আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা, মুনিয়া, কাজল পাখি , দোয়েল-কোকিল-ময়নাবুলবুল, বকপাখি, মোনাল দেখার গল্প,পাঁচ বউয়ের কাহিনি, ঘুঘুর বাসা, টুনটুনি,বাঁশপাতি, মোহনচূড়া , হাট্টিমাটিমটিম থেকে হটিটি, রামগাংড়া, ডাহুক কেন ডাকে, বাদামি কোকিল, পাপিয়া, পাতি জলমুরগি, প্যাঁচা, পানডুবি, নীলকণ্ঠ, কাস্তেচরা, চাতক
কালো মথুরার বৈজ্ঞানিক নাম Lophura leucomelanos, ইংরেজি নাম Kalij Pheasant। মথুরার ৯টি প্রজাতির মধ্যে এই প্রজাতি পূর্ব ভুটান, বাংলাদেশ, উত্তর-পূর্ব ভারত ও মিয়ানমারে দেখা যায়। এদের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৬২ সেন্টিমিটার, ডানা ২২ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ৩.৫ সেন্টিমিটার, পা ৭.৫ সেন্টিমিটার, লেজ ২৩ সেন্টিমিটার ও ওজন ১.৩ কেজি। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। পুরুষ মথুরার পিঠ উজ্জ্বল নীল ও কালো রঙ মেশানো। কোমর ও পেছনের পালকের প্রান্ত সাদা। মাথার চূড়ার পালক খাড়া ও পেছনমুখী। মুখ পালকহীন, মুখের চামড়া ও গলায় ঝুলন্ত লতিকা উজ্জ্বল লাল। স্ত্রী মথুরার দেহে অনুজ্জ্বল বাদামি পালকের ধূসর প্রান্ত আঁশের মতো দেখায়। মাথার চূড়া ও লেজের পালক প্রায় বাদামি। গলা পীতাভ-বাদামি। কোমর ও পায়ের পালকের প্রান্তদেশ ফিকে। চোখের আশপাশের অল্প একটু অংশ পালকহীন ও উজ্জ্বল লাল। স্ত্রী ও পুরুষ মথুরার উভয়ের চোখ পিঙ্গল থেকে কমলা-বাদামি। উভয়ের লেজ মোরগের লেজের মতো। পা ও পায়ের পাতা বাদামি। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে প্রায় স্ত্রী মথুরার মতো, তবে পিঠে কালচে-বাদামি ও পীতাভ ডোরা দেখা যায়। কালো মথুরা বনের প্রান্তে ও বনসংলগ্ন খোলা জায়গায় বিচরণ করে। সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় বা পারিবারিক ছোটো দলে থাকে। ভোরে ও গোধূলিতে এরা বেশি সক্রিয় থাকে। দিনের বেলা গাছের নীচু ডালে বিশ্রাম নেয়। সকাল ও সন্ধ্যায় নীচু স্বরে মুরগির মতো ডাকে। এরা খুব লাজুক পাখি, মানুষের আনাগোনা টের পেলে দ্রুত লুকিয়ে পড়ে। এরা মাটিতে ঘুরে ঘুরে খাবার খুঁজে বেড়ায়। এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে বাঁশবীজ, ডুমুর, বটফল, পিঁপড়া, উইপোকা, ছোটো সাপ ও গিরগিটি। সাধারণত মার্চ থেকে অক্টোবর মাসে পুরুষ কালো মথুরার ডাকাডাকি বেড়ে যায়। স্ত্রী মথুরা ঘন ঝোপের নীচে নখ দিয়ে মাটি আঁচড়ে পাথর, লতাপাতা বা ঘাসের গোছা দিয়ে বাসা বানায়। বাসা বানানো শেষে ৬-৯টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো ফিকে-পীতাভ বা পীতাভ-সাদা থেকে লালচে পীত বর্ণের হয়। স্ত্রী মথুরা একাই ডিমে তা দেয়। ২০-২১ দিনে ডিম ফোটে। দ্য জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (জেড.এস.আই), ভারত সরকারের পরিবেশ, বন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক দ্বারা প্রকাশিত বই – দ্য বার্ডস অফ ইন্ডিয়া-তে এই পাখিকে প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন (International Union for Conservation of Nature – I.U.C.N) ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণা পক্ষী-প্রেমিকদের কিছুটা আশ্বস্ত করবে।
আমাদের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার পাহাড়ি শৈল শহরে অবস্থিত একটি উপত্যকার নাম এই পাখির নামাঙ্কিত – কালেজ উপত্যকা। এক সময় এই স্থানে প্রচুর পরিমাণে কালো মথুরার দেখা পাওয়া যেত। সেই থেকে এক ইংরেজ সাহেব এই উপত্যকার নামে রেখেছেন কালেজ উপত্যকা। সেখানে ঘন জঙ্গল থাকার জন্য হয়তো কদাচিৎ এই পাখির দেখা পাওয়া যায়। আজকাল শোনা যায়, এই উপত্যকায় বেশ কিছু পর্যটকদের আনাগোনা হয়েছে। এখানে কিছু হোম-স্টে হয়েছে পর্যটকদের জন্য আর তাছাড়া এখানে রয়েছে এক অপূর্ব জলপ্রপাত, নাম রেনবো ওয়াটারফলস অর্থাৎ রামধনু অথবা ইন্দ্রধনু জলপ্রপাত। কারণ, এই জলপ্রপাতের ওপর সূর্যের কিরণ পড়লেই রামধনুর সৃষ্টি হয়। আমারও ইচ্ছে রইল একবার এই উপত্যকা ঘুরে দেখার যদি জলপ্রপাতের সঙ্গে কালো মথুরার দেখা মেলে তাহলে তো কেল্লা ফতে!

২০১৭ সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে ঠিক করলাম দিল্লি যাব। ওখানে কিছুদিন কাটিয়ে রওনা দিলাম উত্তরাখণ্ডের কুমায়ূন বিভাগের বিখ্যাত জঙ্গল ইংরেজ শিকারি ও পরবর্তীকালে বন ও বন্য পশু সংরক্ষণকারী জিম করবেট অভয়ারণ্যে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। ইন্টারনেটে অভয়ারণ্যের বিজরানি ও আর-একদিন গৈরাল অঞ্চলে বনবিভাগের বাংলোতে থাকার সুবন্দোবস্ত হয়ে গেল। জঙ্গল সাফারির জন্যও একটা হুড-খোলা জিপ গাড়ির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল ইন্টারনেট মারফত। সেই গাড়ি আমাদের রামনগর রেলস্টেশন থেকে নিয়ে গেল বিজরানি বন বাংলোতে। পরের দিন সকাল ৬টায় সাফারি আরম্ভ। দু-ঘণ্টা সাফারির পর ফিরে এসে স্নান-আহার সেরে আবার ১০টা থেকে সারাদিনের সাফারি। মাঝে দুপুরের আহারের জন্য এক ঘণ্টার বিরাম। আমাদের জিপ গাড়ির চালক রশিদ খাঁ এক প্রাণবন্ত যুবক। সম্পূর্ণ অভয়ারণ্য যেন ওর হাতের তালুর মধ্যে। ঠিক কোথায় গেলে কী দেখতে পাওয়া যাবে, ও যেন দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পায়। আমার মনে হল, ওর একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করে বনের মধ্যে ঘোরার সময়। এক সময় তো মনে হয়েছিল ও যেন ঘ্রাণেই বুঝে নেয় কোন প্রাণী কোন দিকে রয়েছে। পাখিদের ডাক শুনে নাম বলে দিতে পারে। হরিণের ডাক অথবা মর্কট প্রাণীদের কোলহলে ও বলে দিতে পারে কোন অঞ্চলে বাঘ অথবা লেপার্ডের দেখা মিলতে পারে। এইভাবেই ও আমাদের রাস্তার মাঝে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এক বাঁকের ঠিক আগে আর আমাদের চুপ করে থাকতে বলল। কিছুক্ষণ পরেই বাঁক ঘুরেই হেলতে-দুলতে জঙ্গলের রাজা থুড়ি রানি। রশিদ বলে দিল, এই ব্যাঘ্র জঙ্গলের সবথেকে প্রবীণ বাঘিনী, এর নাম শর্মিলি। এর চারটি সন্তান ও বেশ কিছু নাতি-নাতনিও রয়েছে। পরে বনবাংলোতে ফিরে গিয়ে অন্যান্যদের কাছে দিনের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে শুনলাম, আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে প্রথমবারেই বাঘের দর্শন পেলাম, তাও আবার এত কাছ থেকে। একই দিনে আমরা তিনবার বাঘের দর্শন পেয়েছিলাম। অনেকে তিনবার এসেও একবারও বাঘ দেখতে পায়নি।
এই জঙ্গলের পথে গাড়ি নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে রশিদ আমাকে বহু প্রজাতির পাখির ছবি তুলতে সাহায্য করেছে। ওর কাছে ধনেশ অর্থাৎ হর্নবিল পাখি দেখতে চাওয়াতে ও গাড়ি এমন জায়গার দাঁড় করাল যেখান থেকে এক গাছের ডালে না-হলেও দু-ডজন রাজ-ধনেশ দেখতে পেয়েছিলাম। সেই পথেই আবার মেঠো পথের ধারে বাঘ-বাবাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ, কাছেই একটা ঝোরা সেখানে জল খেতে এসেছিল। আমাদের দেখে হেঁটে গিয়ে ঘন ঝোপের মধ্যে প্রবেশ করে বসে থাকল। গাড়ি আবার কিছুটা এগিয়ে এক রাস্তার মাঝে থেমে গেল। আমি মনে করলাম আবার হয়তো বাঘমামার সঙ্গে সাক্ষাৎ হল, কিন্তু তা নয়। আমার চোখ পড়ল দুটি পাখির দিকে অবিকল গৃহপালিত মোরগ ও মুরগির মতো দেখতে, কিন্তু মোরগের গায়ে অদ্ভুত রঙের ছটা। মুরগি তুলনায় ফ্যাকাসে না হলেও বাদামি রঙের। গাড়িকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড় করানো হল, কারণ বেশি কাছে গেলই এরা ঝোপে লুকিয়ে পড়বে। দূর থেকেই এই পাখিজোড়াকে দেখে গেলাম। গৃহপালিত মুরগি থেকে আচার-আচরণে কিছু আলাদা মনে হল না। খাবার মাটি থেকে খুঁটে খাওয়ার ধরন একইরকম। কেবল পুরুষ পাখির গায়ের নীলচে রঙের ছটা ও মাথায় এক অপূর্ব ঝুঁটি এদের আলাদা করে তোলে। স্ত্রী পাখির মাথায়ও একই প্রকারের ঝুঁটি। আমার মনে হয় জঙ্গলে বসবাসকারী ফিসেন্ট পরিবারের পাখিদের ঈশ্বর খুব যত্ন করে রঙ তুলি দিয়ে এঁকেছেন। উদাহরণস্বরূপ মোনাল, কোকলাস ফিসেন্ট, ব্লাড ফিসেন্ট ইত্যাদি। একমাত্র কালো মথুরাকে দেখা যায় হিমালয়ের পাদদেশে, বাকি ফিসেন্টরা থাকে উঁচু পাহাড়ের ঢালে।
যদি জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে এই সুন্দর পাখি যুগলের দেখা মেলে, প্রথমে কথা না বলে কেবল চোখ মেলে এদের দেখে যাবেন। এরা খোলা জায়গায় খুব কম বিচরণ করে আর মানুষের গন্ধ পেলে তো একবারে নয়। আমার সৌভাগ্য যে রশিদের মতো এক ওস্তাদ প্রাণী বিশেষজ্ঞ আমার সঙ্গে ছিল তাই ঠিক কতটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াতে হবে ও সেটা জানত। তাই বনভ্রমণ কালে একজন বিশেষজ্ঞ সঙ্গে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন যার জঙ্গল নখদর্পণে।
বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে