শিবানী রায়চৌধুরীর আগের কিছু লেখা খোক্কস, বাড়ি থেকে পালিয়ে, ফুলঝাড়ু, ইচ্ছেপূরণ, অদৃশ্য, নতুন রূপকথা, ঘরে ফেরা

আমি তখন ক্লাশ এইটে পড়ি। একদিন পুরনো বইয়ের আলমারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটা মলাটছেঁড়া বই খুঁজে পেয়েছিলাম। নাম ছিল “লেজেন্ডস অ্যান্ড মিথস্ অফ গ্রিস এন্ড রোম।” বইটা ইংরেজিতে লেখা। ভাষাটা বেশ সহজ ছিল বলে আমার মতো ইংরেজিতে হোঁচট খাওয়া পড়ুয়াও দুএক পাতা পড়ার পর বই-এর মধ্যে ডুবে গিয়েছিল। গ্রিসের পৌরাণিক কাহিনি আর তার দেবদেবীদের গল্প পড়তে শুরু করলাম। প্যান্ডোরার বাক্সের গল্প এখানেই পড়েছিলাম। দেবতাদের রাজা জিউস ছিলেন বজ্র, বিদ্যুৎ আর আকাশের অধিকর্তা। তাঁর আদেশে আগুনের দেবতা হিফিসটাস জল আর মাটি দিয়ে প্যান্ডোরাকে তৈরি করেছিলেন। প্যান্ডোরার জন্মের পর দেবতারা তাকে উপহার দিলেন। জ্ঞানের দেবতা এথিনা তাকে বিদ্যাবুদ্ধি দিলেন, এফ্রোদাইতি দিলেন রূপ। এ্যাপোলো দিলেন গান, কবিতা আর শিল্প। বাণিজ্য আর ভ্রমণের দেবতা হারমেস দিলেন কূটবুদ্ধি। একে একে প্যান্ডোরা প্রায় সব দেবতার আশীর্বাদ পেল। সব শেষে জিউস তাকে একটা মুখবন্ধ জার দিলেন। প্যান্ডোরাকে সেটা খুলতে বারণ করেছিলেন। প্যান্ডোরা লোভ সামলাতে না পেরে জারটা খুলল। জার থেকে বের হয়ে এল– হিংসা, ঘৃণা, যুদ্ধ, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মৃত্যু- পৃথিবীর সব অনিষ্ট।
দেবতাদের গল্প ছাড়া বইয়ের ছবিতে দেখতাম গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের অ্যাক্রোপোলিস পাহাড়ের ওপর এথিনার মন্দির পার্থানন। সেই যুগে গ্রিসের ধর্ম, সভ্যতা ও রাাজনীতির কেন্দ্র ছিল অ্যাক্রোপোলিস। গ্র্রিসের দক্ষিণে ইজিয়ান সাগরে ক্রিট দ্বীপ। ক্রিটের নসোস প্রাসাদে লুকিয়ে ছিল মাইনেোটোরের গল্প। মাইনোটোরের ছিল ষাঁড়ের মাথা আর মানুষের দেহ। ক্রিটের নসোস প্রাসাদে থাকতেন রাজকন্যা আরিএডনি। তখন থেকেই ভাবতাম জীবনে একবার গ্রিস আর ক্রিটে যেতেই হবে।
দেশ থেকে পাঁচ হাজার মাইল পার হয়ে ব্রিটেনে এলাম। মাত্র কুড়িপঁচিশ মাইল দূরে ইউরোপ। ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে ইউরোপ যাওয়ার পয়সা জমাতে সাত বছর লেগে গেল। ইউরোপের পুবপ্রান্তে গ্রিস।পয়সার অভাবে কলকাতা যাওয়ার খরচ যোগাতেই হিমশিম খচ্ছিলাম।
জানুয়ারি, ১৯৭৬। চাঁদ তখন লিভারপুলে ডাক্তার। চাঁদ একদিন ফোন করে জানাল ও সস্তায় স্থলপথে ইউরোপ বেড়ানোর বিজ্ঞাপন দেখেছে। কোম্পানির নাম ‘টেন্টট্রেক’। জুলাইতে বাসে করে হল্যান্ড, ফ্রাান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইটালি, যুগোশ্লোভিয়ার মধ্যে দিয়ে গিয়ে সব শেষে গ্রিসে পৌঁছব। তারপর এথেন্স থেকে ইজিয়ান সাগর পার হয়ে ক্রিট দ্বীপে সমুদ্র্রের তীরে এক সপ্তাহ থাকব। যাতায়াত, খাওয়াথাকা সব নিয়ে খুব সস্তাই মনে হয়েছিল। তখনি সব পয়সা দিতে হবে না। ছ’মাস ধরে কিস্তিতে দিলেই চলবে। ডাক্তার চাঁদের আর্থিক অবস্থা আমার চেয়ে ভালো ছিল। ও কিস্তি দেওয়া শুরু করবে। আমার পরে দিলেও চলবে। তাই এক পায়ে খাড়া হয়ে গেলাম। চাঁদের দিদি রতনও তখন লন্ডনে। ও দেশে ফিরে যাওয়ার আগে আমরা তিনজনে যাব। আমি ডায়েরিতে দিন গোনা শুরু করলাম। যাওয়ার আগের কয়েকটা মাস ইস্কুলে পড়ানোর কাজ অবান্তর মনে হচ্ছিল।
জুলাই মাসের শেষে এক শনিবার আমরা তিন মূর্তি লন্ডনের ভিক্টোরিয়া স্টেশন থেকে ট্রেনে কেন্টের শিয়ারনেস ডকে হাজির হলাম। আমাদের হাতে একটা করে জামাকাপড়ের পোঁটলা ক্যাম্বিসের ছোট ব্যাগে। সে সময় আমাদের রাকস্যাক বা ব্যাকপ্যাক ছিল না। ডকে পৌঁছে আমরা লোক আর গাড়ির ভিড়ে দিশাহারা। চারচাকার যানবাহনে চারদিক ছয়লাপ- মোটর গাড়ি, বাস, কোচ, ছোটোবড়ো ভ্যান সেখান থেকে জাহাজে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে হল্যান্ডের ফ্লাসিং বন্দরে যাচ্ছিল।
আমাদের ধারনা ছিল কোচে করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ দেখতে দেখতে যাব। দেখলাম অনেক কোচ ও বাসের গায়ে কোম্পানি বা ট্রিপের নাম লেখা। গাড়ির ভিড়ে আমাদের কোচ বা বাস খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ চোখে পড়ল অনেক দূরে প্রায় জলের কাছাকাছি একটা ছোটো টিনের ভ্যান। ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়েছিল রোদেপুড়ে তামাটে রঙের একটা উনিশকুড়ি বছরের ছেলে। চোখ কালো চশমা, পরনে ঢিলেঢালা তাপ্পিমারা হাফপ্যান্ট আর সাদা টিশার্ট। টিশার্টের গায়ে রঙবেরঙে লেখা ‘টেন্টট্রেক’।
আমরা তাড়াহুড়ো করে ভিড় ঠেলে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে আমাদের কাগজপত্র তুলে ধরলাম। সে লিস্টে আমাদের নাম মিলিয়ে নিয়ে নিজের পরিচয় দিল, “আমি স্টিভ। আমি তোমাদের ড্রাইভ করে ইউরোপ ঘুরিয়ে আনব। আমার ইউনি এখন গরমের ছুটিতে বন্ধ। এই হলিডে কোম্পানি আমাকে গরমের ছুটিতে ড্রাইভ করার কাজ দিয়েছে। এর বেশি কিছু বলতে পারব না।”
বুঝলাম ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। তারপর সে ভ্যানটা দেখিয়ে বলল, “আমাকে নিয়ে বারোজন এই ভ্যানে করে যাবে। এখান থেকে আমরা দশজন। হল্যান্ড থেকে দুজনকে তুলে নেব।”
ভ্যানটা দেখে আামাদের মন খারাপ হয়ে গেল। বড়োসড় নরম বসার গদিওলা কোচ না, ইউরোপে বেড়াতে যাওয়ার বাসও না, একটা টিনের ছোটো ভ্যান। আমাদের জন্যে আরো সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিল। ভ্যানের মাথায় আমাদের মালপত্র তুলতে গিয়ে একটা কালো ট্রাঙ্ক দেখিয়ে স্টিভ বলল, “ট্র্র্রাঙ্কে তোমাদের এক মাসের খাবার আছে। প্যাকেটের শুকনো খাবার, জলে ফুটিয়ে খেতে হবে। সব কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে করতে হবে।”
আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে বসলাম, “আমরা যেখানে থাকব সেখানে কেনা খাবার পাওয়া যাবে না? কোন রেস্টুরেন্ট নেই?”
স্টিভ ভ্যানের মাথায় একগাদা নীল কাপড় আর লাঠিসোটা দেখিয়ে বলল, “যেখানে থাকবে মানে? নীল কাপড়গুলো তাঁবু। তাঁবু খাটিয়ে থাকতে হবে।”
এতক্ষণে মালুম হল আমরা না বুঝে, না জেনে ‘ক্যাম্পিং হলিডে’ নিয়েছি। নতুন করে হতাশ হবার কিছু নেই। তার আগেই খাবারের ব্যবস্থা শুনে হতাশায় আমার বেড়ানোর আনন্দ উবে গিয়েছিল। গ্রিসে কাবাব, মুসাকা, বাক্লাভা খেতে পাব না, ইটালিতে পিৎজা ,পাস্তা কিয়ান্তি খেতে পাব না। প্যাকেটের অখাদ্য শুকনো সুপ, ভাত আর স্টু গরম জলে ফুটিয়ে খেতে হবে।
ইতিমধ্যে আর ছ’জন ছেলেমেয়ে এসে যোগ দিয়েছে। তারা আমাদের চেয়ে বয়েসে ছোটো বলেই মনে হল। তাদের সাজসজ্জা আর কথাবার্তা শুনে বুঝলাম তারা ‘ক্যাম্পিং হলিডে’ করতে চোস্ত। তারা কেউ কোম্পানিকে খাওয়ার পয়সা জমা দেয়নি। ক্যাম্পিং সাইটের কাফেটেরিয়া থেকে নিজেরা ইচ্ছেমতো খাবার কিনে খাবে ঠিক করেছে। এসব যে করা যায় আমরা জানতামও না। খাওয়াথাকা সব আছে জেনেই রাজি হয়েছিলাম। এমন সময় জাহাজের ভেঁপু শুনে বেড়ানোর আনন্দে খাওয়ার কথা ভুলে গেলাম। স্টিভের ডাকে আমরা তাড়াতাড়ি ভ্যানে উঠে সরু কাঠের বেঞ্চিতে গাদাগাদি করে বসে পড়লাম। আমাদের ভ্যান বাস আর কোচের পিছনে লাইন দিয়ে জাহাজের পেটের মধ্যে ঢুকে গেল। আমরা ভ্যানে বসে ইংলিশ চ্যানেল পার হলাম। জাহাজের ডকে দাঁড়িয়ে সাগরের নীল জল দেখিনি। জাহাজের পেটের ভিতর কালো অন্ধকারে বসেছিলাম।
জাহাজ ফ্লাসিং বন্দরে নোঙর ফেলল। আস্তে আস্তে ভ্যান জাহাজের পেট থেকে বেরিয়ে আমাদের অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে এল। তারপর ইমিগ্রেশনে আমাদের ভারতীয় পাশপোর্ট আর ভিসার ঝামেলা চুকিয়ে হল্যান্ড পৌঁছলাম। স্টিভ ঝড়ের বেগে গাড়ি চালিয়ে মোটরওয়ে দিয়ে চলল। জানলা দিয়ে সবুজ সমতল ভূমি আর উইন্ডমিল ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না। কোথাও হল্যান্ডের শিল্পী ভ্যান গ’র বিখ্যাত পেন্টিং ‘ইয়েলো কর্নফিল্ড’ দেখা গেল না।
হঠাৎ একটা রাস্তার বাঁকে দুজন ছেলেমেয়ে হাত দেখিয়ে ভ্যান থামাল। স্টিভ চটপট তাদের তুলে নিল। তারা আমাদের সহযাত্রী। ডাচ তরুণ-তরুণী। ভ্যানে উঠে সহজেই আমাদের সঙ্গে আলাপ করে নিল।
আমাদের ভ্যান চলতে শুরু করতেই সবাই গলা ছেড়ে গান ধরল “উই আর অল গোইং অন এ সামার হলি ডে”। গানের তালে তালে টিনের ভ্যান নাচতে নাচতে চলল। আনন্দের ফোয়ারা বইছিল। আলুভাজা, চকলেট, চুইংগাম হাতে হাতে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
অন্ধকার নেমে আসতেই আমরা হল্যান্ড আর জার্মানির সীমানায় একটা ক্যাম্পিং সাইটে থামলাম। স্টিভ নেমে আমাদের জায়গা খুঁজতে গেল। একটু পরে ফিরে এসে দুঃসংবাদ দিল। ইউরোপে পাউন্ডের দাম কমে গেছে। আমরা যা পয়সা দিয়েছিলাম তার চেয়ে বেশি লাগবে। বেশি পয়সা দিয়ে ক্যাম্পিং সাইটে এক রাত্র্রির জন্যে মাথা গোঁজার জায়গা পাওয়া গেল। আমি, চাঁদ আর রতন হিমশিম খেয়ে তাঁবু খাটালাম। তারপর আমরা ছ’জন জল আনা, রান্না করা, বাসন মাজা ইত্যাদি অস্থায়ী সংসারের কাজ নিজদের মধ্যে ভাগ করে নিলাম। আমাদের এতই খিদে পেয়েছিল যে গরম জলে সিদ্ধ অখাদ্য শুকনো খাবার সোনামুখ করে খেয়েছিলাম। অন্যরা কাফেটেরিয়ায় ভালোমন্দ খেয়ে মাঝরাতে ফিরে এসেছিল।
বুভুক্ষু আমরা ছ’জন সাত-সকালে উঠে জল তুলে, রুটি, মাখন, দুধ কিনে সকালের জলখাবার খেয়ে তৈরি হয়ে ভ্যানে উঠলাম। যারা রাত করে ফিরেছিল তারা ঘুম চোখে ঢুলতে ঢুলতে এল। ভাগ্য ভালো যে স্টিভ ঢুলছিল না।
আমরা হল্যান্ড পার হয়ে জার্মানির মোটরওয়ে ধরলাম। আমাদের ভ্যান আবার ঝড়ের বেগে চলল। জালনার বাইরে সবুজ মাঠঘাট ঘরবাড়ি হু হু করে সরে যেতে লাগল। দেখে কিছুই ধরে রাখতে পারছিলাম না। মাঝে বারদুয়েক যানজটে আটকে গেলাম।
অবশেষে রাতের অন্ধকারে মিউনিখে ক্যাম্পিং সাইটে পৌঁছলাম। আবার বেশি পয়সা দিতে হল। স্টিভ বলে রাখল সব ক্যাম্পিং সাইটে আমাদের বাড়তি পয়সা নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে।
পরদিন ভোরবেলা স্টিভ আমাদের তাড়া দিয়ে ভ্যানে তুলে বলল অন্ধকার হওয়ার আগে অস্ট্রিয়া পৌঁছতে চায়। পথে কোথাও খেয়ে নিতে হবে। বৈচিত্র্যহীন মোটরওয়ে দিয়ে ভ্যান ছুটে চলল। যেতে যেতে দেখছিলাম রাস্তায় বোর্ডে দেশ বা শহরের নাম পাল্টে যাচ্ছে, ভাষা পাল্টে যাচ্ছে। তার থেকে বুঝছিলাম আমরা এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে এলাম। দুটো দেশের মাঝখানে চেকপোস্টে আমাদের তিনজনের ভারতীয় পাশপোর্ট ও ভিসা দেখাতে হচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত দিনের আলোয় অস্ট্রিয়া পৌঁছতে পারিনি। রাস্তায় ক্যাফেতে খাওয়াদাওয়া সেরে পাইন বনের মধ্যে আমরা তাঁবু ফেললাম। যথারীতি আমি, চাঁদ আর রতন মাটিতে শক্ত করে তাঁবু দাঁড় করাতে পারিনি। সারা দিনের ক্লান্তিতে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঝমাঝম বৃষ্টির শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল। তারপর দেখলাম আমাদের তাঁবু মাটি থেকে উঠে এসেছে। আমরা তাঁবুতে শুয়ে জলের ওপর ভাসছি। আমাদের সহযাত্রীরা তাদের তাঁবুতে দিব্যি ঘুমাচ্ছিল। চাঁদের আদেশে আমরা ভিজে সপসপে জামাকাপড়ে ভ্যানের মধ্যে গুটিসুটি মেরে ঘুমাতে গেলাম। ভালোই ঘুমিয়েছিলাম। সকালে স্টিভের বকুনিতে আমাদের ঘুম ভাঙল। স্টিভ বলল, আমাদের ভ্যানে ঘুমানো ঠিক হয়নি। আমরা স্টিভের কথায় কান দিলাম না। সারা রাত প্রবল বৃষ্টির পর ঝলমলে রোদ্দুর দেখে আমাদের সকলের মনটা খুশি ছিল। সেদিন দলবেঁধে ক্যাফে থেকে অস্ট্রিয়ান পেস্ট্রি, কেক আর কফি কিনে দারুণ ব্রেকফাস্ট খেলাম।
স্টিভ আমাদের জানাল যে আমরা এবার অস্ট্র্রিয়া ছেড়ে যুগোশ্লাভিয়ায় ঢুকব। যুগোশ্লাভিয়া সে সময় একটাই দেশ ছিল। দেশটা কেটে সাত টুকরো হয়নি। নব্বইয়ের দশকে সাত ভাগ হয়ে গেল -স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, বষনিয়া, মন্টেনিগ্রো, কসভো, নর্থ ম্যাসেডনিয়া।
যুগোশ্লাভিয়া থেকে এড্রিয়াটিক সাগরের ধার দিয়ে গ্রিস যাওয়ার আঁকাবাঁকা পথ। এবার আর মোটরওয়ের মতো একঘেঁয়ে রাস্তা ছিল না। রাস্তার একদিকে এড্রিয়াটিক সাগরের নীল জল, অন্যদিকে শস্যশ্যামল শাকসবজি আর ভুট্টার ক্ষেত। ফুলেফলে ভরা বসুন্ধরা। রাস্তার বাঁকে বাঁকে ছোট ছোট গির্জা যেন খেলাঘর। দুব্রোভনিক শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে চোখ ফেরাতে পারিনি।
যুগোশ্লাভিয়ায় আমরা পুরো দুটো দিন ছিলাম। প্রথমে রাজধানী বেলগ্রেডে তাঁবু ফেলেছিলাম, তারপর দক্ষিণে স্কোপিয়েতে। খুব ভালো আবহাওয়া পেয়েছিলাম বলে দিনের বেলা খেতখামারে ঘুরে বেড়াতাম। চাষিরা আমাদের আঁচল ভরে কচি ভুট্টা, কড়াইশুঁটি আর ক্যাপসিক্যাম দিত। এসবই ছিল তাদের অতিথিসেবা। সন্ধেবেলা আমরা ছ’জন প্যাকেটের শুকনো খাবারে টাটকা সবজি মিশিয়ে তাকে মুখরোচক করে খেতাম। দিনের বেলা দেখতাম পথের ধারে ঝাঁপিতে কোনো বৃদ্ধা নিজের হাতে তৈরি টাটকা খাবার বিক্রি করছে। কিনতে চাইলে হাঁড়িকড়াইয়ের ঢাকনা খুলে দেখাত। নানা ধরনের পাস্তা, মাংস আর টম্যাটো সস দেওয়া, আর ছিল মাংসের পুরভরা টম্যাটো, বেগুন আর ছোট ছোট কুমড়ো। খুব সামান্য দামে এই টাটকা খাবার পাওয়া যেত।
যুগোশ্লাভিয়ায় দুদিন থেকে আমরা বেড়ানোর আনন্দ পেয়েছিলাম। প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখার মতো হাতে সময় বা সুযোগ ছিল না। আমরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মানুষের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম।
যুগোশ্লভিয়ার এ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীর ধরে নামতে নামতে আমরা গ্রিসে পৌঁছে গেলাম। দূর থেকে অ্যাক্রোপোলিস আর পার্থানন দেখে আশা করেছিলাম এবার আমরা এ্থেন্সে নেমে প্রাচীনকালের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য দেখব। আমাদের হতাশ করে টিনের গাড়ি অ্যাক্রোপোলিসকে পাশ কাটিয়ে তরিৎ বেগে ছুটে চলল। আমরা তিনজন হায় হায় করতে লাগলাম। অন্যদের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। তারা গলা ফাটিয়ে এবার গান ধরল “উই অল লিভ ইন এ ইয়েলো সাব মেরিন”। ইউরোপের প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখার বা জানার জন্যে এদের উৎসাহের অভাব দেখে আমরা হতবাক।
এথেন্সের ক্যাম্পিং সাইটে একরাত কাটিয়ে দিনের আলো ফুটতেই আমরা ক্রিটের ফেরি ধরার জন্যে পিরাস বন্দরে এক লম্বা লাইনের শেষে গিয়ে দাঁড়ালাম। সরু ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে এক এক করে আমদের জাহাজে উঠতে হল। প্রায় কলকাতার ডবলডেকার বাসের মতো ভিড়। আমাদের সস্তার টিকিটে সিট ঠিক করা ছিল না। কয়েকজন বসার জায়গা পেয়েছিল। ফেরি পার হতে প্রায় দশ ঘণ্টা লাগবে শুনে আমরা পালা করে বসলাম। অন্য সময় ডেক-এ দাঁড়িয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে ইজিয়ান সাগরে ঢেউয়ের ওঠাপড়া আর ডলফিনের হাই জাম্প দেখলাম।
বেলা চারটের সময় ক্রিটের হিরাক্লিওন বন্দরে জাহাজ থামল। খুব সুন্দর আবহাওয়া। সূর্যের আলো আর উত্তাপে ক্রিটের সৌন্দর্য উপছে পড়েছিল। ক্রিটে আমাদের একবারে ইজিয়ানের তীরে তাঁবু খাটানোর জাায়গা পাওয়া গেল। সাগরের তীরের শক্ত পাথরের জমিতে আমরা তিনজন অনেক চেষ্টা করেও তাঁবু পুঁতে দাঁড় করাতে পারলাম না। গরমে গলদঘর্ম হয়ে অবশেষে তাঁবুর চারকোনায় চারটে পাথর চাপা দিয়ে দাঁড় করালাম। তারপর এক ঘুমে রাত কাবার।
ঘুম ভাঙল ভোর পাঁচটায়। চোখ মেলে দেখলাম ইজিয়ানের নীল জল দূর দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। সেখানে লাল হলুদের সমারোহ। ‘জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং’ দিবাকর উঠছেন। সাগরের তীরে সাজো সাজো রব। আমরা ছাড়া দলের সবাই সুইমিং সুট পরে কাঁধে রবারের হাল্কা ডিঙি নিয়ে জলে ঝাঁপ দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত।
আমরা তিনজন কখনও পুকুরে কি কলকাতায় লেকের জলে সাঁতার কাটিনি। ওদের সাঁতার দেখব বলে আমরা কোমরে শাড়ীর আঁচল জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। একজন কাউন্ট ডাউন শুরু করল – ফাইভ, ফোর, থ্রি, টু, ওয়ান, জিরো—ঝপাস্ করে সবাই জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হল জলের মধ্যে দাপাদাপি। তারপর কেউ সাঁতার কাটতে কাটাতে অনেক দূরে চলে গেল, কেউবা জলে ডিঙিতে ভাসতে লাগল। আমরা পাড়ে বসে এই দৃশ্য উপভোগ করলাম। অনেকে সাঁতার কেটে ক্লান্ত হয়ে জল থেকে উঠে তপ্ত ঘাসের ওপর কড়া রোদে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর চল্লিশ ডিগ্রি গরমে ঘেমে নেয়ে আবার জলে ঝাঁপ দিল। এই ছিল ওদের সকাল থেকে দুপুরের দিনলিপি। ওরা সূর্যের তাপে পুড়ে গায়ের রং বাদামি করতে এসেছিল। সূর্য ডুবে গেলে সাজগোজ করে দলবেঁধে ক্যাম্পিং সাইটের কাফেতে জমায়েত হত। সেখানে সুখাদ্য, কুখাদ্য, পানীয় শেষ করে গভীর রাতে তাঁবুতে ফিরত। অন্ধকারে নিজের তাঁবু খুঁজে পেত না।
প্রথম দিনেই বুঝতে পারলাম আমাদের সহযাত্রীরা ক্রিটে চার হাজার বছর আগের মিনোয়ান সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ দেখতে আসেনি। আমরা স্টিভের কাছে নসোসের প্রাসাাদ ও অন্যান্য প্রাচীন জিনিস দেখতে যাওয়ার জন্যে আবদার করলাম। অন্যদের উৎসাহের অভাব দেখে স্টিভ কী করবে ঠিক বুঝতে পারছিল না। আমরা তিনজন ক্রিটে তিনদিন থেকে দল ছেড়ে এথেন্সে গিয়ে তিন দিন থাকব ঠিক হল। এত দূরে এসে আমরা গ্রিক ও রোমান সভ্যতার স্থাপত্য ও ভাস্কর্য না দেখে ফিরে যাব হতেই পারে না।
স্টিভ সহজেই আমাদের এই আর্জি মঞ্জুর করল। এথেন্সে আমাদের ইটালির ভিসা করতে বলল যাতে আমরা ফেরার পথে ইটালির মধ্যে দিয়ে যেতে পারি। তারপর স্টিভ আমাদের সাবধান করে দিল, “ফেরার দিন তোমরা ঠিক বিকেল চারটের সময় অ্যাক্রোপোলিসের নীচে অপেক্ষা করবে। আমি তোমাদের তুলে নেব। গাড়ি বেশিক্ষণ থামতে দেবে না। তোমাদের না পেলে আমার চলে যেতে হবে।”
একটা বিরাট ঝুঁকি নিয়ে আমরা রাজি হয়ে গেলাম। একবারও ভেবে দেখিনি এথেন্সে আটকে গেলে কী করে ফিরে যাব। হাতে টাকাপয়সাও তেমন ছিল না।
আমরা চলে যাচ্ছি জেনে দলের সবাই এক বেলা নসোসের প্রাসাদ দেখতে রাজি হল। রতন ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিল। ওর ওপর সবাইকে জ্ঞান দেওয়ার ভার পড়ল। ভ্যানে করে নসোসের যাওয়ার রাস্তায় ও বলতে শুরু করল,
“যিশুখ্রিস্টের জন্মের ১৭০০-১৪৫০ বছর আগে নসোস হয়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ শহর। অন্যান্য মিনোয়ান শহরের চেয়ে শক্তিশালী ছিল নসোস। আমরা ছোটবেলায় নসোসের পৌরানিক রাজপ্রাসাদ সম্পর্কে রহস্যময় গল্প শুনেছি। এই প্রাসাদের ভিতরে ছিল এক গোলকধাঁধার মতো জায়গা যেখানে কিংবদন্তী জীব মাইনোটোরকে নির্বাসন দিয়েছিলেন রাজা মিনোস। মাইনোটরের ছিল ষাঁড়ের মাথা আর মানুষের দেহ। অত্যন্ত হিংস্র, ক্ষুধার্ত আর বদমেজাজি জীব।”
আমি খেয়াল করলাম অনেকে কানে হেডফোন লাগিয়ে চুপচাপ ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শুনছে। এসব মোবাইলে টিকটকের জন্মের অনেক আগের কথা। ভাগ্যিস্ রতন দেখতে পায়নি!
রতন থামেনি। বলেই চলল, “এথেন্সকে যুদ্ধে হারিয়ে রাজা মিনোস এথেন্সের কাছে দাবি করলেন প্রতি বছর সাতজন নারী ও সাতজন পুরুষ ক্ষুধার্ত মাইনোটরের জন্যে। এই রক্তবন্যা থামানো জরুরি হয়ে দাঁড়াল। এথেন্সের রাজকুমার থেসিয়াস সাতজন পুরুষের দলে যোগ দিয়ে ক্রিটে গেল।
ক্রিটে থেসিয়াসের রাজা মিনোসের মেয়ে আরিএডনির সঙ্গে দেখা হল। দেখা হতেই তার সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেল। থেসিয়াস মাইনোটরকে মারবে বলে গোলকধাঁধার ভিতরে যাবে ঠিক করেছিল। আরিএডনি থেসিয়াসকে একটা সুতোর বলের একদিকের সুতোটা হাতে দিয়ে বলল, “মাইনোটরকে মেরে সুতোটা ধরে গোলকধাঁধা থেকে বের হয়ে আসবে।” থেসিয়াস মাইনোটরকে মেরে সুতো ধরে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। ইংরেজ প্রত্নতত্ত্ববিদ আর্থার ইভানস মাটির তলা থেকে নসোসের প্রাসাদ খুঁড়ে উদ্ধার করেন।” এই পর্যন্ত বলে রতন থামল।
সেই এক বেলায় আমরা হাজার হাজার বছরের প্রাচীন মিনোয়ান সভ্যতার যেটুকু পেলাম চোখ ভরে দেখলাম। প্রাাসাদের দেয়ালে ছিল লাল, হলুদ, নীল, কালো উজ্জ্বল জলরঙের ছবি। দেয়ালে আঁকা ছবি পরে ফ্রেসকো বলে বিখ্যাত হয়েছে।
নসোসের প্রাসাদ দেখে সেদিন রাত্তিরের জাহাজে হিরাক্লিওন বন্দর থেকে এথেন্স রওনা হলাম। শেষ মুহূর্তে টিকিট কেটেছিলাম বলে দশঘণ্টা জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে কাটালাম। খুব ভোরে জাহাজ এথেন্সে থামল। আমরা তড়িঘড়ি করে নেমে হোটেল খুঁজতে চললাম। আমাদের সেদিন কপাল ভালো ছিল বলে বোধহয় কম খরচায় অ্যাক্রোপোলিসের কাছে ভালো হোটেল পেয়েছিলাম। হোটেলের ঘরে ঢুকে তিনটে সাদা ধবধবে বিছানা দেখে সটান শুয়ে পড়লাম। সাড়ে তিন সপ্তাহ পাথর আর কাঁকড়ের বিছানায় ঘুমাতে পারিনি। অঘোরে সাত ঘণ্টা ঘুমিয়ে যখন উঠলাম তখন দিন শেষ হয়ে এসেছে। আগের দিন বিকেলের পর আমাদের কিছু খাওয়া হয়নি। হোটেলের একতলার কাফেটেরিয়ায় এক প্লেট মুসাকা আর আলুভাজা খেয়ে প্রাণ জুড়াল। আর সময় নষ্ট না করে আমরা রাতের অ্যাক্রোপোলিস আর পার্থানন দেখে এলাম।
আমরা দিন গুনছিলাম। তিন দিনের এক দিন গেল। দ্বিতীয় দিন সকালে আমরা ভিসা করাতে ইটালির দূতাবাসে গেলাম। অচেনা শহরে রাস্তাঘাট চিনি না বলে ট্যক্সি করেই যেতে হল। অনেকটা পথ। ট্যাক্সি চলছে তো চলছেই। মিটারে ভাড়া উঠছিল লাফিয়ে লাফিয়ে। আমাদের পকেট খালি হয়ে আসছিল। প্রথম থেকেই হিসেবের বাইরে খরচ করছিলাম। দুপুর একটায় ইটালির দূতাবাসে পৌঁছলাম। দরজার গায়ে নোটিস ঝুলানো – ‘সিয়েস্তা দুপুর ১-৩’। তিনটের আগে খুলবে না দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এক গাদা পয়সা জলে দিয়ে ফিরে এলাম। সেদিন জানলাম ভূমধ্যসাগরের তীরের দেশগুলোতে দুপুরে ঘণ্টা দুয়েক কাজ থামিয়ে দিবানিদ্রার চল আছে। তার নাম ‘সিয়েস্তা’। পরের দিন দুপুরের আগে পৌঁছে ভিসা পেতে অসুবিধে হল না। হাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় ছিল। এথেন্সের কাছে ডেলফিতে এ্যাপোলোর মন্দির দেখে এলাম। এ্যাপোলো ছিলেন কবিতা, সঙ্গীত আর শিল্পের দেবতা। উনি তাঁর পুরহিতের মুখ দিয়ে মানুষের কাছে তাঁর দৈববাণী পাঠাতেন।
ডেলফি দেখে ফিরতে চারটে বেজে গিয়েছিল। আমরা অ্যাক্রোপোলিসির নীচে অপেক্ষা করছিলাম। আমাদের মনে তখন অজানা সংশয়। স্টিভ যদি থামতে না পেরে চলে গিয়ে থাকে? আমাদের চোখ গাড়ি আর মানুষের ভিড়ে টিনের ভ্যানটা খুঁজছিল। অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছিল না।
হঠাৎ স্টিভ ভিড় ঠেলে দৌড়োতে দৌড়োতে এসে বলল, “আমার সঙ্গে দৌড়ে যেতে হবে। গাড়ি অনেক দূরে রেখে এসেছি। এখানে থামতে দেয়নি। তোমরা তখন ছিলে না। ভাবছিলাম তোমরা হারিয়ে গেছ।”
অপরাধীর মতো স্টিভের পিছনে দৌড়লাম। স্টিভের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমরা কি দৌড়ে পারি? বকুনি খেতে খেতে ভ্যানে উঠলাম।
স্টিভ আমাদের খুঁজে পেয়েছে দেখে দলের সবাই দারুণ খুশি হয়েছিল। তারপর স্টিভ ফেরার পথ ধরল। ভ্যান সেই বৈচিত্রহীন মোটরওয়ে দিয়ে চলতে শুরু করল। এবার আর কেউ গান ধরল না। সবাই ক্লান্ত বিধ্বস্ত। ফেরার সময়টা আমরা ঘুমিয়ে কাটালাম, কখনও ভ্যনে, কখনও ক্যাম্পিং সাইটে।
ট্রেনে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া স্টেশনে ফেরার পথে চাঁদ বলল, “সস্তায় কতগুলো দেশ দেখলাম।”
আমি বললাম, “সস্তার তিন অবস্থা।” ও অবাক হয়েছে দেখে বুঝিয়ে বলতে হল, “টিনের ভ্যানে যাওয়া, তাঁবু খাটিয়ে থাকা আর শুকনো অখাদ্য খাবার। ভালো করে গ্রিস আর ক্রিট দেখা হল না সে কথাতো বাদই দিলাম।”