এই লেখকের আগের গল্প- ম.জা.রু এল বঙ্গে, ঘণ্টা রহস্য, বিভ্রম

এক
কলকাতা বড়ো দ্রুত পালটে যাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী, সংশোধনবাদী, বুর্জোয়া, শ্রেণিশত্রু, খাস জমি বন্টন, বর্গাস্বত্ব—নানা শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক। সময়টা ইংরেজি পরিভাষায় এক ট্র্যানজিশন পিরিয়ড। একদিকে নকশাল আন্দোলন দানা বাঁধছে, কখনও ভেঙে যাচ্ছে। এদিক-সেদিক নকশাল দমনে সি.আর.পি ক্যাম্প। রাতের বেলা পুলিশের গাড়ির শব্দ। কলেজ স্ট্রিট প্রতি দুপুরেই উত্তাল হচ্ছে বোমায়-গুলিতে, কাঁদানে গ্যাসে। একদিকে নড়বড়ে রাষ্ট্রক্ষমতা, অন্যদিকে নকশাল আন্দোলন। বড়ো আগুনে আর অস্থির এই সময়।
এদিকে মইনুল জাস্টিন রুদ্র, সবার প্রিয় মজারুও বড়ো হয়ে উঠছে। না জানি সেও না কখন এইসব সাংঘাতিক কাজেকর্মে লিপ্ত হয়ে যায়—এই ভয় রীতিমতো চেপে ধরেছে অন্নপূর্ণাদেবীকে। চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হয়ে থাকেন তিনি। এইসব নিয়ে যে পরিষ্কার করে একটু আলোচনা করবেন রুদ্রশঙ্করবাবুর সঙ্গে, সে উপায়ও নেই। নাওয়া-খাওয়ারও সময় নেই এখন রুদ্রশঙ্করবাবুর। ফলে নিজের মনের আশঙ্কার কথা কোথাও প্রকাশ করতে না পেরে রীতিমতো আতঙ্কেই থাকেন অন্নপূর্ণাদেবী। চিন্তায় চিন্তায় রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারেন না অন্নপূর্ণাদেবী।
এমন সময় এক গভীর রাতে পাতলা ঘুমের ভিতর বাড়ির ছাদের দিক থেকে কুকুরের প্রচণ্ড হিংস্র গর্জন শুনতে পেলেন অন্নপূর্ণাদেবী। ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসলেন তিনি। বেশ অবাক লাগছিল তাঁর। তাঁদের বাড়িতে তো কোনও কুকুর নেই, তবে এই কুকুরের গর্জন ছাদের দিক থেকে আসছে কীভাবে! দ্রুত ঘরের আলো জ্বেলে দেখলেন, মজারুও ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে বিছানায়। কী এক মজার হালকা হাসি যেন লেগে আছে মজারুর চোখে-মুখে। বেশ বিস্মিত অন্নপূর্ণাদেবী মজারুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ব্যাপার বল তো, ছাদে কুকুর এল কোথা থেকে?”
দুষ্টুমির হাসি হেসে মজারু অন্নপূর্ণাদেবীর হাত ধরে টানতে টানতে ছাদের সিঁড়ির দিকে নিয়ে গেল। শান্তিদেবীও ঘুম থেকে উঠে পড়ে তাদের পিছন পিছন সিঁড়ি দিয়ে ছাদের দিকে চললেন। গর্জন তখন অনেক কমে গেছে, কিন্তু সারা বাড়ি জুড়ে সেই গর্জনের রেশ তখনও রয়ে গেছে। ছাদে উঠে অন্নপূর্ণাদেবী অবাক হয়ে দেখলেন, চিলেকোঠার ঘরের ঠিক সামনেই একটা বিশাল আকারের কুকুর শান্ত হয়ে বসে আছে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন অন্নপূর্ণাদেবী। এত বড়ো একটা কুকুর তাঁদের ছাদে কীভাবে এল, কিছুতেই ভেবে পেলেন না তিনি। বেশ ভয়ই পেয়ে গেলেন তিনি। মজারু ততক্ষণে কুকুরটির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে তার মাথায় হাত বোলাতে লাগল। অন্নপূর্ণাদেবী প্রচণ্ড বিস্মিত হয়ে দেখলেন, সেই বিশাল আকারের কুকুরটা তাঁর চোখের সামনেই ধীরে ধীরে একটা ছোট্ট খেলনা কুকুরে রূপান্তরিত হয়ে গেল। সেই আজব কাণ্ডকারখানা দেখে অন্নপূর্ণাদেবী ছাদের ওপরেই ধপ করে বসে পড়ে শুধু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মজারুর দিকে। শান্তিদেবীও বিস্মিত দৃষ্টি নিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে থেকে ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করতে থাকলেন।
মজারু একগাল হেসে মা আর মাসির দিকে তাকিয়ে বলল, “ম্যাজিক।”
“ম্যাজিক! এ কেমন ম্যাজিক? এত বড়ো বিশাল কুকুর আমাদের ছাদেই-বা এল কী করে আর হঠাৎ করে তার রূপই-বা এমন পালটে গেল কী করে?” বিস্মিত অন্নপূর্ণাদেবী কোনোমতে বললেন। তখনও তাঁর হাত-পা রীতিমতো কাঁপছে।
মজারু বলল, “ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন? এটা নেহাতই একটা খেলনা কুকুর। তবে এর কিছু বিশেষত্ব আছে। সেটা হল এই যে, আমাদের ছাদে যদি মইনুলকাকা, জাস্টিনকাকা, শান্তিমাসি, বাবা, তুমি আর আমি ছাড়া অন্য কেউ আসে তাহলে ও সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে একটা ভীষণ হিংস্র প্রাণীতে পালটে নেবে।”
অন্নপূর্ণাদেবী বললেন, “মানে! কী বলতে চাইছিস তুই? একটা খেলনা কুকুর জীবন্ত হয়ে ওঠে? এও কি সম্ভব!”
মজারু একটু হেসে রহস্য করে বলে, “আমি কি তাই বললাম?”
“তবে কী বলছিস? ভালো করে বুঝিয়ে বল না বাপু!” অধৈর্য হয়ে বলেন অন্নপূর্ণাদেবী।
এবারে মজারু ধীরে ধীরে বলে ওঠে, “চিলেকোঠার ঘরে একটা পাহারাদার লাগবে, এ-কথা তো আগেই বলেছিলাম আমি। এ হল আমার চিলেকোঠার ঘরের সেই বিশ্বস্ত পাহারাদার। এক যান্ত্রিক কুকুর। কেউ ছাদে এলেই ও নিজে-নিজেই সক্রিয় হয়ে ওঠে আর গন্ধ বিচার করে যদি বোঝে যে অচেনা লোক তাহলেই বিশাল হিংস্র কুকুরের রূপ ধারণ করে গর্জন করতে শুরু করে, যে গর্জন তোমরা আজ শুনতে পেয়েছ।”
শান্তিদেবী বলে ওঠেন, “শুধু চিৎকার করে? নাকি কামড়েও দেয়?”
সম্মতিসূচক মাথা হেলিয়ে মজারু বলে, “হুম, তাও দিতে পারে।”
ভয় পেয়ে শিউরে উঠে শান্তিদেবী বলেন, “বাপ রে! তবে তো সাংঘাতিক ব্যাপার!”
“না না, অতটাও সাংঘাতিক ব্যাপার নয়। ওর চেহারা আর গর্জনেই অনাহুত অতিথি নিশ্চয়ই পালিয়ে যাবে। যদি একান্তই কেউ তাতেও ভয় পেয়ে পালিয়ে না যায়, তখন ও আলতো করে দাঁতের ছোঁয়া বসাবে অতিথির পায়ে আর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের ঝটকা লাগবে অতিথির সারা অঙ্গে। এবার আর তার না পালিয়ে উপায় নেই। কী বলো?” বেশ মজা করে বলল মজারু।
এতক্ষণে অন্নপূর্ণাদেবী মোটামুটি ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। বিচিত্রসব আবিষ্কারের যে কীর্তি এইটুকু বয়সেই মজারু করে চলেছে, এটা তার মধ্যে নবতম। নিজের ছেলের জন্য আবার নতুন করে গর্ব অনুভব করলেন অন্নপূর্ণাদেবী। কিন্তু হঠাৎ অন্য একটা চিন্তা এসে গ্রাস করল তাঁকে। এত রাতের বেলায় কোন অনাহুত অতিথি এসেছিল তাঁদের ছাদে? শুধুই কি একটি চোর, নাকি অন্য কিছু?
সময়টা তো বড্ড গোলমেলে।
শুধু জোতদার নয়, সাংবাদিক, ইস্কুল মাস্টার, পুলিশ, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মী কিংবা অন্য যে-কেউ যাকে বিপ্লবের শত্রু বলে মনে করা হচ্ছে, তারই নাম ঢুকে যাচ্ছে খতম তালিকায়। আর রুদ্রশঙ্করবাবু যে ডেপুটি পুলিশ কমিশনার। ভয়ে বুকটা কেঁপে ওঠে অন্নপূর্ণাদেবীর।
দুই
সারারাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারলেন না অন্নপূর্ণাদেবী। নানারকম দুশ্চিন্তা তাঁকে একদম অস্থির করে তুলল। তিনি যে শুধু রুদ্রশঙ্করবাবুকে নিয়ে চিন্তিত তা তো নয়, তাঁর একইরকম চিন্তা হচ্ছে রুদ্রশঙ্করবাবুর দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী মইনুল হক আর জাস্টিন স্টিফেনের জন্য। চিন্তা তো মজারুর জন্যও। কারণ, মজারুর মতোই যারা পড়াশুনায় একেবারে তুখোড়, এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ যাদের সামনে, তারা সে-সব তুচ্ছ করে নেমে পড়েছে সমাজ বদলের স্বপ্ন বুকে নিয়ে। পরিণামে পুলিশের হতে ধরা পড়ে বিনা বিচারে জুটছে অকথ্য অত্যাচার-সহ নির্মম হাজতবাস অথবা একেবারে সরাসরি মর্ত্য ছাড়ার ছাড়পত্র। বিপ্লবের পথ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, প্রশ্ন থাকতে পারে সে-পথের প্রয়োগ নিয়েও, কিন্তু বিপ্লব যারা করছিল তাদের সততা বা আন্তরিকতা নিয়ে অন্নপূর্ণাদেবীর মতো সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনও প্রশ্ন নেই। কিন্তু পড়াশোনা, কাজকর্ম লাটে উঠেছে। স্বস্তিতে রাস্তায় বেরোনো যায় না, কে জানে কখন গুলি-বোমা শুরু হয়ে যাবে। এক কথায় বলতে গেলে, এই অরাজকতায় সাতে-পাঁচে না থাকতে চাওয়া শান্তিপ্রিয় নিরীহ সাধারণ মানুষ একপ্রকার অতিষ্ঠ। এইসব চিন্তা করতে-করতেই সারারাত অন্নপূর্ণাদেবী আর দু-চোখের পাতা এক করতে পারলেন না।
ঠিক ভোরের দিকে বোধ হয় চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল অন্নপূর্ণাদেবীর। জাস্টিনের গলার আওয়াজ পেয়ে ঘুমের চটকা ভেঙে তড়িঘড়ি ঘরের বাইরে বার হয়ে অন্নপূর্ণাদেবী দেখলেন যে মজারু, শান্তিদেবী আর জাস্টিন স্টিফেন চা খেতে খেতে বেশ জমিয়ে গল্প করছে। তাঁকে দেখেই জাস্টিন একগাল হেসে বললেন, “সুপ্রভাত বৌদি! সাতসকালেই চলে এলাম মজারুর হুকুম পালন করতে।”
“সুপ্রভাত, ভাই। এসেছ, ভালো করেছ। কিন্তু মজারুর আবার নতুন কী হুকুম হল?” বললেন অন্নপূর্ণাদেবী।
বারান্দায় রাখা একটা হদ্দ পুরোনো গাড়ির ব্যাটারির দিকে আঙুল দেখিয়ে জাস্টিন বললেন, “ওই যে ব্যাটারি। গাড়ির পুরোনো ব্যাটারি। মজারু আবার নতুন কী এক্সপেরিমেন্ট করবে, তাই আমায় জোগাড় করে আনতে বলেছিল।”
অন্নপূর্ণাদেবী খানিক অবাক হয়েই বললেন, “এ তো বাতিল ব্যাটারি। এ দিয়ে কী হবে?”
জাস্টিন বললেন, “কী হবে সে তো একমাত্র মজারুই জানে। আমাদের কল্পনা যেখানে শেষ, সেখান থেকেই তো মজারুর কাজকর্ম শুরু।” তারপর একটু থেমে আবার বললেন, “কাল রাতে ছাদের পোষ্যকে কেমন দেখলেন?”
অন্নপূর্ণাদেবী চোখে-মুখে ভয়ের ভাব ফুটিয়ে বললেন, “উফ্! আর বলবেন না। মাঝরাতে সে কী সাংঘাতিক কাণ্ড! ভয়ে তো আমার পিলে চমকে গিয়েছিল।”
তাঁর কথা শুনে জাস্টিন মুচকে মুচকে হাসতে থাকলেন। সেই দেখে এবার ছদ্ম রাগে অন্নপূর্ণাদেবী বললেন, “ও, আপনি তো সব জানেন। মইনুল আর আপনি তো মজারুর সব দুষ্টুমির সঙ্গী। যতসব বিদঘুটে জিনিস বানিয়ে আমাকে চমকে দেবে আর আপনারা সবকিছু জেনেও আমাকে কিছু জানাবেন না। কোনদিন ভয়ে না আমার প্রাণটা বেরিয়ে যায়।”
জাস্টিন বললেন, “না না, ওরকম বলবেন না। মজারু আমাদেরকেও সবকিছু বলে না। আমরা শুধু ওর সাহায্যকারী। টুকটাক কোনও কিছু জোগাড় করে দেওয়ার জন্য আমরা আছি। আমরা ওর বিশ্বস্ত হেল্পার, তার বেশি কিছু নয়। কী মজারু, তাই তো?”
এবার মজারু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জাস্টিনের হাত ধরে টানতে টানতে বলে, “অনেক গল্প হয়েছে। এবার চলো তো, ব্যাটারিটা চিলেকোঠায় তুলে দাও।”
জাস্টিনও চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে বলেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, চলো।” তারপর ব্যাটারিটা দুই হাতে তুলতে তুলতে মজারুকে জিজ্ঞাসা করেন, “তারপর আজ কি এই ব্যাটারি নিয়েই এক্সপেরিমেন্ট চলবে? নাকি ক্রিকেট ম্যাচ আছে?”
“না, আজ অনিমেষদার সঙ্গে একটু দরকার আছে।” কী যেন ভাবতে ভাবতে উত্তর দিল মজারু।
পাশের বাড়ির ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র, প্রেসিডেন্সি কলেজের জুয়েল অনিমেষ—অনিমেষ মিত্র। এই ক’দিন আগেও অন্নপূর্ণাদেবীর খুবই ন্যাওটা ছিল সে, অন্নপূর্ণাদেবীও খুবই স্নেহ করেন তাকে। কিন্তু গত বছর কলেজে ভরতি হওয়ার পর থেকেই ছেলেটা যেন ধীরে ধীরে কেমন পালটে যাচ্ছে। কে জানে কী এক অজানা আশঙ্কায় বুকটা একটু কেঁপে উঠল অন্নপূর্ণাদেবীর।
তিন
বেশ কিছুক্ষণ অনিমেষের বাড়িতে বসে আছে মজারু। অনিমেষকে ভীষণ ভালোবাসে সে। সেই একদম ছোটবেলা থেকে অনিমেষও মজারুকে নিজের ভাইয়ের মতো স্নেহ করে। কিন্তু ইদানীং মজারু লক্ষ করেছে যে, অনিমেষ কেমন যেন তাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছে। তাই মজারুর মনটা একটুও ভালো নেই। সেই কারণে সে আজ অনিমেষের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলে জানতে চায় যে, অনিমেষ কেন এমন করছে তার সঙ্গে। এছাড়া শহরের রাস্তার এক দেওয়ালে হঠাৎ রক্তে রাঙানো ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’ স্লোগান দেখে তার মনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন মাথা চাড়া দিয়েছে—‘রাজতন্ত্রে রাজার সেনার চাবুক বা কামান ছিল রাজার হাতিয়ার, বর্তমান গণতন্ত্রেও তো পুলিশ-প্রশাসনকে নিজের স্বার্থে কুক্ষিগত করে রেখেই ক্ষমতার অপব্যবহার করছে নেতা-মন্ত্রীরা; বন্দুকের নল দিয়েই যদি ক্ষমতা দখল হয়, তবে তো সেই একই ব্যাপার হল। শ্রমিক-কৃষকের শ্রম আর লাঙ্গল প্রাধান্য পেল কই?’ মজারুর মনে হয়েছে, একমাত্র অনিমেষদার সঙ্গেই এই ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
কিন্তু অনিমেষের জন্য বেশ কিছুক্ষণ বসে থেকেও অনিমেষের দেখা না পেয়ে ব্যর্থ-মনোরথ হয়ে মজারু তাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এদিক ওদিক ঘুরতে থাকল। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকল মজারু। ঠিক তখনই তার পাশ দিয়েই কলেজ ছাত্রদের একটা মিছিল স্লোগান তুলে চলে গেল। ভীষণ অবাক হয়ে মজারু দেখল, সেই মিছিলে একেবারে সামনের সারি থেকে স্লোগান দিচ্ছে অনিমেষদা। কলকাতা শহরে মিছিলের তো খামতি নেই। আর মিছিল দেখলেই মজারুর অবচেতনে অন্য এক মিছিলের ছায়া পড়ে, যে মিছিলে হাজার হাজার নারী-পুরুষের সঙ্গে যেন সেও হেঁটে চলেছে। অথচ কোনও মিছিলে কখনোই মজারু হাঁটেনি, মিছিলে হাঁটার মতো বয়সই তার হয়নি। তবু মনের মধ্যে কেন যে এই মিছিলের ছবি ভেসে ওঠে, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না সে। অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে মজারু। কখন যে মিছিলটা তার সামনে দিয়ে এগিয়ে গেছে, খেয়ালই করে না সে। হঠাৎ ভীষণ জোরে গোটা তিনেক বোমের আওয়াজে চমকে ওঠে মজারু। পরক্ষণেই দুদ্দাড় করে সবাইকে ছুটতে দেখে মজারুও ছুটতে শুরু করল। কিন্তু ছুটতে ছুটতে তার চোখ দুটো ভীষণ জ্বালা করে উঠল আর দু-চোখ বেয়ে অঝোরে জল ঝরতে থাকল। আশেপাশের লোকেদের দিকে তাকিয়ে দেখল, তাদেরও একই অবস্থা। হুড়মুড় করে ছুটতে ছুটতে মজারুর কানে এল—‘পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ছে।’
চোখ-মুখ লাল করে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফিরতেই তাকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে অন্নপূর্ণাদেবী বললেন, “কী হয়েছে রে? তোর চোখ-মুখের এমন হাল কেন?”
মজারু বলল, “মা, জানো তো আজ মিছিলে অনিমেষদাকে দেখলাম।”
এক লহমায় মুখটা শুকিয়ে গেল অন্নপূর্ণাদেবীর। দুরুদুরু বুকে জিজ্ঞাসু চোখে মজারুর দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
“তারপর বোমার আওয়াজ। হুড়মুড় করে ছুটতে শুরু করল সবাই। আমিও ছুটলাম। তবে চোখ দুটো একটু জ্বালা করছে এখনও।” এক নিশ্বাসে বলল মজারু।
অন্নপূর্ণাদেবী তাঁর শাড়ির আঁচল জলে ভিজিয়ে এনে পরম মমতায় বুলিয়ে দিতে থাকলেন মজারুর চোখে-মুখে। অপেক্ষায় থাকলেন মজারুর কাছ থেকে আরও কিছু শোনার জন্য।
কিছুক্ষণ পর মজারু ধীরে ধীরে বলল, “জানো মা, আজও মিছিলটা যখন সামনে থেকে যাচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল আমিও যেন মিছিলে আছি। একটা আবছা ছায়া আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।”
শিউরে উঠলেন অন্নপূর্ণাদেবী। মিছিল দেখলেই মজারুর চোখের সামনে যে অন্য এক মিছিলের ছবি ভেসে ওঠে সে-কথা তাঁর অজানা নয়। অনেকবারই এ-কথা শুনেছেন মজারুর কাছে। স্বামীর সঙ্গে আলোচনাও করেছেন এই ব্যাপারে। রুদ্রশঙ্করবাবু আর অন্নপূর্ণাদেবী—দুজনেই বড়ো চিন্তিত এই ব্যাপারে। অনেক আলোচনার পর তাঁরা স্থির করেছেন, সবকথাই খুলে বলবেন মজারুর কাছে। কিন্তু এও কি সম্ভব যে মাত্র ছয় মাসের শিশুর স্মৃতিতে তার শিশুবেলার ঘটনা চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে যাবে!
চার
সপ্তাহ খানেক পর এক সন্ধ্যাবেলা রুদ্রশঙ্করবাবু আর অন্নপূর্ণাদেবী নিজেদের মধ্যে আর এক দফা আলোচনায় বসলেন। এই এক সপ্তাহে তাঁদের ওপর দিয়ে সাংঘাতিক ঝড় বয়ে গেছে। পরপর দুটো ঘটনা তাঁদের একেবারে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথমটি হল, তাঁদের পাশের বাড়ির অনিমেষ, যে ছোটো থেকেই অন্নপূর্ণাদেবীর খুব ন্যাওটা ছিল, হঠাৎ করেই বেপাত্তা। কেউ কেউ বলছে যে, সে নাকি নকশাল; নকশাল আন্দোলনের জন্য কোন সুদূর গ্রামে আত্মগোপন করেছে। আবার কেউ কেউ বলছে, পুলিশ তাকে এনকাউন্টারে মেরে দিয়েছে। মোট কথা, এক সপ্তাহ ধরে অনিমেষের কোনও খোঁজ নেই। অনিমেষের মা একদম ভেঙে পড়েছেন। সঙ্গে চিন্তায় মাথাখারাপ হয়ে যাচ্ছে অন্নপূর্ণাদেবীর। অনিমেষ যে বড়ো প্রিয় ছিল মজারুর। অনেক সময়ই কারণে-অকারণে মজারু ছুটে যেত অনিমেষের কাছে আর অনিমেষও ছোটো ভাইয়ের মতো ভালোবাসত তাকে। তাই ক’দিন ধরে মজারুর মুখ থেকে সব হাসি যেন উড়ে গেছে। অমন হাসিখুশি মজারু একদম চুপচাপ হয়ে গেছে।
আর দ্বিতীয় সাংঘাতিক ঘটনাটা ঘটেছে গতকাল। নকশালদের ছোড়া বোমার আঘাতে মারাত্মক জখম হয়ে হসপিটালে ভরতি হয়েছেন জাস্টিন স্টিফেন, কলকাতা পুলিসের ডেপুটি কমিশনার রুদ্রশঙ্করবাবুর দীর্ঘদিনের সঙ্গী। জাস্টিনের একটা হাত উড়ে গেছে বোমার আঘাতে। জাস্টিন বড়ো বেশি কাছের তাঁদের সকলের। বিশেষ করে মজারু ভীষণ ভালোবাসে জাস্টিনকে। জাস্টিনও ভীষণ ভালোবাসেন মজারুকে। একদম বন্ধুর মতন মেশেন তার সঙ্গে। মজারুর নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্টের একজন যথার্থ সমঝদার জাস্টিন কারণ, তিনি নিজেও একজন বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। সেই জাস্টিনের এমন একটা সাংঘাতিক দুর্ঘটনার খবর শুনে আরও মুষড়ে পড়েছে মজারু।
অন্নপূর্ণাদেবী একদম মুখটা শুকনো করে আছেন দেখে রুদ্রশঙ্করবাবু বললেন, “আর দেরি করা ঠিক হবে না, এখনই মজারুকে তার জীবন বৃত্তান্ত সব পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলতে হবে।”
“সবটা জনার পর ও আমাকে মা বলে ডাকবে তো?” চোখের কোণে জল টলটল করে ওঠে অন্নপূর্ণাদেবীর।
চিন্তা যে একেবারেই হচ্ছিল না রুদ্রশঙ্করবাবুর এমন নয়, কিন্তু সত্যের পথের পথিক তিনি জ্ঞানত কোনও অন্যায় কখনও করেননি। মজারু যে নিজেদের সন্তান নয়, এ-কথাও কখনও মনে করেননি। সম্পূর্ণ আদর-যত্নে বড়ো করেছেন তাকে। তাই মজারু যে সত্য ঘটনা জানার পর ওঁদের থেকে দূরে সরে যাবে, এমন কথা তিনি মনে করেন না। তবে অন্নপূর্ণাদেবীর কথা একটু আলাদা। মায়ের মন তো, সন্তান দূরে সরে যাবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাই তাঁকে উতলা করে দেবে, এটাই স্বাভাবিক।
মন শক্ত করে দুজনে উপস্থিত হন মজারুর কাছে। ধীরে ধীরে রুদ্রশঙ্করবাবু আর অন্নপূর্ণাদেবী মজারুকে পাওয়ার সেই সাংঘাতিক দিনের কথা আর তার ছোটবেলার কথা বলে চলেন। সবকথা শোনার পরেও মজারু কোনও কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকে। মজারুকে এমন নিশ্চুপ আর নিরুত্তর দেখে রুদ্রশঙ্করবাবু নিজেকে মোটামুটি শান্ত রাখলেও, অন্নপূর্ণাদেবী কিছুতেই তাঁর কান্না চেপে রাখতে পারলেন না।
বেশ কিছুক্ষণ পর যখন রুদ্রশঙ্করবাবু আর অন্নপূর্ণাদেবী চিলেকোঠার ঘর থেকে নেমে এলেন, মজারু তখনও তার প্রিয় চিলেকোঠার ঘরে কী এক বিদঘুটে যন্ত্রের সামনে স্থির হয়ে বসে আছে।
পাঁচ
অন্নপূর্ণাদেবী আর রুদ্রশঙ্করবাবু বেশ কিছুক্ষণ আগে চিলেকোঠার ঘর থেকে নীচে নেমে এসেছেন। বাইরের বারান্দায় চায়ের টেবিলের সামনে তাঁরা বসে আছেন। ইতিমধ্যে জাস্টিনের মৃত্যুসংবাদ নিয়ে তাঁদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন মইনুল হক। তাঁরা তিনজন চুপচাপ বসে রয়েছেন মাথা নীচু করে। মনের মধ্যে দিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে তাঁদের। সামনে রাখা চা টেবিলেই পড়ে পড়ে ঠান্ডা হচ্ছে। এদিকে পুরো কলকাতা জুড়েই লোডশেডিং চলছে। সেই আঁধার যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে তাঁদের তিনজনকেই। জাস্টিনের মৃত্যুসংবাদ তাঁদের একেবারে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের সহকর্মী জাস্টিন চলে যাওয়ায় একেবারেই ভেঙে পড়েছেন মইনুল।
রুদ্রশঙ্করবাবু নিজের মনে বলে উঠলেন, “কে মারছে? কাকে মারছে? জাস্টিনও এক গরিব পরিবারের ছেলে। শুধুমাত্র পুলিশে চাকরি করে বলে ও শ্রেণিশত্রু হয়ে গেল!”
একদিকে ভাইয়ের মতো জাস্টিনের বেদনাদায়ক মৃত্যু, অন্যদিকে সন্তানসম অনিমেষের কোনও খবর না পাওয়া আর তার ওপর আজ মজারুকে তার শিশুবেলার ঘটনাবলি বলে আসা—নিজেকে যেন কিছুতেই স্থির রাখতে পারছেন না অন্নপূর্ণাদেবী। চারদিকের অন্ধকার যেন হাঁ করে গিলে খেতে আসছে তাঁকে। ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। প্রকৃতিও বোধ হয় ওঁদের দুঃখে শরিক হয়ে উঠে ভীষণ জোরে বজ্রপাতসহ তুমুল বেগে বৃষ্টি শুরু করল।
***
চিলেকোঠার অন্ধকার ঘরে বসে মজারু। কখন হ্যারিকেনটা নিভে গেছে, সে খেয়ালও নেই। অনিমেষদাকে খুঁজে না পাওয়ার কথা আর জাস্টিনের মর্মান্তিক মৃত্যুসংবাদ তার কানেও এসে পৌঁছেছে। অন্নপূর্ণাদেবী আর রুদ্রশঙ্করবাবুর কাছ থেকে সদ্য শোনা তার শিশুবেলার কথা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে তার। খাদ্য আন্দোলনের মিছিলে তার জন্মদাতা মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েও সে যে আজ এত সুন্দর একটা জীবনযাপন করতে পারছে, এ-কথা ভেবে ভগবানকে ধন্যবাদ দিল সে। হারিয়ে যাওয়া মা-বাবার কথা ভেবে তার মনখারাপও হল। তারপর মনে পড়ল অনিমেষদার কথা আর জাস্টিনকাকুর কথা। মজারুর মনে হল, সে অনেক ভাগ্যবান। মা-বাবাকে হারিয়েও সে মা-বাবা পেয়েছে, নতুন জীবন পেয়েছে। আর সব থেকেও জাস্টিনকাকু আর অনিমেষদা অন্ধকারে হারিয়ে গেল। মনে মনে আর একবার ধন্যবাদ দিল সে ভগবানকে। প্রচণ্ড বৃষ্টির সঙ্গে আবার একটা জোরদার বাজ পড়ার আওয়াজ হবার ঠিক এক মুহূর্ত আগে প্রচণ্ড আলোর ঝলকানি ছুঁয়ে দিয়ে গেল চিলেকোঠার ঘরখানা।
মজারুর মনে হল, তার আশেপাশের আঁধার ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। নিভে যাওয়া হ্যারিকেনটা আবার জ্বালিয়ে সে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল তার নতুন আবিষ্কৃত সুপার-ডুপার ক্যাপাসিটারটার দিকে। হ্যারিকেনের কালির ভুষো আর বিশেষ ধরনের সিরামিক মিশিয়ে সে এই সুপার ক্যাপাসিরারটা বানিয়েছে। পরম মমতায় সেটার গায়ে আদরের হাত বোলাতে বোলাতে দুই প্রান্ত সংযোগ স্থাপন করল দু-দিক থেকে আসা দুটো তারের সঙ্গে। একটা তার সোজা নেমে এসেছে চিলেকোঠার ছাদের ওপর থেকে; সেখানে ছাদের ওপর একটা ত্রিশূলের মতো দেখতে জিনিসের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে তারের এক প্রান্ত। আর একটি তার ঘরের কোণে রাখা জাস্টিনের নিয়ে আসা সেই ব্যাটারির সঙ্গে জুড়ে আছে। তারের যোগাযোগ সম্পূর্ণ করে হ্যারিকেনটা নিভিয়ে দিয়ে চুপ করে বসে থাকল মজারু।
ছয়
বারান্দায় বসে থাকা রুদ্রশঙ্করবাবুরা বৃষ্টির প্রচণ্ড ছাঁট আসায় তখন ঘরের মধ্যে চলে এসেছেন। জাস্টিনের নির্মম পরিণতিতে তাঁদের মন এমনিতেই ভারাক্রান্ত। তার ওপর মজারু তার শিশুবেলার ঘটনা সবটা জানার পর মজারুর মনের কী অবস্থা হয়েছে সেটাও তাঁদের অজানা। অন্নপূর্ণাদেবী তো কিছুতেই তাঁর কান্না থামাতে পারছেন না। একদিকে জাস্টিনের মৃত্যুসংবাদ, অন্যদিকে সন্তানসম অনিমেষের কোনও খবর না পাওয়া ভিতরে ভিতরে একেবারে ভেঙে দিয়েছে তাঁকে। ছোটবেলার সব ঘটনা জানার পর মজারুর প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা ভেবেও তিনি অস্থির হয়ে যাচ্ছেন। এমন সময় তীব্র শব্দে একটা বাজ পড়ার আওয়াজে চমকে উঠলেন সবাই। ঠিক তার পরেই ঘরের সব আলো জ্বলে উঠল। মইনুল বাইরের দিকে তাকিয়ে খুবই অবাক হয়ে গেলেন। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত চলছে আর চারদিকটাই পুরো অন্ধকার। আলো জ্বলছে শুধুমাত্র এই বাড়িতেই, অন্য কোনও বাড়িতেই ইলেকট্রিক আলোর কোনও চিহ্নই নেই। প্রচণ্ড বিস্ময়ে তিনি একবার রুদ্রশঙ্করবাবু, আর একবার অন্নপূর্ণাদেবীর দিকে, আর একবার ঘরের বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাতে থাকলেন।
রুদ্রশঙ্করবাবু মইনুলের মুখ-চোখের হতভম্ব ভাব দেখে কিছু একটা গণ্ডগোলের আঁচ পেয়ে ঘরের বাইরে একবার উঁকি মেরেই অন্নপূর্ণাদেবীর উদ্দেশে বললেন, “শিগগির চিলেকোঠার ঘরে চলো।”
সঙ্গে সঙ্গে রুদ্রশঙ্করবাবু, অন্নপূর্ণাদেবী আর মইনুল দুদ্দাড় করে সিঁড়ি ভেঙে চিলেকোঠার ঘরের দিকে দৌড়লেন।
মজারু তখন নিবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে রয়েছে একটা বিদঘুটে যন্ত্রের দিকে আর এক অদ্ভুত সাফল্যের হাসি লেগে রয়েছে তার সারা মুখে। রুদ্রশশঙ্করবাবু আস্তে করে নিজের একটা হাত রাখলেন মজারুর মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে মজারু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তিনজনের দিকেই একবার দেখে নিয়ে বলল, “আমাদের বাড়িতে আর আলো নিভবে না।”
জিজ্ঞাসু চোখে তিনজনেই তাকিয়ে রইলেন মজারুর দিকে। অন্নপূর্ণাদেবী কাঁপা কাঁপা গলায় শুধু বললেন, “দেখ বাবা, তুই তো জানিস আমি একটু কম বুঝি। তুই সবকিছু একটু পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বল আমায়।”
মিষ্টি হেসে মজারু অন্নপূর্ণাদেবীর হাত ধরে বলল, “আমি সবটা তোমায় বুঝিয়ে বলছি মা।”
মজারুর মুখে হাসি দেখে আর মা ডাক শুনে অন্নপূর্ণাদেবীর বুকের ওপর থেকে যেন পাষাণভার নেমে গেল।
মজারু অন্নপূর্ণাদেবীর হাত ধরে চিলেকোঠার ঘর থেকে বার হয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে খোলা ছাদের ওপর নিয়ে এসে টর্চের আলো ফেলল চিলেকোঠার ছাদের দিকে। অন্নপূর্ণাদেবী, রুদ্রশঙ্করবাবু আর মইনুল হক—তিনজনেই অবাক হয়ে দেখলেন, একটা বেশ লম্বা ত্রিশূলের মতো জিনিস চিলেকোঠার ছাদে লাগানো। টর্চের জোরালো আলোয় ভালোভাবে দেখে বুঝতে পারলেন যে, দেখতে ত্রিশূলের মতো হলেও বস্তুটি ঠিক তিনটি শূলবিশিষ্ট নয়, বরং বেশ কয়েকটি স্পাইক আছে দণ্ডটির অগ্রভাগে।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে রুদ্রশঙ্করবাবু বললেন, “এটা কী?”
মজারু বলল, “ওই ত্রিশূলের মতো দণ্ডটা হল রিসিভার বা গ্রাহক। ওটা বজ্রপাতকে গ্রহণ করে,” তারপর টর্চের আলো ছাদের ওপর রাখা একটা লম্বামতো বস্তুর ওপর ফেলে বলে চলল, “আর এটা হল সুপার-ডুপার ক্যাপাসিটার। বজ্রপাত হলেই ওই ত্রিশূলের মাধ্যমে এই ক্যাপাসিটারটাকে চার্জ করবে।”
রুদ্রশঙ্করবাবু, অন্নপূর্ণাদেবী আর মইনুল হক—তিনজনেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে মজারুর কথা শুনে চলেছেন। মজারু তার মায়ের হাত ধরে এবার চিলেকোঠার ঘরের মধ্যে ঢুকে ঘরের এককোণে রাখা সেই পুরোনো গাড়ির ব্যাটারির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে, “ওই ক্যাপাসিটার ডিসচার্জিংটাকে ব্যবহার করে ওই ব্যাটারিটা চার্জ হবে। আর ব্যাটারি চার্জ হলেই কৃত্রিম বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়ে আলো জ্বলবে।”
অন্নপূর্ণাদেবী তো মজারুর কথার বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারলেন না। রুদ্রশঙ্করবাবুও যে খুব একটা বুঝতে পারলেন তা নয়, তবে এটা বুঝতে পারলেন যে মজারু আকাশের বিদ্যুতকে আপন করে নিয়ে ঘরের আলোয় পরিণত করেছে।
মইনুল এগিয়ে গিয়ে মজারুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “গাড়ির পুরোনো ব্যাটারি যে জাস্টিন জোগাড় করে দিয়েছিল সে তো জানি, কিন্তু সেটার সাহায্য নিয়ে তুই যে বিজ্ঞানের এমন আবিষ্কার করবি, সে তো আমরা ভাবতেও পারিনি।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মজারু বলে উঠল, “জাস্টিনকাকুর এনে দেওয়া ব্যাটারি আর অনিমেষদার এনে দেওয়া ত্রিশূলের সাহায্যেই এটা সম্ভব হয়েছে। আজ ওরা দুজনেই নেই, কিন্তু আমার ‘প্রথম আলো’ জ্বলেছে।”
দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল মজারুর দু-চোখ বেয়ে।
অন্নপূর্ণাদেবী, রুদ্রশঙ্করবাবু আর মইনুলের চোখ দিয়েও আনন্দাশ্রু গড়িয়ে এল।
রুদ্রশঙ্করবাবু সেই বিদঘুটে যন্ত্রটির দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, “আর ওটা? ওটা কী?”
মজারু বলল, “ওটা রেকর্ডিং ডিভাইস। কিন্তু ওটার কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।”
অন্নপূর্ণাদেবী এগিয়ে গিয়ে দুই হাতে মজারুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “জাস্টিন আর অনিমেষ—ওরা দুজনেই আছে, সবসময় থাকবে। তোর মধ্যে দিয়ে, তোর কাজের মধ্যে দিয়ে, তোর দেখানো আলোর মধ্যে দিয়ে।”
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস