জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়) অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)
এই ধারাবাহিকের আগের পর্ব- পর্ব ১, পর্ব ২ পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব ৫ পর্ব ৬, পর্ব ৭

স্যার অরেল স্টাইন ছিলেন একজন ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিক। ১৮৬২ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর জন্ম হাঙ্গেরিতে। তিনি ব্রিটিশ সময়কালে নানা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মধ্য এশিয়ায় একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তিনি শুধু একজন প্রত্নতাত্ত্বিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন নৃতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ভাষাবিদ এবং জরিপকারী। ডানহুয়াং গুহা থেকে উদ্ধারকরা পুথি এবং পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ মধ্য এশিয়ার ইতিহাস এবং বৌদ্ধধর্মের শিল্প ও সাহিত্যের অধ্যয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অভিযান এবং আবিষ্কারের উপর বেশ কিছু বই লিখেছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন খোটান, সেরিন্ডিয়া এবং আভ্যন্তরীণ এশিয়া বিষয়ক বই। সংস্কৃত থেকে রাজতরঙ্গিণীর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি। চিরকুমার অরেল স্টাইন ১৯৪৩ সালের ২৬ অক্টোবর কাবুলে দেহত্যাগ করেছিলেন। এই নিবন্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে চলেছে তাঁর তাকলামাকান মরুভূমির প্রত্নতাত্ত্বিক খোটান অভিযানের কথা।
খোটানের পথে
২ অক্টোবর সকালে আমাদের ক্যারভ্যান শহরের পুবদিক দিয়ে শহর ছেড়ে রওনা দিয়েছিল। এই পথ সোজা গিয়েছে খোটানের দিকে। চ্যাং ডারিন ওঁর প্রধান ‘তুংচি’ বা দোভাষীকে পাঠিয়েছিলেন যাত্রা শুরুর সময় আমাকে খানিক এগিয়ে দিতে। খোটানের পথে মাইল খানেক এগিয়ে অনুর্বর মরু রাস্তা শুরু হতে সুদর্শন বৃদ্ধ বিদায় নিয়েছিলেন।
মাইল কয়েক চলার পর বেশারিক নামে একটা ছোট্ট মরূদ্যান পড়েছিল। বিকেল তিনটে নাগাদ সামান্য চাষের জমি আর কয়েকটা ঘরবাড়ি সম্বলিত মরু-গ্রামের পাশ দিয়ে আমরা পড়েছিলাম রুক্ষ মরুর পথে। পথের পাশে খানিক পরপর লম্বা কাঠের খুঁটি পোঁতা যাতে রাতের অন্ধকারে বা মরুঝড়ের কবলে পথচারি পথ না হারায় তার ব্যবস্থা। আমাদের যাত্রা যেখানে শেষ হয়েছিল সেই কোশ ল্যাঙ্গারে। পৌঁছে অবাক হয়ে গেছিলাম মরুর মাঝে পোড়া ইটের তৈরি সরাইখানা দেখে। অনেকগুলো খিলান দেওয়া বড়ো ঘর-সহ বেশ কিছু ছোটো ছোটো আউট-হাউস।
ইয়াকুব বেগের সময় খোটানের গভর্নর নিয়াজ হাকিম বেগ এই সরাই তৈরি করিয়েছিলেন। সরাইখানার প্রান্তে একটা বড়ো জলাশয়—এই জলাশয়ে ছোটো নালা দিয়ে বহু দূরের পাহাড় থেকে প্রতি সপ্তাহে একদিন জল সরবরাহ আসে। সরাই থেকে খানিক এগিয়ে মরুর মাঝে প্রায় মাইল দেড়েক জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ফুট তিরিশ উঁচু ইটের ভাঙাচোরা ঢিবি। সম্ভবত এগুলো কোনও প্রাচীন স্তূপের ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু এর প্রাচীনত্বের কাল সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
৩ অক্টোবর আমাদের যেতে হয়েছিল পুরোটাই মরুপথ ধরে। বহুদূরের পাহাড়শ্রেণি আবছাভাবে দেখা গেলেও সেই পাহাড় থেকে কোনও জলের ধারা নেমে আসেনি এখানে মরুর বুকে। রাত কনকনে ঠান্ডা হলেও দিনের বেলার প্রচণ্ড গরম ঝলসে যাচ্ছিলাম আমরা। তাকলামাকান মরুর ভয়াবহ পথ এনেছে আমার ইতিহাসের প্রতি টান। নিঃসন্দেহে এই পথই ছিল অক্সাস থেকে খোটান হয়ে চিনে যাবার প্রাচীন পথ। কখনও হেঁটে, কখনও পশুর পিঠে চেপে যেতে যেতে দেখছি মরু পথের দু-পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা অসংখ্য সাদা হয়ে যাওয়া পশুর কঙ্কালের স্তূপ। শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে এই জলশূন্য ঊষর পথে চলতে চলতে পথেতেই মারা গিয়েছে অগণিত পশু আর পথচারীরা। হিউয়েন সাং তাঁর গ্রন্থে এই পথের ভয়াবহতার কথা বিস্তারিত বলে গেছেন। হিউয়েন সাং-এর পর মধ্যযুগে এই পথ ধরে ক্যাথে (চিন) গিয়েছেন মার্কো পোলো সহ অনেক স্বল্প-পরিচিত ভ্রমণকারী। যুগ যুগ ধরে এই পথ ধরে অগণিত ভ্রমণকারী চলাচল করলেও ভয়ংকরতম যাত্রায় বিশেষ কোনও পরিবর্তন হয়নি। অতীতকে ধরে রেখেছে এই পথ। যারা একবার পথের টানে এই বালিতে পা রেখেছেন তাঁদের আত্মায় জড়িয়ে গেছে বৌদ্ধ ধর্ম, শিল্প সংস্কৃতি আর ভারত।
চোলক ল্যাঙ্গার ঠিক কোশ ল্যাঙ্গারের সরাইয়ের মতো। দক্ষিণ দিকে থেকে ক্রমশ নেমে আসা নীচু পাহাড়ের উপত্যকার মাঝে বালুময় গিরিখাতের কিনারায় দাঁড়িয়ে। মরুর মাঝে এ-সরাইয়ের বিশেষত্ব হল এর কোল-ঘেঁষা বেশ কিছু টইটম্বুর জলাশয়। একটা ছোটো ধারা বেয়ে জল আসে সেই সুদূর উত্তরের পাহাড় থেকে। জলধারার পাশে হয়ে থাকা ঝোপের সার, জলের স্রোতকে চিহ্নিত করে রেখেছে সবুজ রেখা হয়ে।
গতকাল রাতে এখানে কর্মরত ডাকবিভাগের ক্লার্ক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। ছেলেটি স্বভাবে শান্ত এবং সুশিক্ষিত। কিন্তু দীর্ঘদিন মরুর বুকে কাজ করতে করতে বেচারা মানসিক অবসাদে ভুগছিল। ওর অধীনে ছিল ডাকবিভাগের ন’টা ঘোড়া আর চারজন পত্রবাহক। গুমা থেকে কারগালিক পর্যন্ত ডাকব্যবস্থা পরিচালনা করার পুরো দায়িত্ব ওর ওপর। এই ডাকপথ সাধারণত চিনা কর্তৃপক্ষের চিঠিপত্রের জন্যই সীমাবদ্ধ। বছর দুয়েক আগে ছেলেটিকে উরুমচি থেকে কারগালিকের আম্বান এখানে এনেছিলেন। কারগালিকের আম্বান আর ছেলেটি—দুজনেই হো-নান প্রদেশের বাসিন্দা। তাং-সেং বা হিউয়েন সাং-এর জন্ম হয়েছিল ছেলেটির বাড়ির খুব কাছের এক গ্রামে। এ-কথা শুনে খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম। চা-কেক খাইয়ে, সে নিশ্চয়ই খুব তাড়াতাড়ি ভালো কোনও জায়গায় পোস্টিং পেয়ে যাবে এসব বলে যতটা সম্ভব ছেলেটিকে চনমনে করার চেষ্টা করেছিলাম।
গুমা মরূদ্যানে

চোলক ল্যাঙ্গার থেকে গুমা যাবার পথ বেশ লম্বা, নয় ‘পোতাইস’। তাই ভোর হবার আগেই ভারী মালপত্র সমেত উটগুলো রওনা করে দেওয়া হয়েছিল। সকালে আমার টেন্ট আর অন্যান্য সরঞ্জাম টাট্টুতে বাঁধাছাঁদার ফাঁকে সরাইখানার আশপাশটা একবার ভালো করে ঘুরে দেখে নিচ্ছিলাম। সরাইয়ের বাইরের দেওয়ালে সাঁটানো একটা বড়ো সরকারি হুকুমনামা নজরে এসেছিল। প্রায় দু-মাস আগের এই বিজ্ঞপ্তিতে চিন ও রাশিয়ার মধ্যে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে চিনা, মঙ্গোলিয়ান আর তুর্কি—তিনটে ভাযায় লেখা ছিল সম্রাটের তরফে এক নিয়মনীতি সংক্রান্ত আদেশ। আমার দোভাষী নিয়াজ আখুন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল এটাই শেষ আদেশনামা কি না জানতে। কারণ, এই আদেশ পিকিং থেকে শুরু করে দেশের সব বাজারেই সাঁটা হয়েছে।
মাইল দশেক নুড়ি আর বালির ওপর দিয়ে হেঁটে পৌঁছেছিলাম শিলগি ল্যাঙ্গারে। একটি ছোটো জলধারা শিলগি সরাইয়ের খানকয়েক জলাশয়কে জলে পূর্ণ করে আশেপাশের বালিমাটিকে কাদাময় করে তুলেছিল। ছোটো ছোটো ঝোপে ভরে ছিল জায়গাটা। পুরো অঞ্চলটায় ‘কুমুশ’ গাছের ছড়াছড়ি। পরের সরাই মাইল আড়াই দূরের হাজিব ল্যাঙ্গার পর্যন্ত পুরো পথের পাশেই দেখা মিলেছিল এই ছোটো ছোটো ঝোপ আর কুমুশ গাছের। এরপর ছোটো ছোটো গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে পুরো পথটাই ছিল নুড়ি-পাথরে ভরা। দূরে বহুদূরে গুমা মরূদ্যানের আবছা গাছপালার আভাস দেখা যাচ্ছিল। মাইল ছয়েক ভয়াবহ এবড়োখেবড়ো পথ দিয়ে চলার পর আমরা পৌঁছেছিলাম এক শুকনো নদীখাতে। এটাই গুমার পশ্চিম সীমান্ত। নদীখাত ধরে অনেকটা পথ যাওয়ার পর ফুট চল্লিশ উঁচু নদীর খাড়া পাড় বেয়ে উঠে পৌঁছেছিলাম মরু মাঝের উর্বর চাষের ক্ষেত আর বাগানের মধ্যে। শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা খালের ধারে মূল বাজার থেকে খানিক দূরে এক বিশাল উইলো আর পপলারের বনের মাঝে একটা সুন্দর মাঠ দেখতে পেয়ে সেখানেই ক্যাম্প করতে মনস্থ করেছিলাম। আমার লোকেরা যখন ক্যাম্প খাটাচ্ছিল তখন আমি টাট্টুর পিঠে চেপে ছুটেছিলাম বাজারের দিকে।
সেদিন ছিল সাপ্তাহিক বাজারের দিন। পুরোদমে বাজার চলছিল। গবাদি পশু, ফল, তুলো আর স্থানীয় নানবিধ পণ্য কেনাবেচার জন্য জমায়েত লোকজন বুঝিয়ে দিচ্ছিল এই মরূদ্যানের বিশালতা। সারি সারি দোকানে ঝুলছিল লাল চামড়ার হাঁটু পর্যন্ত উঁচু বুটজুতো। শীতকাল আসন্ন, তাই এই বুটের চাহিদা খুব।
৫ অক্টোবর গুমাতেই থেকে গেছিলাম নানা পুরাকীর্তির বিষয়ে খোঁজ নেবার প্রয়োজনে। ১৮৯৫ সাল থেকে মি. ম্যাকার্টনি সহ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক অফিসার ভারত সরকারের জন্য ‘অজানা অক্ষর’-এর অনেক কাগজের পাণ্ডুলিপি ও ‘ব্লকপ্রিন্ট’ সংগ্রহ করেছেন এই অঞ্চল থেকে। রাশিয়ান এবং ইউরোপের বেশ কিছু সরকারি সংগ্রহশালাতেও এই ধরনের পুরাকীর্তি পৌঁছেছিল। সম্ভবত এগুলোর সবই সংগৃহীত হয়েছিল খোটান অঞ্চলের বালির তলা থেকে। খোটানের ‘ধন-সন্ধানী’ ইসলাম আখুন, মি. ম্যাকার্টনি যার কাছ থেকে এই পাণ্ডুলিপি ও অন্যান্য পুরাকীর্তি সংগ্রহ করেছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ উনি নথিবদ্ধ করেছিলেন কাশগরের অফিসে। পরবর্তীকালে এই সংগ্রহ কলকাতায় যায় ও ড. হোয়র্নল বিশদভাবে এগুলোর এলাকাভিত্তিক ক্রম উল্লেখ করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই পুরাকীর্তির সংগ্রহস্থল মরু ক্যারাভ্যান পথের উত্তরে গুমা ও খোটানের মাঝে বলে উল্লিখিত হয়েছিল। কাশগরে যে-সব তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম সেগুলোর সত্যতা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে যাচাই করার গুমাই সঠিক জায়গা।
সকালে স্থানীয় বেগ ও আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রধান ‘ইউজ-বাশির’-দের নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে হাজির হয়েছিল। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলেম গুমা আর মোজির মরূদ্যানের মধ্যবর্তী অঞ্চল মরুপথের পূবধারে একটি বিস্তৃত ধ্বংসাবশেষ বালিতে ঢাকা পড়ে আছে, স্থানীয়দের কাছে জায়গাটা ‘কোন-শহর’ নামে পরিচিত। কিন্তু যারা এসেছিল তাদের কেউই এই অঞ্চল থেকে প্রাচীন পুথি পাওয়া যাওয়ার বিষয়ে কিছু আলোকপাত করতে পারেনি। ইসলাম আখুন বর্ণিত অনেকগুলো ধ্বংসাবশেষের মধ্যে মাত্র দুটো নাম ওদের পরিচিত।
বেগ ও তার সাথীদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলাম আশপাশটা দেখে আসতে। উত্তর-পূর্বদিকে খানিক চলার পর আমরা বিশাল বিশাল বালিয়াড়ির সাম্রাজ্যে পৌঁছে গেছিলাম। এক-একটা বালির পাহাড় নয় নয় করেও কুড়ি থেকে চল্লিশ ফুট উঁচু। এই বালিয়াড়িগুলো গুমাকে উত্তর দিকে বেড় দিয়ে আছে। ‘হাসা’ নামের একটা গ্রাম পৌঁছে শুনলাম, ওরা কোন-শহরের ধ্বংসস্তূপের বিষয়ে ভালোই জানে। সেখানে বালির তলায় অনেক বাড়িঘর চাপা পড়ে আছে। কিছুদিন আগে পর্যন্তও খানিক ধ্বংসাবশেষ দেখা যেত, কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতে বালি ঝড় সব ঢেকে দিয়েছে। এখন আর কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু ওখানে যে একটা জনপদ জাতীয় কিছু ছিল তা ওরা নিশ্চিত করে বলেছিল।
কারাকুল মাজার
হাসা থেকে মাইল তিনেক এগিয়ে কারাকুল মাজারে পৌঁছেছিলাম। ইসলাম আখুনের কথনে এই মাজারের উল্লেখ ছিল। মাজারের ঠিক পাশে একটা বড়ো জলাশয়। জলাশয়কে ঘিরে ছোটো ছোটো বালিয়াড়ি। একটা বালি পাহাড়ের ওপরে খুঁটির মাথায় ঝোলানো ইয়াকের লেজ, চামড়া আর কাপড়ের পতাকা—যা বলে দিচ্ছিল এটি এক সাধুর কবরস্থান। যদিও এই সাধু সম্পর্কে কোনও তথ্য জানতে পারিনি। শুধু জানতে পেরেছিলাম সাধু যখন এখানে এসেছিলেন তাঁর দাড়ি ছিল কালো, আর মারা গিয়েছিলেন ‘এক-সাকাল’ (সাদা দাড়ি) হিসেবে। এই মাজারের চারপাশের সুবিশাল কবরস্থান থেকেই নাকি ইসলাম আখুন সুপ্রাচীন ব্লক-প্রিন্টগুলো খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু আমার স্থানীয় সাথীদের কেউই এখানে কোনও ধরনের ব্লক-প্রিন্ট ও ওই জাতীয় জিনিসের উপস্থিতি সম্পর্কে কোনোরকম আলোকপাত করতে পারেনি।
উলুখাগড়ায় অর্ধেক ভরা এই জলাশয়ে জল আসে মাজারের পূর্বদিকের এক নালা বেয়ে। এই নালাটা গিয়ে মিশেছে মাইল খানেক দূরে হাসার কাছে ছোটো ছোটো কতগুলো ঝরনার সঙ্গে। জলের স্বাদ লবণাক্ত, তাই এখন এর নাম কারা-সু। তবে বসন্ত ও গ্রীষ্মের ঠিক আগে আগে যখন দূর দক্ষিণ পাহাড়ের বরফ-গলা জল বন্যার মতো ভাসিয়ে দেয় নদী আর ঝোরার দু-কূল, তখন এইসব জলবাহিকা হয়ে যায় আক-সু—মিষ্টি জলের স্রোত।
প্রায় শুকনো এই নালার বুক বেয়ে মাইল তিনেক গিয়ে আমরা পৌঁছেছিলাম কারাতাঘ-আঘজি বা কারাতাঘিজের মরূদ্যানে। মরুতে প্রবেশের পর এই প্রথম এত ঘন জঙ্গল দেখলাম। নানা ধরনের শক্ত খাগড়া জাতীয় গাছ আর শক্ত ইউলঘুন উদ্ভিদ। হিদারের ছোটো ছোটো ফুল কারা-সুর বুক জুড়ে। শরৎ ঋতু ইতিমধ্যে গাছের পাতার রঙ বদলে হলদে করে দিয়েছে। এত রঙ দেখতে দেখতে মনে ধাঁধা লেগে যায়—সত্যি মরুপ্রদেশে আছি তো?
কারাতাঘ-আঘজির ভুট্টার ক্ষেতের মাঝে পপলার, মালবেরি আর ওই জাতীয় গাছের ঝোপ। কিছুদিন আগেই একপ্রস্থ ফসল কাটা হয়ে গেছে। শুনলাম, মাত্র বছর পনেরো হল জল ধরে জলসিঞ্চন ব্যবস্থা গড়ে তুলে মরুর মাঝে এই জমিগুলোকে চাষযোগ্য করে তোলা হয়েছে। ইসলাম আখুন বলেছিল যে বেশ কিছু প্রাচীন পুথি ও অন্যান্য প্রত্নসামগ্রী সে সংগ্রহ করেছিল কারাতাঘ-আঘজির আশেপাশের ধ্বংসস্তূপ থেকে, কিন্তু স্থানীয় লোকেরা আশেপাশে কোনও ধ্বংসস্তূপের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই বলতে পারল না। সারাদিন ঘুরেও ইসলাম আখুনের বক্তব্যের সত্যাতা যাচাই করতে না পেরে গুমায় ফিরে এসেছিলাম। বালিময় পথ ধরে গুমা মরূদ্যানের উপকণ্ঠ তোয়েন বাজার হয়ে শহরে ফিরেছিলাম। পুরো পথটাই ছিল গ্রামের ভেতর ছোটো ছোটো ফল বাগানের মাঝ দিয়ে। শসা আর তরমুজ ফলে আছে অসংখ্য। আর ছিল কিছু কাগজের কারখানা। মালবেরি গাছের ছাল থেকে মণ্ড তৈরি করে সেগুলো থেকে হাতে তৈরি হচ্ছে কাগজ। একদল সন্ন্যাসী ভিক্ষুর দেখা পেয়েছিলাম গ্রামের পথে। তারা খানিক করে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করছিল বাড়ি বাড়ি ঘুরে।

৬ অক্টোবর গুমার ক্যাম্প গুটিয়ে রওনা দেবার সময় আকাশ ছিল পরিষ্কার। গুমা মরূদ্যানের ছায়া-ঢাকা পথ থেকে বেরিয়ে ‘দশত’-এর শক্ত মাটি, ছোটো ছোটো ঝোপঝাড় পরিপূর্ণ অঞ্চলে পৌঁছতেই বহুদূরের তুষার-ঢাকা পর্বত দেখা দিয়েছিল। ওই বরফ কারাকোরাম পর্বতমালার আর ওর পেছনেই রয়েছে সিন্ধু উপত্যকা। কারাকোরামের দিকের আকাশ অধিকাংশটাই কুয়াশা আর মেঘে আচ্ছন্ন। ক্ষণিকের জন্য দেখা দিয়ে বরফ চূড়া আবার চলে গেছিল মেঘের ঘোমটার আড়ালে।
কয়েক মাইল যাবার পর একটা চওড়া জলশূন্য নদী পার হয়ে পৌঁছেছিলাম গুমা আর মোজি মরূদ্যানের মধ্যবর্তী জায়গায়। নদীর ডান তীর বরাবর বালির বুকে ছড়িয়ে অজস্র লাল মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরো। ভাঙা পাত্রের গায়ে কোনও অলংকরণ না থাকলেও এর জেল্লা ও শক্তপোক্ত গড়ন বুঝিয়ে দিচ্ছিল এর প্রাচীনতা। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পড়ে থাকা এই পাত্রের টুকরোগুলো জানান দিচ্ছিল যে এক সময় এই জায়গাটি একটি বড়ো জনপদ ছিল। সভ্যতার আর-সব চিহ্ন ঢাকা পড়ে বালির তলায়।
টোপা টিমের স্তূপ

ধ্বংসাবশেষ থেকে খানিক পূর্বদিকে এগোতে পৌঁছেছিলাম মোকুইলা নামের এক গ্রামে। গ্রামের সেচখালের পাশ দিয়ে দশতে পৌঁছতে উত্তর-পূর্বদিকে নজরে এসেছিল ঢিবিটা। গুমা থেকেই জানতে পেরেছিলাম এই ঢিবিটা সম্পর্কে। এর নাম টোপা টিম। কাশগর সন্নিহিত অঞ্চলের অধিকাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত ঢিবি বা স্তূপকে ‘টিম’ বলা হয়। আমি দূরবীন চোখে লাগিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম এটি অতি প্রাচীন স্তূপের ধ্বংসাবশেষ। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢিবিটার কাছে পৌঁছতে চাইছিলাম।
কিন্তু পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে গেছিল। স্তূপের কাছে দ্রুত পৌঁছনোর জন্য আমাদের গাইড বুদ্ধি দিয়েছিল নদীর শুকনো বুক ধরে এগোতে। আমি খানিক দোনামনা করে ওর কথা মেনে নিয়েছিলাম। আবার নদীতে ফিরে মাইল দুয়েক গিয়ে ঢিবির কাছে পৌঁছে দেখি সেখানে নদীর ধার ফুট পঞ্চাশেক খাড়া উঠে গেছে। সে-খাড়াই বেয়ে ওপরে ওঠা অসম্ভব। আবার আগের জায়গায় ফিরে এসে দশত পার হয়ে মরু পথে চলে পৌঁছেছিলাম ঢিবির কাছে।
স্তূপের কাছে পৌঁছে আমার প্রত্নতাত্ত্বিক মন আনন্দে নেচে উঠেছিল। স্তূপের বহিরঙ্গ অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে। স্তূপের গায়ে খোঁড়াখুঁড়ির ছাপ স্পষ্ট। ধনসন্ধানীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি ২৯ ফুট উঁচু এ-স্তূপ। স্তূপের চারপাশে ঘুরে অসংখ্য প্রাচীন ভাঙা মাটির পাত্র পেয়েছিলাম, যেরকম আগেও দেখেছিলাম মোকুইলা সহ আরও কিছু স্তূপে। বেশ জোর দিয়েই বলা যায়—এই স্তূপ বৌদ্ধ যুগের।
ক্যারাভান পথের উত্তরে প্রায় তিন বর্গ মাইল জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ধ্বংসাবশেষ। এই অঞ্চলে আগে যা দেখেছি সেগুলো থেকে এর ব্যাপ্তি অনেক বড়ো। আমার গাইড জানিয়েছিল, ওরা এই জায়গাটাকে কাকশালের ‘তাতি’ বলে। এই অঞ্চলে ধ্বংসস্তূপকে আবার তাতি বলে। পুরো অঞ্চলটা ঘুরে প্রচুর মাটির পাত্র, পোড়া ইট ও ধাতুর টুকরো ছাড়াও হাড় ও অনুরূপ শক্ত বর্জ্য দেখেছিলাম। কাকশাল তাতির বস্তুর টুকরোগুলো দেখে এটা পরিষ্কার যে এই স্তূপ ধ্বংস হয়েছে প্রাকৃতিক কারণে।
এই অঞ্চলে নদীর ধারে গড়ে ওঠা স্তূপের ধ্বংসের কারণ যে বালি ঝড় আর জোড়াল বাতাস তা পরিষ্কার। বিশেষ করে বসন্ত আর গ্রীষ্মে ঝড় আর বাতাস এখানে প্রচণ্ড দাপটে বয়। মাটির দেওয়াল, কাঠের কড়িবরগা যা সাধারণত তুর্কিস্থানে বাসস্থান বানাতে ব্যবহৃত হয়—সব হাওয়ার দাপটে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে চলে গেছে বালির তলায়। শুধু কিছু কাঠামো তাদের কাঠিন্যের দৌলতে খানিক জেগে আছে বালি-মাটির ওপরে।
কয়েক শতাব্দী ধরে বালি জমে জমে আশেপাশের ভূমিতল ধীরে ধীরে উঁচু হয়েছে, আর প্রাচীন বসতি চলে গেছে বালির তলায়। কিন্তু ভূমিতল সব জায়গায় সমানভাবে উঁচু না হবার ফলে পুরো সভ্যতার চিহ্ন মাটির তলায় চলে যায়নি। বালি সাম্রাজ্যে বালির পাহাড়ের মাঝে উপত্যকার আকার নেওয়া অংশে জেগে থাকা তাতি বা ধ্বংসের স্তূপ তার প্রমাণ। এই ধ্বংসস্তূপের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব অপরিসীম, অবশ্যই সংরক্ষণ হওয়া উচিত। প্রাচীন মুদ্রা, ধাতুর অলংকার, পাথরের সিলমোহর—এইসব জাতীয় প্রত্নদ্রব্য যে এখান থেকে বহুল পরিমাণে খুঁড়ে বের করে নেওয়া হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। ইসলাম আখুন বর্ণিত ধ্বংসস্তূপের তালিকায় এই অঞ্চল ছিল। এখান থেকেও সে কাগজের ব্লক-প্রিন্ট পেয়েছিল বলে জানিয়েছিল। কিন্তু আমার মনে হয়েছে তার দাবি সঠিক নয়, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বলেছে। এই অঞ্চলের আবহাওয়ায় কাগজের প্রাচীন ব্লক-প্রিন্ট টিকে থাকা সম্ভব নয়।
আমি হন্যে হয়ে কাকশালের ধ্বংসস্তূপ হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম যদি কোনও বিশেষ ধরনের নমুনা খুঁজে পাই, কিন্তু সময়ের অভাব টের পাচ্ছিলাম। আমাদের গন্তব্য মোজি এখান থেকে বহুদুর, ইতিমধ্যেই দেরি হয়ে গেছে অনেক। একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নতা গ্রাস করে রেখেছিল আমাকে। সম্পূর্ণ জনমানবহীন জায়গাটা একসময় ঘনবসতি ছিল। আমার লোকেরা একের পর এক কারুকার্য করা মাটির পাত্রের নমুনা ধ্বংসাবশেষ থেকে খুঁড়ে বার করছিল আর আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। জায়গাটা ছেড়ে এগোনোটাই কষ্টকর হয়ে উঠছিল, দিন শেষের সূর্যের নরম লাল আলো ভাঙা পাত্র আর হলুদ বালির ওপর একটা অবর্ণনীয় রঙের ছোঁয়া দিয়েছে।
একের পর এক বালি পাহাড়ের জন্য হালকা আলোয় সামনের পথ চেনাই দুরূহ হয়ে উঠেছিল। বেশ কয়েক মাইল ধু ধু বালির সাম্রাজ্য ধরে চলার পর দেখা মিলেছিল সামান্য ঝোপঝাড়ের। আমরা পৌঁছেছিলাম চুড্ডা নামের ছোট্ট এক গ্রামে। ঝকঝকে চাঁদের আলোর ভরসায় গ্রামের পাশ দিয়ে ঘোড়ার পিঠে এগিয়ে চলেছিলাম নিঃশব্দে। নির্মল আকাশের চাঁদ সঙ্গ দিচ্ছিল আমাদের, ফলে পথ হারানোর ঝুঁকি কমে গেছিল অনেকটাই। রাত আটটা নাগাদ পৌঁছেছিলাম মোজিতে। আমার দলের আগে আসা লোকেরা তাঁবু খাটিয়ে বসে ছিল আমাদের অপেক্ষায়।
মোজিতে – পুরোনো মুদ্রা
৭ তারিখ আমি মোজিতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমার কাছে নিয়ে আসা স্তূপীকৃত পুরোনো মুদ্রা দেখে। মুদ্রাগুলো প্রাক মুহাম্মদান শাসক কিংবদন্তির সুলায়মান খাগানের সময়ের। যেখান থেকে এগুলো তুলে আনা হয়েছে সেই তোগুজাই এখান থেকে উত্তরে মাইল খানেক। জায়গাটা খুঁটিয়ে দেখা দরকার ছিল। তোগুজাইয়ের শুকনো নদীখাতের ধারে পৌঁছে দেখি গতকাল দেখা ভাঙা মৃৎপাত্রের মতো অসংখ্য মাটির পাত্র পড়ে। কিন্তু এগুলো গতকালের জায়গায় দেখা পাত্রের মতো অত ভাঙাচোরা নয়। সম্ভবত এখানে ক্ষয় কাকশালের মতো অতটা হয়নি। বিগত গ্রীষ্মে নদীখাত প্লাবিত হওয়ার পর জল সরে গেলে নদীখাতের ধারের এক জায়গা থেকে এই প্রাচীন মুদ্রার স্তূপ পাওয়া যায়। প্লাবন নদীখাতের ওপর জমে থাকা পলি সরিয়ে দিয়েছিল অনেকটা।
স্থানীয় বেগের নির্দেশে গ্রাম থেকে বেশ কিছু লোক আমার সঙ্গে এসেছিল জায়গাটা ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য। আমার সামনেই নদীর ধার থেকে গ্রামের লোকগুলো কারুকাজ করা অসংখ্য মাটির পাত্র কুড়িয়ে আনছিল; শুকনো নদীখাত খুঁড়ে তুলে এনেছিল কয়েক ডজন তামার মুদ্রা। কোনও সন্দেহ নেই কালের গতিতে নদীর বুকে জড়ো হওয়া এই মুদ্রা আর মাটির পাত্র একই অঞ্চলের। এই নমুনাগুলো আশপাশের ধ্বংসস্তূপের কালানুক্রম তৈরিতে সাহায্য করবে। মৃৎপাত্র আর মুদ্রার সঙ্গে নদীখাতের বালি খুঁড়তে বেরিয়ে এসেছিল ভাঙা কাচ আর জেড পাথরের পুঁতি। কাচ শিল্প তুর্কিস্থানের বিস্মৃতপ্রায় অতি প্রাচীন এক কলা। কিন্তু এই কাচের টুকরোগুলোর সঙ্গে প্রাচীন পশ্চিমী পাত্রের মিল অনেক।
তোগুজাই থেকে গেছিলাম মাইল দেড়েক উত্তর-পূর্বে আর একটি ধ্বংসাবশেষ দেখতে। হাসা নামে পরিচিত জায়গাটার উল্লেখ ড. হেডিন তাঁর লেখায় করে গেছেন। নিঃসন্দেহে হাসা একটি মুহাম্মদান কবরস্থান। কিন্তু এর প্রাচীনত্ব আন্দাজ করা মুশকিল। ছোট্ট টিলার মাথায় অজস্র মাথার খুলি আর কঙ্কাল ছড়িয়ে। কাঠের পাটাতনে ঢাকা অনেকগুলো কবরের একটার আচ্ছাদন সরাতে দেখতে পেয়েছিলাম কাপড়ে জড়ানো একটি শিশুর কঙ্কাল। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শিশুটির মাথা কিবলার (কাবা) দিকে করা ছিল।
এই কবরগুলো শহিদদের হওয়ার কথা, অর্থাৎ কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধে যারা মারা গিয়েছিল। সাধারণত এই ধরনের কবর নাড়াচাড়া করতে গেলে ধর্মীয় বাধা আসে, কিন্তু আমার সঙ্গে আসা মোজির গ্রামবাসীরা আমি কবরস্থানে ঘাঁটাঘাঁটি করলেও কোনও বিরুদ্ধাচারণ করেনি। এটি প্রমাণ করে ধর্মীয় কুসংস্কার এখানে গেঁড়ে বসেনি। মরু, মৃত ব্যক্তিদের বিশ্রামস্থলের ওপর পুরু বালির চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। নির্জনতা গাঢ় হয়ে চেপে আছে চতুর্দিকে। ধুলো-মাখা আকাশে ফ্যাকাসে ভাব সবসময়।
এখান থেকে পাহাড়ের দেখা পাওয়া যায় না। যদিও কারাকোরামে যাওয়ার পথ যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেই সাঞ্জু, মোজি থেকে মাইল বারো দক্ষিণে। আমার ধারণা, হিউয়েন সাং পো-কিয়া-আই বলে যে জনপদের উল্লেখ করছিলেন, তা হল মোজি। সেই তীর্থযাত্রীর সময় থেকে কাশ্মীর থেকে আনীত এক বুদ্ধমূর্তি এখানে পূজিত হয়।
৮ অক্টোবর নুড়ি-পাথর ভরা দশত দিয়ে চোদ্দ মাইল মতো পথ চলে পৌঁছেছিলাম জাঙ্গুয়াতে। পথের দু-পাশ ভরতি ছিল ছোটো ছোটো ঝোপঝাড়ে। গ্রামে ঢোকার ঠিক আগে যে নদীটা পার হয়েছিলাম সেটা পুরো শুকনো ছিল। এই মরশুমে জল মূলত সেচের কাজে লাগানো হয়। পাঁচশোর বেশি পরিবারের বাস জাঙ্গুয়া মরূদ্যান ও লাগোয়া গ্রামগুলোতে। ভিড়ে ভরা গ্রামের বাজার পার করে গ্রামের পুবদিকের শেষ প্রান্তে এক লুসার্নের ক্ষেতের ধারে আমরা তাঁবু খাটিয়েছিলাম।
শেষ বিকেলে গ্রাম থেকে মাইল দুয়েক উত্তর-পশ্চিমে মরুর প্রান্তে একটি ধ্বংসস্তূপ দেখতে গেছিলাম। কুল-ল্যাঙ্গার নামের জায়গাটায় অনেক ভাঙা মৃৎপাত্রের পাশাপাশি দুটো বড়ো বুজে যাওয়া জলাশয়ের চিহ্ন নজরে এসেছিল।
৯ তারিখ সকালে যাত্রা শুরু করি পিয়ালমা যাব বলে। পিয়ালমা মরূদ্যান জাঙ্গুয়া থেকে উনিশ মাইল দূরে। প্রথম কয়েক মাইল পথ গিয়েছিল সেচযুক্ত ক্ষেতের মাঝ দিয়ে। কিন্তু সেচের জল যেহেতু কম পাওয়া যায় তাই প্রতিবছর মরূদ্যানের চারপাশের জমিগুলোতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাষযোগ্য করা হয়। এই বছর এই খণ্ড জমিটায় চায হল তো পরের বছর তার পাশের খণ্ডটায়। এতে করে নাকি জমিতে বেশি ফসল পাওয়া সম্ভব। ধীরে ধীরে পিয়ালমা পর্যন্ত অনুর্বর দশতকে যতটা সম্ভব সেচের আওতায় আনার চেষ্টা হচ্ছে।
আধা রাস্তা পার হতে দশত শেষে আবার বালু সাম্রাজ্যে পড়েছিলাম। তবে বালি পাহাড়গুলো এখানে খুব একটা উঁচু নয়। মরু পথ ধরে চলতে চলতে আমরা পৌঁছেছিলাম একটা ঢিবির মাথায়। বেলকুম নামের জায়গাটার অর্থ ‘বালি পাহাড়ের শীর্ষ’। এখান থেকে কয়েক মাইল এগোনোর পর আমরা পৌঁছেছিলাম কারাকিরে। একটা প্রাচীন ঢিবি বা স্তূপ এই কারাকির। ধ্বংস হয়ে গেলেও বালি পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে পারেনি এর অস্তিত্বকে। এখনও স্তূপের শীর্ষদেশ বালি থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। অক্ষত অবস্থায় এই ঢিবির কাঠামো ৬৫ বর্গফুট মতো ছিল বালে আমার মনে হয়। কাঠামোর ইটের মাপ প্রায় মৌরি স্তূপের ইটের মাপের মতো।
পিয়ালমা একটা শ-খানেক ঘরের ছোটো গ্রাম। এটাই খারগালিক জেলার পুবের দিকের শেষ মরূদ্যান। গ্রামের পিচ গাছের এক বাগানে আমার তাঁবু খাটিয়েছিলাম। বাগান মালিক তার বাড়ির ঘরগুলো আমার চাকরদের থাকার জন্য খুলে দিয়েছিল। ঘরগুলোর মেঝের খানিকটা অংশ খাটের মতো উঁচু। সেই জায়গায় দ্রুত বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল মোটা তোষক আর তার ওপর পেতে দেওয়া হয়েছিল পশমের গালিচা। আমি যতবার চাকরদের থাকার ঘরগুলোর পাশ দিয়ে গেছি ততবার অবাক হয়ে দেখেছি স্থানীয়দের জীবনযাত্রার উচ্চতর মান। শুধুমাত্র জীবনযাত্রার মানই নয়, কৃষিভিত্তিক তুর্কিস্থানের আবাসনও অনেক উচ্চস্তরের—অন্তত ভারতের সমশ্রেণির গড় জীবিকাধারীদের তুলনায়।
(ক্রমশ)