
এই লেখকের আগের লেখা- নীল কার্বন বাস্তুতন্ত্র, মহাকাশযাত্রীদের পোশাক পরিচ্ছদ, জীবন্ত বেড়া, বিপন্ন মেরুভল্লুক, গ্রিন মাফলার, বিজ্ঞানের কথক ঠাকুর, পতঙ্গ অনুপ্রাণিত প্রযুক্তি
ভোরের আলো তখন ঠিকমতো ফোটেনি। মাঝ জঙ্গলে ভীমবেঠকা পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে ছিল কিশোর অভি ও তার স্কুলের বন্ধুরা, আর তাদের বিজ্ঞান শিক্ষক। শিক্ষামূলক ভ্রমণে তারা এসেছে প্রাচীন গুহাচিত্র দেখতে। গুহার অন্ধকার মুখটা দেখে অভির মনে হল, এ যেন সময়ের দরজা। স্যার বললেন, “এই গুহায় ঢুকলে তুমি শুধু ছবি দেখবে না, বরং হাজার হাজার বছরের পুরোনো মানুষের জীবনকেও ছুঁয়ে দেখবে।”
অভি আলো ফেলে যখন দেওয়ালের দিকে তাকাল, মুহূর্তে চমকে উঠল সে। চিত্রে দেখা যাচ্ছে, দলবেঁধে শিকার করছে মানুষ, প্রাণীরা দৌড়চ্ছে, কোথাও নৃত্য করছে বিভিন্ন আদিম মানব গোষ্ঠী। এ ঠিক যেন চলমান জীবনের নানা গল্প। গুহার শীতল বাতাসে দাঁড়িয়ে স্যার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন ভারতের গুহাচিত্রের নানা বিস্ময়।
স্যার বললেন, “এই গুহাগুলো কেবল ছবি আঁকার দেওয়াল নয়। এগুলো হল প্রাচীন মানুষের বিজ্ঞান ল্যাবরেটরি। এখানে তারা প্রথম এঁকেছিল পশুর ছবি, বিভিন্ন অস্ত্রের ব্যবহার, আকাশের ছবি, ঋতুচক্র ও দলগত জীবনের ছবি।”
তিনি বলে চললেন, “চিত্র মানে শুধু সৌন্দর্য নয়; চিত্র হল পর্যবেক্ষণ, ভাবনা আর জ্ঞানের ঐতিহাসিক দলিল।”
তারা বিস্ময়ে ছবিগুলো দেখছিল। স্যার বললেন, “মানুষের মস্তিষ্ক যখন ভাবতে, পরিকল্পনা করতে ও কল্পনা করতে শিখল, তখনই এধরনের ছবি আঁকা সম্ভব হল। তাই গুহাচিত্র মানুষের বুদ্ধির বিবর্তনের পরিচ্ছন্ন এক প্রমাণ।”
ভীমবেটকার গুহায় জীবনের গল্প
উৎসাহী ছাত্ররা এগিয়ে গিয়ে আর একটি দেওয়াল দেখল। সেখানে বড়ো একটি হরিণ ও তার সামনে তির-ধনুকধারী মানুষের ছবি দেখল। তারা তখন একত্রে জিজ্ঞাসা করল, “স্যার, ওরা কি খাবারের জন্য শিকার করত?”
“হ্যাঁ।” স্যার বললেন, “এগুলো প্রায় ৩০,০০০ বছরের পুরোনো। সেই সময়ে মানুষ পশুপাখির চলন, আচরণ, শিকার করার কৌশল সব নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করত, যেটা আসলে হল প্রাথমিক জীববিজ্ঞান। তারা জানত কোন প্রাণী কখন কোথায় থাকে। সেটাই তারা রঙে রঙে আঁকত গুহার দেওয়ালে।”
ছাত্ররা অবাক বিস্ময় দেখল চারকোলে আঁকা কালো রঙ, লাল রঙে বড়ো বড়ো চিত্র, আবার কোথাও তার ওপর সাদাটে রেখা।
স্যার বললেন, “দেখো, লাল রঙ এসেছে লোহার গুঁড়ো থেকে, কালো এসেছে চারকোল আর ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইড থেকে, সাদা এসেছে অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের কাওলিনাইট থেকে। এ থেকে প্রমাণ হয়, প্রাগৈতিহাসিক মানুষ খনিজ রসায়ন জানত না ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করত ও বৈজ্ঞানিকভাবে সেখান থেকে রঙ তৈরি করত।”
শিক্ষার্থীরা তাদের স্যারকে জিজ্ঞাসা করল, এত পুরোনো রঙ এতদিন কীভাবে টিকে আছে? স্যার তাদের উত্তরে বললেন, “কারণ, গুহার ভিতরে আলো কম, আর্দ্রতা কম আর রঙগুলো রাসায়নিকগতভাবে কম বিক্রিয়াশীল।”
অজন্তা শিল্পের সঙ্গে জ্ঞানের মিশেল
এরপর স্যার তাদের গল্প শোনালেন অজন্তা গুহার চিত্রকথার।— “অজন্তা শুধু শিল্প নয়, প্রযুক্তির এক অনন্য উদাহরণ। প্রাচীন শিল্পীরা প্লাস্টারের বহু স্তর দিয়ে দেওয়াল তৈরি করত, তারপর খনিজ পদার্থের রঙ মিশিয়ে ছবি আঁকত। রঙ মেশানোর এই বিজ্ঞান পৃথিবীর ইতিহাসে খুবই উন্নত স্তরের।”
তারা কল্পনায় অজন্তার সেই উজ্জ্বল চিত্রগুলির কথা মনে করতে লাগল। বৌদ্ধদের জীবনের গল্প, নৃত্য, সংগীত, রাজকুমারীর মূর্তি—এসবই যেন অন্ধকারের ভেতর এক-একটি নতুন আলোর রেখাস্বরূপ।
দক্ষিণ ভারতের গুহাচিত্র এবং স্থানীয় বিজ্ঞান
শিক্ষক মহাশয় বললেন, “দক্ষিণ ভারতের গুহাচিত্র আবার আলাদা ধরনের। সেখানে মাটি, বিভিন্ন গাছের রস ও চারকোল মিশিয়ে বিভিন্ন রঙ তৈরি করা হত। সেখানে আঞ্চলিক খনিজের ব্যবহার করা হত। এইগুলি এদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পরিচয় দেয়।”
তামিলনাড়ু ও কেরালার গুহাচিত্রে পাওয়া যায় নৌকা, প্রাচীন কৃষিকাজ ও বিভিন্ন দেবদেবীর চিত্র। এছাড়াও দলগত উৎসবের ছবিও পাওয়া যায়, যা থেকে জানতে পারা যায় সেখানকার মানুষদের প্রখর আঞ্চলিক জ্ঞানের কথা।
গুহার দেওয়ালে প্রাণীবৈচিত্র্য
ভারতের নানা অঞ্চলের গুহাচিত্রে বিভিন্ন প্রাণীর চিত্র পাওয়া যায়; যথা— গৌর, হাতি, মহিষ, গণ্ডার, বাঘ, সিংহ, হরিণ ও বিভিন্ন পোকামাকড় ইত্যাদি। তিনি বললেন, “এই ছবিগুলো দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝেছেন তখনকার পরিবেশ কেমন ছিল। যেখানে গণ্ডারের ছবি আছে, সেই অঞ্চলটিতে একসময় তৃণভূমি ও সেই সঙ্গে জলাভূমিও ছিল। যেমন বর্তমান সময়ে আসামের কাজিরাঙ্গা জঙ্গল। যেখানে বন্য মহিষের ছবি ছিল, সেখানে ছিল তৃণভূমি। এগুলো আজ কিন্তু পরিবেশ গবেষণায় দারুণ কাজে দেয়।”
এই কথাগুলি তাদের চোখে জীববিজ্ঞানের নতুন এক দুনিয়া খুলে দেয়।
গুহাচিত্রে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ছাপ
গুহার আর এক দেওয়ালে সূর্যের মতো চিহ্ন দেখে উৎসাহী ছাত্ররা তাদের স্যারকে জিজ্ঞাসা করল, “এটা কি সূর্যের চিত্র, স্যার?”
স্যার হাসলেন। বললেন, “হ্যাঁ, প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চার বহিঃপ্রকাশ এই চিত্রগুলি। বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানীরা কার্বন ডেটিং, রমন স্পেকট্রোস্কপি, এক্স-রে ডিফ্রাকশন এবং লেজারের থ্রিডি ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে অনেক চিত্রকে পরিষ্কারভাবে উদ্ধার করেছেন এবং তাদের বয়স ও সময়কাল সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছেন। এসব প্রযুক্তি, রঙের উৎস, শিলার বয়স ও মানব হস্তের স্পর্শ বিশ্লেষণ করতে পারে।”
এই কথাগুলি ছাত্রদের মনে গভীর রেখাপাত করে এবং তারা ভাবতে থাকে, প্রকৃতপক্ষে গুহাগুলি যেন এক-একটি বিরাট বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার।
স্যার দেওয়ালের নাচের দৃশ্য দেখিয়ে বললেন, “দেখো, এরা একসঙ্গে নাচছে। এর মানে এদের একটি সুস্থ সামাজিক জীবন ছিল। মিলেমিশে থাকা, সহযোগিতা ও আনন্দ—এইসব ছিল মানবসমাজ গঠনের প্রাথমিক ধাপ। গুহাচিত্রে আমরা সেই সমাজেরই গল্প পাই।”
গুহাচিত্র রক্ষার বিজ্ঞান
গুহাচিত্র আজ নানা কারণে বিপন্ন; যথা—জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্ব উষ্ণায়ন, পর্যটকদের শ্বাসের আর্দ্রতা ইত্যাদি রঙগুলিকে দুর্বল করে। মানুষের হাতের স্পর্শে ছত্রাক ও জীবাণু সেখানে বাসা বাঁধে, আলো ও ক্যামেরার ফ্ল্যাশও এদের ক্ষতি করে। তাই বিজ্ঞানীরা এই চিত্রগুলির সংরক্ষণে জোর দিচ্ছেন। বায়োকনসারভেশন, নিয়ন্ত্রিত আলোকের ব্যবহার, কম আর্দ্রতা বজায় রাখা ও 3D ডিজিটাল আর্কাইভ ইত্যাদি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গুহাচিত্রকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রক্ষা করা হচ্ছে।
গুহা থেকে বের হওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা বিস্ময়ে চুপ করে যায়। স্যার তখন তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “কী ভাবছো তোমরা?”
তারা আবেগ বিহ্বলভাবে বলল, “স্যার, মনে হচ্ছে আদিম মানুষেরা কেবল ছবি আঁকেনি, বরং এরা তাদের জীবনের গল্প, বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণ আর বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের স্বাক্ষর রেখে গেছে অন্ধকার, রহস্যময় এই দেওয়ালগুলিতে।”
স্যার হাসলেন। বললেন, “ঠিক তাই। ভারতের গুহাচিত্র শুধু শিল্প নয়, মানুষের প্রথম বিজ্ঞানচর্চার জীবন্ত দলিলও। এদের রক্ষা করার দায়িত্ব তোমাদের মতো নতুন প্রজন্মের।”
জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর