ভ্রমণ-কানাডার চিঠি৩-বুমা ব্যানার্জি দাস-বর্ষা-২০২৪

Happy Canada Day background

রকি বেয়ে গল্পেরা সব প্রেইরি জুড়ে নামে,
জুটিয়ে নিয়ে লিখছি চিঠি, মেপল পাতার খামে।
পর্ব ৩
।।

“আমাদের পূর্বজরা অন্য কোথাও থেকে এখানে আসেনি—এ আমাদের স্বভূমি, আমাদের বাসস্থান। আমাদের অন্য কোথাও যাওয়ার নেই, কারণ আমরা স্বস্থানেই আছি” – উক্তি তো নয়, এ হল ঘোষণা। এ নিনাদ যাঁদের, তাঁরা আজও মাটির কাছাকাছি, প্রকৃতির নিয়ম মেনে বাঁচতে পছন্দ করেন। তাঁরা এই অঞ্চলের আদিতম বাসিন্দা, আজকের ভাষায় যাঁদের বলা হয় ফার্স্ট নেশন।

কানাডা স্বায়ত্তশাসিত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায় ১৮৬৭ সালে। তার আগে দেশটাকে ব্রিটিশরা কলোনি বানিয়ে রেখেছিল বহুবছর। ব্রিটিশদেরও আগে ফরাসিরা এ-দেশের দখল নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, এমনকি নাম পর্যন্ত রেখেছিল নিউ ফ্রান্স। তারপর ব্রিটিশদের সঙ্গে ফরাসিদের বহুবছর ধরে যুদ্ধবিগ্রহ হয়, সে-সব কথায় পরে আসছি। ইওরোপীয়রা কানাডায় এসে পৌঁছানোরও আগে দেশটাতে কারা থাকত, কীভাবে থাকত সেই গল্পটা আগে করা যাক।

অনুমান করতেই পারছ, দেশটা তখন যাকে বলে নিতান্তই বুনো। চারদিকে ঘন জঙ্গল, পালে পালে জন্তুজানোয়ার ঘুরে বেড়াচ্ছে; তার উপর বেশিরভাগ সময়েই যাকে বলে তুষারাবৃত। সে-সব সহ্য করে যে আদি বাসিন্দারা টিকে গেছিল এখানে, কানাডিয়ান ঐতিহাসিকরা তাদের ছয়রকম দলে বিভক্ত করেছেন। এই বিভাজন অনেকটাই তাদের ভৌগলিক অবস্থানের উপর নির্ভরশীল। একটু বুঝিয়ে বলি।

কানাডা বললেই মনে পড়ে বিস্তীর্ণ তাইগা বনাঞ্চল, তাই তো? এখানে অবশ্য তাইগা বলে না, ওর কানাডিয়ান নাম হল বোরিয়াল ফরেস্ট বা তুষার জঙ্গল। ৫৫২ মিলিয়ন হেক্টর জুড়ে পাইন, স্প্রুস আর লার্চ গাছে ভরা এই কানাডিয়ান তাইগা। দেশের পুবদিকের বোরিয়াল ফরেস্টের আদি বাসিন্দাদের নাম উডল্যান্ড ফার্স্ট নেশন। খুবই যথাযথ নাম সন্দেহ নেই।

দক্ষিণাঞ্চলের উর্বর জমির বাসিন্দাদের নাম ইরোকোইয়ান ফার্স্ট নেশন। এরা চাষ-আবাদে পটু ছিল।

প্রেইরির ঘাসজমির মালিকানা বর্তেছিল প্লেইনস ফার্স্ট নেশনদের উপর।

উত্তরের পাহাড় আর জঙ্গল ছিল প্ল্যাটো ফার্স্ট নেশনদের দখলে।

প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে বাস করত প্যাসিফিক কোস্ট ফার্স্ট নেশনরা। এরা সিডার গাছ দিয়ে পেল্লায় পেল্লায় বাড়ি বানাত।

বাকি থাকল ম্যাকেঞ্জি আর ইউকন নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী ফার্স্ট নেশনরা। এদের জীবন সবচেয়ে কঠিন ছিল—কারণ, একে ওই এলাকার জমি অনুর্বর, তার উপর ছিল মাসকেগ নামে জলাজমির প্রাদুর্ভাব।

একটু ভূগোল বইয়ের গন্ধ বেরোচ্ছে? ধৈর্য ধরো—মারপিট, ঝগড়া, যুদ্ধবিগ্রহ সব আছে, মায় কিডন্যাপিং পর্যন্ত।

তা এ তো গেল কোন ফার্স্ট নেশন দল কোথায় থাকত তার বৃত্তান্ত। একটা কথা কিন্তু মনে রাখা দরকার, এই প্রত্যেকটা দলে আবার একাধিক আলাদা আলাদা ট্রাইব বা গোষ্ঠী থাকত। যেমন বোরিয়াল উডল্যান্ডদের শিকারের অঞ্চল অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী ছিল। না, শিকারের এলাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব বিশেষ ছিল না এদের মধ্যে। তবে এরা প্রত্যেকেই ছিল দক্ষ শিকারি, আর সেরা শিকারি পেত দলনেতার শিরোপা। সেরা শিকারি মানে কিন্তু সবচেয়ে বেশি পশু মারতে পারা নয়। এখানেই সাধারণ শিকারি আর ফার্স্ট নেশন শিকারিদের মধ্যে অনেক তফাত। প্রকৃতির এত কাছে, বলতে গেলে প্রায় প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকত বলেই এরা প্রকৃতির দানকে অত্যন্ত সম্মান করত। প্রয়োজন ছাড়া বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিকার এরা কখনোই করত না। শোনা যায়, ভালুক শিকার করার আগে গান গেয়ে সেই ভালুককে খাদ্য ও চামড়া দান করার জন্য ধন্যবাদ জানানোর রীতি পালন করা হত। এছাড়াও পরিযায়ী পশুদের গমনপথ ইত্যাদি বিষয়েও তাদের গভীর জ্ঞান ছিল।

বলা বাহুল্য, শিকার এদের খাদ্যের মূল উৎস হওয়ার দরুন এরা জঙ্গলের এক জায়গায় বেশিদিন থাকতে পারত না। শিকারের পশু কমে এলেই গাছের ছাল কি পশুর চামড়া আর হালকা খুঁটির তাঁবু বগলদাবা করে হাঁটা লাগাত। এই তাঁবুগুলোকেই টিপি বলে। আজকাল কোনও ফার্স্ট নেশনই টিপিতে বাস করে না, কিন্তু মেলা বা প্রদর্শনীতে খুব দেখতে পাওয়া যায়।

bhromoncanada01

তিনটে টিপির ছবি দিলাম। একটা মেলায় দেখেছিলাম এগুলো। খেয়াল করে দেখো, টিপির গায়ের মোটিফগুলো কেমন আলাদা। অর্থাৎ, তিনটে আলাদা গোষ্ঠীর টিপি। খুঁটিগুলো পাইন গাছ থেকে বানানো। একটা টিপি বানাতে আন্দাজ বারোটা মোষের চামড়া লাগত। ছবির টিপিগুলো পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি নয় যদিও। উডল্যান্ড ফার্স্ট নেশনরা ছাড়াও উত্তরের বনের আর ইউকন নদীর অববাহিকার বাসিন্দারাও টিপিতে থাকত। টিপি বানানোর ভার থাকত দলের মহিলাদের উপর, আর টিপির মালকিনও ছিল তারাই।

ইরোকোইয়ান ফার্স্ট নেশনদের জীবনযাত্রা এদের থেকে বেশ একটু আলাদা ছিল কারণ, উর্বর জমিতে থাকার দরুন ওরা ফসল ফলানোর সুযোগ পেত। শুধু তাই নয়, এর ফলে এরা একই জায়গায় বেশ কিছু বছর, অন্তত সেই জায়গার মাটির উর্বরতা না হারানো পর্যন্ত থেকে যেতে বাধ্য হত। তাই ইরোকোইয়ানদের আর এক নাম হোডিনো-শনি (উচ্চারণ কিন্তু শো নয়, শ), ওদের ভাষায় যার অর্থ হল, যারা বাড়ি বানায়।

ফসল ছিল তিনরকম—ভুট্টা, বইন আর স্কোয়াশ। এই তিন ফসলকে ওরা বলত তিন বোন। পুরুষরা জঙ্গল সাফ করে চাষের জমি পরিষ্কার কর, চাষ রক্ষণাবেক্ষণ ও ফসল তোলার কাজ মহিলারা সামলাত। জমি উর্বরতা হারালে আবার নতুন চাষের জমি পরিষ্কার করার পালা। তবে বছর দশেক একই জায়গায় থাকার সুযোগ এরা পেত। যে-বাড়ি বানানোর জন্য এমন নাম ওদের, সেগুলো কেমন দেখতে হত বলি। এক-একটা বাড়ি হত প্রায় দশ মিটার চওড়া, দশ মিটার উঁচু আর লম্বায় পঁচিশ মিটার। উলটানো ইউ-র আকারে খুঁটি বেঁধে তার উপর বিছানো হত গাছের ছাল। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলারা হতেন এই লংহাউসের মালকিন।

bhromoncanada02

লংহাউস স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়নি, ছবিগুলো Alamy Stock Phot-র সৌজন্যে প্রাপ্ত। দ্বিতীয় ছবিতে লংহাউসের ভিতরে শোবার আর ঠিক মাঝখানে আগুন জ্বালাবার কেমন ব্যবস্থা ছিল বোঝা যায়। ছাদের কাছে মালার মতো ঝুলছে শীতের জন্য জমানো ভুট্টা।

হোডিনো-শনিদের সম্বন্ধে আর একটা কথা না বললে চলে না। ওরা নাকি অসম্ভব তাড়াতাড়ি দৌড়াতে পারত; অনেক লম্বা দূরত্ব খুব অল্প সময়ে দৌড়ে চলে যেতে এদের জুড়ি ছিল না।

প্রেইরির বাসিন্দারা, অর্থাৎ প্লেইনস ফার্স্ট নেশনরা বাইসন শিকারে ছিল ওস্তাদ। জুন-জুলাই নাগাদ যখন গ্রীষ্মের ভুরিভোজের পর বাইসনগুলো বেশ নধরকান্তি হত, তখনই শুরু হত এদের হান্টিং সিজন। এক-একটা বাইসন থেকে মিলত প্রায় সাতশো কেজি মাংস। আন্দাজ করতে পারছ নিশ্চয়ই প্রেইরির বাইসন কেমন বিশাল? চামড়ার থলেতে সেই মাংস পুরে সেদ্ধ করে সুস্বাদু স্যুপ বানানো হত। মাংস শুকিয়ে রেখে দেওয়া হত কাঁচা চামড়ার থলেতে। ওভাবে নাকি অনেকদিন পর্যন্ত খাবার ভালো থাকে। ওই শুঁটকি মাংসকে জার্কি বলে। জার্কি গুঁড়ো করে মোষের গলানো চর্বি আর বেরি মিশিয়ে ওরা পেমিকান নামে একটা খাবার বানাত। শিকারে বেরোনোর সময় এই পেমিকান সঙ্গে রাখতে ভুলত না প্লেইনস ফার্স্ট নেশনরা। অনেক পরে, ইওরোপীয় ব্যবসায়ী আর অভিযাত্রীরাও এই পেমিকান নিয়ে লম্বা পাড়ি জমানোর অভ্যাস করেছিল। তাদের গল্পে আসব ধীরে ধীরে।

প্লেইনস ফার্স্ট নেশনদের আর একটা বিশেষত্ব ছিল, এরা কুকুরে টানা ছোটো গাড়িতে মালপত্র বয়ে নিয়ে যেত।

প্ল্যাটো ফার্স্ট নেশনদের প্রধান খাদ্য ছিল নদী থেকে ধরা স্যামন মাছ। এরা দক্ষ জেলে, লাঠির ডগায় লাগানো জাল বা হুকের সাহায্যে রাশি রাশি স্যামন ধরত গ্রীষ্ম আর শীতের শুরুতে। এর বেশিরভাগটাই অবশ্য প্রখর শীতের জন্য জমিয়ে রাখত ওরা। মাটির নীচে গর্ত খুঁড়ে, বার্চ গাছের বাকল দিয়ে সে-গর্ত ঘিরে, তাতে শুকনো মাছ রাখা হত শীতকালের খাদ্য হিসেবে। এছাড়া কন্দ আর বেরিও এদের মেনুর প্রধান অংশ ছিল।

গর্ত খুঁড়ে শুধু যে মাছ রাখত তা নয়, নিজেরা থাকার জন্যও প্রায় দুই মিটার গভীর ছয় থেকে বারো মিটার চওড়া গর্ত খুঁড়ে ফেলত অনায়াসে। খুঁটি আর গাছের ছাল দিয়ে তৈরি হত গর্তের আচ্ছাদন। এখানের কুখ্যাত শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য গাছের ছালের উপর চাপাত স্প্রুস গাছের ডাল আর গর্ত খোঁড়ার ফলে বের হওয়া মাটির তাল। ধোঁয়া বেরোনো আর যাতায়াতের পথ হিসাবে ছোটো একটা ফাঁক থাকত উপরে। সেখান থেকে ধাপ করা গাছের গুঁড়ি নামত গর্তের ভিতর। গুঁড়ির মাথাটা বেরিয়ে থাকত গর্তের বাইরে। যেহেতু নদীর কাছাকাছিই থাকতো এরা, ডিঙি বানিয়ে নদী বেয়ে যাতায়াত করাই এদের পক্ষে ছিল স্বাভাবিক এবং সুবিধের।

গর্ত বাড়ি আর ধিকি ধিকি ধোঁয়ায় স্যামন শুঁটকি বানানোর ছবি রইল নীচে। এসবও স্বচক্ষে দেখিনি কখনও।

bhromoncanada03

বাড়ি বানানেওয়ালা হোডিনো-শনিরাও বছর দশেক বাদে বাদে উর্বর জমির সন্ধানে পাড়া পালটাত, কিন্তু প্যাসিফিক কোস্ট ফার্স্ট নেশনরা একেবারে স্থায়ী গ্রাম বানিয়ে শিকড় গেড়ে বসত। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে খাদ্যের ভান্ডার অফুরন্ত, যাযাবরগিরি করার প্রয়োজন তাদের পড়বে কেন? পুরাতত্ত্ববিদরা এমন একটি গ্রামে প্রায় চার হাজার বছর ধরে বসবাসের চিহ্ন পেয়েছেন। এরা খাদ্যতালিকা থেকে স্যামন, অক্টোপাস, কাঁকড়া, তিমি—কিচ্ছুটি বাদ দিত না। শীতকালের জন্য যথারীতি স্যামন শুঁটকি বানিয়ে রাখা হত। সেই শুঁটকি আবার মাছের তেল দিয়ে মেখে খেত ওরা।  বিশেষ করে ইউলাকন নামে একধরনের ছোটো মাছের তেল এদের বিশেষ প্রিয় ছিল। এই ইউলাকন এত তৈলাক্ত যে শুকনো মাছে আগুন ধরালে তা নাকি মোমবাতির মতো জ্বলে। তাই এর আর এক নাম ক্যান্ডেল ফিশ। এই ছোটো তৈলাক্ত শ্রেণির মাছকে বলে স্মেল্ট। দক্ষিণ ভারতেও কিন্তু স্মেল্ট ভেজে খাওয়ার প্রচলন আছে।

এই মৎস্যপ্রেমী ফার্স্ট নেশনরা আবার ওস্তাদ কাঠের কারিগরও ছিল। উপকূল জোড়া সিডার গাছের বন থেকে কাঠ কেটে চমৎকার বাড়ি বানাতে জানত। ফার্স্ট নেশন সংস্কৃতিতে সিডার গাছ প্রাণশক্তির প্রতীক। বিশাল আকারের সেইসব বাড়িতে একাধিক পরিবার বাস করতে পারত, তবে প্রত্যেক পরিবারের বসবাসের জায়গা ও চুল্লি হত আলাদা। সিডার গাছ দিয়ে মাছ ধরার ডিঙি নৌকাও তৈরি করত প্যাসিফিক কোস্ট ফার্স্ট নেশনরা।

এক-একটা ডিঙি বানাতে লাগত মাস খানেক। যারা ডিঙি বানাত, পুরো সময়টা তাদের খুব নিয়ম-নিষ্ঠার মধ্যে কাটানোর রীতি ছিল।

এই উপকূলবর্তী ফার্স্ট নেশনদের অন্যতম গোষ্ঠী ছিল নু-চা-নুল্থ। এরা কাঠের তৈরি হারপুন নিয়ে তিমি শিকারে বেরোত। হারপুনধারী ছাড়াও তিমি শিকারের নৌকাতে থাকত আরও জনা আষ্টেক শিকারি।

bhromoncanada04

ছবির তিমি শিকারের ভাস্কর্যটি ব্রিটিশ কলম্বিয়া মিউজিয়ামে আছে। ছবি ঋণ: উইকিমিডিয়া কমন্স।

খাদ্যাভ্যাস বা বাসস্থান এলাকা অনুযায়ী আলাদা হলেও প্যাসিফিক কোস্ট ফার্স্ট নেশনরা ছাড়া বাকিদের রোজকার পোশাক মোটামুটি একই ধরনের ছিল। হরিণ, ক্যারিবু, বাইসন ইত্যাদি পশুর চামড়া ছিল পোশাকের মূল উপাদান। হাড়ের তৈরি সূঁচ দিয়ে সেলাই করা হত সে-সব পোশাক। শীতকালে তার উপর একপ্রস্থ পশুর লোমের আস্তরণ চড়ত। ক্যারিবুর লোম নাকি শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য সেরা।

প্যাসিফিক কোস্টের লোকজন সিডার গাছের ছাল পিটিয়ে নরম করে তা দিয়ে পোশাক বানাত। এমনকি বর্ষাতি পর্যন্ত বানানো চলত ওই বস্তু দিয়ে। স্প্রুস গাছের শিকড় বুনে টুপি বানালেও জুতোর ধার ধার না এরা। তিমি শিকারি সেই নু-চা-নুল্থরা আবার বাকলের ফাঁকে ভোঁদড়ের লোম বুনে বাহার দিয়ে বেড়াত।

উৎসবের পোশাকে অবশ্য সকলেই কিছু না কিছু শৌখিনতার চিহ্ন রাখার চেষ্টা করত। যেমন উডল্যান্ড ফার্স্ট নেশন আর হোডিনো-শনিরা জুতো-জামায় শজারুর কাঁটা দিয়ে নকশা আঁকত। ফুল-ফল-বেরি থেকে আসত লাল, হলুদ, সবুজ আর নীল রঙ। এছাড়া মুখে রঙ মাখার প্রচলন তো ছিলই। মেক-আপ নয়, ওয়র পেইন্ট।

প্রত্যেক বছর দারুণ হইচইয়ের রোডিও শো হয় ক্যালগেরিতে। কাউবয় (গার্ল), ঘোড়া, খাওয়াদাওয়া, মেলা, আতশবাজি নিয়ে সাতদিনের এক এলাহি কারবার। সে-গল্প তো অবশ্যই বলব কোনও পর্বে।

তা সেই স্ট্যামপিড উৎসবে বর্তমান প্রজন্মের ফার্স্ট নেশনরা আসেন, দারুণ নাচগান হয়। এসব নিজের চোখে দেখা। ছবি রইল নীচে।

bhromoncanada05

প্রথম ছবিতে দুই বয়োজ্যেষ্ঠা। ঐতিহ্য অনুযায়ী অনুষ্ঠান শুরু করার অধিকার কেবল এঁদের। সকলে খুব সম্মানের সঙ্গে কথা বলছিল ওঁদের সঙ্গে। প্রকৃতির নানা বিষয়ে বয়োজ্যেষ্ঠাদের জ্ঞান অপরিসীম। পরের ছবিতে দুই রাজপুত্তুর। এঁরা সকলেই প্রেইরির ফার্স্ট নেশন হলেও গোষ্ঠী অনুযায়ী পোশাকের তারতম্য হয়। গলা থেকে স্কার্ফের মতো যেগুলো ঝুলছে ওগুলো কিন্তু পুঁতি দিয়ে বোনা। ওই পুঁতির বুনন দেখেই নাকি কে কোন গোষ্ঠীর তা চেনা যায়। সে জ্ঞান কি আর সকলের থাকে?

bhromoncanada06

আরও কিছু বাহারের পোশাকের ছবি। নাচ সেদিন দারুণ জমেছিল। মাঝখানে জড়োসড়ো অড ম্যান আউট হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অনুষ্ঠান পরিচালক।

এই বিবিধের মাঝে মহান মিলন রূপে দাঁড়িয়ে আছে সকল ফার্স্ট নেশনদের বিস্ময়কর জীবনদর্শন ও সংস্কৃতি। ভৌগোলিক অঞ্চল বা গোষ্ঠী যাই হোক না কেন, ফার্স্ট নেশনরা সবাই বিশ্বাস করে—তাদের ঐতিহ্য, তাদের মূল্যবোধ স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে তারা উপহার হিসেবে পেয়েছে। প্রকৃতির প্রতিটি অংশের সঙ্গে তারা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রকৃতিকে সম্মান না করলে প্রকৃতি তার দান ফিরিয়ে নিতে পারে। তাই মাটি তৈরি থেকে ফসল পাকা পর্যন্ত প্রত্যেকটি ধাপ তারা পালন করত বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে দিয়ে। যারা মাছ ধরত, তারা জালে পড়া প্রথম স্যামনটির সম্মানে নানা উৎসবের আয়োজন করত।

জ্ঞান, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সাহস, সততা, বিনয় আর সত্যবাদিতা—এই সাত অনুশাসনে তাদের জীবন বাঁধা ছিল। দলের বৃদ্ধ মানুষেরা এই সমস্ত শিক্ষা আর লব্ধ জ্ঞান নানা গল্পের ভিতর দিয়ে ছড়িয়ে দিতেন পরবর্তী প্রজন্মে। সন্ধের অন্ধকার যখন ঘন হয়ে আসত, বাচ্ছারা ঘিরে বসত গাঁওবুড়োকে। কোনও ভাষায় তিনি ইসুমাতাক, কোনও ভাষায় অন্য কিছু। কালো আকাশে একটা দুটো করে তারা ফুটে উঠত, চুল্লিতে জ্বলত আগুন। বৃদ্ধ কখনও তারা চেনাতেন, কখনো-বা গল্পের মধ্যে দিয়ে অন্য কোনও গভীর জ্ঞানের সন্ধান দিতেন। দূরে শোনা যেত ক্লান্ত বাইসনের খুরধ্বনি অথবা দৈত্যাকার সিডার গাছের পাতায় বয়ে যাওয়া হাওয়ার ফিসফাস। হয়তো শুরু হত নিঃশব্দ তুষারপাত, বাচ্চারা তাদের গপ্পবুড়োর আরও একটু কাছ ঘেঁষে বসত।

bhromoncanada07

উপরের ছবিটা ক্যালগেরির গ্লেনবো মিউজিয়ামে দেখা উডল্যান্ড ফার্স্ট নেশনদের জীবনযাত্রার অসাধারণ একটা পেইন্টিং। ক্যানো আর টিপিগুলো ভালো করে খেয়াল কোরো।

এইভাবেই চলছিল এদের জীবন। নিজেদের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, যুদ্ধ ইত্যাদি অবশ্যই লেগে থাকত। এলাকার অধিকারের মতো সাধারণ কারণ তো ছিলই, এ ছাড়া দলের লোক কোনও কারণে কমে গেলে অন্য দলের সঙ্গে লড়াই করে যুদ্ধবন্দি ধরে আনার রেওয়াজ ছিল। কিন্তু সেই বন্দি যদি দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার উপযুক্ত না হত, তখন হত মুশকিল। মৃত্যুই ছিল তার ভবিতব্য। এছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার প্রমাণস্বরূপ কিশোরদের যুদ্ধযাত্রা করার প্রচলন ছিল, ওই যাকে বলে কামিং অফ এজ রিচুয়্যাল। অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে কুড়ুল ছিল প্রধান। এ ছাড়া বর্শা, ছুরি, কাঠের মুগুর—এসব তো ছিলই। জীবনযুদ্ধে পারদর্শী অত্যন্ত পরিশ্রমী এই মানুষগুলো দিন কাটাচ্ছিল ওদের মতো করেই, এমন সময় হঠাৎ ইউরোপিয়ানদের নজর পড়ল এই দিকে।

সবার আগে আইসল্যান্ড আর গ্রিনল্যান্ড থেকে ভাইকিংদের আগমন ঘটে এখানে। বেশ কয়েকবার যাতায়াত করার পর নিউফাউন্ডল্যান্ড আর ল্যাব্রাডোরের উপকূলে ছোটো একটা বসতি স্থাপন করতে সক্ষম হয় ভাইকিংরা। তখন ১০২০ কি ১০২১ খ্রিস্টাব্দ। ম্যাপ দুটো চট করে একবার দেখে নিলে সুবিধা হবে। ওই কমলা রঙের ভিনল্যান্ড জনা পঁয়ষট্টি ভাইকিং তাদের জন্তুজানোয়ার সমেত এসে আস্তানা গেড়েছিল। আজ আর ভিনল্যান্ডের কোনও অস্তিত্ব নেই, ও-জায়গাকে এখন বলে ল্যান্স অ মেডোস।

bhromoncanada08

ভিনল্যান্ড সাগা বলে নর্স নথি থেকে এসব ঘটনা জানা যায়। যাই হোক, ওখানে বসতি স্থাপন করা ভাইকিংরা মাছ ধরে, শিকার করে, বুনো আঙুর তুলে মোটামুটি ভালোই ছিল। প্রচুর বুনো আঙুর হত ও-এলাকায়; নর্সরা ভিনল্যান্ডকে বুনো আঙুরের দেশ বলেও উল্লেখ করেছে।

এরপর ধীরে ধীরে এলাকার ফার্স্ট নেশনদের সঙ্গে ভাইকিংদের মোলাকাত শুরু হয়। প্রথম প্রথম একটা শান্তিপূর্ণ ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল, কিন্তু বছর খানেক বাদে শুরু হয় গণ্ডগোল। সম্ভবত ফার্স্ট নেশনরা পশুর লোমের বদলে ভাইকিংদের অস্ত্র কিনতে চাওয়ায় এই বিপত্তি। একে ফার্স্ট নেশনদের অস্ত্র ভাইকিংদের থেকে নিম্নমানের এমনটা একেবারেই নয়, তার উপর এলাকা তাদের পরিচিত—তাদের ডিঙি ভাইকিংদের নৌকো থেকে চালানো অনেক সোজা। এসব কারণে হাওয়া সুবিধের নয় দেখে স্রেফ চম্পট দেয় ভাইকিংরা। তবে হাল ছাড়ে না। পরের প্রায় তিনশো বছর ধরে কাঠের সন্ধানে বার বার ফিরে এসেছিল ভাইকিংরা। কিন্তু বসতি আর স্হাপন করার সুযোগ পায়নি।

এবার শুরু হল আসল সমস্যা। এশিয়ার মশলা, রেশম, দামি ধাতব বস্তুর গল্প ততদিনে ইউরোপে ভালোই ছড়িয়েছে। সে-সব জিনিসের লোভ পেয়ে বসেছে ব্রিটিশ, ফরাসি আর পর্তুগিজ নাবিকদের। এশিয়া যাওয়ার রাস্তা খুঁজতে বেরিয়ে তারা ছুঁয়ে যাচ্ছে কানাডার আটল্যান্টিক উপকূল। ১৪৯৭ সালে ইংল্যান্ডের হয়ে জন ক্যাবট নিউফাউন্ডল্যান্ড দখল করে নেয়। দেখাদেখি ফরাসি জ্যাকোয়েস কার্টিয়ার ঠিক তার নীচে সেন্ট লরেন্স খাঁড়িতে ঘোরাঘুরি শুরু করে। এখানে মিকম্যাক নামে এক ফার্স্ট নেশন গোষ্ঠীর সঙ্গে বহাল তবিয়তে বাণিজ্যও শুরু করে দেয় কার্টিয়ার। পশুর লোমের বদলে লোহার জিনিস দিয়ে মন ভুলিয়ে আরও খানিকটা ঢুকে আসে ধুরন্ধর ফরাসি। গ্যাসপে উপদ্বীপ দখল করার চেষ্টায় জমিতে বিশাল একটা ক্রস পুঁতে ফেলে সে। এইবার সন্দেহ জাগে ওই এলাকার হোডিনো-শনিদের। গোলমাল হতে পারে বুঝে কার্টিয়ার একটা ভয়ানক কাণ্ড করে বসে। গোষ্ঠীপ্রধান ডোনাকোনার দুই পুত্রকে অপহরণ করে সে ফ্রান্সে পালিয়ে যায়। পরের বছর দুজনকে ফিরিয়ে আনে বটে, কিন্তু তাতে কি আর শান্তিস্থাপন হয়! ডোনাকোনার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও কার্টিয়ার নদীপথে মনট্রিয়ল (ফার্স্ট নেশনরা তাকে বলত হোচেলাগা) পর্যন্ত যাওয়ার মতলব করে। শুধু তাই নয়, রাস্তা দেখানোর জন্য এবার স্বয়ং ডোনাকোনাকেই অপহরণ করে কার্টিয়ার। বন্দি অবস্থায় মৃত্যু হয় গোষ্ঠীপ্রধানের। অনুমান করা যেতেই পারে, বন্দি অবস্থায় অত্যাচারিত হয়েছিল ডোনাকোনা। ইতিমধ্যে কার্টিয়ারের দলবলও কানাডার ভয়ংকর শীতে ধীরে ধীরে কাবু হয়ে পড়ছিল। তার উপর দলের মধ্যে স্কার্ভি রোগ মহামারীর আকার ধারণ করেছিল। ডোনাকোনার মৃত্যুর খবরটা ছড়িয়ে যেতেই হোডিনো-শনিদের একটা দল এই শীতার্ত স্কার্ভি আক্রান্ত ফরাসিদের উপর হামলা করে তাদের প্রায় কচুকাটা করে ফেলে। তখনকার মতো রণে ভঙ্গ দেয় কার্টিয়ার।

এই সূত্রে বলে রাখা ভালো, কোয়েবেকে ডোনাকোনার নামে শহর আছে এখন।

যাই হোক, সেই হল শুরু। সম্ভবত ফার্স্ট নেশনরাও বুঝে গিয়েছিল ইউরোপিয়ানদের আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। হলও তাই। মাছ ধরার ছুতোয় তারপর দলে দলে ইউরোপিয়ানরা আসতে শুরু করল কানাডায়। ইউরোপে বিভারের লোমের কদর ছিল খুব। তার বদলে ফার্স্ট নেশনদের তামার পাত্র, লোহার তৈরি অস্ত্র, কাচের পুঁতি, আয়না—এসবের লোভ দেখিয়ে ইংরেজ আর ফরাসিরা শুরু করল জমজমাট ব্যাবসা। একবার ফার্স্ট নেশনদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারলেই তাদের কেল্লা ফতে। কয়েক বছরের মধ্যে বসতি স্থাপনও করে ফেলল সুযোগসন্ধানী ইউরোপিয়ানরা। ফার্স্ট নেশন দলগুলির মধ্যে বিশেষ ঐক্য না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ সুবিধা হয়েছিল তাদের। নিজেদের স্বার্থেই কোনো-কোনো ফার্স্ট নেশন দলের হয়ে অন্য দলের বিরুদ্ধে লড়াই করতেও লাগল ইংরেজ আর ফরাসিরা। এ-ফাঁদে পা দিতে বিশেষ দেরি করল না সরলপ্রাণ ফার্স্ট নেশনরা।

শুরু হল এক দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। যেসব এলাকায় বিভার শিকারের সুবিধা ছিল না, সেই এলাকার ফার্স্ট নেশনরা অন্যদের আক্রমণ করে ছিনিয়ে নিয়ে আসত তাদের জমিয়ে রাখা বিভারের চামড়া। ইউরোপের সস্তা কাচের পুঁতির লোভ তাদের পেয়ে বসেছে তখন। কোথায় তখন তাদের জন্মগত শিক্ষা, গাঁওবুড়োদের জ্ঞানের আলো।

তা এ আর নতুন কথা কোথায়? মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে লোভ দেখানো, তারপর তিলে তিলে তাদের নিঃস্ব করে তাদের সংস্কৃতি, তাদের ধ্যানধারণাকে ধ্বংস করে ফেলা—নিজেদের সভ্য বলে গর্ব করা ইউরোপিয়ানরা চিরকালই এতে সিদ্ধহস্ত, নয় কি?

কী করে থামল এই যুদ্ধ? কী হল ফার্স্ট নেশনদের তারপর? সে-গল্প নিয়ে ফিরে আসব পরের পর্বে।

একটা দেশকে পরিপূর্ণভাবে দেখতে গেলে তার হারানো অতীতটা অস্বীকার করা চলে না।

টা টা।

এরপর পরের সংখ্যায়

ভ্রমণ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply