বনের ডায়েরি-ভারতের মানুষ ও না মানুষদের গল্প -বিস্ট অ্যান্ড মেন ইন ইন্ডিয়ার বঙ্গানুবাদ-পিয়ালী চক্রবর্তী-মূল লেখা-জন লকউড কিপলিং-বর্ষা ২০১৬

সব পর্ব একত্রে পর্ব ১পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫,পর্ব৬ পর্ব ৭ ,পর্ব ৮ , পর্ব ৯ , পর্ব ১০ পর্ব ১১ পর্ব ১২, পর্ব ১৩ 

beastandman5701 (Medium)

একটা অদ্ভুত কান্ড ঘটেছিল সিমলাতে এই বাঁদরদের উৎপাতের জন্য। ওখানকার প্রধান যে ময়রা,সে একটা দারুণ বিয়ের কেক বানিয়ে খুব নিরাপদে একটা ঘরের মধ্যে রেখে দিয়েছিল, যেরকম সিমলার ঘরগুলো হয়,খাড়াই পাহাড়ের পাশেই। কিন্তু জানলা খোলা রেখে,দরজায় তালা দিলে কি আর নিরাপদে রাখা হল?  খানিক বাদেই দল বেঁধে বাঁদররা এসে জুটল কেক নিয়ে যাবার জন্য। এমনকি শেষ টুকরোটা পর্যন্ত জানলা দিয়ে বাইরে নিয়ে আসা হয়েছিল।

এদিকে বাকি কেকটা ছড়িয়ে ততক্ষণে বাঁদররা বাইরেটাকে সাদা করে দিয়েছে। কীরকম ক্ষতি হল বল? অথচ বাঁদরেরা কিন্তু মোটেই মাখন দেওয়া খাবার পছন্দ করে না,এমনকি অতিরিক্ত মিষ্টিও না। আর বিয়ের সাদা কেক মানে সেতো দেখতে যেন অনেকটা একতাল প্লাস্টার রাখা রয়েছে। তবুও বাঁদরগুলো কী করে বুঝল যে ওটা খাবার জিনিস সেটাই আশ্চর্যের।

আসলে এই জীবটার একটা কাজই হচ্ছে,যেকোন জিনিসকে টুকরো টুকরো করে ফেলা। একটা ফুল বা একটা ভাঙা খেলনা একটা বাঁদরকে অনেকক্ষণ ধরে টেনে রাখে। যদি একটা পাখি এসে ওদের হাতে পড়ে,তাকে এরা ততক্ষণ ছাড়বে না যতক্ষণ না তার সবকটা পালক উপড়ে নিচ্ছে। আর তারপরে আপনমনেই ওর মাথাটা মাটিতে ঘষতে থাকবে। তাই বাঁদরকে যদি ভাল করে শিখিয়ে নেওয়া যায় তো রান্নার জন্যও পাখি ধরে ছাড়িয়ে দিতে পারে। এটা বলা হয় যে বাঁদরেরা সাপ মারে ওদের মাথাটা পাথরে ঘষটে দিয়ে। মাঝে মাঝে ওর ওপর থুতু ফেলে,আর ঘষতে ঘষতে আবার হাতে তুলে নিয়ে দেখে নেয় কী অবস্থা। তাই এরকম একটা প্রবাদ আছে যে,এমন কোন দ্বিধার ব্যাপার বা সুযোগ,যেটা হয়ত বা লাভজনক হবে না,তাকে বলে ‘যেমন সাপ যখন বাঁদরের হাতে থাকে’। ও ভয় পেলেও ওটাকে যেতে দেবে না। লোকজন এমনও বলে যে,বাঁদরেরা পাখির বাসা নষ্ট করে আর তার সাথে ডিম আর ছানাগুলোকেও নষ্ট করে দেয়।

এমনকি বন্য বাঁদরদের রুচিসম্পন্ন স্বাদের ব্যাপারটাও খুব কৌতূহলের, সে ওরা যতই নিরাপত্তাহীন জীবনযাপন করুক না কেন। যেমন আমি আর আমার পরিবার একটা বন্য বাঁদরদের দলকে প্রতিদিন খাওয়াতাম, বিভিন্ন স্বাদ ও গন্ধের খাবার দিতাম। একবার ওদের একরকম বিস্কুট দিলাম,সেটা দোকানে অনেকদিন পড়েছিল। আর তাতে একটা পচা গন্ধ হয়ে গেছিল। এই বিস্কুটগুলো আমরা আগেও ওদের খাইয়েছি,কিন্তু সেগুলো তাজা ছিল। এখন হল কী,ওরা বিস্কুটগুলো নিয়েই মুখে পুরেছে,আর বিচ্ছিরি মুখ করে থু থু করে ফেলে দিল। আবার হাতে তুলে

বিস্কুটগুলো দেখতে লাগল,বিস্কুটগুলো তো ওদের চেনা,ওরা জানে কেমন খেতে,তাই আবার ওরা মুখে পুরল,ভাবল হয়ত আগের মত হবে,কিন্তু না,এবার বিরক্ত হয়ে ওরা সব ছুঁড়ে ফেলে দিল। এইভাবে ওরা গন্ধ দিয়ে খাবার বুঝতে শিখে গেল।

আবার কাক যেমন অতি ধূর্ত কিন্তু আবার নিজেকেই ঠকায়,বাঁদরেরা কিন্তু খুব সুকৌশলে কাজ সারে। এরা খুব সাহসী হয় কিন্তু কখনও বন্ধু হয় না। শুধু একজনই ব্যতিক্রম ছিল,সে আসলে বন্দী অবস্থা থেকে পালিয়েছিল। আমরা ওকে ধরে ফেলেছিলাম কিন্তু আবার ছেড়েও দিলাম। তার ওপর আমার মেয়ে আবার হাত ভর্তি খাবার নিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করছিল আর খোলা দরজার দিকে নজর রাখছিল। কিন্তু বাকি বাঁদরগুলোর কী রাগ,তারা খাবারের টুকরোগুলোকে ভাবল ওদের জন্য ফাঁদ পাতা হয়েছে,আর ভীষণ রাগী চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে ওগুলো নিয়ে যেতে বলছিল। যেন আমাদের দেওয়া জিনিসগুলো দিয়ে ওদের চাতুরীকে ছোট করা হচ্ছে।

এইজন্য বাঁদরের পালকে মাঠ বা বাগান থেকে তাড়ানোর সময় ওরা খুব চীৎকার করে, আসলে মানুষের মত ওরাও শত্রুকে নিরাপদ দুরত্ব থেকে ভয় দেখায়।

beastandman5702 (Medium)বাঁদরের এইসব ছলচাতুরি মানুষকে খুব প্রভাবিত করে। এরকম বলা হয় যে,বাঁদরকে বিষ দেওয়া কখনও সম্ভব নয়। প্রাচীনকালের মানুষদের মধ্যে অনেকদিন ধরে এই ধারণাটা বাসা বেঁধে ছিল। আল মাসুদি,যিনি সেই দশম শতাব্দীতে সংকলন করেছিলেন আরব বিশ্বকোষ “সোনার ক্ষেত্র, রত্নের খনি”, লিখেছিলেন যে বেশিরভাগ চীনা এবং ভারতীয় বিচক্ষণ রাজারা বাঁদরকে ব্যবহার করতেন তাঁদের খাবার পরীক্ষার জন্য। মানে কোনটাতে বিষ আছে,কোনটায় নেই। একবার এক পাহাড়ি চাষী দেখলেন বাঁদরের উৎপাতে তাঁর ক্ষেতের ভীষণ ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। তখন এই শত্রুদের তাড়ানোর জন্য তিনি প্রথমে রোজ এক বাটি ভাত রাখতে শুরু করলেন ক্ষেতের পাশে। বাঁদরেরা আসে আর রোজ খায়। এইভাবে যখন এটা তাদের অভ্যেসে পরিণত হল,তখন একদিন চাষী একটা স্বাদহীন বিষ মিশিয়ে দিলেন ভাতের মধ্যে। তিনি দেখলেন বাঁদরেরা খাবারের চারিদিকে ঘুরছে আর নিজেদের মধ্যে কিচিমিচি করছে। তারা কিন্তু খাবারটা ছুঁল না,গোল হয়ে তার চারদিকে বসে নিজেদের মধ্যে কী সব গভীর আলোচনা করল আর শেষে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে কোথায় যেন চলে গেল। খুব তাড়াতাড়ি তারা ফিরে এল সাথে গাছের ডাল আর পাতা নিয়ে। আসলে ওরা বুঝতে পেরেছিল যে খাবারটায় কিছু আছে,তাই বিষের প্রতিষেধক হিসেবে এসব নিয়ে তারা হাজির। এরপর সেগুলো ভাতের সাথে মেখে তারা মহানন্দে খেয়ে নিল,আর সুস্থ শরীরে তারা আবার পরেরদিন ক্ষেতে এসে উপস্থিত হল।  এই

লেহনা সিং মাজিথিয়া নামে এক শিখ সর্দার বদমাশ বাঁদরদের শায়েস্তা করতে এই একই কাজ করেছিলেন হরিদ্বারে। তুমি যদি বিশ্বাস কর যে বাঁদরেরা কথাও বলতে পারে,কিন্তু বলে না কাজ করার ভয়ে,তাহলে ওদের রসায়নের জ্ঞানকে বাহবা দিতেই হয়। কারণ ভারত এমনকি পাশ্চাত্য দেশের লোকও এটা বিশ্বাস করে যে ওরা বলতে পারে।

একটা জিনিষ লক্ষ্ করা গেছে যে,বাঁদরেরা নিজেদের জন্য কোন বাসা বা ছাউনি বানাতে  পারে না। এমনকি খুব বৃষ্টি হলেও নিজেদের জন্য একটা জায়গা খুঁজে উঠতে পারেনা। এই যেমন সিমলায় অনেক রাস্তার ধারেই কিছু মাথা ঢাকা দেবার জায়গা বানানো থাকে,এমন দেখা গেছে যে তার কিছুটা দূরেই বসে বাঁদরেরা বৃষ্টিতে ভিজছে,ঝড়ে কাঁপছে,কিন্তু তারা ওইসব ছাউনির তলায় আশ্রয় নিচ্ছে না।

চলবে