পিয়ালি গাঙ্গুলীর আগের লেখা– ফোচনের কীর্তি , ফোচনের আরেক কীর্তি মিঠে প্রতিশোধ , বেলুন দাদু , দুটি অণুগল্প , নতুন বছর , বাঘমামার বিয়ে, মাম্বোর শুঁড় , জঙ্গলের নতুন নিয়ম , টুংটাং, লেজ নিয়ে, জুনিয়র পাণ্ডব গোয়েন্দা,তিতাসের নৈশ অভিযান , মায়ের যখন রাগ হয়

ঋজুটা এমন একটা শট মারল যে বলটা উড়ে গিয়ে কোথায় পড়ল কে জানে। টিনটিন আর জয়ী ছুটল বল কুড়োতে। এই নতুন পার্কটা হওয়াতে তবু ওদের একটা খেলার জায়গা জুটেছে। শহরের মাঝে এত বড়ো একটা জায়গা এতদিন খালি পড়ে ছিল, কেউ কোনোদিন খেয়ালই করেনি। গাছপালা, জগিং ট্র্যাক, খেলার মাঠ, দোলনা সব আছে এই পার্কে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল গাছপালায় ঘেরা বড়ো লেকটা। পরিষ্কার স্বচ্ছ জলে রকমারি মাছেদের প্রায়ই তিড়িংবিড়িং করতে দেখা যায়। শুধু মাছ নয়, একদল রাজহাঁসও আছে। লেকের পাড়েই ওদের জন্য একটি ঘর করে দেওয়া হয়েছে। জলের কাজ মিটে গেলে তার দল বেঁধে লাইন করে গটগট করে হেঁটে সেই বাড়িতে ঢুকে বিশ্রাম নেয়। বাপ রে, কী ডিসিপ্লিন তাদের! একদম সোজা লাইন করে হাঁটে, কেউ এতটুকু লাইন ছেড়ে বেরোয় না। তেমনি তাদের পার্সোনালিটি। একেবারে মাথা উঁচু করে হাঁটে, কাউকে বিশেষ পাত্তা দেয় না।
বলটা যেদিকে উড়েছিল সেইদিকে লক্ষ করে এগোতে গিয়ে জয়ীর হঠাৎ চোখে পড়ল একটা বড়ো গাছের ডালে একটা বাসা। সেখানে দুটো পেঁচার মাঝখানে দুটো ছোট্ট বেড়ালছানা। দেখেই জয়ী চিৎকার করে উঠল, “এই রে, নির্ঘাত ছানা দুটোকে খাবে বলে ধরে এনেছে। ওদের বাঁচাতে হবে।”
ততক্ষণে ঋজুও হাঁপাতে হাঁপাতে চলে এসেছে ওদের পেছনে। টিনটিন বলল, “চল মায়েদের ডেকে আনি। কিছু একটা করতে হবে।”
ওদের মায়েরা তখন হাত-পা ছড়িয়ে বেশ একটু গল্প করছিলেন। দেখাই তো হয় না আজকাল। তবু এই পার্কটা হওয়াতে বাচ্চাগুলো একটু খেলতে পারে আর ওদের নিয়ে এসে মায়েরাও শান্তিতে দু-দণ্ড কাটাতে পারেন। আচমকা তিনটেতে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল, “শিগগিরি চলো, পেঁচাগুলো ওদের খেয়ে ফেলবে।”
মায়েরা তো প্রথমে আকাশ থেকে পড়লেন। তারপর সব ঘটনা শুনে ওঁরাও ছুটে গেলেন গাছটার কাছে। টিনটিনের মা বললেন, “পার্কের কর্মচারীদের খবর দেওয়া উচিত।”
এই ভেবে ওঁরা তাড়াতাড়ি পার্ক অফিসে গিয়ে ঘটনাটা জানালেন।
একটা সিঁড়ি লাগানো হল গাছের গায়ে। এই সিঁড়ি বেয়ে একটা ছেলে তরতর করে উঠে গেল ওপরে। কিন্তু ওপরে গিয়ে তার এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা হল। ও দুটো পেঁচা নয়, পেঁচার বাচ্চা। আর ওদের হাবভাব দেখে একটুও মনে হল না যে ওরা বেড়ালছানাগুলোকে খাবে বলে ধরেছে। বরং দেখে মনে হচ্ছে বেড়ালছানাগুলো ওদের সান্নিধ্য চাইছে। ছানাগুলো একেবারেই ছোটো, এক হাতের মুঠোয় ধরা যায়। কিন্তু এদের মা কোথায়? আর পেঁচাগুলোর মাই-বা কোথায়? গাছের কোটরে উঁকি মেরে পেঁচা-মাকে খুঁজে পাওয়া গেল না, সে হয়তো ছানাদের বাসায় রেখে খাবার খুঁজতে গেছে। কিন্তু বেড়ালছানাদের মা গেল কোথায়? আর ছানাগুলো গাছে চড়লই-বা কী করে, তাও এক রহস্য।
পেঁচা-মা নেই দেখে সাহস করে ছেলেটা কোটরের ভেতরে হাত ঢোকাল। হাত ঢোকাতেই কিছু শুকনো ডালপালা আর পাতার মধ্যে হাতে কী যেন একটা নরম নরম ঠেকল। তাড়াতাড়ি পাতাগুলো সরাতেই দেখা গেল আরও দুটো বেড়ালছানা। এক এক করে চারটে ছানাকে একটা বাস্কেটের মধ্যে রাখা হল। সবক’টাই বেঁচে আছে। এদিকে নীচে টিনটিন, ঋজু আর জয়ী অধৈর্য হয়ে যাচ্ছে। ওপরে কী হচ্ছে ওরা ঠিক বুঝতে পারছে না। ওদের দেখাদেখি আরও কিছু মা আর বাচ্চাও ততক্ষণে এসে জড়ো হয়েছে। সবাই অধীর আগ্রহে রেসকিউ অপারেশন দেখছে। চারটে বাচ্চা পেয়ে ছেলেটার মনে হল ভেতরে হয়তো আরও থাকতে পারে। এই ভেবে সে সিঁড়ি থেকে প্রায় শুয়ে পড়ে নিজের হাতটা যতদূর সম্ভব ঢুকিয়ে দিয়েছে গর্তের মধ্যে।
এ তো সেই স্কুলের ম্যাজিক শোতে দেখানো ম্যাজিকের মতো। এক এক করে মোট এগারোটা বাচ্চা উদ্ধার হল গাছের কোটর থেকে। বাস্কেট ভরে গেছে। ওদের নিয়ে নীচে নামতেই বাচ্চারা সবাই ঘিরে ধরল ছেলেটাকে। সবাই একটু ছুঁতে চায়, আদর করতে চায় বেড়ালছানাগুলোকে। দেখে টিনটিন আর ঋজু একেবারে মিলিটারি মেজাজ নিয়ে রুখে দাঁড়াল, “একদম নয়। দেখছ না ওরা বেবি! ওদের ইনফেকশন হয়ে যাবে।”
জয়ীর মা ডাক্তার। জয়ী মাকে বলল, “ও মা, একটু দেখো না ওরা ঠিক আছে কি না।”
জয়ীর মা হেসে বললেন, “ওরে আমি কি ভেট? আমি কি ওদের ব্যাপারে অত বুঝি? অ্যাক্টিভ আছে যখন, মনে তো হয় সুস্থই আছে। কিন্তু ওদের মাকে খুঁজে বার করা দরকার। মা ছাড়া ওদের খাওয়াবে কে?”
সিঁড়ি ধরে ছিল অন্য যে ছেলেটি, সে বলল, “আমরা বরং চারপাশটা একটু খুঁজে দেখি।” এই বলে সে গাছের আশেপাশে খুঁজতে গেল। তার পেছন পেছন চলল বাচ্চাবাহিনী। অনেকে বেশ হল্লা করছিল। টিনটিন তাদের এক ধমক দিয়ে বলল, “কিপ কোয়ায়েট! তোমাদের কি কোনও সেন্স নেই?”
টিনটিনের দাবড়ানিতে বেশ কাজ হল। সবাই চুপ করে গাছপালা, ঘাসপাতার পেছনে খুঁজছে, এমন সময় যেন খুব হালকা একটা মিউ মিউ শোনা গেল। খানাতল্লাশি করে এদিক ওদিক থেকে আরও পাঁচটা ছানা উদ্ধার হল। সবমিলিয়ে ষোলোটা বেড়ালছানা। কিন্তু মা কোথায়? খোঁজ খোঁজ খোঁজ। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে একটা ইয়া বড়ো ক্যাঙারু শেপের ডাস্টবিনের পেছনে ছায়ায় তাকে পাওয়া গেল। বাস্কেট থেকে একটা ছানাকে নিয়ে মায়ের কাছে এগিয়ে দিতেই বাচ্চাকে আদর করার বদলে মা খ্যাঁক করে উঠল। আরও দুই-তিনবার চেষ্টা করেও সেই এক ফল হল।
ঋজু, জয়ী, টিনটিনের চোখে তখন জল এসে গেছে, “ওদের মা তো ওদের রিফিউজ করছে, এবার তাহলে ওদের কী হবে?”
ওদের মায়েরা খানিকটা ভরসা দিয়ে বললেন, “দাঁড়া না, দেখ না কী হয়। মা ঠিক ওদের কাছে টেনে নেবে।”
মায়ের মুড ভালো করার জন্য একটা ফিশ-ফ্রাই এনে তার মুখের কাছে ধরা হল। প্রথমে সে খ্যাঁক করে উঠলেও, দ্বিতীয়বার ফিশ-ফ্রাইয়ের গন্ধে লোভটা বোধ হয় আর সামলাতে পারেনি। লাফিয়ে উঠে এসে এক কামড় বসাল ফিশ-ফ্রাইটাতে। ফিশ-ফ্রাইটা ভালো লেগেছে বোঝা গেল কারণ, চোখের নিমেষে সেটা শেষ হয়ে গেল। ফ্রাই খেয়ে বোধ হয় মাথাটা একটু ঠান্ডা হল। এই সুযোগে তাকে বাবা-বাছা করে ভুলিয়ে তোয়ালেতে মুড়ে একটা বাস্কেটের মধ্যে বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হল।
“এবার ওদের কোথায় নিয়ে যাবে মা?” সব বাচ্চাদের তখন একটাই প্রশ্ন।
পার্কের মধ্যে যে ছোটো বেবি পার্ক আছে, আপাতত সেখানেই নিয়ে যাওয়ায় হল মা আর ছানাদের। খেয়েদেয়ে শক্তি পেয়ে মায়ের ততক্ষণে মুড একটু ঠিক হয়েছে। একটা গাছের ছায়ায় মা বেড়ালকে বাস্কেট থেকে নামিয়ে ওর বাচ্চাদের একে একে ছেড়ে দেওয়া হল ওর চারপাশে। সবাইকে বলা হল দূরে সরে যেতে। ওদেরও তো একটু প্রাইভেসি দরকার।
ঋজু, জয়ী আর টিনটিন দূরে একটা গাছের আড়াল থেকে লক্ষ করছে। দেখা গেল একটুক্ষণ চুপ করে থেকে মা-বেড়াল মুখে করে একে একে তার সবক’টা ছানাকে একজায়গায় নিয়ে এল। মাকে পেয়েই সবক’টা একসঙ্গে গুঁতোগুঁতি করতে লাগল কে আগে মায়ের কাছে পৌঁছতে পারবে। স্মার্টগুলো চটপট ম্যানেজ করে আগে গিয়ে মায়ের দুধ খেতে লাগল, বাকিগুলো পেছন থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল একটু জায়গা পাওয়ার।
সেগুলোকে দেখে জয়ীর খুব মায়া হল, “আহা রে বেচারা, ওরা কী করে দুধ খাবে? ওদেরও তো নিউট্রিশন দরকার।”
সত্যিই তো, চিন্তার বিষয়। যতই রাগ হোক বা বিরক্ত লাগুক, মা তো মা-ই হয়। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল মা নিজেই সরিয়ে সরিয়ে সবক’টাকে দুধ খাওয়াচ্ছে। ঋজুর মা বললেন, “মা-টার ওপরেই-বা রাগ করি কী করে? আমরা একটাকে নিয়েই সামলাতে পারছি না, ও-বেচারি ষোলোটাকে নিয়ে কী নাজেহাল বল তো?”
টিনটিন আর জয়ীর মা প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলেন, “যা বলেছিস! চল আমরাও একদিন এগুলোকে ছেড়ে সারাদিন কোথাও পালিয়ে যাই। কোথাও একটা ডে-ট্রিপ করে আসি।”
ঋজুর মাও সায় দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ চল, সত্যি-সত্যিই একদিন করে ফেলি।”
এইসব আলোচনার মাঝে বিচ্ছুগুলো এসে হাজির, “কী করে ফেলার প্ল্যান করছ গো তোমরা?”
“ও কিছু না, চলো এবার বাড়ি চলো, হোম-ওয়ার্ক শেষ করতে হবে।”
মা আর বেড়ালছানাদের রিইউনিয়নে সবারই মন খুশি। এখন পেঁচা-মাও তাড়াতাড়ি খাবার নিয়ে বাচ্চাদের কাছে ফিরে এলে ষোলোকলা পূর্ণ হয়। কিন্তু অতক্ষণ অপেক্ষা করার সময় নেই। কাল আবার স্কুল।
জয়ঢাকি গল্প-উপন্যাসের লাইব্রেরি এইখানে