ধারাবাহিক অভিযান-আমার অভিযাত্রী জীবন(এপিসোড ৪)-স্বেন হেডিন-অনু-রাজীবকুমার সাহা-বর্ষা ২০২৫

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

সব পর্ব একত্রে-পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪

obhijanhedinheader

স্বেন হেডিন একাধারে একজন সুইডিশ ভূগোলবিদ, টপোগ্রাফার, অভিযাত্রী, ফটোগ্রাফার ও চিত্রশিল্পী। ১৮৬৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যু: ২৬ নভেম্বর, ১৯৫২, স্টকহোম।
এই আত্মজীবনীতে নিজের জীবনভর অভিযাত্রার দুর্ধর্ষ সব অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন হেডিন। রোমহর্ষক উত্তর মেরু অভিযানের নায়ক সুইডিশ অভিযাত্রী নর্দেনস্কিওল্ডকে দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং পনেরো বছর বয়সেই ভবিষ্যতে উত্তর মেরু অভিযাত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। পরে তাঁর অভিযাত্রার গতিমুখ পরিবর্তিত হয়ে এশিয়ার দিকে ধাবিত হয়। নিয়তির ফেরে কাস্পিয়ান সাগরতীরের ঝড়ের শহর বাকুতে আসেন আর সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করেন এশিয়ার পথে। শুরু হয় রাশিয়া, ককেশাস আর পারস্য হয়ে প্রায় সমগ্র এশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন। বাধাবিঘ্ন বিপত্তির সম্মুখীনও হন প্রচুর। তুলে ধরেন দেশীয় সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবরণ। গবেষণার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাচিত্র তারই সাক্ষ্য বহন করে। MY LIFE AS AN EXPLORER স্ভেন হেডিনের অসামান্য সৃষ্টি। ১৯২৬ সালে কাসেল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড-এর হাত ধরে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

।।দশ।।

সূর্যের আপন দেশ খোরাসান হয়ে

১৮৯০-এর সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখে দীর্ঘ এক কাফেলা পথে বেরিয়ে পড়লাম। পথটা তেহরান থেকে মেশহেদ অবধি বিস্তৃত। মাঝে চব্বিশটা স্টেশন পড়ে মোট। সূর্যের আপন দেশ খোরাসানের রাজধানী এই মেশহেদ। পারস্যের তীর্থযাত্রীদের প্রধান মাজার এইখানেই অবস্থিত।

সুদূর অতীতে জারেক্স ও দারিয়ুসের আমলে ডাক ব্যবস্থার প্রচলন ছিল এই পথে। তৈমুরের রাজত্বকালেও তাঁর ডাকবাহকেরা এই পথেই আসাযাওয়া করত। মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোও এখনকার মতোই ছিল, পরিবর্তন কিছু হয়নি।

এখানকার মাটিতে সেই অতীতের সুবাস। এখানেই পলাতক তৃতীয় দারিয়ুসকে এসে আটক করেছিলেন আলেকজান্ডার। এখানেই হারুন-অল-রশিদ তাঁর সুবিশাল বাহিনী নিয়ে এসে চারবার আক্রমণ করেছেন। এখানেই হিংস্র মঙ্গোলীয় উপজাতিরা লুঠতরাজ চালাবার পর লোকজনদের হত্যা করত। এখানেই নাদির শাহের অস্ত্রের ঝনঝনানি বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। আর এখানেই শতশত হাজার হাজার ক্লান্ত তীর্থযাত্রী মেশহেদের ইমাম রজার কবরস্থানের পথ ধরত।

রওনা হওয়ার দু-দিন আগে বৃদ্ধ শাহ্‌ নাসির-উদ্‌-দিনের কাছ থেকে বিদায় চাইতে গেলাম। তিনি তখন সুলতানাবাদের এক বাগিচার পথ ধরে পায়চারি করছেন। হাতে সোনায় মুঠ বাঁধা একটা বেতের লাঠি। আমার যাত্রা শুভ হোক বলেই ফের হাঁটতে শুরু করলেন একা একা। আর কিছু বললেন না। তাঁর প্রপৌত্রেরও প্রপৌত্র রাজত্ব করে গিয়েছেন পারস্যের এই সিংহাসনে। তিনি নিজে রাজ্য শাসন করেছেন আটচল্লিশ বছর। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর আটাশ বছরের মধ্যে চারটে প্রজন্ম বসেছিল এই সিংহাসনে।

এইবারে ৩,৬০০ মাইল পথ পাড়ি দেব বলে বেরিয়েছি। কখনও ঘোড়ার পিঠে, কখনও ঘোড়ায় টানা গাড়িতে, কখনো-বা যানবাহন বা ট্রেনে চলেছি। যথাসম্ভব মিতব্যয়ী থাকবার চেষ্টা করেছি। এই পথে আমার সর্বমোট খরচা পড়ল ২০০ পাউন্ড।

সঙ্গে তিনটে ঘোড়া আমার। একটার পিঠে আমি, আর একটা আমার মালপত্র বইছে আর শেষটা আমার সহিস ছেলেটির। পারস্য উপসাগরের পথে প্রত্যেক স্থানে ঘোড়া আর সহিস বদলি করতে হল।

খোরাসান তোরণ দিয়ে তেহরান থেকে বেরোলাম আমরা। হলুদ, নীল আর সাদা মসৃণ রঙের চারটে ছোটো ছোটো মিনার আছে এই তোরণটিতে। একটি মুদ্রা বকশিস পেয়ে দ্বাররক্ষী বলে উঠল, “সিয়ারেত মোবারক।” অর্থাৎ, শুভ তীর্থযাত্রা।

ডান পাশে তাকালে শাহ্‌ আবদুল আজিমের সমাধির চূড়াটি যেন এক স্বর্ণ-গোলকের মতো দেখায়। তার পাদদেশের গোলাকার টিলার ওপর নৈঃশব্দ্যের মিনার। বাঁ পাশে সেই দেমাভেন্দ, আবছা মেঘে ঢাকা। চূড়ায় শীতের তুষার মুকুট। ধু ধু প্রান্তরে ইতিউতি যাযাবরদের কালো কালো তাঁবুর গুচ্ছ। সন্ধের মুখমুখ কুবেদ গুমবেদ নামে এক গ্রামে পৌঁছলাম গিয়ে। যত রাজ্যের কুকুর আর বেড়াল এসে ঘিরে ধরল আমাদের। এদের নিয়েই সঙ্গে সন্ধেটা কাটল আমাদের।

যে-কোনো মুহূর্তে অশ্বারোহী ডাকবাহক এসে উঠতে পারে এখানে। সে এসে পরের ঘোড়াটি বেছে নিয়ে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমাদের পালটি ঘোড়া দেওয়া হবে না। শেষে মাঝ-রাত্তিরে আবার পথচলা শুরু হল আমাদের। টিকটিক হাঁটা থেকে দৌড় করালাম ঘোড়াদের। তারপর আবার হাঁটা। তাতে ঘোড়া তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হয়ে পড়ে না। মৃদু বাতাস বইছে। আকাশে কালপুরুষ ফুটেছে, চাঁদও উঠেছে। দূর থেকে ক্লান্ত কাফেলার ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই উটের ছায়া এসে পড়ল পথে।

পরদিনও প্রায় সারাক্ষণই পথ চলেছি। মাঝে মাঝে কাভেখানায় (কফিখানা) দাঁড়িয়েছি খানিকক্ষণের জন্যে। কখনও বিশ্রামরত কাফেলার মধ্যে গিয়ে বসেছি। কখনো-বা যাযাবরদের তাঁবুতে বসে দম নিয়েছি। এদের তামাটে-বাদামি ছেলেমেয়েদের কুকুর আর ভেড়াদের নিয়ে খেলা দেখেছি। কখন চোখ লেগে এসেছিল জানি না, হঠাৎ ‘লা ইলাহা ইল আল্লাহ্‌’ উচ্চনাদ কানে আসতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। সূর্য অস্ত গিয়েছে তখন। সন্ধে পাঁচটাতেও তাপমাত্রা ৯৩ ডিগ্রি।

দেহ্‌-ই-নমক নামের গ্রামে প্রথম ডাকবাহক এসে ধরল আমাদের। ছোকরা বেশ সভ্যভব্যই দেখলাম, একসঙ্গে যাবার প্রস্তাব দিল আমাকে। অতএব তাজা দেখে পাঁচটি ঘোড়া বেছে নিয়ে রাতারাতিই রওনা হয়ে গেলাম ফের। দেখা গেল বেশ ক’টি সমান্তরাল পথচিহ্নও রয়েছে আমাদের পথের পাশে। হাজার হাজার বছর ধরে উটের, ঘোড়ার খুরের আর মানুষের পদচিহ্ন। গ্রাম থেকে গ্রামান্তের পথ ধরে সেমনান হয়ে গুশেহ্‌ পর্যন্ত এগিয়ে গেলাম। পথে দেখা পেলাম সাদা আর সবুজ পাগড়ি মাথায় চব্বিশ জন দরবেশের। মেশহেদ থেকে নিজেদের ঘর শুশতেরে ফিরে চলেছেন তাঁরা। আর একদিন আবার শুভ্র-শ্মশ্রু বৃদ্ধ ক’জন তীর্থযাত্রীর সঙ্গে দেখা, এতটাই দুর্বল তাঁরা, উটের পিঠে পালকি চড়ে চলেছেন।

গুশেহতে দুটো মাত্র বাড়ি—একটা কাফেলা সরাই, আর অন্যটি স্টেশন বাড়ি। স্টেশন বাড়িটির ছাদ থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বদিকে এ-দেশের লবণ মরু কেভির দেখা যায়। যেন বরফে ঢাকা সমুদ্রটি। এর পাড়ে পাড়ে গোটা একটা দিন ঘোড়ার পিঠে ঘুরে বেড়িয়েছি আমি—চারদিকে সাদা একটা আস্তরণ, অপূর্ব দৃশ্য। একত্রিশ মাইল পথ অতিক্রম করবার পর যেখানটায় এসে দাঁড়ালাম, সেখানে লবণের আস্তরণ নয় সেন্টিমিটার পুরু। দক্ষিণে এই সাদা অঞ্চলটি দিকচক্রবালে গিয়ে মিশেছে। ষোলো বছর পর ফের দুটো আলাদা পথে ধরে এই দুর্দান্ত মরুভূমি অতিক্রম করেছি আমি।

আবারও কাফেলা পথ ধরে অল্প সময়ের মধ্যেই পাহাড়ি পথ থেকে নেমে গিয়ে পৌঁছলাম দমঘানে। সেখানে বেশ বাগবাগিচার সমাহার। নগরটি একসময় মোঙ্গোলেরা ধ্বংস করে দিয়েছিল। উঁচু উঁচু মিনারের সুন্দর এক মসজিদ রয়েছে এখানে। আর একটা পুরোনো মসজিদও আছে, জরাজীর্ণ। এতেও বেশ ক’টি দৃষ্টিনন্দন খিলান আর মঠ আছে।

এইখানে হঠাৎ মনস্থির করলাম, একবার অস্তরাবাদ ঘুরে আসি। এখান থেকে ষাট মাইল উত্তরে। সেখানে যেতে অলবুর্জ পর্বতমালা আর তার ঢালে ঢালে গভীর বন পেরোতে হবে আমাকে। একজন চারভাদর (কাফেলা যানচালক) আর দুটো ঘোড়া ভাড়া করে বেরিয়েও পড়লাম।

রওনা হয়ে দ্বিতীয় দিন ন্যাড়া পাহাড়ে ঘেরা চারদেহ্‌ নামে অভাবী এক গ্রামের পথে চললাম। কিন্তু চারভাদর আমাকে গ্রামে ঢুকতে দিল না, গাড়ি দাঁড় করাল কয়েকশো গজ দূরে এক বাগিচায়। সেই গ্রামে নাকি বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব। এই বাগিচা আবার পাঁচ ফুট উঁচু মাটির পাঁচিলে ঘেরা, দরজা নেই কোনও। অতএব পাঁচিল টপকেই ভেতরে ঢুকতে হল দুজনকে। একটা আপেল গাছের নীচে আমার ফরাস পেতে দিল চারভাদর। তারপর গায়ের কম্বল, অলস্টার আর বালিশ সাজিয়ে বিছানা পেতে দিল আমার। দুটো চামড়ার বাক্স এনে রাখল পাশে। এরপর দুটো ঘোড়া নিয়ে গাঁয়ের দিকে বেরিয়ে গেল ডিম, মুরগি, আপেল, রুটি ইত্যাদি কিনে আনতে। অল্প পরেই দুজন লোক সঙ্গে করে ফিরে এল সে। তারপর রাতের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম সবাই। খেয়েদেয়ে উদ্বৃত্তটুকু আমার বিছানার পাশের বাক্সে ভরে রেখে তিনজন আবার ফিরে গেল গাঁয়ে।

দিনের আলো যতক্ষণ পেলাম বিছানায় বসে লিখে চললাম। একটা প্রাণীও চোখে পড়ছে না কোথাও। থেকে থেকে কোন দূরে শুধু কুকুরের ডাক কানে আসছে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে শুয়ে পড়লাম।

হঠাৎ মাঝ-রাত্তিরে ঘুম ভেঙে শুনি আমার বাক্স থেকে কেমন খচরমচর আওয়াজ আসছে। উঠে বসে কান পেতে রইলাম। সঙ্গে সঙ্গে আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেল, চারদিক যে-কে-সেই নিঝুম। ঘুমিয়ে পড়লাম আবার। কিছুক্ষণ বাদেই ফের উঠে বসতে হল, এইবারে চামড়ার বাক্সে কেমন আঁচড়ানোর শব্দ উঠছে। চারদিকে পরখ করতে গিয়ে তারার আলোয় আধা ডজন শেয়াল আবছা নজরে এল। ভাবসাব কেমন অস্থির, সবক’টা পাঁচিলের ছায়ার আড়াল নিয়েছে। আমার ঘুম-টুম সব ছুটে গিয়েছে ততক্ষণে, দৃষ্টি খর হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে আমার পেছনে পায়ের শব্দ পেলাম এদের। চারদিকের খোলা মাঠ থেকে ততক্ষণে আরও ক’টা এসে জুটেছে দলে।

শেয়াল নিরীহ প্রাণী, সাধারণত তেমন কিছু অনিষ্ট করে না বলেই জানি। কিন্তু এ-মুহূর্তে আমি একা, হলপ করে কিছুই বলা যায় না। কী আর করি, সময়টা কাটাতে বাকি খাবারটায় মন গেল। কাছে গিয়ে দেখি এক আপেলগুলো বাদে কিচ্ছুটি আর নেই, ব্যাটারা সব সাফ করে রেখেছে কখন। ধীরে ধীরে সাহস বেড়ে চলেছে দলটার। এইবারে আমার পাতা বিছানার দিকে গুটি গুটি এগোচ্ছে দেখে একটা আপেল তুলে নিয়ে সর্বশক্তি একত্র করে ছুড়লাম পালটাকে লক্ষ্য করে। ব্যথার গোঙানির মতো আওয়াজ উঠল একটা, নিশাচর যমদূতগুলো কোনও একটার গায়ে লেগেছে নিশ্চয়ই। তাতে ফল হল উলটো। আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল দলটা। শেষে ঘোড়ার চাবুক একটা টেনে নিয়ে চামড়ার বাক্সগুলোর গায়ে সপাং সপাং মারতে শুরু করলাম ভয় দেখাতে। সময় যেন থেমে গিয়েছে, কাটতেই চায় না। জোর করে শুয়ে পড়তে পারতাম, কিন্তু মাথার ওপর অমন মূর্তিমান বিপদ নাচলে কারই-বা ঘুম আসে।

একসময় ভোর হল শেষে। চারদেহেতে মোরগের ঘুমভাঙানি ডাক শোনা গেল। আলো ফুটতেই শেয়ালেরা সব পাঁচিল ডিঙিয়ে পগারপার হয়ে গেল, আর ফিরে এল না। আমারও চোখ জুড়ে ঘুম নেমে এল। চারভাদর এসে ডাকাডাকি করে ওঠাল। পরবর্তী ক্যাম্পে বসে এই শেয়াল সম্পর্কে বেশ কিছু ঘটনা শুনলাম। অনতিপূর্বেই খচ্চরের পিঠে গ্রামান্তরে যাচ্ছিল একজন। দশটা শেয়ালের এক দল পিছু নিল। লোকটাকে অনেক কষ্টে তাড়াতে হয়েছিল ওগুলোকে। হিংস্র শেয়ালের দলের শিকার হয়েছে এমন লোকজনের ঘটনাও শোনা গেল।

জুনিপার বন দিয়ে চলেছি আমরা। রাতে খোলা আগুন জ্বেলে ঘুমিয়েছি। তারপর ওক, প্লেন আর জলপাইয়ের গভীর বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গিয়েছি। উঁচু উঁচু খাড়া গিরিচূড়া হয়ে পথ। উত্তরে উপত্যকাগুলো সব সাদা কুয়াশায় ঢাকা। একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ ইয়োমুদ তুর্কিজাতির বাসভূমি পেরিয়ে অস্তরাবাদ পৌঁছলাম অবশেষে। প্রবেশদ্বারের নামটিও এই প্রদেশের নামেরই অনুরূপ—মাজারদরান।

রুশ বাণিজ্য দূতের অতিথি হয়েই এখানে রয়ে গেলাম ক’দিন। শাহের জন্মদিন উপলক্ষে নগরপালের নিমন্ত্রণ পেলাম। অনুষ্ঠানটি জীবনে ভোলবার নয়। অপূর্ব সব আতসবাজির খেল দেখলাম সে-রাতে। অশ্বারোহীর দল কাগজের ঘোড়া বানিয়ে খেলা দেখাচ্ছে, হাতে হাতে আলকাতরায় রঙ করা কাঠের বর্শা। বাজনদারের মন্দিরা, বাঁশি, নাকাড়া, ঢোলে ঝংকার তুলেছে। ছেলেপিলেরা মেয়েদের সাজে নাচ করছে। কোরানের নির্দেশের তোয়াক্কা না করেই অল্পস্বল্প মদিরা পানও চলছে।

 সুদৃশ্য বনজঙ্গল আর খাড়া বিপজ্জনক গিরিপথ ধরে আবার এগিয়ে চলেছি। পথ গিয়েছে পুবে। বস্তাম এবং শাহরুদ নগর থেকে ফের মূল কাফেলা রাস্তায় পড়েছি আমরা। বস্তামে গোটাকতক পুরোনো দালান চোখে পড়ল। সবজেটে চিনেমাটিতে টুকরোতে মোড়া। সুলতান বাজাজেত নামে একটা মসজিদও দেখলাম। আর আছে বেপমান কেল্লা নামে দুটো মিনার।

তারপর সামান্য ঢেউখেলানো প্রান্তর আর খাড়া গিরিপথ পেরিয়ে পুবদিকের পথ ধরলাম আমরা। উত্তরে তুর্কিদেশের ঠিক সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে এক পর্বতমালা। বেশি নয়, পঞ্চাশ বছর আগেও তুর্কিদের নামে এই অঞ্চলের মানুষজনের বুকে কাঁপন ধরত। পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ঢুকে তারা লুঠতরাজ চালাত। গাঁ উজাড় করে ধনসম্পদ, গবাদি আর দাস নিয়ে ফিরে যেত। ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল দাস বাণিজ্য। ১৮২০-তে রুশ রাষ্ট্রদূত মুরাভিফ খিভাতে থাকাকালীন পারস্য আর রাশিয়ার মিলে ত্রিশ হাজার দাস ছিল এখানে। যেসব খ্রিস্টানরা ইসলাম ধর্ম প্রত্যাখান করত, জ্যান্ত পুঁতে ফেলা হত তাদের। অথবা কানে গজাল মেরে টাঙিয়ে রাখা হত দেওয়ালে। দীর্ঘ অনশনে মৃত্যু হত তাদের। ১৮৮১-তে স্কোবেলেফ জিওক-টিপ অধিকার করবার পর পঁচিশ হাজার মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।

যত এগোচ্ছি পথের ধারে কেল্লার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। সে এক-একটা প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ফুট উঁচু, স্থানীয়রা বুর্জ বলে। এই কেল্লাগুলো একসময় পার্সি প্রহরীদের দখলে ছিল। ওতে দাঁড়িয়ে উত্তর এবং পূর্বদিকে নজরদারি চালাত এরা। বিপদ দেখলে কাছাকাছি গ্রামবাসীদের সতর্ক করত সময় থাকতে পালিয়ে যেতে বা লুকিয়ে পড়তে। অঞ্চলটা জা-ই-কুফ নামে পরিচিত, যার অর্থ সন্ত্রাসের আস্তানা। কারণ একটাই, লুঠেরা গোকলান তুর্কি উপজাতির আতঙ্ক।

মরুভূমির মধ্যিখানে মিয়ানদশ্ত নামে কাফেলা সরাই আছে একখানা। নিঃসন্দেহে মুসলমান সরাইখানাগুলোর মধ্যে অন্যতম বড়ো এটিই। পূর্ব-পশ্চিম থেকে আসা যতসব কাফেলার বিরামস্থল। তীর্থযাত্রীরাও এক-দু’দিনের জন্যে বিশ্রাম নেয় এখানে। ছেলে কাঁখে স্ত্রীলোকে, নানা দরবেশে, সৈন্যসামন্তে আর ব্যাপারী-বণিকে গমগম করে সরাই। রঙবেরঙে ছয়লাপ। কেউ দেখা গেল একটু বেশি সুবিধের জায়গা পেতে ঝগড়া করছে, কেউ উঠোনের কুয়ো থেকে জল টেনে আনছে, কেউ-বা ছোটো ছোটো খুপরি দোকান থেকে ফল-ফলাদি সওদা করছে। একদিকে একটা কাফেলা রওনা হওয়ার তোড়জোড় করছে, অন্যদিকে দেখা গেল আর এক কাফেলা পৌঁছে উটের বাঁধন আলগা করতে লেগেছে। ওদিকে সম্ভ্রান্ত এক নারীকে দেখি তখতারেভনে (দুই খচ্চর বাহিত সেডান চেয়ারের মতো) বসে পদাতিক আর অশ্বারোহী বেষ্টিত হয়ে সরাইখানায় প্রবেশ করছেন।

এখান থেকে পুবে তাকালে মরু প্রান্তরই চোখে পড়ে কেবল। মরতে বসা একটা উট পেরিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। তার মনিব ফেলে দিয়ে গেছে তাকে। পথে চারজন দরবেশের সঙ্গে দেখা হল, নিজেদের জুতো কাঁধে ফেলে হেঁটে চলেছে তারা, পা খালি। অনেকক্ষণ ধরে একদল কাক আমাদের আগে আগে উড়ে চলল আগুয়ান প্রহরীর মতো। পেছন ফিরে দেখি, সরাইয়ের যে ওপরতলার ঘরটায় রাত কাটিয়েছি আমি, ধুলোর ঘূর্ণি গিয়ে পাক খাচ্ছে তাকে ঘিরে।

এরপর সবজেবর গিয়ে ঢুকলাম আমরা। একে শাকসবজির নগর বলা হয়। পনেরো হাজার লোকের বাস এখানে। দুটো বড়ো আর ছোটো ছোটো বেশ ক’টা মসজিদ আছে। বরগাওলা ছাতের নীচে বাজার বসেছে। প্রকারে এবং পরিমাণে সদাইপত্র পর্যাপ্তই। একটা খিলান বা কেল্লার ধ্বংসাবশেষও দেখা যাচ্ছে। যদিও তুর্কিরা এখন আর লুঠতরাজ করতে আসে না।

অত্যন্ত লজ্জাজনক আর একটা জিনিস দেখলাম—আফিমের আখড়া। মাটির নীচে গুহার ভেতর এইসব আস্তানা। এক আর্মেনীয়কে সঙ্গে করে একটার ভেতর গিয়ে ঢুকলাম আমি। মেঝেতে পাতা ফরাসে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে দুজন লোক দেখি ধূমপান করছে। লম্বা একটা নলে মাটির এক থেলো লাগানো, তাতে আবার এক ছিদ্র—এতেই আফিম খাওয়ার ব্যবস্থা। সেই ছিদ্রে বড়ো মটরদানার মতো আফিমের গুলি ঢুকিয়ে জ্বলন্ত আগুনে ধরা হয়। তারপর আফিমসেবীরা এই বিষাক্ত ধোঁয়া টেনে খায়। একের পর এক গুলি ঠোসা হয় তাতে। ধীরে ধীরে মৌতাত জমে ওঠে আর আফিমখোরও স্বপ্নের দেশে পাড়ি দেয়। এর মধ্যেই চারজন দেখি বেহুঁশ হয়ে অন্ধকার দেওয়ালের পাশে পড়ে আছে। সামান্য ক’বার আমিও ফুঁকে দেখলাম, কেমন শিং পোড়া গন্ধ।

নিশাপুর যাবার পথে দুশো সাঁইত্রিশটি উটের এক বাণিজ্য কাফেলার দেখা পেলাম। তীর্থযাত্রীর দলও রয়েছে একটা সঙ্গে। জনা দশেক মেয়েমানুষ কাজেভেহ্‌-তে (মুটের ঝাঁকা) করে চলেছে। খচ্চরের পিঠে পুরুষেরা ঘুমিয়ে আছে। এক মৌলবি তীর্থযাত্রীর দলটাকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। ইমাম রেজার মাজারে যাবে এরা। পথে অপরাপর পবিত্র স্থানেরও দর্শন করবে।

আমার পরের গন্তব্য নিশাপুর। গোটা প্রাচ্যদেশে এই নগরী উৎকৃষ্ট মানের নীলকান্তমণির জন্যে বিখ্যাত। উত্তরে বিনালুদ পর্বতমালায় সোনা, রূপা, তামা, দস্তা, সিসা আর পান্নার সম্ভার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই নিশাপুর নগরী বারংবার যেমন ধ্বংস হয়েছে, তেমনি আবার গড়েও উঠেছে। খোদ আলেকজান্ডারই একসময় ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন এই নগরী।

দিন কতক পর গিয়ে হাজির হলাম টিপ-ই-সলাম পাহাড়ে। দলে দলে তীর্থযাত্রী মেশহেদের দিকে মুখ করে নমাজ পড়ে এখানে। শহিদের ভূমি মেশহেদ। এই পাহাড় থেকেই ওই পবিত্র নগরী চোখে পড়ে। হাজার হাজার উঁচু উঁচু শিলাস্তূপের স্মৃতিস্তম্ভে তীর্থযাত্রীরা একটা করে পাথর গুঁজে দিয়ে আসে তাদের আন্তরিক শ্রদ্ধার অভিজ্ঞান হিসেবে।

॥ এগারো॥

শহিদ নগরী মেশহেদ

বহু ইতিহাস-বিখ্যাত মানুষজনের সমাধিস্থল এই মেশহেদ। আরব্য রজনী-খ্যাত খলিফা হারুন-অল-রশিদ এক বিদ্রোহ দমন করতে যাবার পথে এখানেই দেহরক্ষা করেন।

নয় বছর পর অষ্টম ইমাম, ইমাম রেজাও মেশহেদেই সমাধি নেন। পার্সি মুসলমানেরা শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। আলি এবং তাঁর পরবর্তী এগারোজন বংশধর এই সম্প্রদায়ের ইমাম হিসেবে মনোনীত হন। শুরুতে আলি এবং তাঁর দুই পুত্র হুসেন ও হাসান ইমাম নিযুক্ত হন প্রথম। ইমাম রেজা ছিলেন অষ্টম ধাপের। আর অল-মেহদি (ইনি বেশ রহস্যময় পুরুষ ছিলেন) দ্বাদশতম। এই মানুষটি গোটা পৃথিবীতে মহম্মদী সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

তৃতীয় সমাধিটা নাদির শাহের। তাতার দস্যু ছিলেন তিনি। খোরাসানকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। এই দুর্ধর্ষ শক্তিশালী মানুষটি দ্বিতীয় শাহ্‌ তহমাস্পের পক্ষে দাঁড়িয়ে ফের তুর্কিদের হাত থেকে এই গোটা অঞ্চলটা ছিনিয়ে আনেন। চতুর্দিকে পারস্যের সীমান্ত বৃদ্ধিতে মন দেন। তারপর একদিন পারস্য সম্রাটকে হত্যা করে স্বয়ং সিংহাসনে আরোহণ করেন। ১৭৩৯ সালে দিল্লিতে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেন এই নাদির। প্রাণাশঙ্কার বশবর্তী হয়ে নিজ পুত্রের চোখ উপড়ে ফেলতেও এতটুকু হাত কাঁপেনি তাঁর। শিরশ্ছেদ করে মানুষের মুণ্ডু দিয়ে মসজিদের ছাদে ছাদে পিরামিড গড়েছিলেন তিনি। নিজ গৌরব-বার্তা অঙ্কিত মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন—‘হে মুদ্রা, দিকে দিকে ঘোষণা করে দাও যে গোটা পৃথিবীটা জয় করবার ক্ষমতা রাখে নাদির।’ ১৭৪৭-এর বসন্তকালে মেশহেদের সীমান্তে সৈন্যসমাবেশ ঘটালেন নাদির শাহ্‌। তাঁর পার্সি সেনা ও শাহি কর্মচারীদের প্রতি ক্রোধান্বিত হয়ে সংকেত পাওয়া মাত্র তাদের হত্যা করবার আদেশ দেন। কিন্তু এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হল। কারণ তুর্কি, উজবেগি আর তাতার ঘাতকেরা গোপনে নিজ নিজ অস্ত্রে শান দিতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল। অতএব শত্রুপক্ষের এইবারে নাদির শাহকে হত্যা করা ছাড়া আর কোনও উপায় রইল না। সালে বেগ নামে এক প্রহরী সর্দার রাতের অন্ধকারে শাহি তাঁবুতে ঢুকে নাদিরের শিরশ্ছেদ করল। জমকালো এক সমাধি তৈরি করে কবর দেওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু বর্তমান শাহি প্রাসাদের (কাজর) নির্মাতা আগা মহম্মদ খাঁ ১৭৯৪ সালে সিংহাসন আরোহণ করেই নাদিরের সমাধি খুঁড়ে দেহাবশেষ কুকুর দিয়ে খাওয়ালেন। কথিত আছে, নাদিরের দেহাবশিষ্টাংশ নাকি বর্তমানে চারটে তুঁতগাছের ছায়ায় এক পাথরের নীচে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে।

তীর্থস্থলের মাহাত্ম্য এই যে অজান্তেই সে এক নগরীর জন্ম দেয় নিজেকে ঘিরে। মেশহেদও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে এই নগরীর সবচাইতে দৃষ্টিনন্দন বস্তু হচ্ছে বিভিন্ন সমাধির ওপর নির্মিত আট ফুট উঁচু চকচকে গম্বুজ। সমাধিগুলোর সদরের বহির্ভাগ এবং মিনারগুলো সব রঙবেরঙের চিনেমাটির টুকরো সেঁটে পলিশ করা। বাইরের চত্বরে তিন হাজার তীর্থযাত্রীর জন্যে জায়গায় জায়গায় ছায়াকুঞ্জের ব্যবস্থা। দেওয়ালের খাঁজে খাঁজে অগুনতি পায়রার বাস। তৈমুর খাঁর প্রিয়তম বেগম নির্মিত দুই মিনারযুক্ত নীল গম্বুজের এক মসজিদও রয়েছে এখানে। অপরিমিত ধনসম্পদের খনি এইসব ইমারত। আমি যখন গিয়েছিলাম, শুনেছি এক লক্ষ তীর্থযাত্রী মেশহেদে আসে প্রতিবছর। আর দশ হাজার শবদেহ ইমামের সমাধির আশেপাশে কবর দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য, পুনরুজ্জীবনের দিনে তিনি যেন এঁদের হাত ধরে বেহেশতে নিয়ে যেতে পারেন। শেয়ালের দল কবরস্থানের আশেপাশে ঘুরঘুর করে। রাতের বেলায় নগরে ঢুকে বাগ-বাগিচা অবধি চলে আসে। এখানকার হাজার আটেক অধিবাসীদের মধ্যে পাঁচ ভাগের তিন ভাগই হচ্ছে মোল্লা-মৌলবি, ফকির-দরবেশ আর তীর্থযাত্রীর দল। কবরস্থানের পাশে দরিদ্র ভোজন করানো হয়। রয়েছে চিকিৎসারও চমৎকারিত্ব। অন্ধজনে দৃষ্টি ফিরে পায়, পঙ্গু উঠে দাঁড়ায়।

এই পবিত্র ভূমির যাবতীয় পথ শেকলবদ্ধ থাকে। দণ্ডার্হ অপরাধীরাও এখানে সুরক্ষিত। নিজ পাপ স্বীকার করা খুনে বা ডাকাতেরাও নির্বিঘ্ন আশ্রয়ের সুবিধে ভোগ করতে পারে।

রোজ প্রভাতে সূর্যকে অভ্যর্থনা জানাতে নগাড়া-খানেহ্‌ বা ডঙ্কা মিনার থেকে আশ্চর্য এক বাজনা বেজে ওঠে। আবার বাজে রোজ সন্ধেতে খোরাসানের পশ্চিম দিগন্তে অস্ত যাবার বেলায়।

॥ বারো॥

বোখারা ও সমরখন্দ

অক্টোবরের মাঝামাঝি। শরৎ আসন্ন। তিনটে ঘোড়া আর একজন চারভাদরকে সঙ্গে করে মেশহেদ ছেড়ে রওনা হলাম। চলেছি হেসার-মসজিদ পর্বতমালার অত্যন্ত সংকীর্ণ পথে, অজস্র গিরিসংকট পার হয়ে। কেলাৎ-ই-নাদির নামে প্রাকৃতিক এক কেল্লাও পেরিয়ে এলাম। অঞ্চলটা ট্রান্স-কাস্পিয়ান রেলওয়ের উত্তরে পড়ে। চলতে চলতে কাহকা স্টেশনে এসে পৌঁছলাম শেষে।

ট্রান্স-কাস্পিয়ান অঞ্চলের রাজধানী আস্কাবাদ। সেখানকার মিলিটারি নগরপাল জেনারেল কুরোপাতকিন আমার পূর্বপরিচিত, দেখা করলাম তাঁর সঙ্গে। প্লেভনাতে রুশ-তুর্কি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ট্রান্স-কাস্পিয়ান অঞ্চলের বিজয় অভিযানেও দলে ছিলেন। জাপান যুদ্ধেও রুশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন। পরবর্তীকালে সমরখন্দ, তাশখন্দ ও সেন্ট পিটার্সবার্গেও বারকয়েক দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। আমার পথকষ্ট লাঘব করতে যথেষ্ট অবদান ছিল তাঁর। কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি তাঁকে।

আস্কাবাদের চারদিকে প্রচুর ঘোরাঘুরি হল। তুর্কিরা দেখলাম যাযাবর-বৃত্তি ছেড়ে অনেকাংশেই চাষাবাদে মন দিয়েছে। গাঁয়ের আশেপাশে প্রচুর চাষ ভূমি তৈরি করেছে তারা। আনাউতে দারুণ সুন্দর এক মসজিদ দেখতে পেলাম। এরও সদরের দিকটা চিনেমাটির টুকরোতে সাজানো। তবে এই মসজিদের বিখ্যাত জিনিস হচ্ছে দারুণ সজ্জায় রচিত হলুদ চিনে ড্রাগন। সেখান থেকে কারা-কুম মরুভূমি প্রথম দেখি আমি। সে এক কালো রঙের বালির মরু। পুবে আমু-দরিয়া, পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর, উত্তরে আরাল সাগর আর দক্ষিণে খোরাসানের মাঝে তার অবস্থান। এইখানটায় জংলি গাধা, শুয়োর, বাঘ এবং শেয়ালের রাজত্ব। তুর্কিস্তানের বেশ কিছু অংশ ততদিনে রাশিয়ার দখলে চলে গেছে। খিভা এবং কাস্পিয়ান সাগরের গোটা পূর্ব তট জারের অধীনে। মধ্যবর্তী অঞ্চলটা অর্থাৎ কারা-কুম মরুভূমি তখনও জয় করার বাকি। এখানকার মরূদ্যানগুলোতে তেক্কে-তুর্কি দলের বাস।

শুরুতে কিন্তু রুশ বাহিনী জোর ধাক্কা খেয়েছিল এখানে। তাদের আঠারো হাজার উটের মধ্যে সতেরো হাজারই মারা পড়েছিল এখানকার অধিবাসীদের হাতে। গর্জে উঠেছিল তুর্কিরা। রুশ বাহিনীর স্থির করল, ভয়ংকর এক শিক্ষা দিতে হবে তুর্কিদের, আজীবন মনে থাকে যাতে। অতএব স্কোবেলেফ এমন এক সিদ্ধান্ত নিলেন যা এশিয়ার যুদ্ধ ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ঘটনাবলির একটি। লেলিনের সময়কালে নাম-নিশানা মিটিয়ে দেওয়া হল এ-অঞ্চলের তুর্কিদের।

ফলত ১৮৮০-র ডিসেম্বরে সাত হাজার সৈনিক আর সত্তরখানা বন্দুক নিয়ে স্কোবেলেফ রওনা হলেন সেই মরুভূমির পথে। ওদিকে জেনারেল আনেনকোফ অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সার ধরে একের পর এক চলন্ত বালিয়াড়ির আড়াল নিয়ে সেনাবাহিনীর রসদ জুগিয়ে গেলেন। তুর্কিরা আনেনকোফকে ‘সামোভর পাশা’ বলে ডাকে, আর তাঁর রসদবাহী শকটগুলোকে বলে ‘শয়তানের গাড়ি’। আখাল তেক্কে তুর্কিদের পঁয়তাল্লিশ হাজার জনের বড়ো এক দল জান লড়িয়ে দিয়েছিল এই যুদ্ধে। দশ হাজার সশস্ত্র অশ্বারোহীর দল ছিল এর মধ্যে। নারী আর শিশুদল মিলিয়ে এক শ্রেণিবদ্ধ লড়াকুর দল রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল গিওক-টিপির কেল্লায় (সবুজ পাহাড়)। এই কেল্লার চারদিক ছিল মাটির পাঁচিলে ঘেরা। তুর্কিদের সর্দার ছিল মকদুম কুলি খাঁ। রাইফেল, বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র আর একখানা কামান ছিল এই দলে। কামান থেকে পাথরের গোলা ছোড়া হত।

১৯৮১-র জানুয়ারিতে কেল্লার কাছাকাছি এসে পাঁচিলের গোড়ার মাটি খুঁড়তে শুরু করল রুশ বাহিনী। উদ্দেশ্য, মাইন পেতে পাঁচিলের ফাটল ধরানো। ওদিকে তুর্কি বাহিনী বুঝল পাঁচিল খুঁড়ে গর্ত করে একে একে রুশ সেনা ঢুকবে ভেতরে। তারা খোলা তলোয়ার হাতে পাঁচিল ঘেঁষে পাহারায় বসল। একে একে হামাগুড়ি দিয়ে রুশ সেনা ঢুকতে শুরু করলেই কচুকাটা করবে। তারপর এল সেই বিধ্বংসী দিন। কয়েক টন বারুদের আচমকা বিরাট এক বিস্ফোরণ হল পাঁচিলের ও-পারে। হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল কাদা মাটির পাঁচিল। তিন দলে বিভক্ত রুশ সেনা ঢুকে পড়ল ভেতরে। দুটি দলের সেনাপতি ছিলেন দুজন—কুরোপাতকিন ও স্কোবেলেফ। সাদা এক ঘোড়ার পিঠে স্কোবেলেফ, পরনেও সাদা উর্দি, কুঞ্চিত কেশ—এমন আতর ছিটিয়েছেন গায়ে যেন বিয়ে করতে চলা বরটি। পেছন পেছন কুচকাওয়াজের সুর তুলেছে সেনাবাহিনীর বাজনদারেরা। এক লপ্তে কুড়ি হাজার তুর্কির প্রাণ গেল। পাঁচ হাজার নারী, শিশু এবং পার্সি দাসকে রেহাই দেওয়া হল। ওদিকে মাত্র চারজন রুশ আধিকারিক ও পঞ্চান্ন জন সৈনিকের মৃত্যু হল। এই যুদ্ধের দীর্ঘদিন বাদেও রুশ সেনাবাহিনীর বাদ্যে বিলাপ করে কাঁদত তুর্কিরা। কারণ, এদের এমন একটাও ঘর বা পরিবার ছিল না যারা সেই গিওক-টিপির যুদ্ধে স্বজনহারা হয়নি।

এর কয়েক বছরের মধ্যেই রুশেরা হেরাত থেকে একদিনে যাওয়া চলে এমন দূরত্ব অবধি তুর্কিদেশটা ছিনিয়ে নিল। এদিকে ভারতবর্ষে তখন ইংরেজ রাজত্ব। রুশজাতির এই আগ্রাসন কাঁপন ধরিয়ে দিল তাদের।

১৮৮৮-তে সমরখন্দ অবধি ৮৭০ মাইল দীর্ঘ রেলপথ চালু হয়ে গেল। আর অক্টোবরের শেষাশেষি আমিও ওই পথে মার্ভের মরূদ্যান অবধি রওনা হলাম। আমাদের দেশের আভেস্তাতে একে মোরু বলা হয়। এখানে দারিয়ুস হিস্টাপেসের একজন সত্রাপ, অর্থাৎ অধস্তন কর্মচারী মার্গা নিযুক্ত ছিলেন এখানে।

মার্ভ জায়গাটা তুরান আর ইরানের সীমান্তে অবস্থিত। হাজার হাজার বছর ধরে একের পর এক শাসক রাজত্ব করে গেছেন এখানে। পঞ্চম শতাব্দীতে উচ্চস্তরের একজন নেস্টোরিয়ান ধর্মযাজক বাস করতেন মার্ভে। ৬৫১ সালে সর্বশেষ সাসানীয় শাসক তৃতীয় ইয়েজদিগার্ড চার হাজার অনুগামী নিয়ে এখানে পালিয়ে এসেছিলেন। সঙ্গে এনেছিলেন প্রজন্মবাহিত পবিত্র আগুন। তারপর তাতারেরা মার্ভকে ধূলিসাৎ করে দেয়। দৌড়ে পালিয়ে যান রাজা। এক ঘানিওলার কাছে আশ্রয় চান। মূল্যের বিনিময়ে সে রাজিও হয় রাজাকে লুকিয়ে রাখতে। ইয়েজদিগার্ড নিজের তলোয়ার আর বহুমূল্য খাপখানা তুলে দেন ঘানিওলার হাতে। কিন্তু সে-ব্যাটার নজর ছিল রাজার জমকালো পোশাকের দিকে। রাত গভীর হলে তাঁকে হত্যা করে সে। কিন্তু অচিরেই তাতারেরা এসে টুকরো করে ফেলে ঘানিওলাকে।

আরবি পণ্ডিত জাকুত এই মার্ভের পাঠাগারে বিদ্যাশিক্ষা করেছিলেন। এখানকার নির্মল জল, রসালো খরবুজ আর তুলতুলে বস্ত্রের প্রশস্তিও রচনা করেছিলেন। ১২২১-এ চেঙ্গিজ খাঁর পুত্র তুলাই এই অঞ্চলটাকে শ্মশানে পরিণত করেন। আর ১৩৮০-তে এই মরূদ্যান তৈমুর লঙের দখলে আসে। তবে মার্ভের তুর্কিরা স্বভাবে ছিল ভয়ংকর। বলা হয়, বিষাক্ত সাপ ও কোনও মার্ভির সঙ্গে যদি দেখা হয় তাহলে আগে সেই মার্ভিকে খতম করা উচিত, সাপ পরে।

আমি মার্ভে ছিলাম যখন, রোববার করে একটা বাজার বসত এই মরূদ্যানে। বিভিন্ন স্থানীয় শিল্পকলার পসরা আসত বাজারে। বিশেষত দারুণ সুন্দর সব ফরাস—রক্তরঙা লালের ওপর সাদা কারুকাজের সারি। সে-সব খোলা আকাশের নীচে অথবা ত্রিপল খাটানো দোকানে দোকানে বিক্রি হয়। এই ভিড়ভাট্টা আর তুমুল হই-হট্টগোলের মধ্যেও পশমের টুপি মাথায় লম্বাচওড়া মানুষজন, ব্যাক্ট্রীয় উটের পাল, প্রসিদ্ধ তুর্কি ঘোড়া—এদের মাথায় আবার জবরজং সাজ, লিকলিকে ঘাড়-গর্দান; ঘোড়সওয়ারের দল, কাফেলা আর পশুবাহিত যানবাহন ইত্যাদি মিলিয়ে এক মনোহর দৃশ্য চোখে পড়ে। যেমনটা মনোহর এখানকার বিভিন্ন ধ্বংসস্তূপ আর পুরোনো মার্ভের (বৈরাম আলি) গম্বুজ।

মার্ভ থেকে চলন্ত বালিয়াড়ির মধ্য দিয়ে রেলপথ। সাক্সাউল, ঝাউ এবং অন্যান্য মরু ঝোপ জন্মায় এইসব বালিয়াড়ির মাথায়। উড়ন্ত বালি এসে রেললাইন ঢেকে যাওয়াকে প্রতিহত করে সেগুলো। দুই ভার্স্ট লম্বা এক কাঠের ব্রিজ পেরিয়ে বিশাল আমু-দরিয়া পাড়ি দিল আমাদের ট্রেন। পামির মালভূমি থেকে নেমে ১৪৫০ মাইল পেরিয়ে আরাল সাগরে গিয়ে মিশেছে এই নদী।

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিম এশীয় সংস্কৃতি আর ইতিহাসের পরবর্তী যে পীঠস্থান আমার গন্তব্য, সে হচ্ছে বোখারা-ই-শরিফ। সেই বোখারা, পৃথিবীর প্রসিদ্ধ নগরগুলোর একটি—যাকে এশিয়ার রোম বলে আখ্যায়িত করা হয়।

গ্রিক, আরবি আর মঙ্গোলীয় সেনার দল বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুরমুশ করে গিয়েছিল গোটা অঞ্চলটাকে। এখানটায় গ্রিকদের সোগডিয়ানা আর রোমানদের ট্রান্সোক্সিয়ানা সভ্যতা ছিল একসময়। একাদশ শতাব্দীতে ধ্রুপদি শিক্ষার কেন্দ্র ছিল এই বোখারা। প্রবাদ আছে যে, ‘পৃথিবীব্যাপী ওপর থেকে আলো এসে পড়ে। আর বোখারায় সে আলো নীচে থেকে ক্রমপ্রসারিত হয়।’ এই প্রসিদ্ধ নগর এবং তার পার্শ্ববর্তী নগর সমরখন্দের সম্পর্কে বহু শায়রি লিখে গেছেন হাফিজ। তার একটি যেমন—

‘Agger on Turk-i-Shirazi bedast dared dill i ma ra
Be khal-i-hindu bakshem Samarkand va Bokhara ra.’

এর অনুবাদ (ক্যালকাটা সংস্করণ) করলে দাঁড়ায়—

‘শিরাজের কোনও বীরাঙ্গনা আমাদের হৃদয় জয় করে নেয় যদি,
চিবুকের ওই কৃষ্ণ কালো তিলটির জন্যে তার পায়ে সমরখন্দ আর বোখারা লুটিয়ে দিতে পারি আমি।’

একশো পাঁচখানা মাদ্রাসা, অর্থাৎ ধর্ম শিক্ষার স্কুল, তিনশো পঁয়ষট্টিটি মসজিদ রয়েছে বোখারায়। সেখানকার বিশ্বস্ত প্রতিনিধিরা সারাবছরই একদিন করে পৃথক মসজিদে গিয়ে নমাজ পড়ে।

চেঙ্গিজ খাঁর হাত থেকে রক্ষা পায়নি এই নগরও। একসময় অধিকার করেছিলেন তৈমুর লঙও। ১৮৪২-এ কর্নেল স্টোডার্ট ও ক্যাপ্টেন কন্নোলি বোখারায় বেড়াতে আসেন। তৎকালীন আমির নাসির-উল্লাহ্‌ ছিলেন বড়ো নিষ্ঠুর মানুষ। ইংরেজ দুজনকে বন্দি করে অকথ্য অত্যাচার চালান তিনি। তারপর কুখ্যাত কীট-মূষিক কূপে ফেলে শিরশ্ছেদ করা হয়। ১৮৬৩-তে ভ্যামবেরি এক দরবেশের ছদ্মবেশে এ-দেশে ঢুকে এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো অবগত করান।

এখানে স্পষ্টতই মিশ্র সম্প্রদায়ের বসতি পরিলক্ষিত হয়। সবচাইতে উঁচু স্তরে রয়েছে ইরানি বংশোদ্ভূত তাজিকরা। শিক্ষিত সমাজ আর ধর্মগুরুরা সব এই শ্রেণিরই লোকজন। আছে মঙ্গোলীয় জাতির উজবেগি ও জাগগাতাই তুর্কি সম্প্রদায়। আর আছে সার্ত—এক মিশ্র জাতি। সমাজে এরা সাধারণ সম্প্রদায় এবং স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত। এছাড়া পার্সি, আফগান, কিরগিজ, তুর্কি, তাতার, ককেশীয় ও ইহুদি ইত্যাদি প্রাচ্যদেশীয় জাতিরও বসত রয়েছে।

এখানকার বাজারের খিলান পথে সবসময় গোধূলির আলো বিরাজ করে। প্রাচ্যের স্থানে স্থানে এই ব্যস্ত জীবন যেন নিজেই এক বহুবর্ণ চিত্রপট। বোখারীয় বস্ত্রশিল্প এক বিস্ময়কর জিনিস। পুরা দ্রব্যের দোকানে দোকানে গ্রিক আর সাসানীয় সোনারূপা আর বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য জিনিসপত্রের সম্ভার। তুলো, ভেড়ার পশম, মেষ শাবকের চামড়া আর কাঁচা রেশম ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে রপ্তানি হয়। প্রত্যেকটা কাফেলা সরাইখানাগুলোর উঠোন বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত। সেখানে পর্বতপ্রমাণ মালপত্রের বড়ো বড়ো গাঁট ডাঁই করে রাখা। দারুণ দারুণ সব রেস্তোরাঁ আর কফিহাউস এখানে। দূর থেকেই প্যাস্ট্রি তৈরির পেঁয়াজ আর মশলাপাতির গন্ধ নাকে আসে। ভেসে আসে চা আর কফির সুবাসও। ছোটো এক বাটি অম্বলের দাম এখানে এক পুল।

আমি অবশ্য এইসব অদ্ভুত দেখতে দোতলা বাড়িঘরের অলিগলির পথ মাড়াইনি কখনও। উটের কাফেলাগুলো বিভিন্ন পশু-গাড়ি, ঘোড়সওয়ার আর পদাতিক মানুষজনের সঙ্গে গুঁতোগুঁতি করে সেই পথ পেরোয়। আমি কেবল জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে মসজিদ আর গিজগিজে পথঘাটের ছবি আঁকি। আর আমাকে ঘিরে জটলা ঘন হয়ে আসে। ওদিকে রুশ দূতাবাসের এক কর্মচারী সইদ মুরাদ অবাধ্য ছেলেপিলেদের আমার কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না, পাতা-কাটা এক চাবুক দিয়ে তাদের ঠেকিয়ে রেখেছে। যেই না একদিন একা বেরিয়েছি পথে, অমনি ছেলেপিলের দল প্রতিশোধ তুলল। কথা নেই, বার্তা নেই, আচমকা ঢিল বৃষ্টি। চারদিক ঘিরে দৌড়ে এসেই পচা আপেল আর মাটির ঢেলা ছুড়তে শুরু করল আমাকে। আপ্রাণ চেষ্টা করেও নিজেকে রক্ষা করতে না পেরে একদৌড়ে সইদ মুরাদের শরণাপন্ন হলাম শেষে।

মসজিদ-ই-কলন এ-দেশের বিখ্যাত এক মসজিদ। ১২১৯ সালে চেঙ্গিস খাঁ এতে ঢুকে ধ্বংসলীলা চালান। এর দুশো বছর পর তৈমুর লং এই মসজিদের পুনর্নির্মাণ করেন। এই বছর পঁয়ত্রিশ আগেও আসামিদের মসজিদের পঁয়ষট্টি ফুট উঁচু মিনারের মাথা থেকে ছুড়ে ফেলা হত। তার খানিক আগেই হয়তো হাকিম বিচার পর্ব শেষ করে অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করে গমগমে স্বরে তার শাস্তির বিধান শুনিয়ে গেছেন। এই মিনারে এখন একজোড়া সারস পাখির বাস। বর্তমানে মিনারের মাথায় চড়ার অনুমতি নেই কারও। কারণ, নিকটবর্তী হারেমটা ওখান থেকে স্পষ্ট চোখে পড়ে।

মসজিদের ঠিক বিপরীতেই রয়েছে মির-আরব। সে এক মাদ্রাসা। মধ্য এশিয়ার সমস্ত মাদ্রাসার মধ্যে সবচাইতে জনপ্রিয় এটি। বৃত্তাকার মিনারে, উজ্জ্বল সবুজ দুই গম্বুজে সত্যিই অপূর্ব সে। চার দুয়ারি এই মাদ্রাসায় দুশো মোল্লা আর মৌলবির বসবাসের জন্যে একশো চোদ্দটি কক্ষ রয়েছে।

সমরখন্দকে মধ্য এশিয়ার মুক্তো নামে অভিহিত করা হয়। ১ নভেম্বর আমি ডেরা ফেললাম এখানে। আলেকজান্ডার যখন এখানকার আশেপাশের সমস্ত দেশ জয় করে ফেললেন, তখন সগডিয়ানার রাজধানীর নাম ছিল মারাকান্ডা। আজও মেসিডোনিয়ায় ইস্কন্দর বেগ নামের লোকজন খুঁজে পাওয়া যায়। সমরখন্দও একদিন চেঙ্গিস খাঁর আক্রমণের মুখে পড়ল। এক লক্ষ দশ হাজার সশস্ত্র সৈনিক মরণপণ যুদ্ধ করেছিল সেদিন। তার পরও আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল তাদের। চেঙ্গিস খাঁ সমরখন্দকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন।

তৃতীয় ধাপে এসেছিলেন তৈমুর লং। এই তাতার উপজাতি মানুষটির জন্ম ১৩৩৩ সালে। উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন খিভা থেকে। কারা-কুম মরুতে তাঁর অভিযানের কাহিনি তো লোকের মুখে মুখে ফেরে। সিস্তানে আহত হয়ে খোঁড়া হয়ে পড়েন তৈমুর। সেই কারণেই তৈমুর লেঙ্ক বা লেন বলে ডাকতে শুরু করে লোকে। মুখে মুখে পরে বিকৃতি ঘটে তৈমুর লং নামে পরিচিত হন। ১৩৬৯ সালে সমরখন্দের সিংহাসন অধিকার করেন তিনি। আর তার পরপরই শুরু হয় মহা অভিযান। পারস্য হস্তগত হয়। শিরাজে এসে হাফিজের সঙ্গে মোলাকাত করেন। সে-কথা অবশ্য আগেই উল্লেখ করেছি। এতসব যুদ্ধবিগ্রহের মাঝেই বেশ ক’টা অতুলনীয় প্রাসাদ নির্মাণ করেন তিনি। সমরখন্দকে অপরূপা করে তোলেন। আজও সেই সবুজ প্রাসাদ-শৃঙ্গ অপূর্ব শ্যামলিমার মাঝে উজ্জ্বল। আকাশের বুকে দাঁড়িয়ে আছে নীলকান্তমণির মতো ঘন নীলরঙা মিনার।

১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে তৈমুর লং হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে হিন্দুস্তানের সুলতান মাহমুদকে পরাস্ত করে দিল্লি লুঠ করেন। ছিনিয়ে আনা হাতির পিঠে করে সমরখন্দে তুলে আনেন অপরিমিত সম্পদ। তারপর বাগদাদ, অ্যালেপ্পো আর দামাস্কাস দখল করেন। ১৪০২ খ্রিস্টাব্দে আঙ্গোরার সুলতান বাজাজেতকে পরাজিত করেন। কথিত আছে (ততটা বিশ্বাসযোগ্য নয় যদিও), সেই সুলতানকে তৈমুর এক চোখ উপড়ে নিয়ে লোহার খাঁচায় বন্দি করে রাখেন পরবর্তী সময়ে এশিয়ার বিভিন্ন নগরে প্রদর্শন করবেন বলে। সমরখন্দ ফিরতি পথে তেহরান থেকে মেশহেদে যে-পথে ফিরেছিলেন তৈমুর, ক্যাস্টিল ও লিওনের রাজা তৃতীয় হেনরির রাজপ্রতিনিধি রুই গনজালেজ দি ক্লাভিজোও তাঁর পিছু পিছু এসেছিলেন। সে-যাত্রার বর্ণনা তিনি লিখে গেছেন।

১৪০৫ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে তৈমুর লং সমরখন্দ থেকে শেষবারের মতো যুদ্ধে বের হন। মিং সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট ইয়োং লোহ্‌-কে পরাস্ত করা ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু সির-দরিয়ার (জাক্সারটেস নদী) অপর প্রান্তে ওটরারে বাহাত্তর বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তৈমুর। শবদেহ সমরখন্দে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর নিজেরই নকশা করা অপূর্ব এক সমাধিসৌধ নির্মাণ করা হয়। পৃথিবী-সেরা সমাধিসৌধগুলোর মধ্যে এটি একটি। কস্তূরী আর গোলাপজলে স্নান করিয়ে, পট্টবস্ত্রে সজ্জিত করে সম্রাটকে গজদন্তের কফিনে ভরে কবর দেওয়া হল। প্রাসাদ শৃঙ্গের পেছনে সমাধিস্থলে অত্যন্ত কঠিন এক জেড পাথর স্থাপন করা হল। লম্বায় সে ছ’ফুট, প্রস্থে দেড় ফুট আর দেড় ফুট পুরু। এটিকেই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জেড পাথর বলে অভিহিত করা হয়। সমাধির একটি দেওয়ালে শ্বেতপাথরের ওপর কারুশিল্পে আরবিতে লেখা নিম্নলিখিত কথাগুলো খোদিত আছে।—

‘আমি জীবিত থাকব, গোটা মানবজাতিও থরহরি কম্প থাকবে।’

মহম্মদী যুগের শুরুতে নবীর এক অনুগামী কাসিম ইবন আব্বাস ইসলাম প্রচারে সমরখন্দে এসেছিলেন। অকৃতজ্ঞ লোকজন তাঁকে ধরে শিরশ্ছেদ করে। মানুষটি তখন নিজের কাটা মুণ্ডুটা বগলে চেপে দৌড়ে ভূগর্ভস্থ এক গুহায় পালিয়ে যান। পরবর্তী সময় ওই গুহার ওপর তৈমুর নিজের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ নির্মাণ করেন। হলদে জমির ওপর আজও সেই প্রাসাদের সাতটি নীল-সবজে গম্বুজ ঝলমল করে। এই প্রাসাদে সুরাপানের লড়াইয়ের আয়োজন করতেন সম্রাট। বিজয়ীকে বাহাদুর উপাধি দেওয়া হত। তো সেই গুহায় যাবার একটি পথও ছিল সেই প্রাসাদে। উঁকি দিলেই দেখা যেত, সেই স্কন্ধকাটা মুণ্ডু বগলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শাহ্‌-ই-সিন্দেহ্‌ নামে অভিহিত ছিলেন তিনি। অর্থ, জীবন্ত সুলতান। আজও এই নামেই প্রাসাদটি বিখ্যাত। রাশিয়ানরা যখন এশিয়ার দিকে একটু একটু করে আগুয়ান, দেশবাসীর বিশ্বাস ছিল রুশেরা সমরখন্দে এলেই সেই শাহ্‌-ই-সিন্দেহ্‌ গুহা থেকে বেরিয়ে এসে মুণ্ডুটি উঁচিয়ে ধরবেন আর রুশ বাহিনী পালিয়ে যাবে। একদিন সত্যই কফম্যান এসে সমরখন্দ জয় করলেন, কিন্তু সেই স্কন্ধকাটা বেরিয়ে এলেন না। ফলে তাঁর প্রতি মহম্মদীদের ভক্তি-শ্রদ্ধা ধীরে ধীরে লোপ পেল।

তৈমুর যুগের পর পৃথিবীর সেরা উন্মুক্ত স্থানগুলোর অন্যতম এই রেগিস্তান জুড়ে মির্জা উলুগ বেগ, তিল্লাহ্‌ কার্চ এবং মাদ্রাসাহ্‌-ই-শিরদার নামে তিনটি মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হয় সমরখন্দে। মহাবিদ্যালয়গুলোর সদরের আকর্ষণীয় নকশা, উজ্জ্বল গম্বুজ আর মিনারগুলোকে দারুণ দক্ষতায় নিজের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিলেন রুশ চিত্রকর ভেরেস্তচাগিন।

নগরের বহির্ভাগে চৈনিক রাজকন্যা তথা তৈমুর লংয়ের প্রিয় বেগম বিবি খানমের সমাধি পরিদর্শন করলাম। তাতে দেখলাম ১৩৮৫ সাল অঙ্কিত আছে এবং বর্তমানে জরাজীর্ণ এই স্থাপত্যেরও সৌন্দর্য কম নয়।

এক ফরাসি সঙ্গীর সান্নিধ্যে নৈশ ভ্রমণে নর্তকীদের অপরিসর বাসস্থান পাই-কাবাকে বেরিয়ে পড়েছিলাম একদিন। প্রথমেই সুগন্ধি ছিটনো এক কক্ষে ঢুকলাম গিয়ে। ফরাস পাতা, দেওয়ালের ধারে ধরে বসবার পালঙ্ক। রূপসীরা চম্পাকলি আঙুলে সেতার (জিথার) আর ছেতারের (গিটার) তারে ঝংকার তুলেছে। অন্যেরাও খঞ্জনি বাজাচ্ছে দক্ষ হাতে। ঢোলকের ছানি টানটান রাখতে ঘনঘন জ্বলন্ত কাঠকয়লার (মঙ্গল) ওপর ধরছিল তারা।

বাজনা জমে উঠতেই নর্তকীরা আলোতে দাঁড়াল এসে। বেশভূষা উড়ুউড়ু, চটুল চলন। এদের কেউ কেউ পার্সি বা আফগান, কারো-বা ধমনীতে বইছে তাতার রক্ত। বাদ্যের তালে তালে শরীর দুলিয়ে নাচছিল তারা। এক-একটি যেন স্বপ্নে দেখা বেহেশতের হুর।

ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply