আগের লেখাগুলো- গল্প- ওই বাড়িটা , গল্প- সূর্যশেখরের ধাঁধা, গল্প চোর চোর, ভ্রমণ- বেইরুটের গপ্পো, ভ্রমণ- ফিলিপিনসের গপ্পো, ভ্রমণ- ইয়াঙ্কিদের দেশে দ্বিতীয়বার- সাউথ বাই সাউথ ওয়েস্ট,

(যাদের ভূতের গল্প না শুনলে ঘুম হয় না, তারা এ গল্প পড়বে। তবে অধিক ভয় পেলে আমার কিছু করার নেই। তবে ভয় পাবার নিয়ম এই; গল্পটা শব্দ আর অক্ষরে লেখা, কিন্তু ছবি দিয়ে মনে মনে তাকে দেখতে জানতে হবে। ছবিতেই আসল ভয় থাকে। রঙ, আলো, ছায়ায়।)
গা ছমছমে ভূতের গল্প কার না ভালো লাগে? কিন্তু আমাদের তো পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি তোলার হিড়িকে ভূতেরাও বাস্তুচ্যুত। তাদের কথা কেই-বা ভাবে। তা, মার্কিন দেশে কিন্তু ব্যাপারটা তেমন নয়। পুরোনোকেও নতুনের পাশাপাশি বেশ যত্ন করে রাখা-টাখা হয়। ভূতুড়ে বাড়ি, ভূতুড়ে গাড়ি—সবকিছু সাজিয়ে রেখে গা ছমছমে করে তোলা, এরকম একটা অভিজ্ঞতারই গল্প বলি এসো। তাইতেই তো আছে, তাই না, ভূতের ভয়ের শিরশিরে আনন্দ? ভূতুড়ে জিনিস, ভূতুড়ে স্যুভেনির সাজিয়ে রাখতে পেরেছিল বটে রুট সিক্সটি সিক্সের সেই গা ছমছমে দোকান।
সেই যে আগের বার লিখেছিলাম, দীর্ঘ রুট সিক্সটি সিক্সের গল্পটা? তো, এই তো ক’বছর আগেই, ইয়াংকিদের দেশে চিরু আর তার মা গিয়েছিল, গল্পে গল্পে সে-কাহিনি শুনেছ তো তোমরা। এবার তার পরের পর্বে বলি কয়েকটা ভূতুড়ে অভিজ্ঞতার কথা।
সেই ভূতুড়ে গাড়িটা
লম্বা রোড ট্রিপ, মানে গাড়িতে করে মাইলের পর মাইল পাড়ি। পথে যেমন তেল নেবার জন্য থামতে হয় ছোটো ছোটো পেট্রোল পাম্পে, ও-দেশে যাকে গ্যাস স্টেশন বলে, সেই সবের পাশেই থাকে ছোটো খাওয়ার জায়গা। আমাদের ধাবা আর ওদের ডাইনার। থাকে ছোটো দোকান, গ্যাস স্টেশনের নিজেরই। সেখানে কোক, লেমনেড, চুইং গাম, ল্যাবেঞ্চুশ পাবে; পাবে সিগারেট, খবরের কাগজের মতো নিত্য দ্রব্য; পাবে জলের বোতল— এসবই মার্কিনিদের খুব পছন্দসই জিনিস। কফি ভেন্ডিং মেশিন থেকে এক গামলা মতো কফি নেবে। গামলা মানে, ওই বড়ো টাম্বলার, যার মাথায় খয়েরি কাগজের ঢাকা পরানো। দোকানের পাশে আছে ‘বায়োলজিক্যাল ব্রেক’-এর জন্য জলযোগের পাশাপাশি জলবিয়োগের জন্যও মোটামুটি পরিচ্ছন্ন টয়লেট।
কিন্তু এইসবের পথে ট্যুরিস্টদের খপ করে ধরে ভূত দেখাবার আয়োজন? সে আবার কেমন? টেক্সাসের স্যান অ্যাঞ্জেলো হয়ে, রুট সিক্সটি সিক্স ধরে, নিউ মেক্সিকোর সান্তা ফে ছুঁয়ে, গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের দক্ষিণ বিন্দু ছুঁয়ে, আরিজোনার ফিনিক্স যাবার পথেই, একখানা ‘ওয়েস্টার্ণ’ ছবিতে দেখা চেনা চেনা সব চিহ্ন, স্মারক (যাকে সাদা বাংলায় লোকে বলে মেমেন্টো বা স্যুভেনির) … ইয়ে, মানে, কাঁটাতোলা বুট থেকে ল্যাসো, কঙ্কাল থেকে বন্দুক, ক্যাকটাস থেকে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের পাহাড়, এইসব আঁকা-ছাপা-লেখা মাগ, ফ্রিজ ম্যাগনেট, গলার স্কার্ফ, সানগ্লাস, টুপি বা ঘর সাজানোর জিনিস আর কি, কিনতে পারো এমনই দোকানে থেমেছিলাম আমরা।
দোকানের ভেতরে ঢুকে দেখা গেল একদিকে খাবারদাবারেরও মেলা। ওই ঠান্ডা জল, নরম পানীয়, আর স্যান্ডউইচ বা বার্গার জাতীয় খাদ্যের দোকান যেমন হয়। মিষ্টি মিষ্টি কেক, ডোনাট, চকোলেট, বা চিনিমাখানো, বাদাম দেওয়া বিস্কুট ও বেমিল নয়। সেসব বেশ খানিক কিনে ট্যাঁকে ভরে আমরা দোকানের বাইরে আসি। চার মক্কেল। চিরুর মাসি-মেসো, চিরুর মা ও চিরু।
খুউউব খিদে পেয়ে গেছে। বিশেষ করে গাড়ি চালাচ্ছে পালা করে মাসি-মেসো। তাদের তো আবার ম্যাপ দেখতে হচ্ছে, পুলিস চৌকির দিকে নজর রাখতে হচ্ছে, স্পিড লিমিটের কাঁটা এদিক-ওদিক হলেও হাজার কড়াকড়ি, বেজায় ফাইন। তা, সব্বার পেটে তখন ছুঁচোরা এক্সারসাইজ করছে ডাম্বেল নিয়ে। এই চত্বরে তাই খাবারদাবার নিয়ে বসে বেশ খানিকটা বার্গার আর ডোনাট, সঙ্গে ঠান্ডা নরম পানীয় উদরস্থ করে নিজেদের ট্যাংকিই ফুয়েল ভরার মতো আরাম যেই পাওয়া গেল, তখনই ভালো করে চোখ পড়ল চারপাশের রুক্ষ, প্রবলভাবে মরুভূমির মতন দৃশ্যটার দিকে। অনেক দূরে তাকালে যেটাকে বলে দিকচক্রবাল, সেইখানে তো পাহাড়ের পর পাহাড়ের সারি; পাহাড় মানে হিমালয়ের মতন মোটেই না। এই পাহাড় যেন ধূসর রুক্ষ মাটি থেকে সরাসরি চ্যাপ্টা চৌকো একটা দেওয়ালের মতো উঠে গেছে। যেন পাহাড়ের তিনকোনা মাথাগুলো কেউ কেক কাটার ছুরি দিয়ে কেটে দিয়েছে। এগুলোর নামই ফ্ল্যাট টপড মাউন্ড বা মেসা। অনেকটা ভূগোল বইতে পড়া মালভূমির মতোই তাই এরা। অনেক প্রাচীন শিলা, গায়ে আঁকিবুকি থেকে ভূবৈজ্ঞানিকদের তেমনই ধারণা। এগুলো নাকি ৭ থেকে ২৫ কোটি বছরের পুরোনো। সংখ্যাটার ধারণা চিরু অন্তত করতে পারেনি, তাই হাল ছেড়ে দিয়েছে।

সেই বিস্তৃত উঁচু প্রাচীরের মতন পাথুরে এলাকা, আর তার এদিক ওদিকে অজস্র কাঁটাগাছ, বুনো ক্যাকটাস দেখে চক্ষু সার্থক করতে-করতেই চিরুর খেয়াল হল, ওইখানে দোকানের বাইরে, রাস্তার ধারে একটা পুরোনো মতন গাড়ি রাখা। গাড়িটার রঙ জলপাই আর হলুদ ছিল এককালে। এখন সারা গায়ে ছোপ ছোপ জং ধরার দাগ। যেমন মিলিটারির জিপগাড়ি হয়, রোদে-জলে তার দশা খারাপ। যেন-বা বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহার হয়েছে! বা কাউবয়েদের নিয়ে চলত দুর্ধর্ষ দুশমনদের সঙ্গে মোকাবিলায়। এখন ধসে যাওয়া, অ্যান্টিক। কঙ্কাল গাড়ির মতন আকার আকৃতি। তবু গাড়িটা ওখানে রাখা কেন? এও কি তাহলে এক মেমেন্টো? একটা স্যুভেনির? চিরুর মা তখন পেট পুরে খেয়ে একটু ঝিমোচ্ছে। চিরু একাই গেল দেখতে গাড়িটা। কারণ, ততক্ষণে দূর থেকে দেখে একটা আন্দাজ হচ্ছে, গাড়ির ড্রাইভিং সিটে কে যেন বসে আছে। সত্যি নাকি, না চোখের ভুল? চিরু ভাবল। তেমন তো হবার কথা না। এই জং ধরা গাড়ির ভেতরে যেন ওরকম মিলিটারিমার্কা, সবজে হলুদ ছোপছাপ দেওয়া একটা পোশাকে ড্রাইভারও বসে আছে। কেন?
আরও কাছে গিয়ে কাচের ভেতর দেখবে নাকি? দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এ-গাড়ি যুগ যুগ ধরে চলে না। তাহলে?
বুক ধুকপুক করছিল। তবু সে কাচের ওপরের ধুলো হাত দিয়ে মুছে কাচে নাক ঠেকিয়ে দেখল। এ কি! ভেতরে জলপাইরঙা পোশাকে বসে আছে একটা কঙ্কাল! কী মারাত্মক! চোখে গর্ত, নাকে গর্ত। শুধু এক বত্রিশ পাটি বের করা হাসি।
আর যেই না গাড়ির গায়ে হাত ঠেকানো, চিরু লাফিয়ে পিছিয়ে এসেছে, কারণ কোথাও শোনা যাচ্ছে করোটির হাসি খলখল! কী দুষ্টু, কী দুষ্টু এই স্যুভেনির দোকানিরা। চিরুর হার্টফেল করিয়ে দেওয়া হাসির শব্দ রেকর্ডে বাজিয়ে দিয়েছে গাড়ির ভেতরে। যেই না সে জানালার কাচটা ধরে মুছেছে ধুলোটা, হয়তো কোন অদৃশ্য বোতামে চাপ পড়েছে। তাই!
এমন আঁতকে ওঠা, এরপর বার বার হবে। যেমন হুবহু মানুষের মূর্তির মতো সাগুয়ারো কাঁটাগাছ! মাথা আর দু-হাত শূন্যে তোলা। কোথায় দেখল চিরু? মেসোর সঙ্গে, অ্যারিজোনাতে, ফিনিক্স শহরে।
সাগুয়ারোর ভূত
মাসি-মেসো খুব হাঁটে, সাইকেল চালায়, এসব পার্কে সাগুয়ারো গাছেরা যেন বিশালাকৃতি এক-এক দৈত্য, হাত তুলে রয়েছে । মানুষের অর্ধেক তৈরি আর অর্ধেক প্রকৃতির তৈরি ট্রেইলে। মিড ওয়েস্টে তখন চড়া রোদ্দুর। মার্চের শেষ। চমৎকার হাওয়া। হাওয়াটা ঠান্ডা, গায়ে কেটে বসে। কিন্তু রোদ্দুর এমন চড়া যে মনে হয় বসন্ত বা গ্রীষ্মই বুঝি!
ট্রেলটা গোটাটাই পাহাড়ে। আপিসের পর এটা সে-দেশের চাকুরিজীবীর স্বাস্থ্যরক্ষার মূলধন। পার্কিংয়ে সবাই গাড়ি রাখছে আর হয় গাড়ির মাথা থেকে সাইকেলটা পেড়ে নিয়ে বাইকিং করছে, নয় হাঁটাহাঁটি। পোষা কুকুর সঙ্গে আছে কারও। কারোর আছে ছেলে বা মেয়ে। পাহাড়ে চড়ো। দেখো চারপাশে অসংখ্য হাত তোলা মানুষের মতো, কিন্তু মানুষের তিনগুণ আকার সাউয়ারো (বানান অনুযায়ী পড়লে সাগুয়ারো) ক্যাকটাস বৃক্ষ।
চিরু মেসোর সঙ্গে ট্রেক করছিল দিব্যি। হঠাৎ গা ছমছম করে। পেছনে কার ছায়া? তখন বিকেল। নিজের ও মেসোর ছায়াও দীর্ঘ হয়ে এসে পড়েছে রাস্তায়। তার ঠিক পেছনেই আর একজন ভূতুড়ে মতন দাঁড়িয়ে আছে না হাত তুলে?

গা শিরশির করে চিরুর। গলার পেছনে কাঁটার মতন ফুটে ওঠে ঘাড়ের রোম। কে? কে পেছনে। ঝট করে সাহসে ভর করে পেছনে তাকায়। দেখে, সাগুয়ারো কাঁটাগাছটা, যেটাকে সে দেখেছিল পাহাড়ের মাথায়, সে কখন হঠাৎ ঠিক পেছনে চলে এসেছে! ও মাই! ও মাই!
নাহ্, চোখের ভুল হবে বোধ হয়। কী করবে চিরু? চাদ্দিকেই তো সাগুয়ারো! তা বাদে, ছোটো ছোটো বদমাইশ বাচ্চার মতো বা গুঁড়ি মারা খোক্কসের মতো ক্যাকটাসের ঝোপ, অসংখ্য বুনো ঝাড়, হলুদ-সাদা ফুল ফুটে ওঠা নানাধরনের ঝোপ আশেপাশে আলো করে আছে। পাথরের চট্টানে পড়ে বিকেলের সোনালি রোদ্দুর ঝলকে উঠছে। শুষ্ক ঠান্ডা চমৎকার বাতাস বসন্তের। আর ক’দিন পরে ভয়ানক গরম পড়বে, উষ্ণতায় ফুটি ফাটবে। জল, জল করে অস্থির হবে তুমি। তবু সন্ধে সাতটা, সাড়ে সাতটা, আটটা, ন’টা অবধি সূর্য থাকবে এই উত্তর গোলার্ধে। অফিসের পর এসে যত খুশি শরীরচর্চা করো, পকেটে জলের বোতল রেখে অবশ্যই।
স্যান অ্যাঞ্জেলোর ট্রেল আবার ঈষৎ উচ্চাবচ, কিন্তু পাক দিয়ে আছে লেককে। এই হ্রদ শহরের মধ্যে একমাত্র জলা জায়গা। পরিচ্ছন্ন জল। চিকচিক করছে। পাশ দিয়ে দীর্ঘ সাপের মতো পাকিয়ে আছে পাকা রাস্তা। লেকের ধারে ধারে প্রাইম প্রপার্টি অনেক আছে। সেসব বাড়ির লোকেরা এ-রাস্তায় গাড়ি চালালেও দিকে দিকে নোটিস দিয়ে বলা আছে, এখানে রাইট অফ ওয়ে দিতে হবে জগার বা হাঁটিয়েদের। প্রত্যহ সন্ধ্যায় এই ট্রেলের মুখেও বড়ো পার্কিংয়ে গাড়ির সারি। মানুষ স্বাস্থ্যোদ্ধার করতে ঢুকে পড়ছে সে-পথে।
আর ট্রেল না
এর পর মিশিগানেও গেল চিরু। সেখানেও আবার প্রশ্ন—চিরু, তুমি ট্রেইলে যাবে?
আবার ট্রেইল? অনেক হাঁটতে হবে বুঝি?
না না, কাছেই। মানে আমাদের এখানে কাছেই একটা ট্রেইল আছে তো, হিউরন নদীর ধার দিয়ে দিয়ে। যাবে?
এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা। ভাই, ইয়ার্কি না। লাল বিপুল কোট পরে, তবু নদীর ধারে বিকেলে ঘুরতে গেল চিরু, মা, দেবুমামা ও তনিমামামির সঙ্গে। দেবাশিস ও তনিমা, ওরা থাকে মিশিগানে। তনিমা মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করে। কাছেই ডেট্রয়েট, যেখানে গাড়ি শিল্পের ধ্বংসাবশেষ এখন, জ্যান্ত গাড়ি কোম্পানিদের বিশাল বহুতলের পাশাপাশিই। ওটাও ভূতের শহর। বলা ভালো, গাড়ি ভূত বা বাড়ি ভূত৷
তবে ওরা তো থাকে গ্রামে। অ্যান আরবরে। বিলাসবহুল, মধ্যবিত্ত উচ্চমধ্যবিত্তের বাড়িঘর যা কিছু সুখের, আরামের, তা সব বড়ো শহরের ‘ডাউনটাউন’ থেকে অনেক দূরে। গাড়ি চালিয়ে কিলোমিটার ছয়-সাতেক গেলে তবে কাজের জায়গায় পৌঁছনো যায়। অন্যথা পাখির ডাক, কাঠবেড়ালির খুটুরখাটুর এসব নিয়ে, পর্চে এসে পড়া লালচে মেপল পাতার হেমন্ত, সাদা তুষারপাতের শীতকাল নিয়ে ওরা থাকে।
আর ছুটিছাটা পেলেই ট্রেইলে যায়। ভালোবাসে ট্রেইল। নিকটবর্তী বলতে ওই হিউরন নদীর ধার। একেবারেই ঘন গাছপালা জঙ্গল এখানে। কাঠের ছোটো ছোটো সেতু, বিশেষ যত্নে রাখা কাঁচা-পাকা রাস্তা, দু-ধারে স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক গাছপালা রাখার চেষ্টা হয়েছে। এই হল গে’ ট্রেইল। ছোটোদের খেলার জন্য একটা ছড়ানো গড়ানো বেড়াহীন পার্ক, বেঞ্চি মাঝে মাঝে। হাঁস চরছে, পাখি উড়ছে। লাল বুকের রবিন, অথবা লাল ডানার জ্যে পাখি।
হাঁটার পথে কোনও বেঞ্চি উৎসর্গীকৃত কারও মৃত ছেলে বা মেয়ের নামে। পাথরের ওপর লোহার ফলকে তার নাম। কারো-বা নামের সঙ্গে দু-কলি কবিতা। মিশিগানের শান্ত শীতল জঙ্গল, অতি যত্নে রক্ষিত। প্রাণে ঠান্ডা আঙুল বুলিয়ে দেয় তা। উইক-এন্ডে বাবা-মা যায় বাচ্চাদের নিয়ে, ঝুড়িতে আপেল ও স্যান্ডউইচ প্যাক করে নিয়ে, সারাদিনের পিকনিকে এইসব ট্রেইলে।
উত্তর আমেরিকাতে যখন শীতের চরম। মার্চের শেষ। ফিনিক্স, স্যান এঞ্জেলোর ট্রেইলে সাগুয়ারো ভূত দেখাও হয়ে গেছে চিরুর। কাজেই অ্যান আরবরের প্রবল দাঁত খিটখিটানো শীতের পর, বস্টনে গিয়ে যেই না আমাদের গৃহকর্তা ট্রেইলে যাবার উল্লেখ করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে না না, আমাদের ট্রেইল দেখা হয়ে গেছে বলে চেপে গেলাম। এখনও বরফ গলছে গত সপ্তাহের বরফ ঝড়ের, দিকে দিকে ভেঙে পড়ে আছে গাছ। এই কর্তার বাড়িতে দুটি ক্যানো রাখা। নদীতে রেগুলার যান গ্রীষ্মকালে ক্যানুইং করতে। আপাতত ট্রেইলে গিয়ে একঘণ্টা হেঁটে জমে-টমে যেতে পারি। ভেবে শঙ্কিত আমি।
ডেট্রয়েট, ভূতের শহর
মিশিগান অ্যান আরবর থেকে দেবাশিসরা শেষ অবধি নিয়ে গেল ভূতুড়ে গাড়িদের শহরে। একদা এই শহরটা গড়েই উঠেছিল নানা বিখ্যাত গাড়ি কোম্পানিদের কর্মীদের জন্য। ডেট্রয়েটে বিশ্বের প্রধান সব অটোমোবাইল কোম্পানির বিশাল কারখানা ছিল। এর মধ্যে ফোর্ড মোটর কোম্পানি, প্যাকোর্ড মোটর কার কোম্পানি এবং অ্যান্ডারসন ইলেকট্রিক কার কোম্পানি (ডেট্রয়েট ইলেকট্রিক) উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও, জেনারেল মোটরস এবং ক্রাইসলারের মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর সদর দপ্তর ও কারখানা এই অঞ্চলে এখনও আছে।
কিন্তু সে-শহরে চিরু যখন গেল, ওর মনে হল, রে ব্রাডবেরির গল্প মঙ্গলগ্রহের ডায়েরি থেকে উঠে আসা একটা ভিনগ্রহীদের শহর বুঝি। যেখানে ভিনগ্রহীরা সব লোপাট। পড়ে আছে শুধু এক সভ্যতার চিহ্ন!
রাস্তায় সিনেমা হলে সিনেমা হচ্ছে না, মিউজিক হল বন্ধ পড়ে আছে, গান বাজছে না, মানুষ ভিড় করছে না ক্যাফে বা ডাইনারে, পথচারীরা রাস্তায় চলাচল করছে না, গরম প্যানকেক ভাজার গন্ধ বেরোচ্ছে না কোথাও। ডেট্রয়েট নদীর ধারটা বাঁধানো, কিন্তু একটাও লোক নেই সেখানে। সব কী অদ্ভুত! শেষ পর্যন্ত সে-শহরের বাড়িগুলো শুধু পড়ে আছে, লম্বা লোহার খাঁচার মতন। রাস্তাকে রাস্তা, বাড়িকে বাড়ি জনহীন। অথবা কিছু সমাজবিরোধীর আড্ডাখানা, আশ্রয়স্থল সেগুলো। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ডেট্রয়েট ছিল বিশ্বের মোটরগাড়ি শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু পরবর্তীতে কোম্পানিগুলো কম খরচে উৎপাদনের জন্য কারখানাগুলো শহরতলি (Suburbs) এবং অন্যান্য দেশে সরিয়ে নিতে শুরু করে, যার ফলে ব্যাপক বেকারত্ব দেখা দেয়। কর্মসংস্থানের অভাবে ১৯৫০-এর দশকে প্রায় ১৮ লাখ মানুষের এই শহর থেকে মানুষ দলে দলে বাইরে চলে যেতে শুরু করে, যার ফলে অনেক এলাকা জনমানবহীন হয়ে পড়ে। যাদের হাতে টাকাকড়ি বেশি, সেই শ্বেতাঙ্গ ও ধনী নাগরিকরা শহর ছেড়ে শহরতলিতে চলে যেতে শুরু করে, যার ফলে শহরে বসবাসকারী নিম্নবিত্ত ও কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। জনসংখ্যা ও ব্যাবসার অভাবে শহরের কর আদায় ব্যাপকভাবে কমে যায়। অর্থাভাবে শহরের পরিসেবা ও আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং ২০১৩ সালে ডেট্রয়েট আমেরিকার ইতিহাসের বৃহত্তম মিউনিসিপ্যাল দেউলিয়া (Bankruptcy) শহর হিসেবে ঘোষিত হয়। হাজার হাজার বাড়ি, কারখানা ও স্কুল খালি পড়ে থাকে এবং অপরাধের হার বেড়ে যাওয়ায় শহরটার অনেক অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
চিরুর এবারও মনে হল, জায়গাটা ভূতুড়ে, ক্রাইসলার টাওয়ারের মাথায় উঠে আবার নেমে এসে চটপট ডেট্রয়েট মিউজিয়ামের দারুণ সব তৈলচিত্র আর মূর্তি দেখেই সোজা ফেরত যাবার ইচ্ছে চাগিয়ে উঠল তার। ঠিক উলটো রকম লাগল পুরোনো লাইব্রেরি যেতে। লম্বা আলোদানি নেমে এসেছে টেবিল অবধি, অজস্র পড়ুয়া, কিন্তু কোনও শব্দ নেই। সবাই নীরব, মনোযোগ দিয়ে বই পড়তে ব্যস্ত। বস্টনের পুরোনো লাইব্রেরি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের। বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড, আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম। চত্বরের চারপাশের লাল দেওয়ালের গায়ে ক্রিপার বা লতানে গাছ উঠে গেছে। ওখানে পড়তে পারা সহজ না। অনেক মেধাবীরাই শুধু সুযোগ পায়। কিন্তু তার লাইব্রেরি সবার জন্য উন্মুক্ত দ্বার। যে-কেউ চাইলেই যেতে পারো।
হার্ভার্ডের মাঠে এক আঠারো বছরের ছেলে একটা কাঠবিড়ালিকে খাবার খাওয়াচ্ছিল দেখে চিরুর মনে হল, এই তো ভালো, এই তো দারুণ। এক্কেবারে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দাও ভয়ভাবনাকে।
ফটোগ্রাফিঃ লেখক
জয়ঢাকের ভ্রমণ লাইব্রেরি