বনের ডায়েরি ভারতের মানুষ ও না মানুষদের গল্প–শরৎ ২০১৫জন লকউড কিপলিং-অনু- পিয়ালী চক্রবর্তী- শরৎ ২০১৫

সব পর্ব একত্রে পর্ব ১পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫,পর্ব৬ পর্ব ৭ ,পর্ব ৮ , পর্ব ৯ , পর্ব ১০ পর্ব ১১ পর্ব ১২, পর্ব ১৩ 

beastandmantitle02

আমাদের দেশটা ভারী মজার। এ দেশে একদিকে যেমন বনের পশুপাখিকে নির্বিচারে মারা হয় আবার তেমনি অন্যদিকে তাদের সঙ্গে মানুষদের ভারী আত্মীয়তা। তাদের কাউকে সে ভগবান বলে পুজো করে, কাউকে আবার পুষ্যি বানিয়ে আদর করে, আবার কাউকে সে আবার বন্ধু বানিয়ে নিজের রুজিরোজগারের কাজে তার সাহায্যও নেয়।

মানুষে ও পশুতে এই যে নানারঙের ভাবসাব এ দেশে, তাই নিয়ে ১৮৯১ সালে জন লকউড কিপলিং ভারী চমৎকার এক বই লিখেছিলেন। তার নাম বিস্টস অ্যান্ড মেন ইন ইন্ডিয়া। বনের ডায়েরির পাতায় এইবারে তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করল।

প্রথম অধ্যায়

পাখির কথা-টিয়া পাখি

beastandmen01

কোনো কোনো ধর্মে এই বিশ্বাস আছে যে, স্বর্গ থেকে মানুষকে ঠোঁটে করে শস্য, বীজ এনে দেয় এক পাখি। সে মানুষের পরম বন্ধু। সবুজ রঙের শরীর, লাল টকটকে তার ঠোঁট। কোন পাখি বলত? ঠিক, টিয়া পাখি। যদিও অনেক রূপকথা, উপকথায় একে ঘাতক পাখি বলা হয়েছে, তবুও এই পাখি আমাদের ঘরের একজন। সবচেয়ে প্রিয় ‘খাঁচার পাখি’।

শুধু কি এদেশের রূপকথা? বিদেশের কত গল্পগাথাতেও টিয়াপাখির উজ্জ্বল উপস্থিতি। লর্ড উইলিয়ম, মে কোলভিনের ব্যালাড, স্যার জনের অ্যাডভেঞ্চারে আছে টিয়াপাখি, সে বিদেশের বইতেও স্থান পেয়েছে। আমাদের দেশে অবশ্য বইয়ের পাতা ছেড়ে টিয়াপাখি আমাদের বাড়িরই এক সদস্য। যার বাড়িতে থাকা খুবই শুভ। সে কথা বলতে পারে, চিন্তা করতে পারে। আবার সে কি শুধুই এক সাধারণ পাখি? ভারতের ভালবাসার দেবতা কামদেবের বাহনও।

কিন্তু ভাবো একবার, আমরা কেমন নিষ্ঠুর। টিয়াপাখি ওর শক্ত ঠোঁট দিয়ে কাঠের খাঁচা ভেঙে ফেলতে পারে, তাই আমরা ওকে লোহার খাঁচায় আটকে রাখি। প্রচন্ড গরমে, খাঁচা তেতে ওঠে, ভিতরটা হয়ে যায় জ্বলন্ত উনুনের মত। পাখিগুলো ছটফট করতে থাকে, যেন বলতে চায় ‘আমাদের ছেড়ে দাও’। আর আমরা শুধুই হাসি। আচ্ছা বল তো, আমাদের ভালো লাগার জন্য আমরা কি ওদের এতখানি কষ্ট দিতে পারি?

ভারতবর্ষে কত ভগবানের নাম শেখানো হয় টিয়াকে, রাম, গঙ্গারাম, শ্রী ভগবান আর টিয়া তাড়াতাড়ি শিখেও নেয়। আবার মুসলমানের ঘরের টিয়া বলে মিঞা, মিট্টু। আবার উত্তর ভারতে হিন্দু বাড়ির টিয়া ছড়া কাটে

লতপত পঞ্ছী,

চতুর সুজন,

সব কা দাদা শ্রী ভগবান,

পড়ো গঙ্গারাম

ছোট্ট মেয়েদের আদর করে বলে ছোট্ট টিয়া আবার দুই বাড়ির বউতে মিলে ঘাড় নেড়ে নেড়ে মিষ্টি মিষ্টি গল্প করলেও বলে টিয়া পাখির মত কথা বলছে।

beastandmen5002

কিন্তু যেই বলে ‘টিয়াপাখির চোখ’, উঁহু, সেটা কিন্তু মোটেই ভাল উপমা নয়। ভাবা হয় খুব অকৃতজ্ঞ, স্বার্থপর লোকেদের চোখ নাকি এমন হয়। কারণ ধর তুমি টিয়াপাখিকে খেতে দিয়ে, ভুল করে খাঁচার দরজা খুলে রেখে চলে গেছ, ওমনি সেও ফুরুত করে পালাবে, মনেই রাখবে না তুমি তাকে কত কথা শেখাও, গান শেখাও, ভালবাস। আসলে তুমি যখন টিয়াপাখির সাথে কথা বল, ওর স্বভাবই হল তোমার দিকে না তাকিয়ে অন্যদিকে তাকানো। মানে ভীষণ অন্যমনস্ক। আবার এই গান গল্পের নায়ক টিয়াপাখিই কিন্তু পরিবারের অনেক শিক্ষা-সহবতের অংশ হয়ে ওঠে। মা বাদামের কিছুটা তার সন্তানকে দিয়ে কিছুটা টিয়াপাখিকে দেয় যাতে করে ভাগ করে খাবার অভ্যেসটা তৈরি হয় বাচ্চার মধ্যে। আবার দরজার ওপর ঝোলানো টিয়াপাখির খাঁচার তলা দিয়ে বর-বৌ গেলে সেটা খুব শুভ, কিন্তু অন্য কেউ গেলে সেটা আবার অশুভ ধরা হয়।

একবার হল কি, পাহাড়ি এক রাজ্যের এক সরকারি হোমরাচোমরা গোছের লোকের বিয়ে ঠিক হল। বিয়ের দিন, তখনও বর যাত্রা শুরু করেনি, কি এক কাজে সে গেল অন্তঃপুরে তার এক পরিচিত মহিলার সাথে দেখা করতে। অমনি সেই মেয়ের সঙ্গী সাথীরা করল কি, দরজার ওপর দিল টিয়াপাখির খাঁচা ঝুলিয়ে। এইবার তো আর বিয়ের পাত্র সেই ঘর থেকে বেরোতে পারেনা, অন্য দরজাও নেই। এদিকে বিয়ের দিন। খাঁচার তলা দিয়েও বেরোনো যাবে না। সবার সে কি চিন্তা। তবে কি ছাদ ফুটো করে বের করা হবে? এবার তো পারিষদেরা অনেক উপায় করে শেষমেশ এল এক বুড়ো উজিরের কাছে। উজির বলল ‘কই আমার আবার দৃষ্টি খাটো, কিন্তু তবুও তো আমি কোন খাঁচা দেখতে পাচ্ছিনা। তখন আবার সকলে ফিরে গিয়ে দেখে সত্যি তো খাঁচা নেই। ব্যাস রাজাকেও উদ্ধার করা হল।

টিয়াপাখিরা কিন্তু আবার জিমন্যাস্টিক করে। আর লোকজনকে করেও দেখায়। এমনটা দিল্লীর রাস্তায় প্রায়ই দেখা যায়। সে মিলিটারিদের মত ব্যায়াম করছে, ছোট টর্চ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কামানের পিছনে বারুদ ভরে, আগুন লাগিয়ে তোপ দেগে দিল। দিয়েই অমনি নিজে মরে গেল, আবার বেঁচে উঠল, ভারি মজার খেলাগুলো। কিন্তু ভারতের টিয়াপাখিদের বলার ক্ষমতা নাকি বাইরের দেশের টিয়াপাখিদের থেকে কম হয়।

beastandmen5003

ভারতবর্ষে কাজ করতে আসা ইংরেজ সৈন্যরা অবসরে প্রজাপতি ধরে জমায় বা পাখি ধরে ফাঁদ পেতে। আবার কেউ কেউ বুলি শেখায় টিয়াপাখিকে। এটা ভাবা হয় যে অন্ধকার নিঝুম ঘরে নিয়ে গেলে টিয়া নাকি তাড়াতাড়ি কথা বলে। তাই সেই সময় সৈন্যরা একটা কুয়োর মধ্যে খাঁচাটাকে অর্ধেক ঝুলিয়ে রেখে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে কথা বলা শেখা্য। কারণ তাদের নিজেদের ব্যারাকে এমন কোন ঘর নেই। এটা খুবই ধৈর্যের কাজ। কোনদিন এদেশের কোন দেশি লোককে একাজ করতে দেখা যায়নি। 

ছবিঃ মূল গ্রন্থ