ধারাবাহিক অভিযান-খোটানের বালুসমাধিতে(৫ম পর্ব)-অরেলস্টাইন-অনু-অরিন্দম দেবনাথ-শীত ২০২২

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- ভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

এই ধারাবাহিকের আগের পর্ব- পর্ব ১, পর্ব ২ পর্ব-৩, পর্ব-৪

obhijjaankhotancover

স্যার অরেল স্টাইন ছিলেন একজন ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিক। ১৮৬২ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর জন্ম হাঙ্গেরিতে। তিনি ব্রিটিশ সময়কালে নানা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মধ্য এশিয়ায় একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তিনি শুধু একজন প্রত্নতাত্ত্বিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন নৃতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ভাষাবিদ এবং জরিপকারী। ডানহুয়াং গুহা থেকে উদ্ধারকরা পুথি এবং পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ মধ্য এশিয়ার ইতিহাস এবং বৌদ্ধধর্মের শিল্প ও সাহিত্যের অধ্যয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অভিযান এবং আবিষ্কারের উপর বেশ কিছু বই লিখেছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন খোটান, সেরিন্ডিয়া এবং আভ্যন্তরীণ এশিয়া বিষয়ক বই। সংস্কৃত থেকে রাজতরঙ্গিণীর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি। চিরকুমার অরেল স্টাইন ১৯৪৩ সালের ২৬ অক্টোবর কাবুলে দেহত্যাগ করেছিলেন। এই নিবন্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে চলেছে তাঁর তাকলামাকান মরুভূমির প্রত্নতাত্ত্বিক খোটান অভিযানের কথা।

কাশগরের দিনগুলি

মিস্টার ম্যাকার্টনির বাড়ির প্রথম সন্ধেতেই আভাস পেয়েছিলাম যে কাশগরে আগামী দিনগুলো চূড়ান্ত ব্যস্ততার মধ্যেও আনন্দে কাটবে। চাইনিজ তুর্কিস্থানের রাজধানীর দিকে রওনা হবার আগে অনেক জরুরি কাজ শেষ করার আছে। আমার মূল অভিযান শুরু হবে তুর্কিস্থানের রাজধানী থেকেই।  প্রায় প্রতিটি কাজের জন্য মিস্টার ম্যাকার্টনির অভিজ্ঞতা আর সক্রিয় সাহায্যের দরকার হয়ে পড়ছিল। মিস্টার ম্যাকার্টনির স্থানীয় রাজনীতিক ও ভৌগলিক জ্ঞান আর তার সঙ্গে ওঁর পদাধিকারজনিত ক্ষমতা আমাকে কাজগুলো দ্রুত শেষ করতে সাহায্য  করছিল ভীষণভাবে। যদিও প্রথম দিন থেকেই উনি ব্যক্তিগতভাবে আমার স্বাচ্ছন্দ্য আর কাজের দিকে নজর রাখছিলেন। অভিযান নিয়ে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন ক্রমাগত। প্রায় দু-মাস ধরে লাগাতার দুর্গম পাহাড়ি পথে যাত্রার পর খানিক বিশ্রাম অবশ্যই দরকার ছিল। মিস্টার ম্যাকার্টনির দৌলতে কাজ আর বিশ্রাম দুটোই সমানতালে হচ্ছিল।

মিস্টার ম্যাকার্টনি দশ বছর হল ভারতের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে এখানে আছেন। ওঁর বাংলো চিন্নি-বাগ পাঁচিল আর সুন্দর বাগান দিয়ে ঘেরা।

obhijaankhotan01

শহরের বাইরে যত সম্মাননীয় লোকেদের বাড়ি আছে, তার সবক’টিতে মনোরম বাগান রয়েছে। আছে সুদৃশ্য পাঁচিল। পাথরের ওপর মাটির প্রলেপ দেওয়া বাড়িগুলোয় ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা আছে। মিস্টার ম্যাকার্টনির বাড়ির ঘরগুলো ও আউটহাউস শুধু সুসজ্জিত আরামদায়ক ব্রিটিশদের মতোই নয়, বিশাল কম্পাউন্ড-সহ যে-কোনো ভারতীয় বাংলোর মতোই দর্শনীয়। তিমেন-দারিয়া নদীর বিস্তৃত ধারার কিনারা থেকে সোজা উঠে আসা পাহাড়ের ঢালে মিস্টার ম্যাকার্টনির বাংলো থেকে শহরের উত্তরদিকের সবুজে ছাওয়া চাষের ক্ষেত, ফলের বাগান আর গ্রামের দৃশ্য মন ভরিয়ে দেয়। গ্রীষ্মের তুর্কিস্থানে সবসময় বইতে থাকা হালকা ধুলোর পর্দা দৃশ্যগুলোয় এক-একটা অদ্ভুত মোচড় দেয়। নিমেষে হারিয়ে গিয়ে আবার চোখের সামনে ফুটে ওঠে অপরুপ দৃশ্যাবলি। ফুটে ওঠে দূরের উঁচু পাহাড়ের হালকা রূপরেখা। আর বৃষ্টি হলে ধূলিকণা সরে যেতে দেখা যায় মুজতাগ-আতার উত্তর আর উত্তর-পূর্বের বিশাল বরফে ঢাকা চূড়াগুলো। দেখা যায় অনেক অনেক দূরের তিয়েন-শান পর্বতমালার তুষারময় শৃঙ্গরাজি।

বিগত দু-মাসের রোজকার তাড়াহুড়ো জীবনের পর বন্ধুর বাড়ির দিন কয়েকের স্বাচ্ছন্দ্য আয়েশ করে উপভোগ করছিলাম। প্রতিদিনকার খুচখাচ সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে না। আমি লোকজনের সঙ্গে মিশতে পারছিলাম মন খুলে, ভাবনাগুলোকে শান দিতে পারছিলাম নিশ্চিন্তে। শান্তিতে এই লম্বা বিশ্রামটা আমার খুব দরকার ছিল। আগামী দিনগুলো যে অসম্ভব পরিশ্রম-সাপেক্ষ হতে চলেছে, তাতে সন্দেহ নেই।

প্রথম যে দরকারি কাজটা প্রয়োজন ছিল তা হল আমার সামনের যাত্রার জন্য একটা দল ঠিক করা। যেই দল আমার সঙ্গে মরু সন্ধানে কাজ করবে বেশ বুঝতে পারছিলাম, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়ে সাফল্য পাওয়ার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে দলের সদস্যদের কর্মদক্ষতার ওপর। শুধু মানুষজন নয়, মরুভূমিতে আমাদের যে পশুর দল নিয়ে যাবে সেইসব পশু নির্বাচনও করতে হবে অতি সতর্কতার সঙ্গে। আগামী আট মাস মরুবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, থেকে খাবারদাবার, পোশাক-আশাক, তাঁবু, ওষুধপত্র সব এমনভাবে নিতে হবে শুধুই যা দরকার। অতিরিক্ত জিনিস নেওয়াও যেমন যাবে না, তেমনি কোনও সরঞ্জাম যেন বাদ না যায় সেটাও দেখে নিতে হচ্ছিল। জেনে নিতে হচ্ছিল মরুপ্রদেশের জলবায়ুর খোঁজ। হিসেব করে দেখেছিলাম, আটটা উট আর বারোটি ঘোড়া হলেই চলে যাবে। বছরের এই সময়টা মোটেই উট কেনার উপযুক্ত সময় নয়। কারণ, এই সময় বেশিরভাগ পশু ব্যবসায়ীরাই ব্যস্ত থাকে পশুর পিঠে মালপত্র চাপিয়ে রাশিয়ার ব্যবসায়িক শহর আন্দিজান এবং আলমাতির দিক থেকে আনা-নেওয়া করতে। কাজেই এই সময় সহজে কেউ ভারবাহী পশু হাতছাড়া করতে চায় না। অনেক টানাপড়েন, আলোচনা ও দর কষাকষির পর মুন্সি বাহাদুর শাহ্ ও মিস্টার ম্যাকার্টনির অভিজ্ঞ কর্মচারীদের সহায়তায় আগামী অভিযানের জন্য পশুর দল-সহ জিনিস জোগাড় করা গেছিল। অভিজ্ঞ মানুষগুলোর বিবেচনা বোধ যে কী ভীষণভাবে ফলপ্রসূ হয়েছিল, মূল অভিযানের সময় তা টের পেয়েছিলাম। কাশগর থেকে সংগ্রহ করা এই পশুর দল মরু অভিযানে তিন হাজার মাইলেরও বেশি পথ চলে এক ফোঁটাও বিগড়ায়নি। এক-একটি উটের জন্য গড় দাম দিতে হয়েছিল ৬২৪ টাঙ্গাস যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯১ টাকা মতো আর ঘোড়াগুলোর জন্য দিতে হয়েছিল ২৬০ টাঙ্গাস মানে ৩৮ টাকা মতো।

অভিযান দলে লোকজন নিয়োগের বিষয়েও বিশেষ সতর্কতা নিতে হয়েছিল, যাতে করে অনাবশ্যক খরচও না বাড়ে আর খাবারদাবারের ভাঁড়ারেও চাপ না পড়ে। ঠিকঠাক লোক জোগাড় করাটাও সহজ কাজ নয়। পাহাড়ি পথে চলার সময় টের পেয়েছিলাম আমার পেশোয়ারি ব্যক্তিগত চাকর মির্জা আলম দুর্গম অভিযানের জন্য যথেষ্ট শক্তপোক্ত নয়। মির্জার এক বিকল্প খুঁজে পেয়েছিলাম, মুহাম্মদ-জাউ, আধা ইয়ারকান্দি আধা কাশ্মীরি, শক্তিশালী ‘কিরাকাশ’। কারাকোরামের বাণিজ্য পথে ঘুরে ঘুরে ঘোড়া সম্পর্কে দক্ষ হয়ে উঠেছিল। ক্যাপ্টেন ডেইজির অভিযান সেরে ভারতে ফেরার পথে ও সঙ্গী ছিল।  ‘সাহেব’দের জিনিসপত্র রক্ষণাবেক্ষণ ও খাবারদাবারের বিষয়েও ওর জ্ঞান ছিল অসাধারণ।

নিয়াজ আখুন নামের কাশগরের এক চাইনিজভাষীকে দলে নেওয়া হয়েছিল অনেক লোকজনকে ইন্টারভিউ করার পর। মিস্টার ম্যাকার্টনির সাহায্যে ওকে ‘তুংচি’ (চাইনিজ দোভাষী) হিসেবে পাওয়া গেছিল। শুধু তাই নয়, দুর্গম অঞ্চলে আমাদের ঘোড়ার দলের দেখভাল করার দায়িত্বও ও নিয়েছিল। নিয়াজ, মিস্টার এবং মিসেস লিটলডেলের তিব্বত ও চিন অভিযানে যাত্রাসঙ্গী ছিল। ও ছাড়া আমার দলের বাকি তুর্কি সদস্যদের কেউই ‘বাজিন’ বা পিকিং  শহর  দেখেনি। চিন্নি-বাগের বাংলোয় বসে ওর কয়েকটা ব্যক্তিগত বদভ্যাসের কথা টের পাইনি। পরে পেয়েছিলাম। তা হল আফিম আর জুয়ায় প্রতি অত্যধিক আসক্তি। এর ফলে ও মাঝেমধ্যেই হাতাহাতি কিংবা ছোটোখাটো লুটপাটে জড়িয়ে পড়ত। এতে পরবর্তীকালে আমাদের খানিক সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। যদিও উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে সততার সঙ্গে ও সারা অভিযানে দোভাষীর কাজটা করেছিল ঠিকঠাক। দুজন ‘তুঘাছিস’ যুবক আমার দলে যোগ দিয়েছিল। যারা আমাকে উট বিক্রি করেছিল তারাই এই দুইজনকে জুটিয়ে দিয়েছিল। রোজা আখুন বা হাসান আখুন নামের এই দুজন কেউই উত্তরের ক্যারাভান পথের বাইরের কিছু দেখেনি, ফলে কিছুই জানত না। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই উটকে কীভাবে চালিয়ে নিয়ে যেতে হয় সে-বিষয়ে ওস্তাদ হয়ে উঠেছিল। কম বয়সের উৎসাহ আর অ্যাডভেঞ্চারের টানে মরুভূমি যাত্রার কষ্ট ও ঝুঁকি সহ্য করে আমার অভিযানে যোগ দিতে সোৎসাহে রাজি হয়েছিল।

কাশ্মীর থেকে এতদিনের টানা যাত্রার পর, তাঁবু-টাবু সহ ক্যাম্পিংয়ের অনেক জিনিস মেরামত করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। সেগুলো খুঁটিয়ে দেখে ঠিকঠাক মেরামত করাতেও অনেক সময় লেগে যাচ্ছিল। দীর্ঘ যাত্রায় ঘোড়া, ইয়াক আর মানুষের পিঠে চেপে এসে সরঞ্জাম বোঝাই বাক্সগুলোও  অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সবকিছুই মেরামত করতে হচ্ছিল। মরুযাত্রার জন্য কিনতে হচ্ছিল আরও অনেক কিছু। ভারতীয় কারিগরদের মতো দক্ষতা কাশগরিদের না থাকলেও প্রয়োজনীয় মেরামত করাতে খুব বেশি সময় লাগেনি। মিস্টার ম্যাকার্টনির বাংলোর চৌহদ্দি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাশগরের জনাকয়েক ‘মাস্টার’ কারিগর দিয়ে মেরামতির কাজগুলো দাঁড়িয়ে থেকে করিয়েছিলাম।

সবচাইতে ঝামেলার কাজ ছিল মরুযাত্রার জন্য কিছু অতিরিক্ত জলের ট্যাঙ্ক তৈরি করা। কলকাতায় তৈরি গ্যালভানাইজড লোহার জলের ট্যাঙ্কগুলো নিরাপদে পৌঁছলেও আরও কিছু জলের ট্যাঙ্ক নিয়ে সঙ্গে রাখা উচিত বলে আমার মনে হয়েছিল। উটের পিঠে নেবার জন্য যেই ট্যাঙ্কগুলো তৈরি করা হয়েছিল সেগুলো এক-একটা মাত্র ১৭ গ্যালন মানে সাতাত্তর লিটার জল ধরতে পারে। মরুভূমির বুকে বালিচাপা পড়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক খননের একটা বিশাল দলের জন্য সঙ্গে আনা জলের ট্যাঙ্ক যথেষ্ট ছিল না। তাই সঙ্গে অন্তত আরও চারটে ট্যাঙ্ক নেওয়া খুব দরকার ছিল। কিন্তু সমস্যাটা হয়েছিল ট্যাঙ্ক বানানো নিয়ে। ট্যাঙ্ক বানানোর জন্য যা পাওয়া যাচ্ছিল তা হল ট্রান্স-কাস্পিয়ান রেলপথ থেকে তুর্কিস্থানে কেরোসিন তেল নিয়ে আসা কিছু তোবড়ানো টিনের কৌটো। কামার আর ছুতোর মিস্তিরি দিয়ে কাঠের বাক্সের মধ্যে টিনের পাত্র বসিয়ে জলের ট্যাঙ্ক বানাতেই এক সপ্তাহের ওপর লেগে গেছিল। জল নেবার পাত্রগুলো শক্তপোক্ত করে তৈরি না করালে বিপদে পড়তে হত।

যদিও এইসব কাজ করাতে গিয়ে আমার অন্য কাজগুলো পণ্ড হয়নি। মিস্টার ম্যাকার্টনির বাংলোর পপলার গাছের ছায়ায় বসে মেরামতির দেখভালের ফাঁকে ফাঁকে পড়ে ফেলছিলাম একের পর এক বই। পূর্ব তুর্কিস্থানের পুরোনো বিবরণ, চিনা ইতিহাসের নানা ঘটনা, চিনা তীর্থযাত্রীদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা আর কিছু প্রাচীন ইউরোপীয় পর্যটকদের পূর্ব তুর্কিস্থানে ভ্রমণের কথা। যত পড়ছিলাম ততই এই অঞ্চল সম্পর্কে আমার জ্ঞান বেড়ে যাচ্ছিল। পড়তে পড়তে আমি মোহিত হয়ে যাচ্ছিলাম। আরও ভালো লাগছিল কাড়ন আমি যে-জায়গায় বসে ছিলাম, পড়ছিলাম সে জায়গা আর তার আশেপাশের ইতিহাস নিয়ে। চিন্নি-বাগে বসে আমি আমার পেশাটাকে ভীষণ-ভীষণভাবে উপভোগ করছিলাম। দীর্ঘদিন এখানে বসবাসের সুবাদে মিস্টার ম্যাকার্টনি যেসব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করেছিলেন, তা উজাড় করে আমাকে জানিয়ে যাচ্ছিলেন। আধুনিক তুর্কিস্থানের আর্থ-সামাজিক বিষয় না জানলে অতীত আর বর্তমানটাকে চিনতে পারা দুঃসাধ্য। মাঝেমধ্যেই চিনের প্রথাগত বিষয় নিয়ে বুঝতে অসুবিধা হত। তখন মিস্টার ম্যাকার্টনি ডেকে আনাতেন সান-সু-ইয়েহকে, ওঁর চিনা মুন্সিকে। সান-সু-ইয়েহ একজন সাহিত্যিক এবং চিনের ক্লাসিক সাহিত্য নিয়ে ওঁর জ্ঞান অসামান্য। অসাধারণ জ্ঞানী মানুষ। আমি মুগ্ধের মতো ওঁর ব্যাখ্যাগুলো শুনতাম। এই সময় মিস্টার ম্যাকার্টনি দোভাষীর কাজটা করতেন। আমার কাশ্মীরি পণ্ডিত বন্ধু পণ্ডিত গোবিন্দ কাউলের কথা বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল। দীর্ঘদিন ওঁর সঙ্গে সরাসরি সংস্কৃত ভাষায় আমি নানা প্রাচীন সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছি। এখানে সেটা সম্ভব হচ্ছে না চিনা ভাষা জানা নেই বলে।

কাশগরে বেশি সময় থাকার আরও একটা উদ্দেশ্য ছিল। তা হল চিনা প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের আস্থা অর্জন করা। আমার অভিযানের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব পরিষ্কারভাবে বোঝানো। আমি ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলাম, এই কাজটা ঠিকঠাক না হলে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চালানো মুশকিল হবে। মিস্টার ম্যাকার্টনি বিচক্ষণ অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। উনি ঠিক ঠিক লোকের সঙ্গেই আমার আলাপ-পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে পুরো বিষয়টা সামলাতে অসুবিধা হয়নি। উনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রাদেশিক গভর্নর ও সরকারের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে। যেখানেই নিয়ে গেছেন সেখানেই সুন্দর আর মনোগ্রাহী আলোচনা হয়েছে। শিখতে আর জানতে পেরেছিলাম অনেক কিছুই। শিখেছিলাম চাইনিজ শিষ্টাচার, যা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের লোকেরা এই  শিষ্টাচারকে ভদ্রতার অপরিহার্য অঙ্গ বলে মনে করে। মিস্টার ম্যাকার্টনির উপদেশমতো এই কাজটা না করলে পরে বিপদে হত। মিস্টার ম্যাকার্টনি এতদিনের অভিজ্ঞতায় চাইনিজদের মনোভাব ভালোভাবেই জেনে গেছিলেন।

এই অঞ্চলের মুখ্য সামরিক অধিকর্তা তাও-তাই, খোতনের আম্বানকে লিখিতভাবে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যাতে আমাকে খাবারদাবার-সহ, লোকজন যা যা লাগবে তা পেতে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করা হয়; পাশাপাশি তিনি আমাকে এই অঞ্চল জুড়ে ঘোরাঘুরির পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তাও-তাইয়ের এই হুকুমনামাটা খুব খুব জরুরি ছিল। মাত্র আঠারো মাস আগে এই অঞ্চলে জরিপের কাজে এসে ক্যাপ্টেন ডেইসি পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। বিশেষ করে আমি যে অঞ্চলে যাচ্ছি সেই দক্ষিণ খোতনে। মিস্টার ম্যাকার্টনির উচ্চপদস্থ চিনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সদ্ভাব ও প্রভাবের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। তাও-তাইয়ের সঙ্গে পরপর বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকার ও অনেক চিঠিপত্রের আদানপ্রদানের পরই উনি হুকুমনামা জারি করেছিলেন। একের পর এক তথ্য তুলে ধরে তাও-তাইকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম আমার প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের উদ্দেশ্য, মধ্য এশিয়ার সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি ও বৌদ্ধধর্মের ঐতিহাসিক সংযোগের কথা। উনি নিশ্চিন্ত হতে চাইছিলেন আমার উদ্দেশ্য নিয়ে; ওঁর সমস্ত সন্দেহ দূর করতে পেরেছিলাম মিস্টার ম্যাকার্টনির সক্রিয় সহযোগিতায়।

তাও-তাইয়ের সঙ্গে আলোচনার সময় হিউয়েন-সাংয়ের  ভ্রমণ-বৃত্তান্ত ‘সাই-আই-কি’র প্রসঙ্গ বার বার ঘুরেফিরে এসেছিল। প্রায় প্রত্যেক শিক্ষিত চাইনিজ সরকারি আধিকারিকরা হয় এই বইটি পড়েছেন নতুবা এই বরেণ্য চৈনিক পরিব্রাজকের ‘পশ্চিমের দেশ’ ভ্রমণের নানা ঘটনার কথা শুনেছেন। আর আমি সেই মহান সন্ন্যাসীর পদচিহ্নের হদিস তুর্কিস্থানের মাটিতে করতে চলেছি আর ঠিক একই ধরনের অন্বেষণ এর আগেও আমি ভারতভূমিতে করেছি জানার পর সহযোগিতার হাত এগিয়ে এসেছিল।

যখন প্রায় প্রতিদিনই আমার হয় তাও-তাই বা তাঁর অধীনস্থ সিহ-তাই (সামরিক বাহিনীর জেনারেল) বা স্থানীয় ম্যান্ডারিনদের সঙ্গে অভিযান নিয়ে আলোচনা চলছিল, আর আমি জেগে স্বপ্ন দেখতাম  বালির তলা থেকে বেরিয়ে আসছে একের পর এক ইতিহাস।

গিলগিট থেকেই জেনে এসেছিলাম বিশ্বের নানা প্রান্তে শুরু হওয়া যুদ্ধের খবর। চিনদেশের ইউরোপিয়ান বসতিগুলো বিপদের আশঙ্কায় ভীত ছিল। উরুমচি থেকে কাশগর পর্যন্ত টেলিগ্রাম লাইন ছিল। চিনা কর্মকর্তারাও প্রতিনিয়ত যুদ্ধের খবর পাচ্ছিলেন। এদিকে ইউরোপে পিকিংয়ে গণহত্যা হয়েছে বলে একটা মিথ্যে খবর পৌঁছেছিল, সেই খবরটা আমাদের কাছে এসেছিল ইয়েমেনের মাধ্যমে (দূতাবাস- মিস্টার ম্যাকার্টনির অফিস)। বার বার টেলিগ্রাম করে জানতে চাওয়া হচ্ছিল পরিস্থিতি। দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছিল পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও দূতাবাসের সবাই নিরাপদে আছে।

আমি কাশগরে পৌঁছনোর সপ্তাহ খানেক আগেই ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে যুদ্ধের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল অঞ্চল জুড়ে। মুসলিম ও চিনাদের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হয়ে সংঘর্ষ বেধে যাবার পরিস্থিতি তৈরি হতে বসেছিল নতুন গড়ে ওঠা ইয়াঙ্গি-শাহরে শহরে। পুরোনো শহর কাশগরে চাইনিজ সমর অধিকর্তার আকস্মিক উপস্থিতিও পরিস্থিতিকে খানিক জটিল করে তুলেছিল। তাও-তাইয়ের নিরাপত্তার জন্য সামরিক বাহিনী অতিরিক্ত তৎপর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু উনি এক তাস খেলার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছেন এ-কথা জানার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছিল।

স্যার ডগলাস ফোরসিথ আসার পর থেকে অনেক ইউরোপিয়ান পর্যটক এই অঞ্চলে ঘুরে গেছেন তাই শহরের খুঁটিনাটি বিবরণ দেবার চেষ্টা করছি না। আমার দিনগুলো চিন্নি-বাগের ঘেরাটোপে চূড়ান্ত ব্যস্ততায় কাটছিল। বাইরের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ কমই হচ্ছিল। যদিও তুর্কিস্থানের সমভূমির চূড়ান্ত গরমের সময়টা পার হয়ে গেছিল, কিন্তু দুপুরের গরমটা ছিল দুঃসহ। তাই যতটা পারতাম সকালেই কাজগুলো এগিয়ে রাখতাম। খুব ভোরে উঠে বাগানের পপলার গাছের নীচে কাগজ আর বইপত্র নিয়ে বসে যেতাম পড়াশুনার কাজে।

এখানে এখন ফলের ভরা মরশুম। বাগানের ঢাল এপ্রিকট, পিচ আর আপেল-কুলের গাছগুলো ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। বাগানের গাছের ছায়ায় বসে কাজ করতে করতে দেখতাম চাষি পরিবারের নারী-পুরুষরা দলে দলে ঘোড়ার গাড়িতে ফলের ঝুড়ি চাপিয়ে গান করতে করতে শহরের বাজারের চলেছে। শুধুমাত্র ভিক্ষুকদের দেখতাম পায়ে হেঁটে যেতে, কখনো-কখনো অবশ্য ওদেরও দেখতাম গাধার পিঠে চেপে চলাফেরা করতে। সৌভাগ্য এখানে কোনও প্রাত্যহিক খবরে কাগজের বালাই নেই, নেই রোজকার চিঠিপত্রের আসা-যাওয়া। তাই ওস্তাদদের দিয়ে নিশ্চিন্তে কাজ করিয়ে নিতাম দিনভর। অনেক কাজই শেষ হয়ে এসেছিল। প্রতিদিন সকালের খাবারের পর মিস্টার ম্যাকার্টনি আমার সঙ্গে বাগানে হাঁটতে হাঁটতে কাজ কতটা এগোল দেখতেন, প্রয়োজনে নানা উপদেশ দিতেন। তারপর উনি চলে যেতেন ওঁর দফতরে। সেখানে বসে নানা রিপোর্ট লিখে পাঠাতে হত ভারত সরকারের অফিসে। ওঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রতিদিন অনেক লোক আসেন। পাঞ্জাবি ব্যবসায়ী, শিকারপুর থেকে এখানে এসে আস্তানা গাড়া হিন্দু মহাজন, লাদাকি কুলি, রাসকামের কানজুটি বসতি স্থাপনকারী… ভারতের ‘মুল্কি সাহেব’ তুর্কিস্থানের রাজধানীতে বসবাসকারী ভারতীয়দের যাতে ভালো হয় তা দেখভাল করার জন্যই তো আছেন। আর আমি প্রতিদিন এক-দু’ঘণ্টা কাশগরের প্রধান মাদ্রাসায় গিয়ে তুর্কি ভাষা নিয়ে পড়াশুনা করতাম। প্রাচীন শাসন ব্যবস্থা ও ধর্মতাত্ত্বিক জীবন নিয়ে মাদ্রাসার পণ্ডিতরা উৎসাহ নিয়ে আলোচনা করতেন। দুপুরের খানিক আগের সময়টা আমি ব্যস্ত থাকতাম হসপিটালের এক সহকারীর খালি কোয়ার্টারে। ওর একটা ঘরকে আমি ফটোগ্রাফিক প্রসেস রুম বানিয়ে নিয়েছিলাম। এতদিন পর্যন্ত তোলা ছবিগুলোকে প্রসেস করে রাখাটা খুব দরকার ছিল। বিকেলে মিস্টার ম্যাকার্টনি ওঁর স্ত্রী বা অন্য  কারও সঙ্গে গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে বেড়াতাম। কখনো-বা সদ্য কেনা ঘোড়ার পিঠে চেপে ঘুরে বেড়াতাম। তবে সবচাইতে ভালো লাগত সন্ধেতে ছাদে বসে আড্ডা। ছাদে বসে প্রায়ই দেখতাম পরিবার নিয়ে কাশগরিরা পিকনিক সেরে ফিরছে। ফলের মরশুমে বাগানভর্তি ফলের মাঝে দিন কাটিয়ে মহিলা, শিশু আর পুরুষদের ঘোড়ার পিঠে বা গাড়িতে চেপে গান করতে করতে ফেরার দৃশ্য আমাকে অনেকদিন আগে শোনা হাঙ্গেরির নদীর ধারের রাস্তার কথা মনে করিয়ে দিত।

এখানে বসেও প্রতিদিন পশ্চিমের স্বাদ পেতাম যখন সন্ধেবেলা আধ-মাইল দূরের রাশিয়ান কনসুলেটের কসাক গার্ডরা একযোগে গান গাইত। প্রায়শই রাস্তা দিয়ে অনেক উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের যেতে দেখতাম, কিন্তু তাদের ‘সাহেব’-দের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ মেলেনি। যেমন কাশগরে নিয়োজিত রাশিয়ার ইম্পেরিয়াল কনসাল-জেনারেল এম. পেট্রোভস্কি। তিনি প্রাচীন ইতিহাসের একজন মহা পণ্ডিত। নৃতাত্ত্বিকতার প্রতি তাঁর আগ্রহ অসীম। নিজেও একজন পুরাকীর্তির সংগ্রাহক। আমি ওঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য খুব উৎসুক ছিলাম। কিন্তু উনি অসুস্থ থাকায় সেই সুযোগ মেলেনি। মিলেছিল নয় মাস পরে খোতন অভিযান সেরে ফেরার সময়।

কনসুলেটের কল্যাণে একটা ছোটোখাটো রাশিয়ান উপনিবেশ গড়ে উঠেছে। রাশিয়ানরা ছাড়া   কাশগরে যেসব ইউরোপিয়ানরা ছিলেন, তারা হলেন ফাদার হেনড্রিকস এবং সুইডিশ ধর্মপ্রচারক, মি. জি. রাকুয়েট ও তাঁর স্ত্রী। এঁদের সঙ্গে প্রায়শই দেখা হত। ফাদার হেনড্রিকসকে বহু বছর আগে তাঁর জন্মভূমি হল্যান্ড থেকে মঙ্গোলিয়াতে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে এখন তাঁর ঠাঁই হয়েছে কাশগরে। চিন্নি-বাগে মিস্টার ম্যাকার্টনির বাড়িতে এঁরা প্রায় সন্ধেতেই আড্ডা মারতে আসতেন।  আসতেন রাশিয়ান কনসুলেটের লোকজন আর কিছু চাইনিজ উঁচুদরের কর্তা। বসত সত্যিকারের আন্তর্জাতিক আসর। সংবাদপত্রের খামতি মিটিয়ে দিত এঁদের কাছ থেকে পাওয়া নানা খবর।

এখানে আসার পর আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে যে প্রাচীন কাঠামোর ধ্বংসাবশেষগুলো আমি প্রথমেই দেখেছিলাম সেগুলো নিয়ে বলা যাক। কাশগর প্রাচীন সাম্রাজ্য ‘কি-শা’র রাজধানী ছিল বলে অনুমান করা হয়। হিউয়েন-সাং এই স্থানকে সহস্র বৌদ্ধমঠের ধারক বলে বর্ননা করেছেন। প্রাক-মুহাম্মদন যুগের নানা সামগ্রীর নমুনা এখানকার মাটির ওপর এখনও বর্তমান। সবচাইতে সুস্পষ্ট চিহ্ন হল উত্তরদিকের সূর্যের আলোয় শুকোনো ইটের গাঁথুনির ঢিবি। যা ভেঙেচুরে গেলেও মাটির ওপর মাথা তুলে আছে। চিন্নি-বাগ থেকে উত্তর-পশ্চিমে মাইল দেড়েক দূরে তিমেন-দারিয়া নদীর তীরে যে বিশাল স্তূপের ধ্বংসাবশেষ মাটির তলায় লুকিয়ে আছে, তা আশেপাশের ঢিবির ধ্বংসস্তূপ দেখে আমি নিঃসন্দেহ।

তিমেন-দারিয়া নদীতীরের ঢিবির ধ্বংসস্তূপের উচ্চতা ৮৫ ফুট আর পুব থেকে পশ্চিমে ভিতের ব্যাস ১৬০ ফুট। কিন্তু সঠিকভাবে জরিপ না করে এই স্তূপ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়। এর গাঁথুনির নরম ইট বহুলাংশে খসে গেছে। আমার মনে হয় এর ভিত কম করেও মাটির নীচে ১৫ ফুট গভীরে আছে। এখন এর চারপাশে গড়ে উঠেছে চাষের ক্ষেত। মূলত নদীর পলি জমে জমে নদীখাতের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়াতে স্তূপের অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে। কোনও সন্দেহ নেই, এই স্তূপ প্রাচীন খোতনের রাজধানীর অন্তর্গত ছিল। শহরের দক্ষিণে এইরকম আরও একটি ধ্বংসস্তূপ দেখতে পেয়েছি। সেই স্তূপ নিয়ে বিস্তারিত কিছু লিখছি না। আধুনিক শহরের আশেপাশে এরকম অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেগুলো নিয়ে কাজ করার অনুমতি নেই। শুধু চিনা সেনানিবাসে যাবার পথে দেখা ‘নতুন শহর’ কাশগরের চারপাশে নজরে আসা প্রাচীন শহরের চিহ্নের কথা আমি ডায়েরিতে শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ হিসেবেই নথিভুক্ত করে রাখছি।

মি. ম্যাকার্টনির চু-কুয়ানস বা সহকারী শহর-প্রধানের সঙ্গে দেখা করার প্রয়োজন ছিল। আমিও শহর দেখা ও খানিক কেনাকাটার জন্য ওঁর সঙ্গ নিয়েছিলাম। অন্য দিনের তুলনায় রোদ ঝলমলে দিনটা খানিক ঠান্ডা-ঠান্ডাই ছিল। নতুন আর প্রাচীন কাশগরের মধ্যে একটা মাইল আটেক চওড়া গাছে ছাওয়া রাস্তা আছে। এই রাস্তা ধরে ঘোড়ার গাড়ি চেপে যেতে যেতে দু-পাশের সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। প্রায় মাঝপথে কিজিল-সুর নদীর এক শাখা অতিক্রম করেছিলাম। নদী লালচে-বাদামি জলে কানায় কানায় ভরা। নদীর জলই বলে দিচ্ছিল দূর পাহাড়ে প্রবল বর্ষার কথা। নতুন শহরের উত্তর-পশ্চিম সীমার কাছাকাছি আসতেই সুদৃশ্য নতুন নতুন বাড়িঘরের কমপ্লেক্স একের পর এক দেখা যেতে শুরু করেছিল। প্রথমেই যে দ্রষ্টব্য স্থান এসেছিল সেটি হল সেনাপতি লিউ-কিন-টাং-এর স্মৃতিতে গড়া চিনা মন্দির। ১৮৭৭ সালে ইয়াকুব বেগের মৃত্যুর পর সেনাপতি লিউ-কিন-টাং  তুর্কিস্থান পুনরুদ্ধার করেন। আমরা মন্দিরটি দেখতে ঢুকেছিলাম।

পপলার গাছে ছাওয়া একটা বিশাল মাঠের মাঝখানে মন্দিরটি। একটা সুন্দর কারুকার্য করা বড়ো গেটের মধ্যে দিয়ে আমরা মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছিলাম। গেটের খানিক দূরেই মাটি থেকে প্রায় ফুট আটেক উঁচু কাঠের মঞ্চ। মঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে উঠে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করতে প্রথমেই নজর কেড়েছিল অনেকটা ইউরোপীয় ঘরানার মতো কাঠকয়লায় আঁকা দেওয়ালময় সব ছবি। বিশাল হলঘরে প্রবেশের মুখের দরজার ওপরে লালের ওপর জ্বলজ্বলে সোনার অক্ষরে লেখা একটি বোর্ড। মন্দিরে ঔপনিবেশিকতার ছাপ স্পষ্ট। স্মৃতি মন্দিরের ভেতরের সুপরিকল্পিত অঙ্গসজ্জা প্রশংসার যোগ্য। হলের ডান আর বা-পাশের দেওয়ালগুলোতে লিউ-কিন-টাং-এর কর্মজীবনের পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যকলাপের বর্ণনা-সহ বড়ো বড়ো পেইন্টিংয়ের সিরিজ দিয়ে আচ্ছাদিত। রয়েছে  অবরোধ আর যুদ্ধের কিছু গ্রাফিক স্কেচ। যুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া আন্দিজানি ও উরুমচি এবং কালো চামড়ার তাতার জনগণের উপস্থিতিও গুরুত্ব সহকারে হলের ভেতরে ছবি-গাথায় প্রদর্শিত হয়েছে। জেনারেল আদালতে বসে আছেন, অপরাধীদের বিচার করেছেন এরকম ছবির পাশাপাশি জেনারেল পৈতৃক বাড়িতে থাকার দৃশ্য, বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে ছবি, সব মিলিয়ে একজনের কর্মজীবনের অসাধারণ নৃতাত্ত্বিক জাদুঘর। হলের ঠিক মাঝখানে সোনার কাজ করা ফ্রেমে জেনারেলের এক বিরাট প্রতিকৃতি। যে-কোনো ইউরোপের জাদুঘরের সঙ্গে তুলনীয়। এই হলে কোনও চিনা দেবতার ছবি বা মূর্তি দেখতে পাইনি। এই ঘরটি শুধু জেনারেলের জন্যই উৎসর্গিত।

হলঘরে না থাকলেও দুটো বিশাল আকারের পৌরাণিক ড্রাগনের ছবি মন্দিরের দেওয়ালে আঁকা। এর একটি ঝড় সৃষ্টি করতে পারা ড্রাগন। যিনি এঁকেছেন সেই শিল্পীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেই হয়। ছবিগুলো দেখে হিউয়েন-সাং বর্ণিত লোককথার ভয়ংকর নাগাদের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। যিনি বরফ ঝরিয়ে আর হাওয়া বইয়ে পামিরের উচ্চতা রক্ষা করেন। ঘরে আর একটি ছবি ছিল। অর্ধেক মানব আর অর্ধেক বাঘ। ড্রাগনের চোখে-মুখে যেমন উদগ্রতা, ঠিক তার বিপরীত ভাব বাঘ-মানুষের মধ্যে। এক চরম হতাশা ছেয়ে। জানি না শিল্পী বা শিল্পীরা কেন দু-রকম অভিব্যক্তির ছবি এঁকেছিলেন।

মন্দিরের পুরোহিত মি. ম্যাকার্টনির দিকে এগিয়ে এসে বিনয়ের সঙ্গে লাজুক মুখে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করলেন। মি. ম্যাকার্টনির এখানে চিনা ভাযায় পরিচয় ‘মা-শাও-ইয়েহ’ নামে। মন্দিরের পুরোহিত ছোটোখাটো চেহারার লামা, কাছের এক ছোট্ট মঠ থেকে এখানে আসেন। লিউ-কিন-টাংকে একজন সাধক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু যখন ছবি তোলার প্রসঙ্গ এল তখন পুরোহিতমশাই ভয় পেয়ে একদম কাঁচুমাচু মুখ করে ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন। ভয়ংকর কিছু হতে যাচ্ছে ভেবে নিজেকে শক্ত করছিলেন উনি। ছবি তোলার কাজটি সারা হয়ে যাওয়ার পর স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়েছিলেন।

obhijaankhotan02

ছোটো শহরতলির মধ্যে দিয়ে নতুন শহর ইয়াঙ্গি-শাহরের উত্তরদিকের প্রবেশদ্বার পার হতেই পুরো চিনা বসতির রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। ছোটো ব্যবসায়ীরাও প্রায় সবাই চিনা। রাস্তার দু-পাশে সার সার চিনা খাবারের দোকান। সর্বত্র চিনা সৈন্যদের উপস্থিতি। ঠিক দুর্গ শহরের পরিবেশ। নানা সরকারি অফিস ভবনের ঠিক পেছনেই সেনা ছাউনির প্রধান বাজার।

obhijaankhotan03

পুরোনো শহরের থেকে অনেক অনেক বেশি চিনা দোকান। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দরভাবে সাজানো। দেখলেই মনে হবে একবার ঢুকে দেখি। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘শপিং’ খুব একটা পছন্দ করি না, কিন্তু উপহার হিসেবে বন্ধুবান্ধব ও বাড়িতে পাঠানোর জন্য জন্য সিল্কের পোশাক আর বিচিত্র ধরনের বাসনপত্র না ঘেঁটে পারলাম না। যদিও ভালো করে দেখার মতো সময় প্রায় ছিলই না।

কয়েকটা দোকান ঘুরে আমরা মি. ম্যাকার্টনির চিনা বন্ধু লিউ-লাই-চিনের বাড়িতে পৌঁছেছিলাম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সুন্দর করে সাজানো বাড়িটি শহর-প্রধানের বাড়ির কাছেই। মিস্টার লিউ-লাই-চিন শুধু একজন সুদক্ষ প্রশাসকই নন, একজন গুণী শিল্পীও। মিসেস ম্যাকার্টনিকে উপহার দেওয়া ওঁর আঁকা ছবি আমি আগেই মি. ম্যাকার্টনির বাড়িতে দেখেছি। বিশাল সুসজ্জিত ড্রয়িং রুমটি একাধারে পড়ার ঘর, তথা অফিস। আবার ছবি আঁকার স্টুডিও বটে। দেওয়ালে ঝোলানো তুলির সূক্ষ্ম  কাজগুলো দেখতে দেখতে মনটা আনন্দে ভরে গেছিল। আমার অভিযান নিয়ে ওঁর উৎসাহ উনি আকার-ইঙ্গিতে প্রকাশ করছিলেন। পুরাকীর্তি নিয়ে ওঁর জ্ঞান যথেষ্ট। হিউয়েন-সাং কথিত ‘নতুন সাম্রাজ্য’-এর প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। যদিও আলোচনার খুবই সামান্যই আমার বোধগম্য হচ্ছিল, তাও মি. ম্যাকার্টনি খানিক তর্জমা করে দেওয়ায়।

ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s