গল্প-বুলু সেরিমোনিয়াল পাইপ-চুমকি চট্টোপাধ্যায়-শরৎ ২০২৪

চুমকি চট্টোপাধ্যায়ের আরো গল্প
আজব মানুষের গজব কাহিনী, ভগবানের বেটা বেটি, শুদ্ধ ভক্তের ঘড়ি, জ্বর গাছ, হরিদ্রাবৃত্ত, কঙ্কাল কান্ড, আহা কী আনন্দ, রহস্য খুঁজতে খুঁজতে

golpobuluceremonialpipe

আমি আর হ্যারিকাকা ক্যামেরুন থেকে ইকোয়েটোরিয়াল গিনির দিকে যাচ্ছি। এই ইকোয়েটোরিয়াল গিনি বা বিষুবীয় গিনি সেন্ট্রাল আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত। দেশটার সম্পর্কে আরও অনেক কথা হ্যারিকাকা বলেছিল, কিন্তু আমার অতশত মনে নেই। এটুকু মনে রাখতে পেরেছি যে সেটাই অনেক। ভূগোলে আমি আন্ডা।

বাই দ্য ওয়ে, আমি রাহুল। ক্লাস নাইনে পড়ি। হ্যারিকাকার সঙ্গে আমি দেশবিদেশ ঘুরে বেড়াই। না না, হ্যারিকাকা গোয়েন্দা নন, আর আমিও ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট নই। হ্যারিকাকা ইউ.এস.এ-র  ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে অঙ্ক পড়ায়। বছরে একবার দেশে আসে এবং ঠিক তখনই আসে যখন আমার হয় গরমের ছুটি নয়তো পুজোর ছুটি অথবা খ্রিস্টমাসের ছুটি চলে। তাই আমি যেতে পারি কাকার সঙ্গে। হ্যারিকাকা হল আমার বাবার খুড়তুতো ভাই।

ক্যামেরুন থেকে ইকোয়েটোরিয়াল গিনি যাবার তিনটে রুট আছে। দূরত্ব প্রায় ৬৬৬ কিলোমিটার। এক ঘণ্টামতো লাগে। হ্যারিকাকা যে রুটটা বেছে নিল, সেটাতে প্রথমে ইয়ন্ডে থেকে ফ্লাইটে লিবারভিল। তারপর গাড়িতে এম্বিনি। নামগুলো এমন খটোমটো যে উচ্চারণ করা মুশকিল। এই রাস্তাও কিছু কম নয়, ৬৫১ কিলোমিটার। রুটটা অনেকটা ঘোরানো ঘোড়ার খুরের মতো যার বাঁদিকটা খোলা।

পৃথিবীতে এত ভালো ভালো জায়গা থাকতে কেন আমরা ইকোয়েটোরিয়াল গিনি যাওয়া ঠিক করলাম সেটা অনেকেই ভাবতে পারে। আসলে হ্যারিকাকা সবসময় অফবিট জায়গা সিলেক্ট করে। যেখানে কম টুরিস্ট যায়, যে জায়গাগুলো নিয়ে আলোচনা হয় না, সেরকম জায়গায় যেতে পছন্দ করে। তাছাড়া, কোনও কিছু অদ্ভুত জিনিস পাওয়া যায় কানে এলেও হ্যারিকাকা সেখানে যাবার জন্য রেডি হয়।

ক্যামেরুনের ইয়ন্ডে থেকে ফ্লাইটটা ছোটো ফ্লাইট। সিঙ্গল ইঞ্জিন ফ্লাইটটাতে খুব বেশি হলে জনা-নয়েক প্যাসেঞ্জার ছিল। হ্যারিকাকা বলছিল, আফ্রিকা মহাদেশের সবথেকে ছোটো এবং সবথেকে কম লোকসংখ্যার দেশ হল এই ইকোয়েটোরিয়াল গিনি। এটাই একমাত্র আফ্রিকার দেশ যেখানে স্প্যানিশ হল অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ। শুনে আমার বেশ অবাক লাগল। সে-সবের পেছনের কারণ জানার আগ্রহ আমার ছিল না তাই হ্যারিকাকা বলেওনি।

কাকা বলছিল, এখানে মাউন্টেন গোরিলা দেখতে পাওয়া যায়। পৃথিবীতে বানর জাতীয় প্রাণীদের মধ্যে মাউন্টেন গোরিলা সবচেয়ে বড়ো। শুনে আমার দেখার লোভ হচ্ছিল। আবার ভাবছিলাম, সামনে পড়লে প্রাণপাখি বডি ছেড়ে হাওয়া হয়ে যাবে।

আর একধরনের প্রজাপতিও দেখা যায় যার লোভে বহু প্রজাপতি সংগ্রহকারী এখানে ছুটে আসে। উজ্জ্বল নীল বর্ডার দেওয়া ডানাওয়ালা এই প্রজাপতির নাম ব্লু মরফো বাটারফ্লাই। যাক গে, অনেক জানা হল, এবার হ্যারিকাকার কথা একটু বলি।

হ্যারিকাকার আসল নাম হরিসাধন চক্রবর্তী। এ-দেশ ও-দেশ করতে করতে হরি হ্যারি হয়ে গেছে। বাড়িতে কেবল দাদু-ঠাম্মারা হরি বলে ডাকে। বাকিরা হ্যারিই বলে। NTRO (National Technical Research Organization)-তে কাজ করত হ্যারিকাকা। রিটায়ার করে গেছে দু-তিন বছর আগে। এখন নিজের মতোই কাজ করে, কিন্তু কী সেই কাজ আমি জানি না।

ফ্লাইটে আমাদের পাশের রোতে বসেছিল একজন অদ্ভুত পোশাক-পরা মানুষ। যদিও অদ্ভুত পোশাক কথাটা বলা উচিত নয়। হতে পারে ওটাই ওদের জাতীয় পোশাক। খাঁটি আফ্রিকান চেহারা। দেখলেই বোঝা যায় গায়ে কেমন জোর। বার-দুয়েক ঘুরে আমাদের দিকে দেখেছে সে। চোখ দুটো লালচে। কপালে রঙচঙে ফেট্টি বাঁধা। হাতের ওপর দিকেও সেরকমই ফেট্টি বাঁধা।

হ্যারিকাকার দিকে তাকালাম। কাকা জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু কী করে যেন বুঝে গেল আমার মনের কথা। মুখ ঘুরিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে ফ্যাং ট্রাইব। ইকোয়েটোরিয়াল গিনির সংখ্যাগরিষ্ঠ ট্রাইব এরা। আরও ট্রাইব আছে—ইগবো, বুবি ইত্যাদি।”

হ্যারিকাকা যখন আমাকে কথাগুলো বলছিল, লোকটা আর একবার ঘুরে তাকাল আমাদের দিকে। আমার কেমন ভয় করছিল। যদিও এই বয়সে ভয় পাওয়া উচিত নয়। তাছাড়া সঙ্গে হ্যারিকাকা আছে।

লিবারভিলে ঠিকঠাকমতো ল্যান্ড করল ফ্লাইট। ক’টা তো মাত্র লোক। প্লেন স্থির হতেই নিজেদের লাগেজ মাথার ওপর থেকে নামিয়ে তাকিয়ে দেখি সেই লোকটা নেই। মনে মনে বললাম, বাবা, এর মধ্যেই নেমে গেল! কী স্পিড রে!

এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়ির খোঁজে গেলাম আমরা। সার সার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। হ্যারিকাকা কথা বলে একটা ট্যাক্সি ঠিক করল। আমরা রওনা দিলাম এমবিনির উদ্দেশ্যে। যেতে প্রায় দশ ঘণ্টা মতন লাগবে। ক্যামেরুন শুনলেই যেমন ফুটবলের কথা মনে আসে, এমবিনি শুনলেই তেমন ফরাসি ফুটবলার এমবাপের কথা মনে হয়। আমি এমবাপের ফ্যান।

ড্রাইভার ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলতে পারে। লং ড্রাইভ আমার খুব ভালো লাগে। এটা তো লংগেস্ট ড্রাইভ যাকে বলে। হ্যারিকাকা মাঝে-মধ্যে জায়গার নাম জিজ্ঞেস করছে। ড্রাইভার বলছে বটে, তবে সে আমার মাথায় ঢুকছে না। কেবল আম্ভাম আর বিসক বুঝতে পেরেছি।

হ্যারিকাকা বলল, “জুয়ান, এবার খেতে হবে, খিদে পেয়েছে। কোনও একটা ফুড জয়েন্ট দেখে দাঁড়িও।”

মাথা নেড়ে সায় দেয় ড্রাইভার। হ্যারিকাকা ঠিক ওর নাম জেনে নিয়েছে। জুয়ান নামটা সহজ।

বিসক ছাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে বাঁদিকে ম্যাক ডোনাল্ডসের মতো ছবি দেওয়া একটা ফুড জয়েন্ট চোখে পড়ল। জুয়ান সেদিকেই গাড়ি ঘোরাল। হ্যারিকাকা জুয়ানকেও ডেকে নিল।

আমদের গাড়ির পেছনেই এসে থামল আর একটা ট্যাক্সি। সেটা বোধ হয় শাটল ট্যাক্সি। ভেতরে অনেক লোক। সেই গাড়িটা থেকে নামল ফ্লাইটের সেই লোকটা। আমার কেন জানি মনে হল, আমাদের ও ফলো করছে। নাও হতে পারে, ভাবনার কি আর মাথামুণ্ডু আছে!

হ্যারিকাকা রাকস্যাকটা পিঠে ফেলে ট্রলি টেনে চলতে লাগল, পেছনে আমার ট্রলি টেনে আমিও চললাম। নিজেদের গাড়ি হলে লাগেজ বয়ে খেতে ঢুকতে হত না। এখানে সে উপায় নেই। হ্যারিকাকা একবার বলেছিল লাগেজ গাড়িতে রেখে আসার কথা, জুয়ান মানা করেছে।

আমার হঠাৎ মনে হল, ওই বিশাল দেখতে লোকটার নাম মাউন্টেন গোরিলা। নিজে ভেবে নিজেই হেসে ফেললাম। হ্যারিকাকা বলল, “কী রে, হাসছিস কেন?”

হাসার কারণ শুনে কাকাও হেসে ফেলল।

বার্গার আর কোল্ড ড্রিংক খেয়ে দাম মিটিয়ে বাইরে আসতেই দেখলাম জুয়ানকে সেই মাউন্টেন গোরিলা হাত নেড়ে নেড়ে কী যেন বলছে। জুয়ান মাথা নেড়ে না বলছে।

আমরা গাড়ির কাছে পৌঁছতেই জুয়ান বলল, “ইনি বলছেন লিফট দিতে। এখান থেকে এমবিনি যাবার পথে ওয়েম বলে একটা জায়গা পড়ে। ইনি সেখানে থাকেন। কোনও গাড়ি নাকি পাচ্ছেন না। বলছেন কিছু টাকা দিয়ে দেবেন। আমি নিতে চাইছি না। আমাকে ভুল বুঝবেন না দয়া করে।”

অনিচ্ছে সত্ত্বেও কাকা মুখে বিরক্তি প্রকাশ করল না। অচেনা জায়গায় বেশি কেরদানি না দেখানোই ভালো। কাকা বলল, “ওকে, টেক হিম ইউথ আস।”

জুয়ান লোকটাকে কিছু বলার আগেই সে লাফিয়ে সামনের সিটে বসে পড়ল।

ব্যাপারটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগল আমার। চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে কাকার দিকে তাকালাম। ওর কোনও  সমস্যা আছে, খুব রেস্টলেস। উদ্দেশ্য তো একটা কিছু আছেই। দেখা যাক।

ট্যাক্সি চলতে শুরু করেছে। রাস্তার দু-পাশে বেশ মোটা গুঁড়ির বড়ো বড়ো গাছ দেখতে পাচ্ছি এই স্ট্রেচটায়। জুয়ানকে জিজ্ঞেস করতে বলল, ওগুলো সিবা ট্রি। মাউন্টেন গোরিলা জুয়ানকে ওদের ভাষায় কিছু বলল। জুয়ান তার উত্তর দিয়ে কাকাকে উদ্দেশ করে বলল, “ওকে ওর বাড়ির সামনে ছাড়তে বলছে। কী করব?”

“তাই নামাও।” কাকা বলল।

আমার মনে হল, কাজটা ঠিক হবে না। তবু চুপ করে থাকলাম। কাকা নিশ্চয়ই কিছু ভেবেই বলেছে।

সারাটা রাস্তা আমার অস্বস্তিতে কাটল। আমরা যাচ্ছিলাম নিজেদের মতো, কোত্থেকে এই গোরিলাটা ঘাড়ে চেপে বসল!  বিরক্ত লাগছে।

গাড়ি চলছে তো চলছেই। হ্যারিকাকা দেখলাম একটা চটি বই রাকস্যাক থেকে বের করে পড়ছে। আমার ঘুম পাচ্ছিল।  চোখ বন্ধ করে ঘাড় হেলিয়ে দিলাম।

“হেই, হোয়াট আর ইউ ডুইং? হে ম্যান!”

কানে আসতেই ধড়মড়িয়ে উঠে চোখ খুলতেই অবাক হয়ে দেখলাম, গাড়ির বাঁদিকের দরজাটা খোলা আর সেই গোরিলামাফিক লোকটা হ্যারিকাকার হাত ধরে টানছে। আমি কোনও কিছু না ভেবে ডানদিকের দরজা খুলে লাফ দিয়ে নেমে ঘুরে চলে গেলাম হ্যারিকাকার দিকে। গায়ের জোরে লোকটার পিঠে কিল মারতে লাগলাম।

লোকটা ততক্ষণে কাকাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়েছে। অত শক্তিশালী লোকের সঙ্গে কি আমরা পারি? আমার কিলে ওর কিছুই এল-গেল না। বাঁহাত দিয়ে হ্যারিকাকাকে ধরে ডানহাতে আমার জামার বুকের কাছটা খিমচে ধরল। তারপর হালকা ঠেলা মারতেই আমি পড়ে গেলাম।

লোকটা হ্যারিকাকাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর কী যে বলে যাচ্ছে ওই জানে। সামনে একটা ইটের বাড়ি, মাথায় টিনের চাল। একটা দরজা, দুটো জানালা দেখা যাচ্ছে—সব নীল রঙের। ওটাই বোধ হয় ওর বাড়ি।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে জুয়ানের দিকে তাকালাম, নির্বিকার চিত্তে বসে আছে স্টিয়ারিং ধরে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ও কী বলছে? তোমাদের দেশে টুরিস্টদের সঙ্গে এরকম ব্যবহার করে?”

“ওর নাম গুয়েমা। তোমার আংকলের কাছে এমন কিছু আছে যা ওর বউয়ের অসুখ সারিয়ে দেবে। তাই এরকম করছে। আমার টাকাটা পেলে আমি কেটে পড়তাম। বেকার সময় নষ্ট হবে। তোমার আংকলকে বলো না আমার পেমেন্ট দিয়ে দিতে।”

জুয়ানের কথার উত্তর না দিয়ে আমি ছুটলাম বাড়িটার দিকে। হ্যারিকাকাকে ততক্ষণে ভেতরে নিয়ে গেছে লোকটা। আমিও ঢুকে পড়লাম ভেতরে।

আধা অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে উৎকট একটা গন্ধ। মনে হচ্ছে ইঁদুরজাতীয় কিছু মরে পচেছে। সেই ঘরের মেঝেতে কাপড় জড়ানো এক মহিলা শুয়ে আছে।

লোকটার কথা আমরা বুঝতে পারছি না দেখে হ্যারিকাকার রাকস্যাকটা কেড়ে নিল সে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “হেই, হোয়াট আর ইউ ডুইং ইডিয়ট!”

কাকা আমাকে হাতের ইশারায় চুপ করতে বলল।

সেই মাউন্টেন গোরিলা এরপর টান দিয়ে রাকস্যাকের চেনটা খুলে ফেলে বের করে আনল ক্যামেরুন থেকে হ্যারিকাকার কেনা ‘বুলু সেরিমোনিয়াল পাইপ’। ৮০ সেমি লম্বা বাঁদর আকৃতির সামনের অংশের সঙ্গে খাঁজকাটা পাইপ উঠেছে বাঁদরের পিঠের দিক থেকে। ভেতরে মেটাল, বাইরে কাঠের আস্তরণ দেওয়া পাইপটা দুর্দান্ত দেখতে। একটাই মাত্র পাওয়া গেল সারা মহল্লা খুঁজে। এটার কথা হ্যারিকাকা শুনেছিল, তাই অনেক খুঁজে বের করেছে।

সেই হুমদোটা পাইপটা হাতে নিতে বাঁদরের মাথার খোপে কিছু একটা গুঁজতে শুরু করল। হ্যারিকাকা চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখছিল। তারপর তাতে আগুন ধরিয়ে দিল। বিকট পচা গন্ধে আর ধোঁয়ায় ভরে গেল জায়গাটা।

পাইপটা নিয়ে গিয়ে শুয়ে থাকা মহিলার মুখের সামনে ধরল লোকটা। মহিলা দু-হাত দিয়ে ধাক্কা দিল লোকটার হাতে। পাইপটা ছিটকে যেতেই হ্যারিকাকা ধরে নিল। না, হাতে করে ধরেনি কাকা, কারণ পাইপটা গরম। কখন যে কাকা রাকস্যাক থেকে ক্যাপসুল ছাতাটা বের করে খুলে ধরেছে, আমি খেয়ালই করিনি। কাকার ইনটুইশন অসাধারণ।

মহিলার ওইরকম আচরণে লোকটা বেদম রেগে গেল। চড় কষাতে যেতেই হ্যারিকাকা লোকটার পিঠে হাত দিল। লোকটা ঘুরে তাকাল কাকার দিকে। কাকা হাত উলটে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে। অঙ্গভঙ্গি আর অদ্ভুত ভাষার ফোয়ারা ছুটিয়ে হুমদো যা বলল, তাতে আমার মনে হল মহিলা অসুস্থ। তাকে ওই পাইপে ভরে ওষুধ খাওয়াতে যাচ্ছিল লোকটা। কাকার মুখ দেখে মনে হল কাকা আরও ডিটেলে বুঝেছে ব্যাপারটা। লোকটা সেরিমোনিয়াল পাইপটা দেখিয়ে কীসব বলতে লাগল। কাকা দু-হাত দিয়ে তাকে বোঝাতে চাইছিল—‘বুঝেছি, বুঝেছি।’

“আমি কি একবার ওঁকে দেখতে পারি?” কাকা গোরিলাকে জিজ্ঞেস করল।

কোনও উত্তর দিল না সে। লাল লাল চোখ করে আমাদের দেখতে থাকল।

হ্যারিকাকা সাহস করে মহিলার দিকে এগোতেই ঘপাৎ করে বিশাল হাতের পাঞ্জা দিয়ে কাকার শার্ট খামচে ধরে এক টানে পেছনে নিয়ে এল। মাথাটা প্রায় দেওয়ালে ঠুকে যাবার উপক্রম। আমার ভয়ানক রাগ হয়ে গেল। আমি বললাম, “হ্যারিকাকা, চলো চলে যাই, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে। তোমার পাইপ থাক গে, পরে দেখা যাবে। জুয়ানও বলছিল ওকে ছেড়ে দিতে।”

কাকা সামলে নিয়ে উঠতে যাবে, সেই সময় দরজায় দেখা গেল জুয়ানকে।—“স্যার, আমার পেমেন্ট মিটিয়ে দিন, আমি চলে যাই। টাইম ওয়েস্ট হচ্ছে। পুরোটা দিতে হবে না।”

কাকা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “জুয়ান, তুমি একে জিজ্ঞেস করো তো ভদ্রমহিলার কী হয়েছে। আমার কেনা সেরিমোনিয়াল পাইপটা কেড়ে নিয়েছে। কী চাইছে?”

অনিচ্ছে সত্ত্বেও জুয়ান কথা বলতে লাগল লোকটার সঙ্গে। বিশালাকার লোকটা হাত-মুখ নেড়ে, মাথা ঝাঁকিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় প্রায় চার মিনিট ধরে কথা বলে গেল।

সব শুনে জুয়ান বলল, “ওর স্ত্রী অসুস্থ। ভুল বকছে, গুয়েমাকে চিনতে পারছে না। সারাদিন ঘুমোচ্ছে। ফ্যাং উপজাতিদের মধ্যে বুলু যারা, তারা এই পাইপকে পবিত্র বলে মানে। এর মধ্যে নানারকম জিনিস ভরে, আগুন দিয়ে সেই ধোঁয়া টানলে অনেক অসুখ সেরে যায় বলে এদের বিশ্বাস। কিন্তু এখন আর এই পাইপ পাওয়া যায় না। আপনি ফ্লাইটে পাইপ বের করে দেখছিলেন যখন, তখন গুয়েমা দেখেছিল। তাই ও এই কাণ্ড করেছে। পাইপের মধ্যে  ব্যাঙের চামড়া পুরে সেই ধোঁয়া টানাতে চাইছিল ওর স্ত্রীকে।”

হ্যারিকাকা সব শুনে বলল, “গুয়েমাকে বলো, আমি ওর স্ত্রীকে ভালো করার চেষ্টা করতে পারি যদি ও রাজি থাকে। ভালো যে হবেই সে-কথা দিতে পারছি না, তবে ক্ষতি কিছু হবে না, কথা দিতে পারি। আমার পাইপটা ফেরত দিতে বলো।”

জুয়ান কথা বলল গুয়েমার সঙ্গে। আমি তো আতঙ্কে মরছি। হ্যারিকাকা কি ডাক্তার নাকি যে রোগ সারাবে! কিছু একটা কেলেঙ্কারি হলে আর দেখতে হবে না, মেরে এখানেই পুঁতে দেবে। ভেতর থেকে একটা কাঁপুনি উঠছিল।

গুয়েমা কটমট করে হ্যারিকাকার দিকে তাকিয়ে তারপর জুয়ানকে কীসব বলল। জুয়ান বলল, “ও বলছে গায়ে হাত দেওয়া চলবে না। ওর স্ত্রীর কিছুমাত্র ক্ষতি হলে গুয়েমা ছেড়ে দেবে না।”

হ্যারিকাকা বলল, “গুয়েমাকে এক গ্লাস জলে এক চামচ নুন গুলে আনতে বলো। বাড়িতে যদি সয়া সস বা টমেটো কেচ-আপ জাতীয় কিছু থাকে, তাও আনতে বলো। এছাড়া কলা লাগবে।”

জুয়ান বলল। গুয়েমা ভেতরে ঢুকে গেল।

“বেকার ফেঁসে গেলাম, জানেন।” জুয়ান বিড়বিড় করল।

“আমরাও কি ফেঁসে যাইনি বলো তো? এভাবে টুরিস্টকে কেউ হ্যারাস করে? সেরিমোনিয়াল পাইপ যখন এতই কাজের তাহলে কিনে রাখে না কেন?”

“এখন আর কেউ বানায় না এসব। আর্টিসানদের ছেলেমেয়েরা সব লেখাপড়া কর‍তে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। কেউ আর এই পেশায় আসছে না।”

গুয়েমা একটা গ্লাসে নুন গুলে এনেছে আর একটা সয়া সসের বোতল নিয়ে এসেছে। জুয়ানকে কিছু বলল গুয়েমা। জুয়ান বলল, “ও বলছে, বাড়িতে কলা নেই, তবে আশেপাশে পেয়ে যাবে। আমাকে বলছে পাহারা দিতে যাতে আপনারা পালিয়ে না যেতে পারেন।”

“ওকে বলো আগে ওর বউকে আস্তে আস্তে এই জলটা খাইয়ে দিতে। তারপর বাড়িতে যে খাবার আছে তাতে সয়া সস মিশিয়ে ওঁকে খাওয়াতে। তারপর কলা আনতে যায় যেন।”

আমি হ্যারিকাকার কাজের মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম মেঝেতে।

গুয়েমা ধীরে ধীরে ওর বউয়ের মাথাটা বাঁহাতে উঠিয়ে ডানহাতে গ্লাসের জল খাওতে শুরু করল। পুরো গ্লাস খাওয়ানোর পর ভেতরে গিয়ে কী একটা ঘ্যাঁটমতো এনে তাতে খানিক সয়া সস ঢালল। তারপর সেটাও খাওয়াল।

এইবার জুয়ানকে পাহারায় রেখে গুয়েমা গেল কলার খোঁজে। এই ফাঁকে আমি কাকাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কীসের চিকিৎসা করছ? এদিক ওদিক কিছু হবে না তো?”

“সিম্পটম দেখে মনে হচ্ছে সোডিয়াম পটাশিয়াম লেভেল নেমে গেছে। এই ট্রিটমেন্টে ক্ষতি কিছুই হবে না। নুন খাওয়াতে বললাম সোডিয়াম তোলার জন্য আর কলা পটাশিয়াম বাড়াবে।”

হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল গুয়েমা। হাতে চার-পাঁচটা বড়ো বড়ো কলা। হ্যারিকাকা ইশারায় বোঝাল স্ত্রীকে খাইয়ে দিতে। গুয়েম কাজে লেগে পড়ল।

জুয়ান বিরক্ত হলেও কৌতূহল নিয়ে দেখছিল বিষয়টা। এটাও ঠিক যে, মহিলার কিছুটা উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত আমরা ছাড়া পাব না। আদৌ ছাড়া পাব তো! আ বিগ কোয়েশ্চেন।

আধঘণ্টা কেটে গেল। খাওয়ানোর পর্ব আপাতত শেষ। হ্যারিকাকা জুয়ানকে বলল, “গুয়েমাকে বলো আর এক গ্লাস নুন জল করে আনতে।”

ঠিক তখনই মহিলা ওদের ভাষায় কী যেন বলে উঠল। আমি আন্দাজ করলাম এরকম হতে পারে বলাটা—“কী ব্যাপার, এরা কারা? কী করছ তুমি?”

গুয়েমা লাফ দিয়ে উঠে ‘আভেলিনা, আভেলিনা…’ আরও কী বলে হাততালি দিয়ে উঠল। আভেলিনা হয়তো মহিলার নাম—শুধু এটুকুই বুঝতে পারলাম, বাকিটা নয়।

মহিলা উঠে বসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু আবার শুয়ে পড়লেন। কাকা হাতের ইশারায় গ্লাস দেখালেন। গুয়েমা ভেতরে চলে গেল।

এভাবে প্রায় আড়াই ঘণ্টা কাটল। মহিলা এখন অনেকটা সেন্সে এসেছে। কথাবার্তা ঠিকঠাক বলছে। কিন্তু দুর্বল। জুয়ানের মাধ্যমে হ্যারিকাকা বলে দিল কী কী খাইয়ে যেতে হবে ওকে।

হঠাৎ সেই মাউন্টেন গোরিলা ঝড়াস করে হ্যারিকাকার পায়ের সামনে সটান শুয়ে পড়ল। কাকা তো হতভম্ব। সঙ্গে আমিও। বুঝলাম উপকার পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে। হ্যারিকাকা একটু ধাতস্থ হয়ে গুয়েমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। জুয়ানকে দিয়ে বলাল, এবার আমরা যাব।

গুয়েমা উঠে দাঁড়াল, দু-চোখে জল। বিশালকায় মানুষটাকে কাঁদতে দেখে মনে হল, বাইরের চেহারার সঙ্গে মনের কোনও মিল হয় না।

আমরা বেরিয়ে এলাম। গুয়েমা আমাদের সঙ্গে গাড়ি পর্যন্ত এল। হ্যারিকাকার হাতে একটা মসৃণ পাথর দিয়ে ওর ভাষায় যা বলল, জুয়ান তার ট্রান্সলেশন করে বলে দিল, ‘এই পাথরটা অমাবস্যায় ছোটো থাকে। তারপর পূর্ণিমা যত এগিয়ে আসতে থাকে, সাইজে বাড়তে থাকে। আর রঙও বদলায়। এই পাথর পৃথিবীর অন্দর থেকে তুলে আনা। এর ভেতরে জল আছে যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। এটা খুব রেয়ার পাথর, গুয়েমা কাকাকে গিফট করছে।’

হ্যারিকাকা গুয়েমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে হাত দুটো ধরে কপালে ঠেকিয়ে বোঝাল যে, গিফট অ্যাক্সেপ্ট করছে। তারপর আমরা গাড়িতে উঠলাম, জুয়ান স্টার্ট দিল।

“আপনি কি ম্যাজিশিয়ান?” গাড়ি চালাতে চালাতে জুয়ান প্রশ্ন করল।

হ্যারিকাকা হেসে বলল, “তাহলে কি আর তোমার গাড়িতে চড়ে যেতাম? উড়েই চলে যেতাম। না ভাই, আমি ম্যাজিক জানি না। আমি যা করেছি সেটা সিম্পল মেডিক্যাল সায়েন্স। আর কিছুই না।”

“আমার হাত-পায়ের জয়েন্টগুলোতে খুব ব্যথা। ঘুম থেকে উঠে পা ফেলতে পারি না, গোড়ালিতে ব্যথা করে। কিছু উপায় আছে আপনার কাছে?”

“সি-ফুড আর মাংস খাওয়া বন্ধ করে দাও। প্রন, ক্র্যাব খেও না। দেখবে কমে যাবে।”

“ওকে, থ্যাংক ইউ স্যার।”

এই প্রথম আমি জুয়ানের মুখে হাসি দেখলাম।

জায়গামতো পৌঁছে দিল জুয়ান। হ্যারিকাকা ওকে ভাড়ার সঙ্গে এক্সট্রা টাকা দিল অতক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য। টাকাটা ফিরিয়ে দিল জুয়ান। বলল, “এটা নিলে আমার পাপ হবে। আপনি একজন মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। আমাকেও রেমেডি দিয়েছেন। আপনি খুব ভালো।”

জুয়ান চলে গেল। আমরা হোটেলের ঘরে ঢুকলাম। হ্যারিকাকা ফ্রেশ হতে গেল। আমি তখন মাথার মধ্যে রিল ঘুরিয়ে প্রথম থেকে ঘটনার ঘনঘটা দেখতে শুরু করলাম। কী অদ্ভুত কাটল দিনটা! হ্যারিকাকা জিন্দাবাদ!

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply