
সেটা ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ। স্প্যানিশরা ততদিনে কলোনি বানানোর সদিচ্ছা নিয়ে আমেরিকায় হাজির হয়েছে। খুব যে সুবিধা করতে পারছিল তা নয়, খাদ্যাভাব ছিল অন্যতম প্রধান সমস্যা। গবাদি পশু পালন করে সেই খাদ্যাভাবের সুরাহা করার জন্য সেই সময়ে স্প্যানিশরা মেক্সিকোতে র্যাঞ্চ বা খামার তৈরী করতে শুরু করে। খামারে কাজ করার জন্য স্পেন থেকে ঘোড়া নিয়ে আসত তারা। মুশকিল হল, কিছু ঘোড়া যাতায়াতের পথে পালাত, কিছু উপযুক্ত দেখভালের অভাবে মারাও পড়ত। গবাদি পশুর ক্ষেত্রেও ছিল একই সমস্যা। তখন তাদের নজর গেল ঘোড়ায় চড়া এক বিশেষ শ্রেণীর মানুষের দিকে। এরা মেক্সিকোর ভূমিপুত্র, ঘোড়ার পিঠে সারাদিন কাটিয়ে দিতে পারে। নিজস্ব জিনিসপত্র বলতে ওই ঘোড়ার পিঠের পুঁটলিতে যেটুকু ধরে। হাতে চামড়ার ফালি আর ঘোড়ার চুল পাকিয়ে নিজেদের হাতে তৈরি করা পাকানো দড়ি, যাকে ওরা বলে লা রিয়াতা। এই দড়ির মুখে থাকে ফাঁস, অদ্ভুত কায়দায় দড়িটা ঘোরাতে ঘোরাতে ওরা ছুঁড়ে দেয় বুনো ঘোড়ার দিকে। অব্যর্থ লক্ষ্যে বন্য প্রাণীটির গলায় ফাঁস পরিয়ে টান দিলেই সে আটকা পড়ে যায়। এখানেই এদের কীর্তির ইতি ঘটে না। বুনো ঘোড়াকে পোষ মানিয়ে প্রশিক্ষণ দিতেও এদের জুড়ি মেলা ভার। এরা নিজেদের পরিচয় দেয় ভ্যাক্যুরো বলে। স্প্যানিশদের এটা বুঝতে সময় লাগেনি যে এই ভ্যাক্যুরোদের সাহায্য না পেলে তাদের খামার বানানোর স্বপ্ন সত্যি হবে না।
এই ভ্যাক্যুরোদের পিছুটান বলে বিশেষ কিছু থাকত না, কমবয়সী ছেলেপুলের দল, টাকা রোজগারের ধান্ধায় তারাও এক খামার থেকে অন্য খামারে ঘুরে বেড়াতে থাকল। এক জায়গায় বেশিদিন মন টেঁকে না তাদের। তবে যতক্ষণ থাকে, কাজের অন্ত থাকে না। গবাদি পশু চরানো, তাদের দেখভাল করে ফিরিয়ে আনা, ঘোড়ার দেখাশোনা করা, বুনো ঘোড়া ধরে এনে ট্রেইনিং দিয়ে খামারের কাজে লাগানো, এসব তো আছেই। কোন পশু কোন খামারের সেটা বোঝার খুব ভালো কোনো উপায় ছিল না তখন। প্রত্যেক খামার নিজের পছন্দমত নকশা বা লোগো বানিয়ে নিত। লম্বা একটা রডের মাথায় থাকত সেই লোহার তৈরী নকশা। সেটা গরম করে দুই তিন সেকেন্ডের জন্য চেপে ধরা হত পশুর চামড়ায়। চামড়া পুড়ে গিয়ে নকশাটা চিরতরে বসে যেত। কোনটা কোন খামারের পশু এতে বুঝতে সুবিধা হত বটে, তবে এই ভয়ানক কাজের দায়িত্বও ছিল ভ্যাক্যুরোদেরই উপর। চরে বেড়ানো বা পলায়নপর পশুদের তাড়িয়ে এনে এক জায়গায় জড়ো করাকে ওরা বলত রোডিও।
এসব ছাড়াও বেড়া বা খামার বাড়ি মেরামতির কাজে এরা ওস্তাদ ছিল। মাসে কয়েকটা স্প্যানিশ রিয়েল পেলেই খুশি। মেক্সিকান তামার পয়সা তখন ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ছে, স্প্যানিশ রিয়েলের কদর বেশি। দিনে পনের ঘন্টা কাজ করেও ভ্যাক্যুরোদের কোনো ক্লান্তি নেই। মাথায় রোদের হাত থেকে বাঁচার জন্য চওড়া বারান্দা দেওয়া মস্ত টুপি, পায়ে ঘোড়ায় চড়ার উপযুক্ত উঁচু বুট, গলায় ধুলোর হাত থেকে বাঁচার জন্য ব্যান্ডেনা। কেউ কেউ আবার লম্বা প্যান্টের উপর চামড়ার আবরণ লাগাত, যাতে ঊষর এলাকার মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করার সময় ক্যাকটাসের কাঁটার খোঁচা লেগে পোশাক ছিঁড়ে না যায়। নেহাত প্রয়োজনের কথা ভেবে তৈরী এই পোশাক যে একদিন স্টাইল স্টেটমেন্ট হয়ে দাঁড়াবে তা নিশ্চয়ই তারা ভাবেনি একবারও।
তবে, এরা রীতিনীতির তোয়াক্কা করত না খুব একটা, তাই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বিশেষ ছিল না বললেই হয়। দিনের শেষে কাজ ফুরোলে এরা নিজেদের মধ্যেই সময় কাটাত তাই। কেউ গান গাইত, কেউ বাজাত গিটার। এমনকি কবিতাও লিখত কেউ কেউ। কখনো কখনো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে দেখত কে কতক্ষণ বুনো ঘোড়া বা ষাঁড়ের পিঠ থেকে ছিটকে না পড়ে গিয়ে বসে থাকতে পারে। আরো একটা মজার প্রতিযোগিতা ছিল ব্যারেল রেসিং। মাঠের উপর তিনটে ব্যারেল দিয়ে মস্ত একটা ত্রিভুজ বানানো হত। তিনটে ব্যারেলকে ঘোড়সওয়ার আলাদা আলাদা করে পাক খেয়ে বেরিয়ে আসবে। যে সবচেয়ে কম সময় নেবে, সেই জয়ী। ধীরে ধীরে এই প্রতিযোগিতাগুলো জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছিল। হয়ত ভ্যাক্যুরোদের রোজকার কার্যকলাপ নিয়ে প্রতিযোগিতা বলেই লোকমুখে এর নামও হয়ে যায় রোডিও। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকেই এখনকার টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনা পর্যন্ত ভ্যাক্যুরোরা বিভিন্ন র্যাঞ্চে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই সঙ্গে সেইসব অঞ্চলে রোডিও প্রতিযোগিতারও চলন শুরু হয়।
১৮০০ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে বাইরে থেকে আসা বসবাসকারীদের মধ্যে কেউ কেউ ভ্যাক্যুরোদের কাছ থেকে তাদের পশু তাড়িয়ে আনা, পোষ মানানো, ইত্যাদির কলাকৌশল শিখতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, ভ্যাক্যুরোদের মত পোশাক আশাক পরে তাদের আদব কায়দাও রপ্ত করে ফেলে তারা। নিজেদেরকে তারা বলতে শুরু করে কাউবয়। লা রিয়াতা নামে সেই পাকানো দড়ি লোকমুখে হয়ে দাঁড়ায় ল্যাসো।
সংখ্যায় খুব কম হলেও কিছু কিছু মেয়েরাও এই কাজ শিখতে শুরু করে, তবে কাউগার্ল হিসেবে পরিচিতি বা স্বীকৃতি পেতে তাদের আরো একশ’ বছর লেগে গিয়েছিল।
যাই হোক, ক্যালগেরির কথায় এবার ফেরা যাক। এই শহর তখন সদ্য তৈরী হচ্ছে, বাসিন্দার সংখ্যা কুল্যে ২০০০। পূর্ব কানাডার চাষীরা খামার চালাতে বেশি সফল। তাদের কেউ কেউ যাতে পশ্চিমে আসতে উৎসাহ পায় সেই চেষ্টা চলছে পুরোদমে। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে সেই উদ্দেশ্যেই তৈরী হল ক্যালগেরি অ্যান্ড ডিস্ট্রিক্ট এগ্রিকালচারাল সোসাইটি। বছর দুই বাদে তারা একটা মেলার আয়োজনও করেছিল। লোকে ভয়ানক উৎসাহ না দেখালেও জনা পাঁচশো লোক হয়েছিল সেখানে। এই সোসাইটি এলবো নদীর ধারে বেশ খানিকটা জমিও কিনেছিল মেলার জন্য। ভালোই চলছিল সব, কিন্তু পর পর কয়েকটা বছর ফলন ভালো হল না। অবশেষে ১৮৯৫-এ, এই সোসাইটি ভেঙে গেল। জমির মালিকানা পেলেন আর.বি. বেনেট, ইনি আবার পরবর্তী সময়ে প্রধান মন্ত্রীর পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বেনেটের কাছ থেকে জমিটা আবার কিনতে হয়েছিল শহরকে, তারপর তৈরী হয়েছিল ওয়েস্টার্ন প্যাসিফিক এক্সিবিশন কোম্পানি। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে এরা কৃষি ও শিল্প মেলার আয়োজন করল। এই মেলা কিন্তু ভালোই সাড়া পেল। ১৯০৮ পর্যন্ত প্রতি বছর চলেছিল এই মেলা।
এদিকে কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার ১৮৭৯ থেকে ডমিনিয়ন এক্সিবিশন নামে একটা মেলার আয়োজন শুরু করেছিল প্রত্যেক বছর। সে বেশ জমজমাট ব্যাপার, খরচ টরচ সব সরকারই দেয়, তবে দেশের কোন একটা বড় মেলার আয়োজকদের দায়িত্বটা দেওয়া হয়। দেশের সেরা বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদরা তাদের নানারকম আবিষ্কার প্রদর্শন করার সুযোগ পায় সেখানে।
১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ক্যালগেরির কপালে সেই সম্মান জুটে গেল। শহরের বড়কর্তারা আর ওয়েস্টার্ন প্যাসিফিক এক্সিবিশন কোম্পানির লোকজন তো মহা খুশি। নিজেদের আর সরকারের দেওয়া অর্থ জুড়ে ১৪৫,০০০ ডলার খরচ করে ফেলল। তৈরী হল ছয়টা ঝাঁ চকচকে নতুন প্যাভিলিয়ন আর একটা ঘোড়দৌড়ের ট্র্যাক। বিপুল হুল্লোড় করে মেলা শুরু হল, তাতে থাকল প্যারেড, ঘোড়দৌড়, এমনকী রোডিওও। শহরের জনসংখ্যা তখন পঁচিশ হাজার, তাদের আর্থিক অবস্থা বেশ করুণ। কিন্তু তবুও ভিড় হল এই মেলায়, সাত দিনে লাখখানেক লোক এল। আর এল ল্যাসো ছোঁড়ার ওস্তাদ মার্কিন গাই উইডিক।
ততদিনে রোডিও শো এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে বেশ কিছু র্যাঞ্চের নিজস্ব রোডিও দলও তৈরী হয়ে গেছে। এই গাই উইডিক ছিল ওকলাহোমার মিলার ব্রাদার্স ১০১ র্যাঞ্চের দলের সদস্য। উইডিকের ছিল জহুরীর চোখ। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা ক্যালগেরিতে রোডিও শো করার ইচ্ছা দানা বাঁধতে থাকে তার মস্তিষ্কে। চার বছর বাদে, মানে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে আরো কিছু ডলার জমিয়ে র্যাঞ্চের কাজে ইস্তফা দিয়ে সে হাজির হয় এখানে। ক্যালরগেরির এক্সিবিশন কোম্পানির কর্মকর্তারা কিন্তু মোটেও কান দিলেন না তার প্রস্তাবে, বরং উটকো আর উদ্ভট বলে উড়িয়ে দিলেন।
ডমিনিয়ন এক্সিবিশনের সময়ে উইডিকের দোস্তি হয়েছিল ম্যাকমুলেন নামে ক্যালগেরির এক গবাদি পশুর যোগানদারের সাথে। এই ম্যাকমুলেন এবার বুদ্ধি দিল শহরের বিগ ফোরের কাছে যেতে। এই বিগ ফোর হল চার বিত্তশালী খামারের মালিক। প্যাট্রিক বার্নস, জর্জ কেন, এ. ই. ক্রস আর আর্চিবল্ড ম্যাকলীন শুধু ধনীই নয়, অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্নও বটে। ম্যাকমুলেন আর উইডিক মিলে এই বিগ ফোরকে দিব্য রাজি করিয়ে ফেলল। চারজনে মিলে এক লাখ ডলারের ব্যবস্থাও করে দিল। সেই দিয়ে তৈরি হল রোডিও শো’র উপযুক্ত মস্ত স্টেডিয়াম। অবশেষে ১৯১২ র সেপ্টেম্বর মাসে পশ্চিম কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, আর মেক্সিকো থেকে আসা কয়েকশো কাউবয়দের নিয়ে শুরু হল ছয় দিনের জমজমাট রোডিও প্রতিযোগিতা। সব মিলিয়ে পুরস্কারের অর্থ ছিল কুড়ি হাজার ডলার। লাখখানেক দর্শকের কল্যাণে লাভও হল বিস্তর। শোয়ের নাম দেওয়া হয়েছিল স্ট্যামপিড। লোকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল এই নাম।
উইডিক স্বাভাবিভাবেই ভেবেছিল এত সফল একটা প্রতিযোগিতা নিশ্চয়ই প্রত্যেক বছর আয়োজন করতে রাজি থাকবে কর্মকর্তারা। কিন্তু কোন কারণে বিগ ফোর হাত গুটিয়ে নিল। হয়ত তাদের বয়স হয়ে গিয়েছিল বলে বাকি জীবনটা শান্তিপূর্ণভাবে কাটাতে চেয়েছিল। তবে স্ট্যামপিডের কথা ছড়িয়ে পড়েছিল চারিদিকে। হতাশ উইডিককে উইনিপেগের ব্যবসাদাররা তাদের শহরে স্ট্যামপিডের আয়োজন করার আমন্ত্রণ জানাল। হলও তাই, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেখানে স্ট্যামপিড সফল হল না। আর তারপরেই শুরু হয়ে গেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। উইডিকের আর খোঁজ রইল না অনেকদিন, যুদ্ধের চক্করে কারুর আর মনে রইল না স্ট্যামপিডের কথা। উইডিক কিন্তু হাল ছাড়েনি। বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটতেই ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে সে আবার উপস্থিত হল ক্যালগেরিতে। ততদিনে ক্যালরগেরির এক্সিবিশন কোম্পানির ম্যানেজার বদলে গেছে। এই নতুন ম্যানেজার ই. এল. রিচার্ডসনের কিন্তু উইডিকের স্ট্যামপিডের প্রস্তাব ভারি পছন্দ হল। বিগ ফোরের চারজন তখনও জীবিত,
রিচার্ডসন তাদেরও অনুমতি ও সমর্থন আদায় করে ছাড়ল। ঠিক হল বিশ্বযুদ্ধ-ফেরত সৈন্যদলের সম্মানে এবারের স্ট্যামপিড হবে বিজয় স্ট্যামপিড, বা গ্রেট ভিক্টরি স্ট্যামপিড।
বলা বাহুল্য এবারো তুমুল সাফল্যের মুখ দেখল তারা। রিচার্ডসন বুঝেছিলেন প্রত্যেক বছর স্ট্যামপিডের আয়োজন করলে সেটা লাভজনকই হবে, কিন্তু বাদ সাধল শিল্পমেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। কেটে গেল আরো দুটো বছর। শহরের আর্থিক অবনতির সাথে সাথে শিল্পমেলার দর্শকদের সংখ্যাও কমে গেল অনেক। রিচার্ডসন এবার প্রস্তাব রাখলেন স্ট্যামপিড, কৃষিমেলা আর শিল্পমেলা সব জুড়ে যদি একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করা যায়। এবারে কিন্তু তার প্রস্তাব গৃহীত হল। উইডিকের আনন্দ দেখে কে। সে ঘুরে ঘুরে শহরবাসীদের উৎসাহ দিতে থাকল যাতে তারা ওই ক’টা দিন কাউবয়দের মত পোশাক পরে, তাদের দোকানপাট সাজানোর ঢঙেও যেন কাউবয়দের জীবনযাত্রার আমেজ প্রতিফলিত হয়। তুমুল সাফল্য পেয়েছিল ১৯২৩এর এই যুগ্ম প্রদর্শনী।
নীচে রইল ১৯২৩-এর ক্যালগেরির রাস্তায় স্ট্যামপিড প্যারেডের ছবি। ঋণস্বীকার: উইকিকমন্স

পরের বছরও একইরকম সফলতা পেল এই যুগ্ম প্রদর্শনী। স্বাভাবিকভাবেই এই বাৎসরিক প্রদর্শনী আর প্রতিযোগিতা একরকম পাকা জায়গা করে নিল ক্যালগেরি শহরে।
১৯২৯ পর্যন্ত সব কিছু ঠিকঠাক চলল, নতুন নতুন প্রতিযোগিতা যোগ হচ্ছিল রোডিও শো’তে, বাড়ছিল অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ও পুরস্কারের অর্থ। হঠাৎ ঘটল সেই মহা বিপর্যয়, ইতিহাসে যার নাম গ্রেট ডিপ্রেশন, বা অর্থনৈতিক মহামন্দা। বিশ্বজুড়ে মানুষ তখন মহা অর্থনৈতিক সংকটের শিকার। স্ট্যামপিড একেবারে বন্ধ না হয়ে গেলেও লাভের মুখ আর দেখছিল না। পর পর দুই বছর ক্ষতি স্বীকার করে প্রদর্শনী বোর্ড বেশ কিছু কাটছাঁট করার সিদ্ধান্ত নেয়। গাই উইডিকের সেটা একেবারেই পছন্দ হয় না, ধীরে ধীরে বোর্ডের সাথে তার সম্পর্ক তিক্ত হতে শুরু করে। আসলে উইডিক মনে করত রোডিও তার একান্ত নিজস্ব এলাকা, এখানে বোর্ডের দখলদারি একেবারেই তার না-পসন্দ। এই নিয়েই ১৯৩২-এ রিচার্ডসনের সাথে তুমুল তর্কাতর্কি বাঁধে তার। উইডিক হুমকি দেয় রেডিওর ব্যাপারে নাক গলাতে এলে সে আর এই ব্যাপারে থাকবেই না। হয়ত উইডিক ভেবেছিল তাকে ছাড়া রোডিও হবে না, বোর্ড মেনে নেবে তার দাবি। বাস্তবে কিন্তু হয় তার উল্টোটাই। মাসখানেক বাদে বোর্ড ঘোষণা করে যে উইডিককে তার দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেওয়া হল, অর্থাৎ একরকম তাড়িয়েই দেওয়া হল তাকে। একে কাউবয়, তার উপর ভয়ানক জেদী। তাড়িয়ে দিলেই তো আর উইডিক সুড়সুড় করে চলে যাবে না। সেও চুক্তিভঙ্গ আর অন্যায় ভাবে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে মামলা ঠুকে দিল বোর্ডের বিরুদ্ধে। যে সে মামলা নয়, একেবারে এক লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল উইডিক। তবে শেষ পর্যন্ত উইডিক পেয়েছিল আইনি খরচ ছাড়া মাত্র দুই হাজার সাতশ’ পঞ্চাশ ডলার। বলা বাহুল্য সে মোটেই খুশি হয়নি, পরবর্তী কুড়ি বছর ধরে এই তিক্ততা দুই পক্ষই বজায় রেখেছিল। কিন্তু ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের স্ট্যামপিডে উইডিককে সম্মানীয় অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই বছর প্যারেড মার্শালের দায়িত্বও সে পালন করে। প্যারেড মার্শালকে পুরো প্যারেডের নেতা বলা যেতে পারে, খুবই সম্মানের পদ।
এতে উইডিকের মন অবশেষে শান্ত হয়েছিল কিনা তা অবশ্য জানি না।
১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে গোটা অ্যালবার্টা প্রদেশের ভাগ্যের চাকা মস্ত এক পাক ঘুরে যায়। ক্যালগেরি থেকে প্রায় তিনশ’ কিলোমিটার দূরে লেডুক শহরে বিপুল পরিমাণ খনিজ তেলের সন্ধান পায় ইম্পেরিয়াল অয়েল কোম্পানি। এর আগে তারা তিরিশ বছর ধরে চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছিল। যাইহোক, এর ফলে ক্যালগেরি কৃষিপ্রধান সমাজ থেকে কানাডার খনিজ তেল আর গ্যাসের ঘাঁটি হয়ে দাঁড়ায়। ছয় সাত বছরের মধ্যে জনসংখ্যা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। প্রবাসীরাও আসতে থাকে দলে দলে। তারাও পরিবার বন্ধুবান্ধব নিয়ে স্ট্যামপিডে দিব্য মেতে ওঠে। ১৯৫০-এর দশককে স্ট্যামপিডের স্বর্ণযুগ বললে ভুল হয় না। এই ক্রমবর্ধমান দর্শকসংখ্যাকে সামাল দিতে সব কিছু ঢেলে সাজাতে হয়েছিল প্রদর্শনী কর্তৃপক্ষকে। ১৯৫৩ সালের স্ট্যামপিড গ্রাউন্ডের ছবি রইল নীচে।
ছবিঋণ: প্রভিন্সিয়াল আর্কাইভস অফ অ্যালবার্টা।

দর্শকসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে স্ট্যামপিড ক্রীড়াঙ্গনের বদল ঘটানো হয়েছে বাববার। তবে গাড়ি পার্ক করার ব্যবস্থাটা এখনও তেমন সরেস নয়। আগের তুলনায় অনেক বাড়ালেও দর্শক সংখ্যার তুলনায় তা নগণ্য।
১৯৭৬-এ যখন প্রথমবার স্ট্যামপিডে দশ লাখ লোকের ভিড় হয়, তখনই কতৃপক্ষ স্টেডিয়াম বদলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নতুন প্রদর্শনী কক্ষ, ওলিম্পিক স্যাডেলডোম নামে মস্ত স্টেডিয়াম, সবই তৈরী হল ধীরে ধীরে। ওলিম্পিক স্যাডেলডোম এখন ক্যালগেরি শহরের অন্যতম প্রতীক। ৪৭৪,০০০ বর্গ ফুট জোড়া এই স্টেডিয়ামের দর্শকাসন সংখ্যা ১৯,০০০। এর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে। ততদিনে অবশ্য ছয় দিনের মেলা গিয়ে দাঁড়িয়েছে দশ দিনের মহোৎসবে। আজ ক্যালগেরির বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে গেছে স্ট্যামপিড।

এত বড় কর্মকাণ্ড, নানা সমস্যা আসবে এটাই স্বাভাবিক। প্রথম দিকের সমস্যাগুলোর কথা তো মোটামুটি বললাম। ২০১৩তে স্ট্যামপিড শুরু হওয়ার ঠিক দুই সপ্তাহ আগে এল এক ভয়ানক বন্যা। মেলার গ্রাউন্ড ক্ষতিগ্রস্থ হল খুব। কিন্তু “শো মাস্ট গো অন”, তাই সেবারও স্ট্যামপিড হয়েছিল। কিছু কিছু ইভেন্ট বাতিল করে, গান বাজনার আসর অন্যত্র সরিয়ে বন্যাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেবারও একই উৎসাহে মানুষের ঢল নেমেছিল রাস্তায়।
শুধু একশ’ বছরের মধ্যে একবারই বন্ধ হয়েছিল এই পার্বণ। সেই অভিশপ্ত প্যান্ডেমিকের বছর, ২০২০। সারা পৃথিবীই তো থমকে গিয়েছিল তখন, কী আর করা। তবে ঘোড়ার পিঠে চড়ে কাউবয় আর পুলিশ সারা শহর টহল দিয়ে বেড়াত। আমরা তখন ডাউনটাউনে থাকতাম, সেসব দেখতে পেয়েছিলাম ভালো করে। সন্ধের পর ভিন্টেজ গাড়ির সারি বেরোত। এমনিতে এরা কেবল কোন কিছুর প্রতিবাদ করার জন্য হর্ণ বাজায়, কিন্তু তখন প্রায় একটানা দশ মিনিট ধরে হর্ণ বাজাতে বাজাতে গাড়ি নিয়ে পাক খেত সিনিয়র কাউবয়রা। হয়ত প্যান্ডেমিককেই বলতে চাইত, আমরা আছি, থাকবও। আর দশ দিন ধরে রোজ রাত এগারোটার পর মিনিট পনের ধরে স্টেডিয়াম থেকে একের পর এক বাজি ফাটানো হত। স্টেডিয়াম থেকে বাজি ফাটালে নাকি সারা শহর থেকে তা দেখা যায়। দূষণের কারণে আমি বাজি ফাটানোর বিরুদ্ধে, কিন্তু প্যান্ডেমিকের সেই অন্ধকার রাত্রিগুলো আলোয় আলো হয়ে উঠত, সেটাও বড় কম কথা নয়।

স্ট্যামপিডের সাথে ইয়াহু শব্দটা এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে, দর্শকরা রোডিও প্রতিযোগীদের উৎসাহ দিয়ে ইয়াহু বলে শোরগোল তোলে। তবে এই শব্দ অনেক পরের আমদানি। সেই গাই উইডিকের বিজ্ঞপ্তিতে কিন্তু ব্যবহার করা হয়েছিল হুপ-ই-ই-ই। শহরের জনপ্রিয় খবরের কাগজ ক্যালগেরি হেরাল্ড ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে ইয়াহু শব্দটা ব্যবহার করলেও তখন এর অর্থ ছিল অমার্জিত মানুষ। পরে কোনভাবে আমোদ প্রমোদের সাথে এই শব্দ জুড়ে যায়। কেউ কেউ আবার বলত ইপ্পি। যাইহোক, ১৯৪৯-এ এক পাঠিকা ক্যালগেরি হেরাল্ডের সম্পাদককে লেখা চিঠিতে বলেন স্ট্যামপিডের কতৃপক্ষদের মস্ত ধন্যবাদ আর ইয়াহু জানানো উচিত। কথাটা সবার বেশ মনে ধরে। এখন তো মেলার মাঝখানে ফ্রেম দিয়ে বড় বড় অক্ষর বানিয়ে ইয়াহু লেখা থাকে।

স্ট্যামপিডের ইতিহাস তো মোটামুটি শুনলে, পরের পর্বে নিয়ে যাব মেলার ভিতরে। সে এক হই হই কাণ্ড, রই রই ব্যাপার। খাবার দাবার, বিকট সব রাইড, ঘোড়ার আর খামারের নানারকম প্রাণীদের প্রদর্শনী, মার্ডি গ্রা, কী নেই সেখানে। ক্যালগেরির দুটো ডাকনাম আছে, জানো তো? স্ট্যামপিড সিটি, আর কাউটাউন।
আজ তবে এই পর্যন্ত, টাটা।
ক্রমশ