গল্প-ফরেনকাকু দ্য গ্রেট-চুমকি চট্টোপাধ্যায়-শরৎ ২০২৫

চুমকি চট্টোপাধ্যায়ের আরো গল্প
আজব মানুষের গজব কাহিনী, ভগবানের বেটা বেটি, শুদ্ধ ভক্তের ঘড়ি, জ্বর গাছ, হরিদ্রাবৃত্ত, কঙ্কাল কান্ড, আহা কী আনন্দ, রহস্য খুঁজতে খুঁজতে, সেরিমোনিয়াল পাইপ

রাজারহাটের প্যাঁচার মোড় থেকে ডাইনে ঘুরে দুটো বাঁদিক ছেড়ে তিন নম্বর বাঁদিক দিয়ে ঢুকে অনেকটা যেতে হল রথীজিৎকে। অনেকটা মানে, চলছে তো চলছেই গাড়ি। যখন বাড়ির সংখ্যা কমে গিয়ে বিশাল মাঠ শুরু হচ্ছে, সেই মাঠের মাঝামাঝি ফরেনকাকুর বাড়ি।

ভারী অদ্ভুত দেখতে সেই বাড়ি। দেখলে মনে হয় যেন মন্দির, মসজিদ, গির্জার মিক্সচার। ফরেনকাকু তিতিনের বাবার বন্ধু। ওর বাবা ফরেনকাকুর অনেক গল্প তিতিনকে বলেছে। ফরেনকাকুর আসল নাম ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত। বিদেশে থাকে বলে তিতিন ডাকে ফরেনকাকু।

“ছোটো থেকেই ইন্দ্র খুব বুদ্ধিমান। ভাঙাচোরা জিনিসপত্র থেকে কত অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস বানাতে পারত। স্কুলের স্যাররা বলতেন, ও বড়ো হয়ে হয় ইঞ্জিনিয়ার হবে নয়তো বিজ্ঞানী হবে।”

“কী বানাত ফরেনকাকু?” কৌতূহলে প্রশ্ন করে তিতিন। ও নিজেও তো জুতোর বাক্স দিয়ে রেডিও, দেশলাই বাক্স দিয়ে সোফা-সেট বানাতে পারে। দেখে সবাই হাততালি দিলেও বড়ো হয়ে তিতিন বড়ো মাপের কেউ হবে যে, সেটা তো বলে না।

“ট্রাই-সাইকেলের চাকা দিয়ে দেওয়াল ঘড়ি, রিচার্জেবল টর্চ, আরও কী কী সব বানিয়েছিল, এখন আমার অত মনে নেই। স্কুল পাশ করার পরেই তো পোল্যান্ডে চলে গেছিল। ওখানে ওর মামা থাকতেন তার কাছে। তখন তো আর মোবাইল ছিল না, তাই যোগাযোগ একদম কমে গেছিল।”

“তাহলে আবার এখানে ফিরে এল কেন?”

“ওর ইচ্ছে হল তাই। দেশ ছেড়ে থাকতে কারোরই ভালো লাগে না। তাছাড়া, পুরোপুরি তো চলে আসেনি। যাওয়া-আসা করে। এখন এখানে আছে, আবার ছ’মাস পরে চলে যাবে ও-দেশে।”

সেই ফরেনকাকু তিতিনদের পুরো ফ্যামিলিকে নেমন্তন্ন করেছে। তিতিনের মায়ের শরীরটা ঠিক নেই বলে আসেনি। তিতিন আর ওর বাবা যাচ্ছে।

বাড়িটার সামনে গাড়ি থেকে নেমে অবাক হয়ে যায় তিতিন। এরকম অদ্ভুত দেখতে বাড়ি সে কোনোদিন দেখেনি। মাঝখানটা মন্দিরের ছাদের মতো গোল। দু-পাশটা পিরামিডের মতো মনে হচ্ছে এখন। দূর থেকে গির্জার মতো লাগছিল। হাঁ করে দেখছিল তিতিন। আর ভাবছিল, এ কেমন বিচ্ছিরি দেখতে বাড়ি রে বাবা! বুদ্ধিমান ফরেনকাকুর বাড়ির থেকে ওদের বাড়ি অনেক সুন্দর।

“তিতিন আয়।” গাড়ি পার্ক করে বাবা ডাকল।

তিতিন বাবার সঙ্গে গিয়ে দাঁড়াল বাড়ির দরজায়। বেল বাজাল তিতিনের বাবা রথীজিৎ। একটা লোকের গলা বলে উঠল, “হু ইজ দিস? প্লিজ টেল ইয়োর নেম। আপনি কে? দয়া করে নাম বলুন।” ইংরেজি আর বাংলা, দু-ভাষাতেই বলল।

“আমি রথীজিৎ গাঙ্গুলি। আমার ছেলে স্মরণজিৎ গাঙ্গুলি।”

“ধন্যবাদ।”

এর পরেই দরজা খুলে গেল। ওরা গিয়ে দাঁড়াল একটা কোলাপ্সিবল গেটের সামনে। গেটটা আপনা থেকেই দু-পাশে সরে গিয়ে ওদের যাবার জায়গা করে দিল।

সিঁড়িতে পা দিতেই সিঁড়ি চলতে শুরু করল। রথীজিৎ তাকাল ছেলের দিকে। তিতিন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “এগুলো সব দেখেছি বাবা। এসকালেটর তো কত জায়গাতেই চড়েছি। আর অটোম্যাটিক গেটও আমি নীতুপিসির বাড়িতে দেখেছি। ছোটো স্ক্রিনে দেখা যায় কে এসেছে। তারপর রিমোট টিপলে দরজা খুলে যায়।”

“আয় আয়, রথি। এসো এসো, মাস্টার।”

সিঁড়ি যেখানে গিয়ে থামল, সেখানে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে ফরেনকাকু। অনেক ছোটোবেলায় তিতিন দেখেছিল বলে চেহারাটা ঠিক মনে ছিল না। ছোটোখাটো মানুষটার ঝকঝকে হাসি আর চকচকে চোখ দেখে মনটা কেমন ভালো হয়ে গেল ওর। দেখলেই মনে হয় ভালো মানুষ।

“তারপর, খবর কী, তিতিনবাবু? কোন ক্লাস হল?”

যে ঘরে নিয়ে গিয়ে তিতিনদের বসাল ফরেনকাকু, সেই ঘরটা বেশ সাজানো গোছানো। তবে ফার্নিচারগুলো ঠিক ওদের মতো নয়, একটু অন্যরকম। সোফাগুলো কেমন গোল গোল মতো, সেন্টার টেবিলটাও অন্যরকম দেখতে। ভেতরে ছ’টা টুল গোঁজা। দেওয়ালে তাক করা, তাতে নানা রঙের পাথর সাজানো। কোনো-কোনোটা থেকে আলো ঠিকরাচ্ছে।

তিতিনকে পাথরের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইন্দ্রজিৎ বলল, “ওগুলে সব খনি থেকে সংগ্রহ করা ক্রিস্টাল। ওই বেগুনি মতোটা অ্যামেথিস্ট, লাকি ক্রিস্টাল নামে পরিচিত। ওই হালকা হলুদটা সিট্রিন। সবুজ যেটা সেটা অ্যাভেনটুরিন। গাঢ় সবুজটা জেড। গোলাপিটা রোজ কোয়ার্টজ। সরি, এগুলোর বাংলা নাম আমার জানা নেই।”

“খনি থেকে খাঁটি পাথর সংগ্রহ করা আমার নেশা বলতে পারো। তাছাড়া এগুলোর ভালো এফেক্ট আছে। মানে, পজিটিভ এফেক্ট। তুমি আর একটু বড়ো হলে ডিটেলে বোঝাব কীভাবে সূর্যরশ্মি সঙ্গে পাথরগুলো বিক্রিয়া করে। কিন্তু তোমার ক্লাসটাই তো জানা হল না।”

“ক্লাস সিক্স, এবার সেভেনে উঠব। জেড পাথর আমি দেখেছি। ট্রেড ফেয়ারে গেছিলাম মা’র সঙ্গে, সেখানে একটা স্টলে জেড পাথরের টেবিল দেখেছি।”

“ইয়েস মাই বয়, ইউ আর রাইট। গুড। তোমার অবজার্ভেশন ভালো। তোর ছেলেটা ব্রাইট আছে রথি। বল, খবরাখবর শুনি তোর কাছে।”

রথীজিৎ কথা শুরু করার মাঝেই তিতিন বলে উঠল, “তুমি তো ছ’মাস এখানে থাকো আর ছ’মাস বিদেশে থাকো। পাথরগুলো কি কেবল এখানেই থাকে?”

কথার মাঝখানে কথা বলাতে রথীজিৎ রাগের চোখে তাকাল তিতিনের দিকে। তিতিন বুঝতে পারল বাবা কেন রাগ করছে। ও বলল, “সরি কাকু, আমি মাঝাখানে কথা বলে ফেললাম।”

“তুমি খুব বুদ্ধিমান ছেলে। খুব খুশি হলাম তোমার ভাবনা-চিন্তা দেখে। যখনই আমি এগুলো সংগ্রহ করি, দুটো করে করি। এই একই সেট আমার জার্মানির বাড়িতেও আছে। আমি পোল্যান্ড থেকে জার্মানি শিফট করে গেছি।”

দুই বন্ধু গল্প করতে শুরু করল। তিতিন উঠে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল, আকাশের রঙটা পুরো কালো। ওরা বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ে অল্প অল্প মেঘ ছিল। এখন একেবারে আকাশ ছেয়ে গেছে মেঘে।

খুব মেঘ করেছে কথাটা ওর বাবাকে বলতে গিয়েও থেমে গেল তিতিন। বাবা আর কাকু গল্প করছে, মাঝখানে কথা বললে বাবা রাগ করবে। মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল সে।

“তিতিনের বোর লাগছে মনে হয়। যাও তুমি ছাদে ঘুরে এসো। তবে মেঘ করেছে তো, বিদ্যুৎ চমকালে ছাদে থেকো না, কেমন?”

মনে মনে তিতিনের এটাই ইচ্ছে ছিল। বাবার কাছে শুনেছে, ফরেনকাকু অনেকরকম যন্ত্র বানিয়েছে যেগুলো গোপন আছে। বিদেশের সরকারের কাছ থেকে পেটেন্ট পেয়েছে। যদিও পেটেন্ট ব্যাপারটা বোঝেনি তিতিন। ওর মনে হয়েছে, পেটেন্ট মানে পারমিশন। সে যাই হোক, সেইসব যন্ত্র কি এখানে নেই? থাকলে তিতিন দেখত। খুউব ইচ্ছে ওর দেখার কী সেইসব যন্ত্র।

তিনতলায় ওঠার সময়ও এসকালেটর আছে, কিন্তু সেটা এখন বন্ধ। শপিং মলের এসকালেটরের ধাপগুলো অনেক উঁচু উঁচু। কিন্তু এই বাড়ির এসকালেটরের সিঁড়িগুলোর ধাপ বেশ ছোটো ছোটো। বাড়ির সিঁড়ির মতো। বন্ধ থাকলেও উঠতে অসুবিধে হল না ওর।

ছাদে গিয়ে তিতিনের কেমন ভয় লাগল। আকাশ কালো করে যেন সন্ধে নেমে এসেছে। বাঁদিকে তাকিয়ে ও দেখল একটা ঘর, দরজা বন্ধ। হাত দিয়ে ঠেলে বুঝল লক করা। ওই ঘরটার মাথাটাই গোলমতো। এটা মনে হয় ঠাকুরঘর। ওদের বাড়ির ছাদের ঘরটা তো ঠাকুরঘর।

ঘরের পাশ দিয়ে তিতিন আর একদিকে গেল। সেখানে গিয়ে ভয়ানক অবাক হয়ে গেল সে। এগুলো কী? ছাদের ওই অংশটা পুরোটা ঘিরে বড়ো থেকে ছোটো নানাধরনের মাশরুম লাগানো। যে মাশরুম মা রান্না করে, এগুলো ঠিক সেরকম নয়। বেশ মোটাসোটা আর লম্বা মাশরুম।

ওখানে আবার কিছু সরু তারের মতো জিনিসপত্র জালের মতো বেছানো। একটা অ্যান্টেনার মতো জিনিসও আছে। তিতিনের মাথায় হঠাৎ ঝিলিক মারে, তাহলে কি এটা ফরেনকাকুর বানানো কোনও যন্ত্র? ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ চিরে ও-পাশ থেকে এ-পাশ এঁকে-বেঁকে চলে গেল বিদ্যুতের রেখা। গড়গড় করে ডেকে উঠল মেঘ। ভয় পেয়ে গেল তিতিন। দৌড়ে চলে এল নীচে বাবার কাছে।

“কী রে, চলে এলি? বৃষ্টি পড়ছে?”

“না। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কাকু বারণ করেছিল, তাই চলে এসেছি।”

ওদের কথা শেষ হতে না হতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। ইন্দ্রজিৎ বলল, “আজ মনে হচ্ছে ভালো বৃষ্টি হবে।”

“এই রে, পনেরো মিনিট জোরে বৃষ্টি হলেই আমাদের ওদিকে জল জমে যায়। আমি আবার গাড়ি নিয়ে এলাম। না আনলেই ভালো হত।”

“ও ঠিক আছে। জল জমলে জমবে। বাড়ি চলে যেতে পারবি, অসুবিধে হবে না।”

“তুই জানিস না আমাদের এলাকায় কেমন জল জমে। গাড়ির ইঞ্জিনে জল ঢুকে যায়।” চিন্তিত মুখে বলল রথীজিৎ।

ইন্দ্রজিৎ তিতিনিকে জিজ্ঞেস করল, “ছাদে কী দেখলে, মাস্টার?”

“বড়ো বড়ো মাশরুমের মতো ওগুলো কী কাকু? খাওয়ার মাশরুম?”

“তুমি ওগুলো দেখেছ? গুড, গুড! ওগুলো খাওয়ার মাশরুম নয় তিতিন। ওগুলো ফাঙ্গি। ওখানে চাররকমের ফাঙ্গি  আছে— ইনোকি, স্প্লিট গিল, গোস্ট আর ক্যাটারপিলার। এরা নিজেদের মধ্যে ভাবনা আদানপ্রদান করতে পারে ইলেকট্রিক্যাল সিগনালের মাধ্যমে। যেমন ধরো, ওয়েদার কীরকম বা খাবার কী আছে আশেপাশে, বলাবলি করে নেয়। ওয়েস্ট ইংল্যান্ড ইউনিভার্সিটির একজন প্রফেসর এটা আবিষ্কার করেছেন। উনি বলেছেন, এদের ভাষা যদি ডিকোড করা যায়, মানে, কী বলব… ধরো ভেঙে ফেলা যায়…”

“আমি বুঝতে পেরেছি কাকু, যেমন শিলালপিতে কী লেখা আছে সেটা যেভাবে বুঝতে হয়, তেমন…”

“এগজ্যাক্টলি! বাহ্‌, দারুণ এগজাম্পল দিয়েছ! রথি, তোর ছেলেটা কিন্তু সুপার ইন্টেলিজেন্ট। তিতিন, এর পরের বার এসে তোমাকে আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট করে নেব। একসঙ্গে রিসার্চ করব।”

“যেটা বলছিলে বলো কাকু, ওদের সিগন্যাল ভেঙে ফেললে…”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, যদি ডিকোড করা যায় তাহলে প্রায় পঞ্চাশটার মতো শব্দ পাওয়া যেতে পারে। যদিও, এখনও অবধি সেটা প্রমাণিত হয়নি। কাজ চলছে। আমিও করছি, কিন্তু কেউ জানে না। এদের সিগনাল কাজে লাগিয়ে অনেক গোপন খবর পাঠানো যাবে।”

তিতিনকে অ্যাসিস্ট্যান্ট করে নেবার কথাটা শুনে মনে মনে খুশি হয় সে। কিন্তু এই কাজটা তো অন্য একজনের, ফরেনকাকুর নিজের নয়, বাবা যে বলল কাকু অনেক কিছু নতুন জিনিস বানিয়েছে!

রথীজিৎ উঠে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, “ওরেব্বাবা, বৃষ্টি তো থামার নাম নেই রে! আমাদের ওখানে নির্ঘাত সমুদ্র হয়ে গেছে। ফোন করে দেখি বাড়িতে।”

রথীজিৎ কথাটা শেষ করতে না করতেই মোবাইল বেজে উঠল। তিতিনের মা।— “তোমরা ফিরবে কী করে, এখানে তো বুক-জল জমেছে! বুঝেশুনে এসো। গাড়ি নিয়ে ফেঁসে যাবে।”

“ব্যস, হয়ে গেল! আজ ফিরব কী করে রে?” কপালে ভাঁজ ফেলে বলল রথীজিৎ।

“অত চিন্তা করছিস কেন, উপায় ঠিক হয়ে যাবে। না ফিরতে পারলে থেকে যাবি। আমার বাড়িতেই তো আছিস। এই দেখ না, সোফাগুলো উলটে দিলেই খাট হয়ে যাবে। থাকার কোনও অসুবিধে নেই।”

“না রে, তা নয়। একটা পিপিটি বানাতে হবে আমাকে। কাল ট্রেনিং আছে অফিসে। তাছাড়া তোর বউদির শরীরটা ভালো নেই। ফিরতেই হবে।”

গড়গড় আওয়াজ করে মেঘ ডেকেই চলেছে আর বৃষ্টি হয়েই চলেছে। মেঘভাঙা বৃষ্টির খবর অনেক শোনা যায়। এ যেন তাই।

“আমার গাড়িটা…” রথীজিতের উদ্বিগ্নতা কমিয়ে ইন্দ্রজিৎ বলল, “এখানে জল জমে না। যদি-বা জমে, তোর গাড়ি আমি ভেতরে ঢুকিয়ে নেব, নো টেনশন।”

ভেতরে কোথায় ঢুকিয়ে নেবে সেটা বুঝতে পারল না তিতিন। ঢোকার সময় নীচে কোথাও গ্যারাজ দেখেনি। ওর ইচ্ছে ছিল ফরেনকাকুর কেমন গাড়ি সেটা দেখবে। কিন্তু দেখতে পায়নি। কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞাসাই করে ফেলল সে, “কাকু, তোমার গাড়ি কোথায় থাকে?”

হেসে ইন্দ্রজিৎ বলল, “সাবাশ, তিতিন! আমি যত দেখছি তোমাকে তত খুশি হচ্ছি। তুমি ঠিক নজর করেছ যে নীচে গ্যারাজ নেই বা গাড়ি রাখা নেই। আসলে তুমি বেশিক্ষণ ছাদে থাকতে পারোনি, পারলে ঠিক খুঁজে বের করে ফেলতে পারতে। চলো, দেখিয়ে দিই তোমাকে আমার গাড়ি কোথায় থাকে।”

ইন্দ্রজিতের পেছন পেছন চলল তিতিন। ওর বাবাও গেল ওদের সঙ্গে। ছাদের দিকে উঠতে দেখে তিতিন বলল, “বৃষ্টি পড়ছে তো খুব, ছাদে যাচ্ছ কেন কাকু?”

“ছাদে যাচ্ছি না তো। এই যে এখানে।”

তিতিন দেখল ছাদে পৌঁছনোর আগেই সিঁড়িটা থেমে গেল। একটা ছোট্ট চাতালমতো দেখা গেল। কই, ছাদে যাবার সময় এটা তো দেখেনি ও!

চাতালে পা দিল ইন্দ্রজিৎ। পেছন পেছন চলল তিতিন আর ওর বাবা। ইন্দ্রজিৎ বাঁদিকে গেল। দিব্যি একটা গলিমতো আছে যা চলমান সিঁড়ির রেলিংয়ের জন্য দেখা যায় না।

একটা বড়ো ঘরে গিয়ে দাঁড়াল ওরা। সেখানে ফরচুনার গাড়ি রাখা। আরও তিনটে গাড়ি রাখার মতো জায়গা আছে।

“এটা কত তলা কাকু?”

“এটা আড়াইতলা।”

“গাড়ি কী করে ওঠে এখানে?”

“এদিকে এসো। এই যে স্পাইরাল কার ওয়ে করা আছে, এটা ধরেই উঠে আসে। এই অংশটা আমি বাড়ির মধ্যেই ঢুকিয়ে নিয়েছি যাতে বাইরে থেকে কিছু বোঝা না যায়। ছ’মাস সাত মাস থাকি না, গাড়িটা এখানে সেফ থাকে।”

“এরকম পার্কিং শপিং মলগুলোতে আছে, না বাবা?”

“ইয়েস ইয়েস, ইউ আর রাইট মাই বয়! একদম ঠিক বলেছ। ওদের পার্কিং প্লেসটা বাইরে থেকে দেখা যায়, এটা দেখা যায় না। এখুনি আমি তোমাদের গাড়িটাও ঢুকিয়ে নেব। আজ মনে হচ্ছে কলকাতা ফ্লাডেড হয়ে যাবে।”

এ পর্যন্ত তিতিন যা দেখেছে তাতে ফরেনকাকু স্পেশাল কিছু বানিয়েছে বলে মনে হয়নি। এগুলো যে-কেউ বানাতে পারে। সে যাই হোক, আজ বাড়ি ফিরবে কী করে সেটা বেশ চিন্তার ব্যাপার। মা বাড়িতে একা। মনটা মা মা করে উঠল ওর।

“আচ্ছা, এদিকে এসো তিতিন, তোমাকে আর একটা জিনিস খাওয়াই।”

পার্কিং এরিয়া থেকে আর একটা গলিমতো দিয়ে ওরা অন্য একটা ঘরে এসে পড়ল। ঘরটা বেশি বড়ো নয়। মাঝখানে একটা টেবিলমতো রাখা। তার ওপরে কিছু জিনিস নেটের ঢাকা দিয়ে রাখা।

ইন্দ্রজিৎ এগিয়ে গিয়ে ঢাকা তুলে তিতিনকে ডাকল। তিতিন যেতেই ওর হাতে ছোটো ছোটো হলদেটে কমলা রঙের ফল দিয়ে বলল, “এগুলো ক্লাউড বেরি, খেয়ে দেখো। জার্মানি থেকে এনেছি।”

একটা নিয়ে মুখে দিল তিতিন। ওর বাবার হাতেও দিল ইন্দ্রজিৎ। রথীজিৎ বলল, “ফল ফ্রিজে না রেখে এখানে রেখেছিস কেন?”

“এটা আমার একটা এক্সপেরিমেন্ট। এই ফলগুলো আমি এনেছি প্রায় একমাস হতে চলল। খেয়ে কেমন লাগল, নষ্ট হয়নি তো?”

“না না, ফ্রেশ আর জুসি আছে। বিষয়টা কী?” রথীজিতের চোখে কৌতূহল।

তিতিন কিন্তু ছাদের দিকে তাকিয়ে বুঝে গেছে, এটা সেই পিরামিডের মতো ছাদের অংশটা।

“পিরামিডের ভেতরে একদম সেন্টার পয়েন্টে কিছু রাখা থাকলে সেটা নষ্ট হত না। আমি সেই থিওরিটা ঠিক কি না দেখার জন্য এই ঘরের ছাদটা ওকমভাবেই বানিয়েছি। তার সেন্টার পয়েন্টে রেখেছি এই ফলগুলো। এখনও অবধি একদম ঠিক আছে। আমি দেখতে চাই কতদিন ঠিক থাকে।”

তিতিনের বেশ অবাক লাগল। ফরেনকাকু অনেক কিছু জানে, কিন্তু এসব তো অন্যদের আবিষ্কার। কাকুর নিজের করা কিছু এখনও দেখা হল না।

এর মধ্যেই মায়ের ফোন এল।— “আজ তোমরা ওখানে থেকে যাও। এখানে কারেন্ট চলে গেছে, ফিডার বক্স ডুবে গেছে।”

তিতিন ওর বাবার হাত চেপে ধরে বলল, “বাড়িতে মা একা আছে বাবা। মা’র জ্বর। অন্ধকার হয়ে গেছে, চলো যাই।”

রথীজিৎ খুবই চিন্তায় পড়ে গেল। বন্ধুকে বলল, “যে করে হোক বাড়ি আমাদের ফিরতেই হবে। আমি বেরোই, বুঝলি। তারপর দেখা যাবে।”

“বউদি একা আছে, তার ওপর লাইট নেই। তোদের যেতেই হবে। দাঁড়া একটু, আমি দু-মিনিটে আসছি।” বলেই কোথায় চলে গেল ইন্দ্রজিৎ।

ঠিক দু-তিন মিনিটের মধ্যে ফিরে এসে বলল, “আয় আমার সঙ্গে।”

রথীজিৎ অবাক হয়ে বলল, “কোথায় যাব?”

“আয় না।”

ইন্দ্রজিতের পেছন পেছন বাবা আর ছেলে গেল। চলমান সিঁড়িতে চড়ে ছাদে পৌঁছল ওরা। ধূসর কালো মেঘে আকাশ ছাওয়া। বৃষ্টি পড়েই চলেছে, তেজ একটু কম। সেই বন্ধ ঘরটার দরজায় কার্ড ছোঁয়াতেই দরজা খুলে গেল। ইন্দ্রজিৎ ওদের নিয়ে ভেতরে ঢুকল।

একটা গোল মতন মেশিন রাখা ঘরজুড়ে। অনেকটা ফ্লাইং সসারের মতো দেখতে। ইন্দ্রজিৎ রিমোট টিপতেই সিঁড়ি নেমে এল। তারপর ওপরের গোল ছাদ অর্ধেকের বেশি সরে গেল। প্রথমে নিজে উঠল, তারপর ডেকে নিল তিতিন আর রথীজিৎকে।

ভেতরে চারজন বসার মতো জায়গা। যদিও সিটগুলো ছোটো। বসতেই অটোম্যাটিক সিট বেল্ট এসে আটকে দিল ওদের। মাথার ওপরের ছাদ এসে ঢেকে দিল। সিঁড়ি উঠে এল। তিতিন আর রথীজিৎ বুঝতেই পারছে না ব্যাপারটা কী হচ্ছে।

“এটা হল আমার তৈরি ফিউচার কার। শুধু আমি বললে ভুল হবে, আমরা জনাচারেক মিলে বানিয়েছি। বাকিটা যেতে যেতে বলব।”

ঘরের গম্বুজের মতো ছাদ সরে গেল। ফিউচার কার সোজা উঠে গেল আকাশে। গম্বুজের মাথা আবার তার জায়গায় ফিরে গেল।

ইন্দ্রজিৎ বলল, “বাড়ির পুরো ঠিকানা বল।”

রথীজিৎ বলতে লাগল, ইন্দ্রজিৎ সামনের প্যানেলে টাইপ করে ইনপুট দিতে লাগল। ফিউচার কার চলছে। তিতিন পুরো বোবা হয়ে গেছে। কোনও কথাই বেরোচ্ছে না ওর মুখ দিয়ে। যেন স্বপ্ন দেখছে।

ফিউচার কারের চারদিকটা কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া মনে হচ্ছে। তিতিন শুধু ডানে-বাঁয়ে ওপর-নীচে তাকাচ্ছে। ইন্দ্রজিৎ বলল, “কী তিতিনবাবু, কেমন লাগছে বলো।”

“চারদিকটা কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া লাগছে কেন কাকু?”

“এটা ইচ্ছে করেই করা হয়েছে যাতে ফিউচার কার দেখা না যায়। নীচ থেকে মনে হবে মেঘ ভেসে যাচ্ছে। দেখতে পেলে আর্মি গুলি করে নামাবে। এই তো, এসে গেছি প্রায়। তোর বাড়ির ছাদ ফাঁকা আছে তো রথি? মানে, আমি বলতে চাইছি আজকাল তো অনেকেই ফাইবারের শিট দিয়ে ছাদ কভার করে দিচ্ছে, সেরকম করা কি?”

“না না, ছাদ খোলাই আছে।”

“নামছি তাহলে। তুই একটা কাজ কর। বউদিকে এবার ফোন কর। ছাদ দিয়ে নামলে খুবই ভয় পাবে না-হলে।”

সামান্য একটু ঝাঁকুনি হল। তিতিন বুঝল, ল্যান্ড করে গেছে ফিউচার কার। মনখারাপ হয়ে গেল ওর। একে একে নেমে এল তিনজন।

রথীজিৎ ফোন করে তিতিনের মাকে বলল, “ছাদের ঘরের দরজাটা খুলে দিতে হবে। টর্চ নিয়ে এসো।”

“কেন? ছাদের ঘরে কী হয়েছে?” বিস্মিত তিতিনের মা।

“আমরা এসেছি। তুমি খোলো, তারপর সব বলছি। ইন্দ্র আছে আমাদের সঙ্গে।”

“ছাদে এলে কী করে!” এবার গলার স্বরে ভয়।

তিতিন ওর বাবার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বলল, “মা, আমরা ফরেনকাকুর ফিউচার কারে করে এসে ছাদে নেমেছি। তুমি দরজা খুলে দাও।”

দরজা খুলে দিল তিতিনের মা। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল সে।

“আয় ইন্দ্র, চা খেয়ে যা।” রথীজিৎ বলল।

“আজ আর বসব না। পরে এসে চা খেয়ে যাব।”

তিতিন হঠাৎ ইন্দ্রজিতের হাত জড়িয়ে ধরে বলল, “ফরেনকাকু, তুমি কী দারুণ গাড়ি বানিয়েছ! আমাকে একটা বানিয়ে দেবে?”

হেসে উঠে ইন্দ্রজিৎ বলল, “তুমি নিজেই বানাতে পারবে তিতিন। তুমি খুব বুদ্ধিমান ছেলে। এর পরের বার এসে তোমাকে আমি ট্রেনিং দেব। এসব বানাতে গেলে আর একটু বড়ো হতে হবে। আচ্ছা, আজ চলি, টা টা।”

ওরা তিনজনেই ছাদে এল ইন্দ্রজিৎকে বাই বাই করতে। ফিউচার কার উঠে গেল আকাশে। তিতিন দেখল, একখণ্ড মেঘ উড়ে চলে গেল। এবার তিতিন বুঝল, ওর বাবা ঠিকই বলেছিল। ফরেনকাকু ইস গ্রেট!

তিতিন এখনও ঘোরের মধ্যেই আছে।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply