জয়তী রায়ের আগের গল্প- চোখ, গজুমামা জিন্দাবাদ, আলোর কৌটো , আলো আসবে, গজুমামা ও গুহা রহস্য, উড়ন্ত কাকু আর গজুমামা , দোষ নেই, একটি সরেস দিন, ভবনাথের ভাবনা

মধুপুরগঞ্জে দুগ্গাপুজো ভারী উৎসব। খড় তেরপল রঙিন কাপড়ে মোড়া মণ্ডপ আলো করে থাকেন ছেলেপুলে নিয়ে সিংহবাহিনী মা, পায়ের নীচে মহিষাসুর। গাঁয়ের লোক হাত জোড় করে বলবে, “আয় মা। আর টিঁকতে পারি না। গাঁয়ে যে ঢুকেছে অসুর!”
সে আবার কি কথা? ছাপোষা সাধারণ একখানি গ্রাম, আতর নামের মিষ্টি নদীর তীরে, ঘন জঙ্গলের পাশে গ্রামটিতে কী ঘটল?
ঘটনা কি একটা? এই গ্রাম তো আজকের নয়! নদী আছে, দেবালয় আছে, পাঠশালা, চণ্ডীমণ্ডপ, দোল উৎসব, বড়োদের সম্মান, ছোটোদের স্নেহ, মায়েদের সুরক্ষা, ধানের কালে ধান, দুধেল গরুর গোয়াল, পরিপাটি গঞ্জটি। লোকের আর যাই থাক দুশ্চিন্তা ছিল না কোনো এইখানে। বাচ্চারা মান্য করত গুরুজনদের কথা। লেখাপড়া করবে বা কৃষি কাজ – সততার সঙ্গে ভালবেসে করবে। এ যেন সেই কবিতার মত… আমরা কাজ করি আনন্দে…
কিন্তু গত কিছুদিন ধরে এই সুন্দর গাঁয়ে চোখের সামনে কত কী যে ঘটল! মুকুন্দ পণ্ডিত সজ্জন মানুষ, বয়স হয়েছে সত্তরের কোঠায়, আতরের জলে ডুব দিয়ে ঘটি করে জল নিয়ে শিব মন্দিরে পুজো করেন চিরটা কাল। তাঁকে হঠাৎ এসে হুমকি দিচ্ছে কতগুলো অজানা ছোকরা। চোয়াড়ে হাবভাবের ছেলেগুলোর চোখে হিংস্র চাউনি। পণ্ডিতমশাইয়ের পথ আটকে পিতলের ঘটি ছিনিয়ে নিয়ে বলল, “পুজো করতে পারমিশন লাগবে।”
মুকুন্দ পণ্ডিত নরম সুরে বলেওছিলেন, “ভোর থেকে উপোস করে আছি। পুজো করে জলটুকুন খেতে পেতাম…”
উত্তরে কী কদর্য হাসি তাদের! বলে কি না, “ওই দেখা যায় অসুর ক্লাব। ওখানে নাম লেখা। যা চাস তাই পাবি।”
সেই শুরু! এরা কারা? এত দাপট হয় কী করে? গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে সেই মানুষগুলোর মাথায় কী যে ভূতে ভর করেছে! বিচারের আগে ফেল টাকা তারপর কথা। চেনা মানুষ অচেনা হতে হতে পুরো গ্রাম না হয়ে যায় অসুর গ্রাম! দুচারজন যারা এখনও মানুষ আছে তারা চেয়ে আছে মধুপুরের শান, মান, ইজ্জত যাদের হাতে সেই বালু – ভালুর দিকে।
***
শরৎকালের মেলা চলবে একমাস ধরে। যত্ত দোকান থাকুক, নাগরদোলা থাকুক, আধামরা বাঘ, লোম ওঠা ভাল্লুকের সার্কাস থাকুক, মেলা জমবে কুস্তির কসরত দেখালে তবেই। মধুপুর গঞ্জের হিরো হচ্ছে বালু – ভালু দুই ভাই। একে অপরের বিরুদ্ধে খেলে না। মেলার মূল আয়োজক পুরোনো ঝলমলে জরির পোশাক পরে উঠতি পালোয়ানদের ডাক পাড়ে, “ ও ও ও কে আসবি আয় রে…”
চোঙায় মুখ রেখে ডাক পাড়লেই বেজে উঠবে ঢোল… “ও ও ও মধুগঞ্জের শান রে, মানুষ লয় হাতি রে, খায় কত জানিস?”
অমনি পাশ থেকে দোহার বলবে, “কত্ত কত্ত?”
“জালা ভরা দুধ রে, বাদ্দাম রে, কলা খাবে তিনশত… ও ও ও… ঝাঁটু উস্তাদের চ্যালা রে …”
ঝাঁটু ওস্তাদের আখড়ার নাম আছে। ঝাঁটু মরে গেছে। রহিম – করিম আর বালু – ভালু … নামের চারজন নামকরা শাগরেদ আছে তার নামের নিশান উঁচু করে। রহিম – করিমের বয়স হয়েছে। খেলে না আর তবে সঙ্গে থাকে। সিংহের দলে থাকলেও মন ভালো থাকে কিনা!
কুস্তি খেলার মাতন আলাদা। এ হচ্ছে জান এবং মানের লড়াই। হাঁটুতে চাপড় মেরে মেরে খেলবে। দূর দূর থেকে পালোয়ান কুস্তি খেলতে আসবে। বালু – ভালুর সঙ্গে খেলতে হলে প্রবেশ মূল্য দিতে হবে। টাকার মালা পরে খেলা শেষে দুই ভাই। সে কী হল্লা! মাঠ ঘিরে উল্লাস। উঠতি পালোয়ানের দল কাঁধে তোলে হৈ হৈ করে। দঙ্গলে প্যাঁচ মারতে পারলেই সম্মান জুটবে কপালে। ফিরে গেলে লোক জিজ্ঞেস করে — কেমন গো ওই দুইভাই? মস্ত পালোয়ান শুনিচি।
***
ভালু – বালু দুই ভাই। যমজ। মা যতদিন বেঁচে ছিলেন, বলতেন, “ভালু তিন পলকের বড়ো।” বাবাকে দেখেনি চক্ষে। মা একলাই টেনে বড়ো করেছিল। জমিতে ধান ফলিয়ে, গরু মোষের দুধ দুইয়ে, গাছ ভরা কলা আম পেয়ারা খাইয়ে, ঝাঁটু ওস্তাদের ঝাঁটার বাড়ি খেয়ে কসরৎ শিখে … দুই ভাই হয়ে উঠল মস্ত পালোয়ান। মধুপুর গঞ্জের লোকজন বলবে — বালু – ভালু মোদের গরব।
পথ দিয়ে চলবে যেন চলন্ত পাহাড়। গায়ের রঙটা কালো আর ঘাড়ে গর্দান জুড়ে চর্বির তাল থাকায় লোকে রাতের বেলা গরিলা ভেবে ভয় পেয়ে আঁতকে ওঠে। যেমন মোটা তেমনি লম্বা ওজন দুশো মন। তালগাছের গুঁড়ির মতো পা ফাঁক করে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে কুস্তির আখড়ায় যখন হাম হাম হুম হুম করে তাল ঠুকে দাঁড়ায়, লোক জড়ো হয়ে ঘিরে দাঁড়িয়ে দেখে। লড়াই করতে এলে রক্ষা নেই। পা ধরে লটকিয়ে ছুড়ে ফেলে কাঁধদুটো চেপে ধরে থাকত যতক্ষণ না নেতিয়ে পড়ে।
দু’ভায়ের চেহারায় ফারাক বিশেষ না হলেও স্বভাবে আছে সামান্য। যেমন, বালু উত্তেজনার সময় পদ্য আউড়ে দেবে। কুস্তির সময় ছড়া শুনে প্রতিপক্ষ ভয় পেয়ে ভেগে যায় এমন ঘটনার সাক্ষী আছে কেউ কেউ।
মুশকিল হচ্ছে, দিন কতক হয় দুই ভাইয়ের মন ভালো নেই! মধুপুরে মেলা বসেছে। ভালু – বালুর নামে পোস্টার পড়েছে। টাকা পড়বে ঝনঝন। পুজোর মরশুমে ঝনঝন টাকা …লোকে হাতে করে কলাটা মুলোটা এনে দরজায় রেখে যাচ্ছে। দুই ভাই তবু উদাস। মনটা যে কেন ভালো নেই তার কারণ খুঁজতে বালু লম্বা শ্বাস ফেলে বলে, “মোদের হাতির খোরাক। রোজ কুড়িটা ডিম। মাংস। জালা ভরা টেংরি জুস। কিশমিশ, বাদাম। ওস্তাদ বলেছিল তোর শক্তি দিয়ে অন্যের উপগার করিস। কিস্যুটি হচ্ছে না কেবল টাকার মালা পরছি।”
ভালু বলে, “কসরৎ শেখানোর সময় গুরু বলেছিলেন, ‘ওরে ভালু, আর যাই করিস, খারাপ কাজ করিস নে। ভাই রে, লোভ করতে করতে এমন অব্যেস হয়েছে ভালো কাজ করলে মন ভালো হয় কী করে তাই জানি না।”
– জানলেই জানা হয়।
– কে রে? কে কথা বলে? কার এত সাহস?
গর্জনের উত্তরে মিনমিন করে কেউ বলে, “আমি।”
– কে আমি?
চারফুট দুইইঞ্চির গোলগোল একটা লোক। রবারের তৈরি পোশাক পরা। হাসিমুখের সঙ্গে চকচকে চোখ নাচিয়ে বলল, “আমি ফু।”
– ফু? এ আবার কেমন বিদঘুটে নাম?
– আজ্ঞে, আমাদের দিকে নামগুলো অমনি ধারা।
– তোমাদের দিক? সেটা কোথায়?
প্রশ্নটা এড়িয়ে লোকটা বলে, “ভালো কাজ করলে মন ভালো হয় এটা নিয্যস সত্য।
করুণ সুরে ভালু বলে, “ভালো কাজটাই তো জানি নে। এদিকে মন খারাপের চোটে হজমে গোলমাল, প্যাঁচ ভুলে লড়াই হেরে কুপোকাত হচ্ছি। কী যে করি?”
ঘাস জমিতে ঘুরপাক খেয়ে খানিক নেচে নিয়ে ফু বলে, “কুস্তি করতে করতে মগজ খালি হয়ে গেছে বলে দেখতে পাও না? তোমার মধুপুর গঞ্জ কি আছে আগের মতো?”
বালু তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “না না না। কিরকম অন্য সুরে কতা কয়, টেরিয়ে তাকায়, চেনা লোগ অচেনা ব্যভার।”
-কেমন ব্যবহার? একটু উগ্র, একটু রাগুনে, একটু চন্ড, তাই না?
– হ্যাঁ হ্যাঁ, মহা উৎসাহে বলে ওঠে দুই ভাই, “ঠিক ঠিক।”
ফু হঠাৎ ঘুরিয়ে দিল কথা। অন্য দিকে টান দিয়ে রবারের মুখ টেনে হাসি দিয়ে চারিদিকে তাকিয়ে বলে, “এইটা তোমাদের লড়াইয়ের জায়গা?”
বালু বুক চিতিয়ে বলেবলে, “আখড়া আমাদের। হলুদ, ঘি, দই সেইসঙ্গে পূজার জল মিশিয়ে মাটি তৈরি হয়।”
চোখ বড়ো নাকের ফুটো বড়ো… ফু যেন ভারি অবাক হয়েছে এইভাবে বলল, “তারপর তারপর?”
– ওস্তাদ তালিম দেন। তার আগে মাটি ছুঁয়ে প্রণাম করি। তেল মালিশ করি, দৌড়ঝাঁপ। বুক ডন করে শুরু করি। এখন তো কত কিছু পারি।
– যেমন যেমন?
বাচ্চা ছেলেকে বোঝানোর মতো ভালু বলে, “যেমন … ধোবি পাট, আড় মারা, ঢুঁসা মারা …”
– থাক। থাক।
ফু বলল, “দারুণ ব্যাপার। বুঝে গেছি। আর বালু? তোমার একটা বিশেষ গুণ আছে না?”
বালু লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, “পদ্য। জনগণ বলে, এইটা নাকি দৈব শক্তি। কিন্তুক … এই শক্তি ঢুকল কেমন করে সেইটা জানা নাই!”
ফু হাততালি দিয়ে বলল, “এই জিনিস কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।”
ভালু বলে, “কুস্তিগীর হয়ে পদ্য বলে! বালুটা চিরকাল খ্যাপা। একবার কী হল জানো? প্যাঁচ দিতে বালু হঠাৎ বলে, ‘আর লড়ে না আর লড়ে না, লড়াই এবার জমবে না। সত্যি বলছি, কুস্তি করে আমার সঙ্গে পারবে না।’ ”
ফু একটু গম্ভীর হয়ে বলেবলে, “টোকা টোকা গন্ধ পাচ্ছি যেন?”
-টোকার আবার গন্ধ হয় নাকি গো?”
-হয় না কে বলেছে? টুকে লেখায় টক গন্ধ। যাক গে, বঙ্গদেশে এখন সকলি সম্ভব।
– আচ্ছা, ফু ভায়া, তুমি থাকো কোথায়?
– অনেক দূরে।
– আরে? কত দূরে? ধরিত্তির বুকে তো না কি?
– পৃথিবী থেকে একশত আলোকবর্ষ দূরে।
ভালু চেঁচিয়ে বলে, “অ্যাঁ? তুমি মানুষ নও? ওরে বালু, সন্দ আমার শুরু থেকেই হচ্ছিল। তা বাপু, তুমি কে?”
ফু নরম সুরে বলে, “শোনো গো, আমরা হলাম ভিন্ন গ্রহের প্রাণী। এই পৃথিবীর মতো সেই গ্রহটাও সবুজ রঙের। তোমরা হয়ত পুরোটা বুঝবে না। এইটুকু জেনো, আমরা হলাম বন্ধু গ্রহ।”
বালু পালোয়ান বটে কিন্তু কথার প্যাঁচ সামলাতে না পেরে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, “বাবা ফু, সোজা করে বলো, এমন অবাক করা ঘটনা কোনোদিন শুনিনি। দেখিনি। অন্য গ্রহ থেকে এলে কেমন করে? ভাষাটাও জানো দেখছি?”
“একটা যান আছে। হুশ করে মাঝে মাঝে চলে আসি বন্ধু গ্রহে। আমাদের ভিতর যন্তর থাকে তারা তোমাদের ভাষায় উত্তর দেয়।”
বালু উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, “বটেই তো। বটেই তো। চেহারাখান মানুষের মতো নয়কো। কপালের জোর আছে আমাদের। তাই দেখা পেলাম। পেন্নাম হই। তা, তুমি কোন্ ঠাকুর হে? শুনেছি দেবতারা থাকেন অনেক দূরে। চোখের জল ফেলে ডাকলে পরে তিনি আসেন। এবার কেন এলে? কিসের বিপদ?”
ফু বলল, “সহজ করে ধরলে এটাও বলতে পারো। দেবতারা দূরে থাকলেও বন্ধু বটে। আমাদের মতো ওঁরা সাহায্য নেন মাধ্যমের। দেবতারাও উঁচু স্তরের এলিয়েন।”
বালু – ভালুর মাথায় কিচ্ছুটি ঢুকছে না। মাথায় কত চোট লেগেছে, ঘিলু কি আর আছে? কোন্ দূরে কোন্ গ্রহ … তার থেকে কে এক জীব এসেছে ভালো কাজের বরাত নিয়ে – সে নিজে কেন করছে না? এইসব ভাবতে গিয়ে মাথা গরম, ক্ষিদে পেট আরো গরম, বালু – ভালু দুজনেই একসঙ্গে ভাবল, “অ ফু ঠাকুর, খাবে নাকি গাওয়া ঘিয়ের লুচি আর ছোলা?”
***
পুজোমণ্ডপ এখনো সেজে ওঠেনি। মেলা বসে গেছে। সাঁঝ নেমে এলে জ্বলে উঠছে লাল নীল লাইট।
ফু বলে, “গোটা পৃথিবী জুড়ে একটা অদ্ভুত কালো ছায়া এসে পড়েছে। মধুপুর গঞ্জেও ঘটেছে বদল। পৃথিবীর শরীর থেকে শুষে নিচ্ছে সরলতা। খেয়ে খেলছে মানুষের নিশ্চিন্ত বিশ্বাস। কত যুগ আগে, মানুষের বোধ কম ছিল। মারামারি ছাড়া অন্য কিছুই জানত না। ধীরে ধীরে উন্নতি করল মানব সভ্যতা। ইদানীং হিংস্রতা বেড়ে গেছে কয়েক শত গুণ। কারা যেন স্প্রে করে দিচ্ছে হিংস্রতার ওষুধ।”
ভালু মাথা চুলকে বলল, “বিদ্যের জাহাজ হয়ে কথা কইলে হবে কী করে? এইটুকু বুঝলাম যে, পুরাকালের পাজি অসুরের মতো পিশাচের মতো ধেয়ে এসেছে কেউ।”
ফু লাফিয়ে উঠে বলল, “তব্বে! কে বলে কুস্তি করে বুদ্ধি ভাগে?”
-ভাগে না?
-না রে বাবা না। এই তো ধরলে এই তো বললে। দৈত্য, অসুর ঝম্প দিয়ে খম্প দিয়ে এসেছে বইকি! সঙ্গে এসেছে ভূত পিশাচের দল।
-কেন? কেন? দরকার কী পড়ল?
-পুরাকালের লোভী অসুর, অত্যাচারী দৈত্য, তারা জেগে উঠেছে যে। পৃথিবী দখল করে অসুররাজ শুরু করবে।
বালু বলে, “একটু রকমসকম টের পাচ্ছি যেন? ভালো কাজ কম হচ্ছে, খারাপ লোকের পায়া ভারি হচ্ছে। গুন্ডামি বেড়ে যাচ্ছে। মোটা মাথায় ভুল বললাম না কি?”
-ভুল? বলো কী হে? এ যে দৈববাণী! এটাই ছিল আমাদের গবেষণার বিষয়। অসুর প্রবৃত্তি আবার জেগে উঠছে। শক্তি বাড়িয়ে, গোটা এলাকা দখল করে এবার এগোচ্ছে পা পা করে।
-পা পা করে? অস্ত্র শস্ত্র নেই?
-নেই আবার! আধুনিক সব মারণাস্ত্র। একটা মারলে আর দেখতে হবে না।
ভালু এক ঢোঁক জল খেয়ে বিষম খেয়ে বলল, “দেখো বাপু ফু, মোদের অস্ত্র চারটে হাত-পা। একটা কাটা পড়লে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে।”
ফু উদাস গলায় বলল, “ভালো করে শুনলে না আগেই দোষ দিয়ে বসলে?”
নিম তেতো মুখ করে বালু বলে, “ভালো কাজ করতে যখন হবেই তখন বলো বলো কাজটা বলো। যদি একান্ত না পারি তখন না হয়…”
ফু উৎসাহ নিয়ে বলে, “এই তো মরদ কা বাত। মহাপরাক্রম শালী অসুর রাজা শৃঙ্গ হচ্ছে মহিষাসুরের দিদির ছোটোপুত্রের নাতির পিসিশাশুড়ির ভায়রাভাইয়ের একমাত্র পুত্র।”
“কও কী হে?”
ফুটবলের মতো মুখ নেড়ে দুই ভাই বলে, “আমাদের মহিষাসুর?”
ফু খিলখিল করে হেসে উঠে বলে, “এমন করে বলছ … হিহি।”
-বচ্ছর বচ্ছর দেখি কি না! কেমন আপন আপন মনে হয়। ধরো, একবার যদি না ই আসে কেমন খালি খালি লাগবে না?
-যাকগে যাকগে। শৃঙ্গরাজের আছে বিশেষ ক্ষমতা। অস্ত্র দিয়ে মারার হলে আমরাই দিতুম উড়িয়ে। সে হবার নয়। মরলে খালি হাতের যোদ্ধার সঙ্গেই মরবে।
– ও ও ও। তাই বলো। শুনেচি বটে, অসুরগুলো টপাটপ এমন ধারা বর পেয়ে যেত। এই শৃঙ্গ কি তেমনি কিছু পেয়েচে?
ফু রাগ রাগ সুরে বলল, “একটা দপ্তর আছে সেখানে ঘুষ দিয়ে অনেক কিছু পাওয়া যায়, তা সে পেয়েছে।”
-আচ্ছা ভাই ফু, আমরা তাঁকে চিনব কেমনে?
-চিনতে পারা ভারি মুশকিল। ওই ধরোগে তোমাদের পাড়ার হরি পানওয়ালা?
-ওমা! সে তো ভারী ভালো লোক। অভাবের সময় মাগনা পান খাইয়েছে কত্ত।
-এবার সেই যদি হয় শৃঙ্গ?
ভালু – বালু হাঁ। বলে কী হে? আজন্মের চেনা হরি? প্যাকাটি চ্যায়ারা। সে নাকি অসুর? হেসে গড়াতে লাগল দুইভাই। বিশাল শরীরের কাঁপনে মাটির বাড়ি নড়তে লাগল হুড়হুড়।
– আরে থামো।
বিরক্ত হয়ে ফু বলে – শৃঙ্গ কি সেই পুরাণ কালের মতো ইয়া চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়াবে? দখল করতে হলে শুধু যুদ্ধ করতে হয় নাকি?
আমতা আমতা করে বালু বলে – অসুর শুনলে ওই ছবিটাই তো ফোটে গো ফু দাদা।
-আজ্ঞে না। এখন হচ্ছে মগজ দিয়ে দখল। জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেবে অসুর হলে কত লাভ হবে। পান বিক্রেতা, রোল বিক্রেতা, আলু বিক্রেতা রাতারাতি হয়ে যাবে ধনীর ধনী। গাড়ি হবে। বাড়ি হবে। ব্যাংকে রাশি রাশি টাকা হবে। বিনিময়ে?
দুইভাই মন্ত্র মুগ্ধের মতো বলে – বিনিময়ে?
-অসুর তন্ত্র আপন করতে হবে। একটা থেকে লাখো, লাখো থেকে কোটি… ছেয়ে যাবে পৃথিবী। এমন অবস্থা হবে যে মনে হবে, পাশেই আছে অসুর। আতরের জলে মেশাবে বিষ রাতের অন্ধকারে, সেইসময়ে তাক করে ঝাঁপিয়ে পড়বে ঘাড়ে।
বালু অবাক, “ফু মশাই, পদ্য বলছেন?”
ফু লজ্জা পেয়ে বলল, “সঙ্গে থেকে থেকে… যাকগে, বুঝেছ তবে? বিপদ ভয়ানক।”
-তাই তো! বলছ কি হে? আতরের জলে বিষ মিশিয়ে দেবে?
বালু বলে, “ঠিক আছে। মোরা রাজি। জীবন লাগালাম বাজি। খালি হাতেই মারব অসুর। দেখি, ব্যাটা কত চতুর। আতর বাঁচিয়ে করব প্রমাণ। লোভ করলে বাঁচে না প্রাণ।”
***
অসুররাজ শৃঙ্গ বাস্তবে দেখতে অসুরের মতই। যেমন লম্বা তেমন চওড়া। মেজাজ তেমনি, ভীষণ কড়া। বাম হাতে সর্বক্ষণের সঙ্গী পিস্তল। অব্যর্থ নিশানা। আর একটা গুণ আছে। যে কোনো রূপ ধারণ করতে ওস্তাদ সে। অসুর থেকে ফকির হয়ে যাবে নিমেষে। ফিসফিস করে বলবে – ধনী যদি হতে চাও, অসুর দলে নাম লেখাও।
লোক হয়েও যাচ্ছে রাজি। অসুর তন্ত্র, অসুর মন্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে। আইন মানছে না। চুরি ডাকাতি বেড়ে চলেছে। চোর অসুর, পুলিশ অসুর, কোর্ট কাছারি সবখানেই ওদের দলের লোক। কাজে নেমে অবাক ভালু – বালু। নজরেই পড়েনি এত পরিবর্তন? নরহরি সর্দারের অবস্থা ভাল। জমিজমা খেতিবাড়ি আছে। অভাব নেই। তার নাতিটাকে দিনে দুপুরে ইলোপ করে নিল। ফোন এল, “তিন কোটি দাও নতুবা জমিখান দাও, যদি নাতি ফেরৎ চাও।”
ফোনের গলা শুনে নরহরি থ, “ওরে তুই তো মোদের ছিদু।”
উত্তরে প্রচণ্ড হুঙ্কার, “ছিদু অসুর বট্টে।”
থানায় নালিশ করতে দারোগা ধমকায়, “ব্যাটা নরে, গত ছয়মাসে তোলা কেন দিসনি? হারামজাদা!”
নরহরি বলে, “নতুন নিয়ম নাকি দারোগা মশাই? ট্যাশকো ভরে আসছি বছর ভর।”
দারোগা গোঁফ মুচড়ে বলে, “অসুররাজের নিয়ম। নিয়ে আয় তিন কোটি। নাতি না হলে বটি বটি।”
হায় হায়! কেমন করে কয় কথা কয়টি? নরহরি চেঁচাতে চেঁচাতে পথ ধরে দৌড়ায় তো পথে দেখা ভালু – বালুর সঙ্গে। হেলতে দুলতে আসে যেন চলন্ত পাহাড়টি।
– কান্দ কেন দাদা নরহরি?
কপাল চাপড়ে ঘটনা বললে দুই ভাই থানায় গিয়ে মারে এলপাথাড়ি। টেবিল চেয়ার আছড়ে, দারোগাকে মাথার উপর তুলে বনবন ঘুরিয়ে আছাড় মারতেই সে বেচারা কেঁদে কেটে ফের পুরোনো দারোগা রাখহরি সামন্ত হয়ে বলে, “বালু – ভালু। আমায় কেন মারিস? এতকাল তোদের রক্ষা করেছি কি না? এখন শৃঙ্গ অসুরের আদেশ। মানতে না পারলে গর্দান।”
-আগে বল বাচ্চাটা কোথায়?
-থানার মধ্যেই আছে।
-সে কী! রক্ষক হল ভক্ষক?
-সব থানা এখন একই রকম।
নাতি কাঁধে নরহরি বাড়ি চলে গেল।
***
শৃঙ্গ অসুরের ডেরা এখন জঙ্গলেও নয় মঙ্গলগ্রহেও নয়। মানুষের মনের মধ্যে পড়েছে ঢুকে। এতদিন নজর করে দেখেনি কেন? যারাই অসুরত্ব মেনে চলছে তাদেরই রমরম করে সোনাদানা হীরে জহরত বেড়ে চলেছে। আর বাড়ছে অপরাধ।
এবারের অপরাধ আরো সাংঘাতিক। আতরের জলে বিষ মিশিয়ে প্রমাণ করবে যে নদীকে পুজো করে এসেছে, সে নদী আসলে মৃত্যুর আর এক নাম!
বালু বলল – আতর আমাদের মা, তার অপমান সইব না।
ভালু বলে – অসুর করছে লোকসান এইটা যদি হয় প্রমাণ তবেই তো লোক দলে করবে না যোগদান। কি বল?
বালু বলে – রহিম – করিমকে খবর পাঠাই। চারজনে বসি। চারমাথা এক হয়, দূর হয়ে যাবে ভয়।
***
রহিম – করিম খবর এনেছে আগামী অমাবস্যার গভীর রাতে অসুর দল আতরের জলে বিষ মেশাবে। বিপদে পড়বে দলে দলে মানুষ। সেইসময় টাকা দিয়ে কিনে নেবে অসহায়দের বুদ্ধি। মতলব আরো আছে। ভালো মানুষের রূপ ধরে অসুর থাকবে মিলে মিশে। নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে ঝগড়া বাঁধিয়ে দেবে। বালু বলল, “মোরা তবে চারজন, অসুর অগণন, আর কেউ নাই স্বজন?”
“আছে আছে। আছে এক প্রিয়জন, ” বলতে বলতে ঢুকল নরহরি। করুণ সুরে বলে, “ মোরে সঙ্গে নাও ভাই। মারপিট করতে পারি না। বাকি যা বলবে করব।”
করিম বলল, “ খুব চলবে। মোট তবে পাঁচজন?”
ভালু বলে, “ভালো করে দেখ ভেবে। দুটো করে হাত হলে হয় দশজন। মনে রেখ ভাই, দুগ্গা ঠাকুর একলা যুদ্ধু করলেন। ভয় পেলেন না। ভয় পেলে চলবে না।”
***
শরৎঋতুর মাধুর্য ছড়িয়ে দিয়ে সেজে উঠেছে মধুরগঞ্জ।
নীলকান্ত মণির মতো উজ্জ্বল আকাশে থোকা থোকা ফুলের মতো সাদা মেঘ। আতরের উপর থেকে বয়ে যাওয়া খুশবুদার বাতাসের ছোঁয়ায় মাথা দোলায় কাশ ফুল। বিল জুড়ে ফুটেছে পদ্ম। ঢাকের শব্দ যেন আসছে কানে? মা দুর্গা এসে গেছেন নাকি?
শরৎঋতু নিয়ে ভালু-বালু গা করেনি। পুজো উপলক্ষে কুস্তির বায়না পেলেই মন ভালো হয়ে যেত। আজ কেন এইসব চোখে পড়ছে কে জানে? কেন মনের মধ্যে এমন উদাস সুরে ঢাক বাজছে কে জানে? বালু পদ্য আউড়ে যাচ্ছে, “ ও মা দুর্গা এসে বসো এখানে, আবার অসুর বধ করিব তোমার সামনে।”
শুনেই কেঁদে ফেলল ভালু। বালু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “কাঁচা পদ্য। তাই বলে একেবারে কান্না?”
চোখের জল মুছে ভালু বলে, “কী যে বলিস ভাইটি? তোর পদ্য শুনে জাগি পদ্য শুনে ঘুমাই। কাঁদছি কেন? কারণটা এক্কেবারে অন্য। ওই ফু নামের আজব জীবটা কেমন গোলমাল করে দিল বল? এই মধুরগঞ্জ নাকি দেশের অংশ, পৃথিবীর অংশ। আজ এখানে প্রতিবাদ হলে ছড়িয়ে পড়বে সব খানে। তুই বল বালু, এমন করে ভেবেছি কখনো? জিতলে উল্লাস হারলে দুঃখ-এই বিচারের বাইরেও যে জগৎ আছে, যেখানে হারলেও লোকে মনে রাখবে, কী করে বুঝব বল?
***
নির্জন অন্ধকার মেঠো পথ ধরে বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে কানে এল পায়ের খসখস শব্দ। নিশাচর শয়তানের মতো আসছে কারা? ভালু-বালুর প্রকাণ্ড শরীর টানটান। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে কালো গেঞ্জি প্যান্ট পরে এগিয়ে আসছে জনা আটেকের দল। উত্তেজনার হাঁফিয়ে ওঠে রহিম-করিম। ওরা যে আমাদের গাঁয়ের ছেলেপুলে। নদীকে বিষ দেওয়ার মতো কাজ করতে পারে?
ছেলেগুলো যেন যন্ত্র। চোখগুলো নড়ছে না। একসারি লম্বা করে হাঁটছে। হাতে হাতে মেটে হাঁড়ি। কাঁধে বন্দুক। আর ওই হাঁড়ি ভর্তি আছে বিষ।
এখন আর ভাবার সময় নেই। এখুনি করতে হবে যা করার। ভাবতে না ভাবতেই চলন্ত পাহাড়ের মত ভালু গিয়ে পড়ল দলটার মধ্যে। তারা ভ্যাবাচ্যাকা খেতে না খেতেই কাটারির মত রদ্দার বাড়ি। ওদিকে এসে পড়েছে বালু। সে দিচ্ছে ধোবিপাট আছাড়। মাথার উপর তুলে ঘুরিয়ে ছুঁড়ে ফেলছে। যে পড়ছে সে আর উঠছে না। বন্দুক-ফন্দুক উড়ে পড়ল কোথায় কে জানে? হুটোপুটি প্রবল চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যে তিনটে ছেলে তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে আসার চেষ্টা করতে রহিম – করিম তাদের ঠেলে দিল আতরের জলে।
কাজ শেষ হল। মধুর গঞ্জের জনগণ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। পানওয়ালা গুণগুণ সুরে পান সেজে বিকুতে লাগল, ছিদু রঙ্গ তামাশায় মেতে উঠল, দুগ্গা পূজার ঢাক বেজে উঠল, গায়ে মাটি মেখে পালোয়ানের দল হুম হাম করতে লাগল। শৃঙ্গ গেল কোথায়? নরহরি চেঁচিয়ে বলতে লাগল, “সবাই মিলে করো কাজ অসুর শক্তি বরবাদ।”
বালু বলল, “উঁহু। কেউ কোথাও যায়নি। ঘাপটি মেরে আছে পাশেই।”