আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা, মুনিয়া, কাজল পাখি , দোয়েল-কোকিল-ময়নাবুলবুল, বকপাখি, মোনাল দেখার গল্প,পাঁচ বউয়ের কাহিনি, ঘুঘুর বাসা, টুনটুনি,বাঁশপাতি, মোহনচূড়া , হাট্টিমাটিমটিম থেকে হটিটি, রামগাংড়া, ডাহুক কেন ডাকে, বাদামি কোকিল, পাপিয়া, পাতি জলমুরগি, প্যাঁচা, পানডুবি
অত্যন্ত সুন্দর দেখতে একটি পাখি এই নীলকণ্ঠ। বিশেষজ্ঞরা বলেন সারা দেশ জুড়েই এর বিচরণক্ষেত্র অথচ এই পাখি সহজে চোখে পড়ে না। নীলকণ্ঠ অর্থাৎ, যার গলা নীল। সমুদ্র মন্থনের সময় নির্গত হলাহল পান করেছিলেন শিব। সেই বিষকে নিজের কণ্ঠে ধারণ করার ফলে, জ্বালায় মহাদেবের কণ্ঠ নীলবর্ণ হয়ে যায়। তাই শিবের আর এক নাম নীলকণ্ঠ। নীলকণ্ঠকে পৃথিবীতে শিবের প্রতিনিধি ও স্বরূপ, দুই-ই মনে করা হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, নীলকণ্ঠ রূপ ধারণ করেই শিব মর্ত্যে বিচরণ করেন। প্রচলিত রয়েছে যে এই পাখির দেখা পেলে ধনধান্য বৃদ্ধি হয়। আবার এর কৃপায় বাড়িতে শুভকার্য লেগেই থাকে।
নীলকণ্ঠ পাখি দেখা নিয়ে একাধিক ধারণা প্রচলিত রয়েছে। বিজয়া দশমীর দিনে নীলকণ্ঠ পাখির দর্শন শুভ মনে করা হয়। সেদিন নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো ও এই পাখি দেখা যাওয়াকে অত্যন্ত শুভ মনে করা হয়।
‘যাও উড়ে নীলকণ্ঠ পাখি, যাও সেই কৈলাসে,
দাও গো সংবাদ তুমি, উমা বুঝি ওই আসে।’—
একটি ধারণা অনুযায়ী, ন’দিন মর্ত্যে কাটিয়ে দশমীর দিনে কৈলাসে গমন করেন দেবী দুর্গা। তখন নীলকণ্ঠ পাখিই মহাদেবকে উমার আগমনবার্তা পৌঁছে দিয়ে আসে। দশমীর দিন দুটি নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হয়। প্রথমটি মণ্ডপ থেকে দেবী দুর্গার যাত্রা শুরু হওয়ার সময় ও অপরটি দেবী দুর্গার নিরঞ্জনের পর।
অপর একটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, নীলকণ্ঠ পাখির দর্শনের পরই রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করেন রামচন্দ্র। লঙ্কাজয়ের পর রামের ওপর ব্রহ্মহত্যার পাপ লাগে। এরপর লক্ষ্মণের সঙ্গে মিলে রাম শিবের আরাধনা করেন ও ব্রাহ্মণ হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হন। সে সময় শিব নীলকণ্ঠ পাখির রূপ ধারণ করে মর্ত্যে এসেছিলেন। নীলকণ্ঠ পাখিকে আবার কৃষকমিত্রও বলা হয়। খেত-খামারে ফসলে লেগে থাকা কীট খেয়ে কৃষকদের সহায়তা করে নীলকণ্ঠ পাখি। উল্লেখ্য, এককালে বনেদি ও জমিদার পরিবারে দুর্গাপুজোর পর এই পাখি ওড়ানোর রীতি প্রচলিত ছিল। তবে বর্তমানে পাখি ধরা নিষিদ্ধ হওয়ায়, সেই রীতি পালন সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে অনেকেই নীলকণ্ঠ পাখি আঁকা ফানুস উড়িয়ে থাকেন।
এই পাখির পেট ও ডানার ভিতরের রঙ হালকা আকাশী। বুকের রঙ লালচে বাদামি। মাথার আকার বেশ বড়ো এবং চ্যাপ্টা রকমের আর মোটা বড়ো ঠোঁট। ওড়ার সময় ওদের আরো সুন্দর দেখায় যখন ডানার ওপরের গাঢ় নীল রঙ খুলে উঠে। আমি এই পাখি একবার জলদাপাড়ার কাছে এক গ্রামের মাঠে সাপ ধরতে দেখেছিলাম আর ঝাড়খণ্ডের রাস্তায় বিদ্যুৎ ও টেলিগ্রাফের তারে বসে থাকতে দেখেছি। এদের প্রধান খাদ্য কৃষিকাজের ক্ষতিসাধন করে সব পোকামাকড়, এছাড়া সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, গিরগিটি ইত্যাদিও খেয়ে থাকে। বর্ষাকাল এদের প্রজননের সময়। কর্কশ স্বরে ডেকে এরা সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করে। গাছের ডালের ফাঁকে বা ফোকরে এরা খড়কুটো দিয়ে বাসা বাঁধে। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি নীলকণ্ঠ পাখি কর্ণাটক, ওড়িশা ও তেলেঙ্গানা রাজ্যের প্রাদেশিক পাখিও।
জলদাপাড়ার গ্রামে যখন ছবি তুলতে অক্ষম হলাম, মন ভীষণ খারাপ হয়েছিল আমার পাখির অ্যালবামে এই পাখিকে যোগ না করতে পারার জন্য। আমি ছিলাম গাড়ির মধ্য সবার মাঝে বসে। বাইরে বেরনোর আগেই দেখতে পেলাম যে একটা সরীসৃপকে পায়ের নখ দিয়ে আঁকড়ে ধরে উড়ে গেল। সাপটা বিষাক্ত কি না বুঝতে পারলাম না। আবার ঝাড়খণ্ডেও একাধিক জায়গায় সেই গাড়ি চলাকালীন, দেখতে পেয়েও কাজে লাগাতে পারলাম না আমার লেন্সটাকে। আরো একবার, ট্রেনে করে অফিস যাচ্ছিলাম। কপালজোরে সেদিন জানালার কাছে একটা বসার জায়গা পেলাম। কল্যানি স্টেশন ছাড়ার পর, কাঁচরাপাড়া আসার আগে একটা সরু নোংরা খাল পড়ে, যেটাকে বাঘের খাল বলা হয়। খালের এই অদ্ভুত নামকরণ নিশ্চই অনেক পুরনো কালের যখন এই সব এলাকায় বাঘ দেখা যেতো। সেই বিষয় না গিয়ে বলি যে এই খালের আগে কিছুটা খোলা মাঠের মতো জায়গা রয়েছে আর রয়েছে কিছু গাছগাছালি আর ঝোপঝাড়। ট্রেনে গতি বেশ দ্রুত এবং তার মধ্যেই চোখে পড়ল একটা বাঁশের খুঁটির ওপর বসে নীলকণ্ঠ পাখি। আমার মনে হচ্ছিল ট্রেনটা যদি এই মুহূর্তে এখানে থেমে যায় আমি অফিসে জানিয়ে এখানেই নেমে পড়ব। অন্তত এই জায়গায় আমি নীলকণ্ঠ দেখার আশা করিনি। আমার মনে হল আমি যদি এই পাখির খোঁজে বেরিয়ে পড়ি তাহলে নিশ্চই দেখা পাব। শনিবার আমার ছুটি থাকে কিন্তু সে আসতে তখনো চার দিন বাকি। ততদিন আমি ছটফট করছি ক্যামেরা কাঁধে বেরোনোর জন্য। অথচ আমি নিরুপায়, অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তাও জানি না বেরোলেই যে আমি নীলকণ্ঠ দেখতে পাব তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবুও হাল তো ছেড়ে দেওয়া যায় না। একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি।
অবশেষে আমার বহু আকাঙ্খিত সেই শনিবার এল। আমার ক্যামেরার পরীক্ষানীরিক্ষা করে আমি বেরিয়ে পড়লাম গাড়ি নিয়ে। অবশ্যই চালক ছিল কারণ নিজে গাড়ি ড্রাইভ করলে আর পাখি খুঁজবো কী করে? আমি প্রস্তুত আর আমার ক্যামেরা তৈরি কেবল অপেক্ষা নীলকণ্ঠের উড়ে আসার অপেক্ষায়। একই বাঁশের খুঁটির ওপর এসে প্রতিদিন বসবে একি আর হয়। তবে ইদানিং এক পাকড়া কাঠঠোকরা প্রতিদিন একই জায়গায় এসে ঠোকর মারছে। নীলকণ্ঠের স্বভাব আমার জানা নেই। একই স্থানে কতদিন থাকে। এদিকে বাসা বেঁধেছে কিনা জানা নেই। তবে সময়টা ছিল বর্ষাকাল, এই পাখির প্রজননকাল, সেই অর্থে দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশ প্রবল। আমি বেশ উত্তেজিত, চোখ কেবল ঘোরাঘুরি করছে। আমার গাড়ির চালক এই পাখি চেনে না কিন্তু ওকে বলে রেখেছি যদি ওর অচেনা পাখি নজরে আসে ও গাড়ি থামিয়ে ততক্ষণাৎ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। বেশ কিছু বাঁশপাতি, মাছরাঙা দেখিয়ে ও কয়েকবার গাড়ি থামিয়েছে। তারপর ওকে বললাম শালিকের চেয়ে একটু বড়ো আকারে, সেরকম কিছু দেখতে পেলে আগে গাড়ি থামাবে তারপর দেখাবে কেবল আঙুল দেখিয়ে, চেঁচাবে না।
আমার নির্দেশমতন ও গাড়ি একটা সীমিত গতিতে চালিয়ে যাচ্ছিলো যদি হঠাৎ করে পাখি দেখা যায় দ্রুত গাড়ি থামাতে পারবে।
শেষ পর্যন্ত ওই এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে এক দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখাল, ফাঁকা জায়গা, মানুষজন বিশেষ নেই। গাড়ি থেকে নামলাম, আমার চালকও নামল। ওর আঙুল এখনো সেদিকে তোলা। একটা দেওয়ালের স্তম্ভ ও তার ওপরে বসে নীলকণ্ঠ।

আমি চালককে ধন্যবাদ জানালাম আমার মনবাঞ্ছা পূর্ণ করার জন্য। একাধিক ছবি তোলার সুযোগ পেলাম। পরে পাখিটা উড়ে গিয়ে এক গাছের ডালে বসল। এখানে ওকে আরো অপূর্ব দেখাচ্ছিল। ট্রেনে যেতে গিয়ে যেখানে দেখেছিলাম সেখান থেকে এই জায়গা খুব বেশি দূরে নয়। ২-৩ কিমি হতে পারে আনুমানিক। অর্থাৎ নীলকণ্ঠ এখন কাছাকাছি কোথাও ডেরা বেঁধেছে এবং এটা বেশ আনন্দের সংবাদ।
আমার পক্ষিপ্রেমিক বন্ধুদের এই সংবাদ দেওয়া মাত্র তারা উত্তেজিত হয়ে পড়ল আর যে যার মতো করে বেরিয়ে পড়ল। পরে জানতে পেরেছি বোধহয় পাঁচজনের মধ্যে একজনই দেখা পেয়েছে আমার স্থান থেকে আরো একটু এগিয়ে এসে। তারপর ওই পথে কতবার যাওয়া আসে করেছি কিন্তু নীলকণ্ঠ আর দেখা দেয়নি। কিন্তু এমনই এক অপুর্ব পাখি যে যতবার দেখবে, স্থান কালের মতো ওকে এক এক রকম লাগবে। তাই ততবার ওর ছবি বিভিন্ন প্রকারের আসবে। বলতে পারি অত্যন্ত কেতাদুরস্ত – ‘স্টাইলিশ’ – পাখি।

ছবি-লেখক
বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে