গল্প-ভবনাথের ভাবনা-জয়তী রায়-শরৎ-২০২৫

জয়তী রায়ের আগের গল্প- চোখ, গজুমামা জিন্দাবাদ, আলোর কৌটো , আলো আসবে, গজুমামা ও গুহা রহস্য, উড়ন্ত কাকু আর গজুমামা , দোষ নেই, একটি সরেস দিন

ভাবনায় জর্জরিত হয়ে পড়ছেন ভবনাথ চৌধুরী। তিনি জঙ্গবাজ লোক। সর্বদা যুদ্ধং দেহী মনোভাব। পূর্বপুরুষ উপাধি পেয়েছিল রায়বাহাদুর। সে কি আর কেউ মনে রাখে না কি ভাঙিয়ে দু’টাকার চানাচুর মিলবে? বাড়ির ঠকখানায় দেওয়ালে গাদা বন্দুক আর বাঘের মাথার সঙ্গে টাঙানো আছে দাদু রায়বাহাদুর  বিভূতি নাথ চৌধুরীর তৈল চিত্র। দাদুর সঙ্গে ভবনাথের চেহারার বেশ মিল আছে। চেহারাটি খাসা। মাথায় ঘন শাদা চুল। টকটক ফর্সা রঙ, বড় বড় চোখ, নাকের নিচে পুরু গোঁফ, মোটাসোটা চেহারার সঙ্গে মানানসই পাঁচনম্বর ফুটবল  সাইজের ভুঁড়ি। ষাট বছরে চামড়ার ভাঁজ পড়লেও দাঁত পড়েনি। এমন একখানি চেহারার সঙ্গে হাঁক ডাক শুনলে এলাকার লোকের ভয় খাওয়া উচিত কিন্তু খায় না। উল্টে পিছনে লাগে। দূর থেকে দেখলেই ক্ষ্যাপায়, ‘ওই আসছে রে! কেটে পড়ি। গল্প শুনতে হবে।’

জায়গাটা ছিল গ্রাম। এখন শহর-গঞ্জ এলাকা। নদী আছে। ওপারে জঙ্গল আছে। সেখানে মাকালীর  মন্দিরে যায় পুজো দিতে। অনেক অনেক আগে বাঘ দেখা দিত। জঙ্গলে ঢুকতে ভয় পেত লোক এখন জঙ্গল লোকের ভয়ে, মোবাইলের ক্লিকের ভয়ে ফাঁকা হতে শুরু করেছে। লোকজন চালাক-চতুর। দোকান পাট, শপিং মল, শহুরে ক্যাফে গজিয়ে উঠছে ব্যাঙের ছাতার মত। হাতে হাতে মোবাইল ঘুরছে, বাচ্চাগুলোর মুখে সবজান্তা ভাব। গল্প শুনতে চায় না কেউ। উল্টে বলে, “দূর। রায়বাহাদুর খেতাবের কথা বলবেন না। দুয়ো খাবেন। ইংরেজদের পা চাটা বলবে। হ্যাঁ, চা-শিঙাড়া খাওয়ালে বাঘ মারার গুলটা শুনতে পারি।”

ভবনাথ রেগে কাঁই হয়ে পাকা কাঁঠাল রঙের মুখ তোম্বা করে বলেন, “বাঘ শিকারের গল্প গুল?”

লোকটা নিশ্চিন্ত মনে উল্টো পথে হাঁটা দিতে দিতে বলবে, “আপনি দেখেছেন বাঘ শিকার? দেখেননি। না দেখা গপ্প চালাতে হলে মালকড়ি খসাতে হয়।”

লোকের চোখে হাসির খোরাক হচ্ছেন বুঝেও ভববাবু থামতে পারেন না। পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া বিরাট বাড়িটা ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই। সোনা দানা জমি সম্পত্তি কিচ্ছু নয়। দেখভালের অভাবে লোহার গেটে মরচে পড়েছে, দুই পাশের  থামের উপর সিংহদের ল্যাজ ভাঙা, ভিতরের বাগানে আগাছার সঙ্গে বড়ো বড়ো ফলের গাছে পাখির সঙ্গে আছে বাদুড়, সাপ আরো কত কী!  সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। পেনশন আছে। ঘরে বৌ আছে। হরেক রকম অসুখ-বিসুখ জ্বালা-যন্ত্রণা আছে নিঃসন্তান ভবনাথের। সুখের মধ্যে শান্তির মধ্যে আছে অতীতের কিছু সুখের গল্প। বলতে না পারলে পেটের মধ্যে পাক খায়, গুড়গুড় করে, মাথা ধরে, অরুচি আসে। গল্পটা বলে ফেললেই মন ঝরঝরে।  সমস্যা নেই। ভাঙাচোরা বাড়ি, ঘরের অর্ধেক তালা বন্ধ, রাতের বেলা ভৌতিক পরিবেশ… সব তুচ্ছ হয়ে যায়। প্রোমোটার হরেনের চোখ রাঙানি অস্বীকার করে দাদুর মতই হাঁকিয়ে বলে ওঠেন, “দেব না জমি। যা পারিস করিস।”

এমন হতেই পারে। কিন্তু, হয় না। গল্প কেউ শোনে না। শুনতে চায় না।

শরৎঋতুর আগমন বার্তার মধ্যে ভেসে বেড়ায় উৎসবের সুবাস। নীল আকাশ। পেঁজা মেঘ। এলাকায় প্যান্ডেলের বাঁশ পড়েছে। উদ্বোধনে মন্ত্রী আসবে। সুখ উড়ছে বাতাসে। গোল হয়ে বসে আড্ডা চলছে এদিক সেদিক। নিবারণের চায়ের দোকানে, পাড়ার ক্লাবের সামনের উঠোনে, বাজারে, নদীর ধারের বটগাছের বাঁধানো বেদীতে। জমায়েত দেখলে ভববাবুর চোখ চকচক, গল্পগুলো ঘাই মারে। বুড় বুড় বুড় বুড় উঠে আসতে চায় গলা বেয়ে। রসিয়ে বসে হাত পা নেড়ে চোখ বড়ো বড়ো করে বলবেন, “দাদুর ছিল ইয়া এক ঘোড়া। কুচকুচ কালো ঘোড়া চেতকের মাথায় রেশমি ঝালরের মতো কেশর। চাবুক হাতে নিয়ে সাহেবি পোশাক পরে দাদু চড়ে বসতেন ঘোড়ায়। সে কী রূপ! যেন রাজা-বাদশা। সেই ঘোড়া একদিন মারা গেল বন্দুকের গুলি খেয়ে।”

এলাকার যুবসমাজের নেতা বিষ্ণুপদ  রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলবে, “ভব দাদু, এই গল্পটা শুনে শুনে তিরিশ বছরে পা দিলাম। আজকের ইয়ং জেনারেশনের জন্যে অন্য গল্প ছাড়ুন। আপনার দাদু দেখুন গে অন্য গ্রহে এলিয়েন হয়ে গেছে সেই নিয়ে বলুন দেখি।”

“বানিয়ে? মিথ্যে বলব?”

বিষ্ণুপদ মোলায়েম হেসে বলে, “রায়বাহাদুরের কীর্তি চোখে  দেখেননি।  শোনা কথা বলছেন, জল মেশাতে হচ্ছে কিনা, বুকে হাত দিয়ে বলুন দেখি? ইয়া বড়ো বন্দুক, ইয়া বড়ো ঘোড়া, হেই ছুটে গেল হুই বাঘ মরল! সুপারম্যানের গল্প যদি বলতেই হয়, দাদুকে ছেড়ে আজকাল যা চলছে তাই বলুন।”

গ্লাসে চামচ নাড়তে নাড়তে নিবারণ  দুঃখের গলায় বলে উঠল, “ভববাবু, আপনের বড্ড  কষ্ট। লোকে এত ঠাট্টা করে! চা-সিঙ্গাড়া খাইয়ে গল্প শোনাতে গেলে ফতুর হয়ে যাবেন।”

সাঁ করে বাইক স্টার্ট দিতে দিতে কলেজের ছাত্র  অঙ্কুর আইডিয়া উড়িয়ে দেয় কাশফুলের মতো, “চেতক ঘোড়া বাদ দিন, মহাকাশ যান করে এলিয়েন নামিয়ে আনুন।”

ভবনাথ ভাবিত। গলা নেমে গেছে খাদে, “কিন্তু…”

“আবার কিসের কিন্তু?”

“দাদুর আত্মা যদি রাগ করেন?”

অঙ্কুর বলে ওঠে, “ভূত? তল্লাটে নেই। বাঘ, গাছ, ভূত সব হাওয়া। আপনি নিশ্চিন্তে এলিয়েনের গল্প বানিয়ে দিন।”

“বিদেশি এলিয়েন থাকতে পারে আর দেশি ভূত থাকবে না?” চেঁচিয়ে ওঠেন ভব বাবু, “জানো, চেতকের মৃত্যু হয় দাদুর হাতে। এক গরিব চাষীকে এইখানেই বেধড়ক পেটাচ্ছিল সাহেব। চেতক ঝাঁপিয়ে পড়ে খুলি ফাটিয়ে দেয়। দাদু চালিয়ে দেন বন্দুক। চেতক মরে যায়। দাদু পেয়ে যান রায়বাহাদুরের খেতাব।”

দোকান সুদ্ধু লোক চেঁচিয়ে উঠে চায়ের গ্লাস উল্টে যাচ্ছিল প্রায়। এটা একটা বলার মত গল্প? ছিঃ ছিঃ।
 ভববাবু মুখ নীচু করে ভাবতে থাকেন। ভেবে ভেবে থই হারিয়ে যায়। এমন একটা বাজে কাজ কেন করলেন বিভূতি নাথ?

ভাবনায় আকুল হয়ে ভববাবু এসে বসলেন নদীর ধার ঘেঁষে বটগাছের নীচে। দূরের গাছ-পাতলা জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ল দাদুর বাঘ শিকারের গল্পটা। বিরাট বাঘ নাকি জল পেরিয়ে ঢুকে পড়েছিল গ্রামে। ছোটাছুটি আতঙ্কের মাঝে গুড়ুম গর্জে ওঠে দাদুর বন্দুক। সেই বাঘটির মাথা রাখা আছে? নাকি সেটাও গুল?

বিকেল থেকে লোকজনের ধাতানি খেয়ে খেয়ে সন্ধ্যায় বটগাছের বাতাসে আরাম হল। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে দেখলেন নদীর বুকে জেগে উঠেছে মাটির চর। কাশ ফুলে ভরে গেছে চরাচর। জায়গাটা কেমন যেন ভেজা রুটির মত প্রাণহীন। নদী আগের মত জলভরা নেই। জঙ্গল নেই গাছে ভরা। কিছুই নেই আগের মত সুন্দর। সন্দেশে স্বাদ নেই। গুড়ে ভেজাল। মাছগুলো তাজা নয়। কত আর ভালো লাগে নেই নেই শুনতে? ওই পুরোনোকালের গল্প বলতেন, স্বপ্নের মত ফুটে উঠত অতীত। সোনার অতীত। সেই সেবারে… দুগ্গাপুজোর আগে আগে… আনন্দ নয়, নেমে এসেছে ভয়। বেশ কিছুদিন ধরে শুরু হয়েছে মানুষখেকো বাঘের উৎপাত। দাদু একদিন মেরে এলেন সেই বাঘ। জন্মের আগে ঘটেছিল বলে শুনেছে গল্প আর পুষে রেখেছেন মনের ভিতর পরম আদরে। বনেদি বংশের দাপট নেই কিন্তু গল্পগুলো আছে। মনের সিন্দুক থেকে পাখা মেলে গল্প। নায়ক একজন জাঁদরেল দাদু, হাতে রুপো বাঁধানো লাঠি, বন্দুক তাক করছেন বাঘের দিকে। জল তোলপাড় করে এগিয়ে আসছে ডোরাকাটা যমদূত, সে কী গর্জন! সে কী দাপট। গ্রামশুদ্ধু লোক দূরে দাঁড়িয়ে থরহরি কাঁপছে। দাদুর ভয় নেই। নিখুঁত নিশানায় গর্জে উঠল বন্দুক। জলের মধ্যে পড়ে গেল বাঘ। জয় জয় উঠল গ্রাম ঘিরে। ধুমধাম দুর্গাপুজো হল মনের আনন্দে।
 ভবনাথ চোখ মুছলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে বিরাট বাড়ি আর ঝলমলে গল্প… এইটুকুই ছিল সম্বল। সেখানেও ফাঁকি? গুল মারলেন দাদু?

“কে বলল গুল দিয়েছি?”

গায়ের চাদর উড়ে গেল কনকন বাতাসের ঝাপটে, উটকো বিদঘুটে আঁধার ঝাঁপিয়ে পড়ল ফটাস, ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে কানের পর্দা চিরে হুঙ্কার দিয়ে উঠল বাঘের মত গলা! তাকিয়ে দেখে আত্মারাম খাঁচা ছেড়ে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলেও ভবনাথ সিধে বসে রইলেন। উল্টে মেজাজ খারাপ করে ত্যাড়া গলায় বললেন, “এসে ধন্য করেছেন। ভূত হয়ে এসেছেন?  লোকে সেটাকেও গুল ভাববে এমনই আপনার মহিমা।”

রায়বাহাদুর দাদু ভূত থতমত খেয়ে পাশে বসতে বসতে নরম গলায় বললেন, “আহঃ। রেগে যাচ্ছ কেন ভবু?  চেতক মেরেছিল এক সাহেব। ক্ষ্যাপা ইংরেজ জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল আমার ঘোড়াকে। নিজে হাতে গুলি করে মুক্তি দিয়েছি। রায়বাহাদুর উপাধির জন্যে নয়।

গজগজ করতে করতে ভবনাথ বললেন, “আর বাঘ?”

“বাঘ মরেছিল তাই তো ছবি এল, মাথা টাঙানো রইল।”

ভববাবু একটুও পাত্তা না দিয়ে নিমতেতো গলায় বলে, “মেরেছিলেন আপনি? সত্য বলুন।”

রায়বাহাদুর কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, “না মানে… মেরেছিল তারিণী।”
 “কে তারিণী?”

“আমার বিশেষ বন্ধু।”

ভবনাথ আবারো খিঁচিয়ে উঠে বলেন, “চেতক সাহেব মারল, তারিণী বাঘ মারল। আপনি তবে করলেন কী?  লোকজন গুল ধরে ফেলছে দাদু। এখনকার দিন হলে রায়বাহাদুর উপাধি পেতে হত না।”

ভূতদাদু কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “আরো আছে।”

ভবনাথ মাথায় হাত দিয়ে ভুঁড়ি দুলিয়ে তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে বললেন, “এরপরেও? এতেই আমি কাহিল হয়ে যাচ্ছি।”
 “তোমার ভাবনা দেখেই তো ছায়াশরীরে নীচে এলাম।”

হতাশ ভবনাথ বললেন, “তাতে আমার কি মোক্ষ লাভ হল?”

দাদুর ছায়া শরীর হঠাৎ হয়ে উঠল লম্বা দড়ির মত। সেই দড়ি ঝুলতে ঝুলতে দুলতে দুলতে নদীর জলের উপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, “তোমায় নিয়ে যারা হেসেছে, তাদের গলা টিপে দিয়ে আসব। মজা বুঝবে।”

মুখখানা প্যাঁচার মত করে ভবনাথ বললেন, “ভয় পাবে না কেউ। উল্টে জেলে পুরবে আমায়। আপনি বরং কুকীর্তিগুলি ফাঁস করুন। ভুলভাল আর বলতে চাই না। চিন্তায় আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।”

মানুষের রূপ ধরে দাদু ফের পাশে বসে বললেন, “নাহ্। ভূতেদের দুর্দশার সীমা নেই। কেউ ভয় পায় না। পাত্তা দেয় না। যাক গে বাপু, একটি মাত্তর নাতি আমার, তোমার কাছে স্বীকার করি, দোষ ত্রুটি ছিল। ভূত বলে কি অনুতাপ হয় না? বাঘ মারার দরুণ মেডেল প্রাপ্য ছিল তারিণীর।”

“সেটাও গাপ করেছেন?” আর্তনাদ করে ওঠে ভবনাথ।

“আহহহ শোনো শোনো। গাপ বলো আর গুল দেওয়া বলো, সেকালেও ছিল একালেরও আছে। অনুতাপ করলে বা দোষ স্বীকার করলে অপরাধ কমে যাবে না? কি বলো?”

ভবনাথ বললেন, “ছায়া হয়ে দোষ স্বীকার করে লাভ হবে ঘণ্টা। তারিণীবাবুর পরিবারকে ফিরিয়ে দিতে হবে মেডেল। অর্থ মূল্য ছিল নাকি?”

আমতা আমতা করে ভূত দাদু বলেন, “ওই অতি সামান্য।”

“কত?”

“এখনকার মূল্যে হাজারদশেক হবে।”

“দ-শ -হা-জা- র? আপনি মেরে দিলেন?”

দাদু দুঃখিত গলায় বললেন, “আর কত গাল দেবে ভবু? তারিণীর বাড়ি যাবে? সেখানে গিয়ে মেডেল ফিরিয়ে দেব।”
 “আর টাকা?” আর্তনাদ করে ওঠেন ভববাবু, “পুজোর সময় কোথায় পাব অতো টাকা?”

“মেরে দাও। টাকাটা মেরে দাও।”

“কভি নেহী। ঘরবাড়ি বেচে হলেও ফেরৎ দেব।”

“ঘরবাড়ি বেচে দেবে? বলি, রায়বাহাদুরের নাতি নাকি পুরুতমশাই? কোনটা তুমি?”

ভববাবুর শরীর জ্বলে যাচ্ছে রাগে। রাগের চোটে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “শুনুন, দুর্গাপুজো উদ্বোধন করতে মন্ত্রীমশাই আসবেন। মেডেল তুলে দেব তারিণীবাবুর পরিবারের হাতে। সঙ্গে দশহাজার টাকা, আর… আর…”
 গলা ভেঙে এল ভববাবুর। একমাত্র সম্পদ, অতীতের গল্পগুলো… মুছে ফেলব। আর বলব না। কোনোদিন না!”
 ***

পুজোর প্যান্ডেল উদ্বোধন হয়েছে। মন্ত্রীমশাই ভাষণ দিয়ে খুশি খুশি মুখে বসেছেন। গাড়ি রেডি আছে। কলকাতা ফিরতে হবে। দেরি করলে চলবে না। বিগলিত মুখে ক্লাবের সেক্রেটারি বিষ্ণুপদ পাঁচমিনিট সময় চেয়েছেন। এলাকার মাননীয় ভবনাথ চৌধুরী কিছু বলতে চান। মন্ত্রীমশাই সানন্দে রাজি। প্রবীণ গ্রামবাসী। সজ্জন ব্যক্তি। রায়বাহাদুরের বংশধর। কম কথা নয়!

ভবনাথ  মঞ্চে উঠলেন। সঙ্গে রোগা শুঁটকো পানা হাড়গিলে চেহারার একটা লোক। লোকটার হাতভাবে ভয় ভয় ভাব। নিতান্ত অনিচ্ছায় কুঁজো হয়ে মঞ্চে এসে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে। মঞ্চের সামনে লোকজনের  মধ্যে থেকে ভেসে এল ফুট কাটা ফাজিল গলা, “দাদু দেখবেন। গুল দেবেন না।”

ভববাবু কিছু একটা বলতে যাবার আগেই ঘটল কান্ডটা। আলোগুলো দপদপ, বাতাস হঠাৎ শনশন। লোকজন চেঁচিয়ে ওঠার মধ্যেই শোনা গেল বাঘের মত গলা, “আমি শ্রীযুক্ত রায়বাহাদুর বিভূতি নাথ চৌধুরী। বাঘ মেরেছিল তারিণী। পিছনের জমি বেচে দশহাজার টাকা ভবু তুলে দিচ্ছে তারিণীর নাতির হাতে। ভবু গুলবাজ নয়। এই জায়গা ছিল একদিন সবুজে সবুজ। রেশমের মত কেশর উড়িয়ে ছুটে বেড়াত চেতক। দিনগুলো মুছে গেছে মাত্র, মিথ্যে হয়ে যায়নি।”

বলতে বলতে থেমে যায় অদৃশ্য কন্ঠ। সব স্বাভাবিক। সব আগের মত। প্যান্ডেল চুপ। মশা নড়লেও শব্দ হবে এমন নিস্তব্ধ। রায় বাহাদুরের ভূত এসেছিল? সবাই মিলে একই কথা শুনল কী করে?  স্বয়ং মন্ত্রীমশাই বিদায় নেবার সময় বললেন, “জীবনে এমন অভিজ্ঞতা একবারই হোক চৌধুরী মশাই। ভয়ে হাত-পা কাঁপলেও আমি ধন্য। ধন্য।”

***

ভবনাথবাবু চায়ের দোকানে বসেন। কাপ এগিয়ে দেয় নিবারণ, স্কুটার থামিয়ে বিষ্ণুপদ, বাইক নিয়ে এসে অঙ্কুর। কেউ আর ঠাট্টা করে না। প্রশান্ত হেসে ভববাবু বলেন, “মনের ভিতর জমে থাকা কথারা গল্প হয়ে উড়তে থাকলে মানুষ বড্ড ভালো থাকে। তোমরা আমার উপর রাগ করো না।”

সকলে হৈ হৈ করে বলে ওঠে, “রাগ কিসের? এবার থেকে সপ্তাহে একদিন গল্প বলার আসর বসবে। আপনি বলবেন আমরা শুনব। চা-শিঙাড়া আমরা খাওয়াব।”

“বলছ? ভাবনা থেকে মুক্ত হলাম আজ থেকে? আঃ। শান্তি।”

পুজো মন্ডপে বেজে ওঠে ঢাকের বাজনা। মায়ের আরতি শুরু হল।

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply