বনের ডায়েরি-পাখি দেখা-চাতক-অলোক গাঙ্গুলী-বর্ষা ২০২৪

আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা, মুনিয়া, কাজল পাখি , দোয়েল-কোকিল-ময়নাবুলবুল, বকপাখি, মোনাল দেখার গল্প,পাঁচ বউয়ের কাহিনি, ঘুঘুর বাসা, টুনটুনি,বাঁশপাতি, মোহনচূড়া , হাট্টিমাটিমটিম থেকে হটিটি, রামগাংড়া, ডাহুক কেন ডাকে, বাদামি কোকিল, পাপিয়া, পাতি জলমুরগি, প্যাঁচা, পানডুবি, নীলকণ্ঠ, কাস্তেচরা

মহাকবি কালিদাসের মেঘদূতে চাতক পাখির উল্লেখ পাওয়া যায়। জ্যাকোবিন কাক্কু নামে পরিচিত এই পাখিটিকে বাংলায় চাতক বলে। মাঝারি আকারের এই পাখিটির উপরের অংশ কালো এবং বুক ও পেটের বর্ণ সাদা। ওড়ার সময় এদের ডানার ও লেজের সাদা অংশ সহজেই দেখা যায়। অপরিণত পাখিটির বুকে রঙ সাদা হয় না বরং কিছুটা কমলা বর্ণের হয়ে থাকে। বর্ষার ঠিক আগে এই পাখিটির বঙ্গে আগমন ঘটে, তাই ভাবা হয় এই পাখিটি বর্ষাকে ডেকে নিয়ে আসে। অনেকের ধারণা, চাতক একটি কাল্পনিক পাখি, শিশুদের গল্প বলার জন্য এই পাখির উদ্ভাবন। আমার মনে পড়ে শিশু বয়সে মা জলপান করতে বলত আর জলের অপচয় না করতে সাবধান করত না-হলে চাতক পাখি হয়ে জন্মাতে হয়, চাতক বর্ষা ছাড়া জল পায় না, অন্য কোনও জলপান করে না। তাই ওই বয়সে শেখা যে জল অপচয় করা যাবে না আজও মেনে চলি। কিন্তু দেখে কষ্ট পাই যে রাস্ত্রার ধারে বসানো কল থেকে অঝোরে জল পড়ে যায়, ব্যবহারের পর কারও খেয়াল হয় না যে কলটাকে বন্ধ করি। যারা এরকম করে, পরবর্তী জন্ম হলে তারা কি সত্যিই চাতক পাখি হয় জন্ম নেবে? তবে এই চাতক পাখি কিন্তু জল নিয়ে আমাদের সত্যিই অনেক শিক্ষা দেয় আর একে দেখেই আমাদের শেখা উচিত যে জলের অপচয় করা অত্যন্ত হানিকারক সমস্ত প্রাণীদের জন্য।

এই পাখিটি সাধারণত ফড়িং, পোকা বিশেষ করে শুঁয়োপোকা খেতে পছন্দ করে। শুঁয়োপোকা খাওয়ার আগে পায়ের নখে চেপে তার ভেতরের সমস্ত অংশকে বের করে তারপর জমিয়ে খায়। এই পাখিটি নিজের বাসা তৈরি করতে পারে না, জঙ্গলের অন্যান্য পাখি বিশেষত ছাতারে পাখির বাসায় নিজেদের ডিম পাড়ে। জল পান করা ছাড়া যে বেশিদিন বেঁচে থাকা সম্ভব না, তা আমাদের সবারই জানা। কিন্তু এই পৃথিবীতেই এমন জীব আছে যারা জল পান করা ছাড়াই দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারে। বিষয়টি অবিশ্বাস্য হলেও এদের মধ্য অনেক জীবই নির্দিষ্ট কোনও উৎসের জল পান করে থাকে। এধরনের প্রাণীর মধ্যে চাতক অন্যতম। বৃষ্টির জল ছাড়া অন্য কোনও উৎসের জল পান করে না এই পাখি। কোনও স্থানে বৃষ্টি কম হলেও অন্য কোনও উৎস থেকে জল পান করে না চাতক। এই পাখিকে খাঁচায় পুষে পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যে এরা আসলেই বৃষ্টির জল ছাড়া অন্য জল পান করে না। বর্ষার ঠিক আগে এই পাখিটির আগমন ঘটে। তাই ভাবা হয় এই পাখিটি বর্ষাকে ডেকে নিয়ে আসে। ওড়ার সময় এদের ডানার ও লেজের সাদা অংশ সহজেই দেখা যায়। অপরিণত পাখির বুকের রঙ সাদা হয় না, বরং কিছুটা কমলা বর্ণের হয়ে থাকে। মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এ চাতক পাখির উল্লেখ পাওয়া যায়।

এর মাথার ওপরে ঝুঁটি এর সৌন্দর্য অনেক মাত্রায় বাড়িয়ে তোলে। এর ডাক শুনতেও বেশ মিষ্টি লাগে। কখনও মনে হয় ‘পিহু পিহু’ করে ডাকে আবার কেউ বলে ইংরেজিতে ডাকে – ও মাই লাভ। ও মাই লাভ (Oh my love! Oh my love!)। এটা পড়ার পর আমি তৎক্ষণাৎ আমার ডিজিটাল বই খুলে ওর রেকর্ড করা ডাক শুনলাম – আমার তো তাই মনে হল। যে বলেছে ইংরেজি ডাক ডাকে, একদম ঠিক বলেছে। তবে কে ওর প্রেম সেটা জানা নেই। হয়তো বর্ষার জল, তৃষ্ণার্ত পাখি বর্ষাকে নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়ে আহ্বান করছে।

এক বর্ষার সকালে আমি আমাদের বাড়ির ছাদে রয়েছি, ছুটির দিন। আকাশে ঘন গহন মেঘের ছটা, আজকাল বর্ষাকালে এরককম কালো ঘন মেঘ দেখাই যায় না। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে বর্ষাকাল উপভোগ করছি। গাছগাছালিতে অনেকরকমের পাখির কিচিরমিচির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। বেশ ভালো লাগছিল এই পরিবেশ। হঠাৎ এর মধ্যে শুনতে পেলাম এক উচ্চৈঃস্বরে পাখির ডাক, এই আওয়াজকে ঠিক কিন্তু কর্কশ বলা যাবে না। ডাকটি বেশ সুরেলা, মধুর অথচ উচ্চৈঃস্বরে। ডানা মেলে এক ঝুঁটিওয়ালা সাদা-কালো পাখি এসে বসল ঠিক আমার চোখের সামনে এক গাছের ডালে। আমার হাতে তখন চায়ের কাপ, অনেকটা চা রয়েছে কাপে, চা পান করব নাকি দৌড়ে নীচে নেমে ক্যামেরা নিয়ে আসব। আস্তে করে দরজার কাছে গিয়ে আমার স্ত্রীকে একটা ডাক দিয়ে বললাম যদি ছাদে ক্যামেরার ব্যাগটা পৌঁছে দেয়। সে কাজে ব্যস্ত তখন রন্ধন-প্রণালীতে, তাও কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য খুব একটা বিরক্তি প্রকাশ না করে ব্যাগটা ছাদে পৌঁছে দিল। সে নিজেও অবশ্য একজন পক্ষীপ্রেমী, তাই বোধ হয়। বহু জায়গায় আমার সঙ্গী পাখি দেখতে যাওয়ার জন্য। গত শীতকালে চুপিরচরে গিয়েছিল আমার সঙ্গে। পাখিটা গাছে বসে ডেকে যাচ্ছিল আর বোধহয় খেয়াল করছিল আমার ক্যামেরা সরঞ্জাম গোছানো। ও বোধহয় ছবি তোলাতে অভ্যস্ত। তাই অপেক্ষায় বসে থাকল। এবার ক্যামেরা লেন্স তাক করাতে আরও একটু ভালো করে পোজ (অঙ্গভঙ্গি) দিল। আমি আমার লাইফ-টাইমের (জীবদ্দশা) চাতকের ছবি পেয়ে গেলাম।

bonerdiary (2)

আমার মনে হয়েছে ২০২৩ সালের গ্রীষ্মকাল খুবই মারাত্মক। এপ্রিল মাস থেকেই পারদ ৪২ ডিগ্রিতে চেপে বসে, যাকে বলে পরিশ্রম না করেও মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়েছে। বিপুল পরিমাণে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র বিক্রি হয়েছে আর বোধহয় তার তিনগুণ গাছ কাটা পড়েছে সড়ক প্রশস্তিকরণ এবং অট্টালিকা নির্মাণের জন্য। তার সঙ্গে বিঘ্নিত হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। সব মিলিয়ে ত্রাহি-ত্রাহি রব। অথচ প্রকৃতি ঈশ্বরের করুণার কোনও চিহ্নমাত্র নেই। আকাশে মেঘ নেই আর বাতাসে চাতক নেই যে মেঘকে ডেকে আনবে। আমি ভাবি এই গরমে আমরা মানুষেরা এবং অন্যান্য প্রাণীরা যখন নাজেহাল অবস্থা, লিটার-কে-লিটার জল পান করে নিচ্ছি, ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা পানীয় এবং জল নিমেষে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, এই চাতক পাখিরা নাকি বৃষ্টির জল ছাড়া অন্য জল পান করে না। কী অদ্ভুত ব্যাপার, এদের এই গরমে জল তেষ্টাও পায় না! তবে কি এরা সঠিক দিনক্ষণ জানে বছরের। মানুষের হা-পিত্যেশ দেখে এরা হয়তো মজা পায়। নিজেরা যেই বর্ষা আগমনের সংকেত পায় তখনই সকলকে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে জানান দিয়ে দেয়।

এরপর এই অসহ্য গরমে বৃষ্টির জন্য শূন্যে চাতকের মতো তাকিয়ে না থেকে বরং চাতকের ডাকের অপেক্ষায় থাকা বেশি ভালো। একমাত্র ওই বৃষ্টির আগমনবার্তা নিয়ে আসে। চাতকের ডাক আর যাই হোক স্বস্তির ভাব নিয়ে আসবে মস্তিষ্কে, এই বুঝি বর্ষা এল। ২০২৩-এর ১৫ই জুন জয়ঢাক ওয়েবজিনের বর্ষা ইন্টারনেট সংখ্যা প্রকাশিত হল অথচ এখন পর্যন্ত চাতকের দেখা নেই। আকাশেও চোখ রয়েছে আর কান পেতে রয়েছি বাইরে, এই বুঝি চাতক এল তার সুরেলা ডাকের সঙ্গে। এই প্রসঙ্গে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন এখানে। আমাদের বন, জঙ্গল, গাছগাছালি সবকিছু বিনাশের জন্য আমরা মানুষেরাই দায়ী, আমরাই ঘাতক, তাই বর্ষাকালেও আমরা হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াই আকাশে মেঘের চিহ্ন, যদি বৃষ্টি পাই – তাই আমরাও এখন চাতক।

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Leave a Reply