ধারাবাহিক অভিযান-আমার অভিযাত্রী জীবন(এপিসোড ৫)-স্বেন হেডিন-অনু-রাজীবকুমার সাহা-শরত ২০২৫

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

সব পর্ব একত্রে-পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪

obhijanhedinheader

স্বেন হেডিন একাধারে একজন সুইডিশ ভূগোলবিদ, টপোগ্রাফার, অভিযাত্রী, ফটোগ্রাফার ও চিত্রশিল্পী। ১৮৬৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যু: ২৬ নভেম্বর, ১৯৫২, স্টকহোম।
এই আত্মজীবনীতে নিজের জীবনভর অভিযাত্রার দুর্ধর্ষ সব অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন হেডিন। রোমহর্ষক উত্তর মেরু অভিযানের নায়ক সুইডিশ অভিযাত্রী নর্দেনস্কিওল্ডকে দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং পনেরো বছর বয়সেই ভবিষ্যতে উত্তর মেরু অভিযাত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। পরে তাঁর অভিযাত্রার গতিমুখ পরিবর্তিত হয়ে এশিয়ার দিকে ধাবিত হয়। নিয়তির ফেরে কাস্পিয়ান সাগরতীরের ঝড়ের শহর বাকুতে আসেন আর সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করেন এশিয়ার পথে। শুরু হয় রাশিয়া, ককেশাস আর পারস্য হয়ে প্রায় সমগ্র এশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন। বাধাবিঘ্ন বিপত্তির সম্মুখীনও হন প্রচুর। তুলে ধরেন দেশীয় সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবরণ। গবেষণার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাচিত্র তারই সাক্ষ্য বহন করে। MY LIFE AS AN EXPLORER স্ভেন হেডিনের অসামান্য সৃষ্টি। ১৯২৬ সালে কাসেল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড-এর হাত ধরে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

॥ তেরো॥

এশিয়ার হৃদ মাঝারে

একদিকে দুগার তোরণদ্বারে ঘণ্টা বাজল, ওদিকে আমিও রওনা হলাম সমরখন্দ ছেড়ে। শহরের নীল প্রাসাদ-শৃঙ্গগুলো ধীরে ধীরে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। অন্যদিকে আফ্রাসিয়াবের গিরিশৃঙ্গগুলোর মাথায় সূর্যদেবও স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠলেন।

শরৎকাল। চারদিকে শুধু হলুদ আর লালের সমারোহ। ঝলমলে সব বাগবাগিচা পার হয়ে চলেছি ট্রয়কার চড়ে। পার হয়ে এলাম জেরাফশান নদী। দুই সোনারঙা ঢাল তার। সমরখন্দের চাষভূমি আর নিকটবর্তী মরূদ্যান সব এই নদীর জলেই পুষ্ট। একসময় ‘তৈমুর লং দ্বার’ নামে সংকীর্ণ এক গিরিপথও পার হয়ে এলাম। তারপর পড়ল ‘গোলোদনায়া’ নামে ভয়ংকর এক খাড়া ঢাল। লাল বালির কিজিল-কুম মরুভূমির এক কোনায় তার অবস্থান। রুশ-তুর্কিস্তানের দুই মহানদী অক্সাস আর জাক্সারটেসের মাঝে এই মরু।

সুবিশাল এক ফেরিতে আরও এক নদী পেরোলাম তারপর। তার তুর্কি নাম সির-দরিয়া। দশটা উট আর ঘোড়াসহ বারোটা গাড়িও ছিল একই ফেরিতে। ঘোড়া বদলে রুশ মধ্য এশিয়ার রাজধানী তাশখন্দে পৌঁছলাম শেষে।

একদা চেঙ্গিস খানের পুত্র জগতাই খানের রাজত্ব ছিল এখানে। তারপর ১৮৬৫ সালে জেনারেল চেরনিয়াইফ তাশখন্দকে রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে আনেন। এখানে একশো কুড়ি হাজার লোকের বাস ছিল তখন। মাত্র দু-হাজার সৈন্য নিয়ে এই নগর জয় করেন চেরনিয়াইফ। তাশখন্দ যেদিন আত্মসমর্পণ করল, চেরনিয়াইফ সেই সন্ধ্যায় দুইজন কসাক সঙ্গীর সঙ্গে নগর পথ পেরিয়ে সর্ত হামামে স্নান সেরে বাজারে বসে আহার সারলেন। তাঁর এই দৃপ্ত চলনভঙ্গি নগরবাসীর মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক ঘটাল।

তাশখন্দে যখন পৌঁছি, গভর্নর জেনারেল ব্যারন ভন রেওস্কি রয়েছেন সেখানে। তাঁর বাসভবনেই আশ্রয় মিলল যতদিন ছিলাম। তিনি মানচিত্র ও পাসপোর্ট দিলেন, আর একটা পরিচয়পত্রও লিখে দিয়ে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ করলেন আমাকে। পাশাপাশি আতিথেয়তায়ও মুগ্ধ হলাম তাঁর। ১৮৭৩ সালে আমাদের রাজার রাজ্যাভিষেকের সময় রুশ দূত হিসেবে স্টকহোমে উপস্থিত ছিলেন তিনি।

সেখান থেকে নতুন গাড়িতে ফের যাত্রা শুরু। আবারও সির-দরিয়া পেরিয়ে এইবারে খোজন্দে ঢুকলাম গিয়ে। সেখান থেকে ফারগানার উর্বর উপত্যকার পেরিয়ে এলাম খোখন্দে। সর্বশেষ খান সম্রাট খোদিয়ার খানের শাহি প্রাসাদ দেখা হল আমাদের। ছোটো ছোটো খুপরিতে বসে দরবেশেরা গান গায় এখানে। তারপর মারগেলান শহরে যাত্রা। এইখানে যে-কোনো আগন্তুকের সহজেই চোখে পড়বে গুর-ই-ইস্কন্দর-বেগ, যা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সমাধিস্থল নামে পরিচিত।

ঝলমলে চাঁদ উঠেছে আকাশে। টুংটাং শব্দে আমরা চলেছি ওশের পথে। কর্নেল দিউবনার সেখানকার জেলাপ্রধান তখন। আমি চাইছিলাম কাশগর থেকে যতটা দূর দিয়ে যাওয়া যায়। চিনের সবচাইতে পশ্চিমের শহর এই কাশগর। তার অন্যদিকে তিয়ান-শান আর পামিরে গিয়ে মিশেছে এক পর্বতশ্রেণি। সেই শৃঙ্গরাজির উচ্চতম গিরি দিয়ে কাফেলা পথ চলে গেছে ওশ এবং কাশগরের দিকে। ওশ পড়ে রুশ-তুর্কিস্তানের মধ্যে, আর কাশগর হচ্ছে চিন-তুর্কিস্তানের অংশ। সেই পথের নাম তেরেক-দাভান বা পপলার গিরিপথ। উচ্চতা ১৩,০০০ ফুট।

কর্নেল দিউবনার জানালেন, শেষ কাফেলাটিও ততদিনে রওনা হয়ে গেছে সে-পথে। তুষার-ঝড়ের মরশুম, অতএব অসমসাহসী কিরগিজরাই একমাত্র যারা এই গিরিপথকে হাতের তালুর মতো চেনে, সে-পথে আসে যায়। কিন্তু ওটুকুতেই দমে যাবার পাত্র কি আর আমি? ফলে কর্নেল আমার সে-পথে যাত্রার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্রে মন দিলেন। কিছু জোগাড়যন্ত্র আমারও করার ছিল। একটা করে পশমের কোট এবং ফরাস কিনলাম প্রথমেই। তারপর চারটে ঘোড়াও ভাড়া করলাম মাথাপিছু দৈনিক ষাট কপেকের কড়ারে। তিনজন পরিচারক নিলাম সঙ্গে। করিম জান দলের জিগিত, অর্থাৎ দলকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে সে। সঙ্গে যাচ্ছে সহিস আতা বাই আর রাঁধুনি আশুর।

১ ডিসেম্বর মোটা মোটা সব শীত পোশাক আর ভালেঙ্কি (নরম ফেল্ট বুটজুতো) চাপিয়ে রওনা হলাম আমরা। পুরু হয়ে তুষার পড়ছে অঝোরে। পাহাড়-সমতল যেদিকে তাকাই সাদা চকের মতো শুধু তুষার আর তুষার। কিরগিজদের বড়ো বড়ো খিলানওলা কম্বলের তাঁবুগুলো শুধু জেগে আছে তাতে কালো কালো ফুটকির মতো। সুফি-কুরগান অবধি যেতে আমরা একদিনে ৪২ মাইল হেঁটেছিলাম। ওটা আমাদের রেকর্ড ছিল সেই যাত্রায়। রীতি অনুসারে কিরগিজদের সেই তাঁবুতে গিয়ে উঠলাম আমরা। খেয়েদেয়ে ওদের চমৎকার আগুনের পাশে ঘুমিয়ে পড়লাম শিগগির। এই সুফি-কুরগানে পঞ্চাশটা তাঁবু নিয়ে একটা গ্রাম (আউল)। বৃদ্ধ গ্রাম-প্রধান খোয়াত বি সানন্দেই গ্রহণ করলেন আমাদের। তাঁর তাঁবুর চুলোয় আশুর চমৎকার এক সুরুয়া রাঁধল ভেড়ার মাংস, বাঁধাকপি, গাজর, আলু, চাল, পেঁয়াজ, গোলমরিচ আর নুন দিয়ে। গোটা রান্নাটাই জলে সেদ্ধ করে। এর নাম ‘বেশ বারমাক’ (পাঁচ আঙুল)। অর্থাৎ, সুরুয়া এতই ঘন যে হাতে তুলেই খাওয়া যায়।

৫ ডিসেম্বর তেরেক-দাভানের পথে রওনা হলাম। তাপমাত্রা চলনসই (৬ ডিগ্রি)। দলের লোকেরা এক-একজন এমন ঢোলা চামড়ার প্যান্ট পরেছে যে গায়ে চাপানো সমস্ত কাপড়চোপড়, মায় পশমের কোটটা পর্যন্ত সে-প্যান্টের ভেতরে চলে যায়। কোমরের প্যান্ট বগল অবধি উঠে এসেছে এদের।

জমাট বাঁধা সব ঝোরার বুকে ছোটো ছোটো নড়বড়ে কাঠের সাঁকো পেরিয়ে আমাদের পথ। বার্চ আর জুনিপারের সার পেরিয়ে উপত্যকার ঢাল ধরে এগোচ্ছি। দুই পাহাড়ের মধ্যিখানে বড়োজোর ফুট কুড়ি প্রশস্ত এক প্যাসেজে দাঁড়ালাম এসে। দরবাশেহ্‌ (দ্বার) বলে তাকে। তুষার মরুর বুকে আঁকাবাঁকা খাড়া পথ। অতিকষ্টে গিরিপথটার মাথায় গিয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে দিন ঢলে এল। অগুনতি মানুষ আর ঘোড়ার কংকাল তুষারের নীচে চাপা পড়ে আছে। তুষার ঝড় কতটা ভয়ংকর হয় এখানটায়, এ তার চাক্ষুষ প্রমাণ।

পুব আর দক্ষিণ ধরে পাহাড়শ্রেণির গোলকধাঁধা আর অবিশ্বাস্য বন্য দৃশ্যপট। পুবদিকে বয়ে চলা ঝোরাগুলো গরমের সময় লোপ-নোরে গিয়ে পড়ে। সেখান থেকে আবার পশ্চিমে বেয়ে জল গিয়ে মেশে আরাল সাগরে।

নামতে গিয়ে একবার আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম বড্ড। একপাল কিয়িক (বুনো ছাগল) আচমকাই উদয় হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল পাহাড়ের ঢলানে। উপত্যকার পর উপত্যকা তাঁবুর পর তাঁবুতে বিশ্রাম নিতে নিতে নীচে নামছি আমরা। রুশ সীমান্ত ঘেঁষে নাগারা-চালদির বনে ইরকেশ্তাম দুর্গ আর কিজিল-কু নদী নজরে এল। কুড়িটা তাঁবুতে মিলে একশো জন ইয়োয়াশ কিরগিজ বাস করে এখানটায়। তাদের মোড়ল নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানাল আমাদের। টক দুধ, চিটচিটে মাংস, মাছ-মাংস আর তরিতরকারি মিশিয়ে একটা সুরুয়া আর চা খেতে দিল।

চিন সীমান্তের দুর্গ উলুগচাতে আশি জন কিরগিজ আর পঁচিশ জন চিনা লোকের এক সৈন্যদলের প্রধান হচ্ছেন একজন খোয়াং দারিন। সন্ধেতে তিনজন বেগ আর বারোজন লোক সমভিব্যাহারে তিনি এলেন দেখা করতে। সঙ্গে উপহার আনলেন নাদুসনুদুস এক ভেড়া।

দিন যত যাচ্ছে, ধীরে ধীরে এই দেশ নিজের রূপ মেলে ধরছে। পুবের দিকে অসীম প্রান্তর, শেষ প্রান্ত তার মরুতে গিয়ে মিশেছে।

১৪ ডিসেম্বর কাশগরের চারদিক ঘিরে থাকা প্রথম গ্রামটায় গিয়ে উঠলাম আমরা। নগর প্রাচীরের বাইরে রুশ দূতাবাসও রয়েছে একখানা। লম্বাচওড়া, দাড়িওলা বয়স্ক একজন মানুষ সোনালি ফ্রেমের রোদচশমা চোখে এগিয়ে এলেন। মাথায় কোনাকার সবুজ টুপি, গাউনের মতো লম্বা ঝুলের খলত পরনে। আপ্যায়ন করে নিজের বাসস্থানে নিয়ে গেলেন আমাকে। নাম নিকোলাই ফিউদরোভিচ পেত্রোভস্কি, পূর্ব তুর্কিস্তানের প্রিভি কাউন্সিলর তথা ইম্পেরিয়াল রাশিয়ান কনসাল-জেনারেল। তাঁর বাড়িতেই ছিলাম টানা দশদিন। আমার পরবর্তী সফরগুলোতেও তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সাহায্য আমি পেয়েছি। তখন কাশগরই ছিল আমার মূল ডেরা।

বহু সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের সাক্ষী এই কাশগর। বহু আর্য আর মোঙ্গল রাজা রাজত্ব করেছেন এখানে। চেঙ্গিজ খাঁ আর তৈমুর লংয়ের সময়কার বহু স্মৃতি মিশে আছে এই মাটিতে। চিনেরাও বহুবার এই দেশে রাজত্ব করেছে। ১৮৬৫ থেকে ১৮৭৭ সাল অবধি রুশ-তুর্কিস্তানের স্বৈরাচারী শাসক ইয়াকুব বেগ তিব্বত আর তিয়ান-শাহের মধ্যবর্তী গোটা দেশে রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর চিনেরা ফের দখল নেয় এখানকার।

আশ্চর্য শহর এই কাশগর। পৃথিবীর অন্যান্য শহরের তুলনায় সমুদ্র থেকে এর দূরত্ব বেশি। দাও-তাই কাশগরের চিনে রাজ্যপাল হলেও এখানকার সবচাইতে ক্ষমতাধর মানুষ কিন্তু পেত্রোভস্কি। স্থানীয় সর্ত উপজাতির লোকেরা তাঁকে ‘দ্বিতীয় জগতাই খাঁ’ নামে চেনে। পঁয়তাল্লিশ জন কসাক আর দুজন আধিকারিকের একটা মিলিটারি দল রয়েছে তাঁর দূতাবাসে।

আরও চারজন মানুষকে আজও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি আমি। সেখানেই তখন বসবাস ছিল তাঁদের। দুজনে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন, আর বাকি দুজনের প্রাণ গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। শেষের দুজনের একজন ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে স্যার ফ্রান্সিস) ইয়ংহাসব্যান্ড, আর একজন মিস্টার (পরবর্তীতে স্যার জর্জ) ম্যাকার্টনি। ইয়ংহাসব্যান্ড মুসতাঘের গিরিপথ হয়ে সম্প্রতি এশিয়া সফরের লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। উপস্থিত নগর প্রাচীরের বাইরে দারুণ এক বাগান চিনিবাগে রয়েছেন। এখানে তাঁর ঘরবাড়ি কিছু ছিল না। কিন্তু যে বিশাল ঘরে (কিবিকা) থাকতেন তার গালিচা পাতা কাঠের মেঝে, দেওয়ালে দেওয়ালে বহুমূল্য কাশ্মীরি শাল আর ফরাসের সজ্জা। ম্যাকার্টনি ছিলেন তাঁর চিনে দোভাষী। সেই বাসস্থান ঘিরে আফগান, গুর্খা আর ভারতীয়দের বাস। এই দুই অমায়িক ইংরেজের সঙ্গে বহু স্মরণীয় সন্ধ্যা কাটিয়েছি আমি।

একদিন কনসালের পড়ার ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় চশমাপরা এক দাড়িওলা পাদ্রি সটান ঢুকলেন এসে। পরনে বৌদ্ধভিক্ষুদের মতো লম্বা আলখাল্লা। ঢুকেই সুইডিশ ভাষায় শুভেচ্ছা জানালেন আমাকে। পরিচয় পেলাম, ইনি ফাদার হেন্ড্রিকস, আদতে হল্যান্ডবাসী। ১৮৮৫ সালে টমস্ক থেকে কুলজার পথে কাশগরে পৌঁছান। সঙ্গে ছিলেন আর এক পোল্যান্ডবাসী, অ্যাডাম ইগন্যাটিফ। তবে এখানে কিন্তু কেউ ফাদারের অতীত জানে না। তিনি নিজেও এ-বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। কাশগরে আসা ইস্তক কোনও চিঠিপত্রও আসেনি তাঁর কাছে। ফলে তাঁর পরিচয় নিয়ে স্বভাবতই একটা ধোঁয়াশা রয়েছে এখানে।

অন্যদিকে ইগন্যাটিফ মানুষটির পরিচয় বেশ আকর্ষণীয়। বেশ লম্বাচওড়া। নিখুঁত কামানো গাল, ছোটো করে ছাঁটা চুল। গায়ের রঙ খড়িমাটির মতো সাদা, পরনেও সাদা পোশাক। গলায় ক্রুশওলা হার। লোকে বলে, পোল্যান্ড বিপ্লবের সময় এক রুশ পাদ্রির ফাঁসির কাজে নাকি সাহায্যকারী ছিলেন তিনি। সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। কনস্যুলেটের কাছাকাছি অতিসাধারণ এক ঘরে থাকেন। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা কনসালের বাড়িতেই।

ওদিকে এক ভারতীয় কাফেলা সরাইয়ে সাধারণ একখানা ঘরে থাকেন ফাদার হেন্ড্রিকস। মাটির মেঝে, কাগজের জানালা। সে-ঘরে আছে একপ্রস্থ চেয়ার-টেবিল, একটা বিছানা আর গোটাকতক মদের পিপে। ফাদার আবার মদ্য তৈরিতে দারুণ সিদ্ধহস্ত। ঘরের একটা দেওয়ালে একটা ক্রুশ, এতেই গির্জার কাজও চলে। দিলখোলা মানুষ, লোকজনের সঙ্গে আনন্দ-ফুর্তির সুযোগটি হাতছাড়া করেন না। তাঁর ঈশ্বর আরাধনার একমাত্র সঙ্গী ছিলেন অ্যাডাম ইগন্যাটিফ। গত ক’বছর ধরে ইগন্যাটিফকে নিয়ম করে ধর্মের বাণী শুনিয়ে আসছিলেন ফাদার। তারপর কী নিয়ে তুমুল ঝগড়া বাধে দুজনের মধ্যে। ইগন্যাটিফকে সটান তাঁর গির্জায় আসতে বারণ করে দেন ফাদার। দুজনের হৃদ্যতাও নষ্ট হয়ে যায়। পরিবর্তে এইবারে পিপে পিপে মদ বিলিয়ে লোকজনকে ঘরে ডেকে ধর্মোপদেশ দিতে শুরু করলেন ফাদার। অ্যাডাম বেচারা দরজার চাবির ছিদ্রে চোখ রেখে সে-দৃশ্য দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

নগরদ্বারের বাইরে কিছু চিনে সেনা ডেরা ফেলেছে। তবে বেশিরভাগ সেনাই থাকে এখান থেকে সাত মাইল দূরে পাঁচিল-ঘেরা নগর ইয়াঙ্গি শহরে। সর্ত কাশগরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য হচ্ছে তার খোলা বাজারহাট। বেপর্দা রমণীরা সেখানে দোকানপাট সামলায়, বেচাকেনা করে। একঘেয়ে হলদে-ছাইরঙা মাটির ঘরবাড়ির মাঝে এক দুটো মসজিদ চোখের আরাম আনে। হজরত আপাকের মাজারের পাশেই তুঁত আর সাধারণ গাছগাছালির ছায়ায় ইয়াকুব বেগের সমাধি। লোকে বলে, চিনেরা এই শহর দখল করে তাঁর মরদেহ তুলিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছিল। কাশগরের চারদিকে অমন অসংখ্য সন্তের কবর রয়েছে। তবে এইসব কবরের সবক’টাকে লোকেরা মান্য করে না অবশ্য, কিছু কিছু অবজ্ঞা আর উপহাসও করে। একটা উপাখ্যান শোনাই—

কাশগরের বাইরে এক সন্তের মাজারে বসে এক শেখ তার ছাত্রদের কোরান পাঠের শিক্ষা দিত। একদিন এক ছাত্র এসে বলে, “দয়া করে আমায় ক’টা টাকা আর কিছু খাবারদাবার দিন মৌলবি সাহেব, ভাগ্যান্বেষণে যাই।”

শেখ উত্তর দেয়, “একটা গাধা ছাড়া তো তোমাকে আর কিছু দেবার ক্ষমতা নেই আমার। উপস্থিত ওটাই নাও, আল্লাহ্‌ তোমার সহায় হোন।”

সেই গাধার পিঠে ছাত্রটি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পথ চলতে থাকে। শেষমেশ একদিন সুবিশাল মরুভূমিও পেরিয়ে এল প্রায়। এমনি সময় গাধাটা পথের ধকলে শুকিয়ে মরল। ছেলেটি এক গর্ত খুঁড়ে কবর দিল। তারপর নিজের এই ক্ষতি আর একাকিত্বে কবরে বসে কাঁদতে লেগেছে।

এই সময় পাশ দিয়ে ধনবান ক’জন বণিক যাচ্ছিল কাফেলা নিয়ে। একজনায় জিজ্ঞেস করে, “ও হে ছেলে, কাঁদছ কেন বসে?”

ছেলেটি উত্তর করে, “আমার একমাত্র বন্ধু, আমার বিশ্বস্ত সহচরকে আজীবনের মতো হারালাম আমি।”

বণিকেরা ছেলেটির এই আকুতিতে বিচলিত হল। সবাই মিলে পাহাড়ের মাথায় অপূর্ব এক সমাধি তৈরি করে দিল তারা। তাদের সুবিশাল বাণিজ্য-বহর সমাধির জন্যে ইটপাথর, সাজসজ্জা টেনে আনল। দেখতে দেখতে আকাশছোঁয়া উজ্জ্বল গম্বুজ আর মিনারের এক সমাধি-প্রাসাদ গড়ে উঠল এই মরুতে। মুখে মুখে নতুন সন্তের এই সমাধির খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ফলে কাতারে কাতারে সমাধিতে এসে হত্যে দিয়ে পড়ল কাছের দূরের যত তীর্থযাত্রী।

দীর্ঘ বছর পর কাশগরের সেই শেখও এসে একদিন হাজির হল সেখানে। সমাধিতে গেড়ে বসা তার সেই ছাত্রটিকে দেখে আশ্চর্য শেখ জানতে চায়, “হ্যাঁ রে, সত্যি করে বল তো কোন মহাত্মা শুয়ে আছেন এই কবরের নীচে?”

ছাত্র তখন ফিসফিস করে বলে, “সেই যে গাধাটি আপনি দিয়েছিলেন আমাকে। এইবারে আপনি বলুন তো কোন সন্তের সমাধিতে বসে কাশগরে কোরান পড়াতেন আমাদের?”

বৃদ্ধ শেখ হাসতে হাসতে উত্তর দেয়, “আর কে, তোর এই গাধার বাপ।”

 

॥ চোদ্দ॥

বোখারার আমিরের সান্নিধ্যে

বড়দিনের ঠিক আগের দিন ঘোড়ার পিঠে বেরিয়ে পড়লাম আবার। মনোরম বুনো পথ। সঙ্গে ঘোড়ায় টানা মালগাড়ি। চলেছি পশ্চিম এশিয়ার পথে। কনস্যুলেটে চাকরির মেয়াদ শেষে সেমিরিয়েৎচেনস্কের নারিনস্কে ফিরে যাচ্ছিল তিনজন কসাক। সে আবার রাশিয়ার সাত নদীর এক দেশ। সেই তিনজনের সঙ্গ ধরে নতুন পথে বের হলাম ফের।

মালবাহী ঘোড়ার ছোটো এক কাফেলা নিয়ে উত্তরের পথে চলেছি আমরা। সরু উপত্যকা বেয়ে পথ, সেখানে -৪ ডিগ্রি শীতের কামড়। খানে খানে জমে যাওয়া জলের নদী পেরোলাম গুটিকতক। এইবারে কসাকেরা এক খেল দেখাল বটে। প্রথমে তারা নদীর পাড় বেয়ে উঠতে লাগল যতক্ষণ না বরফ ভেঙে গড়িয়ে পড়ে। তার পরমুহূর্তেই নদীতে ঘোড়া নামাল বেগে। ইতিউতি জলে ভেসে থাকা বরফের চাঙড়ের ওপর ডলফিনের মতো লাফিয়ে চলল ঘোড়া। এদিকে আমি ভয়ে কাঁটা হয়ে আছি সেই চাঙড়ের ধারালো কানায় লেগে পেট না চিরে যায় বেচারি ঘোড়ার। এক এক লাফের সঙ্গে আমাদের জিনের আধাআধি জল পৌঁছে যাচ্ছে এসে। পা তুলে তুলে নিজেদের ফেল্ট বুটজুতোগুলো বাঁচাতে হচ্ছে আমাদের। ভিজে গেলেই বিপদ।

ওপরে উঠছি যত, শক্ত বরফ হয়ে আছে জল। স্ফটিক-স্বচ্ছ বরফে ঘোড়ার পা পিছলোচ্ছে বার বার, পাগলের মতো নৃত্য করে চলেছে যেন।

চিনে সীমান্ত পেরিয়ে এলাম একসময়। তুরুগার্তের গিরিপথ (১২,৭৪০ ফুট) বেয়ে চলেছি এইবারে। পেরিয়ে এলাম তুষারে জমে পাথর হয়ে থাকা চাতির-কুল হ্রদ আর তাশ-রাবাত গিরিপথ (১২,৯০০ ফুট)। এইবারে গিয়ে পড়েছি সার সার উপত্যকার গোলকধাঁধায়। তিয়ান-শান পর্বতশ্রেণির বিরাট সব বুনো পাহাড়ের জটিল আঁকিবুকি। চিনেদের ভাষায় গগনচুম্বী স্বর্গীয় পাহাড়।

শেষোক্ত গিরিপথ থেকে সোজা পথ নেমে গিয়েছে অগুনতি তীক্ষ্ণ বাঁকে। তার মাঝে তীক্ষ্ণ পাথরের এক-একটা পাহাড় আর শাখাপ্রশাখা। ইতিউতি জমে আছে তুষার আর বরফ। এইখানটায় এক মালবাহী ঘোড়া পা পিছলে পড়ল। খাড়া ঢালে গড়িয়ে পড়ে ঘাড় মটকে মরেই গেল।

 

এদিকে তুষারপাতের বিরাম নেই। ১৮৯১ সালের নববর্ষের দিনে সে যেন সাদা কাপড়ের ঠাসবুনটের এক অবগুণ্ঠন।

নারিনস্ক পৌঁছে যথারীতি কাফেলা বিদায় নিল। আমি তখন একাই পাড়ি দিলাম হাজার মাইল দূর সমরখন্দের পথে। সঙ্গে শুধু গাড়োয়ান। বরফের স্লেজ পথে ঘোড়া দৌড়ে চলে। সে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য বটে। সাধারণত দুটো ঘোড়াতেই টানছিল আমাদের গাড়ি। তবে তুষার যেখানটায় ঘন এবং ঝুরঝুরে, সেখানে তিনটে ঘোড়া জুতে দিচ্ছিল গাড়োয়ান। সে নিজের আসনের ডানদিকে বসে পা-দুটো ঝুলিয়ে রেখেছে বাইরে। ক্ষণে ক্ষণে তাড়না দিয়ে চলেছে ঘোড়াগুলোকে—‘আর খানিক জোরে বাবারা, আর খানিক জোরে ছোট।’ ঘোড়ার গলায় বাঁধা ঘণ্টি মিষ্টি টুংটাং শব্দ তুলেছে চলার তালে তালে। আর ওদিকে তুষার ঝরেই চলেছে। সাদা ঘোমটায় ঢেকে যাচ্ছে চরাচর। পথের ধারের খাঁজগুলোতে ফুটের পর ফুট তুষার জমা হয়ে চলেছে। বিপজ্জনক গতিতে এগিয়ে চলেছি আমরা। অমসৃণ পথে পড়ে নৌকোর মতো লাফিয়ে চলেছে স্লেজ গাড়ি। কিন্তু টলছে না সহজে। সমান্তরাল দুটো রানার লাগানো আছে যে। লাফিয়ে ওঠবার ধাক্কাটা প্রথমেই সামলে নিচ্ছে সেগুলো। অতএব গাড়ি কাত হয়ে উলটে পড়বার সম্ভাবনা নেই আপাতত। রাতে একবার মাত্র তুষার-ভরতি গর্তে উলটে পড়েছি আমরা। সে ছিল আরও বেশি ঢালের পথ। তবে বিপদ কিছু হয়নি, পরমুহূর্তেই গাড়িতে চেপে বসেছি ফের। যাই হোক, তীব্র ঝাঁকুনি আর লাফাতে লাফাতে কোনোমতে রাতের অন্ধকারে পথটুকু পার হয়েছি আমরা।

সুবিশাল ইসিক-কুল হ্রদের (উষ্ণ হ্রদ; তার কুসুম গরম জলের গুণে জমে না যাওয়ার কারণে এই নাম) সবচাইতে পশ্চিমের সংকীর্ণ প্রান্তে পৌঁছে বিখ্যাত রুশ পর্যটক জেভালস্কির সমাধি দর্শন করব বলে মনস্থির করলাম। শহরের কাছেই তাঁর কবর, আর তাঁর নামেই বর্তমানে এই শহর পরিচিত। এখান থেকে দূরত্বটা ঠিক কমও নয় অবশ্য, একশো ছাব্বিশ মাইল। পাহাড়ের মাথায় খ্রিস্টের অবয়ব গড়া কালো রঙের কাঠের ক্রুশ দাঁড়িয়ে। গলায় গুল্মের মালা। দু-বছর হল জেভালস্কি মধ্য এশিয়া যাত্রার দোরগোড়া এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় এসে গত হয়েছেন।

আলেকজান্ডার পর্বতশ্রেণির উত্তর পাদদেশ ধরে পশ্চিমদিকে আউলি আতা নামে ছোট্ট শহরের পথে রওনা হলাম। পেরোতে হবে আসা নামের এক নদী। হাঁটুজল তাতে। যাত্রী এবং পলকা মালপত্র সব ওই সাড়ে তিন ফুট গভীর জলে ‘আরাবা’-তে পেরোবে। আরাবা হচ্ছে গিয়ে উঁচু উঁচু দুই চাকা লাগানো এক খোল। আর ঘোড়ারা খালি স্লেজ নৌকোর মতো ভাসিয়ে টেনে নিয়ে যাবে।

 

একনাগাড়ে তুষার ঝরেই চলেছে। তাপমাত্রা এইবারে -৯ ডিগ্রিতে গিয়ে নেমেছে। ফলে তুষার এখনও ঝুরঝুরে। তিন ঘোড়ায় টানা গাড়ি খানাখন্দে পড়ে কয়েক ফুট করে লাফিয়ে উঠছে। আর ফেনার মতো তুষার ছিটকে উঠছে চারদিকে। তবে চিমখন্দ ও তাশখন্দ পৌঁছতে পৌঁছতে খানাখন্দের পরিমাণ অনেকটাই কমে এসেছে। তারপর রাজধানী শহরের পশ্চিমে এক খোলা ময়দানে স্লেজ ছেড়ে দিয়ে ট্যারান্টাসে চেপে বসলাম আমি।

চিনাসে গিয়ে সির-দরিয়ার বালুতটে পৌঁছলাম শেষে। জলে বরফ ভাসতে থাকায় ফেরি পারাপার সম্ভব নয় তখন। পরিবর্তে হালকা নৌকোয় যাওয়া চলে। আমি আর করল্যান্ডের এক তরুণ লেফটেন্যান্ট উঠে পড়লাম এক নৌকোয়। বলিষ্ঠ তিন মাঝি ভাসমান বরফে লোহা বাঁধানো লগি মেরে মেরে পার করে দিল দুজনকে।

নদী পেরিয়ে দুজনে আলাদা আলাদা তিন ঘোড়ার ট্যারান্টাস ভাড়া করে যে-যার পথে চলে গেলাম। মিসরা-রাবাতের আর অর্ধেক পথ বাকি, এমনি সময় আমার গাড়ির পেছনের অ্যাক্সেলখানা গেল ভেঙে। একখানা চাকা ঢিলে হয়ে গিয়ে হেঁচড়াতে লাগল গাড়ি। এতে ঘোড়া ব্যাটারা ভড়কে গিয়ে পাগলের মতো ছুট লাগাল নির্জন প্রান্তরে। সঙ্গে গাড়িও লাফাচ্ছে, ঝাঁপাচ্ছে; কখনও গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে টিলার গায়ে। প্রাণপণে চেপে ধরে বসে আছি আমি। দম ফুরোতে একসময় দৌড় থামাল তিন আপদ। গাড়োয়ান আর আমি মিলে ছড়ানো ছিটনো মালপত্র সব একত্র করে আবার একটা ঘোড়ার পিঠে চাপালাম তারপর। নিজেরা চড়ে বসলাম বাকি দুই ঘোড়ার খোলা পিঠে। বিধ্বস্ত ট্যারান্টাসখানা ফেলে রেখে এগিয়ে চললাম মিসরা-রাবাতের পথে। সেই তরুণ লেফটেন্যান্ট সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন আমাদের।

তার পরের অঘটনটা ঘটেছিল জিসাক নদীতে। আমরা সেদিন রওনাই হয়েছিলাম সন্ধে পার করে। মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ, বাতাসও বইছিল জোর। আর শীতের কথা তো বলেই লাভ নেই। নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় মাঝরাত। নদীতে জল এবং ভাসমান বরফ দুই-ই অত্যন্ত বেশি। আমাদের ট্যারান্টাস গাড়ি দুটো হাঁটুজলে গিয়ে যখন থামল, জনমনিষ্যির কোনও চিহ্ন নেই কোথাও।

করল্যান্ডের সেই লেফটেন্যান্ট বরফ-ভাসা জলে গিয়ে নামলেন প্রথমে। তাঁর গাড়ির আর একচুলও এগোবার উপায় ছিল না। ঘোড়াসুদ্ধ গাড়ির পেট গিয়ে বরফের স্তূপে আটকেছে, নট নড়নচড়ন। বিস্তর টানাহ্যাঁচড়ার পর ঘোড়ার বাঁধন খুলে দেওয়া হল। লেফটেন্যান্ট নিজের মালপত্র গুছিয়ে সহিসের সঙ্গে পাড়ে উঠে এলেন। গাড়ি পড়ে রইল জলেই। সম্ভবত পরের বসন্ত অবধি ওটা সেখানেই পড়ে ছিল, যতদিন না গরম পড়ে গিয়ে বরফ গলে।

সহিস দেখা গেল আরও একটা পথ চেনে যেখান দিয়ে নদী পার হওয়া সম্ভব। নদী আবার সেখানে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। লেফটেন্যান্টের দুটো ঘোড়া আমার ট্রয়কার সঙ্গে জুতে দেওয়া হল। মালপত্র রাখা হল আমার মালপত্রের সঙ্গে। নিজে গিয়ে বসলেন সহিসের আসনে ঘোড়ার দিকে পিঠ দিয়ে। ছইয়ের সামনাটা আঁকড়ে ধরে প্রাণপণে স্থির থাকবার চেষ্টা করে চলেছেন।

সব যখন ঠিকঠাক, নদীর প্রথম শাখাটা পেরোবার জন্যে রওনা হলাম আমরা। বরফের ওপর দারুণ আরামেই চলছে গাড়ি। বড়ো গাড়ির ক্ষেত্রে অবশ্য ঝাঁকুনি থাকত বেশ। ঘোড়াদের খুরের দাপটে চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে বরফের গুঁড়ো। ঘোড়া একটা পিছলে পড়ছিল, আবার সামলেও নিল। পরের শাখানদীটায় পৌঁছনো অবধি সব ঠিকই ছিল। সে-নদীর ঢাল খাড়া নেমে গিয়েছে জলে, আর তারপরই নদীটা তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়েছে ডানে।

সহিস চেঁচিয়ে, গাল পেড়ে চাবুকের ডগায় ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে। মুখে ফেনা তুলে উল্কার মতো ছুটছে ঘোড়া, আর তা এসে ছিটকে পড়ছে পেছনে। দৌড়ের ছন্দে নেচে নেচে উঠছে এক-একটা পেশি। দৌড়ে গিয়েই ঘোড়াগুলো লাফিয়ে পড়ল নদীতে। আর সঙ্গে-সঙ্গেই অর্ধেক ডুবে গেল জলে। নদীর সেই বাঁকে এসে পৌঁছলাম আমরা। গাড়ির ডানদিকের দুটো চাকা তখনও বরফের ঢালে আটকে, আর বাঁদিকের দুই চাকা গিয়ে পিছলে পড়েছে জলে। চোখের পলকে ঘটে গেল ঘটনাটা। বিপদ বুঝে ছইয়ের একেবারে ডানদিকে চেপে গেছিলাম আমি। বাঁকটা নেওয়ার সময় ঘোড়াদের গতি ছিল চূড়ান্ত। তিন ফুট জলে গিয়ে আটকে গেল আমাদের গাড়ি। আর ঠিক সেই গতিতেই টুকরো হয়ে গেল ছইটা। একেবারে সামনের দুটো ঘোড়া পড়ে গিয়ে দড়িদড়ার সঙ্গে জড়িয়ে-মড়িয়ে একাকার। ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের সহিস জলে ঝাঁপিয়ে না পড়লে ডুবেই যাচ্ছিল প্রায় সে-দুটো। নদীতে সেখানটায় বুকজল। লেফটেন্যান্ট সাহেবও গাড়ি ছেড়ে তক্ষুনি লাফিয়ে পড়তেই বরফের এক চাঙড়ে গিয়ে মোক্ষম ধাক্কা খেলেন। এদিকে মালপত্র সব উড়ে গিয়ে জলে পড়েছে আমাদের। আমার কম্বল, পশমের কোট, ফরাস ইত্যাদি সব ভেসে যাচ্ছে স্রোতে। জিনিসপত্র অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমরাও ভিজে চুপসে একশা। ধীরে ধীরে মালপত্র সব জল থেকে তুললাম আমরা। ঘোড়ার পিঠে ওগুলোকে ও-পাড়ে পাঠিয়ে শেষে বরফের চাঁই টপকে টপকে নদী পেরোলাম। পরবর্তী স্টেশন অবশ্য খুব দূর নয়। জিনিসপত্র সব ওখানে বসেই শুকিয়ে যতটুকু সম্ভব উদ্ধার করলাম। তবে লেফটেন্যান্ট সাহেব জোর বেঁচে গিয়েছেন এ-যাত্রা। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন সাক্ষাৎ। সমরখন্দে পৌঁছে তাঁকে যখন হাসপাতালে ভরতি করাই, ধুম জ্বর তখন।

***

বোখারার আমির সইদ আবদুল আহাদের কাছ থেকে আমন্ত্রণ এল একদিন। উপস্থিত নিজের শহর-ই-সবস্‌ দুর্গে রয়েছেন তিনি। জায়গাটা সমরখন্দ থেকে মাইল পঞ্চাশের মধ্যেই। এই দুর্গেই ১৩৩৩ সালে জন্মেছিলেন তৈমুর লং। সেই অর্থে ইতিহাস-বিখ্যাত দুর্গ। তাঁরই লতায় পাতায় এক উত্তরাধিকারীর সাক্ষাতে চলেছি আমি। সার প্রদেশের এই সামন্ত আমির মস্কোতে তৃতীয় আলেকজান্ডারের রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তাঁর কীসে বেশি আসক্তি জানতে চাইলে সটান উত্তর দিয়েছিলেন, ‘বরফ দেওয়া লেবুজল।’

সীমান্তে একদল অশ্বারোহী স্বাগত জানাল আমাকে। তারপর তাদের সঙ্গেই পেরিয়ে গেলাম গ্রামের পর গ্রাম। পথ যত এগোচ্ছে, অশ্বারোহী প্রহরীরা ততই ভারী হচ্ছে দলে। ফরাস পাতা দারুণ ক’টা ওমওলা ঘরে রাত কাটাবার ব্যবস্থা হল আমাদের। সেখানে দেখি খাবারদাবারের এলাহি আয়োজন। ঘরে ঘরে দস্তরখান; তাতে থরে থরে প্যাস্ট্রি, কিশমিশ, কাঠবাদাম, ফল আর মিষ্টি সাজানো। দৈনিক খাদ্য মাংস তো আছেই। শাদিবেগ কারাওল বেগি শিঘাউল নামের একজন আধিকারিক লাল-নীল মখমলের খলত পরা একদল কর্মচারী নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে দেখা করতে এলেন আমার সঙ্গে। ঘোড়াদের পিঠেও সোনার সুতোয় অপূর্ব কাজ করা জিন। আমিরের তরফে আমায় স্বাগত জানাতে এসেছেন তাঁরা। চারদিক ঘিরে আমাদের এই দর্শনীয় অশ্বারোহী বাহিনীকে দেখতে ভিড় জমাল লোকে।

 

কিতাব শহরে পৌঁছতেই সেখানকার হাকিম সাহেব এক ভোজসভায় আয়োজন করলেন আমার সম্মানে। সেখানে আমার নিজের দেশ আর সুইডেন ও রাশিয়ার মধ্যে বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে বহু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হল। পরে বুঝেছিলাম, এ-দেশের আমির সুইডেন সম্পর্কে যথেষ্ট আগ্রহী এবং ওয়াকিফহালও।

সমরখন্দে তৈমুর লঙের সভায় যাবার পথের যে বর্ণনা দিয়েছিলেন ক্লাভিজো, তাতে এ-দেশের আনুষ্ঠানিকতায় প্রায় পাঁচশো বছর পরেও তেমন কিছু রদবদল দেখলাম না। হিন্দুস্তানে মোগল বংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের আত্মকথায় পড়েছি, শহর-ই-সবস্‌ আর কিতাব নগর দুটি অতীতে একই প্রাচীরে বেষ্টিত ছিল। বসন্তে তার শ্যামল বাহার ছিল দেখা মতো। হরিৎ নগরী নামেও লোকে চিনত তাকে।

এক প্রাসাদে থাকবার ব্যবস্থা হল আমার। আয়োজন হল রাশি রাশি খাবারের একত্রিশটা পদের বিশাল এক দস্তরখানের। আমার বিছানায় লাল রেশমের কাপড়, আর মেঝেতে অপূর্ব দেখতে বিরাট আকারের বোখারি ফরাস পেতে দেওয়া হল। ইস্‌, সে-দুটো বাড়ি নিতে যেতে পারতাম যদি!

পরদিন সকাল ন’টায় শাহি অভ্যর্থনার সময় স্থির করাই ছিল। যথাসম্ভব সেজেগুজে আক সরাই হয়ে—একদা যেটা তৈমুর লঙের প্রাসাদ ছিল, রওনা হলাম আমি। সঙ্গে চলেছেন নীল উর্দির একদল আধিকারিক। পঞ্চাশ জন সশস্ত্র প্রহরী আর সঙ্গে জনা ত্রিশের এক বাদ্যকরের দল। শোভাযাত্রার পুরোভাগে দুই অগ্রদূত, পরনে সোনার জরির কাজ করা খলত আর হাতে সোনার লাঠি।

তিনটে দুর্গের আঙিনা পেরিয়ে নতুন এক দুর্গে গিয়ে আর এক দল শাহি কর্মচারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। বিশাল এক অভ্যর্থনা কক্ষে নিয়ে হাজির করা হল আমাকে। কক্ষের ঠিক মধ্যিখানে দুটো হাতলওয়ালা চেয়ার পাতা। তার একটায় আমির বসে আছেন স্বয়ং। উঠে এসে তিনি পার্সিতে অভ্যর্থনা জানালেন আমাকে। খাঁটি আর্য চেহারা—লম্বাচওড়া, সুদর্শন মানুষ; গালে কালো দাড়ি। সাদা সাটিনের পাগড়ি মাথায়, পরনে নীল রঙের মখমলি খলত, দুই কাঁধে সামরিক অভিজ্ঞান, কোমরবন্ধে চন্দ্রহাস গোঁজা। বেশভূষা ঝলমল করছে হিরকদ্যুতিতে।

টানা কুড়ি মিনিট ধরে আমার অভিযাত্রা, সুইডেন, রাশিয়া আর বোখারা নিয়ে কথা হল আমাদের। তারপর নগরপাল অবিস্মরণীয় এক ভোজে আমন্ত্রণ জানালেন। গুনে গুনে চল্লিশটি পদ ছিল তাতে। সেই উপলক্ষে সোনার এক স্মারকও উপহার দিলেন তিনি আমিরের তরফে। সঙ্গে এক স্তুতি পত্র—

‘এই পুণ্য মুহূর্তে ইস্টকহোমের আগা স্যেন হেডিন মহোদয় উপস্থিত আছেন আমাদের তুর্কিস্তান দর্শনের অভিপ্রায়ে। তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের বন্ধনের কারণেই বর্তমানে রুশ সম্রাটের সঙ্গে আমাদের আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপন সম্ভবপর হয়েছে (!) বোখারার যত্রতত্র প্রবেশ ও ভ্রমণে তাঁর শাহি অনুমতি রইল এবং ভবিষ্যতেও যখন ইচ্ছে আমাদের দেশে আগমনের মিনতি রইল।…’

কিন্তু আমির এবং তাঁর অনুচরদের ফিরতি উপহার হিসেবে দেবার মতো কিছুই ছিল না আমার হাতে। আমার পথখরচের জোগান সীমিত, তাতে অমিতব্যয়িতার কোনও সুযোগ নেই। পরিবর্তে আমার ব্যবহারে সুইডেনের যাতে কোনও বদনাম না হয়, সেই চেষ্টাই করছিলাম তৈমুরের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী এই মানুষটির সঙ্গে।

পরবর্তী এক সপ্তাহ কাটল বোখারার রুশ দূত লেসারের সান্নিধ্যে। গোটা এশিয়ার শাহি দরবারে সবচাইতে জ্ঞানী ও অমায়িক দূত হিসেবে তাঁর খ্যাতি রয়েছে।

এইবারে দেশে ফিরে যাবার প্রস্তুতি। কারা-কুম মরুভূমি হয়ে, কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে, ককেশিয়ার পথ ধরে আর নভরোস্কিয়স্ক, মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও ফিনল্যান্ড হয়ে স্টকহোমে নিজের সেই পুরোনো বাড়িতে ফিরে এলাম আমি।

(চলবে)

ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply