দীপক দাসের আগের লেখাঃ তোমরাও ভালো থেকো, সমু, কাকের বাসায় কোকিল ছা, যমধারার জঙ্গলে, আবার যমধারার জঙ্গলে, শিয়াল চরা সেই রাত, একটি অনৈতিহাসিক সার্জিকাল স্ট্রাইকতুমি অন্নপূর্ণা, ফুচকা কাকিমা

কান পেতে রইল চায়ের দোকানের আড্ডাটা। শ্রীবাস ঘোষণা করছে। ঘোষণার প্রথম অংশটা মাইকে ফুঁকে দিয়েছে— “আনন্দ সংবাদ ও শুভ সংবাদ, বড়গাছি স্টেশন রোডে এই প্রথম খুলতে চলেছে একটি আধুনিক কেকের দোকান। কেকের দোকান…কেকের দোকান…কেকের দোকান…”। ইকোটা যান্ত্রিক নয়। ‘কেকের দোকান’ শব্দ দুটো ঘোষক নিজেই বার বার বলছে। ইকোর অনুকরণে। তার পরেই গোস্বামীপাড়ার ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল ঘোষণার দ্বিতীয় অংশ— “জয়গুরু ফার্মেসি, ভালো ওষুধের দোকান। বেলতলা মোড়ে ওষুধের দোকান।”
দ্বিতীয় অংশের জন্যই কান পেতে ছিলেন চায়ের দোকানের আড্ডাধারীরা। শ্রীবাসের ঘোষণার এটাই বৈশিষ্ট্য বা ব্যারাম। আড্ডাধারীরা নিশ্চিত হলেন, শ্রীবাসের রোগ সারেনি এখনও।
ঘোষক হিসেবে শ্রীবাস বেশ নামি। এতটাই নামি যে ওর পদবি ভুলেছে এলাকার লোক। শ্রীবাস মজুমদার বললে কেউ চিনবে না। যদি কেউ বলে ঘোষক শ্রীবাস তা হলে লোকে অনায়াসে ঠিকানা বলে দেবে। ঠিকানা বলতে রোনা সাহার মুরগির পোলট্রির কাছে একটা ঘর। ওই ঘরই শ্রীবাসের আস্তানা। বর্তমানে।
কেকের দোকানের সঙ্গে ওষুধের দোকানের ঘোষণা যায় না। কম্পিউটার সেন্টারের সঙ্গেও ওষুধের দোকানের ঘোষণা খাপ খায় না। রেস্তরাঁর সঙ্গে ওষুধের দোকান একেবারেই বেমানান। কুঁদুলে স্বভাব, খুঁত-প্রিয়রা প্রশ্ন তুলবেই— তা হলে কি এই রেস্তরাঁয় খাওয়ার পরে ওষুধ খেতে হবে? রেস্তরাঁ আর ওষুধের দোকানের যৌথ উদ্যোগ নাকি? রেস্তরাঁ চলল, আবার ওষুধও বিক্রি হল! কেউ কেউ মস্তিষ্ক অতি সক্রিয় করে ফেলে, মানবদা কি শেয়ারে রেস্তরাঁ খুলল? মানবদা মানে জয়গুরু ফার্মেসির মালিক। ভালো মানুষ। সাতে-পাঁচে থাকেন না। তাঁর ওষুধের দোকান ভালো চলে। জমিজমাও রয়েছে। অন্য ব্যাবসা করার কোনও ইচ্ছে তাঁর আছে, এমনটা শোনা যায় না। লোকের কল্পনা যে জলের লাইনের পুরোনো ট্যাপের মতো— টপটপিয়েই যায়। বন্ধ করার চেষ্টা করলে টপ টপ করে পড়ে না, চোঁয়ায়।
শ্রীবাস এমন কাণ্ড ঘটিয়েছিল। রেস্তরাঁ খুলেছিল কাকা গলুই। কাকা কারও নাম হতে পারে না। ওর সরকারি নাম শুভম গলুই। কী কারণে যেন ডাকনামটা কাকা হয়ে গিয়েছিল। এলাকার শিক্ষিতমহল বলে, ওই নাম সৃষ্টির কারণ রাজনৈতিক। এক শ্রদ্ধেয় রাজনীতিক কাকা নামে পরিচিত। তাঁর দলের আদর্শে অনুপ্রাণিত শুভম। তাই এমন নাম। কম লেখাপড়া জানা বা না জানা মহল আবার নামকরণের এই ব্যাখ্যায় তেমন সন্তুষ্ট হতে পারে না। মানে ব্যাপারটা ওদের তেমন বোধগম্য হয় না। ওরা নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে নিয়েছে। সেই ব্যাখ্যা এইরকম— শুভম কাকাদের মতো। চুপচাপ, শান্ত। শিক্ষিতমহল এমন ব্যাখ্যা সরাসরি খারিজ করে দেয়। তাদের মতে, কাকাদের এমন সাধারণ কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। সাহিত্য, সিনেমা এমন কাকাদের কথা বলেনি। বরং সেখানে জ্যাঠাদের প্রাধান্য। বাস্তবে শান্ত কাকাদের থেকে কুচুটে, অশান্তি-প্রিয় কাকার সংখ্যা বেশি। তাদের জন্য বহু সংসার চোখের জলে নাকের জলে হয়। কাকা দুটো ব্যাখ্যাই জানে। দুই ব্যাখ্যাতেই তার সায় আছে। ও শিক্ষিত-অল্প শিক্ষিত বিভাজনকে প্রশ্রয় দেয় না।
কাকা গলুই নতুন রেস্তরাঁ উদ্বোধনের দিন ঘোষণার ভার শ্রীবাসকেই দিয়েছিল। এটাই এখন লোকাল ট্রেন্ড। শ্রীবাস হাঁকতে শুরু করেছিল পাড়ায় পাড়ায়— “দিলখুশ রেস্তরাঁ, উদ্বোধন পয়লা বৈশাখ। মসলন্দিপাড়া বাজারে দিলখুশ রেস্তরাঁ…দিলখুশ রেস্তরাঁ…দিলখুশ রেস্তরাঁ।” তার পরই ঘোষণা হয় সেই অনিবার্য লাইন— “জয়গুরু ফার্মেসি, ভালো ওষুধের দোকান, বেলতলা মোড়ে ওষুধের দোকান।” এমন ঘোষণার পরেই কুচুটে লোকজন ঘোষণার ভাবসম্প্রসারণ করে কাকা গলুইকে জানায়। কাকা তাতে বিচলিত হয়নি তেমন। ও জানিয়ে দেয়, লোকজনকে এত বোকা ভাবা ঠিক নয়। শ্রীবাসের স্বভাব বহু লোক জানে। তাছাড়া ঘোষণার সঙ্গে শ্রীবাস তো লিফলেটও ছড়ায়। তাতে শুধু রেস্তরাঁর নামই আছে। ঘোষণায় কোনও অসুবিধা হবে না। চুকলি, পিন বা কান ভাঙানো— যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তা কার্যকরী না হলে মজা নেই। কুচুটেরা মুখ ঝুলিয়ে ফিরে যায়।
কাকার রেস্তরাঁ ভালো চলছে। কিন্তু মুশকিল হল, বিষ-কথা আর প্যাঁচ কষা অসফল হলেও ছাপ রেখে যায়। সেটাই আবার কুচুটুদের উল্লসিত করল। তাদের বিষ-কথা কিছুটা হলেও কাজ করেছে যে! শ্রীবাসের ঘোষণার বরাত এখন আশেপাশের গ্রাম থেকেও আসে। ঘোষণার মধ্যে খাবারের দোকান থাকলে মালিকেরা শ্রীবাসকে বার বার অনুরোধ করে ওষুধের দোকানের নাম না বলতে। তাতে কাজ হয় না। এক মালিক নিজেই প্রচারের সময়ে টোটোয় ঘুরছিল শ্রীবাসের সঙ্গে। ও নতুন দোকানের নামের ঘোষণা শেষ করলেই মালিক মাইক্রোফোন চেপে ধরবে বলে। প্রাথমিকভাবে সফলও হয়েছিল। কিন্তু একজায়গায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে টোটো থেকে নামতে হয়েছিল তাকে। সেই সুযোগ হাতছাড়া করেনি শ্রীবাস। মনের সুখে ফুঁকে দিয়েছে মানবদার ওষুধের দোকানের নাম। খাবারের দোকানের নামও বলেছে। এদিক দিয়ে শ্রীবাস বেশ পেশাদার।
এত কিছু সত্ত্বেও শ্রীবাসের ঘোষক হিসেবে জনপ্রিয়তা কমেনি। না কমার একটা কারণ, শ্রীবাস সস্তার শ্রমিক। এত কম টাকায় ঘোষক পাওয়া মুশকিল। নামমাত্র টাকা আর নামমাত্র টিফিন দিলে অনেকখানি এলাকা জুড়ে প্রচার করে দেয়। ওর হাতে যদি লিফলেট ধরিয়ে দেওয়া যায় তাহলে তো দ্বিগুণ লাভ। শ্রীবাস রাস্তায় লিফলেট ছড়িয়ে দেয় না। জনে-জনের হাতে ধরিয়ে দেয়। এটা লিফলেট ছড়ানোর থেকে বেশি কার্যকরী। একমাত্র শ্রীবাসকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পারিশ্রমিক দেয় কাকা গলুই। লিফলেট বিলির পারিশ্রমিক অতিরিক্ত।
সকলে কাকার মতো নীতি-নিয়মের ধার ধারে না। তারাই আবার তাদের পয়সায় মুফতে ওষুধের দোকানের বিজ্ঞাপনটা মেনে নিতে পারে না। তারা শ্রীবাসকে বোঝায়। শ্রীবাস চুপ করে থাকে। ঘোষণার বরাতদাতারা তখন এসে ধরে জয়গুরুর মালিক মানবদাকে। শ্রীবাসের কীর্তিতে মানবদা সংকুচিত হয়েই থাকেন। লোকজন এসে ধরলে তাঁর বিড়ম্বনা বাড়ে। তিনি অনেকবার শ্রীবাসকে বারণ করেছেন তাঁর দোকানের নাম না বলতে। বরাতদাতাদের সামনেও বারণ করেন। কিন্তু শ্রীবাস কথা শোনেনি। মানবদা একবার ভেবেছিলেন কোনও ঘোষণার বরাত পেলে তিনি একশো টাকা করে শ্রীবাসকে দেবেন। তার পর ভেবে দেখলেন, টাকাটা নিয়মমতো যিনি বরাত দিচ্ছেন তাঁর পাওয়ার কথা। তাছাড়া তিনি টাকা দিলে গুজব ছড়াবে। লোকে এমনিতেই বলে। টাকা দেওয়ার কথা জানাজানি হলে লোকে বলে বসবে, তিনিই টাকা দিয়ে শ্রীবাসকে এসব করতে বলেন। মানবদা এখন মাঝে মাঝে শ্রীবাসকে খাইয়ে দেন।
শ্রীবাস ঘোষক হিসেবে নাম করল কীভাবে? ঘোষক হওয়ার কোনও ইচ্ছে শ্রীবাসের কখনও ছিল এ-কথা মনে করতে পারে না কেউ। যখন ভালো ছিল তখনও ওর মধ্যে এমন ইচ্ছে বা লক্ষণ কখনও প্রকাশ পায়নি। পাড়ার অনুষ্ঠানে কোনোদিন আবৃত্তি পর্যন্ত করেনি। তবে বন্ধুদের কেউ কেউ বলে, স্কুলে ‘বড়ো হয়ে কী হতে চাও’ রচনায় শ্রীবাস নাকি লিখেছিল, ও সংবাদপাঠক হতে চায়। ওদের বাড়িতে টিভি ছিল না। পাশের বাড়িতে টিভির সংবাদ পাঠ দেখে ওর খবর পড়ার ইচ্ছে হয়েছিল। শান্তশিষ্ট, বরাবরের ভালো ছেলে শ্রীবাস। স্নাতক হওয়ার পরে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গরিব ঘরের ছেলে। বাবা নেই। মা একটা কাপড়ের দোকানে কাজ করে সংসার চালায়। লাজুক স্বভাবের জন্য শ্রীবাসের টিউশনও খুব বেশি জোটেনি তখন।
চলে যাচ্ছিল জীবনটা। হঠাৎই একদিন মারা গেল শ্রীবাসের ভাই। রাতে খেয়েদেয়ে শুয়ে সকালে আর উঠল না। এক সপ্তাহের মধ্যে মা মারা গেল ভাইয়ের শোকে। সামলাতে পারল না শ্রীবাস। মাথাটা গেল বিগড়ে। ওদের ঘর দুটো দখল করে নিল আত্মীয়রা। রোনা সাহা, কাকা গলুইরা কয়েকজন চেষ্টা করেছিল শ্রীবাসের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু বাঁচাতে। কিন্তু শ্রীবাস ঘরে থাকতেই চায় না। তাতে আত্মীয়দের সুবিধেই হল। ওরা বলতে শুরু করল, “শ্রীবাস তো ঘরেই থাকে না। ঘরে না থাকলে ঘর কি টেকে? আমরা তো ওর জন্যই ঘরটা ঠিকঠাক রাখার চেষ্টা করছি। ও তো আমাদের বাড়িরই ছেলে।” স্থানীয় রাজনীতিরও কিছুটা সমর্থন পেয়েছিল আত্মীয়েরা। শ্রীবাস ধীরে ধীরে রোনা সাহার পোলট্রির কাছের ঘরে আশ্রয় নিল।
পোলট্রিতে টুকটাক কাজ করে শ্রীবাস। ওকে দেখলে হঠাৎ বোঝা যায় না মাথার গণ্ডগোলটা। কিছুক্ষণ কথা বলার পরে বোঝা যায়। রোনা সাহা ওকে কোনোদিন কিছু করতে বলেনি। কিন্তু শ্রীবাস কাজের বদলেই খাবার পেতে চায়। রোনা সাহা কাজ করতে দেয়নি বলে দু-একদিন খায়নি। বাধ্য হয়েই রোনা সাহা ওর জন্য হালকা কিছু কাজ বরাদ্দ করেছে। মুরগিদের খাবার, জল দেওয়া, সন্ধেবেলা আলো জ্বালা, সকালে নেভানো— ব্যস। খুশি মনেই করে শ্রীবাস। আর সময় সুযোগ পেলে রোনা সাহাকে জিজ্ঞাসা করে, “আচ্ছা রোনাদা,, অ্যানাউন্সার হতে গেলে কি ভালো নাম লাগে?” আসলে শ্রীবাস নামটা ঘোষক হিসেবে খুব হালকা বলে মনে হয় ওর।
তবে কোনও নাম ঠিক করে উঠতে পারেনি শ্রীবাস। ওর ঘোষক হওয়ার আগ্রহে রোনা সাহার মাথায় একটা পরিকল্পনা খেলে যায়। রোনা সাহা প্রতিবছর পয়লা বৈশাখ এলাকার দুঃস্থদের খাওয়ায়। গান, আবৃত্তি, সিনেমার সংলাপ বলারও ব্যবস্থা থাকে। বলে দুঃস্থরাই। এদের অধিকাংশই ভবঘুরে, মাথায় গোলমাল হয়ে যাওয়া লোকজন। আমন্ত্রিত থাকেন এলাকার গণ্যমান্যরাও। ছোটোখাটো একটা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। এক বছর রোনা সাহা এই অনুষ্ঠানে ঘোষণার দায়িত্ব দিয়েছিল শ্রীবাসকে। অনুষ্ঠান থেকে শ্রীবাসের দুটো বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার হয়। এক, ঘোষণার নিপুণতা। দুই, ঘোষণার সঙ্গে জয়গুরু ফার্মেসির নাম বলা। শ্রীবাসের ঘোষণায় প্রভাবিত হয়েছিলেন এক অতিথি। তিনি ব্যবসায়ী ইন্দ্রনাথ। নতুন ইমারতি দ্রব্যের কারবার খুলতে চলেছিলেন সেই সময়। তিনি প্রথম শ্রীবাসকে দিয়ে ঘোষণা করান নতুন ব্যাবসার। এখন তাঁর ব্যাবসা ফুলে ফেঁপে উঠেছে প্রোমোটারির প্রাবল্যে। লোকে শ্রীবাসকে লাকি বলে মানতে শুরু করে। যদিও জয়গুরুর দোষটা নিয়ে মাথাব্যথা ছিলই।
এরকম করেই চলছিল শ্রীবাসের জীবন। একদিন একটা ঘটনা ঘটল। শ্রীবাসের এক বরাতওয়ালা মানবদার উপরে চোটপাট করল। ওর কাছে খবর গিয়েছিল, মানবদা মাঝে মাঝে শ্রীবাসকে খাওয়ান। খাওয়ানোর টোপ দিয়ে নিজের দোকানের নাম ঘোষণা করিয়ে নেন। মৃদু স্বভাবের মানবদা জোরালো প্রতিবাদ করে উঠতে পারেননি। কাকা গলুই সেই সময় দোকানের কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। ও এসে মানবদাকে বাঁচায়। তেড়ে মুখ খারাপ করতে পালায় বরাতওয়ালা।
মানবদার হেনস্থায় খারাপ লেগেছিল কাকা গলুইয়ের। শ্রীবাসের জন্যই এই হেনস্থা। ওকে বুঝিয়ে ঘোষণাটা বন্ধ করতে পারলেই কাজ হবে। আর এ-কাজ করতে পারে একমাত্র রোনা সাহা। এক দুপুরে রোনা সাহার কাছে হাজির হয় কাকা। পোলট্রিতে তখন শ্রীবাস ছিল না। কাকা গলুই ওর আসার উদ্দেশ্য বলে। রোনা জানাল, সে অনেকবার শ্রীবাসকে জিজ্ঞাসা করেছে কেন জয়গুরুর নাম বলে। চুপ থেকেছে শ্রীবাস। কিন্তু পরক্ষণেই বলে উঠেছে, “নামটা কিন্তু ঠিক করে দিলে না, রোনাদা!”
কাকা বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকে। শ্রীবাসের ফেরার আসায়। আজ ঘোষণার জট ছাড়াবে বলে ঠিক করেছে দুজনে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পরে কাকার মনে হয়, মানবদার কাছেই একবার গেলে কেমন হয়? তিনজনে মিলে ধরলে শ্রীবাস হয়তো কিছু বলতে পারে। রোনা সাহা বলে, “মানবদা এই সময় মন্দিরে বসে থাকেন। এখন মন্দির ফাঁকাই থাকে।”
মন্দিরেই পাওয়া যায় মানবদাকে। দুজনে বিষয়টা বলে ওঁকে। রোনা সাহা বলে, “চলুন, শ্রীবাসকে খুঁজে বের করি। ও দু-একটা জায়গার বেশি কোথাও যায় না। পেয়ে যাব।”
কিন্তু মানবদা ওঠার তেমন আগ্রহ দেখান না। চুপচাপ বসেই থাকেন মন্দিরের চাতালে। কাকা আর রোনা পরস্পরের দিকে তাকায়। মন্দিরের চাতালে হাত চাপড়ে ওদের দুজনকে বসতে বলেন মানবদা।
ফাঁকাই ছিল মন্দির। তবুও মানবদা নীচু গলায় বলতে শুরু করেন, ‘‘কেন শ্রীবাস আমার দোকানের নাম বলে সঠিক বলতে পারব না। তবে একটা ঘটনার কথা বলতে পারি। ওর মায়ের যখন হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, আমি সাহায্য করেছিলাম। আমার দোকানে যে ডাক্তার বসেন, তাঁকেই অনুরোধ করে বাড়িতে পাঠিয়েছিলাম। তিনি হাসপাতালে ভরতির ব্যবস্থা করেছিলেন। ওষুধপত্র, যাতায়াত ভাড়া সবকিছু দিয়েছিলাম। শ্মশানযাত্রার খরচও দিয়েছিলাম। শ্রীবাসকে বলেছিলাম, এসব কথা কাউকে যেন না বলে। ও বলেনি কাউকে। বললে কেউ না কেউ তো কথাটা বলত আমাকে। ডাক্তার বাইরের লোক। বলার সম্ভাবনা নেই। তার পর তো মাথাখারাপ হয়ে গেল ভালো ছেলেটার। কিন্তু আশ্চর্যের ঘটনা, ঘোষণার সুযোগ পেলে ও আমার দোকানের নামটা বলে। সেটা কি কৃতজ্ঞতা থেকে? আমি জানি না। কাউকে বলতেও পারি না। লোকে ভাবতে পারে বড়াই করছে। কেউ কেউ ভাবতে পারে, ছেলেটার মাথাখারাপ হয়েছে। কী হয়েছিল তা তো জানার উপায় নেই। এই সুযোগে নিজের ঢাক পেটাচ্ছি।’’
তিনজনেই চুপ করে ছিল। মানব মনের এই রহস্য তাঁদের অজানা। এই সময়ই মন্দিরে ঢোকে শ্রীবাস। সোজা রোনা সাহার কাছে গিয়ে বলে, “আচ্ছা রোনাদা, দ্য অ্যানাউন্সার নামটা কেমন হবে গো?”
(গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবের কোনও স্থান, চরিত্র বা ঘটনার সঙ্গে মিল পেলে তা নেহাতই কাকতালীয়)