বনের ডায়েরি

ভারতের মানুষ ও না মানুষের গল্প

জন লকউড কিপলিং-এর বিস্ট অ্যান্ড মেন ইন ইন্ডিয়া অবলম্বনে-পিয়ালি চক্রবর্তী

সব পর্ব একত্রে পর্ব ১পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫,পর্ব৬ পর্ব ৭ ,পর্ব ৮ , পর্ব ৯ , পর্ব ১০ পর্ব ১১ পর্ব ১২, পর্ব ১৩ 

 beastandman5401 (Small)

পেঁচা

এ এমন একটি পাখি যে খারাপ আর ভালো লক্ষণ এই দুই অর্থেই ব্যবহৃত হয়। আবার জনশ্রুতি এও বলে যে ‘খারাপ ভাগ্যের’জন্য পেঁচা দায়ী। ‘একমাত্র পেঁচারাই একলা থাকে’, অসামাজিক মানুষদের এমন বলা হয়, কেউ মাতাল হলেও তাকে পেঁচার সাথে তুলনা করা হয়।  আবার বোকাসোকা, মাথামোটা লোকজনকেও ‘পেঁচার ছেলে’ বলা হয়। প্রাচীন প্রবাদে এমন বলা হয় যে ‘একটা পেঁচাই আর একটা পেঁচার মর্ম বোঝে’। বা ‘একটা ফিনিক্স কি বোঝে পেঁচাকে?’ এমন বলা হয়, পেঁচা সেদ্ধ খেয়ে নেশা হয়। এই যেমন বন্ধুরা যদি দেখে কেউ তার বউয়ের সাথে একটু বেশিই বিনয়ী ব্যবহার করছে, অমনি বলবে নিশ্চই বউ,বরকে পেঁচা সেদ্ধ খাইয়েছে। পেঁচার বহু প্রকারভেদ দেখা যায় ভারতে। আবার ইটালিতে ছোটো পেঁচা দেখতে পাওয়া যায় তারা নাকি গোধুলীবেলায় মৃদু মৃদু হাসে।

শ্রীলঙ্কায় বড়ো পেঁচার কান্নাকে খুব অশুভ ধরা হয়, যেন সে কোন মৃত্যুর ঘোষণা করছে। ভারতে পেঁচার কান্না মানেই, সে যেন কোন ভূতুড়ে খালি বাড়িতে বসে ডাকছে। কোন ভারতীয় কখনও পেঁচাকে মারেনা, সে শস্য-ফলের যতই ক্ষতি করুক। ইংরেজরা অবশ্য খেলার ছলে প্যাঁচা হত্যা করে থাকে।

পায়রা

beastandmen5402 (Small)পায়রা, প্রধানত মক্কার পাখি। হিন্দু, মুসলিম দুইয়েরই পছন্দের পাখি। হিন্দুদের তিন প্রধান দেবতার একজন, মহাদেব বেছে নিয়েছিলেন পায়রাকে, কপোতেশ্বরের অবতার হিসেবে। কাশ্মীরের কাছে ছোট একটি মন্দিরের পুরোহিত বলেছিলেন, যে মহাদেব নাকি মাঝে মাঝে জোড়া পায়রার রূপ ধারণ করেন আর উড়ে ছাদের ওপর থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। যেসব জায়গায় হিন্দুদের জনসংখ্যা বেশি, সেখানে প্রতিদিন হিন্দু ব্যবসায়ী, দোকানদাররা নিয়মিত পায়রাদের খেতে দেন। কোন একজন পর্যটক যখন পায়রার ডানা ঝাপটানো শুনতে পান, তাঁর মনে হয় তিনি আছেন ভেনিস বা কনস্ট্যান্টিনোপলে। আবার আরেকটু উত্তর দিকে গেলে,  কাবুলের গ্রামে প্রচুর পায়রা দেখা যায়। এরা আবার মাটির উর্বরতা বাড়াতেও সাহায্য করে।

উত্তর ভারতে প্রচুর মানুষ পায়রা পোষেন, বিশেষ করে মুসলমানরা। এঁরা নানারকম প্রজাতির পায়রা রাখেন, এদের মধ্যে বেশিরভাগ ‘শিরাজী’ আর ছোট পাখার মত লেজওয়ালা, আর প্রবালের রঙের মত পা যাদের, সেগুলো সাধারণত তামার শিকলে বাঁধা থাকে। এদের ওড়াটাও এমন হয় যে অন্যেরা দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, আর প্রতিবেশী পাখিরা এসে এদের পালের সাথে মেশে।

একটি জনপ্রিয় প্রবাদে বলা হয় যে, গৃহবধূরা টিয়া পোষে, প্রেমিক-প্রেমিকারা পোষে মুনিয়া, আর চোরেরা পোষে পায়রা। আগেকার দিনে পায়রা যারা ওড়াত, তাদের কাজটাকে মোটেই ভালো চোখে দেখা হতনা। কিন্তু চিরকালই পায়রা দূতের কাজ করে এসেছে। তবে সবসময়ই যে প্রেমপত্র আদান-প্রদান করেছে তা নয়। অনেক দুঃখের কাহিনীও রয়েছে পায়রা নিয়ে। এমন শোনা যায় এক হিন্দু রাজা একবার মুসলিম বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি সাহসের সাথে তাদের মুখোমুখি হলেন। সসৈন্যে তাদের সাথে যুদ্ধে বেরিয়ে গেলেন। সঙ্গে নিয়ে গেলেন একটি পায়রা।  বলে গেলেন, তিনি হেরে গেলে, পায়রা উড়ে ফিরে আসবে প্রাসাদে এবং তাহলেই বোঝা যাবে যুদ্ধে পরাজয় ঘটেছে এবং তখন প্রাসাদের বাকিরা আগুনে আত্মাহুতি দেবে। কিন্তু রাজা যুদ্ধে জিতে গেলেন। শ্রান্ত,ক্লান্ত হয়ে তিনি এক নদীতে জল খেতে নেমেছেন, এমন সময় সেই পায়রা রওনা দিল প্রাসাদের দিকে। অনেক চেষ্টা করেও রাজা তাকে ফেরাতে পারলেন না। এরপর রাজা যখন প্রাসাদে ফিরলেন, তখন সবাই আগুনে আত্মাহুতি দিয়ে ফেলেছে। রাজার কাছেও তখন আগুনে আত্মাহুতি দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় রইল না।

ভারতের শহরগুলোতে দেখা যায়, ছ’ফুট লম্বা বাঁশের খুঁটির ওপর হাল্কা বাঁশের জাফরি বানানো থাকে, পায়রা ধরার ফাঁদ হিসাবে। খুব ভোরবেলা পায়রা ওড়ানেওয়ালারা একটা টোপ ফেলে, একটা লাঠির মাথায় বস্তা বেঁধে, শিস দিতে থাকে। এই শুনে পায়রারা আকৃষ্ট হয়, একঝাঁক পায়রার গোল গোল হয়ে আকাশে ঘোরা, তারপর একসাথে এসে বসা, ভারি সুন্দর লাগে দেখতে, শুধু মনে হয় এর পিছনে ওই মানুষগুলোর দুরভিসন্ধি না থাকলেই হত।

কোকিল

beastandmen5403 (Small)ইংরেজরা কোকিলকে খুব আমুদে নবাগত আর বসন্তের অগ্রদূত হিসাবে ডাকে। কিন্তু শুধু বসন্তের জন্য নয়, কোকিলের গান এদেশে সবচেয়ে সুরেলা হিসাবেও বিবেচিত হয়। কিন্তু পাশ্চাত্যের মানুষ কোকিলের গানে ক্লান্তিকর, তাতে একটা বা দুটো তীক্ষ্ণ সুরের অনুরণন ছাড়া বিশেষ কিছুই পান না। কিন্তু সাহিত্যে, কবিতায় কোকিলকেই নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তার কন্ঠের জন্য। সঙ্গীত শিল্পীর খুব ভাল পরিবেশনকেও কোকিলের সাথে তুলনা করা হয়। ইংরেজদের অবশ্য কোকিলের ওপর একটু হিংসে আছে। কারণ ভারতে গ্রীষ্মকালটা অনেক লম্বা, তাই অনেকটা সময় কোকিলকে শোনা যায়, সেই তুলনায় বিদেশে শুধু স্বল্পদৈর্ঘ্যের বসন্তকালে কোকিলকে দেখা যায়।

আর কাকের সাথে কোকিলের একেবারে আড়ি। কারণ- কোকিল, কাকের বাসা খুঁজে খুঁজেই তাতে ডিম পাড়ে, আর কাক নিজের বাচ্চা ভেবে তাকে বড় করে। তাই মাঝে মাঝেই কাকের দল, কোকিল দেখলে ঘিরে ফেলে। অবশ্য এই কাকের দল দেখলে লন্ডনের  রাস্তার বাচ্চাদের কথাই মনে পড়ে। ওরাও রাস্তা ঘাটে কোন অপরিচিত ব্যাপার দেখলেই তা ঘিরে ফেলে।

ক্রমশ