সব পর্ব একত্রে পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫,পর্ব৬, পর্ব ৭ ,পর্ব ৮ , পর্ব ৯ , পর্ব ১০ , পর্ব ১১ , পর্ব ১২, পর্ব ১৩
চিলঃ
সাদা মাথা, বুক, ঘন চকোলেট রঙের শরীর, আর যার হাবভাব কিছুটা ঈগলের কিছুটা কাকের মত, গলার স্বর তীক্ষ্ণ, ছিপছিপে চেহারা, ঠিক ধরেছ, এটা চিল। এমনকি পুরনো দিনে মুসলমান সেনারা তাদের মাথার ওপর চিল ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখলে এটা মনে করত যে যুদ্ধে তাদের জয় অবধারিত। চিলকে ওরা খুব শুভ গণ্য করত।
চিল অনেকটা ডাকেও কাকের মত। ভুলেও যদি ছাদ থেকে কিছু খাবারের টুকরো নিচে ফেলেছ, তো একেবারে দস্যুর মত তার ওপর হানা দেবে সবাই মিলে। সে এক অদ্ভুত শিল্প। একের পর এক চিল এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কারুর সাথে কারুর ধাক্কাধাক্কি লাগছে না। আর যেই বৃষ্টি নামে, সাদা সাদা, মোটা কীটগুলো জন্মায়, ব্যাস আর দেখে কে? চিলের দল জমা হয়ে, মজা করে চড়ুইভাতি করে আর একটার পর একটা মুখে পোকা নিয়ে সারি বেঁধে উড়ে চলে যায়। সে এক আশ্চর্য দৃশ্য।
এরকমটা মনে করা হয় যে পরশ পাথর, মানে লোহাকে সোনা বানিয়ে দেয়া সেই মূল্যবান পাথর নাকি চিলের বাসাতেই পাওয়া যায়। মুসলমান রমণীদের মধ্যে এমনটাই প্রচলিত যে চিলের বাচ্চারা বাসায় সোনা না দেখা অব্দি দেখতেই শেখে না। কোন মানুষ যদি সারাদিন টইটই করে ঘোরে আর কিছুতেই বাড়িতে থাকতে না পারে, তাকে বলা হয় চিলের স্বভাব।
চিল একটি বদমাশ চোর। খাবারদাবার চোখের নিমেষে ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। আর পলকে তার উড়ে আসা, ছোঁ মেরে নিয়ে উড়ে যাওয়া, ধরে ফেলার কোন জায়গাই নেই। যেমন মিষ্টির দোকানে ধর মিষ্টি তৈরি করার পর দোকানে নিয়ে আসা হচ্ছে, ব্যাস চিলের হামলা। অথবা কসাইয়ের দোকানে, কিম্বা খোদ পোস্টমাস্টারের হাত থেকে টাকা নিয়ে পালানো। একবার দুটো নিরীহ পোষ্যকে থালা থেকে খাওয়াচ্ছিলাম, ব্যাস হানা দিল চিল। খাবার নিয়ে, প্লেট ভেঙে একাকার কান্ড।
এক স্যাকরা চিলের এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দুষ্টুবুদ্ধি বার করেছিল শোন। একদিন চার স্যাকরার মধ্যে কথা হচ্ছিল। এক উজির তাদের কথা কান পেতে শুনছিল। একজন বলল, “আমি সোনার গয়নায় প্রতি এক টাকায় সোনার মজুরি সমেত ২৫ পয়সা লাভ করি”, একজন বলল সে আট আনা, আর একজন ৭৫ পয়সা। শেষের জন বলল “দূর তোমরা বোকা, আমি তো পুরোটাই লাভ করি।”
এই শুনে উজির তো গিয়ে বলল রাজাকে। রাজা তখন সেই শেষের কারিগরকে ডেকে সোনার হার বানাতে বলল। কারিগর যে বারান্দায় বানাতে বসল, চুপিসাড়ে সে সেখানে কাঠের রেলিঙে একটা ছোট গর্ত মত করে সেখানে কয়েকটা মাংসের টুকরো রেখে দিয়েছিল। যথারীতি চিল উড়ে এসে বসল সেখানে। এরপর দিনের শেষে সে সোনার হারের মত একই পিতলের হার বানিয়ে সেটাকে অ্যাসিডের পাত্রে রেখে দিল। পরের দিন এসে সে অ্যাসিডের পাত্র থেকে হারটাকে তুলে টাঙিয়ে রাখল ওই রেলিঙের ওপর শুকোনোর জন্য আর সোনার হারটাকে অ্যাসিডের পাত্রে। এবার রাজাকে দেখাল ওই পিতলের হার। রাজার সাথে কথা বলতে বলতেই চিল এসে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল পিতলের হার। তখন কারিগর কাঁদতে থাকল হারের শোকে। রাজা দেখল সত্যিই তো পাখি নিয়ে পালাল হার, তখন সে আবার সোনা দিল কারিগরকে। পরেরদিন কারিগর আসল সোনার হারটা অ্যাসিডের পাত্র থেকে তুলে দিয়ে দিল রাজাকে। কারিগর এমন কাজ প্রায়ই করত এবং সে তা শেষমেষ স্বীকারও করে উজিরের কাছে। তার প্রখর বুদ্ধিতে খুশি হয়ে রাজা তাকে পুরস্কৃত করেন।
সারস ও বকঃ
সারস পাখিকে একটা বিশেষ কারণে পারস্পরিক বিশ্বস্ততার প্রতীক বলা হয়। কারণ এটা বিশ্বাস করা হয় যে এদের জুটির একটি পাখিকে যদি কেউ মারে, অন্যটি আকুল হয়ে ওঠে এবং কখনও আর কারো সাথে জুটি বাধে না।
একটা স্প্যানিশ প্রবাদ অনুযায়ী সারস নাকি ঘোড়ার সাথে নাচ করেছিল কোন একসময়, তাই তার একটা পা ভাঙা। কিন্তু এইসব লম্বা পায়ের পাখিদের নাচ কিন্তু কখনও ভারতে সেভাবে চর্চা হয়না। যদিও এইসব পাখিদের বাগানে রাখা হয়- ইউরোপিয়ানরা এদের পোষ্য হিসাবে রাখে। আর এদের ব্যবহার আর ভঙ্গিমা? দারুণ সুন্দর। আর সেগুলোকে দারুণ সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে আমেরিকান উপন্যাস ‘ইস্ট এঞ্জেলস’এ।
কিন্তু এই নাচের মধ্যেও যে অদ্ভুত শয়তানি থাকে,সে ব্যাপারে হাড়গিলে পাখির সাথে কারুর তুলনা হয়না। এমনকি ডন কুইক্সোট বা মালভোলিও এই নাচের পাশে অর্ধেক জাঁকজমকপূর্ণ নয়। যদি বয়স্ক,লম্বা একেবারেই অচপল মহিলাদের অনেক শ্যাম্পেন খাইয়ে,ব্যালে নাচ শেখানো হয়,তাহলে যে’রকম অবস্থা হবে,সেই থেকে হাড়গিলের নাচের একটা সামান্য ধারণা পাওয়া যায়। কলকাতাতে একসময় এই হাড়গিলেদের খুব দেখা যেত, স্থানীয় মানুষ বলেন, ওরা আবর্জনাপূর্ণ জায়গায় জোট বাঁধে আর নাচের অভ্যাস করে।
একটা বেশ মজার ভারতীয় প্রবাদ আছে “বকধার্মিক”। বক কী করে জান? নদীর একটা নির্জন কোণায় এক পা তুলে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠিক যেন হিন্দুদের সাধু বা মুসলমান ফকিরটি। ভাবখানা এমন যেন কী পবিত্র সাধনা সে করছে, আসলে সে অপেক্ষা করে কখন একটা মাছ বা ব্যাং এসে পড়বে কাছাকাছি আর সে গপাত করে গিলে নেবে।
পোলট্রি বা হাঁস-মুরগির খামারঃ
ইউরোপে এইসব খামারের গন্ধকে সেখানকার মানুষ “ব্রহ্মা গন্ধ” বলেন, কারণ ওইসব খামার বড়ো অপরিচ্ছন্ন থাকে। হিন্দুরা কিন্তু এই ব্রহ্মা নামটাকে খুব শ্রদ্ধা করে। যদিও ভারতে ব্রহ্মার মন্দির খুবই কম আছে। হিন্দুরা নিয়ম মেনে ঘরের মধ্যে কখনও পোলট্রি রাখে না। একটা কারণ তো অপরিচ্ছন্নতা, দ্বিতীয় হল উঁচু বর্ণের মানুষরা ডিম খায়না।
কিন্তু রাজপুতরা আবার মোরগ লড়াইয়ের খুব ভক্ত। এইসব লড়াই অবিরাম চলতে থাকে,আর পাখিদুটো বারবার একে-ওকে আঘাত করতে করতে কখনও অন্ধ হয়ে যায়,রক্তপাত ঘটায়। শেষে তারা এতই ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে একে অন্যকে ধাক্কা মারার শক্তিও থাকে না। আর যে খেলা পরিচালনা করে সে একজনের মাথা, আরেকজনের মুখের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়।
গোয়ানিজ বা পর্তুগীজ,হিন্দু,মুসলিম সকলেই এই খেলায় অংশ নেয়,আর প্রতিদিন এই খেলার জন্য তারা মোটা টাকা ব্যয় করে।
প্রফেসর উইলসন,একজন খ্রিস্টান কবি,এই মোরগ-লড়াইয়ের ব্যাপারে বেশ সাগ্রহে লেখালিখি করেছেন। এই মৃত পাখিগুলোর ছবি পর্যন্ত লণ্ডনের দোকানগুলোয় টাঙানো থাকে, অন্যান্য খেলার ছবির সাথে। স্যার টমাস মোর সম্পর্কেও জানা যায় যে তিনি এই নিকৃষ্ট খেলাটার ভক্ত ছিলেন,এবং একটা মোরগকে ল্যাম্পপোস্টের সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে তার দিকে লাঠি ছুঁড়ে মারতেন।
মোরগ নিয়ে নানান গল্পসল্প আছে। একবার এক মালিকের পাতে তার চাকর একটি এক পা ওয়ালা পাখির রোস্ট দিল। তা মালিক আপত্তি জানিয়ে বলল,“এর একটা পা কেন?” চাকর বলল যে এক বিশেষ প্রজাতির পাখির নাকি এমন একটাই পা থাকে। এই বলে সে তার মালিককে একটা পাখি দেখালো,যে একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। মালিক তাকে দেখেই যেই “শূ শূ”বলে চিৎকার করেছে, অমনি সে আর এক পা বের করে,উড়ে পালালো। অমনি চাকরটা বলে উঠলো, “যাহ!তুমি পাতের পাখিটাকেও একবার শূ বলতে পারতে!”
মুরগি নিয়ে অনেক প্রবাদ প্রচলিত আছে। যেমন “মুরগি শুধু শস্যের স্বপ্ন দেখে”। কোনো স্বার্থপর,নীচ মানুষকে বোঝাতে হলে এই কথাটা বলা হয়।
হিন্দুরা কাউকে অপমান করতে চাইলে তাকে “হাঁসমুরগিওয়ালা”বলে সম্বোধন করে। আবার আরেকটা বাংলা প্রবাদ বলে,জমির মালিকেরা তাদের কৃষকদের মুরগির মত করে ব্যবহার করে,ভালো করে খাইয়ে শেষে যাদের মারা হয়। দুষ্টু বাচ্চাদের শাসন করতে গিয়ে অনেকে বলে পশুশাবকরা মুরগির লাথিতে মরে না।
যে কোনো খামারের পশুদের খুব নিষ্ঠুরভাবে মারা হয় বাজারে বিক্রির জন্য। এরা ভাবেও না যে এইসব পাখিদের কতখানি কষ্ট হয়। টার্কিদের সারাদিন রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়, যাতে করে তাদের মাংস কেটে কেটে নেওয়া যায়। একজন হিন্দুকে এইরকম ব্যবহার কোনো টিয়ার সাথে করতে বললে সে খুব দু:খ পাবে,কিন্তু হাঁস-মুরগিদের জন্য যেন কারুর কোনো দায় নেই।
হংসীঃ
এই পাখিটি তার পূর্ব পরিচিতি অনেকটাই হারিয়েছে। একসময়ে হিন্দু আর বৌদ্ধ ধর্মে একে পবিত্র স্থান দেওয়া হয়েছিল। পরে আধুনিক যুগে সে তার জায়গা অনেকটাই হারিয়েছে।
একসময় হাঁস ছিল ব্রহ্মার বাহন। এরপর সে শিবের অভিশাপে তার স্থান হারায়। রাজহংস আর হংসী, হাতি আর তিতিরের পরেই তাদের সুন্দর চেহারা নিয়ে কথা হয়। এমনকি সুন্দর আর তন্বী মেয়েদের হংসীর সাথে তুলনা করা হয়।
পাতিহাঁস
একটা পাখি যাদের বেশিরভাগ সময় একসাথে দেখা যায়,তারা হল হাঁস। তাই এরা বারবার ভালবাসার কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে,যদিও এদের বিচ্ছিন্ন প্রেমিক-প্রেমিকা রূপে দেখান হয়। রোজ রাতে নাকি নদীর ধারে পুরুষ হাঁস চীৎকার করে ডাকে “চখী আমি আসব?” অমনি মেয়েটি বলে ওঠে “না চখা”। আবার একইভাবে মেয়েটি ডাকলে “চখা আমি কি আসব?” ছেলেটি বলে ওঠে “না চখী।”
প্রতি রাতে এরা এভাবে আলাদা হয়ে যায়। এমনকি খাঁচাতেও নাকি এদের আত্মারা একে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে থাকে। এই ব্যাপারটা কবিতার দিক থেকে বেশ রোমাঞ্চকর,এবং এগুলো ভারতীয়রা এখনও ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু এটা ইংরেজদের কানে একটু বিচিত্র শোনায়।
ময়ূরঃ
ময়ূর হল যুদ্ধের দেবতা কার্তিকের বাহন এবং খুব পূজিত। গুজরাট,পুরো রাজপুতানা, কেন্দ্রীয় এবং উত্তর-পশ্চিমের অনেকটা অংশ জুড়ে ময়ূর দেখা যায়। একটি প্রবাদে বলে হরিণ, বাঁদর, তিতির আর ময়ূর চারজনেই চোর। কিন্তু চুরি করার জন্য কখনোই তাদের শাস্তি দেওয়া হয়না। কখনও তাদের জীবন্ত জঙ্গল থেকে ধরে যখন বাজারে নিয়ে আসে,ওদেরই পালকের বোঁটা দিয়ে ওদের চোখদুটো সেলাই করা থাকে,যাতে ওরা ছটফট করে নিজেদের পালকগুলো না নষ্ট করতে পারে।
তবে ময়ূরের পেখম যেমন সুন্দর,তেমনই বিশ্রি ওদের পা। অনেকে বলে ময়ূর ভারি সুন্দর নাচে,তবে নাচতে নাচতে যখনই সে নিজের পা দেখতে পায়,সে নাচ থামিয়ে দেয়,লজ্জা পায় আর খুব কাঁদে। আসলে এর পিছনে একটা গল্প আছে। একসময় নাকি ময়ূরের পা দুটো খুব সুন্দর ছিল। সে ময়না,তিতিরের সাথে একসাথে নাচছিল,তিতির বলল, “তোমার তো ভাই এত সুন্দর পেখম আছে,তুমি এমনিতেই ভাল নাচ,তা তোমার সুন্দর পা দুটো আমায় ধার দাওনা,আর আমারটা তুমি নাও।” ময়ূর তো খুশিমনেই নিজের পা দুটি দিল,কিন্তু যেই নাচ শেষ হল,অমনি তিতির করল কী,ফেরত দেওয়ার বদলে সেই পা দুটো নিয়ে পালাল।
তবে ময়ূরের পেখম তো বরাবরই কবিতার বিষয়, আর ময়ূরের গলার তো অন্যরকম সৌন্দর্য, তাকে সুন্দরী মহিলাদের সাথে তুলনা করা হয়।
ময়ূর হল সাপের সবচেয়ে বড় শত্রু। একবার ধরলে না মেরে ছাড়ে না। কিন্তু খুব বিষাক্ত কেউটে সাপ,সেও তো সহজে হার মানতে চায়না। তাই এই দুজনের লড়াই চলে অনেকক্ষণ, এমনকি ময়ূরকে নাচতে নাচতে সাপের চারপাশে ঘুরতেও দেখা যায়। ভারত,ইংল্যান্ড দু জায়গাতেই পাখিরা সাপেদের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়। এই ব্যাপারটা ভাল করে দেখান হয়েছিল Mrs. J. A. Owen এর On Surrey Hills বইতে।
বৃষ্টি এলেই দুজনের মন খুব নেচে ওঠে- ময়ূর আর ব্যাং। ইউরোপে পাখির কান্না মানে তো বৃষ্টি আসার সময় হল।
লন্ডনে কোন বাড়ির বসার ঘরে ময়ূরের পালক লাগানো থাকে না,কারণ একে অপয়া মনে করা হয়। তেমনই আবার উল্টোটা হয় ভারতে। এখানে একটি লোককে পায়ে ময়ূরের পালক বেঁধে রাখতে দেখা গেছিল,জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল যে তার খুব পায়ে যন্ত্রণা হয়,তাই ভাল হওয়ার জন্য এই উপায়। তবে এটাও ঠিক যে এর সাথে মন্ত্র-তন্ত্র বেঁধে রাখা থাকে। তাউস ময়ূরের আরব নাম,যেমন হিন্দীতে “মোর”। একটি গিটারকে ময়ূরের মত রঙ করে,তার মত আকৃতি দিলে,তাকেও “তাউস” বলে।
ক্রমশ
daarun!