ধারাবাহিক অভিযান-আমার অভিযাত্রী জীবন(এপিসোড ১)-স্যেন হেডিন-অনু-রাজীবকুমার সাহা-শরৎ ২০২৪

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

obhijanhedinheader

স্ভেন হেডিন একাধারে একজন সুইডিশ ভূগোলবিদ, টপোগ্রাফার, অভিযাত্রী, ফটোগ্রাফার ও চিত্রশিল্পী। ১৮৬৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যু: ২৬ নভেম্বর, ১৯৫২, স্টকহোম।
এই আত্মজীবনীতে নিজের জীবনভর অভিযাত্রার দুর্ধর্ষ সব অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন হেডিন। রোমহর্ষক উত্তর মেরু অভিযানের নায়ক সুইডিশ অভিযাত্রী নর্দেনস্কিওল্ডকে দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং পনেরো বছর বয়সেই ভবিষ্যতে উত্তর মেরু অভিযাত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। পরে তাঁর অভিযাত্রার গতিমুখ পরিবর্তিত হয়ে এশিয়ার দিকে ধাবিত হয়। নিয়তির ফেরে কাস্পিয়ান সাগরতীরের ঝড়ের শহর বাকুতে আসেন আর সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করেন এশিয়ার পথে। শুরু হয় রাশিয়া, ককেশাস আর পারস্য হয়ে প্রায় সমগ্র এশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন। বাধাবিঘ্ন বিপত্তির সম্মুখীনও হন প্রচুর। তুলে ধরেন দেশীয় সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবরণ। গবেষণার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাচিত্র তারই সাক্ষ্য বহন করে। MY LIFE AS AN EXPLORER স্ভেন হেডিনের অসামান্য সৃষ্টি। ১৯২৬ সালে কাসেল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড-এর হাত ধরে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

॥ ১॥

শুরুয়াত যেভাবে হল

যে-ছেলে কচি বয়সেই জীবন-যুদ্ধের অন্ধিসন্ধিগুলো চিনে যায়, তার মতো ভাগ্য আর কারও বুঝি হয় না। এদিক দিয়ে আমার ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলা চলে। বিশেষ অপেক্ষা করতে হয়নি, বছর বারোর মধ্যেই আমার ভবিষ্যৎ জীবনের লক্ষ্য স্থির হয়ে গিয়েছিল। ফেনিমোর কুপার, জুল ভার্ন, লিভিংস্টোন, স্ট্যানলি, ফ্র্যাঙ্কলিন, পেয়ার, নর্দেনস্কিওল্ড—এঁরাই তো ছিলেন আমার গুরু, সত্যিকারের আপনজন। বিশেষত আর্কটিক অভিযানের নায়ক, শহিদ প্রত্যেকেই আসলে। নর্দেনস্কিওল্ড সে-সময় স্পিৎসবার্গেন, নোভায়া জেমলিয়া ও ইয়েনিসি নদীর মুখে দুঃসাহসিক এক অভিযানে গিয়েছিলেন। নর্থ-ইস্ট প্যাসেজ পাড়ি দিয়ে যখন স্টকহোমে ফিরে আসেন তখন আমি সবে পনেরো। স্টকহোমেই আমার জন্ম।

১৮৭৮-এর জুনে জাহাজ ‘ভেগা’-য় চড়ে সুইডেন থেকে যাত্রা শুরু করেন নর্দেনস্কিওল্ড। ক্যাপ্টেন ছিলেন প্যালান্ডর। ইউরোপ আর এশিয়ার দক্ষিণ তীরভূমি ধরে এগোতে থাকেন তাঁরা। এগোতে এগোতে একসময় পূর্বের শেষপ্রান্তে সাইবেরিয়ার আর্কটিক উপকূলে গভীর বরফে আটকা পড়ে জাহাজ। দীর্ঘ দশ মাস ওখানেই আটকে থাকেন নর্দেনস্কিওল্ড। বাড়িতে দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে আসে। বেশ ক’জন বিজ্ঞানী ও জাহাজ কর্মীও ছিলেন সঙ্গে। সেই জাহাজের উদ্ধারকার্যে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে ইউনাইটেড স্টেটস। জেমস গর্ডন বেনেট স্ট্যানলিকে ডেকে নির্দেশ দিয়েছিলেন—‘ফাইন্ড লিভিংস্টোন!’ তারপর ১৮৭৯-র জুলাই মাসে ক্যাপ্টেন ডি লং আমেরিকান জাহাজ ‘জিনেট’ নিয়ে ভেসে পড়েন উত্তর মেরুর উদ্দেশ্যে। নর্থ-ইস্ট প্যাসেজ পাড়ি দিয়ে সুইডিশ অভিযাত্রী জাহাজের দিকে এগিয়ে যান।

কিন্তু আমেরিকান উদ্ধারকারী দলের যাত্রাপথও মসৃণ ছিল না মোটেও। ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় তাঁদের। জিনেটও একসময় বরফ মরুতে আটকে পড়ে; দলের বেশিরভাগই মারা যান। ইত্যবসরে বরফের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে ভেগা বেরিং খাঁড়ি ধরে প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে। দলের কাউকে না হারিয়ে নর্থ-ইস্ট প্যাসেজ পেরিয়েও আসে। কুশলসংবাদের প্রথম তার এসে পৌঁছায় ইয়োকোহামা থেকে। আর তাতে স্টকহোমে যে হইচই পড়ে গিয়েছিল সে আমি জীবনে ভুলব না।

এশিয়া আর ইউরোপের তীরভূমি ধরে এই সফল সমুদ্রযাত্রার তুলনা ছিল একমাত্র সে নিজেই। ১৮৮০-র ২৪ এপ্রিল স্টকহোমের বন্দরে এসে ভিড়ল ভেগা। আলোয় আলোয় ভরে উঠল গোটা শহর। অসংখ্য দীপ আর মশালের আলোয় আলোকিত হল জলের ধারের যত বাড়িঘর। রাজবাড়ির উদ্যোগে সেদিনের হিরো ভেগাকে অত্যুজ্জ্বল গ্যাসীয় আগুনের সাজে সজ্জিত করা হল। সেই আলোকমালা সমুদ্রের গা পিছলে বন্দরে এসে পড়ছিল।

বাবা-মা আর ভাইবোনদের নিয়ে দক্ষিণের উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে শহরের এই অনুপম আলোকসজ্জা উপভোগ করেছিলাম আমি। অদম্য এক উত্তেজনার শিকার হয়েছিলাম সেদিন। আজীবন সেই দৃশ্য মনে থাকবে আমার। বস্তুত সেদিনই নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নিয়েছিলাম আমি। জেটি, পথঘাট, সমস্ত বাড়িঘরের ছাদ আর জানালা থেকে বাজ পড়ার মতো উল্লাসধ্বনি ভেসে আসছিল থেকে থেকে। মনে মনে ঠিক করলাম, আমিও ঠিক এইভাবে দেশে ফিরব একদিন।

তারপর থেকেই আর্কটিক অভিযান নিয়ে আদাজল খেয়ে লেগে পড়লাম। নতুন-পুরোনো একটা বইও বাদ দিলাম না। মেরু অঞ্চলের খুঁটিনাটির খবর সব জোগাড় করতে লাগলাম। সঙ্গে প্রত্যেকটা অভিযানের ম্যাপ আঁকা। অন্যদিকে শরীরটাকেও তো পোক্ত করে তুলতে হবে। তাই আমাদের এই উত্তুরে শীতের বরফে গড়াগড়ি খাওয়ার প্র্যাকটিস শুরু করলাম। রাতে জানালা খুলে ঘুমোতাম। উদ্দেশ্য, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেরু অভিযানের জন্যে নিজেকে তৈরি করে নেওয়া। চোখে তখন একটাই স্বপ্ন—শিগগিরই একদিন সহৃদয় এক মিসিনাস এসে উদয় হবেন আর পায়ের কাছে এক থলে মোহর ছুড়ে দিয়ে বলবেন, ‘যা ব্যাটা, খুঁজে বের কর গে যা উত্তর মেরু।’ প্রচুর লোকজন, কুকুর আর স্লেজ গাড়ি সঙ্গে নেব—এও মনে মনে ঠিক করে রেখেছি। আমার জাহাজ চলবে অবিরাম, থামবে না রাতেও। কোনও বরফ তাকে কাবু করতে পারবে না, সে যত গভীর প্রান্তরই হোক। জাহাজের একমাত্র লক্ষ্য থাকবে উত্তুরে হাওয়ার গতিপথ অনুসরণ।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। ১৮৮৫-র এক বসন্তের দিন। আর ক’দিন বাদেই স্কুলের পড়া সাঙ্গ হবে আমার। প্রিন্সিপাল হঠাৎ ডেকে জানতে চাইলেন কাস্পিয়ান সাগরতীরে বাকুতে মাস-ছ’মাসের জন্যে নীচু ক্লাশের এক ছেলেকে পড়াতে যেতে উৎসাহী কি না। ছেলেটার বাবা নোবেল ব্রাদার্স কোম্পানিতে চিফ ইঞ্জিনিয়ার। এক মুহূর্তও না ভেবে সঙ্গে সঙ্গে লুফে নিলাম অফারটা। আমার সেই মিসিনাস কবে এসে হাজির হবেন কে জানে। আর এ তো মেঘ না চাইতেই জল! এক্কেবারে সোজা এশিয়ার দ্বার প্রান্তে গিয়ে হাজির হবার আমন্ত্রণ। এ কি ভুল করেও উপেক্ষা করা যায় কখনও?

অতএব নিয়তি নিয়ে ফেলল এশিয়ার সেই উজানপথে। আর যত দিন গেল, আমার উত্তর মেরু অভিযানের অস্থিরতাও ধীরে ধীরে থিতিয়ে এল। মহাকালের চক্রান্তে শেষে আজীবনের জন্যে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মহাদেশের মায়ার বন্ধনে বাঁধা পড়লাম আমি।

১৮৮৫-র বসন্ত ও গ্রীষ্মের সময়টায় আর সহ্য হচ্ছিল না, অস্থির হয়ে উঠলাম বেরিয়ে পড়তে। মনে মনে তখন কাস্পিয়ান সাগরের গর্জন শুনতে পাই। কানে বাজে কাফেলার ঘণ্টার একটানা ঝনঝন শব্দ। অপেক্ষা করে আছি, কবে প্রাচ্যের সেই অনাবিল সৌন্দর্য ধরা দেবে আমার চোখে। সেই চির রহস্যময় ভূমির চাবিকাঠি যেন এখন আমারই হাতে। স্টকহোমে তখন একদল মাদারি কোত্থেকে এসে তাঁবু ফেলেছে। খাঁচাবন্দি প্রচুর পশুপাখি সঙ্গে এনেছে তারা। একটা উটও ছিল তুর্কিস্তানের। আমি দূর থেকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকতাম ওর দিকে।

বাড়িতে বাবা-মা, ভাইবোন কারও মত ছিল না আমি অত দূরে যাই। ভয় পাচ্ছিল তারা। কিন্তু আমি তো আর একা নই। আমার ছাত্রটিই শুধু নয়, তার ছোটো এক ভাই ও মাও ছিল সঙ্গে। চোখের জলে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে এক স্টিমারে চেপে বসলাম একদিন। স্টিমার বাল্টিক সাগর পার করে ফিনল্যান্ডের উপসাগর অবধি যাবে। পথে ক্রনস্টাট থেকে সেন্ট আইজ্যাকের ঝলমলে গম্বুজ চোখে পড়ে—সূর্যের মতোই উজ্জ্বল। কয়েক ঘণ্টা পর সেন্ট পিটার্সবার্গের নেভা কুয়ের জেটিতে এসে নামলাম।

এইখানে খানিক সময় কাটাই, তেমন সুযোগ আমাদের হাতে ছিল না। ঘণ্টা কতক পরে সেখান থেকে দ্রুতগামী ট্রেনে রওনা হলাম আমরা। ইউরোপিয়ান রাশিয়া থেকে ককেশাস অবধি চারদিনের এই সফরে একসময় মস্কো পেরিয়ে গেল ট্রেন। জানালা দিয়ে সাঁ সাঁ করে পেছনে ছুটে চলেছে অসীম সমতল ভূমি। পাতলা পাইন বনের মধ্যে দিয়ে ছুটে গেছে ট্রেন। পেরিয়ে গেছে কতশত শস্যক্ষেত। শরতের পাকা ফসল বাতাস লেগে দুলে উঠছে। ঘড়ঘড় শব্দ তুলে ট্রেন চলেছে দক্ষিণ মস্কো দিয়ে। চারদিকে রাশিয়ার উন্মুক্ত প্রান্তর। আমি গোগ্রাসে গিলে খাচ্ছি সেই আশ্চর্য সৌন্দর্য। প্রথম বিদেশযাত্রা আমার। সুন্দর নিরিবিলি গাঁ-ঘরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে সাদা রঙের ছোটো ছোটো চার্চ। তাদের মাথায় মাথায় আবার পেঁয়াজের মতো সবুজরঙা গম্বুজ। পায়ে ভারী জুতো আর লাল জামা গায়ে চাষিরা ফসল বুনছে মাঠে। কোথাও-বা চার চাকার গাড়ি করে খড় আর ভোজ্য কন্দের চালান চলেছে। অনিকাশী ভাঙাচোরা রাস্তায়—আমেরিকান মোটরগাড়ি তখনও স্বপ্ন যেখানে, তিন ঘোড়ায় (ট্রয়কা) টানা টেলেগা আর ট্যারান্টাস গাড়ি ছুটে যাচ্ছে বিদ্যুৎ বেগে। গলায় বাঁধা ঘণ্টা তাদের ঝংকার তুলেছে।

obhijaanhedin90 (1)

রোস্তভ ছাড়িয়ে সুবিশাল নদী ডন পেরোল আমাদের ট্রেন। কৃষ্ণসাগরের উপসাগর আজভ থেকে এর মোহনা খুব দূরে নয়। ট্রেন ছুটে চলেছে দক্ষিণে নিরন্তর। স্টেশনে স্টেশনে কসাক সৈনিক, সশস্ত্র পুলিশ আর সুঠাম চেহারার সুপুরুষ ককেশীয় উপজাতিদের ভিড়। লম্বা লম্বা মানুষগুলোর পরনে বাদামি কোট আর পশমের টুপি মাথায়। বুকে ক্রস করে গুলির ছড়া বাঁধা। কোমরের বেল্টে পিস্তল, কিনজাল(Kindjal. ককেশাস অঞ্চলের  দোফলা ছোরা।)

ট্রেন এইবারে শ্লথগতিতে ককেশাস পর্বতমালার পাদদেশের উত্তর পাদদেশ ধরে বেয়ে উঠছে। টেরেক নদীর তীরে সুন্দর ছোটো শহর ভ্লাদিকাভকাজ। একেই ককেশাসের শাসক বলা হয়। যেমনটা ভ্লাদিভোস্তককে বলে পুবের মনিব। এইখানে আমার ছাত্রের বাবা চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেব একটা ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। এই গাড়িতেই গ্রুসিয়ান আর্মি রোড ধরে ১২০ মাইল পাড়ি দিতে হবে আমাদের। তার মানে ককেশাসে আরও দু-দিনের পথ। গোটা পথটায় এগারোটা ধাপ রয়েছে মোট। আর প্রত্যেক স্টেশনে গিয়ে ঘোড়া পালটাতে হয়। গোদঝুর স্টেশন অবধি যেতে সাত-সাতটা ঘোড়ার প্রয়োজন পড়ে। স্টেশনটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৮৭০ ফুট ওপরে। ফিরতি পথে নীচে নামতে অবশ্য দু-তিনটে ঘোড়াই যথেষ্ট। উঁচু-নীচু বন্ধুর ঢালু পথ। গাড়ি কখনো-কখনো খাড়া পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে তুলেছে আমাদের, কিছুক্ষণ পরই আবার হয়তো পাহাড়ের উলটো পিঠে কোনও উপত্যকার কোলে নেমে এলাম চার-পাঁচটা বাঁক পেরিয়ে। তারপর আবার পরের উৎরাই।

obhijaanhedin90 (2)

তবে যাত্রাটা মনোরম ছিল বলতেই হয়। জীবনে কোনোদিন এমন পথে আসিনি আমি, এই প্রথম। চারদিকে দৈত্যের মতো ককেশাস দাঁড়িয়ে। অপূর্ব তার বাহার—এক-একটা খাড়া দেওয়ালের পেছনেই তুষারাবৃত এক-একটা চূড়া। এর মধ্যে সবচাইতে উঁচু যেটি—কাজবেক, সেটির উচ্চতা ১৬,৫৪০ ফুট—সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় নাইছে।

obhijaanhedin90 (3)

পথ এইবারে বেশ ভালোই বলা চলে। রাশিয়ার জার প্রথম নিকোলাসের রাজত্বকালে তৈরি। সে বানাতে এমন খরচা হয়েছিল যে জার আশ্চর্য হয়ে উক্তি করেছিলেন—‘আমি তো ভেবেছিলাম সোনায় মোড়ানো রাস্তা হবে। এ যে দেখি পাথর বাঁধানো।’ পথের ধারে পাথুরে নীচু দেওয়াল গাঁথা, কেউ যাতে পাশের অতল খাদে গিয়ে না পড়ে। শীতকালে পথের ঢাল বেয়ে তুষারের স্রোত নেমে এসে খাদে গিয়ে জমা হয়। দশ ফুট দেওয়ালের তুষার ছাউনির ভেতর দিয়ে গাড়ি ছুটেছে আমাদের।

দিনভর উল্কা বেগে ছুটে চলেছে ঘোড়াগুলো। সঙ্গে পাগলের মতো ছুটে চলেছি আমরাও। আমি বসেছি গাড়োয়ানের পাশে। এক-একটা আচমকা বাঁক নেওয়ার সময় কেমন ঝিমঝিমে ভাব এসে যাচ্ছিল শরীরে। প্রত্যেকবার শিউরে উঠছিলাম, এই বুঝি পাক খেয়ে গিয়ে পড়ব অতল খাদে।

সে-সব কিছুই ঘটল না অবশ্য। শেষ পর্যন্ত ককেশাসের প্রধান শহর তবিলিসিতে গিয়ে পৌঁছলাম নিরাপদেই। গিজগিজ করছে মানুষজন। রঙচঙে শহর। কুরা নদীর পাড় থেকে মনে হয় বাড়িঘরগুলো যেন থিয়েটারের গ্যালারির মতো পাহাড়ের খাড়া ঢালে বসিয়ে গেছে কেউ। নিষ্ফলা পাথুরে ঢালু জমি। সড়ক আর গলিপথ সব উট, খচ্চর আর যানবাহনে ভরতি। পথেঘাটে হাজার জাতের মানুষ—রাশিয়ান, আর্মেনিয়ান, তাতার, জর্জিয়ান, সির্কাসিয়ান, পার্সি, জিপসি, ইহুদি—কে নেই!

তবিলিসি থেকে এইবারে আবার ট্রেন। গরমের সময়, গা পুড়ে যাচ্ছে তাতে। বাতাস পাব বলে থার্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টের টিকিট কাটলাম আমরা। সহযাত্রীরা কেউ পার্সি, কেউ তাতার, আবার কেউ-বা আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ী। স্ত্রী-সন্তান সঙ্গে করে বেরিয়েছে। আবার সেই মনোরম প্রাচ্য ভূমি, দৃষ্টি আকর্ষণীয় পোশাক-আশাক। এই ঠা ঠা গরমেও তারা ভেড়ার চামড়ার বড়োসড়ো টুপি পরে আছে। অন্যদিকে তাকিয়ে দেখি, মক্কা ফেরত ক’জন আবার কম্পার্টমেন্টের মেঝেতেই পাতলা চাদর বিছিয়ে নমাজে বসে গিয়েছে। পবিত্র ধর্মস্থানের দিকে মুখ করে বসেছে সবাই। সূর্য তখন ডোবে ডোবে।

কখনও কুরা নদীকে ডানে রেখে চলেছি, কখনও বাঁয়ে। চাষ দেওয়া জমি আর শস্য-সবুজ নদীতীর চোখে আরাম বুলিয়ে দিচ্ছিল। অন্যথায় এই দেশ জনশূন্যই প্রায়—সুবিশাল সব প্রান্তর, সেখানে কেবল রাখালেরা পশু চরায়—একরকম মরুভূমিই বলা চলে। উত্তরে ককেশাস পর্বতমালা উজ্জ্বল এক ছবির মতো দেখা দিল হঠাৎ—নীলরঙা সব পাহাড়ের গায়ে সাদা ডোরাকাটা। এই তো সেই এশিয়া! যতই দেখি, মন আর ভরে না। কে যেন এসে কানে কানে বলে গেল—‘এই তোমার নিয়তি, বুঝলে হে। এই তোমার ভালোবাসা। বারে বারে এই পুবের দেশেই ফিরে আসতে হবে তোমায়।’

উজিরি পৌঁছে বরাবরের স্বভাবমতো কিছু স্কেচ সেরে নিচ্ছিলাম দ্রুত। আঁকছি, এমন সময় ক’টা ভারী হাতের স্পর্শ পেলাম কাঁধে। চোখ তুলে দেখি তিনজন সশস্ত্র পুলিশ এসে ঘিরে দাঁড়িয়েছে কখন। সাঁড়াশির মতো হাতের পাকড়। আচার-আচরণ অভব্য, চোখ-মুখ সন্দেহজনক। ফুলঝুরির মতো শুরু করল জিজ্ঞাসাবাদ। উত্তর দেব কী, রাশিয়ান তো জানি না। শেষে এক আর্মেনিয়ান মেয়ে—সে ফ্রেঞ্চটাও জানে, আমার দোভাষী নিযুক্ত হল। তার আগেই হঠাৎ খপ করে আমার স্কেচ বুকটা ছিনিয়ে নিল পুলিশ। আর যা-ই বুঝিয়ে বলি না কেন, সবেতেই অসভ্যের মতো হাসে। স্পষ্ট ঘৃণা চোখে। আমাকে তারা স্পাই ঠাউরেছে, সন্দেহ নেই। জার সম্রাটের দেশে এ এক ঘোরতর বিপদ বটে।

দেখতে দেখতে বড়োসড়ো একটা ভিড় ঘনিয়ে এল চারদিকে। ব্যাটারা টানাটানি করে আমায় নিয়ে যেতে চাইছে, জেলে দেবে হয়তো। এমনি সময় ট্রেন ছাড়ার প্রথম হুইশিলটা বেজে উঠল। আর স্টেশন মাস্টারও ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন কী ঘটেছে দেখবেন বলে। তিনিই শেষে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন ট্রেনের দিকে। ততক্ষণে দ্বিতীয় হুইশিলও বেজে উঠেছে। আমি তখন উঁচু প্ল্যাটফর্মে, আর পুলিশেরা পায়ের নীচে। তারাও লাফিয়ে ট্রেনে উঠছে একে একে। ইতোমধ্যে ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তুলে ট্রেন চলতে শুরু করেছে। ইল মাছের মতো একে ওকে পাশ কাটিয়ে দু-তিনটে কামরা পালটে এক কোণে গিয়ে লুকোলাম আমি। শেষে দুশমনেরা ধুপধাপ নেমে যেতে নিজের কামরায় গিয়ে সুস্থির হলাম।

obhijaanhedin90 (4)

কাস্পিয়ান সাগরের কাছে গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন জোর বাতাস ছুটেছে। মাটি থেকে ধুলো পাক খেয়ে উঠে ঘন মেঘের আকার নিয়েছে। প্রথমে চারদিকের পাহাড়গুলো দৃষ্টির বাইরে চলে গেল, তারপর ধীরে ধীরে গোটা দেশটাই মুছে যেতে লাগল। যেন কোনো অবিচ্ছেদ্য এক কুজ্ঝটিকা। বাতাসের প্রকোপ বাড়তে বাড়তে একসময় ঘূর্ণিঝড়ের আকার নিল। সেই প্রবল ঝড় ঠেলে ছুটে চলেছে আমাদের ইঞ্জিন। শ্বাসরুদ্ধকর এই দৃশ্য দেখে শিউরে উঠলাম আমি। আবছা ফেনিল এক-একটা রাক্ষুসে ঢেউ উঠছে সাগরে আর আছড়ে পড়ছে বেলাভূমিতে। যাই হোক, ট্রেন শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়াল বাকুতে—ঝড়ের দেশে। সেই সন্ধ্যায় দেখা দৃশ্য এই নামেরই উপযুক্ত বটে।

অ্যাবসেরন পেনিনসুলা কাস্পিয়ান সাগরের পুবে মাইল পঞ্চাশেক পর্যন্ত বিস্তৃত। আর বাকু এই পেনিনসুলার দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত। তার পুবে হচ্ছে ব্ল্যাক টাউন। ওতে নোবেল সহ অপরাপর তৈল-সম্রাটদের রাজত্ব। বিরাট সব তৈল শোধনাগার রয়েছে সেখানে। পরিশোধিত তেল ওখান থেকে পাইপ বেয়ে সমস্ত দক্ষিণ ককেশাস হয়ে কৃষ্ণসাগরে যায়। তারপর ট্যাংক স্টিমারে বোঝাই হয়ে এই অমূল্য বস্তু কাস্পিয়ান সাগর পেরিয়ে আস্ত্রাখান ও জারিৎসিন হয়ে ভোল্গায়। সেখানে বালাখানিতে আবার মস্ত বড়ো সব তৈল খনি রয়েছে। সে এক তাতার গ্রাম, বাকু থেকে ১৩ ভার্স্ট (১ ভার্স্ট = এক-তৃতীয়াংশ মাইল) উত্তর-পূর্বে। এলাকাটা ক্রুড অয়েলের আখড়া হিসেবে পরিচিত। তবে ১৮৭৪-এ দুই ভাই লুডউইগ নোবেল আর রবার্ট নোবেল আমেরিকান ড্রিলিং পদ্ধতিতে এখানে কাজ শুরু করবার আগে পর্যন্ত বালাখানি আর পাঁচটা গ্রামের মতোই সাধারণ ছিল।

obhijaanhedin90 (5)

ক’বছরের মধ্যেই এই বাণিজ্য ফুলে-ফেঁপে উঠল। আর ১৮৮৫-তে যখন প্রথম বালাখানিতে আমি যাই, ততদিনে সেখানে ৩৭০-খানা ড্রিল স্থাপন করা হয়ে গেছে। আর সেখানকার তৈলকূপে বাৎসরিক শত লক্ষ পুদ(১ পুদ= ১৬.৩৮ কিলোগ্রাম) উৎপাদনও শুরু হয়ে গেছে। কখনও দেখা গেছে অত্যন্ত ভূগর্ভস্থ চাপে তেল আপনা-আপনিই ঝরনার মতো বইতে শুরু করেছে। একদিনে এক-একটা কূপ থেকে সাধারণত পাঁচ লক্ষ পুদ তেল উত্তোলিত হয়।

obhijaanhedin90 (6)

ড্রিল আর ডেরিকের(Derrick- অতিকায় ক্রেন) সেই অরণ্যে সাত মাস ছিলাম আমি। ততদিনে ছাত্রটির মাথায় যথেচ্ছ পরিমাণে ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য আর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সব ঠেসে দিয়েছি। তাতে যত না আনন্দ লাভ করেছি, তার কয়েকগুণ বেশি করেছি লুডউইগ নোবেলের অয়েল ফিল্ডের পরিদর্শনের সঙ্গী হতে পেরে। ঘোড়ায় চড়ে মহানন্দে গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি; তাতার নারী-পুরুষ, শিশু আর ঘরবাড়ির স্কেচ এঁকেছি। তেজি ঘোড়ার পিঠে বাকুর পথেঘাটে ছুটে গেছি। পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছি ব্ল্যাক বাজারের আনাচে-কানাচে। সে-বাজারে তাতার, পার্সি আর আর্মেনিয়ানদের অন্ধকারাচ্ছন্ন সব ঘুপচি দোকান। কুর্দিস্তান আর কেরমান থেকে কম্বল এনে বিক্রি করছে। কিংখাবের কাপড় ঝুলিয়ে রেখেছে। হরেকরকমের জুতো, পাপাশ (বড়ো পশমি টুপি)। একদিকে স্বর্ণকারেরা সোনা গলিয়ে গয়না গড়ছে। অন্যদিকে কামারেরা লোহা পিটিয়ে ছোরা-ছুরি আর কিনশাল তৈরি করছে। আলুথালু কম্বল জড়িয়ে ‘দরবেশ’ আর ‘বেগ’-রা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইতিউতি ঘন নীল রঙের লম্বা কোট গায়ে শাহজাদারা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘুরে বেড়াতাম বাজারময়।

আর এক আকর্ষণীয় জায়গা ছিল অগ্নি উপাসকদের মন্দির। আগে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই আগুন জ্বলত সেখানে। প্রাকৃতিক গ্যাসে মন্দিরের তলদেশ থেকে মাথার গম্বুজ অবধি জ্বলতে থাকত নিরন্তর। বর্তমানে তা নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন এই প্রাচীন মন্দির নিকষ আঁধার আর নৈঃশব্দ্যে ডুবে থাকে সারারাত।

একদিন শীতের এক সন্ধের পরপর। একটা আলো ঘিরে বসেছি সবাই। হঠাৎ রক্ত জল করা এক চিৎকার উঠল কোথায়—‘ইয়াঙ্গো! ইয়াঙ্গো!’ অর্থাৎ আগুন, আগুন! খেয়াল করে বুঝলাম, চিৎকারটা আসছে জানালার বাইরে রাস্তা থেকে। তাতারেরা সব দৌড়ে ঘর ছেড়ে বাইরে আসতে শুরু করেছে। উত্তেজিত কণ্ঠে একে অপরকে সাবধান করে চলেছে। চারদিকে শুধু আতঙ্ক আর চিৎকার। আমরাও দুদ্দাড় করে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। দেখি কী, গোটা তৈলক্ষেত্রটা দিনের মতো আলোকিত হয়ে আছে। আগুনটা এখান থেকে মাত্র কয়েকশো গজ দূরে। চার দেওয়ালের মাঝে সে যেন জ্বলন্ত এক জলাশয়। সঙ্গে ডেরিকও জ্বলছে। জোর বাতাসে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে এক-একটা লকলকে আগুনের শিখা। ছেঁড়াখোঁড়া পতাকার মতো উড়ে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। তৈলকূপগুলো থেকে ঘন বাদামি ধোঁয়া গলগল করে মেঘের মতো উঠে যাচ্ছে আকাশে। তাতারেরা মাটি ঢেলে আগুন আয়ত্তে আনবার চেষ্টা করছিল, কাজে আসেনি। ডেরিকের জঙ্গল বেশ ঘনসন্নিবদ্ধ। এলোমেলো বাতাসে আগুনের লক্ষ ফুলকি। ফলে এক গাছ থেকে অন্য গাছে আগুন ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় নিল না। সেই বিধ্বংসী দুশমন সামনে যা পেল ছারখার করে দিল। সবচাইতে কাছের ড্রিলটা যেন জাজ্বল্যমান সাদা এক অপচ্ছায়া। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় আগুন নেভানোর চেষ্টা চালিয়েছে তাতারেরা। একসময় তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষমও হয়। সামান্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গোটা একটা এলাকা শ্মশানপুরী হয়ে গেল।

॥ ২॥

তেহরানের অলবুর্জ পর্বতমালা পেরিয়ে

বালাখানি থাকতে শীতের সময় সন্ধেতে বসে তাতার, ফার্সি ইত্যাদি ভাষার চর্চা শুরু করেছিলাম। গড়গড় করে বলতেও শিখে গেলাম বেশ। বাকি খানফ নামে এক তরুণ তাতার এসে আমাকে তালিম দিয়ে যেত।

এপ্রিলের শুরুতে আমার ছাত্র পড়াবার চাকরির মেয়াদ শেষ হল। পকেটে তখন তিনশো রুবল—আমার পারিশ্রমিক। ঠিক করলাম, ঘোড়া নিয়ে প্রথমে পারস্য হয়ে দক্ষিণের দিকে রওনা হব, সেখান থেকে সাগরতীরে। বাকি খানফ-ও সানন্দে সঙ্গে যেতে রাজি হয়ে গেল।

চেনা-পরিচিতদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এক সন্ধ্যায় রাশিয়ান প্যাডেল-হুইল স্টিমারে চেপে বসলাম একদিন। বাকুর আকাশে তখন ভয়ানক ঝড় উঠেছে। ক্যাপ্টেন জাহাজ ছাড়তে মোটেও রাজি নয়। পরদিন সকালের দিকে ঝড়ের দাপট কমে এল অনেকটা। তখন ঝপাঝপ প্যাডেল চালু হল, আর জাহাজও ধীরে ধীরে দক্ষিণের পথ ধরল। আমরাও ত্রিশ ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে অনজালি বন্দরে এসে নামলাম। জায়গাটা কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ তীরে। সঙ্গে-সঙ্গেই আর একটা লঞ্চে চড়ে পরিষ্কার জলের লেগুন পেরিয়ে এলাম। নাম তার মুরদাব—অর্থ, অচল জল। লেগুন পেরিয়ে গিয়ে উঠলাম এক গ্রামে। চারদিকে তার প্রচুর হ্রদ আর সবুজের সমারোহ। এখান থেকে ঘোড়ার পিঠে বাণিজ্য শহর রশ্ত-এর পথে রওনা হব।

টাকাপয়সা সব পার্সি ‘ক্রান’-এ ভাঙিয়ে নিয়েছিলাম আগেই। তখন এক ক্রান মানে এক ফ্রাঙ্কের সমান। রুপোর মুদ্রাগুলো কোমরের চামড়ার বেল্টে সেলাই করে নিয়েছি। টাকাপয়সা আমি আর বাকি খানফ আধাআধি ভাগ করে রেখেছি। পরনে যথাসম্ভব হালকা জামাকাপড়। গায়ের শীতের স্যুটটা বাদে আর একখানা ছোটো শীত-কোট আর একটা কম্বল ছাড়া সঙ্গে আর কোনও কাপড়চোপড় নেই। একটা রিভলভার ছিল আমার। আর বাকি খানফ একখানা বন্দুক নিয়েছে তার তাতার কোটের ফিতেয় বেঁধে। বেল্টে একখানা কিনজাল-ও এঁটেছে।

শুনেছি রশ্তের জঙ্গলে নাকি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ঘুরে বেড়ায়। জলাভূমির জায়গা। তার তীব্র পচা গন্ধে নাকি জ্বর এসে যায়। যখন-তখন ভয়ংকর মহামারী ছড়ায়। ছোটোখাটো এই শহরে ছ’হাজার লোক নাকি মারা গিয়েছিল একবার। মাটি দেওয়ার লোক ছিল না। হাতেগোনা যে ক’জন বেঁচে গিয়েছিল, মসজিদে মসজিদে নাকি শবদেহগুলো রেখে এসেছিল তারা।

সে-দেশের মসজিদ বড়ো সুন্দর। ছোটো ছোটো মিনার আর লাল স্লেট পাথরের ছাদ। সূর্যের তাপ ঠেকাতে হরেক রঙের ঝালর দেওয়া গুমটিতে বসে ব্যাপারীরা কেনাবেচা করে। এই উপকূলে রেশম, তুলো আর ধানই হচ্ছে প্রধান অর্থকরী ফসল।

মি. ভ্লাসফ নামে একজন রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত রয়েছেন রশ্ত-এ। আমাকে ডিনারে নেমন্তন্ন করলেন। আমিও আমার সেই ট্র্যাভেলিং স্যুট আর রাইডিং বুট পরে হাজির হলাম গিয়ে। পার্সি কারুকাজ করা বাড়িতে ঢুকে দেখি রাজকীয় আলোকসজ্জা। গৃহকর্তা নেমে এলেন সাধারণ ইভিনিং স্যুট পরে। মনটা দমে গেল। রাগ হল, বাকি খানফের কথায় কেন যে ওই হতশ্রী কাফেলা সরাইয়ে থাকতে গেলাম। অবশ্য আর কোনও ইভনিং স্যুটও ছিল না সঙ্গে। কী আর করা, এইবারে ভালোয় ভালোয় এই রাজসিক খানাপিনা সেরে পালাতে পারলে বাঁচি।

obhijaanhedin90 (7)

পরদিন সকাল সকাল আমাদের দুই ঘোড়া এসে কাফেলা সরাইয়ের দরজাইয় ধাক্কা দিতে লাগল। সারারাত বিশ্রাম পেয়ে তরতাজা হয়ে এসেছে। সঙ্গে দুটি ছেলে। নরম-সরম একটা ডবল ব্যাগ—তাতাররা কার্চিন বলে একে—জিনের পেছন দিকে বেঁধে নেওয়া হল। আমার যৎ-যাবতীয় সব এতেই আঁটা। ঘোড়ায় চড়ে বসলাম আমরা। ছেলে দুটো পায়ে হেঁটে চলেছে। অবশ্য হাঁটা নয় ঠিক, হালকা দৌড়ে আসছে বলা চলে। মনোরম এক জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ। তাতে কত ঘোড়সওয়ার আর পথচারীর সঙ্গে দেখা। খচ্চরের বেশ ক’টা লম্বা লম্বা কাফেলা চলেছে মালপত্র পিঠে। সাগর পেরিয়ে রাশিয়ায় চালান যাবে। চামড়ায় মোড়া বাক্সে বাক্সে যত শুকনো ফল আর মেওয়া। খচ্চরদের গলায় টুংটাং ঘণ্টির আওয়াজ। প্রত্যেকটা কাফেলার সবচেয়ে প্রথম খচ্চরটার গলায় আবার বড়োসড়ো কাঁসার ঘণ্টা, তার শব্দ আলাদা—ডং ডং।

সেদিন রাতটা আমরা কোদোমের এক সরাইখানায় কাটালাম। তার মসে ঢাকা ছাদের তলায় ঝাঁকে ঝাঁকে সোয়ালো পাখির বাসা। জানালা গলে ফুড়ুত-ফাড়ুত আসছে যাচ্ছে।

এইখানটা থেকেই পাহাড়ের সমতল-প্রায় ঢাল শুরু। এক নদী আছে—সফেদ-রুদ (সাদা নদী)। রওনা হয়ে তার উপত্যকা ভূমিতে নেমে এলাম আমরা। অপূর্ব দেখতে এক গ্রামে রাত কাটালাম। সে-গাঁয়ের চারদিকে জলপাইয়ের ঝাড়, বিভিন্ন ফল-ফলাদি, প্লেন আর উইলো গাছে সমাহার। খাবারদাবার যেহেতু সঙ্গে কিছু আনিনি, অতএব নামমাত্র দামে গ্রামবাসীরাই দিল—হাঁস-মুরগি, ডিম, দুধ, গমের রুটি, ফল-ফলাদি।

পথ ক্রমশ খাড়া হয়ে আসছে। আমরা তখন অলবুর্জ পর্বতমালা বেয়ে উঠছি। বনজঙ্গল পাতলা হতে হতে শেষ হয়ে এল একসময়।

মনজিলে পৌঁছে আট খিলানের এক পাথরের সাঁকো পেরিয়ে ওপরে চলেছি। দিনটা কেমন মেঘলা করে আছে, বাতাসও বইছে জোর। চারদিকের পাহাড়ের মাথা সব বরফে ঢাকা। যত ওপরে উঠছি, বরফ ততই পুরু হয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তুষারপাত শুরু হয়ে গেল। গোটা দেশটা দেখতে দেখতে তুষার ঝড়ের পর্দার আড়ালে চলে গেল। এই আবহাওয়ার উপযুক্ত পোশাক আমার নেই। জিন আঁকড়ে পড়ে রইলাম ঘোড়ার পিঠে। চামড়া ভেদ করে শীত যেন বর্ষার ফলার মতো হাড়ে গিয়ে বিঁধছে। চলার পথটা বরফের চাদর দিয়ে মুছে দিয়েছে কে। ডলফিনের মতো লাফিয়ে চলেছে আমাদের ঘোড়া দুটো। বরফ-গুঁড়ো তিরের মতো এসে লাগছে চোখ-মুখে। চারদিক সাদা। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হল, আমরা পথ হারিয়েছি। আর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই এই বরফ-ঘূর্ণির মধ্যে আবছা কী যেন ফুটে উঠল চোখের সামনে। হ্যাঁ, ঘোড়া-খচ্চরের একটা কাফেলা বটে। চলেছে আমাদেরই পথে। তার অগ্রভাগে দুই ঘোড়সওয়ার, লম্বা আর পাতলা বর্শা খুঁচিয়ে পথের হদিস নিচ্ছে—সামনে কোনও বিপজ্জনক খাদ বা উঁচু পাথর লুকিয়ে নেই তো! বিধ্বস্ত অবস্থায় কোনোরকমে শেষে মাস্রা গ্রামে উঠলাম গিয়ে। সেখানে গুহার মতো নোংরা এক খুপরিতে ঢুকে আগুন জ্বালানো হল। দলে তখন চার তাতার, দুই পার্সি, আর এক সুইডিশ। এবার আর কী—জমে খিল ধরে যাওয়া হাত-পা ঘষে ঘষে গরম করো আর জামাকাপড় খুলে আগুনে মেলে দাও।

obhijaanhedin90 (8)

অলবুর্জ পর্বতমালার চূড়ায় শৈলশিরার পথটা দেখলে মনে হয় গুটিয়ে যেন কুঁকড়ে আছে কার ভয়ে। দক্ষিণের ঢাল থেকে বরফ ততক্ষণে নেমে গেছে। ধু ধু ন্যাড়া প্রান্তর পেরিয়ে কাজভিন। এই সেই কাজভিন, যার সম্পর্কে নবী উক্তি করেছিলেন—‘একে সলাম দাও। বেহেশতের পাক দরজার একটি তোরণ হচ্ছে এই কাজভিন।’ পারস্যের বিখ্যাত খলিফা হারুন-অল-রশিদ আর প্রথম শাহ্‌ তমাসের রাজধানী কাজভিন। অপূর্ব এর সৌন্দর্য। ফার্সি ভাষায় দার-এস-সলতানত। ১৫৪৮-এর চল্লিশ বছর পর শাহ্‌ আব্বাস ইস্পাহানে রাজধানী উঠিয়ে নিয়ে যেতেই কাজভিনের গরিমা মলিন হতে শুরু করে।

obhijaanhedin90 (9)

জনশ্রুতি, আরবদেশীয় কবি লোকমান নাকি কাজভিনেই বাস করতেন। মৃত্যুর সময় নিজ পুত্রকে ডেকে বলে যান, ‘ধনসম্পদ তোমাকে তো কিছুই দিয়ে যেতে পারিনি, বিশেষ গুণ-সম্পন্ন ওষুধের এই তিনটে শিশি রইল। প্রথম শিশিটা থেকে কোনও মৃত ব্যক্তির দেহে কয়েক ফোঁটা ফেললেই তার আবার প্রাণসঞ্চার হবে। দ্বিতীয় শিশি থেকে ছিটিয়ে দিলে সে উঠে বসবে। আর তৃতীয় শিশির ওষুধ তার সম্পূর্ণ কর্মশক্তি ফিরিয়ে আনবে। তবে মনে রেখো, জিনিসটা অমূল্য, খরচ করতে হবে হিসেব করে—অল্প পরিমাণে।’ ক্রমে কবির সেই ছেলেও বৃদ্ধ হল একদিন, তারও দিন ঘনিয়ে এল। সে করল কী, চাকরকে ডেকে ওষুধের প্রয়োগবিধি বুঝিয়ে দিয়ে বলে গেল, তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে চাকর যেন বিধিমতো ওষুধ ছিটিয়ে দেয়। চাকরও মনিবের মৃত্যুর পর চানঘরে দেহ টেনে নিয়ে গিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শিশির ওষুধ প্রয়োগ করল। সঙ্গে-সঙ্গেই লোকমানের মৃত পুত্রের দেহে প্রাণের সঞ্চার হল। সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করতে লাগল—‘শেষেরটা ছিটিয়ে দে, ছিটিয়ে দে! জলদি কর!’ ওদিকে চোখের সামনে আচমকা এক মরা মানুষ উঠে বসতে দেখে চাকর ব্যাটার মাথাটা কেমন আউলে গেল। ভড়কে গিয়ে তৃতীয় শিশিটা চানঘরের পাথরের মেঝেতে ফেলে দিয়ে দে ছুট। অসহায়ের মতো একা বসে রইল লোকমানের পুত্র। দেহে প্রাণসঞ্চার হয়েছে বটে, কিন্তু কর্মক্ষমতা ফিরে পায়নি সে। সেই থেকে কাজভিনের সেই চানঘরের খিলান বেয়ে আজও চিৎকার ভেসে আসে—‘ছিটিয়ে দে! ছিটিয়ে দে!’

অলবুর্জ পর্বতমালার দক্ষিণ সমতলে কাজভিন অবস্থিত। এ-দেশের রাজধানী এখন তেহরান। কাজভিন থেকে ছয় ভাগে বিভক্ত নব্বই মাইল লম্বা রাস্তা গিয়েছে তেহরানের দিকে। যানবাহন ব্যবস্থা রাশিয়ার মতোই—ট্যারান্টাস আর ট্রয়কা। পথে গোটা পাঁচবার ঘোড়া বদলাতে হয়। বসন্তোপম আবহাওয়া আর আকাশ পরিষ্কার থাকায় বেশ দ্রুত এগোচ্ছিলাম আমরা। পেছনে ধুলোর ঝড় তুলে তীব্র গতিতে ছুটে চলেছিল আমাদের ঘোড়া। উত্তরে অলবুর্জের তুষার ঢাকা শৈলশিরা চোখে পড়ে। দক্ষিণে আদিগন্ত সমতল ভূমি। একদিকে ইতিউতি সবুজ শ্যামল বাগিচা, গোটা কতক ছড়ানো ছিটানো গ্রাম—অপূর্ব দেখতে, অন্যদিকে একঘেয়ে হলদে-ধূসর চিত্র।

এরই মধ্যে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আর একটা ট্যারান্টাস ছুটে আসছে পেছন পেছন। অসম্ভব দ্রুত গতি তার। মুহূর্তেই পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল আমাদের। খেয়াল করে দেখি তিনজন তাতার ব্যাপারী বসে ওতে। যাওয়ার সময় ব্যঙ্গ করে গেল—‘যাত্রা শুভ হোক।’ এরাই এখন পরের স্টেশনে গাড়ি বদলাবার সময় সবচেয়ে ভালো জাতের ঘোড়াগুলোকে নিয়ে পালাবে। কেমন যেন আঁতে ঘা লাগল হঠাৎ। ওই অসভ্য তাতারগুলোর আগে যেতে পারলে দুই ক্রান উপরি দেব—কবুল করে ফেললাম গাড়োয়ানকে। অতএব কষিয়ে চাবুক পড়ল ঘোড়ার পিঠে, আর আমরাও পরের স্টেশনের সামান্য আগে ওই তাতারদের হারিয়ে দিলাম। এইবারে আমার পালা। পাশ কেটে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে সর্বশক্তি একত্র করে চিৎকার করে বলে গেলাম, ‘যাত্রা শুভ হোক।’

তেহরানে একজন সুইডিশ ডাক্তার থাকেন বলে শুনেছিলাম। ১৮৭৩ থেকে পারস্যের শাহের দাঁতের চিকিৎসক তিনি। বর্তমানে খান উপাধি পেয়ে পারস্যের সম্ভ্রান্ত শ্রেণির একজন। তেহরান পৌঁছেই সর্বাগ্রে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা করলাম। স্বদেশী মানুষের দেখা পেয়েই দু-হাত বাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। সুন্দর বাড়িটি তাঁর। পারস্যের দেশীয় সাজসজ্জা সর্বত্র। ওখানেই থেকে গেলাম ক’দিন। দিনের পর দিন দুজনে পায়ে হেঁটে চষে ফেললাম শহর। সে-বিবরণে পরে আসছি। এমন এক ঘটনা ঘটেছিল সেখানে যা আমার ভবিষ্যৎ জীবনে দারুণ প্রভাব ফেলেছিল।

একদিন ড. হাইবেনেট আর আমি তেহরানের ধুলোময় পথ ধরে হাঁটছি। দু-পাশে হলদেটে সব কাদামাটির ঘরবাড়ি, উঁচু-নীচু দেওয়াল। পথঘাট এমনিতে প্রশস্তই, ধারে ধারে সরু খোলা নর্দমা। তার পাশে প্লেন, পপলার, উইলো আর তুঁত গাছের সার। হঠাৎ দেখি, একদল ফেরাশ (শাহি-ঘোষক) দৌড়ে চলেছে সামনে, লাল রঙের পোশাক পরনে। মাথায় রুপোলি শিরস্ত্রাণ। হাতে লম্বা লাঠি। সে দিয়ে তারা ভিড় ঠেঙিয়ে শাহেনশার গতিপথ উন্মুক্ত রাখে। ফেরাশদের পেছন পেছন পঞ্চাশ অশ্বারোহীর এক দল চলেছে। ঠিক তার পেছনে ছ’টা তাগড়া কালো ঘোড়ায় টানা শাহি রথ। জমকালো রুপোর অঙ্গসজ্জা এদের। বাঁহাতি ঘোড়ার পিঠে একজন করে সওয়ার। শাহের পরনে কালো আলখাল্লা, মাথায় মণিমুক্তোখচিত কালো রঙের পাগড়ি, তাতে আবার বিরাট এক পান্না গাঁথা। বাকি লোকজন সব তাঁর পেছনে আসছে। সবশেষে একটা খালি রথ—আপদকালিন পরিস্থিতিতে কাজে আসবে। শাহের রথের আগে আগে একদল ভিস্তিওয়ালা খচ্চরে টানা জল এনে ছিটিয়ে দিচ্ছে রাস্তায়, ফলে মোরাম না থাকলেও শাহি ঘোড়ার খুরে ধুলো জমছে না। মিনিট খানেকের মধ্যেই গোটা শোভাযাত্রা দূরে গাছের সারির আড়ালে চলে গেল।

এই প্রথম পারস্যের সম্রাট নাসির-উদ-দিনকে চাক্ষুষ করলাম আমি। আয়ত কালো চোখ, বাঁশির মতো নাক, তার নীচে ইয়া বড়ো গোঁফ—রাজোচিত চেহারাই বটে। আমরা পথ ছেড়ে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, শাহ্‌ বেরিয়ে যেতে গিয়ে আমার দিকে আঙুল নির্দেশ করে জানতে চাইলেন—“ইন কি এস্ত্‌?” (এইজন কে)

ড. হাইবেনেট তড়িৎ কণ্ঠে উত্তর দিলেন, “আমার দেশের লোক, শাহেনশাহ্‌। দেখা করতে এসেছে।”

ক’বছর পর পারস্যের সুপ্রাচীন সিংহাসনের এই শেষ অধিপতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সুযোগ ঘটেছিল আমার। ভয়ংকর স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন।

॥ ৩॥

ঘোড়ার পিঠে পারস্যের বুকে

গ্রীষ্মকাল ঘনিয়ে আসছে। দিন-কে-দিন তাপ বেড়েই চলেছে। দক্ষিণের পথে যাত্রার আর দেরি চলে না। কিন্তু বাকি খানফ পড়ল ধুম জ্বরে। এপ্রিলের ২৭-এ সে বাকু ফিরে গেল, আর আমিও একাই রওনা দিলাম নিজ পথে। সঙ্গে একটা চাকরবাকরও নেই, সম্পূর্ণ একা।

তবে সঙ্গে একটা চাপারি (ভাড়ার ঘোড়া) থাকলে আসলে কেউ আর একা থাকে না। পারস্যদেশে এক স্থান থেকে অন্যত্র যাতায়াতে ঘোড়া ভাড়া পাওয়া যায়। আমার সঙ্গেও একজন সহিস রইল অন্য ঘোড়ার পিঠে। পরের গন্তব্যে আমি ঘোড়া ছেড়ে দিলে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। এ-দেশে দুই ক্রান-এ একটা ঘোড়া ভাড়া পাওয়া যায়, সঙ্গে চাপারখানায় রাত্রিবাসের সুবিধে। লম্বা পথে জায়গায় জায়গায় ঘোড়া ও সহিস বদল হয়। ধকল সইলে আরোহী প্রয়োজনে দিনরাতও চলতে পারে। তবে বারো থেকে আঠারো মাইল পরপর ঘোড়া বদলাবার নিয়ম। আমার যাবতীয় জিনিসপত্র সব জিনের সঙ্গে একটা বড়ো ডবল ব্যাগে বাঁধা। আর কোমরের বেল্টে সেলাই করে ছয়শো ক্রানের বা ফ্রাঙ্কের সমতুল্য রুপোর মুদ্রা নিয়েছি সঙ্গে। দরকারমতো বেল্টের পকেটের মুখ কেটে মুদ্রা বার করে নিই। বাকি রইল খাবারদাবার—সে বেশ সস্তা এখানে।

তেহরান থেকে তার দক্ষিণ তোরণ দিয়ে বের হয়েছি। সঙ্গে আমার প্রথম সহিস আর চোখের সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত পারস্য ভূমি। প্রসারিত দুই বাহু আলিঙ্গন-প্রত্যাশী যেন। এশিয়ার এই অকৃপণ আহ্বানে শিহরিত হলাম। পথে দেখা সব ঘোড়সওয়ার, এক-একটা কাফেলা, উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো দরবেশ—মনে হচ্ছিল প্রত্যেকটা প্রাণী যেন আমারই ভাইবন্ধু। পাশাপাশি খুব কষ্টও হল অবোলা খচ্চরগুলোকে দেখে। অসহ্য বোঝার ভারে নুয়ে পড়েছে বেচারিরা। পিঠে পিঠে খাগড়ায় বোনা ঝুড়িতে লাল তরমুজ, হলদে ফুটির ভার।  ‘বুক অফ টোবিট’-এ উল্লেখিত প্রাচীন নাম সেই ‘ভয়ংকর দুর্গ’টা এখন আমরা বাঁদিকে রেখে চলেছি। তার স্বর্ণালি গম্বুজের তলায় চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ফকির শাহ্‌ আব্দুল আজম। এই সেই সমাধি মসজিদ যা আর দশ বছর পর শাহ্‌ নাসির-উদ-দিন ধর্মান্ধ কিছু মোল্লার হাতে গুঁড়িয়ে দেবেন।

চারদিক এইবারে ক্রমশ নির্জন হতে শুরু করেছে। বাগ-বাগিচার সংখ্যাও কমে এসেছে, ধু ধু প্রান্তর—ধীরে ধীরে মরুর পরিবেশ প্রকট হতে শুরু করল। আমাদের ঘোড়ার গতি কখনও শিথিল, কখনো-বা লাফিয়ে চলেছে। মক্কা ফেরত একদল তীর্থযাত্রীর দেখা পেলাম পথে। আমার সহযাত্রী সহিস ঘোড়া থেকে নেমে এদের আলখাল্লার কানায় চুমু খেয়ে এল গিয়ে।

পবিত্র এক ধর্মস্থান রয়েছে কুম-এ। হাজারো ভক্তের সমাগম হয়; সাধিকা ফাতেমা চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন সেখানে। তাঁর চির শয্যার ওপর নির্মিত সোনালি গম্বুজে সূর্যের কিরণ যেন ঠিকরে পড়ছে। সরু সরু লম্বা দুই মিনার সেই গম্বুজের পাশে দাঁড়িয়ে।

obhijaanhedin90 (10)

প্রসিদ্ধ বাণিজ্য শহর কাশান হয়ে এইবারে আমাদের পথ চলে গেছে পাহাড়ের উতরাইয়ে। আমার সঙ্গী সহিসটি বাচ্চা ছেলে, বছর পনেরো বয়স বড়োজোর। রওনা হওয়ার সময় এটা খেয়ালই করিনি যে সে আধমরা একটা ঘোড়া ধরিয়ে দিয়েছে আমাকে। আর নিজে রেখেছে তাজাটি বেছে। হুঁশ হতেই সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া অদলবদল করে নিয়েছি। এইবারে ব্যাটা পড়েছে পিছিয়ে। তারপর কোনোমতে দৌড়ে এসে সে আমায় ধরে কেঁদে ফেলে আর কি। মিনতি শুরু করে তাকে ফেলে না যেতে। আমি শক্ত হলাম। বললাম, “এ-দেশ আমার চাইতে তুমি ভালো চেনো। কুহ্‌রুদ অবধি নিজেই চলে যেতে পারবে। ওখানেই পাবে আমাকে।”

সে উত্তর দেয়, “তা বটে। কিন্তু দেখছেন না কেমন অন্ধকার নেমে আসছে! এই জঙ্গল দিয়ে একা যেতে ভয় করবে না বুঝি?”

আমি সে-কথা উড়িয়ে দিয়ে বললাম, “আরে ধুর! এখানে ভয়ের কিচ্ছু নেই। ঘোড়া যতটা দ্রুত পারে ছুটে যাক।”

আমি দক্ষিণের দিকে রওনা হয়ে গেলাম। ছেলেটাও আস্তে আস্তে পেছনে মিলিয়ে গেল। সূর্য পাটে গেল। গোধূলির আলো মরে গিয়ে অন্ধকার নেমে এল। পথ যতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল তো যাচ্ছিল, তার পর সম্পূর্ণ ঘোড়ার ওপর ছেড়ে দিতে হল আমাকে। একসময় কুহ্‌রুদের পাহাড়তলিতে এনে হাজির করল আমাকে। চারদিক অন্ধকার, জায়গাটা দেখতে কেমন কিছুই ঠাহর হচ্ছে না। ঘোড়া হাঁটছে। হঠাৎ হঠাৎ লতাপাতা নাকে-মুখে এসে ঝাপটা মারছে। কখনো-বা গাছের কোন মোটা গুঁড়ি এসে ঘষে যাচ্ছে শরীর। এইবারে মনে হচ্ছে পথ হারিয়েছি। ছেলেটিকে ফেলে আসা বোধ হয় বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। এখন ঘোড়াটাই ভরসা। সে-ব্যাটা নির্দ্বিধায় হেঁটে চলেছে। এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে মাথার ওপর জ্বলজ্বলে তারা ছাড়া আর কোত্থাও কিছু নেই। এমনি সময় অনেক দূরে মিটমিটে একটা আলো চোখে পড়ল যেন।

অন্ধকারে টানা চার ঘণ্টা পাড়ি দেওয়ার পর গাছপালার আড়ালে আলোর আভাস পাওয়া গেল এক ঝলক। আসছে কোন এক যাযাবরের তাঁবু থেকে। ঘোড়া বেঁধে তাঁবুর মুখের কানাত উঠিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কে আছ ভেতরে?”

সঙ্গে সঙ্গে কে এক বুড়ো খেঁকিয়ে উঠল—“কী ধ্যাস্টামো হচ্ছে এই মাঝরাতে, অ্যাঁ? পরিবার আছে সঙ্গে। যাও এখন।”

তাকে আশ্বস্ত করে জানালাম—“দেখো, মনে হচ্ছে পথ হারিয়েছি আমি। কুহ্‌রুদ এই পথেই কি?”

বুড়ো উঠে এসে বিনা বাক্যব্যয়ে পথ ধরল আমার সঙ্গে। জঙ্গল পার করে কুহ্‌রুদের রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে ফের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল নিঃশব্দে। আমি কুহ্‌রুদে পৌঁছলাম শেষে। ঢোকার মুখেই দেখি সেই সহিস ছেলে হাসছে দাঁড়িয়ে। ক’ঘণ্টা আগেই পৌঁছে গেছে সে। আমাকে না পেয়ে ভেবেছে নির্ঘাত ধরে নিয়ে গেছে কেউ। শেষ পর্যন্ত ডিম সেদ্ধ ও নুন দিয়ে রুটি আর চা খেয়ে জিন থেকে ব্যাগটা নামিয়ে আনলাম আমার। তারপর মাথার নীচে সেইটে ফেলে তোফা ঘুম।

পারস্যের ওপর দিয়ে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান টেলিগ্রাফের যে লাইনটি গেছে, কুহ্‌রুদেই তার উচ্চতা সবচেয়ে বেশি—সাত হাজার ফুট।

চলতে চলতে একসময় এক নগরে প্রবেশ করলাম আমরা। এখানকার হাইওয়ের আশেপাশের জীবনযাত্রা বেশ বৈচিত্র্যময়, বর্ণময়ও বটে। গ্রাম-গঞ্জ, বাগ-বাগিচা সব কাছাকাছি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে নয়। পথে ঘোড়া আর খচ্চরের ছোটো ছোটো কাফেলা বিভিন্ন শস্য আর ফল বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শেষ এক রাস্তায় পড়লাম গিয়ে। এই সেই বিখ্যাত ইস্পাহান, সম্রাট শাহ্‌ আব্বাসের রাজধানী।

নগরের ডানদিক ছুঁয়ে জয়ন্দেহ্‌-রুদ (নদী) বয়ে চলেছে। কাদাগোলা ঘূর্ণি-স্রোত তাতে। তিনশো বছরেরও বেশি পুরোনো বেশ ক’টা বড়ো বড়ো সাঁকো আছে এর বুকে। নতুন এলে অনেক কিছু দেখার আছে ইস্পাহানে। গোটা দুনিয়ার সর্ববৃহৎ নগর-চত্বরগুলোর একটা এখানেই রয়েছে—ময়দান-এ-শাহ্‌—আড়েদিঘে যথাক্রমে ৭০০ ফুট ও ২০০০ ফুট। চমৎকার কারুকাজ করা মসজিদ-এ-শাহের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে প্রশংসা না করে থাকা যায় না। চেহেল সুতুনে (চল্লিশ থামওয়ালা প্রাসাদ) ঢুকে কুড়িটা থামই কেবল গুনে পাওয়া যায়। আর বাকি কুড়িটা হচ্ছে প্রাসাদের সামনের সরোবরে তাদের ছায়া। অতএব নামকরণের কৌশলটি সহজেই অনুমেয়।

obhijaanhedin90 (11)

ইউলফা একটি উপনগর, তাতে হতভাগ্য আর্মেনিয়ানদের বাস। যেতে যেতে পিচ, অ্যাপ্রিকট আর আঙুরের মিষ্টি সুবাস টের পেলাম নাকে। পাকা চার দেওয়ালের ভেতরে বিরাট এক বাজার—বেজায় হই-চিৎকার। কান পাতা দায়। থিকথিকে ভিড় ঠেলে কাফেলা ঢুকছে, বেরোচ্ছে। দোকানিরা চিৎকার করে ডাকাডাকি করছে। কাঁসারিরা ঠং ঠং কাঁসা পেটাচ্ছে।

নগরের দক্ষিণাংশের পাহাড়ের মাথায় গিয়ে দাঁড়ালে সার সার ঘরবাড়ি, মনোরম সব বাগ-বাগিচা আর সবুজ গাছগাছালির মাথা ছাড়িয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ঝকঝকে গম্বুজ আর মিনার চোখে পড়ে। সব মিলিয়ে সে এক দেখার মতো দৃশ্য বটে।

আবার একদিন সেই নির্জন পথে রওনা। পাথরের খাঁজে খাঁজে লাল লাল মাকড়শা, সবুজ বা ছাইরঙা গিরগিটির আস্তানা। ইতিউতি যাযাবরের দল ভেড়া চরায়। সে-সব পেরিয়ে উতরাই বেয়ে বিধ্বস্ত পাসারগাদিতে উঠলাম গিয়ে। অল্প সময়ের ঠিকানা। বড়ো ভালো লাগল সেখানে উঁচু ধাপের ছোটো একটা মার্বেল পাথরের মহলে থাকতে পেরে। সে-মহল আজও পঁচিশ শতাব্দীর রাজকীয় গৌরবের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

এই প্রাচীন কীর্তিস্তম্ভকে পার্সিরা ‘মদর-এ-সুলেমান’ বলে চেনে। অর্থাৎ, মাদার অফ সলোমন। বিশ্বাস করে, সেই মহীয়সী নারী চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এর সমাধির নীচে। সিঁড়ির মাথায় সেই সমাধি দৈর্ঘ্যে দশ ফুট ও প্রস্থে সাত ফুট। কিন্তু ইউরোপবাসীদের মত ভিন্ন। তাদের দাবি, এই সমাধি আর কারও নয়, স্বয়ং সাইরাসের। যদিও সন্দেহ আছে যে আদৌ সেই মহান সম্রাটকে এইখানেই সমাধিস্থ করা হয়েছিল কি না। সহজ কাজ তো নয়—সমাধি হতে হবে স্বর্ণখচিত ভাস্কর্যের। মহলের দেওয়ালে দেওয়ালে থাকবে ব্যাবিলন থেকে আনা সব ঝালর। সম্রাটের ঢাল-তরোয়াল, তির-ধনুক সবই সমাধিতে অর্পণ করতে হবে। দেহে থাকবে তাঁর কণ্ঠহার, কর্ণ কুণ্ডল, রাজ-পরিচ্ছদ—সব।

সম্রাট সাইরাসের সেই দৃপ্ত উক্তি মনে পড়ে যায়—‘আমার পিতৃভূমির দক্ষিণে অ-বাসযোগ্য অতি উষ্ণ ভূমি। আর উত্তরে শৃঙ্খলাবদ্ধ বরফের সাম্রাজ্য। এর মাঝেই আমার রাজত্ব।’

obhijaanhedin90 (12)

দীর্ঘ পার্বত্য এলাকা একসময় মর্বদশ্তের সমতলে গিয়ে শেষ হল। সেখানকার উল্লেখযোগ্য আর এক কীর্তিস্তম্ভের পথে রওনা হলাম তারপর। পার্সেপলিস—প্রাচীন এক ধ্বংসপ্রাপ্ত নগর। আকিমেনিয়ান সাম্রাজ্যের রাজধানী। পারস্যের পুরাকালের স্মৃতিচিহ্নের ধারক। নির্জন জায়গা। সূর্যের তাপে হলদে কাদামাটি চারদিকে ফুটিফাটা হয়ে আছে। দূরদূরান্ত অবধি প্রাণের কোনও চিহ্ন নেই। ঘোড়াসুদ্ধ সহিসটিকে ফেরত পাঠিয়ে সারাদিন এই ধ্বংসস্তূপে বসে রইলাম আমি।

দুই সারির প্রশস্ত একটা সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে। মার্বেল পাথরের নীচু নীচু ধাপ। পাশাপাশি দশজন অশ্বারোহী অনায়াসে বেয়ে উঠতে পারে। ওপরে সুবিশাল এক চত্বর। তাতে সম্রাট প্রথম দারিয়ুসের রাজপ্রাসাদের বুনিয়াদি প্রাচীরগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে। ছত্রিশটার মধ্যে তেরোটি থাম এখনও ধরে রেখেছে জক্সেসের প্রাসাদের ২৪০০ বছরের প্রাচীন ছাদটাকে। সুসায় অবস্থিত আহাসুয়েরাসের প্রাসাদে রক্ষিত ইস্টারের বইয়ের এক বর্ণনার সাহায্য নিয়ে তার মোটামুটি একটা চিত্র আঁকা যেতে পারে।—

‘মর্মর প্রস্তরের স্তম্ভে রাজ-মর্যাদার উপযুক্ত পট্টবস্ত্রের তন্ত্রীতে বাঁধা বেগুনি ও রুপোলি আংটায় নীল, সবুজ আর সাদা ঝালর দেওয়া। লাল, সাদা, নীল আর কালো মর্মরে শান বাঁধানো বেদির ওপর সোনা ও রুপোর শয্যা পাতা।’

এই বৈভব, এই ঐশ্বর্য ধ্বংস হয়েছিল ম্যাসিডনিয়ার আলেকজান্ডারের হাতে। সেটা ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এক মদ্যপানের লড়াইয়ে উন্মত্ত হয়ে গোটা রাজপ্রাসাদে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। পার্সেপলিস ভস্মীভূত হয়।

ফের পথচলা শুরু। আরও দক্ষিণে এগিয়ে সংকীর্ণ এক গিরিপথের ওপর থেকে সমতলে শায়িত শিরাজ নগরের নয়নাভিরাম দৃশ্য নজরে এল। স্থানীয়রা এই গিরিপথকে টাং-এ-আল্লাহ্‌ আকবর বলে। কারণ, পার্সিরা প্রথম এখানে পৌঁছে দূর থেকে শিরাজের এই সৌন্দর্য দেখে নাকি বলে উঠেছিল, ‘আল্লাহ্‌ আকবর!’ (ঈশ্বর সুমহান)

শিরাজের বিখ্যাত জিনিস হচ্ছে শরাব, শবাব আর গুলাব। শায়রিরও খ্যাতি রয়েছে দারুণ। মদ সব তৈরি হয় এখানকার পাহাড়ি এলাকায়। সেখানে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে থাকে মিষ্টি গন্ধে। কীর্তিমান কবিদের কবর ঘিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে সাইপ্রেসের সারি। এগুলোর মধ্যে পারস্যের প্রসিদ্ধ দুই কবি সাদি ও হাফিজের সমাধি উল্লেখযোগ্য। সাদি ১১৭৬-এ জন্মগ্রহণ করেন। ‘গুলিস্তাঁ’ (গোলাপের বাগিচা) তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। আর হাফিজ জন্মান ১৩১৮-তে। তিনি লিখেন ‘দ্য ডিভান’। তাঁর সমাধিতে লেখা আছে—

‘আমার কবরে এলে শরাব আর শায়রি সঙ্গে এনো, হে প্রিয়। তোমার সুমধুর কণ্ঠধ্বনি আর গানের টানে এই চিরনিদ্রা ভঙ্গ করেও উঠে আসতে পারি।’

তৈমুর শাহ্‌ হাফিজের কবিতার উচ্চ প্রশংসা করতেন। কোনও এক সফরকালে শিরাজে এসে কবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গিয়েছিলেন।

এ-দেশে দরবেশদের আবার বিভিন্ন ভাগ রয়েছে। প্রত্যেক শ্রেণির প্রধানকে পীর বলা হয়। রীতিনীতি, নিয়মকানুন আলাদা আলাদা। কেউ কেউ সারাদিন ‘আল্লাহ্‌ হুঁ’ (হা ঈশ্বর) বলে চিৎকার করতে থাকে। কেউ কেউ আবার—‘ইয়া হুঁ, ইয়া হক’ (তিনিই একমাত্র, তিনিই সত্য)। এদের মধ্যে কঠোর সংযমী যারা, তারা লোহার শেকল দিয়ে সপাসপ নিজের কাঁধে-পিঠে প্রহার করতে থাকে। কিন্তু প্রায় সবার ক্ষেত্রেই একটা বিষয়ে সাদৃশ্য রয়েছে—তাদের এক হাতে লাঠি, অন্য হাতে নারকোল মালার ভিক্ষাপাত্র।

১৮৬৩-তে ফেগারগ্রেন নামে একজন সুইডিশ ডাক্তার শিরাজে আসেন। তারপর দীর্ঘ ত্রিশ বছর কাটিয়ে দেন এই গোলাপ আর কাব্যের দেশে। খ্রিস্টীয় চার্চের জমিতে তাঁকে কবর দেওয়া হয়। একদিন এক দরবেশ এসে হাজির তাঁর কাছে। ফেগারগ্রেন দরজা খুলে একটা তামার মুদ্রা ছুড়ে দেন তার দিকে। দরবেশ ঘৃণার চোখে তাকিয়ে প্রতিবাদ করে—“ভিক্ষা নিতে তো আসিনি।”

“তবে?”

“এসেছি এক বিধর্মীকে ইসলামে দীক্ষা দিতে।”

ফেগারগ্রেন হেসে বললেন, “বেশ তো। আগে তোমার অলৌকিক কোনও ক্ষমতার পরীক্ষা দাও তবে।”

“নিশ্চয়ই।” দরবেশ রাজি হয়ে যায়।—“তুমি যে-ভাষার নাম করবে তাতেই কথা বলে দেখাব আমি।”

ফেগারগ্রেন তক্ষুনি নিজের ভাষায় বলে উঠলেন, “একটু সুইডিশ বলে দেখাও দেখি।”

দরবেশও সঙ্গে সঙ্গে উদাত্ত কণ্ঠে টেগনারের ‘ফ্রিথিওফ’স সাগা’ থেকে নির্ভুল আবৃত্তি করে গেল খানিক। ডাক্তার তো অবাক। নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছে না যেন। কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। দরবেশ তারপর চাপটা বেশি হয়ে যাচ্ছে ভেবে নিজের ছদ্মবেশ খুলে ফেললেন এইবারে। ডাক্তার আরও এক কাঠি আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, এ যে প্রাচ্যদেশের ভাষাবিদ আর্মিনিয়াস ভামবেরি! বুদাপেস্ট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছিলেন যিনি।

তাই বলে আমাকে কোনও ছদ্মবেশ নিতে হয়নি শিরাজে ঢুকতে। দিব্যি ক’টা দিন মি. ফার্গুসের সঙ্গে কাটিয়েও দিলাম সেখানে। বড়ো অমায়িক ফরাসি মানুষ। ১৮৬৬-তে দেশে চাকরি করবার সময় ছ’মাসের ছুটি পাওনা হলেন শিরাজে এসে কাটিয়ে যাবার। আর আমি ওখানে যাই ১৮৮৬-তে। তখনও শিরাজেই রয়ে গেছেন তিনি। এর চার বছর পর আবার দেখা হয়েছিল আমাদের, তখন তিনি তেহরানে। ভদ্রলোক আসলে পারস্যের প্রেমে পড়ে গেছেন।

কাস্পিয়ান সাগর থেকে এ-দেশে আমার সবচেয়ে কঠিন পথ ছিল শিরাজ থেকে পারস্য উপসাগর অবধি। ফার্সিস্তান পর্বতমালার গিরিপথ সব অত্যন্ত খাড়া এবং বিপজ্জনক। চড়াই, উতরাই—শেষ আর হয় না। বন্য পথ। চারদিকে ফুটিফাটা আর রোদপোড়া ছোটোবড়ো পাথর। প্রাণ হাতে করে তিনটে গিরিপথ পেরিয়ে এসেছি—সিন-এ-সফেদ (সাদা জিন), পির-এ-সান (বৃদ্ধা নারী) আর কোতেল-এ-দুখতার (গিরি-বালিকা)। একবার তো পা হড়কে আমার ঘোড়াটা খাদে গড়িয়েই পড়ছিল প্রায়। আমি কোনোমতে জিন থেকে পথে লাফিয়ে পড়লাম।

গুমোট গরমে দমবন্ধ হয়ে আসছে। চারদিকের পাহাড়-পর্বত ক্রমশ আকারে ছোটো হতে হতে সমতলে গিয়ে মিশতে শুরু করেছে। সমুদ্র উপকূল হয়তো আর বেশি দূর নয়। যেদিকে তাকাই যেন মরু প্রান্তর। পথে আমার পালটি বয়স্ক সহিসটিকে ছেড়ে এসেছি। এই অঞ্চলে বেশ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে দেখলাম। পাহাড়ি ডাকাতেরা নাকি ঘুরে বেড়ায় এখানে। তবে খারাপ কিছুই ঘটল না। ভোর হল। রুপোর পাতের মতো ঝকঝকে আকাশ। ঘণ্টা কতক পরে এক বন্দর শহর—বুশহরে প্রবেশ করলাম। সুবিশাল শাহ্‌ সাম্রাজ্যে ঊনত্রিশ দিনে এ-যাবৎ ন’শো মাইল পথ পাড়ি দিয়েছি আমি।

ছবি: লেখক

 

Leave a Reply