাকা দাবানলগুলোর অবস্থান আর পরিস্থিতির উপর নজর রাখার ব্যবস্থা আছে। লাল মানে বিধ্বংসী, কমলা মানে নিভে এসেছে বা ছড়ানোর তেমন সম্ভাবনা নেই। এই বছরের ম্যাপে কমলা বিন্দু তেমন চোখেই পড়েনি। কানাডা না কিউবা বোঝা দায়।
।।
কেবল ধোঁয়া নয়, অদ্ভুত এক কটু গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে সেইসঙ্গে। কবি হলে বলতাম শ্মশানের গন্ধ। এ-ও তো একরকম শ্মশানই বটে। ধোঁয়ার সাথে মিশে থাকে হালকা ছাই। গাছের পাতায়, বারান্দার রেলিঙে, গাড়ির মাথায় আঙুল বোলালে ছাই উঠে আসে হাতে। ভারী অস্বস্তি হয়। তবে মাটিতে মিশলে এই ছাই উপকারী, ফুসফুসের পক্ষে একেবারেই তা নয়। প্রাণচঞ্চল ক্যালগেরি হয়ে যায় কল্পবিজ্ঞানের পাতা থেকে উঠে আসা ডিস্টোপিয়ান কোনো শহর। মাথার উপরে অসহায় কমলা রঙের  সূর্য হলদেটে আলো ছড়াতে থাকে।
।।
এখন বার্নিং কোয়েশ্চন (বাজে পান, স্বীকার করছি) হল এই তল্লাটে এত আগুন লাগে কেন জঙ্গলে। একটা কারণ তো ইয়ে, মানে মানুষ। এত বড় একটা কান্ড আর আমাদের কোনো অবদান থাকবে না তাতে, তাই কি হয়। ভয়ানক দায়িত্বশীল কেউ ধূমপান করে ধোঁয়ার কাঠির শেষটা ভালো করে না নিভিয়ে জঙ্গলে ছুঁড়ে ফেলল, অথবা ক্যাম্পে গিয়ে দুটো দিন হুল্লোড় করে ফেরার সময়ে ভালো করে আগুন নেভালো না, এসব তো আছেই। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্তত মানুষের ঘাড়ে পুরো দোষটা দেওয়া চলে না। বজ্রপাত থেকে আগুন লাগে, শুকনো কাঠে ঘষা লেগে আগুন জ্বলে ওঠে, আরো নানারকম জটিল কারণ আছে। চিরকালই এইভাবে লেগে এসেছে। কিন্তু ব্যাপার হলো, বছর কুড়ি আগেও এমন ভয়ানক দাবানল দেখা যেত না। একটু পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাপারটা বোঝাই। মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বলা যেতে পারে দাবানল ঋতু। এই বছর মে মাস পর্যন্ত চারশ ষোলোটা আলাদা আলাদা অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে, যেটা গত বছর একই সময় পর্যন্ত ছিল একশ বিরাশিটা। সত্যি কথা বলতে কি,এই বছরের মত এতটা না হলেও গত পাঁচ বছরে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে।
।।
সেটার কারণ বলতে গেলে একটু শিবের গান গাইতে লাগবে। পৃথিবীর আবহাওয়া নামক ব্যবস্থাটির দিকে একটু কড়া চোখে তাকানো যাক। হাওয়া গরম হয়ে উপর দিকে উঠে নীচে নিম্নচাপ তৈরি করে,অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা হাওয়ার উচ্চচাপযুক্ত এলাকা থেকে সেখানে হাওয়া ছুটে আসে ব্লা ব্লা ব্লা। এ আমরা একেবারে নীচু ক্লাস থেকে শুনে আসছি,তাই তো? কিন্তু এ হলো পৃথিবীর মাটির কাছের খবর।
।।
বায়ুমণ্ডলের একটু উপর দিকে ব্যাপারটা কী হচ্ছে একটু খতিয়ে দেখা যাক। উপর বলতে ধরা যাক ট্রোপোস্ফিয়ার আর স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের মাঝামাঝি ট্রোপোপজ এলাকা। মেরু অঞ্চলের ঠান্ডা ভারী হাওয়া নীচের দিকে নেমে যাওয়ার ফলে উপরের দিকে হাওয়ার ঘনত্ব কমে সেখানে তৈরি হয় নিম্নচাপ। আবার উল্টোদিকে ক্রান্তীয় থেকে উপ-ক্রান্তীয় এলাকায় গরম হাওয়া হালকা হয়ে উপর দিকে উঠে যাওয়াতে সেখানে, মানে ট্রোপোপজের ঠিক নীচে তৈরি হয় উচ্চচাপ। মাটি থেকে প্রায় দশ বারো কিলোমিটার উপরে এসব কান্ড ঘটে। অর্থাৎ, উষ্ণ অঞ্চল থেকে ঠান্ডা মেরু অঞ্চলে সেখানে বায়ু প্রবাহিত হয়। দুই অঞ্চলের তাপমাত্রার তফাৎ যত বেশি হয়, এই হাওয়ার গতিবেগও স্বাভাবিকভাবে তত বেশি। শীতকালে এই হাওয়ার গতিবেগ কখনও কখনও ঘণ্টায় তিনশো কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়াও বিচিত্র নয়। গরমকালে দুই অঞ্চলের তাপমাত্রার তফাৎ অত বেশি না হওয়ায় এই হাওয়ার গতিবেগ কিছু কম থাকে। 
।।
কিন্তু গরম অঞ্চলের হাওয়া ঠান্ডা অঞ্চলে সোজা ধেয়ে যাচ্ছে এমন সোজাসাপ্টা ব্যাপার হলে আর মজাটা কোথায়। অন্যান্য সব রকম হাওয়ার মতো এই হাওয়াও পৃথিবীর আবর্তনের পাল্লায় পড়ে সোজা না গিয়ে পুব দিকে ঘুরে যায়। সেখানেই অবশ্য শেষ নয়, এর সঙ্গে যোগ হয় আরো সমস্যা। জলের উপর বয়ে যাওয়া হাওয়ার আর স্থলের উপরের হাওয়ার ঠান্ডা বা গরম হওয়ার হার একেবারেই আলাদা। এই সমস্ত জটিলতা মিশে এই হাওয়ার চূড়ান্ত চেহারাটা দাঁড়ায় পশ্চিম থেকে পুবে বয়ে চলা ঢেউ খেলানো ফিতের মতো। একটা বাহারের নামও আছে এর। একে বলে জেট স্ট্রিম। এর ঢেউয়ের ভাঁজে কোথাও তৈরি হয় উচ্চচাপ কোথাও বা নিম্নচাপ। সেইমত ঝড় বৃষ্টি সাইক্লোন এইসব ছড়াতে ছড়াতে পৃথিবী পরিক্রমণ করতে থাকে এই জেট স্ট্রিম। বোঝাই যাচ্ছে কোন অঞ্চলের কী আবহাওয়া হবে সেটা এই সর্পিল ফিতেটাই নিয়ন্ত্রণ করে। আর যেহেতু ফিতেটি চলমান, তাই যে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের আবহাওয়ার পরিবর্তন জুড়ে থাকে এর সঙ্গে। মানে যেখানে ঝড় হচ্ছে সেখানে ঝড় হতেই থাকে না, ইত্যাদি।
।।
এবার দাবানলের কথা বলতে গিয়ে জেট স্ট্রিমকে কেন টেনে আনলাম সেইটে বলি। বিগত কয়েক দশকের বিশ্ব উষ্ণায়নের পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে সুমেরু অঞ্চল বাকি পৃথিবীর তুলনায় প্রায় চারগুণ দ্রুততর হারে উষ্ণ হয়েছে। আগে গ্রীষ্মের যে সময়ে সেখানে তুষার গলতে শুরু করত,তার তুলনায় অনেক আগে সেখানে তুষারের আস্তরণ গলে ভূখণ্ড অনাবৃত হয়ে পড়ে। এই অনাবৃত ভূখণ্ড গ্রীষ্মকালে অনেক বেশি তাপ শুষে নিয়ে উষ্ণায়নকে আরো বাড়িয়ে নিয়ে চলে। এই সব গন্ডগোলের ফলে মেরু আর ক্রান্তীয়/ উপক্রান্তীয় অঞ্চলের মধ্যেকার তাপমাত্রার তফাৎ ধীরে ধীরে কমে আসছে, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে। স্বাভাবিকভাবে এর ফলে জেট স্ট্রিমের আচরণও পাল্টে যাচ্ছে দিন দিন। ঘোর গ্রীষ্মে সে হয়ে যাচ্ছে আরো সর্পিল, ধীরগতি। কখনও গতিহীন হয়ে থেমেই যাচ্ছে একপ্রকার। 
।।
এই প্রায় গতিহীন জেট স্ট্রিম উচ্চচাপ এলাকা তৈরি করে ফেলে। সেই এলাকার সঙ্কুচিত উষ্ণ বায়ু উপর দিকে উঠতে পারে না এই চাপের জন্য, ফলে মেঘ তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আকাশ নির্মেঘ থাকার দরুন সূর্যের বিকিরণ আরো বেশি পরিমাণে সেই ভূখণ্ডে এসে পড়ে। সেই এলাকা হতে থাকে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর। সমস্ত আর্দ্রতা নষ্ট হয়ে গিয়ে সেই ভূখণ্ড হয়ে পড়ে শুকনো খটখটে। এই বিশ্রী অসহ্য পরিস্থিতিকে বলে হিট ডোম। এই বছর একেবারে বসন্তের শেষ থেকেই এই অঞ্চলে হিট ডোম তৈরি হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। শুধু এই বছর নয়,২০২১ থেকেই এই প্রবণতা বেড়ে চলেছে। শুকনো খটখটে বনভূমিতে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে নিয়ন্ত্রণহীন দাবানল। নষ্ট হচ্ছে সম্পত্তি, বন্যপ্রাণী। 
।।
সাধারণত দাবানল শুরু হলেই সেই এলাকার বন্যপ্রাণী বনের অন্য অঞ্চলে পালিয়ে যায়। তবে শিশু, অসুস্থ বা বৃদ্ধ প্রাণীদের পক্ষে সেটা সম্ভব হয় না সবসময়ে। তাছাড়া বিকট ধোঁয়ায়, তাপে, অক্সিজেনের অভাবে, অসুস্থ হয়ে মারা পড়ে বহু বন্যপ্রাণী। পালাতে গিয়ে পুড়ে মরার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। 
।।
সে না হয় দাবানল লাগল,কিন্তু তা এমন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছে কেন,নেভানো সম্ভব হচ্ছে না কেন তাকে? সেটা বুঝতে গেলে কীভাবে দাবানলের মোকাবিলা করা হয় সেটা বোঝা দরকার। অন্ট্যারিও বা কোয়েবেকে, যেখানে লেকের সংখ্যা অনেক বেশি, জল হল সেখানে প্রধান হাতিয়ার। হয় ফোম মিশিয়ে হেলিকপ্টার থেকে ঢালা হয়,অথবা লেক থেকে পাম্প করে তুলে হোসে ভরে জল ছিটানো হয়। শুকনো জায়গায়,যেমন ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় আবার ধেয়ে আসা আগুনের রাস্তা থেকে না পোড়া গাছগাছালি,ফসল ইত্যাদি নষ্ট করে দেওয়া হয় যাতে আগুন ছড়াতে না পারে। ব্যাপার হল,যত জায়গায় আগুন লেগেছে,তত আগুন নেভানোর মতো পরিকাঠামো সত্যিই নেই। উপর থেকে জল ঢেলে আগুন নেভানোর পদ্ধতি কার্যকরী হতে গেলে প্রত্যেক দশ বারো মিনিট অন্তর একটা করে হেলিকপ্টার উড়ে যাওয়া প্রয়োজন। তার উপর এই পদ্ধতি আগুন ঠিক নেভাতে পারে না পুরোপুরি, ছড়াতে দেয় না মাত্র। আগুন পুরোপুরি নেভাতে গেলে বা নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা আগুন (যাকে বলে হটস্পট)খুঁড়ে বের করতে হয়। কুড়ুলের মত দেখতে পুলাস্কি দিয়ে এই কাজটা করে দাবানল যোদ্ধারা। মাটির নীচের ওই হটস্পট না নেভালে আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আগুন মাথা চাড়া দেবে। ।।
বোঝাই যাচ্ছে চট করে শান্তি স্থাপন করেন না কানাডার অগ্নিদেব। তার উপর একসঙ্গে শয়ে শয়ে আগুন শুরু হলে ধীরে ধীরে তা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী। অগ্নিযোদ্ধাদের নিজেদের বিপদও বড় কম নয়। পুড়ে যাওয়া গাছ ভেঙে পড়ে চাপা দিতে পারে, তাপের চোটে হিট স্ট্রোক হওয়াও বেশ সাধারণ ব্যাপার। ।।
সবচেয়ে বড় কথা হলো কানাডার প্রধান সৌন্দর্যই তার দাবানল নেভানোর পথে প্রধান অন্তরায়। জঙ্গলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দুর্গম,পৌঁছাতে গেলে ম্যাপ বা রাস্তা কোনোটার সাহায্যই পাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে যদি সেই দুর্গম অঞ্চলে আর বসতিপূর্ণ অঞ্চলে আগুন লাগে, বলাই বাহুল্য দ্বিতীয়টা নেভানোর এবং সম্পত্তি, প্রাণ ইত্যাদি রক্ষার চেষ্টা করাটাই সমীচীন। আর জঙ্গলের গভীরে লাগা সেই আগুন ততক্ষণে হয়তো গ্রাস করেছে মাইলের পর মাইল। সেরকম জোরালো হাওয়া থাকলে মিনিটে পঞ্চাশ থেকে সত্তর মিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েন ইনি।
।।
এই বছরের ক্ষয়প্রাপ্ত বনাঞ্চলের হিসেবের দিকে তাকালে সত্যি আঁতকে উঠতে হয়। ১৯৯০ থেকে বেশ কিছু বিধ্বংসী দাবানলের সাক্ষী হয়েছে কানাডার বনাঞ্চল, তাও জঙ্গল,ঘাসজমি, ঝোপঝাপ মিলিয়ে আগুনের কবলে পড়া এলাকার বাৎসরিক গড় ছিল ২.৫ মিলিয়ন হেক্টর। ভয়াবহ লাগছে? তাহলে এই বছরের হিসেবটা দেখা যাক। এখনো পর্যন্ত ১৫ মিলিয়ন হেক্টর জ্বলে ছাই হয়ে গেছে। ৬১১৮ টি আলাদা আলাদা দাবানলের খবর নথিভুক্ত হয়েছে। দুই লাখ মানুষকে করা হয়েছে স্থানান্তরিত। আগুন আয়ত্তে আনতে কানাডা সরকার বাধ্য হয়েছে আন্তর্জাতিক অগ্নিযোদ্ধাদের সাহায্য নিতে। বর্তমানে ৫৮০০র বেশি কানাডিয়ান অগ্নিযোদ্ধার পাশাপাশি প্রায় পাঁচ হাজার আন্তর্জাতিক কর্মীও দিন রাত এক করে কাজ করছেন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এই সংখ্যা নিতান্তই কম। কেন, একটা উদাহরণ দিয়ে বলি। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ডনি ক্রিক অঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল ৫,৭৪৫ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে। মে মাসের মাঝামাঝি বাজ পড়ে শুরু হয়েছিল এই ভয়ানক দাবানল। প্রায় দুই মাস অক্লান্ত লড়াই চালানোর পর একে নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে, তাও বৃষ্টি নেমেছিল বলে।
।।।।
।।
এটা কিন্তু ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় লাগা একমাত্র দাবানল নয়,এত বিশাল না হলেও আরো ছশোর উপর ছোটখাটো দাবানল শুরু হয়েছিল সেখানে। তাদের মধ্যে কিছু এখনো জ্বলছে। কিন্তু এ তো গেল শুধুমাত্র ব্রিটিশ কলম্বিয়ার কথা। এই বছরের দাবানল নিত্য নতুন রেকর্ড স্থাপন করে চলেছে। সাধারণত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে এই লঙ্কাকাণ্ড। তারপর আবহাওয়া ঠান্ডা হয়ে আসে,তুষারপাত শুরু হয় বিভিন্ন এলাকায়, ধীরে ধীরে দাবানলের প্রকোপ কমে আসে। তবে আশ্চর্য ব্যাপার হল, মাটির নীচে এর অস্তিত্ব থেকে যায় মাসের পর মাস। এমনকী বছরের পর বছর ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে, অপেক্ষায় থাকে সুযোগের। উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি হলেই আবার লেলিহান শিখা হয়ে লাফিয়ে ওঠে।
।।
এই পোড়া ছাই প্রাণীজগতের পক্ষে ভীষণ ক্ষতিকর। দাবানল জনিত দূষণ ছড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার মাইল জুড়ে। বিপুল পরিমাণে কার্বন ডাইঅক্সাইড আর অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস মিশতে থাকে বায়ুমণ্ডলে। ফলস্বরূপ ফুসফুসের সমস্যা শুরু হতে পারে,এমনকি সুস্থ মানুষেরও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া গাছ ধ্বংস হওয়ার ফলে শিকড় দিয়ে মাটিকে ধরে রাখার কাজটা বন্ধ হয়। মাটির ধ্বসে পড়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়। এর ফল সুদুরপ্রসারী।
।।
এই জ্বলে যাওয়া বনাঞ্চলের ভবিষ্যৎ কী? কানাডার জঙ্গল চিরকাল জ্বলেছে, আবার নতুন করে সৃষ্টি করে নিয়েছে নিজেকে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কোনো কোনো গাছের আবার এই সর্বনাশেই পৌষ মাস। জ্যাক পাইন, লজপোল পাইনের ফল বা কোণ এমন মোমের মত বস্তু দিয়ে ঢাকা থাকে যে আগুনের তাপ না পেলে সেই ফল ফেটে বীজ বের হতেই পারে না। আবার বনের মেঝেতে জমে থাকা পাতা, আগাছা, ঝোপ পুড়ে না গেলে অনেক নতুন গাছ গজানোর সুযোগই পায় না। এতদিন তাই-ই হয়ে এসেছে। কিন্তু এবারের অগ্নিকাণ্ড অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বনভূমিতে। প্রকৃতি কি পারবে? বিশেষজ্ঞরা একমত নন। কারো মতে জঙ্গলের ধরণটা হয়তো বদলে যাবে,কমে যাবে সাধারণ কনিফারদের সংখ্যা। হয়তো যে সমস্ত প্রজাতির গাছ আগুনজনিত ক্ষয় দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারে, তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। অথবা কে জানে, হয়তো নতুন প্রজাতির বিবর্তিত কোনো গাছ জন্ম নেবে কানাডার বনভূমি জুড়ে।
।।
এই গ্রহের সামগ্রিক বনভূমির প্রায় নয় শতাংশ আছে কানাডায়। অঙ্কের হিসেবে সেটা ৩৪৭ মিলিয়ন হেক্টর। প্রত্যেক বছর বসন্তের শেষ থেকে হেমন্তের মাঝামাঝি পর্যন্ত এর খানিকটা অংশ পুড়ে ছাই হয়,আবার গজিয়ে ওঠে। জন্মমৃত্যুর আবর্তের মতো অমোঘ, ত্রুটিহীন এই চক্র। এর যে অংশ প্রকৃতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত,তা আমাদের হাতের বাইরে। কিন্তু মনুষ্যকৃত গুণকগুলি হয়ত একটু চেষ্টা করলে আয়ত্তে আনা যেতে পারে। এই গ্রহের অপূরণীয় ক্ষতি আমরা করেই ফেলেছি, হয়তো দেরিও হয়ে গেছে অনেক। ১৫ মিলিয়ন হেক্টর পোড়া বনভূমির দিকে তাকিয়ে, সুমেরুর ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার দিকে তাকিয়ে, কী ভাবছে প্রাণীজগতের সেরা প্রজাতি?

।।
কানাডায় সেপ্টেম্বর বাইশ থেকে হেমন্তের শুরু বলে ধরে নেওয়া হয়। সামনে শীতের আশ্চর্য সুন্দর অথচ কঠিন দিন। উত্তর গোলার্ধ শীতল হবে, দাবানল নামের এই জ্বলন্ত দুঃস্বপ্ন নিভে আসবে ধীরে ধীরে। কোথাও কোথাও মাটির নীচে সে অসহ্য তাপ পরের বছরের অপেক্ষায় চুপচাপ বসে থাকবে। তুষারের নীচে চাপা পড়বে ছাই,জ্বলে যাওয়া গাছের মৃতদেহ। পড়ে থাকা মৃত বন্যপ্রাণীদের দেহাবশেষও ঢেকে যাবে তুষারের লেপে। 
।।
সব ভুলে জীবন এগিয়ে যাবে, যেমন যায়। 
।।
অনেক মন খারাপের কথা হলো, এবার একটা মজার কথা বলি। সদ্য বিদায় নিল ভূতেদের দৌরাত্ম্য করার দিন, হ্যালোউইন। অক্টোবর মাসের শেষ দিনে সে যে কী মজার কান্ড হয়, কী বলব! বাজারের সামনে আগে থেকেই স্তূপ করা থাকে কুমড়োর দল। কিন্তু এখন আর নয়, সেই গল্প নিয়ে আবার আসব পরের পর্বে। 
টাটা।
এরপর পরের সংখ্যায়

ভ্রমণ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply