বনের ডায়েরি-ভারতের মানুষ ও না মানুষদের গল্প -বিস্ট অ্যান্ড মেন ইন ইন্ডিয়া-জন লকউড কিপলিং-অনুঃপিয়ালী চক্রবর্তী

bonerbeast (Medium) 

বাঁদরের কথা

ওরা ভীষণ আড়ালে লুকিয়ে থাকে, আর ওদের মুখ ভীষণ লাল। আর তারপরেই ওরা ভীষণ জোর দিয়ে মাথা চুলকোয়, ওদের আচার-আচরণ যে সবসময় খুব ভাল, তা একেবারেই নয়, কিন্তু আমার কেন ইচ্ছে হল পাহাড়ের গায়ে আলতো করে শুয়ে থাকা বাঁদরকে দেখতে

 আর.কে

বাঁদর ভগবান

হিন্দুদের কাছে এই প্রাণিটার সম্পর্কে যেটুকু শ্রদ্ধা আছে, তা সবই হনুমানের জন্য, দক্ষিণ ভারতে যাকে বলে মারুতি। হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, হনুমান হল শ্রীরামচন্দ্রের অনুগত ভক্ত, যুদ্ধক্ষেত্রে যার সাহস ছিল দেখার মত আর তার সাথে মিশে ছিল তার অপরিসীম ভক্তি। সে এখন ভগবান এবং তার অগুন্তি হিন্দু ভক্ত। তার সাহসীকতার প্রচুর ছবি দেখা যায়। কিন্তু প্রাচীন হিন্দু দেবদেবীদের পাথরের মূর্তির মধ্যে হনুমানকে খুব একটা দেখা যায়না। এরকমটা শোনা যায় যে হিন্দুরা মনে করে, ইংরেজরা হনুমানের বংশধর। রাক্ষসরাজার নাকি একজন পরিচারিকা ছিল, যে বন্দী অবস্থায় সীতার রক্ষণাবেক্ষণ করত। সে সীতাকে এত যত্ন করেছিল যে রাম খুশি হয়ে তাকে বর দিয়েছিল যে সে একটা জাতির মা হবে, যারা অনেকখানি জমি অধিকার করে থাকবে। পরে সেই পরিচারিকাকেই হনুমান স্ত্রীর মর্যাদা দেয়। এইসব কিছু কবিতা থেকে জানা যায়। এছাড়াও একটা অপ্রিয় প্রবাদ আছে, ব্রিটিশদের বলা হয় ‘বাঁদরসেনা’।

হনুমানকে পুজো করার রীতি যদিও হিন্দুধর্মে তুলনামূলকভাবে অনেক পরে এসেছে, কিন্তু হিন্দুদের বাঁদরের প্রতি ভালবাসার নিদর্শন অনেক পুরোন। বেনারস, অযোধ্যা, মথুরাতে এদের নিয়মিত খেতে দেওয়া হয়। যদিও বলা হয় যে এটা হল কাউকে হত্যা করার মত জঘন্য কাজকে একটু ধামাচাপা দেবার চেষ্টা। বেনারসের মন্দিরে দুর্গা, কালী, অন্যান্য দেবীদের যেসব মূর্তি আছে তাতে প্রার্থনার সময় প্রচুর বাঁদরের ভিড় হয়, যতটা হনুমানের মূর্তির পাশেও হয় না। আসলে এরা ভক্তদের চারপাশে ঘোরে খাবারের আশায়। ওরা জানে যে খাবারও পাবে আর নিরাপদেও থাকবে। কারণ এইসব জায়গায় ওদের ওপর কোন অত্যাচার হয়না। মুসলিম আর হিন্দু সাধুরা ওদের প্রতি যথেষ্ট দয়াশীল হয় কারণ ওদের এই লম্ফঝম্প ওই পবিত্র বাতাবরণে একটু আনন্দ আনে।

একধরণের বাদামী ছোট লেজওয়ালা বাঁদর আছে যাদের সমতল আর পাহাড়ি দুজায়গাতেই দেখা যায়। অনেকেই এদের সত্যিকার হনুমানের সাথে গুলিয়ে ফেলে। আবার লম্বা লেজওয়ালা,কালো মুখের ওপর সাদা লোম লাগানো লঙ্গুর যাদের গায়ের লোম দেখল মনে হয় সাদা আর ধূসর ওভারকোট চাপিয়ে বসে আছে। এদের মুখ দেখলে জোয়েল হ্যারিসের ‘আঙ্কেল রিমাস’এর কথা মনে পড়ে। ভারতের কিছু জায়গায় লঙ্গুররা দল বেঁধে খুব উৎসাহের সাথে ট্রেন চললে দেখতে আসে আর তাদের লেজগুলো প্রশ্নচিহ্নের মত উঠে থাকে। আবার ওরা গাছ বা দেওয়ালের ওপর বসে থাকে, আর তুমি হয়ত আপনমনে হাঁটছ, ওরা হঠাৎ করে সব ভুলে ঠিক তোমার সামনে অদ্ভুতভাবে মাথাটা এগিয়ে দেয়। এটা ওদের একটা বিশেষ স্বভাব। আবার কালো এক বাঁদরের মত জন্তু, যাদের অসম আর বাংলায় হুল্লুক বলে, এরা একটু ভীতু,শান্ত, ভদ্র প্রকৃতির হয় আর এরা যুগলে থাকে। আবার লোকে বলে এদের মধ্যে নাকি দৈত্য বা কালো জিন থাকে যাদের গলার আওয়াজ অনেক কুকুরের কান্নার আওয়াজের মত। হুল্লুকের মধ্যে কিছু বাঁদরের মত বাঁদরামি থাকলেও, এরা একজন সঙ্গীর সাথেই থাকে আর আসামে এদের বলে ‘লাজুক মুখের’ বাঁদর যারা একটু কিছু হলেই নিজের হাতের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলে, আর ভীতু বাচ্চাদের মত মাথা নাড়াতে থাকে। এদের লোম খুব নরম আর উজ্জ্বল রঙের হয়।

কোনরকম নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বাঁদরেরা সংখ্যায় খুব তাড়াতাড়ি বাড়তে থাকে এবং ভীষণ বেশি দুষ্টু আর দুঃসাহসী হয়ে যায়। আমাদের এখানে একে খুব পবিত্র বললেও, আমরাও ইউরোপের মত বাঁদরকে তার সমস্ত স্বভাবজাত ত্রুটি, দস্যিপনা, বিচিত্র কীর্তিকলাপ এসব দিয়ে বিচার করে থাকি। এরা যে শুধু বাগান নষ্ট করে তা নয়, ভারতের অনেক দোকানেই দরজা, জানলা বলে কিছু থাকেনা, রাস্তার উপর শুধু একটা আলমারির মত বসানো থাকে। আর সেখানে খাবারদাবার, আরও অনেক জিনিষপত্র একেবারে খোলা থাকে। ধর একজন মোটা মত দোকানদার বসে আছে, আর এদিকে ব্যস্ত সময়ে, তার দোকানে গরু, বাঁদর, পাখির দল হানা দিয়েছে, কী করবে বেচারা দোকানদার? ওরা তো সংখ্যায় অল্প, আর বাঁদরের দল তো বিশাল। আবার ধর বেচারা দোকানদার একটু ঝিমোচ্ছে দুপুরের দিকে, ওদিকে বাঁদর এসে তাকে ভাল করে দেখেই একখানা খাবারের প্যাকেট হাতে করে নিয়ে দে ছুট। কিন্তু অনেক আগে, যখন ব্রাহ্মণরা সমাজের মাথা ছিলেন, তখন পাল পাল হনুমান যখন এমনভাবে আক্রমণ করত, তখন তাদের ধরে, গরুর গাড়িতে করে মাইল মাইল দূরে পাচার করা হত। আর যেই খালি গাড়িগুলো ফিরে আসত, বাঁদরগুলো অমনি শহরের তোরণের সামনে একসাথে দাঁড়িয়ে এমন একখানা ভাব দেখত যেন পিকনিক করে ফিরছে, এত মজা। আরে ওদের শত্রুদের যে হার হয়েছে, ওরা বুঝতে পারত তো। এদের নৌকায়, ট্রেনেও পাচার করা হত।

 bonerbeast02 (Medium)একবার সাহারানপুরে এক স্টেশনমাস্টারকে টেলিগ্রাম করা হল, যে বাঁদর ভর্তি গাড়ি পাঠান হচ্ছে, এদের যেন কাছাকাছি শিবালিক পাহাড়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু হল কি,খাঁচাগুলো গেল ভেঙে, আর বাঁদরগুলো পড়ল বেরিয়ে। এদিকে সাহারানপুর একটা ছোট্ট শহর, সেখানে রেলের অফিস, একটা সরকারি বোটানিক্যাল গার্ডেন আর বিশাল ফলের বাগান রয়েছে। কয়েকটা বাঁদর তো ট্রেনের ছাদ থেকে এদিক ওদিক করে, ট্রেনের রান্নাঘরে ঢুকে জিনিসপত্র নষ্ট করতে লাগল।  লন্ঠনের কাচ থেকে ঝাড়ু- যেগুলো ওদের কোন কাজে লাগবে না, সেইসব নিয়ে পালাতে লাগল। আর একদল গেল বাগানে। সেখানে ভর্তি মুসলমান। তারা বাঁদরগুলোকে মোটেই বেশি খাতির করে নি,  ভাল করে তাদের পিটুনি দিয়েছিল।       

চলবে

এই লেখার আগের সমস্ত পর্বের লিংক একত্রে