গল্প-ম.জা.রু-র ইতিকথা-সোমনাথ ভট্টাচার্য-বর্ষা ২০২৪

এই লেখকের আগের গল্প- ম.জা.রু এল বঙ্গে, ঘণ্টা রহস্য, বিভ্রম, ম.জা.রু-র প্রথম আলো,  

golpomojaru88

“রাস্তার উপর অজস্র জুতা মালিকবিহীন অবস্থায় পড়িয়া আছে। এখানে ওখানে ছেঁড়া কাপড়, জামা, গামছা, টিফিন কেরিয়ারের বাটি, রুটি, মুড়ি গড়াগড়ি খাইতেছে।… একটু দূরে খানকয়েক আধলা ইট এবং রাস্তার বিজলী বাতির ভাঙ্গা কাঁচের অজস্র টুকরার ছড়াছড়ি দেখা যায়।”

১৯৫৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর বৃষ্টিভেজা সকালে একরত্তি এক বাচ্চা ছেলেকে কোলে নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকা হাতে ধরে ঘরে বসে আছেন অন্নপূর্ণা। চোখের জলের ফোঁটায় ভিজে যাচ্ছে হাতে ধরা কাগজখানা। বাঙালির খাদ্যতালিকায় ভাতের পরিবর্তে ভুট্টার ও গমের আটা মিশিয়ে রুটি বানিয়ে খাওয়া, ভুট্টার চাল বানিয়ে খিচুড়ি খাওয়া, ভুট্টার ছাতু গুলে খাওয়া, এমনকি বাজরার রুটি বা তুলোর বিচির মতো তামাটে রঙের মাইলো দিয়ে তৈরি কালচে তিতকুটে রুটি খাওয়ার কথাও তাঁর কানে এসেছে। চারদিকে খাবারের অভাব—চাল নেই, ডাল নেই, তেল নেই—এসব কথাও তাঁর অজানা নেই। গ্রামে খাবার না পেয়ে হাতে অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র নিয়ে ভাতের ফ্যান (মাড়) চেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘোরা ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড়ও তিনি আকছার দেখেছেন কলকাতায়। কিন্তু গতকাল মহাকরণ অভিযানে গ্রামবাংলা এবং কলকাতা ও হাওড়ার শহরতলি থেকে অসংখ্য কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী এবং বাস্তুহারা মানুষ, এমনকি কোলে বাচ্চা নিয়ে কৃষিনিদের যে মিছিলের অঝোর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে গোটা কলকাতার রাজপথের দখল নেওয়ার যে বিবরণ তিনি এই মুহূর্তে খবরের কাগজে পড়লেন তা তাঁকে নাড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশ আর সেই মিছিলের মানুষের যে খণ্ডযুদ্ধ হয়েছিল তাতে কার দোষ বেশি বা কম তা তিনি বিচার করছেন না। তিনি বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন সেইসব মানুষের কথা ভেবে যাঁরা প্রথমবার কলকাতা এসেছিলেন গ্রাম থেকে; যাঁরা শহরের বিন্দুমাত্র চেনেন না; যাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েন; যাঁদের অসহায় ছোট্ট শিশু সেই গণ্ডগোলের শিকার হয়ে এই মুহূর্তে স্বজনহারা।

তেমনি মাত্র মাস ছয়েকের একটি শিশু এখন তাঁর কোলে শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। কাল গভীর রাতে তাঁর স্বামী যিনি কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার, দুই সহযোগী ইন্সপেক্টরের সঙ্গে মাত্র দু-মিনিটের জন্যে ঘরে এসে খিদের জ্বালায় ছটফট করে কাঁদতে কাঁদতে ধুঁকতে থাকা এই হাড় জিরজিরে শিশুটিকে তাঁর কোলে তুলে দিয়ে বলেন, “আজ বিশাল গণ্ডগোল হয়েছে। কার কোল থেকে কখন যে এ ছিটকে পড়েছে জানি না। পায়ের চাপে যে পিষে যায়নি এই রক্ষা। আপাতত তুমি সামলাও, পরে কাল সকালে যা করার করব।” বলেই আর না দাঁড়িয়ে গটমট করে জিপে উঠে আবার বেরিয়ে পড়েন। একরত্তি সেই শিশুটিকে নিয়ে অন্নপূর্ণা তখন কী করবেন ভেবেই পান না। সেই মুহূর্তে শান্তি মহন্ত, তাঁর ঘরের কাজের দিদি, তার অসীম সাহসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসেন এবং সারারাত সেবা-শুশ্রূষা করে খাইয়ে- দাইয়ে ভোরের দিকে ঘুম পাড়িয়ে বাচ্চাটিকে তাঁর কোলে তুলে দেন। সেই থেকে বাচ্চাটা পরম নিশ্চিন্তে তাঁর কোলে ঘুমিয়েই রয়েছে; অনেকদিন পর তার পেটের খিদের জ্বালা বুঝি মিটেছে। এমন সময় ‘মা! একটু ফ্যান দিবি?’ গেটের বাইরের দিক থেকে আসা আওয়াজে চমকে ওঠেন অন্নপূর্ণাদেবী। কচি বাচ্চাটাও ঠিক তখনই ঘুমের ঘোরে তার এক হাতের মুঠি শক্ত করে শূন্যে তোলে। কিছুক্ষণ আগেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, আকাশ তখনও কালো মেঘে ঢাকা। সেই মেঘের ফাঁক দিয়ে একচিলতে রোদ উঁকি দিল। মনে হচ্ছিল তার বিস্ময়ের বুঝি আর সীমা নেই।

ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরে অনেক রাতের দিকে যখন রুদ্রশঙ্কর ঘরে ফিরে এলেন তখন কলকাতার রাস্তায় অশান্তির ঘনঘটার মেঘ না সরলেও আকাশ থেকে ঝরে পড়া জ্যোৎস্নার আলোকছটা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা কলকাতা জুড়ে। তারই এক ফালি জানালার ফাঁক গলে অনাবিল সৌন্দর্যের জাল বুনেছে পাশাপাশি শুয়ে ঘুমিয়ে থাকা অন্নপূর্ণা ও ছোট্ট ছেলেটির মুখের ওপর। অভিভূত হলেন তিনি। কী এক মায়ায় যেন আবিষ্ট হলেন শক্ত হৃদয়ের পুলিশ কর্তা। ইচ্ছে হল ডেকে দেখান তাঁর সর্বক্ষণের দুই ছায়াসঙ্গী মইনুল হক আর জাস্টিন স্টিফেনকে, মাত্র একদিনেই বাচ্চাটার কী আমূল পরিবর্তন। দেখে কে বলবে যে এই সে বাচ্চাটি যে গতকাল হাত-পা ছুড়ে ক্ষীণ গলায় চিৎকার করে অভিযোগ জানাচ্ছিল গোটা পৃথিবীর বিরুদ্ধে, আজ পরম শান্তিতে কেমন হাসি হাসি মুখে ঘুমিয়ে আছে।

চুপিচুপি তিনি বাইরে এসে বারান্দার টি-টেবিলে বসলেন। সেখানে তখন ক্লান্ত ও অবসন্ন তাঁর দুই সর্বক্ষণের সঙ্গী মইনুল আর জাস্টিনও অপেক্ষা করছেন বাচ্চাটার খবর নেবেন বলে। স্যারকে প্রসন্ন মুখে আসতে দেখেই তাঁরা ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। রুদ্রশঙ্কর হাতের ইশারায় তাঁদের বসতে বলে বললেন, “তোমাদের সঙ্গে জরুরি কথা আছে, বসো।”

স্যারের কথা অমান্য করার সাধ্য, সাহস বা ইচ্ছা কোনোটাই তাঁদের নেই। তাই চুপচাপ দুজনেই আবার বসে পড়লেন চেয়ারে।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে রুদ্রশঙ্কর আবার বলে উঠলেন, “বাচ্চাটাকে তো বাঁচানো গেছে, এবার সকাল হলেই একটা সুবন্দোবস্ত করতে হবে। তোমাদের কী মত সেটা বলো।”

অনেকক্ষণ থেকেই কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য উশখুশ করছিলেন মইনুল। এবার সুযোগ পেয়েই প্রশ্ন করলেন, “বাচ্চাটা কেমন আছে স্যার?”

“সেই জন্যেই তো একটু বসে যেতে বললাম। এখন ঘুমাচ্ছে দেখে এলাম। ভালোই আছে বলে তো মনে হল। ঘুম থেকে থেকে উঠুক, একবার দেখেই যাও।”

“উফ্, কাল যা হয়েছিল, প্রাণে বেঁচে গেছে এই রক্ষা।” শান্তির নিশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন মইনুল।

“হুম, কাল তুমি যদি ওকে দেখতে না পেতে আর জাস্টিন যদি তড়িঘড়ি ওকে তুলে না নিয়ে আসত, তাহলে কী যে হত কে জানে। ওই ভিড়ে পায়ের চাপেই হয়তো…” বলতে বলতে গতকালের ঘটনা মনে করে একটু শিহরিতই হয়ে উঠলেন দুঁদে পুলিশ কর্তাও।

ইতিমধ্যে চা আর বিস্কুটের সঙ্গে ঘরে ভাজা গরম গরম চপ এনে হাজির করেছে শান্তিদি। চপে এক কামড় দিয়ে আর চায়ের এক ঢোঁকে গলাটা ভিজিয়ে অন্যমনস্ক গলায় ধীরে ধীরে বললেন রুদ্রশঙ্কর, “কিন্তু আসল কাজটাই তো এখনও বাকি। ওকে তো ওর বাবা-মায়ের হাতে তুলে দিতে হবে।”

“কিন্তু স্যার, চারদিকের যা হাল, খুঁজে পাবেন কী করে! আজ তো আপনার কথামতো কলকাতার সবক’টা থানাতে খবর লাগলাম। কোথাও কোনও বাচ্চার মিসিং ডায়েরি নেই।”

“থাকবেই-বা কী করে! গোটা বাংলা জুড়ে যা ধুন্ধুমার চলছে, এর মধ্যে বাচ্চা হারিয়ে গেলেও ওদের কেউ থানার আশেপাশে আসার সাহস করবে না।” বেশ গম্ভীর হয়েই বললেন রুদ্রশঙ্কর।

“স্যার, সেটাই তো মুশকিল। ওরা তো পুলিশকেই ওদের শত্রু মনে করে।”

“ভুল ভাবছ। হয়তো ওরাও ভুল ভাবছে। কিন্তু ওরা তো ক্রিমিনাল নয়, ওদের লড়াই তো পুলিশের সঙ্গে নয়। ক্ষুধার্ত ওই মানুষগুলো লড়ছে সিস্টেমের বিরুদ্ধে আর আমাদের কাজ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। যাক গে, ওসব কথা বাদ দাও। যেমন করেই হোক বাচ্চাটার বাবা-মাকে খুঁজে বার করতে হবে।” বেশ চিন্তিত স্বরেই বললেন রুদ্রশঙ্কর।

এতক্ষণ মইনুল আর রুদ্রশঙ্করের কথার মাঝে একটিও কথা বলেননি জাস্টিন। এবার ভয়ে ভয়ে ধীরে ধীরে তাঁর সন্দেহের কথা বললেন, “কিন্তু স্যার, এমন হয়নি তো, কাল যারা মারা গিয়েছে, এই বাচ্চাটা তাদেরই কারও?”

চা খেতে গিয়ে হাতটা বুঝি একটু কেঁপেই উঠল রুদ্রশঙ্করবাবুর। ঘুম ভেঙে ঘরের পর্দার আড়ালে থেকে এতক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে সবকথা শুনছিলেন অন্নপূর্ণা। তার দু-চোখে শ্রাবণের ধারা ঝরছিলই, এবার বুঝি মাথাটা ঘুরে পড়েই যাচ্ছিলেন। চট করে এসে তাঁকে ধরে এনে খাটে বসিয়ে দিল শান্তি।

পুরো একমাস ধরে গোরু খোঁজার মতো তন্নতন্ন করে কলকাতার এ-গলি সে-গলি খুঁজে বেড়ালেন মইনুল আর জাস্টিন। রুদ্রশঙ্কর তাঁর সি.আই.ডি বন্ধুদের মারফত সব থানায় খোঁজ করলেন; এমনকি পুলিশের পোষা খোঁচরদেরও কাজে লাগালেন বাচ্চাটির বাবা-মার সন্ধানের জন্য। পরিস্থিতি খুব একটা সহজ ছিল না। সাধারণ খেটে খাওয়া বা বাস্তুহারা মানুষেরা পুলিশ দেখলেই মুখ খুলতে চাইতেন না। কোনোরকম কোনও আশার আলো কোনোদিক থেকেই এল না।

বাধ্য হয়েই রুদ্রশঙ্কর একদিন বেশ রাতের বেলায় তাঁর সর্বক্ষণের ছায়াসঙ্গী মইনুল আর জাস্টিনকে নিয়ে আলোচনায় বসলেন পরবর্তী কর্তব্য নির্ধারণ করতে। দীর্ঘক্ষণ তিনজনের আলোচনা শেষে যখন স্থির হল যে একটা ভালো অনাথ আশ্রমেই বাচ্চাটার মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হবে, তখনই পর্দার আড়াল সরিয়ে বেরিয়ে এসে দৃঢ় স্বরে বললেন অন্নপূর্ণা, “ও অনাথ নয়।”

“মানে?” বিস্মিত হলেন রুদ্রশঙ্কর।

“ও বাংলা মায়ের সন্তান।”

“সে তো বুঝলাম। কিন্তু ও কার পরিচয়ে বড়ো হবে?”

“কেন? বাবা-মার পরিচয়ে।”

“কে ওর মা, কেই-বা বাবা সেটাই তো উদ্ধার করতে পারলাম না।” হতাশ গলায় বললেন রুদ্রশঙ্কর।

“ও আমার সন্তান।” খুব ধীরস্থিরভাবে দৃঢ় প্রত্যয়ে বললেন অন্নপূর্ণা।

ঘটনার আকস্মিকতায় রুদ্রশঙ্কর, মইনুল আর জাস্টিন তিনজনেই চুপ। ততক্ষণে শান্তিও বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে অন্নপূর্ণার পাশে। মিতভাষী অন্নপূর্ণা বলে চললেন, “বাংলার রুদ্রশঙ্কর ব্যানার্জী, বিহারের মইনুল হক, ত্রিপুরার জাস্টিন স্টিফেন, আসামের শান্তি মহন্ত আর উড়িষ্যার অন্নপূর্ণাদেবী—সবাই মিলে সত্যিকারের মানুষ গড়ে তুলব ওকে। ওর না থাকবে কোনও ধর্ম, না থাকবে কোনও জাত, না থাকবে কোনও পদবি।”

এদিকে সবার অজান্তে কখন যেন রাত কেটে গিয়ে ভোরের সূচনা হয়ে গেছে। দূরে কোন এক বাড়ির রেডিও থেকে ঠিক তখনই ভেসে এল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মাতৃ-আবাহনী সুর। কী এক মহা আনন্দে যেন খিলখিল করে হেসে উঠল শিশুটি। বাতাসের সদ্য হিমেল হাওয়ার পরশের সঙ্গে শিশুর অকৃত্রিম মনভরানো হাসি, মহালয়ার সুর আর সদ্য ফোঁটা শিউলির গন্ধ মিলেমিশে এক অপার্থিব পরিবেশের সৃষ্টি করল।

সেই ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে’ নামকরণ হয়ে গেলেও প্রথম দিন স্কুলে ভরতি করানোর সময় ফর্ম ফিল-আপ করতে গিয়ে একটু সমস্যায় পড়েছিলেন রুদ্রশঙ্কর। তখনকার দিনে এখনকার মতো অতসব বার্থ সার্টিফিকেটের ঝামেলা ছিল না। অভিভাবক যা লিখে দিতেন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাই শিরোধার্য বলে মেনে নিতেন। ফর্ম ফিল-আপ হয়ে যাবার পর শুধু হেডমাস্টার মশাই ফর্মটা পড়তে পড়তে ‘কাস্ট- হোমিনিনা’ আর ‘রিলিজিয়ন- হিউম্যানিটি’ দেখে অবাক দৃষ্টিতে প্রশ্নসূচক জিজ্ঞাসা নিয়ে একবার তাকান তাঁদের দিকে। কিন্তু তিন-তিনজন পুলিশ অফিসারের সামনে কিছু প্রশ্ন করার সাহস তাঁর হয়নি। স্কুলের শিক্ষকেরা কোনও কালেই তাঁদের ছাত্রদের ধর্ম-জাত নিয়ে উৎসুক ছিলেন না, আর বাচ্চারা কেই-বা কবে সে সম্বন্ধে কিছু জানতে চেয়েছে। তাই ‘মইনুল জাস্টিন রুদ্র’ হইহই করে ভরতি হয়ে গেল স্কুলে আর বন্ধুরাও ‘ম.জা.রু.’-কে নিয়ে মেতে উঠল মজায়।

কিন্তু গোল বাধল অন্য জায়গায়।

মাস খানেক কাটতে না কাটতেই হেডমাস্টারের জরুরি তলব পেয়ে পড়ি কি মরি করে অন্নপূর্ণা আর শান্তি ছুটলেন স্কুলে। মনে ভয়, কী জানি কী হয়েছে। কিন্তু স্কুলে গিয়ে যা শুনলেন তাতে মন আনন্দে নেচে উঠল। হেডমাস্টার মশাই বললেন, “আপনাদের ছেলে অন্য আর দু-চারটে সাধারণ ছেলের মতো নয়। ভালো ছেলে আমরা অনেক দেখেছি, খুব ভালো ছাত্রও আমরা পেয়েছি। কিন্তু ও জিনিয়াস। এখনি টপাটপ উঁচু ক্লাসের সব অঙ্কের ঝটপট সমাধান করে দিচ্ছে। আমরা আপাতত ওকে প্রমোশন দিয়ে দু-ক্লাস উঁচুতে উঠিয়ে দিচ্ছি।”

মজারুর কিছু দস্যিপনা শান্তি বা অন্নপূর্ণার অজানা নয়। অদ্ভুত-অদ্ভুতসব জিনিস বানিয়ে বাড়িতে রীতিমতো হইচই ফেলে দেয় সে। একবার তো কী এক অদ্ভুত উপায়ে অমাবস্যার রাতে চিলেকোঠার ঘরে চামচিকা আর ভূতের ছায়ার যুগ্ম নাচ দেখিয়ে পিলে রীতিমতো চমকিয়ে দিয়েছিল সে। কিন্তু স্কুলে পড়াশুনার ক্ষেত্রেও যে সে তার অসাধারণ গুণপনার পরিচয় দিয়েছে, সেটা জেনেই অনাবিল আনন্দে প্লাবিত হল মায়ের হৃদয়।

এমনি করেই হাসি-মজায় দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল বেশ। গোটা বাংলার মানুষ কিন্তু তখন মোটেই মজায় নেই। গোটা রাজ্য জুড়ে তখনও খাদ্যের হাহাকার চলছে। চাষি ফসলের দাম পায় না, বাজারদর আকাশছোঁয়া, খাদ্যদ্রব্য অগ্নিমূল্য। মজুতদার আর কালোবাজারির দাপটে লোক না খেয়ে মরতে শুরু করেছে। কেরোসিন আর রেশন সুষ্ঠুভাবে বন্টনের দাবিতে সর্বত্র স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন শুরু হয়ে হয়েছে। সে আন্দোলন প্রস্তুতিহীন, বিশৃঙ্খল কিন্তু তেজোদীপ্ত। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, চব্বিশ পরগনায় ছাত্রদের বিক্ষোভে মাঝে-মাঝেই শহর অচল হয়ে পড়ছে। খাদ্যের দাবিতে, কেরোসিনের দাবিতে বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন স্থানে সভাসমিতি, গণ অনশন, বিক্ষোভ, বিডিও অফিস অভিযান যেন নিত্যদিনের ঘটনা। এর মধ্যে মাঝে-মাঝেই ঘটছে সরকারি দফতরে আগুন লাগাবার ঘটনা। কলকাতাতে সেই আন্দোলনের আঁচ ততটা না পড়লেও যেদিন দৈনিক বসুমতীর সম্পাদকীয়তে পড়লেন ‘আনন্দ সত্যই বিদায় নিয়াছে’, একেবারে ভিতর থেকে কেঁপে উঠলেন অন্নপূর্ণাদেবী। ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিচালনায় ছাত্রের নিহত হবার ঘটনা একেবারে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিল তাঁকে। আরও বেশি করে জড়িয়ে ধরতে চাইলেন মজারুকে।

কিন্তু মজারু কি সহজে ধরে রাখার পাত্র! সুযোগ পেলেই সে ফুড়ুৎ করে চলে যায় তার প্রিয় চিলেকোঠার ঘরে। সেখানেই তার যেন প্রাণভোমরা লুকোনো আছে। মাঝে মাঝে তাদের সবারও ডাক পড়ত মজারুর সেই চিলেকোঠার ঘরে, মজার খেলায় যোগ দেবার জন্য। তার বানানো কথা-বলা পুতুল, উড়ন্ত চাকতি এসব দেখে তাক লেগে যায় তাঁদের। ওইটুকুন ছেলের এসব কাণ্ডকারখানায় যারপরনাই বিস্মিত হন তাঁরা। কিন্তু সরস্বতী পূজার দিন অঞ্জলি দেবার পরে ঘুড়ি ওড়ানো দেখতে গিয়ে তাঁদের চোখ একেবারে ছানাবড়া হয়ে গেল। ঘুড়ি আছে কিন্তু সুতোও নেই, লাটাইও নেই; তার বদলে মজারুর হাতে রয়েছে ছোটো রেডিওর মতো একটা যন্ত্র যার গায়ে চার-পাঁচটা সুইচ। একটা সুইচ টিপে ছাদে শোয়ানো একটা চাঁদিয়ালকে ঝপাং করে শূন্যে তুলে দিল, তারপর একবার এই নব ঘোরাচ্ছে আর একবার ওই নব ঘোরাচ্ছে; আর সেই নব ঘোরানোর তালে তালে ঘুড়িটা একবার এদিক গোঁত্তা খাচ্ছে তো একবার ওদিকে, কখনো-বা পাঁই পাঁই করে উপর পানে ছুটে চলেছে যেন এখুনি গিয়ে পেড়ে আনবে আকাশের লুকিয়ে থাকা চাঁদকে, কখনো-বা চরকির মতো বনবন করে ঘুরছে। এসব দেখে তো অন্নপূর্ণা আর শান্তির মাথাই বনবন করে ঘুরতে লাগল। গলা কাটা রাহু ও কেতুর কথা তাঁরা শুনেছেন বটে, কিন্তু সুতো ছাড়া ঘুড়িকে আকাশে উড়তে দেখে তাঁরা বাকরহিত হয়ে পড়লেন। রুদ্রশঙ্কর, মইনুল আর জাস্টিন কিন্তু দিব্যি মজা লুটছিলেন। হাজার হোক পুলিশের লোক কিনা। সবকিছু সইবার অভ্যাস তাঁদের এমনিতেই আছে। তার ওপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুড়ি উড়িয়ে যুদ্ধবিমান ধ্বংসের কথা বা ঘুড়ির মাধম্যে রেডিও সংকেত পাঠাবার কথা বা ঘুড়ির সাহায্যেই আমেরিকার ‘ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস’-এর আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানার কথাও তাঁদের অজানা নয়। তবে এই যে তাঁদের ঘুড়ি কাউকে ‘ভোকাট্টা’ করছে না বা অন্য কেউ তাদের ‘ঘুড়ি লুট’ করতে পারছে না, এটা তাঁদের কাছে বেশ মজার লাগছিল। ঘুড়ি ওড়ানোর শেষে মজারুকে তার এই নতুন মজা দেখাবার জন্য তাঁরা পিঠ চাপড়ে বাহবা দিলেন। তখনই কি কেউ জানতেন কী বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে তাঁদের জন্য আগামীকাল?

পরের দিন তাঁরা সবাই মিলে মজারুর স্কুল মাঠে; সেদিন ইন্টার স্কুল ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল কিনা। এবার মজারুর স্কুল ফাইনালে উঠেছে আর মজারুও আছে সেই টিমে। সে টিমের জবরদস্ত স্পিনার। স্পিন বলের মাঝেই সে হঠাৎ এক-একটা এমন জোরে বল করে যে ব্যাটসম্যান বল দেখতে পায় না। তারপর ফিল্ডিং টিমের নাচানাচি দেখে থতমত খেয়ে পিছন ফিরে দেখে উইকেট আর বেল ছন্নছাড়া হয়ে মাটিতে শুয়ে আছে। মজারুর বন্ধুরা সেই স্পেশাল বলের নাম দিয়েছে ‘ধাঁধালি’, যে বল ব্যাটসম্যানকে ধাঁধায় ফেলে আউট করে।

খেলা শুরু হবার বেশ কিছুটা আগেই সবাই চলে এসেছেন ভালো জায়গায় বসে খেলা দেখবার জন্য। কিন্তু ধীরে ধীরে আকাশ কালো হয়ে আসে, মনে হয় একটু পরেই খুব জোরে বৃষ্টি আসবে। আর বৃষ্টি এলেই চিত্তির। গতবার চ্যাম্পিয়ন থাকার সুবাদে এবারও চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে জেভিয়ার্স স্কুল, শিকে ছিঁড়বে না মজারুদের হিন্দু স্কুলের ভাগ্যে। মনখারাপ করে মুখ শুকনো করে দর্শক আসনে বসে আছেন তাঁরা পাঁচজনে। জোরে হাওয়া বইতে শুরু করেছে, বৃষ্টি এই আসে আসে। হঠাৎ মজারু তিরের মতো ছুটে এসে রুদ্রশঙ্করের হাত ধরে টানতে টানতে তাঁর গাড়ির দিকে নিয়ে যায়; পরক্ষণেই হুশ করে ছেড়ে দেয় গাড়ি। মইনুল আর জাস্টিন নিজেদের মধ্যে কিছু একটা আলোচনা করে নেন। তারপর তাঁরাও শান্তি আর অন্নপূর্ণাকে নিয়ে গাড়ি চেপে দ্রুত বাড়ির দিকে রওনা দেন।

বাড়ি ফিরেই মজারু সোজা ছাদে গিয়ে চিলেকোঠার ঘর থেকে সেই রেডিওর মতো যন্ত্রটা বার করে তার সঙ্গে লিকলিকে দুটো অ্যান্টেনার মতো কিছু লাগিয়ে দেয়। তারপর দ্রুত গতিতে ঘোরাতে থাকে একটার পর একটা নব। কিছুক্ষণ নবগুলো ঘোরাবার পর একটা সবুজ আলো জ্বলে ওঠে সেই যন্ত্রটায় আর রঙ পরিবর্তন করে কালো হয়ে যায় অ্যান্টেনা দুটো। মুখে হাসি ফুটে ওঠে মজারুর।

পিছনে দাড়িয়ে এতক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে ছেলের অদ্ভুত কীর্তিকলাপ দেখছিলেন রুদ্রশঙ্কর আর তাঁর পাশেই একে একে এসে দাঁড়ানো মইনুল, জাস্টিন, শান্তি আর অন্নপূর্ণা। অবাক হয়ে তাঁরা দেখলেন হাওয়া আস্তে আস্তে কমে আসছে, কালো মেঘ দ্রুত সরে গিয়ে সূর্যের আলো ফুটে উঠছে। মজারুর কেরামতি যে আসন্ন বৃষ্টিকে রুখে দিয়ে ক্রিকেট ম্যাচের উপযোগী রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশের সৃষ্টি করেছে তা অনুধাবন করে তাঁরা তখন যারপরনাই বিস্মিত।

মজারু ঝট করে তার যন্ত্রটি চিলেকোঠার ঘরে রেখে দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামতে নামতে বলে, “জলদি চলো, খেলা এখুনি শুরু হবে।”

চমক ভেঙে তাঁরা পাঁচজনও সিঁড়ি ভেঙে তাড়াতাড়ি নামতে থাকেন। কেউই খেয়াল করলেন না যে, একটু দূরে এক বাড়ির ছাদে ঘাপটি মেরে বসে থাকা দুই ছিঁচকে চোরও এই ঘটনাটা পুরো লক্ষ করেছে।

ফল যা হওয়ার তাই হল। যে-দেশে রবি ঠাকুরের ‘নোবেল প্রাইজ’ এত সুরক্ষাতেও চুরি হয়ে যায়, সেখানে অসুরক্ষিত মজারুর খেলার মজার যন্ত্র যে বেহাত হবে সে আর এমন কথা কী। কিন্তু বাঁদরের গলায় যেমন মুক্তোর হার মানায় না, তেমনি মজারুর সেই অদ্ভুত যন্ত্রও চোরদের সহ্য হল না। সেই রাতেই কী এক অদ্ভুতভাবে তারা নিজেরা সমেত তাদের গোটা বাড়িটা একেবারে ভ্যানিশ হয়ে গেল। পরের দিন সকালে আশেপাশের বাড়ির লোক না দেখতে পেল তাদের বাড়ি, না খুঁজে পাওয়া গেল লোক দুটিকে। অবাক হয়ে শুধু লোকজন বাড়ির জায়গায় ফাঁকা মাঠ হয়ে যাওয়া জায়গায় দাড়িয়ে জটলা করতে থাকল। তাদের মধ্যে শুধু একজন প্রকৃতির তাড়নায় সাড়া দিতে বাধ্য হয়ে গতকাল রাতের বেলায় উঠেছিল। আকাশ থেকে নেমে আসা কালো ফানেলের মতো এক লম্বা দানব আলো চমকাতে চমকাতে আর গর্জন করতে এসে বাড়িসুদ্ধু ওই দুজনকে যে নিমেষে তুলে নিয়ে গেল সে তা দেখেছে, কিন্তু কোনও এক অজানা আশঙ্কা বা ভূতের ভয়ে সে আর মুখ খুলল না।

পরের দিন খবরের কাগজের ভিতরের পাতায় ছোট্ট করে বেরিয়েও ছিল খবরটা—‘অদ্ভুত টর্নেডো’। অনেকের চোখ এড়িয়ে গেলেও মজারুর চোখে ঠিকই পড়েছিল খবরটা। সে শুধু মনে মনে বলল, ‘পাহারাদার লাগবে চিলেকোঠায়।’

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

 

Leave a Reply