পিয়ালি গাঙ্গুলীর আগের লেখা– ফোচনের কীর্তি , ফোচনের আরেক কীর্তি মিঠে প্রতিশোধ , বেলুন দাদু , দুটি অণুগল্প , নতুন বছর , বাঘমামার বিয়ে, মাম্বোর শুঁড় , জঙ্গলের নতুন নিয়ম , টুংটাং, লেজ নিয়ে, জুনিয়র পাণ্ডব গোয়েন্দা,তিতাসের নৈশ অভিযান

আওয়াজটা ক্রমশ জোরে হতে লাগল। ঘোড়ার খুরের মতো আওয়াজ। তিতাস লাফিয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ল। মনে হল আওয়াজটা আসছে আলমারির ভেতর থেকে। ছুটে গিয়ে আলমারির দরজাটা খুলতেই ছিটকে বেরিয়ে এল এক তরতাজা কালো ঘোড়া। অপূর্ব দেখতে। ঠিক যেন অ্যান সিউয়েলের ব্ল্যাক বিউটি। আলমারির ভেতরে উঁকি মেরে তিতাস দেখল মামার দেওয়া সেই অ্যান্টিক ছোটো কালো পাথরের ঘোড়াটা আর নেই। তিতাসের বুঝতে আর বাকি রইল না যে মামার দেওয়া কালো পাথরের ঘোড়াটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তিতাসকে হকচকিয়ে দিয়ে ঘোড়াটা বলে উঠল, “উঠে পড়ো আমার পিঠে, বলো কোথায় যেতে চাও।”
তিতাস অবাক হয়ে বলল, “ও মা, ঘোড়া আবার কথা বলতে পারে নাকি?”
ঘোড়াটা যেন একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “আমি কি যে-সে ঘোড়া নাকি? আমি হলাম জাদু ঘোড়া। কেন, তোমার মামা তোমায় উপহার দেওয়ার সময় কিছু বলেননি?”
তিতাস বলল, “কই, না তো।”
ঘোড়া বলল, “তাহলে হয়তো উনি তোমায় সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলেন।”
তিতাস বলল, “তা হতে পারে, কিন্তু তুমি এতদিন কেন আত্মপ্রকাশ করোনি?”
জবাবে ঘোড়া বলল, “আমরা যার-তার কাছে আত্মপ্রকাশ করি না। একমাত্র ভালো আর সংবেদনশীল মানুষদের কাছেই আমরা নিজের রূপ প্রকাশ করি। এতদিন আমি তোমায় পরীক্ষা করছিলাম। নাও নাও, এবার উঠে পড়ো আমার পিঠে। কোথায় যেতে চাও বলো।”
তিতাস সদ্য কিং সলোমনস মাইনস পড়েছে। খুব ইচ্ছা হল জাদু ঘোড়ায় চড়ে সলোমনের মাইনটা যদি একবার দেখে আসা যায়। কিন্তু গাগুল তো সেই গুহার মুখ বন্ধ করে দিয়েছে, ঢুকব কী করে? ঘোড়া অধৈর্য হয়ে বলল, “আরে ধুর, তোমার গাগুল না গুগুল, ওঠো তো এখন আমার পিঠে!”
তিতাস ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসতেই জানালার গ্রিল আর কাচ ভেদ করে ঘোড়া ছুটে চলল রাতের অন্ধকার আকাশে। যত পথ এগোচ্ছে, তত আকাশের অন্ধকার ফিকে হচ্ছে।
ঘোড়া এসে নামল এক শহরে। শহরটা দেখে খুব চেনা মনে হচ্ছে তিতাসের। ছবিতে অনেকবার দেখেছে। তুফান বলল, (ততক্ষণে ঘোড়ার নাম জেনে নেওয়া হয়ে গেছে তিতাসের) “এই হল ইসরাইলের রাজধানী জেরুসালেম। এখানেই থাকেন তোমার কিং সলোমন।”
তিতাস প্রায় লাফিয়ে উঠল।—“উনি এখনও বেঁচে আছেন নাকি?”
“আরে চলো না দেখবে।” তুফান ওকে নিয়ে সটান হাজির হল রাজদরবারে।
সিংহাসনে বসে আছেন কিং সলোমন। লম্বা, চওড়া বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। ওঁর বুদ্ধি আর বিচক্ষণতার অনেক গল্প তিতাস পড়েছে। তিতাসকে দেখে রাজা স্বয়ং উঠে এসে ওকে হাত ধরে বসালেন নিজের সিংহাসনের পাশে। বললেন, “আমার রাজ্যে স্বাগত।”
কী আশ্চর্য! উনি হিব্রু ভাষাতে কথা বলছেন অথচ তিতাস সব বুঝতে পারছে।
খানিক কথোপকথনের পরে তিতাস বলেই ফেলল, “মহারাজ, আমি আপনার খনিটা একবার দেখতে চাই।”
মুচকি হেসে রাজা বললেন, “হবে, হবে। আগে তুমি একটু খাওয়াদাওয়া করে নাও।”
খাওয়ার টেবিলে সাজানো নানারকম লোভনীয় খাবার। কে বলে তিতাসের খাওয়া নিয়ে অনেক ঝামেলা? দিব্যি লক্ষ্মী মেয়ের মতো চেটেপুটে খেয়ে শেষ করে ফেলেই বলল, “নাও, চলো এবার তোমার মাইনস দেখাতে।”
রাজার সঙ্গে রথে বসে তিতাস চলল কিং সলোমনের মাইনস দেখতে। ইসরাইলের টিম্না উপত্যকার একটা খনিতে এসে ঢুকল ওরা। ঢোকার আগে সে কী উত্তেজনা! কিন্তু এ কি, ভেতরে যে সোনাদানা, হিরে-জহরত কিছুই নেই! চারদিকে শুধু তামা। তিতাসের মনের ভাব আন্দাজ করে কিং সলোমন বললেন, “অবাক হচ্ছ তো? তোমরা আমার বিপুল ঐশ্বর্যের যে-কথা শুনেছ, তা সব গল্পকথা। আমার রাজ্যের সমৃদ্ধির আসল কারণ কিন্তু এই তামা।”
তিতাসকে হতাশ হতে দেখে রাজা সস্নেহে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “বন্ধুদের কাছে না-হয় না-ই বললে। ওরা থাকুক ওদের কল্পনার জগতে।”
এর মধ্যে হঠাৎ তুফান এসে তাড়া দিল, “এবার চলো তিতাস, দেরি হয়ে যাবে।”
রাজার ইশারায় এক কর্মচারী এসে রাজার হাতে কী একটা দিয়ে গেল। রাজা এগিয়ে এসে বললেন, “এই নাও তোমার উপহার।” এই বলে কিং সলোমন ওর হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা অপূর্ব সুন্দর তামার পুতুল। বললেন, “এই পুতুলকে বললে ও যে-কোনো সময় তোমায় আমাদের দেশে নিয়ে আসতে পারবে। ওকে যত্ন করে রেখো।”
“এবার কোথায় তিতাস?” তুফান জিজ্ঞেস করল।
“আচ্ছা, তুতানখামেনের টুম্বের গল্পটাও কি তাহলে মিথ্যে? ওঁরও কি তাহলে অত ঐশ্বর্য ছিল না?”
“চলো তাহলে দেখে আসবে।”
জেরুসালেম থেকে ইজিপ্ট পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগল না। ফ্যারাও টুট তখন দুপুরের ঘুম থেকে উঠে বিকেলের জলখাবার খেতে বসেছেন। তিতাস অপলক দৃষ্টিতে তখন প্রাসাদের সৌন্দর্য দেখছে। সোনা আর মণিমাণিক্য-খচিত প্রাসাদের প্রতিটা দেওয়াল, জানালা, দরজা। রাজার দেহও আপাদমস্তক অলংকারে মোড়া। তিতাসের হাতে এক পানীয়ের গেলাস ধরিয়ে দিয়ে গেল এক পরিচারিকা। খেয়ে তিতাসের মনে হল অমৃত। ওর পছন্দের মকটেল ব্লু লাগুন খেয়েও কোনোদিন এত ভালো লাগেনি।
তারপর কিং টুট বললেন, “কী, পিরামিড দেখতে চাও তো? চলো তাহলে গিজায়। তোমায় আমার পূর্বপুরুষ ফ্যারাও খুফুর পিরামিড দেখিয়ে আনি।”
ফ্যারাও টুটের রথে চড়ে তিতাস চলল পিরামিড দেখতে। লাইমস্টোন, ব্যাসাল্ট, ইট ইত্যাদি দিয়ে তৈরি বিশালকায় এই প্রাচীন পিরামিডের সামনে নিজেকে আরও ছোটো লাগছিল তিতাসের। সামনে স্ফিংসের মূর্তিটাও দেখবার মতো। পিরামিডের ভেতরের প্রাচুর্য আর ব্যবস্থাপনা দেখে তিতাসের ভাবতে অবাক লাগছিল যে এতসব আয়োজন একজন মৃত মানুষের জন্য। আরবি ভাষায় বললেও ফ্যারাওয়ের কথাগুলো বুঝতে একটুও অসুবিধা হচ্ছিল না তিতাসের।
ইজিপশিয়ান সভ্যতার এমন অনেক কথা তিনি তিতাসকে বললেন যা ইতিহাস বইয়ে বা গুগলে কোথাও লেখা নেই।
“তুমি নিশ্চয়ই মমি দেখতে চাও?” ওর মনের কথাটা ফ্যারাও কী করে বুঝে গেলেন?
তিতাস আমতা আমতা করে বলল, “হ্যাঁ, মানে কলকাতায় যাদুঘরে আমি একটা মমি দেখেছিলাম, কিন্তু সত্যিকারের পিরামিডে এসে মমি দেখতে চাই।”
তিতাস জানত না যে ইজিপ্টের প্রথম মমি ছিল ইজিপ্টের জীবন, মৃত্যু ও পরলোকের দেবতা ওসিরিস। কিন্তু এ-কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে, যে ফ্যারাওয়ের সমাধি নিয়ে এত গল্প, এত রহস্য—তাঁকে তিতাস জীবন্ত অবস্থায় দেখেছে? এসব ভাবতে ভাবতে তিতাসের মনে পড়ল সামনে হাফ ইয়ার্লি, বাড়ি ফিরে ওকে পড়তে বসতে হবে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই ভোর হয়ে এসেছে। তিতাস জোরে জোরে তুফানের নাম ধরে ডেকে উঠল। তিতাস তুফানের পিঠে উঠে বসতেই ফ্যারাও ওর হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা সোনার পিরামিডের মডেল।—“এই নাও, আমাদের সভ্যতার প্রতীক, যত্ন করে রেখো।” তারপর খানিক বিষণ্ণ মুখে বললেন, “আমার মৃত্যুর পর আমার ঐশ্বর্যের লোভে কত লোকে আসবে আমার টুম্বে। একটুও শান্তি দেবে না আমায় কেউ।”
তিতাসের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। হাত নেড়ে ফ্যারাওকে টা টা করার সময় তিতাস মনে মনে বলল, ‘ঠাকুর, ফ্যারাওকে ভালো রেখো।’
যতই বাড়ি ফেরার তাড়া থাকুক, তা বলে আফ্রিকায় এসে জঙ্গল না দেখে কি ফেরা যায়? ছোটো থেকেই তিতাসের জঙ্গল ভীষণ ভালো লাগে। আর এখন তো মাসাই মারা যাওয়ার আদর্শ সময়। এখন তো গ্রেট মাইগ্রেশনের সময়। তুফান ওকে নিয়ে এসে থামল সেরেঙ্গেটিতে, একেবারে মারা নদীর তীরে। এখানে এখন বিকেল। দলে দলে হরিণ, জেব্রা, ওইল্ডাবিস্ট ছুটে এসে নামছে মারা নদীর জলে। সে এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। তিতাস লক্ষ করল, প্রতিটা দলেই বাচ্চারা কিন্তু দলের মাঝখানে। বড়োরা চারদিক থেকে আগলে রাখছে। এই মুহূর্তে জেব্রাদের একটা বড়ো দল নদী পার হচ্ছে। হঠাৎ একটা সমবেত আর্ত চিৎকারে তিতাসের চোখ আটকে গেল নদীতে। কয়েকটা কুমির এসে কয়েকটা জেব্রাকে মুখে করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে জলের তলায়। তাদের সাথীরা কেউ তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করছে না। দেখে তিতাসের খুব কষ্ট হল। কিন্তু ছোটো হলেও তিতাস জানে, এটাই জীবনের নিয়ম। তিতাস খেয়াল করল, নদীতে আরও অনেক কুমির ওঁত পেতে বসে আছে, শুধু নাকটা জলের ওপর বেরিয়ে আছে। দেখতে দেখতে হঠাৎ আলোটা ঝপ করে কমে এল আর অন্ধকার নামার সঙ্গে-সঙ্গেই পরিবেশটা কেমন ছমছমে হয়ে এল। তিতাসের এবার ভয় করছে, এখানে আর থাকতে ইচ্ছা করছে না।
আর সময় নেই, এবার বাড়ি ফিরতেই হবে। কিন্তু এখনও তো অনেক কিছু দেখা বাকি রয়ে গেল। মাচু পিচুতে গিয়ে ইনকা সভ্যতা, অ্যান্টার্কটিকা গিয়ে পেঙ্গুইন আর নর্থ পোল গিয়ে পোলার বেয়ার দেখার খুব শখ তিতাসের। তুফান বলল, “আমি তো নিয়ে যেতেই পারি, কিন্তু তোমার মা ঘুম থেকে উঠে পড়লে কেলেঙ্কারি। আর বড়োজোর একটা কোথাও যাওয়া যেতে পারে। বলো এবার কোথায় যাবে।”
তিতাস বলল, “নর্থ হেমিসফিয়ারেই যখন আছি তখন নর্থ পোলেই চলো।”
এ-কথা বলামাত্রই তিতাস দেখল ওর গায়ে এসে গেল মোটা ফারের কোট, মাথায় টুপি, পায়ে বুট। তুফান ছুটে চলল আগের চেয়েও বেশি দ্রুত গতিতে।
নর্থ পোলে নামতেই কনকনে ঠান্ডায় হাড়ের ভেতর অবধি যেন কেঁপে উঠল তিতাসের।
তুফান বলল, “তুমি আমার পিঠ থেকে নেমো না, বরফের ঠান্ডা সহ্য করতে পারবে না।”
পোলার বেয়ার দেখার জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। এক বিশালকায় মা আর তার ছানা এসে ওদের চারপাশে ঘুরতে লাগল। তিতাসের খুব ইচ্ছা করছিল ওদের চটকে মটকে আদর করতে। কিন্তু ওদের চোখ-মুখ দেখে মনে হল ওরা যেন বেশ রেগে আছে। আস্তে আস্তে আরও পোলার বেয়ার এসে যোগ দিতে লাগল।
হঠাৎ সামনের মা ভাল্লুক এসে বেশ অভিমানের সুরে বলল, “থাক আমাদের আর দেখতে আসতে হবে না। তোমাদের জন্যই আজ আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন। তোমরা বেপরোয়াভাবে দূষণ বাড়িয়ে চলেছ আর তার খেসারত দিচ্ছি আমরা। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, বরফ গলে যাচ্ছে। এত গরমে আমরা বাঁচতে পারব না। ডাইনোসরের মতো আমরা আর আমাদের সাউথ পোলের বন্ধু পেঙ্গুইনরাও বিলুপ্ত হয়ে যাব।”
কথাগুলো শুনে তিতাসের খুব লজ্জা করল। সত্যিই তো, মানুষের জন্যই তো আজ প্রকৃতির এই অবস্থা। তিতাস বলল, “আমি তোমাদের কথা দিচ্ছি যে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব তোমাদের কথাগুলো সকলের কাছে তুলে ধরার।”
পোলার বেয়ারদের বিদায় জানানোর আগে তিতাস একবার তুফানের পিঠ থেকে নেমে বেয়ার ছানাগুলোকে বেশ করে আদর করে দিল।
তারপর তুফানের পিঠে চড়ে বসতেই তিতাসের চিন্তা হতে লাগল। মা এতক্ষণে উঠে পড়েনি তো? তিতাসের বুক ঢিপঢিপ করছে। বাড়ি থেকে মেয়ে উধাও জানতে পারলে তো এতক্ষণে নিশ্চয়ই কান্নাকাটি থানা-পুলিশ সব শুরু হয়ে গেছে। তবে তিতাস বৃথাই এতসব চিন্তা করছিল। ঘরের জানালা ভেদ করে ওরা যখন ঘরে ঢুকল, বাইরে আকাশ তখনও অন্ধকার। তুফান আবার সেই ঘোড়ার মূর্তি হয়ে ঢুকে গেল আলমারির ভেতরে। তামার পুতুল আর সোনার পিরামিডকে তিতাস লুকিয়ে রাখল ওর বাতিল খেলনার গাদায়, যেখানে মা জীবনেও হাত দেয় না। ওদের পরের অ্যাডভেঞ্চার শুরু হবে মাচু পিচু দিয়ে। বাকি জায়গাগুলো ও ভেবে ভেবে লিস্ট করে রাখবে। কিন্তু তুফান বলেছে হাফ ইয়ারলির আগে আর কোথাও নিয়ে যাবে না। পরীক্ষার পরে আবার শুরু হবে ওদের নৈশ অভিযান। ততদিন শুধু মন দিয়ে পড়াশুনো।
জয়ঢাকি গল্প-উপন্যাসের লাইব্রেরি এইখানে